Friday, August 14, 2026

পীরের আস্তানা শয়তানের কারখানা (দ্বিতীয় অংশ)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

পীরের আস্তানা শয়তানের কারখানা

(দ্বিতীয় অংশ)


 পীর-অলি, সুফি-সাধকদের দরবার, দরগা ও মাজারগুলো শিরক, বিদআতের কারখানা

পীরদের আস্তানা বা তথাকথিত খানক্বা শরীফঃ

পীরদের আস্তানা, দরবার বা তথাকথিত খান্ক্বা শরীফ ইসলামের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য বিদ্রোহ। শুধু আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই নয় বরং তারা আমলের ক্ষেত্রেও রাসূল (সা.) আনীত বিধানের সাথে বিদ্রোহ করেছে। বাস্তব কথা এইযে, খান্ক্বা, মাযার, দরবার বা পীরদের আস্তানায় ইসলামের যতটুকু অসম্মান হয়েছে ততটুকু অসম্মান মন্দির, গির্জা বা চার্চেও হয়নি।

পীর-বুযুর্গদের কবরের উপর ঘর বা গুম্বজ তৈরী করা, কবরকে সাজ-সজ্জা বা আলোকিত করা, কবরের উপর ফুল ছড়ানো, কবরকে গোসল দেয়া, কবরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কবরের খাদিম হয়ে তার পার্শ্বে অবস্থান করা, কবরের জন্য কোন কিছু মানত করা, কবরকে উপলক্ষ করে খানা বা শিরনি বিতরণ করা, পশু জবাই করা, কবরের জন্য রুকূ’-সিজ্দাহ্ করা, কবরের সামনে দু’ হাত বেঁধে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো, কবরে শায়িত ব্যক্তির নিকট কোন কিছু চাওয়া, তাদের নামে চুলের বেণী রাখা বা শরীরের কোথাও সুতা বেঁধে দেয়া, তাদের নামের দোহাই দেয়া বা বিপদের সময় তাদেরকে ডাকা, মাযারের চতুষ্পার্শ্বে তাওয়াফ করা, তাওয়াফ শেষে কুরবানী করা বা মাথা মুন্ডানো, মাযারের দেয়ালে চুমু খাওয়া, বরকতের জন্য কবরের মাটি যত্ন সহকারে সংগ্রহ করা, খালি পায়ে কবর পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যাওয়া এবং উল্টো পায়ে ফিরে আসা ইত্যাদি ইত্যাদি তো যে কোন কবরের জন্যই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যা শির্ক ও বিদ্’আত ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।

কোন কোন খান্ক্বার খিদমতের জন্য তো ছোট বাচ্চা বা যুবতী মেয়েও ওয়াক্ফ করা হয় এবং নিঃসন্তান মহিলাদেরকে নয় রাতের জন্য খাদিমদের খিদমতে রাখা হয়। তথাকথিত যমযমের পানি পান করানো হয়। আবার কোন কোন মাযারে তো মদ, গাঁজা ও আফিমের আড্ডা জমে। কোন কোন মাযাওে তো যেনা-ব্যভিচার বা সমকামিতার মতো নিকৃষ্ট কাজও চর্চা করা হয়। আবার কোন কোন মাযারকে তো হত্যাকারী ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থলও মনে করা হয়।

উরস উপলক্ষে পুরুষ ও মহিলাদের সহাবস্থান, নাচ-গান তো নিত্য দিনেরই ব্যাপার। পাকিস্তানের সরকারী হিসেবে যখন সেখানে প্রতি বছর ৬৩৪ টি উরস তথা প্রতি মাসে ৫৩ টি উরস সংঘটিত হয়ে থাকে তখন বাংলাদেশে প্রতি মাসে বিশ-ত্রিশটা উরস তো হয়েই থাকবে এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, লাহোরের মুসলমানরা ‘‘মধু লাল’’ নামক এক ব্রাহ্মণের কবরের উপরও মাযার বানিয়েছে যার উপর শেখ হুসাইন নামক এক বুযুর্গ আশিক হয়েছিলেন। মধু লালের মৃত্যুর পর শেখ হুসাইনের ভক্তরা মধু লালকে তার আশিকের পাশেই দাফন করে দেয় এবং উভয় নামকে মিলিয়ে তাদের মাযারকে মধু লাল হুসাইনের মাযার বলে আখ্যায়িত করে।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কোনো নবী-ওলী অথবা অন্য কোনো পীর-বুযুর্গ সব কিছু শুনতে বা দেখতে পান এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই সব কিছু দেখতে বা শুনতে পান। তা যতই ক্ষুদ্র বা সূক্ষ্ম হোকনা কেন এবং যতই তা অদৃশ্য বা অস্পষ্ট হোক না কেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘হে রাসূল (সা.)! তুমি যে কোন অবস্থায়ই থাকোনা কেন অথবা কোর’আন মাজীদের যে কোন আয়াতই পড়োনা কেন এমনকি তোমরা (নবী ও তাঁর সকল উম্মত) কোন্ কাজ কোন্ সময় করো তা সবই আমি জানি। আকাশ ও পৃথিবীতে একটি ছোট লাল পিপীলিকা (অণু) সমপরিমাণ অথবা তার থেকেও ক্ষুদ্র বা বড় যে পরিমাপেরই হোক না কেন কোন বস্ত্তই তোমার প্রভুর অগোচরে নয়। বরং তা সুস্পষ্ট কিতাব তথা লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে’’। (সুরা ইউনুস: ৬১)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘কাফিররা বলে: আমাদের উপর কিয়ামত আসবে না। হে নবী! আপনি ওদেরকে বলে দিন: আমার প্রভুর কসম খেয়ে বলছি: কিয়ামত অবশ্যই আসবে। তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। আকাশ ও পৃথিবীতে একটি ছোট পিপীলিকা সমপরিমাণ অথবা তার থেকেও ক্ষুদ্র বা বড় যে পরিমাপেরই হোকনা কেন কোন বস্ত্তই তাঁর অগোচরে নয়। বরং তা সুস্পষ্ট কিতাব তথা লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে’’। (সুরা সাবা: ৩)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলার নিকট আকাশ ও পৃথিবীর কোন বস্ত্তই লুক্কায়িত নয়’’। (সুরা আ’লে-ইমরান: ৫)।

তিনি আরো বলেন: “নিশ্চয়ই তিনি প্রকাশ্য ও গুপ্ত সকল বিষয়ই জানেন’’। (সুরা আ’লা: ৭)।

আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখন কোন উপত্যকায় আরোহণ করতাম, তখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলতাম। আর আমাদের আওয়াজ অতি উঁচু হয়ে যেত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা তো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। বরং তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন, তিনি তো শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ২৯৯২, ৪২০২, ৬৩৮৪, ৬৪০৯, ৬৬১০, ৭৩৮৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)  ৬৭৫৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭০৪, আহমাদ ১৯৬১৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৭৭১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৭৮১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অনেক কোর’আন ও হাদীসে অপরিপক্ক ব্যক্তি উক্ত হাদীস শুনে খুব খুশি হয়ে থাকবেন। কারণ, তাদের ধারণা, আল্লাহ্ তা’আলা নিজ সত্তা সহ সর্বস্থানেই রয়েছেন। মূলতঃ তাদের এতে খুশি হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা এ সকল মূর্খদের সম্পর্কে সর্বদা অবগত রয়েছেন বলে তিনি বহু পূর্বেই কারোর সাথে তাঁর থাকার সত্যিকারার্থ নিজ কোর’আন মাজীদের মধ্যে সুন্দরভাবে বাতলিয়ে দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা মূসা ও হারূন (আলাইহিমাস্ সালাম) সম্পর্কে বলেন:

‘‘তিনি (আল্লাহ্ তা’আলা) বলেন: তোমরা ভয় পেয়োনা। আমিতো তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমি তোমাদের সকল কথা শুনছি ও তোমাদের সকল কাজ অবলোকন করছি’’। (সুরা ত্বা-হা : ৪৬)।

যারা ওলীদেরকে সাধারণ মানুষের ইহ-পরকালীন কল্যাণের ক্ষেত্রে অনেক কিছু করতে পারেন বলে মনে করে, তাঁদেরকে নিকট ও দূর থেকে আহ্বান করে এবং মনে করে যে, তাঁরা তাদের এ সব আহ্বান শ্রবণ করতে পারেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের এ ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন পূর্বক বলেন :

‘‘আল্লাহকে ব্যতীত তারা যাদেরকে আহ্বান করে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না অথচ তাদের সৃষ্টি করা হয়। তারা মৃত, জীবিত নয়, আর তারা কবে পুনরুজ্জীবিত হবে তা অনুধাবন করতে পারে না।’’ (আল-কুরআন, সূরা নাহাল: ২০, ২১)।

আরবের মুশরিকরা উপর্যুক্ত ধারণার ভিত্তিতে ওয়াদ, সুয়া‘, ইয়াগুস, উয়া‘উক, নসর ও অন্যান্য যে সব ওলিদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানাতো, সে সব অলিগণের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে এ আয়াতে আলোকপাত করা হয়েছে এবং তাদেরকে এ কথা বলা হচ্ছে যে, তোমরা যাদেরকে উক্ত ধারণার ভিত্তিতে আহ্বান করছো, তারাতো তোমাদের সাহায্য করতে পারে না; কেননা, তারাতো মৃত। আর মৃতরা কিছুই শ্রবণ করতে পারে না। পৃথিবীতে কে কী করছে, এখানে কখন কী ঘটছে, কখন মহাপ্রলয় ঘটার পর তাঁরা পুনরুজ্জীবিত হবে, এ সব ব্যাপারে তাঁদের কোনই অনুভূতি নেই।

এই যদি হয় মুশরিকদের আহ্বানকৃত অলিগণের অবস্থা, তা হলে সাধারণ মুসলিমরা যে সব ওলিগণ কে উক্ত ধারণার ভিত্তিতে আহ্বান করে থাকে, তাঁদের অবস্থা যে এর ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা-ই বাহুল্য। বস্তুত মরে যাবার পর তাঁদের রূহের দ্বারা তাঁরা নিজেরা এবং অপর কেউ উপকৃত হতে পারবে না কেননা, রূহের দ্বারা রূহ নিজের বা অপর কারো উপকার করার জন্য রূহের সাথে জীবন্ত দেহের সহঅবস্থান একান্ত প্রয়োজন। দেহ যখন মরে যায় তখন রূহের জীবিত থাকা আর না থাকা উভয়ই সমান হয়ে যায়। দেহ মরে যাওয়ার ফলে রূহকে হাজারো আহ্বান করলেও তা স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী কিছুই শ্রবণ করতে পারে না। তখন তা কারো কোনো উপকারও করতে পারে না।

 মানুষ মরে না ইন্তেকাল করে?

এ-কথা সত্য যে, আমাদের দেহের সাথে রূহের সহঅবস্থান যতদিন থাকে, ততদিন আমরা এ ইহজগতে জীবিত থাকি। আর যখন তা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন আমাদের এ দেহ মরে যায়। আমাদের দেহ মরে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা বরযখী জগতে স্থানান্তরিত হই। এটি হচ্ছে পরজগতের প্রথম ধাপ। এ সময় আমাদের দেহ মরে গেলেও রূহ মরে না। এমতাবস্থায় একজন মানুষ মরে যাওয়ার পর তিনি মরে গেছেন না ইন্তেকাল করেছেন কোনটি বলবো ?

মৃত্যুর মাধ্যমে সকল মানুষ পরজগতে স্থানান্তরিত হলেও কুরআনুল কারীমের পরিভাষায় তাদেরকে স্থানান্তরিত হয়েছেন না বলে মরে গেছেনই বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ আর অসাধারণ মানুষ বলে কুরআন ও হাদীসে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুকে মৃত্যু বলেই আখ্যায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘‘নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে’’। (আল-কুরআন, সূরা যুমার: ৩০)।

অপর স্থানে বলেছেন,

‘‘আর মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র, তাঁর পূর্বেও রাসূলগণ অতিবাহিত হয়েছেন, তিনি যদি মরে যান বা নিহত হন, তা হলে তোমরা কি তোমাদের পিছনে ফিরে যাবে’’। (আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান: ১৪৪)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণও তাঁর মৃত্যুকে ইন্তেকাল না বলে মৃত্যু বলেই মনে করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর যখন ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্যরূপ চিন্তা করেছিলেন, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবাইকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন:

‘‘যে মুহাম্মদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপাসনা করে সে নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে আল্লাহর উপাসনা করে সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ নিশ্চিত জীবিত, তিনি মরেন না’’। (বুখারী, প্রাগুক্ত; (কিতাবু ফাযাইলিস সাহাবাহ, বাব নং-৫, হাদীস নং ৩৪৬৭), ৩/১৩৪১; বায়হাক্বী, আহমদ ইবনে হুসাইন, আস্সুনানুল কুবরা; (মক্কা: মাকতাবাতু দারুল বায, সম্পাদনা: মুহাম্মদ আব্দুল কাদির আত্বা, সংস্করণ বিহীন, ১৯৯৪ খ্রি.), ৮/১৪২; ইবনে কাছীর, তাফসীরুল রুরআনিল আজীম; ১/৪১০)।

রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুকে আল্লাহ ও সাহাবীদের দৃষ্টিতে যদি ইন্তেকাল না বলে মৃত্যু বলা হয়, তা হলে অন্য কারো মৃত্যুকে মৃত্যু না বলে ইন্তেকাল বা স্থানান্তরিত বলার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না। তর্কের খাতিরে যদি তা স্বীকার করেও নেয়া হয়, তবুও কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া মৃতদের রূহের শ্রবণের বিষয়টি স্বীকার করা যায়না।

মৃত্যুর পর মানুষের রূহ কোথায় যায়?

মৃত মানুষের রূহের শ্রবণ করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পূর্বে মৃত্যুর পর মানুষের রূহ কোথায় যায়-এ বিষয় সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারণা হলে মৃতদের শ্রবণ সম্পর্কিত অনেক জিজ্ঞাসারই জবাব আমরা অতি সহজেই অবগত হতে পারবো।

এ বিষয়ে কুরআন, হাদীস ও মনীষীগণের মতামত যাচাই করে যা জানা যায় তা হলো:মানুষ মরে যাওয়ার পর নাকীর ও মুনকার ফেরেশ্তাদ্বয়ের জিজ্ঞাসাবাদের পূর্বে মানুষের শরীরের সাথে রূহের সম্পর্ক হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের পর সে সম্পর্ক পুনরায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রূহ কোথায় যায় আল্লামা ইবনু আবিল ইয্য আল-হানাফী এর বর্ণনানুযায়ী এ নিয়ে মনীষীদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। নিম্নে এর উল্লেখযোগ্য কয়কেটি মত বর্ণিত হলো:

১. মু’মিনদের রূহসমূহ জান্নাতে অবস্থান করে এবং কাফিরদের রূহসমূহ জাহান্নামে অবস্থান করে।

২. মু’মিনদের রূহসমূহ জান্নাতের বাইরে এর দরজার নিকটবর্তী প্রাঙ্গনে থাকে, সেখানে থেকেই তারা জান্নাতের সুঘ্রাণ ও জীবিকা লাভ করে।

৩. ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: আমার নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, রূহসমূহ মুক্ত থাকে এবং তা যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘুরে বেড়ায়।

৪. কা‘ব আল-আহবার এর মতে মু’মিনদের রূহ সপ্তম আকাশে অবস্থিত ‘ইল্লিয়্যীন’ নামক স্থানে অবস্থান করে এবং কাফিরদের রূহ সপ্তম জমিনের নিচে ‘সিজ্জীন’ নামক স্থানে থাকে।

৫. ইমাম ইবনে হাযাম বলেন: শরীর সৃষ্টির পূর্বে রূহ যেখানে ছিল মৃত্যুর পর তা সেখানে অবস্থান করে।

৬. ইমাম ইবনে ‘আব্দিল বার বলেন:শহীদদের রূহসমূহ জান্নাতে থাকে এবং অন্যান্য সাধারণ মু’মিনদের রূহ তাদের কবর প্রাঙ্গনে থাকে। (আল্লামা ইবনু আবিল ইয্‌য আল-হানাফী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪৫৩, ৪৫৪)।

৭. শেখ আব্দুর রহমান আল-জাযা-ইরী বলেন: কবরে জিজ্ঞাসাবাদের পর মানুষের রূহসমূহ ইল্লিয়্যীন অথবা সিজ্জিনে থাকে এবং কেয়ামত পর্যন্ত তা এ-ভাবেই বন্দী অবস্থায় থাকে। প্রত্যেকের শরীরের সাথে তার রূহের সম্পর্ক ঠিক সেভাবে হয়ে থাকে যেভাবে মোবাইল ফোনের সংযোগ টাওয়ারের সাথে থাকে। এ সংযোগের মাধ্যমেই একজন কবরবাসী তাকে যিয়ারতকারী ও সালামকারীদের সম্পর্কে অবগত হয়ে থাকে। (শেখ আব্দুর রহমান আল-জাযাইরী, ‘আক্বীদাতুল মু’মিন; পৃ.৪১৮)।

৮. ইমাম ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাঃ বলেন: রূহ দু’প্রকার:এক, শাস্তি ভোগকারী রূহ। দুই, আরাম ভোগকারী রূহ। যারা শাস্তির মধ্যে রয়েছে তারা কেউ কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারে না। আর যারা শান্তিতে রয়েছে তারা পরস্পরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে। (ইবনু কাইয়্যিম, কিতাবুর রূহ; পৃ.২৬)।

উপর্যুক্ত মতামতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করলে এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, মৃত্যুর পর রূহ কোথায় যায়, এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট দলীল না থাকার কারণেই মনীষীগণ এ ব্যাপারে উপর্যুক্ত মতামত ব্যক্ত করেছেন। রূহ কবরে থাকে এ-কথা যদি নিশ্চিত করে বলা না যায়, তা হলে রূহকে সম্বোধন করে কিছু বললে তা শ্রবণ করতে পারে, এ-কথা নিশ্চিত করে বলার কোনো উপায় নেই।

মৃত মানুষের শ্রবণ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য :

কুরআন ও হাদীসের প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিদান করলে দেখা যায় যে, জীবিত মানুষ যেভাবে শ্রবণ করতে পারে মৃত মানুষ সেভাবে শ্রবণ করতে পারেনা। এ বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য আমরা নিম্নে বর্ণিত আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করতে পারি। যারা জীবিত থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান-বুদ্ধি খাটিয়ে সত্যকে গ্রহণ না করে মৃত মানুষের ন্যায় আচরণ করে মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেন: ‘‘তুমি মৃতদের শ্রবণ করাতে পারবে না’’। (আল-কুরআন, সূরা রূম:৫২)।

অপর আয়াতে বলেছেন:

‘‘শ্রবণ করার ক্ষেত্রে জীবিত আর মৃতরা এক নয়, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শ্রবণ করান, তুমি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে পারবে না’’ (আল-কুরআন, সূরা ফাতির: ২২)।

অত্র আয়াত দু’টিতে আল্লাহ তা‘আলা জীবিত মুশরিক ও কাফিরদের কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা না শুনার অবস্থাকে কবরবাসীদের শ্রবণ না করার অবস্থার সাথে তুলনা করেছেন। কবরবাসীরা শ্রবণ করতে পারে কি না, এ-কথা বলা এ আয়াত দু’টির মুখ্য উদ্দেশ্য না হয়ে থাকলেও যেহেতু আয়াত দু’টিতে মুশরিকদের শ্রবণ না করার অবস্থাকে মৃত মানুষ বা কবরস্থ মানুষের না শুনার সাথে তুলনা করা হয়েছে, এতে প্রমাণিত হয় যে, আসলে মৃত মানুষেরা নিজ থেকে কিছু শুনতে পারে না। কেননা, একটি বস্তুকে অপর বস্তুর বৈশিষ্ট্যের সাথে তুলনা কেবল তখনই করা হয় যখন সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যে উভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য থাকে বা অপর বস্তুর মধ্যে সে বৈশিষ্ট্যটি অধিকমাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এতে বুঝা যায় যে, মৃতরা নিজ থেকে আদৌ কিছু শুনতে পারে না বলেই মুশরিকদের না শুনাকে মৃতদের না শুনার সাথে তুলনা করা হয়েছে।

উপর্যুক্ত আয়াত দু’টির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে প্রখ্যাত হাদীসবিদ আল্লামা আলবানী (মৃত ১৯৯৯ খ্রি.)বলেন:‘‘উক্ত আয়াত দু’টিতে মুশরিকদের দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা না শুনার অবস্থাকে মৃত মানুষের শ্রবণ না করার অবস্থার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, মৃত লোকেরা আসলে নিজ থেকে কিছুই শ্রবণ করতে পারে না। একজন মানুষের সাহসিকতার প্রশংসা করে যদি তাকে সিংহের সাথে তুলনা করা হয়, তা হলে এতে যেমন সিংহের দুর্দান্ত সাহসিকতা প্রমাণিত হয়, ঠিক তেমনি উক্ত আয়াত দু’টিতে কাফিরদের শ্রবণ না করাকে মৃত মানুষের শ্রবণ না করার সাথে তুলনা করাতে মৃতদের শ্রবণ না করার কথাই প্রমাণিত হয়।

শুধু তা-ই নয়, আরবী ভাষায় দক্ষ প্রতিটি মানুষই এ তুলনার দ্বারা এ-কথাই বুঝবে যে, মৃতরা শ্রবণ করার ক্ষেত্রে জীবিতদের চেয়ে অধিক অক্ষম। আর সে কারণেই জীবিতদের শ্রবণ না করাকে মৃতদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, মৃতরা আদৌ কিছুই শ্রবণ করতে সক্ষম নয়’’। (নু’মান ইবন মুহমূদ, প্রাগুক্ত;পৃ. ২৭-২৮)।

মৃতরা নিজ থেকে জীবিতদের কর্মের ভাল-মন্দ অবগত হতে পারলে সর্বপ্রথম তা নবী ও রাসূলগণেরই অবগত হওয়ার কথা। তাদের পরবর্তী উম্মতগণ শরী‘আত অনুসারে চলেছে কি না, বা তাঁদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে কেউ শির্ক করেছে কি না, তা তাঁদের খুব ভাল করেই জানা থাকার কথা। কিন্তু কুরআনের বক্তব্যানুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা মৃত্যুর পর এ-সব বিষয়ে নিজ থেকে কিছুই অবগত হতে পারেন না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

‘‘যেদিন আল্লাহ সকল রাসূলদেরকে একত্রিত করবেন তখন তিনি তাঁদেরকে বলবেন:তোমরা (তোমাদের পরবর্তী উম্মতদের পক্ষ থেকে) কী উত্তর পেয়েছিলে? তাঁরা বলবেন: (এ ব্যাপারে) আমাদের কোনই জ্ঞান নেই, আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে মহা জ্ঞানী’’। (আল-কুরআন, সূরা মা-ইদাহ : ১০৯)।

রাসূলগণ মরে যাওয়ার পর মোট দু’টি মাধ্যমে তাঁদের জ্ঞান আহরণের সম্ভাবনা থাকতে পারে:

এক.মৃত্যুর পরেও হয়তো তাঁরা জীবিত থাকার ন্যায় নানাভাবে জ্ঞান আহরণ করে থাকবেন এবং সে অনুযায়ী কারা তাঁদের অনুসরণ করলো আর কারা করলো না, তা তাঁরা জেনে থাকতে পারেন।

দুই.নতুবা মৃত্যুর পর আল্লাহ তা‘আলা নিজ থেকে তাদেরকে শ্রবণ করার ও জানার এমন কোনো অতিরিক্ত যোগ্যতা দিয়ে থাকবেন, যার মাধ্যমে তাঁরা মরে গিয়ে থাকলেও দুনিয়ায় কে কী করলো, তা শুনে ও জেনে থাকবেন।কিন্তু এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলগণ মরে যাওয়ার পর জ্ঞান আহরণের উপর্যুক্ত দু সম্ভাবনার কোনো সম্ভাবনা দিয়েই তাঁরা কোনো জ্ঞান আহরণ করতে পারেন না। জীবিত মানুষেরা কী করে, তাঁরা এর কোনো কিছুই অবগত হতে পারেন না। যদি পারতেন, তা হলে তাঁরা তাঁদের পরবর্তী উম্মতদের অনুসরণের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতে পারতেন।

তাঁদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে যারা শির্ক করেছে, আখেরাতে তাঁরা আল্লাহর প্রশ্নের জবাবে সে-সব লোকদের কর্মের অবস্থা বর্ণনা করতেন। কিন্তু যেহেতু তাঁরা এ-সব কিছুই অবগত হতে পারেন না, সে-জন্যে তাঁরা সেদিন বলবেন, প্রভু ! এ-সবতো অদৃশ্যের ব্যাপার। কাজেই তা কেবল আপনারই জানার কথা। আমাদের পক্ষে তা জানার বা শুনার কোনই উপায় নেই। রাসূলগণ যদি মৃত্যুর পর তাঁদের উম্মতদের কর্ম সম্পর্কে কিছুই শুনতে ও জানতে না পারেন, তা হলে অবশিষ্ট ওলি ও সাধারণ মানুষেরা যে কিছুই শুনতে ও জানতে পারবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

দেহে প্রাণ থাকলেই কেবল সকল জীব শ্রবণ করতে পারে

উপর্যুক্ত আয়াত দ্বারা আরো প্রমাণিত হয় যে, মানুষসহ সকল জীবের দেহের সাথে যতক্ষণ তাদের রূহের স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে, ততক্ষণ তাদের দেহ জীবিত থাকে এবং ততক্ষণ পর্যন্তই সকল জীব শুনতে পারে। অন্যথায় নয়। দেহ মরে যাওয়ার পর রূহ মরে না গেলেও রূহের শ্রবণ করার মত নিজস্ব কোনো যোগ্যতা অবশিষ্ট থাকে না। আর সে-জন্যই রাসূলগণ আখেরাতে উপর্যুক্ত জবাব দেবেন। পক্ষান্তরে মুশরিকরা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে যে সকল ফেরেশ্তাদের উপাসনা করতো তারা জীবিত থাকার কারণে তাদেরকে কেন্দ্র করে মুশরিকরা যা কিছু করতো আখেরাতে তারা আল্লাহ তা‘আলার এ জাতীয় প্রশ্নের জবাবে রাসূলগণের ন্যায় জবাব না দিয়ে বলবেন:ওরা আমাদের উপাসনা করেনি, ওরা বরং জিনের তথা শয়তানের উপাসনা করতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

‘‘আর যেদিন তিনি সবাইকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ফেরেশ্তাদের বলবেন: এরা কি তোমাদেরই উপাসনা করতো? তারা বলবে:আপনি পূত পবিত্র, আপনিই আমাদের অভিভাবক, ওরা নয়। বরং তারা জিনেরই উপাসনা করতো এবং তাদের অধিকাংশরাই এদের উপর ঈমান আনয়ন করতো।’’ (আল-কুরআন, সূরা সাবা: ৪১)।

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে যে ফেরেশ্তাদেরকে কেন্দ্র করে শির্ক কর্ম করতো, সে ফেরেশ্তারা জীবিত থাকায় তারা সে সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। আর সে-জন্যই আল্লাহর উপর্যুক্ত প্রশ্নের জবাবে রাসূলগণের ন্যায় তাদের অজ্ঞতার কথা না বলে তাঁরা বলবেন:ওরা আমাদের উপাসনা করেনি, বরং তারা জিন তথা শয়তানের উপাসনা করেছে।

অনুরূপভাবে দেখা যায় আল্লাহ তা‘আলা আখেরাতে যখন ঈসা u কে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ত্ববাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন, তখন তিনিও সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকার কারণে বলবেন:

‘‘আপনি আমাকে যা বলতে আদেশ করেছিলেন আমি তাদেরকে কেবল তাই বলেছি যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা করো, যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা, আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকে আপনিই তাদের সম্পর্কে অবগত রয়েছেন...’’। (আল-কুরআন, সূরা মা-ইদাঃ ১১৮)।

ঈসা আলাইহিস সালামের উক্ত জবাব থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, এ দুনিয়াবী পরিবেশে জীবিত না থাকলে কারো পক্ষে এ দুনিয়ার মানুষেরা কি করছে, তা নিজ থেকে জানার বা শ্রবণ করার কোনই উপায় নেই।

অনুরূপভাবে দেখা যায়, আরবের মুশরিকরা ওয়াদ, সুয়া‘, ইয়াগুছ ও অন্যান্য যে-সব মূর্তিসমূহকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করতো, সে-সব মূর্তিসমূহের সবাই তাদের আহ্বান না শুনলেও অন্তত ওয়াদ, সুয়া‘...ইত্যাদি মূর্তিগুলো সৎ মানুষদেরকে কেন্দ্র করে তৈরী হওয়ার কারণে তাঁদের পক্ষে তা শ্রবণ করার কথা। কিন্তু আল্লাহর কথানুযায়ী প্র্র্রমাণিত হয় যে, তারাও মুশরিকদের সে-সব আহ্বান সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর রয়েছেন।

যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ব্যতীত এমন কাউকে আহ্বান করে যে কেয়ামত পর্যন্ত তার আহবানে সাড়া দেবে না, সে ব্যক্তির চেয়ে পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? তাঁরা তো তাদের আহ্বান সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর।’’ (আল-কুরআন, সূরা আহক্বাফ: ৫-৬)।

উক্ত এ-সব আয়াতসমূহ দ্বারা এ-কথাই প্রমাণিত হয় যে, কোনো মানুষ মরে যাওয়া বা ইন্তেকাল করার পর- তিনি কোনো ওলি হোন আর না-ই হোন না কেন-তিনি নিজ থেকে জীবিতদের কর্মকাণ্ডের কোনো খোঁজ-খবর রাখতে পারেন না। আল্লাহ যদি কাফের ও মু’মিন নির্বিশেষে তাদেরকে বিশেষ কোনো মুহূর্তে কিছু শুনাতে চান, কেবল তা ব্যতীত তারা নিজ থেকে কারো কোনো কথা বা আহ্বান শ্রবণ করতে পারেন না।

মৃতদের বিশেষ মুহূর্তে শ্রবণ

মৃতরা নিজ থেকে কিছুই শ্রবণ করতে পারে না, এটি হচ্ছে কুরআনের মূল কথা। তবে হাদীস দ্বারা বিশেষ একটি সময়ে তাদের শ্রবণের কথা প্রমাণিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘‘মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরে রাখা হয় তখন তাকে দাফনকারীরা ফিরে যাওয়ার সময় সে তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়’’। (মুসলিম, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল জান্নাতি..., বাব নং ১৭, হাদীস নং ২৮৭০), ৪/২২০১;মুহাম্মদ ইবনে হিববান আল-বুস্তী, সহীহ ইবনে হিববান; (বৈরুত: মুআছছাছাতুর রিছালাঃ, ২য় সংস্করণ, ১৯৯২ খ্রি.), ৭/৪৪২)।

আল্লামা ইবনে আবিদীন এ হাদীস প্রসঙ্গে বলেন:‘‘এ হাদীসে মৃতের শ্রবণের বিষয়টি মৃত ব্যক্তির কবরে রাখার সময়ে সওয়াল-জাওয়াবের প্রারম্ভে^র সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই এ হাদীসের সাথে কুরআনের কোনো সংঘর্ষ নেই’’। (ইবনে আবিদীন, প্রাগুক্ত; ৩/১৮০)।

শায়খ আলবানী বলেন:‘‘এ হাদীসটি মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা এবং তাকে প্রশ্ন করার জন্য ফেরেশ্তাদের আগমনের সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং মৃতের শ্রবণের ক্ষেত্রে এ হাদীসকে সাধারণ অর্থে গ্রহণের কোনো উপায় নেই’’। (নু’মান ইবনে মাহমূদ আল-আলূসী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৫১)।

আল্লামা নু‘মান ইবন মাহমূদ আলূসী এ প্রসঙ্গে হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট আলেমদের উক্তিসমূহ মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফিকহ গ্রন্থসমূহ থেকে উদ্ধৃত করার পর বলেন:

‘‘ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.) এবং মাযহাবের অন্যান্য মনীষীদের ফতোয়া দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রূহ বের হয়ে যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তি শ্রবণ করে না, যেমনটি মত প্রকাশ করেছেন উম্মুল মু’মিনীন আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা। হানাফীগণ মাযহাবের কোনো আলেমদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রকার মতবিরোধের বর্ণনা করেননি...’’। (তদেব; পৃ. ১৯)।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন:‘‘মৃত ব্যক্তির শ্রবণ না করার ব্যাপারে হানাফী ও তাদের মতের সমর্থনকারীদের বক্তব্যকে এ বিষয়টিও সমর্থন করে যে, মৃত ব্যক্তি যদি সাধারণভাবেই শ্রবণ করে থাকবে, ‘তা হলে তাকে প্রশ্ন করার সময় তার নিকট রূহ ফিরে আসা, অতঃপর তা চলে যাওয়া’ এ মর্মে হাদীস বর্ণিত হতো না’’। (তদেব; ৩৫)।

অতঃপর মৃতদের শ্রবণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা সম্পর্কে তিনি বলেন:

‘‘ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মাযহাবের অনুসারী বলে দাবীদার কিছু অজ্ঞ লোকদের ব্যাপারে আশ্চর্য হতে হয় যে, তারা জনগণের মাঝে এ তথ্য প্রচার করে যে, মৃতদের শ্রবণের বিষয়টি নাকি বিজ্ঞজনদের ঐকমত্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং এটাই নাকি ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর অগ্র-পশ্চাতের অনুসারীগণের মাযহাব। অথচ তারা জানতেও পারেনি যে, হানাফীগণ এ বিষয়ে আয়েশা (রা.) ও অন্যান্যদের ন্যায় এ আয়াত দু’টি গ্রহণ করেছেন এবং মৃতদের শ্রবণ সম্পর্কিত হাদীস দু’টি অবগতির পর (যার একটি উপরে বর্ণিত হয়েছে এবং অপরটি নিম্নে বর্ণিত হবে) এ-দু’টির তা’বীল করেছেন’’। (তদেব)।

মৃতদের শ্রবণ সম্পর্কিত দ্বিতীয় হাদীস:

মৃতদের শ্রবণ সম্পর্কে সামান্য একটু সম্ভাবনা প্রমাণিত হয় নিম্নে বর্ণিত হাদীস থেকে। বদরের যুদ্ধের পরে মুশরিকদের লাশগুলো যখন নিকটস্থ একটি কূপে নিক্ষেপ করা হয়, তখন সেখান থেকে প্রস্থানের পূর্ব মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-সে কূপের নিকটে যেয়ে মুশরিকদের লাশগুলোকে সম্বোধন করে কিছু কথা বলেন। তা দেখে ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

‘‘হে আল্লাহর রাসূল! রূহ বিহীন লাশের সাথে আপনি কথা বলছেন ? রাসুলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেন: যাঁর হাতের মধ্যে মুহাম্মদের আত্মা তাঁর শপথ করে বলছি: আমি তাদের লক্ষ্য করে যা বলেছি তা তাদের চেয়ে তোমরা বেশী শ্রবণ করোনি’’। (বুখারী, প্রগুক্ত; (কিতাবুল মাগাযী, বাব নং ৩, হাদীস নং ৩৭৫৬), ৩/৩/১৮৫-১৮৬)।

এ হাদীস দ্বারা কোনো কোন মনীষী মৃতদের শ্রবণের কথা প্রমাণ করতে চান। তবে অধিকাংশ বিদ্বানদের মতে এ হাদীস দ্বারা তা আদৌ প্রমাণ করা যায়না। পাঠকদের সুবিধার্থে এ হাদীস সম্পর্কে প্রখ্যাত মনীষীগণ কী বলেছেন, তা নিম্নে বর্ণনা করা হল:

এ হাদীস সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীদের মতামত:

মৃতদের শ্রবণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লামা নু‘মান ইবনে মাহমূদ আল-আলূসী বলেন: ‘‘আমি এ বিষয়ে কোনো আলেমকে এ-কথা সুস্পষ্টভাবে বলতে দেখিনি যে, মৃত মানুষেরা দুনিয়ায় জীবিত থাকার ন্যায় মৃত্যুর পরেও সাধারণভাবে শ্রবণ করতে পারেন। কোনো জ্ঞানী এ ধরনের কথা বলতে পারেন বলেও আমি মনে করি না। আমি তাদের কাউকে কোনো কোন দলীল দ্বারা মৃতদের মোটের উপর কিছু শ্রবণের কথা প্রমাণ করতে দেখেছি’’। (আল-আলূসী, নু‘মান ইবন মাহমুদ, আল-আ-য়াত আল-বায়্যিনাত ফী আদামি সেমাইল আমওয়াত আলা মাজহাবিল হানাফিয়্যাতিত সা-দাত; সম্পাদনা: আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী, (হালব: মাত্ববা‘আতু অফিসত, ২য় সংস্করণ, ১৩৯৯হি:), পৃ.৫১)।

উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এ হাদীসটি কুরআনুল কারীমে বর্ণিত ‘‘কবরবাসীদেরকে তুমি শুনাতে পারবে না’’ (আল-কুরআন, সূরা ফাত্বির: ২২)।

এ আয়াতের মর্মের বিপরীত হওয়ায় তিনি এ হাদীসটি অগ্রাহ্য করেছেন। (আল-আলূসী, নু‘মান ইবন মাহমূদ, প্রাগুক্ত; পৃ.৫১)।

এ হাদীসকে কুরআনের উক্ত আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক মনে না করলেও এ হাদীস দ্বারা তা প্রমাণ করা যায়না। কেননা, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ উক্তিটি আসলে কাফেরদেরকে উপদেশ প্রদানের জন্য বলেছিলেন, তাদের বুঝাবার জন্য বলেন নি। (তদেব; প্র. ৯)।

আল্লামা ইবনে নুজাইম আল-মিশরী উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন:এটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি মু‘জিযা বিশেষ। (তদেব; পৃ. ৮)।

যা অন্য কোনো মৃতদের বেলায় প্রযোজ্য নয়।

বিশিষ্ট তাবেঈ ক্বাতাদাঃ (রহ.) উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,

 ‘‘আল্লাহ তা‘আলা কাফেরদেরকে ধমকি প্রদান ও হেয় প্রতিপন্ন করা এবং বদলা গ্রহণ ও হতাশাগ্রস্ত করানোর জন্যে জীবিত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা শ্রবণ করিয়েছিলেন।’’ (তদেব; পৃ. ৬; আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/২৯)।

ইমাম কুরত্ববী উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: ‘‘কাফেরদের শ্রবণ করানোর ব্যাপারটি সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। আল্লাহ তা‘আলা তাদের অনুভূতি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যার কারণে তারা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা শ্রবণ করেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শ্রবণ করার কথা আমাদেরকে না বললে তাঁর এ-কথাগুলোকে আমরা অবশিষ্ট কাফেরদের জন্য ধমকি স্বরূপ এবং মু’মিনদের মনের প্রশান্তি স্বরূপ বলার অর্থে গ্রহণ করতাম’’। (আল-ক্বুরত্ববী, প্রাগুক্ত;১৩/৩৩২)।

আল্লামা ইবনে আবিদীন বলেন: ‘‘এ শ্রবণ করার বিষয়টি কাফেরদের আফসোসকে বৃদ্ধি করার জন্য তাদের সাথেই বিশেষভাবে সম্পর্কিত ছিল এবং এটি ছিল রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য একটি বিশেষ মু‘জিজা’’। (নু‘মান ইবন আলূসী, প্রাগুক্ত;পৃ. ১০)।

এ প্রসঙ্গে শায়খ আলবানী বলেন:‘‘এ ঘটনার বর্ণনায় ইবনে ‘উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদীস রয়েছে, তাতে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেন:

‘‘তোমাদের রব যে ওয়াদা করেছিলেন তোমরা কি তা সঠিকভাবে পেয়েছ? অতঃপর রাসূলুল্লাহr বলেন:নিশ্চয় (কাফেররা) এখন আমি যা বলছি তারা তা শ্রবণ করছে’’। (ইবনে হাজার, ফাতহুলবারী; ২/২৪২)।

অর্থাৎ তাদেরকে সম্বোধন করার সময় তারা তা শুনছিল। মৃতরা সব সময় শুনতে পায়, সে-জন্যই তারা তা শুনতে পেয়েছে, বিষয়টি এমনটি নয়।

মাহমূদ আলূসী বলেন: ‘‘এ হাদীসে এ-কথার শক্তিশালী ইঙ্গিত রয়েছে যে, মৃতরা শ্রবণ করেন না’’। (মাহমূদ আলূসী, প্রাগুক্ত; ৬/৪৫৫)।

ইমাম ইবনুত তীন বলেন: ‘‘ইবনে ‘উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস এবং এ আয়াতের মধ্যে আসলে কোনো বৈপরিত্ব নেই। কেননা, মৃতরা শ্রবণ করেন না, এ-কথায় কোনই সন্দেহ নেই, তবে যাদের শ্রবণ করার কথা নয়, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শ্রবণ করাতে পারেন’’। (ইবনে হাজার , ফাতহুলবারী; ৩/১৪২)।

কুরআন, হাদীস ও মনীষীদের মতামতের আলোকে এ-কথাই প্রমাণিত হয় যে, মৃত মানুষ সে যে-ই হোক কেন, জীবিতদের কথা ও কর্ম সম্পর্কে তাদের কিছু শুনা ও জানার নিজস্ব কোনো যোগ্যতা নেই। আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ ব্যবস্থায় তাদেরকে কিছু শুনাতে চাইলে তারা কেবল তা-ই শুনতে পারেন। সে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমেই তাদেরকে কেউ সালাম করলে বা তাদের মাগফেরাতের জন্য কেউ দো‘আ করলে তাদেরকে তা অবগত করানো হয়। কিন্তু তাদের কবরকে কেন্দ্র করে এর বাইরে শরী‘আত বিরোধী যে-সব শির্কী কাজকর্ম হয়, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জানানো বা শ্রবণ করানোর কোনো ব্যবস্থা করেননি, তারা নিজ থেকেও তা জানতে বা শ্রবণ করতে পারেন না।

তারা যদি তা জানতে পারতেন এবং জীবিতদেরকে কোনো উপদেশ দেবার মত কোনো মাধ্যম তাদের কাছে থাকতো, তা হলে অলিগণের কবরকে কেন্দ্র করে যে-সব শির্কী কর্ম করা হয়, তা পরিত্যাগ করার জন্য তারা সাধারণ জনগণকে উপদেশ দিতেন। কিন্তু এ-সবই তাদের নাগালের বাইরে থাকার কারণে যুগ যুগ ধরে অলিগণের কবর ও কবরকে কেন্দ্র করে অহরহ শির্কী কর্মকাণ্ড হয়েই চলেছে। যেহেতু এ-সব কর্ম শয়তানের প্ররোচনায়ই সেখানে হয়ে চলেছে, তাই মানুষেরা যাতে সর্বদা তা করে যায়, সে-জন্য শয়তান নিজেই অলিগণের কবরে নিরাপদ আস্তানা গেড়ে বসে রয়েছে। নানা উপায়ে সেখানে সে তার বিভিন্ন তেলেশমাতি প্রকাশ করে চলেছে। আর ধর্মীয় জ্ঞানে মিসকীন সাধারণ মানুষ তা দেখে ভাবছে-এ-সব কবরস্থ অলিরই কারামত ও ফয়েয। সাধারণ মানুষ এবং আল্লাহর মাঝে তাঁরা ওসীলা হওয়ার কারণেই কবরে থেকেও তাঁরা এভাবে সাধারণ মানুষের উপকার করে চলেছেন!

কিয়ামতের দিন কোনো নবী-ওলী অথবা কোন পীর-বুযুর্গ কাউকে আল্লাহ্ তা’আলার কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে এমন মনে করার শির্ক

কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলা যাকে চান শাস্তি দিবেন। কোন নবী বা ওলী তাকে আল্লাহ্ তা’আলার হাত থেকে কোনভাবেই রক্ষা করতে পারবে না।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা কাফিরদের জন্য নূহ্ (আ.) ও লূত্ (আ.) এর স্ত্রীদ্বয়ের দৃষ্টান্ত পেশ করেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: তারা ছিলো আমার বান্দাহদের দু’ নেককার বান্দাহ্’র অধীন। কিন্তু তারা তাদের স্বামীদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে নূহ্ (আ.) ও লূত্ (আ.) তাদেরকে আল্লাহ্’র শাস্তি থেকে কোনভাবেই রক্ষা করতে পারলোনা। বরং তাদেরকে বলা হলো: জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ করো’’। (সুরা আততাহরীম: ১০)।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল করলেন, ’’আপনি আপনার নিকটাত্মীদেরকে সতর্ক করে দিন’’ (শু’আরা ২১৪) তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়ালেন এবং বললেন, ’হে কুরায়শ সম্প্রদায়! কিংবা অনুরূপ শব্দ বললেন, তোমরা আত্মরক্ষা কর। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে বানূ আব্দ মানাফ! আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্তালিব! আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে সাফিয়্যাহ! আল্লাহর রাসূলের ফুফু, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে ফাতিমাহ বিন্তে মুহাম্মদ! আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না। আসবাগ (রহ.) ইবনু ওয়াহব (রহ.) .... আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় আবুল ইয়ামান (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ২৭৫৩, ৩৫২৭, ৪৭৭১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০৩, আহমাদ ১০৭৩০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৫৫১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৫৬৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এমনকি আল্লাহ্ তা’আলার রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ্ তা’আলার সর্বপ্রিয় বান্দাহ্ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে আল্লাহ্ তা’আলা পরকালে কি ব্যবহার করবেন তা নিয়ে তিনি সর্বদা শঙ্কিত ছিলেন।

আনসারী মহিলা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বাই‘আতকারী উম্মুল ‘আলা (রাঃ) হতে বর্ণিত, (মাদ্বীনায় হিজরতের পর) লটারীর মাধ্যমে মুহাজিরদের বণ্টন করা হচ্ছিল। তাতে ‘উসমান ইবনু মায‘ঊন (রাঃ) আমাদের অংশে পড়লেন, আমরা (সাদরে) তাঁকে আমাদের গৃহে স্থান দিলাম। এক সময় তিনি সেই রোগে আক্রান্ত হলেন, যাতে তাঁর মৃত্যু হল। যখন তাঁর মৃত্যু হল এবং তাঁকে গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরানো হল, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করলেন। তখন আমি বললাম, হে আবাস্-সায়িব! আপনার উপর আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হোক! আপনার ব্যাপারে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ্ আপনাকে সম্মানিত করেছেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি করে জানলে যে, আল্লাহ্ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আল্লাহ্ আর কাকে সম্মানিত করবেন? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার ব্যাপার তো এই যে, নিশ্চয় তাঁর মৃত্যু হচ্ছে এবং আল্লাহ্র কসম! আমি তার জন্য কল্যাণ কামনা করি। আল্লাহ্র কসম! আমি জানি না আমার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হবে, অথচ আমি আল্লাহ্র রাসূল। সেই আনসারী মহিলা বলেন, আল্লাহ্র কসম! অতঃপর এরপর হতে কোন দিন আমি কোন ব্যক্তিকে সম্বন্ধে পবিত্র বলে মন্তব্য করব না।  (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ১২৪৩, ২৬৮৭, ৭০০৩, ৭০১৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১১৬৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১১৭০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে মানত করা শির্ক

কোনো অলির মাযার অথবা যে সব স্থানে শির্কী কর্মকাণ্ড হয় অথবা যে মাযার বা কবরকে কেন্দ্র করে ইসালে সওয়াবের নামে বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা ওরস পালিত হয়, সে সব স্থানের উদ্দেশ্যে কোনো মানত করা বৈধ নয়। কেউ করে থাকলেও সেখানে তা পূর্ণ করা জায়েয নয়। যারা তা করবে তারা দ্বিতীয় হাদীসের মর্মানুযায়ী মুশরিকদের মধ্যেই গণ্য হবে। কোনো মাযারকে কেন্দ্র করে এর পার্শ্বে ইসালে সওয়াবের নামে কোনো অনুষ্ঠান হলে তাও জাহেলী যুগের মেলারই ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য হবে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কবরকে এ জাতীয় ইসালে সওয়াবের অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত রাখার জন্য তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর জীবনের অন্তিম সময়ে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,

‘‘তোমরা আমার কবরকে ঈদ তথা উৎসবের স্থানে পরিণত করো না।’’ (প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাসিক, বাব নং ৯৮ (যিয়ারাতুল কুবূর), হাদীস নং ২০৪২; ২/৫৩৪; ‘আযীমআবাদী, শামসুল হক, প্রাগুক্ত; ৬/২২; ইবনে কাছীর, তাফছীরুল ক্বুরআনিল ‘আযীম; ৩/৫১৬; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/৩৬৭; ইবনে আবী শায়বাঃ, প্রাগুক্ত; ২/১৫০)।

বিপদ দেখলে মানুষ মানত করে। ধারণা করে হয়তো বা এতে তার বিপদ কেটে যাবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানত মানুষের কর্মের কোনো পরিবর্তন এনে দিতে পারে না। সে জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানত করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘‘মানত বনী আদমের জন্য এমন কিছু বয়ে আনতে পারে না যা আামি তার তাকদীরে রাখি নি, বরং মানত তাকে তার জন্য তাকদীরে যা নির্ধারণ করা আছে সেটার উপর নিয়ে রাখে। ফলে এর দ্বারা আল্লাহ কেবল কৃপণের কিছু সম্পদ তার হাত ছাড়া করেন। তখন তার কাছে এমন কিছু আসে যা পূর্বে আসত না” (বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব : মানত পূর্ণ করা; ৪/৮/২৫৩; মুসলিম, প্রাগুক্ত; ভাগ্য অধ্যায়, পরিচ্ছেদ নং- (২), ৩/১২৬১)।

ইমাম তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে : ‘‘তোমরা মানত করো না কেননা; তা তাকদীরের কোনো পরিবর্তন করতে পারে না...।’’ (ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত; ৪/১১২; নাসাই, প্রাগুক্ত; শপথ ও মানত অধ্যায় পরিচ্ছেদ: মানতের দ্বারা কৃপনের সম্পদ বের করে নেওয়া হয়; ৪/৭/১৬)।

এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে মানত করার জন্য কোনো নির্দেশ ও উৎসাহ প্রদান করেননি। তবে যেহেতু মানতের মাধ্যমে সম্মানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তা এমন কারো নামে করতে হয় যিনি মানুষের বিপদাপদ দূরীকরণের মালিক। এ দু’টি বিষয় বিবেচনায় আনলে মানতকে আল্লাহর উপাসনায় পরিণত করার জন্য তাতে মোট দু’টি শর্ত পূর্ণ হতে হবেঃ

এক. তা কেবল আল্লাহ তা‘আলার সম্মানার্থে কেবল তাঁরই নামে এবং কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করতে হবে।

দুই. পূর্বে বর্ণিত যাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের মর্মানুযায়ী তা জাহেল লোকদের ওরস ও শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান মাযার ও মুকাম থেকে মুক্ত হতে হবে।

যারা মানত সঠিক হওয়ার জন্য এ দু’টি শর্তের কথা বিবেচনায় না এনে বিভিন্ন মাযার ও কবরে মানত করে, তারা মানতটি পূর্ণ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে থাকলেও মূলত তাদের মানতের দ্বারা মাযার ও কবরস্থ সে অলি ও দরবেশের সম্মানই প্রদর্শিত হয়ে থাকে এবং মাযার ও কবরস্থ অলির নিকটেই তারা বিপদ দূরীকরণের জন্য তাদের আবদার করে থাকে। তারা যদি প্রকৃতপক্ষে তাদের বিপদ দূরীকরণের কথা আল্লাহর নিকটেই চেয়ে থাকতো, তা হলে কোনো অবস্থাতেই তারা কোনো মাযার বা কবরে মানত করতো না।

মানত আল্লাহর পছন্দনীয় কোনো উপাসনার মাধ্যম না হয়ে থাকলেও যেহেতু এর দ্বারা আল্লাহর সম্মান প্রদর্শিত হয়, সে জন্য মানতের শর্তানুযায়ী কেউ তা করলে সে মানত পূর্ণ করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায় এবং এ জাতীয় মানত পূর্ণ করা আল্লাহ তা‘আলার দৃষ্টিতে মু’মিনদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত হয়ে থাকে। সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘‘তারা (মু‘মিনগণ) মানত পূর্ণ করে।’’ (আল-কুরআন, সূরা দহর : ৭)।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘‘তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূর প্রসারী’’। (সূরা দাহারঃ ৭)

ব্যাখ্যাঃ ইমাম ইবনে কাছীর (রঃ) বলেনঃ আল্লাহ তাআলা ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমে যেসব বিষয় তাদের উপর ওয়াজিব করেছেন, তারা ঐসব বিষয়ের মাধ্যমে আল্লাহর এবাদত করে এবং মানতের মাধ্যমে নিজেদের উপর যা আবশ্যক করে নিয়েছে, তা পূর্ণ করার মাধ্যমেও তারা আল্লাহর এবাদত করে।

আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেনঃ ‘‘তোমরা যা কিছু খরচ করেছ আর যে মানত মেনেছ, তা আল্লাহ জানেন’’। (সূরা বাকারাঃ ২৭০)।

ব্যাখ্যাঃ ইমাম ইবনে কাছীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, মানুষেরা যা কিছু খরচ করে এবং তারা যে মানত করে, আল্লাহ তাআলা সেগুলো সম্পর্কে পূর্ণ অবগত আছেন। আর আল্লাহ তাআলা যেহেতু তাদের আমল সম্পর্কে অবগত আছেন, তাই যারা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে আমল করবে তাদেরকে পূর্ণরূপে বদলা দিবেন।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) বলেনঃ মানত যেহেতু একটি এবাদত তাই মূর্তি, চন্দ্র, সূর্য, কবর-মাজার এবং অনুরূপ অন্যান্য বস্ত্তর জন্য উহা করা শির্ক। তিনি আরো বলেনঃ যে ব্যক্তি কবর বা মাজারকে আলোকিত করার জন্য বাতি মানত করল এবং মুশরিকদের ন্যায় বলল যে অমুক কবর বা মাজার মানত কবুল করে, সকল উম্মতের ঐক্যমতে এই মানত পাপ কাজের মানতের অন্তর্ভূক্ত। এ মানত পূর্ণ করা জায়েয নয়। এমনি যে ব্যক্তি কবর ও মাজারের খাদেমদের জন্য কিংবা তাতে অবস্থানকারীদের জন্য টাকা-পয়সা মানত করল, সেও পাপের কাজ করল। কেননা কবর ও মাজারের খাদেমদের মধ্যে এবং লাত, মানাত ও উয্যার খাদেমদের মধ্যে এক বিরাট সাদৃশ্য রয়েছে। পূর্বযুগে লাত, মানাত ও উয্যার খাদেমরা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করতো এবং লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে বিরত রাখতো। এমনি বর্তমান কালের মাজারের খাদেমদের মধ্যে ঐ সমস্ত লোকদের সাদৃশ্য রয়েছে, যাদের ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন,

‘‘এই মূর্তিগুলো কী, যাদের তোমরা এবাদত করছো? তারা বললঃ আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এদের এবাদত করতে দেখেছি’’। (সূরা আম্বীয়াঃ ৫২-৫৩)।

সুতরাং কবর ও মাজারের খাদেম এবং তাতে অবস্থানকারীদের জন্য মানত করা গুনাহ্র কাজ। এমনি কবর ও মাজারের খাদেমদের জন্য মানত করা খৃষ্টানদের গীর্জার পরিচর্যাকারীদের এবং তথায় অবস্থানকারীদের জন্য মানত করার মতই।

যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্য মানত করে, সে কেবল আল্লাহর কাছেই আশা-ভরসা করে। কেননা সে জানে যে, আল্লাহ তাআলা যা চান, তাই হয়। তিনি যা চান না, তা সংঘটিত হয়না। তিনি যা প্রদান করেন, তা প্রতিহত করার কেউ নেই। আর তিনি যা প্রতিহত করেন, কেউ তা প্রদান করার ক্ষমতা রাখেনা। এটিই হচ্ছে توحيد القصد তাওহীদুল কাস্দ। বস্ত্ততঃ তাওহীদুল কাস্দ আর তাওহীদুল ইবাদাহ একই বিষয়। যেহেতু তাওহীদুল কাস্দ হচ্ছে অন্তর দিয়ে আল্লাহর জন্য ইখলাসের নিয়ত করা এবং আল্লাহর কাছেই বান্দার প্রয়োজন পূর্ণ করার প্রার্থনা করা, সে হিসাবে এটি তাওহীদুল উলুহীয়াতের অন্তর্ভূক্ত। এ জন্যই বান্দা আল্লাহর আনুগত্য ও এবাদতের নিয়তে মানত করলে তা পূর্ণ করা জরুরী।

আর যেসব কাজ এবাদতের অন্তর্ভূক্ত, সেগুলো আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য সম্পাদন করা হলে আল্লাহর সাথে শির্ক করা হবে। (মানত যেহেতু আল্লাহর এবাদতের অন্তর্ভূক্ত, তাই তা পূর্ণ করা জরুরী এবং তা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করা হয়, তা এবাদতের মধ্যে শির্কে পরিণত হবে)।

কেননা সে যা আশা করে অথবা যা থেকে ভয় করে, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যের দিকে মনোনিবেশ করেছে। যার দিকে সে মনোনিবেশ করেছে, তাকে সে এবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর শরীক বানিয়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়; বরং কালেমায়ে তায়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের এবাদতের যেই অস্বীকৃতি হয়েছিল, সে তা সাব্যস্ত করে দিল এবং এ কালেমার মাধ্যমে আল্লাহর জন্য যেই ইখলাস সাব্যস্ত হয়েছিল, সে তা সাব্যস্ত করেনি।

পূর্বে যেসব অধ্যায় অতিক্রম করেছে তার সবগুলোই প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি কাস্দ ও তলবের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ দ্বারা সাব্যস্ত বিষয়কে বাতিল করল এবং এই কালেমাটি যে বিষয়ের প্রমাণ করে, তার বিপরীত করল। সেই সঙ্গে কালেমাটি যা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছে, সে তা সাব্যস্ত করল। আর যে তাওহীদকে সাব্যস্ত করেছে, তা প্রত্যাখ্যান করলো। এটিই হচ্ছে শির্ক। শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রঃ) পূর্বের অধ্যায়ে ‘তাওহীদ ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর ব্যাখ্যা’ নামক শিরোনামে বলেছেন, সামনের অধ্যায়গুলোতে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা আসবে। সে অধ্যায়গুলোতে তিনি তাওহীদের ব্যাখ্যা করেছেন। তার উক্ত কথার তাৎপর্য এটিই।

যে শির্ক পূর্বে সংঘটিত হয়েছে অথবা আগামীতে যে শির্ক সংঘটিত হবে, তা কালেমায়ে ইখলাস এবং তাওহীদের পরিপন্থী।

শরহুল মিনহাজে ইমাম আয্রায়ী (রঃ) বলেনঃ অলী-আওলীয়া বা পীরদের কবরের উপর যে সমস্ত সমাধি বানানো হয়েছে অথবা যেখানে কোনো অলী বা সৎ লোক বসবাস অথবা আসা-যাওয়া করেছিল- এ ধারণায় সেই অলীর নামে সেখানে যে মাজার বানানো হয়েছে, তার উদ্দেশ্যে মানত করা হলে অথবা মানতকারী যদি সে স্থান বা মাজার বা মাজারের কোনো এক পার্শ্বকে সম্মান করার নিয়ত করে, তাহলে সেই মানত বাতিল। এমনি মানতকারী যদি এমন যমীনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিয়তে মানত করে, যেখানে কোনো অলীকে দাফন করা হয়েছে অথবা ঐ যমীনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিয়তে মানত করে, যেখানে কোন অলীর দিকে নিসবত করা হয়েছে অথবা যে অলীর নামে কোনো শহর নির্মাণ করা হয়েছে, তার জন্য যদি মানত করে, তাহলে সেই মানত বাতিল বলে গণ্য হবে। কেননা যারা এ সমস্ত স্থানে মানত করে, তারা বিশ্বাস করে যে, এ স্থানগুলোর বিশেষ ফযীলত রয়েছে। তারা আরো মনে করে, এসব স্থানে মানত করার মাধ্যমে বালা-মসীবত দূর হয়, এর মাধ্যমে নেয়ামত ও বরকত হাসিল হয় এবং রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এরূপ মন্দ আকীদাহ পোষণকারী লোকেরা পাথরের জন্যও মানত পেশ করে থাকে। এ ব্যাপারে যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তারা বলেঃ এ পাথরের উপর আল্লাহর এক সৎ বান্দা বসেছিল অথবা এতে হেলান দিয়েছিল। এরা কোন কোন কবরের উপর চেরাগ, মোমবাতি এবং তেল মানত করে। তারা বলে উমুক কবর এবং উমুক স্থান মানত কবুল করে এবং তাতে মানত করলে কবুল হয়। তাদের কথার ব্যাখ্যা এভাবে করে থাকে যে, এখানে মানত করলে উদ্দেশ্য হাসিল হয় এবং মনের আশা পূর্ণ হয়। এসব স্থানে রোগী ভাল হওয়ার মানত, হারানো লোক ফেরত পাওয়ার মানত, ধন-সম্পদ নিরাপদ থাকার মানত এবং আরও অনেক প্রকার মানত করা হয়। নিজ নিজ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ সমস্ত স্থানে লোকেরা মানত করে। এ প্রকারের সকল মানতই নিঃসন্দেহে বাতিল। কবর ও মাজারের জন্য মোমবাতি, তেল এবং অনুরূপ অন্যান্য বস্ত্ত মানত করা সম্পূর্ণ বাতিল।

ইবরাহীম খলীল (আঃ) এবং অন্যান্য নবী-অলীদের কবরের জন্য বড় বড় মোমবাতি মানত করাও বাতিল। কেননা এগুলোতে মানতকারী স্বীয় মানতের দ্বারা কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তা থেকে বরকত লাভের নিয়ত ব্যতীত অন্য কোন নিয়ত করেনা। সে এটিকে এবাদত ও নৈকট্যের কাজ মনে করে। তার এ কাজ বাতিল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এভাবে কবরে বাতি জ্বালানো হারাম। এ বাতির আলো থেকে কেউ উপকৃত হোক বা না হোক- তাতে কিছুই আসে যায়না।

শাইখ কাসেম আল-হানাফী শারহু দুরারিল বিহার নামক গ্রন্থে বলেনঃ অধিকাংশ মূর্খ লোক যে সমস্ত মানত করে থাকে, তার ধরণ হচ্ছে, যেমন কারো কোন আত্মীয় হারিয়ে গেল কিংবা অসুস্থ হয়ে গেল অথবা অন্য কোন প্রয়োজন দেখা দিল, তখন সে কোন সৎ লোকের কবরের কাছে যায় এবং বলেঃ ইয়া সায়্যেদী! আল্লাহ তাআলা যদি আমার হারানো ব্যক্তিকে ফেরত দেন বা আমার রোগী যদি ভাল হয় অথবা আমার প্রয়োজন যদি পূর্ণ হয়, তাহলে তোমার জন্য এই পরিমাণ র্স্বণ অথবা রূপা অথবা এই পরিমাণ খাদ্য, পানীয়, মোমবাতি, তেল ইত্যাদি দান করবো। এ ধরণের মানত উম্মতে মুহাম্মাদীর সকল আলেমের ঐক্যমতে নিম্ন বর্ণিত কারণে বাতিলঃ

(১) এ মানত হচ্ছে সৃষ্টির জন্য। সৃষ্টির জন্য মানত করা জায়েয নেই। কেননা মানত হচ্ছে এক প্রকার এবাদত। আর এবাদত কোন সৃষ্টির জন্য হতে পারেনা।

(২) যার জন্য মানত করা হচ্ছে, সে যদি মৃত ব্যক্তি হয়ে থাকে তাহলে সে কারো উপকার করার ক্ষমতা রাখেনা।

(৩) মানতকারী ধারণা করে, যার সন্তুষ্টির জন্য মানত করা হচ্ছে, সে আল্লাহ ব্যতীতই অনেক কর্ম সম্পাদন করতে পারে। এ রকম বিশ্বাস করা কুফরী। শাইখ কাসেম আল-হানাফী আরো বলেনঃ তুমি যখন এটি বুঝতে সক্ষম হবে, তখন জানতে পারবে যে, কবর ও মাজারে দাফনকৃত অলীদের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেসব টাকা-পয়সা, মোমবাতি, তেল এবং অন্যান্য বস্ত্ত প্রেরণ করা হয়, তা মুসলিমদের ঐক্যমতে সম্পূর্ণ হারাম।

ইবনু নুজাইম ‘আল-বাহরুর রায়িক’ গ্রন্থে এবং শাইখ মুরশিদী তার ‘তাযকিরাহ’ নামক গ্রন্থে এবং অন্যান্য আলেমগণ তাদের কিতাবসমূহে শাইখ কাসেম আল-হানাফীর উপরোক্ত কথা নকল করেছেন।

যারা অলীদের জন্য যবেহ ও মানত করাকে জায়েয মনে করে, তাদের জবাবে শাইখ সুনউল্লাহ আল-হালাবী আলহানাফী (রঃ) বলেনঃ যবেহ ও মানত যে কারো নামেই হোক, তা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যের জন্যে হওয়ার কারণে বাতিল। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

‘‘যেসব জন্তুর উপর আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারিত হয় না, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করোনা; এ ভক্ষণ করা গুনাহ্’’। (সূরা আনআমঃ ১২১)।

আল্লাহ তাআলা সূরা আনআমের ১৬২ ও ১৬৩ নং আয়াতে আরও বলেনঃ

‘‘তুমি বলোঃ আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহ্‌রই জন্য। তার কোনো শরীক নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য মানত করা তিনি ছাড়া অন্যের জন্য যবেহ করার মতই শির্ক।

সহীহ বুখারীতে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে মানত করে, সে যেন তা পূরা করার মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত করে সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে’’। অর্থাৎ মানত যেন পূরণ না করে। (নামায, রোযা, সাদকাহ্ ইত্যাদি সৎ আমল করার মানত করলে তা পূর্ণ করা জরুরী। আর পাপ কাজের মানত যেমন কবরে বাতি জ্বালানো বা কোন মাজারে পশু যবাই করার মানত করলে তা থেকে বিরত থাকা জরুরী)।

ব্যাখ্যাঃ আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হলেন উম্মুল মুমিনীন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রী। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলীফা আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ ও সুন্নাত সম্পর্কে তিনি মহিলাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন। সাত বছর মতান্তরে ছয় বছর বয়সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। নয় বছর বয়সে তিনি তাঁর সাথে বাসর করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্যে খাদীজার পরে তিনি ছিলেন সর্বাধিক উত্তম। খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উত্তম কথা হচ্ছে, না খাদীজাকে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার চেয়ে উত্তম বলা হবে এবং না আয়েশাকে খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার চেয়ে উত্তম বলা হবে।

সঠিক কথা হচ্ছে, অহী নাযিল হওয়ার প্রথম পর্যায়ে খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার এমন অনেক ফযীলত ছিল, যা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার ছিলনা। খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা সর্বপ্রথম ঈমান আনয়ন করেছেন এবং ইসলামের প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। সহীহ বুখারী এবং অন্যান্য কিতাবে এ বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ঈমান, আমল ও ইসলামের সহযোগিতার উপর বহাল ছিলেন। তিনি হিজরতের পূর্বে ইন্তেকাল করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীছ এবং শরীয়তের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার এমন জ্ঞান ছিল, যা খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ছিলনা। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সমস্ত অবস্থা, আহকামের আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং হালাল ও হারামের বিবরণ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর মৃত্যুর পর সাহাবীগণ যখন কোনো হাদীছ বা মাস্আলা সম্পর্কে সমস্যায় পড়তেন, তখন তারা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার নিকট গমণ করতেন। তিনি ৫৭ হিজরী সালে ইন্তেকাল করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর বাণীঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করবে, সে যেন তার মানত পূর্ণ করে। কেননা সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মানত করেছে। সুতরাং তা পূর্ণ করা ওয়াজিব। কেননা এটি এবাদতে পরিণত হয়েছে।

আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি বিশেষ কোন উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়ার শর্তে এবাদত ও আনুগত্যের মানত করে, যেমন বললঃ আমার রোগী ভাল হলে আমি এত টাকা দান করবো কিংবা অনুরূপ কথা বলল, তখন যে উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার শর্তে মানত করেছিল তা হাসিল হওয়ার পর মানত পূরণ করা জরুরী। তবে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এই মাসআলায় দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেনঃ কেবল সেসব এবাদতের মানত করলেই পূরণ করা জরুরী হবে, যা মূলত ইসলামী শরীয়তে ওয়াজিব। যেমন রোযা এবং অন্যান্য এবাদত। যেসব কাজ ইসলামী শরীয়তে ওয়াজিব নয়, তা করার মানত করলে তা পূরণ করা জরুরী নয়।

যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার মানত করল, সে যেন তার মানত পূর্ণ না করে। ইমাম তাহাবী (রঃ) আরও বাড়িয়ে বলেনঃ সে যেন তার শপথের (মানতের) কাফফারা প্রদান করে।

আলেমগণ একমত যে, পাপকাজের মানত পূর্ণ করা জায়েয নয়। তাতে কাফফারা ওয়াজিব হবে কি হবেনা, তাতে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ) থেকে দু’ধরণের মত পাওয়া যায়। তাঁর একমতে পাপকাজের মানত করলেও তাতে কাফফারা ওয়াজিব। এটিই তার মাজহাব। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে এটিই বর্ণিত হয়েছে। আর এটিই হচ্ছে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর শিষ্যদের মত। এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১) নেক কাজের মানত পূরণ করা ওয়াজিব।

২) মানত যেহেতু আল্লাহর এবাদত হিসেবে প্রমাণিত, তাই আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্য মানত করা শির্ক।

৩) আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মানত পূরণ করা জায়েয নয়।

মানতের শির্ক:

মানতের শির্ক বলতে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য কোন কিছু মানত করাকে বুঝানো হয়।

যে কোন উদ্দেশ্য সফলের জন্য কোন কিছু মানত করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। যা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক।

আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নেক বান্দাহদের গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:

 ‘‘তাদের বৈশিষ্ট্য হলো: তারা তাদের মানত পূরা করে’’। (সুরা ইন্সান/দাহর: ৭)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘তারা যেন তাদের মানত পুরা করে নেয়’’। (সুরা হাজ্জ : ২৯)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘তোমরা যা ব্যয় করো বা মানত করো তা অবশ্যই আল্লাহ্ তা’আলা জানেন’’। (সুরা বাক্বারাহ্ : ২৭০)।

উক্ত আয়াতসমূহের প্রথম আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মানত পুরা করার কারণে তাঁর নেক বান্দাহ্দের প্রশংসা করেছেন। আর কারোর প্রশংসা শুধুমাত্র আবশ্যকীয় বা পছন্দনীয় কাজ সম্পাদন অথবা নিষিদ্ধ কাজ বর্জনের কারণেই হয়ে থাকে। দ্বিতীয় আয়াতে মানত পুরা করার আদেশ দেয়া হয়েছে। আর আল্লাহ্ তা’আলা বা তদীয় রাসূল (সা.) এর আদেশ মান্য করার নামই তো হচ্ছে ইবাদাত। তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মানত সম্পর্কে অবগত আছেন এবং উহার প্রতিদান দিবেন বলে ওয়াদা করেছেন। ইহা যে কোন মানত ইবাদাত হওয়াই প্রমাণ করে। আর এ কথা সবারই জানা যে, ইবাদাত বলতেই তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্যই হতে হবে। অন্য কারোর জন্য নয়। অন্য কারোর জন্য সামান্যটুকু ইবাদাত ব্যয় করার নামই তো শির্ক। অতএব কারোর জন্য কোন কিছু মানত করা সত্যিই শির্ক। এ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

বর্তমান যুগে যারা ওলী-বুযুর্গদের কবরের জন্য নিয়ত বা মানত করে যাচ্ছে তাদের ও মক্কার মুশ্রিকদের মধ্যে সামান্যটুকুও ব্যবধান নেই।

আল্লাহ্ তা’আলা মক্কার মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন:

‘‘মুশ্রিকরা আল্লাহ্ তা’আলার দেয়া শস্য ও পশু সম্পদের একাংশ তাঁর জন্যই নির্ধারিত করছে এবং তাদের ধারণানুযায়ী বলছে: এ অংশ আল্লাহ্ তা’আলার জন্য আর এ অংশ আমাদের শরীকদের। তবে তাদের শরীকদের অংশ কখনো আল্লাহ্ তা’আলার নিকট পৌঁছেনা। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ তা’আলার অংশ তাদের শরীকদের নিকট পৌঁছে যায়। এদের ফায়সালা কতোই না নিকৃষ্ট’’। (সুরা আন্’আম : ১৩৬)।

মূলতঃ মানত দু’ প্রকার: কোন উদ্দেশ্য হাসিলের শর্ত ছাড়াই এমনিতেই আল্লাহ্ তা’আলার জন্য কোন ইবাদাত মানত করা। আর অন্যটি হচ্ছে কোন উদ্দেশ্য হাসিলের শর্তে আল্লাহ্ তা’আলার জন্য কোন কিছু মানত করা। এ দু’য়ের মধ্যে প্রথমটিই প্রশংসনীয়। আর এ ধরনের মানত পুরা করাই নেককারদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়টি নয়। বরং তা খুবই নিন্দনীয়। তাই তো রাসূল (সা.) এ জাতীয় মানত করতে নিষেধ করেছেন। তবে এরপরও কেউ এ ধরনের মানত করে ফেললে সে তা পুরা করতে অবশ্যই বাধ্য।

কুতাইবাহ্ ইবনু সাঈদ (রহঃ)...আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মানৎ করো না। কারণ, মানৎ তাকদীর থেকে কোন উপকার করে না। তার মাধ্যমে কেবল কৃপণের সম্পদই বের করা হয়। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪১৩৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৪০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪০৯৫ ইসলামিক সেন্টার ৪০৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: মানতের মাধ্যমে আদম সন্তান এমন কিছু অর্জন করতে পারে না যা আমি তার জন্য ইতিপূর্বে বরাদ্দ করিনি। তবে মানতের মাধ্যমে কৃপণের পকেট থেকে কিছু বের করে আনা হয়। কারণ, সে মানতের মাধ্যমেই আমাকে এমন কিছু দেয় যা সে কার্পণ্যের কারণে ইতিপূর্বে আমাকে দেয়নি’’। (আহমাদ্ ২/২৪২)।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘মানত দু’ প্রকার। তার মধ্যে যা হবে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই জন্য তার কাফ্ফারা হবে শুধু তা পুরা করা। আর যা হবে শয়তানের জন্য তথা শরীয়ত বিরোধী তা কখনোই পুরা করতে হবে না। তবে সে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কসমের কাফফারা দিতে হবে’’। (ইবনুল জারূদ্/মুন্তাক্বা, হাদীস ৯৩৫ বায়হাক্বী ১০/৭২)।

‘‘ওয়াহ্দাতুল্ উজূদ্’’, ‘‘ওয়াহ্দাতুশ্ শুহূদ্’’ ও ‘‘’হুলূল’’ এর দর্শনঃ

অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করেন যে, মানুষ ইবাদাত করতে করতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সে তখন দুনিয়ার প্রতিটি বস্ত্তর মধ্যে আল্লাহ্ তা’আলাকে স্বয়ং দেখতে পায় অথবা দুনিয়ার প্রতিটি বস্ত্তকে আল্লাহ্ তা’আলার অস্তিত্বের বিশেষ অংশ হিসেবে মনে করে। এ পর্যায়কে সূফীদের পরিভাষায় ‘‘ওয়াহদাতুল্ উজূদ্’’ বলা হয়।

এভাবে মানুষ আরো বেশি বেশি আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত করতে থাকলে সে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তখন তার অস্তিতব আল্লাহ্ তা’আলার অস্তিত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তখন আল্লাহ্ তা’আলা ও তাঁর বান্দাহ্’র মাঝে আর কোন ব্যবধানই থাকে না। এ পর্যায়কে সূফীদের পরিভাষায় ‘‘ওয়াহদাতুশ্ শুহূদ্’’ বা ‘‘ফানা ফিল্লাহ্’’ বলা হয়।

এভাবে মানুষ আরো বেশি বেশি আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত করতে থাকলে সে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তখন আল্লাহ্ তা’আলার অস্তিত্ব তার অস্তিত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। এ পর্যায়কে সূফীদের পরিভাষায় ‘‘হুলূল্’’ বলা হয়।

মূল কথা বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, এ পরিভাষাগুলোর মাঝে কোন ফারাকই নেই। কারণ, সবগুলোর মূল কথা হচ্ছে, মানুষ তথা আল্লাহ্ তা’আলার সকল সৃষ্টি তাঁরই অংশ বিশেষ মাত্র। হিন্দুদের পরিভাষায় এ বিশ্বাসকে অবতার বলা হয়।

উক্ত বিশ্বাসের কারণেই ইহুদীরা উযাইর (আ.) কে এবং খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.) কে আল্লাহ্ তা’আলার ছেলে বলে আখ্যায়িত করেছে। শিয়াদের মধ্যেও এ বিশ্বাস চালু রয়েছে এবং উক্ত কারণেই সূফী সম্রাট মনসূর হাল্লাজ নিজকে আল্লাহ্ তা’আলা তথা ‘‘আনাল্ হক্ব’’ বলে দাবি করেছিলেন। হযরত বায়যীদ বোস্তামীও বলেছিলেন: ‘‘সুব্হানী মা আ’যামা শা’নী’’ (আমি পবিত্র এবং আমি কতই না সুমহান!)। একদা জনৈক ব্যক্তি তাঁর ঘরের দরোজায় গিয়ে তাঁকে ডাক দিলে তিনি বলেন: কাকে চাও। সে বললো: আমি বায়যীদ বোস্তামীকে চাই। তখন তিনি লোকটিকে বললেন: ঘরে আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া আর কেউ নেই। পরবর্তীতে এ দাবির সমর্থন জানিয়েছেন সর্বজনাব ’আলী হাজুইরী, শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী, খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া, মাওলানা আশ্রাফ আলী থানুভী ও রশীদ আহমাদ গঙ্গূহী সাহেবগণ।

এ দিকে অনেক নতুন ও পুরাতন সূফী সাহেবগণ উক্ত বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে বড় বড় অনেক কিতাব ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন হলো এই যে, আল্লাহ্ তা’আলা এবং তাঁর বান্দাহ্ যদি একই হয়ে যায় তা হলে ইবাদাতই বা করবে কে এবং কার ইবাদাত করা হবে? সিজ্দাহ্ই বা করবে কে এবং কাকে সিজ্দাহ্ করা হবে? স্রষ্টাই বা কে এবং সৃষ্টি বলতে কোন বস্ত্তটিকে বুঝানো হবে? মুখাপেক্ষীই বা কে এবং সমস্যা দূর করবেন কে? মরবেই বা কে এবং মৃত্যু দিবেন কে? জীবিতই বা কে এবং জীবন দিচ্ছেন কে? গুনাহ্গারই বা কে এবং ক্ষমা করবেন কে? কিয়ামতের দিন হিসেব দিবেই বা কে এবং হিসেব নিবেন কে? জান্নাত ও জাহান্নামে যাবেই বা কে এবং পাঠাবেন কে?

উক্ত দর্শন মেনে নিলে মানুষ ও মানুষের সৃষ্টি এবং আখিরাত সবই অর্থহীন হতে বাধ্য। উক্ত দর্শন ঠিক হলে খ্রিস্টানদের দর্শনও ঠিক হতে বাধ্য। তারা তো শুধু এতটুকুই বলে যে, ঈসা (আ.) আল্লাহ্ তা’আলার সন্তান বা সরাসরি আল্লাহ্ তা’আলা। তাদের দর্শন ও উক্ত দর্শনের মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই; অথচ আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে তাদেরকে কাফির বলেছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তারা অবশ্যই কাফির যারা বলে: নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা হচ্ছেন স্বয়ং মার্ইয়াম এর ছেলে মাসীহ্ বা ঈসা (আ.)। হে নবী! আপনি তাদেরকে বলে দিন: আল্লাহ্ তা’আলা যদি মার্ইয়াম এর ছেলে মাসীহ্ বা ঈসা (আ.) কে এবং তাঁর মাকে ও দুনিয়ার সবাইকে ধ্বংস করে দিতে চান তখন তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার হাত থেকে রক্ষা করবেন কে? ভূমন্ডল-নভোমন্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবগুলোর কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই হাতে। তিনি যা চান তাই সৃষ্টি করেন। আর আল্লাহ্ তা’আলা সকল বস্ত্তর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান’’। (সুরা মা’য়িদাহ্ : ১৭)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘তারা বলে: দয়াময় আল্লাহ্ তা’আলা সন্তান গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: মূলতঃ তোমরা এক মারাত্মক কথার অবতারণা করলে। যে কথার ভয়ঙ্করতায় আকাশ ফেটে যাবে। পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হয়ে যাবে। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পাহাড়ও ভেঙ্গে পড়বে। যেহেতু তারা দয়াময় আল্লাহ্ তা’আলার সন্তান আছে বলে দাবি করেছে’’। (সুরা মার্ইয়াম : ৮৮-৯১)।

উক্ত ব্যাপারটি এতো মারাত্মক হওয়ার একমাত্র কারণ এই যে, যখন কেউ আল্লাহ্ তা’আলার সন্তান অথবা কারোর অস্তিত্বের মধ্যে আল্লাহ্ তা’আলার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে বলে মনে করা হবে তখন এটাও মনে করতে হবে যে, তার মধ্যে আল্লাহ্ তা’আলার সকল বৈশিষ্ট্য এসে গিয়েছে। আর যখন তার মধ্যে আল্লাহ্ তা’আলার সকল বৈশিষ্ট্য আছে বলে মনে করা হবে তখন স্বাভাবিকভাবেই তার সন্তুষ্টির জন্য সকল ধরনের ইবাদাত ব্যয় করা হবে। তা হলে বুঝা গেলো, আল্লাহ্ তা’আলার অস্তিত্বে শির্ক করা এবং তাঁর গুণাবলী ও ইবাদাতে শির্ক করার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত আয়াতে তাঁর অস্তিত্বের মধ্যে শির্ক করার ব্যাপারে এতো কঠিন মন্তব্য করেছেন।

উক্ত ঈমান বিধ্বংসী বিশ্বাসের কারণেই সূফীরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ব্যাপারে কঠিন কঠিন ঈমান বিধ্বংসী মন্তব্য করতে এতটুকুও লজ্জা পায়নি। বিষয়গুলো নিম্নরূপ:

(ক) রাসূল ও রিসালাত:

নবু’ওয়াত ও রিসালাত সম্পর্কে সূফীদের ঈমান বিধ্বংসী ধারণার কিয়দাংশ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

সূফীদের নিকট ‘‘বিলায়াত’’ তথা বুযুর্গী নবু’ওয়াত এবং রিসালাত চাইতেও উত্তম।

শাইখ মুহয়ুদ্দীন ইবনু ’আরাবী বলেন: ‘‘নবু’ওয়াতের অবস্থান মধ্যম পর্যায়ের। বিলায়াতের নীচে ও রিসালাতের উপরে’’। (শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১১৮)।

বায়েযীদ বুস্তামী বলেন: ‘‘আমি (মা’রিফাতের) সাগরে ডুব দিয়েছি; অথচ নবীরা আশ্চর্য হয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন’’। তিনি আরো বলেন:

‘‘আমার পতাকা কিয়ামতের দিন মুহাম্মাদ (সা.) এর পতাকা চাইতেও অনেক উঁচু হবে’’। আমার পতাকা হবে নূরের। যার নিচে থাকবেন সকল নবী ও রাসূলগণ। সুতরাং আমাকে একবার দেখা আল্লাহ্ তা’আলাকে এক হাজার বার দেখার চাইতেও উত্তম।

সূফীদের কেউ কেউ ধারণা করেন: রাসূল (সা.) হচ্ছেন বিশ্বের কেন্দ্র স্থল। তিনিই হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ্। যিনি আর্শের উপর রয়েছেন। আকাশ ও জমিন, আর্শ এবং কুর্সী এমনকি বিশ্বের তাঁর নূর থেকেই তৈরি করা হয়েছে। তাঁর অস্তিত্বই সর্ব প্রথম। আল্লাহ্’র আর্শের উপর তিনিই সমাসীন। (সূফিয়্যাত, শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১২০)।

নিযামুদ্দীন আউলিয়া বলেন: ‘‘পীরের কথা রাসূল (সা.) এর কথার সম পর্যায়ের’’। (সূফীবাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব, পৃষ্ঠা: ৬৯)।

’হাফিয শীরাযী বলেন: ‘‘যদি তোমাকে তোমার পীর সাহেব নিজ জায়নামায মদে ডুবিয়ে দিতে বলে তাহলে তুমি তাই করবে। কারণ, বুযুর্গীর রাস্তায় চলন্ত ব্যক্তি সে রাস্তার আদব-কায়দা সম্পর্কে ভালোই জানেন’’। (শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১৫২)।

(খ) কুর’আন ও হাদীস:

কুর’আন ও হাদীস সম্পর্কে সূফীদের ধারণা:

সূফী ’আফীফুদ্দীন তিলমাসানী বলেন:

‘‘কোর’আন মাজীদের মধ্যে তাওহীদ কোথায়? তা তো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শির্ক দিয়েই পরিপূর্ণ। যে ব্যক্তি সরাসরি কোর’আনকে অনুসরণ করবে সে কখনো তাওহীদের উচ্চ শিখরে পৌঁছুতে পারবে না’’। (শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১৫২)।

জনাব বায়েযীদ বোস্তামী বলেন: ‘‘তোমরা (শরীয়তপন্থীরা) নিজেদের জ্ঞান মৃত ব্যক্তিদের থেকে (মুহাদ্দিসীনদের থেকে) সংগ্রহ করে থাকো। আর আমরা নিজেদের জ্ঞান সরাসরি আল্লাহ্ তা’আলা থেকে সংগ্রহ করি যিনি চিরঞ্জীব। আমরা বলি: আমার অন্তর আমার প্রভু থেকে বর্ণনা করেছে। আর তোমরা বলো: অমুক বর্ণনাকারী আমার নিকট বর্ণনা করেছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, ওই বর্ণনাকারী কোথায়? উত্তর দেয়া হয়, সে মৃত্যু বরণ করেছে। যদি বলা হয়: সে বর্ণনাকারী কার থেকে বর্ণনা করেছে এবং সে কোথায়? বলা হবে: সেও মৃত্যু বরণ করেছে। (শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১৫২)।

(গ) ইবলিস ও ফির’আউন:

অভিশপ্ত ইবলিস সম্পর্কে সূফীদের ধারণা হচ্ছে এই যে, সে আল্লাহ্ তা’আলার কামিল বান্দাহ্। সর্ব শ্রেষ্ঠ আল্লাহ্’র সৃষ্টি। খাঁটি তাওহীদ পন্থী। কারণ, সে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া আর কাউকে সিজদাহ্ করেনি। আল্লাহ্ তা’আলা তার সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন।

ফির’আউন সম্পর্কে তাদের ধারণা হচ্ছে এই যে, সে একজন শ্রেষ্ঠ তাওহীদ পন্থী। কারণ, সে ঠিকই বলেছে: ‘‘আনা রাব্বুকুমুল-আ’লা’’ (আমিই তো তোমাদের সুমহান প্রভু)। মূলতঃ সেই তো হাক্বীক্বতে পৌঁছেছে। কারণ, সব কিছুই তো স্বয়ং আল্লাহ্। তাই সে খাঁটি ঈমানদার এবং জান্নাতী।

(ঘ) ইবাদাত ও মুজাহাদাহ্:

সূফীদের পরিভাষায় নামায বলতে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে আন্তরিক সাক্ষাতকেই বুঝানো হয়। আবার কারো কারোর নিকট পীরের প্রতিচ্ছবি কাল্পনিকভাবে নামাযীর চোখের সামনে উপস্থিত না হলে সে নামায পরিপূর্ণই হয় না। রোযা বলতে হৃদয়ে গায়রুল্লাহ্’র চিন্তা (একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া দুনিয়াতে অন্য কিছু আছে বলে মনে করা) না আসাকেই বুঝানো হয় এবং হজ্জ বলতে নিজ পীর সাহেবের সাথে বিশেষভাবে সাক্ষাৎ করাকেই বুঝানো হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা প্রচলিত নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতকে সাধারণ লোকের ইবাদাত বলে আখ্যায়িত করে। যা বিশেষ ও অতি বিশেষ লোকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ যিকির, নিতান্ত একা জীবন যাপন, নির্দিষ্ট খাবার, নির্দিষ্ট পোষাক ও নির্দিষ্ট বৈঠক।

ইসলামে ইবাদাতের উদ্দেশ্য ব্যক্তি বা সমাজ শুদ্ধি হয়ে থাকলেও সূফীদের ইবাদাতের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে অন্তরের বিশেষ বন্ধন সৃষ্টি যার দরুন তাঁর থেকেই সরাসরি কিছু শিখা যায় এবং তাঁর মধ্যে বিলীন হওয়া যায়। তাঁর রাসূল থেকে গায়েবের জ্ঞান সংগ্রহ করা যায়। এমনকি আল্লাহ্ তা’আলার একান্ত চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্য মন্ডিত হওয়া যায়। তা হলে সূফী সাহেবও কোন কিছুকে হতে বললে তা হয়ে যাবে। মানুসের গুপ্ত রহস্যও তিনি বলতে পারবেন। এমনকি আকাশ ও জমিনের সব কিছুই তিনি সচক্ষে দেখতে পাবেন।

এ ছাড়াও সূফীরা ইবাদাত ও মুজাহাদাহ্’র ক্ষেত্রে এমন কিছু পন্থা আবিষ্কার করেছে যা কুর’আন ও হাদীসের সম্পূর্ণ বিরোধী। নিম্নে উহার কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো:

(১) বলা হয়: আব্দুল কাদির জিলানী পনেরো বছর যাবৎ এক পায়ে দাঁড়িয়ে ’ইশা থেকে ফজর পর্যন্ত এক খতম কোর’আন মাজীদ তিলাওয়াত করেছেন। (শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪৯১)।

একদা তিনি নিজেই বলেন: আমি পঁচিশ বছর যাবৎ ইরাকের জঙ্গলে একা একা ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি আমি এক বছর পর্যন্ত তো শুধু ঘাস ও মানুষের পরিত্যক্ত বস্ত্ত খেয়েই জীবন যাপন করেছি। পুরো বছর একটুও পানি পান করিনি। তবে এর পরের বছর পানিও পান করতাম। তৃতীয় বছর তো শুধু পানি পান করেই জীবন যাপন করেছি। চতুর্থ বছর না কিছু খেয়েছি না কিছু পান করেছি না শুয়েছি। (গাউসুস্ সাক্বালাইন, পৃষ্ঠা: ৮৩ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪৩১)।

(২) বায়েযীদ বোস্তামী তিন বছর যাবৎ সিরিয়ার জঙ্গলে রিয়াযাত (সূফীবাদের প্রশিক্ষণ) ও মুজাহাদাহ্ করেছেন। একদা তিনি হজ্জে রওয়ানা করলেন। যাত্রাপথে তিনি প্রতি কদমে কদমে দু’ রাক্’আত দু’ রাক্’আত নামায আদায় করেছেন। এতে করে তিনি বারো বছরে মক্কা পৌঁছেন। (সূফিয়ায়ে নক্বশেবন্দী, পৃষ্ঠা: ৮৯ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪৩১)।

(৩) মু’ঈনুদ্দীন চিশতী আজমীরি বেশি বেশি মুজাহাদাহ্ করতেন। তিনি সত্তর বছর যাবৎ পুরো রাত এতটুকুও ঘুমাননি। (তারীখে মাশায়েখে চিশ্ত, পৃষ্ঠা: ১৫৫ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৫৯১)।

(৪) ফরীদুদ্দীন গাঞ্জে শুক্র চল্লিশ দিন যাবৎ কুয়ায় বসে চিল্লা পালন করেছেন। (তারীখে মাশায়েখে চিশ্ত, পৃষ্ঠা: ১৭৮ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৩৪০)।

(৫) জুনাইদ বাগ্দাদী ত্রিশ বছর যাবৎ ’ইশার নামায পড়ার পর এক পায়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেছেন। (সূফিয়ায়ে নক্বশেবন্দী, পৃষ্ঠা: ৮৯ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪৯১)।

(৬) খাজা মুহাম্মাদ্ চিশ্তী নিজ ঘরে এক গভীর কুয়া খনন করেছেন। তাতে তিনি উল্টোভাবে ঝুলে থেকে আল্লাহ্’র স্মরণে ব্যস্ত থাকতেন। (সিয়ারুল আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ৪৬ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪৩১)।

(৭) মোল্লা শাহ্ কাদেরী বলতেন: পুরো জীবনে আমার স্বপ্নদোষ বা সহবাসের গোসলের কোন প্রয়োজন দেখা দেয়নি। কারণ, এগুলোর সম্পর্ক বিবাহ্ ও ঘুমের সঙ্গে। আর আমি না বিবাহ্ করেছি না কখনো ঘুমিয়েছি। (হাদীক্বাতুল আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ৫৭ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ২৭১)।

রাসূল (সা.) এর আদর্শের সঙ্গে উক্ত আদর্শের কোন মিল নেই। বরং তা রাসূল (সা.) প্রদর্শিত আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) আমার নিকট এসে বললেন: আমাকে সংবাদ দেয়া হয়েছে তুমি পুরো রাত নামায পড়ো এবং প্রতিদিন রোযা রাখো। এ সংবাদ কি সঠিক নয়? আমি বললাম: অবশ্যই। তিনি বললেন: তাহলে তুমি আর এমন করোনা। তুমি রাত্রে নামাযও পড়বে এবং ঘুমুবে। রোযা রাখবে এবং কখনো কখনো আবার রাখবেনা। কারণ, তোমার উপর তোমার শরীরেরও অধিকার আছে। তেমনিভাবে চোখ, মেহমান এবং স্ত্রীরও। হয়তোবা তুমি বেশি দিন বেঁচে থাকবে। তাই তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তুমি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখবে। কারণ, তুমি একটি নেকি করলে দশটি নেকির সাওয়াব পাবে। এ হিসেবে প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখলে পুরো বছর রোযা রাখার সাওয়াব পাবে। আব্দুল্লাহ্ বলেন: আমি কঠোরতা দেখিয়েছি। তাই আমার উপর কঠিন করা হয়েছে। আমি বললাম: আমি এর চাইতেও বেশি পারি। তিনি বললেন: তাহলে প্রতি সপ্তাহে তিনটি রোযা রাখবে। আব্দুল্লাহ্ বলেন: আমি কঠোরতা দেখিয়েছি। তাই আমার উপর কঠিন করা হয়েছে। আমি বললাম: আমি এর চাইতেও বেশি পারি। তিনি বললেন: তাহলে আল্লাহ্’র নবী দাঊদ (আ.) এর ন্যায় রোযা রাখবে। আমি বললাম: দাঊদ (আ.) এর রোযা কেমন? তিনি বললেন: অর্ধ বছর। অর্থাৎ একদিন পর একদিন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আমি এর চাইতেও ভালো পারি। তিনি বললেন: এর চাইতে আর ভালো হয় না। শেষ জীবনে আব্দুল্লাহ্ বলেন: এখন তিন দিন মেনে নেয়াই আমার নিকট বেশি পছন্দনীয় যা রাসূল (সা.) বলেছিলেন আমার পরিবার, ধন-সম্পদ চাইতেও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৬১৩৪, ১১৩১, মুসলিম, হাদীস ১১৫৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬৯৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫৯১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন: রাসূল (সা.) আমাকে বলেছেন:

‘‘তুমি প্রতি মাসে কোর’আন মাজীদ এক খতম দিবে। আব্দুল্লাহ্ বলেন: আমি বললাম: হে আল্লাহ্’র নবী! আমি আরো ভালো পারি। তিনি বললেন: তাহলে প্রতি বিশ দিনে এক খতম দিবে। আমি বললাম: হে আল্লাহ্’র নবী! আমি আরো ভালো পারি। তিনি বললেন: তাহলে প্রতি দশ দিনে এক খতম দিবে। আমি বললাম: হে আল্লাহ্’র নবী! আমি আরো ভালো পারি। তিনি বললেন: তাহলে প্রতি সপ্তাহে এক খতম দিবে। কিন্তু এর চাইতে আর বেশি পড়বেনা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন: আমি এর চাইতেও বেশি পড়তে সক্ষম। তখন রাসূল (সা.) বললেন: তাহলে তুমি তিন দিনে এক খতম দিবে। ওব্যক্তি কোর’আন কিছুই বুঝেনি যে তিন দিনের কমে কোর’আন খতম করেছে’’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৬১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১৫৯, সুনান আবু দাউদ, হাদীস ১৩৯০, ১৩৯১, ১৩৯৪, সুনান আত তিরমিযী, হাদীস ২৯৪৯, সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ১৩৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৫৯৬, ইসলামীক সেন্টার ২৫৯৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

একদা সাল্মান (রা.) তাঁর আন্সারী ভাই আবুদ্দারদা’ (রা.) এর সাক্ষাতে তাঁর বাড়ি গেলেন। দেখলেন, উম্মুদ্দারদা’ (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) ময়লা কাপড় পরিহিতা। তখন তিনি তাঁকে বললেন: তুমি এমন কাপড়ে কেন? তোমার তো স্বামী আছে। তিনি বললেন: তোমার ভাই আবূদ্দারদা’র দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। ইতিমধ্যে আবূদ্দারদা’ ঘরে ফিরে সাল্মান (রা.) এর জন্য খানা প্রস্ত্তত করে বললেন: তুমি খাও। আমি এখন খাবোনা। কারণ, আমি রোযাদার। সাল্মান (রা.) বললেন: আমি খাবোনা যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি না খাবে। অতএব আবূদ্দারদা’ (রা.) খানা খেলেন। যখন রাত্র হয়ে গেল তখন আবূদ্দারদা’ (রা.) নফল নামায পড়তে গেলেন। এমন সময় সাল্মান (রা.) বললেন: ঘুমাও। তখন আবূদ্দারদা’ (রা.) ঘুমিয়ে গেলেন। অতঃপর আবারো আবূদ্দারদা’ (রা.) নফল নামায পড়তে গেলেন। এমন সময় সাল্মান (রা.) বললেন: ঘুমাও। তবে রাত্রের শেষ ভাগে সাল্মান (রা.) আবূদ্দারদা’ (রা.) কে বললেন: এখন উঠতে পারো। অতএব উভয়ে উঠে নামায পড়লেন। অতঃপর সাল্মান (রা.) আবূদ্দারদা’ (রা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন: নিশ্চয়ই তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার আছে। তেমনিভাবে তোমার এবং তোমার পরিবারেরও। অতএব প্রত্যেক অধিকার পাওনাদারকে তার অধিকার অবশ্যই দিতে হবে। ভোর বেলায় আবুদ্দারদা’ (রা.) নবী (সা.) কে উক্ত ঘটনা জানালে তিনি বলেন:

‘‘সালমান (রা.) সত্যই বলেছে’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৬১৩৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আনাস্ (রা.) বলেন: একদা তিন ব্যক্তি নবী (সা.) এর স্ত্রীদের নিকট এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তাদেরকে সে সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া হলো। তারা তা সামান্য মনে করলো এবং বললো: নবী (সা.) এর সাথে আমাদের কোন তুলনাই হয়না। তাঁর আগ-পর সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাদের এক জন বললো: আমি কিন্তু যত দিন বেঁচে থাকবো সর্বদা পুরো রাত নফল নামায আদায় করবো। দ্বিতীয় জন বললো: আমি কিন্তু পুরো জীবন রোযা রাখবো। কখনো রোযা ছাড়বোনা। তৃতীয় জন বললো: আমি আদৌ বিবাহ করবোনা এমনকি কখনো মহিলাদের সংস্পর্শেও যাবোনা। রাসূল (সা.) কে এ সম্পর্কে জানানো হলে তিনি বলেন:

‘‘তোমরাই কি এমন এমন বলেছো? জেনে রাখো, আল্লাহ্’র কসম! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের চাইতেও অনেক অনেক বেশি আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করি। তবুও আমি কখনো কখনো রোযা রাখি। আবার কখনো রাখিনা। রাত্রে নফল নামাযও পড়ি। আবার ঘুমও যাই। বিবাহও করি। অতএব যে ব্যক্তি আমার আদর্শ বিমুখ হলো সে আমার উম্মত নয়’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম, হাদীস ১৪০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঙ) পুণ্য ও শাস্তি:

‘‘হুলূল’’ ও ‘‘ওয়াহ্দাতুল্ উজূদ্’’ এর দর্শন অনুযায়ী মানুষতো কিছুই নয়। বরং তার মধ্যে আল্লাহ্ তা’আলাই অবস্থান করছেন বলে (না’ঊযু বিল্লাহ্) সে যাই করুক না কেন তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছায়ই করে থাকে। মানুষের না কোন ইচ্ছা আছে না অভিরুচি। যার দরুন সূফীবাদীদের নিকট ভালো-খারাপ, হালাল-হারাম, আনুগত্য-নাফরমানি, পুণ্য ও শাস্তি বলতে কিছুই নেই। তাই তো তাদের মধ্যে রয়েছে বহু যিন্দীক্ব ও প্রচুর সমকামী। বরং তাদের কেউ কেউ তো প্রকাশ্য দিবালোকে গাধার সাথেও সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে। আবার কেউ কেউ তো মনে করেন, তাঁদের আর শরীয়ত মানতে হবে না। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁদের জন্য সব কিছুই হালাল করে দিয়েছেন। এ কারণেই অধিকাংশ সূফীগণ জান্নাত ও জাহান্নাম নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করেছেন। বরং তাঁরা জান্নাত কামনা করাকে একজন সূফীর জন্য মারাত্মক অপরাধ মনে করেন। তাঁদের চাওয়া-পাওয়া হচ্ছে, ফানা ফিল্লাহ্, গায়েব জানা ও বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ এবং এটাই তাঁদের বানানো জান্নাত। তেমনিভাবে জাহান্নামকে ভয় পাওয়াও একজন সূফীর জন্য মারাত্মক অপরাধ। কারণ, তা গোলামের অভ্যাস ; স্বাধীন লোকের নয়। বরং তাঁদের কেউ কেউ তো দাম্ভিকতা দেখিয়ে এমনো বলেছেন যে, আমি যদি চাই জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনকে মুখের সামান্য থুতু দিয়েই নিভিয়ে দিতে পারি। আরেক ক্বুতুব বলেনঃ আমি যদি আল্লাহ্ তা’আলাকে লজ্জা না করতাম তা হলে মুখের সামান্য থুতু দিয়েই জাহান্নামকে জান্নাত বানিয়ে দিতাম।

নিযামুদ্দীন আওলিয়া তাঁর সংকলিত বাণী ‘‘ফাওয়ায়িদুল্ ফুওয়াদ্’’ কিতাবে বলেন:

’’কিয়ামতের দিন মা’রূফ কার্খীকে জান্নাতে যাওয়ার জন্য আদেশ করা হবে। কিন্তু তিনি তখন বলবেনঃ আমি জান্নাতে যাবো না। আপনার জান্নাতের জন্য আমি ইবাদাত করিনি। অতএব ফিরিশ্তাদেরকে আদেশ করা হবে, একে নূরের শিকলে মজবুত করে বেঁধে টেনে হেঁচড়ে জান্নাতে নিয়ে যাও’’।

বায়েযীদ বোস্তামী বলেন: জান্নাত তো বাচ্চাদের খেলনা ছাড়া আর কিছুই নয়। পাপী আবার কারা ? কার অধিকার আছে মানুষকে জাহান্নামে ঢুকাবে? (শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৫০০)।

রাবে’আ বস্রী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি একদা ডান হাতে পানির পেয়ালা এবং বাম হাতে আগুনের জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে বলেন: আমার ডান হাতে জান্নাত এবং বাম হাতে জাহান্নাম। অতএব আমি জান্নাতকে জাহান্নামের উপর ঢেলে দিচ্ছি। যাতে করে জান্নাতও না থাকে এবং জাহান্নামও। তাহলে মানুষ একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত করবে।

(চ) কারামাত:

সূফীগণ ‘‘’হুলূল’’ ও ‘‘ওয়াহ্দাতুল্ উজূদে’’ বিশ্বাস করার দরুন তাঁরা মনে করেন যে, আল্লাহ্ তা’আলা এককভাবে যা করতে পারেন তাঁরাও তা করতে পারেন। তাই তো মনে করা হয়, তাঁরা বিশ্ব পরিচালনা করেন। গাউসের নিকট রয়েছে সব কিছুর চাবিকাঠি। চার জন ক্বুতুব গাউসেরই আদেশে বিশ্বের চার কোণ ধরে রেখেছেন। সাত জন আব্দাল গাউসেরই আদেশে বিশ্বের সাতটি মহাদেশ পরিচালনা করেন। আর নজীবগণ নিয়ন্ত্রণ করেন বিশ্বের প্রতিটি শহর। প্রত্যেক শহরে একজন করে নজীব রয়েছেন। হেরা গুহায় তাঁরা প্রতি রাত্রে একত্রিত হন এবং সৃষ্টিকুলের ভাগ্য নিয়ে খুব নিবিড়ভাবে তাঁরা চিন্তা করেন। তাঁরা জীবিতকে মারতে পারেন এবং মৃতকে জীবিত করতে পারেন। বাতাসে উড়তে পারেন এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন ; অথচ কোর’আন ও হাদীসের দৃষ্টিতে এ সবগুলো একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই করতে বা করাতে পারেন। অন্য কেউ নয়।

নিম্নে সূফীদের কিছু বানানো কাহিনী উল্লেখ করা হলো:

(১) একদা আব্দুল কাদের জিলানী মুরগীর তরকারি খেয়ে হাড়গুলো পাশে রেখেছেন। অতঃপর হাড়গুলোর উপর হাত রেখে বললেন: আল্লাহ্’র আদেশে দাঁড়িয়ে যাও। ততক্ষণাতই মুরগীটি জীবিত হয়ে গেলো। (সীরাতে গাউস্, পৃষ্ঠা: ১৯১ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪১১)।

(২) একদা আব্দুল কাদের জিলানী জনৈক গায়কের কবরে গিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন: আমার আদেশে দাঁড়িয়ে যাও। তখন কবর ফেটে লোকটি গাইতে গাইতে কবর থেকে বের হয়ে আসলো। (তাফরীজুল্ খা’ত্বির, পৃষ্ঠা: ১৯ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪১২)।

(৩) খাজা আবু ইস্হাক্ব চিশ্তী যখনই সফর করতে চাইতেন তখনই দু’ শত মানুষকে সাথে নিয়ে চোখ বন্ধ করলেই সাথে সাথে গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যেতেন। (তা’রীখে মাশায়িখে চিশ্ত, পৃষ্ঠা: ১৯২ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৪১৮)।

(৪) সাইয়েদ মাওদূদ চিশ্তী ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর প্রথম জানাযা মৃত বুযুর্গরা পড়েছেন। দ্বিতীয় জানাযা সাধারণ লোকেরা। অতঃপর জানাযাটি একা একা উড়তে থাকে। এ কারামত দেখে অগণিত মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। (তা’রীখে মাশায়িখে চিশ্ত, পৃষ্ঠা: ১৬০ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৭৪)।

(৫) খাজা ’উস্মান হারুনী দু’ রাক’আত তাহিয়্যাতুল্ ওযু নামায পড়ে একটি ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে অগ্নিকুন্ডে ঢুকে পড়লেন। উভয়ে দু’ ঘন্টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। আগুন তাদের একটি পশমও জ্বালাতে পারেনি। তা দেখে অনেক অগ্নিপূজক মুসলমান হয়ে যায়। (তা’রীখে মাশায়িখে চিশ্ত, পৃষ্ঠা: ১২৪ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৩৭৫)।

(৬) জনৈকা মহিলা কাঁদতে কাঁদতে খাজা ফরীদুদ্দীন গাঞ্জে শুক্রের নিকট এসে বললোঃ রাষ্ট্রপতি আমার বেকসুর ছেলেকে ফাঁসি দিয়েছে। এ কথা শুনে তিনি নিজ সাথীদেরকে নিয়ে ওখানে পৌঁছে বললেনঃ হে আল্লাহ্! যদি ছেলেটি বেকসুর হয়ে থাকে তাহলে আপনি তাকে জীবিত করে দিন। এ কথা বলার সাথে সাথেই ছেলেটি জীবিত হয়ে তাঁর সাথেই রওয়ানা করলো। তা দেখে এক হাজার হিন্দু মুসলমান হয়ে যায়। (আস্রারুল আউলিয়া, পৃষ্টা: ১১০-১১১ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৩৭৬)।

(৭) জনৈক ব্যক্তি আব্দুল কাদির জিলানীর দরবারে একজন ছেলে

সন্তান ছেয়েছিলো। অতএব তিনি তাঁর জন্য দো’আ করেন। ঘটনাক্রমে লোকটির মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়। অতএব তিনি লোকটিকে বললেন: তাকে ঘরে নিয়ে যাও এবং কুদরতের খেলা দেখো। যখন লোকটি ঘরে ফিরলো তখন মেয়েটি ছেলে হয়ে গেলো। (সাফীনাতুল্ আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৭ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ২৯৯)।

(৮) আব্দুল কাদির জিলানী মদীনা যিয়ারত শেষে খালি পায়ে বাগদাদ ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তাঁর সাথে জনৈক চোরের সাক্ষাৎ হয়। লোকটি চুরি ছাড়তে চাচ্ছিলো। অতএব লোকটি গাউসে আ’জমকে চিনতে পেরে তাঁর পায়ে পড়ে বলতে শুরু করলো: হে আব্দুল কাদির! আমাকে বাঁচান। তিনি তার এ অবস্থা দেখে তার উপর দয়ার্দ্র হয়ে তার ইস্লাহের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে দো’আ করলেন। গায়েব থেকে আওয়াজ আসলো, তুমি চোরকে হিদায়াত করতে যাচ্ছো। তা হলে তুমি তাকে ক্বুতুব বানিয়ে দাও। অতএব চোরটি তাঁর এক দৃষ্টিতেই ক্বুতুব হয়ে গেলো। (সীরাতে গাউসিয়া, পৃষ্ঠা: ৬৪০ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১৭৩)।

(৯) মিয়া ইসমাঈল লাহোরী ফজরের নামাযের পর সালাম ফেরানোর সময় ডান দিকে দয়ার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সঙ্গে সঙ্গে ডান দিকের সকল মুসল্লী কোর’আন মাজীদের হাফিজ হয়ে যায় এবং বাম দিকের সকল মুসল্লী কোর’আন শরীফ দেখে দেখে পড়তে পারে। (হাদীক্বাতুল্ আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৭৬ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ৩০৪)।

(১০) খাজা আলাউদ্দীন সাবের কালীরিকে খাজা ফরীদুদ্দীন গাঞ্জে শুক্র ‘‘কালীর’’ পাঠিয়েছেন। এক দিন খাজা সাহেব ইমামের নামাযের জায়গায় বসে গেলেন। লোকেরা তাতে বাধা প্রদান করলে তিনি বললেন: ক্বুতুবের মর্যাদা কাজীর চাইতেও বেশি। অতঃপর সবাই তাঁকে জোর করে সেখান থেকে উঠিয়ে দিলে তিনি মসজিদে নামায পড়ার জন্য কোন জায়গা পাননি। তখন তিনি মসজিদকে উদ্দেশ্য করে বললেন: সবাই সিজদাহ্ করছে। সুতরাং তুমিও সিজদাহ্ করো। সাথে সাথে মসজিদটি ছাদ ও দেয়াল সহ ভেঙ্গে পড়লো এবং সবাই মরে গেলো। (হাদীক্বাতুল্ আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ৭০ শরীয়ত ও তরীক্বত, পৃষ্ঠা: ১৯৬)।

(১১) একদা কা’বা শরীফের প্রতিটি পাথর শায়েখ ইব্রাহীম মাত্বূলীর চতুর্দিকে তাওয়াফ করে পুনরায় নিজ জায়গায় ফিরে আসে।

(১২) ইব্রাহীম আল-আ’যাব সম্পর্কে বলা হয়, আগুনকে বেশি ভয় পায় এমন লোককে তিনি বলতেন: আগুনে ঢুকে পড়ো। এ কথা বলেই তিনি আগুনে প্রবেশ করে সেখানে দীর্ঘক্ষণ থাকতেন ; অথচ তাঁর জামা-কাপড় এতটুকুও পুড়তো না এবং তাঁর কোন ক্ষতিও হতো না। এমনিভাবে তিনি নির্ভয়ে সিংহের পিঠে চড়ে এ দিক ও দিক ঘুরে বেড়াতেন।

(১৩) ইব্রাহীম আল-মাজ্যূব সম্পর্কে বলা হয়, তিনি কখনো কোন জিনিসের প্রয়োজন অনুভব করলেই তা পূরণ হয়ে যেতো। তাঁর জামাগুলো গলা কাটা থাকতো। গলাটি সঙ্কীর্ণ হলে সকল মানুষই খুব কষ্টে জীবন যাপন করতো। আর গলাটি প্রশস্ত হলে সকল মানুষই খুব আরাম অনুভব করতো।

(১৪) ইব্রাহীম ’উস্বাইফীর সম্পর্কে বলা হয়, তিনি সাধারণত শহরের বাইরে গিয়ে নিচু ও গভীর জায়গায় ঘুমুতেন। বাঘের পিঠে চড়ে তিনি শহরে ঢুকতেন। পানির উপর দিয়ে তিনি হাঁটতেন। তাঁর নৌকার কোন প্রয়োজন ছিলো না।

(১৫) ইব্রাহীম মাত্বূলী সম্পর্কে আরো বলা হয়, তিনি যখন কোন বাগানে ঢুকতেন তখন সেখানকার সকল গাছ ও উদ্ভিদগুলো নিজেদের সকল গুণাগুণ তাঁকে ডেকে ডেকে বলতো।

(১৬) ইব্রাহীম মাত্বূলী সম্পর্কে আরো বলা হয়, তিনি কখনো মিসরে জোহরের নামায পড়তেন না। একদা জনৈক মুফতী সাহেব তাঁকে তিরস্কার করেন। অতঃপর তিনি ফিলিস্তিন সফর করে দেখেন, ইব্রাহীম মাত্বূলী রামাল্লাহ্’র সাদা মসজিদে জেহরের নামায আদায় করছেন। মসজিদের ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেনঃ এ তো সর্বদা এখানেই নামায পড়ে।

(১৭) শায়েখ ইব্রাহীম ’উরয়ান সম্পর্কে বলা হয়, যখন তিনি কোন শহরে ঢুকতেন তখন সেখানকার ছোট-বড়ো সবাইকে তিনি তাদের নাম ধরে ডাকতেন। যেন তিনি এখনকার দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা। অতঃপর তিনি মিম্বরে উঠে উলঙ্গ অবস্থায় খুতবা দিতেন।

(১৮) শায়েখ আবু ’আলী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি ছিলেন বহু রূপী। কখনো তাঁকে সৈন্য রূপে দেখা যেতো। আবার কখনো নেকড়ে বাঘ রূপে। কখনো হাতী রূপে। আবার কখনো ছোট ছেলের রূপে। তিনি মানুষকে মুষ্ঠি ভরে মাটি দিলে তা স্বর্ণ বা রুপা হয়ে যেতো।

(১৯) ইউসুফ আজ্মী সম্পর্কে বলা হয়, একদা হঠাৎ তাঁর চোখ একটি কুকুরের উপর পড়ে গেলে সকল কুকুর তার পিছু নেয়। কুকুরটি হাঁটলে সেগুলোও হাঁটে। আর কুকুরটি থেমে গেলে সেগুলোও থেমে যায়। মানুষ এ ব্যাপারটি তাঁকে জানালে তিনি কুকুরটির নিকট খবর পাঠিয়ে বললেন: তুমি ধ্বংস হয়ে যাও। তখন সকল কুকুর কুকুরটিকে কামড়াতে শুরু করলো। অন্য দিন আরেকটি কুকুরের উপর তাঁর হঠাৎ দৃষ্টি পড়লে সকল কুকুর আবার তার পিছু নেয়। তখন মানুষ কুকুরটির নিকট গেলে তাদের সকল প্রয়োজন সমাধা হয়ে যেতো। কুকুরটি একদা রোগাক্রান্ত হলে সকল কুকুর একত্রিত হয়ে কাঁদতে শুরু করলো। তারা কুকুরটির জন্য আপসোস করতে লাগলো। একদা কুকুরটি মরে গেলে সকল কুকুর চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলো। আল্লাহ্ তা’আলার ইলহামে কিছু মানুষ কুকুরটিকে দাপন করে দিলো। কুকুরগুলো যতোদিন বেঁচে ছিলো তারা উক্ত কুকুরটির যিয়ারত করতো।

(২০) আবুল খায়ের মাগরিবী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি একদা মদীনায় গেলেন। তিনি পাঁচ দিন যাবত কিছুই খাননি। নবী (সা.), আবু বকর ও ’উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) কে সালাম দিয়ে তিনি রাসূল (সা.) কে আবদার করে বললেনঃ হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা.)! আমি আজ রাত আপনারই মেহমান। এ কথা বলে তিনি মিম্বরের পেছনে শুয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখেন স্বয়ং রাসূল (সা.) আবু বকর, ’উমর ও ’আলী  কে নিয়ে তাঁর সামনেই উপস্থিত। আলী (রা.) তাঁকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন: উঠো, রাসূল (সা.) এসেছেন। অতঃপর তিনি দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.) এর দু’ চোখের মাঝে চুমু খেলেন। রাসূল (সা.) তাঁকে একটি রুটি দিলেন। যার অর্ধেক তিনি স্বপ্নে খেয়েছেন। আর বাকি অর্ধেক ঘুম থেকে উঠে নিজের হাতেই দেখতে পেলেন।

(২১) বায়েযীদ বোস্তামী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি এক বছর যাবত ঘুমাননি এবং পানিও পান করেননি।

(২২) শায়েখ মুহাম্মাদ আহমাদ ফারগালী সম্পর্কে শুনা যায়, একদা একটি কুমির মুখাইমির নাক্বীবের মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তখন সে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর নিকট আসলে তিনি বললেন: যেখান থেকে তোমার মেয়েটিকে কুমির ছিনিয়ে নিলো সেখানে গিয়ে উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবে: হে কুমির! ফারগালীর সাথে কথা বলে যাও। তখন কুমিরটি সাগর থেকে উঠে সোজা ফারগালীর বাড়িতে চলে আসলো। আর মানুষ তা দেখে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছিলো। তখন তিনি কামারকে বললেন: এর দাঁতগুলো উপড়ে ফেলো। তখন সে তাই করলো। অতঃপর তিনি কুমিরকে মেয়েটি উগলে দিতে বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মেয়েটি জীবিতাবস্থায় কুমিরের পেট থেকে বের হয়ে আসলো। তখন তিনি কুমিরটিকে এ মর্মে অঙ্গিকার করালেন যে, যতোদিন সে বেঁচে থাকবে কাউকে আর এ এলাকা থেকে ছিনিয়ে নিবে না। তখন কুমিরটি কাঁদতে কাঁদতে সাগরের দিকে নেমে গেলো।

(২৩) শায়েখ আব্দুর রহীম ক্বান্নাভী সম্পর্কে বলা হয়, একদা তাঁর বৈঠকে আকাশ থেকে একটি মূর্তি নেমে আসলো। কেউ চিনলো না মূর্তিটি কি? ক্বান্নাভী সাহেব কিছুক্ষণ পর্যন্ত তাঁর মাথাটি নিচু করে রাখলেন। অতঃপর মূর্তিটি উঠে গেলো। লোকেরা এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: একজন ফিরিশ্তা দোষ করে বসলো। তাই সে আমার নিকট সুপারিশ কামনা করলো। আমি সুপারিশ করলে আল্লাহ্ তা’আলা তা কবুল করেন। অতঃপর ফিরিশ্তাটি চলে গেলো।

(২৪) সাইয়েদ আহমাদ স্বাইয়াদী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি যখনই নদীর পাড়ে যেতেন তখন নদীর মাছগুলো তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়তো। কোন মরুভূমি দিয়ে তিনি চলতে থাকলে সকল পশু তাঁর পায়ে গড়াগড়ি করতো। এমনকি তাঁর স্বাভাবিক চলার পথেও রাস্তার দু’ পার্শ্বে পশুরা তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতো।

তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয়: তিনি একটি সিজ্দায় পূর্ণ একটি বছর কাটিয়ে দিলো। একটি বারের জন্যও তিনি সিজ্দাহ্ থেকে মাথাটি উঠাননি। যার দরুন তাঁর পিঠে গাস জন্মে গেলো।

(২৫) সাইয়েদ বাদাভী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি আল্লাহ্ তা’আলার নিকট তিনটি দো’আ করেন। যার মধ্যে দু’টি দো’আ আল্লাহ্ তা’আলা কবুল করেছেন। আরেকটি দো’আ কবুল করেননি। তিনি আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ মর্মে দো’আ করেছেন যে, কেউ যদি তাঁর কবর যিয়ারত করে তা হলে আল্লাহ্ তা’আলা যেন তার ব্যাপারে তাঁর পক্ষ থেকে যে কোন সুপারিশ কবুল করেন। আল্লাহ্ তা’আলা তা কবুল করলেন। তিনি আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ মর্মেও দো’আ করেছেন যে, কেউ যদি তাঁর কবর যিয়ারত করে তা হলে আল্লাহ্ তা’আলা যেন তাকে একটি হজ্জ ও একটি ’উমরাহ্’র পূর্ণ সাওয়াব দেন। আল্লাহ্ তা’আলা তাও কবুল করলেন। তিনি আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ মর্মেও দো’আ করেছেন যে, আল্লাহ্ তা’আলা যেন তাঁকে জাহান্নামে প্রবেশ করান। আল্লাহ্ তা’আলা কিন্তু তা কবুল করলেন না। লোকেরা এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেনঃ আমি যদি জাহান্নামে ঢুকে গড়াগড়ি করি তা হলে জাহান্নাম সবুজ বাগানে পরিণত হবে। আর আল্লাহ্ তা’আলার তো এ অধিকার অবশ্যই রয়েছে যে, তিনি কাফিরদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করবেন।

(ছ) জা’হির ও বা’তিন শব্দদ্বয়ের আবিষ্কার:

সূফীদের আক্বীদা-বিশ্বাস কোর’আন ও হাদীসের সরাসরি বিরোধী হওয়ার দরুন মানুষ যেন সেগুলো বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে পারে সে জন্য তারা বা’তিন শব্দের আবিষ্কার করে। তারা বলে: কুর’আন ও হাদীসের দু’ ধরনের অর্থ রয়েছে। একটি জা’হিরী। আরেকটি বা’তিনী এবং বা’তিনী অর্থই মূল ও সঠিক অর্থ। তারা এ বলে দৃষ্টান্ত দেয় যে, জা’হিরী অর্থ খোসা বা খোলসের ন্যায় এবং বা’তিনী অর্থ সার, মজ্জা ও মূল শরীরের ন্যায়। জা’হিরী অর্থ আলিমরা জানে। কিন্তু বা’তিনী অর্থ শুধু ওলী-বুযুর্গরাই জানে। অন্য কেউ নয় এবং এ বা’তিনী জ্ঞান শুধুমাত্র কাশ্ফ, মুরাক্বাবাহ্, মুশাহাদাহ্, ইল্হাম অথবা বুযুর্গদের ফয়েয বা সুদৃষ্টির মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আর এ গুলোর মাধ্যমেই তারা শরীয়তের মনমতো অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকে।

যেমন: তারা কোর’আন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলে:

‘‘তুমি তোমার প্রভুর ইবাদাত করো এক্বীন বা মা’রিফাত হাসিল হওয়া পর্যন্ত। যখন মা’রিফাত হাসিল হয়ে যাবে তথা আল্লাহ্ তা’আলাকে চিনে যাবে তখন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও তিলাওয়াতের কোন প্রয়োজন হবে না। অথচ মূল অর্থ এই যে, তুমি তোমার প্রভুর ইবাদাত করো মৃত্যু আসা পর্যন্ত’’। (সুরা হিজ্র : ৯৯)।

তেমনিভাবে তারা নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলে:

 ‘‘তোমরা যারই ইবাদাত করোনা কেন তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত হিসেবেই গণ্য করা হবে। ব্যক্তি পূজা, পীর পূজা, কবর পূজা ও মূর্তি পূজা সবই আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত। প্রকাশ্যে অন্য কারোর ইবাদাত মনে হলেও তা তাঁরই ইবাদাত হিসেবে গণ্য করা হবে। অথচ মূল অর্থ এই যে, আপনার প্রভু এ বলে আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি (আল্লাহ্) ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত করবে না’’। (সুরা বানী ইস্রাঈল : ২৩)।

তারা কালিমায়ে তাওহীদের অর্থ করতে গিয়ে বলে থাকে, দুনিয়াতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্। তিনি ভিন্ন অন্য কিছু কল্পনাই করা যায় না।

সূফীরা কোন হালাল বস্ত্তকে হারাম এবং হারাম বস্ত্তকে হালাল করার জন্য বা’তিন শব্দ ছাড়াও আরো কিছু পরিভাষা আবাষ্কিার করেছে যা নিম্নরূপ:

‘‘অবস্থা’’, ‘‘জযবা’’, ‘‘পাগলামি’’, ‘‘মত্ততা’’, ‘‘চেতনা’’ ও ‘‘অবচেতনা’’।

তারা আরো বলে: ঈমান বলতে আল্লাহ্ তা’আলার খাঁটি প্রেমকে বুঝানো হয়। আর নকল প্রেম ছাড়া খাঁটি প্রেম কখনো অর্জিত হয়না। তাই তারা নকল প্রেমের সকল উপকরণ তথা নাচ, গান, বাদ্য, সুর, তাল, মদ, গাঁজা, রূপ-সৌন্দর্য ও প্রেমের কাহিনী শুনে মত্ত হওয়াকে হালাল মনে করে।

আরও বিভিন্ন শিরক সম্পর্কে

(১) আহবানের শির্ক:

আহবানের শির্ক বলতে পুণ্যার্জন বা মানুষের সাধ্যের বাইরে এমন কোন পার্থিব লাভের আশায় অথবা এমন কোন পার্থিব ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কাউকে আহবান করাকে বুঝানো হয়।

সকল আহবান একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই জন্য এবং তা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। যা তিনি ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক। তবে মানুষের সাধ্যের বাইরে নয় এমন কোন সহযোগিতার জন্য সক্ষম যে কোন ব্যক্তিকে আহবান করা যেতে পারে। এতদ্সত্ত্বেও এ সকল ব্যাপারে মানুষের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

‘‘নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ তা’আলাকে ডাকার পাশাপাশি অন্য কাউকে ডেকো না’’। (সুরা জিন : ১৮)।

যারা আল্লাহ্ তা’আলাকে গর্ব করে ডাকছে না তাদেরকে তিনি জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তোমাদের প্রভু বলেন: তোমরা আমাকে সরাসরি ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। নিশ্চয়ই যারা অহঙ্কার করে আমার ইবাদাত (দো’আ বা আহবান) হতে বিমুখ হবে তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’’। (সুরা মু’মিন/গাফির : ৬০)।

আল্লাহ্ তা’আলা ভিন্ন অন্য কাউকে ডাকা হলেও তারা কখনো কারোর ডাকে সাড়া দিবে না। বরং তাদেরকে ডাকা সর্বদা ব্যর্থ ও নিষ্ফল হতে বাধ্য।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘সত্যিকারের একক ডাক একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্য। যারা তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে আহবান করে তাদের আহবানে ওরা কখনো কোন সাড়া দিবে না। তারা ওব্যক্তির ন্যায় যে মুখে পানি পৌঁছুবে বলে হস্তদ্বয় সম্প্রসারিত করেছে। অথচ সে পানি কখনো তার মুখে পৌঁছুবার নয়। বস্ত্তত কাফিরদের ডাক ব্যর্থ ও নিষ্ফল হতে বাধ্য’’। (সুরা রা’দ : ১৪)।

যারা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কাউকে ডাকে তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলা ভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে হতে পারে? যে আল্লাহ্ তা’আলার পরিবর্তে এমন ব্যক্তি বা বস্ত্তকে ডাকে যা কস্মিনকালেও (কিয়ামত পর্যন্ত) তার ডাকে সাড়া দিবে না এবং তারা ওদের প্রার্থনা সম্পর্কে কখনো অবহিত নয়’’। (সুরা আহ্কাফ : ৫)।

ইব্রাহীম (আ.) মুশরিকদেরকে এবং তারা যাদেরকে ডাকতো তাদেরকেও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাকে ডাকেন। যাঁকে ডাকলে কখনো সে ডাক ব্যর্থ হয় না।

তিনি বলেন:

‘‘আমি তোমাদেরকে এবং তোমরা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া যাদেরকে ডাকছো সকলকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমি শুধু আমার প্রভুকে ডাকছি। আশা করি, আমার প্রভুকে ডেকে আমি কখনো ব্যর্থ হবো না’’। (সুরা মারইয়াম: ৪৮)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই সকল লাভ-ক্ষতির মালিক। অন্য কেউ নয়। তিনি ইচ্ছে না করলে কেউ কারোর লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না। আর সকল কল্যাণাকল্যাণও কিন্তু মানব সাধ্যের আওতাধীন নয়। বরং তার অনেকটুকুই মানব সাধ্যাতীত। সুতরাং সকল ব্যাপারে তাঁকেই ডাকতে হবে।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আর তুমি আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া এমন কোন বস্ত্ত বা ব্যক্তিকে ডাকো না যা তোমার কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারবে না। এমন করলে সত্যিই তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। যদি আল্ল¬াহ্ তা’আলা তোমাকে কোন ক্ষতির সম্মুখীন করেন তাহলে তিনিই একমাত্র তোমাকে তা থেকে উদ্ধার করতে পারেন। আর যদি তিনি তোমার কোন কল্যাণ করতে চান তাহলে তাঁর অনুগ্রহের গতিরোধ করার সাধ্য কারোরই নেই। তিনি নিজ বান্দাহ্দের মধ্য থেকে যাকে চান অনুগ্রহ করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও অতিশয় দয়ালু’’। (সুরা ইউনুস : ১০৬-১০৭)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘হে নবী তুমি বলে দাও: তোমরা যাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার পরিবর্তে পূজ্য মনে করো তাদেরকে ডাকো। তারা আকাশ ও পৃথিবীর অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়। এতদুভয়ে তাদের কোন অংশীদারিত্বও নেই এবং তাদের কেউ তাঁর সহায়কও নয়। তাঁর নিকট একমাত্র অনুমতিপ্রাপ্তদেরই কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হতে পারে’’। (সুরা সাবা : ২২-২৩)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তামরা আল্লাহ্ তা’আলার পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা (খেজুরের আঁটির আবরণ পরিমাণ) সামান্য কিছুরও মালিক নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা কিছুতেই শুনতে পাবে না। আর শুনতে পাচ্ছে বলে মেনে নিলেও তারা তো তোমাদের ডাকে কখনো সাড়া দিবে না। কিয়ামতের দিবসে তারা তোমাদের শির্ককে অস্বীকার করবে। আমার মতো সর্বজ্ঞের ন্যায় কেউই তোমাকে সঠিক সংবাদ দিতে পারবে না’’। (সুরা ফাতির : ১৩-১৪)।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আববাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল (সা.) আমাকে কিছু মূল্যবান বাণী শুনিয়েছেন যার কিয়দাংশ নিম্নরূপ:

‘‘কিছু চাইলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই চাইবে। কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই কামনা করবে। জেনে রেখো, পুরো বিশ্ববাসী একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন কল্যাণ করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই কল্যাণ করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। আর তারা সকল একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২৫১৬)। হাদিসের মান সহিহ।

এ হচ্ছে মানব সাধ্যাধীন কল্যাণাকল্যাণ সম্পর্কে। তাহলে যা মানব সাধ্যাতীত তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছা ছাড়া কখনো ঘটবে কি? কখনোই নয়।

আল্লাহ্ তা’আলাকে ডাকা বা তাঁর নিকট দো’আ করা যে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত তা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) অসংখ্য হাদীসে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে এসে সকল মানুষকে দো’আর জন্য আহবান করে থাকেন।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে বলতে থাকেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আছে যে আমার কাছে কিছু চাবে আমি তাকে তা দান করবো। কে আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চাবে আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ১১৪৫, সহিহ মুসলিম, হাদীস ৭৫৮, সুনান আবু দাউদ, হাদীস ১৩১৫, সুনান আততির্মিযী, হাদীস ৩৪৯৮ মালিক, হাদীস ৩০)। হাদিসের মান সহিহ।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলার নিকট দো’আর চাইতেও সম্মানিত কোন বস্ত্ত নেই’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ৩৩৭০, সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩৮৯৭, ইবনু হিব্বান/ইহসান, হাদীস ৮৬৭)। হাদিসের মান সহিহ।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলাকে ডাকে না তার উপর তিনি রাগান্বিত হন’’। (আদাবুল্ মুফ্রাদ, হাদীস ৬৫৮ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩৮৯৫)।

নু’মান বিন্ বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘দো’আই হচ্ছে ইবাদাত’’। (তিরমিযী, হাদীস ৩৩৭২ আবু দাউদ, হাদীস ১৪৭৯ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩৮৯৬ ইবনু হিব্বান/ইহ্সান, হাদীস ৮৮৭)।

সুতরাং এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক বৈ কি।

এমন তো নয় যে, আল্লাহ্ তা’আলা কোন মাধ্যম ছাড়া কারোর ডাকে সাড়া দেন না। বরং তিনি যখনই কোন বান্দাহ্ তাঁকে একান্তভাবে ডাকে, সাথে সাথেই তিনি তার ডাকে সাড়া দেন।

তিনি বলেন:

‘‘যখন আমার বান্দাহরা আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন আপনি তাদেরকে বলুনঃ নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ্ তা’আলা) অতি সন্নিকটে। কোন আহবানকারী যখনই আমাকে আহবান করে তখনই আমি তার আহবানে সাড়া দেই। অতএব তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার উপর ঈমান আনে। তাহলেই তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে’’। (সুরা আল বাক্বারাহ্ : ১৮৬)।

কবরবাসী কোন ওলী বা বুযুর্গ কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে এমন বিশ্বাস করে তাদেরকে ডাকাও কিন্তু এ জাতীয় শির্কের অন্তর্ভুক্ত। এমন ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের গন্ডী থেকে বের হয়ে যাবে। যদিও সে আল্লাহ্ তা’আলার একান্ত ইবাদাতগুযার বান্দাহ্ হোক না কেন। কারণ, মক্কার কাফিররাও তো আল্লাহ্ তা’আলাকে স্বীকার করতো এবং তাঁর ইবাদাত করতো। কিন্তু শির্কের কারণেই তাদের এ ইবাদাত কোন কাজে আসেনি। তাই তারা অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে।

আল্লাহ্ তা’আলা মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে বলেন:

‘‘আপনি যদি কাফিরদেরকে জিজ্ঞাসা করেন: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ্ তা’আলাই সৃষ্টি করেছেন। আপনি বলুন: তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো যে, আল্লাহ্ তা’আলা আমার কোন অনিষ্ট করতে চাইলে তোমাদের উপাস্যরা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? বা আল্লাহ্ তা’আলা আমার প্রতি কোন অনুগ্রহ করতে চাইলে ওরা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? আপনি বলুন: আমার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট। ভরসাকারীদেরকে তাঁর উপরই ভরসা করতে হবে’’। (সুরা যুমার : ৩৮)।

মক্কার কাফিররা আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাতকে মৌলিক মনে করতো। তবে তারা মূর্তিপূজা করতো একমাত্র তাঁরই নৈকট্য লাভের জন্য।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘জেনে রেখো, অবিমিশ্র আনুগত্য একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই জন্য। আর যারা আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কাউকে অভিভাবক বা সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করেছে তারা বলে: আমরা তো এদের পূজা এ জন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। তারা যে বিষয় নিয়ে এখন নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা কিয়ামতের দিন সে বিষয়ের সঠিক ফায়সালা দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা কাফির ও মিথ্যাবাদীকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না’’। (সুরা যুমার : ৩)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘তারা আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত এমন ব্যক্তি বা বস্ত্তসমূহের ইবাদাত করে যা তাদের কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না। তারা বলে: এরা আল্লাহ্ তা’আলার নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করবে। আপনি বলে দিন: তোমরা কি আল্লাহ্ তা’আলাকে ভূমন্ডল ও নভোমন্ডলে তাঁর অজানা কোন কিছু জানিয়ে দিচ্ছো? তিনি পবিত্র এবং তিনি তাদের শির্ক হতে অনেক ঊর্ধ্বে’’। (সুরা ইউনুস : ১৮)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তারা কি আল্লাহ্ তা’আলার অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে সুপারিশকারী বানিয়ে নিয়েছে? আপনি বলে দিন: তোমরা কি কাউকে সুপারিশকারী বানিয়ে নিয়েছো? অথচ তারা এ ব্যাপারে কোন ক্ষমতাই রাখে না এবং কিছুই বুঝে না। আপনি বলে দিন: যাবতীয় সুপারিশ একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই জন্য তথা তাঁরই ইখতিয়ারে। অন্য কারোর ইখতিয়ারে নয়। আকাশ ও ভূমন্ডলের সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই। পরিশেষে তাঁর নিকটই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’’। (সুরা যুমার : ৪৩-৪৪)।

কবর পূজারীদের অনেকেই মনে মনে এমন ধারণা পোষণ করে থাকবেন যে, মক্কার কাফির ও মুশ্রিকরা নিজ মূর্তিদের ব্যাপারে এমন মনে করতো যে, তাদের মূর্তিরা স্পেশালভাবে এমন কিছু ক্ষমতার মালিক যা আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে কখনোই দেননি। বরং তাদের এ সকল ক্ষমতা একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব। আর আমরা আমাদের পীর-বুযুর্গদের সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করছি তা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা মনে করছি যে, আমাদের পীর-বুযুর্গদের সকল ক্ষমতা একান্ত আল্লাহ্ প্রদত্ত। আল্লাহ্ তা’আলা নিজ দয়ায় তাঁর ওলীদেরকে এ সকল ক্ষমতা দিয়েছেন। তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব নয়।

মূলতঃ তাদের এ ধারণা একেবারেই বাস্তববর্জিত। কারণ, মক্কার কাফির- মুশ্রিকদের ধারণাও হুবহু এমন ছিলো। বিন্দুমাত্রও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। তারাও তাদের মূর্তিদের ক্ষমতাগুলোকে একান্তভাবেই আল্লাহ্ প্রদত্ত বলে মনে করতো। একেবারেই তাদের নিজস্ব ক্ষমতা বলে কখনোই মনে করতো না।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘মুশরিকরা বলতো: (হে প্রভু!) আপনার ডাকে আমি সর্বদা উপস্থিত এবং আপনার আনুগত্যে আমি একান্তভাবেই বাধ্য। আপনার কোন শরীক নেই। তখন রাসূল (সা.) বলতেন: হায়! তোমাদের কপাল পোড়া। এতটুকুই যথেষ্ট। এতটুকুই যথেষ্ট। আর একটুও বাড়িয়ে বলো না। তারপরও তারা বলতো: তবে হে আল্লাহ্! আপনার এমন শরীক রয়েছে যার মালিক আপনি এবং সে যা কিছুর মালিক সেগুলোও আপনার। তার নিজস্ব কিছুই নেই। তারা এ বাক্যগুলো বলতো এবং ক্বাবা শরীফ তাওয়াফ করতো’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ১১৮৫)।

 (২) ফরিয়াদের শির্ক:

ফরিয়াদের শির্ক বলতে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য আহবান করাকে বুঝানো হয়। যে ধরনের সাহায্য সাধারণত একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ করতে সক্ষম নয়। যেমন: রোগ নিরাময় বা নৌকোডুবি থেকে উদ্ধার ইত্যাদি।

এ জাতীয় ফরিয়াদ গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক।

যে কোন সঙ্কট মুহূর্তে সাহায্যের জন্য ফরিয়াদ করা হলে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই সে ফরিয়াদ শুনে থাকেন এবং তদনুযায়ী বান্দাহ্কে তিনি সাহায্য করেন। অন্য কেউ নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘স্মরণ করো সেই সংকট মুহূর্তের কথা যখন তোমরা নিজ প্রভুর নিকট কাতর স্বরে প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তোমাদের সেই প্রার্থনা কবুল করেছিলেন’’। (সুরা আনফাল্ : ৯)।

মক্কার কাফিররা সংকট মুহূর্তে নিজ মূর্তিদের কথা ভুলে গিয়ে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই ফরিয়াদ করতো। তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করতেন। এরপর তারা আবারো আল্লাহ্ তা’আলাকে ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বর্তমান যুগের কবর বা পীর পূজারীরা আরো অধঃপতনে পৌঁছেছে। তারা সংকট মুহূর্তেও আল্লাহ্ তা’আলাকে ভুলে গিয়ে নিজ পীরদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকে।

আল্লাহ্ তা’আলা মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে বলেন:

‘‘তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাকে ডাকে। অন্য কাউকে নয়। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে পানি থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তারা আবারো তাঁর সাথে শির্কে লিপ্ত হয়’’। (সুরা আনকাবূত: ৬৫)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আপনি ওদেরকে বলুন: তোমরাই বলো! আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে কোন শাস্তি অথবা কিয়ামত এসে গেলে তোমরা কি তখন আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে? তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকলে অবশ্যই সঠিক উত্তর দিবে। সত্যিই তোমরা তখন অন্য কাউকে ডাকবেনা। বরং তখন তোমরা ডাকবে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাকে। তখন তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। আর তখন তোমরা অন্যকে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে শরীক করা ভুলে যাবে’’। (সুরা আন্’আম : ৪০-৪১)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘সমুদ্রে থাকাকালীন যখন তোমরা কোন বিপদে পড়ো তখন আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য সকল শরীক তোমাদের মন থেকে উধাও হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তোমরা আবারো তাঁর প্রতি বিমুখ হয়ে যাও। সত্যিই মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ’’। (সুরা ইস্রা/বানী ইস্রাঈল : ৬৭)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তোমরা যে সকল নিয়ামত ভোগ করছো তা সবই আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে। অতঃপর যখন তোমরা দুঃখ দীনতার সম্মুখীন হও তখন তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে ডাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করে দেন তখন আবারো তোমাদের একদল নিজ প্রতিপালকের সঙ্গে শির্কে লিপ্ত হয়ে যায়’’। (সুরা নাহ্ল : ৫৩-৫৪)।

আল্লাহ্ তা’আলা এ জাতীয় শির্কে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে জাহান্নামী বলেছেন। তিনি বলেন:

‘‘মানুষকে যখন দুঃখ দুর্দশা পেয়ে বসে তখন সে একনিষ্ঠভাবে তার প্রভুকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি ওর প্রতি কোন অনুগ্রহ করেন তখন সে ইতিপূর্বে আল্লাহ্ তা’আলাকে স্মরণ করার কথা ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে অন্যদেরকে তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। (হে রাসূল!) তুমি বলে দাও: আরো কিছু দিন কুফরীর মজা ভোগ করো। নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামীদের অন্যতম’’। (সুরা যুমার : ৮)।

পীর বা কবর পূজারীরা যতই নিজ ওলী বা বুযুর্গদের নিকট ফরিয়াদ করুকনা কেন, যতই তাদের পূজা অর্চনা করুকনা কেন তারা এতটুকুও নিজ ভক্তদের দুর্দশা ঘুচাতে পারবে না।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আপনি বলে দিন: তোমরা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া যাদেরকে পূজ্য বানিয়েছো তাদেরকে ডাকো। দেখবে, তারা তোমাদের কোন দুঃখ দুর্দশা দূর করতে পারবে না। এমনকি সামান্যটুকু পরিবর্তনও নয়’’। (সুরা ইস্রা/বানী ইস্রাঈল : ৫৬)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘মূর্তীদের উপাসনা করাই উত্তম না সেই সত্তার উপাসনা যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন, বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং যিনি পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’আলার সমকক্ষ অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো’’। (সুরা নাম্ল : ৬২)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই সকল সমস্যা সমাধান করতে পারেন। তা যাই হোকনা কেন এবং যে পর্যায়েরই হোকনা কেন।

আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘(আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর বান্দাহ্দেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন) হে আমার বান্দাহরা! তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট। শুধু সেই ব্যক্তিই হিদায়াতপ্রাপ্ত যাকে আমি হিদায়াত দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই হিদায়াত চাও। আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। শুধু সেই ব্যক্তিই আহারকারী যাকে আমি আহার দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই আহার চাও। আমি তোমাদেরকে আহার দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই বিবস্ত্র। শুধু সেই ব্যক্তিই আবৃত যাকে আমি আবরণ দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকটই আবরণ চাও। আমি তোমাদেরকে আবরণ দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই রাতদিন গুনাহ্ করছো। আর আমি সকল গুনাহ্ ক্ষমাকারী। অতএব তোমরা আমার নিকটই ক্ষমা চাও। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবো’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৫৭৭)।

 (৩) আশ্রয়ের শির্ক:

আশ্রয়ের শির্ক বলতে যে কোন অনিষ্টকর বস্ত্ত বা ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর শরণাপন্ন হওয়াকেই বুঝানো হয়।

আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ জাতীয় কোন আশ্রয় কামনা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা তিনি ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক। তবে যে আশ্রয় মানব সাধ্যাধীন তা সক্ষম যে কারোর নিকট চাওয়া যেতে পারে। তবুও এ ব্যাপারে কারোর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া ছোট শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নিকটই আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন:

‘‘যদি শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে প্ররোচিত করতে চায় তাহলে তুমি একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই আশ্রয় চাবে। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ’’। (সুরা ফুস্সিলাত/হা-মীম আসসাজদাহ্ : ৩৬)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আর আপনি বলুন: হে আমার প্রভু! আমি শয়তানের প্ররোচনা হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করি তাদের উপস্থিতি হতে’’। (সুরা মু’মিনূন : ৯৭-৯৮)।

মানব শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও একমাত্র তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনার জন্য আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন:

‘‘অতএব আপনি (ওদের শত্রুতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য) একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই শরণাপন্ন হোন। তিনিই তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা’’। (সুরা গাফির/মু’মিন : ৫৬)।

আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রিয় নবীকে আরো ব্যাপকভাবে তাঁর আশ্রয় চাওয়া শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন:

‘‘আপনি বলুন: আমি আশ্রয় চাচ্ছি প্রভাতের প্রভুর তাঁর সকল সৃষ্টি, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত, গ্রন্থিতে ফুৎকারকারিনী নারী এবং হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে’’। (সুরা ফালাক্ব : ১-৫)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আপনি বলুন: আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানবের প্রভু, মালিক ও উপাস্যের আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে। যে কুমন্ত্রণা দেয় মানব অন্তরে। চাই সে জিন হোক অথবা মানুষ’’। (সুরা নাস : ১-৬)।

আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর আশ্রয় চাইলে তাতে তারা তাদের অনিষ্ট কখনো বন্ধ করেনা বরং তারা আরো হঠকারী, অনিষ্টকারী ও গুনাহ্গার হয় এবং আশ্রয় অনুসন্ধানীরা আরো বিপথগামী ও পথভ্রান্ত হয়।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আর কিছু সংখ্যক মানুষ কতক জিনের আশ্রয় প্রার্থনা করতো। তাতে করে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা আরো বাড়িয়ে দেয়’’। (সুরা জিন : ৬)।

জিনদের আশ্রয় কামনাকারী মুশ্রিক বা জাহান্নামী হলেও তারা আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছায় মানুষের কিছুনা কিছু উপকার করতে অবশ্যই সক্ষম। সুতরাং তাদের থেকে উপকার পাওয়া যাচ্ছে বলে তাদের আশ্রয় কামনা করা কখনোই জায়েয হবেনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন বস্ত্ত বা ব্যক্তি কর্তৃক উপকৃত হওয়া তা জায়েয বা হালাল হওয়া প্রমাণ করেনা। এমনও অনেক বস্ত্ত বা কর্ম রয়েছে যা হারাম বা না জায়েয হওয়া সত্ত্বেও তা কর্তৃক মানুষ কিছু না কিছু উপকৃত হয়ে থাকে। যেমন: ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি।

উল্লেখ্য যে, কোর’আন ও হাদীসে অজ্ঞ বা অপরিপক্ব পীর ফকিররা যে কোন সমস্যার সমাধানে সাধারণত জিনদের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে।

মানুষরা যে জিন জাতি কর্তৃক কখনো কখনো উপকৃত হতে পারে তা আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘হে মোহাম্মাদ! স্মরণ করুন সে দিনকে যে দিন আল্লাহ্ তা’আলা কাফির ও জিন শয়তানদেরকে একত্রিত করে বলবেন: হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা বহু মানুষকে গুমরাহ্ করেছো। তখন তাদের কাফির অনুসারীরা বলবে: হে আমাদের প্রভু! আমরা একে অপরের মাধ্যমে প্রচুর লাভবান হয়েছি। এভাবেই আমরা আমাদের নির্ধারিত জীবন অতিবাহিত করেছি। আল্লাহ্ তা’আলা বলবেন: জাহান্নামই হচ্ছে তোমাদের বাসস্থান। সেখানে তোমরা চিরকাল থাকবে। তবে আল্লাহ্ তা’আলা যাকে মুক্তি দিতে চাইবেন সেই একমাত্র মুক্তি পাবে। অন্যরা নয়। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু সুকৌশলী এবং অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়’’। (সুরা আন্’আম : ১২৮)।

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) বিশেষ প্রয়োজনে সকলকে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার আশ্রয় চাওয়া শিখিয়েছেন। অন্য কারোর নয়।

খাওলা বিন্তে হাকীম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবস্থান করে বলবেঃ আল্লাহ্ তা’আলার পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় চাচ্ছি তাঁর সকল সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। তাহলে উক্ত স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোন বস্ত্ত বা ব্যক্তি তার এতটুকুও ক্ষতি করতে পারবে না’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৮, সুনান আত তিরমিযী, হাদীস ৩৪৩৭)।

(৪) আশা বা বাসনার শির্ক:

আশা বা বাসনার শির্ক বলতে মানুষের অসাধ্য এমন কোন বস্তত একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর নিকট কামনা করাকে বুঝানো হয়। যেমন: কবরে শায়িত পীর-বুযুর্গের নিকট স্বামী বা সন্তান কামনা করা।

এ জাতীয় বাসনা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক।

তবে কোন পুণ্যকর্ম সম্পাদন না করে আল্লাহ্ তা’আলার রহমত ও জান্নাতের আশা করাও কিন্তু অমূলক।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ তা’আলার উপর ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত ও আল্লাহ্’র পথে জিহাদ করেছে সত্যিকারার্থে তারাই একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার অনুগ্রহের প্রত্যাশী। তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়’’। (সুরা বাক্বারাহ্ : ২১৮)।

’আলী (রা.) বলেন:

‘‘বান্দাহ্’র নিশ্চিত কর্তব্য হলো এইযে, সে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই কোন কিছু কামনা করবে। অন্য কারোর নিকট নয়’’।

 (৫) রুকু, সিজ্দাহ্, বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাযের শির্ক:

রুকু, সিজ্দাহ্, সাওয়াবের আশায় কোন ব্যক্তি বা বস্ত্তর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাযের শির্ক বলতে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য এ সকল গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো ব্যয় করাকে বুঝানো হয়।

এ ইবাদাতগুলো একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্যই করতে হয়। অন্য কারোর জন্য নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমারা রুকূ, সিজ্দাহ্, তোমাদের প্রভুর ইবাদাত এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’’। (সুরা হাজ্জ: ৭৭)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘তোমরা সিজদাহ্ করোনা সূর্য বা চন্দ্রকে। বরং সিজদাহ্ করো সে আল্লাহ্ তা’আলাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন ওগুলোকে। যদি তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করতে চাও’’। (সুরা ফুসসিলাত/হা-মীম আস্ সাজদাহ্ : ৩৭)।

কাইস্ বিন্ সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি ইয়েমেনের ‘‘হীরা’’ নামক এলাকায় গিয়ে দেখতে পেলাম, সে এলাকার লোকেরা নিজ প্রশাসককে সিজ্দা করে। তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, এ জাতীয় সিজ্দাহ্’র উপযুক্ত একমাত্র রাসূলই (সা.) হতে পারে। অন্য কেউ নয়। তাই আমি মদীনায় এসে রাসূল (সা.) কে ঘটনাটি এবং আমার মনের ভাবটুকু জানালে তিনি বললেন:

‘‘বলো! তুমি আমার ইন্তিকালের পর আমার কবরের পাশ দিয়ে গেলে আমার কবরটিকে সিজ্দাহ্ করবে কি? আমি বললাম: না, তিনি বললেন: তাহলে এখনও করোনা। আমি যদি কাউকে কারোর জন্য সিজ্দাহ্ করতে আদেশ করতাম তাহলে মহিলাদেরকে নিজ স্বামীদের জন্য সিজ্দাহ্ করতে আদেশ করতাম। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা পুরুষদেরকে নিজ স্ত্রীদের উপর প্রচুর অধিকার দিয়েছেন’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ২১৪০)।

আল্লাহ্ তা’আলা নামায ও সুদীর্ঘ বিনম্রভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পর্কে বলেন:

‘‘তোমরা নামাযসমূহ বিশেষভাবে মধ্যবর্তী নামায (’আসর) সময় মতো আদায় করো এবং বিনীতভাবে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উদ্দেশ্যেই দাঁড়াও। অন্য কারোর উদ্দেশ্যে নয়’’। (সুরা আলবাক্বারাহ্ : ২৩৮)।

মু’আবিয়াহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি:

‘‘যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট যে, মানুষ তার জন্য মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকুক তাহলে সে যেন নিজ বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২৭৫৫)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘আপনি বলে দিন: আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণকালের সকল নেক আমল সারা জাহানের প্রভু একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই, আমি এরই জন্যে আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই আমার উম্মতের সর্বপ্রথম মুসলমান’’। (সুরা আন্’আম : ১৬২-১৬৩)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘অতএব তোমার প্রভুর জন্য নামায পড়ো এবং কুরবানী করো’’। (সুরা কাউসার : ২)।

 (৬) তাওয়াফের শির্ক:

তাওয়াফের শির্ক বলতে একমাত্র কা’বা শরীফ ব্যতীত অন্য কোন বস্ত্তর তাওয়াফ করাকে বুঝানো হয়।

সাওয়াবের আশায় কোন বস্ত্তর চতুষ্পার্শ্বে তাওয়াফ করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা’আলার মর্জি ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক। অতএব তা শরীয়ত সমর্থিত হতে হবে। ইচ্ছে করলেই কোন মাজার তাওয়াফ করা যাবেনা।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘তারা যেন প্রাচীন গৃহ (কা’বা শরীফ) তাওয়াফ করে’’। (সুরা হাজ্জ : ২৯)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আলাইহিমাস্ সালাম) থেকে এ বলে অঙ্গীকার নিয়েছি যে, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজ্দাহ্কারীদের জন্যে সর্বদা পবিত্র রাখো’’। (সুরা আল বাক্বারাহ্ : ১২৫)।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘কিয়ামত সংঘটিত হবেনা যতক্ষণ না দাউস্ গোত্রের মহিলারা পাছা নাচিয়ে যুল্খালাসা নামক মূর্তির তাওয়াফ করবে’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৭১১৬, মুসলিম, হাদীস ২৯০৬, বাগাওয়ী, হাদীস ৪২৮৫, ইবনু হিব্বান, হাদীস ৬৭১৪, আব্দুর রাযযাক, হাদীস ২০৭৯৫)।

(৭) তাওবার শির্ক:

তাওবার শির্ক বলতে আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর নিকট তাওবা করাকে বুঝানো হয়।

কোন অপকর্ম বা গুনাহ্ থেকে খাঁটি তাওবা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই তাওবা করো। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’’। (সুরা নূর : ৩১)।

সকল গুনাহ্ ক্ষমা করার মালিক একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা। অন্য কেউ নয়। সুতরাং একমাত্র তাঁর কাছেই কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। অন্য কারোর নিকট নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:‘‘একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই গুনাহ্ মাফ করতে পারেন’’। (সুরা আ’লে-ইমরান : ১৩৫)।

(৮) জবাইয়ের শির্ক:

জবাইয়ের শির্ক বলতে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর নৈকট্য লাভের জন্য যে কোন পশু জবাই করাকে বুঝানো হয়। চাই তা আল্লাহ্ তা’আলা’র নামেই জবাই করা হোক বা অন্য কারোর নামে। চাই তা নবী, ওলী, বুযুর্গ বা জিনের নামেই হোক বা অন্য কারোর নামে।

সাওয়াবের আশায় কোন পশু জবাই করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আপনি বলে দিন: আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণকালের সকল নেক আমল সারা জাহানের প্রভু একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই, আমি এরই জন্যে আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই আমার উম্মতের সর্বপ্রথম মুসলমান’’। (সুরা আন্’আম : ১৬২-১৬৩)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন

‘‘সুতরাং আপনার প্রতিপালকের জন্য নামায পড়ুন ও কুরবানি করুন’’। (সুরা কাউসার : ২)।

’আলী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা লা’নত (নিজ রহমত হতে বঞ্চিত) করেন সে ব্যক্তিকে যে তিনি ব্যতীত অন্য কারোর জন্য পশু জবেহ্ করে’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৮)। হাদিসের মান সহিহ।

সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘জনৈক ব্যক্তি জান্নাতে গিয়েছে একটি মাছির জন্যে। আর অন্য জন জাহান্নামে। শ্রোতারা বললো: তা কিভাবে? তিনি বললেন: একদা দু’ ব্যক্তি কোন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। তাদের ছিলো একটি মূর্তি। যাকে কিছু না দিয়ে তথা দিয়ে অতিক্রম করা ছিলো যে কোন ব্যক্তির জন্য দুষ্কর। অতএব তারা এদের একজনকে বললো: মূর্তির জন্য কিছু পেশ করো। সে বললো: আমার কাছে দেয়ার মতো কিছুই নেই। তারা বললো: একটি মাছি হলেও পেশ করো। অতএব সে একটি মাছি পেশ করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তাতে করে শির্ক করার দরুন সে জাহান্নামী হয়ে গেলো। তেমনিভাবে তারা অন্য জনকে বললো: মূর্তির জন্য কিছু পেশ করো। সে বললো: আমি আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর জন্য কোন নজরানা পেশ করতে পারবোনা। তাতে করে তারা ওকে হত্যা করলো এবং সে জান্নাতী হলো’’। (সুরা আহমাদ/যুহদ : ১৫)।

এ জাতীয় কুরবানির গোস্ত খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের উপর হারাম করে দিয়েছেন মৃত পশু, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের গোস্ত এবং যা আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর নামে জবেহ্ করা হয়েছে’’। (সুরা আল বাকারাহ্ : ১৭৩)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘যে পশু আল্লাহ্ তা’আলার নামে জবাই করা হয়নি (বরং তা জবাই করা হয়েছে অন্য কারোর নামে অথবা এমনিতেই মরে গেছে) তা হতে তোমরা এতটুকুও খেয়োনা। কারণ, তা আল্লাহ্ তা’আলার অবাধ্যতার শামিল। শয়তানরা নিশ্চয়ই তাদের অনুগতদের পরামর্শ দিয়ে থাকে তোমাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্যে। তোমরা তাদের আনুগত্য করলে নিঃসন্দেহে মুশরিক হয়ে যাবে’’। (সুরা আন্’আম : ১২১)।

যেখানে বিদ্আত বা শির্কের চর্চা হয় যেমন: বর্তমান যুগের মাযারসমূহ সেখানে কোন পশু জবাই করা এমনকি তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নাম উচ্চারণ করে জবাই করা হলেও তা করা বৈধ নয়। বরং তা মারাত্মক একটি গুনাহ্’র কাজ।

সাবিত বিন্ যাহ্হাক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সা.) এর যুগে বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট কুরবানি করবে বলে মানত করেছে। রাসূল (সা.) কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: ওখানে কোন মূর্তি পূজা করা হতো কি? সাহাবারা বললেন: না। তিনি বললেন: সেখানে কোন মেলা জমতো কি? সাহাবারা বললেন: না। রাসূল (সা.) মানতকারীকে বললেন: তুমি মানত পুরা করে নাও। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলার অবাধ্যতা বা মানুষের মালিকানা বহির্ভূত বস্ত্তর মানত পুরা করতে হয় না’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩৩১৩ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ২১৬১)। হাদিসের মান সহিহ।

তবে এ সকল স্থানে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ কোন কিছু মানত করে থাকলে মানত পুরা না করে শুধুমাত্র কসমের কাফ্ফারা আদায় করবে।

’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

 ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার আনুগত্য (ইবাদাত) করবে বলে মানত করেছে সে যেন তাঁর আনুগত্য করে তথা মানত পুরা করে নেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার অবাধ্যতা তথা গুনাহ্’র কাজ করবে বলে মানত করেছে সে যেন তাঁর অবাধ্য না হয় তথা মানত পুরা না করে’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২৮৯ তিরমিযী, হাদীস ১৫২৬ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ২১৫৬)। হাদিসের মান সহিহ।

’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) আরো বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘কোন গুনাহ্’র ব্যাপারে মানত করা চলবেনা। তবে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ এ জাতীয় মানত করে ফেললে উহার কাফ্ফারা কসমের কাফ্ফারা হিসেবে দিতে হবে’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২৯০, ৩২৯২ তিরমিযী, হাদীস ১৫২৪, ১৫২৫ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ২১৫৫)। হাদিসের মান সহিহ।

 (১০) আনুগত্যের শির্ক - ১

আনুগত্যের শির্ক বলতে বিনা ভাবনায় তথা শরীয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমাণ ছাড়াই হালাল, হারাম, জায়েয, নাজায়েযের ব্যাপারে আলেম, বুযুর্গ বা উপরস্থ কারোর সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়াকে বুঝানো হয়।

এ জাতীয় আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা জঘন্যতম শির্ক।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তারা আল্লাহ্ তা’আলাকে ছেড়ে নিজেদের আলিম, ধর্ম যাজক ও মার্ইয়ামের পুত্র মাসীহ্ (’ঈসা) (আ.) কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে শুধু এতটুকুই আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই ইবাদাত করবে। তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা’বূদ নেই। তিনি তাদের শির্ক হতে একেবারেই পূতপবিত্র’’। (সুরা তাওবাহ্: ৩১)।

’আদি’ বিন্ হাতিম (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘আমি নবী (সা.) এর দরবারে গলায় স্বর্ণের ক্রুশ ঝুলিয়ে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে ডেকে বলেন: হে ’আদি’! এ মূর্তিটি (ক্রুশ) গলা থেকে ফেলে দাও। তখন আমি তাঁকে উক্ত আয়াতটি পড়তে শুনেছি। ’আদি’ বলেন: মূলতঃ খ্রিষ্টানরা কখনো তাদের আলিমদের উপাসনা করতো না। তবে তারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে বিনা প্রমাণে আলিমদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতো। আর এটিই হচ্ছে আলিমদেরকে প্রভু মানার অর্থ তথা আনুগত্যের শির্ক’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ৩০৯৫)।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘যে পশু একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নামে জবাই করা হয়নি (বরং তা জবাই করা হয়েছে অন্য কারোর নামে অথবা এমনিতেই মরে গেছে) তা হতে তোমরা এতটুকুও খেয়ো না। কারণ, তা আল্লাহ্ তা’আলার অবাধ্যতার শামিল। শয়তানরা নিশ্চয়ই তাদের অনুগতদের কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে তোমাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্যে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে তোমরা নিশ্চিতভাবে মুশ্রিক হয়ে যাবে। (সুরা আন’আম : ১২১)।

ইসলাম বিরোধী কালা কানুনের আলোকে রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রশাসকদের বিচার-মীমাংসা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া এ শির্কের অন্তর্ভুক্ত। যেমন: সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার বা মদ জাতীয় হারাম বস্ত্তকে হালাল করার নীতি। পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে ওয়ারিসি সম্পত্তির সমবন্টন বা পর্দাহীনতার নীতি। বহুবিবাহের মতো হালাল বস্ত্তকে হারাম করার নীতি। এ সকল ব্যাপারে প্রশাসকদের অকুন্ঠ আনুগত্য সম্পূর্ণরূপে হারাম ও একান্ত শির্ক। কারণ, মানব জীবনের প্রতিটি শাখায় তথা যে কোন সমস্যায় কোর’আন ও হাদীসের সঠিক সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়াই সকল মোসলমানের একান্ত কর্তব্য। আর এটিই হচ্ছে আল্লাহ্ তা’আলার গোলামী ও একত্ববাদের একান্ত দাবি। কেননা, আইন রচনার সার্বিক অধিকার একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘জেনে রাখো, সকল সৃষ্টি তাঁরই এবং হুকুমের অধিকারীও একমাত্র তিনি। তিনিই হুকুম দাতা এবং তাঁর হুকুমই একান্তভাবে প্রযোজ্য’’। (সুরা আ’রাফ : ৫৪)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘তোমরা যে কোন বিষয়েই মতভেদ করো না কেন উহার মীমাংসা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই দিবেন’’। (সুরা শূরা : ১০)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে উহার মীমাংসার জন্য একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূলের দিকেই প্রত্যাবর্তন করো। যদি তোমরা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ও পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে থাকো। এটিই হচ্ছে তোমাদের জন্য কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর পরিসমাপ্তি’’। (সুরা নিসা’ : ৫৯)।

উক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে অনুধাবিত হয় যে, আল্লাহ্ তা’আলার আইনানুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করা শুধু ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই নয় বরং তা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত এবং তা সত্যিকারার্থে আল্লাহ্ তা’আলার অধিকার বাস্তবায়ন ও নিজ আক্বীদা-বিশ্বাস সুরক্ষণের শামিল। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মানব রচিত বিধি-বিধানের আলোকে সকল বিচার-ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিচ্ছে পরোক্ষভাবে সে যেন এ বিধান রচয়িতাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করছে।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তাদের কি এমন কোন (আল্লাহ্’র অংশীদার) দেবতাও রয়েছে যারা আল্লাহ্ তা’আলার অনুমোদন ছাড়া তাদের জন্য বিধি-বিধান রচনা করে’’। (সুরা শূরা : ২১)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘তোমরা যদি তাদের আনুগত্য করো তাহলে তোমরা নিশ্চিতভাবে মুশরিক হয়ে যাবে’’। (সুরা আন’আম : ১২১)।

আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে মানব রচিত আইন গ্রহণকারীদেরকে ঈমানশূন্য তথা কাফির বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আপনি কি ওদের ব্যাপারে অবগত নন? যারা আপনার প্রতি অবতীর্ণ কিতাব ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপর ঈমান এনেছে বলে ধারণা পোষণ করছে। অথচ তারা তাগূতের (আল্লাহ্ বিরোধী যে কোন শক্তি) ফায়সালা কামনা করে। বস্ত্ততঃ তাদেরকে ওদের বিরুদ্ধাচরণের আদেশ দেয়া হয়েছে। শয়তান চায় ওদেরকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করতে। ... অতএব আপনার প্রতিপালকের কসম! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ না তারা আপনাকে নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক বানিয়ে নেয় এবং আপনার সকল ফায়সালা নিঃসঙ্কোচে তথা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়’’। (সুরা নিসা’ : ৬০-৬৫)।

অতএব যারা নিয়ত মানব রচিত বিধি-বিধান বাস্তবায়নের আহবান করছে পরোক্ষভাবে তারা বিধি-বিধান রচনা ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে অন্যকে আল্লাহ্ তা’আলার অংশীদার বানাচ্ছে। আর যারা আল্লাহ্ তা’আলার বিধান ছাড়া অন্য বিধানের আলোকে বিচারকার্য পরিচালনা করছে তারা নিশ্চিতভাবেই কাফির। চাই তারা উক্ত বিধানকে আল্লাহ্ তা’আলার বিধান চাইতে উত্তম, সম পর্যায়ের বা আল্লাহ্ তা’আলার বিধান এর পাশাপাশি এটাও চলবে বলে ধারণা করুকনা কেন। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের উক্ত আয়াতে বলেছেন: তারা ঈমান আছে বলে ধারণা পোষণ করে। বাস্তবে তারা ঈমানদার নয়। দ্বিতীয়তঃ তারা তাগূতকে বিচারক মানে ; অথচ তার বিরুদ্ধাচরণ ঈমানের অঙ্গ।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘অতএব যে ব্যক্তি তাগূতকে অবিশ্বাস এবং আল্লাহ্ তা’আলাকে বিশ্বাস করে সেই প্রকৃতপক্ষে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরলো। অর্থাৎ ঈমানদার হলো’’। (সুরা বাক্বারাহ্ : ২৫৬)।

আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে তাঁর বিধান বিমুখতাকে মুনাফিকের আচরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি বলেন:

‘‘যখন তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার বিধান ও রাসূল (সা.) এর প্রতি আহবান করা হয় তখন আপনি মুনাফিকদেরকে আপনার প্রতি বিমুখ হতে দেখবেন’’। (সুরা নিসা’ : ৬১)।

আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর বিধান ছাড়া অন্য বিধানকে জাহিলী (বর্বর) যুগের বিধান বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন:

‘‘তারা কি জাহিলী যুগের বিধান চাচ্ছে? দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার বিধান চাইতে সুন্দর বিধান আর কে দিতে পারে?’’ (সুরা মা’য়িদাহ্ : ৫০)।

ইব্নে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহু) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত আয়াতে সে ব্যক্তিকে দোষারোপ করছেন যে ব্যক্তি সার্বিক কল্যাণময় আললাহ্ তা’আলার বিধান ছেড়ে মানব রচিত বিধি-বিধানের পেছনে পড়েছে। যেমনিভাবে জাহিলী যুগের লোকেরা ভ্রষ্টতা ও মূর্খতার মাধ্যমে এবং তাতার্রা চেঙ্গিজ খান রচিত ‘‘ইয়াসিক’’ নামক সংবিধানের মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালনা করতো। যা ছিলো ইহুদী, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের সংবিধানসমূহ থেকে বিশেষভাবে চয়িত। তাতে চেঙ্গিজ খানের ব্যক্তিগত মতামতও ছিল। ধীরে ধীরে তার সন্তানরা এ সংবিধানকে জীবন বিধান হিসেবে মেনে নিয়েছে। যার গুরুত্ব তাদের নিকট কোর’আন ও হাদীসের চাইতেও বেশি। যে এমন করলো সে কাফির হয়ে গেলো। তার সাথে যুদ্ধ করা সবার উপর ওয়াজিব যতক্ষণনা সে আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর বিধানের দিকে ফিরে আসে। বর্তমান যুগে অধিকাংশ রাষ্ট্রে মানব রচিত যে সংবিধান চলছে তা অনেকাংশে তাতারদের সংবিধানেরই সমতুল্য’’। (আল্ ইরশাদ্ : ১০২-১০৩)।

যে কোন মুফতি সাহেবের ফতোয়া কোর’আন ও হাদীসের বিপরীত জেনেও নিজের মন মতো হওয়ার দরুন তা মেনে নেয়া এ শির্কের অন্তর্ভুক্ত। সঠিক নিয়ম হচ্ছে, কোন গবেষকের কথা কোর’আন ও হাদীসের সঠিক প্রমাণভিত্তিক হলে তা মেনে নেয়া। নতুবা নয়।

ইমামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, রাসূল (সা.) ছাড়া সবার কথাই গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য হতে পারে। এ জন্য তাঁরা সবাইকে কোর’আন ও হাদীসের সঠিক প্রমাণ ছাড়া কারোর কথা অন্ধভাবে মেনে নিতে নিষেধ করেছেন।

ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি (কোর’আন ও হাদীসের) দলীল সম্পর্কে অবগত নয় (যে কোর’আন ও হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমি ফতোয়া দিয়েছি) তার জন্য আমার কথানুযায়ী ফতোয়া দেয়া হারাম’’। (শা’রানী/মীযান, ফুতূহাতি মাক্কিয়্যাহ্, দিরাসাতুল্ লাবীব : ৯০ সাবীলুর্ রাসূল : ৯৭)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘যখন তোমরা দেখবে আমার কথা কোর’আন ও হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধী তখন তোমরা কোর’আন ও হাদীসের উপর আমল করবে এবং আমার কথা দেয়ালে ছুঁড়ে মারবে’’। (শা’রানী/মীযান ১/৫৭ সাবীলুর্ রাসূল : ৯৭-৯৮)।

জনৈক ব্যক্তি ‘‘দানিয়াল’’ (কেউ কেউ তাঁকে নবী মনে করেন) এর কিতাব নিয়ে কূফায় প্রবেশ করলে ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ্) তাকে হত্যা করতে চেয়েছেন এবং তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন: ‘‘কোর’আন ও হাদীস ছাড়া অন্য কিতাব গ্রহণযোগ্য হতে পারে কি?’’ (শা’রানী/মীযান, হাক্বীক্বাতুল্ ফিক্বহ্, সাবীলুর্ রাসূল : ৯৯)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) ও সাহাবাদের বাণী সদা শিরোধার্য। তবে তাবেয়ীনদের বাণী তেমন নয়। কারণ, তারাও পুরুষ আমরাও পুরুষ। অর্থাৎ আমরা সবাই একই পর্যায়ের। সুতরাং প্রত্যেকেরই গবেষণার অধিকার রয়েছে’’। (যাফারুল্ আমানী : ১৮২ আল্ ইর্শাদ্ : ৯৬ সাবীলুর্ রাসূল : ৯৮)।

ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে আরো বলা হয়:

“ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞাসা করা হলো: আপনার ফতোয়া যদি কোর’আনের বিপরীত বলে সাব্যস্ত হয় তখন আমাদের কি করতে হবে? তিনি বললেন: আমার ফতোয়া ছেড়ে দিয়ে তখন কোর’আনকে মানবে। বলা হলো: আপনার ফতোয়া যদি হাদীসের বিপরীত সাব্যস্ত হয়? তিনি বললেন: আমার ফতোয়া ছেড়ে দিয়ে তখন হাদীসকে মানবে। বলা হলো: আপনার ফতোয়া যদি সাহাবাদের বাণীর বিপরীত সাব্যস্ত হয়? তিনি বললেন: আমার ফতোয়া ছেড়ে দিয়ে তখন সাহাবাদের বাণী অনুসরণ করবে’’। (রাওযাতুল্ ’উলামা, ’ইক্ব্দুল্ জীদ্ : ৫৪ সাবীলুর্ রাসূল : ৯৭)।

ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ্) আরো বলেন:

‘‘তুমি আমি আবু হানীফা এবং মালিক এমনকি অন্য যে কারোর অন্ধ অনুসরণ করোনা। বরং তারা যেভাবে হুকুম-আহ্কাম সরাসরি কোর’আন ও হাদীস থেকে সংগ্রহ করেছে তোমরাও সেভাবে সংগ্রহ করো’’। (শা’রানী/মীযান, ’হাক্বীক্বাতুল্ ফিক্বহ্, ত’ুহ্ফাতুল্ আখ্ইয়ার্ : ৪ সাবীলুর্ রাসূল : ৯৯)।

ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

‘‘আমাদের সকলের মত গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য হতে পারে তবে রাসূল (সা.) এর মত অনুরূপ নয়। বরং তা সদা গ্রাহ্য। কারণ, তা ওহি তথা ঐশী বাণী’’। (ইক্ব্দুল্ জীদ্, আল্ ইয়াওয়াক্বীতু ওয়াল্ জাওয়াহির ২/৯৬ ইর্শাদুস্ সালিক ১/২২৭ আল্ ইর্শাদ্ : ৯৬ সাবীলুর্ রাসূল : ১০১)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আমি মানুষ। সুতরাং আমার কথা কখনো শুদ্ধ হবে। আবার কখনো অশুদ্ধ হবে। তাই তোমরা আমার কথায় গবেষণা করে যা কোর’আন ও হাদীসের অনুরূপ পাবে তাই মেনে নিবে। অন্যথায় তা প্রত্যাখ্যান করবে’’। (জাল্বুল্ মান্ফা’আহ্, ’হাক্বীক্বাতুল্ ফিক্বহ্, জামি’উ বায়ানিল্ ’ইল্মি ওয়া ফায্লিহী ২/৩৩ আল্ ইহ্কাম ফী উসূলিল্ আহ্কাম ৬/১৪৯ ঈক্বাযুল্ হিমাম ৭২ আল্ ইয়াওয়াক্বীতু ওয়াল্ জাওয়াহির ২/৯৬ সাবীলুর্ রাসূল : ১০১-১০২)।

ইমাম শাফি’য়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি কোর’আন ও হাদীসের কোন প্রমাণ ছাড়া জ্ঞানার্জন করে সে ওব্যক্তির ন্যায় যে রাত্রি বেলায় কাঠ কেটে বোঝা বেঁধে বাড়ি রওয়ানা করলো অথচ তাতে সাপ রয়েছে যা তাকে দংশন করছে। কিন্তু তার তাতে কোন খবরই নেই’’। (ই’লামুল্ মুওয়াক্বক্বি’য়ীন, সাবীলুর্ রাসূল : ১০১)।

ইমাম আবু হানীফা এবং শাফি’য়ী (রাহিমাহুমাল্লাহ) আরো বলেন:

‘‘কোন হাদীস বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে তা আমার মায্হাব বলে মনে করবে। জেনে রাখো, আমার কোন সিদ্ধান্ত হাদীসের বিপরীত প্রমাণিত হলে তখন হাদীস অনুযায়ী আমল করবে এবং আমার কথা দেয়ালে ছুঁড়ে মারবে’’। (ইক্ব্দুল্ জীদ্, আল্ ইয়াওয়াক্বীতু ওয়াল্ জাওয়াহির ২/৯৬ রাদ্দুল্ মুহ্তার ১/৪৬ রাস্মুল্ মুফ্তী : ১/৪ ঈক্বাযুল্ হিমাম : ৫২, ১০৭ দিরাসাতুল্ লাবীব : ৯১ সাবীলুর্ রাসূল : ১০১)।

ইমাম শাফি’য়ী (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন:

‘‘আমি যদি এমন কোন কথা বলে থাকি যা নবী (সা.) এর কথার বিপরীত তখন নবী (সা.) এর বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করাই সর্বোত্তম। অতএব তখন আমার অন্ধ অনুসরণ করবে না’’। (ইক্ব্দুল্ জীদ্, ই’লামুল্ মুওয়াক্বক্বি’য়ীন ২/২৬১ ঈক্বাযুল্ হিমাম ১০০, ১০৩ সাবীলুর্ রাসূল : ১০০)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘সকল আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, রাসূল (সা.) এর হাদীস যখন কারোর নিকট সুস্পষ্ট হয়ে যায় তখন অন্য কারোর কথার কারণে তা প্রত্যাখ্যান করার কোন অধিকার সে ব্যক্তির আর থাকে না’’। (হাক্বীক্বাতুল্ ফিক্বহ্, শা’রানী/মীযান, তাইসীর : ৪৬১)।

 ১০. আনুগত্যের শির্ক - ২

ইমাম আহমাদ্ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

‘‘তুমি আমি আহমাদ্, ইমাম মালিক, শাফি’য়ী, আওযা’য়ী, সাওরী এমনকি কারোর অন্ধ অনুসরণ করো না। বরং তুমি ওখান থেকেই জ্ঞান আহরণ করো যেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন এ সকল ইমামরা’’। (ইক্ব্দুল্ জীদ্, ইবনুল্ জাওযী/মানাক্বিবুল্ ইমামি আহমাদ্ : ১৯২ ঈক্বাযুল্ হিমাম ১১৩ আল্ ইয়াওয়াক্বীতু ওয়াল্ জাওয়াহির ২/৯৬ দিরাসাতুল্ লাবীব : ৯৩ সাবীলুর্ রাসূল : ১০০)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর কথার পাশাপাশি আর কারোর কথা বলার কোন অধিকার থাকে না’’। (ইক্ব্দুল্ জীদ্, আল্ ইয়াওয়াক্বীতু ওয়াল্ জাওয়াহির ২/৯৬ সাবীলুর্ রাসূল : ১০০)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তোমার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মকে এদের (ইমামদের) কারোর হাতে সোপর্দ করো না। বরং তুমি রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের কথানুযায়ী চলবে। তবে তাবি’য়ীনদের কথা মানার ব্যাপারে তুমি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন’’। (ই’লামুল্ মুওয়াক্বক্বি’য়ীন, সাবীলুর্ রাসূল : ১০০)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আশ্চর্য হয় ওদের জন্য যারা হাদীসের বর্ণনধারার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত। এতদসত্ত্বেও তারা তা না মেনে সুফ্ইয়ান (সাওরী) (রাহিমাহুল্লাহ) এর একান্ত ব্যক্তিগত মতামত গ্রহণ করে। অথচ আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ রাসূল (সা.) এর আদেশ অমান্যকারীদের এ মর্মে সতর্ক থাকা উচিত যে, তাদের উপর নেমে আসবে বিপর্যয় বা আপতিত হবে কঠিন শাস্তি’’। (আল্ ইর্শাদ্ : ৯৭ তাইসীর : ৪৬১)।

ইমাম আহমাদ্ (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত আয়াত সম্পর্কে বলেন:

‘‘উক্ত আয়াতে ফিৎনাহ্ বলতে শির্ককেই বুঝানো হয়েছে। সম্ভবত এটাই বুঝানো হচ্ছে যে, যখন কোন ব্যক্তি রাসূল (সা.) এর কোন কথা প্রত্যাখ্যান করে তখন তার অন্তরে কিছুটা বক্রতা সৃষ্টি হয়। এমনকি ধীরে ধীরে তার অন্তর সম্পূর্ণরূপে বক্র হয়ে যায়। এতেই তার ধ্বংস অনিবার্য’’। (তাইসীরুল্ ’আযীযিল্ হামীদ : ৪৬২)।

তিনি উক্ত আয়াতের দ্বিতীয় ব্যাখ্যায় আরো বলেন:

‘‘তুমি জানো কি? উক্ত আয়াতে ফিৎনাহ্ বলতে কি বুঝানো হয়েছে। তিনি বলেন: উক্ত আয়াতে ফিৎনাহ্ বলতে কুফরীকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ ফিৎনাহ্ (কুফরী) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর’’। (সুরা বাক্বারাহ্ : ২১৭) (তাইসীরুল্ ’আযীযিল্ হামীদ: ৪৬২)।

ইমাম আহমাদ্ (রাহিমাহুল্লাহ্) ওদের প্রতি কটাক্ষ করেছেন যারা হাদীসকে বিশুদ্ধ জেনেও সুফ্ইয়ান (সাওরী) (রাহিমাহুল্লাহ্) বা অন্যান্য ইমামগণের অন্ধ অনুসরণ করে।

তারা কখনো কখনো এ বলে হাদীস মানতে অক্ষমতা প্রকাশ করে যে, হাদীস মানা না মানা গবেষণা সংক্রান্ত ব্যাপার। আর গবেষণার দরোজা বহু পূর্বেই বন্ধ হয়ে গেছে অথবা আমার ইমাম আমার চাইতে এ সম্পর্কে ভাল জানেন। তিনি জেনে শুনেই এ হাদীস গ্রহণ করেননি। সুতরাং এ ব্যাপারে ভাবনা বা গবেষণার কোন প্রয়োজন নেই অথবা গবেষণার দরোজা এখনো বন্ধ হয়নি। তবে গবেষণার জন্য এমন অনেকগুলো শর্ত রয়েছে যা এ যুগে কারোরই মধ্যে পাওয়া যাচ্ছেনা। যেমন: গবেষক কোর’আন ও হাদীসে বিশেষজ্ঞ হওয়া এবং উহার নাসিখ (রহিতকারী) মান্সূখ (রহিত) সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত হওয়া ; হাদীসের শুদ্ধাশুদ্ধ জানা ; শব্দ ও বাক্যের ইঙ্গিত, অভিব্যক্তি ও বাচনভঙ্গি সম্পর্কে সুপন্ডিত হওয়া ; আরবী ভাষা, নাহু (ব্যাকরণ), উসূল (ফিকাহ্ শাস্ত্রের মৌলিক প্রমাণ সংক্রান্ত জ্ঞান) ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা। আরো এমন অনেকগুলো শর্ত বলা হয় যা যা আবু বকর ও ’উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এর মধ্যে পাওয়া যাওয়াও হয়তো বা অসম্ভব।

উক্ত শর্তসমূহ সঠিক বলে মেনে নিলেও তা শুধু ইমাম আবু হানীফা, মালিক, শাফি’য়ী ও আহমাদ (রাহিমাহুমুল্লাহু) এর মতো প্রথম পর্যায়ের বা মহা গবেষকদের ক্ষেত্রে মেনে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু ওগুলোকে সরাসরি কোর’আন ও হাদীস মোতাবেক আমল করা জায়েয হওয়ার ব্যাপারে শর্ত হিসেবে মেনে নেয়া হলে তা হবে সত্যিকারার্থে আল্লাহ্ তা’আলা, তদীয় রাসূল ও ইমামগণের উপর মারাত্মক অপবাদ। বরং একজন মু’মিন হিসেবে প্রতিটি ব্যক্তির উপর ফরয এই যে, যখনই কোর’আনের কোন আয়াত অথবা রাসূল (সা.) এর বিশুদ্ধ কোন হাদীস তার কর্ণকুহরে পৌঁছুবে এবং সে তা হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে তখনই সে তা নিঃসঙ্কোচে মেনে নিবে। তা যে কোন বিষয়েই হোকনা কেন এবং উহার বিপরীতে যে কেউই মত ব্যক্ত করুকনা কেন। ইহাই মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা এবং তদীয় রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) এর একান্ত নির্দেশ এবং সকল আলিম এ ব্যাপারে একমত।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তোমরা নিজ প্রভুর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বিধানের অনুসরণ করো। তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে অনুসরণীয় বন্ধু বা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না। তবে তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো’’। (সুরা আ’রাফ : ৩)।

সকল হিদায়াত একমাত্র রাসূল (সা.) এর আনুগত্যে। অন্য কারোর আনুগত্যে নয়। সে যত বড়ই হোক না কেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘যদি তোমরা তাঁর (আল্লাহ্) রাসূলের আনুগত্য করো তাহলে তোমরা সত্যিকারার্থে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। রাসূলের কর্তব্যই তো হচ্ছে সকলের নিকট আল্লাহ্ তা’আলার সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেয়া’’। (সুরা নূর : ৫৪)।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূলের আনুগত্যে হিদায়াত রয়েছে বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু মাযহাবীরা তাতে হিদায়াত দেখতে পাচ্ছে না। বরং তাদের অধিকাংশের ধারণা, রাসূল (সা.) এর হাদীস সরাসরি অবলম্বনে সমূহ গোমরাহির নিশ্চিত সম্ভাবনা এবং একান্তভাবে মাযহাব অনুসরণে সার্বিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তাইতো তারা নির্দিষ্ট কোন মাযহাব পরিত্যাগ করাকে মারাত্মক অপরাধ ও চরম গোমরাহির কারণ বলে আখ্যায়িত করে থাকে।

ইমাম আহমাদ্ (রাহিমাহুল্লাহ) এর উপরোল্লিখিত বাণীতে এ কথাও সুস্পষ্ট যে, কারোর নিকট রাসূল (সা.) এর সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছা পর্যন্ত ততক্ষণ কোন ইমামের অন্ধ অনুসরণ (তাক্বলীদ) সত্যিকারার্থে দোষনীয় নয়। বরং দোষনীয় হচ্ছে কারোর নিকট রাসূল (সা.) এর সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছার পরও পূর্ব ভুল সিদ্ধান্তের উপর অটল ও অবিচল থাকা। দোষনীয় হচ্ছে ফিকাহ্’র কিতাবসমূহ জীবন চালনার জন্যে সম্পূর্ণরূপে যথেষ্ট মনে করে কোর’আন ও হাদীসের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোর’আন ও হাদীস অধ্যয়ন করা হলেও তা একমাত্র বরকত হাসিল অথবা মাযহাবী অপতৎপরতা দৃঢ়তর করা তথা কোর’আন ও হাদীসের অপব্যাখ্যা দেয়ার উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। একান্ত শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে নয়। শুধুমাত্র চাকুরির জন্যে। শরীয়ত শেখার জন্যে নয়। তাদের সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া উচিৎ যে, নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর অন্তর্ভুক্ত তারাইতো নয়? না অন্য কেউ।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আমি আমার পক্ষ থেকে আপনাকে কোর’আন মাজীদ দিয়েছি উপদেশ স্বরূপ। যে ব্যক্তি তা হতে বিমুখ হবে সে কিয়ামতের দিন গুনাহ্’র মহা বোঝা বহন করবে। এমনকি সে স্থায়ী শাস্তির সম্মুখীনও হবে এবং এ বোঝা তার জন্য দুঃখ ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে’’। (সুরা ত্বা-হা: ৯৯-১০১)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে কঠিন ও সংকুচিত এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উঠাবো অন্ধ রূপে। তখন সে বলবে: হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কেন অন্ধ করে উঠালেন? আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান। তখন আল্লাহ্ তা’আলা বলবেন: এ ভাবেই। কারণ, দুনিয়াতে তোমার নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী এসেছিলো তখন তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। সে ভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো। এ ভাবেই আমি হঠকারী ও প্রভুর নিদর্শনে অবিশ্বাসীকে শাস্তি দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই পরকালের শাস্তি কঠিন ও চিরস্থায়ী’’। (সুরা ত্বা-হা : ১২৪-১২৭)।

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আববাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এ জাতীয় লোকদের সম্পর্কেই বলেন:

’’অচিরেই তোমাদের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হবে। আমি বলছি: রাসূল (সা.) বলেছেন। অথচ তোমরা বলছো: আবু বক্র (রা.) বলেছেন, ’উমর (রা.) বলেছেন’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৭)।

শায়েখ আব্দুর রহমান বিন্ হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) প্রতিটি মুসলমানের সঠিক কর্তব্য সম্পর্কে বলেন:

‘‘প্রতিটি ব্যক্তির কর্তব্য এই যে, যখন তার নিকট কোর’আন ও হাদীসের সঠিক প্রমাণ পৌঁছুবে এবং সে তা বুঝতে সক্ষম হবে তখন সে আর সামনে পা বাড়াবেনা বরং তা নিঃসঙ্কোচে মেনে নিবে। এর বিরোধিতায় যে কোন ব্যক্তিই মত পোষণ করুকনা কেন’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৭)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘প্রত্যেক নিজ হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির কর্তব্য এই যে, যখন সে কিতাব পড়ে কোন আলিমের মতামত জানবে তখন তা কোর’আন ও হাদীসের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিবে। কারণ, যে কোন গবেষক বা তার অনুসারীরা যখনই কোন মাস্আলা উল্লেখ করেন সাথে সাথে তার প্রমাণও উল্লেখ করে থাকেন। সুতরাং আমাদের সক্ষমদের কর্তব্য, প্রতিটি মাস্আলার সঠিক দৃষ্টিকোণ জেনে নেয়া। কারণ, যে কোন মাস্আলার সঠিক দৃষ্টিকোণ সবেমাত্র একটি। দু’টো বা ততোধিক নয়। তবে ইমামগণ সর্বাবস্থায় গবেষণার সাওয়াবের অধিকারী হবেন। চাই তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হোন বা নাই হোন। অতএব, ইনসাফ অন্বেষী ব্যক্তি সে, যে গবেষকদের মতামতে গভীর দৃষ্টি আরোপ করে কোর’আন ও হাদীস সম্মত সঠিক মত জেনে নিবে এবং জানবে কোন্ আলিমের মত নিখুঁত প্রমাণভিত্তিক তাহলে সে তা মেনে নিবে। এভাবেই ক্ষণকালের মধ্যে তার নিকট পরীক্ষিত এক ধর্মীয় জ্ঞানভান্ডার সঞ্চিত হবে’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৭)।

আব্দুর রহমান বিন্ হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহ্’র বাণী: ‘‘তোমরা যদি তাদের আনুগত্য করো তাহলে তোমরা নিশ্চিতভাবে মুশ্রিক হয়ে যাবে’’। (সুরা আন্’আম : ১২১)।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন:

‘‘এ জাতীয় শির্কে মায্হাব অনুসারীদের অনেকেই লিপ্ত। কারণ, তারা নিজ ইমামের মত পরিপন্থী কোন প্রমাণ গ্রহণ করেনা যতই তা বিশুদ্ধ প্রমাণিত হোকনা কেন। তাদের কট্টরপন্থীরাতো এমনও বিশ্বাস করে যে, ইমাম সাহেবের মত পরিপন্থী কোন প্রমাণ গ্রহণ করা মাকরূহ বা হারাম। এমতাবস্থায় বিপর্যয় আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তারা এমনও বলে থাকে যে, ইমাম সাহেব দলীল সম্পর্কে আমাদের চাইতে কম অবগত ছিলেন না’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৭-৯৮)।

শায়েখ মোহাম্মদ বিন্ আব্দুল ওয়াহ্হাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

‘‘পঞ্চম মাস্আলা এই যে, অবস্থার পরিবর্তন এতটুকু পর্যন্ত পৌঁছেছে যে, অনেকেই বুযুর্গদের উপাসনাকে উৎকৃষ্ট আমল বলে মনে করছে। এমনকি উহাকে বিলায়াত (বুযুর্গী) বলতে এতটুকুও সঙ্কোচ করছেনা। অনুরূপভাবে আলিমদের উপাসনাকে ইল্ম তথা ফিক্হ বলা হচ্ছে। ধীরে ধীরে অবস্থার এতখানি অবনতি ঘটেছে যে, বুযুর্গ নামধারী ভন্ডদের এবং আলিম নামধারী মূর্খদের পূজা শুরু হয়েছে’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৮)।

অতএব মৃত ব্যক্তিদের ওয়াসীলা গ্রহণ, যে কোন সমস্যার সমাধান কল্পে তাদেরকে আহবান, সূফীদের পথ ও মত অনুসরণ, জন্মোৎসব উদ্যাপন এ জাতীয় সকল ভ্রষ্টতা, বিদ্’আত ও কুসংস্কারের ক্ষেত্রে ভ্রষ্ট আলিমদের অনুসরণ তাদেরকে প্রভু মানার শামিল। ভ্রষ্ট আলিমরা ইসলাম ধর্মে এমন কিছু কর্মকান্ড আবিষ্কার করেছে যার লেশমাত্রও কোর’আন বা হাদীসে খুঁজে পাওয়া যায়না। পরিশেষে ব্যাপারটি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, বিদ্’আতকে ধর্ম পালনের মূল মানদন্ড বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। যা পালন না করলে সে ব্যক্তিকে ধর্ম ত্যাগী বা আলিম-বুযুর্গদের চরম শত্রু ভাবা হচ্ছে।

গবেষক ইমামদের ভুল গবেষণা মানা যদি নাজায়েয হয়ে থাকে অথচ তারা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য একটি সাওয়াব পাচ্ছেন তাহলে আক্বীদার বিষয়ে (যাতে গবেষণার সামান্যটুকুও অবকাশ নেই) ভ্রষ্ট আলিমদের অনুসরণ কিভাবে জায়েয হতে পারে। মূলতঃ ব্যাপারটি এমন যেমনটি আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আমি মানুষকে বুঝানোর জন্যে এ কোর’আন মাজীদে সর্ব প্রকারের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছি। আপনি যদি তাদের সম্মুখে কোন নিদর্শন উপস্থিত করেন তখন কাফিররা নিশ্চয়ই বলবে: তোমরা অবশ্যই মিথ্যাশ্রয়ী। এভাবেই আল্লাহ্ তা’আলা মূর্খদের অন্তরে মোহর মেরে দেন। অতএব আপনি ধৈর্যধারণ করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলার প্রতিশ্রুতি সত্য। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকুন যে, অবিশ্বাসীরা যেন আপনাকে বিচলিত করতে না পারে’’। (সুরা রূম : ৫৮-৬০)।

সর্ব বিষয়ে আলিমদের কট্টর অন্ধ অনুসারীদের পাশাপাশি আরেকটি দল রয়েছে যারা সবার উপর গবেষণা ওয়াজিব বলে মনে করে। যদিও সে গন্ডমূর্খ হোকনা কেন। তারা ফিক্হের কিতাব পড়া হারাম মনে করে। তারা চায় মূর্খরাও যেন কোর’আন ও হাদীস থেকে মাস্আলা বের করে নেয়। এটি চরম কট্টরতা বৈ কি? ভয়ঙ্করতার বিবেচনায় এরাও প্রথমোক্তদের চাইতে কম নয়। অতএব, এ ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অনুসরণ করাই সর্বোত্তম। অর্থাৎ আমরা গবেষকদের অন্ধ অনুসরণও করবোনা আবার তাদের কোর’আন-হাদীস সম্মত জ্ঞানগর্ব আলোচনাও প্রত্যাখ্যান করবোনা। বরং আমরা তাদের গবেষণা গভীরভাবে অধ্যয়ন করে কোর’আন ও হাদীস বুঝার সঠিক পথ খুঁজে পেতে পারি।

 (১৩) তাওয়াক্কুল বা ভরসার শির্কঃ

তাওয়াক্কুল বা ভরসার শির্ক বলতে মানুষের অসাধ্য ব্যাপারসমূহ সমাধানে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর উপর ভরসা করাকে বুঝানো হয়। যেমন: রিযিক দান, সমস্যা দূরীকরণ ইত্যাদি। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত যা অন্য কারোর জন্য ব্যয় করা মারাত্মক শির্ক।

তবে আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত না করে তাঁর উপর যে কোন বিষয়ে ভরসা করাও কিন্তু অমূলক।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘সুতরাং আপনি আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত করুন এবং তাঁর উপর ভরসা করুন। আপনার প্রভু কিন্তু আপনাদের কর্ম থেকে গাফিল নন’’। (সুরা হূদ: ১২৩)।

আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে তাওয়াক্কুলকে ঈমানের শর্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন: ‘‘তোমরা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপরই ভরসা করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো’’। (সুরা মায়িদাহ্ : ২৩)।

অন্য আরেকটি আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা তাওয়াক্কুলকে ইসলামের শর্ত বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন:

‘‘মূসা (আ.) আরো বললেন: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যদি আল্লাহ্ তা’আলার উপর ঈমান এনে থাকো তাহলে তাঁরই উপর ভরসা করো যদি তোমরা নিজকে মুসলিম বলে দাবি করো’’। (সুরা ইউনুস : ৮৪)।

কোর’আন মাজীদের আরেকটি আয়াতে তাওয়াক্কুলকে মু’মিনদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই মু’মিন ওরা যাদের সম্মুখে মহান আল্লাহ্ তা’আলার নাম উচ্চারিত হলে তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের সামনে আল্লাহ্ তা’আলার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা সকল বিষয়ে নিজ প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে’’। (সুরা আনফাল : ২)।

ইমাম ইব্নুল ক্বায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত আয়াতে তাওয়াক্কুলকে ঈমানের শর্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাহলে বুঝা গেলো, তাওয়াক্কুল না থাকলে ঈমান থাকে না। আর যখনই ঈমান শক্তিশালী হবে তাওয়াক্কুলও শক্তিশালী হবে এবং যখনই ঈমান দুর্বল হবে তাওয়াক্কুলও দুর্বল হয়ে যাবে। তাহলে বুঝা গেলো, তাওয়াক্কুলের দুর্বলতা নিঃসন্দেহে ঈমান দুর্বল হওয়া প্রমাণ করে। আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আনের কয়েকটি আয়াতে তাওয়াক্কুল ও ইবাদাত, তাওয়াক্কুল ও ঈমান, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহ্ভীরুতা, তাওয়াক্কুল ও ইসলাম, তাওয়াক্কুল ও হিদায়াতকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তাওয়াক্কুল বস্ত্তটি ঈমান ও ইহ্সানের সকল পর্যায় এবং ইসলামের সকল কর্মকান্ডের মূল উৎস। আরো প্রতীয়মান হয় যে, এগুলোর সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক এমন যেমন শরীরের সাথে মাথার সম্পর্ক। যেমনিভাবে শরীর ছাড়া মাথার অবস্থান অকল্পনীয় তেমনিভাবে তাওয়াক্কুল ছাড়াও এগুলোর উপস্থিতি সত্যিই অকল্পনীয়’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯১-৯২)।

তাওয়াক্কুল বা ভরসার প্রকারভেদ:

আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর উপর ভরসা করা তিন প্রকার। যা নিম্নরূপ:

(১) সৃষ্টির অসাধ্য এমন কোন ব্যাপারে স্রষ্টা ছাড়া অন্য কারোর উপর ভরসা করা। যেমন: বিজয়, রক্ষণ, রিযিক বা সুপারিশ ইত্যাদির ব্যাপারে মৃত বা অনুপস্থিত কোন ব্যক্তির উপর ভরসা করা। এটি বড় শির্ক।

(২) মানুষের সাধ্যাধীন এমন কোন বাহ্যিক ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি, গভর্ণর বা সক্ষম কারোর উপর সম্পূর্ণরূপে ভরসা করা। যেমন: দান, সাদাকা বা বাহ্যিক সমস্যা দূরীকরণ ইত্যাদির ব্যাপারে উপরোক্ত কারোর উপর ভরসা করা। এটি ছোট শির্ক।

(৩) কোন কর্ম সম্পাদনে নিজ প্রতিনিধির উপর নির্ভরশীল হওয়া। যেমন: ক্রয়, বিক্রয় ইত্যাদির ব্যাপারে। এটি জায়েয। তবে এ সকল প্রতিনিধির উপরও সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। বরং এ জাতীয় কর্মসমূহ সহজ করণে সত্যিকারার্থে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপরই নির্ভরশীল হতে হবে। কারণ, প্রতিনিধি বলতেই তা মাধ্যম মাত্র এবং এ মাধ্যম ক্রিয়াশীল করতে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই সক্ষম। অন্য কেউ নয়।

তবে এ কথা একান্তভাবে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করা বৈষয়িক উপকরণ গ্রহণ করার মোটেও পরিপন্থী নয়। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা প্রতিটি বস্ত্ত বা ব্যাপারকে যে কোন উপকরণ বা মাধ্যম নির্ভরশীল করেছেন। এ কারণেই তিনি মানুষকে তাঁর উপর তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি মাধ্যম ও উপকরণ গ্রহণ করতে আদেশ দিয়েছেন। অতএব উপকরণ বা মাধ্যম গ্রহণ করাও ইবাদাত। যেমনিভাবে আল্লাহ্ তা’আলার উপর তাওয়াক্কুল করাও একটি ইবাদাত। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা উপকরণ গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন। আর আল্লাহ্ তা’আলার আদেশ পালনের নামই তো ইবাদাত।

আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেন: ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজ সতর্কতা অবলম্বন করো’’। (সুরা নিসা : ৭১)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘তোমরা কাফিরদের মোকাবিলায় যথাসাধ্য শক্তি সঞ্চয় করো’’। (সুরা আনফাল : ৬০)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘নামায শেষ হলেই তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহ্ তা’আলার অনুগ্রহ তথা রিযিক অনুসন্ধান করো’’। (সুরা জুমু’আহ্ : ১০)।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘শক্তিশালী মু’মিন দুর্বল মু’মিন অপেক্ষা অনেক ভালো এবং আল্লাহ্ তা’আলার নিকট অধিক পছন্দনীয়। তবে উভয়ের মধ্যে কম ও বেশি কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার উপকারে আসবে তা করতে সর্বদা উৎসাহী থাকো এবং আল্লাহ্’র সাহায্য কামনা করো। অক্ষমের ন্যায় বসে থেকো না। কোন অঘটন ঘটলে এ কথা বলবেনা যে, যদি এমন করতাম তাহলে এমন এমন হতো। বরং বলবে: আল্লাহ্ তা’আলা ইহা আমার ভাগ্যে রেখেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কারণ, ‘‘যদি’’ শব্দটি শয়তানের শয়তানীর দরোজা খুলে দেয়’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৬৬৪)। হাদিসের মান সহিহ।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘জনৈক ব্যক্তি বললো: হে আল্লাহ্’র রাসূল! আমি উটটি বেঁধে তাওয়াক্কুল করবো নাকি না বেঁধেই তাওয়াক্কুল করবো? তিনি বললেন: বেঁধেই তাওয়াক্কুল করো। না বেঁধে নয়’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২৫১৭)।হাদিসের মান সহিহ।

’উমর বিন্ খাত্তাব (রা.) এর সঙ্গে ইয়েমেনের কিছু সংখ্যক লোকের সাক্ষাৎ হলে তিনি তাদেরকে বলেন:

‘‘তোমরা কারা? তারা বললো: আমরা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপর নির্ভরশীল। তিনি বললেন: না, বরং তোমরা অসদুপায়ে মানুষের সম্পদ ভক্ষণকারী। আল্লাহ্ তা’আলার উপর সত্যিকার নির্ভরশীল সে ব্যক্তি যে জমিনে বীজ বপন করে তাঁরই উপর ভরসা করে’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৪)।

ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, জনৈক ব্যক্তি উপার্জন না করে বসে আছে এবং বলছে: আমি আল্লাহ্ তা’আলার উপর তাওয়াক্কুল করেছি। তখন তিনি বলেন:

‘‘প্রত্যেকেরই উচিত আল্লাহ্ তা’আলার উপর তাওয়াক্কুল করা। তবে এর পাশাপাশি নিজকে উপার্জনে অভ্যস্ত করতে হবে। কারণ, সকল নবীগণ পয়সার বিনিময়ে কাজ করেছেন। এমনকি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) , আবু বকর, ’উমরও। তাঁরা আল্লাহ্ তা’আলার রিযিকের আশায় বসে থাকেননি। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহ্ তা’আলার অনুগ্রহ তথা রিযিক অনুসন্ধান করো’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৪)।

এ ব্যাপারে জনৈক আলিম সত্যই বলেছেন। তিনি বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি রোজগার বা উপকরণ অবলম্বনের ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করলো সে যেন রাসূল (সা.) এর হাদীস নিয়ে উচ্চবাচ্য করলো। আর যে ব্যক্তি তাওয়াক্কুল নিয়ে উচ্চবাচ্য করলো সে যেন ঈমান নিয়ে উচ্চবাচ্য করলো’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৩)।

ইমাম ইবনে রাজাব (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন: মানবকর্ম বলতেই তা সর্বসাকুল্যে তিনটি প্রকারের যে কোন একটি প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। যা নিম্নরূপ:

(১) ইবাদাত। যা সম্পাদন করতে আল্লাহ্ তা’আলা বান্দাহ্দেরকে আদেশ করেছেন এবং যা বান্দাহ্’র জন্য পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতে প্রবেশের কারণ হবে। তা বিনা ভেদাভেদে প্রত্যেককে অবশ্যই সম্পাদন করতে হবে। তবে এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা ও তাঁর সহযোগিতা কামনা করা একান্ত কর্তব্য। কারণ, একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই বান্দাহ্কে সৎ কাজ করতে এবং অসৎ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে সহযোগিতা করে থাকেন। আল্লাহ্ তা’আলা যা ইচ্ছে করেন তাই ঘটে থাকে এবং তিনি যা ইচ্ছে করেন না তা কখনোই ঘটে না। তাই যে ব্যক্তি ইবাদাত করতে গাফিলতি করবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে অবশ্যই শাস্তির সম্মুখীন হবে।

ইউসুফ বিন্ আস্বাত (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন:

‘‘এমন ব্যক্তির ন্যায় আমল করবে পরকালে নিষ্কৃতির জন্য যার একমাত্র আমলই ভরসা এবং এমন ব্যক্তির ন্যায় তাওয়াক্কুল করবে যে কেবল ভাগ্যে যা আছে তাই ঘটবে বলে বিশ্বাস করে’’। (আল্ ইরশাদ্ : ৯৩)।

(২) প্রকৃতিগতভাবে মানুষ সর্বদা যা করে থাকে এবং যা সম্পাদন করতে মানুষ আদিষ্ট ও একান্তভাবে বাধ্য। যেমন: খিদে লাগলে ভক্ষণ, পিপাসা লাগলে পান, সূর্যের তাপে ছায়া ও ঠান্ডায় তাপ গ্রহণ ইত্যাদি। এ সকল কর্ম সম্পাদন করা বান্দাহ্’র উপর ওয়াজিব। যে ব্যক্তি এগুলো করতে সক্ষম অথচ সে অবহেলা বশতঃ তা না করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে ব্যক্তি অবশ্যই অপরাধী এবং পরকালে শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। তবে আল্লাহ্ তা’আলা কোন কোন ব্যক্তিকে এমন কিছু ক্ষমতা দিয়ে থাকেন যা অন্যের নেই। সুতরাং সে তার সাধ্যানুযায়ী ব্যতিক্রম কিছু করলে তাতে কোন অসুবিধে নেই। এ কারণেই রাসূল (সা.) একটানা রোযা রাখতেন। কিন্তু তিনি সাহাবাদেরকে তা করতে নিষেধ করতেন এবং বলতেন:

‘‘আমি তোমাদের মতো নই। আমাকে আল্লাহ্ তা’আলা খাওয়ান ও পান করান’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ১৯৬৪ মুসলিম, হাদীস ১১০৫)। হাদিসের মান সহিহ।

পূর্ববর্তীদের অনেকেই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে পারতেন। তাতে এতটুকুও তাদের ইবাদাতের ক্ষতি হতো না। কিন্তু যে ব্যক্তি না খেলে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইবাদাত করতে কষ্ট হয় তার জন্য না খাওয়া সত্যিই দোষনীয়।

(৩) প্রকৃতিগতভাবে মানুষ অধিকাংশ সময় যা করে থাকে এবং যা করতে মানুষ একান্তভাবে বাধ্য নয়। যেমন: বিবাহ-শাদি ইত্যাদি। অতএব কারোর এ সবের একেবারেই প্রয়োজন নেই বলে কেউ তা না করলে সে এ জন্য গুনাহ্গার হবে না।

যে কোন ব্যাপারে বান্দাহ্’র জন্য একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট। তাই তাঁর উপরই ভরসা করতে হবে। অন্য কারোর উপর নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রিয় নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

‘‘হে নবী! আপনি ও আপনার অনুসারীদের জন্য সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট’’। (সুরা আন্ফাল : ৬৪)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘কাফিররা যদি আপনাকে প্রতারিত করতে চায় তাহলে আপনার জন্য একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট। একমাত্র তিনিই আপনাকে নিজ সাহায্য (ফিরিশতা) ও মু’মিনদের দিয়ে শক্তিশালী করেছেন’’। (সুরা আনফাল : ৬২)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করবে আল্লাহ্ তা’আলা তাকে যে কোন সংকট থেকে উদ্ধার করবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিযিক দিবেন। আর যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপরই ভরসা করবে তখন তিনিই হবেন তার জন্য একান্ত যথেষ্ট’’। (সুরা ত্বালাক্ব : ৩)।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা তাওয়াক্কুলকে যে কোন কার্যসিদ্ধির অনেকগুলো মাধ্যমের একটি সবিশেষ ও সর্বপ্রধান মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এতদ্সত্ত্বেও তা কিন্তু একেবারেই সর্বেসর্বা নয়। বরং এর পাশাপাশি অন্য মাধ্যমও গ্রহণ করতে হবে। যেমনিভাবে আল্লাহভীতিও কার্যসিদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। তবে যখন সকল মাধ্যম চরমভাবে ব্যর্থ হবে তখন একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপর খাঁটি তাওয়াক্কুলই কার্যকরী মাধ্যম হিসেবে প্রমাণিত হবে।

’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি:

‘‘তোমরা যদি আল্লাহ্ তা’আলার উপর সত্যিকারার্থে ভরসা করতে তাহলে তিনি তোমাদেরকে রিযিক দিতেন যেমনিভাবে তিনি রিযিক দিয়ে থাকেন পাখীদেরকে। পাখীরা ভোর বেলায় খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যা বেলায় ভরা পেটে বাসায় ফিরে আসে’’। (সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪২৩৯)। হাদিসের মান সহিহ।

যখন কোনো কল্যাণ বা অকল্যাণ করা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো বৈশিষ্ট্য হতে পারে না, এমনকি সে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যখন স্বয়ং আল্লাহর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও হতে পারেন না, তখন সবাইকে বুঝতে হবে যে, আল্লাহ ব্যতীত মানুষের কল্যাণ লাভের এবং অকল্যাণ দূরীকরণের অপর কোনো আশ্রয়স্থল নেই।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন :

“বলুন: আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি সাধন করার এবং তোমাদেরকে সুপথে আনয়ন করার মালিক নই। বলুন, আমার অবস্থা এমন যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে আমাকে রক্ষা করার মত কেউ নেই এবং তিনি ব্যতীত আমি অপর কোনো আশ্রয় স্থলও পাব না।’’ (আল-কুরআন, সূরা আল-জিন : ২১)।

এ আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মুখ দিয়ে এ ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে এ কথা বুঝাতে চাইলেন যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই হলেন সকল লাভ-ক্ষতি, কল্যাণ ও অকল্যাণের একচ্ছত্র মালিক। কোনো কল্যাণার্জন বা অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য প্রার্থনা ও আবেদন করার স্থান একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কোথাও নেই। সুতরাং অবস্থার যে কোনো পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকে কেবল তাঁরই শরণাপন্ন হতে হবে। কারো কোনো অলৌকিক মাধ্যমের চিন্তা ভাবনা পরিহার করে সরাসরি কেবল তাঁর নিকটেই তা চাইতে হবে; কেননা, তিনি একাই বান্দাদের যাবতীয় অভাব ও অভিযোগ শ্রবণ করার এবং তা পূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মানুষেরা এরপরও তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের আশ্রয় গ্রহণ করে, অন্যের কাছে তাদের অভাব ও অভিযোগের কথা তুলে ধরে, তাঁর কাছে তাদের অভাবের কথা সরাসরি না জানিয়ে অন্যের মাধ্যম গ্রহণ করে। বান্দাদের এ হেন কর্মে তিনি প্রশ্ন করে বলেন :

“আল্লাহ কি তা হলে তাঁর বান্দার (যাবতীয় অভাব ও অভিযোগ শ্রবণ করার) জন্য যথেষ্ট নন?’’ (আল-কুরআন, সূরা যুমার : ৩৬)।

হ্যাঁ, অবশ্যই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের যাবতীয় অভাব ও অভিযোগ শুনার ও তা পূরণের জন্য যথেষ্ট। তাই তাদের উচিত কেবল তাঁরই নিকট সরাসরি তাদের যাবতীয় অভাবের কথা তুলে ধরা, তাঁরই নিকট যাবতীয় সাহায্য কামনা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয়ার জন্যই ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বলেন :

“যখন কোনো সাহায্য চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে।’’ (আবু ঈসা আত্ তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল কিয়ামাহ, বাব : নং ৫৯, ৪/৬৬৭; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ১/২৯৩)।

(১৫) হিদায়াতের শির্কঃ

হিদায়াতের শির্ক বলতে আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ কাউকে হিদায়াত দিতে পারে এমন বিশ্বাস করা অথবা এ বিশ্বাসে কারোর নিকট হিদায়াত কামনা করাকে বুঝানো হয়।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছে ছাড়া কেউ কাউকে ইচ্ছে করলেই সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে না। এমনকি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও নিজ ইচ্ছায় কাউকে হিদায়াত দিতে পারেননি। একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই যাকে চান হিদায়াত দিতে পারেন। অন্য কেউ নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা রাসূল (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন:

‘‘তাদেরকে সুপথে আনার দায়িত্ব আপনার উপর নয়। বরং আল্লাহ্ তা’আলা যাকে চান সৎপথে পরিচালিত করেন’’। (সুরা বাক্বারাহ্ : ২৭২)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘আপনি যতই চান না কেন অধিকাংশ লোকই মু’মিন হওয়ার নয়’’। (সুরা ইউসুফ : ১০৩)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘আপনি যাকে ভালোবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারেন না। তবে আল্লাহ্ তা’আলা যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই সৎপথে আনয়ন করেন। তিনি হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে ভালই জানেন’’। (সুরা ক্বাসাস্ : ৫৬)।

আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘(আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর বান্দাহ্দেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন) হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট। শুধু সেই ব্যক্তিই হিদায়াতপ্রাপ্ত যাকে আমি হিদায়াত দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকট হিদায়াত চাও। আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দেবো’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৫৭৭)।

মুসাইয়াব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

রাসূল (সা.) এর চাচা আবু তালিব যখন মৃত্যু শয্যায় তখন তিনি [রাসূল (সা.)] তার (আবু তালিব) নিকট এসে দেখতে পেলেন, আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ্ বিন্ আবু উমাইয়া তার নিকট বসা। তখন রাসূল (সা.) তাঁর চাচাকে বললেন: হে চাচা! আপনি বলুন: আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই। তাহলে আমি আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ ব্যাপারে আপনার জন্য সাক্ষী দেবো। আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ্ বললো: হে আবু তালিব! তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করছো? এভাবে রাসূল (সা.) তাকে কালিমা পাঠ করাতে চাচ্ছিলেন। আর ওরা সে কথাই বার বার বলছিলো। পরিশেষে আবু তালিব আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম নিয়েই ইন্তিকাল করলো এবং কালিমা উচ্চারণ করতে অস্বীকার করলো। এরপরও রাসূল (সা.) বললেন: আল্লাহ্’র কসম! আমি আপনার জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো যতক্ষণনা তিনি আমাকে নিষেধ করেন। অতঃপর তার সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হলো: ‘‘নবী ও অন্যান্য সকল মু’মিনদের জন্য জায়িয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয়-স্বজনই বা হোকনা কেন এ কথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে, তারা সত্যিকার জাহান্নামী’’। আরো নাযিল হলোঃ ‘‘আপনি যাকে ভালোবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারেন না। তবে আল্লাহ্ তা’আলা যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই সৎপথে আনয়ন করেন’’। (তাওবা: ১১৩) এবং (ক্বাসাস্ : ৫৬) (বুখারী, হাদীস ১৩৬০, ৩৮৮৪, ৪৬৭৫, ৪৭৭২, ৬৬৮১ মুসলিম, হাদীস ২৪)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কোনো গাওস, ক্বুতুব, ওয়াতাদ, আব্দালের এ বিশ্ব পরিচালনায় অথবা উহার কোন কর্মকান্ডে হাত আছে এমন মনে করার শির্ক

যেমন: বৃষ্টি দেয়া, তুফান বন্ধ করা ইত্যাদি ইত্যাদি

বস্ত্ততঃ দুনিয়ার সকল বিষয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার হাতেই ন্যস্ত। অন্য কারোর হাতে নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তিনিই আল্লাহ্ যিনি আকাশমন্ডলীকে স্থাপন করেছেন স্তম্ভ বিহীন। যা তোমরা দেখতে পাচ্ছো। অতঃপর তিনি নিজ ’আরশে ’আজীমের উপর সমাসীন হন এবং তিনিই চন্দ্র ও সূর্যকে নিয়মানুবর্তী করেন। ওদের প্রত্যেকেই নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত (নিজ কক্ষপথে) আবর্তন করবে। তিনিই দুনিয়ার সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন। যাতে তোমরা পরকালে নিজ প্রভুর সাথে সাক্ষাতে নিশ্চিত হতে পারো’’। (সুরা রা’দ : ২)।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু আল্লাহ্ তা’আলা। যিনি আকাশ ও পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। অতঃপর তিনি নিজ ’আরশে ’আজীমের উপর সমাসীন হন এবং তিনিই দুনিয়ার সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন’’। (সুরা ইউনুস : ৩)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘হে নবী! আপনি মক্কার কাফিরদেরকে বলুন: তিনি কে? যিনি আকাশ ও জমিন হতে তোমাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকেন। তিনি কে? যিনি কর্ণ ও চক্ষুসমূহের মালিক। তিনি কে? যিনি প্রাণীকে প্রাণহীন থেকে এবং প্রাণহীনকে প্রাণী থেকে বের করেন। আর তিনি কে? যিনি দুনিয়ার সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। তখন তারা অবশ্যই বলবে: তিনি হচ্ছেন আল্লাহ্ তা’আলা। সুতরাং আপনি তাদেরকে বলুন: তারপরও তোমরা কেন তাঁকে ভয় পাচ্ছোনা এবং শির্ক থেকে নিবৃত্ত হচ্ছোনা?’’ (সুরা ইউনুস : ৩১)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তিনিই (আল্লাহ্ তা’আলা) আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সকল বিষয় পরিচালনা করেন। অতঃপর একদিন সব কিছুই তাঁর সমীপে সমুত্থিত হবে। যে দিন হবে তোমাদের দুনিয়ার হিসেবে হাজার বছরের সমান’’। (সুরা সাজদাহ্ : ৫)।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা বলেন’’ মানুষ আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যুগকে গালি দেয়। অথচ আমিই যুগ নিয়ন্ত্রক। সকল বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতেই। আমার আদেশেই রাত-দিন সংঘটিত হয়’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪৮২৬, ৬১৮১, ৭৪৯১ মুসলিম, হাদীস ২২৪৬ আবু দাউদ, হাদীস ৫২৭৪ আহমাদ : ২/২৩৮ ’হুমাইদী, হাদীস ১০৯৬ বায়হাক্বী : ৩/৩৬৫ ইবনু হিব্বান/ইহসান, হাদীস ৫৬৮৫ হা’কিম : ২/৪৫৩)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কোনো ব্যক্তি বা দল কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য জীবন বিধান রচনা করতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই মানব জাতির সার্বিক জীবন ব্যবস্থা রচনা করার অধিকার রাখেন। এ কাজের যোগ্য তিনি ভিন্ন অন্য কেউ নয়।

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) ও সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় কারোর জন্য কোন জীবন বিধান রচনা করে যাননি। বরং তিনি তাঁর জীবদ্দশায় যাই বলেছেন তা ওহীর মাধ্যমেই বলেছেন। স্বাধীনভাবে তিনি কিছুই বলে যাননি।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘তিনি (রাসূল (সা.)) মনগড়া কোন কথা বলেননা। বরং তিনি যাই বলেন তা ওহীর মাধ্যমেই বলেন। যা তাঁর নিকট প্রেরিত হয়’’। (সুরা নাজম : ৩-৪)।

আল্লাহ্ তা’আলা বিধান রচনার কর্তৃত্ব কার সে সম্পর্কে বলেন:

‘‘বিধান দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদাত করবে। আর কারোর নয়। এটিই হলো সরল ও সঠিক ধর্মমত। এরপরও অধিকাংশ মানুষ এ ব্যাপারে কিছুই অবগত নয়’’। (সুরা ইউসুফ : ৪০)।

আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে তাঁরই প্রেরিত রাসূল (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন:

‘‘হে নবী! আল্লাহ্ তা’আলা আপনার জন্য যা হালাল করেছেন আপনি কেন তা নিজের জন্য হারাম করতে যাচ্ছেন। আপনি নিজ স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনা করছেন। তবে আল্লাহ্ তা’আলা পরম ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত দয়ালু’’। (সুরা তাহরীম : ১)।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমাদের প্রিয় নবী (সা.) জিব্রীল (আ.) কে একদা বললেন:

‘‘হে জিবরীল! তোমার অসুবিধে কোথায়? তুমি কেন বেশি বেশি আমার সাথে সাক্ষাৎ করছো না? তখনই উক্ত আয়াত নাযিল হয় যার অর্থ: আমি আপনার প্রভুর আদেশ ছাড়া আপনার নিকট কোনভাবেই আসতে পারিনা। আমাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ এবং এ দু’ এর অন্তর্বর্তী যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ্’র। আপনার প্রভু কখনো ভুলবার নন। বর্ণনাকারী বলেন: এ হচ্ছে জিব্রীল (আ.) এর পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ (সা.) কে দেয়া উত্তর’’। (সুরা মারইয়াম : ৬৪, সহিহ বুখারী, হাদীস ৩২১৮, ৪৭৩১, ৭৪৫৫)।

যখন জিবরীল (আ.) অথবা মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ্ তা’আলার অনুমতি ছাড়া বিধান রচনা করার কোন অধিকার রাখেন না তখন অন্য কেউ বিধান রচনা করার ধৃষ্টতা দেখানো ভ্রষ্টতা বৈ কি?

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কেউ কাউকে ধনী বা গরিব বানাতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই বিশ্বের সকল কিছুর মালিক। অতএব তিনি ইচ্ছা করলেই কেউ ধনী বা গরিব হতে পারে। অন্য কারোর ইচ্ছায় কেউ ধনী বা গরিব হয় না।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘আকাশে ও জমিনে যা কিছুই রয়েছে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই’’। (সুরা আল বাক্বারাহ্ : ২৮৪)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘তিনিই আল্লাহ্, যিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য মা’বূদ নেই। তিনিই সব কিছুর মালিক এবং তিনিই পবিত্র’’। (সুরা হাশর : ২৩)।

আল্লাহ্ তা’আলা যাকে ইচ্ছা ধনী বানান। আর যাকে ইচ্ছা গরিব বানান। এতে তিনি ভিন্ন অন্য কারোর সামান্যটুকুও হাত নেই।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘আল্লাহ্ তা’আলা যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং তেমনিভাবে সংকুচিতও’’। (সুরা রা’দ : ২৬)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘নিশ্চয়ই আপনার প্রভু যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং তেমনিভাবে সংকুচিতও’’। (সুরা ইস্রা’/বানী ইস্রাঈল : ৩০)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘(হে নবী) আপনি বলে দিন: নিশ্চয়ই আমার প্রভু যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং তেমনিভাবে সংকুচিতও। তবুও অধিকাংশ লোক এ সম্পর্কে অবগত নয়’’। (সুরা সাবা : ৩৬)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘তোমরা নিজ সন্তানদেরকে দরিদ্রতার ভয়ে হত্যা করোনা। একমাত্র আমিই ওদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই ওদেরকে হত্যা করা মহাপাপ’’। (সুরা ইস্রা’/বানী ইস্রাঈল : ৩১)।

আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘(আল্লাহ্ তা’আলা নিজ বান্দাহদেরকে বলেন) হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। শুধু সেই আহারকারী যাকে আমি আহার দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকট আহার চাও। আমি তোমাদেরকে আহার দেবো। হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই বিবস্ত্র। শুধু সেই আবৃত যাকে আমি আবরণ দেবো। অতএব তোমরা আমার নিকট আবরণ চাও। আমি তোমাদেরকে আবরণ দেবো’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৫৭৭)।

যতই দান করা হোক তাতে আল্লাহ্ তা’আলার ধন ভান্ডার এতটুকুও খালি হবে না। এর বিপরীতে মানুষ যতই দান করবে ততই তার ধন ভান্ডার খালি হতে থাকবে।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ (হে বান্দাহ্!) তুমি অন্যের উপর ব্যয় করো। আমি তোমার উপর ব্যয় করবো। রাসূল (সা.) বলেন: আল্লাহ্’র হাত সর্বদা ভর্তি। প্রচুর ব্যয়েও তা খালি হয়ে যায়না। তিনি রাত ও দিন সকলকে দিচ্ছেন আর দিচ্ছেন। তাঁর দানে কোন বিরতি নেই। রাসূল (সা.) আরো বলেন: তোমরা কি দেখছোনা যে, আল্লাহ্ তা’আলা আকাশ ও জমিন সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত শুধু দিচ্ছেন আর দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর হাতে যা রয়েছে তা কখনোই শেষ হচ্ছে না’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪৬৮৪, ৭৪১১ মুসলিম, হাদীস ৯৯৩)। হাদিসের মান সহিহ।

আল্লাহ্’র রাসূল বা অন্য কোন পীর-বুযুর্গ কাউকে ধনী বা গরীব করতে পারেন না।

আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

‘‘(হে নবী!) আপনি ওদেরকে বলে দিনঃ আমি তোমাদেরকে এ কথা বলছিনা যে, আমার নিকট আল্লাহ্’র ধন ভান্ডার রয়েছে। যাকে ইচ্ছা তাকে আমি ধনী বানিয়ে দেবো। আর এমনো বলছিনা যে, আমি গায়েব জানি তথা অদৃশ্য জগতের কোন খবর রাখি’’। (সুরা আন’আম : ৫০)।

কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলার একান্ত ইচ্ছা ছাড়াও অন্য কোন নবী বা ওলী তাঁর হাত থেকে কাউকে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবে এমন মনে করার শির্ক

কোন ব্যক্তি সে আল্লাহ্ তা’আলার যতই নিকটতম বান্দাহ্ হোক না কেন আল্লাহ্ তা’আলার একান্ত ইচ্ছা ছাড়া কাউকে তাঁর হাত থেকে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারে না।

আল্লাহ্ তা’আলা রাসূল (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন:

‘‘(হে নবী!) আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন বা নাই করুন উভয়ই সমান। আপনি যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন তবুও আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। তা এ কারণে যে, তারা আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূলের সাথে কুফরি করেছে। আর আল্লাহ্ তা’আলা এরূপ অবাধ্য লোকদেরকে কখনো সঠিক পথ দেখান না’’। (সুরা তাওবাহ্ : ৮০)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই বান্দাহ্’র সকল অপরাধ ক্ষমাকারী। তিনি ইচ্ছে করলেই কেউ ক্ষমা পেতে পারে। অতএব একান্তভাবে তাঁর নিকটই ক্ষমা চাইতে হবে। অন্য কারোর কাছে নয়।

আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘(আল্লাহ্ তা’আলা নিজ বান্দাহ্দেরকে বলেন) হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা সবাই রাতদিন গুনাহ্ করছো। আর আমিই সকল গুনাহ্ ক্ষমাকারী। অতএব তোমরা আমার নিকট ক্ষমা চাও। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবো’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৫৭৭)। হাদিসের মান সহিহ।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কোনো নবী-ওলী অথবা অন্য কোন পীর-বুযুর্গ গায়েব জানেন এমন মনে করার শির্ক

গায়েব বলতে মানব জাতির বাহ্য বা অবাহ্যেন্দ্রিয়ের আড়ালের কোন বস্ত্তকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ যা কোন ধরনের মানবেন্দ্রিয় বা মানব তৈরী প্রযুক্তি কর্তৃক উপলব্ধ বা জ্ঞাত হওয়া সম্ভবপর নয় তাই গায়েব।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই গায়েব জানেন। তিনি ভিন্ন অন্য কেউ এতটুকুও গায়েব জানে না।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘(হে নবী) আপনি বলে দিন: আকাশ ও পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ গায়েব জানে না এবং তারা এও জানে না যে তারা কখন পুনরুত্থিত হবে’’। (সুরা নামল : ৬৫)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘গায়েবের চাবিকাঠি একমাত্র তাঁরই হাতে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ গায়েব জানে না। জল ও স্থলের সব কিছুই তিনি জানেন। কোথাও কোন বৃক্ষ থেকে একটি পাতা ঝরলেও তিনি তা জানেন। এমনকি ভূগর্ভের দানা বা বীজ এবং সকল শুষ্ক ও তরতাজা বস্ত্তও তাঁর অবগতির বাইরে নয়। বরং সব কিছুই তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে’’। (সুরা আন্’আম : ৫৯)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তিনিই একমাত্র জানেন গর্ভবতী মহিলার জরায়ুতে কি জন্ম নিতে যাচ্ছে। কেউ জানেনা আগামীকাল সে কি অর্জন করবে। কেউ জানেনা কোথায় তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা সর্বজ্ঞ ও সর্ব বিষয়ে অবগত’’। (সুরা লোকমান : ৩৪)।

তবে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) হাদীসের মধ্যে আমাদেরকে গায়েব সম্পর্কে যে সংবাদগুলো দিয়েছেন তা আল্লাহ্ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন। অতএব তিনি নিজ পক্ষ থেকে গায়েবের কোন সংবাদ দেননি এবং কখনো তিনি গায়েব জানতেন না।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘(হে নবী!) আপনি তাদেরকে বলে দিন: আমি তোমাদেরকে এ কথা বলছি না যে, আমার নিকট আল্লাহ্’র ধন ভান্ডার রয়েছে। যাকে ইচ্ছা তাকে আমি ধনী বানিয়ে দেবো। আর এমনো বলছি না যে, আমি গায়েব জানি তথা অদৃশ্য জগতের কোন খবর রাখি’’। (সুরা আন’আম : ৫০)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘(হে নবী!) আপনি বলে দিন: আমার ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, মঙ্গল-অমঙ্গল ইত্যাদির ব্যাপারে আমার কোন হাত নেই। বরং আল্লাহ্ তা’আলা যাই ইচ্ছে করেন তাই ঘটে থাকে। আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে আমি প্রভূত কল্যাণ লাভ করতে পারতাম এবং কোন অমঙ্গল ও অকল্যাণ কখনো আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না। আমি অন্য কিছু নই। বরং আমি শুধু মু’মিন সম্প্রদায়ের জন্য ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদবাহী’’। (সুরা আ’রাফ : ১৮৮)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘এভাবেই আমি আপনার নিকট আমার প্রত্যাদেশ রূহ তথা কোর’আন পাঠিয়েছি। ইতিপূর্বে আপনি কখনোই জানতেন না কোর’আন কি এবং ঈমান কি? মূলতঃ আমি কোর’আন মাজীদকে নূর হিসেবে অবতীর্ণ করেছি। যা কর্তৃক আমার বান্দাহ্দের যাকে ইচ্ছে হিদায়াত দিয়ে থাকি। আর আপনিতো নিশ্চয়ই মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে থাকেন’’। (সুরা যুখরুফ : ৫২)।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল (সা.) ঘর থেকে বের হলে জনৈক ব্যক্তি (জিব্রীল) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, কিয়ামত কখন হবে? তখন তিনি উত্তরে বললেন:

‘‘যাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে তিনি কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকারী চাইতে বেশি জানেন না। তবে আমি আপনাকে উহার আলামত সম্পর্কে কিছু জ্ঞান দিতে পারি। যখন কোন দাসী তার প্রভুকে জন্ম দিবে তখন এটি কিয়ামতের একটি আলামত এবং যখন উলঙ্গ ও খালি পা ব্যক্তিরা মানুষের নেতৃস্থানীয় হবে তখন এটি কিয়ামতের আরেকটি আলামত। আর যখন পশু রাখালরা বিরাট বিরাট অট্টালিকা বানাতে প্রতিযোগিতা করবে তখন এটি কিয়ামতের আরেকটি আলামত’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৫০ মুসলিম, হাদীস ৯)। হাদিসের মান সহিহ।

রাসূল (সা.) যদি সত্যিই গায়েব জানতেন তাহলে তিনি বিলাল (রা.) কে সাথে নিয়ে তায়েফে গিয়ে পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হতেন না। কারণ, রাসূল (সা.) গায়েব জেনে থাকলে তিনি প্রথম থেকেই জানতেন তারা তাঁকে সংবর্ধনা জানাবে। না পাথর নিক্ষেপে রক্তাক্ত করবে।

রাসূল (সা.) যদি গায়েব জানতেন তাহলে তিনি ক্বাবা শরীফের সামনে সিজ্দাহ্রত থাকাবস্থায় তাঁর পিঠে কাফিররা উটের ফুল চাপিয়ে দিতে পারতো না।

রাসূল (সা.) যদি গায়েব জানতেন তাহলে হা’ত্বিব্ বিন্ আবু বাল্তা’আহ্ (রা.) যখন জনৈকা মহিলাকে মক্কার কাফিরদের নিকট এ সংবাদ লিখে পাঠালেন যে, রাসূল (সা.) অচিরেই তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসছেন। অতএব তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য অতিসত্বর প্রস্ত্ততি নিয়ে নাও। তখন রাসূল (সা.) কে ওহীর মারফত তা জেনে অনেক দূর থেকে সে মহিলাকে ধরে আনার জন্য সাহাবাদেরকে পাঠাতে হতোনা। কারণ, তিনি গায়েব জেনে থাকলে প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে জানতেন।

রাসূল (সা.) যদি গায়েব জানতেন তাহলে যখন তাঁর দাসী মারিয়াকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া হলো তখন তিনি হযরত ’আলী (রা.) কে ব্যভিচারী গোলামকে হত্যা করার জন্য বহু দূর পাঠাতেন না। অথচ তার কোন লিঙ্গই ছিলোনা। যাতে ব্যভিচার সংঘটিত হতে পারে।

রাসূল (সা.) যদি গায়েব জানতেন তাহলে যখন মক্কার কাফিররা ’উসমান (রা.) কে হত্যা করে দিয়েছে বলে গুজব ছড়ালো তখন তিনি ঐতিহাসিক ’হুদাইবিয়াহ্ এলাকায় মক্কার কাফিরদের থেকে ’উসমান হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সাহাবাদের থেকে দ্রুত বায়’আত গ্রহণ করতেন না। যা ইতিহাসের ভাষায় ‘‘বায়’আতুর্ রিযওয়ান’’ নামে পরিচিত।

রাসূল (সা.) যদি গায়েব জানতেন তাহলে তাঁকে খায়বারে গিয়ে ইহুদী মহিলার বিষাক্ত ছাগলের গোস্ত খেয়ে দীর্ঘ দিন বিষক্রিয়ায় ভুগতে হতো না।

রাসূল (সা.) যদি গায়েব জানতেন তাহলে মুনাফিকরা যখন ’আয়েশা (রাঃ)-কে ব্যভিচারের অপবাদ দিয়েছিলো তখন তিনি ’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) কে এ ব্যাপারে সন্দেহ করে তাঁর সাথে সম্পূর্ণরূপে কথাবার্তা বন্ধ দিয়ে তাঁকে তাঁর বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন না। ইত্যাদি ইত্যাদি।

রাসূল (সা.) যখন গায়েব জানেন না তখন তিনি ছাড়া অন্য কোন পীর বা বুযুর্গ গায়েব জানেন বলে বিশ্বাস করা সত্যিই বোকামি বৈ কি?

কাশ্ফ ও গায়েবের জ্ঞানের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সূফীদের নিকটে কারোর কাশফ হয় বা কেউ কাশ্ফ ওয়ালা মানে, তার অলক্ষ্যে কিছুই নেই। সকল লুক্কায়িত বা দূরের বস্ত্তও সে খোলা চোখে দেখতে পায়। দুনিয়া-আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম, ’আর্শ-কুরসী, লাওহ্-ক্বলম সব কিছুই সে নির্দ্বিধায় দেখতে পায়। এমনকি মানব অন্তরের লুক্কায়িত কথাও সে জানে।

বরং কাশ্ফের ব্যাপারটি গায়েবের জ্ঞানের চাইতেও আরো মারাত্মক। কারণ, গায়েবের জ্ঞানের সাথে খোলা চোখে দেখার কোন শর্ত নেই। কিন্তু কাশফের মানে, খোলা চোখে দেখা।

অতএব যখন একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া গায়েবের জ্ঞান আর কারোর নেই তখন কাশ্ফও একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই হবে। আর কারোর নয়। যদিও কাশ্ফ শব্দের অস্তিত্ব উক্ত অর্থে কোর’আন ও হাদীসের কোথাও পাওয়া যায় না। বরং তা সূফীদের নব আবিষ্কার।

রাসুল সা. কি গায়েব জানতেন? বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন,

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কোনো নবী বা ওলী মানব অন্তরের কোনো লুক্কায়িত কথা জানতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই মানব অন্তরের লুক্কায়িত কথা জানতে পারেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানতে কখনোই সক্ষম নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘তোমরা তোমাদের কথা যতই গোপনে বলো অথবা প্রকাশ্যে আল্লাহ্ তা’আলা তা সবই শুনেন। এমনকি তিনি অন্তরে লুক্কায়িত বস্ত্তও জানেন। যিনি সকল বস্ত্ত সৃষ্টি করেছেন তিনি কি সকল কিছু জানবেন না? না কি অন্য কেউ জানবেন। তিনিই সূক্ষ্মদর্শী এবং সকল বিষয়ে অবগত’’। (সুরা মুলক : ১৩-১৪)।

আনাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রি’ল, যাক্ওয়ান, ’উসাইয়াহ্ ও বানী লাহ্’ইয়ান নামক চারটি সম্প্রদায় রাসূল (সা.) এর নিকট শত্রুর বিপক্ষে সাহায্য চাইলে রাসূল (সা.) তাদেরকে সত্তর জন আন্সারী দিয়ে সহযোগিতা করলেন। আমরা তাদেরকে সে যুগের ক্বারী সাহেবান বলে ডাকতাম। তারা দিনে লাকড়ি কাটতো আর রাত্রিতে বেশি বেশি নফল নামায পড়তো। যখন তারা মা’ঊনা কূপের নিকট পৌঁছালো তখন তারা উক্ত সাহাবাদেরকে হত্যা করে দিলো। নবী (সা.) এর নিকট সংবাদটি পৌঁছালে তিনি এক মাস যাবৎ ফজরের নামাযে ক্বুনূত পড়ে তাদেরকে বদ্ দো’আ করেন’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪০৯০ মুসলিম, হাদীস ৬৭৭)। হাদিসের মান সহিহ।

যদি রাসূল (সা.) তাদের মনের লুক্কায়িত কথা জানতেন তাহলে প্রথম থেকেই তিনি তাদেরকে সাহাবা দিয়ে সহযোগিতা করতেন না। কারণ, তখন তিনি তাদের মনের শয়তানির কথা অবশ্যই জানতেন।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও কেউ কাউকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিতে পারে এমন মনে করার শির্ক

কাউকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা। অন্য কেউ নয়। তিনি ইচ্ছে করলেই কেউ কোন না কোন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতে পারে। নতুবা নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘হে নবী! আপনি বলুন: হে আল্লাহ্! আপনি হচ্ছেন রাজাধিরাজ। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দেন এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। আপনারই হাতে সকল কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান’’। (সুরা আ’লি-ইমরান : ২৬)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই যে কারোর অন্তরে যে কোন ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অন্য কেউ নয়।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর হুকুম পালন করো যখন তিনি তোমাদেরকে কোন বিধানের প্রতি আহবান করেন যা তোমাদের মধ্যে সত্যিকারের নব জীবন সঞ্চার করবে। জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকেন (অর্থাৎ তাঁর হাতেই মানুষের অন্তর। তাঁর যাই ইচ্ছা তাই করেন) এবং পরিশেষে তাঁর কাছেই সবাইকে সমবেত হতে হবে’’। (সুরা আন্ফাল : ২৪)।

শাহ্র বিন্ ’হাউশাব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘আমি উম্মে সালামাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) কে বললাম: হে উম্মুল মু’মিনীন! আপনার নিকট থাকাবস্থায় রাসূল (সা.) অধিকাংশ সময় কি দো’আ করতেন? তিনি বললেন: অধিকাংশ সময় রাসূল (সা.) বলতেন: হে অন্তর নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনি ইসলামের উপর অটল অবিচল রাখুন। উম্মে সালামাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন: আমি বললাম: হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনাকে দেখছি আপনি অধিকাংশ সময় উপরোক্ত দো’আ করেন। মূলতঃ এর রহস্য কি? রাসূল (সা.) বললেন: হে উম্মে সালামাহ্! প্রতিটি মানুষের অন্তর আল্লাহ্ তা’আলার দু’টি আঙ্গুলের মধ্যে অবস্থিত। ইচ্ছে করলে তিনি কারোর অন্তর সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আর ইচ্ছে করলে তিনি কারোর অন্তর বক্র পথে পরিচালিত করেন। বর্ণনাকারী মু’আয বলেন: এ জন্যই আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে সর্বদা তাঁর নিকট নিম্নোক্ত দো’আ করতে আদেশ করেন যার অর্থ: (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ৩৫২২)।

"রব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা‘দা ইয হাদাইতানা, ওয়া হাব লানা মিল্লাদুঙ্কা রাহমাহ; ইন্নাকা আন্তাল ওয়াহহাব।" (সূরা আল-ইমরানের ৮)।

অর্থঃ “হে আমার প্রভু! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন। অতএব আমাদের অন্তরকে আর বক্র পথে পরিচালিত করবেন না”।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছা ছাড়াও অন্য কারোর ইচ্ছা স্বকীয়ভাবে প্রতিফলিত হতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছাই স্বকীয়ভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। অন্য কারোর ইচ্ছা নয়। সে যে পর্যায়েরই হোক না কেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি শুধু এতটুকুই বলেন: হয়ে যাও, তখন তা হয়ে যায়’’। (সুরা ইয়াসীন : ৮২)।

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘জনৈক ব্যক্তি নবী (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন: আল্লাহ্ তা’আলা এবং আপনি চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। তখন নবী (সা.) বললেন: তুমি কি আমাকে আল্লাহ্ তা’আলার শরীক বানাচ্ছো? এমন কথা কখনো বলবে না। বরং বলবে: একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না’’। (আহমাদ : ১/২১৪, ২২৪, ২৮৩, ৩৪৭ বুখারী/আদাবুল্ মুফরাদ্, হাদীস ৭৮৩ নাসায়ী/আমালুল্ ইয়াওমি ওয়াল্লাইলাহ্, হাদীস ৯৮৮ বায়হাক্বী : ৩/২১৭ ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ১৩০০৫, ১৩০০৬ আবু নু’আইম/হিল্ইয়াহ্ : ৪/৯৯)।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই যাকে চান তাকে সন্তান-সন্ততি দিয়ে থাকেন। তিনি ভিন্ন অন্য কেউ কাউকে ইচ্ছে করলেই সন্তান-সন্ততি দিতে পারে না। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই। তিনি যা চান তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান। আর যাকে ইচ্ছা পুত্র ও কন্যা উভয়টাই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে রাখেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান’’। (সুরা শূরা : ৪৯-৫০)।

ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘’উসমান (রা.) এর স্ত্রী এবং রাসূল (সা.) এর মেয়ে রুক্বাইয়াহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) যখন ইন্তিকাল করেন তখন রাসূল (সা.) তাঁর আর এক মেয়ে উম্মে কুল্সুম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) কে ’উসমান (রা.) এর নিকট বিবাহ দেন। অতঃপর উম্মে কুলসুম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ও ইন্তিকাল করেন। তবে তাঁর কোন সন্তান হয়নি। এরপর নবী (সা.) ’উসমান (রা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন: যদি আমার দশটি মেয়েও থাকতো এবং পর পর সবাই ইন্তিকাল করতো তাহলেও আমি একটির পর আর একটি মেয়ে তোমার নিকট বিবাহ দিতাম। (ত্বাবারানী, হাদীস ১০৬১, ১০৬২)।

উম্মে কুল্সুম (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এর কোন সন্তান হয়নি এমতাবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। যদি আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া কেউ কাউকে সন্তান দিতে পারতো তা হলে নবী (সা.) অবশ্যই তাঁর মেয়েকে সন্তান দিতেন। কারণ, তিনি ’উসমান (রা.) কে খুব বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর ভালোবাসার চিহ্ন এটাও যে তিনি তার আনন্দ দেখবেন। আর এ কথা সবারই জানা যে, যে কোন ব্যক্তি (সে পাগলই হোক না কেন) তার ঘরে নব সন্তান আসলে সে অত্যধিক খুশি হয়। উপরন্তু নবীর মেয়ের ঘরের সন্তান।

অপর দিকে নবী (সা.) ’উসমান (রা.) কে বেশি ভালোবাসার দরুন তাকে উদ্দেশ্য করে আপসোস করে এ কথা বললেন যে, যদি আমার দশটি মেয়েও থাকতো এবং পর পর সবাই ইন্তিকাল করতো তা হলেও আমি একটির পর আর একটি মেয়ে তোমার নিকট বিবাহ দিতাম। এ কথা এটাই প্রমাণ করে যে, সন্তান দেয়া আল্লাহ্ তা’আলার হাতে। তাঁর হাতে এর কিছুই নেই। নতুবা তিনি আরো কয়েকটি মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে পর পর ’উসমান (রা.) এর নিকট বিবাহ দিতেন।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও কেউ কাউকে সুস্থতা দিতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই কাউকে সুস্থতা দিতে পারেন। অন্য কেউ নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

‘‘তিনিই (আল্লাহ্ তা’আলা) আমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতএব তিনিই আমাকে সঠিক পথ দেখাবেন। তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান এবং আমি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন। তিনিই আমাকে মৃত্যু দিবেন এবং পুনরুজ্জীবিত করবেন। আশা করি তিনিই কিয়ামতের দিন আমার অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। (সুরা শু’আরা’ : ৭৮-৮২)।

’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) তাঁর স্ত্রীদের কেউ অসুস্থ হলে ব্যথার জায়গায় ডান হাত রেখে নিম্নোক্ত দো’আ পড়তেন।

‘‘হে মানব প্রভু! রোগটি দূর করুন এবং পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। যার পর আর কোন রোগ থাকবেনা। কারণ, আপনিই সুস্থতা দানকারী এবং সুস্থতা একমাত্র আপনিই দিয়ে থাকেন’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৫৬৭৫, ৫৭৪২, ৫৭৪৩, ৫৭৪৪, ৫৭৫০ মুসলিম, হাদীস ২১৯১)। হাদিসের মান সহিহ।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার তাওফীক ছাড়াও কেউ ইচ্ছে করলেই কোন ভালো কাজ করতে বা কোন খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই ইচ্ছে করলে কাউকে কোন ভালো কাজ করার অথবা কোন খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিয়ে থাকেন। তিনি ভিন্ন অন্য কেউ ইচ্ছে করলেই তা করতে পারে না।

আল্লাহ্ তা’আলা শু’আইব (আ.) সম্পর্কে বলেন:

‘‘আমি শুধু তোমাদেরকে সংশোধন করতে চাই যত টুকু আমার সাধ্য। আমি যা করেছি অথবা সামনে যা করবো তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে তাওফীক বা সুযোগ দিয়েছেন বলেই হয়েছে বা হবে। তাঁর উপরই আমার সার্বিক নির্ভরতা এবং তাঁর নিকটই আমাকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে’’। (সুরা হূদ্ : ৮৮)।

মু’আয (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) আমার হাত ধরে বললেন:

‘‘হে মু’আয! আল্লাহ্’র কসম! আমি তোমাকে নিশ্চয়ই ভালোবাসি। আল্লাহ্’র কসম! আমি তোমাকে নিশ্চয়ই ভালোবাসি। হে মু’আয! আমি তোমাকে ওয়াসীয়ত করছি যে, তুমি প্রতি বেলা নামায শেষে নিম্নোক্ত দো’আ করতে ভুলবে না। যার অর্থ: হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে আপনার যিকির, শুকর ও উত্তম ইবাদাত করার তাওফীক দান করুন। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ১৫২২)। হাদিসের মান সহিহ।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছা ছাড়াও কেউ নিজ ইচ্ছায় কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ইচ্ছা করলেই কেউ কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে। নতুবা নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আপনি ওদেরকে বলে দিন: আল্লাহ্ তা’আলা যদি তোমাদের কারোর কোন ক্ষতি অথবা লাভ করতে চান তাহলে কেউ কি তাঁকে উক্ত ইচ্ছা থেকে বিরত রাখতে পারবে? বস্ত্ততঃ আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের কর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত’’। (সুরা ফাত্হ : ১১)।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূল (সা.) আমাকে কিছু মূল্যবান বাণী শুনিয়েছেন যার কিয়দাংশ নিম্নরূপ:

‘‘কিছু চাইলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই চাবে। কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার নিকটই কামনা করবে। জেনে রেখো, পুরো বিশ্ববাসী একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন কল্যাণ করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই কল্যাণ করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। আর তারা সকল একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। তাক্বদীর লেখার কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তাক্বদীর লেখা বালাম শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ লেখা শেষ। আর নতুন করে লেখা হবে না’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২৫১৬)। হাদিসের মান সহিহ।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও কেউ কাউকে জীবন বা মৃত্যু দিতে পারে এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই ইচ্ছে করলে কাউকে জীবন বা মৃত্যু দিতে পারে। অন্য কেউ নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। যখন তিনি কিছু করতে চান তখন তিনি বলেন: হয়ে যাও, তখন তা হয়ে যায়’’। (সুরা মু’মিন : ৬৮)।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘আমরা ‘‘যাতুর রিক্বা’’’ যুদ্ধে নবী (সা.) এর সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে যখন আমরা একটি ছায়া বিশিষ্ট গাছের নিকট পৌঁছুলাম তখন আমরা তা নবী (সা.) এর জন্য ছেড়ে দিলাম। যাতে তিনি উহার নীচে বিশ্রাম নিতে পারেন। নবী (সা.) বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এমতাবস্থায় জনৈক মুশরিক নবী (সা.) এর নিকট আসলো এবং গাছে ঝুলন্ত তাঁর তলোয়ার খানি খাপ থেকে বের করে তাঁকে বললো: তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছো না? নবী (সা.) বললেন: না। মুশরিকটি বললো: তাহলে এখন আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? নবী (সা.) বললেন: আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে বাঁচাবেন এবং রাসূল (সা.) তাকে একটুও শাস্তি দেননি। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪১৩৫, ৪১৩৬, ৪১৩৯ মুসলিম, হাদীস ৮৪৩)। হাদিসের মান সহিহ।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও অন্য কোনো নবী-ওলী অথবা অন্য কোন গাউস-ক্বুতুব সর্বদা জীবিত রয়েছেন এমন মনে করার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ চিরঞ্জীব নয়। চাই সে যে কেউই হোক না কেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘ভূ পৃষ্ঠে যা কিছুই রয়েছে তা সবই নশ্বর। যা একদা ধ্বংস হয়ে যাবে। শুধু থাকবে আপনার প্রতিপালক। যিনি মহিমাময় মহানুভব’’। (সুরা রহমান : ২৬-২৭)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘সকল জীবকে একদা মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। কেউই সর্বদা বেঁচে থাকবে না’’। (সুরা আ’লি ’ইম্রান : ১৮৫)।

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) ও এ মৃত্যু থেকে রেহাই পাননি। তিনিও একদা মৃত্যু বরণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল এবং নিশ্চয়ই তারাও মরণশীল। কেউই এ দুনিয়াতে চিরদিন থাকবে না’’। (সুরা যুমার : ৩০)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘আমি আপনার পূর্বের কাউকেই (কোন মানুষকেই) অনন্ত জীবন দেইনি। সুতরাং আপনি যদি মৃত্যু বরণ করেন তাহলে তারাকি চির জীবন এ দুনিয়াতে থাকতে পারবে বলে আশা করে? সবাইকেই একদা মরতে হবে। কেউই চিরঞ্জীব নয়’’। (সুরা আম্বিয়া : ৩৪)।

তিনি আরো বলেন:

‘‘মুহাম্মাদ (সা.) একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার রাসূল। এ ছাড়া তিনি অন্য কিছু নন। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। সুতরাং তিনি যদি মৃত্যু বরণ করেন অথবা তাঁকে হত্যা করা হয় তাহলে তোমরা কি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে তথা কাফির হয়ে যাবে? জেনে রাখো, তোমাদের কেউ কাফির হয়ে গেলে সে আল্লাহ্ তা’আলার এতটুকুও ক্ষতি করতে পারবে না। অচিরেই আল্লাহ্ তা’আলা কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন’’। (সুরা আ’লি ’ইমরান : ১৪৪)।

’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) মৃত্যু বরণ করেছেন। অথচ আবু বকর (রা.) সেখানে উপস্থিত নেই। তিনি ছিলেন ‘‘সুনহ’’ নামক এলাকায়। ইতিমধ্যে ’উমর (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন: আল্লাহ্ তা’আলার কসম! রাসূল (সা.) মৃত্যু বরণ করেননি। ’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) বলেন: ’উমর (রা.) বলেছেন: আল্লাহ্ তা’আলার কসম! তখন আমার এতটুকুই বুঝে আসছিলো। আমি ধারণা করতাম, তিনি ঘুমিয়ে আছেন এবং অবশ্যই তিনি ঘুম থেকে উঠে সবার হাত-পা কেটে দিবেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা.) এসে রাসূল (সা.) এর চেহারা উন্মোচন করে তাতে একটি চুমো দিলেন এবং বললেন: আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোক! আপনি জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায়ই পূত-পবিত্র। সে সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! আপনাকে আল্লাহ্ তা’আলা দু’ বার মৃত্যু দিবেন না। শুধু সে মৃত্যুই আপনি বরণ করেছেন যা আপনার জন্য বরাদ্দ ছিলো। অতঃপর আবু বকর (রা.) রাসূল (সা.) এর নিকট থেকে বের হয়ে বললেন: হে কসমকারী! তুমি একটু শান্ত হও। আবু বকর (রা.) যখন কথা শুরু করলেন তখন ’উমর (রা.) বসে গেলেন। আবু বকর (রা.) আল্লাহ্ তা’আলার প্রশংসা করে বললেন: তোমরা জেনে রাখো, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সা.) এর ইবাদাত করতো তার জানা উচিৎ তিনি আর এখন জীবিত নেই। মৃত্যু বরণ করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাত করতো তার কোন অসুবিধে নেই। তিনি নিশ্চয়ই জীবিত। তিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না। অতঃপর আবু বকর (রা.) যুমার ও আ’লু ’ইম্রানের উপরোক্ত আয়াতদ্বয় তিলাওয়াত করেন। আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) বলেন: আল্লাহ্ তা’আলার কসম! পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিলো যে, কেউ বুঝতে পারেনি আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত আয়াত ইতিপূর্বে নাযিল করেছেন। অতএব আবু বকর (রা.) তা তিলাওয়াত করার পরপরই সবাই তা গ্রহণ করে নেয় এবং তিলাওয়াত করতে শুরু করে’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ১২৪১, ১২৪২, ৩৬৬৭, ৩৬৬৮, ৪৪৫২, ৪৪৫৩, ৪৪৫৪)। হাদিসের মান সহিহ।

সুতা বা রিং পরার শির্ক

সুতা বা রিং পরার শির্ক বলতে কোন বালা-মুসীবত দূরীকরণ বা প্রতিরোধের জন্য দম করে গেরো দেয়া সুতা বা রিং পরিধান করাকে বুঝানো হয়।

এটি ছোট শির্ক হিসেবে গণ্য করা হবে ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবহারকারী এ রূপ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্ তা’আলা এর মাধ্যমেই আমার আসন্ন বালা-মুসীবত দূরীভূত করবেন। এটি এককভাবে আমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারেনা। আর যখন এ বিশ্বাস করা হয় যে, এটি এককভাবেই আমার বিপদাপদ দূরীকরণে সক্ষম তখন তা বড় শির্কে রূপান্তরিত হবে।

আমাদের জানার বিষয় এইযে, কোন বস্ত্ত তা যাই হোকনা কেন তা কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারেনা।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আপনি ওদেরকে বলুন: তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো যে, আল্লাহ্ তা’আলা আমার কোন অনিষ্ট করতে চাইলে তোমরা আল্লাহ্ তা’আলার পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা কি সেই অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা আল্লাহ্ তা’আলা আমার প্রতি কোন অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? আপনি বলুন: আমার জন্য আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট। নির্ভরকারীদের তাঁর উপরেই নির্ভর করতে হবে’’। (সুরা যুমার : ৩৮)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

‘‘আল্লাহ্ তা’আলা মানুষের প্রতি কোন অনুগ্রহ অবারিত করলে কেউ তা নিবারণ করতে পারেনা। আর তিনি কিছু নিবারণ করলে তিনি ছাড়া আর কেউ তা পুনরায় অবারিত করতে পারে না। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়’’। (সুরা ফাতির : ২)।

আসন্ন বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কেউ নিজের শরীরের সাথে কোন জিনিস ঝুলিয়ে রাখলে তা তাকে কোনভাবেই বিপদাপদ থেকে রক্ষা করতে পারেনা। বরং আল্লাহ্ তা’আলা তখন তাকে ওজিনিসের প্রতি সোপর্দ করে দেন। এতে করে তখন যা হবার তাই হয়ে যায়।

আবু মা’বাদ জুহানী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘কেউ কোন বস্ত্ত কোন উদ্দেশ্যে শরীর বা অন্য কোথাও ঝুলিয়ে রাখলে আল্লাহ্ তা’আলা ওকে উহার প্রতিই সোপর্দ করেন তথা তার উদ্দেশ্য পূর্ণ করা হয় না বরং যা হবার তাই হয়ে যায়’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২০৭২)। হাদিসের মান সহিহ।

রুওয়াইফি’ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) আমাকে ডেকে বললেন:

‘‘হে রুওয়াইফি’! হয়তো তুমি বেশি দিন বাঁচবে। তাই তুমি সকলকে এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দিবে যে, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি (নামাযরত অবস্থায়) দাড়ি পেঁচায়, গলায় তার ঝুলায় অথবা পশুর মল বা হাড্ডি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করে মুহাম্মাদ (সা.) সে ব্যক্তি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত’’। (আহমাদ : ৪/১০৮)।

শুধু মানুষের শরীরেই কোন কিছু ঝুলানো নিষেধ যে তা সঠিক নয়। বরং আসন্ন বালা-মুসীবত বা কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উট, ঘোড়া, গরু, ছাগল ইত্যাদির গলায়ও তার বা এ জাতীয় কোন কিছু ঝুলানো নিষেধ।

আবু বাশীর আন্সারী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি কোন এক সফরে রাসূল (সা.) এর সফরসঙ্গী ছিলাম। তখন সবাই ঘুমে বিভোর। এমতাবস্থায় রাসূল (সা.) এ মর্মে জনৈক প্রতিনিধি পাঠান যে,

‘‘কোন উটের গলায় তার বা অন্য কিছু ঝুলানো থাকলে তা যেন কেটে ফেলা হয়’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৩০০৫ মুসলিম, হাদীস ২১১৫ আবু দাউদ, হাদীস ২৫৫২)। হাদিসের মান সহিহ।

তবে শুধু বেঁধে রাখার উদ্দেশ্যে কোন পশুর গলায় কোন জিনিস লাগিয়ে রাখা নিষেধ নয়। বরং তা প্রয়োজনে করতে হয়। যাতে পশুটি পালিয়ে না যায়।

আবু ওহাব জুশামী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তোমরা ঘোড়া বেঁধে রাখো এবং ওর কপাল বা পাছায় হাত বুলিয়ে দাও। প্রয়োজনে ওর গলায় কিছু বেঁধে দিতে পারো। কিন্তু আসন্ন বালা-মুসীবত বা কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তার বা অন্য কিছু ঝুলিয়ে দিওনা’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ২৫৫৩)।

ঝাঁড় ফুঁকের শির্ক

ঝাঁড় ফুঁকের শির্ক বলতে এমন মন্ত্র পড়ে ঝাঁড় ফুঁক করাকে বুঝানো হয় যে মন্ত্রের মধ্যে শির্ক রয়েছে।

যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমার স্বামী ’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ (রা.) একদা আমার গলায় একটি সুতো দেখে বললেন: এটি কি? আমি বললাম: এটি মন্ত্র পড়া সুতো। এ কথা শুনা মাত্রই তিনি তা খুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। অতঃপর বললেন: নিশ্চয়ই আব্দুল্লাহ্’র পরিবার শির্কের কাঙ্গাল নয়। বরং ওরা যে কোন ধরনের শির্ক হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। তিনি আরো বললেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘নিশ্চয়ই ঝাঁড় ফুঁক, তাবিজ কবচ ও ভালোবাসা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার্য বস্ত্ত শির্ক। যায়নাব বললেন: আমি বললাম: আপনি এরূপ কেন বলছেন? আল্লাহ্’র কসম! আমার চোখ উঠলে ওমুক ইহুদীর নিকট যেতাম। অতঃপর সে মন্ত্র পড়ে দিলে তা ভালো হয়ে যেতো। তখন ’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ (রা.) বলেন: এটি শয়তানের কাজ। সেই নিজ হাতে তোমার চোখে খোঁচা মারতো। অতঃপর যখন মন্ত্র পড়ে দেয়া হতো তখন সে তা বন্ধ রাখতো। তোমার এতটুকু বলাই যথেষ্ট ছিলো যা রাসূল (সা.) বলতেন। তিনি বলতেন: হে মানুষের প্রভু! আপনি আমার রোগ নিরাময় করুন। আপনি আমাকে সুস্থ করুন। কারণ, আপনিই একমাত্র সুস্থতা দানকারী। আপনার নিরাময়ই সত্যিকার নিরাময়। যার পর আর কোন রোগ থাকে না’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৩ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩৫৯৬)। হাদিসের মান সহিহ।

সকল মন্ত্রই শির্ক নয়। বরং সেই মন্ত্রই শির্ক যাতে শির্কের সংমিশ্রণ রয়েছে। যাতে ফিরিশ্তা, জিন ও নবীদের আশ্রয় বা সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। তাদের নিকট ফরিয়াদ কামনা করা হয়েছে বা তাদেরকে ডাকা হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব আল্লাহ্ তা’আলার নাযিল করা কিতাব, তাঁর নাম ও বিশেষণ দিয়ে ঝাঁড় ফুঁক করা জায়িয।

’আউফ বিন্ মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমরা জাহিলী যুগে অনেকগুলো মন্ত্র পড়তাম। তাই আমরা রাসূল (সা.) কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:

‘‘তোমরা তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার সামনে উপস্থিত করো। কারণ, শির্কের মিশ্রণ না থাকলে যে কোন মন্ত্র পড়তে কোন অসুবিধে নেই’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২২০০ আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৬)।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: ‘‘রাসূল সা. কুদৃষ্টি তথা বদনযর, বিচ্ছু বা সর্পবিষ ইত্যাদি এবং পিপড়ার মন্ত্র পড়ার অনুমতি দেন’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৬ তিরমিযী, হাদীস ২০৫৬ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩৫৮১)। হাদিসের মান সহিহ।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সা. মন্ত্র পড়া নিষেধ করে দিলে ’আমর বিন্ ’হায্মের গোত্ররা তাঁর নিকট এসে বললো: হে আল্লাহ্’র রাসূল! আমরা একটি মন্ত্র পড়ে বিচ্ছুর বিষ নামাতাম। অথচ আপনি মন্ত্র পড়তে নিষেধ করে দিয়েছেন। অতঃপর তারা রাসূল (সা.) কে মন্ত্রটি শুনালে তিনি বললেন:

‘‘এতে কোন অসুবিধে নেই। তোমাদের কেউ নিজ ভাইয়ের উপকার করতে পারলে সে তা অবশ্যই করবে’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২১৯৯)। হাদিসের মান সহিহ।

শুধু কোন মন্ত্রের ফায়দা প্রমাণিত হলেই তা পড়া জায়িয হয়ে যায়না। বরং তা শরীয়তের কষ্টি পাথরে যাচাই করে নিতে হয়। দেখে নিতে হয় তাতে শির্কের কোন মিশ্রণ আছে কি না?

ইবনুত্ তীন (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন:

‘‘সাপ স্বভাবগতভাবে মানুষের শত্রু হওয়ার দরুন তার সাথে মানুষের আরেকটি শত্রু শয়তানের ভালো সখিত্ব রয়েছে। এতদ্কারণেই সাপের উপর শয়তানের নাম পড়ে দম করা হলে সে তা মান্য করে নিজ স্থান ত্যাগ করে। তেমনিভাবে সাপের ছোবলে আক্রান্ত ব্যক্তিকেও শয়তানের নামে ঝাঁড় ফুঁক করা হলে মানুষের শরীর হতে বিষ নেমে যায়’’।

মোটকথা, চার শর্তে ঝাঁড় ফুঁক করা জায়িয। যা নিম্নরূপ:

(১) তা আল্লাহ্ তা’আলার নাম বা গুণাবলীর মাধ্যমে হতে হবে।

(২) নিজস্ব ভাষায় হতে হবে। যাতে করে তা সহজেই বোধগম্য হয় এবং তাতে শির্কের মিশ্রণ আছে কিনা তা বুঝা যায়।

(৩) যাদুমন্ত্র ব্যতিরেকে এবং শরীয়ত সমর্থিত জায়িয পন্থায় হতে হবে। কারণ, যে কোন উদ্দেশ্যে যাদুর ব্যবহার শরীয়তের দৃষ্টিতে কুফরীর শামিল।

(৪) এ বিশ্বাস বদ্ধমূল থাকতে হবে যে, আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছে ছাড়া মন্ত্র (তা যাই হোক না কেন) কোনো কাজই করতে পারবেনা। আর এর বিপরীত বিশ্বাস হলে তা বড় শির্কে রূপান্তরিত হবে।

তা’বীয-কবচের শির্ক

তা’বীয-কবচের শির্ক বলতে বালা-মুসীবত, কুদৃষ্টি ইত্যাদি দূরীকরণ অথবা প্রতিরোধের জন্য দানা গোটা, কড়ি কঙ্কর, কাষ্ঠ খন্ড, খড়কুটো, কাগজ, ধাতব ইত্যাদি শরীরের যে কোনো অঙ্গে ঝুলানোকে বুঝানো হয়।

শরীয়তের দৃষ্টিতে রোগ নিরাময়ের জন্য দু’টি জায়িয মাধ্যম অবলম্বন করা যেতে পারে। যা নিম্নরূপ:

(ক) শরীয়ত সমর্থিত মাধ্যম। যা দো’আ ও জায়িয ঝাঁড় ফুঁকের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। যা ক্রিয়াশীল হওয়া কোর’আন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত। এ মাধ্যমটি গ্রহণ করা আল্লাহ্ তা’আলার উপর নির্ভরশীল হওয়াই প্রমাণ করে। কারণ, তিনি নিজেই বান্দাহ্কে এ মাধ্যম গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন।

(খ) প্রকৃতিগত মাধ্যম। যা মাধ্যম হওয়া মানুষের বোধ ও বিবেক প্রমাণ করে। যেমন: পানি পিপাসা নিবারণের মাধ্যম। পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে তৈরিকৃত ওষুধ নির্ধারিত রোগ নিরাময়ের মাধ্যম।

তাবিজ কবচ উক্ত মাধ্যম দু’টোর কোনটিরই অধীন নয়। না শরীয়ত উহাকে সমর্থন করে, না প্রকৃতিগতভাবে উহা কোন ব্যাপারে ক্রিয়াশীল। অতএব তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘যদি আল্ল¬াহ্ তা’আলা তোমাকে কোন ক্ষতির সম্মুখীন করেন তাহলে তিনিই একমাত্র তোমাকে তা থেকে উদ্ধার করতে পারেন। আর যদি তিনি তোমার কোন কল্যাণ করতে চান তাহলে তাঁর অনুগ্রহের গতিরোধ করার সাধ্য কারোর নেই। তিনি নিজ বান্দাহদের মধ্য থেকে যাকে চান অনুগ্রহ করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও অতিশয় দয়ালু’’। (সুরা ইউনুস : ১০৭)।

তিনি আরো বলেন: ‘‘একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপরই ভরসা করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো’’। (সুরা মায়িদাহ্ : ২৩)।

আবু মা’বাদ জুহানী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘কেউ কোন বস্ত্ত কোন মাকসুদে শরীর বা অন্য কোথাও ঝুলিয়ে রাখলে আল্লাহ্ তা’আলা তাকে উহার প্রতিই সোপর্দ করেন তথা তার মাকসুদটি পূর্ণ করা হয়না বরং যা হবার তাই হয়ে যায়’’। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২০৭২)। হাদিসের মান সহিহ।

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘নিশ্চয়ই ঝাঁড় ফুঁক, তাবিজ কবচ ও ভালোবাসা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার্য যে কোন বস্ত্ত শির্ক’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৩, সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩৫৯৬)। হাদিসের মান সহিহ।

’উক্ববা বিন্ ’আমির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) এর নিকট দশ জন ব্যক্তি আসলে তিনি তম্মধ্যে নয় জনকেই বায়’আত করান। তবে এক জনকে বায়’আত করাননি। সাহাবারা বললেন: হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনি নয় জনকেই বায়’আত করিয়েছেন। তবে একে করাননি কেন? তিনি বললেন: তার হাতে তাবিজ আছে। অতঃপর লোকটি তাবিজটি ছিঁড়ে ফেললে রাসূল (সা.) তাকে বায়’আত করিয়ে বললেন: যে তাবিজ কবচ ঝুলালো সে শির্ক করলো’’। (আহমাদ : ৪/১৫৬)।

সাঈদ বিন্ জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘যে ব্যক্তি কারোর তাবিজ কবচ কেটে ফেললো তার আমলনামায় একটি গোলাম আযাদের সাওয়াব লেখা হবে’’।

বিশেষভাবে জানতে হয় যে, আল্লাহ্ তা’আলার নাম ও গুণাবলী এবং কোর’আন মাজীদের আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদীস দিয়ে তাবিজ কবচ করার ব্যাপারে সাহাবাদের মধ্যে মতানৈক্য ছিলো।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আমর বিন্ ’আস্ (রা.) ও ’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এ জাতীয় তাবিজ কবচ জায়িয হওয়ার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন। আবু জা’ফর মুহাম্মাদ্ আল্ বাক্বির ও ইমাম আহমাদ (এক বর্ণনায়) এবং ইমাম ইবনুল্ কাইয়িম (রাহিমাহুমুল্লাহ্) ও এ মতের সমর্থন করেন।

অন্য দিকে ’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ্, ’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস, হুযাইফা, ’উক্ববা বিন্ ’আমির, ’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উক্বাইম এবং ’আলক্বামা, ইব্রাহীম বিন্ ইয়াযীদ্ নাখা’য়ী, আস্ওয়াদ্, আবু ওয়া’ইল্, ’হারিস্ বিন্ সুওয়াইদ্, ’উবাইদাহ্ সাল্মানী, মাসরূক্ব, রাবী’ বিন্ খাইসাম্, সুওয়াইদ্ বিন্ গাফলা (রাহিমাহুমুল্লাহ্) সহ আরো অন্যান্য বহু সাহাবী ও তাবিয়ীন তাবিজ ও কবচ না জায়িয বা শির্ক হওয়ার ব্যাপারে মত ব্যক্ত করেন। ইমাম আহমাদও (এক বর্ণনায়) এ মত গ্রহণ করেন। চাই তা কোর’আন ও হাদীস এবং আল্লাহ্ তা’আলার নাম ও গুণাবলী দিয়ে হোক অথবা চাই তা অন্য কিছু দিয়ে হোক। কারণ, হাদীসের মধ্যে তাবিজ ও কবচ শির্ক হওয়ার ব্যাপারটি ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাতে কোন পার্থক্য করা হয়নি এবং এ ব্যাপকতা হাদীস বর্ণনাকারীরাও বুঝেছেন। শুধু আমরাই নয়।

অন্য দিকে তাবিজ ও কবচ জায়িয হওয়ার ব্যাপারটিকে ঝাঁড় ফুঁকের সাথে তুলনা করা যায়না। কারণ, ঝাঁড় ফুঁকের মধ্যে কাগজ, চামড়া ইত্যাদির প্রয়োজন হয়না যেমনিভাবে তা প্রয়োজন হয় তাবিজ ও কবচের মধ্যে। বরং তাবিজ ও কবচ না জায়িয হওয়ার ব্যাপারকে শির্ক মিশ্রিত ঝাঁড় ফুঁকের সাথে সহজেই তুলনা করা যেতে পারে।

যখন অধিকাংশ সাহাবা ও তাবিয়ীন সে স্বর্ণ যুগে কোর’আন ও হাদীস কর্তৃক তাবিজ ও কবচ দেয়া না জায়িয বা অপছন্দ করেছেন তা হলে এ ফিতনার যুগে যে যুগে তাবিজ ও কবচ দেয়া বিনা পুঁজিতে লাভজনক একটি ভিন্ন পেশা হিসেবে রূপ নিয়েছে কিভাবে তা জায়িয হতে পারে? কারণ, এ যুগে তাবিজ ও কবচ দিয়ে সকল ধরনের হারাম কাজ করা হয় এবং এ যুগের তাবিজদাতারা এর সাথে অনেক শির্ক ও কুফরের সংমিশ্রণ করে থাকে। তারা মানুষকে সরাসরি আল্লাহ্ তা’আলার উপর নির্ভরশীল না করে নিজের তাবিজ ও কবচের উপর নির্ভরশীল করে। এমনকি অনেক তাবিজদাতা এমনও রয়েছে যে, কেউ তার নিকট এসে কোন সামান্য সমস্যা তুলে ধরলে সে নিজ থেকে আরো কিছু বাড়িয়ে তা আরো ফলাও করে বর্ণনা করতে থাকে। যাতে খদ্দেরটি কোনভাবেই হাতছাড়া না হয়ে যায়। তাতে করে মানুষ আল্লাহ্ভক্ত না হয়ে তাবিজ বা তাবিজদাতার কঠিন ভক্ত হয়ে যায়।

মোটকথা, কোর’আন ও হাদীস কর্তৃক তাবিজ কবচ দেয়া বহু হারাম কাজ ও বহু শির্কের গুরুত্বপূর্ণ বাহন। যা প্রতিহত করা দল মত নির্বিশেষে সকল মুসলমানেরই কর্তব্য। এরই পাশাপাশি তাবিজ ও কবচ ব্যবহারে কোর’আন ও হাদীসের প্রচুর অপমান ও অসম্মান হয় যা বিস্তারিতভাবে বলার এতটুকুও অপেক্ষা রাখে না।

যে কোন মসজিদে নামায ও ইবাদাতের মাধ্যমে বরকত গ্রহণ

যে কোন মসজিদে বিশেষভাবে তিনটি মসজিদে নামায ও অন্যান্য ইবাদাতের মাধ্যমে বরকত কামনা করা শরীয়ত সম্মত। সে তিনটি মসজিদ হলো: মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে ’আকসা।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আমার মসজিদে এক ওয়াক্ত নামায পড়া অন্য মসজিদে হাজার ওয়াক্ত নামাযের চাইতেও উত্তম। তবে শুধু মসজিদে হারাম। তাতে নামায পড়ার সাওয়াব আরো অনেক বেশি’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ১১৯০, সহিহ মুসলিম, হাদীস ১৩৯৪, সহিহ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ১৪২৪, ১৪২৬)। হাদিসের মান সহিহ।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আমার মসজিদে এক ওয়াক্ত নামায পড়া অন্য মসজিদে হাজার ওয়াক্ত নামাযের চাইতেও উত্তম। তবে শুধু মসজিদে হারাম। কারণ, তাতে এক ওয়াক্ত নামায পড়া অন্য মসজিদে লক্ষ ওয়াক্ত নামাযের চাইতেও উত্তম’’। (সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ১৪২৭, আহমাদ : ৩/৩৪৩, ৩৯৭)। হাদিসের মান সহিহ।

আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘আমার মসজিদে এক ওয়াক্ত নামায পড়া বাইতুল মাক্বদিসে চার ওয়াক্ত নামাযের চাইতেও উত্তম। ভাগ্যবান সে মুসল্লী যে বাইতুল মাক্বদিসে নামায পড়েছে। অতি সন্নিকটে সে দিন যে দিন কারোর নিকট তার ঘোড়ার রশি পরিমাণ জায়গা থাকাও অধিক পছন্দনীয় হবে দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুর চাইতে। যে জায়গা থেকে সে বাইতুল মাক্বদিস দেখতে পাবে’’। (হাকিম্ : ৪/৫০৯ ইবনু ’আসাকির্ : ১/১৬৩-১৬৪ ত্বাহাবী/মুশকিলুল্ আসার্ : ১/২৪৮)।

তবে এ সকল মসজিদে নামায বা যে কোন ইবাদাতে বরকত রয়েছে বলে এ মসজিদগুলোর দেয়াল, পিলার, দরোজা, চৌকাঠ ইত্যাদিতে এমন কোন বরকত নেই যা সেগুলো স্পর্শ করার মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে। কারণ, এ ব্যাপারে শরীয়তের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বরকতের নিয়্যাতে কোন ঐতিহাসিক জায়গা ভ্রমণ বা কোন বস্ত্ত স্পর্শ করণ

যেমন: বরকতের নিয়্যাতে আরক্বাম্ বিন্ আরক্বাম্ সাহাবীর ঘর, হেরা ও সাউর গিরিগুহা যিয়ারাত এবং কোন কোন মসজিদ বা মাযারের দেয়াল, জানালা, চৌকাঠ বা দরোজা স্পর্শ বা চুমু দেয়া ইত্যাদি। এ সব বিদ্’আত, শির্ক ও না জায়িয কাজ। কারণ, বরকত গ্রহণ একটি ইবাদাত যা অবশ্যই শরীয়ত সম্মত হতে হবে। যদি এগুলোতে কোন বরকত থাকতো তা হলে অবশ্যই রাসূল (সা.) তা নিজ উম্মাতকে জানিয়ে দিতেন এবং সাহাবায়ে কিরামও অবশ্যই এ গুলোতে বরকত কামনা করতেন। কারণ, তাঁরা কোন পুণ্যময় কর্মে আমাদের চাইতে কোনভাবেই পিছিয়ে ছিলেন না। যখন তাঁরা এতে কোন বরকত দেখেননি তাহলে কি করে আমরা সেগুলোতে বরকত কামনা করতে যাবো। তা একেবারেই যুক্তি বহির্ভূত।

রাসূল (সা.) কোন বস্ত্ত কর্তৃক বরকত হাসিলকে মূর্তিপূজার সাথে তুলনা করেছেন।

আবু ওয়াক্বিদ্ লাইসী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) যখন ’হুনাইন্ অভিমুখে রওয়ানা করলেন তখন পথিমধ্যে তিনি মুশরিকদের ‘‘যাতু আন্ওয়াত’’ নামক একটি গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যার উপর তারা যুদ্ধের অস্ত্রসমূহ বরকতের আশায় টাঙ্গিয়ে রাখতো। তখন সাহাবারা বললেন: হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনি আমাদের জন্যও একটি গাছ ঠিক করে দিন যেমনিভাবে মুশরিকদের জন্য একটি গাছ রয়েছে। নবী (সা.) বললেন: আশ্চর্য! তোমরা সে দাবিই করছো যা মূসা (আ.) এর সম্প্রদায় তাঁর নিকট করেছিলো। তারা বলেছিলো: হে মূসা! আপনি আমাদের জন্যও একটি মূর্তি বা মা’বূদ ঠিক করে দিন যেমনিভাবে অন্যদের অনেকগুলো মূর্তি বা মা’বূদ রয়েছে। (সুরা আ’রাফ : ১৩৮)।

রাসূল (সা.) বললেন: ঐ সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন। তোমরা নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তীদের হুবহু অনুসারী হবে। (সুনান আততিরমিযী, হাদীস ২১৮০, ’হুমাইদী, হাদীস ৮৪৮, ত্বায়ালিসী, হাদীস ১৩৪৬, আব্দুর্ রায্যাক্ব, হাদীস ২০৭৬৩, ইবনু হিববান্/মাওয়ারিদ্, হাদীস ১৮৩৫, ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ৩২৯০, ৩২৯৪)। হাদিসের মান সহিহ।

শরীয়ত অসম্মত কোনো সময় কর্তৃক বরকত কামনা করণ

যেমন: নবী (সা.) এর জন্ম দিন, মি’রাজের রাত্রি এবং হিজরত, বদর যুদ্ধ ইত্যাদির দিনকে বরকতময় মনে করা।

যদি এ সময় গুলোতে কোন বরকত থাকতো তা হলে রাসূল (সা.) অবশ্যই তা নিজ উম্মাতকে শিখিয়ে যেতেন এবং সাহাবায়ে কিরামও তা অবশ্যই পালন করতেন। যখন তাঁরা তা করেননি তা হলে বুঝা গেলো এতে কোন বরকত নেই। বরং তা কর্তৃক বরকত গ্রহণ বিদ্’আত ও শির্ক।

কোনো বুযুর্গ ব্যক্তি বা তদীয় নিদর্শনসমূহ কর্তৃক বরকত গ্রহণ

ইতিপূর্বে দলীল-প্রমাণসহ উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে শুধুমাত্র রাসূল (সা.) এবং তাঁর শরীর থেকে নির্গত ঘাম, কফ, থুতু ইত্যাদি এবং তাঁর চুল ও ব্যবহৃত পোশাক পরিচ্ছদ, থালা বাসন ইত্যাদিতে আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে এমন কিছু বরকত রেখেছেন যা তিনি অন্য কোথাও রাখেননি।

কেউ কেউ ভাবতে পারেন যে, রাসূল (সা.) ও তদীয় নিদর্শনসমূহ কর্তৃক যখন বরকত হাসিল করা জায়িয তখন অবশ্যই ওলী-বুযুর্গ ও তদীয় নিদর্শনসমূহ কর্তৃক বরকত হাসিল করাও জায়িয হতে হবে। কারণ, তাঁরা নবীর ওয়ারিশ।

উত্তরে বলতে হবে যে, প্রবাদে বলে: কোথায় আব্দুল আর কোথায় খালকূল। কোথায় রাসূল (সা.) আর কোথায় আমাদের ধারণাকৃত বুযুর্গরা। আর যদি উভয়ের মধ্যে তুলনা করা সম্ভবই হতো তাহলে সাধারণ সাহাবায়ে কিরাম অবশ্যই আবু বকর, ’উমর, ’উস্মান, ’আলী ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কিরাম এর সত্তা ও নিদর্শনাবলী কর্তৃক বরকত হাসিল করতেন। যখন তাঁরা তা করতে যাননি। তাহলে বুঝা যায়, এ রকম তুলনা করা সত্যিই বোকামো।

অন্য দিকে আমরা কাউকে নিশ্চিতভাবে ওলী বা বুযুর্গ বলে ধারণা করতে পারি না। কারণ, বুযুর্গী বলতে সত্যিকারার্থে অন্তরের বুযুর্গীকেই বুঝানো হয়। আর এ ব্যাপারে কোর’আন ও হাদীসের মাধ্যম ছাড়া কেউ কারোর ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারে না। শুধু আমরা কারোর সম্পর্কে এতটুকুই বলতে পারি যে, মনে হয় তিনি একজন আল্লাহ্’র ওলী। সুতরাং তাঁর ভালো পরিসমাপ্তির আশা করা যায়। নিশ্চয়তা নয়। এমনো তো হতে পারে যে, আমরা জনৈক কে বুযুর্গ মনে করছি। অথচ সে মৃত্যুর সময় ঈমান নিয়ে মরতে পারেনি।

আরেকটি বিশেষ কথা এই যে, আমাদের ধারণাকৃত কোন বুযুর্গের সাথে বরকত নেয়ার আচরণ দেখানো হলে তাতে তাঁর উপকার না হয়ে বেশিরভাগ অপকারই হবে। কারণ, এতে করে তাঁর মধ্যে গর্ব, আত্মম্ভরিতা ও নিজকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবার রোগ জন্ম নেয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা কারোর সম্মুখবর্তী প্রশংসারই শামিল যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নামে কসম খাওয়ার শির্ক

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্ত্তর নামে কসম খাওয়া ছোট শির্ক।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নিশ্চয়ই আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি। তিনি ইরশাদ করেন: ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্ত্তর কসম খাবে সে মুশরিক হয়ে যাবে’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২১৫, তিরমিযী, হাদীস ১৫৩৫, ইবনু হিব্বান/মাওয়ারিদ, হাদীস ১১৭৭, হা’কিম : ১/১৮, ৫২ ৪/২৯৭, বায়হাক্বী : ১০/২৯, আব্দুর রাযযাক : ৮/১৫৯২৬, ত্বায়ালিসী, হাদীস ১৮৯৬, আহমাদ : ২/৩৪, ১২৫)। হাদিসের মান সহিহ।

’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদেরকে নিজ পিতার কসম খেতে নিষেধ করেছেন। যে ব্যক্তি কসম খেতে চায় সে যেন আল্লাহ্’র কসম খায়। নতুবা সে যেন চুপ থাকে’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ২৬৭৯, ৬১০৮, ৬৬৪৬, সহিহ মুসলিম, হাদীস ১৬৪৬, সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২৪৯, সুনান আততিরমিযী, হাদীস ১৫৩৪ মালিক : ২/৪৮০ দারামী : ২/১৮৫ বায়হাক্বী : ১০/২৮ বাগাওয়ী, হাদীস ২৪৩১, ত্বায়ালিসী, হাদীস ১৯ আহমাদ : ২/১১, ১৭, ১৪২ হুমাইদী, হাদীস ৬৮৬)। হাদিসের মান সহিহ।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তোমরা পিতা-মাতার কসম খেয়ো না। এমনকি আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য যে কোন ব্যক্তি বা বস্ত্তর কসম খেয়ো না। তা যাই হোক না কেন। শুধু কসম খাবে আল্লাহ্ তা’আলার। তবে আল্লাহ্ তা’আলার কসম হতে হবে সত্যি সত্যি। মিথ্যা নয়’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২৪৮)। হাদিসের মান সহিহ।

বুরাইদাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘যে ব্যক্তি আমানতের কসম খাবে সে আমার উম্মত নয়’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২৫৩)। হাদিসের মান সহিহ।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘আমার নিকট মিথ্যাভাবে আল্লাহ্’র কসম খাওয়া অনেক ভালো সত্যিকারভাবে আল্লাহ্ ভিন্ন অন্যের কসম খাওয়া চাইতে’’। (ত্বাবারানী/কাবীর : ৯/৮৯০২)।

আল্লাহ্ তা’আলা ভিন্ন অন্য কারোর কসম খেলে যা করতে হয়

আল্লাহ্ তা’আলা ভিন্ন অন্য কারোর কসম খেলে কালিমায়ে তাওহীদ পড়ে নিবে।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘কোন ব্যক্তি ‘‘লাত’’ ও ‘‘’উযযা’’ এর কসম খেলে সে যেন বলেঃ আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৬৬৫০, সহিহ মুসলিম, হাদীস ১৬৪৭, সহিহ আবু দাউদ, হাদীস ৩২৪৭, সুনান তিরমিযী, হাদীস ১৫৪৫, সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ২১২৬, বায়হাক্বী ১০/৩০, আহমাদ ২/৩০৯)। হাদিসের মান সহিহ।

সা’আদ বিন্ আবী ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘আমি একদা ‘‘লাত’’ ও ‘‘’উযযা’’ এর কসম খেয়েছিলাম। তখন নবী (সা.) আমাকে বললেন: তুমি বলো: আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই’’। (ইবনু হিববান, হাদীস ১১৭৮ আহমাদ : ১/১৮৩, ১৮৬-১৮৭ আবু ইয়া’লা, হাদীস ৭১৯, ৭৩৬ নাসায়ী/আল্ ইয়াওমু ওয়াল্লাইলাহ্, হাদীস ৯৮৯, ৯৯০)।

যেমনিভাবে রাসূল (সা.) নিজ উম্মতকে আল্লাহ্ ভিন্ন অন্যের কসম খেতে নিষেধ করেছেন তেমনিভাবে তিনি কেউ আল্লাহ্ তা’আলার কসম খেলে তাকে সত্যবাদী বলে মেনে নেতে উৎসাহিত করেছেন যাতে সে আল্লাহ্ ভিন্ন অন্যের কসম খেতে বাধ্য না হয়।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা নবী (সা.) জনৈক ব্যক্তিকে নিজের পিতার কসম খেতে দেখলে তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

‘‘তোমরা নিজ পিতার কসম খেয়ো না। কেউ আল্লাহ্ তা’আলার কসম খেলে সে যেন সত্য কসম খায়। আর যার জন্য আল্লাহ্ তা’আলার কসম খাওয়া হলো সে যেন সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নেয়। যে ব্যক্তি তার জন্য আল্লাহ্ তা’আলার কসম খাওয়ার পরও সে তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয় না তার সাথে আল্লাহ্ তা’আলার কোন সম্পর্ক নেই’’। (সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ২১৩১)। হাদিসের মান সহিহ।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘ঈসা (আ.) জনৈক ব্যক্তিকে চুরি করতে দেখে বললেন: তুমি কি চুরি করেছো? সে বললো: না, আল্লাহ্ তা’আলার কসম যিনি এক ও একক। তখন ঈসা (আ.) বললেন: আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করে মেনে নিচ্ছি, তুমি সত্যই বলেছো আর আমি মিথ্যা দেখেছি’’। (সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ২১৩২)। হাদিসের মান সহিহ।

কবর পূজার শির্ক

কবর পূজার শির্ক বলতে কবরে শায়িত কোন ওলী বা বুযুর্গের জন্য যে কোন ধরনের ইবাদাত সম্পাদন বা ব্যয় করাকে বুঝানো হয়।

বর্তমান যুগের মাযারকে শির্কের কুঞ্জ বা আড্ডা বলা যেতে পারে। এমন কোন শির্ক নেই যা কোন না কোন মাযারকে কেন্দ্র করে অনুশীলিত হচ্ছে না। আহবান, ফরিয়াদ, আশ্রয়, আশা, রুকু, সিজদাহ্, বিনম্রভাবে কবরের সামনে দাঁড়ানো, তাওয়াফ, তাওবা, জবাই, মানত, আনুগত্য, ভয়, ভালোবাসা, তাওয়াক্কুল, সুপারিশ ও হিদায়াত কামনা করার মত বড় বড় শির্ক যে কোন কবরের পার্শ্বে নির্বিঘ্নে চর্চা করা হচ্ছে।

এ সবের মূলে সর্বদা একটি কারণই কাজ করে চলছে। আর তা হলো: ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে অমূলক বাড়াবাড়ি। এ জাতীয় বাড়াবাড়ির কারণে যেমনিভাবে ধ্বংস হয়েছে নূহ (আ.) এর উম্মতরা তেমনিভাবে ধ্বংস হয়েছে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা।

এ কারণেই আল্লাহ্ তা’আলা ওদেরকে ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আপনি বলে দিন: হে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে অমূলক সীমালংঘন করো না এবং ওসব লোকদের ভিত্তিহীন কল্পনার অনুসারী হয়ো না যারা অতীতে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং আরো বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে। বস্ত্ততঃ তারা সরল পথ থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছে’’। (সুরা মায়িদাহ্ : ৭৭)।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি আল্লাহ্ তা’আলার বাণী:

‘‘তারা বলেছে: তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের দেব-দেবীকে ; পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ্, সুওয়া’, ইয়াগুস্, ইয়াঊক্ ও নাসর্কে’’। (সুরা নূহ্ : ২৩)।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন:

‘‘যে মূর্তিগুলোর প্রচলন নূহ্ (আ.) এর সম্প্রদায়ে ছিলো তা এখন আরবদের নিকট। দাউমাতুল্ জান্দাল্ এলাকায় কাল্ব সম্প্রদায় ওয়াদ্দকে পূজা করতো। হুযাইল্ সম্প্রদায় সুওয়া’কে। মুরাদ্ সম্প্রদায় ইয়াগুস্কে। সাবাদের নিকটবর্তী এলাকা জাউফের ‘‘বানী গোত্বাইফ্’’ গোত্ররাও ইয়াগুসেরই পূজা করতো। হাম্দান সম্প্রদায় ইয়াউক্কে। জুল্ কালা’ এর বংশধর হিম্য়ার সম্প্রদায় নাস্রকে। এ সবগুলো ছিল নূহ্ (আ.) এর সম্প্রদায়ের ওলী-বুযুর্গদের নাম। যখন তারা মৃত্যুবরণ করলো তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে এ মর্মে বুদ্ধি দিলো যে, তোমরা ওদের বৈঠকখানায় ওদের প্রতিমূর্তি বানিয়ে সম্মানের সাথে বসিয়ে দাও। অতঃপর তারা তাই করলো। কিন্তু তখনো ওদের পূজা শুরু হয়নি। তবে এ প্রজন্ম যখন নিঃশেষ হয়ে গেলো এবং ধর্মীয় জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটলো তখনই এ প্রতিমূর্তিগুলোর পূজা শুরু হলো’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪৯২০)। হাদিসের মান সহিহ।

শুধু বুযুর্গদের ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি নয় বরং রাসূল (সা.) নিজ ব্যাপারেও কোন বাড়াবাড়ি করতে উম্মতদেরকে সুদৃঢ় কন্ঠে নিষেধ করেছেন।

রাসূল (সা.) এর প্রতি সত্যিকার সম্মান:

’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন:

‘‘তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করো না যেমনিভাবে বাড়াবাড়ি করেছে খ্রিষ্টানরা ’ঈসা বিন্ মার্য়াম্ (আ.) এর ব্যাপারে। আমি কেবল আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাহ্। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে: তিনি আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাহ্ এবং তদীয় রাসূল’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪৫, ৬৮৩০)। হাদিসের মান সহিহ।

রাসূল (সা.) কে অমূলক বেশি সম্মান দিতে যাওয়ার কারণেই বহু শির্কের উদ্ভাবন হয়। এ অমূলক সম্মান হেতুই যে কোন সমস্যায় তাঁকে আহবান করা হয়, তাঁর নিকট ফরিয়াদ করা হয়, তাঁর জন্য মানত মানা হয়, তাঁর কবরের চতুষ্পার্শ্বে তাওয়াফ করা হয় এবং তিনি গায়েব জানেন ও তাঁর হাতে সর্বময় ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

সত্যিকারার্থে এটি সম্মান নয় বরং তা কুফরী বৈ কি? মূলতঃ রাসূল (সা.) কে তিন ভাবে সম্মান করা যায়। তা নিম্নরূপ:

(ক) অন্তর দিয়ে সম্মান করা। আর তা হচ্ছে মুহাম্মাদ (সা.) কে আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাহ্ ও তদীয় রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করার আওতাধীন এবং তা কেবল রাসূল (সা.) এর ভালোবাসাকে নিজ সত্তা, মাতা, পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের ভালোবাসার উপর প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

তবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, বাহ্যিক এমন দু’টি কর্ম রয়েছে যা কারোর অন্তরে সত্যিকারার্থে রাসূল (সা.) এর জন্য এ জাতীয় ভালোবাসা বিদ্যমান রয়েছে কি না তা প্রমাণ করে। কর্ম দু’টি নিম্নরূপ:

(১) খাঁটি তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া। কারণ, রাসূল (সা.) সার্বিকভাবে শির্কের সকল পথ, মত ও মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছেন। সুতরাং রাসূল (সা.) এর সম্মান কখনো শির্কের মাধ্যমে হতে পারে না।

(২) সর্ব ক্ষেত্রে তাঁরই অনুসরণ করা। অতএব সর্ব বিষয়ে তাঁর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। অন্য কারোর কথা নয়। যেমনিভাবে সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্যই হতে হয় তেমনিভাবে সকল প্রকারের অনুসরণ একমাত্র তাঁরই রাসূলের জন্য হতে হবে।

(খ) মুখ দিয়ে সম্মান করা। আর তা কোন রকম বাড়াবাড়ি ছাড়া রাসূল (সা.) এর যথোপযুক্ত প্রশংসা করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

(গ) অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে সম্মান করা। আর তা রাসূল (সা.) এর সমূহ আনুগত্য বাস্তব কর্মে পরিণত করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

মোটকথা, রাসূল (সা.) এর কার্যত সম্মান তাঁর বিশুদ্ধ বাণীর প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা, তাঁরই জন্যে কাউকে ভালোবাসা বা কারোর সাথে শত্রুতা পোষণ করা, যে কোন ব্যাপারে তাঁরই ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়ার মাধ্যমেই সুসংঘটিত হয়ে থাকে।

অমূলক বাড়াবাড়ি শরীয়তের দৃষ্টিতে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাই তা ইবাদাতের ক্ষেত্রেই হোক বা আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে।

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘হে মানুষ সকল! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার সকল উম্মাত শুধু এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে’’। (সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩০৮৫, ইবনু হিববান্, হাদীস ১০১১)। হাদিসের মান সহিহ।

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্’ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: ‘‘সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক! রাসূল (সা.) এ বাক্যটি তিন বার উচ্চারণ করেন’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ২৬৭০, সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪৬০৮)। হাদিসের মান সহিহ।

ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বেশি বাড়াবাড়ি করার কারণেই প্রথমে তাদের কবরের উপর ঘর বা মসজিদ তৈরি করা হয়। অতঃপর সে কবরের জন্য সিজদা করা হয়, মানত করা হয় এমনকি উহাকে নামায ও দো’আ কবুল হওয়ার বিশেষ স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়, তাতে শায়িত ব্যক্তির নামে কসম খাওয়া হয়, তার নিকট ফরিয়াদ করা হয়, তাকে আল্লাহ্ তা’আলার চাইতেও বেশি ভয় করা হয়, তার নিকট যে কোন সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়, তার নিকট অতি বিনয়ের সঙ্গে এমনভাবে কান্নাকাটি করা হয় যা আল্লাহ্ তা’আলার ঘর মসজিদেও করা হয় না এমনকি পরিশেষে তা খাদিম নামের কিছু সংখ্যক মানুষের আড্ডা হয়ে যায়। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারীকে আল্লাহ্ তা’আলার সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: উম্মে হাবীবাহ্ ও উম্মে সালামাহ্ (রা.) ইথিওপিয়ায় একটি গির্জা দেখেছিলো যাতে অনেকগুলো ছবি টাঙ্গানো রয়েছে। তারা তা রাসূল (সা.) কে জানালে তিনি বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই ওরা তাদের মধ্যে কোন ওলী-বুযুর্গ ইন্তিকাল করলে তারা ওর কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং এ জাতীয় ছবিসমূহ টাঙ্গিয়ে রাখে। ওরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে সাব্যস্ত হবে’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৮৭৩, মুসলিম, হাদীস ৫২৮, ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ৭৯০)। হাদিসের মান সহিহ।

আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘সর্ব নিকৃষ্ট মানুষ ওরা যারা জীবিত থাকতেই কিয়ামত এসে গেলো এবং ওরা যারা কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করলো’’। (ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ৭৮৯, ইবনু হিববান/ইহ্সান, হাদীস ৬৮০৮, ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ১০৪১৩, বায্যার/কাশ্ফুল আস্তার, হাদীস ৩৪২০)।

নবী (সা.) কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে লা’নত (অভিশাপ) দিয়েছেন।

’আয়েশা ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন:

‘‘যখন রাসূল (সা.) মৃত্যু শয্যায় তখন তিনি চাদর দিয়ে নিজ মুখমণ্ডল ঢেকে ফেললেন। অতঃপর যখন তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচিছলো তখন তিনি চেহারা খুলে বললেন: ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের উপর আল্লাহ্ তা’আলার লা’নত ; তারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো। এ কথা বলে নবী (সা.) নিজ উম্মতকে সে কাজ না করতে সতর্ক করে দিলেন’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৪৩৫, ৪৩৬, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪, সহিহ মুসলিম, হাদীস ৫৩১)। হাদিসের মান সহিহ।

নবী (সা.) কবরের উপর মসজিদ বানানোর ব্যাপারে শুধু লা’নত ও নিন্দা করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি তা করতে সুস্পষ্টভাবে নিষেধও করেছেন।

জুন্দাব্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি নবী (সা.) কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন:

‘‘তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা নিজ নবী ও ওলী-বুযুর্গদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিতো। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিওনা। আমি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করছি’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ৫৩২)। হাদিসের মান সহিহ।

শুধু কবরের উপর মসজিদ বানানোই নয় বরং রাসূল (সা.) কবরের উপর বসতে বা উহার দিকে ফিরে নামায পড়তেও নিষেধ করেছেন।

আবু মার্সাদ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তোমরা কবরের উপর বসো না এবং উহার দিকে ফিরে নামাযও পড়ো না’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ৯৭২, সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৩২২৯, ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ৭৯৩)। হাদিসের মান সহিহ।

আনাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: ‘‘নবী (সা.) কবরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন’’। (ইবনু হিববান, হাদীস ৩৪৫ আবু ইয়া’লা, হাদীস ২৮৮৮ বাযযার/কাশফুল আস্তার, হাদীস ৪৪১, ৪৪২)।

রাসূল (সা.) শুধু কবরের উপর ঘর বানাতে নিষেধ করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি কবরকে পাকা করতে এবং কবরের সাথে যে কোন বস্ত্ত সংযোজন করতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) কবর পাকা করতে, উহার উপর বসতে, ঘর বানাতে এমনকি উহার সাথে কোন জিনিস সংযোজন করতেও নিষেধ করেছেন’’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ৯৭০, সুনান  আবু দাউদ, হাদীস ৩২২৫, ৩২২৬, আব্দুর রায্যাক, হাদীস ৬৪৮৮, ইবনু হিববান/ইহসান, হাদীস ৩১৫৩, ৩১৫৫)। হাদিসের মান সহিহ।

কবরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা যাতে মানুষের অন্তরে গেঁথে না যায় এবং রাসূলে আক্রাম (সা.) এর কবর এলাকা যাতে মেলা বা ঈদগাহে রূপান্তরিত না হয় সে জন্য রাসূল (সা.) তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করার আদেশ দেননি। বরং তিনি এর বিপরীতে তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করার প্রতি নিজ উম্মতদেরকে অনুৎসাহিত করেছেন। সুতরাং যে কোন মুসলমান যে কোন স্থান হতে তাঁর নিকট সালাত ও সালাম পাঠাতে পারে। অতএব তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম দেয়ার মধ্যে কোন বিশেষত্ব নেই।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তোমরা নিজেদের ঘর গুলোকে কবর বানিও না। বরং তোমরা তাতে নফল নামায, কোর’আন তিলাওয়াত ও দো’আ ইত্যাদি করিও এবং আমার কবরকে মেলা বানিও না। তাতে বার বার নির্দিষ্ট সময়ে আসার অভ্যাস করো না। বরং তোমরা সর্বদা আমার উপর সালাত ও সালাম পাঠিও। কারণ, তোমাদের সালাত ও সালাম আমার নিকট অবশ্যই পৌঁছুবে। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ২০৪২, আহমাদ : ২/৩৬৭)। হাদিসের মান সহিহ।

আউস্ বিন্ আউস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘সর্বোৎকৃষ্ট দিন জুমার দিন। এ দিন আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ দিনই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এ দিনই সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। অতএব তোমরা এ দিন আমার নিকট বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠিও। কারণ, নিশ্চয়ই তোমাদের সালাত ও সালাম আমার নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। সাহাবারা বললেন: কিভাবে আপনার নিকট আমাদের সালাত ও সালাম পৌঁছিয়ে দেয়া হবে? অথচ আপনি তখন মাটি হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবেন। রাসূল (সা.) বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা মাটির উপর নবীদের শরীর হারাম করে দিয়েছেন’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ১০৪৭, ১৫৩১, ইবনু হিববান/ইহসান, হাদীস ৯০৭, ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ১৭৩৩)। হাদিসের মান সহিহ।

এ যদি হয় রাসূল (সা.) এর কবরের অবস্থা। যেখানে যিয়ারাতের উদ্দেশ্যে বার বার যাওয়ার অভ্যাস করা যাবে না। যাতে করে তা মেলাক্ষেত্রে রূপান্তরিত না হয়ে যায়। তাহলে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর ওলী-বুযুর্গদের কবরের উপর উরস ও দো’আভোজ উদ্যাপন কিভাবে জায়িয হতে পারে? যা সরাসরি মেলা হওয়ার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই এবং যাতে ঈদের চাইতেও অনেক বেশি খুশি প্রকাশ করা হয়। অতএব কোন্ যুক্তিতে উরস মাহফিল অভিমুখে মানতের গরু ছাগল নিয়ে মাযারভক্তদের শোভাযাত্রা বড় শির্ক না হয়ে তা জায়িয বরং সাওয়াবের কাজ হতে পারে? অথচ রাসূল (সা.) তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সাওয়াবের নিয়্যাতে ভ্রমণ করা হারাম করে দিয়েছেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সাওয়াবের নিয়্যাতে সফর করা যাবে না। সে মসজিদগুলো হলোঃ হারাম (মক্কা) শরীফ, মসজিদে আক্সা এবং মসজিদে নববী’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ১১৯৭, ১৯৯৫, সহিহ মুসলিম, হাদীস ৮২৭, সুনান আততিরমিযী, হাদীস ৩২৬)। হাদিসের মান সহিহ।

বাস্রা বিন্ আবী বাস্রা গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি আবু হুরাইরাহ্ (রা.) কে তূর পাহাড় থেকে আসতে দেখে বললেন:

‘‘আমি আপনাকে তূর পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পূর্বে দেখতে পেলে অবশ্যই সে দিকে যেতে দিতাম না। কারণ, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি: সাওয়াবের নিয়্যাতে তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা যাবে না। সে মসজিদগুলো হলো: মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আকসা’’। (মালিক : ১/১০৮-১০৯ আহমাদ : ৬/৭ ’হুমাইদী, হাদীস ৯৪৪)।

মোটকথা, ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা সমূহ ধ্বংসের মূল। সুতরাং যে কোন ধরণের বাড়াবাড়ি ওদের ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

নবী-ওলীদের নিদর্শনসমূহ অনুসন্ধান করে তা নিয়ে ব্যস্ত হওয়াও তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির শামিল। সুতরাং তাও শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

নাফি’ (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর পর রিদ্ওয়ান বৃক্ষের (যে গাছের নীচে রাসূল (সা.) সাহাবাদেরকে ষষ্ঠ হিজরী সনে মক্কার কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধের বায়’আত করেন) নীচে এসে অনেকেই নামায পড়া শুরু করলো। তা শুনে ’উমর (রা.) কঠোর ভাষায় উহার নিন্দা করলেন এবং উক্ত গাছটি কেটে ফেললেন’’। (ইবনু আবী শাইবাহ্, হাদীস ৭৫৪৫ আল্-মুন্তাযিম ৩/২৭২)। হাদিসের মান সহিহ।

মা’রুর বিন্ সুওয়াইদ্ (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আমি ’উমর (রা.) এর সাথে মক্কার পথে ফজরের নামায আদায় করলাম। অতঃপর তিনি দেখলেন অনেকেই এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: এরা কোথায় যাচ্ছে। উত্তরে বলা হলো: রাসূল (সা.) যেখানে নামায পড়েছেন ওখানে নামায পড়ার জন্যে। তখন তিনি বললেন:

‘‘তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। তারা নিজ নবীদের নিদর্শনসমূহ খুঁজে বেড়াতো এবং উহার উপর গির্জা বা ইবাদাতখানা বানিয়ে নিতো। অতএব এ মসজিদগুলোতে থাকাবস্থায় নামাযের সময় হলে তোমরা তাতে নামায পড়ে নিবে। নতুবা তা অতিক্রম করে যাবে। বিশেষ সাওয়াবের নিয়্যাতে তাতে নামায পড়তে আসবে না’’। (ইবনু আবী শাইবাহ্ : ২/৩৭৬)।

আবুল ’আলিয়াহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

‘‘যখন আমরা তুস্তার্ জয় করলাম তখন আমরা হুর্মুযের খাজাঞ্চিখানায় একটি খাট পেলাম। তাতে একটি মৃত মানুষ শায়িত এবং তার মাথার পার্শ্বে একখানা কেতাব রাখা আছে। আমরা কেতাবখানা ’উমর (রা.) এর নিকট নিয়ে আসলে তিনি কা’ব (রা.) কে ডেকে তা আরবী করে নেন। আরবদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তা পড়লাম। যেভাবে আমরা কোর’আন মাজীদ পড়ি সেভাবেই পড়লাম। বর্ণনাকারী বলেন: আমি আবুল্ ’আলিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম: তাতে কি লেখা ছিলো? তিনি বললেন: তোমাদের জীবন যাপন, কর্মকান্ড, কথার ধ্বনি ও ভবিষ্যতে যা ঘটবে সে সম্পর্কেই আলোচনা ছিলো। বর্ণনাকারী বললো: সে মৃত লোকটাকে আপনারা কি করলেন? তিনি বললেন: আমরা দিনের বেলায় বিক্ষিপ্তভাবে তার জন্য তেরোটি কবর খনন করলাম। রাত্র হলে আমরা তাকে কোন একটিতে দাফন করে কবরগুলো সমান করে দেই। যাতে কেউ বুঝতে না পারে তাকে কোথায় দাফন করা হলো। যাতে তারা পুনরায় তাকে কবর থেকে উঠিয়ে না ফেলতে পারে। বর্ণনাকারী বললো: তারা সে ব্যক্তি থেকে কি আশা করতো? তিনি বললেন: (তাদের ধারণা) যখন তাদের এলাকায় কখনো অনাবৃষ্টি দেখা দিতো তখন তারা তাকে খাট সহ বাইরে নিয়ে আসতো এবং তখনই বৃষ্টি হতো। বর্ণনাকারী বললো: আপনাদের ধারণা মতে সে কে হতে পারে? তিনি বললেন: লোক মুখে শুনা যায়, তিনি ছিলেন দানিয়াল নবী। বর্ণনাকারী বললো: কতদিন থেকে আপনারা তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেলেন? তিনি বললেন: তিন শত বছর থেকে। বর্ণনাকারী বললো: তাঁর শরীরের কোন অংশের পরিবর্তন হয়নি কি? তিনি বললেন: না। তবে শুধু ঘাড়ের কয়েকটি চুলের সামান্যটুকু পরিবর্তন দেখা গেলো। কারণ, মাটি নবীদের শরীর খেতে পারে না। (আল্ বিদায়া ওয়ান্ নিহায়াহ্ : ২/৪০ আম্ওয়াল্/আবু ’উবাইদ্ : ৮৭৭ ফুতূহুল্ বুল্দান্ : ৩৭১)।

কোন কবরকে পূজা করা হলে শরীয়তের পরিভাষায় তা মূর্তিপূজা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কারণেই রাসূল (সা.) তাঁর কবরকে ভবিষ্যতে কেউ যেন মূর্তি বানিয়ে না নেয় সে জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট করুণ কন্ঠে ফরিয়াদ করেন।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী কারীম (সা.) আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ দো’আ প্রার্থনা করেন:

 ‘‘হে আল্লাহ্! আপনি আমার কবরকে মূর্তি বানাবেন না। ভবিষ্যতে যার পূজা করা হবে। আল্লাহ্ তা’আলার লা’নত এমন সম্প্রদায়ের উপর যারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো’’। (আহমাদ : ২/২৪৬ আবু নু’আঈম্ : ৭/৩১৭)।

বর্তমান যুগের কবর পূজারী ও মাযারের খাদিমদের সাথে ইব্রাহীম ও মূসা (আলাইহিমাস্ সালাম) এর যুগের মূর্তি পূজারীদের কতইনা সুন্দর মিল রয়েছে।

ইব্রাহীম (আ.) তাঁর যুগের মূর্তি পূজারীদেরকে বললেন: ‘‘এ মূর্তিগুলো কি যে ; তোমরা তাদের নিকট পূজার জন্য নিয়মিত অবস্থান করছো’’। (সুরা আম্বিয়া : ৫২)।

মূসা (আ.) এর যুগের মূর্তি পূজারীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আমি বনী ইস্রাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলে তাদের সঙ্গে মূর্তির নিকট নিয়মিত অবস্থানকারী এক দল পূজারীর সাথে সাক্ষাৎ হয়’’। (সুরা আ’রাফ : ১৩৮)।

কবর পূজারীদের অনেকেরই ধারণা এই যে, যারা একবার আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর উপর ঈমান এনেছে তাদের মধ্যে কখনো কোন শির্ক পাওয়া যেতে পারে না। মুশরিক শুধু রাসূল (সা.) এর যুগেই ছিল। যারা তাঁর ইসলাম প্রচারে সর্বদা বাধা প্রদান করতো। অন্যদিকে যে ব্যক্তি একবার আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর উপর ঈমান এনেছে সে কি করে মুশরিক হতে পারে? তা কখনোই সম্ভব নয়।

তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণরূপেই ভুল প্রমাণিত। কারণ, রাসূল (সা.) হাদীসের মধ্যে এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেছেন। শুধু এতটুকুতেই তিনি ক্ষান্ত হননি বরং তিনি এ উম্মতের মধ্যে মূর্তি পূজাও যে চালু হবে তা সত্যিকারভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।

সাউবান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘কিয়ামত কায়েম হবেনা যতক্ষণনা আমার উম্মতের কয়েকটি গোত্র মুশরিকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা এবং মূর্তি পূজা শুরু করবে’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২, সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪০২৩, বাগাওয়ী, হাদীস ৪০১৫)। হাদিসের মান সহিহ।

শুধু এতটুকুতেই ক্ষান্ত নয় বরং রাসূল (সা.) এর উম্মতরা ছোট-বড় প্রতিটি কাজে ইহুদী, খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজকদের হুবহু অনুসারী হবে।

আবু সাঈদ খুদ্রী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসারী হবে। হাত হাত বিঘত বিঘত তথা হুবহু অবিকলভাবে। এমনকি তারা যদি কোন গুইসাপ গর্তে ঢুকে পড়ে তাহলে তোমরাও তাতে ঢুকে পড়বে। আমরা (সাহাবাগণ) বললাম: হে আল্লাহ্’র রাসূল! তারা কি ইহুদী ও খ্রিষ্টান? তিনি বললেন: তারা নয় তো আর কারা?’’ (সহিহ বুখারী, হাদীস ৩৪৫৬, ৭৩২০, মুসলিম, হাদীস ২৬৬৯, ত্বায়ালিসী, হাদীস ২১৭৮)। হাদিসের মান সহিহ।

এরই পাশাপাশি কোর’আন ও হাদীসে অপরিপক্ক কিছু আলিম সমাজ, রাজা-বাদশাহ, আমীর-উমারা বিপুল সংখ্যক জনসাধারণকে পথভ্রষ্ট করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। তারা এতটুকুও আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় পাচ্ছে না। এদেরই সম্পর্কে রাসূল (সা.) বহু পূর্বে সত্য ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।

সাউবান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘নিশ্চয়ই আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে পথভ্রষ্টকারী ইমাম বা নেতাদের ভয় পাচ্ছি। যারা প্রতিনিয়ত জনসাধারণকে গোমরাহ্ করবে’’। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২, ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪০২৩, বাগাওয়ী, হাদীস ৪০১৫)। হাদিসের মান সহিহ।

এতদ্সত্ত্বেও একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সর্বদা ও সর্ববস্থায় সত্যের উপর অটল ও অবিচল থাকবে। কারোর অসহযোগিতা বা অসহনশীলতা তাদের কোনরূপ ক্ষতি করতে পারবেনা।

সাউবান, মু’আবিয়া ও মুগীরা বিন্ শো’বা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘সর্বদা আমার একদল উম্মত সত্যবিজয়ী এবং সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। কারোর অসহযোগিতা বা বিরোধিতা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিয়ামত আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থায়ই থাকবে’’। (সহিহ বুখারী, হাদীস ৩৬৪০, ৩৬৪১, মুসলিম, হাদীস ১৯২০, ১৯২১, ১০৩৭, সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২, সুনান ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪০২৩, বাগাওয়ী, হাদীস ৪০১৫)। হাদিসের মান সহিহ।

ওলীদের কবর ও কবরের মাটি, গাছ, নিকটস্থ কূপের পানি ও জীব-জন্তুর দ্বারা উপকারে বিশ্বাস করা

মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এ পৃথিবীর অনেক কিছুই মানুষের অনেক অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে উপকারী হয়ে থাকে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কোনো ওলির কবর বা কবরের মাটি, এর নিকটস্থ গাছ, পুকুরের মাছ, কচ্ছপ ও কুমির ইত্যাদির প্রতি তা সে ওলির সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কারণে উপকারী হওয়ার ধারণা করা শির্কের অন্তর্গত। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মুসলিমদের মনে এ সব উপকারী হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। সে কারণে তাদেরকে অলিগণের কবরের মাটি, কবর বা কবরের উপর পুড়ানো মোম সংগ্রহ করতে দেখা যায়।

কূপ ও পুকুরের পানি ময়লা হলেও তা যমযমের পানির মত আগ্রহের সাথে পান করতে ও তা ক্রয় করতে দেখা যায়। এমনকি শাহ জালাল (রহ.)-এর কূপের সাথে যমযম কূপের গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলেও ধারণা করতে দেখা যায়। (সৈয়দ মোস্তফা কামাল, শাহ জালাল ও তাঁর কারামত; (সিলেট : নিউ এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১০ম ষংস্করণ, ১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ২২)।

কবরের কবুতর, পুকুরের মাছ, কচ্ছপ ও কুমিরকে যত্নের সাথে খাবার দিতে দেখা যায়। অনিষ্টের ভয়ে কবুতর ও মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন রোগ মুক্তি ও সন্তান লাভের আশায় কোনো কোনো কবর বা কবরের নিকটস্থ গাছে তারকাঁটা মারতে ও লাল সুতা বেঁধে রাখতে দেখা যায়। এ জাতীয় গাছ শির্ক চর্চার কেন্দ্র হওয়াতে তা স্বমূলে উৎপাটন করা প্রসঙ্গে মালিকী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম ইমাম ত্বরত্বুশী বলেন :

‘‘ওহে মুসলিম জনতা লক্ষ্য কর! আল্লাহ আপনাদের উপর রহম করুণ! যেখানেই তোমরা এমন কোনো কুল গাছ বা অন্য কোনো গাছ পাবে, যার নিকটে লোকেরা (দূর-দূরান্ত থেকে) উদ্দেশ্য করে আগমন করে, এর সম্মান করে ও তাত্থেকে রোগ মুক্তি কামনা করে, তাতে তারকাঁটা মারে ও কাপড়ের টুকরা ঝুলিয়ে রাখে, তা হলে তোমরা বুঝে নিবে যে, এটি (কাফিরদের) সেই যাতে আনওয়াত (এরই অনুরূপ গাছ, যাকে কাফিররা দূর-দূরান্ত থেকে উদ্দেশ্য করে আসতো)। সুতরাং তোমরা তা কেটে ফেলো।’’ (মুহাম্মদ আব্দুর রহীম, ফতাওয়া রহীমিয়্যাহ; (গুজরাট : মকতবা-ই- রহীমিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), ১/২০৩-২০৪)।

আল্লামা আহমদ রূমী কবর ও কবরের নিকটতম গাছের কাছে লোকেরা যা করে সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন:

‘‘কবরের কাছে যিয়ারতকারীদের নামায পড়া, কবরের হজ্জ করার সময় বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মেনে চলা, এর পার্শ্বে পশু যবাই ও কান্নাকাটি করা, প্রয়োজনের কথা কবরবাসীকে জানানো, তাদের নিকট কষ্ট, অভাব ও বিপদ থেকে মুক্তি ইত্যাদি কামনা করে যিয়ারতকারীরা যে সব কর্ম করে, এর কোনটিই আল্লাহর জন্য নয়, বরং তা শয়তানের জন্যেই করে থাকে।’’ (আহমদ রূমী, প্রাগুক্ত; পৃ. ১৫৯)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহচরগণ তাঁর নিকট মুশরিকদের ‘যাতে আনওয়াত’ নামের কুল গাছের অনুরূপ একটি গাছ নির্ধারণ করে দেয়ার আবেদনের হাদীসটি নিম্নরূপ : আবু ওয়াক্বিদ আল-লায়ছী রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খয়বর অভিযানের বের হলেন, তখন মুশরিকদের একটি গাছের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করেন, যাকে ‘যাতে আনওয়াত’ বলা হতো, এর উপর তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখতো। সাহাবীগণ বললেন- হে রাসূল! ওদের ন্যায় আমাদের জন্যেও একটি ‘যাতে আনওয়াত’ নির্ধারণ করে দিন। সাহাবীদের এ আবেদন শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : সুবহানাল্লাহ! তোমাদের এ কথাটি মূসা (আ.) এর জাতির কথার মতই হয়ে গেল, তারা বলেছিল- মুশরিকদের ইলাহের ন্যায় আমাদের জন্যে একটি ইলাহ বানিয়ে দিন। যার হাতের মধ্যে আমার আত্মা তাঁর শপথ করে বলছি- তোমরা অবশ্যই তোমাদের অতীতের লোকদের রীতিনীতি অনুসরণ করবে।’’ দেখুন : আবু ঈসা আত- তিরমিযী, প্রাগুক্ত; ৪/৪৭৫। কোনো কোনো বর্ণনায় খয়বার যুদ্ধের পরিবর্তে হুনায়ন যুদ্ধের কথা বর্ণিত হয়েছে।

বর্ণনা পূর্বক তিনি বলেন : ‘‘লক্ষ্য করুন! যখন (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীদের পক্ষ থেকে) কোনো প্রকার এবাদত বা এর নিকট কোনো প্রয়োজন পূরণের কথা জানানো ছাড়াই, শুধুমাত্র এতে অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখা এবং এর পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের গাছকে নির্ধারণ করে দেয়ার আবদার করা-ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে এ গাছকে ইলাহ বা উপাস্যে পরিণত করার নামান্তর হয়ে গেল, তখন সেই সমস্ত লোকদের ব্যাপারে আমরা কী ধারণা করতে পারি, যারা কোনো কবর, গাছ ও পাথরের কাছে আগমন করে এটাকে সম্মান করে, এর দ্বারা রোগমুক্তি কামনা করে, এর উদ্দেশ্যে মানত করে, এ ধারণার বশবর্তী হয়ে যে, এটি তাদের মানত গ্রহণ করে।

এটিকে তারা হাত দিয়ে স্পর্শ করে, মুখ দ্বারা চুম্বন করে, অথচ আল্লাহ তা‘আলা ‘মাকামে ইব্রাহীমকে’ নামাযের স্থান হিসেবে নির্ধারণের জন্য আমাদেরকে নির্দেশ প্রদান করা সত্ত্বেও সলফগণ তা হাত দ্বারা স্পর্শ করতে নিষেধ করেছেন।

বাস্তবিক অর্থে যারা কোনো কবর, কবর, গাছ, পাথর, মাটি, কূপ ও পুকুর এবং ওলীদের নিদর্শনাদিকে বিভিন্ন রোগমুক্তির হাসপাতাল ও বিপদের আশ্রয়স্থল বানিয়ে নিয়েছে, সন্তান লাভ ও বিভিন্ন মনস্কামনা পূরণের স্থান বানিয়ে নিয়েছে, তারা যেন ওলীদের কবর ও কবরসমূহকে মুশরিকদের ‘হুবল’ ও ‘মানাত’ দেবতার স্থানে বসিয়েছে এবং গাছ, কূপ, পুকুর ও ওলীদের নিদর্শনাদিকে মুশরিকদের ‘যাতে আনওয়াত’, ‘উয্‌যা’ ও ‘লাত’ নামের দেবীতে পরিণত করেছে। এসবকে কেন্দ্র করে তারা যা কিছু করে এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে ভবিষ্যদ্বাণীরই সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে, তিনি বলেছিলেন :‘‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্বেকার জাতির (মুশরিকদের) রীতিনীতির অনুসরণ করবে।’’ (দেখুন : তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল কদর, বাব নং ১৮, হাদীস নং ২১৮০; ৪/৪৭৫; ইবনে মাজাহ, প্রাগুক্ত; ২/১৩২২; ইবনে আবী শায়বাহ, ৭/৪৭৯)।

কবর কিভাবে মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত হয়

একটি কবর বা একটি স্থানের ব্যাপারে যদি জনমনে এ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, এখানে গেলে বরকত বা ফয়েয হাসিল হয় এবং সেখানে গেলে লোকজনের বিভিন্ন রকমের মনস্কামনা পূর্ণ হয় এবং লোকজন সুযোগমত সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে বরকত ও ফয়েয হাসিল এবং মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য প্রতি দিন, সপ্তাহে, মাসে, ছয়মাসে বা বছরের নির্দিষ্ট কোন দিনে সমবেত হয় এবং সে কবর বা স্থানের উদ্দেশ্যে টাকা-পয়সা মানত করে, গরু, ছাগল ও মুরগী ইত্যাদি নিয়ে এসে সেখানে উৎসর্গ করে, তা হলে এতে সে কবর বা সে স্থান মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত হবে কেননা; এ জাতীয় কর্মসমূহ জাহেলী যুগের মানুষেরা বিভিন্ন অলিদের নামে নির্মিত দেবতা ও প্রতিমাদের উদ্দেশ্যেকৃত কর্মেরই ধারাবাহিকতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবরকে যাতে কেউ এ রকম মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত না করে সে জন্য তিনি আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেছেন। যা আমরা একটু আগেই অবগত হয়েছি।

ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (৬৬১-৭২৮হিঃ) ঈদ(عيد) শব্দের অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: ‘‘ঈদ হলো সে সব সাধারণ সমাবেশের নাম যা প্রথা ও রেওয়াযানুযায়ী বছর, সপ্তাহ বা মাস ইত্যাদি ঘুরে আসলে ঘুরে আসে। ঈদ কয়েকটি বিষয়ের সমষ্টির নামঃ

এক. তা এমন এক দিনে হয় যা ঘুরে আসে। যেমন- ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা ও জুমু‘আর দিন।

দুই. সে দিনে সমবেত হওয়া।

তিন. সে দিনে সমবেত হয়ে উপাসনা ও প্রথাগত কিছু কর্ম করা।

ঈদ কখনও নির্দিষ্ট কোনো স্থানে হয়, কখনও তা অনির্দিষ্ট থাকে। উপরে বর্ণিত এ তিনটি বিষয়ের প্রতিটি বিষয়কেও ঈদ নামকরণ করা যেতে পারে। সে অনুযায়ী একটি সময়কেও ঈদ বলা যেতে পারে। যেমন- জুমু‘আর দিনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

‘‘জুমু‘আর দিনটি এমন একটি দিন যাকে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।’’ (ইবন মা-জাঃ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল একামাহ, বাব: মা জা-আ ফী ইয়াওমিল জুমু‘আহ; ১/৩৪৯)।

অনুরূপভাবে কোন স্থানকেও ঈদ বলা যেতে পারে। যেমন- রাসূলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেছেন :

‘‘তোমরা আমার কবরকে ঈদগাহে পরিণত করোনা।’’ (টীকা নং ১৬৪ দ্রষ্টাব্য)।

কখনও একটি দিন এবং সে দিনে যে অনুষ্ঠান করা হয়, এ দু’য়ের সমষ্টির নামও ঈদ হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈদ শব্দ দ্বারা এটাই বুঝানোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যেমন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ঈদের দিনে ঢোল বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা প্রসঙ্গে বলেন:

‘‘হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির জন্য ঈদ রয়েছে, আর এটি হলো আমাদের ঈদ।’’ (ইবন মাজাহ, প্রাগুক্ত; কিতাবুন নিকাহ, বাব : আল-গেনা-ই ওয়াদ দফফি; ১/৬১২; ইবন তাইমিয়্যাহ, আহমদ, একতিদাউস সিরাতিল মুস্তাক্বীম, তাহকীক : হামিদ আল-ফকী, (বৈরুত : দারুল মা‘রিফাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ১৮৯-১৯০)।

মেলা প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (৬৯১-৭৫১হি:) বলেন : ‘‘যা প্রথাগতভাবে ঘুরে আসে এবং যে সময় আগমনের অপেক্ষা করা হয় এবং যে স্থানে গমনের ইচছা করা হয়, তাকে ঈদ বলা হয়। ঈদ (عيد) শব্দটিকে معاودة ফিরে আসা ও (اعتياد) ‘প্রথা স্বরূপ গ্রহণ করা’ শব্দমূল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদ যখন কোনো স্থান কেন্দ্রিক হবে তখন এর দ্বারা সে স্থানই বুঝতে হবে যে স্থানকে সমবেত হওয়া ও উপাসনার জন্য উদ্দেশ্য করা হয়। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা মসজিদুল হারাম (কা‘বা শরীফ), মিনা, মুযদালিফাঃ, আরাফাঃ ও নিদর্শনের স্থানসমূহকে তাওহীদপন্থীদের জন্য ঈদ ও পুণ্যার্জনের স্থান হিসেবে গণ্য করেছেন। অতীতে মুশরিকদের সময় ও স্থান কেন্দ্রিক অনেক ঈদ ছিল। ইসলাম আগমন করে তাদের সময় কেন্দ্রিক ঈদসমূহ বাতিল ঘোষণা করে এর পরিবর্তে মুসলিমদের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এবং মিনা এর দিনসমূহকে ঈদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অনুরূপভাবে মুশরিকদের ঈদের স্থানসমূহের পরিবর্তে কা‘বা শরীফ, মিনা, মুযদালিফা, আরাফা ও নিদর্শনের স্থানসমূহকে ঈদ পালনের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছে।’’ (শেখ আব্দুর রহমান ইবন হাসান আ-লুশ শায়খ, ফাতহুল মাজীদ বি শারহি কিতাবিত তাওহীদ; (লাহুর : আনসারুস সুন্নাতিল মুহাম্মদিয়্যাঃ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ২৫৭)।

উপর্যুক্ত এ আলোচনার দ্বারা বুঝা গেল যে, ইসলাম সাধারণ মুসলিমদের জন্য সময় কেন্দ্রিক যে সব ঈদ নির্ধারণ করেছে তা হলো: জুমু‘আর দিন, ঈদুলফিতর ও ঈদুলআযহা এবং আইয়্যামে তাশরীকের চার দিন। এ-দিনসমূহ ব্যতীত সপ্তাহান্তে ও বছরান্তে সমবেত হওয়ার জন্য মুসলিমদের সময় কেন্দ্রিক আর কোনো ঈদ নেই। এ সব দিনসমূহ হচ্ছে তাদের জন্য ঈদ পালনের দ্বীন নির্দেশিত দিবস। এ সকল দিবস ব্যতীত অপর কোনো দিবসকে কারো জন্ম দিবস হিসেবে আনন্দ প্রকাশের জন্য বা কারো মৃত্যু দিবস হিসেবে দুঃখ প্রকাশের জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ নামকরণ করা যাবে না এবং এটাকে কোনো ধর্মীয় কাজ মনে করে তাতে সমবেত হওয়াও যাবে না।

যদিও সে দিবসটি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম দিবসও হয়ে থাকতে পারে।অনুরূপভাবে আমরা আরো অবগত হলাম যে, মুসলিমদের জন্য কা‘বা শরীফ, মিনা, মুযদালিফাঃ ও এর আশেপাশের নিদর্শনের (مشاعر) স্থানসমূহ ও ঈদের মাঠ ব্যতীত দ্বীন নির্দেশিত স্থান কেন্দ্রিক অপর কোনো ঈদ পালনের স্থান নেই। এ সকল স্থানের মধ্যে কা‘বা শরীফে আমরা সকলেই সব সময় পুণ্যার্জনের জন্য সমবেত হতে পারবো। অবশিষ্ট স্থানসমূহে হাজীগণ কেবল হজ্জের সময়ে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে দূর ও নিকট থেকে সমবেত হতে পারবেন। কা‘বা শরীফের পাদদেশে আমরা বছরের প্রত্যেক দিনে এবং হাজীগণ আরাফার ময়দানে জিলহজ্জ মাসের নবম দিনে, মুযদালিফায় জিলহজ্জ মাসের নবম দিনের দিবাগত রাতে, মিনায় জিলহজ্জ মাসের অষ্টম, দশম, এগারো, বারো ও তেরো তারিখসমূহে এবংমাশায়ের (مشاعر) অর্থাৎ যে সকল নিদর্শনের স্থানসমূহে হাজীগণ হজ্জের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালনার্থে অবস্থান গ্রহণ করেন, সেখানেও হজ্জের সময় তারা ধর্মীয় কাজ হিসেবে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে সমবেত হতে পারবেন।

হজ্জের সময় ব্যতীত একমাত্র কা‘বা শরীফ ছাড়া উপর্যুক্ত এ সব স্থানসমূহে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে আগমনের ধর্মীয় কোনো গুরুত্ব নেই। অবশ্য আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি যে, কা‘বা শরীফসহ মসজিদে নববী এবং বায়তুল মাকদিস এ তিনটি মসজিদে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আগমন করার ব্যাপারে শরী‘আতের অনুমোদন রয়েছে। সুতরাং এ তিন মসজিদেই কেবল আমরা দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে সফর করে এসে সমবেত হতে পারবো। অন্য কোনো মসজিদ বা স্থানে নয়। এবার যদি আমরা উপর্যুক্ত সময় ও স্থানসমূহের সাথে অপর কোনো সময় ও স্থানকে সংযোজন করি, তবে তা যেমন দ্বীনীভাবে কোনো ছাড়পত্র পাবে না, তেমনি তা কোন পুণ্যার্জনের কাজ বলেও বিবেচ্য হবে না। বরং দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে তা একেকটি বেদ‘আতী কর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কেননা; উপর্যুক্ত সময় ও স্থান ব্যতীত মুসলিমদের জন্য দ্বীন নির্দেশিত অপর কোনো ঈদ পালন ও সফর করার স্থান নেই।

কেউ যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অপর কোনো অলি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাযারে তাঁদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসে সমবেত হয়ে সেখানে আনন্দ প্রকাশ করে, বা ওরস পালন করে, তা হলে এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাঁদের জন্ম দিবসকে ঈদের দিন এবং তাঁর ও তাঁদের কবরকে ঈদ পালনের স্থানে পরিণত করার শামিল হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁদের জন্ম দিবস আমাদের জন্য আনন্দের দিবস হয়ে থাকলেও তাঁদের জন্ম দিনকে ঈদের দিন বলে নামকরণ করে সেদিনে তাঁদের কবরে বা অন্যত্র কোথাও ঈদ পালন করার কোনো বৈধতা শরী‘আতে স্বীকৃত নয় কেননা; এমনটি করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে জাহেলী যুগের মুশরিকদের সে সব ঈদ পালনেরই ধারাবাহিকতা যা তারা তাদের দেব-দেবীদেরকে কেন্দ্র করে পালন করতো।

কবরমুখী হয়ে বা কবরের পার্শ্বে নামায আদায় করা

আল্লাহর উপাসনাকে শির্কমুক্ত রাখার জন্য কবরমুখী হয়ে বা কবরের পার্শ্বে নামায আদায় করা থেকে নিষেধ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

‘‘তোমরা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করবে না।’’ (মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল জানাইয, ২/৬৬৮;নাসাঈ, প্রাগুক্ত; ২/৬২; আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/১৩৫)।

যদি কেউ তা করে তবে তার এ সালাত দ্বারা আল্লাহর তা‘যীম আদায় না হয়ে কবরবাসীরই তা‘যীম প্রকাশিত হয়ে থাকবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো কোনো কবরের ভক্তদের মধ্যে এমনটি করার প্রচলন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ শরীয়তপুর জেলার ‘শুরেশ্বর’ কবরের ভক্তদের কথাই বলা যায়। তাদের অনেকেই তাদের পীরের কবরকে ক্বিবলার মত গণ্য করে সে দিকে মুখ করে সালাত আদায় করে থাকে। কবরের পার্শ্বে কবরের তা‘যীম করার উদ্দেশ্য ছাড়া সালাত আদায় করা হারাম, শির্ক নয়। তবে কেউ যদি কবরের তা‘যীম করার উদ্দেশ্যে এর পার্শ্বে সালাত আদায় করে, তা হলে শির্ক হিসাবে গণ্য হবে। মুল্লা আলী ক্বারী হানাফী উপর্যুক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন :

“এ তা‘যীম যদি কবর ও কবরস্থ ব্যক্তির জন্যে হয়ে থাকে, তা হলে তা‘যীমকারী কাফের হয়ে যাবে।” (মুল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী, আল-মিরক্বাত ফী শরহিল মিশকাত; ২/৩৭২)।

 দ্রুত দো‘আ কবুল হওয়ার আশায় মুরশিদ বা পীরের বৈঠকখানার দিকে মুখ করে দো‘আ করা

মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাওনা কেন সে দিকেই আল্লাহর দিক রয়েছে’’। (আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ : ১১৫)।

এ আয়াতের ভিত্তিতে যে কোনো দিকে মুখ করে আল্লাহকে ডাকা যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর দিকে মুখ না করে দ্রুত দো‘আ কবূলের জন্য তার মুরশিদ বা পীরের বৈঠকখানার দিকে মুখ করে, তা হলে এ উপাসনা আল্লাহর জন্য না হয়ে তার মুরশিদ বা পীরের জন্যেই হবে। এ জাতীয় কর্মের প্রচলন ফরিদপুর জেলার আটরশির বিশ্বজাকির মঞ্জিলের ভক্তদের মাঝে রয়েছে। অথচ আল্লাহর নিকট কিছু চাইতে হলে সরাসরি তা তাঁরই কাছে চাওয়ার নির্দেশ করে তিনি বলেছেন :

‘‘তোমরা আমাকে আহ্বান কর, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’’। (আল-কুরআন, সূরা গাফির : ৬০)।

আমরা যদি আল্লাহ- মুখী হয়ে তাঁর কাছে সরাসরি না চেয়ে অপর কোনো মৃত মানুষের মাধ্যমে তাঁর কাছে কিছু চাই, তা হলে এ চাওয়া আল্লাহর কাছে না হয়ে মধ্যস্থ সে ব্যক্তির কাছেই চাওয়া হিসেবে গণ্য হবে। কেননা; এ জাতীয় চাওয়া আল্লাহর নিকট সরাসরি চাওয়ার উপাসনায় তাঁর সাথে মধ্যস্থ ব্যক্তিকে শরীক করে নেয়া হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। আর এ জাতীয় উপাসনার ব্যাপারে হাদীসে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

‘‘যে ব্যক্তি কোনো কাজে আমার সাথে অপর কাউকে শরীক করে, আমি তাকে ও তার কর্মকে ছেড়ে দেই এবং এ কাজে যাকে সে শরীক করেছে, তাকেই সে কাজটি দিয়ে দেই।’’ (মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুয যুহদ, বাব নং: ৫, হাদীস নং ২৯৮৫; ৪/২২৮৯; আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/২০১)।

পীর-ওলীদের কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে বিনয় প্রকাশ করা

নামায হচ্ছে আল্লাহর সাথে বান্দার সাক্ষাতের সুবর্ণ সুযোগ ও মুনাজাত। এর মাধ্যমে বান্দা যেমন আল্লাহর তা‘যীম প্রকাশ করে, তেমনি অত্যন্ত সংগোপনে আল্লার কাছে তার মনের আকুতি, মিনতি ও প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করে। এ জন্য প্রয়োজন হয় বিনয় ও একাগ্রতার। সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা নামাযে তাঁর সম্মুখে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দাঁড়াবার নির্দেশ করে বলেছেন :

‘‘তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে (সালাত আদায় করার সময় তাঁর সামনে) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দাঁড়াও।’’ (আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ : ২৩৮)।

কেউ নামায আদায় করার উদ্দেশ্যে বিনয়ের সাথে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ালে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তা উপাসনার মত দেখালেও প্রকৃত অর্থে তা নামায হিসেবে তখনই গণ্য হবে যখন এর সাথে ভালবাসা ও এখলাসের সংমিশ্রণ হবে। নামাযে দাঁড়িয়ে একজন নামায আদায়কারী এভাবে আল্লাহর সম্মান ও তা‘যীম প্রকাশ করে থাকে। মানুষের পক্ষে এ ধরনের তা‘যীম প্রকাশ একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কারো জন্যে করা শির্ক। কিন্তু অনেক পীর ও আউলিয়া ভক্তদের দেখা যায় তারা নিজ পীর ও ওলিদের তা‘যীম করার জন্য তাঁদের পীরের সামনে বা ওলিদের কবরে অনুরূপ বিনয় প্রকাশের মাধ্যমে তাঁদের তা‘যীম করে থাকেন। সাথে সাথে কবরস্থ ওলিদের নিকট তাদের প্রয়োজনের কথাও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পেশ করে থাকেন যা সম্পূর্ণ শির্ক।

কবরের চার পার্শ্বে প্রদক্ষিণ করা

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হজ্জ এবং ‘উমরা পালনের সময় ছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়েও কেবলমাত্র মসজিদুল হারামের চার পার্শ্বে ত্বওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করার অনুমতি দিয়েছেন। এ কাজটি তাঁর সম্মান ও তা‘যীম প্রকাশের একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে বলেছেন :

‘‘তোমরা সম্মানিত গৃহ অর্থাৎ কা‘বা শরীফের চার পার্শ্বে ত্বওয়াফ কর।’’ (আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ২৯)।

ত্বওয়াফের এ উপাসনাটি কা‘বা শরীফের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার ফলে তা কোনো কবরে করা বৈধ হওয়া তো দূরের কথা, অপর কোনো মসজিদের চার পাশে করারও কোনো অনুমতি নেই। কেউ যদি আল্লাহর উপাসনার উদ্দেশ্যে তা কোনো মসজিদে করে তবে তা বেদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো ওলির কবরে করে, তবে তা শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদেরকে বিভিন্ন সময়ে ওলীদের কবরে এ ধরনের কর্ম করতে দেখা যায়। বিশেষ করে তথাকথিত শবে বরাতের সময় হাইকোর্ট কবরে এ ধরনের কর্ম অত্যন্ত বেশী হয়ে থাকে।

কবরকে সামনে রেখে রুকূ‘ ও সেজদা করা

রূকু‘ ও সেজদার মাধ্যমে আমাদের ভক্তি ও সম্মান লাভের একক অধিকারী হলেন মহান আল্লাহ। মানুষ কোনো মানুষকে এভাবে সম্মান করলে এটি একটি প্রত্যক্ষ শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গের সম্মানের শর‘য়ী পন্থা হচ্ছে-তাঁদের আগমনের সংবাদ পেলে তাঁদেরকে এগিয়ে নিয়ে আসা, বা আসতে দেখলে এগিয়ে যেয়ে সালাম, মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করা, কপালে ও হাতে চুমু দেওয়া। সাধ্যানুযায়ী আদর ও আপ্যায়ন করা। তাঁদের বিদায়ের সময় তাঁদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও সম্মানের সাথে বিদায় করা। কিন্তু ওলি ও পীরদের ভক্তগণ মানুষকে সম্মান প্রদর্শনের এ বৈধ পন্থা অতিক্রম করে অলিগণের কবরে সেজদা করে থাকেন এবং পীরদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাদের পায়ে পড়ে সেজদা করে থাকেন; কেননা তাদের দৃষ্টিতে ওলি ও পীরদের মন জয় করাই হলো প্রকৃত কাজ। তা করতে পারলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে! এ উদ্দেশ্যেই দেওয়ানবাগের পীরকে তার ভক্তরা সেজদা করে থাকে।

কবর পূজার বিরুদ্ধে আন্দোলন

এ দেশের মুসলিমদের এ হেন অবস্থা দৃশ্যে হাজী শরী‘আত উল্লাহই (মৃত ১২৬৭হি:/১৮৫০খ্রি.) হলেন প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি পীর ও কবর পূজার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। জনগণকে তিনি তাঁর আন্দোলনের দ্বারা দ্বীনের অত্যাবশ্যকীয়বিষয়াদি (فرائض الدين) সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। যার ফলে তাঁর এ আন্দোলন ‘ফারায়েযী আন্দোলন’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। (গোলাম ছাকালায়েন, প্রাগুক্ত; পৃ. ২০১)।

তাঁর এ আন্দোলন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জেমস টেইলর বলেন :

‘‘হাজী শরী‘আত উল্লাহ পীর ও কবর পূজা এবং গাজী, ফাতেমা ও অন্যান্যদের উদ্দেশ্যে হালুয়া দান- এ জাতীয় যে সকল কর্মের সাথে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির কোনই সম্পর্ক নেই এ সবের বিরুদ্ধে তাঁর যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যয় করেন।’’ (আব্দুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত; পৃ. ২০২)।

ভারত, বাংলাদেশ ও অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহে এভাবে শির্ক, অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা প্রসারিত হতে থাকায় এক সময় গোটা মুসলিম বিশ্ব থেকে পরিচ্ছন্ন ইসলামই পর্দার অন্তরালে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এ অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী বলেছেন :

‘‘শির্ক, অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার বিবিধ নেক্বাব পরিচ্ছন্ন ইসলামকে আবৃত করে ফেলার উপক্রম হয়েছিল। ধর্মীয় বিধানের উপরে এমন সব বেদ‘আতী কর্মকাণ্ড উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল যা মুসলিমদের জীবনের বিস্তর স্থান দখল করে নিয়েছিল, তাদেরকে সঠিক দ্বীন পালন ও দুনিয়া অর্জন করতেও বিরত রেখেছিল।’’ (আবুল হাসান ‘আলী নদভী, মা-যা খাসিরাল আ-লামু বি ইনহেত্বাত্বিল মুসলিমীন; ‘‘মুসলিমদের অধঃপতনের ফলে বিশ্ব কি ক্ষতির সম্মুখীন হলো’’, (আল-ইত্তেহাদুল ‘আলমিল ইসলামী লিল মুনাজ্জামাতিত ত্বুল্লাবিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, ১৯৮১ খ্রি.), পৃ. ১৯৪-১৯৫)।

এ প্রসঙ্গে মিসরের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাহমুদ শালতুত বলেন : ‘‘অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মত মুসলিমদের মধ্যেও একটি ভ্রান্ত চিন্তা অনুপ্রবেশ করেছে যে, রাসূলগণ ছাড়াও আল্লাহর বান্দাদের মধ্যকার এমন একদল বান্দাও রয়েছেন যাদেরকে আল্লাহ ইহজগত পরিচালনার দায়িত্ব দান করেছেন। তাঁদেরকে মানুষের দো‘আয় সাড়া দেবার যোগ্যতা দান করেছেন। সকল সৃষ্টিকে তাঁদের প্রতি মুখাপেক্ষী করে এবং বিপদের সময় তাঁদের নিকট সাহায্য চাওয়ার অধিকার দিয়ে সকলের উপর তাঁদেরকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন।

সকল মানুষের সমাধি থেকে তাঁদের সমাধিকে- এর উপর গম্বুজ নির্মাণ করা, মোমবাতি জালানো, বরকত অর্জনের জন্য তাঁদের কবরের উপর হাত বুলানো ও পর্দা টানানো ...ইত্যাদির মাধ্যমে- বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। এ ছাড়াও তাঁদের উদ্দেশ্যে মানত করা যায় এবং যাবতীয় ধরনের হাদিয়া তুহফা তাঁদের নিকট পেশ করা যায়। এ জাতীয় ধ্যান-ধারণা ও কর্ম সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে যেমন বিস্তৃতি লাভ করেছে, তেমনিভাবে তা অমুসলিম সাধারণ মানুষের মাঝেও বিস্তৃতি লাভ করে।’’ (মাহমূদ শালতূত, আল-ইসলামু ‘আক্বীদাতুন ওয়া শরী‘আতুন; (কায়রো : দারুশ শুরুক, ১৭তম সংস্করণ, ১৯৯৭ইং), পৃ. ৪০)।

বিভিন্ন মনীষীদের এ সব বক্তব্যের দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের দেশসহ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই অধিকাংশ মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসে মারাত্মক বিকৃতি সাধিত হয়েছিল। ধর্মের নামে তারা অধর্মের কর্মে লিপ্ত হয়েছিল।

ওলীদেরকে তাঁদের উপযুক্ত স্থানে না বসিয়ে তাঁদের মর্যাদা দানের ক্ষেত্রে তারা অতিমাত্রায় সীমালঙ্ঘন করেছিল। তাঁদের কবরগুলোকে শির্ক ও বেদ‘আত চর্চার আখড়ায় পরিণত করেছিল। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার পূর্বের তুলনায় অধিক হওয়াতে অবস্থার অনেকটা উন্নতি সাধিত হয়েছে। অতীতে ওলীদের কবরে গেলে যেভাবে মুসলিমদেরকে ভক্তি ও সম্মানের তাড়নায় তাঁদের কবর ও কবরে সেজদায় পড়ে থাকতে দেখা যেতো, বর্তমানে আর সে পরিমাণে দেখা যায় না। কবরে সেজদা করার বিষয়টি এখন অনেকের কাছে গর্হিত কাজ বলে মনে হলেও ওলীদের ব্যাপারে তাদের মনে অতিরিক্ত যে সব ধ্যান-ধারণা পূর্ব থেকে লালিত ছিল তা শুধু দেশের সাধারণ মুসলিমদের মধ্যেই নয় অনেক বিজ্ঞ লোকদের মাঝেও তা যথারীতি বিদ্যমান রয়েছে।

বাংলাদেশে শির্ক চর্চার কেন্দ্রসমূহ

আমাদের দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় শির্ক চর্চা করার যে সব কেন্দ্র রয়েছে তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করলে দেখা যায় যে, সংখ্যার দিক থেকে যেমনি তা অগণিত, প্রকারের দিক থেকেও তেমনি তা বিভিন্ন রকমের। চিন্তা করলে এগুলোকে মোট আট প্রকারে বিভক্ত করা যায়।

প্রথম প্রকার: এমন সব কেন্দ্র যা ওলীদের কবরকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে

এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুগে যুগে অসংখ্য আউলিয়া ও সৎ ব্যক্তিবর্গের শুভাগমন হয়েছিল। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল এদেশের পথভ্রষ্ট মানুষদেরকে তাওহীদের সন্ধান দান করা এবং তাদেরকে সকল সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসে পরিণত করা। এ চেষ্টা ও সাধনা করতে করতে তাঁদের অনেকে এ- দেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন শাহ জালাল, শাহ পরান, শেখ বদর ও আল্লামা কেরামত আলী জৌনপুরীসহ আরো অগণিত মনীষীগণ।

বহুকাল অতিবাহিত হয়ে যায় তাঁদের কারো সমাধি বা বিশ্রাম স্থলের উপর কোনো প্রকার স্থাপনা ও গম্বুজ নির্মাণ করা হয় নি। কবরের উপর টানানো হয় নি কোনো পর্দা। ছিল না এর কোনো খাদেম; কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে শুরু হয়ে যায় তাঁদের ভক্তদের সাথে শয়তানের প্রাচীনতম খেলা। কাওমে নূহ এর মত তাদের অন্তরেও সে এ ধারণার জন্ম দিল যে, এ সব ওলিগণ হলেন আমাদের ও আল্লাহর মধ্যকার মাধ্যম, তাঁরা হলেন আল্লাহর নিকট আমাদের যাবতীয় অভাব ও অভিযোগ উপস্থাপনের ব্যাপারে শাফা‘আতকারী। আল্লাহর সন্তুষ্টি তাঁদের সন্তুষ্টির মাঝেই নিহিত, তাঁরা মরে গেলেও রূহানী শক্তি বলে তাঁরা আমাদের দুনিয়া-আখেরাতের অনেক কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূর করতে পারেন।

এভাবে যারা এখানে এসেছিলেন শির্ক নিপাত করে ইসলামের তাওহীদী পতাকা উড্ডীন করতে, কালের পরিক্রমায় শয়তানের প্ররোচনায় তাঁদের কবর ও বিশ্রামের স্থানসমূহই ইসলামকে ধ্বংস করার ও শির্ককে প্রসারিত করার অসংখ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁরা যেখানে জনগণকে শির্কের অপরাধে জাহান্নামে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন, সেখানে তাঁদেরকে কেন্দ্র করেই শয়তান এমন সব ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা সৃষ্টি করে দিলো, যার মাধ্যমে সে জনগণকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার পথকে সুগম করে ফেললো। তাদেরকে কীট-পতঙ্গের ন্যায় জ্বলন্ত আগুনে ঝাপ দিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিল।

উল্লেখ্য যে, ওলীদের কবর কেন্দ্রিক শির্কের কেন্দ্রসমূহ শির্কের অন্যান্য কেন্দ্রসমূহের তুলনায় সংখ্যায় কম হলেও এগুলোর অপকারিতা ও অনিষ্টতা অন্যান্যগুলোর চেয়ে অধিক; কারণ, এ সব কেন্দ্রের মধ্যে এমনও কেন্দ্র রয়েছে যা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে এবং তা তাদের দুনিয়া-আখেরাতের মুক্তি! অর্জনের সহজ ও সরল মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শাহ জালাল (রহ.)-এর কবর :

এক্ষেত্রে শাহ জালাল (রহ.)-এর কবর প্রথম স্থান অধিকার করেছে। যার ফলে সেখানে দৈনন্দিন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে শত শত লোক তাদের মনোবাঞ্ছনা পূরণের উদ্দেশ্যে আগমন করে। আমার এ গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ উপলক্ষে আমি ১৯৯৯ সালে সেখানে গিয়েছিলাম। আগত ব্যাক্তিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে তার পরিচয় জানতে চাইলে লোকটি বললো : সে কুমিল্লা জেলা থেকে তার একটি মানত পূরণের উদ্দেশ্যে সপরিবারে এখানে আগমন করেছে। অনেককে দেখলাম কবরের খাদিমের নিকট টাকা, মোমবাতি ও আগরবাতি দিচ্ছে। কেউবা কবরের গিলাফের উপর গোলাপজল ছিটাচ্ছে। আরেকজনকে দেখলাম কবরের উত্তর পূর্ব পার্শ্বে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আগরবাতি জ্বালাচ্ছে।

এ সবই অবলীলায় করা হচ্ছে সকলের মানত পূর্ণ করার নিমিত্তে। অনুরূপভাবে আরো দেখলাম কিছু লোক কবরের চার পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করে রয়েছে। আবার অনেকে কবরের পশ্চিম উত্তর পার্শ্বের নির্ধারিত স্থানে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছে। আবার পুকুরে গিয়ে দেখলাম কেউ কেউ পুকুরের মাছগুলোকে ছোট ছোট মাছ খেতে দিচ্ছে। অনেকে কবরের বড় বড় ডেগ ও কূপে টাকা দান করছে। কূপ থেকে অপরিষ্কার ময়লা পানি নিয়ে পান করছে। এক ব্যক্তি এ ময়লা পানি বোতলে ভরে বিক্রি করছে। এ সবই করা হচ্ছে কবরবাসী শাহ জালাল (রহ.) এর নিকট এ আকুতি প্রকাশ করতে- তিনি যেন তাদের ইহকালীন কল্যাণ এনে দেন এবং অকল্যাণ দূর করে দেন।

অথবা তিনি যেন আল্লাহর নিকট সে জন্য শাফা‘আত করেন। আর সে জন্যই তারা কবরের পার্শ্বে অত্যন্ত ভগ্ন হৃদয়ে ও বিগলিত চিত্তে নেহায়েত অনুনয়-বিনয়ের সাথে দো‘আ করছে। তাদের ভাবটা যেন এমন যে, তারা যেন বিপদে পড়ে তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থী হয়ে হাত তুলেছে, তিনি ছাড়া যেন তাদের আর কোনো আশ্রয় স্থল নেই। তিনি ছাড়া তাদের উপর আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হওয়ারও কোনো উপায় নেই। পৃথিবীর চলমান ঘটনা প্রবাহে তাঁর প্রভাব সম্পর্কে জনমনে এ বিশ্বাসও রয়েছে যে, যে মাটিতে শাহ জালালের কবর রয়েছে সে মাটির নিকটে বা দূরে কোথাও কোনো মারাত্মক অঘটন ঘটতে পারে না। সে কারণেই একটি বিমান দুর্ঘটনায় কোনো হতাহত না হওয়ার ফলে পত্রিকান্তরে এ মর্মে মন্তব্য প্রকাশিত হয় যে, সিলেটের মাটিতে শাহ জালাল (রহ.) শায়িত রয়েছেন বলেই বিমানের আরোহীরা নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল।

উক্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে বা তাঁর রূহানী নেক নজর লাভের আশায় কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর কবর যিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারাভিযান আরম্ভ করতেও দেখা যায়।

শরফুদ্দীন চিশ্তী (রহ.)-এর কবর :

এ জাতীয় কেন্দ্রসমূহের মধ্যে অপর উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হচ্ছে রাজধানী ঢাকার হাইকোর্টে অবস্থিত শাহ শরফুদ্দিন চিশতী বেহেশ্তী (রহ.)-এর কবর। এ কবরটি বর্তমানের ন্যায় অতীতে এতো প্রসিদ্ধ ছিল না। রাজধানী ঢাকাতে অবস্থিত কবর ও কবরসমূহের উপর উর্দূ ভাষায় লিখিত একটি গ্রন্থে এ কবর সম্পর্কে লেখক যা বলেছেন, পাঠকদের বুঝার সুবিধার্থে সংক্ষেপে এর কিছু কথা অনুবাদ করে নিম্নে তুলে ধরা হলো:

‘‘অতীতে এ কবরের কিছু অনুসারী ছিল, যারা এ কবর যিয়ারত করতে আসতো। এ কবরবাসী সম্পর্কে সঠিকভাবে আমার কিছুই জানা নেই। আমার ধারণামতে এ কবরবাসী ব্যক্তি নওয়াব আলাউদ্দিন ইসলাম খাঁন চিশ্তীর কোনো নিকটাত্মীয় বা তাঁর কোনো সাথী হয়ে থাকবেন। এ কবরটি সরকারী জমির মধ্যে অবস্থিত হওয়ার কারণে বৃটিশ সরকার এ কবরটি নিশ্চিহ্ন করার জন্যে বারংবার চেষ্টা করেছে এবং এ উদ্দেশ্যে এর আশে-পাশে গাছও লাগিয়েছে। এর ভক্তদের দ্বারা কবরের উপর নতুন করে কোনো স্থাপনা বা গম্বুজ ইত্যাদি নির্মাণ করতেও বারণ করেছে, যাতে কবরকে ঘিরে পুরাতন যে দেওয়াল বা গম্বুজ রয়েছে তা সূর্যের আলোর অভাবে শেওলা ধরার ফলে ধীরে ধীরে নিজ থেকেই ধসে পড়ে।’’

বৃটিশ শাসনামলের শেষ সময়ে এ কবরের এ জীর্ণ অবস্থা ছিল। তবে স্বাধীনতা উত্তরকালে এ কবরটি তার ভক্তদের দ্বারা পুরো মাত্রায় লালিত হতে আরম্ভ করে এবং ধীরে ধীরে এর প্রসিদ্ধিও দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বর্তমানে প্রসিদ্ধির ক্ষেত্রে এটি প্রায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এক সময় এখানে ছিল না কোনো মসজিদ। কোনো কবরকে বা কবরকে কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মাণ করা শরী‘আতে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে এ কবরের ভক্তদের দ্বারা এ কবরকে ঘিরেই মসজিদ নির্মিত হয়েছে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে শবে বরাতের রাতে এ কবর দর্শন করতে গিয়ে দেখেছিলাম, হাজার হাজার বনী আদম এ কবরের চার পার্শ্বে ত্বওয়াফ করছে। এ অবস্থা দেখে আমার মনে হচ্ছিল- তারা যেন কা‘বা শরীফের চার পার্শ্ব দিয়ে প্রদক্ষিণ করছে। সে সময়ে এ কবরটির পরিবেশ বর্তমানের চেয়ে অত্যন্ত খারাপ ছিল।

তখন কবরে অনেককে সেজদায় পড়ে থাকতে দেখা যেতো। কবরসহ পুরা এলাকাটি তখন মাথায় জটধারী নেংটা ফকীর, আউল-বাউল, মদ ও গাঁজাখোরদের আস্তানা ছিল। বর্তমানে এ কবরের অবস্থা অনেকটা উন্নতি লাভ করেছে। ১৯৯৯ সালে এ কবরটি পুনরায় দেখতে গেলে আমি আগের সেই অবস্থা দেখতে পাই নি। তবে এ কবরের উদ্দেশ্যে মানত করার এবং এখানে তা পূর্ণ করার সাধারণ মানুষের চিরাচরিত যে রীতি ছিল, বর্তমানেও তা পুরোমাত্রায় বহাল রয়েছে বলে দেখতে পেলাম। আরো দেখতে পেলাম একদল মানুষ কবরকে ঘিরে রয়েছে। এদের কেউবা বসে কিছু ধ্যান করছে, কেউবা দাঁড়িয়ে কিছু পাঠ করছে, আরেক দল মানুষ উচ্চ স্বরে মিলাদ পাঠ করছে। কিছু লোককে দেখলাম কা‘বা শরীফের ন্যায় এ কবরের বেষ্টনী ও দরজার চৌকাঠের উপর হাত মুছে নিয়ে নিজ মুখ ও শরীরে হাত বুলিয়ে বরকত হাসিল করছে।

কবর থেকে বের হওয়ার সময় বেআদবী হলে অনিষ্টের ভয়ে পিট পিছনে রেখে বের হচ্ছে। আরো দেখলাম কবর থেকে দূরে মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে মোমবাতি জ্বালানো রয়েছে। একটি যুবককে দেখলাম কা‘বা শরীফের গিলাফ ধরে চুম্বন করে বরকত অর্জন করার ন্যায় মসজিদের উত্তর পার্শ্বের দেওয়ালে লাগানো হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ও ‘আব্দুল কাদির জীলানী (রহ.)-এর কবরের গিলাফদ্বয়ে ঠোঁট দিয়ে চুম্বন করছে এবং গাল দিয়ে তা স্পর্শ করে তাত্থেকে বরকত গ্রহণ করছে।

উপর্যুক্ত এ জাতীয় শির্কী ও বেদ‘আতী কর্মে যে শুধুমাত্র আমাদের দেশের সাধারণ মুসলিমরাই জড়িত রয়েছে, তা নয়, বরং এ জাতীয় গর্হিত কর্মে সকল মুসলিম দেশের সাধারণ মুসলিমরাও জড়িত রয়েছে। এ জন্য মুসলিমদের এ জাতীয় কর্মের উপর আক্ষেপ করে আল্লামা আহমদ বাহজাত বলেন :

‘‘এ নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত না হওয়ার জন্য ইসলাম ধর্মে অনেক দলীল প্রমাণাদি দাঁড় করানো সত্ত্বেও মুসলিমরা ওলীদের কবরে মসজিদ বানিয়েছে, তাঁদের সমাধিকে দৃঢ় ও মজবুত করার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করেছে, এমনকি এমন সব নামের উপরেও সমাধি তৈরী করেছে যে নামে আসলে কোনো ব্যাক্তিরও অস্তিত্ব নেই। বরং তা তৈরী করা হয়েছে কাঠের তখতী ও জীব জন্তুর লাশের উপর। এ অবস্থা সত্ত্বেও এগুলো জনগণের দ্বারা আবাদকৃত এমন সব কবর, যা বিপদ দূরীকরণ, রোগমুক্তি ও কঠিনকে সহজতর করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে (আগমনের জন্য) উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে।’’

আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর কবরঃ

এ দিকে চট্রগ্রামের আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর কবরও প্রসিদ্ধির দিক থেকে পিছিয়ে নেই। সেখানে বার্ষিক ওরসে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই আপন আপন প্রয়োজন পূরণার্থে একত্রিত হয়ে থাকে। ভক্তরা তাঁর প্রশংসায় কবিতার পুস্তক পর্যন্ত রচনা করেছে। এ কবরের ভক্ত এক হিন্দু কবি তার পুস্তকে নিজ গুরুকে স্বয়ং আল্লাহর অবতার বলে দাবী করেছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত কথা আমরা ইন-শাআল্লাহ শির্কের বাস্তব প্রমাণাদি বর্ণনা প্রসঙ্গে পরবর্তীতে আলোচনা করবো।

এভাবে জনগণ প্রত্যেক ছোট ও বড় ওলিদের কবরগুলোকে পবিত্র স্থানে পরিণত করে হিন্দুদের ‘বৃন্দাবন’ ও ‘কাসী’র ন্যায় তীর্থযাত্রার স্থানে পরিণত করেছে। সেগুলোকে বিপদের সময় আশ্রয় নেবার স্থান বানিয়ে নিয়েছে। যাবতীয় অসুখ-বিসুখ দূরীকরণ ও প্রয়োজন পূরণার্থে তারা সেখানে এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করে যেমন আরবের মুশরিকরা তাদের দেবতাদের পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করতো। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নিশীথ রাতে নিজ গৃহে বসে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও অনুনয় বিনয় করার পরিবর্তে তারা এ সব ওলিদের কবরে এসে কান্নাকাটি ও অনুনয় বিনয় করে। উদ্দেশ্য তাঁরা যেন তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন এবং তাদের আকুতি ও মিনতির কথা স্মরণ করে আখেরাতের ভয়াবহ দুর্দিনে যেন তাঁরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করেন।

একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ঘর মসজিদ ছাড়াও অন্য কোন মাজার বা কবরে অবস্থান তথা সেখানকার খাদিম হওয়া যায় এমন মনে করার শির্ক

আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের মধ্যে সাওয়াবের নিয়্যাতে একমাত্র তাঁর ঘর মসজিদে অবস্থান তথা ই’তিকাফ করার অনুমতি দিয়েছেন। অন্য কোথাও নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আলাইহিমাস্ সালাম) থেকে এ বলে অঙ্গীকার নিয়েছি যে, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজ্দাহ্কারীদের জন্যে পবিত্র রাখো’’। (সুরা আল বাক্বারাহ্ : ১২৫)।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

‘‘তোমাদের কারোর জন্য জ্বলন্ত কয়লার উপর বসা খুবই উত্তম কোন কবরের উপর বসার চাইতে। যদিও জ্বলন্ত কয়লার উপর বসলে তার কাপড় জ্বলে শেষ পর্যন্ত তার শরীরের ৎ-চামড়াও জ্বলে যাবে তবুও’’। +

কবরের খাদিমরা সরাসরি কবরের উপর না বসে থাকলেও কবরের উপর বসার ন্যায়ই। কারণ, কবরের পাশেই তাদের অবস্থান এবং কবরকে নিয়েই তাদের সকল ব্যস্থতা। সুতরাং উক্ত হাদীস তাদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হওয়া একেবারেই অবাঞ্ছিত নয়।

কবরের খাদিম হওয়ার উদ্দেশ্য :

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ‘হিরনাল’-এর কথিত শাহ আলম আল-হাদী এর কবরের খাদেমকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- আপনি এ কবরের খাদেম হলেন কেন? লোকটি উত্তরে বললো :

‘‘এ কবরের খাদেম হয়েছি এ আশা নিয়ে যে, আমার এ খেদমত দেখে কবরস্থ ওলি আমার উপর দয়াবান হবেন এবং তাঁর কবরের খাদেমী করার কথা স্মরণ করে আখেরাতে আমাকে সাথে না নিয়ে জান্নাতে যেতে লজ্জাবোধ করবেন।’’

ওলিদের কবরের ভক্তদের সেখানে যেয়ে মিনতি করার পার্থিব উদ্দেশ্য হয়তো বিভিন্ন রকমের হতে পারে; কিন্তু তাদের সকলের পরকালীন উদ্দেশ্য একটাই যা উক্ত শাহ আলম আল-হাদীর কবরের খাদেমের বক্তব্যের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। অথচ তারা জানে না যে, ভাগ্য নির্ধারণের মালিক যেমন এককভাবে আল্লাহ, তেমনি তা পরিবর্তনের মালিকও এককভাবে তিনিই। শরী‘আত নির্দেশিত কর্ম করার মাধ্যমেই তা পরিবর্তনের জন্য তাঁর নিকট মিনতি করতে হবে। ভাল-মন্দ সকল মানুষের মিনতি শুনার জন্যে তো তাঁর দরজা সকলের জন্য সমানভাবেই উন্মুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর যে সকল সাহাবীদের জন্য জান্নাতে যাওয়ার সনদপত্র প্রদান করা হয়েছে কেবল তাঁরা ব্যতীত পরবর্তী সৎ মানুষদের ব্যাপারে জান্নাতে যাওয়ার সুধারণা পোষণ করা গেলেও তা কারো জন্যে নিশ্চিত করে বলার অধিকার আমাদের নেই।

আর সে ধারণার ভিত্তিতে কোনো ওলি ও দরবেশের শাফা‘আত লাভের আশায় থাকারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা; তাঁরা প্রকৃতপক্ষে জান্নাতী কি না, তা আমরা জানি না। জান্নাতী হয়ে থাকলেও শাফা‘আত করার বিষয়টি তাঁদের মালিকানাধীন বিষয় নয় যে, তাঁরা যাকে যখন খুশী শাফা‘আত করবেন। বরং তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। কাকে কখন এর অনুমতি দেয়া হবে এবং কার জন্য হবে, তা কেবল তিনিই জানেন। তবে যারা আল্লাহর উলূহিয়্যাত বা রুবূবিয়্যাতে কোনো শির্ক করে মৃত্যুবরণ করবে, কুরআন ও হাদীসের বর্ণনামতে তাদের কারো শাফা‘আত প্রাপ্তির কোনই সুযোগ নেই।

দ্বিতীয় প্রকার : এমন সব কেন্দ্রসমূহ যা কোনো ওলির নিদর্শনের উপর নির্মিত হয়েছে :

এটি হচ্ছে এ দেশের সাধারণ মুসলিমদের সাথে শয়তানের তামাশা করার অপর একটি চিত্র। সে তাদেরকে ওলীদের কোনো কোনো নিদর্শনাদির উপর বা তাঁদের স্মৃতির সাথে জড়িত স্থানের উপর কোনো কবর ছাড়াই মাযার তৈরী করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, শাহ জালাল (রহ.)-এর কবর সিলেট শহরে থাকা সত্ত্বেও তাঁর নামে কুমিল্লা জেলার কোতয়ালী উপজেলার গাজীপুর গ্রামে একটি এবং একই জেলার সদর উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে অপর একটি কবর রয়েছে।

এ দু’টি কবর সম্পর্কে উক্ত এলাকায় এমন জনশ্রুতি রয়েছে যে, শাহ জালাল (রহ.) তাঁর কোনো এক সফরে এ দু’টি স্থানে যাত্রা বিরতি করেছিলেন এবং সে দু’টি স্থানে তাঁর হাত ও পায়ের নখ, গোঁফ ও দাড়ি ছেঁটে এখানে দাফন করেছিলেন। পরবর্তীতে এ স্থান দু’টি জনগণের কাছে সম্মানিত স্থানে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে তা তাঁর কবরের সমান মর্যাদা পেতে থাকে। তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে সাধারণ লোকেরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে যা করে, এ দু’টি স্থানকে কেন্দ্র করেও এলাকার লোকেরাও তা-ই করে।

তৃতীয় প্রকার : পাগলদেরকে কেন্দ্র করে নির্মিত কেন্দ্রসমূহ :

যে সকল পাগল উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ থাকে, সাধরণত মানুষের সাথে কথা-বার্তা বলে না; বিভিন্ন কবর, গোরস্থান, জংগল ও বড় বড় বট গাছের তলায় রাত যাপন করে, রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ করে কারো নিকট কিছু চায় বা কাউকে কোনো বস্তু দান করে; এ জাতীয় পাগলদের প্রতি সাধারণ লোকেরা ভিন্নরকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকেন। এদেরকে অনেকেই আল্লাহর ওলি হিসেবে মনে করে থাকেন। এ জাতীয় পাগলদের মধ্যে কেউবা সত্যিকার অর্থেই পাগল হয়ে থাকে, আবার কেউবা ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটি করে পাগলের ভাব প্রকাশ করে থাকে। উদ্দেশ্য এ অবস্থাকে পুঁজি করে পরবর্তীতে জীবিকার্জনের একটি সহজ উপায় বের করা। তাই কিছু দিন এভাবে থাকার পর এরা উপযুক্ত স্থান দেখে নিজের জন্য একটি আস্তানা গড়ে তুলে এবং সেখানে বসেই সে সাধারণ মানুষের কল্যাণার্জনে ও অকল্যাণ দূরীকরণে নানারকম কবিরাজী, তেলপড়া, পানিপড়া ও তাবীজ-কবজ দিতে আরম্ভ করে।

সাধারণ লোকদের মনে এ ধরনের পাগলদের ব্যাপারে ওলি হওয়ার ধারণা রয়েছে বলেই তারা এ পাগলের নিকট থেকে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তাবীজ নিচ্ছে। তারা এদের সাথে সুন্দর আচরণ করে, এদের সাথে বেআদবী করলে বিপদ হতে পারে বলে মনে করে, এরা কারো নিকট টাকা চাইলে তা সে ব্যক্তির জন্য সৌভাগ্যের কারণ বলে মনে করে দ্রুত তা দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে, না দিলে সমূহ ক্ষতিরও আশঙ্কা করে। কোনো ব্যবসায়ীর নিকট টাকা চাইলে ব্যবসায়ে অধিক লাভের আশায় সে তাকে তা দ্রুত দান করে। এদের দিলে ব্যবসায়ে লাভ হয় ও অধিক বিক্রি হয়, আর না দিলে অন্যান্য দিনের তুলনায় এ দিনে বিক্রি কম হয়, এ মর্মে কিছু বাস্তব ঘটনার কথাও লোক মুখে শুনা যায়।

এ জাতীয় ঘটনা যদি সত্যিও হয় তবে এর অর্থ এ নয় যে, তা এ পাগলকে টাকা দেয়া বা না দেয়ার কারণে হয়েছে, বরং তা হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছার কারণেই। তিনি এ জাতীয় পাগলের দ্বারা জনগণের ঈমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করতে চান। তিনি দেখতে চান কার ঈমান মজবুত আর কার ঈমান দুর্বল। এদের কোনো কোনো কথার সত্যতা বাস্তবে প্রমাণিত হয়ে থাকে, তা দেখে সাধারণ লোকেরা তাদেরকে ওলি বলে মনে করে এবং তাদের সত্য কথাকে তাদের কারামত হিসেবে গণ্য করে; অথচ তারা জানে না যে, এ জাতীয় পাগলেরা জঙ্গল ও গোরস্থানে থাকার কারণে এদের সাথে তাদের অজান্তেই শয়তান জিনের সখ্যতা গড়ে উঠে।

আর এ জিনরাই সাধারণ লোকদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য এদের মুখে কিছু সত্য কথা বা কোনো তথ্য বলে দেয়। শয়তান এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বনী আদমকে যুগের পর যুগ বিভ্রান্ত করে আসছে। সাধারণ লোকেরা এভাবে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত হয়েই যুগে যুগে শির্কে লিপ্ত হয়েছে। যারা মিছেমিছি ওলি হওয়ার ভান করে সাধারণ মানুষদেরকে প্রতারণা করে তাদের সম্পদ ও ঈমান হনন করতে চায়, এদের সাথে যে শয়তানের সখ্যতা গড়ে উঠে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“বল, আমি তোমাদেরকে বলবো কি কাদের উপর শয়তান অবতরণ করে? শয়তান অবতরণ করে প্রত্যেক মিথ্যাবাদী গোনাহগারের উপর। তারা (ফেরেশ্তাদের নিকট থেকে) শ্রুত কথা তাদের নিকট এনে দেয়। এদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী।” (আল-কুরআন, সূরা আশ-শু‘আরা : ২২৩, ২২৪)।

পরিশেষে সকল মুসলিমদের অবগত করছি যে, ইসলামে পীর বলতে কিছু নেই। তবে আল্লাহর বন্ধু বা অলি আছে। বাংলাদেশে সুফি সম্রাট, বিশ্ব অলি, পীরানে পীর, পীরের ছেলে পীর ইত্যাদি নামে যারা খানকা, দরবার, দরগা ইত্যাদি খুলে ধর্ম ব্যবসা করে আসছে তাদের শিরক, কুফর আর বিদআতী কর্মকান্ডের জন্য এরা কেহই আল্লাহর অলি নয়। এদের সান্নিধ্যে যাওয়া আর শয়তানকে আব্বা বলে ডাকা একই কথা। এইসব পীরের বাবারও শক্তি নেই যে তারা সুপারিশ করে কোনো মুরিদকে জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করবে। কিয়ামতে এরা নিজেরাই থাকবে মহাবিপদে।

পরকালে প্রত্যেক সম্প্রদায়কে নেতাসহ (ইসলামি ও অনৈসলামিক দলের সকল নেতা, পীর, অলি, গাউস, কুতুব, সুফি সাধক) ডাকা হবে। পৃথিবীতে কারো অনুসরণ ও অনুকরণের ফল পরকালেও প্রতিফলিত হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো সেই দিনকে, যখন প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতাসহ ডাকা হবে। যাদের ডান হাতে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে, তাদের আমলনামা তারা পাঠ করবে এবং তাদের ওপর সামান্য পরিমাণ অবিচার করা হবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৭১)।

পরকালে বদকাররা আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে দুনিয়ায় তাদের পথভ্রষ্টকারী নেতাসহ। অন্ধ অনুকরণ ও আনুগত্যের কারণে সেদিন তাদের আফসোসের সীমা থাকবে না। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে বিষয়টি বিবৃত হয়েছে। অনুসারীরা অনুগতদের দোষারোপ করবে কেয়ামতের দিন। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আরো বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের আনুগত্য করতাম এবং তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল।’ (সুরা আহজাব: ৬৭)।

অনুসারীরা শুধু দোষারোপ করেই থামবে না; বরং নেতাদের দ্বিগুণ শাস্তি দাবি করবে। প্রসঙ্গটি পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবে—‘হে আমাদের প্রতিপালক, তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং তাদের দাও মহা অভিশাপ।’ (সুরা আহজাব: ৬৮)।

তখন দুনিয়ার দাম্ভিক নেতারা বলবে- ‘তোমাদের কাছে সত্য পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে তা থেকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরা নিজেরাই ছিলে অপরাধী।’ (সুরা সাবা: ৩২)।

অতএব এসব পীর থেকে সাবধান। কোনো সমস্যায় পড়লে সরাসরি আল্লাহকে ডাকবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

প্রখ্যাত আলেম লুৎফুর রহমান ফরায়েজী সাহেবের লিখিত

“আটরশী ও মাইজভান্ডার দরবারের আসল রূপ” এখানে উল্লেখ করা হলো

আমাদের বাংলাদেশে ভ্রান্ত আকীদাপন্থী নামধারী পীরদের মাঝে আটরশী ও মাইজভান্ডারীর দু’টি দরবার খুবই প্রসিদ্ধ। হিন্দুদের ধর্মগুরু ও তাদের মন্দিদের কার্যক্রমের অনুরূপ পরিচালিত হয় এসব দরবারগুলো।

হিন্দুদের মূর্তিপূজার মতই এসব দরবারে কবরপূজা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের মূর্তিদের ঘিরে যতগুলো রুসুম রেওয়াজ পরিচালনা করে হুবহু একই পদ্ধতির রুসুম রেওয়াজ এসব দরবারে পরিচালিত হয়।

যেমন

বর্তমান মূর্তিপূজকরা প্রধানত মূর্তিপূজায় ৪টি কাজ করে থাকেঃ

১. বছরে দু’বার মূর্তিকে কেন্দ্র করে বড় আকারের অনুষ্ঠান করে।

যথা- (ক) কালিপূজা (খ) দূর্গা পূজা।

ছোট আকারের পূজা আরো অনেক হয়। কিন্তু সারাদেশব্যাপী ধুমধামের সাথে এ দু’টি পূজা পালন করে থাকে।

এসময় তারা মূর্তিকে ঘিরে যা করে তারা সারাংশ হলঃ

২. মূর্তির সামনে প্রদিপ জ্বালায়।

৩. মূর্তির নামে মান্নত করে ও পশু বলি দেয়।

৪. মূর্তির সামনে মাথা নত করে ও সেজদা করে।

কবর বা মাযার পূজারীরা যা করে কবরকে কেন্দ্র করেঃ

১. বছরে দু’বার বড় আকারে উরস ও ফাতেহা মাহফিল নামে অনুষ্ঠান করে পীর বা বুযুর্গদের কবরকে ঘিরে।

২. কবরের সামনে মোমবাতি প্রজ্জ্বলিত করে নিয়মিত।

৩. কবরে শায়িত বুযুর্গের নামে মান্নত ও কুরবানী করে।

৪. কবরকে সামনে নিয়ে দুআ করে, ক্ষেত্র বিশেষে মাথানত ও সেজদাও করে।

বিজ্ঞ পাঠকের কাছে আমার জিজ্ঞাসা-মূর্তিপূজকদের মূর্তিপূজায় যে কর্মাদী করে আর আমাদের দেশের মাজারও কবরপূজারীরা যা করে এর মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে?

এবার আসুন দেখি কবর পূজারীদের কর্মকান্ড কুরআন ও হাদিসের মানদন্ডেঃ

(১) স্বীয় কবরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান করাকে নিষিদ্ধ করে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

“তোমরা স্বীয় ঘরকে কবর বানিয়ো না। (অর্থাৎ কবরের ন্যায় ইবাদত-নামায, তেলাওয়াত ও যিকির ইত্যাদি বিহীন কর না) এবং আমার কবরে উৎসব করো না।(অর্থাৎ বার্ষিক, মাসিক বা সাপ্তাহিক কোন আসরের আয়োজন কর না। তবে হ্যাঁ আমার উপর দুরূদ পাঠ কর। নিশ্চয় তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছে থাকে।(আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতারা পৌঁছিয়ে দেন।)” (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৬, সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং-২০৪২, সহীহ আল জামি‘ ৭২২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ রওযা মুবারকে উৎসব (উরস) পালন করতে বারণ করেছেন। তাহলে অন্য কে আর এমন আছে যার কবরে তা বৈধ হবে?

হাদীসের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার আল্লামা মুনাভী রহঃ এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-

 “এ হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, সাধারণ মানুষ যারা বছরের কোনো নির্দিষ্ট মাসে বা দিনে (উরসের নামে) ওলীদের মাযারে একত্রিত হয় এবং বলে-আজ পীর সাহেবের জন্ম বার্ষিকী (মৃত্যু বার্ষিকী), সেখানে তারা পানাহারেরও আয়োজন করে, আবার নাচ গানেরও ব্যবস্থা করে থাকে, এ সবগুলিই শরীয়ত পরিপন্থী ও গর্হিত কাজ। এ সব কাজ প্রশাসনের প্রতিরোধ করা জরুরী। (আউনুল মা’বুদ-৬/২৩)।

(২) কবরের সামনে বাতি প্রজ্জ্বলন করাকে হারাম সাব্যস্ত করে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

 “হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশম্পাত করেছেন (বেপর্দা) কবর যিয়ারতকারীনী মহিলাদের উপর, এবং সেসব লোকদের উপর যারা কবরকে মসজিদ বানায় (কবরকে সেজদা করে) এবং সেখানে বাতি প্রজ্জ্বলিত করে। (সুনান আততিরমিযী ৩২০; সুনান ইবনে মাজাহ ১৫৭৫, সুনান আননাসায়ী ২০৪৩; সুনান আবূ দাউদ ৩২৩৬; আহমাদ ২০৩১,২৫৯৮,২৯৭৭, ৩১০৮, ইরওয়াহ ৭৬২)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর অভিশম্পাত করেছেন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

(৩) আল্লাহ ছাড়া কারো নামে মান্নত বা কুরবানী করা যায়না। কারণ মান্নত ও কুরবানী হচ্ছে ইবাদত। আর ইবাদত আল্লাহ ছাড়া কারা জন্য করা জায়েজ নয়। মহান রাব্বুল

“আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই। তাঁর কোন অংশিদার নেই। আমি তা-ই করতে আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম আনুগত্যশীল”। (সূরা আনআম-১৬২-১৬৩)।

সূরা কাউসারে মহান রাব্বুর আলামীন বলেন- “অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন”। (সূরা কাউসার-২)।

সুতরাং পীরের নামে ও মাযারের নামে মান্নত করা কি শিরকী কাজ ছাড়া আর কী হতে পারে?

(৪) আল্লাহ ছাড়া কাউকে সেজদা করা সুষ্পষ্ট হারাম। কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও হাদীসে নববী দ্বারা যা দিবালোকের ন্যয় পরিস্কার। একথা মনে হয় অন্ধ পীর ও মাজারপূজারী ছাড়া সকল মুসলমানরাই জানে।

কুরআন ও হাদীসের উল্লেখিত বিবরণ মোতাবিক কবর ও মূর্তিপূজার সাযুজ্যতার মাধ্যমে আমরা সহজেই অনুমান করে নিতে পারি আমাদের দেশের আটরশী, মাইজভান্ডারীসহ মাযারপূজারী ও কবরপূজারীরা কি পরিমাণ শিরকী কর্মকান্ডে লিপ্ত।

আরবের মুশরিকদের শিরক কি ছিল?

মহান রাব্বুর আলামীন বলেন-

 “হে পয়গম্বর! আপনি মুশকদেরকে জিজ্ঞেস করুন যে, বল তো কে তোমাদেরকে আসমান জমিন থেকে রুযী কে দেন? এবং কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কে মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তারা পরিস্কার বলবে যে, মহান আল্লাহ। বল এরপরও কি তোমরা ভয় করবে না? (সূরা ইউনুস-৩১)।

আল্লাহ তায়ালাই মূল ক্ষমতার অধিকারী একথা আরবের মুশরিকরাও বিশ্বাস করতো, তারপরও তারা কাফের কেন?

এই সূরার প্রথমাংশে মহান রাব্বুল আলামীন এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে-

“আর তার (মুশরেকরা) আল্লাহ ভিন্ন এমন কতিপয়ের ইবাদত করে, যারা তাদের কোন অপকারও করতে পারেনা এবং তাদের কোন উপকারও করতে পারেনা, ও তারা বলে-এরা হল আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের সুপারিশকারী। (হে রাসূল!) আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ তায়ালাকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা আছে বলে তিনি (নিজেও) জানেন না, না আসমানে না জমিনে! তিনি তাদের শিরকী কার্যকলাপ হতে পবিত্র ও অনেক ঊর্দ্ধে”। (সূরা ইউনুস-১৮)।

আরবের মুশরিকরা আল্লাহকে স্রষ্টা স্বীকার করতো। আরবের মুশরিকরা কাবার হিফাযত করতো। কাবা তওয়াফ করতো। মেহমানদারী করতো। কিন্তু এরপরও তারা কাফির। তারা মুশরিক।

কেন?

কারণ তারা আল্লাহর সাথে সাথে মূর্তির কাছে সন্তান চাইতো। মূর্তির জন্য মান্নত করতো। মূর্তির নামে কুরবানী করতো।

এসব কারণে তারা মুশরিক। ধিকৃত।

প্রশ্ন হল, একই কাজ মাইজভান্ডারী, আটরশীর মাজারের মুরীদেরা করার পরও তারা খাঁটি মুসলিম থাকে কী করে? তারা কেনো মুশরিক নয়?

আটরশী ও মাইজভান্ডারীদের আরো কিছু কুফরী আকীদাঃ

আটরশী ও মাইজভান্ডারীদের মাঝে উপরোক্ত শিরকী কাজ ছাড়াও আরো অনেক ইসলাম ও কুরআন হাদীস বিরোধী আকীদা বিদ্যমান।

কয়েকটি নিচে উদ্ধৃত করা হলঃ

(১) ইসলাম আসার পর ইসলাম ছাড়াও অন্য যেকোন ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে আমল করে মানুষ আখেরাতে মুক্তি পেতে পারে। [মাইজভান্ডারী সিলসিলার দ্বিতীয় পীর সায়্যিদ দিলাওয়ার হুসাইন (মৃত্যু ১৯৮২ ইং) রচিত “বেলায়েতে মুতলাকা” গ্রন্থের ৮৯-৯১, ১২৯ পৃষ্ঠা দৃষ্টব্য]।

ঠিক একই বক্তব্য রয়েছে আটরশীর পীরের।

বিশ্ব জাকের মঞ্জিল, ২৫ই ফেব্রুয়ারী ১৯৮৪ ইং এর প্রকাশিত সংবাদঃ পীর সাহেব বলেন, “হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানগণ নিজ নিজ ধর্মের আলোকেই সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারে”।

অথচ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। (সূরা আলে ইমরান-১৯)।

আর আহলে কিতাবদের এবং নিরক্ষরদের [আরব মুশরকেদের] বলে দাও যে, তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? তখন যদি তারা আতœসমর্পণ করে, তবে সরল পথ প্রাপ্ত হলো, আর যদি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার দায়িত্ব হলো শুধু পৌঁছে দেয়া। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা। (সূরা আলে ইমরান-২০)।

যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা আলে ইমরান-৮৫)।

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ঐ সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, এ উম্মতের ইয়াহুদী বা খৃষ্টান যে-ই আমার দাওয়াত পাবে আর আমার আনীত দ্বীনের উপর ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, সে হবে জাহান্নামী। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৭৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৮৩, ইসলামিক সেন্টারঃ ২৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহঃ লিখেনঃ

 “ইয়াহুদ ও খৃষ্টানদের উল্লেখ এজন্যে করা হয়েছে যেন অন্যদের ব্যাপারে সতর্কারোপ হয়ে যায়। কেননা, ইয়াহুদ ও খৃষ্টানদের রয়েছে আসমানী কিতাব। তাদের নিকট আসমানী কিতাব থাকা সত্ত্বেও যখন অবস্থা এমন, তাহলে যাদের কিতাব নেই তাদের অবস্থাতো বলার অপেক্ষাই রাখে না”। (শরহে মুসলিম-১/৮৬)

(২) মাইজভান্ডারীদের মতেঃ

(ক) তরীকত শরীয়ত থেকে ভিন্ন একটি বিষয়।

(খ) বিশেষ ব্যক্তিবর্গের জন্য শরীয়তের অনুসরণ করা জরুরী নয়।

(গ) বিশেষ ব্যক্তিবর্গের জন্যে নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদত পালন করা অপরিহার্য নয়।

(ঘ) বিশেষ ব্যক্তিবর্গের শরীয়ত ও কুরআন-হাদীস এবং সাধারণ মানুষের শরীয়ত ও কুরআন-হাদীস থেকে ভিন্ন।

(ঙ) সাধারণ মানুষের জন্যে শরীয়তে মুহাম্মদীর অনুসরণও আবশ্যক নয়, বরং নিজের ইচ্ছেমত যে কোন ধর্মের অনুসরণ করলেই আখেরাতে মুক্তি পাওয়া যাবে। দেখুন- মাইজভান্ডারীর পীরের লেখা “বেলায়েতে মোতলাকা” গ্রন্থের ১৬, ১১৮, ১১৯-১২০ নং পৃষ্ঠা।

এমন সব কুফরী আকীদা আমলে ভরপুর এসব ভান্ডারী ও আটরশীদের দরবার। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে হলে পড়ুন- মাওলানা আব্দুল মালেক দামাত বারাকাতুহুর লেখা “তাসাওউফ তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ” গ্রন্থটি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এসব ভ্রান্ত পীরদের ভন্ডামী থেকে আমাদের দেশের সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান ও আমলকে হিফাযত করুন। আমীন।

উক্ত বইয়ের প্রথম অংশ দেখতে এখানে ক্লিক করুন- (প্রথম অংশ)

রিলেটেড আরও বিষয় জানতে এদের উপর ক্লিক করুন,

(ক) পিরতন্ত্র বা সুফিবাদ বনাম ইসলাম-(শয়তানেরওহী কার উপর নাযিল হয়?)।

(খ) পির-অলিদের ভ্রান্ত আক্বিদাহসমূহ।

কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।

(PMMRC)

Author and compiler:

Md. Izabul Alam-M.A., C.In. Ed. (Islamic Studies-Rangpur Carmichael University College, Rangpur), prominent Islamic thinker, researcher, writer and Blogger.

(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)

(2) GENERAL DIRECTOR- PURE MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER (PMMRC),

(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS Coaching (BBC)

(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING INSTITUTE (PTI)

(5) PRINCIPAL- BANGLADESH ONLINE UNIVERSITY (BOU)

(6) GENERAL DIRECTOR AND CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION SERVICES (PIS)

(7) EDITOR-BDC CRIME NEWS24

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক

বইয়ের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। এজন্যে  আপনি বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।

(ক) আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।

(খ) তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর কি হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।

(গ)  আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস  সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮,  রিয়াদুস  সলেহিন,  হাদিস নং  ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঙ) জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত।

তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলামে যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ চালু করলো সে এ চালু করার সাওয়াব তো পাবেই, তার পরের লোকেরা যারা এ নেক কাজের উপর ’আমল করবে তাদেরও সমপরিমাণ সাওয়াব সে পাবে। অথচ এদের সাওয়াব কিছু কমবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করলো, তার জন্য তো এ কাজের গুনাহ আছেই। এরপর যারা এ মন্দ রীতির উপর ’আমল করবে তাদের জন্য গুনাহও তার ভাগে আসবে, অথচ এতে ’আমলকারীদের গুনাহ কম করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২২৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(চ) আবূ মাস্ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি কাউকে কোন কল্যাণের দিকে পথপ্রদর্শন করে, সে উক্ত কার্য সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৭৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৪৬, ইসলামিক সেন্টার ৪৭৪৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।


 Please Share On

পীরের আস্তানা শয়তানের কারখানা (দ্বিতীয় অংশ)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পীরের আস্তানা শয়তানের কারখানা (দ্বিতীয় অংশ)   পীর-অলি, সুফি-সাধকদের দরবার, দরগা ও মাজারগুলো শিরক, বিদআতের কারখান...