Thursday, December 5, 2019

মিলাদ-কিয়াম করা কি জায়েজ? মিলাদ-কিয়ামে রাসুল সা. কি হাজির নাজির হোন?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

মিলাদ-কিয়াম করা কি জায়েজ? মিলাদ-কিয়ামে রাসুল সা. কি হাজির নাজির হোন?

বিদআতী পির অলি ও আলেমগণ রাসুল সা. এর উপর দরুদ ও সালাত পেশ করার  দলীল দিয়ে মিলাদ কিয়াম ফরজ করে নিয়েছেন। আল্লাহ যা করতে বলেন বা নিষেধ করেন তা পালন করা  ফরজ। তেমনি কুরআন ও হাদিসে দরুদ ও সালাত পেশ করার হুকুম এসেছে এবং দরুদ ও সালাত কিভাবে পেশ করতে হয় তা রাসুল (সাঃ) শিখে দিয়েছেন। এর বাহিরে আমাদের যাওয়া যাবে না। কিন্তু বিদআতিরা জিগা গাছের আঠা কাঁঠাল গাছে লাগিয়ে এমনভাবে আটকে গেছে সেজায়গা থেকে এখন তারা বের হতে পারছে না। কারণ তাদের এই আনুষ্ঠানিকতা এখন হয়ে গেছে ইনকামের পথ। এখন দরুদ ও সালাত পেশ করার দলিল আমরা জেনে নেই।

কুরআন হতে দলিল,

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর প্রতি সালাত-দরুদ পেশ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত পেশ করো এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।” (সূরা আহযাব ৫৬ আয়াত)।

মূল অর্থঃ

“নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তার ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোআ-ইসতেগফার করেন। (১) হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত (২) পাঠ কর এবং তাকে যথাযথ ভাবে সালাম (৩) জানাও”। (সূরা আহযাব ৫৬ আয়াত)।

(১) আরবী ভাষায় সালাত শব্দের অর্থ রহমত, দো'আ প্রশংসা। অধিকাংশ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর নবীর প্রতি যে সালাত সম্পৃক্ত করা হয়েছে এর অর্থ, আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন। তার কাজে বরকত দেন। তার নাম বুলন্দ করেন। তার প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেন। ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তার উপর সালাত প্রেরণের অর্থ হচ্ছে, তারা তাকে চরমভাবে ভালোবাসেন এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করেন, আল্লাহ যেন তাকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন, তার শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাকে সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেন। তার উপর রহমত নাযিল করেন। আর সাধারণ মুমিনদের তরফ থেকে সালাতের অর্থ দো'আ ও প্রশংসার সমষ্টি। এ আয়াতের তাফসীরে আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ্ তা'আলার সালাতের অর্থ আল্লাহ কর্তৃক ফিরিশতাদের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও প্রশংসা করা। (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর)।

আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান দুনিয়াতে এই যে, তিনি ফিরিশতাদের কাছে তার কথা আলোচনা করেন। তাছাড়া তার নামকে সমুন্নত করেন। তিনি পূর্ব থেকেই তার নাম সমুন্নত করেছেন। ফলে আযান, ইকামত ইত্যাদিতে আল্লাহর নামের সাথে সাথে তার নামও শামিল করে দিয়েছেন, তার দ্বীন পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন, প্ৰবল করেছেন; তার শরীয়তের কাজ কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছেন এবং তার শরীয়তের হেফাযতের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে আখেরাতে তার সম্মান এই যে, তার স্থান সমগ্র সৃষ্টির ঊর্ধ্বে রেখেছেন এবং যে সময় কোন নবী ও ফেরেশতার সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে না, তখনও তাকে সুপারিশের ক্ষমতা দিয়েছেন, যাকে “মাকামে-মাহমুদ” বলা হয়। মনে রাখা প্রয়োজন যে, রাসূলের উপর সালাত প্রেরণের ক্ষেত্রে সালাত শব্দ দ্বারা একই সময়ে একাধিক অর্থ (রহমত, দো'আ ও প্রশংসা) নেয়ার পরিবর্তে সালাত শব্দের এক অর্থ নেয়াই সঙ্গত অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান, প্রশংসা ও শুভেচ্ছা। (দেখুন: ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউল আফহাম)।

(২) আয়াতের আসল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করার আদেশ দান করা। কিন্তু তা এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, প্রথমে আল্লাহ স্বয়ং নিজের ও তার ফেরেশতাগণের দরূদ পাঠানোর কথা উল্লেখ করেছেন। অতঃপর সাধারণ মুমিনগণকে দরূদ প্রেরণ করার আদেশ দিয়েছেন।

অধিকাংশ ইমাম এ বিষয়ে একমত যে, কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উল্লেখ করলে অথবা শুনলে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (দেখুন: কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর)।

কেননা, হাদীসে এরূপ ক্ষেত্রে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব হওয়া বর্ণিত আছে। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লাঞ্ছিত হোক সেই ব্যক্তি, যার নিকট আমার নাম উচ্চারিত হয় কিন্তু সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে না। লাঞ্ছিত হোক সেই ব্যক্তি, যার কাছে রমাযান মাস আসে আবার তার গুনাহ ক্ষমার আগে সে মাস চলে যায়। লাঞ্ছিত হোক সেই ব্যক্তি, যার নিকট তার বৃদ্ধ মা-বাপ অথবা দু’জনের একজন বেঁচে থাকে অথচ তারা তাকে জান্নাতে পৌঁছায় না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৭, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩৫৪৫, সহীহ আত্ তারগীব, হাকিম ১/৫৪৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

অন্য এক হাদীসে আছে- খলীফাহ্ ’আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রকৃত কৃপণ হলো সে ব্যক্তি, যার কাছে আমার নাম উচ্চারিত হবার পর আমার ওপর দরূদ পাঠ করেনি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯৩৩, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩৫৪৬, ইরওয়া ৫, আহমাদ ১৭৩৬, হাকিম ১/৫৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্যের জন্য ‘সালাত’ পেশ করা জায়েয কিনা, এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি দল, কাযী ঈয়াদের নাম এ দলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, একে সাধারণভাবে জায়েয মনে করে। এদের যুক্তি হচ্ছে, কুরআনে আল্লাহ নিজেই অ-নবীদের ওপর একাধিক জায়গায় সালাতের কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়া সাল্লামও একাধিকবার অ-নবীদের জন্য সালাত শব্দ সহকারে দোআ করেন। যেমন একজন সাহাবীর জন্য তিনি দো'আ করেন, হে আল্লাহ! আবু আওফার পরিজনদের ওপর সালাত পাঠাও। জাবের ইবনে আবদুল্লাহর স্বামীর ওপর সালাত পাঠান। যারা যাকাত নিয়ে আসতেন তাদের পক্ষে তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! ওদের উপর সালাত পাঠাও। সা'দ ইবনে উবাদার পক্ষে তিনি বলেন, হে আল্লাহ! সা'দ ইবন উবাদার পরিজনদের ওপর তোমার সালাত ও রহমত পাঠাও। আবার মুমিনের রূহ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর দিয়েছেন যে, ফেরেশতারা তার জন্য সালাত পাঠ করে।

কিন্তু মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশের মতে এমনটি করা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য তো সঠিক ছিল। কিন্তু আমাদের জন্য সঠিক নয়। তারা বলেন, সালাত ও সালামকে মুসলিমরা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। এটি বর্তমানে তাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাই নবীদের ছাড়া অন্যদের জন্য এগুলো ব্যবহার না করা উচিত। এ জন্যই উমর ইবনে আবদুল আযীয একবার নিজের একজন শাসনকর্তাকে লিখেছিলেন, “আমি শুনেছি কিছু বক্তা এ নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে শুরু করেছেন যে, তারা ‘আস-সালাতু আলান নাবী’-এর মতো নিজেদের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারীদের জন্যও “সালাত” শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমার এ পত্র পৌছে যাবার পরপরই তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখো এবং সালাতকে একমাত্র নবীদের জন্য নির্দিষ্ট করে অন্য মুসলিমদের জন্য দো'আ করেই ক্ষান্ত হবার নির্দেশ দাও।” (রূহুল মা'আনী)।

সহিহ হাদিস হতে দলিল,

আবদুর রহমান ইবনু আবূ লায়লা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কা‘ব ইবনু ‘উজরাহ্ (রাঃ)-এর সাথে আমার দেখা হলে তিনি বললেন, হে ‘আবদুর রহমান! আমি কি তোমাকে একটি কথা উপহার দিব যা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছি? উত্তরে আমি বললাম, হাঁ আমাকে তা উপহার দিন। তিনি বললেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনার প্রতি আমরা ‘সালাম’ কিভাবে পাঠ করবো তা আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা আপানার ও আপনার পরিবারে প্রতি ‘সালাত’ কিভাবে পাঠ করবো? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা বলো,

‘‘আল্লা-হুম্মা সল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিও ওয়া ‘আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- সল্লায়তা ‘আলা- ইবরা-হীমা ওয়া ‘আল- আ-লি ইবরা-হীমা ইননাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক ‘আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- বা-রাকতা ‘আলা- ইবরা-হীমা ওয়া ‘আলা- আ-লি ইবরা-হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ’’

(অর্থঃ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি রহমত বর্ষণ কর, যেভাবে তুমি রহমত বর্ষণ করেছো ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবার-পরিজনের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! তুমি বারাকাত নাযিল কর মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি, যেভাবে তুমি বারাকাত নাযিল করেছো ইব্রাহীম ও ইব্রাহীমের পরিবার-পরিজনের প্রতি। তুমি বড় প্রশংসিত ও সম্মানিত)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), ৯১৯ সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৩৭০, ৪৭৯৭, ৬৩৫৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আত তামীমী (রহঃ)....আবূ মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন, আমরা তখন সা’দ ইবনু উবাদাহ (রাযিঃ) এর বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। বাশীর ইবনু সা’দ (রাযিঃ) তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মহান আল্লাহ আপনার উপর দুরূদ পাঠ করার জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা কিভাবে আপনার উপর দুরূদ পাঠ করব? রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে থাকলেন। এমনকি আমরা আফসোস করে বললাম, সে যদি তাকে এ প্রশ্ন না করত।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমরা বল-

"আল্লাহুম্মা সল্লি আলা- মুহাম্মাদিন ওয়া আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- সল্লাইতা আলা- আ-লি ইবর-হীমা ওয়াবা-রিক আলা- মুহাম্মাদিন ওয়া আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বা-রকতা আলা আ-লি ইবর-হীমা ফিল আলামীন। ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ"

অর্থাৎ "হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ও তার পরিবার পরিজনের উপর রহমত বর্ষণ করো— যেভাবে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবার-পরিজনের উপর রহমত বর্ষণ করেছ। তুমি মুহাম্মাদ ও তার পরিবার-পরিজনকে বারাকাত ও প্রাচুর্য দান করো— যেভাবে তুমি ইবরাহীম (আঃ) এর পরিবার-পরিজনকে দুনিয়া ও আখিরাতে বারাকাত ও প্রাচুর্য দান করেছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত।" আর সালাম দেয়ার নিয়ম যা তোমরা ইতিপূর্বে জেনেছ। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪০৫, সুনান আততিরমিযী ৩২২০, সুনান আননাসায়ী ১২৮৫, ১২৮৬, সুনান আবূ দাউদ ৯৭৯, আহমাদ ১৬৬১৯, ১৬৬২৪, ২১৮৪৭, মুওয়াত্তা মালিক ৩৯৮, দারেমী ১৩৪৩, (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭৯০, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮০২)। হাদিসের মানঃ  সহিহ (Sahih)।

আবূ হুমায়দ আস্ সা‘ইদী (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনার প্রতি কিভাবে দরূদ পাঠ করব? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা বল,

‘‘আল্লা-হুম্মা সল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয্ওয়া-জিহী ওয়া যুররিইয়্যাতিহী কামা- সল্লায়তা ‘আলা- আ-লি ইব্র-হীমা ওয়াবা-রিক ‘আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয্ওয়া-জিহী ওয়া যুররিইয়্যাতিহী কামা- বা-রকতা ‘আলা- আ-লি ইব্র-হীমা ইন্নাকা হামীদুম্ মাজীদ’’

(অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ এবং তাঁর পত্নীগণ ও বংশধরগণের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করো, যেভাবে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিজনের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করেছো এবং মুহাম্মাদ এবং তাঁর পত্নীগণ ও বংশধরগণের প্রতি তোমার কল্যাণ নাযিল করো, যেভাবে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবার-পরিজনের প্রতি কল্যাণ নাযিল করেছো। অবশ্যই তুমি খুব প্রশংসিত এবং খুব সম্মানিত।)।  (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত),৯২০,সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৩৬০, ৩৩৬৯,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪০৭, সুনান আবূ দাঊদ ৯৭৯, সুনান আননাসায়ী ১২৯৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৯০৫, আহমাদ ২৩৬০০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৯১৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৮০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

দরূদ পাঠের ফজিলত

নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা তাঁর উম্মতের প্রতি অবশ্য পালনীয় একটি ইবাদত। এই ইবাদত পালনের মাধ্যমে দরূদ পাঠকারী অনেক ছওয়াবের অধিকারী হয়ে থাকে, যা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি ফজিলত উল্লেখ করা হলোঃ-

(১) আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত লাভঃ

দরূদ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ করা যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২১,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪০৮, সুনান আবূ দাঊদ ১৫৩০, সুনান আননাসায়ী ১২৯৬, সুনান আততিরমিযী ৪৮৫, আহমাদ ৮৮৫৪, দারেমী ২৮১৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৫৬, রিয়াযুছ ছালেহীন ১৩৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের কাছে তাশরীফ আনলেন। তখন তাঁর চেহারায় বড় হাসি-খুশী ভাব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমার নিকট জিবরীল (আঃ) এসেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার রব বলেছেন, আপনি কি এ কথায় সন্তুষ্ট নন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ আপনার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে আমি তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবো? আর আপনার উম্মাতের কোন ব্যক্তি আপনার ওপর একবার সালাম পাঠালে আমি তার উপর দশবার সালাম পাঠাবো? (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৮, সুনান আননাসায়ী ১২৮৩, ছহীহুল জামে ৭১, দারিমী ২৮১৫)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমত। তিনি বান্দার সকল ভাল কাজকেই ১০ গুণ করে বৃদ্ধি করেন। (সুরা আন‘আম ৬/১৬০)।

’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে একটি খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন। এখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর দরবারে সাজদারত হলেন। সিজদা্ এত দীর্ঘ করলেন যে, আমি ভীত হয়ে পড়লাম। আল্লাহ না করুক তাঁকে তো আবার আল্লাহ মৃত্যুমুখে পতিত করেননি? ’আবদুর রহমান বলেন, তাই আমি তাঁর কাছে এলাম, পরখ করে দেখার জন্য। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাথা উঠালেন এবং বললেন, কি হয়েছে? আমি তাঁকে আমার আশংকার কথা বললাম। ’আবদুর রহমান বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন আমাকে বললেনঃ জিবরীল (আঃ) আমাকে বললেন, আমি কি আপনাকে এই সুসংবাদ দিবো না যা আল্লাহ তা’আলা আপনার ব্যাপারে বলেন? যে ব্যক্তি আপনার ওপর দরূদ পাঠ করবে আমি তার প্রতি রহমত বর্ষণ করব। যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাম পাঠাবে আমি তার প্রতি শান্তি নাযিল করব।

(নবী করীম (ছাঃ) বলেন) ‘আর এজন্য আমি শুকরিয়ার সিজদা করি’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯৩৭, আহমাদ ১৬৬৫, ১৬৬৪, সহীহ আত তারগীব ১৬৫৮, হাকিম ২০১৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(২) ফেরেশতা কর্তৃক আল্লাহর কাছে রহমতের জন্য দো‘আঃ

রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠকারীর জন্য ফেরেশতারা আল্লাহর নিকটে দো‘আ করে থাকেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা জুমু‘আর দিন আমার ওপর বেশী পরিমাণ করে দরূদ পড়ো। কেননা এ দিনটি হাজিরার দিন। এ দিনে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) হাজির হয়ে থাকেন। যে বক্তি আমার ওপর দরূদ পাঠ করে তার দরূদ আমার কাছে পেশ করা হতে থাকে, যে পর্যন্ত সে এর থেকে অবসর না হয়। আবুদ্ দারদা বলেন, আমি বললাম, মৃত্যুর পরও কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা‘আলা নবীদের শরীর ভক্ষণ করা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন। অতএব নবীরা কবরে জীবিত এবং তাদেরকে রিযক্ব  দেয়া হয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৬৬, ইরওয়াহ ১/৩৫, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৬৩৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৭২)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

তিনি আরো বলেন,

আমের ইবনু রবীআ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন কোন মুসলিম ব্যাক্তি আমার প্রতি দুরূদ পাঠ করে এবং যতক্ষণ সে আমার প্রতি দুরূদ পাঠরত থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তার জন্য দুআ করতে থাকেন। অতএব বান্দা চাইলে তার পরিমাণ (দরূদ পাঠ) কমাতেও পারে বা বাড়াতেও পারে। (সুনান ইবনু মাজাহ ৯০৭; ছহীহুল জামে‘ ৫৭৪৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৩) পাপ মোচন, ছওয়াব ও মর্যাদা লাভঃ

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ গুনাহ মাফ, ছওয়াব ও মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তা’আলা তার ওপর দশবার রহমত নাযিল করবেন। তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে, আর আল্লাহর নৈকট্যের জন্য দশটি মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২২, সুনান আননাসায়ী ১২৯৭, হাকিম ১/৫৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(৪) ক্বিয়ামতের দিন মর্যাদা লাভঃ

দুনিয়াতে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি যারা যত বেশী দরূদ পাঠ করবে ক্বিয়ামতের দিন তারা রাসূল (ছাঃ)-এর তত বেশী নিকটবর্তী হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কিয়ামতের দিন আমার নিকটতম ব্যক্তি হবে যে আমার প্রতি বেশি পরিমাণে দরূদ পাঠ করেছে। (সুনান আততিরমিযী ৪৮৪, রিয়াযুছ ছালেহীন ১৩৯৮; ছহীহ আত-তারগীব ১৬৬৮)। হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai'f)।

(৫) রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত লাভঃ

দরূদ পাঠের আরেকটি ফযীলত হলো ক্বিয়ামতের দিন রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত লাভ করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল অথবা আমার জন্য ‘অসীলার’ দো‘আ করল ক্বিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে শাফা‘আত করা আমার জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে’। (ইমাম ইসমাঈল বিন ইসহাক্ব আল-কাযী (১৯৯-২৮২ হিঃ) : ফাযলুছ ছালাত ‘আলান নাবী (ছাঃ), তাহক্বীক : আলবানী (বৈরূত : মাকতাবা ইসলামিয়া, ২য় প্রকাশ, ১৩৮৯ হিঃ ১৯৯৬ খৃঃ), পৃঃ ৫১, নং ৫০)।

তিনি আরো বলেন,

’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনলে উত্তরে সে শব্দগুলোরই পুনরাবৃত্তি করবে। আযান শেষে আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে। কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে (এর পরিবর্তে) আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ’ওয়াসীলা’ প্রার্থনা করবে। ’ওয়াসীলা’ হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজন পাবেন। আর আমার আশা এ বান্দা আমিই হব। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ’ওয়াসীলা’র দু’আ করবে, কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে পড়বে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬৫৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৩৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৮৪, সুনান আবূ দাঊদ ৫২৩, সুনান আননাসায়ী ৬৭৮, সুনান আততিরমিযী ৩৬১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৬৯০, ইরওয়া ২৪২, সহীহ আল জামি‘ ৬১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(৬) জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা লাভঃ

জান্নাতে উচ্চমর্যাদা লাভের জন্য রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠের কোন বিকল্প নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

ব্যক্তি যত বেশী আমার প্রতি দরূদ পাঠ করবে, সে ব্যক্তি (জান্নাতে) মর্যাদায় তত বেশী আমার নিকটবর্তী হবে’। (বায়হাক্বী; আস-সুনানুল কুবরা ৩/২৪৯; ছহীহ  তারগীব হা/১৬৭৩)।

(৭) ফেরেশতারা রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে দরূদ পৌঁছানঃ

দুনিয়াতে রাসূলের উপরে কেউ দরূদ পাঠ করলে বা সালাম পেশ করলে ফেরেশতারা তা রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে পৌঁছে দেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

আনাস (রাঃ)] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কিছু মালাক (ফেরেশতা) আছেন যারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান। তারা আমার উম্মাতের সালাম আমার কাছে পৌঁছান। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৪, সুনান আননাসায়ী ১২৮২, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ২৮৫৩, হাকিম ২/৪২১, দারিমী ২৮১৬, আহমাদ হা/৩৬৬৬, ৪২১০; ইবনে হিববান ৯১৪; ছহীহ  তারগীব ১৬৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন,

তোমরা আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ কর। কেননা আল্লাহ আমার কবরের কাছে ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন। যখন আমার উম্মতের কোন লোক আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে, তখন ফেরেশতা আমাকে জানায় যে, নিশ্চয়ই অমুকের ছেলে অমুক আপনার প্রতি এই সময়ে দরূদ পাঠ করেছে’। (ছহীহুল  জামে‘ হা/১২০৭)।

অন্য হাদীছে এসেছে,

রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর কবরের উপর একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে থাকেন এবং যখনই কেউ দরূদ পাঠ করে তখনই তাকে বলেন, হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! অমুকের ছেলে অমুক আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করেছেন। (ছহীহ  আত-তারগীব ও তাহযীব ২/২৯৬; হা/১৬৬৭)।

উল্লেখ্য যে, এই দরূদ পাঠের জন্য রাসূল (ছাঃ)-এর কবরের কাছে যাওয়া শর্ত নয়; বরং বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কোন সময় দরূদ পাঠ করলেই রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে তা পৌঁছানো হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা আমার কবরকে উৎসব কেন্দ্রে পরিণত করো না। তোমরা আমার প্রতি দরূদ পেশ কর। কারণ তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের পেশকৃত দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়’।

মূল হাদিসঃ

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে কবরস্থান বানিও না, আর আমার কবরকেও উৎসবস্থলে পরিণত করো না। আমার প্রতি তোমরা দরূদ পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌঁছে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৬, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪২, সহীহ আল জামি‘ ৭২২৬)।  হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

মুসলিম সমাজে বর্তমানে ধর্মের নামে আলেম-ওলামার কবরকে কেন্দ্র করে যে অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে সেগুলোর কোনটিই জায়েয নয়। এজন্য রাসূল (ছাঃ) সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,

‘সাবধান, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের নবী ও সৎকর্মশীল বান্দাদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছিল। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করছি’।

মূল হাদিসঃ

 আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) [শব্দাবলী আবূ বকর এর] ... জুনদুব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তাকে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের মধ্যে থেকে আমার কোন খলীল বা একান্ত বন্ধু থাকার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে মুক্ত। কারণ মহান আল্লাহ ইবরাহীমকে যেমন খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, সে রকমভাবে আমাকেও খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমি আমার উম্মাতের মধ্য থেকে কাউকে খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলে আবূ বকরকেই তা করতাম। সাবধান থেকো তোমাদের পূর্বের যুগের লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরসমূহকে মাসজিদ (সাজদার স্থান) হিসেবে গ্রহণ করত। সাবধান তোমরা কবরসমূহকে সাজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করে যাচ্ছি। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১০৭৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৩২, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১০৬৯, ইসলামীক সেন্টার ১০৭৭, ছহীহুল জামে‘ ২৪৪৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উবাইদুল্লাহ ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবন ’উতবাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। আয়িশাহ ও ’আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযি.) বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যু পীড়া শুরু হলে তিনি তাঁর একটা চাদরে নিজ মুখমণ্ডল আবৃত করতে লাগলেন। যখন শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো, তখন মুখ হতে চাদর সরিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বললেনঃ ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। (এ বলে) তারা যে (বিদ’আতী) কার্যকলাপ করত তা হতে তিনি সতর্ক করেছিলেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৩৫, ৪৩৬, ১৩৩০, ১৩৯০, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪১, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪, ৫৮১৫, ৫৮১৬; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১০৭৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৩১; আহমাদ ১৮৮৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(৮) রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক সালামের জবাব দানঃ

কেউ যদি সালাম পেশ করে তাহলে রাসূল (ছাঃ) সেই সালমের জবাব দেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ আমার ওপর সালাম পাঠ করলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা আমার কাছে আমার রূহ ফেরত দেন যাতে আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৫, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪১, সহীহ আল জামি‘ ৫৬৭৯, বায়হাক্বীর দা‘ওয়াতে কাবীর ১৭৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৯) দরূদ পাঠের মাধ্যমে চিন্তা দূর হয়ঃ

রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠের কারণে চিন্তা দূর হয় এবং পাপ মোচন হয়। উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার উপর অনেক বেশী দরূদ পাঠ করি। আপনি আমাকে বলে দিন আমি (দু’আর জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ করে রেখেছি তার) কতটুকু সময় আপনার উপর দরূদ পাঠাবার জন্য নির্দিষ্ট করব? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়। আমি আরয করলাম, যদি এক-তৃতীয়াংশ করি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়, যদি আরো বেশী কর তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর। আমি আরয করলাম, যদি অর্ধেক সময় নির্ধারণ করি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার মন যতটুকু চায় কর। যদি আরো বেশী নির্ধারণ কর তাহলে তোমর জন্যই ভালো। আমি বললাম, যদি দুই-তুতীয়াংশ করি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরো বেশি নির্ধারণ কর তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি আরয করলাম, তাহলে আমি আমার দু’আর সবটুকু সবসময়ই আপনার উপর দরূদ পড়ার কাজে নির্দিষ্ট করে দেব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে, তোমার দীন-দুনিয়ার মকসুদ পূর্ণ হবে এবং তোমার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৯, তিরমিযী ২৪৫৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৭০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(১০) দরূদ পাঠের দ্বারা অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ঃ

রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করলে অন্তর পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা আমার প্রতি দরূদ পাঠ কর। নিশ্চয়ই আমার উপর তোমাদের দরূদ তোমাদের (অন্তরের) পবিত্রতা। আর তোমরা আমার জন্য আল্লাহর নিকট ‘ওয়াসীলা’ চাও’।  (সিলসিলা ছহীহা হা/৩২৬৮)।

(১১) দো‘আ কবুল হয়ঃ

হামদ ও ছানা তথা আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করার পরে দো‘আ করা হলে তা কবুল হয়।

আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সালাত আদায় করছিলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর কাছে ছিলেন আবূ বকর ও ’উমার (রাঃ)। সালাত শেষে আমি যখন বসলাম, আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করলাম, এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর দরূদ পাঠ করলাম। তারপর আমি আমার নিজের জন্য দু’আ করতে লাগলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চাও, তোমাকে দেয়া হবে। চাও, তোমাকে দেয়া হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯৩১, সুনান আততিরমিযী ৫৯৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

অপর দিকে দরূদ পাঠ না করে দো‘আ করলে তা আল্লাহর কাছে পৌঁছতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক দো‘আ দরূদ পাঠ না করা পর্যন্ত আড়াল করে রাখা হয়’। (আল-মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৭২১; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫২৩; ছহীহাহ হা/২০৩৫)।

(১২) বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হওয়া থেকে রক্ষাঃ

রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করলে আল্লাহ বান্দাকে দুনিয়া ও আখেরাতে বিপদ ও আশাহত হওয়া থেকে রক্ষা করবেন। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে সমস্ত লোক কোন দরবারে বসেছে অথচ তারা আল্লাহ তা’আলার যিকর করেনি এবং তাদের নবীর প্রতি দরূদও পড়েনি, তারা বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হবে। আল্লাহ তা’আলা চাইলে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন কিংবা মাফও করতে পারেন। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩৩৮০, সহীহাহ ৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এতক্ষণে আমরা রাসুল সা. এর উপর দরুদ ও সালাত পেশ করার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে জানলাম। বিদআতি পীর অলি ও আলেমগণ এইসব দলিলগুলো দিয়েই বলে, যেখানে আল্লাহ ও ফেরাশ্তাগণ রাসুল সা. এর উপর দরুদ ও সালাম পেশ করেন সেখানে আমাদেরকেও দরুদ ও সালাম পেশ করতে হবে। তারপর শুরু হলো ইয়া নবী সালামু আলাইকুম…….। এদের নামাজ নাই, রোজা নাই কিন্তু মিলাদ কিয়াম করতেই হবে, নাহলে রাসুল সা. কিয়ামতে সুপারিশ করবেন না, পীর, অলীরাও মুরিদদেরকে সুপারিশ করবেন না ইত্যাদি। আসুন জেনে নেই, মিলাদ-কিয়াম এর শরঈ বিধান কি?

মিলাদ-কিয়াম এর শরয়ী বিধান

‘মিলাদ’ এর শাব্দিক অর্থ - জন্মকাল। ‘মিলাদ’ এর পারিভাষিক অর্থ- কয়েক জন বা কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে হুজুর (সাঃ) এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করা।

মিলাদ অনুষ্ঠান উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে অত্যন্ত বরকতময় ও ফযিলতের অনুষ্ঠান। মুসলমান জাতি হিসেবে প্রত্যেকের জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আদর্শে আদর্শিত হওয়া অত্যন্ত জরুরী, আর তজ্জন্যে রাসূল (সাঃ) এর জীবনী আলোচনা করাও জরুরী। কেননা ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ও একটি মহান শিক্ষা। আর রাসূল (সাঃ) হচ্ছে তার বাস্তবরুপ। যেমনিভাবে কালামে পাকে ইরশাদ হচ্ছে,

“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের জীবন চরিত্রে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ’। ঐ সব লোকদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল (এর মঙ্গল) প্রত্যাশা করে, এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে। (সূরা-আহযাব-২১)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছিলেন সকল প্রকার মানবিক গুণে গুণান্বিত এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বন্ধু ও শত্রু সকলের মুখে সমভাবে তাঁর অনুপম চরিত্র মাধুর্যের প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে। কঠোর প্রতিপক্ষ আবু সুফিয়ান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সম্মুখে অকুণ্ঠ চিত্তে তাঁর সততা, আমানতদারী ও সচ্চরিত্রতার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৭, ৫১, ২৬৮১, ২৮০৪, ২৯৪১, ২৯৭৮, ৩১৭৪, ৪৫৫৩, ৫৯৮০, ৬২৬০, ৭১৯৬, ৭৫৪১ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আল্লাহপাক নিজেই স্বীয় রাসূলের প্রশংসায় বলেন,  “নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী” (সুরা ক্বলম ৬৮/৪)।

রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি সর্বোত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য’। (হাকেম হা/৪২২১; ছহীহাহ হা/৪৫)।

তেমনিভাবে আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আখলাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছিলেন,

অর্থাৎ-‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র ছিল হুবহু আল-কোরআন’। (ছহীহুল জামে ৪৭১১, সহিহ মুসলিম ৭৪৬)।

সুতরাং মিলাদ তথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জীবনী আলোচনার মাধ্যমে আমাদেরকে তাঁর পূর্ণ জীবনী সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে তাঁর আদর্শে আদর্শিত হয়ে জীবনের সফলতা অর্জন করা আবশ্যকীয় কর্তব্য।

বর্তমানের প্রচলিত মিলাদ

পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, মিলাদ হচ্ছে রাসূলে কারীম (সাঃ) এর জীবনী আলোচনা করা এবং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- আলোচনার মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) জীবনী আদর্শ জানা ও তাঁর আদর্শে আদর্শিত হওয়া।

মূলত ‘মিলাদ অনুষ্ঠান ও তার উদ্দেশ্য’ বিবেচনা করলে এটা ছিল একটা উৎকৃষ্টধর্মীয় অনুষ্ঠান। মুসলিম সমাজের জন্য ছিল অত্যন্ত উপকারী ও খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে বর্তমানে আমাদের সমাজে প্রচলিত মিলাদ একটা রেওয়ায়েজী অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আদর্শ ও জীবনী বর্ণনার পরিবর্তে কয়েকজন লোক এক জায়গায় জড়ো হয়ে কিছু কল্প-কাহিনী ও সুরে সুর মিলেয়ে কিছু শে’র (আরবী কবিতা) আবৃত্তি করা,কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে সবাই দাড়িয়ে যাওয়া ও আল্লাহ,রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা দেয়া আদব লেহাজের সাথে দুরুদ-সালাম পাঠ করারপরিবর্তে নিজের মনগড়া, অশুদ্ধ ও বিকৃত ভাবে সালাম পেশ করা যা আদবের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

অতঃপর মজমা শেষে রুসুম অনুযায়ী, ফিরনী, জিলাপী বা অন্য কোন খাবার বিতরণ করাএবং আগত আলেমকে কিছু নাজরানা পেশ করা।

বস্তুত উদ্দেশ্য ও পন্থা উভয় দিক থেকে বিকৃত করে মিলাদের নামে নব্য আবিকৃত একটি রেওয়ায়েজকে বর্তমানে জাতির সামনে পেশ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ‘শুধু ধনাট্য ব্যক্তিদের সম্পদ প্রদর্শন, ব্যতিত মুসলিম উম্মাহর জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের (অন্য) কোন কল্যান তো নিহিত নেই’ই, উপরন্তু বিদ’আতী কর্মের দ্বারা আমল নষ্ট হচ্ছে। আর যারা এটা করে তাদের মধ্যে অনেকেই যেহেতু এই বিদ’আতকে বিদ’আত বলে মনে করছে না বরং এটাকেই দ্বীন বলে মনে করছে তাই সেদিক থেকে আকীদাও নষ্ট হচ্ছে। আর এভাবেই সাধারণ মুসলমানেরা দিন দিন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির ও আলেম বলে দাবীদার অনেকে’ই নিজেরা এই বিদ’আতে লিপ্ত ও জনসাধারনকেও তার প্রতি ধাবিত করছে। উপরন্তু যাঁরা ইহা করছে না বা তার সমর্থনও করে না তাঁদেরকে ওহাবী-কাফের বলে গালি-গালাজ করছে। আর নিজেরা সুন্নি নামের অন্তরালে সুন্নাতকে দাফন করে দিয়েবিদ’আতের নর্দমায় ডুবে রয়েছে।

আর এই প্রচলিত মিলাদকে জায়েজ বলে প্রমাণ করার লক্ষ্যে অনেকেই এই যুক্তি দিয়ে থাকে যে, মিলাদে পঠিত শে’র গুলোর মর্মার্থ তো খুবই ভাল। তাই এগুলো পড়লে দোষের কি আছে? কিন্তু আমরা বলব যে, যদিও এখানে ঐ শে’র অর্থাৎ- আরবী কবিতা গুলোর মমার্থ খুবই ভালো, তথাপিও তা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং বিদ’আত বলে পরিগণিত হবে। যার কারণ সমূহ আমরা সামনে উল্লেখ করবো। (ইনশাআল্লাহ)।

প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত কেন?

আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি যে, ইসলাম কোনো মানুষের মনগড়া জীবন বিধানের নাম নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (সাঃ) এর মাধ্যমে পাওয়া, সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে বাস্তবায়িত এক জীবন বিধানের নাম’ই হচ্ছে- ইসলাম। আর এই ইসলামকে আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে রাসূল (সাঃ) এর বিদ্যমান থাকাবস্থায়, আর ঘোষণা করেছেন,

“আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম”। (সূরা-মায়েদা-০৩)।

এখন একটি প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, যদি রাসূল (সাঃ)এর বিদ্যমান থাকাবস্থায়’ই দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে- পরবর্তী সোনালী তিন যুগের অনুস্মরণ জায়েয হয় কিভাবে? অথচ দ্বীন তো পূর্বেই পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। এর উত্তরে আমরা বলবো, রাসূল (সাঃ) তাঁহার পরবর্তী সময়ের জন্য শরীয়তের পথ প্রদর্শন করতে গিয়ে বলেন,

মালিক ইবনু আনাস (রাঃ) (রহঃ) হতে মুরসালরূপে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৬, মুয়াত্ত্বা মালিক ১৫৯৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

সুতরাং-শরীয়তের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে কুরআন যেমনিভাবে পালনীয় ঠিক তেমনিভাবে হাদীসও অনুসরণীয়, যেমনিভাবে কালামে পাকে ইরশাদ হচ্ছে,

অর্থাৎঃ- “বলুন যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুগত্য কর”। (সূরা-আল ইমরান-৩১)।

এমনিভাবে সূরা নিসা’র- ৮০ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে,

অর্থ-যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল সে আল্লাহরইআনুগত্য করল। (সূরা নিসা-৮০)।

বর্ণিত আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, কুরআনের অনুসরনের সাথে সাথে রাসূল (সাঃ) তথা হাদিসের অনুসরন করাও জরুরী। আর সেই হাদীসের ভাষ্যানুসারেই পরবর্তী সোনালী তিন যুগের অনুসরন জায়েয এবং অপরিহার্য, যেমন হাদীসে এসেছে,

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাঁকে বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন (একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দিন)। তিনি বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ভীতি অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো (নেতৃ-আদেশ), যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। (সুনান ইবনু মাজাহ (তাওহীদ পাবঃ)  ৪২, সুনান আততিরমিযী ২৬৭৬, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৭, আহমাদ ১৬৬৯২, দারিমী ৯৫, ইরওয়াহ ২৪৫৫, মিশকাত ১৬৫, ফিলাল ২৪-২৬, সালাতুত তারাবীহ ৮৮-৮৯, হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৪৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এমনিভাবে অন্যত্র রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন,

ইমরান ইবনে হুস্বাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হল আমার (সাহাবীদের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ীদের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবে-তাবেয়ীনদের) যুগ।” ইমরান বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর যুগের পর উত্তম যুগ হিসাবে দুই যুগ উল্লেখ করেছেন, না তিন যুগ তা আমার জানা (স্মরণ) নেই।’ “অতঃপর তোমাদের পর এমন এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদেরকে সাক্ষী মানা হবে না। তারা খেয়ানত করবে এবং তাদের নিকট আমানত রাখা যাবে না। তারা আল্লাহর নামে মানত করবে কিন্তু তা পুরা করবে না। আর তাদের দেহে স্থূলত্ব প্রকাশ পাবে”। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ৩৪৮,  সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ২৬৫১, ৩৬৫০, ৬৪২৮, ৬৬৯৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৩৬৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৩৫, আহমাদ ১৯৮৫৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৪৫৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪৭৫)।  হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সুতরাং হাদীসদ্বয়ের ভাষ্যমতে বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যূগের পরে আরো দুই যূগ অর্থাৎ তাবেয়ীন ও তাবেয়ীগণের যূগও অনুসরণীয়, যার সময় সীমা ২২০ হিঃ সাল পর্যন্ত। এই সময়ের ভিতর শরীয়তের কোনো আমল পাওয়া গেলে তা গ্রহণযোগ্য হবে, নচেৎ তা পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হবে।

এখন দেখার বিষয় হলো, আমাদের আলোচ্য বিষয় তথা প্রচলিত মিলাদ, ২২০ হিঃ সালের মধ্যে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল কি না? নাকি এটা ২২০ হিঃ সালের পর নব্যআবিষ্কৃত এমন একটি আমল যা শরীয়তে পরিত্যাজ্য।

সীরাতের কিতাবাদি থেকে প্রচলিত মিলাদের যে তথ্য আমরা পাই তা নিম্নরূপঃ

ইসলামের ইতিহাসে পূর্ণ ৬০০ বৎসরের মধ্যে মিলাদ মাহফিল নামে কোনো অনুষ্ঠান বা এরকম কোনো ইবাদতের নাম-গন্ধও ছিল না। বরং ৬০৪ হিঃ সালে ইরাকের মুসিল শহরে বাদশাহ ‘আবু সাঈদ মুজফ্ফর কুকুবুরী (মৃতঃ-৬৩০ হিঃ) দুনিয়া লোভী, পেটুক দরবারী আলেম ‘আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়া’ এর মাধ্যমে সর্বপ্রথম প্রচলিত মিলাদের সূচনা করেন। ১২ই রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে আনন্দ উৎসব ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জন্য ইসালে সওয়াব এর উদ্দেশ্যে এই প্রচলিত মিলাদ ও যিয়াফতের আয়োজন করা হয়। (ইবনে কাসীর-১৩/১৩৬, তারীখে ইবনে খাল্লেকান-৩/৫৩৭ পৃঃ)।

প্রচলিত মিলাদ মাহফিলের উদ্ভাবক ‘মৌলভী আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে দিহয়া’ সম্পর্কে জগৎ দ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) লিখেন-‘সে পূর্ববর্তী ইমাম আলেম-উলামাদের সাথে বেয়াদবী করত। সে ছিল অশ্লীলভাষী, অহংকারী, নির্বোধ এবং দ্বীন সম্পর্কে সংকীর্ণমনা ও অলস প্রকৃতির। তাঁর সম্পর্কে আল্লামা ইবনুন নাজ্জার (রহঃ) মন্তব্য করেন যে, আমি এই মৌলভীর মিথ্যাচার ও দুর্বলতা সম্পর্কে লোকদের একমত দেখেছি। (লিসানুল মিযান-৪/২৯৬)।

প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত হওয়ার প্রথম দলীলঃ

খায়রুল কুরুন তথা ইসলামের প্রথম সোনালী তিন যুগে না থাকা।

সম্মানিত পাঠক পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা ইহাই প্রতিয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কর্তৃক স্বীকৃত ইসলামের প্রাথমিক তিন স্বর্ণ যূগের মধ্যে এই প্রচলিত মিলাদের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। বরং স্বীকৃত তিন যুগঅতিবাহিত হওয়ার আরো প্রায় ৪০০ বছর পর এমন যুগে এই মিলাদের উদ্ভাবন হয়, যে যুগ সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) এর কোনো স্বীকৃতিতো নাই’ই বরং ‘তারপর হবে মিথ্যার ছড়াছড়ি’ বলে রয়েছে কঠোর হুশিঁয়ারি। উপরন্তু যার সম্পর্কে রয়েছে মিথ্যা, অহংকার ও লোভের অভিযোগ। এমন দুনিয়া লোভী আলেম দ্বারা উদ্ভাবিত কোনো অনুষ্ঠান যার অস্তিত্ব ইসলামের প্রাথমিক স্বীকৃত তিন যুগে ছিল না, এমন আমল শরীয়তে কিছুতেই স্বীকৃত হতে পারে না।

সুতরাং বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ মাহফিল কিছুতেই স্বীকৃত হতে পারে না।বরং তা সম্পূর্ণ বিদ’আত ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত হওয়ার দ্বিতীয় দলীলঃ

এমন কোনো কাজ করা রাসূল (সাঃ) এর সময় প্রয়োজন থাকা সত্বেও যা তিনি করেননি।

ঐ সমস্ত কাজও বিদ’আতের অন্তর্ভুক্ত ‘যার প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সময়েও ছিল এবং তা বাস্তবায়নে কোনো প্রকার বাঁধাও ছিল না। তথাপিও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে কখনো ঐ কাজ করেননি বা সাহাবা কেরামকেও আদেশ বা ইঙ্গিত করেননি, এবং সাহাবা কেরামগণও পরবর্তীতে ঐ কাজ কখনো করেননি।

সুতরাং-আমরা এ নীতিমালার দৃষ্টিকোন থেকেও যদি ‘বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ’ এর পর্যালোচনা ও বিচার করি তথাপিও তা সম্পূর্ণ বিদ’আত বলে বিবেচিত হচ্ছে।

কেননা যদি বলা হয় যে, মিলাদ রাসূল (সাঃ) এর প্রতি দুরুদ শরীফ পড়া বা মহাব্বত প্রকাশ করনের জন্য পড়া হয়, তাহলে তো রাসূল (সাঃ) এর প্রতি দুরুদ পড়া বা মহাব্বত প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তখনও ছিল। কিন্তু তজ্জন্যে রাসূল (সাঃ), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে’ তাবেয়ীনদের কেউই প্রচলিত এ মিলাদের সুরতে দুরুদ পাঠ বা মহাব্বত প্রকাশ করেননি। আর প্রয়োজন থাকা সত্বেও তাঁরা যা করেননি পরবর্তীরা তা করাইবিদ’আত, যা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।

অতএব, বর্তমানে প্রচলিত মিলাদও বিদ’আত ও সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।

প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত হওয়ার তৃতীয় দলীলঃ

শরীয়ত কর্তৃক স্বাধীন কোন বিষয়কে নিজেরা সীমাবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা।

প্রচলিত মিলাদকে যদি আমরা তর্কের খাতিরে কিছুক্ষণের জন্য জায়েজ বলে মেনেও নেই, তথাপিও তা বেশি থেকে বেশি মুস্তাহাব বা নফল আমল বলে গণ্য হবে। আর এমন কোনো মুস্তাহাব বা নফল আমল যার জন্য শরীয়ত কর্তৃক কোনো সীমাবদ্ধতা নির্ধারিত নেই। বান্দা নিজের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য কোনো সীমাবদ্ধতা বা তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা জায়েয নেই। অথচ বর্তমানে প্রচলিত মিলাদের মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নিয়ম নীতি নির্ধারণ ও তা মানার উপর জোর দেয়া হয়। যেমনঃ প্রথমে একজন কিছু আবৃত্তি করবে, অতঃপর সবাই সুরে সুর মিলেয়ে পড়বে, অতঃপর কিছুক্ষণ বসে আবার দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে আবার বাংলা, উর্দূ, ফারসী বা আরবী কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করা ইত্যাদি।যা শরীয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হয়নি বরং (সোনালী তিন যূগের) পরবর্তীরা তা নির্ধারণ করেছে।

আর প্রত্যেক ঐ নিয়ম-শৃঙ্খলা যা ইসলামের অনুস্মরণীয় প্রাথমিক তিন যূগের পরবর্তীরা নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে নির্ধারণ করেছেতা অবশ্যই বিদ’আত ও পরিত্যাজ্য। সুতরাং বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত ও পরিত্যাজ্য।

প্রচলিত মিলাদ বর্জনীয় হওয়ার চতুর্থ দলীলঃ

মুস্তাহাব হিসেবে স্বীকৃত কোনো আমলকে এমন গুরুত্ব সহকারে পালন করা, যে মানুষ ক্রমান্বয়ে তাকে জরুরী ও অত্যাবশ্যকীয় মনে করতে থাকে। (সিয়ায়াহ-২/২৬৫ লাহোর)।

এখানেও আমরা যদি প্রচলিত মিলাদকে জায়েয ও নফল হিসেবে মেনে নেই। তথাপিও বর্তমানের অবস্থানুযায়ী তা বিদ’আত বলে গণ্য হবে। কেননা বর্তমানে প্রচলিত মিলাদকে মানুষ এত গুরুত্ব ও অত্যাবশ্যকীয় মনে করতে শুরু করেছে, যে তা ওয়াজিব বা ফরযের চেয়েও জরুরী মনে করছে।

সমাজে কেউ দাড়ি না রাখলে (যা ওয়াজিব) নামাজ না পড়লে (যা ফরয) এবং সুদের লেনদেন (যা সম্পূর্ণ হারাম) এর সাথে জড়িত থাকলেও এত খারাপ মনে করে না, তাকে নিয়ে এত সমালোচনা করা হয় না। অথচ যে ব্যক্তি প্রচলিত মিলাদ পড়ে না তাকে নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিভিন্ন ভাবে তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়, এমনকি মিলাদ না পড়লে মসজিদ থেকে বের করে দেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। যা কিনা উপরে বর্ণিত হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও করা হয় না। বরং হারাম কাজ থেকে বাঁচা ও নামাজ আদায় করা ফরয। আর বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ না পড়নেওয়ালাদের প্রতি উক্ত ফরয আদায় করার চেয়েও বেশি চাপ সৃষ্টি করা হয়। অবস্থাদৃষ্টে বুঝা যায় তারা মুস্তাহাবকে ফরযের চেয়েও বেশি জরুরী মনে করছে। উপরন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, এই মিলাদ মাহফিল মসজিদ সমূহে হয়ে থাকে, অথচ ইবনে মাসউদ (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদল লোককে মসজিদে থেকে শুধুমাত্র এজন্যই বের করে দিয়েছেন যে, তারা মসজিদের উচ্চস্বরে لآ اله الا اللهও দুরূদ পড়তেছিল এবং তিনি তাদেরকে বললেন যে, আমি তোমাদেরকে কেবল মাত্র বেদ’আতীই মনে করি। (মিনহাজুল ওয়াজিহ-১২৭)।

ভাবার বিষয় এই যে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর মতসাহাবী মসজিদের ভেতর জোরে জিকিরকারী ও জোরে দুরূদ পাঠকারীদেরকে বিদআতী মনে করে মসজিদ হতে বের করে দিয়েছিলেন, অথচ জিকির ও দরূদ কোরআন-হাদীস দ্বারা প্রমানিত কিন্তু মসজিদে উচ্চস্বরে করার কারনে তা তিনি বিদ’আত মনে করেছেন। জিকির ও দরূদের মত প্রমানিত আমলগুলো’ই যখন সম্মিলিতভাবে, মসজিদে, উচ্চস্বরে বিত’আত, তখন ‘প্রচলিত মিলাদ’ শরীয়তে যার কোন ভিত্তি’ই নাই,তা কি কখনো সম্মিলিতভাবে, মসজিদে, উচ্চস্বরে জায়েয হতে পারে? অবশ্যই না। কিন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সম্মিলিতভাবে মসজিদে উচ্চস্বরে জিকির ও দরূদকে বিদ’আত মনে করে সম্মিলিতভাবে উচ্চস্বরে জিকিরও দরূদ পাঠ কারীকে ইবনে মাসউদ (রাঃ) মসজিদ হতে বের করে দিয়েছেন। আর বর্তমানে যারা বিদ’আত হতে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে মসজিদে উচ্চস্বরে মিলাদ পড়ে না বিদ’আতীরা তাদেরকে মসজিদ হতে বের করে দেয়। যা অত্যন্ত বাড়াবাড়ির শামিল। আর এই বাড়াবাড়ির পরিবেশ এ জন্যই সৃষ্টি হয়েছে যে, বর্তমান সমাজে মূর্খতা বেড়েগেছে আর এ মূর্খতার কারনেই মানুষ মুবাহ, মুস্তাহাব এমনকি বিদ’আতসমূহ নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। তর্কের খাতিরে অসম্ভবকে মেনে নিলেও তা বেশি থেকে বেশি মুস্তাহাব। আর কোনো জাতি যখন মুস্তাহাব কোনো আমলকে জরুরী ও অত্যাবশ্যকীয় মনে করতে শুরু করবে তখন ঐ মুস্তাহাব আমলটি ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব হয়ে পড়ে।

সুতরাং- পরিস্থিতিদৃষ্টে বর্তমানের প্রচলিত মিলাদ ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব।

প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত হওয়ার পঞ্চম দলীলঃ

আহবান করে ঐক্যবদ্ধভাবে (জামা’য়াতে) নফল ইবাদত আদায় করা।

প্রচলিত মিলাদকে যদি আমরা কিছুক্ষণের জন্য জায়েয ও নফল হিসেবে মেনেও নেই, তথাপিও বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ নাজায়েয ও পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হয়। কেননা প্রচলিত মিলাদে ঘোষনা দিয়ে কিছু লোক এক স্থানে একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে (জামায়াতে) মনগড়া ভাবে কিছু কবিতা আবৃত্তি করা হয় ও সমস্বরে নিজের খেয়াল খুশিমতো কিছু সালাত-সালাম পাঠ করা হয়, অথচ ইসলামের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ইবাদত নামাযের ক্ষেত্রেওফোকায়ে কেরাম গণের ঐক্যমত হলো যে নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরুহ।

সুতরাং-যেখানে নফল নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত জামাতে(ঐক্যবদ্ধভাবে) আদায় করা মাকরুহ। সেখানে বর্তমানের প্রচলিত মিলাদ (শরীয়তে যার কোন ভিত্তিই নেই) তা কিভাবে জায়েয হতে পারে?

অতএব, বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ সম্পূর্ণরুপে বিদ’আত ও পরিত্যাজ্য।

প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত হওয়ার ষষ্ঠ দলীলঃ

রাসুলের শানে বেয়াদবি।

বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত ও পরিত্যাজ্য হওয়ার অন্য আরেকটা কারণ হলো আকীদা গত দিক থেকে ভ্রান্তিতে নিম্মজ্জিত হওয়া, যথা:- রাসূল (সাঃ) কে হাজির-নাজির মনে করে তার সামনে চিল্লা-চিল্লি করে সালাত সালাম পাঠ করা।

রাসূল (সাঃ) প্রচলিত মিলাদ-মাহফিলে উপস্থিত হোন না এটা’ই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়া’তের আকীদা এবং এই আকীদার মাঝেই রয়েছে রাসূল (সাঃ) এর শানে তা’যীম ও সন্মান এবং ইহাই কোরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণীত সহীহ আকীদা।

উপরন্তু যারা ‘মিলাদ-মাহফিলে রাসূল (সাঃ) আগমন করেন’ বলে আকীদা পোষণ করেন, তাদের এই আকীদা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তাদের এই আকীদার পক্ষে কোরআন-হাদীস থেকে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ তো নাই’ই বরং উক্ত আকীদা কোরআন-হাদীসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

তর্কের খাতিরে সত্যকে পাশ কাটিয়ে কিছুক্ষণের জন্য যদি মেনেও নেই, যে রাসুল (সাঃ) মিলাদ মাহফিলের মজলিসে উপস্থিত হন, তবে এখানে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যথা:-রাসূল (সাঃ) কি স্বশরীরে উপস্থিত হোন, নাকি রুহানিভাবে? যদি বলা হয় যে স্বশরীরে উপস্থিত হন, তবে আমরা বলব এই আকীদা কুরআন-হাদীসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক কেননা হাদীস শরীফে এসেছে- পৃথিবীর বুকে কিছু ফেরেশতাকে আল্লাহ তায়ালা এজন্যই নির্ধারিত করে রেখেছেন যে, যেখানে’ই আমার উম্মতেরা আমার উপর দুরুদ পাঠ করবে, তারা আমার নিকট তা পৌছে দিবে। আরেক স্থানে রাসূল (সাঃ) কিয়ামত পর্যন্ত সর্বদা রওয়াজা মুবারকে থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে সেখান থেকে রওয়াজা খালি করে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নেই। উপরন্তু ইহা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যও নয়। কেননা স্বশরীরে রাসূল (সাঃ) উপস্থিত হলে অবশ্যই উপস্থিত ব্যক্তিরা দেখতে পেত। কেননা স্বশরীরে রাসূল (সাঃ) কে সাহাবায়ে কেরামগণও দেখতে পেতেন। উপরুন্তু এমন আকীদা পোষনকারী মুশরীকদের কাতারে শামিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা সে আল্লাহর খাস সিফাতের সাথে অন্যকে অন্তর্ভূক্ত করার দ্বারাআল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করেছে।

আর যদি কেউ এ দাবি করেন যে, স্বশরীরে নয় বরং রুহানীভাবে উপস্থিত হোন- তখন বলা হবে যে, যদি রাসূল (সাঃ) এর রুহ মোবারক মিলাদ মাহফিলে এসে থাকে। তাহলে রওজায় থাকা দেহ নি®প্রান হয়ে পড়ে থাকবে,আর এটাআহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা হায়াতুন্নাবী’র সম্পূর্ণ বিপরিত ও রাসূলের শানে চরম বেয়াদবী।

এরপরওযদি তর্কের খাতিরে কিছুক্ষণের জন্য তাদের কথাকে মেনে নেই তবে বলব।

একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে একসাথে মিলাদ আনুষ্ঠান হয়ে থাকে তো হযরতের রুহ মোবারক একসাথে কয় স্থানে হাজির হবে।

দ্বিতীয়ত- এর পরও যদি মেনে নেয়া হয় যে হুজুর পাক (সাঃ) মিলাদ অনুষ্ঠানে হাজির হয় তবে বলব, সূরা হুজুরাত-এর ২নং আয়াতে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন,

অর্থাৎ- “হে ঈমানদারগণ তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর উচুঁ করো না, এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উচুস্বরে কথা বলো না।এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে অথচ তোমরা টেরও পাবে না”। (সূরা-হুজরাত-আয়াত-২)।

উক্ত আয়াতের তাফসীরে কাজী আবুবকর ইবনে আরাবী (রহঃ) বলেন! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সম্মান ও আদব তাঁর ওফাতের পরেও জীবদ্দশার ন্যায় ওয়াজিব। তাই কোন কোন আলেম বলেন যে, তাঁর পবিত্র রওজার সামনেও উচ্চস্বরে সালাম কালাম করাআদবেরখেলাফ। (মা’আরেফুল কুরআন -১২৭৬)।

যদি রাসুলের সম্মানার্থে রওজার সামনে উচ্চস্বরে সালাম কালাম করা বে’য়াদবী হয়ে থাকে তবে বর্তমানে প্রচলিত মিলাদে হুজুর (সাঃ) কে হাজির-নাজিরজেনে তাঁর সামনে উচ্চস্বরে চিল্লা-চিল্লি করে সালাত সালাম পাঠ করা তো আরো বড় বে’আদবী, যা রাসূলের শানে ধৃষ্টতা প্রদর্শনেরশামিল।

আর যা রাসূলের শানে বে’আদবীও ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল তা জায়েয নেই।

অতএব বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ ও জায়েয নেই।

তৃতীয়তঃ রাসূল (সাঃ) যদি হাজির হয়েই থাকে তাহলে কখন হাজির হলো মিলাদের শুরুতে, মাঝে না শেষে? যদি বলা হয় যে তাঁকে তো দেখা যায় না। তাহলে বলব যে যদি দেখতে নাই-ই পাও তবে তাঁর আগমনের কারনে সঠিক সময়ে দাঁড়িয়ে তাকে সন্মান প্রদর্শন করে তাঁর প্রতি আদব রক্ষা করবে কিভাবে? কেননা মিলাদ মাহফিলে কিয়াম করা হয় মাহফিলের শেষ দিকে। এমতাবস্থায় রাসূলের (সাঃ) যদি আগে চলে আসেযে অবস্থায় সবাই বসে রইল এমতাবস্থায় কি রাসূলের শানে বে’আদবী হবে না? আর যদি রাসূল (সাঃ) পরে আসে যে অবস্থায় সবাই দাঁড়িয়ে ছিল। তাহলে তা রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো হলো না। এরপর রাসূল (সাঃ) আবার কখন ফিরে গেলেন? যদি বলা হয়, কিয়াম থেকে বসার পূর্বে। তাহলে বলব রাসূল (সাঃ) চলে গেল অথচ তোমরা এমনিতই দাঁড়িয়ে রইলে যা কিনা বেহুদা কাজ। আর যদি বলেন যে কিয়াম থেকে বসার পর। তাহলে বলব, তাঁর রওজার সামনে’ইযখন উচ্চস্বরে সালাম করাও আদবের খেলাফ, তবে তার সামনে মনচাহি মত ইচ্ছে হলেই দাড়িয়ে যাওয়া, আবার ইচ্ছে হলে’ই বসে যাওয়া,ইহা রাসূলের শানে সম্মান নয় বরং তাঁর সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল। আর যা রাসূলের শানে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল তা থেকে বেচেঁ থাকা জরুরী।সুতরাং কিয়াম থেকেও বেচেঁ থাকা জরুরী।

এর পরও যদি কেউ বলেন যে, না বরং রাসূল (সাঃ) যখন আসেন আমরা তখনই দাঁড়াই আর যখন চলে যায় তখন-ই বসে পড়ি, তবে বলব যে- এতো আপনাদের মনগড়া কথা। আপনাদের এই মনগড়া আ‘মাল ও মনগড়া কথার সমর্থনে কোন সহীহ হাদীসতো দূরের কথা যয়ীফ (দুর্বল) হাদীসও পেশ করতে পারবেননা। আর তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও যে, রাসূল (সঃ) যখন আসে তখন‘ই তারা দাঁড়ায় ও যখন চলে যায় তখন‘ই তারা বসে যায়। তারপরও কিয়ামের উক্ত পদ্বতি ও তার বৈধতা সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যায়। আর সন্দেহ যুক্ত বিষয় থেকে বেঁচে থাকাও জরুরী যেমন রাসূলে কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেন-

নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। আর এ উভয়ের মধ্যে এমন অনেক সন্দেহভাজন বিষয় বা বস্ত্ত আছে, যে ব্যাপারে অনেক মানুষই এগুলো হালাল, কি হারাম- এ বিষয়ে অবগত নয়। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় হতে বিরত থাকবে, তার দীন ও মান-মর্যাদা পুত-পবিত্র থাকবে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহে পতিত থাকবে, সে সহসাই হারামে জড়িয়ে পড়বে। বিষয়টি সেই রাখালের ন্যায়, যে রাখাল তার পশুপালকে নিষিদ্ধ এলাকার সীমার কাছাকাছি নিয়ে চরালো, তার পাল অজান্তেই নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

সাবধান! প্রত্যেক দায়িত্বশীলেরই (প্রশাসন বা সরকারেরই) চারণভূমি (নিষিদ্ধ এলাকা) আছে, আর আল্লাহ তা’আলার নিষিদ্ধ চারণভূমি হারামসমূহকে নির্ধারিত করেছেন। মনে রাখতে হবে, মানব দেহের ভিতরে একটি মাংসপিন্ড আছে, যা ভালো থাকলে গোটা শরীরই ভালো থাকে। আর এটি নষ্ট হয়ে গেলে বা বিকৃতি ঘটলে সমস্ত শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়। সেই মাংসপিন্ডটিই হলো ’কলব’ (অন্তঃকরণ)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬২,  সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৫২, ২০৫১,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯৮৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৯৯, সুনান আততিরমিযী ১২০৫, সুনান আবূ দাঊদ ৩৩৩০, আহমাদ ১৮৩৭৪, ১৮৩৯৬, ১৮৪০২, দারিমী ২৫৭৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৩১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫০,ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সুতরাং-ঈমান আমলের হেফাযতের জন্য কিয়াম থেকে বেঁচে থাকা জরুরী।

এরপর কথা হল রাসূল (সাঃ) যদি মিলাদ-কিয়ামের মাহফিলে এসেই থাকে, তাহলে কেনো আসে? মেজবানের আয়োজনকৃত খাবারের জন্য? অবশ্যই না (যা সবাই মানতে প্রস্তুত) তাহলে কেন? যদি বলা হয় যে সালাত-সালাম গ্রহণের জন্য। তাহলে তো তাদের এই ধারণাটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভ্রান্ত যা সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত, কেননা হাদীস শরীফে আছে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ আমার ওপর সালাম পাঠ করলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা আমার কাছে আমার রূহ ফেরত দেন যাতে আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৫, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪১, সহীহ আল জামি‘ ৫৬৭৯, বায়হাক্বীর দা‘ওয়াতে কাবীর ১৭৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

যে পৃথিবীর যে প্রান্তে’ই রাসূল (সাঃ) এর প্রতি দুরুদ পড়া হয় তা রাসূল (সাঃ) নিকট পৌছানোর জন্য ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে। রাসূল (সাঃ) গিয়ে তা আনতে হয় না। যেমনিভাবে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আরেক হাদীসে আছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন-

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কিছু মালাক (ফেরেশতা) আছেন যারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান। তারা আমার উম্মাতের সালাম আমার কাছে পৌঁছান। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৪, সুনান আননাসায়ী ১২৮২, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ২৮৫৩, হাকিম ২/৪২১, দারিমী ২৮১৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

তেমনিভাবে হযরত আবু দারদা (রা) হতে বর্ণিত আরেক হাদীসে আছেতিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

আওস ইবনু আওস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের দিনসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হলো জুমু’আহর দিন। এদিন আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিলো, এদিনই তাঁর রূহ কবজ করা হয়েছিলো, এদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং এদিনই বিকট শব্দ করা হবে। কাজেই এদিন তোমরা আমার উপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো। কারণ তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়। আওস ইবনু আওস (রাঃ) বলেন, লোকজন প্রশ্ন করলো, হে আল্লাহর রসূল! কি করে আমাদের দরূদ আপনার নিকট পেশ করা হবে? আপনি তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। বর্ণনাকারী আওস ইবনু আওস (রাঃ) বলেন, লোকেরা বুঝাতে চাচ্ছিল আপনার শরীর তো জরাজীর্ণ হয়ে মিশে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহ মাটির জন্য নবী-রসূলগণের দেহকে হারাম করে দিয়েছেন। (সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) ১০৪৭,  মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৬১, সুনান আননাসায়ী ১৩৭৪), সুনান ইবনু মাজাহ ১০৮৫, ১৬৩৬, হাকিম (১/২৭৮), ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৬৯৭, আহমাদ ১৬১৬২, দারিমী ১৬১৩, ইবনু খুযায়মাহ্ ১৭৩৩, ইবনু হিব্বান ৯১০, মুসতাদরাক লিল হাকিম ১০২৯, দা‘ওয়াতুল কাবীর ৫২৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৯৯৩, ইরওয়া ৪, সহীহ আত্ তারগীব ৬৯৬, ১৬৭৪, সহীহ আল জামি‘ ২২১২। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উপরোক্ত হাদীসসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল (সাঃ) মিলাদানুষ্ঠানে উপস্থিত হোন না, বরং ফেরেশতাদের মাধ্যমে সমগ্র দুনিয়াতে তাঁর উপর পঠিত দরুদ শরীফসমূহ তাঁর নিকট পৌঁছানো হয়। অতএব রাসূল (সাঃ) মিলাদানুষ্ঠানে হাজির হওয়ার যে আকীদা বিদ’আতীরা পোষণ করে থাকে। তাদের এই আকীদা সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভ্রান্ত আর এই ভ্রান্ত ধারণার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে বর্তমানের প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম। অতএব যেই কাজ ভ্রান্ত আকীদারদিকে নিয়ে যায় তা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।

সুতরাং প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম থেকেও বেঁচে থাকা ওয়াজিব।

মূলত যারা মিলাদ-কিয়াম করে থাকে তারা এর জন্য এমন খোঁড়া যুক্তিই দিয়ে থাকে যা কুরআন-হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত নয়ই, উপরন্তু তাঁর বিপরিত হয়ে থাকে।

সর্বোপরি যে কাজ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন,তাবে’তাবেয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহেদীনদের কেউ কখনো করেননি। জাল হাদীস, অপব্যাখ্যা আর খোঁড়া যুক্তির মাধ্যমে তা কখনো শরীয়ত স্বীকৃত আমল হতে পারে না। হ্যাঁ কিছু পয়সা কামানো ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে মাত্র। কিন্তু দুনিয়ার অন্যান্য মানুষেরা দুনিয়াবী পন্থায় আরো বেশী পয়সা উপার্জন করে, আরো ভালো খায়। যদি পেট ও পিঠের চিন্তা এতোই হয়ে থাকে তবে দুনিয়ায় আরো অনেক পন্থা আছে। দ্বীন বিকৃত করার কোন প্রয়োজন নেই-আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন- আমীন।

কিয়াম ও তার বর্জনীয়তা

কিয়াম এর শাব্দিক অর্থ- দাঁড়ানো, দন্ডায়মানতা বা অবস্থান করা। (মু’জামুল ওয়াফী ৬৫৩ পৃঃ)।

পরিভাষায় কিয়াম বলতে বুঝায়, প্রচলিত পন্থায় কিছুক্ষণ মিলাদ পড়ার পর হঠাৎ সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং মিলাদের মতই সুরে সুর মিলিয়ে ‘ইয়া নবী সালামুলাইকা,ইয়া রাসূল সালামুলাইকা’ বলে সালাম পেশ করা।

বর্তমানের ‘প্রচলিত মিলাদের ন্যায় এই আরেকটি নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য ফিৎনা হলো কিয়াম যা মিলাদের সাথেই সম্পৃক্ত। অনেকে ইহাকে দুরুদ শরীফ পড়ার আদব এবং অনেকে রাসূল (সাঃ) এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন বলে মনে করে থাকে। অবশ্যই মিলাদ-কিয়াম উভয়টি প্রবর্তন ও প্রবর্তক থেকে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু হুকুম অর্থাৎ বিদ’আত ও পরিত্যাজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে উভয়টি সমপর্যায়ের। কেননা শরীয়তের চার দলীল তথা কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসসহ ইসলামের প্রাথমিক তিন যূগে মিলাদের মত এরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। বরং ৭৫১ হিঃ সালে শাফেয়ী মাজহাবের বিখ্যাত বুযুর্গ খাজা তাকী উদ্দিন সুব্কী (রহঃ) এর খানকাহতে প্রসিদ্ধ ফাতেমীয় কবি ইয়াহইয়া ইবনে ইউসুফ হুজুর (সাঃ) এর শানে আবেগপূর্ণ কিছু কবিতা আবৃত্তি করতে করতে যখন এই পংক্তিতে পৌছলে,

অর্থাৎ-যদি সম্মানিত ব্যক্তিগণ রাসূল (সাঃ) এর শানে না’ত শ্রবণের সময় কাঁতার বন্দী হয়ে অথবা সওয়ারীর উপর একত্রিত হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন।

কবিতার মমার্থ বুঝে তাকি উদ্দিন সুব্কী (রহঃ) এর অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন এসে যায় এবং তিনি হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েন। তাঁর দেখাদেখি তাঁর সাথীরাওদাঁড়িয়ে যায়। তাঁর সারা জিন্দেগীতে এই একবারই তিনি কিয়াম করেছেন, এর পূর্বে বা পরে আর কখনো তিনি কিয়াম করেন নি। উপরন্তু তিনি ছিলেন ধ্যানমগ্ন মাযবুর (সূফী সাধকদের ধ্যানমগ্ন এক বিশেষ হালত) অবস্থায়। সে যাই হোক-কোনো ব্যক্তি বিশেষের ঐ আমল যা কোরআন-হাদীস বা ইসলামের প্রথম তিন যূগের দ্বারা প্রমাণিত নয় তা কোনভাবেই অন্যের জন্য অনুস্মরণীয় হতে পারে না। উপরুন্তু যদি সেটাকে জরুরী মনে করা হয় তাহলে তা হবে অবশ্যই বর্জনীয় ও পরিত্যাজ্য।

কিয়াম’ বর্জনীয় হওয়ার দলীলসমূহঃ

কিয়াম বিদ’আত ও বর্জনীয় হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে ঐ কারণগুলোওঅন্তর্ভুক্ত যা আমরা প্রচলিত মিলাদ বিদ’আত হওয়ার কারণ এর ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছি, উক্ত কারণ সমূহ ছাড়াও কিয়াম বিদ’আত হওয়ার আরো কিছু বাড়তি কারণ রয়েছে যা আমরা পূর্বের ছয়টির পর সপ্তম দলীল থেকে ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করছি।

কিয়াম বর্জনীয় হওয়ার সপ্তম দলীলঃ

রাসূল (সাঃ) কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা:

হযরত আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

একবার রাসূল (সাঃ) লাঠিতে ভর করে বের হলেন। আমরা (তাঁর সম্মানার্থে) সকলে দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে নিষেধ করতে গিয়ে বলেন, তোমরা (এভাবে) দাঁড়িও না যেমনিভাবে অনারবরা দাঁড়িয়ে একে অপরকে সম্মান প্রদর্শন করে। (সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) ৫২৩০, মেশকাত-২/৪০৩)।

যারা মিলাদের পর কিয়াম করে থাকে তাঁরা বলে থাকে যে, মিলাদ মাহফিলে রাসূলের আগমনের সম্মানার্থে আদবের জন্য কিয়াম করে থাকে। অথচ আমরা তা মানি না। তর্কের খাতিরে যদি কিছুক্ষণের জন্য মেনেও নেই,তবে আমরা বলব যে, উপরোল্লেখিত হাদীসের দ্বারা জানা যায় যে,রাসূলে কারীম (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায়’ই তাঁকে দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করাকে অপছন্দ ও নিষেধ করেছেন। ইন্তেকালের পর কি খুশি হবেন? অবশ্যই না বরং তাঁর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার কারণে আরো নারাজ হবেন।আর যে কাজে রাসূল (সাঃ) নারাজ হবেন তা অবশ্যই বর্জনীয়।

সুতরাং প্রচলিত কিয়ামও অবশ্যই বর্জনীয়।

কিয়াম বর্জনীয় হওয়ার অষ্টম দলীলঃ

সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের খেলাফ (বিপরীত):

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, সাহাবিদের কাছে রাসুলুল্লাহ -এর চেয়ে প্রিয় কোনো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তবুও তাঁকে দেখে তাঁরা দাঁড়াতেন না। কারণ, তাঁরা জানতেন, তিনি এটি পছন্দ করেন না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৫৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

রাসূলে কারীম (সাঃ) এর পর শরীয়তের সকল ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামগণই আমাদের জন্য অনুসরণীয়। বর্তমানের প্রচলিত কিয়াম যেহেতু সাহাবায়ে কেরামগণের আদর্শের বাইরে আর শরীয়তের কোনো কাজ তাদের আদর্শের বাইরে করাই বিদ’আত। আর যা বিদ’আত তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

সুতরাং-প্রচলিত কিয়ামও বিদ’আত ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

কিয়াম বর্জনীয় হওয়ার নবম দলীলঃ

কুরআন-হাদীসে সম্বোধনকৃত শিক্ষার পরিপন্থী।

আল্লাহ পাক রাববুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীব (সাঃ)কে তাঁর বান্দাদের মাঝে পাঠিয়ে তাঁর মাধ্যমে’ই হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করেছেন। তদুপরি রাসূল (সাঃ) এর মাধ্যমে বান্দাদের শিক্ষা দিয়েছেন ইবাদতের সঠিক নিয়ম-নীতি। আর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করাও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সমূহের অন্যতম।

তাইতো হাদীসের কিতাব সমূহের পাতায় পাতায় উল্লেখ রয়েছে অসংখ্য দুরুদ শরীফ। আর সাহাবায়ে কেরামের জিন্দেগীর আমলের মধ্যে পাই, তা পালন করার বাস্তব নমুনা। তেমনিভাবে রাসূল (সাঃ) কে সালাম পেশ করা বা অন্য কোন প্রয়োজনে তাঁকেসম্বোধন করার ক্ষেত্রেও রয়েছে কুরআন-হাদীসের সঠিক দিক-নির্দেশনা।

সমগ্র কুরআনুল কারীমে বা সহীহ হাদীস সমূহের কোথাও প্রচলিত কিয়ামে ব্যবহৃত শব্দাবলী (ইয়া নবী সালামু আলাইকা, ইয়া রাসূল সালামু আলাইকা) দ্বারা সালাত সালাম পেশ করা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে রাসূল (সাঃ)কে (ইয়া নাবী) বা (ইয়া রাসূল) বলে সম্বোধনের প্রমাণ নেই। বরং কুরআনুল কারীমের যেখানে’ই আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন হুজুর (সাঃ)কে সম্বোধন করেছেন সেখানে’ই ইয়া আয়্যুহান্নাবীয়্যূ, ইয়া আয়্যূহাররাসূলু’ বলে সম্বোধন করেছেন। এমনিভাবে হাদীস শরীফেও সরাসরি শুধুমাত্র ইয়া নবী, ইয়া রাসুল বলে সম্বোধনের প্রমাণ নেই, বরং সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সাঃ)কে অত্যান্ত আদবের সহিত ইয়া নাবীয়্যাল্লাহ, ইয়া রাসূলুল্লাহ বলে সম্বোধন করেছেন। অথচ প্রচলিত কিয়ামে কুরআন হাদীসের অনুসরণ বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া বচন ভঙ্গিতে যেভাবে রাসূলে কারীম (সাঃ)কে সম্বোধন করা হচ্ছে তা আদৌ ঠিক নয় বরং তা সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের খেলাফ ও রাসূলের শানে বেয়া’দবী। আর যে জিনিস সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের খেলাফ ও রাসূলের শানে বেয়া’দবী তা থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরী।

সুতরাং প্রচলিত কিয়াম ও তারবচনভঙ্গি সমূহ থেকেও বেঁচে থাকা অত্যন্তজরুরী।

কিয়াম বর্জনীয় হওয়ার দশম দলিলঃ

আরবী ব্যাকরণের দৃষ্টিতেও তা রাসূলের শানে সম্মানহানীর পর্যায়ের শামিল।

আরবী ব্যাকরণ এর দৃষ্টিতেও কিয়ামে পঠিত বাক্যগুলো রাসূল (সাঃ) এর শানে সম্মানহানীর অন্তর্ভুক্ত। কেননা আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘ইয়া হচ্ছে আহবান সূচক শব্দ যার অর্থ-‘হে’! এই (يا) ‘ইয়া’ অর্থাৎ সম্বোধন সূচক শব্দ দ্বারা যাকে সম্বোধন করা হয় তাকে বলা হয় (منادا) ‘মুনাদা’ অর্থাৎ সম্বোধিত ব্যক্তি। আর ‘ইয়া’ (يا) দ্বারা যখন কোনো ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয় তখন ঐ সম্বোধিত ব্যক্তিকে সম্মানিত বুঝাতে তাঁর নামের পূর্বে ايها (আয়্যুহা) শব্দটি যোগ করতে হয়। যথাঃ-ياايهاالنبى (ইয়া আয়্যুহান্নাবীয়্যু)। এখানে মূলত শব্দটি ছিলيانبى (ইয়া নাবীয়্যূ) কিন্তু নবীজির শান ও সম্মান বুঝাতে نبى (নাবীয়্যূন) শব্দের পূর্বে ايهর্ا (আয়্যূহা) শব্দটি যোগ করায় ياايهاالنبى (ইয়া আয়্যূহান্নাবীয়্যু) হয়েছে, তেমনিভাবে হাদীস শরীফের যেখানেই সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)কে يا (ইয়া) হরফে নেদা দ্বারা সম্বোধন করেছেন, কোথাও শুধু يانبى (ইয়া নাবী) বা يارسول (ইয়া রাসূল) বলে সম্বোধন করেননি। বরং সম্মান প্রদর্শনার্থে يانبىالله (ইয়া নাবীয়্যাল্লাহ) يارسولالله (ইয়া রাসূলুল্লাহ) বলে সম্বোধন করেছেন। আর ইহাই সম্বোধনের ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ)কে সম্মান প্রদর্শনের তরীকা বা পদ্ধতি। আর প্রত্যেক মুসলমান’ই চায় রাসূল (সাঃ)কে সম্মান প্রদর্শন করতে। কিন্তু সেই সম্মান প্রদর্শন হতে হবে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে। আর তা হলো কুরআন-হাদীসে বর্ণিত ও সাহাবায়ে কেরামের প্রদর্শিত পদ্ধতি। তাছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি বা তরীকা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তা বিদ’আত ও অবশ্যই বর্জনীয়। কিয়ামে দাঁড়িয়ে যে শব্দাবলী দ্বারা রাসূল (সাঃ)কে সম্বোধন করা হয়, তা কুরআন-হাদীসে বর্ণিত ও সাহাবায় কেরামের প্রদর্শিত সহীহ পদ্ধতি ও বিশুদ্ধ বচন ভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং তার বিপরীত। আর যা কুরআন-হাদীসে বর্ণিত ও সাহাবায়ে কেরামের প্রদর্শিত সহীহ পদ্ধতি ও বিশুদ্ধ বচন ভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তা অবশ্যই বর্জনীয়।

সুতরাং বর্তমানে প্রচলিত কিয়াম ও তাতে উচ্চারিত শব্দাবলী অবশ্যই বর্জনীয়।

কিয়াম বিদ’আত হওয়ার একাদশতম দলীলঃ

কিয়ামকারীদের প্রতি সন্তুষ্ট ব্যক্তি জাহান্নামী।

হজরত মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি কামনা করে লোকজন দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাক, সে যেন জাহান্নামে তার জায়গা বানিয়ে নেয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫২২৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

বর্তমানে প্রচলিত মিলাদের মধ্যে যারা কিয়াম করে থাকে, তারা অবশ্যই রাসূল (সাঃ)কে সন্মান প্রদর্শন ও তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই তা করে থাকে। অথচ উপরোল্লিখিত হাদীস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, যাকে সন্মান প্রদর্শন করার জন্য দাঁড়ানো হবে, সে ব্যক্তি যদি খুশি হয় তবে সে যেনো তার ঠিকানা জাহান্নামে ঠিক করে নেয়, অর্থাৎ- সে জাহান্নামী।

এখন কথা হচ্ছে, যারা কিয়াম করে, তাদের এই কিয়াম এর প্রতি কি হুজুর (সাঃ) সন্তুষ্ট? না, অসন্তুষ্ট? যদি বলেন সন্তুষ্ট, তবে (নাউযুবিল্লাহ) হাদীসানুসারে হুজুর (সাঃ)...(বাকিটা পাঠক বুঝে নিন)।

আর যদি বলেন যে, না হুজুর(সাঃ) অসন্তুষ্ট, তবে আমরা বলব, যে কাজের প্রতি হুজুর (সাঃ) অসন্তুষ্ট তা করা আল্লাহর পক্ষ থেকে গযব ও লা’নত এর উপযোগী হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

কিয়াম বর্জনীয় হওয়ার দ্বাদশতম দলিলঃ

কিয়ামে পঠিত শব্দসমূহ ভ্রান্ত আকিদার পথ তৈরীকারী।

বর্তমনে যারা কিয়াম করে থাকে তাদের মধ্যেও আবার ‘হুযুর (সাঃ) মিলাদ-মাহফিলে উপস্থিত হওয়া’ না হওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের মতানৈক্য রয়েছে।। অনেকে বলে থাকে যে, ‘হুযুর(সাঃ) মিলাদ-মাহফিলে হাজির হয়’ এটা ভ্রান্ত আকিদা, আমরা এই আকিদা নিয়ে মিলাদ-কিয়াম করি না, বরং আমরা শুধু দুরূদ পাঠের উদ্দেশ্যেইমিলাদ-কিয়াম করে থাকি।

এ ক্ষেত্রে আমরা বলতে চাই যে, মিলাদ-মাহফিলে ‘হুযুর (সাঃ) হাজির হওয়ার’ ভ্রান্ত আকিদা পোষণকরা থেকে বেঁচে থাকলেন ঠিক আছে, কিন্তু আপনি যে শব্দসমূহ দ্বারা দুরূদ-সালাম পেশ করছেন তা ঐ ভ্রান্ত আকিদার দিকেই পথ তৈরী করছে যা থেকে আপনি বেঁচে থাকতে চান। কেননা يانبى (ইয়া নাবী) يارسول (ইয়া রাসূল) শব্দসমূহের মাঝে উপস্থিতির একটা গন্ধ প্রকাশ পায়, যা র্শিকি আকিদা সৃষ্টি হওয়ার দিকে পথতৈরী করে।

ভ্রান্ত আকিদার পথ প্রদর্শনকারী এই শব্দসমূহ থেকে বেঁচে না থাকলে ঐ শব্দসমূহের কারনেই তার দিলে একসময় ভ্রান্ত আকিদাসৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এ কারণেই রাসূল (সাঃ) গোলামের জন্য নিজ মুনিবকে رَبِّي (হে আমার প্রভ‚) এবং মুনিবের জন্য নিজ গোলমকেও عَبْدِي (হে আমার বান্দা) শব্দ দ্বারা ডাকতে নিষেধ করেছেন। কেননা এই শব্দগুলো অর্থের দিক দিয়ে ঠিক থাকলেও তাতে শিরকের গন্ধ পাওয়া যায়, তাই রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন-

ইয়াহইয়া ইবনু আইয়্যুব, কুতাইবাহ ও ইবনু হুজর (রহঃ).....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন আমার আব্‌দ ও আমাত তথা আমার বান্দা, আমার বান্দী না বলে। কারণ তোমাদের সকল পুরুষই আল্লাহর বান্দা এবং তোমাদের সকল নারীই আল্লাহর বান্দী। সুতরাং বলবে, গোলামী, ওয়া জারিয়াতী, ওয়া ফাতায়া, ওয়া ফাতাতী’ অর্থাৎ, আমার সেবক, আমার সেবিকা। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)   ৫৭৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৬৭৮, ইসলামিক সেন্টার ৫৭০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ)....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কেউ যেন আমার দাস না বলে। কারণ, তোমাদের প্রত্যেকেই আল্লাহর দাস ও বান্দা। তবে সে বলবে আমার সেবক। আর কোন আবদ যেন তার মনিবকে আমার রব্ব’ না বলে বরং বলবে আমার সাইয়্যিদ (মনিব ও নেতা)। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৭৬৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৬৭৯, ইসলামিক সেন্টার ৫৭১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ, আবূ কুরায়ব ও আবূ সাঈদ আশাজ্জ (রহঃ).....আ’মাশ (রহঃ) হতে উপরোল্লিখিত সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে তাদের উভয়ের বর্ণনাতে রয়েছে, গোলাম তার সাইয়্যিদ ও মনিবকে আমার মাওলা’ বলবে না। এবং (প্রথম সূত্রের) বর্ণনাকারী আবূ মু’আবিয়াহ্ (রহঃ) এর বর্ণিত হাদীসে বর্ধিত উল্লেখ করেছেন যে, কারণ, তোমাদের মাওলা হলেন আল্লাহ। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)  ৫৭৬৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৬৮০, ইসলামিক সেন্টার ৫৭১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সুতরাং কিয়ামে পঠিত শব্দসমূহ র্শিকি আকিদা সৃষ্টি হওয়ার দিকে পথ প্রদর্শন করে বিধায় তা হতে বেঁচে থাকা জরুরী।

বস্তুত এমন সুস্পষ্ট বর্ণনা সমূহ বিদ্যমান থাকার পরও কিছু খোঁড়া যুক্তি ও দু’একটা অস্পষ্ট বর্ণনার উপর নির্ভর করে সহীহ হাদীসে বর্ণিত আমল সমূহকে বাদ দিয়ে এসব রেওয়ায়েজ ভিত্তিক আমল কোন যুক্তিতে করা হয়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। যারা এসব রেওয়ায়েজ ভিত্তিক বিদ’আতে লিপ্ত, আমরা শুধু মুসলমান ভাই ও দ্বীনের খাতিরে তাদেরকে কুরআন-হাদীসানুযায়ী সঠিক পথ দেখিয়ে যাবো, গড়ি-মসি ও টাল-বাহানার ক্ষেত্রে ফায়সালা আল্লাহর’ই হাতে।

ফোকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে মিলাদ-কিয়ামের হুকুমঃ

বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে’তাবেয়ীন থেকে প্রমাণিত নয়। বরং তা প্রথম তিন যূগের পর খারাপ জামানায় আবিষ্কৃত। অতএব পূর্ববর্তীরা যে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন সেক্ষেত্রে আমরা পরবর্তীদের অনুসরণ করব না। কেননা পূর্ববর্তীদের অনুসরণ’ই যথেষ্ট নতুন বিষয় আবিষ্কারের দরকার কি? (আশ্রাফুল ফতোয়া-১/৪৪০ পৃঃ)।

আল্লামা ইবনে কাসীর (রঃ)তারঁ বিখ্যাত তাফসির ইবনে কাসীরে বলেন: -আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বক্তব্য হলো, যে কথা ও কাজ সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয় তা করা বিদ’আত। কেননা সে কাজ ভাল হলে তা অবশ্যই তারা করতেন। কারণ তারা সওয়াবের কোন দিক, কোন নেক আমল এবং কোন সৎ গুণ ছেড়ে যান নি। বরং দ্বীনের সর্ব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান ছিল অগ্রগণ্য।

কিয়ামকারীদের দলীল ও তার জবাব

প্রথম দলীল-আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) এর হাদীসঃ

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন বনী কুরায়যার ইয়াহূদীরা সা‘দ ইবনু মা‘আয (রাঃ)-এর ফায়সালা মুতাবিক দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসে, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডেকে পাঠান। আর তিনি তখন ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন। তখন সা‘দ (রাঃ) একটি গাধার পিঠে আরোহণ করে আসলেন। যখন তিনি কাছে আসলেন, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা ‘তোমাদের নেতার দিকে দন্ডায়মান হও।’ তিনি এসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসলেন। তখন তাঁকে বললেন, ‘এগিয়ে যাও এরা তোমার ফায়সালায় রাজী হয়েছে। সা‘দ (রাঃ) বলেন, ‘আমি এই রায় ঘোষণা করছি যে, তাদের মধ্য হতে যারা যুদ্ধ করতে পারে তাদেরকে হত্যা করা হবে এবং নারী ও শিশুদের বন্দী করা হবে।’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা‘আলার ফয়সালার মত ফয়সালাই করেছ।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৩০৪৩, ৩৮০৪, ৪১২১, ৬২৬২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪৮৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৬৮, আহমাদ ১১১৬৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৮২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উক্ত হাদিসে উল্লেখিত قومواالىسيدكم(তোমরা তোমাদের নেতার দিকে দাঁড়াও) এই বাক্য দ্বারা বিদ’আতীরা দলীল পেশ করে থাকে যে-কাহারো আগমনে তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা জায়েয, কেননা উক্ত হাদীসের বর্ণণানুযায়ী বুঝা যাচ্ছে, যখন আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) আগমন করলেন তখন হুজুর (সাঃ) তাঁর সম্মানার্থে সবাইকে দাঁড়াতে বলেছেন।

প্রথম জবাবঃ উক্ত হাদীসে উল্লেখিত ঘটনার পঁচিশ দিন পূর্বে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং সা’দ (রাঃ) সে যুদ্ধে পায়ের রগের মধ্যে জখম হওয়ায় তা থেকে রক্ত ঝরতে ছিল। হুজুর (সাঃ) বনু কুরায়যা দূর্গ অবরোধ করলে তারা হযরত সা’দ (রাঃ) যে ফায়সালা দিবে তা মেনে নেয়ার অঙ্গিকার করে। তাই হুজুর (সাঃ) তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দেয়ার জন্য সা’দ ইবনে মু’য়ায (রাঃ)কে ডেকে পাঠালেন। ঐ সময় সা’দ (রাঃ) এর জখম থেকে রক্ত পড়া কিছুটা বন্ধ ছিল। এমতাবস্থায় সা’দ ইবনে মুয়াজ (রাঃ) হুজুর (সাঃ) এর ডাকে সাড়া দিতে ঘোড়ার উপর সওয়ার হওয়া অবস্থায় আসতেছিলেন। তিনি অশ্বারোহন থেকে অবতরনে অনেক কষ্ট হত। এবং অধিক নড়া-চড়ায় যখম থেকে পুনরায় রক্ত বের হওয়ার খুবই সম্ভাবনা ছিল বিধায় হুজুর (সাঃ) তাঁকে বেশী নড়া-চড়া দেওয়া ব্যতিত সওয়ারী থেকে নামতে সাহায্য করার জন্য সাহাবাদের নির্দেশ দিয়ে বললেন قومواالىسيدكم (অর্থাৎ- তোমরা তোমাদের সর্দারের দিকে দাঁড়াও) অর্থাৎ- তোমাদের সর্দারকে অশ্বারোহন থেকে অবতরন করার জন্য সাহায্য করো। এখানে সম্মান প্রদর্শনের কোনো প্রশ্নই আসেনা। যদি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য দাঁড়ানোর জন্য বলা হতো তা হলে الى এর স্থানে ‘ڶ’ হরফ অর্থাৎ- "قوموا إلى سيِّدكُم না বলে لسيدكم قوموا বলতেন। (তানযিমুল আশতাত-১৫৫)।

সুতরাং- উক্ত হাদীস সম্পর্কে পূর্ণ পর্যালোচনা করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত হাদীস দ্বারা কিয়াম এর পক্ষে দলিল দেয়া হাদীসের অপব্যখ্যা বৈ কিছুই নয়।

দ্বিতীয় জবাব: যেমনিভাবে আয়েশা (রাঃ) এর পবিত্রতা বর্ণনাকারী আয়াত নাযিলের পর হযরত আয়েশা রাঃ এর আম্মা তাকে বললেন হে আয়েশা) قومي اليه অর্থাৎ তার নিকটে যাও) তখন আয়েশা রাঃ কৃত্রিম অভিমান করে বললেন لا اقوم اليه بل اشكر الله (না আমি তাঁর নিকট যাবো না বরং আমি কেবল আল্লাহরই প্রশংসা করবো।

ق،ي،م এর মাসদার থেকে উদ্ভূত শব্দ দেখলেই যদি সেখানে দাঁড়ানোর অর্থ নেয়া আবশ্যক হয়ে থাকে, তাহলে এখানেও দাঁড়ানোর অর্থ গ্রহণ করতে হবে, তখন ) قومي اليه এর অর্থ হবে (তার দিকে দাঁড়াও (উত্তরে) অবশ্যই আমি তার দিকে দাঁড়াবো ন ) ফলে হাদিসের পূর্বাকার কথার সাথে এখানের বাক্যগুলোর অর্থ মিলবে না, বরং তা হাদীসের বাক্যের সাথে অসামাঞ্জস্যতা প্রকাশ পাবে এবং এক্ষেত্রে এরূপ অর্থ গ্রহণকারী বেওকুফ হিসেবেই সাব্যস্ত হবে। আর এর মূল কারণ হচ্ছে শব্দের পূর্বাপর না দেখেই তার অর্থ গ্রহণ করা। সুতরাং আয়েশা (রাঃ)এর হাদিসের শব্দ ) قومي اليهযেভাবে সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়ানোকে সাব্যস্ত করে না, ঠিক তেমনিভাবে সাদ ইবনে মুয়ায (রাঃ) এর হাদিসও সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়ানোকে প্রমাণ করে না।

তৃতীয় জবাব: অবস্থার পরিপেক্ষিতে উক্ত হাদীসে বর্ণিত দাঁড়ানোর হুকুমের কারণটা مجمل) অস্পষ্ট( বলে সাব্যস্ত হয়। যার বিপরিতে (আমাদের পূর্বে উল্লেখিত) হযরত আনাস ও আবু উমামা (রাঃ) থেকে বণিত! হাদীস রয়েছে এবং তা সম্পূর্ণ صريح (অর্থাৎ-সুস্পষ্ট)। আর مجمل অর্থাৎ-অস্পষ্ট, হুকুম যখন صريح (সুস্পষ্ট) হুকুমের এর বিপরীত হবে তখন مجمل (অস্পষ্ট হুকুম) কে ত্যাগ করে صريح (স্পষ্ট) হুকুম এর উপর আমল করতে হবে।

সুতরাং-সা’দ ইবনে মু’য়াজ (রাঃ)এর হাদীসের (مجمل) অস্পষ্ট হুকুমকে পরিত্যাগ করে আনাস(রাঃ) ও আবু উমামা (রাঃ) এর হাদীসের (صريح) সুস্পষ্ট হুকুম পালন করতে গিয়ে কিয়ামকে বর্জন করতে হবে।

দ্বিতীয় দলীল-ইক্বরামা ও আদী ইবনে হাতেম (রাঃ) এর হাদীসঃ

এমনিভাবেপ্রচলিত কিয়াম প্রমাণ করার লক্ষ্যে আমাদের দেশের বিদ’আতীরা আরো দুটি হাদীস পেশ করে থাকে যথা :

১/ হযরত ইকরামা ইবনে আবু জাহেল হুজুর (সাঃ) এর নিকট আগমন করলেন তখন হুজুর (সাঃ) আরোহনকারী মুজাহেরদের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েদাঁড়িয়েছেন।

২/ হযরত আদি ইবনে হাতেম (রাঃ) বলেন-আমি যখনই হুজুর (সাঃ)এর খেদমতে উপস্থিত হয়েছি তখন হুজুর (সাঃ) দাঁড়িয়েছেন বা নড়া চড়া করেছেন।

সুতরাং-হুজুর (সাঃ) যখন তাঁর সাহাবাদের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন তবে আমরা হুজুরের জন্য দাঁড়াব না কেন?

প্রথম জবাবঃ প্রথমত এই উভয় হাদীস নিন্তান্তই যয়ীফ যা দ্বারা দলীল পেশ করা যায় না। সুতরাং তা দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয় জবাবঃ তর্কের খাতিরে যদি কিছুক্ষণের জন্য হাদীসদ্বয়কে মেনে নিলেও এই উভয় হাদীস দ্বারা প্রচলিত কিয়াম প্রমানিত হয়না। কেননা এই উভয় হাদিস فِعْلِىْ অর্থাৎ- হুজুর (সাঃ) এর কর্মের বিবরণ। আর আমাদের পেশকৃত হাদীস قَوْلِىْ অর্থাৎ- হুজুরের (সাঃ) এর বাণী। আর শরয়ী উসূল (মূলনীতি) হলো حديثقولىযদি حديثفعلى এর বিপরীত হয় তবে حديثقولى প্রাধান্য পাবে।

সুতরাং-হাদীসদ্বয়ের উপর আমল করা জায়েজ নয়।

তৃতীয় জবাবঃ হুজুর (সাঃ) তাঁর সাহাবাদের জন্য দাঁড়িয়েছেন ইহা যদি তর্কের খাতিরে কিছুক্ষণের জন্য মেনেও নেই, তবুও এই হাদীসদ্বয় দ্বারা প্রচলিত কিয়ামের পক্ষে দলীল পেশ করা যায় না। কেননা হুজুর (সাঃ) দাঁড়িয়েছেন স্বচক্ষে দেখে, আর বিদ’আতীরা দাঁড়ায় না দেখে। যেখানে দাবীর সাথে দলীল ও দলীলের সাথে অবস্থার কোন মিল নাই।

সুতরাং- উক্ত হাদীসদ্বয় দ্বারা কিয়ামের পক্ষে দলিল পেশ করা কোন ভাবে সহীহ হবে না।

বি. দ্র. সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়ানো জায়েজ হবে কি, হবে না, ইহার আলোচনা তখনই আসবে, যখন সম্মান প্রদর্শন যাকে করা হবে সে যদি উপস্থিত থাকে। কিন্তু প্রচলিত মিলাদ মাহফিলগুলোতে হুজুর (সাঃ) উপস্থিত থাকেই না, বরং এই আকীদা রাসূলের শানে চরম বেয়াদবী, এবং ইহার ভিত্তি কোন সহীহ হাদীসে তো নাই’ই কোন দুর্বল হাদীসেও নাই। তাই এই মতানৈক্য ও তার পর্যালোচনা করার কোন দরকার ছিল না। তথাপিও বিদ’আতীরা বিভিন্ন স্থানে মানুষদেরকেবানোয়াট হাদীস ও বিভিন্ন সহিহ হাদিসের অপব্যখ্যা করে বিভ্রান্ত করে বিধায় এখানে সংক্ষেপে তাঁর উত্তর দেয়া হলো।

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী আজ আমাদের মাঝে বিরাজমান। হাদীস শরীফে বর্ণিত অসংখ্য দোয়া-দুরুদ, যা পাঠের প্রতি আমাদেরকে স্বয়ং নবী কারীম(সাঃ) উৎসাহিত করেছেন এবং উক্ত দুরুদের অসংখ্য ফযিলতও বর্ণনা করেছেন সেগুলোও আমাদের সামনে সুবিন্যস্ত। অথচ আমাদের সমাজ থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত সেই দোয়া দুরুদ আজ বিলুপ্ত প্রায়। বড়জোর দুরুদে-ইব্রাহিম কিছু কিছু লোকে পারে তাও আবার কেউ অর্ধৈক কেউ সামান্যএকটু তাঁর মধ্যে আবারশতকরা ৯৯ জনের এমন পর্যায়ের ভুল ও অশুদ্ধ যা শুনলে ব্যথায় দীল মুষড়ে ওঠে। অথচ এতটুকুও আবার শিখা হয়েছে শুধু নামাযে পড়তে হয় বলে। নচেৎ এটুকুও ছেড়ে দিত। কেন এই পরিস্থিতি? তাঁর ঐ একটাই কারণ যা রাসূলে কারীম (সাঃ) আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে ইরশাদ করে গেছেন,

গুযায়ফ ইবনু আল হারিস আস্ সুমালী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখনই কোন জাতি একটি বিদআত সৃষ্টি করেছে, তখনই সমপরিমাণ সুন্নাত বিদায় নিয়েছে। সুতরাং একটি সুন্নাতের উপর ’আমল করা (সুন্নাত যত ক্ষুদ্রই হোক), একটি বিদআত সৃষ্টি করা অপেক্ষা উত্তম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৭,  আহমাদ ১৬৫২২,  তারগীব ৩৭)।

হাসসান (ইবনু ’আতিয়্যাহ্) (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন জাতি যখন দীনের মধ্যে কোন বিদ্আত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৮,  দারিমী ৯৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

ইবনু সীরীন রাহি. বলেন, যখনই কোন ব্যক্তি কোন বিদআতকে আকড়ে ধরে, তখনই সে কোন একটি সুন্নাত থেকে (মুখ) ফিরিয়ে নেয়। (সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি) ২১৪, আবু শামাহ, আল বায়িছ পৃ: ২৬)।

ইব্রাহীম ইবনু মায়সারাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন বিদআতীকে সম্মান দেখালো, সে নিশ্চয়ই ইসলামের ধ্বংস সাধনে সাহায্য করল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৯)।

আর এরই বাস্তবতা বর্তমানে আমাদের মাঝে বিদ্যমান। বর্তমানে মানুষ এই ভিত্তিহীন মিলাদকে’ই দুরুদ মনে করে তাঁর সারাটা জীবন এর পিছেই কাটিয়ে দিচ্ছে। আর আলেমদের মুখে দুরুদ শরীফের ফজীলতের বয়ান শুনে মনে মনে ভাবে, ওহ্ প্রতি বৎসর ধুমধাম করে খাবারের আয়োজন করে মসজিদের হুজুরের মাধ্যমে কয়েকবার মিলাদ পড়াই। আমার চেয়ে বড় আশেকে রাসূল কে হতে পারে? এ ভেবেই আবার গুনগুন করে পড়তে শুরু করে ইয়া ‘নবী সালা মুআলাইকা.....’।

অথচ এদের পরিনতি সম্পর্কে রাসুল সা. ১৫০০ বছর আগেই বলে দিয়েছেন।

বিলাল ইবনু হারিস আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার কোন একটি সুন্নাতকে যিন্দা করেছে, যে সুন্নাত আমার পরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, তার এত সাওয়াব হবে যত সাওয়াব এ সুন্নাত ’আমলকারীদের হবে, কিন্তু সুন্নাতের উপর ’আমলকারীদের সাওয়াবে কোন অংশ হ্রাস করা হবে না। আর যে ব্যক্তি গুমরাহীর নতুন (বিদ্আত) পথ সৃষ্টি করবে, যাতে আল্লাহ ও তাঁর রসূল রাযী-খুশী নন, তার জন্য সে সকল লোকের গুনাহ চাপিয়ে দেয়া হবে, যারা তার সাথে ’আমল করবে, অথচ তাদের গুনাহের কোন অংশ হ্রাস করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৮, সুনান আত তিরমিজি ২৬৭৭, সুনান ইবনে মাজাহ ২১০)।

আর এদিকে কিছু পেট পূজারী আলেমরাও তাদেরকে আর সত্য জানার প্রতি আহবান তো করেইনা উপরন্তু কেউ এ বিষয়ে মুখ খুললেই তাঁকে ওহাবী, কাফের, নবীর দুশমন বলে গালি দিয়ে থাকে। আর নিজেদের এই অপকীর্তি গুলো ঢাকতে মক্কার কাফেরদের মত বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষদের দোহাই দিয়ে বলে থাকে যে, আমাদের বাপ-দাদারা যা করেছে আমরাও তা করব অথবা বলে থাকে ‘আমাদের বাপ-দাদারা কি ভুল করেছে? আমরা বলবো কে ভূল করল আর কে ঠিক করল তা আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে আছে। শরীয়তের ক্ষেত্রে কোরআন-হাদীসের বিপরীতে কোন ব্যক্তি বিশেষ দলিল হতে পারে না।

সুতরাং আমাদের দায়িত্ব রাসূলের দেখানো পথ অনুযায়ী কোরআন-হাদীস মুতাবেক আমল করা, এর বাইরে নয়। বাকী রইল যে ভাইয়েরা বুঝতেছে না তাদেরকে সুন্দর ভাবে বুঝানো। বুঝতে চাইলে ভালো আর একগুয়েমীর বেলায় বলব প্রকৃত হক্ক ও বাতিলের ফায়সালা হাশরের ময়দানের জন্যই তোলা রইল।

দৃষ্টি আকষর্ণঃ

বিদ’আতী সম্প্রদায় সাধারণ মানুষদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে মিলাদের শুরুতে কালামে পাকের এই আয়াত তেলাওয়াত করে থাকে যথা :

"ইন্নাল্লা-হা ওয়া মালা-ইকাতাহূ ইউসাললূনা 'আলান-নাবী। ইয়া-আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ সাললূ 'আলাইহি ওয়াসাল্লিমূ তাছলীমা”

অর্থাৎ- নিশ্চয় আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর উপর “সালাত” প্রেরণ করেন হে ইমানদারগণ তোমরাও নবীর উপর দুরুদ পাঠ কর। (সূরা আহযাব-৫৬)।

উক্ত আয়াত পাঠ করে তারা জনগণকে এটাই বুঝাতে চান যে, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দুরুদ পাঠ করতে বলেছেন’ তাই এখন দুরুদ পাঠ করা হবে অথচ পরবর্তীতেই তারা সমন্বরে সুরে সুর মিলিয়ে প্রচলিত মিলাদ পাঠ করে থাকে। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশকৃত দুরুদ শরীফের সাথে এতটুকুও সম্পর্ক ও নেই। কালামে পাকে ও হাদীস শরীফের অসংখ্য জায়গায় হুজুর (সাঃ) এর উপর দুরুদ পাঠের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে, সাথে সাথে হাদীসের কিতাব সমূহের পাতায় পাতায় বর্ণিত রয়েছে হুজুর (সাঃ) হতে অসংখ্য দুরুদ শরীফ সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামগণের পক্ষ থেকেও রয়েছে দুরুদ-শরীফের আমলের বাস্তবনমুনা। কিন্তু হাদীসে বর্ণিত দুরুদ-শরীফসমূহ ও সাহাবায়ে কেরামগণের আদর্শের সাথে বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ এর কোন সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য নেই। বরং বর্তমানের প্রচলিত মিলাদ-হাদীসে বর্ণিত দুরুদ-শরীফসমূহ থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। কোরআন-হাদীসসহ সাহাবায়ে কেরামগণের জিন্দেগীতেও এর কোন অস্তিত্বখুজে পাওয়া যায় না। বরং ইহা হুজুর (সাঃ) এর ইন্তেকালের ৬০০ বছর পর নব্য আবিষ্কৃত এমন একটি আমল, যার অস্তিত্ব কুরআন-হাদীসের কোথাও খুজে পাওয়া যায়তো না’ই বরং এহেন বিদ’আতী কর্ম-কান্ডের কারণে হাদীস শরীফে বর্ণিত দুরুদ শরীফের আমল সমূহ বিলুপ্ত প্রায়। কেননা জন সাধারণ বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ সমূহকেই দুরুদ-শরীফ মনে করে থাকে, যার কারণে হাদীসে বর্ণিত দুরুদ সমূহকে আর জানা ও তার উপর আমল করার প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। আর এভাবেই বর্তমান সমাজ সুন্নত থেকে দূরে সরে দিন দিনবিদ’আতের চৌরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে। বিদায় নিচ্ছে জন-জীবন থেকে রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাত আর সেই স্থান দখল করে নিচ্ছে অপর একটি বিদ’আত। আর এদিকে ইঙ্গিত করেই হাদীস শরীফে রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন- যখন কোন জাতি কোন বিদ’আত আবিষ্কার করেন তখন তাদের থেকে তদ্রুপ একটি সুন্নতকে উঠিয়ে নেয়া হয়।

উক্ত হাদীসের বাস্তবরূপ বর্তমানে আমাদের সামনে বিদ্যমান। মিলাদ-কিয়াম নামক বিদ’আতের স্তুপের নিচে চাপা পড়ে দুরুদ নামক সুন্নাতটি হারিয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে জনসাধারণ মিলাদ নামক এই বিদ’আতকেই দুরুদ শরীফ মনে করে আমল করে যাচ্ছে। অন্য দিকে যারা এই বিদ’আত ও রুসুমতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে, বিদ’আতী ছদ্মবেশী মৌলভীরা তাঁদেরকে ওহাবী-কাফের নবীর দুশমন বলে গালি-গালাজ করে থাকে এবং জনগণকে এটা বুঝাতে থাকে যে, এরা নবীর সাথে দুশমনী করে নবীর উপর দুরুদ পড়ার বিরোধিতা করে। অথচ- বাস্তবতা হলো যে, এসব হক্কানী আলেম-ওলামাগণ দুরুদ নয় বরং প্রচলিত বিদ’আত ভিত্তিক মিলাদের’ই বিরোধীতা করছে। আর এটা শুধুআলেম-ওলামাদের’ই নয় বরং সকল মুসলমানদের’ই জানা প্রয়োজন যে, প্রচলিত মিলাদ ও দুরুদ এক নয় বরং উভয়টি পরষ্পর ভিন্ন ও বিপরীত। একটি সুন্নাত আরেকটি বিদ’আত। আর প্রত্যেক মুসলমানের উচিৎ বিদ’আতকে বর্জন করে সুন্নাত মোতাবেক আমল করা। তাই সুন্নাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং বিদ’আতকে উৎখাত করতে আমাদেরকে সুন্নাত ও বিদ’আতের মধ্যকার প্রার্থক্য জানতে হবে। (আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের জানার ও তদানুযায়ী আমল করার তওফীক দিন-(আমীন)

মিলাদ-কিয়াম নামক বিদ’আতের স্তূপের নিচে চাপাপড়া দরুদ শরীফের সুন্নাতঃ

প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম বিদ’আত হওয়া সংক্রান্ত আলোচনার পর আমরা ঐ সুন্নাত সমূহকে তুলে ধরার চেষ্টা করব, যে সুন্নাতসমূহ এই বিদ’আতগুলোর স্তুপের নিচে চাপা পড়ে বিলুপ্ত প্রায়। বিদ’আত সমূহের প্রবণতার কারণে সহীহ হাদীসে বর্ণিত এসব সুন্নাত সমূহ আজ আমাদের মাঝে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সুন্নাতের আবরনে মোড়ানো বিদ’আত সমূহকে’ই আমরা প্রকৃত সুন্নাত ভেবে এর পিছনে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি। আর নিজেকে আশেকে রাসূল মনে করে নিজের উপর নিজে খুবই সন্তুষ্ট হয়ে, মনে মনে রাসূলের দিদারের আশা করছি। অপর দিকে বিদ’আতে লিপ্ত থেকে আমল ধ্বংসের মাধ্যমে নিজেই নিজের আখেরাতকে ধ্বংস করে যাচ্ছি। তাই এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতেই বিদ’আত ও তা পরিতাজ্যের কারণ সমূহ বর্ণনা করার পর’ই বিদ’আতের কারণে বিলুপ্ত প্রায় সুন্নাতটিকে তুলে ধরছি।

বর্তমানের প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম এর কারণে যে সুন্নাতটি বিলুপ্ত প্রায় তা হলো রাসুলের (সাঃ) এর প্রতি দুরুদ পাঠ করা। আর রাসূল (সাঃ) এর উপর দুরুদ পাঠ করা সর্ম্পকে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

অর্থাৎ-নিশ্চয়’ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ রাসূল (সাঃ)এর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ তোমরা নবীর উপর দুরুদ পড় এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর। (সূরা-আহযাব-৫৬)।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি যে সালাতের সম্পৃক্ত করা হয়েছে এর অর্থ হবে, আল্লাহ হুজুর (সাঃ) এর উপর রহমত নাযিল করেন। ফেরেশতাদের প্রতি সালাতের যে সম্পৃক্ত করা হয়েছে তার অর্থ হবে-তাঁরা রহমতের দো’য়া করেন, এবং মানুষের দিকে সালাতকে সম্পৃক্ত করে যে হুকুম দেয়া হয়েছে তার অর্থ হবে-‘দুরুদ পাঠ করা’ এক্ষেত্রে শাব্দিক তাহকীক এর স্থান নয়। কিন্তু বিদ’আতী সম্প্রদায় এ আয়াতকে অপব্যখ্যা করে,উক্ত আয়াত দ্বারা মিলাদ-কিয়াম প্রমাণ করতে চায় তাই তারা মিলাদের শুরুতে এই আয়াত তেলওয়াত করেই মিলাদ শুরু করে থাকে। অথচ মিলাদ ও দুরুদ এক নয়। যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে।

দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর আ’স (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার দরুন তার উপর দশটি রহমত (করুণা) অবতীর্ণ করবেন। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৮৬, সহিহ মুসলিম ৮৭৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা জুমআর দিন আমার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়। যেহেতু ক্ষণকাল পূর্বে জিবরীল তাঁর প্রতিপালক আযযা অজাল্লার নিকট থেকে আগমন ক’রে বললেন, ’(হে নবী!) পৃথিবীর বুকে যে কোন মুসলিম তোমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আমি তার উপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করব এবং আমার ফিরিশতাবর্গ তার জন্য ১০ বার ক্ষমা প্রার্থনা করবে। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৮৭, ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ১৬৬২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আনাস বিন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, (তার বিনিময়ে) সেই ব্যক্তির উপর আল্লাহ দশটি রহমত বর্ষণ করেন, তার দশটি পাপ মোচন করেন এবং তাকে দশটি মর্যাদায় উন্নীত করেন। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৮৮, সুনান আননাসাঈ ১২৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আমের বিন রাবীআহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খুতবায় বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমার উপর যত দরূদ পাঠ করবে, ফিরিশতা তার জন্য তত ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবেন। সুতরাং বান্দা চাহে তা কম করুক অথবা বেশী করুক। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৮৯, আহমাদ ১৫৬৮০, সুনান ইবনে মাজাহ ৯০৭, সহীহ তারগীব ১৬৬৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ...যে ব্যক্তি যত বেশী আমার উপর দরূদ পাঠ করবে, সে ব্যক্তি (বেহেশতী) মর্যাদায় তত বেশী আমার নিকটবর্তী হবে। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯০, বাইহাক্বী, সহীহ তারগীব ১৬৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি সব লোকের চাইতে আমার বেশী নিকটবর্তী হবে, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আমার উপর দরূদ পড়বে। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯১, সুনান আততিরমিযী ৪৮৪, হাসান, সঃ তারগীব ১৬৬৮, সঃ মাওয়ারিদ ২০২৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পড়তে ভুল করল, সে আসলে জান্নাতের পথ ভুল করল। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯২, সুনান ইবনে মাজাহ ৯০৮, ত্বাবারানী ১২৬৪৮, সহীহ তারগীব ১৬৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

আওস ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের দিনগুলির মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমআর দিন। সুতরাং ঐ দিন তোমরা আমার উপর অধিকমাত্রায় দরূদ পড়। কেননা, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’’ লোকেরা বলল, ’ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো (মারা যাওয়ার পর) পচে-গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের দরূদ কিভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে?’ তিনি বললেন, “আল্লাহ পয়গম্বরদের দেহসমূহকে খেয়ে ফেলা মাটির উপর হারাম ক’রে দিয়েছেন। (বিধায় তাঁদের শরীর আবহমান কাল ধরে অক্ষত থাকবে।) (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৩, সুনান আবু দাঊদ ১৫৩৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

মালিক বিন হাসান বিন মালিক বিন হুয়াইরিস তাঁর পিতা হতে, তিনি (হাসান) তাঁর (মালেকের) পিতামহ (মালিক বিন হুয়াইরিষ) হতে বর্ণনা করে বলেন, একদা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে চড়লেন। প্রথম ধাপে চড়েই বললেন, ’’আমীন।’’ অতঃপর দ্বিতীয় ধাপে চড়ে বললেন, ’’আমীন’’ অনুরূপ তৃতীয় ধাপেও চড়ে বললেন, ’’আমীন।’’ অতঃপর তিনি (এর রহস্য ব্যক্ত করে) বললেন, ’’আমার নিকট জিবরীল উপস্থিত হয়ে বললেন, ’হে মুহাম্মাদ! যে ব্যক্তি রমযান পেল অথচ পাপমুক্ত হতে পারল না আল্লাহ তাকে দূর করেন।’ তখন আমি (প্রথম) ’আ-মীন’ বললাম। তিনি আবার বললেন, ’যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে জীবিতাবস্থায় পেল অথচ তাকে দোযখে যেতে হবে, আল্লাহ তাকেও দূর করুন।’ এতে আমি (দ্বিতীয়) ’আ-মীন’ বললাম। অতঃপর তিনি বললেন, ‘যার নিকট আপনার (নাম) উল্লেখ করা হয় অথচ সে আপনার উপর দরূদ পাঠ করে না, আল্লাহ তাকেও দূর করুন।’ এতে আমি (তৃতীয়) ’আমীন’ বললাম। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৪, ইবনে হিব্বান ৪০৯, ৯০৭, সহীহ তারগীব ৯৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অভিশাপ দিলেন যে, সেই ব্যক্তির নাক ধূলা-ধূসরিত হোক, যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হল, অথচ সে (আমার নাম শুনেও) আমার প্রতি দরূদ পড়ল না। (অর্থাৎ, ’স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম’ বলল না।) (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৫, সুনান আততিরমিযী ৩৫৪৫)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

উক্ত রাবী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার কবরকে উৎসব কেন্দ্রে পরিণত করো না (যেমন কবর-পূজারীরা উরস ইত্যাদির মেলা লাগিয়ে ক’রে থাকে)। তোমরা আমার প্রতি দরূদ পেশ কর। কারণ, তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের পেশকৃত দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৬, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪৪, সহীহুল জামে’ ৭২২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উক্ত রাবী হতে এটি বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোন ব্যক্তি যখন আমার উপর সালাম পেশ করে, তখন আল্লাহ আমার মধ্যে আমার আত্মা ফিরিয়ে দেন, ফলে আমি তার সালামের জবাব দিই। (এর ধরন আল্লাহই জানেন। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, সরাসরি তিনি শুনতে পান বা তাঁর জবাব কেউ শুনতে পায়।) (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৭, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সুহাইল বলেন, একদা (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাতির ছেলে) হাসান বিন হাসান বিন আলী আমাকে কবরের নিকট দেখলেন। তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। সেই সময় তিনি ফাতেমার বাড়িতে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। আমি উপস্থিত হলে তিনি বললেন, ’এসো খানা খাও।’ আমি বললাম, ’খাবার ইচ্ছা নেই।’ অতঃপর তিনি বললেন, ’কী ব্যাপার যে, আমি তোমাকে কবরের পাশে দেখলাম?’ আমি বললাম, ’নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম দিলাম।’ তিনি বললেন, ’যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দেবে।’

অতঃপর তিনি বললেন, ’আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’তোমরা আমার কবরকে ঈদ বানিয়ে নিয়ো না। তোমাদের ঘরকে কবর বানিয়ে নিয়ো না। তোমরা যেখানেই থাক, সেখান থেকেই আমার উপর দরূদ পাঠ কর। কারণ তোমাদের দরূদ আমার নিকট (ফিরিশতার মাধ্যমে) পৌঁছে যায়। আল্লাহ ইয়াহুদকে অভিশাপ করুন। কারণ তারা তাদের নবীগণের কবরসমূহকে মসজিদ (সিজদা ও নামাযের স্থান) বানিয়ে নিয়েছে। (এ ব্যাপারে এখানে) তোমরা এবং উন্দুলুসের লোকেরা সমান। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৮, সুনান সাঈদ বিন মানসূর, আহকামুল জানায়েয, আলবানী ২২০পৃঃ)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পৃথিবীতে মহান আল্লাহর ভ্রমণরত বহু ফিরিশতা রয়েছেন, যাঁরা আমার উম্মতের নিকট হতে আমাকে সালাম পৌঁছে দেন। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৬৯৯, আহমাদ ৩৬৬৬, ৪২১০, ৪৩২০, সুনান আননাসাঈ ১২৮২, ইবনে হিব্বান ৯১৪, সঃ তারগীব ১৬৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রকৃত কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার কাছে আমি উল্লিখিত হলাম (আমার নাম উচ্চারিত হল), অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৭০০, সুনান আততিরমিযী ৩৫৪৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

আবূ যার (রাঃ) বলেন, একদা বের হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এলাম। তিনি বললেন, তোমাদেরকে কি বলে দেব না, সবচেয়ে বড় বখীল কে?’’ সকলে বলল, ’অবশ্যই হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, ’’যার নিকট আমার নাম উল্লেখ করা হল, অথচ সে (আমার নাম শুনেও) আমার প্রতি দরূদ পড়ল না, সেই হল সব চাইতে বড় বখীল। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৭০১, ইবনে আবী আস্বেম, সহীহ তারগীব ১৬৮৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

ফাযবালা ইবনে উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি লোককে নামাযে প্রার্থনা করতে শুনলেন। সে কিন্তু তাতে আল্লাহর প্রশংসা করেনি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদও পড়েনি। এ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লোকটি তাড়াহুড়ো করল। অতঃপর তিনি তাকে ডাকলেন ও তাকে অথবা অন্য কাউকে বললেন, যখন কেউ দু’আ করবে, তখন সে যেন তার পবিত্র প্রতিপালকের প্রশংসা বর্ণনা যোগে ও আমার প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ ক’রে দু’আ আরম্ভ করে, তারপর যা ইচ্ছা (যথারীতি) প্রার্থনা করে। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৭০২, আবু সুনান আবুদাঊদ ১৪৮৩, সুনান আততিরমিযী ৩৪৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উমার (রাঃ) ও আলী (রাঃ) বলেন, ’প্রত্যেক দু’আ ততক্ষণ পর্যন্ত আসমান ও যমীনের মাঝে লটকে থাকে, (আকাশে ওঠে না বা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না) যতক্ষণ না নবীর উপর দরূদ পাঠ করা হয়।’ (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৭০৩, সুনান আততিরমিযী ৪৮৬, ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ১৬৭৫, ১৬৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে সম্প্রদায়ই এমন কোন মজলিসে বসে যেখানে তারা মহান আল্লাহর যিকর করে না এবং নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপর দরূদ পাঠ করে না, সেই সম্প্রদায়েরই ক্ষতিকর পরিণাম হবে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে আযাব দেবেন, নচেৎ ইচ্ছা করলে মাফ করে দেবেন। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৭০৪, সুনান আবূ দাউদ ৪৮৫৮, সহীহ তিরমিযী ২৬৯১, বাইহাকী, আহমাদ, ইবনে হিব্বান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এমনিভাবে হাদীসের কিতাব সমূহের পাতায় পাতায় রাসূল (সাঃ) এর প্রতি দুরুদ পড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে অসংখ্য দুরুদ শরীফ উল্লেখ রয়েছে। একথা সর্বস্বীকৃত যে,

* রাসূল (সাঃ) এর উপর প্রত্যেক মুসলমানের জীবনে কমপক্ষে একবার দুরুদ পাঠ করা ফরয।

*কেউ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম উচ্চারণ করলে বা শুনলে দুরুদ পড়া ওয়াজিব।

*নামাযে তাশাহহুদের পর দুরুদ পাঠ করা (হানাফীদের মতে) সুন্নাত।

*একই মজলিসে বার বার হুজুর (সাঃ) এর নাম উচ্চারিত হলে (প্রথমবার ওয়াজিব) পরের প্রত্যেক বার দুরুদ পড়া মুস্তাহাব।

*অপবিত্র ও পায়খানা-প্রস্রাবে থাকাবস্থায় দুরুদ পাঠ হারাম।

* নবী ও রাসূল ব্যতীত অন্যদের প্রতি দরুদ পড়া (অনেকের মতেই) বৈধ নয়।

দুরুদ পাঠের বিধানাবলী সম্পর্কে আলোচনার পর, এখন দুরুদ পড়ার নিয়মাবলী সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হচ্ছে।

হাদীসে বর্ণিত দুরুদ শরীফ সমূহঃ

(১ নং দরুদ):

আবদুর রহমান ইবনু আবূ লায়লা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কা‘ব ইবনু ‘উজরাহ্ (রাঃ)-এর সাথে আমার দেখা হলে তিনি বললেন, হে ‘আবদুর রহমান! আমি কি তোমাকে একটি কথা উপহার দিব যা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছি? উত্তরে আমি বললাম, হাঁ আমাকে তা উপহার দিন। তিনি বললেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনার প্রতি আমরা ‘সালাম’ কিভাবে পাঠ করবো তা আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা আপানার ও আপনার পরিবারে প্রতি ‘সালাত’ কিভাবে পাঠ করবো? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা বলো,

‘‘আল্লা-হুম্মা সল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিও ওয়া ‘আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- সল্লায়তা ‘আলা- ইবরা-হীমা ওয়া ‘আল- আ-লি ইবরা-হীমা ইননাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক ‘আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- বা-রাকতা ‘আলা- ইবরা-হীমা ওয়া ‘আলা- আ-লি ইবরা-হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ’’

(অর্থঃ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি রহমত বর্ষণ কর, যেভাবে তুমি রহমত বর্ষণ করেছো ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবার-পরিজনের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! তুমি বারাকাত নাযিল কর মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি, যেভাবে তুমি বারাকাত নাযিল করেছো ইব্রাহীম ও ইব্রাহীমের পরিবার-পরিজনের প্রতি। তুমি বড় প্রশংসিত ও সম্মানিত)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), ৯১৯ সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৩৭০, ৪৭৯৭, ৬৩৫৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(২ নং দরুদ):

আবূ হুমায়দ আস্ সা‘ইদী (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনার প্রতি কিভাবে দরূদ পাঠ করব? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা বল,

“আল্লা-হুম্মা সল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয্ওয়া-জিহী ওয়া যুররিইয়্যাতিহী কামা- সল্লায়তা ‘আলা- আ-লি ইব্র-হীমা ওয়াবা-রিক ‘আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয্ওয়া-জিহী ওয়া যুররিইয়্যাতিহী কামা- বা-রকতা ‘আলা- আ-লি ইব্র-হীমা ইন্নাকা হামীদুম্ মাজীদ’’

(অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ এবং তাঁর পত্নীগণ ও বংশধরগণের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করো, যেভাবে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিজনের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করেছো এবং মুহাম্মাদ এবং তাঁর পত্নীগণ ও বংশধরগণের প্রতি তোমার কল্যাণ নাযিল করো, যেভাবে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবার-পরিজনের প্রতি কল্যাণ নাযিল করেছো। অবশ্যই তুমি খুব প্রশংসিত এবং খুব সম্মানিত।)।  (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত),৯২০,সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৩৬০, ৩৩৬৯,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪০৭, সুনান আবূ দাঊদ ৯৭৯, সুনান আননাসায়ী ১২৯৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৯০৫, আহমাদ ২৩৬০০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৯১৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৮০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সহিহ হাদিস ভিত্তিক আরো দরুদ আছে। এখানে যে দুইটি দরুদ উল্লেখ করা হয়েছে তা আমরা সালাতে তাশাহুদ বৈঠকে এবং অন্যান্য সময় ও স্থানে পাঠ করতে পারবো। মিলাদ ও কিয়ামে অংশ না নিয়ে এইসব দরুদ সালাতের ভিতর ও বাহিরে পাঠ করবেন।

সংক্ষিপ্ত কয়েকটি দরুদ

(১) “আল্লা-হুম্মা সাল্লি ওয়াসাল্লিম ‘আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ”

অর্থঃ “হে আল্লাহ! আপনি সালাত ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদের উপর।”

(রাসুল সাঃ এলন, যে কেউ সকাল বেলা আমার উপর দশবার দরুদ পাঠ করবে এবং বিকাল বেলা দশবার দরুদ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ দ্বারা সৌভাগ্যবান হবে।’ (তাবরানী হাদীসটি দুই সনদে সংকলন করেন, যার একটি উত্তম। (দেখুন, মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ ১০/১২০; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব ১/২৭৩)।

(২) আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে মুসলিম ব্যক্তির দান-খয়রাত করার সামর্থ্য নাই, সে যেন তার দোয়ায় বলে,

“আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন আবদিকা ওয়া রাসূলিকা ওয়া সাল্লি আলাল-মুমিনীনা ওয়াল-মুমিনাত ওয়াল-মুসলিমীনা ওয়াল মুসলিমাত”

অর্থঃ (হে আল্লাহ! তোমার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদকে দয়া করো এবং মুমিন নারী-পুরুষ ও মুসলিম নারী-পুরুষ সকলকে দয়া করো)। এটাই তার জন্য যাকাতস্বরূপ। (আল-আদাবুল মুফরাদ ৬৪৪, হাকিম, ইবনে হিব্বান)।

(৩) সা’ঈদ ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু সা’ঈদ আল উমাবী (রহ.)....যায়দ ইবনু খারিজাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, তোমরা আমার ওপর দরূদ পাঠ কর এবং বেশি বেশি দু’আ কর আর তোমরা বল

“আল্ল-হুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদিন”

অর্থঃ (হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও তার বংশধরের ওপর রহমত বর্ষণ কর)। (সুনান আন-নাসায়ী (তাহকীককৃত) ১২৯২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১২৯৩, নাসায়ীর “আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লাতা” ৩৫, মুসনাদে আহমাদ ১৭১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

(৪) কুতায়বাহ্ (রহ.)...আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনার ওপর সালাম পাঠানোর নিয়ম তো আমরা জানি, কিন্তু আপনার ওপর। দরূদ কিভাবে পাঠ করব? তিনি (সা.) বলেন, তোমরা বলবে-

“আল্ল-হুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদিন ’আবদিকা ওয়া রসূলিকা কামা- সল্লায়তা ’আলা- ইবর-হীমা ওয়াবা-রিক ’আলা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- বা-রকতা ’আলা- ইবর-হীম।"

অর্থঃ (হে আল্লাহ! তুমি তোমার দাস ও তোমার রসূল মুহাম্মাদ (সা.) -এর ওপর রহমত বর্ষণ কর। যেমন তুমি ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর ওপর রহমত বর্ষণ করেছিলে। আর তুমি মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর বংশধরের ওপর বরকত বর্ষণ কর, যেমন তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর ওপর বরকত বর্ষণ করেছিলে)। (সুনান আন-নাসায়ী (তাহকীককৃত)১২৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১২৯৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৭৯৮, ৬৩৫৮, সুনান ইবনু মাজাহ ৯০৩, আহমাদ ১১০৪১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

দরুদ পাঠে যেহেতু অনেক ফজিলত রয়েছে তাই ছোট্ট এই দরুদগুলো জিকিরের মতো নিষিদ্ধ সময় ব্যতীত সব সময় পাঠ করতে থাকবো। দরুদগুলো সালাতের বাহিরে ফরজ সালাতের পরে ১০ বার করে পাঠ করতে পারেন, এ ছাড়া সকাল বিকেল ও রাতে ঘুমানোর আগে পাঠ করবেন।

এমনিভাবে দুরুদ শরীফ পাঠের সময় ও নিয়মাবলী শিক্ষা দিয়ে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার উপর অনেক বেশী দরূদ পাঠ করি। আপনি আমাকে বলে দিন আমি (দু’আর জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ করে রেখেছি তার) কতটুকু সময় আপনার উপর দরূদ পাঠাবার জন্য নির্দিষ্ট করব? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়। আমি আরয করলাম, যদি এক-তৃতীয়াংশ করি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়, যদি আরো বেশী কর তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর। আমি আরয করলাম, যদি অর্ধেক সময় নির্ধারণ করি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার মন যতটুকু চায় কর। যদি আরো বেশী নির্ধারণ কর তাহলে তোমার জন্যই ভালো। আমি বললাম, যদি দুই-তৃতীয়াংশ করি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরো বেশি নির্ধারণ কর তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি আরয করলাম, তাহলে আমি আমার দু’আর সবটুকু সবসময়ই আপনার উপর দরূদ পড়ার কাজে নির্দিষ্ট করে দেব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে, তোমার দীন-দুনিয়ার মকসুদ পূর্ণ হবে এবং তোমার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৯, সুনান আততিরমিযী ২৪৫৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৭০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উল্লেখিত হাদীস সমূহে যেমনিভাবে রাসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামগণকে দুরুদ শরীফসমূহ শিক্ষা দিয়েছেন ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরামগণকে দুরুদ শরীফ পাঠ করার সময় ও তার নিয়ম-কানুন সমূহও শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু হাদীস শরীফের কোথাও বর্তমানে প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম এর আলোচনা, তাতে পঠিত বাক্যসমূহ ও তাতে বসে পড়া-দাঁড়িয়ে পড়া, মাঝে মাঝে কবিতা পড়া ইত্যাদির যে, বাধ্য-বাধকতা পূর্ণ পদ্ধতি রয়েছে এরুপ হাদীসের কোথাও নাই। এমনকি হাদীসে উল্লেখিত দুরুদ সমূহের ক্ষেত্রেও এরুপ কোন নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারনের উপর কোনো রুপ জোর দেয়া হয়নি বরং যার যখন যেভাবে মনে চায়, দাঁড়িয়ে, বসে, হাটতে-হাটতে সব সময় দুরুদ পাঠ করতে পারবে এবং সর্বদা দুরুদ পাঠকারীর ক্ষেত্রে আমাদের উল্লেখিত হাদীসসহ আরো বহু হাদীসে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।অতএব এরুপ গুরুত্ব পূর্ণ আমলের ক্ষেত্রে যতœবান হওয়া উচিত, যার সবগুলো এখানে লিপিবদ্ধ সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরুপ মাত্র কয়েকটি দরুদ শরীফ ও দুরুদ পাঠের কিছু বিধানাবলী এখানে উল্লেখ করা হলো যাতে করে মানুষ দুরুদ ও মিলাদের মধ্যকার সুন্নাত ও বিদ’আতের প্রার্থক্যটা বুঝতে পারে এবং বিদ’আতকে বর্জন করে সুন্নাত অনুযায়ী আমল করতে পারে। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। (আমীন)

Author and Compiler:

Md. Izabul Alam-M.A., C.In., Ed. (Islamic Studies-Rangpur Carmichael University College, Rangpur), Prominent Islamic Thinker, Researcher, Political Analyst, Writer and Blogger.

(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)

(2) GENERAL DIRECTOR- PURE MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER (PMMRC),

(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS Coaching (BBC)

(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING INSTITUTE (PTI)

(5) PRINCIPAL- BANGLADESH ONLINE UNIVERSITY (BOU)

(6) GENERAL DIRECTOR AND CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION SERVICES (PIS)

(7) EDITOR-BDC CRIME NEWS24

কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।

(PMMRC)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক

বইয়ের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। এজন্যে  আপনি বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।

(ক) আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।

(খ) তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর কি হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।

(গ)  আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস  সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮,  রিয়াদুস  সলেহিন,  হাদিস নং  ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

Please Share On

No comments:

Post a Comment

মুহাররম ও আশূরাঃ কুসংস্কার ও সুন্নাহ বিরোধী আমলসমূহ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম মুহাররম ও আশূরাঃ কুসংস্কার ও সুন্নাহ বিরোধী আমলসমূহ   লেখকঃ মোঃ ইজাবুল আলম আশুরাকে নিয়ে এদেশের ভন্ড পীর অল...