বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
অধিকাংশ মুসলমান যেসব গুণাহের সাথে জড়িত
গুণাহ বা পাপঃ গুনাহ
বলতে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা, তাঁর নিষেধমূলক কাজগুলো করা, অথবা তাঁর আদেশ পালন
না করাকে বোঝায়, যা পাপ বা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি মূলত শরিয়তের আদেশ-নিষেধ
লঙ্ঘন করা।
‘গুনাহ’
শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত হলেও এটি মূলত ফার্সি শব্দ। গুনাহ বুঝাতে বাংলায় আরও
একটি বহুল প্রচলিত শব্দ হচ্ছে পাপ। বাংলা অভিধানে এর অর্থ লেখা হয়েছে অন্যায়, কলুষ,
দুষ্কৃতি ইত্যাদি। পাপ হলো তাই, যা অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন,
নাওয়াস
ইবনে সামআন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পুণ্যবত্তা
হল সচ্চরিত্রতার নাম এবং পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে
জেনে ফেলুক—এ কথা তুমি অপছন্দ কর। (হাদিস সম্ভার ৩৭৯৬)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ওয়াবেস্বাহ
ইবনে মা’বাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এর নিকট এলাম। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি পুণ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে এসেছ? আমি বললাম,
’জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, তুমি তোমার অন্তরকে (ফতোয়া) জিজ্ঞাসা কর। পুণ্য হল তা, যার
প্রতি তোমার মন প্রশান্ত হয় এবং অন্তর পরিতৃপ্ত হয়। আর পাপ হল তা, যা মনে খটকা সৃষ্টি
করে এবং অন্তর সন্দিহান হয়; যদিও লোকেরা তোমাকে (তার বৈধ হওয়ার) ফতোয়া দিয়ে থাকে। (হাদিস সম্ভার ৩৭৯৭, আহমাদ ১৮০০১, ১৮০০৬, দারেমী ২৫৩৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
নবি-রাসুলগণ
ব্যতীত পৃথিবীতে যতো মানুষ এসেছিলেন এবং আছেন প্রত্যেকেই কোনো কোনো পাপের সাথে জড়িত।
যে ব্যক্তি বলবে সে নিষ্পাপ সে একজন মিথ্যেবাদী ও ভন্ড। রাসুল সাঃ বলেন,
আবদুল্লাহ
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) আল্লাহর কালামের এ বাণী, “ইল্লাল্লামামা’’ অর্থাৎ- “সগীরাহ্ গুনাহ
ছাড়া’’। এক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে আল্লাহ!
যদি তুমি ক্ষমা করো, ক্ষমা করো বড় গুনাহ। কেননা এমন কোন বান্দা আছে কি, যে সগীরাহ্
গুনাহ করেনি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৩৪৯, সুনান
আততিরমিযী ৩২৮৪, মুসতাদারাক লিল হাকিম ১৮০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭৪৬, সহীহ
আল জামি‘ ১৭১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহর
বান্দাগণ পাপ যদি না করতো তাহলে আল্লাহ তায়ালা এই মানুষ জাতিকে ধ্বংস করে অন্য জাতি
বানাতেন। রাসুল সাঃ বলেন,
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি তোমরা গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ
তা’আলা তোমাদেরকে সরিয়ে এমন জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত ও আল্লাহ তা’আলার কাছে
ক্ষমা চাইত। আর আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২৩২৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৮৫৬, ৬৮৫৭, ৬৮৫৮, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৭৪৮, ২৭৪৯, শু‘আবূল ঈমান ৬৭০০, সহীহাহ্ ১৯৫০, সহীহ আত্ তারগীব ৩১৪৯)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত
হাদিস দ্বারা পাপ বা গুণাহ করতে উৎসাহিত করা হয়নি বরঞ্চ পাপ কাজ হয়ে গেলে তওবার দিকে
উৎসাহ দেয়াই এই হাদিসের মূল উদ্দেশ্য।
পৃথিবীর
প্রত্যেক মানুষই যাদের কেউ না কেউ শিরক, কুফর, নিফাক ও বিদআতের সাথে জড়িত। তথা নিজের
ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অথবা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে সগিরা ও কবিরা গুণাহগুলো করে যাচ্ছে।
বর্তমান
সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাজটা চাঁদাবাজী, দখলবাজী, অস্ত্রবাজী, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি,
অসাধুতা, দলীয় কোন্দল, আদৰ্শহীনতা, উগ্রমেজাজ, নেতার প্রতি অনানুগত্যশীলতা, বেয়াদবী,
অভদ্রতা, দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান অধিকার করা, অপহরণ, খুন, মব সৃষ্টি করা, অশ্লীল ভাষা
প্রয়োগ করা, ধর্ষণ, নির্যাতন, নারী পুরুষ অবাধ মেলামেশা, সমকামিতা, নারী ভক্ষণ, নারী
ব্যবসা, নারী পাচার করা, শ্লীলতাহানি, নারী হেনস্থা করা, ইভটিজিং, টেন্ডারবাজী, ভূমিদস্যুতা,
ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন করা, মদ পান করা বা নেশা করা, মদ ব্যবসা, জুয়া খেলা, নাচ গান,
উলঙ্গ-বেহায়াপনা, পর্দাহীনতা, নিয়োগে বাণিজ্য করা, বিদেশে অর্থ পাচার করা, অবৈধ উপায়ে
টাকা উপার্জন করা, কোনো কাজের কমিশন ভোগ করা, মিথ্যে ওয়াদা করা, কথায় কথায় মিথ্যে কথা
বলা, নির্বাচনকালীন বক ধার্মিক সাজা, আমানতের খেয়ানত করা, ঋণখেলাপী করা, ব্যাংক লুট
করা, লোক দেখানো ইবাদত করা, ইসলামের বিরোধীতা করা, আলেমদেরকে অপমান করা, কাফির নাস্তিকদের
অনুসরণ করা বা তাদের পক্ষাবলম্বন করা, সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া/পুনর্বাসন করা,
ধোঁকাবাজী করা ইত্যাদিতে ভরপুর।
যারা
এসব পাপের সাথে জড়িত তারা নামাজও পড়ে, হজ্জও করে, যৎসামান্য যাকাতও দেয় আবার সাওমও
পালন করে। সরকারি চাকরিজীবিগণ প্রতিদিন ঘুষ না খেলে বড় মাছটা কেনাই হয় না। কিন্তু এটা
যে পাপ ঐ চাকরিজীবি ভুলেই গেছেন। যারা অবৈধ উপায়ে টাকা উপার্জন করে নিজের ও পরিবারের
লোকদের রক্ত মাংসা বৃদ্ধি করায় তথা যাদের অন্ন, বস্ত্র ও পানি হারাম তারা কখনো জান্নাতে
যেতে পারবে না।
(ক) আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দেহ হারাম খাদ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়েছে,
সে দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
২৭৮৭, সহীহাহ্ ২৬০৯, শু‘আবুল ঈমান ৫৭৫৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(খ) জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দেহের গোশত/গোশত হারাম উপার্জনে গঠিত, তা
জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম ধন-সম্পদে গঠিত ও লালিত পালিত দেহের জন্য জাহান্নামই
উপযোগী। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৭২, আহমাদ ১৪৪১,
শু‘আবুল ঈমান ৮৯৭২, দারিমী ২৭৭৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(গ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা পুত-পবিত্র, তিনি
পুত-পবিত্র জিনিসকেই গ্রহণ করেন। আল্লাহ তা’আলা যে কাজ করতে রসূলদের প্রতি নির্দেশ
করেছেন তদ্রূপ এই একই কাজের নির্দেশ মু’মিনদেরকেও করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :
’’হে রসূলগণ! পাক-পবিত্র হালাল রুযী খাও এবং নেক আ’মাল কর’’- (সূরা আল মু’মিনূন ২৩
: ৫১)। আল্লাহ তা’আলা আরো বলেনঃ ’’হে মু’মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যা উপজীবিকা স্বরূপ দান
করেছি সেই পাক-পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ কর’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ১৭২)।
অতঃপর
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দৃষ্টান্ত হিসেবে এক ব্যক্তির অবস্থা উল্লেখ
করে বলেন যে, এ ব্যক্তি দূর-দূরান্তের সফর করছে, তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীর ধূলাবালুতে
মাখা। এ অবস্থায় ঐ ব্যক্তি দু’ হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে ডাকছে, হে রব্!
হে রব্! কিন্তু তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পরনের পোশাক হারাম। আর এ হারামই সে ভক্ষণ
করে থাকে। তাই এমন ব্যক্তির দু’আ কিভাবে কবুল হতে পারে? (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২২৩৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১৫,
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৯৮৯, আহমাদ ৮৩৪৮, দারিমী ২৭১৭, সহীহ আল জামি‘ ২৭৪৪,
সহীহ আত্ তারগীব ১৭১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২২১৫, ইসলামীক সেন্টার ২২১৬)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের সামনে এমন একটি যুগ আসবে,
যখন কেউ কি উপায়ে ধন-সম্পদ উপার্জন করলো, হারাম না হালাল উপায়ে- এ ব্যাপারে কেউ কোনো
প্রকার পরোয়া করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬১,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২০৫৯, ২০৮৩,
নাসায়ী ৪৪৫৪, সহীহ আল জামি‘ ৮০০৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৭২২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯১৬
, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৯৩১)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(ঙ) নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট।
আর এ উভয়ের মধ্যে এমন অনেক সন্দেহভাজন বিষয় বা বস্ত্ত আছে, যে ব্যাপারে অনেক মানুষই
এগুলো হালাল, কি হারাম- এ বিষয়ে অবগত নয়। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় হতে
বিরত থাকবে, তার দীন ও মান-মর্যাদা পুত-পবিত্র থাকবে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহে পতিত থাকবে,
সে সহসাই হারামে জড়িয়ে পড়বে। বিষয়টি সেই রাখালের ন্যায়, যে রাখাল তার পশুপালকে নিষিদ্ধ
এলাকার সীমার কাছাকাছি নিয়ে চরালো, তার পাল অজান্তেই নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা
থাকে।
সাবধান!
প্রত্যেক দায়িত্বশীলেরই (প্রশাসন বা সরকারেরই) চারণভূমি (নিষিদ্ধ এলাকা) আছে, আর আল্লাহ
তা’আলার নিষিদ্ধ চারণভূমি হারামসমূহকে নির্ধারিত করেছেন। মনে রাখতে হবে, মানব দেহের
ভিতরে একটি গোশতপিন্ড আছে, যা ভালো থাকলে গোটা শরীরই ভালো থাকে। আর এটি নষ্ট হয়ে গেলে
বা বিকৃতি ঘটলে সমস্ত শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়। সেই গোশতপিন্ডটিই হলো ’কলব’ (অন্তঃকরণ)।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬২, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৫২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯৮৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৯৯, সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২০৫, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত ৩৩৩০, আহমাদ ১৮৩৭৪, দারিমী
২৫৭৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৩১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
গুণাহের প্রকারভেদ
গুনাহ
দুই প্রকার। যথাঃ
(ক) সগীরা গুনাহ (ছোট পাপ, যা বড় পাপ নয়) এবং
(খ) কাবীরা গুনাহ (বড় পাপ, যেমন শির্ক, হত্যা, পিতা-মাতার
অবাধ্যতা)।
সগীরা গুনাহ
সগীরা
গুনাহ অর্থ ছোট গুনাহ। যে সকল গুনাহের ব্যাপারে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ) সতর্ক
করেছেন কিন্তু কোন শাস্তির কথা বলেননি। যা নেক আমল করলেই ক্ষমা হয়ে যায় তওবার প্রয়োজন
হয় না। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘পাঁচ
ওয়াক্ত ছালাত, এক জুম‘আ হতে আরেক জুম‘আ, এক রামাযান হ’তে আরেক রামাযান এর মধ্যবর্তী
সকল গোনাহের জন্য কাফফারা হবে যদি কবীরা গোনাহ সমূহ থেকে বিরত থাকা যায়’।
হাদিসঃ
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমু’আহ্ হতে অপর জুমু’আহ্ পর্যন্ত এবং এক রমাযান হতে
আরেক রমাযান পর্যন্ত সব গুনাহে্র কাফফারাহ্ হয়, যদি কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহসমূহ থেকে
বেঁচে থাকা হয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৪, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৩৩, আহমাদ ৯১৯৭, সহীহাহ্ ৩৩২২, সহীহ আল জামি‘ ৩৮৭৫, সহীহ আত তারগীব ৬৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৪৪১, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৫৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
বলেন, যারা বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কর্ম সমূহ হতে বেঁচে থাকে ছোটখাট পাপ ব্যতীত (সে সকল
তওবাকারীর জন্য) তোমার প্রতিপালক প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী’। (সুরা নাজম ৫৩/৩২)।
সগীরা
গুনাহের সংজ্ঞায় ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন। যেমন ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,
প্রত্যেক যে সকল পাপের জন্য জাহান্নামের শাস্তি, আল্লাহর গযব, লা‘নত প্রভৃতির কথা উল্লেখিত
হয়েছে, তা কবীরা গুনাহ। এমন গুনাহের সংখ্যা ৭০টির মত। (তাফসীর
কুরতুবী ৫/১৫৯)।
সগীরা
গুনাহের উদাহরণ যেমন- বেগানা নারীর প্রতি অনৈতিক দৃষ্টি নিক্ষেপ, কাউকে গালি প্রদান,
হিংসা করা, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া ইত্যাদি।
তবে
সগীরা গুনাহ বার বার করলে তা কবীরা গুনাহে পরিণত হয়। যেমন হযরত ওমর ও ইবনু আববাস প্রমুখ
থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘বারবার ছগীরা গোনাহ করলে সেটি আর ছগীরা থাকে না এবং ক্ষমা প্রার্থনা
ও তওবা করলে আর কবীরা গুনাহ থাকে না’। (নববী, শরহ মুসলিম ২/৮৭)। যেমন পরনারীর প্রতি
দৃষ্টি দেয়া সগীরা গুনাহ। কিন্তু কেউ কেউ বার বার তাকালে তা কবীরা গুনাহ হয়ে যাবে।
(ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৫/২৯৩)।
সেজন্য
রাসূল (ছাঃ) ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে তাকীদ করেছেন। তিনি বলেন, হে আয়েশা! ক্ষুদ্র
গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে’।
হাদিসঃ
আয়িশাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: হে আয়িশাহ! তুমি ঐ সকল গুনাহ থেকে বেঁচে
থাক যেগুলোকে ছোট বলে ধারণা করা হবে। কেননা এ সমস্ত ছোট ছোট গুনাহগুলোর খোঁজ রাখার
জন্য আল্লাহ তরফ থেকে (ফেরেশতা) নিয়োজিত রয়েছে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৩৫৬, সুনান ইবনু মাজাহ ৪২৪৩,
সিলসিলাতুস সহীহাহ ৫১৩, ২৭৩১, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব ২৪৭২, সিলসিলাতুস সহীহাহ্
৫১৩, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩৪৩৩৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৫৬৮, শুআবূল ঈমান ৭২৬১,
দারিমী ২৭২৬, আল মু'জামুল আওসাত্ব ২৩৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কবীরা গুণাহ
“কবীরা’’
শব্দের আভিধানিক অর্থ: বড়। শরীয়তের পরিভাষায় কবীরা গুনাহ্ বলতে সে সকল গুনাহ্কে বুঝানো
হয় যে সকল গুনাহ্’র ব্যাপারে কুর‘আন বা সহীহ হাদীসে নির্দিষ্ট ঐহিক বা পারলৌকিক শাস্তির
বিধান রাখা হয়েছে অথবা সে সকল গুনাহ্কে কুর‘আন, হাদীস কিংবা সকল আলিমের ঐকমত্যে কবীরা
বা মারাত্মক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
কারো
কারো মতে কবীরা গুনাহ্ বলতে সে সকল গুনাহ্কে বুঝানো হয় যে সকল গুনাহ্’র ব্যাপারে শাস্তি,
ক্রোধ, ঈমানশূন্যতা বা অভিশাপের মারাত্মক হুমকি বা জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
আবার
কারো কারো মতে কবীরা গুনাহ্ বলতে সে সকল গুনাহ্কে বুঝানো হয় যে সকল গুনাহ্গারকে আল্লাহ্
তা‘আলা বা তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন অথবা যে সকল
গুনাহ্গারকে কুর‘আন কিংবা সহীহ হাদীসে ফাসিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
কারো
কারো মতে কবীরা গুনাহ্ বলতে সে সকল কাজকে বুঝানো হয় যে সকল কাজ হারাম হওয়ার ব্যাপারে
আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সকল শরীয়ত একমত।
আবার
কারো কারো মতে কবীরা গুনাহ্ বলতে সে সকল কাজকে বুঝানো হয় যে সকল কাজ হারাম হওয়ার ব্যাপারে
কুর‘আনের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।
কারো
কারো মতে কবীরা গুনাহ্ বলতে সে সকল গুনাহ্কে বুঝানো হয় যে সকল গুনাহ্’র বিস্তারিত বর্ণনা
আল্লাহ্ তা‘আলা সূরাহ নিসা’র শুরু থেকে নিম্নোক্ত আয়াত পর্যন্ত দিয়েছেন।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘তোমরা
যদি সকল মহাপাপ থেকে বিরত থাকো যা হতে তোমাদেরকে (কঠিনভাবে) বারণ করা হয়েছে তাহলে আমি
তোমাদের সকল ছোট পাপ ক্ষমা করে দেবো এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবো খুব সম্মানজনক স্থানে’’।
(সুরা আন নিসা: ৩১)।
কাবীরা গুনাহের তালিকা
কাবীরা
গুনাহের কোন সুনির্দিষ্ট তালিকা কুরআন ও হাদীসে একই জায়গায় ধারাবাহিকভাবে আসেনি। বিভিন্ন
আয়াত ও হাদীস গবেষণা করে ‘আলিমগণ কাবীরা গুনাহের তালিকা প্রণয়ন করেছেন। তাদের মধ্যে
সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছেন ইমাম হাফিয শামসুদ্দীন আয্ যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ)। তিনি তার
কিতাব ‘‘আল কাবায়ির’’-এর মধ্যে অর্ধশতাধিক কাবীরা গুনাহের তালিকা দিয়েছেন। সম্প্রতি
সাউদী আরবের বিখ্যাত ‘আলিম শাইখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বিন ‘আবদুল্লাহ আত্ তুয়াইজিরী
একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন যা তার রচিত ইসলামী ফিকহ বিশ্বকোষ-এর ১৬ তম পর্বে ‘‘কিতাবুল
কাবায়ির’’ নামে উল্লিখিত হয়েছে। নিম্নে সেই তালিকাটি পেশ করা হলো।
(ক) অন্তরের কাবীরা গুনাহসমূহঃ
(১) কুফর সম্পর্কে গুণাহঃ
ইসলামী
পরিভাষায় আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা.), আসমানী কিতাব বা ইসলামের মৌলিক বিধানসমূহ অমান্য
করা, অস্বীকার করা বা অবিশ্বাস করাকে কুফর বলা হয়। এটি ঈমানের বিপরীত, যার অর্থ অকৃতজ্ঞতা,
সত্য গোপন করা বা আবৃত করা। কুফর পরিচালনাকারী ব্যক্তিকে 'কাফির' বলা হয়, যা ঈমান
থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়।
কুফরের
উদাহরণ:
অস্বীকৃতি
বা মিথ্যারোপের কুফরি: আল্লাহ বা রাসূলের কথা সত্য বলে বিশ্বাস না করা।
অকৃতজ্ঞতা
(কুফরান নি'মাহ): আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
সংশয়
বা সন্দেহমূলক কুফর (কুফরু শাক ও রীব): ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে মনে দ্বিধা বা সন্দেহ
রাখা।
অহংকার
ও অবাধ্যতার কুফর: সত্য জানার পরও অহংকারের কারণে তা মেনে না নেওয়া।
মুনাফিকী
বা ভণ্ডামির কুফর: মুখে ঈমানের স্বীকারোক্তি দেওয়া কিন্তু অন্তরে অবিশ্বাস পোষণ করা।
এক কথায়, ইসলাম যে বিষয়গুলো বিশ্বাসের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে, সেগুলোর কোনো একটিকে অবিশ্বাস করা বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাই হলো কুফর।
কুফর এর প্রকারভেদঃ
কুফর
দু’প্রকার। যথাঃ
(ক)
এমন কুফর যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়, ইহা পাঁচ প্রকার:
(১)
মিথ্যারোপের কুফরি, আল্লাহ বলেন:
অর্থাৎ:
যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা তাঁর নিকট হতে আগত সত্যকে অস্বীকার
করে তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে হতে পারে? জাহান্নামই কি কাফেরদের আবাস নয়? (সূরা আনকাবূত ৬৮)।
(২)
সত্য বলে জানার পরও অহংকার করার কুফরি, আল্লাহ বলেন:
অর্থাৎ:
এবং যখন আমি ফেরেশ্তাগণকে বলেছিলাম যে, তোমরা আদমকে সিজদা কর তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই
সিজদা করেছিল; সে অগ্রাহ্য করল ও অহঙ্কার করল এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হল। (সূরা বাকারা ৩৪)।
(৩)
সন্দেহের কুফরি, আর এটি হচ্ছে খারাপ ধারণা করা। আল্লাহ বলেন:
অর্থাৎ:
এ ভাবে নিজের প্রতি যুলুম করে সে তার উদ্যানে প্রবেশ করল। সে বলল: আমি মনে করি না যে
এটা কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। এবং এটাও মনে করি না যে, কিয়ামত হবে, আর আমি যদি আমার প্রতিপালকের
নিকট প্রত্যাবৃত্ত হই তবে অবশ্যই আমি ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব। তদুত্তরে তার
বন্ধু তাকে বলল: তুমি কি তাকে অস্বীকার করছ? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা ও
পরে শুক্র হতে এবং তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন মানুষ্য আকৃতিতে? (সূরা কাহফ ৩৫-৩৭)।
(৪)
প্রত্যাখ্যান করার কুফরি, এর দলীল হিসেবে আল্লাহ বলেন:
অর্থাৎ:
আর যারা কাফের তাদেরকে যা থেকে সতর্ক করা হয়েছে তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সূরা আহকাফ ৩)।
(৫)
নেফাকী কুফরি, এর দলীল হিসেবে আল্লাহ বলেন:
অর্থাৎ:
এটা এ জন্যে যে, তারা ঈমান আনার পর কুফরি করেছে ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে,
পরিণামে তারা বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা মুনাফিকূন
৩)।
(খ)
ছোট কুফরি, এর দ্বারা ইসলাম থেকে বের হবে না। আর এটি হচ্ছে নেয়ামতের অস্বীকার বা কুফরি।
এর
দলীল হিসেবে আল্লাহ বলেন:
অর্থাৎ:
আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিয়েছেন এক জনপদের; যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিত, যেখানে সর্বদিক থেকে
প্রচুর জীবনোপকরণ আসতো; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল ফলে তারা যা করত তজ্জন্যে
তাদেরকে আল্লাহ ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের স্বাদ গ্রহন করালেন। (সূরা নাহল ১১২)।
তিনি
আরও বলেন:
অর্থাৎ:
নিশ্চয়ই মানুষ অতি মাত্রায় যালিম অকৃতজ্ঞ। (সূরা ইব্রাহীম
৩৪)।
যারা
আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করে না তারা কাফির।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।” (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৪)।
আমাদের
দেশে যেসব অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ আছেন তারা কেহই আল্লাহর বিধান বা আইন
দিয়ে বিচারিক কাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন না। তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রেও ইসলামি বিধানের
কোনো কথা উল্লেখ নেই। এইসব দলের নেতাগণ ও তাদের অনুগত কর্মচারীগণ মানবরচিত বিধান দিয়ে
রাষ্ট্রীয় কার্য সমাধা করে থাকেন। ইসলামি আইন বা বিধানের কথা বললে তারা উল্টো জঙ্গি
ট্যাগ লাগিয়ে অপহরণ, হামলা, মামলা, গুম ও খুন করে থাকে। অথচ এইসব অনৈসলামিক দলের বেশীর
ভাগ নেতাই নিজেদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয়।
যেহেতু
তারা ইসলামি বিধান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে না তাই তারা কাফির হিসেবে গণ্য হবে এবং
তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হবে। অন্যায়ের সহযোগী হিসেবে এইসব দলের যারা সমর্থক বা ভোটার
বা কর্মী তাদেরকেও ঐসব নেতাদের সাথে জাহান্নামে যেতে হবে তথা নেতাদের সাথে তাদের হাশর
হবে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“সৎ
কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য
করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর”। (সুরা আল মায়েদা-২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না, জালেমদের সহযোগী হবে না, তাহলে
আগুন (জাহান্নামের) তোমাদেরও স্পর্শ করবে।’ (সূরা হূদ:
১১৩)।
ইবনে
উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক
মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই
সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৩২০,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭, ইরওয়া ৭/৩৫০, সহীহাহ ৪৩৮, ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“অপরাধী
সেদিন স্বীয় হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, ‘হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন
করতাম। হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে (ভাল না বাসতাম, সমর্থন না করতাম, ভোট না
দিতাম) বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! সে তো আমাকে উপদেশ বাণী থেকে (ইসলামী দল থেকে/ইসলামের
পথ থেকে) বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে তা আসার
পর, শয়ত্বান মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক”। (সুরা আল ফুরকান
২৭-২৯)।
যারা
সালাত আদায় করে না তারা কাফির এবং যার পরিণতি হচ্ছে জাহান্নাম।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘নবী
ও হিদায়াতপ্রাপ্তদের পর আসলো এমন এক অপদার্থ বংশধর যারা নামায বিনষ্ট করলো এবং প্রবৃত্তির
পূজারী হলো। সুতরাং তারা ‘‘গাই’’ নামক জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। তবে যারা
এরপর তাওবা করে নিয়েছে, ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তারাই তো জান্নাতে প্রবেশ করবে
এবং তাদের প্রতি কোনরূপ যুলুম করা হবে না’’। (সুরা মারইয়াম
: ৫৯-৬০)।
আল্লাহ্
তা‘আলা আরো বলেন:
‘‘সুতরাং
ওয়াইল্ নামক জাহান্নাম সেই মুসল্লীদের জন্য যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে গাফিল। যারা
লোক দেখানোর জন্যই তা আদায় করে এবং যারা গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় ছোটখাট বস্ত্ত অন্যকে
দিতে অস্বীকৃতি জানায়’’। (সুরা মা’ঊন : ৪-৭)।
আল্লাহ্
তা‘আলা আরো বলেন:
‘‘প্রতিটি
ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে সে দিন আবদ্ধ থাকবে। তবে তারা নয় যারা নিজ আমলনামা ডান
হাতে পেয়েছে। তারা জান্নাতেই থাকবে। তারা অপরাধীদের সম্পর্কে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
এমনকি তারা জাহান্নামীদেরকে জিজ্ঞাসা করবে: কেন তোমরা সাক্বার নামক জাহান্নামে আসলে?
তারা বলবে: আমরা তো নামাযী ছিলাম না এবং আমরা মিসকিনদেরকেও খাবার দিতাম না। বরং আমরা
সমালোচনাকারীদের সাথে সমালোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। এমনকি আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার
করতাম। আর এমনিভাবেই হঠাৎ আমাদের মৃত্যু এসে গেলো’’। (সুরা
মুদ্দাস্সির : ৩৮-৪৭)।
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
আনাস
ইবনু হাকীম আদ-দাববী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ আমাকে বললেন, তুমি
তোমার শহরে পৌঁছে তার বাসিন্দাদের অবহিত করবে যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ কিয়ামতের দিন মুসলিম বান্দার নিকট থেকে সর্বপ্রথম ফরয
সালাতের হিসাব নেয়া হবে। যদি সে তা পূর্ণরূপে আদায় করে থাকে (তবে তো ভালো), অন্যথায়
বলা হবেঃ দেখো তো তার কোন নফল সালাত আছে কি
না? যদি তার নফল সালাত থেকে থাকে, তবে তা দিয়ে
তার ফরয সালাত পূর্ণ করা হবে। অতঃপর অন্যান্য
সব ফরয আমলের ব্যাপারেও অনুরূপ ব্যবস্থা করা হবে। (সুনান
ইবনু মাজাহ, ১৪২৫, ১৪২৬, তিরমিযী ৪১৩, নাসায়ী ৪৬৫-৬৭, আবূ দাঊদ ৮৬৪, আহমাদ ৭৮৪২, ৯২১০,
১৬৫০১; ইবনু মাজাহ ১৪২৬, মিশকাত ১৩৩০-১৩৩১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(ক) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য
হলো সালাত বর্জন। (সুনানে ইবনে মাজাহ (তাওহীদ)-১/১০৭৮,সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮২, সুনান আততিরমিযী ২৬১৮, ২৬১৯,
২৬২০; সুনান আবূ দাঊদ ৪৬৭৮, আহমাদ ১৪৫৬১, ১৪৭৬২; দারিমী ১২৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৪৯,
ইসলামিক সেন্টারঃ ১৫৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) বুরাইদাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে যে অংগীকার রয়েছে তা হলো
সালাত। অতএব যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করলো, সে কুফরী করলো। (সুনানে ইবনে মাজাহ (তাওহীদ)-১/১০৭৯, সুনান আততিরমিযী ২৬২১, মিশকাত ৫৭৪, সুনান আননাসায়ী ৪৬৩, সহীহ আত্ তারগীব ৫৬৪, আহমাদ
২২৯৩৭ , মুস্তাদ্রাক ১১, বায়হাকী ৬২৯১, ইবনে হিববান/ইহ্সান ১৪৫৪, ইবনে আবী শায়বাহ ৩০৩৯৬,
দারাক্বুত্বনী ২/৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিন বান্দা ও শিরক-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত বর্জন
করা। অতএব যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করলো, সে অবশ্যই শিরক করলো। (সুনানে ইবনে মাজাহ (তাওহীদ)-১/১০৮০, সহীহ তারগীব ৫৬৫, ১৬৬৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) বেনামাজি কিয়ামতের দিন চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ
হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“স্মরণ
করো সেই চরম সংকটের দিনের কথা, যেদিন তাদেরকে আহ্বান করা হবে সিজদা করার জন্য, কিন্তু
তারা করতে সক্ষম হবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত, হীনতা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। অথচ যখন তারা
নিরাপদ ছিল তখন তো তাদেরকে আহ্বান করা হয়েছিল”। (সুরা:
কালাম, আয়াত : ৪২, ৪৩)।
(ঙ)
আবূ দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার প্রিয় বন্ধু (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এই উপদেশ দিয়েছেনঃ তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক করো না,
যদিও তোমাকে টুকরা টুকরা করে ছিন্নভিন্ন করা হয় অথবা আগুনে ভস্মীভূত করা হয়। তুমি স্বেচ্ছায়
ফরয নামায ত্যাগ করো না। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করে তার থেকে (আল্লাহর ) যিম্মদারি
উঠে যায়। তুমি মদ্যপান করো না। কেননাতা সর্বপ্রকার অনিষ্টের চাবিকাঠি। (সুনান ইবনু মাজাহ, ৪০৩৪, মিশকাত ৫৪০, আত-তালীকুর রাগীব ১/১৯৫,
ইরওয়া ২০৮৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(চ) বুরায়দাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’আসরের সালাত ছেড়ে দিলো সে তার
’আমল বিনষ্ট করলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৯৫, সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৫৩, ৫৯৪, সুনান
আননাসায়ী ৪৭৪, আহমাদ ২২৯৫৭, সহীহ আত্ তারগীব ৪৭৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৫২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ছ) ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির ’আসরের সালাত ছুটে গেল তার গোটা
পরিবার ও ধনসম্পদ যেন উজাড় হয়ে গেল। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫৯৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৫২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩০৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬২৬, সুনান আবূ দাঊদ
৪১৪, সুনান আননাসায়ী ৫১২, সুনান আততিরমিযী ১৭৫, আহমাদ ৫৩১৩, সহীহ আল জামি‘ ৫৪৯১, সহীহ
আত্ তারগীব ৪৮০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(জ) মু‘আয (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দশটি নসীহত করলেন তার মধ্যে বিশেষ একটি এটাও যে,
‘‘তুমি
ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করলো
তার উপর আল্লাহ্ তা‘আলার কোন জিম্মাদারি থাকলো না’’। (আহমাদ
৫/২৩৮)।
নামায
পড়া মুসলিমদের একটি বাহ্যিক নিদর্শন। সুতরাং যে নামায পড়ে না সে মুসলিম নয়।
(ঝ) আবূ সা’ঈদ্ খুদ্রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
একদা কিছু মালামাল বন্টন সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে জনৈক উঁচু গাল, ঠেলা কপাল এবং গর্তে
ঢোকা চোখ বিশিষ্ট ঘন শ্মশ্রুমন্ডিত মাথা নেড়া জঙ্ঘার উপর কাপড় পরা রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘‘হে
আল্লাহ্’র রাসূল! আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় করুন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন: তুমি ধ্বংস হয়ে যাও! আমি কি দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি নই; যে আল্লাহ্
তা‘আলাকে ভয় করবে। বর্ণনাকারী বলেন: যখন লোকটি রওয়ানা করলো তখন খালিদ বিন্ ওয়ালীদ্
(রাঃ) বললেন: হে আল্লাহ্’র রাসূল! আমি কি তার গর্দান কেটে ফেলবো না? রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, হয়তো বা সে নামায পড়ে’’। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৩৫১, ৩৩৪৪; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৩৪২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬৪, আহমাদ ১১৬৯৫,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০০৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঞ) উমর (রাঃ) বলেন: ‘‘নামায ত্যাগকারী নির্ঘাত কাফির’’।
(বায়হাকী, হাদীস ১৫৫৯, ৬২৯১)।
(ট) আলী (রাঃ) বলেন: ‘‘যে নামায পড়ে না সে কাফির’’।
(বায়হাকী, হাদীস ৬২৯১)।
(ঠ) আব্দুল্লাহ বিন্ মাসঊদ (রাঃ) বলেন: ‘‘যে নামায
পড়ে না সে মুসলমান নয়’’। (বায়হাকী, হাদীস ৬২৯১)।
আমাদের
দেশে দেখা যায়, অনৈসলামিক দলের প্রায় ৮৫% নেতা-কর্মীই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে না।
এদের আবার অনেকে শুধু জুমার নামাজ পড়ে। আর এদের কারণে প্রকৃত নামাজিরা মসজিদে জায়গা
পায় না।
কাফিরদের শেষ পরিনতিঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই যারা কুফর করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের উপর আল্লাহ,
ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের লা'নত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। তাদের শাস্তি শিথিল করা হবে
না এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে ন “। (সূরা আল বাক্বারাহ্
২ : ১৬১-১৬২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“কেউ
তার ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার
উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে
কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত”। (সূরা আন্ নাহ্ল ১৬: ১০৬)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্র প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি, এবং সে কিতাবের প্রতি
যা আল্লাহ তার রাসূলের উপর নাযিল করেছেন। আর সে গ্রন্থের প্রতিও যা তার পূর্বে তিনি
নাযিল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তার ফিরিশতাগণ, তার কিতাবসমূহ, তার রাসূলগণ ও
শেষ দিবসের প্রতি কুফর করে সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হলো”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৩৬)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে
(ঈমানের ব্যাপারে) তারতম্য করতে চায় এবং বলে, ‘আমরা কতক-এর উপর ঈমান আনি এবং কতকের
সাথে কুফরী করি’(১)। আর তারা মাঝামাঝি একটা পথ অবলম্বন করতে চায়। তারাই প্রকৃত কাফির।
আর আমরা প্রস্তুত রেখেছি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্ত “। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৫০-১৫১)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তারা
অবশ্যই কুফরী করেছে- যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়, অথচ এক ইলাহ ছাড়া আর
কোন ইলাহ নেই। আর তারা যা বলে তা থেকে বিরত না হলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদের
উপর অবশ্যই কষ্টদায়ক শাস্তি আপতিত হবে”। (সুরা আল মায়েদা
৭৩)।
(২) শির্ক সম্পর্কে গুণাহঃ
ইসলামী
পরিভাষায় মহান আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণাবলী, কর্ম বা ইবাদতে অন্য কাউকে অংশীদার বা
সমকক্ষ সাব্যস্ত করাকে শিরক (Shirk) বলে। এটি ইসলামের সবচেয়ে বড় অপরাধ ও গুনাহ, যা
তাওহীদের (একত্ববাদ) পরিপন্থী। আল্লাহর প্রাপ্য ইবাদত (যেমন- দোয়া, মান্নত, ভক্তি)
অন্যের জন্য নিবেদন করা বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
শিরক না করতে আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আপনি
বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! এসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র
আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত না করি, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ
আল্লাহ ছাড়া একে অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়
তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম”। (সুরা আলে ইমরান ৬৪)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোন কিছুকে তার শরীক করো না; এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন,
ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ, নিকট প্রতিবেশী, দুর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের
অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহারকরো নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক,
অহংকারীকে”। (সুরা আন নিসা ৩৬)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“বলুন,
এসো, তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তোমাদেরকে তা তিলাওয়াত করি, তা হচ্ছে,
তোমরা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না পিতামাতার
প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না,
আমরাই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযক দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল
কাজের ধারে কাছেও যাবে না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা
তাকে হত্যা করবে না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার”। (সুরা আল আনআম ১৫১)।
শিরকের প্রকারভেদঃ
শির্ক
তিন প্রকার। যথাঃ
(ক)
বড় শির্ক, (খ) ছোট শির্ক এবং (গ) গোপনীয় শির্ক।
(ক)
বড় শির্ক চার প্রকার:
(১) দো‘আর ক্ষেত্রে শির্ক:
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
অর্থাৎ:
তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা বিশুদ্ধ চিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে; অতঃপর
তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়। (সূরা আনকাবূত ৬৫)।
(২) নিয়ত, ইচ্ছা এবং কথার ক্ষেত্রে শির্ক:
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
অর্থাৎ:
যে ব্যক্তি শুধু পার্থিব জীবন ও এর জাঁকজমক কামনা করে আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মগুলির
ফল দৃনিয়াতেই পরিপূর্ণভাবে প্রদান করে দেই এবং দুনিয়াতে তাদের জন্য কোনো কিছুই কম করা
হয় না। তারা এমন লোক যে, আখেরাতে তাদের জন্য জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা
যা কিছূ করেছিল তা সবই আখেরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং যা কিছু করছে তাও বিফল হবে। (সূরা হূদ ১৫-১৬)।
(৩) আনুগত্যের ক্ষেত্রে শির্ক:
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
অর্থাৎ:
তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম ও ধর্মযাজকদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মরিয়মের
ছেলে ঈসাকেও অথচ তাদের প্রতি শুধু এ আদেশ করা হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মা’বূদের
ইবাদত করবে, যিনি ব্যতীত যোগ্য কোনো উপাসক নেই, বস্তুত: তিনি তাদের অংশী স্থির করা
হতে পবিত্র। (সূরা তাওবা ৩১)।
(৪) ভালবাসার ক্ষেত্রে শির্ক:
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
অর্থাৎ:
এবং মানুষের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে সদৃস স্থির করে নেয়,
তারা আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবেসে থাকে এবং যারা ঈমানদার আল্লাহর প্রতি
তাদের ভালবাসা অধিক দৃঢ়তর, আর যারা অত্যাচার করেছে তারা যদি শাস্তি অবলোকন করতো তাহলে
বুঝতো যে, সমুদয় শক্তি আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা বাকারা ১৬৫)।
(খ) ছোট শির্ক: আর এটি হচ্ছে সামান্য লোক দেখানো।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
অর্থাৎ:
সূতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে আর তার প্রতিপালকের
ইবাদতে যেন কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহাফ ১১০)।
(গ) গোপন শির্ক: এর দলীলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
অসাল্লাম) বলেন:
(এ
উম্মতের মাঝে শির্ক এমন গোপনীয় ভাবে প্রবেশ করে যে ভাবে অন্ধকার রাত্রিতে কালো পাথরে
পিপিলিকা হাটলে টের পওয়া যায় না।)
হজরত
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.)
বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল!
সেগুলো কী? নবীজি (সা.) বললেন-
(১).
আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা
(২).
জাদু করা
(৩).
অকারণে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করেছেন
(৪).
সুদ খাওয়া
(৫).
এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা
(৬).
জিহাদের ময়দান থেকে পিঠ ফিরিয়ে নেওয়া
(৭).
সতী-সাধ্বী, বিশ্বাসী ও সরলমনা নারীদের প্রতি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৫৭, ২৭৬৬, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩০১৯, ১৯০১, সুনান বায়হাক্বী ১৭১২৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৯৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মুশরিকদের শেষ পরিনতিঃ
তাওবা
বা অনুতপ্ত হয়ে পাপ বর্জন করা সকল পাপের ক্ষমার পথ। তবে মহান আল্লাহ তাওবা ছাড়াও নেক
কর্মের কারণে, শাস্তির মাধ্যমে বা তাঁর অপার করুণায় অন্য সকল পাপ ক্ষমা করতে পারেন।
তবে শিরকের পাপ তিনি ক্ষমা করেন না। মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘আল্লাহ
তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছ ক্ষমা
করেন। এবং যে কেউ আল্লার সাথে শরীক করে সে এক মহাপাপ করে।’’ (সূরা (৪) নিসা: ৪৮ আয়াত)।
অন্যত্র
মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ছাড়া অন্যান্য
অপরাধ যাকে ইচ্ছ ক্ষমা করেন। এবং যে কেউ আল্লার সাথে শরীক করে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট
হয়।’’ (সূরা (৪) নিসা: ১১৬ আয়াত)।
শিরক-কুফর
সকল নেক কর্ম ধ্বংস করেঃ
অন্য
সকল পাপের সাথে শিরক-কুফরের মৌলিক পার্থক্য এই যে, সাধরণভাবে পাপের কারণে পুন্য বিনষ্ট
হয় না। কিন্তু শিরকের কারণে মানুষের সকল নেক কর্ম বিনষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন:
‘‘তোমার
প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, ‘তুমি আল্লাহর শরীক
স্থির করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্ত’।’’ (সূরা (৩৯) যুমার: ৬৫ আয়াত)।
অন্য
আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘কেউ
ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত
হবে।’’ (সূরা (৫) মায়িদা: ৫ আয়াত)।
মহান
আল্লাহ ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকূব, নূহ, দাঊদ, সুলাইমান, আইঊব, ইউসূফ, মূসা, হারূন, যাকারিয়্যা,
ইয়াহইয়া, ঈসা, ইলইয়াস, ইসমাঈল, ইলইয়াসা, ইউনুস, লূত (আলাইহিমুস সালাম) ও তাঁদের বংশের
নেককার মানুষদের কথা উল্লেখ করে বলেন:
‘‘এ
হলো আল্লাহর হেদায়াত, স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এদ্বারা সৎপথে পরিচালিত
করেন। তারা যদি শির্ক করত তবে তারা যা কর্ম করত সবই বিনষ্ট ও নিষ্ফল হয়ে যেত।’’ (সূরা (৬) আন‘আম: ৮৮ আয়াত)।
শিরক-কুফর জাহান্নামের অনন্ত শাস্তির কারণঃ
শিরক
মুক্ত সকল পাপে লিপ্ত মানুষ আখিরাতে মহান আল্লাহর ক্ষমা লাভ করে, অথবা আল্লাহর অনুগ্রহে
কারো শাফা‘আতের কারণে বা শাস্তিভোগের পরে জান্নাত লাভ করবেন। সকল পাপীই মহান আল্লাহর
বিশেষ ক্ষমার আশা করতে পারেন। তবে শিরকে লিপ্ত মানুষের জন্য কোনোই আশা নেই। জান্নাত
একমাত্র তাওহীদ-পন্থীদের আবাসস্থল। এজন্য মহান আল্লাহ শিরকে লিপ্তদের জন্য তা হারাম
বা নিষিদ্ধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘কেউ
আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করবেন ও তার আবাস জাহান্নাম; জালিমদের
জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৭২)।
আবূ
যার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন:
‘‘যে
ব্যক্তি আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করে পৃথিবী পরিমাণ পাপ-সহ আমার সাথে সাক্ষাত
করবে আমি সমপরিমাণ ক্ষমা-সহ তার সাথে সাক্ষাত করব।’’ (মুসলিম,
আস-সহীহ ৪/২০৬৮)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে তারা এবং মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে
অবস্থান করবে; তারাই সৃষ্টির অধ্যম”। (সূরা আল বায়্যিনাহ্
৯৮ : ৬)।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা
করা হয় এ শর্তে যে, সে আল্লাহ তা’আলার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করবে না। আর সে ব্যক্তি
এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়, যে কোন মুসলিমের সাথে হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করে। মালায়িকাহ্’কে
(ফেরেশতাদেরকে) বলা হয় যে, এদের অবকাশ দাও, যেন তারা পরস্পর মীমাংসা করে নিতে পারে।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০২৯, সহিহ মুসলিম ৩৫-(২৫৬৫),
সুনান আবূ দাঊদ ৪৬১৬, সুনান আততিরমিযী ২১০৯,
সহীহুল জামি‘ ২৯৭০, সহীহ আত্ তারগীব ২৭৬৬, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ৩১, মুওয়াত্ত্বা মালিক
৩৩৭০, আহমাদ ৯০৫৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬৬১, শু‘আবুল ঈমান ৬৬২৬, আস্ সুনানুল কুবরা লিল
বায়হাক্বী ৬৬২৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কিছু শিরকের উদাহরণ এখানে দেয়া হলোঃ
★“সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ” সংবিধানের এই ধারাটি বিশ্বাস করা ও মেনে চলা শিরক। (সুরা আল বাকারা ২০, ১০৬, ১০৯, ১৪৮, ২৯৪, সুরা আলে ইমরান ২৬, ২৯, ১৮৯, সুরা আন নিসা ১৩৩, ১৪৯, সুরা আল মায়েদা ১৭, ১৯, ৪০, ১২০, অনুরুপ ৩৯ টি আয়াত রয়েছে।
★আল্লাহ্ ব্যতিত অন্য কারো নামে
কসম করা শিরক। (আবু দাউদ:৩২৩৬ (ইফা)।
★কোন কিছুকে শুভ-অশুভ লক্ষন
বা কুলক্ষণ মনে করা শিরক। (বুখারি : ৫৩৪৬, আবু দাউদ:৩৯১০)।
★মাজারে ও কোন পির-ফকির কিংবা
কারো নিকট সিজদা দেয়া শিরক। (সুর জীন: ২০, মুসলিম:১০৭৭,আবু
দাউদ, মুত্তাফাকুন আলাই)।
★আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো বা
যেকোন পির-আওলিয়া কিংবা মাজারের নামে মানত করা শিরক। (সহিহ বুখারি: অধ্যায় : তাকদির)।
★কেউ পেছন দিক থেকে ডাক দিলে
কিংবা নিজে যাত্রার সময় পিছন ফিরে তাকালে যাত্রা অশুভ হয় এই ধারনা বিশ্বাস করা শিরক।
(বুখারি, আবু দাউদ:৩৯১০)।
★কোন বিপদে পড়ে আল্লাহকে বাদ
দিয়ে "ও মা, ও বাবা" ইত্যাদি বলে এইরকম গায়েবি ডাকা শিরক।
বিপদে
পড়লে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন" বলতে হয়। (সুরা বাকারাহঃ ১৫৬)।
★তোর ভবিষ্যত অন্ধকার', 'তর
কপালে বহুত কষ্ট আছে', এই ধরনের গায়েবি কথা কাউকে বলা শিরক। (সুরা নমল:৬৫, আল জিন:২৫-২৬, আনাম:৫৯)।
★হোচট খেলে কিংবা পেচা ডাকলে
সামনে বিপদ আছে এই ধারনা শিরক। (সুরা আনাম:১৭, ইউনুস:১০৭)।
★রোগ ব্যাধি বা বিপদ-আপদ থেকে
রক্ষা পেতে শরীরে পিতলের বালা, শামুক, ঝিনুকের মালা, সুতা, কিংবা যেকোন প্রকারের বস্তু
লটকানো শিরক। (তির্মিযি, আবু দাউদ ও হাকেম)।
★সকালে বেচাকেনা না করে কোন
কাষ্টমারকে বাকি দিলে কিংবা সন্ধ্যার সময় কাউকে বাকি দিলে ব্যাবসায় অমঙ্গল হয় এই
ধারনা করা শিরক! (আবু
দাউদঃ৩৯১০)।
★সফলতা কিংবা মঙ্গল লাভের জন্য
এবং অমঙ্গল থেকে রক্ষা পেতে যেকোন প্রকার আংটি ব্যবহার করা শিরক। (সুরা আনাম:১৭, ইউনুস : ১০৭)।
★যে কোন জড় বস্তুকে সম্মান
দেখানো তথা তাযীম করা বা তার সামনে নিরবতা পালন করা শিরক।
যেমন: পতাকা, স্মৃতিসৌধ, শহিদ মিনার কিংবা মাজার ইত্যাদি। (সুরা বাকারাহ:২৩৮, আহকাফ:৫, ফাতহুল বারি ৭/৪৪৮, আবু দাউদ:৪০৩৩)।
★আল্লাহর ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টি
অর্জনের জন্য কিংবা লোক দেখানো ইবাদাত করা শিরক। (সুরা
আনাম:১৬২, বাইয়িনাহঃ ৫, কাহফ:১১০,ইমরান:৬৪, ইবনে মাজাহ হা নং৫২০৪)।
★আল্লাহ্ ব্যাতিত কোন গণক বা
অন্য কেউ গায়েব জানে এই কথা বিশ্বাস করা শিরক।
(সুরা নমল:৬৫, আল জিন:২৬, আনাম:৫৯)।
★পায়রা/ কবুতর উড়িয়ে শান্তি
কামনা করা শিরক, কারণ শান্তিদাতা একমাত্র আল্লাহ্। (সুরা
হাশরঃ ২৩)।
★আল্লাহর ছাড়া কোন পির-আওলিয়া
এবং কোন মাজারের নিকট দুয়া করা বা কোন কিছু চাওয়া শিরক। (সুরা ফাতিহা:৪, আশ শোআরা:২১৩, গাফির:৬০, তির্মিযি)।
★“আপনি চাইলে এবং আল্লাহ্ চাইলে
এই কাজটি হবে" এই কথা বলা শিরক। (নাসাঈ শরিফ) এখানে
শুধু আল্লাহ্ চাইলে হবে, বলা যেতে পারে।
এইরকম
আরো অসংখ্য শিরক সমাজে বিদ্যামান।
★আল্লাহ্ বলেন, অনেক মানুষ আল্লাহর
প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে শিরকও করে।
(সুরা ইউসুফঃ ১০৬)।
(৩) অহংকার সম্পর্কে গুণাহঃ
গর্ব,
দাম্ভিকতা, অহঙ্কার ও অহংবোধ একটি মারাত্মক অপরাধ। যা আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট খুবই অপছন্দনীয়
এবং যা আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অসন্তুষ্টি ও জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণও বটে।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই
তিনি (আল্লাহ্ তা‘আলা) অহংকারীদেরকে ভালোবাসেন না’’। (সুরা
না'হল: ২৩)।
সর্ব
প্রথম গুনাহ্ যা আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে করা হয়েছে তা হচ্ছে অহঙ্কার। আল্লাহ্ তা‘আলা
বলেন:
‘‘যখন
আমি ফিরিশ্তাদেরকে বললাম: তোমরা আদমকে সিজদাহ্ করো। তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই সিজদাহ্
করলো। শুধুমাত্র সেই অহঙ্কার বশত সিজদাহ্ করতে অস্বীকার করলো। আর তখনই সে কাফিরদের
অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো’’। (সুরা আল বাক্বারাহ: ৩৪)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কোন
ব্যক্তি গর্বভরে চলাফেরা করলে এবং যে সত্যিই আত্মম্ভরী সে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ্ তা‘আলার
সাথে সাক্ষাৎ করবে অথচ আল্লাহ্ তা‘আলা তখন তার উপর খুবই অসন্তুষ্ট থাকবেন’’। (আহমাদ ৫৯৯৫ বুখারী/আল্-আদাবুল্ মুফ্রাদ্, হাদীস ৫৪৯; হা’কিম
১/৬০)।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ’’অহংকার আমার চাদর ও শ্রেষ্ঠত্ব আমার লুঙ্গিস্বরূপ’’।
অতএব, যে ব্যক্তি এ দু’টোর কোন একটি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে, আমি তাকে জাহান্নামে
নিক্ষেপ করব। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করব। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৫৭৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬২০, সুনান আবূ দাঊদ ৪০৯০, সুনান ইবনু মাজাহ ৪১৭৪, সহীহ
আত্ তারগীব ৮৯৮, মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার ৬৩৬৩, আহমাদ ৯৩৫৯, সহীহ ইবনু হিব্বান
৩২৮, শু‘আবুল ঈমান ৮১৫৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৫৪১, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৬৫৭৯,
মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার ৬৩৬৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
“মসীহ
আল্লাহ্র বান্দা হওয়াকে কখনো হেয় মনে করেন না, এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও করে না। আর কেউ
তাঁর ইবাদতকে হেয় জ্ঞান করলে এবং অহংকার করলে তিনি অচিরেই তাদের সবাইকে তাঁর কাছে একত্র
করবেন। অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তিনি তাদেরকে পূর্ণ করে দিবেন তাদের
পুরস্কার এবং নিজ অনুগ্রহে আরো বেশী দেবেন। আর যারা (আল্লাহ্র ইবাদত করা) হেয় জ্ঞান
করেছে এবং অহংকার করেছে, তাদেরকে তিনি কষ্টদায়ক শাস্তি দেবেন। আর আল্লাহ্ ছাড়া তাদের
জন্য তারা কোন অভিভাবক ও সহায় পাবে ন “। (সুরা আন নিসা
১৭২-১৭৩)।
মূসা
(আঃ) সকল গর্বকারীদের থেকে আল্লাহ্ তা‘আলার আশ্রয় কামনা করেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
‘‘মূসা
(আঃ) বললো: যারা হিসাব দিবসে বিশ্বাসী নয় সে সকল অহঙ্কারী ব্যক্তি থেকে আমি আমার ও
তোমাদের প্রভুর আশ্রয় কামনা করছি’’। (সুরা গাফির/আল মু’মিন:
২৭)।
দলীল
বিহীন যারা কুর‘আন ও হাদীস নিয়ে অন্যের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় তারা অহঙ্কারীই বটে। আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘যারা
দলীল বিহীন আল্লাহ্ তা‘আলার আয়াতসমূহ নিয়ে ঝগড়া করে তাদের অন্তরে রয়েছে শুধু অহঙ্কারই
অহঙ্কার। তারা তাদের উদ্দেশ্যে কখনো সফলকাম হবে না। অতএব তুমি আল্লাহ্ তা‘আলার শরণাপন্ন
হও। তিনিই তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা’’। (সুরা গাফির/আল
মু’মিন: ৫৬)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
“আর
তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক(১), আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা
অহংকারবশে আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত
হয়ে”। (সুরা গাফির/আল মু’মিন: ৬০)।
গর্বকারীরা
সত্যিই জাহান্নামী এবং যাদেরকে নিয়ে জাহান্নাম জান্নাতের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়েছে।
হারিসাহ্
ইবনু ওহাব খুযায়ী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি
কি তোমাদের জান্নাতীদের সম্পর্কে জ্ঞাত করবো না? (তারা হলেন) ঐ সকল লোক যারা অসহায়
এবং যাদের তুচ্ছ মনে করা হয়। তারা যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, তাহলে তা তিনি নিশ্চয়ই
পুরা করে দেন। আমি কি তোমাদের জাহান্নামীদের সম্পর্কে জ্ঞাত করবো না? তারা হলোঃ কর্কশ
স্বভাব, শক্ত হৃদয় ও অহংকারী। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬০৭১, ৪৯১৮, ৪৯১৮, ৬৬৫৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০৭৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮৫৩,
সুনান আত তিরমিযী ২৬০৫, সুনান ইবনু মাজাহ ৪১১৬, সহীহুল জামি‘ ২৫৯৮, আহমাদ ১৮৭২৮, মুসনাদে
আবূ ইয়া‘লা ৬১২৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬৭৯, শু‘আবুল ঈমান ৮১৭৪, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব
ত্ববারানী ৩১৭৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৩২৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬৩৬, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৫৫৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু
আবূ উমর (রহঃ)....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নাম ও জান্নাত পরস্পর বাক-বিতণ্ডা করল। অতঃপর জাহান্নাম
বলল, প্রতিপত্তি সম্পন্ন অহংকারী লোকেরা আমার মাঝে প্রবেশ করবে। জান্নাত বলল, দুর্বল
ও নিঃস্ব লোকেরা আমার মাঝে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা জাহান্নামকে বললেন, তুমি
আমার আযাব, যাকে ইচ্ছা আমি তোমার দ্বারা ’আযাব দিব। কোন কোন সময় তিনি বলেছেন, যাকে
ইচ্ছা আমি তোমার দ্বারা বিপদে ফেলব। তারপর তিনি জান্নাতকে বললেন, তুমি আমার রহমত, আমি
যাকে ইচ্ছা তোমার দ্বারা রহমত করব। তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই পেট ভর্তির ব্যবস্থা থাকবে।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০৬৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮৪৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৬৯০৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৯৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
গর্বকারীদেরকে
আল্লাহ্ তা‘আলা কিয়ামতের দিন মানুষের আকৃতিতেই ছোট পিপীলিকার ন্যায় উঠাবেন। তখন তাদের
লাঞ্ছনার আর কোনো সীমা থাকবে না।
আমর
ইবনু শু’আয়ব (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তাঁর দাদা
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন অহংকারীদেরকে ছোট পিপীলিকার মতো একত্রিত করা হবে;
কিন্তু আকৃতি-অবয়ব হবে মানুষের। চতুর্দিক থেকে অপমান তাদেরকে ঘিরে থাকবে। তাদেরকে
’’বূলাস’’ নামক জাহান্নামের এক কারাগারের দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। তাদের ওপর আগুনের
কুণ্ডলী হবে এবং তাদেরকে জাহান্নামীদের নিংড়ানো পঁচা রক্ত ও পুঁজ পান করানো হবে, যার
নাম ’’ত্বীনাতুল খবাল’’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১১২,
সুনান আততিরমিযী ২৪৯২, সহীহুল জামি‘ ৮০৪০, সহীহ আত্ তারগীব ২৯১১, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ
৪৩৪, আহমাদ ৬৬৭৭, শু‘আবুল ঈমান ৮১৮৫, দায়লামী, হাদীস ৮৮২১ বায্যার, হাদীস ৩৪২৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
একদা
বানী ইস্রা’ঈলের জনৈক ব্যক্তি গর্ব করলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে কঠিন শাস্তি দেন। রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগেও এমন একটি ঘটনা ঘটে যায়।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
অথবা আবুল কাসিম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি আকর্ষণীয় জোড়া কাপড় পরিধান করতঃ চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে
পথ অতিক্রম করছিল; হঠাৎ আল্লাহ তাকে মাটির নীচে ধ্বসিয়ে দেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) অবধি
সে এভাবে ধ্বসে যেতে থাকবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৭৮৯, ৫৭৯০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৩৫৮,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৮৮, আহমাদ ১০০৪০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৫২৬০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ).....সালামাহ ইবনু আকওয়া (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, এক লোক
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বাম হাতে খাদ্য গ্রহণ করছিল। তিনি
বললেনঃ তুমি তোমার ডান হাতে খাও। সে বলল, আমি পারবো না। তিনি বললেনঃ তুমি যেন না-ই
পার। শুধুমাত্র অহমিকাই তাকে বারণ করছে। সালামাহ্ (রাযিঃ) বলেন, সে আর কখনো তার ডান
হাত মুখের নিকট উঠাতে পারেনি। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫১৬৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০২১, ইব্নু হিববান খন্ড ১৪ হাদীস ৬৫১২, ৬৫১৩ বাইহাক্বী,
হাদীস ১৪৩৮৮ ইব্নু আবী শাইবাহ্, হাদীস ২৪৪৪৫; দা’রামী ২০৩২ আবূ ‘আওয়ানাহ্, ৮২৪৯, ৮২৫১,
৮২৫২; আহমাদ ১৬৫৪০, ১৬৫৪৬, ১৬৫৭৮ ত্বাবারানী/কাবীর খন্ড ৭ হাদীস ৬২৩৫, ৬২৩৬; ইব্নু
’হুমাইদ্ ৩৮৮, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫০৯৬, ইসলামিক সেন্টার ৫১০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কিয়ামতের
দিন আল্লাহ্ তা‘আলা দাম্ভিকের সাথে কথা বলবেন না, তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন
না, তাকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করবেন না এবং তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
তিন প্রকার মানুষ আছে, কিয়ামতের দিন যাদের সাথে আল্লাহ তা’আলা কথা বলবেন না এবং তাদেরকে
পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করবেন না। অন্য এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি
রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আর তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তারা হচ্ছে- বৃদ্ধ
ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী বাদশাহ ও অহংকারী গরীব। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১০৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৭,
সহীহুল জামি‘ ৫৩৮০, সহীহ আত্ তারগীব ২৩৯৬, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক ২০২৮৫, মুসনাদুল
বাযযার ৪০২৩, আহমাদ ১০২২৭, শু‘আবুল ঈমান ৫৪০৫, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১৩৯২৮,
আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৫৬৬৪, আস্ সুনানুল কুবরা ১৭০৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৯৭, ইসলামিক
সেন্টারঃ ২০৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ
করবে না এবং যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ
করতে পারবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১০৭, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৬৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৯১, সুনান ইবনু মাজাহ ৪১৭৩, সহীহুল জামি‘ ৭৬৭৯, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৬৫৮০,
মুসনাদুল বাযযার ১৫৮৪, আহমাদ ৩৯১৩, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৫০৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ২২৪,
আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৯৮৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যার অন্তরে এক বিন্দু অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জনৈক
ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! সকলেই তো এটা পছন্দ করে যে, তার পোশাক ভালো
হোক, জুতো জোড়া ভালো হোক, এসব কি অহংকারের মধ্যে শামিল? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা নিজেও সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দও করেন। আর অহংকার
হলো হককে বাতিল করা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১০৮, সহীহুল জামি‘ ৭৬৭৪, সহীহ আত্ তারগীব ২৯১২, সুনান আবূ দাঊদ ৪০৯২,
সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ৪৩৩, আহমাদ ৪০৫৮, শু‘আবুল ঈমান ৬১৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, যে ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে পরনের কাপড় টাখ্নুর নিম্নভাগে ঝুলিয়ে চলাফিরা করে,
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দিবেন না। এ শুনে আবূ বকর (রাঃ) বললেন,
আমার অজ্ঞাতে কাপড়ের একপাশ কোন কোন সময় নীচে নেমে যায়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তো ফখরের সঙ্গে তা করছ না। মূসা (রহ.) বলেন, আমি সালিমকে
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কি ‘যে ব্যক্তি তার লুঙ্গি ঝুলিয়ে চলল’ বলেছেন? সালিম
(রহ.) বললেন, আমি তাকে শুধু কাপড়ের কথা উল্লেখ করতে শুনেছি। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৬৬৫, ৫৭৮৩, ৫৭৮৪, ৫৭৯১, ৬০৬২,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি
জিনিস পরিত্রাণকারী এবং তিনটি জিনিস ধ্বংসকারী। পরিত্রাণকারী জিনিসগুলো হলো- ১. প্রকাশ্যে
ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা, ২. সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট উভয় অবস্থায় উচিত কথা বলা, ৩. ধনী
ও দরিদ্র উভয় অবস্থায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা। আর ধ্বংসকারী জিনিসগুলো হল- ১. প্রবৃত্তির
অনুসারী হওয়া, ২. লোভ-লালসা করা, ৩. কোন ব্যক্তি নিজেকে নিজে সম্মানিত মনে করা। আর
এ স্বভাবটিই সবচেয়ে খারাপ স্বভাব। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫১২২, শু‘আবুল ঈমান ৭২৫২, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৮০২)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
আসমা
বিনতু ’উমায়স (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ঐ বান্দা মন্দ, যে নিজেকে
অপরের চেয়ে ভালো মনে করে, অহংকার করে এবং আল্লাহ তা’আলাকে ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ,
যে মানুষের ওপর জুলুম-অত্যাচার করে, সীমালঙ্ঘন করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পরাক্রমশালী আল্লাহকে
ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে দীনের কাজ ভুলে যায়, দুনিয়ার কাজে মত্ত হয়ে থাকে এবং কবরস্থানের
কথা ও শরীর পঁচে যাওয়ার কথা ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে ঝগড়া-বিবাদ বাধিয়ে বিপর্যয়
সৃষ্টি করে, অবাধ্য হয় এবং নিজের প্রথম ও শেষ ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে দুনিয়াবাসীকে
’’দীন’’ দ্বারা ধোঁকা দেয়। ঐ বান্দা মন্দ, যে সন্দেহ করে ধর্মকে খারাপ করে দেয়। ঐ বান্দা
মন্দ, যাকে দুনিয়ার লোভ-লালসার দিকে এবং দুনিয়ার পূজারীদের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়।
ঐ বান্দা মন্দ, যাকে দুনিয়ার লোভ-লালসা ও দুনিয়ার প্রতি আসক্তি, অসম্মানিত ও হেয় করে।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১১৫, সুনান আততিরমিযী ২৪৪৮,
য‘ঈফ আত্ তারগীব ১৭৪২, য‘ঈফুল জামি‘ ২৩৫০, শু‘আবুল ঈমান ৮১৮১)।
(৪) মুনাফিক্বীঃ
মুনাফেকি
(নিফাক) হলো ইসলামের বাইরে ঈমানের ভান করে ভেতরে কুফরি বা অবিশ্বাসের মানসিকতা পোষণ
করা। এটি প্রতারণামূলক আচরণ, যেখানে ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে পরিচিতি পায় কিন্তু গোপনে
ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষতি চায়। এটি বড় কুফর বা আমলগত অবহেলা হতে পারে । মুনাফিকরা
ইসলামের দৃষ্টিতে চরম বিশ্বাসঘাতক ও ভণ্ড।
মুনাফিকদের কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা হলোঃ
গচ্ছিত
জিনিস আত্মসাৎ করা, কথোপকথনকালে মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করা এবং বাকবিতন্ডাকালে
বাজে কথা বলাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘ওদের
মাঝে এমন কিছু লোকও আছে যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিল, যদি তিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের
সম্পদ দান করেন, তাহ’লে আমরা অবশ্যই তার (একাংশ আল্লাহর পথে) দান করব এবং অবশ্যই আমরা
সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। অতঃপর যখন তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদের ধন-সম্পদ দান করলেন,
তখন তারা (দানের বদলে) কৃপণতা করতে শুরু করল এবং উপেক্ষার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিল। ফলে
তিনি তাদের অন্তরে মুনাফিকী বদ্ধমূল করে দিলেন সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তাঁর সাথে
সাক্ষাৎ করবে। এটা এ কারণে যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে যে ওয়াদা করেছিল তা ভঙ্গ করেছে এবং
তারা মিথ্যা বলেছিল’। (সুরা তওবা ৯/৭৫-৭৭)।
অন্যত্র
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘মানুষের মাঝে এমন লোকও আছে যারা মুখে বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালের
উপর ঈমান এনেছি। কিন্তু তারা ঈমানদার নয়’। (সুরা বাক্বারাহ ২/৮)।
আবদুল্লাহ
ইবনু‘ আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব
যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা
পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়।
(ক) আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে;
(খ) কথা বললে মিথ্যা বলে;
(গ) প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং
(ঘ)
বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪, ২৪৫৯, ৩১৭৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১১৩, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৫৮, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬,
সুনান আততিরমিযী ২৬৩২, সুনান আননাসায়ী ৫০২০, সুনান আবূদাউদ ৪৬৮৮, আহমাদ ৬৭২৯, ৬৮২৫,
৬৮৪০, ৬৭৮২, সহীহ ইবনু হিব্বান ২৫৪, সহীহ আত্তারগীব ২৯৩৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৩৩)। হাদিসেরমানঃ সহিহ (Sahih)।
মুনাফিকরা অহংকারী হয়ে থাকেঃ
মহান
আল্লাহ বলেন, ‘এদের (মুনাফিকদের) যখন বলা হয় তোমরা (আল্লাহর রাসূলের কাছে) এসো তাহ’লে
আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন এরা অবজ্ঞাভরে
মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং তুমি (এও) দেখতে পাবে, তারা অহংকারের সাথে তোমাকে এড়িয়ে চলে’।
(সুরা মুনাফিকূন ৬৩/৫)।
অহংকার বশে মুনাফিকরা মুখ ফিরিয়ে নেয়ঃ
মুনাফিকদের
উপর আল্লাহর অভিশাপ হোক। তাদেরকে যখন ডেকে বলা হয়, তোমরা আল্লাহর রাসূলের নিকট এসো।
তিনি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন অহংকারবশতঃ তারা সে কথা
মোটেও গ্রাহ্য করে না বরং সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে মাথা দুলিয়ে চলে যায়। এজন্যই আল্লাহ
তা‘আলা তাঁর রাসূলকে বলেছেন, অহংকার বশে ওদের তুমি মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখবে। পরে আল্লাহ
তা‘আলা তাদের প্রতিফল কী দাঁড়াবে তা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘(আসলে) তুমি এদের জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা কর কিংবা না কর উভয়ই তাদের জন্য সমান। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কখনই তাদের ক্ষমা
করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা কোন ফাসিক জাতিকে হেদায়াত দান করেন না’। (সুরা মুনাফিকূন ৬৩/০৬)।
কাফেরদের সাথে সম্প্রীতি রাখাঃ
মুনাফিকদের
সখ্যতা ও সম্প্রীতি মুমিনদের সাথে নয় বরং কাফেরদের সাথে লক্ষ্য করা যায়। কাফেরদের সাথে
তাদের এই দহরম মহরমের জন্য আল্লাহ বলেছেন,
‘হে
নবী! তুমি মুনাফিকদের এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক ভয়াবহ আযাব রয়েছে,
যারা (দুনিয়ার ফায়েদার জন্য) ঈমানদারদের বদলে কাফেরদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
তারা কি এর দ্বারা এদের কাছ থেকে কোন সম্মান লাভের প্রত্যাশা করে? অথচ যাবতয়ি সম্মান
আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট’। (সুরা আননিসা ৪/১৩৮-৩৯)।
মুমিনদের সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরাঃ
আল্লাহ
বলেন, ‘তারা (মুনাফিকরা) যখন ঈমানদারদের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি,
আবার যখন তাদের দুষ্ট নেতাদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো অবশ্যই তোমাদের
সাথে আছি। (ঈমানের কথা বলে তাদের সাথে) আমরা কেবলই ঠাট্টা করি। (মূলতঃ) আল্লাহ তাদের
সাথে ঠাট্টা করেন এবং সীমালংঘনজনিত কাজে যাতে তারা উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় সেজন্য
তাদের অবকাশ দিয়ে রাখেন’। (সুরা আল বাক্বারাহ ২/১৪-১৫)।
আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি এবং ইবাদতে অলসতাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা মুনাফিকদের এ আচরণ সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। বস্ত্ততঃ
এর মাধ্যমে তিনিই (আল্লাহই) তাদের ধোঁকায় ফেলে দেন। আর যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায় তখন
অলস হয়ে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায়, বস্ত্ততঃ তারা আল্লাহকে খুবই কম স্মরণ করে’। (সুরা আননিসা ৪/১৪২)।
দোটানা ও দোদুল্যমান মনোভাবঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘এরা (কুফর ও ঈমানের) দোটানায় দোদুল্যমান, এরা না এদিকে না ওদিকে’। (সুরা আননিসা ৪/১৪৩)।
আল্লাহদ্রোহী শাসকদের নিকট মামলা-মোকদ্দমা পেশ করাঃ
এ
সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘তুমি
কি তাদের দেখনি, যারা দাবী করে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তোমার আগে অবতীর্ণ
হয়েছে, তারা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছে। কিন্তু তারা আল্লাহদ্রোহী শক্তির কাছ থেকে ফায়ছালা
পেতে চায়। অথচ এদের আদেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা এসব আল্লাহদ্রোহীর হুকুম অমান্য করবে।
আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। আর যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা কিছু
নাযিল করেছেন তোমরা তার দিকে এবং রাসূলের দিকে (ফিরে) এসো, তখন তুমি মুনাফিকদের দেখবে,
তারা তোমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে’। (সুরা নিসা ৪/৬০-৬১)।
মুমিনদের মাঝে বিপর্যয় সৃষ্টিঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘তারা তোমাদের সাথে বের হ’লে তোমাদের মধ্যে বিভ্রান্তিই শুধু বাড়িয়ে দিত
এবং তোমাদের মাঝে ফিৎনা সৃষ্টির জন্য ছুটাছুটি করত। তাছাড়া তোমাদের মাঝেও তাদের কথা
আগ্রহের সাথে শোনার মত লোক আছে। আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত’। (সুরা আততওবা ৯/৪৭)।
মিথ্যা শপথ, ভয়-ভীতি, কাপুরুষতা ও অস্থিরতাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা মুনাফিকদের উক্ত আচরণাদি সম্পর্কে বলেন,
‘এরা
আল্লাহর নামে শপথ করে যে, এরা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। অথচ এরা কখনই তোমাদের অন্তর্ভুক্ত
নয়। বস্ত্ততঃ এরা এমন লোক, যারা ভয় করে থাকে। এরা কোন আশ্রয়স্থল, কোন গুহা অথবা মাটির
ভিতর ঢুকে পালাবার মত কোন সুড়ঙ্গ পেলে অবশ্যই তোমাদের ছেড়ে এসব জায়গার দিকে দ্রুত পালিয়ে
যাবে’। (সুরা আততওবা ৯/৫৬-৫৭)।
তারা যা করেনি তা করার নামে প্রশংসা পিয়াসীঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘যারা
নিজেরা যা করে তাতে আনন্দ প্রকাশ করে এবং নিজেরা যা করেনি তার জন্যও প্রশংসিত হ’তে
ভালবাসে এমন লোকদের সম্পর্কে তুমি কখনো ভাববে না যে তারা আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি
পেয়ে যাবে। বরং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে’। (সুরা আলে ইমরান ৩/১৮৮)।
তারা সৎকর্মকে দূষণীয় গণ্য করেঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘এদের (মুনাফিকদের) মাঝে এমন লোকও আছে, যারা দানের ব্যাপারে তোমার উপর
দোষারোপ করে। কিন্তু সেই দান সামগ্রী থেকে তাদের কিছু দেওয়া হ’লে তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ
করে। আর যদি তা থেকে তাদের দেওয়া না হয়, তখন তারা খুবই ক্ষুব্ধ হয়’। (সুরা আততওবা ৯/৫৮)।
অন্যায়ের আদেশ ও ন্যায়ের নিষেধঃ
মুমিনরা
যেখানে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করে থাকে, সেখানে মুনাফিকরা তার বিপরীতে মানুষকে
অন্যায় কথা ও কাজের আদেশ দেয় এবং ন্যায় কথা ও কাজ করতে নিষেধ করে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের
এ আচরণ অবৈধ আখ্যায়িত করে বলেছেন,
‘মুনাফিক
পুরুষ ও মুনাফিক নারী একে অপরের অনুরূপ। এরা অন্যায়ের আদেশ দেয় এবং ন্যায়ের নিষেধ করে।
আর তারা আল্লাহর পথে খরচ করা থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে। এরা (দুনিয়ায়) আল্লাহ তা‘আলাকে
ভুলে গেছে তিনিও আখিরাতে তাদের ভুলে যাবেন। নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা পাপিষ্ঠ’। (সুরা আততওবা ৯/৬৭)।
জিহাদে বিরাগ ও তা থেকে পিছুটানঃ
মুনাফিকরা
ইসলামের খাতিরে জিহাদে অংশগ্রহণে মোটেও আগ্রহ বোধ করে না; বরং জিহাদে অংশগ্রহণ না করতে
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ আচরণ প্রসঙ্গে বলেন,
‘যুদ্ধ
থেকে পশ্চাদপসরণকারীরা আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেদের ঘরে বসে থাকতে পেরে
খুব খুশি হয়েছে এবং নিজেদের জান-মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা অপসন্দ করে;
আর তারা বলেছে, এই গরমে তোমরা বের হয়ো না। বল, জাহান্নামের আগুন এর চাইতেও অধিক উত্তপ্ত।
যদি তারা এ কথা বুঝতে পারত’। (সুরা আততওবা ৯/৮১)।
মুমিনদের সাথে থাকায় গড়িমসিঃ
যারা
মুনাফিক তারা মুমিনদের সাথে জিহাদ কিংবা অনুরূপ কোন কাজে শরীক হ’তে গড়িমসি করে। মূলতঃ
মুমিনদের উপর আপতিত বালা-মুছীবত থেকে বাঁচাই তাদের লক্ষ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘তোমাদের
মধ্যে অবশ্যই এমন লোক আছে, যে (যুদ্ধের ব্যাপারে) গড়িমসি করবে। তোমাদের উপর কোন বিপদ-মুছীবত
চেপে বসলে সে বলবে, আল্লাহ তা‘আলা আমার উপর বড় অনুগ্রহ করেছেন। কেননা আমি সে সময় তাদের
সাথে ছিলাম না’। (সুরা আননিসা ৪/৭২)।
মানুষের দৃষ্টির আড়াল হওয়ার চেষ্টাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘এরা মানুষের কাছ থেকে নিজেদের কর্ম গোপন রাখতে চায়।
কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকে তারা কিছুই গোপন করতে পারবে না। তারা যখন রাতের অন্ধকারে
এমন সব বিষয়ে সলাপরামর্শ করে যা তিনি পসন্দ করেন না, তখনও তিনি তাদের সাথেই থাকেন।
এরা যা কিছু করে তা সম্পূর্ণই আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞানের আওতাধীন’। (সুরা আননিসা ৪/১০৮)।
মুমিনদের ক্ষয়ক্ষতিতে উল্লসিত হওয়াঃ
মুমিনদের
যে কোন ক্ষয়ক্ষতিতে উল্লসিত হওয়া মুনাফিকদের খুবই নীচ স্বভাব। তারা মুমিনদের শত্রু
ভাবে বলেই এমনটা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘হে মুসলিমগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ কর না; তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ত্রুটি করে না- তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্য নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হল, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। দেখ! তোমরাই তাদের ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে ‘আমরা ঈমান এনেছি’। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর রোষবশতঃ আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাক। আল্লাহ মনের কথা ভালই জানেন। তোমাদের যদি কোন মঙ্গল হয় তাহ’লে তাদের খারাপ লাগে। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয়, তাহ’লে তাতে তারা আনন্দিত হয়। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে সে সমস্তই আল্লাহর আয়াত্তে রয়েছে’। (সুরা আলে ইমরান ৩/১১৮-১২০)।
মুনাফিকদের শাস্তিঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“মুনাফিকরা
তো জাহান্নামের নিম্নতমস্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কখনো কোন সহায় পাবেন না”।
(সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৪৫)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“মুনাফেক
পুরুষ, মুনাফেক নারী ও কাফেরদেরকে আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাহান্নামের আগুনের,
যেখানে তারা স্থায়ী হবে, এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন
এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি”। (সূরা আত্ তাওবাহ্
৯ : ৬৮)।
আল্লাহ
তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
‘এদের
(মুনাফিকদের) মনের মধ্যে রয়েছে মারাত্মক ব্যাধি। অতঃপর (প্রতারণার কারণে) আল্লাহ তা‘আলা
এদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মিথ্যাবাদিতার কারণে তাদের জন্য রয়েছে পীড়াদায়ক
শাস্তি’। (সুরা আল বাক্বারাহ ২/১০)।
মুনাফিকদের মুকাবেলায় মুসলমানদের ভূমিকা
মুনাফিকদের
ক্ষেত্রে কোন ঢিলেমি না করা ফরয। তাদের পক্ষ থেকে আগত বিপদকে খাট করে দেখাও বৈধ নয়।
বর্তমানে মুনাফিকরা তো নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগ থেকে বেশী বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
হুযাইফা
ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, মুনাফিকরা আজ নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগের থেকেও
ভয়ানক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন তারা লুকিয়ে ছাপিয়ে মুনাফিকী করত। কিন্তু আজ প্রকাশ্যে
বুক ফুলিয়ে তা করছে’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭১১৩, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬১৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬২৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
তাদের
বিষয়ে মুসলমানদের ভূমিকা হবে নিম্নরূপঃ
(১) তাদের আনুগত্য না করাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘হে
নবী, আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য কর না। অবশ্যই আল্লাহ সর্বজ্ঞ,
প্রজ্ঞাময়’ (আহযাব ৩৩/১)। ইমাম তাবারী (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে সম্বোধন
করে বলেছেন, হে নবী, তুমি আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য এবং তাঁর প্রতি তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্য
পালনের মাধ্যমে তাঁকে ভয় কর। আর তাঁকে ভয় কর, তাঁর নির্দেশিত হারাম থেকে দূরে থাকা
ও তার সীমালংঘন না করার মাধ্যমে। আর তুমি ঐ সকল কাফিরের আনুগত্য করবে না যারা তোমাকে
বলে, তোমার যেসব ছোট লোক ঈমানদার অনুসারী আছে তোমার নিকট থেকে তাদের হটিয়ে দাও, যাতে
আমরা তোমার কাছে বসতে পারি’। তুমি ঐ সকল মুনাফিকেরও আনুগত্য করবে না যারা দৃশ্যত তোমার
উপর ঈমান রাখে এবং তোমার কল্যাণ কামনা করে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তোমার, তোমার দ্বীন
এবং তোমার ছাহাবীদের ক্ষতি করতে মোটেও কোন সুযোগ হাতছাড়া করবে না। তুমি তাদের কোন মতামত
গ্রহণ করবে না এবং শুভাকাঙ্খী মনে করে তাদের কাছে কোন পরামর্শও চাইতে যাবে না। কারণ
তারা তোমার শত্রু। ঐ সমস্ত মুনাফিকের অন্তরে কী লুক্কায়িত আছে আর কী উদ্দেশ্যেই বা
তারা বাহ্যত তোমার কল্যাণ কামনা যাহির করছে তা তাঁর ভাল জানা আছে। তিনি তোমার, তোমার
দ্বীনের এবং তোমার ছাহাবীদের সহ সমগ্র সৃষ্টির ব্যবস্থাপনায় মহাপ্রজ্ঞার অধিকারী। (জামিউল বায়ান ২০/২০২)।
(২) মুনাফিকদের উপেক্ষা করা, ভীতি প্রদর্শন ও উপদেশ দানঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘তুমি মুনাফিকদের এই সংবাদ জানিয়ে দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক
শাস্তি’। (সুরা আননিসা ৪/১৩৮)।
তিনি
আরো বলেন,
‘ঐ
মুনাফিকরাই তো তারা, যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি ওদের এড়িয়ে
চল বা উপেক্ষা কর, ওদের উপদেশ দাও এবং ওদের এমন কথা যা মর্মে গিয়ে পৌঁছে’। (সুরা আননিসা ৪/৬৩)।
আল্লাহ
তা‘আলা আয়াতে ‘ওরা’ (اولئك) বলতে মুনাফিকদের বুঝিয়েছেন,
ইতিপূর্বে যাদের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, হে রাসূল! তাগূতের কাছে তাদের বিচার
প্রার্থনা করা, তোমার কাছে বিচার প্রার্থনা না করা এবং তোমার কাছে আসতে বাধা দানে তাদের
মনে কী অভিপ্রায় লুকিয়ে ছিল তা আল্লাহ খুব ভাল জানেন। তাদের মনে তো মুনাফিকী ও বক্রতা
লুকিয়ে রয়েছে যদিও তারা শপথ করে বলে, আমরা কেবলই কল্যাণ ও সম্প্রীতি কামনা করি।
আল্লাহ
তা‘আলা তাঁর রাসূলকে বলছেন, ‘তুমি ওদের ছাড় দাও, কায়িক-দৈহিক কোন শাস্তি তুমি ওদের
দেবে না। তবে তুমি তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি
চেপে বসার এবং তাদের বসতিতে আল্লাহর মার অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে তাদেরকে ভয় দেখিয়ে
উপদেশ দাও। তারা আল্লাহ ও তার রাসূল সম্পর্কে যে সন্দেহের দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য
যে অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি তারা হবে সে সম্পর্কে তাদের সতর্ক কর। আর তাদের হুকুম
কর আল্লাহকে ভয় করতে এবং আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও শাস্তিকে সত্য
বলে মেনে নিতে’। (ঐ, ৮/৫১৫)।
(৩) মুনাফিকদের সঙ্গে বিতর্কে না জড়ানোঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘যারা
নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তুমি তাদের পক্ষে বিতর্কে লিপ্ত হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ
কখনো বিশ্বাসঘাতক পাপিষ্ঠকে পসন্দ করেন না’। (সুরা আননিসা
৪/১০৭)।
আল্লাহ
বলেছেন, হে রাসূল! যারা নিজেদের সাথে খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের পক্ষ নিয়ে
তুমি বিতর্ক করবে না। বনু উবাইরিক গোত্রের কিছু লোক এই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। যাফর
গোত্রের তাম‘আহ বা বশীর ইবনু উবাইরিক এক আনছারীর বর্ম চুরি করে। বর্মের মালিক নবী করীম
(ছাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করে এবং তাম‘আহর প্রতি তার সন্দেহের কথা বলে। অনুসন্ধান শুরু
হ’লে সে বর্মটি এক ইহুদীর কাছে গচ্ছিত রাখে। পরে তাম‘আহ, তার ভাই-বেরাদার ও বনু যাফরের
আরো কিছু লোক জোট পাকিয়ে সেই ইহুদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। ইহুদীকে জিজ্ঞেস করা হ’লে
সে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে। কিন্তু তাম‘আহর লোকেরা জোরেশোরে বলতে থাকে, এতো শয়তান
ইহুদী, সেতো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করে। তার কথা কেমন করে বিশ্বাসযোগ্য হ’তে
পারে? বরং আমাদের কথা মেনে নেওয়া উচিত। কেননা আমরা মুসলমান। এ মোকদ্দমার বাহ্যিক ধারাবিবরণীতে
প্রভাবিত হয়ে নবী করীম (ছাঃ) ঐ ইহুদীর বিরুদ্ধে রায় দিতে এবং অভিযোগকারীকে বনু উবাইরিকের
বিরুদ্ধে দোষারোপ করার জন্য সতর্ক করে দিতে প্রায় উদ্যত হয়েছিলেন। এমন সময় উক্ত আয়াত
নাযিল হয় এবং সমস্ত ব্যাপারটির প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়।
আসলে
যে ব্যক্তি অন্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে সবার আগে নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
কারণ মন ও মস্তিষ্কের শক্তিগুলো তার কাছে আমানত হিসাবে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। সে সেগুলোকে
অযথা ব্যবহার করে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বাধ্য করে। বিবেক-বুদ্ধিকে দ্বীনের অনুগত
না করে বরং আপন খেয়ালখুশির অনুগত করে সে এভাবে নিজের সাথে খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করে।
তাই
এমন বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ নিতে নবী করীম (ছাঃ)-কে নিষেধ করা হয়েছে। বস্ত্তত মানুষের
সম্পদ আত্মসাৎ করা যাদের স্বভাব এবং এরূপ আত্মসাৎ ও অন্যান্য হারামের মাঝে বিচরণের
মাধ্যমে যারা পাপ-পঙ্কিলতার মাঝে ডুবে থাকে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মোটেও ভালবাসেন
না এবং পসন্দও করেন না। (ঐ, ৯/১৯০)।
(৪) মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে না তোলাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘হে
মুসলিগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না; তারা তোমাদের অমঙ্গল
সাধনে কোন ত্রুটি করে না- তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ
তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য।
তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ
হও’। (সুরা আলে ইমরান ৩/১১৮)।
উক্ত
আয়াত কিছু মুসলিম সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। তারা তাদের ইহুদী মুনাফিক বন্ধুদের সঙ্গে গভীর
মিতালি রাখত এবং প্রাক ইসলামী যুগে জাহেলিয়াতের যামানায় যেসব কারণে তাদের মাঝে বন্ধুত্ব
গড়ে উঠেছিল ইসলাম পরবর্তীকালেও তারা তা নির্ভেজালভাবে অটুট রেখেছিল। আল্লাহ তা‘আলা
এ আয়াতে তাদেরকে এমন বন্ধুত্ব রক্ষা করতে নিষেধ করেন এবং একই সাথে তাদের কোন কাজে ওদের
থেকে পরামর্শ নিতেও নিষেধ করে দেন’। (ঐ, ৭/১৪০)।
(৫) মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালনা এবং কঠোরতা আরোপঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘হে নবী! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাও এবং তাদের
বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ কর। তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। আর তা কতই না নিকৃষ্ট
আবাস’! (সুরা তওবা ৯/৭৩)।
মুনাফিকদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ভয় দেখানোর মাধ্যমে এই কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা যায়।
(৬) মুনাফিকদের প্রতি অবজ্ঞা দেখান এবং তাদের নেতা না বানানোঃ
বুরাইদা
(রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা কোন মুনাফিককে সাইয়্যিদ
বা নেতা নামে আখ্যায়িত করো না। কেননা সে যদি সত্যিই (তোমাদের) নেতা হয়, তাহ’লে তোমরা
তোমাদের প্রভুকে ক্ষুব্ধ করবে’। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৪৯৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৭) মুনাফিকদের জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ না করাঃ
আল্লাহ
তা‘আরা বলেন,
‘তাদের
(মুনাফিকদের) কেউ মারা গেলে তুমি কখনও তার জানাযার ছালাত আদায় করবে না এবং তার কবরের
পাশে দাঁড়াবে না। নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং পাপাচারী
অবস্থাতেই তাদের মৃত্যু হয়েছে’। (সুরা তওবা ৯/৮৪)।
এই
আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে যে, যখন মুনাফিকদের
দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই মারা যায় তখন তার পুত্র আব্দুল্লাহ নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট
এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনার জামাটা আমাকে দিন, ওটা দিয়ে আমি ওকে কাফন
দেব। আর আপনি ওর জানাযার ছালাত আদায় করবেন এবং ওর জন্য ক্ষমা চাইবেন। তিনি তাকে জামাটা
দিয়ে বললেন, কাফন জড়ান শেষ হ’লে আমাকে জানাবে। তিনি কাফন সম্পন্ন করে তাঁকে জানালেন।
তিনি তখন জানাযার ছালাতে ইমামতির জন্য এগিয়ে গেলেন। কিন্তু সে সময় ওমর (রাঃ) তাঁকে
টেনে ধরলেন এবং বললেন, আল্লাহ কি আপনাকে মুনাফিকদের জানাযার ছালাত আদায় করতে নিষেধ
করেননি? তিনি কি বলেননি, তুমি তাদের জন্য মাফ চাও কিংবা না চাও সবই সমান। তুমি যদি
তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা চাও তবুও আল্লাহ তাদের মোটেও ক্ষমা করবেন না? তখন অবতীর্ণ
হয়- ‘হে রাসূল! তুমি তাদের কেউ মারা গেলে কোন দিন তার জানাযার ছালাত আদায় করবে না এবং
তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না’। তারপর থেকে তিনি মুনাফিকদের জানাযার ছালাতে অংশ নেওয়া
বন্ধ করে দেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৭৯৬,
১২৬৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৭২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৬৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৫) রিয়া বা লোক দেখানো আমলঃ
মানুষকে
দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করাকে রিয়া বলা হয়। যাতে করে লোকেরা ইবাদতকারী ব্যক্তির
প্রশংসা করে। الرِّيَاءُ এবং اَلسُّمْعَةُ এর
মধ্যে পার্থক্য হলো, মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে যে আমল করা হয় তথা যা চোখ দিয়ে দেখা
যায়, তাকে الرِّيَاءُ বলা হয়। যেমন, ছালাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি।
আর
যে আমল মানুষকে শুনানোর উদ্দেশ্যে করা হয় তথা যা কানে শুনা যায়, তাকে اَلسُّمْعَةُ বলা
হয়। যেমন, কুরআন তেলাওয়াত করা, ওয়ায করা, যিকির-আযকার করা ইত্যাদি। যেসব আমল মানুষ
তাদের কথাবাতার্য় উল্লেখ করে এবং অন্যকে জানায়, তাও اَلسُّمْعَةُ এর
মধ্যে গণ্য।
লৌকিকতা
বা লোক দেখানোর জন্য আমল করার পরিণাম খুবই ভয়াবহ। লোক দেখানোর জন্য যে আমল করা
হয় ইসলামে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, যা শিরকে আছগার বা ছোট শিরক নামে পরিচিত। আর শিরক
বলতেই অমার্জনীয় অপরাধ বোঝায়, যা মানুষের সকল নেক আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে। কারণ,
ইবাদত-বন্দেগী হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এ ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে
সম্পাদিত হলে তা নিষ্ফল বলে গণ্য হবে। ঐ ইবাদত কোনোই কাজে আসবে না। তাই প্রদর্শনীর
উদ্দেশ্যে যে কোনো ধরনের আমল করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বিশুদ্ধচিত্ত
একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা ব্যতীত তাদেরকে আর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি’। (সুরা আল-বাইয়িনা, ৯৮/৫)।
মহান
আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘নিশ্চয় মুনাফিক্ব (কপট) ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়।
বস্তুত তিনিও তাদেরকে প্রতারিত করে থাকেন এবং যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায়, তখন শৈথিল্যের
সাথে নিছক লোক দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে থাকে’। (সুরা আন-নিসা, ৪/১৪২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“বলুন,
আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র সত্য ইলাহ।
কাজেই যে তার রব-এর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রব-এর ইবাদাতে কাউকেও
শরীক না করে”। (সূরা আল কাহ্ফ ১৮ : ১১০)।
একজন
মুসলিমের প্রতিটি ইবাদত আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হবে। তাতে বিন্দুমাত্র অন্য কোনো উদ্দেশ্য
থাকবে না। দুনিয়া হাছিল কিংবা কারো সুদৃষ্টি লাভের আশায় করার সুযোগ নেই। কাউকে দেখানোর
বা শুনানোর মানসিকতা পোষণ করা বৈধ নয়। এরূপ ইচ্ছা থাকলে পরকালে তার কিছুই অবশিষ্ট
থাকবে না। অনেক আমল করার পরও বিচারের মাঠে শূন্য হাতে উঠতে হবে। লৌকিকতা ও সুনাম অর্জনের
নিমিত্তে করার অপরাধে সবই ধ্বংস হয়ে যাবে।
লোক দেখানো আমল শিরকের অন্তর্ভুক্তঃ
সাধারণত
মানুষ নিজের খ্যাতি অন্যকে জানাতে পছন্দ করে। তার সুনাম ও সুখ্যাতির কথা সবাই জানুক
তা সে মনে মনে চায়। অথচ মানুষকে দেখানোর জন্য বা সুনাম অর্জনের জন্য আমল করা শরীআতে
নিষিদ্ধ। এরূপ আমল শিরকের সমপর্যায়ভুক্ত। এমন কর্মকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম খুব বেশি ভয় পেতেন। তিনি এ বিষয়ে ছাহাবীদের কঠোর ভাষায় সাবধান করে গেছেন।
মাহমূদ ইবনু লাবীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‘তোমাদের
ব্যাপারে আমি সবচেয়ে যে বিষয়ের বেশি ভয় পাই, তা হলো শিরকে আছগার। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস
করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! শিরকে আছগার কী? তিনি বললেন,
রিয়া তথা লোক দেখানো আমল’। যখন (কিয়ামতে) লোকদের আমলসমূহের প্রতিদান প্রদান করা হবে,
তখন আল্লাহ তাআলা সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, ‘তোমরা তাদের নিকটে যাও, যাদের দেখানোর জন্য
দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখো, তাদের নিকট কোনো প্রতিদান পাও কি না’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৩৩৪, মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৬৮৬;
বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, হা/৬৮৩১; ত্বাবারানী কাবীর, হা/৪৩০১; কানযুল উম্মাল, হা/৭৪৭৭;
বুলূগুল মারাম, হা/১৪৮৪; ছহীহুল জামে‘, হা/১৫৫৫; সিলসিলা ছহীহা, হা/৯৫১, সহীহ আত্ তারগীব
ওয়াত তারহীব ৩২, আল মুজামুল কাবীর লিত তবারানী ৪১৩৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
লোক
দেখানো আমল শিরকের অন্তর্ভুক্ত, যা উল্লিখিত হাদীছের দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। এরূপ
ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ ব্যঙ্গ করে তাদের নিকটে ফিরে যেতে বলবেন, যাদের দেখানোর জন্য
সে আমল করেছিল। যা তার জন্য ভীষণ লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ হবে। এমন কাজকে গোপন শিরকও
বলা হয়েছে। এ মর্মে অন্য হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,
আবূ
সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা আমরা মসীহ দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম,
এমন সময় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এসে বললেন, ‘সাবধান!
আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করব না, যা আমার নিকট তোমাদের জন্য মসীহ
দাজ্জাল হতেও আশঙ্কাজনক?’ আমরা বললাম, বলুন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম! তিনি বললেন, ‘আর তা হলো ‘শিরকে খাফী’ অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ছালাতে দাঁড়িয়ে
এই কারণে ছালাতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে যে, তার ছালাত কোনো ব্যক্তি দেখছে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৩৩৩, সুনান ইবনু মাজাহ ৪২০৪, সহীহ
আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৭, সহীহুল জামি' ২৬০৭, ছহীহুল জামে, হা/২৬০৭; কানযুল উম্মাল,
হা/৭৪৬৮; ছহীহ আত-তারগীব, হা/৩০)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
মাহমূদ
ইবনু লাবীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের
হয়ে বললেন,
‘হে
লোকসকল! তোমরা গোপন শিরক থেকে বেঁচে থাকো। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! গোপন শিরক কী? তিনি বললেন, গোত্রের কোনো ব্যক্তি
যখন ছালাত আদায় করে, তখন খুব সুন্দর করে আদায় করার চেষ্টা করে, যাতে করে মানুষ তার
দিকে তাকিয়ে তাকে দেখে। আর এটিই গোপন শিরক’। (ছহীহ ইবনু
খুযায়মা, হা/৯৩৭; বায়হাক্বী কুবরা, হা/৩৪০০; ছহীহুল জামে‘, হা/২৬০৭; ছহীহ আত-তারগীব,
হা/৩১)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
মানুষকে
দেখানোর জন্য কিংবা সুনাম অর্জনের জন্য কোনো আমল করা শিরকে আছগার হিসেবে গণ্য। আবার
একে কোনো কোনো হাদীছে গোপন শিরক বলা হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
স্বীয় উম্মতের ক্ষেত্রে এ বিষয়টির অধিক ভয় পেতেন। বিষয়টি কানা দাজ্জালের ভয়ংকর
ফেতনার চেয়েও মারাত্মক। কারণ এরূপ কাজ করতে মানুষ বেশি পছন্দ করে। একে কোনো অপরাধই
মনে করে না। বরং এরূপ কর্মে সে আনন্দ উপভোগ করে। আর আমল করতে গিয়ে শিরক হয়ে গেলে
ফলাফল খুবই ভয়াবহ হবে।
(৬) যাদু করাঃ
সব
যাদুই যাদু হিসেবে গণ্য। কোনো যাদুকে কালো নামে পৃথক করা যাবে না। যাদু-টোনা, বশীকরণ,
বান মারা তাবিজ করা বা কুফুরী শক্তি প্রয়োগ করাকে কালো যাদু বা ব্ল্যাক মাজিক বলা হয়।
এসব হচ্ছে শয়তানের কাজ।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানরা যা আবৃত্তি করত তারা তা অনুসরণ করেছে। আর সুলাইমান কুফরী
করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত জাদু ও (সে বিষয় শিক্ষা
দিত) যা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফিরিশতাদ্বয়ের উপর নাযিল হয়েছিল। তারা উভয়েই এই
কথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, ‘আমরা নিছক একটি পরীক্ষা; কাজেই তুমি কুফরী করো
না’। তা সত্বেও তারা ফিরিশতাদ্বয়ের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর
মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতো। অথচ তারা আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারত
না। আর তারা তা-ই শিখত যা তাদের ক্ষতি করত এবং কোন উপকারে আসত না। আর তারা নিশ্চিত
জানে যে, যে কেউ তা খরিদ করে, (অর্থাৎ জাদুর আশ্রয় নেয়) তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ
নেই। যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে, তা খুবই মন্দ, যদি তারা জানত”! (সুরা আল বাকারা ১০২)।
জাদু
এমন এক বিষয়কে বলা হয়, যার উপকরণ নিতান্ত গোপন ও সূক্ষ্ম হয়ে থাকে। জাদু এমন সব
গোপনীয় কাজের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যা দৃষ্টির অগোচরে থাকে। জাদুর মধ্যে মন্ত্রপাঠ,
ঝাড়ফুঁক, বাণী উচ্চারণ, ঔষধপত্র ও ধুম্ৰজাল - এসব কিছুর সমাহার থাকে। জাদুর বাস্তবতা
রয়েছে। ফলে মানুষ কখনো এর মাধ্যমে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কখনো নিহতও হয় এবং এর দ্বারা
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাও সৃষ্টি করা যায়। তবে এর প্রতিক্রিয়া তাকদীরের
নির্ধারিত হুকুম ও আল্লাহর অনুমতিক্রমেই হয়ে থাকে। এটা পুরোপুরি শয়তানী কাজ! এ প্রকার
কাজ শির্কের অন্তর্ভুক্ত। দুটি কারণে জাদু শির্কের অন্তর্ভুক্ত।
(এক)
এতে শয়তানদের ব্যবহার করা হয়। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা হয় এবং তাদের পছন্দনীয় কাজের
মাধ্যমে তাদের নৈকট্য অর্জন করা হয়।
(দুই)
এতে গায়েবী ইলম ও তাতে আল্লাহর সাথে শরীক হবার দাবী করা হয়। আবার কখনো কখনো জাদুকরকে
বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। এ সবগুলোই মূলতঃ ভ্রষ্টতা ও কুফরী।
তাই কুরআনুল করীমে জাদুকে সরাসরি কুফরী-কর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কালো
জাদুর অস্তিত্ব ইসলামের ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়, যা অনেক পুরাতন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)
জাদুগ্রস্থ হোন এবং খুব অসস্থিবোধ করতেন। কীভাবে তিনি জাদুগ্রস্থ হোন এ বিষয়ে আয়েশা
(রাঃ) বলেন,
একবার
রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর ওপর জাদু করা হয়। ফলে তাঁর অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছিল যে, তার
ধারণা হত তিনি কোন একটি কাজ করেছেন অথচ তা তিনি করেননি। এ অবস্থায় একদিন তিনি (সা.)
আমার কাছে ছিলেন এবং আল্লাহর নিকট বার বার দু’আ করলেন। অতঃপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
তুমি কি অবগত হয়েছ, আমি যা জানতে চেয়েছিলাম আল্লাহ তা’আলা আমাকে তা জানিয়ে দিয়েছেন।
আমার কাছে দু’জন লোক (মানব আকৃতিতে দু’জন ফেরেশতা) আসে। তাদের একজন আমার মাথার কাছে
এবং অপরজন আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল। এরপর তাদের একজন আপন সাথিকে বলল, এ লোকের অসুখটা
কি? বলল, তার ওপর জাদু করা হয়েছে। প্রথমজন জিজ্ঞেস করল, কে তাকে জাদু করেছে? সে উত্তর
দিল, ইয়াহুদী লাবীদ ইবনু আসাম। প্রথম লোক প্রশ্ন করল, তা কিসের সাহায্যে (করা হয়েছে?)
দ্বিতীয় লোকটি বলল, চিরুনি এবং চিরুনিতে ঝরে পড়া চুলের মধ্যে এবং পুরুষ খেজুর গাছের
নতুন খোলের মধ্যে। [’আয়িশাহ (রা.) বলেন,] অতঃপর নবী (সা.) তাঁর কিছু সাহাবীসহ সে কূপের
কাছে গেলেন। এরপর বললেন, এটাই সেই কূপ যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। তার পানি মেহেদি
নিংড়ানো। আর কূপের আশপাশের খেজুর গাছগুলোর মাথা যেন শয়তানের মাথার মতো। অতঃপর তা
কূপ হতে বের করে ফেলেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৮৯৩,
সহিহ বুখারী ৫৭৬৫, সহিহ মুসলিম ৪৩-(২১৮৯), সুনান ইবনু মাজাহ ৩৫৪৫, মুসান্নাফ ইবনু আবী
শায়বাহ্ ২৩৫১৯, আবূ ইয়ালা ৪৮৮২, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী ১৬৯৩৬, মুসনাদে আহমাদ
২৪৩৪৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিন্ নাসায়ী ৭৬১৫, আল মু'জামুল আওসাত্ব ৫৯২৬, আস্ সুনানুল
কুবরা লিল বায়হাকী ১৬৯৩৬, আস্ সুনানুস্ সুগরা ৩৩৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হজরত
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.)
বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল!
সেগুলো কী? নবীজি (সা.) বললেন-
(১).
আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা
(২).
জাদু করা
(৩).
অকারণে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করেছেন
(৪).
সুদ খাওয়া
(৫).
এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা
(৬).
জিহাদের ময়দান থেকে পিঠ ফিরিয়ে নেওয়া
(৭). সতী-সাধ্বী, বিশ্বাসী ও সরলমনা নারীদের প্রতি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৫৭, ২৭৬৬, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩০১৯, ১৯০১, সুনান বায়হাক্বী ১৭১২৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৯৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবু
মূসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“তিন
ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। অভ্যস্ত মদ্যপায়ী, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ও যাদুতে বিশ্বাসী”।
(আহমদ, হাদীস নং ১৯৫৮৭; হাকিম, হাদীস নং ৭২৩৪; ইবন হিব্বান,
হাদীস নং ৫৩৪৬)।
জাদু থেকে রক্ষা পেতে করণীয়
জাদু
থেকে রক্ষা পেতে করণীয় কিছু আমল এখানে বর্ণনা করা হ’ল। যে সকল ব্যক্তি জাদুতে আক্রান্ত
নয় তাদের জন্য কিছু আমল বর্ণনা করা হলো এবং যারা জাদুতে আক্রান্ত তাদের প্রথমে শরীয়ত
সম্মতভাবে তা নষ্ট করে ফেলা। এরপরে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করতঃ নিম্নোক্ত আমল জারি রাখা।
(ক) সকাল-সন্ধ্যায় (বাদ ফজর
ও বাদ মাগরিব) যে সব আমলঃ
(১) সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে সূরা ইখলাছ, ফালাক্ব
ও নাস পাঠ করা। (সুনান আবুদাঊদ হা/৫০৮২)।
(২) সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার এই দো‘আটি পাঠ করা:
‘বিসমিল্লা-হিল্লাযী
লা-ইয়াযুর্রু মা‘আসমিহী শাইয়ুন ফিল্ আর্যি ওয়া লা ফিসসামা-ই ওয়া হুয়াস সামী‘উল
‘আলীম’। (হাকেম হা/১৯৩৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৬৬০)।
(৩) সকাল-সন্ধ্যায় নিম্নোক্ত দো‘আটি পাঠ করা:
‘আ‘ঊযু
বিকালিমা-তিল্লা-হিত তাম্মা-তি মিন শার্রি মা খালাক্ব’। (সহিহ
মুসলিম হা/২৭০৯, তিরমিযী হা/৩৬০৪)।
(৪) বিতাড়িত জিন শয়তান হতে রক্ষা কবয:
উচ্চারণ
: লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুল্কু ওয়া লাহুল হামদু,
বিইয়াদিহিল খায়রু, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমীতু, ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থ
: ‘নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত, যিনি একক ও শরীকবিহীন। তাঁরই জন্য সকল রাজত্ব ও তাঁরই
জন্য যাবতীয় প্রশংসা। তাঁর হাতেই সমস্ত কল্যাণ। তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান।
তিনি সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাশীল’। (আহমাদ, মিশকাত হা/৯৭৫)।
ফযীলত:
আব্দুর রহমান ইবনু গানাম (রাঃ) বলেন, নবী (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিব ও ফজরের
ছালাতের পর ১০ বার বলবে, লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুল্কু
ওয়া লাহুল হামদু, বিইয়াদিহিল খায়রু, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমীতু, ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি
শাইয়িন ক্বাদীর। এমন ব্যক্তির জন্য প্রত্যেক শব্দের পরিবর্তে ১০টি নেকী লেখা হবে,
তার ১০টি গুনাহ মুছে দেয়া হবে, তার ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়াও এ দো‘আটি
তার জন্য প্রত্যেক মন্দ কাজ এবং বিতাড়িত শয়তান হ’তেও রক্ষাকবয হবে। এর বদৌলতে কোন
গুনাহ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। (অর্থাৎ শিরক ব্যতীত) কোন কিছুই তাকে ধ্বংস করতে
পারবে না। ঐ ব্যক্তি হবে সমস্ত মানুষ অপেক্ষা উত্তম আমলকারী। তবে যে এর চেয়ে উত্তম
কথা বলবে সে অবশ্যই এর চেয়েও উত্তম হবে’। (আহমাদ হা/১৮০১৯;
মিশকাত হা/৯৭৫; মুছনাফ ইবনে আবী শায়বা হা/১৫৩৬৭)।
(৫) সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার নিম্নোক্ত দো‘আটি পাঠ
করা- ‘আল্লা-হুম্মা ‘আ-ফিনী ফী বাদানী, আল্লা-হুম্মা ‘আ-ফিনী ফী সাম্ঈ আল্লা-হুম্মা
‘আ-ফিনী ফী বাসারী। (সুনান আবুদাঊদ হা/৫০৯০; আহমাদ হা/২০৪৩০)।
(খ) ঘুমানোর পূর্বে যে সব আমলঃ
(১)
ঘুমানোর পূর্বে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা। (সহিহ বুখারী হা/২৩১১)।
(২)
ঘুমানোর পূর্বে সূরা ইখলাছ, ফালাক্ব ও নাস পড়ে হাতে ফুঁক দিয়ে সর্বাঙ্গে হাত বুলানো।
এভাবে ৩ বার করা’। (সহিহ বুখারী হা/৫০১৭; ছহীহ ইবনু হিববান
হা/৫৫৪৪)।
(গ) দিনে রাতে যে সব আমলঃ
(১)
সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা। (সহিহ বুখারী
হা/৫০০৮)।
(২)
প্রতি ছালাতের পর, ঘুমানোর সময় এবং সকাল-সন্ধ্যায় ‘আয়াতুল কুরসী’ পাঠ করা। (হাকেম ১/৫৬২; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হ/৬৫৮)।
(৩)
সম্ভব হ’লে ৭টি ‘আজওয়া’ খেজুর সকাল বেলা খালি পেটে খাওয়া। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,
‘যে ব্যক্তি সাতটি আজওয়া খেজুর দিয়ে সকাল করবে, কোন বিষ বা জাদু সে দিনে তার কোন
ক্ষতি করতে পারবে না’। (সহিহ বুখারী হা/৫৪৪৫, ৫৭৬৯; মুসলিম
হা/২০৪৭; মিশকাত হা/৪১৯০)।
ইমাম
খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আজওয়াহ্ খেজুর খেলে বিষ বা যাদু ক্ষতি করতে পারে
না, এতে শুধুমাত্র নবী (সা.) দু‘আর বারাকাতের কারণে নচেৎ খেজুরের মধ্যে আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য
নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৩৮৭২)। এ খেজুর খেলে সে জাদু টোনা থেকে সে দিন মুক্ত
থাকবে। তবে কেহ জাদুগ্রস্ত হলে তা প্রতিহত করতে ঝাঁড়-ফুঁক প্রয়োজন হবে।
‘আল্লামা
নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, মদীনার ‘আজওয়াহ্ খেজুর সকাল বেলায় তার ৭টি ভক্ষণের মর্যাদা
বর্ণিত হয়েছে। মদীনার ‘আজওয়াহ্ খেজুরের বৈশিষ্ট্য এবং সাত সংখ্যার বৈশিষ্ট্য এমন
বিষয় যা শারী‘আত প্রণেতা জানেন আমরা তা জানি না। অতএব তার প্রতি ঈমান আনা এবং তার
মর্যাদার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। এটা এমন এক বিষয় যা সালাতের রাক্‘আত সংখ্যা
ও যাকাতের নিসাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার মতো। (মিরক্বাতুল
মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হা/২০৪৭)।
(৭) অশুভ লক্ষণ বিশ্বাস করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তারা
বলল, আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি (১), যদি তোমরা বিরত না হও তোমাদেরকে
অবশ্যই পাথরের আঘাতে হত্যা করব এবং অবশ্যই স্পর্শ করবে তোমাদের উপর আমাদের পক্ষ থেকে
যন্ত্রণাদায়ক শান্তি)। (সূরা ইয়াসীন ৩৬ : ১৮-১৯)।
(১)
মূলে تطير বলা
হয়েছে, এর অর্থ অশুভ, অমঙ্গল ও অলক্ষুণে মনে করা। উদ্দেশ্য এই যে, শহরবাসীরা প্রেরিত
লোকদের কথা অমান্য করল এবং বলতে লাগল, তোমরা অলক্ষুণে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাদের
অবাধ্যতা ও রাসূলদের কথা অমান্য করার কারণে জনপদে দূর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যায়। ফলে তারা
তাদেরকে অলক্ষুণে বলল। কাফেরদের সাধারণ অভ্যাস এই যে, কোন বিপদাপদ দেখলে তার কারণ হেদায়াতকারী
ব্যক্তিবর্গকে সাব্যস্ত করে। অথবা তাদের এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল একথা বুঝানো যে,
তোমরা এসে আমাদের উপাস্য দেবতাদের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে তার ফলে
দেবতারা আমাদের প্রতি রুষ্ট হয়ে উঠেছে এবং এখন আমাদের ওপর যেসব বিপদ আসছে তা আসছে
তোমাদেরই বদৌলতে। ঠিক এ একই কথাই আরবের কাফের ও মোনাফিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে বলতোঃ “যদি তারা কোন কষ্টের সম্মুখীন হতো, তাহলে বলতো, এটা
হয়েছে তোমার কারণে।” (সূরা আন-নিসা: ৭৮)।
তাই
কুরআন মজীদে বিভিন্ন স্থানে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ ধরনের জাহেলী কথাবার্তাই
প্রাচীন যুগের লোকেরাও তাদের নবীদের সম্পর্কে বলতো। সামূদ জাতি তাদের নবীকে বলতো,
“আমরা তোমাকে ও তোমার সাথীদেরকে অমংগলজনক পেয়েছি।” (সূরা
আন-নমল: ৪৭)।
আর
ফেরাউনের জাতিও এ একই মনোভাবের অধিকারী ছিলঃ “যখন তারা ভালো অবস্থায় থাকে তখন বলে,
এটা আমাদের সৌভাগ্যের ফল এবং তাদের ওপর কোন বিপদ এলে তাকে মূসা ও তার সাথীদের অলক্ষুণের
ফল গণ্য করতো।” (সূরা আল-আ'রাফ: ১৩১)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা শির্কী কাজ। এ বাক্যটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করেছেন। আর আমাদের
মধ্যে কেউ নেই যার মনে অশুভ লক্ষণের ব্যাপারে উদ্রেক না হয়; কিন্তু আল্লাহর ওপরে পূর্ণ
তাওয়াক্কুল বা ভরসা করলে তিনি তা দূরীভূত করে দেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৫৮৪, সুনান আবূ দাঊদ ৩৯১০, সুনান ইবনু মাজাহ ৩৫৩৮, সুনান আততিরমিযী
১৬৭৯, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৪৩০, গয়াতুল মারাম ৩০৩, আল জামি‘উস্ সগীর ৭৪০৭, সহীহুল জামি‘
৩৯৬০, আবূ ইয়া‘লা ৫২১৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১২২, শু‘আবুল ঈমান ১১৬৭, আল মুসতাদরাক ৪৩,
‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১৬৯৫৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
বর্তমানে
মাস, দিন, সংখ্যা, নাম ইত্যাদিকে দুর্ভাগ্য বা অশুভ প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
যেমন অনেক দেশে হিজরী সনের ছফর মাসে বিবাহ করা থেকে বিরত থাকা হয়। প্রতি মাসের শেষ
বুধবারকে কুলক্ষণে মনে করা হয়। বিশ্বজুড়ে আজকাল ১৩ সংখ্যাকে ‘অলক্ষুণে তের’ বা
Unluckey thirteen বলা হয়। অনেক বিক্রেতা প্রথম ক্রেতার ক্রয় না করাকে অশুভ গণ্য করে।
অনেকে কানা, খোঁড়া, পাগল ইত্যাকার প্রতিবন্ধীদের কাজের শুরুতে দেখলে মাথায় হাত দিয়ে
বসে। অথচ এ জাতীয় আক্বীদা পোষণ করা হারাম ও শিরক। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘কুলক্ষণে
বিশ্বাস করা শিরক’।
(খ) জ্ঞান ও জিহাদ সংক্রান্ত কাবীরা গুনাহঃ
(৮) আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশে জ্ঞান অর্জন করাঃ
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন,
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা
যায়, কোনো লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে কিয়ামতের দিন
জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৬৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫২, আহমাদ ৮২৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জাবের
(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর
রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তোমরা উলামাগণের সাথে তর্ক-বাহাস করার
উদ্দেশ্যে ইল্ম শিক্ষা করো না, ইল্ম দ্বারা মূর্খ লোকেদের সাথে বাগ্বিতণ্ডা করো না
এবং তদ্বারা আসন, পদ বা নেতৃত্ব) লাভের আশা করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তা করে তার জন্য
রয়েছে জাহান্নাম, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।” (সুনান ইবনে
মাজাহ ২৫৪, ইবনে হিব্বান ৭৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭১, সহীহ তারগীব ১০১)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
কা’ব
বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর
রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, “যে ব্যক্তি উলামাদের সাথে তর্ক
করার জন্য, অথবা মূর্খ লোকেদের সাথে বচসা করার জন্য এবং জন সাধারণের সমর্থন (বা অর্থ)
কুড়াবার জন্য ইল্ম অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ জাহান্নাম প্রবেশ করাবেন।” (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৬৫৪, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
২২৫, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, হাকেম ২৯৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭২, সহীহ তারগীব ১০০,
সহীহুল জামি ১০৬, তা’লীকুর রাগীব ১/৬৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
বিনা
ইলমে কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার হুকুম করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘এমন
কোনো জিনিসের পেছনে লেগে যেয়ো না যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চিয়ই চোখ, কান
ও দিল সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’’। (সূরা বানী ইসরাঈল:
৩৬)।
আল্লাহ
তা‘আলা আরো বলেন,
‘‘কতক
লোক এমন আছে যারা জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করে এবং প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের
অনুসরণ করতে থাকে। অথচ তার ব্যাপারে তো এটা নির্ধারিত রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তাকে বন্ধু
বানাবে তাকে সে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে এবং জাহান্নামের আযাবের পথ দেখিয়ে দেবে’’। (সূরা আল হজ্জ: ৩-৪)।
আল্লাহ
তা‘আলা আরো বলেন,
‘‘আরো
কিছু লোক এমন আছে যারা কোনো জ্ঞান পথ নির্দেশনা ও দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহর ব্যাপারে
বিতর্ক করে। সে বিতর্ক করে ঘাড় বাঁকিয়ে যাতে লোকদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করা যায়।
এমন ব্যক্তির জন্য রয়েছে দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে আগুনের আযাবের
জ্বালা আস্বাদন করাবো’’। (সূরা আল হজ্জ: ৮-৯)।
আল্লাহ
তা‘আলা সূরা কাসাসের ৫০ নং আয়াতে আরো বলেন,
‘‘আল্লাহর
হেদায়াতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট
আর কে হতে পারে? নিশ্চয়ই আল্লাহ্ জালেম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না’’। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘তারা
শুধু ধারণা এবং তাদের এ যা চায় তারই অনুসরণ করে। অথচ তাদের নিকট তাদের প্রভুর পক্ষ
হতে হেদায়াত আগমন করেছে। (সূরা আন নাযম: ২৩)।
এ
অর্থে এমন আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
আবূ
উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ হিদায়াত প্রাপ্তির এবং হিদায়াতের উপর ক্বায়িম থাকার পর কোন জাতির মধ্যে বিভেদ
সৃষ্টি হয় না, কিন্তু যখন তারা ধর্মীয় বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলেন (অর্থঃ) ’’তারা বাক-বিতণ্ডা করার উদ্দেশ্য ছাড়া আপনার
নিকট তা উত্থাপন করে না। প্রকৃতপক্ষে তারা হচ্ছে বাক-বিতণ্ডাকারী লোক’’- (সূরাহ্ আয্
যুখরুফ ৪৩: ৫৮)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮০, আহমাদ
২১৬৬০, সুনান আত তিরমিযী ৩২৫৩, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪৩, সহীহুত্ তারগীব ১৪১)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
আয়িশাহ
(রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সেই
লোক সবচেয়ে বেশী ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪৫৭, ৪০২৩, ৭১৮৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৯৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
যে
ব্যক্তি নিজেকে রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের কাছে সোপর্দ না করবে,
তার তাওহীদ নষ্ট হবে। কেননা যে ব্যক্তি হাদীছ দিয়ে কথা না বলবে, সে কেবল নিজস্ব মত
ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করেই কথা বলবে। সে সঙ্গে সে এমন লোকের তাকলীদ (দলিলবিহীন অনুসরণ)ও
করবে, যে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে সুস্পষ্ট হেদায়াতের উপর নেই। এতে করে রাসূলের সুন্নাত
থেকে সরে যাওয়া অনুপাতে তার তাওহীদ কমে যাবে। কেননা সে অনুসরণের ক্ষেত্রে আল্লাহ ব্যতীত
অন্য কাউকে ইলাহ হিসাবে গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“তুমি
কি তাকে দেখো নি, যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে”? (সূরা ফুরকান: ৪৩)।
(৯) জ্ঞান গোপন করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা গোপন করে আমরা যেসব সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়াত নাযিল করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে
তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পর(২), তাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেন এবং লা'নতকারীগণও তাদেরকে
লা'নত করেন। তবে যারা তাওবা করেছে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করেছে এবং সত্যকে সুস্পষ্টভাবে
ব্যক্ত করেছে। অতএব, এদের তাওবা আমি কবুল করব। আর আমি অধিক তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”।
(সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৫৯-১৬০)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“নিশ্চয়
যারা গোপন করে আল্লাহ কিতাব হতে যা নাযিল করেছেন তা এবং এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ
করে, তারা তাদের নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া(১) আর কিছুই খায় না। আর কেয়ামতের দিন আল্লাহ্
তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক
শাস্তি। তারাই হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা এবং ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে;
সুতরাং আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”! (সূরা আল
বাক্বারাহ্ ২ : ১৭৪-১৭৫)।
আবূ
হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যাকে ধর্মীয় জ্ঞান বিষয়ক
কোন কথা জিজ্ঞাসা করা হয়, আর সে (যদি উত্তর না দিয়ে) তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে
(জাহান্নামের) আগুনের লাগাম পরানো হবে।” (সুনান আবূ দাঊদ
৩৬৬০, সুনান আততিরমিযী ২৬৪৯, সুনান ইবনে মাজাহ ২৬৪, ইবনে হিব্বান, বাইহাক্বীর শুআবুল
ঈমান ১৭৪৩, হাকেম অনুরূপ।)
ইবনে
মাজার এক বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি তার
সংরক্ষিত (ও জানা) ইল্ম গোপন করবে, সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন মুখে আগুনের লাগাম দেওয়া
অবস্থায় হাযির করা হবে।” (সুনান ইবনে মাজাহ ২৬১, সহীহ
তারগীব ১১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(১০) আল্লাহ ও রাসূল (সা.) এর উপর মিথ্যা আরোপ করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“এবং
উটের দুটি ও গরুর দুটি। বলুন, নর দুটিই কি তিনি নিষিদ্ধ করেছেন কিংবা মাদী দুটিই অথবা
মাদী দুটির গর্ভে যা আছে তা? নাকি আল্লাহ যখন তোমাদেরকে এসব নির্দেশ দান করেন তখন তোমরা
উপস্থিত ছিলে? কাজেই যে ব্যক্তি না জেনে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহ সম্বন্ধে
মিথ্যা রটনা করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ্ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত
করেন না”। (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৪৪)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“
আর তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা আরোপ করে বলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা রটনা করার জন্য বলো না,
এটা হালাল এবং এটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফলকাম হবে না।
তাদের সুখ-সম্ভোগ সামান্যই এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আন্ নাহ্ল ১৬: ১১৬-১১৭)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত যে,
নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’আমার নামে তোমরা নাম রেখ; কিন্তু আমার উপনামে
(কুনিয়াতে) তোমরা নাম রেখ না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান
আমার আকৃতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে
যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ১১০, ৩৫৩৯, ৬১৮৮, ৬১৯৭, ৬৯৯৩; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি
ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে, সে যেন জাহান্নামকে তার আবাস বানালো। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩০, সুনান আততিরমিযী ২২৫৭, ২৬৫৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আলী
(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা আমার উপর মিথ্যা বলো না। যেহেতু
যে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন দোযখে প্রবেশ করল।” (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১০৭)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
সালামাহ
(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমি যা বলিনি তা বানিয়ে বলে,
সে যেন নিজের ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নেয়। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১১০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ হাদিস।
আব্দুল্লাহ
ইবনুস যুবায়র (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি যুবায়র (রাঃ)-কে বললাম,
আপনি অন্যান্য সাহাবীদের মতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস
বর্ণনা করেন না কেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তাঁর নৈকট্য লাভ করেছি, তাঁর সাহচর্যে
থেকেছি। কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা
আরোপ করলো, সে (জাহান্নামের) আগুনে তার বাসস্থান নির্দিষ্ট করে নিলো। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৬৫১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(১১) জ্ঞান অনুযায়ী ‘আমল না করাঃ
জ্ঞানার্জন
নিঃসন্দেহে এক মহৎ ইবাদত, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে
আল্লাহ জ্ঞানীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, ‘তুমি বল, যারা জানে (বিজ্ঞ) এবং যারা জানে
না (অজ্ঞ), তারা কি সমান?’ (সুরা যুমার ৩৯/৯)।
অন্যত্র
তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ
তাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন’। (সুরা মুজাদালা ৫৮/১১)।
অত্র
আয়াত দু’টির মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের মর্যাদা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ইলম হাছিলের এই
মহৎ ইবাদতটিই এক ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হয়, যখন তা কর্মে রূপান্তরিত না হয়। যে জ্ঞান
ব্যক্তিকে আল্লাহর অনুগত করার কথা, আমলের অভাবে সেই জ্ঞানই তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির
বদলে ক্রোধের পাত্র বানিয়ে দেয়। কথা ও কাজের এই অমিলকে আল্লাহ সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করেন।
যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নিকটে বড় ক্রোধের বিষয় হ’ল, তোমরা যা বল তা কর না?’ (সুরা ছফ ১১৪/৩)।
অন্যত্র
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি লোকদের সৎকাজের আদেশ দাও এবং নিজেদের বেলায় তা ভুলে যাও? অথচ
তোমরা আল্লাহর কিতাব (তাওরাত) পাঠ করে থাকো। তোমরা কি বুঝো না?’ (সুরা বাক্বারাহ ২/৪৪)।
অত্র
আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী, ইমাম ইবনে কাছীর, ইমাম বাগাভী সহ প্রমুখ মুফাসসিরীনে
কেরাম নিম্নের হাদীছটি উল্লেখ করেছেন।
আনাস
(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘মে‘রাজের রাতে আমি এমন একদল লোকের পাশ
দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাদের ঠোঁটগুলো আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘হে জিবরীল! এরা কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এরা আপনার উম্মতের সেই সব বক্তা, যারা এমন
কথা বলত যা তারা নিজেরা করত না। তারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করত, কিন্তু সে অনুযায়ী আমল
করত না’। (বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৪৬১৩; ছহীহুত তারগীব
হা/১২৫)।
আমলবিহীন
ইলমের সকল পরিণতির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও চূড়ান্ত পরিণতি অপেক্ষা করছে ক্বিয়ামতের সেই
মহাবিচারের ময়দানে। দুনিয়ার অপমান, অন্তরের অশান্তি, জ্ঞানের স্বাদ থেকে বঞ্চনা- এসব
সেই আখেরাতের ভয়ংকর শাস্তির তুলনায় অতি তুচ্ছ। সেদিন অর্জিত জ্ঞান ব্যক্তির মুক্তির
জন্য সুপারিশকারী না হয়ে, তার বিপক্ষেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসাবে দাঁড়াবে এবং
তাকে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করার কারণ হবে। ক্বিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের
বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রায় ঘোষণা করা হবে। তাদেরকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা
হবে। তারা হ’লেন : শহীদ, ক্বারী বা আলেম এবং দানশীল।
আবু
হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘(ক্বিয়ামতের দিন যার বিরুদ্ধে
বিচারের প্রথম রায় ঘোষিত হবে তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল) সেই ব্যক্তি সে ইলম অর্জন করেছিল
ও অন্যদের শিক্ষা দিয়েছিল এবং কুরআন পড়েছিল। তাকে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে
যত নে‘মত দিয়েছিলেন তা অবহিত করবেন। সে তা স্বীকার করবে। তখন তিনি বলবেন, এসব নে‘মত
পেয়ে তুমি কী করেছিলে? সে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছিলাম, অন্যদের তা শিখিয়েছিলাম এবং
তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলাম। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা
বলছ। তুমি বরং (জনগণের মাঝে) আলেম বা বিদ্বান বলে আখ্যায়িত হবে সেজন্য বিদ্যা শিখেছিলে
এবং ক্বারী বলে পরিচিত হবে সেজন্য কুরআন তেলাওয়াত করেছিলে। তোমাকে তো সেসব বিশেষণে
ভূষিত করা হয়েছে। তারপর তার সম্পর্কে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে অধোমুখী করে হেঁচড়াতে
হেঁচড়াতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২০৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৮১৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯০৫, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৪৭৭০, ইসলামিক সেন্টার ৪৭৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ
হাদীছ এতটাই ভারী ও গুরুত্ববহ যে আবু হুরায়রা (রাঃ) এই হাদীছটি বর্ণনার সময় অজ্ঞান
হয়ে যেতেন। মিসরের প্রখ্যাত তাবেঈ শুফাই আল-আছবাহী (মৃ. ১০৫ হি.)-এর নিকটে এই হাদীছটি
বর্ণনা করতে গিয়ে আবূ হুরায়রা (রাঃ) ভয়ে তিন বার বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৩৮২, হাকেম ১৫২৭; ছহীহ ইবনু
হিববান ৪০৮, সহীহ তা’লীকুর রাগীব ১/২৯-৩০, তা’লীক আলা ইবনে খুযাইমাহ ২৪৮২)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
ওয়াইল (রহ.) হতে বর্ণিতঃ
তিনি
বলেন, উসামাহ (রাঃ)-কে বলা হল, কত ভাল হত! যদি আপনি ঐ ব্যক্তির (উসমান (রাঃ)-এর নিকট
যেতেন এবং তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন। উত্তরে তিনি বললেন, আপনারা মনে করছেন যে আমি তাঁর
সঙ্গে আপনাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলব। অথচ আমি তাঁর সঙ্গে (দাঙ্গা দমনের ব্যাপারে) গোপনে
আলোচনা করছি, যেন আমি একটি দ্বার খুলে না বসি। আমি দ্বার উন্মুক্তকারীর প্রথম ব্যক্তি
হতে চাই না। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে কিছু শুনেছি,
যার পরে আমি কোন ব্যক্তিকে যিনি আমাদের আমীর নির্বাচিত হয়েছেন এ কারণে তিনি আমাদের
সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি এ কথা বলতে পারি না। লোকেরা তাঁকে বলল, আপনি তাঁকে কী বলতে শুনেছেন?
উসামাহ (রাঃ) বললেন, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর
তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন আগুনে পুড়ে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। এ সময়
সে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা তার চাকা নিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামবাসীরা
তার নিকট একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, হে অমুক ব্যক্তি! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদেরকে
সৎ কাজের আদেশ করতে আর অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতে? সে বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজে
আদেশ করতাম বটে, কিন্তু আমি তা করতাম না আর আমি তোমাদেরকে অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতাম,
অথচ আমিই তা করতাম। এ হাদীসটি গুনদার (রহ.) শুবা (রহ.) সূত্রে আ‘মাশ (রহ.) হতে বর্ণনা
করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩২৬৭, ৭০৯৮,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৩৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৮৯, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫১৩৯,সহীহুল জামি ৮০২২, সহীহ আত্ তারগীব ১২৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৯২, আহমাদ ২১৭৮৪,
শু‘আবুল ঈমান ৭৫৬৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭০৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০২৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৩৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
একবার
চোখ বন্ধ করে সেই ভয়াবহ দৃশ্যটি কল্পনা করুন। যে আলেম, যে বক্তা, যে দ্বীনের দাঈ দুনিয়ার
বুকে মানুষের কাছে সম্মানিত ছিল, ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে
পড়েছে আর সে পেষণের চাকায় বাঁধা গাধার মতো অন্তহীন যন্ত্রণায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার এই
অপমানজনক পরিণতি দেখে জাহান্নামীরাও অবাক হয়ে প্রশ্ন করছে, ‘আপনি না আমাদের সৎ পথের
দিশা দিতেন?’ এই দৃশ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যে জ্ঞান ও উপদেশ নিজের জীবনকে
পরিবর্তন করতে পারে না, তা আল্লাহর কাছে কতখানি মূল্যহীন ও ঘৃণিত। আমাদের প্রতিটি উপদেশ,
প্রতিটি স্ট্যাটাস, প্রতিটি লেকচার প্রথমে আমাদের নিজেদের আত্মার জন্য হওয়া উচিত। নতুবা
যে জ্ঞান আমাদের মুক্তির আলো হওয়ার কথা ছিল, সেই জ্ঞানই ক্বিয়ামতের দিন আমাদের কপটতার
সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে এবং জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত হবে। তাই আজ নিজেকে প্রশ্ন করার
সময় এসেছে- আমার অর্জিত জ্ঞান কি আমার মুক্তির অছীলা, নাকি আমারই বিরুদ্ধে আল্লাহর
আদালতে সবচেয়ে বড় অভিযোগকারী?
অতএব
যারা মুসলিম শাসক বা নেতা হিসেবে রাষ্ট্র শাসন করছে এবং তাদের অনুসারী আলেম যারা কুরআন
হাদিসে অভিজ্ঞ কিন্তু রাষ্ট্র শাসন সংক্রান্ত কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে চলছে
না তাদেরকে কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালা কঠিন শাস্তি দিবেন। এসব লোক ইহকাল ও পরকালে অপমান
অপদস্ত হবে।
(১২) আল্লাহর পথে দাওয়াত দানে বিরত থাকা বা দাওয়াতী কাজ ছেড়ে দেয়াঃ
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“তুমি
মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের
সাথে বিতর্ক করো সুন্দর পন্থায়”। (সুরা নহল ১৬/১২৫)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ
দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম। তোমরা তাদের মত হয়ে না, যারা তাদের নিকট
স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে।
আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি”। (সূরা আ-লি ‘ইমরা-ন
৩: ১০৪-১০৫)।
আল্লাহর
পথে দাওয়াত দানে বিরত থাকা বা দাওয়াতী কাজ ছেড়ে দেয়ার জন্য পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে। এমর্মে হাদীছে এসেছে,
নু’মান
ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি প্রদানের বিষয়ে অলসতা করাকে ঐ সম্প্রদায়ের
সাথে তুলনা করা যায়, যারা নৌকায় স্থান পাওয়ার জন্য লটারি করেছে এবং লটারি অনুসারে তাদের
কেউ নৌকার নিচে এবং কেউ উপরে বসেছে। নৌকার নিচের লোকেরা উপরের লোকেদের পাশ দিয়ে পানির
জন্য গমনাগমন করত, ফলে উপরের লোকেদের কষ্ট হত। একদিন নিচের লোকেদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি
কুঠার হাতে নিয়ে নৌকার তলায় কাঠ কোপাতে আরম্ভ করল। তখন উপরের লোকেরা তার কাছে এসে জিজ্ঞেস
করল, সর্বনাশ! তুমি কি করছ? লোকটি বলল, তোমরা আমাদের কারণে কষ্ট পাচ্ছ। আর আমাদেরও
পানি একান্ত প্রয়োজন। এমতাবস্থায় যদি তারা তার হস্তদ্বয় ধরে ফেলে, তাহলে তাকেও রক্ষা
করবে, নিজেরাও রক্ষা পাবে। আর যদি তাকে তার কাজের উপরই ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকেও ধ্বংস
করবে, নিজেদেরকেও ধ্বংস করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫১৩৮, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৬৮৬, ২৪৯৩, সুনান আততিরমিযী ২১৭৩, সিলসিলাতুস্
সহীহাহ্ ৬৯, সহীহ আত্ তারগীব ২৩০৯, আহমাদ ১৮৩৭০, আস সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৯৩৪,
আধুনিক প্রকাশনী ২৪৯১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৫০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি সমবেত লোকেদের উদ্দেশে বলেন, হে জনগণ! তোমরা নিশ্চয়
এ আয়াতটি পাঠ করেছ, (অর্থাৎ-) ’’হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ওপর এ কথা আবশ্যিক করে
নাও, যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত
তোমরা হিদায়াতের উপর স্থির থাকবে’’। এ সম্পর্কে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন কোন খারাপ কাজ হতে দেখে, সেটাকে পরিবর্তন করে
না, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর তাঁর ’আযাব নাযিল করবেন। (ইবনু মাজাহ ও তিরমিযী;
আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি সহীহ বলে বর্ণনা করেছেন।)
আর
আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক বর্ণনায় আছে যে, মানুষ যখন কোন অত্যাচারীকে অত্যাচার
করতে দেখেও তার হাত ধরে না ফেলে, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন।
ইমাম আবূ দাঊদ-এর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, যে জাতির মধ্যে পাপাচার হয়, আর সে জাতির পরিবর্তন
ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেটার পরিবর্তন না করে, তাহলে অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তাকে
শাস্তি প্রদান করবেন। তাঁর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, যে জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয়, আর পাপে
লিপ্তদের তুলনায় সাধারণ লোক সংখ্যায় বেশি হয়। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪২, সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৫, সুনান আততিরমিযী ২১৬৮, সুনান আবূ দাঊদ
৪৩৩৮, সহীহুল জামি ১৯৭৪, আহমাদ ৩০, আবূ ইয়া‘লা ১৩১, অন্য রিওয়ায়তে আবূ দাঊদ ৪৩৩৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জাবির
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ
মহীয়ান-গরীয়ান জিবরীল (আ.)-কে আদেশ করেন যে, অমুক শহর বা জনপদটিকে সেটার বাসিন্দাসহ
উল্টিয়ে দাও। তখন জিবরীল (আ.)বললেনঃ হে প্রভু! ঐ জনপদে তোমার অমুক বান্দা রয়েছে, যে
এক মুহূর্ত তোমার নাফরমানি করেনি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ
তা’আলা বলেন, তার ও তাদের সকলের ওপর শহরটিকে উল্টিয়ে দাও। কারণ ঐ ব্যক্তির মুখমণ্ডলে
পাপীদের পাপাচার দেখে আমার সন্তুষ্টির জন্য এক মুহূর্তের জন্যও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ
সে অপরকে দাওয়াত প্রদান করে না, সে শুধু নিজেকে রক্ষা করার জন্য ইবাদত করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৫২, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৯৫, বায়হাক্বী)।
হুযায়ফা
(রাঃ) বলেন, নবী কারীম (ছাঃ) বলেছেন, সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার আত্মা রয়েছে। অবশ্যই
তোমরা ভাল কাজের আদেশ করবে আর মন্দ কাজের নিষেধ করবে। নইলে আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তোমাদের
উপর শাস্তি পাঠাবেন, তখন তোমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা করবে কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা
কবুল হবে না। (সুনান আত তিরমীজী ২১৬৯, সহীহাহ ২৮৬৮, তারগীব
৩৩০৭, বুখারী, মুসলিম)। হাদিসের মান সহিহ।
হুযায়ফাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ পবিত্র
সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, নিম্নোক্ত দু’টো বিষয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই হবে। হয়
অবশ্যই তুমি সৎকাজের আদেশ দান করবে এবং মন্দকাজ হতে নিষেধ করবে; নতুবা অনতিবিলম্বে
আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর ’আযাব নাযিল করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে;
কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা হবে না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪০, সুনান আততিরমিযী ২১৬৯, সহীহুল জামি‘ ৭০৭০, সহীহ আত্ তারগীব
২৩১৩, আহমাদ ২৩৩০১, আবূ ইয়া‘লা ৫০৩৫, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৫৮ হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/২৭৯, আল
মুজামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩৯৭, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ১৩৭৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল
বায়হাক্বী ২০৬৯৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
জারীর
ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতিতে কোন লোক পাপে লিপ্ত থাকে, আর ঐ ব্যক্তিকে পাপ
থেকে ফেরাতে জাতির লোকেদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও না ফেরায়, তাহলে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই
আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করবেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪৩, সুনান আবূ দাঊদ ৪৩৩৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৯, সহীহ আত্ তারগীব
২৩১৬, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৬৮৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
উপরোক্ত
হাদীছ সমূহ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যারা দাওয়াত প্রদানে অলসতা করে বা দাওয়াত প্রদানে
বিরত থাকে কিন্তু নিজেরা সর্বদা ইবাদত করে,
তারাও পাপীদের সাথে ধ্বংস প্রাপ্ত হবে। কেননা দাওয়াত দান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যা ত্যাগ করা গর্হিত অপরাধ। কাজেই দাওয়াতী কাজ না করে শুধুমাত্র ইবাদতে মশগূল থাকলে
সে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না।
(১৩) সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে নিষেধ করা হতে বিরত থাকা বা তা ছেড়ে
দেয়াঃ
সৎ
কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধের মহান দায়িত্ব পরিহার করা হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ
দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম। তোমরা তাদের মত হয়ে না, যারা তাদের নিকট
স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে।
আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি”। (সূরা আ-লি ‘ইমরা-ন
৩: ১০৪-১০৫)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘বানী
ইস্রাঈলের (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের) কাফিরদের উপর লা’নত দাঊদ ও ’ঈসা বিন্ মারইয়াম (‘আলাইহিমুস-সালাম)
এর মুখে এবং তা এ কারণে যে, তারা ছিলো ওহীর আদেশ বিরোধী এবং সীমা লঙ্ঘনকারী। তারা একে
অপরকে কৃত গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করতো না। মূলতঃ তাদের উক্ত কাজ ছিলো অত্যন্ত নিকৃষ্ট’’।
(সুরা আল মা’য়িদাহ্ : ৭৮-৭৯)।
হুযায়ফাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ পবিত্র
সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, নিম্নোক্ত দু’টো বিষয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই হবে। হয়
অবশ্যই তুমি সৎকাজের আদেশ দান করবে এবং মন্দকাজ হতে নিষেধ করবে; নতুবা অনতিবিলম্বে
আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর ’আযাব নাযিল করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে;
কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা হবে না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪০, সুনান আততিরমিযী ২১৬৯, সহীহুল জামি‘ ৭০৭০, সহীহ আত্ তারগীব
২৩১৩, আহমাদ ২৩৩০১, আবূ ইয়া‘লা ৫০৩৫, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৫৮ হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/২৭৯, আল
মুজামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩৯৭, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ১৩৭৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল
বায়হাক্বী ২০৬৯৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
জারীর
ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতিতে কোন লোক পাপে লিপ্ত থাকে, আর ঐ ব্যক্তিকে পাপ
থেকে ফেরাতে জাতির লোকেদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও না ফেরায়, তাহলে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই
আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করবেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪৩, সুনান আবূ দাঊদ ৪৩৩৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৯, সহীহ আত্ তারগীব
২৩১৬, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৬৮৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(১৪)
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা হতে বিরত থাকা বা তা ছেড়ে দেয়াঃ
আল্লাহর
রাস্তায় জিহাদ করা ফরযে কিফায়া। যখন মুসলিমদের মধ্যে থেকে কেউ এই দায়িত্ব পালন করবে
তখন অবশিষ্ট ব্যক্তিরা পাপমুক্ত হবে। (ইবনু কুদামা, আল-মুগনী,
৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ১৩)।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘আর
মুমিনদের এটাও সমীচীন নয় যে, (জিহাদের জন্য) সবাই একত্রে বের হয়ে পড়ে; সুতরাং এমন কেন
করা হয় না যে, তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল বহির্গত হয়, যাতে তারা দ্বীনের
জ্ঞান অর্জন করতে পারে, আর যাতে তারা নিজ কওমকে (নাফারমানী হতে) ভয় প্রদর্শন করে যখন
তারা ওদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা সতর্ক হয়’। (সূরা
আত-তাওবাহ: ১২২)।
তবে
তিন অবস্থায় জিহাদ করা ফরযে আইন হবে। যথাঃ
প্রথমতঃ
যখন মুসলিম ব্যক্তি যুদ্ধে উপস্থিত হয় এবং উভয় দল ও উভয় কাতার সামনাসামনি মুখোমুখি
সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘হে
মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর এবং অবিচল থাকবে যখন কোন দলের সম্মুখীন হও,
আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে’। (সূরা আল-আনফাল: ৪৫)।
অন্যত্র
বর্ণিত হয়েছে যে,
হে
ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কাফির বাহিনীর সম্মুখীন হবে তখন তাদের মুকাবিলা করা হতে কখনোই
পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আর সেদিন যুদ্ধ কৌশল বা স্বীয় বাহিনীর কেন্দ্রস্থলে স্থান
নেয়া ব্যতীত কেঊ তাদের থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে অর্থাৎ পালিয়ে গেলে সে আল্লাহর গযবে
পরিবেষ্টিত হবে, তার আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট স্থান’।
(সূরা আল-আনফাল: ১৫-১৬)।
এছাড়া
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন
করা সাতটি ধ্বংসাত্মক বস্তুর একটি। হাদীছটি নিম্নরূপঃ
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ (হে লোক সকল!) সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় হতে তোমরা দূরে থাকবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস
করলেন, হে আল্লাহর রসূল! এ সাতটি বিষয় কী? জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, (১) আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা। (২) যাদু করা। (৩) শারী’আতের অনুমতি ব্যতীত
কাউকে (অন্যায়ভাবে) হত্যা করা। (৪) সুদ খাওয়া। (৫) (অন্যায়ভাবে) ইয়াতীমের মাল খাওয়া।
(৬) জিহাদের মাঠ থেকে পালিয়ে আসা। (৭) নির্দোষ ও সতী-সাধ্বী মুসলিম মহিলার বিরুদ্ধে
ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫২,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৭৬৭, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৬৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৮৯, সুনান আননাসায়ী ৩৬৭১, সুনান আবূ দাঊদ ২৮৭৪, শু‘আবুল ঈমান ৪০০০, সহীহ ইবনু হিব্বান
৫৫৬১, ইরওয়া ১২০২, সহীহ আল জামি‘ ১৪৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৩৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৬৪,
ইসলামিক সেন্টারঃ ১৭০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
দ্বিতীয়তঃ
যখন শত্রুদল মুসলিমদের কোন শহরে উপস্থিত হয় তখন ঐ শহরবাসীর উপর ফরযে আইন হয়ে যায় যে,
তারা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে ঐ শহর থেকে তাড়িয়ে দিবে। তবে ঐ শহরবাসী যদি
তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে অক্ষম হয় তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা অনন্যা মুসলিমদের উপর আবশ্যক
হয়ে যায়। এই ওয়াজিব বিধানের ধারাবাহিকতা নিকটতম এলাকা তারপর নিকটতমভাবে চলমান থাকবে।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘হে
মুমিনগণ! ঐ কাফিরদের সাথে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের আশেপাশে অবস্থান করছে, যেন তারা তোমাদের
মধ্যে কঠোরতা খুঁজে পায়; আর জেনে রেখ যে, আল্লাহ পরহেযগারদের সাথে রয়েছেন’। (সূরা আত-তাওবাহ : ১২৩)।
তৃতীয়তঃ
যখন মুসলিমদের ইমাম মানুষদেরকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাবে এবং তাদের থেকে উপস্থিতি
কামনা করবে (তখন তাদের জন্য যুদ্ধে অংশ নেয়া ফরযে আইন)।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘অভিযানে
বের হও স্বল্প সরঞ্জামের সাথেই হোক, অথবা প্রচুর সরঞ্জামের সাথেই হোক এবং আল্লাহর পথে
নিজেদের ধন-সম্পদ ও প্রাণ দ্বারা যুদ্ধ কর। এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা
জানতে’। (সূরা আত-তাওবাহ : ৪১)।
আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ আর হিজরত নেই, তবে অবশিষ্ট আছে জিহাদ ও নিয়্যাত। তাই যখন তোমাদেরকে জিহাদের জন্য বের হতে বলা হবে, বের হয়ে পড়বে। সেদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন, এ শহরকে সেদিন হতে আল্লাহ তা’আলা সম্মানিত করেছেন যেদিন তিনি আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; আর এটা ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত আল্লাহর সম্মানেই সম্মানিত (হারাম বা পবিত্র) থাকবে। এ শহরে আমার আগে কারো জন্য যুদ্ধ করা হালাল ছিল না আর আমার জন্যও একদিনের অল্প সময়ের জন্য মাত্র হালাল করা হয়েছিল। অতঃপর তা ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত আল্লাহর সম্মানেই সম্মানিত। এ শহরের কাঁটাযুক্ত গাছ পর্যন্ত কাটা যাবে না, এখানে শিকার হাঁকানো যাবে না, এর রাস্তায় পড়ে থাকা কোন জিনিস ঘোষণাকারী ছাড়া কেউ উঠাতে পারবে না। আর এর ঘাসও কাটতে পারবে না। বর্ণনাকারী ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, এ সময় ’আব্বাস(রাঃ) বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রসূল! ইযখির ঘাস ছাড়া? এ ঘাসতো কর্মকরদের জন্যে ও লোকদের ঘরের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ঠিক আছে ইযখির ঘাস ছাড়া। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭১৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৮৩৪, সুনান আবূ দাঊদ ২৪৮০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩১৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৫৩, সুনান নাসায়ী ৪১৭০, সুনান আততিরমিযী ১৫৯০, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক্ব ৯৭১৩, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩৬৯৩০, আহমাদ ২৮৯৬, দারিমী ২৫৫৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৯৯৪৪, ইরওয়া ১১৮৭, সহীহ আল জামি‘ ৭৫৬৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩১৬৮, ইসলামীক সেন্টার ৩১৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ
প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
“হে
ঈমানদারগগণ! তোমাদের কি হল যে, যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে অভিযানে বের হতে বলা হয়,
তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে যমীনে ঝুঁকে পড়? তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে
পরিতুষ্ট হয়েছ? আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগের উপকরণ তো নগণ্য। যদি তোমরা
অভিযানে বের না হও, তবে তিনি তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং অন্য জাতিকে
তোমাদের পরিবর্তে আনয়ন করবেন এবং তোমরা তার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ্ সব
কিছুর উপর ক্ষমতাবান”। (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৩৮-৩৯)।
মূলত
জিহাদ হল ফরযে আইনঃ সেটা হতে পারে অন্তর দিয়ে, হতে পারে মুখ দিয়ে, হতে পারে সম্পদ দিয়ে
কিংবা হাত দিয়ে। সুতরাং মুসলিমদের উপর আবশ্যক হল, সে তার ক্ষমতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী
এ সকল প্রকারের কোন একটির মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। জান ও মাল তথা সম্পদ
দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার নির্দেশ আল-কুরআন ও হাদীছে অনেক বর্ণিত হয়েছে।
আনাস
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুশরিকদের
সাথে তোমাদের জান, মাল ও জবান দ্বারা জিহাদ কর। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৮২১, সুনান আবুদাঊদ ২৫০৪, সুনান আননাসায়ী ৩০৯৬, মুসনাদ আহমাদ ১২২৪৬,
দারিমী ২৪৭৫, সহীহ আল জামি ৩০৯০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
যেহেতু
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ফরজে আইন তাই জিহাদ থেকে বিরত থাকা বা জিহাদের মাঠ থেকে
পলায়ন করা কঠিন একপ্রকার কবিরা গুণাহ।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“সমান
নয় সেসব মু’মিন যারা বিনা ওযরে ঘরে বসে থাকে এবং ওই সব মু’মিন যারা আল্লাহর পথে নিজেদের
জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে। যারা স্বীয় জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা
বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের ওপর যারা ঘরে বসে থাকে। আর প্রত্যেককেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়া’দা
করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদীনদের মহান পুরস্কারের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন যারা ঘরে বসে থাকে
তাদের ওপর।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৯৫)।
(১৫) যুদ্ধে মুশরিকদের সাথে
বন্ধুত্ব করা ও তাদেরকে সাহায্য করাঃ
আল্লাহ
তাআলা বলেছেন,
"হে
মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও নাসারাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পর পরস্পরের
বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে"।
(সূরা আল-মায়েদাহ: ৫১)।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য-সহযোগিতা করা বড় অপরাধঃ
আল্লাহ
বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না"।
(সূরা আল-মুমতাহিনাহ: ১)।
আল্লাহ
তাআলা বলেন,
‘হে
মুমিনগণ! তোমরা মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না’। (সুরা আন-নিসা, ৪/১৪৪)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
ঈমানদারগণ! তোমাদের পিতৃবর্গ ও ভাতৃবৃন্দ যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে পছন্দ করে,
তবে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে,
তারাই যালিম”। (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৩)।
আল্লাহ
তাআলা বলেন,
‘আল্লাহ
তোমাদেরকে সেইসব লোকের প্রতি সদ্ব্যবহার ও ন্যায়বিচারে নিষেধ করেন না, যারা তোমাদের
সাথে ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ করে না এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দেয় না। নিশ্চয়ই
আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। তবে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন তাদের সাথে বন্ধুত্ব
করতে, যারা তোমাদের সাথে ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে
এবং তোমাদেরকে বের করতে সহায়তা করেছে’। (সুরা আল-মুমতাহিনা,
৬০/৮-৯)।
(গ) ইবাদাতের ক্ষেত্রে কাবীরা গুনাহঃ
(১৬) পেশাব হতে বেঁচে/সতর্ক না থাকা (যথাযথভাবে পরিচ্ছন্ন না থাকাঃ
আমাদের
সমাজে অধিকাংশ মুসলিম যুবক যুবতী এমনকি বয়স্ক লোকদেরকেও দেখা যায় তারা পেশাব করে পানি
বা ঢিলা কুলুপ ব্যবহার করে না। যেখানে পেশাবের ছিটে ফোটা শরীরে লাগার কারণে কবরে কঠিন
শাস্তি দেয়া হয় সেখানে যারা পানি বা ঢিলা কুলুপই ব্যবহার করে না তাদের শাস্তি আরও কতো
হবে!
ইবনু
‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা দু’টি
কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তিনি বললেনঃ এদের ‘আযাব দেয়া হচ্ছে, কোন গুরুতর
অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব হতে সতর্ক থাকত না। আর
অপরজন চোগলখোরী করে বেড়াত। তারপর তিনি একখানি কাঁচা খেজুরের ডাল নিয়ে ভেঙ্গে দু’ভাগ
করলেন এবং প্রত্যেক কবরের উপর একখানি গেড়ে দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর
রাসূল! কেন এমন করলেন? তিনি বললেনঃ আশা করা
যেতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত এ দু’টি শুকিয়ে না যায় তাদের আযাব কিছুটা হালকা করা হবে।
ইবনুল মুসান্না (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) বলেনঃ আমি মুজাহিদ (রহ.) হতে অনুরূপ শুনেছি। সে তার
পেশাব হতে সতর্ক থাকত না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২১৮, ২১৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২১৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আল্লাহর
রসূল (ﷺ)
বলেন, ‘‘তোমরা পেশাব থেকে সাবধানতা অবলম্বন কর। কারণ, অধিকাংশ কবরের আযাব এই পেশাব
(থেকে সাবধান না হওয়ার) ফলেই হয়ে থাকে।’’ (দারাকুত্বনী,
সহীহ তারগীব ১৫১)।
তিনি
আরো বলেন, ‘‘অধিকাংশ কবরের আযাব প্রস্রাবের (ছিটা গায়ে লাগার) কারণে হবে।’’ (আহমদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ১৫৩)।
সুতরাং
পেশাব করতে এমন জায়গায় বা এমনভাবে বসবেন না, যাতে তার ছিটা ঘুরে আপনার দেহ বা কাপড়ে
না লাগে। অতএব উঁচু জায়গায় বসে নিচু জায়গায় পেশাব করুন, যেদিক থেকে জোর হাওয়া বইছে
তার বিপরীত দিকে (কিবলা না হলে) বসে পেশাব করুন। পাথরের উপর না করে নরম জায়গায় পেশাব
করুন তাহলে ছিটা লাগার আশঙ্কা থাকবে না।
যেমন
বিপদের আশঙ্কা আছে বলে কোন ফাটল বা গর্তে পেশাব-পায়খানা করবেন না।
আর
ছিটা লাগার আশঙ্কা আছে বলেই অপ্রয়োজনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেশাব করা উচিত নয়।
মা
আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাদেরকে বলবে যে, আল্লাহর রসূল (ﷺ)
দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন, তার কথা বিশ্বাস করো না। যেহেতু তিনি বসে বসেই পেশাব করতেন।’
(সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২, সুনান নাসাঈ ২৯, সুনান
ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অবশ্য
তিনি প্রয়োজনে দাঁড়িয়েও পেশাব করেছেন।
হুযাইফাহ
(রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার স্মরণ আছে যে, একদা আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এক সাথে চলছিলাম। তিনি দেয়ালের পিছনে মহল্লার একটি আবর্জনা ফেলার জায়গায়
এলেন। অতঃপর তোমাদের কেউ যেভাবে দাঁড়ায় সে ভাবে দাঁড়িয়ে তিনি পেশাব করলেন। এ সময় আমি
তাঁর নিকট হতে সরে যাচ্ছিলাম কিন্তু তিনি আমাকে ইঙ্গিত করলেন। আমি এসে তাঁর পেশাব করা
শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২২৫, ২২৪; মুসলিম ২/২২, হাঃ ২৭৩, আহমাদ ২৩৩০১, ২৩৪০৫, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ২১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতএব
আপনিও প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে পারেন। তবে শর্ত হল, যেন আপনার লজ্জাস্থান কেউ দেখে
না ফেলে এবং আপনার কাপড়ে যেন পেশাবের ছিটা না লাগে।
(১৭) সলাত পরিত্যাগ করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তাদের
পরে আসল অযোগ্য উত্তরসূরীরা, তারা সালাত নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। কাজেই
অচিরেই তারা ক্ষতিগ্রস্ততার সম্মুখীন হবে”। (সূরা মারইয়াম
১৯ : ৫৯)।
ইসলামের
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হ’ল ছালাত। সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণকে হৃদয়ে জাগ্রত
রাখার প্রক্রিয়া হিসাবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয
করেছেন। ছালাত এমন একটি ইবাদত, কালেমায়ে শাহাদতের পরেই যার স্থান। কেউ মুসলমান হলে
তাকে প্রথমেই ছালাতে অভ্যস্ত হওয়া আবশ্যক। ছাহাবীগণের মধ্যে কেউ ছালাতে না আসলে তাকে
কাফের মনে করা হতো। ছালাত ত্যাগ করা কাফের ও মুনাফিকদের কাজ। ছালাত ত্যাগকারীরা পরকালে
ফেরাউন, হামান, কারূনের মত কাফেরদের সাথে জাহান্নামে অবস্থান করবে।
আমরা
জেনেছি যে, ছালাত সঠিক হলে কিয়ামতে তার অন্যান্য আমলগুলো কাজে আসবে আর ছালাত সঠিক না
হলে তার জীবনের অর্জিত অন্যান্য আমলগুলো তাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে কোনো উপকারে আসবে
না। এসব জানার পরও আমরা ছালাতে অবহেলা, অলসতা ও পরিত্যাগ করেই চলছি। অথচ এর পরিণতি
অত্যন্ত ভয়াবহ। নিম্নে ছালাত পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হলোঃ
(১) ছালাত পরিত্যাগ করা কুফরীঃ
ছালাত
পরিত্যাগ করা কুফরী কাজ। ছালাত ত্যাগ করাকে রাসূল (ছাঃ) কুফরী বলেছেন। যেমন হাদীছে
এসেছে,
জাবির
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
(মু’মিন) বান্দা ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত পরিত্যাগ করা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৪৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮২, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬৭৮, সুনান আননাসায়ী ৪৬৪, সুনান আততিরমিযী
২৬২০, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১০৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্য
বর্ণনায় আছে, মানুষ ও শিরক-কুফরের মধ্যে পার্থক্য হ’ল ছালাত। কোন বর্ণনায় আছে, ঈমান
ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো ছালাত। (ছহীহুত তারগীব হা/৫৬৩)।
অন্যত্র
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘বান্দা, কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হ’ল ছালাত। যখন সে ছালাত
পরিত্যাগ করল, তখন সে শিরক করে ফেলল’। (ছহীহুত তারগীব
হা/৫৬৬)।
বুরায়দাহ্
(রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের
ও তাদের (মুনাফিক্বদের) মধ্যে যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা হলো সালাত। অতএব যে সালাত পরিত্যাগ
করবে, সে (প্রকাশ্যে) কুফরী করলো (অর্থাৎ- কাফির হয়ে যাবে)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৪, সুনান আততিরমিযী ২৬২১, সুনান
আননাসায়ী ৪৬৩, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১০৭৯ সহীহ আত্ তারগীব ৫৬৪, আহমাদ ২২৯৩৭)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
বিন শাক্বীক্ব (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
সাহাবীগণ সালাত ছাড়া অন্য কোন ’আমল পরিত্যাগ করাকে কুফরী বলে মনে করতেন না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৯, সুনান আততিরমিযী ২৬২২, সহীহ
আত্ তারগীব ৫৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
শাদ্দাদ
ইবনু মা‘কেল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সর্বপ্রথম তোমরা তোমাদের দ্বীনের যা হারাবে তাহ’লে
আমানত এবং সর্বশেষ দ্বীনের যা হারাবে তা হ’ল ছালাত’। (তাবারানী
কাবীর হা/৯৭৫৪; ছহীহাহ হা/১৭৩৯)।
ইমাম
আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, ‘ইসলাম থেকে চলে যাওয়া সর্বশেষ বস্ত্ত যেহেতু ছালাত সেহেতু
যে বস্ত্তর শেষ চলে যায় সে বস্ত্ত সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। এজন্য আপনাদের উচিৎ দ্বীনের
সর্বশেষ অংশ ছালাতকে যথাযথভাবে আঁকড়ে ধরা, আল্লাহ আপনাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (ইমাম আহমাদ, কিতাবুছ ছালাত)।
জাবের
বিন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে আমলসমূহের মধ্যে কোন আমলটি
আপনাদের নিকট ঈমান এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী হিসাবে বিবেচিত হ’ত? তিনি বললেন,
ছালাত’। (ইবনু বাত্ত্বা, আল-ইবানাতুল কুবরা হা/৮৭৬; মারওয়াযী,
তা‘যীমু কাদরিছ ছালাত হা/৮৯৩)।
উল্লেখ্য
যে, কুফরী করা ও কাফের হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। এক্ষণে কেউ যদি ছালাতকে অস্বীকার করে
বা একেবারে ছেড়ে দেয় তাহ’লে সে কাফের হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যদি অলসতাবশত ছালাত ত্যাগ
করে এবং মাঝে-মধ্যে আদায় করে তাহ’লে সে কাফের হবে না বরং কবীরা গুনাহগার হবে। তওবা
না করলে তাকে জাহান্নামে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। (আলবানী,
হুকমু তারিকিছ ছালাত ১/১০, ৫১; উছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১২/৫৫-৫৬; ছহীহাহ হা/৩০৫৪-এর
আলোচনা দ্রষ্টব্য)।
(২) ছালাত ত্যাগ করা হত্যাযোগ্য অপরাধঃ
ছালাতকে
অবজ্ঞা করে তা ত্যাগ করা হত্যাযোগ্য অপরাধ। কেউ ইচ্ছা করে ছালাত পরিত্যাগ করলে তাকে
ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিতে হবে। সে এই বিধান অস্বীকার করলে সরকার তাকে শাস্তি দিবে।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, “তোমরা মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর, পাকড়াও কর, অবরোধ কর এবং ওদের
সন্ধানে প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, ছালাত আদায় করে
ও যাকাত দেয়, তাহলে ওদের রাস্তা ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান”। (সুরা তওবা ৯/৫)।
এর
তাফসীরে বলা হয়েছে, তারা ছালাত আদায় করলে জান ও মালের নিরাপত্তা লাভ করবে। আর তা পরিহার
বা অস্বীকার করলে তা হত্যাযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। হাদীছে এসেছে,
আনাস
ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেনঃ আমাকে লোকের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা “লা- ইলা-হা
ইল্লাল্লাহ’’ স্বীকার করবে। যখন তারা তা স্বীকার করে নেয়, আমাদের মত সালাত আদায় করে,
আমাদের ক্বিবলা মুখী হয় এবং আমাদের যবহ করা প্রাণী খায়, তখন তাদের জান-মালসমূহ আমাদের
জন্যে হারাম হয়ে যায়। অবশ্য রক্তের বা সম্পদের দাবীর কথা ভিন্ন। আর তাদের হিসাব আল্লাহর
নিকট। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৯২, আধুনিক প্রকাশনীঃ
৩৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮৫, সুনান আননাসাঈ ৩৯৬৭; আহমাদ ১৩৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কুতাইবাহ
ইবনু সাঈদ (রহঃ) ..আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তিকালের পর আবূ বকর (রাযিঃ) খলীফা নিযুক্ত হলেন। এ সময় আরবের
একদল লোক (যাকাত অস্বীকার করে) মুরতাদ হয়ে গেল। [আবূ বকর (রাযিঃ) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের
সংকল্প করলেন] ’উমার (রাযিঃ) বললেন, আপনি কিরূপে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন?[1] অথচ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আমি (আল্লাহর পক্ষ থেকে)
লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা বলে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ
(আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) আর যে ব্যক্তি ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বললো, সে
তার জান-মাল আমার হাত থেকে রক্ষা করলো। অবশ্য আইনের দাবী আলাদা। (অর্থাৎ ইসলামের বিধান
অনুযায়ী দণ্ডনীয় কোন অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে)। তবে তার আসল বিচারের
ভার আল্লাহর উপর ন্যস্ত।
আবূ
বকর (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, যে ব্যক্তি সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে আমি
অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো [2] কেননা যাকাত হচ্ছে মালের (উপর বঞ্চিতের) অধিকার।
আল্লাহর কসম, যদি তারা আমাকে একখানা রশি প্রদানেও অস্বীকৃতি জানায় যা তারা (যাকাত
বাবদ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রদান করতো, তবে আমি এ অস্বীকৃতির
কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। এবার উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর কসম,
ব্যাপারটা এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, আল্লাহ তা’আলা আবূ বকরের হৃদয়কে যুদ্ধের জন্য
প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। আমি স্পষ্টই উপলদ্ধি করলাম, এটাই (আবূ বকরের সিদ্ধান্তই) সঠিক
এবং যথার্থ। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৩২, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অত্র
হাদীছে ছালাত আদায়কে নিরাপত্তার মাপকাঠি বলা হয়েছে।
আবূ
সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক প্রকার (রঙিণ) চামড়ার থলে করে সামান্য
কিছু স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। তখনও এগুলো থেকে সংযুক্ত মাটি পরিষ্কার করা হয়নি। আবূ সা‘ঈদ
খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার জনের মাঝে স্বর্ণখন্ডটি
বণ্টন করে দিলেন। তারা হলেন, ‘উয়াইনাহ ইবনু বাদর, আকরা ইবনু হাবিস, যায়দ আল-খায়ল এবং
চতুর্থ জন ‘আলক্বামাহ কিংবা ‘আমির ইবনু তুফায়ল (রাঃ)। তখন সাহাবীগণের মধ্য থেকে একজন
বললেন, এটা পাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের অপেক্ষা আমরাই অধিক হাকদার ছিলাম। (রাবী) বলেন,
কথাটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি আমার উপর আস্থা রাখ না অথচ আমি আসমানের অধিবাসীদের
আস্থাভাজন, সকাল-বিকাল আমার কাছে আসমানের সংবাদ আসছে। রাবী বলেন, এমন সময়ে এক ব্যক্তি
উঠে দাঁড়াল। লোকটির চোখ দু’টি ছিল কোটরাগত, চোয়ালের হাড় যেন বেরিয়ে পড়ছে, উঁচু কপাল
বিশিষ্ট, দাড়ি অতি ঘন, মাথাটি ন্যাড়া, পরনের লুঙ্গী উপরে উত্থিত। সে বলল, হে আল্লাহর
রাসূল! আল্লাহকে ভয় করুন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার জন্য আফসোস!
আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আমি কি অধিক হাকদার নই? রাবী আবূ সা‘ঈদ
খুদরী (রাঃ) বলেন, লোকটি চলে গেলে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!
আমি কি লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
না, হতে পারে সে সালাত আদায় করে। খালিদ (রাঃ) বললেন, অনেক সালাত আদায়কারী এমন আছে যারা
মুখে এমন এমন কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে মানুষের দিল ছিদ্র করে, পেট ফেড়ে দেখার জন্য বলা হয়নি। তারপর
তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তখন লোকটি পিঠ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। তিনি বললেন, এ ব্যক্তির
বংশ থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হবে যারা শ্রুতিমধুর কণ্ঠে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে
অথচ আল্লাহর বাণী তাদের গলদেশের নিচে নামবে না। তারা দ্বীন থেকে এভাবে বেরিয়ে যাবে
যেভাবে লক্ষ্যবস্তুর দেহ ভেদ করে তীর বেরিয়ে যায়। (বর্ণনাকারী বলেন) আমার মনে হয় তিনি
এ কথাও বলেছেন, যদি আমি তাদেরকে পাই তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে সামূদ জাতির মতো হত্যা
করে দেব। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৩৫১, ৩৩৪৪;
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী ২৩৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬৪, আহমাদ ১১৬৯৫, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ৪০০৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩) আল্লাহ ও রাসূলের যিম্মা থেকে মুক্তিঃ
কেউ
ইচ্ছা করে ছালাত ত্যাগ করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর যিম্মা থেকে সে বের হয়ে যায়।
যেমন,
(ক)
মুআ’য বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম)এর নিকট জনৈক লোক আগমণ করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন কিছু আমল শিখিয়ে
দিন, উহা বাস্তবায়ন করলে যেন আমি জান্নাতে প্রবেশ করি।
তিনি
বললেনঃ ’’তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না- যদিও তোমাকে শাস্তি দেয়া হয় বা
আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পিতা-মাতার আনুগত্য করবে- যদিও তারা তোমাকে তোমার সম্পদ ও তোমার
মালিকানাধীন সকল বস্ত্ত থেকে বহিস্কার করে দেয়। ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ করবে না।
কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ করবে, তার থেকে আল্লাহর জিম্মাদারী মুক্ত
হয়ে যাবে।’’ (হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ত্বাবরানী)। (তাবারানী
আওসাত্ব হা/৭৯৫৬; ছহীহুত তারগীব হা/৫৬৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
(খ)
আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার বন্ধু (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আমাকে উপদেশ দিয়েছেনঃ (১) তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে
খণ্ডবিখন্ড করা হয় বা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়; (২) ইচ্ছা করে কোন ফরয সালাত ত্যাগ করবে
না, যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ফরয সালাত ত্যাগ করবে তার ওপর থেকে ইসলাম প্রদত্ত নিরাপত্তা
উঠে যাবে; (৩) মদ পান করবে না, কারণ মদ হচ্ছে সকল মন্দের চাবিকাঠি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৮০, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪০৩৪, সহীহ
আত্ তারগীব ৫৬৭)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(গ)
অন্যত্র তিনি বলেন, উম্মে আয়মান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো নামায ছেড়ে দিবে না। কেননা যে ব্যক্তি
ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয়, তার থেকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জিম্মাদারী মুক্ত হয়ে
যায়।’’ (আহমাদ ৬/৪২১, ২৭৪০৪; ছহীহুত তারগীব হা/৫৭৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪) ছালাত ত্যাগকারীর ইসলামে কোনো অংশ নেইঃ
ছালাত
ত্যাগ করা এমন ভয়াবহ পাপ যে, কেউ তা করলে সে ইসলাম থেকে অনেক দূরে চলে যায়। যেমন আছারে
এসেছে,
মিসওয়ার
ইবনু মাখরামা (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, যে রাত্রে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে ছুরিকাঘাত
করা হয়, সেই রাত্রে তিনি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করলেন। ওমর (রাঃ)-কে
ফজরের ছালাতের জন্য জাগানো হ’ল। ওমর (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমি এই অবস্থায়ও ছালাত আদায়
করব। কারণ যে ব্যক্তি ছালাত ছেড়ে দেয়, ইসলামে তার কোন অংশ নেই। অতঃপর ওমর (রাঃ) ছালাত
পড়লেন অথচ তার জখম হ’তে তখনও রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। (বায়হাক্বী,
সুনানুল কুবরা হা/১৬৭৩; ইবনুল খাল্লাল, আস-সুনাহ হা/১৩৮৮,; মারওয়াযী, তা‘যীমু কাদরিস
ছালাত হা/৯২৯, সনদ ছহীহ, জামে‘উল ঊছূল হা/৫২২৫)।
অন্য
বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত বিনষ্ট করে ইসলামে তার কোন অংশ নেই’।
(দারাকুৎনী হা/১৭৫০; মুয়াত্ত্বা হা/১০১; ইরওয়া হা/২০৯)।
(৫) ছালাত ত্যাগ করা মুশরিকদের কাজঃ
ছালাত
পরিত্যাগ করা মূলতঃ মুশরিকদের কাজ। এজন্য মুসলমান ব্যক্তি কখনো ছালাত পরিত্যাগ করতে
পারে না।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘আর তোমরা তাঁকে ভয় কর ও ছালাত কায়েম কর এবং তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত
হয়ো না’। (সুরা রূম ৩০/৩১)।
ইবনু
বাত্তা (রহঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ ছালাত পরিত্যাগ- কারীকে মুশরিক এবং ঈমান থেকে
খারিজ হিসাবে গণ্য করেছেন। কারণ এই সম্বোধনের মাধ্যমে মুমিনদেরকে সতর্ক করা হয়েছে,
যাতে তারা ছালাত পরিত্যাগ না করে। আর তারা এটা করলে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে এবং মুশরিকদের
মত হয়ে যাবে’। (আল-ইবানাতুল কুবরা ২/৭৯২)।
ইবনু
বাত্তা (রহঃ) আরো বলেন, ‘ঈমান, ছালাত ও যাকাতের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি। যার ঈমান
নেই তার ছালাত কোনো কাজে আসবে না। যে ছালাত আদায় করে না তার ঈমান কোনো উপকারে আসবে
না’। (আল-ইবানাতুল কুবরা ২/৭৯২)।
আনাস
ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিন বান্দা
ও শিরক-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত বর্জন করা। অতএব যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করলো,
সে অবশ্যই শিরক করলো। (সুনান ইবনু মাজাহ ১০৮০, সহীহ তারগীব ৫৬৫, ১৬৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৬) ছালাত ত্যাগ করা অজ্ঞদের বৈশিষ্ট্যঃ
যারা
ছালাত আদায় করে না তাদেরকে অজ্ঞদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর
যখন তোমরা ছালাতের জন্য (আযানের মাধ্যমে) আহবান করে থাকো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা
বলে মনে করে। কারণ ওরা একেবারেই নির্বোধ সম্প্রদায়’। (সুরা
মায়েদাহ ৫/৫৮)।
সুদ্দী
(রহঃ) বলেন, ‘মদীনায় এক নাছারা ছিল যে মুওয়াযযিনের আযানের সময় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,
মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর রাসূল! বলতে শুনত, তখন সে বলত, মিথ্যাবাদী আগুনে পুড়ুক! এক
রাতে সে পরিবারসহ ঘুমিয়ে ছিল। এমন সময় তার দাসী সে ঘরে আগুন নিয়ে প্রবেশ করে। আগুনের
একটি টুকরো ঘরে পড়ে যায় এবং আগুন ধরে যায়। এতে তার বাড়ি পুড়ে যায় এবং সে পরিবারসহ পুড়ে
মারা যায়’। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৩/১২৮)।
ছালাত
ও আযানকে নিয়ে কটূক্তি করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা সপরিবারে তাকে ধ্বংস করে দেন। যখন
আযান শেষে মুসলমানেরা ছালাতে দাঁড়াত তখন ইহূদীরা হাঁসি-তামাশা করত। যার ফলশ্রুতিতে
আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত নাযিল করে বলেন, এরাই নির্বোধ সম্প্রদায়। (তাফসীরুল খাযেন ২/৫৭)।
(৭) ছালাত ত্যাগ করা যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার সমতুল্য অপরাধঃ
কোন
এলাকায় যদি আযানের ধ্বনি শোনা যেত তাহ’লে সে এলাকায় রাসূল (ছাঃ) বা ছাহাবায়ে কেরাম
অভিযান পরিচালনা করতেন না। বরং মনে করা হতো এরা ছালাত আদায়কারী। আর আযান শোনা না গেলে
সে এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো। যেমন আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,
আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই আমাদের নিয়ে কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করতে যেতেন, ভোর না হওয়া পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করতেন না বরং লক্ষ্য রাখতেন, যদি
তিনি আযান শুনতে পেতেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হতে বিরত থাকতেন।
আর যদি আযান শুনতে না পেতেন, তাহলে অভিযান চালাতেন। আনাস (রাযি.) বলেন, আমরা খায়বারের
উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম এবং রাতের বেলায় তাদের সেখানে পৌঁছলাম। যখন প্রভাত হলো এবং তিনি
আযান শুনতে পেলেন না; তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ার হলেন।
আমি আবূ তালহা (রাযি.)-এর পিছনে সওয়ার হলাম। আমার পা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
-এর পায়ের সাথে লেগে যাচ্ছিল। আনাস (রাযি.) বলেন, তারা তাদের থলে ও কোদাল নিয়ে বেরিয়ে
আমাদের দিকে আসলো। হঠাৎ তারা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেখতে পেলো,
তখন বলে উঠল, ‘এ যে মুহাম্মাদ, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ তাঁর পঞ্চ বাহিনী সহ!’ আনাস
(রাযি.) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে বলে উঠলেনঃ
‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোন কাওমের আঙ্গিণায় অবতরণ
করি, তখন সতর্কীকৃতদের প্রভাত হয় মন্দ।’ (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১০, ৩৭১; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৩৮৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
১৩৬৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ৫৭৫ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫৮৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৮) ছালাত পরিত্যাগে আমীর বা নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অনুমতিঃ
ছালাত
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যে, রাষ্ট্র বা নেতারা যতদিন ছালাত কায়েম রাখবে ততদিন
তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা জনগণের জন্য হারাম। যদিও তারা অন্যান্য ক্ষেত্রে নিন্দনীয়
হয়।
আওফ
ইবনু মালিক আল আশজা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বোত্তম, যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারা
তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ করো এবং তারাও তোমাদের জন্য দু’আ করে। আর
তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বনিকৃষ্ট, যাদের প্রতি তোমরা ক্রোধান্বিত হও এবং তারাও তোমাদের
প্রতি ক্রোধ ও শত্রুতা পোষণ করে। আর তাদের প্রতি তোমরা অভিসম্পাত করো এবং তারাও তোমাদের
প্রতি অভিসম্পাত করে। রাবী বলেন, তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এমতাবস্থায়
কি আমরা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করব না (তবুও কি বায়’আতের উপর থাকব)? তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে।
(পুনরায় বললেনঃ) না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। সাবধান!
যে ব্যক্তিকে তোমাদের প্রতি শাসক নিযুক্ত করা হয় আর তার মধ্যে যদি আল্লাহ তা’আলার নাফরমানি
পরিলক্ষেত হয়, তাহলে তার সে নাফরমানির কাজটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু
তার আনুগত্য থেকে পিছপা হবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৩৬৭০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৯৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫৫, আহমাদ ২৩৯৮১,
দারিমী ২৮৩৯, সহীহাহ্ ৯০৭, সহীহ আল জামি‘ ৩২৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৫২, ইসলামিক সেন্টার
৪৬৫৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের ওপর এমন শাসকবর্গ নিযুক্ত হবে যারা
ভালো-মন্দ উভয় প্রকারের কাজ করতে দেখতে পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অসৎ কাজের প্রতিবাদ
করল, সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেল। আর যে ব্যক্তি অন্তর থেকে ঘৃণা করল, সেও নিরাপদ
হয়ে গেল। কিন্তু যে ব্যক্তি উক্ত কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল ও শাসকের আনুগত্য করল,
তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, এমতাবস্থায় কি আমরা তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব না? তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে।
না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে। রাবী বলেন, প্রতিবাদ ও মন্দ জানার অর্থ হলো,
যে ব্যক্তি অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে ও অগ্রাহ্য করে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫৪,
সুনান আততিরমিযী ২২৬৫, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘ ২৩৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৭, ইসলামিক
সেন্টার ৪৬৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৯) ছালাত ত্যাগ করা অন্যান্য আমল বিনষ্টের কারণঃ
ছালাত পরিত্যাগ করা এমন অপরাধ যে, এ কারণে তার অন্যান্য
সৎ আমল বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। যেমন বুরায়দা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’আসরের সালাত ছেড়ে দিলো সে তার ’আমল বিনষ্ট করলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৯৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৫৩, সুনান আননাসায়ী ৪৭৪, আহমাদ ২২৯৫৭, সহীহ আত্ তারগীব ৪৭৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫২০,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্য
হাদীছে এসেছে,
ইবনু
’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
যে ব্যক্তির ’আসরের সালাত ছুটে গেল তার গোটা
পরিবার ও ধনসম্পদ যেন উজাড় হয়ে গেল। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫৯৪, বুখারী ৫৫২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩০৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৬২৬, সুনান আবূ দাঊদ ৪১৪, সুনান আননাসায়ী ৫১২, সুনান আততিরমিযী ১৭৫, আহমাদ ৫৩১৩, সহীহ
আল জামি‘ ৫৪৯১, সহীহ আত্ তারগীব ৪৮০, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১২৯১, ইসলামীক সেন্টার ১৩০৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোনো
কোনো বর্ণনায় আছর ছালাতের কথা উল্লেখ নেই। বরং বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ছালাত
পরিত্যাগ করে অবশ্যই তার আমল বিনষ্ট হয়ে যায়’। (হায়ছামী,
মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/১৬৩৯)।
অন্য
হাদীছে এসেছে,
রাসুলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আযাদকৃত দাসী উমাইমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ
আমি একদা রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ওযুর পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম।
এমন সময় একজন লোক প্রবেশ করল। বলল আমাকে কিছু নসীহত করুন।
তিনি
বললেনঃ ’’তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না- যদিও তোমাকে কেটে টুকরো করে দেয়া
হয় বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না- যদিও তারা তোমাকে তোমার পরিবার
ও দুনিয়ার ধন-সম্পদ পরিত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। মদ্যপান করবে না। কেননা উহা সকল খারাপ
কাজের চাবি। ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ করবে না। কেননা যে এরূপ করবে, তার থেকে আল্লাহ্
ও রাসূলের জিম্মাদারী মুক্ত হয়ে যাবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্
তারহীব ৫৭১)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(১০) ছালাত ত্যাগে রিযিক থেকে বঞ্চিতঃ
ছালাত
এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে রিযিক বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা‘আলা যে সকল স্থানে তাঁর ইবাদত
করার নির্দেশ দিয়েছেন তার পরপরই প্রায় সব জায়গাতে রিযিকের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যেমন
কুরআনে এসেছে, ‘আর তুমি তোমার পরিবারকে ছালাতের আদেশ দাও এবং তুমি এর উপর অবিচল থাক।
আমরা তোমার নিকট রুজি চাই না। আমরাই তোমাকে রুজি দিয়ে থাকি। আর (জান্নাতের) শুভ পরিণাম
তো কেবল মুত্তাক্বীদের জন্যই’। (সুরা ত্বোয়াহা ২০/১৩২)।
আল্লাহর
বাণী, ‘আমরা তোমার নিকট রুজি চাই না। আমরাই তোমাকে রুজি দিয়ে থাকি’-এর ব্যাখ্যায় হাফেয
ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘তুমি যখন ছালাত আদায় করবে তোমার নিকট এমন জায়গা থেকে রিযিক
আসবে যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, ‘বস্তুতঃ যে
ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন। আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত
উৎস থেকে রিযিক প্রদান করে থাকেন’। (সুরা তালাক ৬৫/২-৩)।
তিনি
আরো বলেন, ‘আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি কেবল এজন্য যে, তারা আমার ইবাদত করবে। আমি
তাদের নিকট থেকে কোন রিযিক চাই না এবং চাই না যে তারা আমাকে আহার যোগাবে। নিশ্চয় আল্লাহ
হলেন সবচেয়ে বড় রিযিকদাতা ও প্রবল শক্তির অধিকারী’। (সুরা
যারিয়াত ৫১/৫৬-৫৭)।
(১১) ফেরাউন, হামান, ক্বারূন ও উবাই বিন খালফের সাথে হাশরঃ
যারা
ছালাত ত্যাগ করবে তাদের হাশর হবে বড় বড় কাফেরদের সাথে। আর পরকালে বড় কাফেরদের অবস্থা
হবে ভয়াবহ। যাদের মধ্যে রয়েছে ফেরাউন, হামান, ক্বারূন, উবাই ইবনু খালফ ও তাদের দোসরেরা।
এ মর্মে হাদীছে এসেছে,
আব্দুল্লাহ
ইবনু আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন ছালাতের কথা উল্লেখ
করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি তা (ছালাত) হেফাযত করবে, ক্বিয়ামত দিবসে তা তার জন্য নূর, দলীল-প্রমাণ
ও জাহান্নাম হ’তে মুক্তি (এর উপায়) হবে। আর যে ব্যক্তি তা (ছালাত) হেফাযত করবে না,
ক্বিয়ামত দিবসে তা তার জন্য নূর, দলীল-প্রমাণ ও জাহান্নাম হ’তে মুক্তি (এর উপায়) হবে
না। আর ঐ ব্যক্তি ক্বিয়ামত দিবসে ক্বারূন, ফেরাউন, হামান ও উবাই ইবনু খালফ-এর সাথে
থাকবে’। (দারেমী হা/২৭২১; আহমাদ হা/৬৫৭৬; ইবনু হিববান
হা/১৪৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ)।
ইমাম
আহমদ রহ. এ হাদীসকে সালাত পরিত্যাগকারীর কুফুরীর ব্যাপারে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
কেননা বড় বড় কাফিরদের সাথে বেনামাযীর হাশর হওয়ার জন্য তার কুফুরী সাব্যস্ত হওয়া চাই।
ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, “এই চার জনকে বিশেষভাবে এ জন্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা
কাফিরদের নেতা।
(১২) বারযাখে ভয়াবহ শাস্তিঃ
যে
ব্যক্তি ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে বরং উদাসীন থাকে তার জন্য কবরে এবং জাহান্নামে
ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
সামুরাহ্
ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভ্যাস
ছিল তিনি ফজরের সালাত শেষে প্রায়ই আমাদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের
কেউ আজ রাতে কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? রাবী বলেন, আমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখে থাকলে তাঁর
নিকট বলত। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তার তা’বীর
করতেন। যথারীতি একদিন সকালে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কেউ (আজ রাতে) কোন স্বপ্ন দেখেছ
কি? আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ না।
তখন
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কিন্তু আমি দেখেছি, আজ রাতে দু’ ব্যক্তি
আমার নিকট এলো এবং তারা উভয়ে আমার হাত ধরে একটি পবিত্র ভূমির দিকে (সম্ভবত তা শাম বা
সিরিয়া) নিয়ে গেল। দেখলাম, এক ব্যক্তি বসে আছে আর অপর এক ব্যক্তি লোহার সাঁড়াশি হাতে
দাঁড়ানো। সে তা ঐ উপবিষ্ট ব্যক্তির গালের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে তা দ্বারা চিরে গর্দানের
পিছন পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর তার দ্বিতীয় গালের সাথেও অনুরূপ ব্যবহার করার মাঝে
প্রথম গালটি ভালো হয়ে যায়। আবার সে পুনরায় তাই করে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? তারা
উভয়ে বলল, সামনে চলুন।
সম্মুখের
দিকে চললাম। এ পর্যায়ে আমরা এমন এক ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম, যে ঘাড়ের উপর চিৎ হয়ে
শুয়ে রয়েছে, আর অপর এক ব্যক্তি একখানা ভারী পাথর নিয়ে তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
সে ঐ পাথরের আঘাতে শায়িত ব্যক্তির মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করছে। যখনই সে পাথরটি নিক্ষেপ
করে (মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে) তা গড়িয়ে দূরে চলে যায়। তখন সে লোকটি পুনরায় পাথরটি তুলে
আনতে যায় সে ফিরে আসার পূর্বেই ঐ ব্যক্তির মাথাটি পূর্বের ন্যায় ঠিক হয়ে যায় এবং পুনরায়
সে তা দ্বারা তাকে আঘাত করে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী? তারা উভয়ে বলল, সামনে চলুন।
আমরা
সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম। সেখানে একটি গর্তের নিকট এসে পৌঁছলাম যা তন্দুরের মতো ছিল।
এটার উপরিঅংশ ছিল সংকীর্ণ এবং ভিতরের অংশটি ছিল প্রশস্ত। তার তলদেশে আগুন জ্বলছিল।
আগুনের লেলিহান শিখা যখন উপরের দিকে উঠছে, তখন তার ভিতরে যারা রয়েছে তারাও উপরে উঠে
আসছে এবং গর্ত হতে বাইরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। আর যখন অগ্নিশিখা কিছু স্তিমিত হচ্ছে
তখন তারাও পুনরায় ভিতরের দিকে চলে যাচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে কিছুসংখ্যক উলঙ্গ নারী ও
পুরুষ। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? তারা উভয়ে বলল : সামনে চলুন।
আমরা
সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম এবং একটি রক্তের নহরের নিকট পৌঁছলাম। দেখলাম, তার মধ্যস্থলে
এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে এবং নহরের তীরে একজন লোক দণ্ডায়মান। আর তার সম্মুখে রয়েছে প্রস্তরখন্ড।
নহরের ভিতরের লোকটি যখন তা হতে বের হওয়ার উদ্দেশে কিনারার দিকে অগ্রসর হতে চাচ্ছে,
তখন তীরে দাঁড়ানো লোকটি ঐ লোকটির মুখ লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করছে এবং সে লোকটিকে
ঐ স্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে যেখানে সে ছিল। মোটকথা, লোকটি যখনই বাইরে আসার চেষ্টা করে,
তখনই তার মুখের উপর পাথর মেরে সে যেখানে ছিল পুনরায় সেখানে ফিরিয়ে দেয়। আমি জিজ্ঞেস
করলামঃ এটা কী? সঙ্গীদ্বয় বললেনঃ সামনে চলুন।
আমরা
সম্মুখে অগ্রসর হয়ে শ্যামল সুশোভিত একটি বাগানে পৌঁছলাম। বাগানে ছিল একটি বিরাট বৃক্ষ।
ঐ বৃক্ষের গোড়ায় উপবিষ্ট ছিলেন একজন বৃদ্ধ লোক এবং বিপুল সংখ্যক বালক। ঐ বৃক্ষটির সন্নিকটে
আরেক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম, যার সম্মুখে রয়েছে আগুন, যাকে সে প্রজ্জ্বলিত করছে। এরপর
আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে ঐ বৃক্ষের উপরে আরোহণ করাল এবং সেখানে তারা আমাকে বৃক্ষরাজির
মাঝখানে এমন একখানা গৃহে প্রবেশ করাল যেমন সুন্দর ও মনোরম ঘর আমি আর কখনো দেখিনি। তার
মধ্যে ছিল কতিপয় বৃদ্ধ, যুবক, নারী ও বালক। অনন্তর তারা উভয়ে আমাকে সে ঘর হতে বের করে
বৃক্ষের আরো উপরে চড়াল এবং এমন একখানা গৃহে প্রবেশ করাল যা প্রথমটি হতে আরো সুন্দর
ও উত্তম। এতেও দেখলাম, কতিপয় বৃদ্ধ ও যুবক।
অনন্তর
আমি সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আপনারা উভয়েই তো আমাকে আজ সারা রাতে অনেক কিছু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে
দেখালেন। এখন বলুন, আমি যা কিছু দেখেছি তার তাৎপর্য কী? তারা উভয়ে বলল: হ্যাঁ, (তা
বলছি)। ঐ যে এক ব্যক্তিকে দেখেছেন সাঁড়াশি দ্বারা যার গাল চেরা হচ্ছিল, সে মিথ্যাবাদী,
সে মিথ্যা বলত এবং তার নিকট হতে মিথ্যা রটানো হত। এমনকি তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত। অতএব
তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ আচরণ করা হতে থাকবে, যা করতে আপনি দেখেছেন।
আর
যে ব্যক্তির মস্তকে পাথর মেরে ঘায়েল করতে দেখেছেন, সে ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা’আলা
কুরআন শিক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু সে কুরআন হতে গাফিল হয়ে রাত্রে ঘুমাত এবং দিনেও তার
নির্দেশ মোতাবেক ’আমল করত না। সুতরাং তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ আচরণই করা হবে, যা
আপনি দেখেছেন।
আর
(আগুনের) তন্দুরে যাদেরকে দেখেছেন তারা হলো যিনাকার (নারী-পুরুষ)।
ঐ
ব্যক্তি যাকে (রক্তের) নহরে দেখেছেন, সে হলো সুদখোর।
ঐ
বৃদ্ধ ব্যক্তি যাকে একটি বৃক্ষের গোড়ায় উপবিষ্ট দেখেছেন, তিনি হলেন : ইবরাহীম (আ.)।
তাঁর চতুষ্পার্শ্বের শিশুরা হলো মানুষের সন্তান-সন্ততি।
আর
যে লোকটিকে অগ্নিকুন্ড প্রজ্জ্বলিত করতে দেখেছেন তা শহীদদের ঘর। আর আমি হলাম জিবরীল
(আ.) এবং ইনি হলেন মীকাঈল (আ.)।
এবার
আপনি মাথাটি উপরের দিকে তুলে দেখুন। তখন আমি মাথাটি তুলে দেখলাম, যেন আমার মাথার উপরে
মেঘের মতো কোন একটি জিনিস রয়েছে। অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, একের পর এক স্তবকবিশিষ্ট সাদা
মেঘের মতো কোন জিনিস দেখলাম। তাঁরা বললেনঃ তা আপনারই বাসস্থান। আমি বললামঃ আমাকে সুযোগ
দিন আমি আমার ঘরে প্রবেশ করি। তাঁরা বললেনঃ এখনো আপনার হায়াত বাকি আছে, যা আপনি এখনো
পূর্ণ করেননি। আপনার যখন নির্দিষ্ট হায়াত পূর্ণ হবে, তখন আপনি আপনার বাসস্থানে প্রবেশ
করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৬২১, সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৭, ৮৪৫, সুনান আততিরমিযী ৭০৪৮, ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১০৭৭৬, ‘ত্ববারানী’র
আল মু‘জামুল কাবীর ৬৮৪৫, ৮৪৫; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৮৩১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৭৫, আহমাদ ২০১১৫,
আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১৩) ছালাত বিনষ্ট করা পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্যঃ
ছালাত
ইসলামের প্রধান রুকন। এজন্য ছালাত ত্যাগকারী কবীরা গুনাহগার এবং অস্বীকারকারী কাফের।
আল্লাহ তা‘আলা ছালাত বিনষ্টককারী পূর্ববর্তী এক সম্প্রদায়ের কথা আলোচনা করে আমাদেরকে
সতর্ক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের পরে এলো তাদের (অপদার্থ) উত্তরসূরীরা।
তারা ছালাত বিনষ্ট করল ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। ফলে তারা অচিরেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত
হবে’। (সুরা মারিয়াম ১৯/৫৯)।
আবূ
সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে (সূরা মারিয়ামের ৫৯ আয়াত পাঠ করার
পর) বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘ষাট বছর পর কিছু (অপদার্থ) পরবর্তীগণ আসবে, তারা ছালাত
নষ্ট করবে ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হবে। সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। অতঃপর
এক জাতি আসবে, যারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী পার হবে না। (হৃদয়ে জায়গা
পাবে না।) কুরআন তিন ব্যক্তি পাঠ করে- মুমিন, মুনাফিক ও ফাজের (পাপী)। (হাকেম হা/৩৪১৬; আহমাদ
হা/১১৩৫৮; ছহীহাহ হা/৩০৩৪)।
(১৪) ছালাত ত্যাগ করা জাহান্নামে যাওয়ার বড় কারণঃ
যে
সকল পাপের কারণে মানুষ জাহান্নামে যাবে তন্মধ্যে ছালাত ত্যাগ করা অন্যতম। যার স্বীকিৃতি
স্বয়ং জাহান্নামীরাই দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কথোপকথন তুলে
ধরে বলেন, ‘কোন্ বস্তু তোমাদেরকে ‘সাক্বারে’ (জাহান্নামে) প্রবেশ করাল? তারা বলবে,
আমরা মুছল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’। (সুরা মুদ্দাছি্ছর
৭৪-৪২-৪৩)।
ইবনু
মাসঊদ (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা কোন কোন ঈমানের অধিকারীদের শাস্তি দিবেন। অতঃপর মুহাম্মাদ
(ছাঃ)-এর শাফা‘আতে তাদের বের করে আনবেন। জাহান্নামে কেবল তারাই থেকে যাবে যাদের কথা
আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে আলোচনা করেছেন- ‘কোন্ বস্তু তোমাদেরকে ‘সাক্বারে’ প্রবেশ করাল?
তারা বলবে, আমরা মুছল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’। (মুদ্দাসসির
৭৪-৪২-৪৩; শরহ মুশকিলুল আছার হা/৫৫৫৬, মুসনাদে আবী হানীফা হা/১২)।
(১৫) ছালাত ত্যাগকারীর ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের অবস্থান,
ইসলামে ছালাত পরিত্যাগকারীর কোন অবস্থান নেইঃ
যে
সকল আমলের মাধ্যমে মানুষের ঈমান টিকে থাকে তার মধ্যে সর্বাধিক বড় মাধ্যম হলো ছালাত।
কেউ ছালাত ত্যাগ করলে ইসলামে কোন অংশ থাকবে না বলে ছাহাবায়ে কেরাম সতর্ক করে দিয়েছেন।
মুমূর্ষু অবস্থায় থাকাকালীন ছালাতের কথা বলা হ’লে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন,
‘নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তির ইসলামে কোন অবস্থান নেই, যে ছালাত বিনষ্ট করে। অতঃপর ওমর (রাঃ)
ছালাত পড়লেন অথচ তার জখম হ’তে তখনও রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল’। (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৬৭৩; আবুবকর ইবনুল খাল্লাল, আস-সুনাহ
হা/১৩৮৮; মারওয়াযী, তা‘যীমু ক্বাদরিস ছালাত হা/৯২৯, জামে‘উল ঊছূল হা/৫২২৫)। হাদিসের
মানঃ সহিহ।
(১৬) ছালাত ত্যাগকারী ঈমানহীন মানুষঃ
ছালাতহীন
মানুষ ঈমানহীন মানুষের মত। কেউ ছালাত পরিত্যাগ করলে তার ঈমান থাকবে না। এজন্য ছালাত
ত্যাগ করা যাবে না। যেমন আছারে এসেছে, দ্দারদা (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত পড়ে না
তার ঈমান নেই। আর যে ব্যক্তি ওযূ করেনি তার ছালাত হবে না’। (ছহীহুত তারগীব হা/৫৭৫;
আস-সুন্নাহ হা/১৩৮৪)।
ইবনে
মাসউদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত ত্যাগ করে, তার দ্বীনই নেই’।
(তাবারানী কাবীর হা/৮৮৪৭-৪৮; ছহীহুত তারগবি হা/৫৭৪)।
মুছ‘আব
বিন সা‘দ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বললাম, হে পিতা! আল্লাহ বলেন, ‘যারা
তাদের ছালাত থেকে উদাসীন’। (সুরা মা‘ঊন ১০৭/৫)।
এই
আয়াত সম্পর্কে আপনি কি বলেন? আমাদের মধ্যে কে এমন আছে যার ছালাতে উদাসীনতা আসে না?
কে এমন আছে ছালাত পড়তে গিয়ে যার মনে বিভিন্ন কথা স্মরণ হয় না? তিনি বললেন, বিষয়টা এরকম
নয়। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছালাত নষ্ট করা। যারা আজে-বাজে (দুনিয়াবী) কাজে লিপ্ত
থেকে ছালাতের সময়কে নষ্ট করে দিবে’। (আবু ইয়া‘লা হা/৭০৪;
ছহীহুত তারগীব হা/৫৭৬; আল-আছারুছ ছহীহাহ হা/৩৭৭)। হাদিসের মানঃ হাসান।
জাবের
বিন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো ‘রাসূল (ছাঃ)-এর আমলে আমলসমূহের মধ্যে কোন আমলটি
আপনাদের নিকট ঈমান এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী হিসাবে বিবেচিত হ’ত? তিনি বললেন,
ছালাত’। (ইবনু বাত্ত্বা, আল-ইবানাতুল কুবরা হা/৮৭৬; মারূযী,
তা‘যীমু ক্বাদরিছ ছালাত হা/৮৯৩)।
যায়েদ
বিন ওয়াহাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা আমি হুযায়ফা (রাঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ
করলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার রুকূ‘-সিজদা পূর্ণ করছে না। সে ছালাত শেষ
করলে তিনি তাকে ডেকে বললেন, তুমি কতদিন থেকে এভাবে ছালাত আদায় কর? লোকটি বলল, চল্লিশ
বছর। হুযায়ফা (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি ছালাত আদায় করনি। শাক্বীক্ব বলেন, আমার মনে হয়
হুযায়ফা এ কথাও বলেছেন, যদি তুমি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ কর, তাহ’লে নবী করীম (ছাঃ)-কে
যে প্রকৃতির উপর আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন, তুমি তার বাইরে মৃত্যুবরণ করবে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৮৮৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮০৮, ৩৮৯, ৭৯১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৭৪৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭৫৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অনুরূপ
বর্ণনা রাসূল (ছাঃ) থেকেও এসেছে। আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল
(ছাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার ছালাতে পূর্ণভাবে রুকূ‘ করছে না এবং ঠকঠক করে (তাড়াতাড়ি)
সিজদা করছে। এ দেখে তিনি বললেন, এ ব্যক্তি যদি এই অবস্থায় মারা যায়, তাহ’লে তার মরণ
মুহাম্মাদী মিল্লাতের উপর হবে না। অতঃপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার রুকূ‘ সম্পূর্ণরূপে
করে না এবং ঠকাঠক (তাড়াহুড়া করে) সিজদা করে তার উদাহরণ সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মত,
যে একটি অথবা দু’টি খেজুর তো খায় অথচ তা তাকে মোটেই পরিতৃপ্ত করে না’। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব
৫২৮, তাবারানী কাবীর হা/৩৮৪, আবু ইয়ালা ৭১৮৪ ও ইবনে খুযায়মা ১/৩৩২)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
বিলাল (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি একদা দেখলেন একজন
লোক রুকূ‘-সিজদা পরিপূর্ণরূপে করছে না। তখন তিনি বললেন, এ লোক (এ অবস্থায়) মৃত্যুবরণ
করলে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ধর্মের বাইরে মৃত্যুবরণ করবে। (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৫৩০, ত্বাবারনী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ৩/১২৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
ছালাত
আদায় করার পরেও যখন ত্রুটি হওয়ার কারণে মিল্লাতে মুহাম্মাদীর উপর টিকে থাকা যাচ্ছে
না সেখানে ছালাত পরিত্যাগকারীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে তা সহজে বুঝা যায়।
আবু
দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ’যে ব্যক্তি নামায পড়ে না তার ঈমান নেই। আর যে
ব্যক্তি ওযু করেনি তার নামায হবে না।’ (ইবনে
আবদুল বার মাওকূফ সূত্রে বর্ণনা করেন)।
ইবনে
আবী শায়বার বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
“যে
ব্যক্তি নামায পরিত্যাগ করবে, সে কুফরী করবে।’’
মুহাম্মাদ
বিন নসর মারওয়াযী বলেনঃ আমি ইসহাককে বলতে শুনেছিঃ নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
থেকে সহীহ্ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, নামায পরিত্যাগকারী কাফের।
অনুরূপভাবে
নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে নিয়ে সকল বিদ্বানের মত হচ্ছে বিনা ওযরে ইচ্ছাকৃতভাবে
নামায পরিত্যাগকারী কাফের।
হাম্মাদ
বিন যায়দ থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি আইয়্যুব থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ নামায পরিত্যাগ
করা কুফরী, এতে কোন মতভেদ নেই। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব
৫৭৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু
হাযম (রহঃ) বলেন, ‘ছাহাবীদের মধ্যে ওমর, আব্দুর রহমান ইবনু আওফ, মু‘আয বিন জাবাল ও
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা এসেছে যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত একটি ফরয ছালাত পরিত্যাগ
করবে এমতাবস্থায় যে, ওয়াক্ত অতিবাহিত হয়ে গেল তাহ’লে সে কাফের মুরতাদ’। (মুহাল্লা ২/১৫)।
হাসান
বছরী (রহঃ) বলেন, ‘আমার নিকট এ মর্মে খবর পৌঁছেছে যে, রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবীরা বলতেন,
বান্দা এবং শিরককারীর মধ্যে পার্থক্য হ’ল এই যে, সে বিনা ওযরে ছালাত পরিত্যাগ করল’।
(আবু বকর ইবনু খাল্লাল, আস-সুন্নাহ হা/১৩৭২; ইবনু বাত্তাহ,
আল-ইবানাতুল কুবরা হা/৮৭৭)।
সূরা
মা‘আরিজ ২৩ আয়াতের তাফসীরে ইমাম কাতাদা (রহঃ) বলেন, ‘দানিয়াল (আঃ) উম্মতে মুহাম্মাদী
(ছাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, তারা ছালাত আদায় করে। যদি নূহের সম্প্রদায় ছালাত
আদায় করত তাহ’লে তারা ডুবে মরত না। আ‘দ সম্প্রদায় ছালাত আদায় করলে তাদের প্রতি ঝড়-তুফান
পাঠিয়ে ধ্বংস করা হ’ত না। ছামূদ সম্প্রদায় ছালাত আদায় করলে তাদেরকে গর্জন-ভূমিকম্প
পাকড়াও করত না। অতএব তোমাদের জন্য ছালাত আদায় করা আবশ্যক। কারণ এটি মুমিনদের জন্য সুন্দর
চরিত্রের অংশ’। (মুহাম্মাদ বিন নাছর মারূযী, তা‘যীমু কাদরিছ
ছালাত হা/৬৮)।
(১৭) সলাতে ইমামের পূর্বে কোন কাজ করাঃ
ইমামের
আগে রুকূ, সিজদা, ক্বিয়াম ইত্যাদি করা হারাম।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ)...আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সালাত আদায় করালেন। তিনি সালাত শেষ করে আমাদের
দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে বলেনঃ হে লোকেরা! আমি তোমাদের ইমাম। অতএব, তোমরা আমার আগে রুকু’-সাজদায়,
উঠা-বসা করবে না অতঃপর তিনি বললেনঃ সে সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আমি
যা দেখতে পাই, তোমরাও যদি তা দেখতে পেতে তবে তোমরা কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে। তারা
বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি দেখতে পান? তিনি বললেনঃ আমি জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে
পাই। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৮৪৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৪২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৮৪৩, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮৫৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
বরং
এ ব্যাপারে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোরতা আরোপ করেছেন।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ
যখন ইমামের পূর্বে মাথা উঠিয়ে ফেলে, তখন সে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তার মাথা
গাধার মাথায় পরিণত করে দিবেন, তার আকৃতি গাধার আকৃতি করে দেবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৯১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৮৪৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪২৭, সুনান আবূ দাঊদ
৬২৩, আহমাদ ১০৫৫১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৬৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৬৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih।
ইমামের
পিছনে সালাম ফিরানোর সঠিক সময় হলো- ইমামের সালাম ফিরানোর পরপরই সালাম ফিরানো।
আনাস
ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা
ঘোড়া হতে পড়ে গেলেন, এতে তিনি পায়ের ‘গোছায়’ অথবা (রাবী বলেছেন) ‘কাঁধে’ আঘাত পান।
তিনি তাঁর স্ত্রীদের হতে এক মাসের জন্যে পৃথক হয়ে থাকেন। তখন তিনি ঘরের উপরের কক্ষে
অবস্থান করেন যার সিঁড়ি ছিল খেজুর গাছের কান্ডের তৈরি। সাহাবীগণ তাঁকে দেখতে এলেন,
তিনি তাঁদের নিয়ে বসে সালাত আদায় করলেন, আর তাঁরা ছিলেন দাঁড়ানো। সালাম ফিরিয়ে তিনি
বললেনঃ ইমাম এজন্যে যে, মুক্তাদীরা তার অনুসরণ করবে। সুতরাং ইমাম তাকবীর বললে তোমরাও
তাকবীর বলবে, তিনি রুকূ করলে তোমরাও রুকূ করবে। তিনি সিজদা করলে তোমরাও সিজদা করবে।
ইমাম দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলে তোমরাও দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে। অতঃপর ঊনত্রিশ দিন পূর্ণ
হলে তিনি নেমে আসলেন। তখন লোকেরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো এক মাসের শপথ করেছিলেন।
তিনি বললেনঃ এ মাস ঊনত্রিশ দিনের। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৩৭৮, ৬৮৯, ৭৩২, ৭৩৩, ৮০৫, ১১১৪, ১৯১১, ২৪৬৯, ৫২০১, ৫২৮৯, ৬৬৮৪; সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৮২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪১৭, ৪১১, আহমাদ ১২০৭৫ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক
প্রকাশনীঃ ৩৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত
হাদীছে বুঝা যায় যে, সালাম ফিরানোর ক্ষেত্রে বেশি দেরি করা যাবে না। বরং ইমামের সালাম
ফিরানোর পরপরই ফিরাতে হবে।
(১৮) সলাত আদায়কারীর সামনে
দিয়ে অতিক্রম করাঃ
নি:সন্দেহে
নামাজি-ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুনাহের কাজ। কেননা, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
বুসর
ইবনু সা’ঈদ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, যায়দ ইবনু খালিদ (রাযি.) তাঁকে আবূ জুহায়ম (রাযি.)-এর
নিকট পাঠালেন, যেন তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন যে, মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীর সম্পর্কে
তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কী শুনেছেন। তখন আবূ জুহায়ম
(রাযি.) বললেনঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি মুসল্লীর
সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানতো এটা তার কত বড় অপরাধ, তাহলে সে মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম
করার চেয়ে চল্লিশ (দিন/মাস/বছর) দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম মনে করতো।
আবুন-নাযর
(রহ.) বলেনঃ আমার জানা নেই তিনি কি চল্লিশ দিন বা মাস কিংবা চল্লিশ বছর বলেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১০১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫০৭, আহমাদ ১৭৫৪৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৪৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে,
কেউ যদি নামাজীর বরাবর সামনে থাকে, তাহলে সেখান থেকে ডানে কিংবা বামে চলে যাওয়ার সুযোগ
আছে। এটা নামাজের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার অন্তর্ভুক্ত নয়। অবশ্য বিনা প্রয়োজনে এমন
করা ঠিক নয়।
অনুরূপভাবে
যদি নামাজরত ব্যক্তির সামনে ‘সুতরা’ থাকে তাহলে তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করা যাবে। যদিও
এটাও বিনা প্রয়োজনে করা ঠিক নয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
মূসা
ইবনু ত্বলহাহ্ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা সালাত পড়তাম, আর
চতুস্পদ জন্তু আমাদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করতো। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর নিকট উত্থাপন করা হলে তিনি বলেনঃ তোমাদের কারো সামনে শিবিকার খুঁটির
ন্যায় কিছু থাকলে তার সামনে দিয়ে যে কেউ অতিক্রম করলে তা তার কোন ক্ষতি করবে না। (সুনান ইবনু মাজাহ ৯৪০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৯৯৮, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৪৯৯, সুনান আততিরমিযী ৩৩৫, সুনান আবূ দাঊদ ৬৮৫, আহমাদ ১৩৯১, ১৩৯৬, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৯৯২, ইসলামিক সেন্টারঃ ১০০৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(১৯) যাকাত দানে বাধা দেয়া
বা যাকাত না দেয়াঃ
যারা
যাকাত আদায়ে উদাসীনতা দেখায় এবং কৃপণতা করে তাদের বিষয়ে কুরআনে করীমে কঠিন হুমকি এসেছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“আর
যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের
বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা
তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেওয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই যা তোমরা নিজদের
জন্য জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ কর’’। (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৫, ৩৬)।
যে
সম্পদের যাকাত দেওয়া হয় না, তা অবশ্যই তা গচ্ছিত মাল যদ্বারা তার মালিককে কিয়ামতের
দিন শাস্তি দেওয়া হবে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত
বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
সুওয়াইদ
ইবনু সাঈদ (রহঃ)....আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সোনা-রূপার অধিকারী যেসব লোক এ হাক (হক) (যাকাত) আদায় করে
না, কিয়ামতের দিন তার ঐ সোনা-রূপা দিয়ে তার জন্য আগুনের অনেক পাত তৈরি করা হবে, অতঃপর
তা জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে কপালদেশ ও পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ
দেয়া হবে। যখনই ঠাণ্ডা হয়ে আসবে পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে। এরূপ করা হবে এমন একদিন
যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। আর তার এরূপ শাস্তি লোকদের বিচার শেষ না হওয়া
পর্যন্ত চলতে থাকবে। অতঃপর তাদের কেউ পথ ধরবে জান্নাতের আর জাহান্নামের দিকে।
জিজ্ঞেস
করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! উটের (মালিকের) কী অবস্থা হবে? তিনি বললেন, যে উটের মালিক
তার উটের হাক (হক) আদায় করবে না তার উটের হকগুলোর মধ্যে পানি পানের তারিখে তার দুধ
দোহন করে অন্যদেরকে দান করাও একটি হাক (হক), যখন কিয়ামতের দিন আসবে তাকে এক সমতল ময়দানে
উপুড় করে ফেলা হবে। অতঃপর তার উটগুলো মোটাতাজা হয়ে আসবে। এর বাচ্চাগুলোও এদের অনুসরণ
করবে। এগুলো আপন আপন খুর দ্বারা তাকে পায়ে মাড়াতে থাকবে এবং মুখ দ্বারা কামড়াতে
থাকবে। এভাবে যখন একটি পশু তাকে অতিক্রম করবে অপরটি অগ্রসর হবে। সারাদিন তাকে এরূপ
শাস্তি দেয়া হবে। এ দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর বান্দাদের বিচার
শেষ হবে। তাদের কেউ জান্নাতের দিকে আর কেউ জাহান্নামের দিকে পথ ধরবে।
অতঃপর
জিজ্ঞেস করা হলো- হে আল্লাহর রসূল! গরু-ছাগলের (মালিকদের) কী অবস্থা হবে? উত্তরে তিনি
বললেন, যেসব গরু ছাগলের মালিক এর হাক (হক) আদায় করবে না কিয়ামতের দিন তাকে এক সমতল
ভূমিতে উপুড় করে ফেলে রাখা হবে। আর তার সে সব গরু ছাগল তাকে শিং দিয়ে আঘাত করতে থাকবে
এবং খুর দিয়ে মাড়াতে থাকবে। সেদিন তার একটি গরু বা ছাগলের শিং বাকা বা শিং ভাঙ্গা
থাকবে না এবং তাকে মাড়ানোর ব্যাপারে একটিও অনুপস্থিত দেখতে পাবে না। যখন এদের প্রথমটি
অতিক্রম করবে দ্বিতীয়টা এর পিছে পিছে এসে যাবে। সারাদিন তাকে এভাবে পিষা হবে। এ দিনের
পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর বান্দাদের বিচার শেষ হবে এবং তাদের কেউ
জান্নাতের দিকে আর কেউ জাহান্নামের দিকে পথ ধরবে।
অতঃপর
জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! ঘোড়ার (মালিকের) কী অবস্থা হবে? তিনি (উত্তরে)
বললেন, ঘোড়া তিন প্রকারের- (ক) যে ঘোড়া তার মালিকের জন্য গুনাহের কারণ হয়, (খ) যে
ঘোড়া তার মালিকের পক্ষে আবরণ স্বরূপ এবং (গ) যে ঘোড়া মালিকের জন্য সাওয়াবের কারণ
স্বরূপ। বস্তুতঃ সে ঘোড়াই তার মালিকের জন্য বোঝা বা গুনাহের কারণ হবে, যা সে লোক দেখানোর
জন্য অহংকার প্রকাশের জন্য এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার উদ্দেশে পোষে। আর যে
ব্যক্তি তার ঘোড়াকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য পোষে এবং এর পিঠে সওয়ার হওয়া
এবং খাবার ও ঘাস দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহর হাক (হক) ভুলে না, এ ঘোড়া তার দোষ-ত্রুটি
গোপন রাখার জন্য আবরণ হবে।
আর
যে ব্যক্তি মুসলিমদের সাহায্যের জন্য আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়া পোষে এবং কোন চারণভূমি
বা ঘাসের বাগানে লালন পালন করতে দেয় তার এ ঘোড়া তার জন্য সাওয়াবের কারণ হবে। তার
ঘোড়া চারণভূমি অথবা বাগানে যা কিছু খাবে তার সমপরিমাণ তার জন্য সাওয়াব লেখা হবে।
এমনকি এর গোবর ও প্রস্রাবে সাওয়াব লেখা হবে। আর যদি তা রশি ছিড়ে একটি বা দুটি মাঠেও
বিচরণ করে তাহলে তার পদচিহ্ন ও গোবরের সমপরিমাণ নেকী তার জন্য লেখা হবে। এছাড়া মালিক
যদি কোন নদীর তীরে নিয়ে যায়- আর সে নদী থেকে পানি পান করে অথচ তাকে পানি পান করানোর
ইচ্ছা মালিকের ছিল না তথাপি পানির পরিমাণ তার ’আমলনামায় সাওয়াব লেখা হবে।
অতঃপর
জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! গাধা সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, গাধা সম্পর্কে
কোন আয়াত আমার কাছে অবতীর্ণ হয়নি। তবে ব্যাপক অর্থবোধক এ আয়াতটি আমার উপর অবতীর্ণ
হয়েছে, যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ একটি ভাল কাজ করবে সে তার শুভ প্রতিফল পাবে আর যে এক
অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে সে তার মন্দ ফল ভোগ করবে (অর্থাৎ আলোচ্য আয়াত দ্বারা বুঝা
যায় যে, গাধার যাকাত দিলে তারও সাওয়াব পাওয়া যাবে)। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২১৮০-২১৮৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৮৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২১৫৯,
ইসলামীক সেন্টার ২১৬১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তারপর
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট, গরু ও ছাগলের মালিকদের বিষয়ে আলোচনা
করেন যারা তাদের পশুর যাকাত আদায় করে না। তিনি তাদের জানিয়ে দেন যে, নিশ্চয় তাদেরকে
কিয়ামতের দিন যাকাত না দেওয়ার কারণে শাস্তি দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে ঐ ধন-সম্পদের
যাকাত আদায় করেনি, সে ধন-সম্পদকে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন টাকমাথা সাপে পরিণত হবে।
এ সাপের দু’ চোখের উপর দু’টি কালো দাগ থাকবে (অর্থাৎ বিষাক্ত সাপ)। এরপর ঐ সাপ গলার
মালা হয়ে ব্যক্তির দু’ চোয়াল আঁকড়ে ধরে বলবে, আমিই তোমার সম্পদ, আমি তোমার সংরক্ষিত
ধন-সম্পদ। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, অর্থাৎ ’’যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে
না করে এটা তাদের জন্য উত্তম বরং তা তাদের জন্য মন্দ। কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন অচিরেই
যা নিয়ে তারা কৃপণতা করছে তা তাদের গলার বেড়ী করে পরিয়ে দেয়া হবে’’- (সূরাহ্ আ-লি
’ইমরান ৩: ১৮০) আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ১১৭৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৪০৩, ৪৫৬৫, ৪৬৫৯, ৬৯৫৭, আহমাদ ৮৬৬১,
সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৩১১৩, সহীহ আত্ তারগীব ৭৬১, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫৬০, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ১৩১২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩১৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তারপর
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার বাণী তিলাওয়াত করেন। আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
“আর
আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন
ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা
কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও যমীনের
উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত”। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮০)।
(২০) সিয়াম পরিত্যাগ করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববতীদেরকে
দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারত”। (সূরা
আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৮৩)।
ইবন
’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই
এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য
প্রদান করা। ২. সালাত কায়িম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমাযানের
সিয়ামব্রত পালন করা। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮, ৪৫১৪; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬, আহমাদ ৬০২২, ৬৩০৯,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
শরিয়ত
অনুমোদিত কারণ ছাড়া রোজা ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। কেননা আল্লাহর নির্দেশ হলো, “রমজান
মাস, এতে মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী কোরআন
অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন
করে। কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করবে”। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।
আবূ
উমামাহ বাহেলী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শুনেছি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু
আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, ‘‘একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম; এমন সময় (স্বপ্নে) আমার নিকট
দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার উভয় বাহুর ঊর্ধ্বাংশে ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের
নিকট উপস্থিত করলেন এবং বললেন, ‘আপনি এই পাহাড়ে চড়ুন।’ আমি বললাম, ‘এ পাহাড়ে চড়তে আমি
অক্ষম।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা আপনার জন্য চড়া সহজ করে দেব।’ সুতরাং আমি চড়ে গেলাম। অবশেষে
যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেশ কিছু চিৎকার-ধ্বনি শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা
করলাম ‘এ চিৎকার-ধ্বনি কাদের?’ তাঁরা বললেন, ‘এ হল জাহান্নামবাসীদের চীৎকার-ধ্বনি।’
পুনরায় তাঁরা আমাকে নিয়ে চলতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলাম একদল লোক তাদের পায়ের গোড়ালির উপর
মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে, তাদের কশগুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কশ বেয়ে
রক্তও ঝরছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমি বললাম, ‘ওরা কারা?’ তাঁরা
বললেন, ‘ওরা হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত---।’’ (ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিববান ৭৪৯১, বাইহাকী ৪/২১৬, হাকেম, মুস্তাদ্রাক
১/৪৩০, সহীহ তারগীব, আলবানী ৯৯১নং)।
‘ওরা
হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত---।’ রোযা রাখার পরেও তাদের
যদি ঐ অবস্থা হয়, তাহলে যারা পূর্ণ দিন মূলেই রোযা রাখে না, তাদের অবস্থা এবং যারা
পূর্ণ মাসই রোযা রাখে না, তাদের অবস্থা যে কত করুণ, কত সঙ্গিন তা অনুমেয়!
আবূ
হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন অজুহাত বা রোগ ছাড়া রামাযান মাসের একটি রোযা ভেঙ্গে ফেলে,
তার পুরো জিন্দেগীর রোযা দিয়েও এর ক্ষতিপূরণ হবে না। যদিও সে জীবনভর রোযা রাখে। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৭২৩, সহিহ ইবনু মাজাহ ১৬৭২)।
রোজা
রাখার পুরস্কারঃ
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি
লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ
ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমাযানে সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের
সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
১৯০১, ৩৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৬৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৭৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(২১) হাজ্জ পরিত্যাগ করাঃ
ইবন
’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই
এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য
প্রদান করা। ২. সালাত কায়িম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমাযানের
সিয়ামব্রত পালন করা। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮, ৪৫১৪; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬, আহমাদ ৬০২২, ৬৩০৯,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করা একটি মারাত্মক অপরাধঃ
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘আল্লাহ্
তা‘আলার জন্যই উক্ত ঘরের হজ্জ করা ওদের উপর বাধ্যতামূলক যারা এ ঘরে পৌঁছুতে সক্ষম।
যে ব্যক্তি (হজ্জ না করে) আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কুফরি করলো তার জানা উচিৎ যে, নিশ্চয়ই
আল্লাহ্ তা‘আলা সর্ব জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী’’। (সুরা
আ’লি ইমরান : ৯৭)।
(২২) আল্লাহকে স্মরণ না করাঃ
আল্লাহর
স্মরণ (জিকির) থেকে বিরত থাকার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই
ভোগ করতে হয়। এর ফলে মানুষ শয়তানের সঙ্গী হয়, হৃদয়ে অশান্তি ও সংকীর্ণতা তৈরি হয়, এবং
কবরে ও হাশরে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। এটি কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী গোনাহের কাজ।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
আপনি আপনার রবকে নিজ মনে স্মরণ করুন(১) সবিনয়ে, সশংকচিত্তে ও অনুচ্চস্বরে, সকালে ও
সন্ধ্যায়। আর উদাসীনদের অন্তভুক্ত হবেন না”। (সূরা আল
আ‘রাফ ৭ : ২০৫)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে সমস্ত
লোক কোন দরবারে বসেছে অথচ তারা আল্লাহ তা’আলার যিকর করেনি এবং তাদের নবীর প্রতি দরূদও
পড়েনি, তারা বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হবে। আল্লাহ তা’আলা চাইলে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন
কিংবা মাফও করতে পারেন। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৩৮০, সহীহাহ ৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তাআলা বলেন,
“আর
যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে আর আমি তাকে কেয়ামতের
দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো”। (সুরা ত্বহা: আয়াত ১২০)।
(ঘ) শাসন-প্রশাসন ও লেনদেনের ক্ষেত্রে কাবীরা গুনাহঃ
(২৩) আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান
ছাড়া শাসন/বিচার করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তোমরা
সকলইে এখান হতে নেমে পড়। অতঃপর তোমাদের কাছে আমার পক্ষ হতে জীবন বিধান (কুরআন) যেতে
থাকবে। পরন্তু যারা আমার জীবন বিধান (কুরআন) অনুসারে চলবে, তাঁদরে ভয় ও চিন্তার কোনো
কারণ থাকবে না। (অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তিতে তাঁরা আবার অনন্ত সুখের আধার এ বেহেশতেই
ফিরে আসবে)। আর যারা তা অস্বীকার করে আমার নিদর্শনসমুহকে মিথ্যে সাব্যস্ত করবে, তাঁরা
হবে জাহান্নামের অধিবাসী এবং সেখানে তাঁরা অনন্তকাল থাকবে”। (সূরা বাকারা, আয়াত নং ৩৮-৩৯)।
আল্লাহ
বলেন,
“নিশ্চয়ই
আমি তোমার প্রতি পূর্ণ কুরআন পরম সত্যতার সাথে এ জন্যেই নাযিল করেছি যে, তুমি সে অনুযায়ী
মানুষের উপর আল্লাহর প্রদর্শিত পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং বিচার ফায়সালা করবে।
(কুরআনকে যারা এ কাজে ব্যবহার করতে চায় নি তারা এ মহান আমানতের খিয়ানত করে) তুমি এ
খিয়ানতকারীদের সাহায্য পক্ষ সমর্থনকারী হয়ো না”। (সুরা
আন নিসা: ১০৫)।
আল্লাহ
বলেন,
“আল্লাহর
বিধান অনুযায়ী মানুষের মধ্যে ফায়সালা করো, তাদের মনের খেয়াল খুশী ও ধারনা বাসনা অনুসরন
করো না”। (সুরা আল মায়েদা: ৪৯)।
আল্লাহ
বলেন,
“তুমি
কি জান না যে, আকাশ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর”। (সুরা আল
বাকারাঃ ১০৭)।
আল্লাহ
বলেন,
“হুকুম
বা বিধান একমাত্র আল্লাহরই”। (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০)।
আল্লাহ
বলেন,
“আমি
আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি সহকারে পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব (বিধি-বিধান)
ও মানদণ্ড পাঠিয়েছি যাতে লোকেরা ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর আমি লৌহ অবতীর্ণ
করেছি যাতে প্রচণ্ড শক্তি ও মানবমণ্ডলীর জন্য বিবিধ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর এর উদ্দেশ্য
হচ্ছে, আল্লাহ্ জেনে নেবেন, কে গায়েবকে আশ্রয় করে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে।
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ মহাশক্তিধর ও মহা পরাক্রান্ত।” (সূরা
হাদীদ: ২৫)।
মানবরচিত
আইন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করা বা কোনো অপরাধের শাস্তির রায় দেয়া মুসলিম বিচারকদের জন্যে
সম্পূর্ন নিষেধ। যারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইনে বিচারের রায় দেয় তারা মুসলমান
হয়েও কাফের, জালেম ও ফাসেক। এরা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ বলেন,
(ক)
“আর আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার-ফয়সালা ও শাসনকার্য পরিচালনা করেনি,তারা
কাফের।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৪)।
(খ)
“আর আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করে নি তারা
জালেম।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৫)।
(গ)
“আর আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করে নি তারা
ফাসেক (পাপাচারী)।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৭)।
(ঘ)
“(হে নবী!) অতএব,আল্লাহ্ তায়ালা যা নাযিল করেছেন,তার ভিত্তিতে আপনি তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা
করুন এবং আপনার নিকট যে সত্যের আগমন ঘটেছে,তার পরিবর্তে তাদের প্রবৃত্তির (দাবীর) অনুসরণ
করবেন না।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৮)।
(ঙ)
“তারা কি জাহেলীয়াতের (মূর্খতাজাত) বিচার-ফয়সালা পেতে চায়? প্রত্যয়ের অধিকারী লোকদের
জন্য বিচার-ফয়সালা প্রদানের প্রশ্নে আল্লাহর চেয়ে কে অধিকতর উত্তম হতে পারে?” (সূরা মায়েদাহ্: ৫০)।
(চ)
“হে রাসূল! তাদের বলে দিন:) আর তোমরা এ বিষয়ে (আল্লাহর অভিভাবকত্ব সম্বন্ধে) যে মতভেদই
করো না কেনো, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছেই সোপর্দ। তিনিই আল্লাহ্-আমার প্রতিপালক; আমি
তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তাঁরই অভিমুখী হই।” (সূরা শুরা:
১০)।
(ছ)
“হে ঈমানদারগণ! ন্যায়কে আশ্রয় করে আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসাবে দণ্ডায়মান হয়ে যাও এমনকি
যদি তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও ঘনিষ্ঠ জনদের বিরুদ্ধেও হয়; সে ব্যক্তি ধনীই
হোক বা গরীব হোক তাদের উভয়ের (বিরোধে লিপ্ত পক্ষদ্বয়ের) জন্য আল্লাহ্ই অধিকতর ঘনিষ্ঠ।
অতএব,ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি বজায় রাখার ব্যাপারে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর
তোমরা যদি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল বা পাশ কাটিয়ে যাও,তা হলে (জেনে রাখ) তোমরা যা কিছু
করছ অবশ্যই আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে অবহিত।” (সূরা নিসা: ১৩৫)।
(জ)
“(হে নবী!) অবশ্যই আমি সত্য সহকারে আপনার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আল্লাহ্ আপনাকে
যা প্রদর্শন করেছেন তার সাহায্যে লোকদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করেন। আর আপনি খেয়ানতকারীদের
(অন্যায়কারীদের) সপক্ষে বিতর্ককারী হবেন না।” (সূরা নিসা:
১০৫)।
(ঝ)
“হে দাউদ! নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে ধরণির বুকে (আমার) প্রতিনিধি বানিয়েছি, অতএব, সত্যতা
সহকারে লোকদের মাঝে বিচার-ফয়সালা কর।” (সূরা সাদ: ২৬)।
(ঞ)
নবি (সাঃ) বলেন, আল্লাহর কুরআন- আল্লাহর দেয়া বিধানই বাঁচবার একমাত্র উপায়। তাতে অতীতের
জাতিগুলোর ইতিহাস আছে, ভবিষ্যতের মানব বংশের
অবস্থা ও ঘটনাবলী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে এবং বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে তোমাদের
পারস্পরিক বিষয় সম্পর্কীয় রাষ্ট্রীয় আইন কানুন ও তাতে রয়েছে। বস্তুতঃ উহা এক চূড়ান্ত
বিধান, উহা কোন বাজে জিনিস নহে। (সুনান আততিরমিজি)।
(ট)
রাসুল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি এই বিধান অনুসারে জীবন যাপন করবে, সে উহার প্রতিফল লাভ
করবে। যে উহার অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তার শাসন সুবিচার পূর্ণ হবে এবং যে উহাকে
দৃঢ় রুপে আকড়িয়ে ধরবে সে সঠিক এবং সত্যিকার কল্যাণের পথে পরিচালিত হতে পারবে।
আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহই হলেন বিধান-দাতা, আর তাঁর নিকট
থেকেই বিধান নিতে হবে”। (সুনান আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪৯৫৫;
সুনান আননাসাঈ, (৮/২২৬); বায়হাকি (১০/১৪৫)। হাদিসের মান সহিহ।
(ঠ)
হাসান বাসরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মা’কিল ইবনু ইয়াসারের কাছে তার সেবা-শুশ্রূষার
জন্য আসলাম। এ সময় ’উবাইদুল্লাহ্ প্রবেশ করল। তখন মালিক (রাঃ) বললেন, আমি তোমাকে এমন
একটি হাদীস বর্ণনা করে শোনাব, যা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করল
এবং তার মৃত্যু হল এ হালতে যে, সে ছিল খিয়ানাতকারী, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাত
হারাম করে দেবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫১,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৫৯, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৪২, আহমাদ ২০১৩১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬৬)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২৪) শাসক কর্তৃক নাগরিকদের
ধোঁকাদান বা নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“শুধু
তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে যারা মানুষের উপর যুলুম করে এবং যমীনে অন্যায়ভাবে
বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদেরই জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”। (সূরা আশ্ শূরা ৪২ : ৪২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
দাউদ! আমরা আপনাকে যমীনে খলীফা বানিয়েছি, অতএব আপনি লোকদের মধ্যে সুবিচার করুন এবং
খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না, কেননা এটা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয়
যারা আল্লাহর পথ থেকে ভ্ৰষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচার দিনকে
ভুলে আছে”। (সূরা সোয়াদ ৩৮ : ২৬)।
জনগণের
সাথে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করার পরিণামঃ
নেতাগণ
জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ না করে ধোঁকা দিয়ে থাকে। নেতাদের ধোঁকাবাজির কারণে
তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। ধোঁকাবাজিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
ইবনু
’উমার ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।
আর
ইমাম মুসলিম (রহঃ) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, আর যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে বা ধোঁকা দেয়, সে আমাদের
দলভুক্ত নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫২০, সহিহ বুখারী
৭০৭, সহিহ মুসলিম ১০১, সুনান আননাসায়ী ৪১০০, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৯, সুনান ইবনু মাজাহ
২৫৭৫, আহমাদ ৯৩৯৬, সহীহ আল জামি‘ ৬২১৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কেউ
কাউকে ধোঁকা দিলে সেই ধোঁকাবাজের আমলনামায় একটি করে পাপ লেখা হয়।
আব্দুল্লাহ
ইবনু আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে বসা অবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে দিবো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেনঃ তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা
করছে? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ
যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে এ কারণে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ
হতো। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯৯১, মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৪৮৮২, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৪৮, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৯৪৩, মুসান্নাফ
ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৬০৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
ইবনু
উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলিত (খাড়া) করা হবে,
আর বলা হবে- এটা অমুকের পুত্র, অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৫, ৩৭২৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬১৭৮, ৩১৮৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪৪২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৫,
সুনান আবূ দাঊদ ২৭৫৬, সুনান আততিরমিযী ১৫৮১, আহমাদ ৪৬৪৮, সহীহ আল জামি‘ ১৬৮৩, সহীহ
আত্ তারগীব ৩০০১, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৭৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবূ
সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের
দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের নিতম্বের সাথে তার জন্য (অপরাধ অনুপাতে) একটা করে পতাকা
রাখা হবে।
অপর
বর্ণনাতে আছে, কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ
অনুপাতে পতাকা উত্তোলিত হবে। সাবধান! রাষ্ট্র প্রধানের বিশ্বাসঘাতকতাই হবে সর্ববৃহৎ
(অপরাধ)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৭, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৪৪৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৮, সুনান আততিরমিযী ২১৯১, আহমাদ ১১৩০৩,
সহীহাহ্ ১৬৯০, সহীহ আল জামি‘ ৫১৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জনগণের সাথে যারা ধোঁকাবাজি করে তারা জান্নাতে যাবে নাঃ
জান্নাত
হচ্ছে মুমিনের জন্য। ঈমানদারের জন্য। সচ্চরিত্র মানুষের জন্য। জান্নাতে চিরস্থায়ী সুখময়
জীবন উপহার দেওয়া হবে মুমিনকে। ধোঁকাবাজ জান্নাতে যেতে পারবে না। তার জন্য জান্নাতের
দরজা বন্ধ। ধোঁকার হৃদয় জান্নাতে প্রবেশের ন্যূনতম যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। আবু বকর সিদ্দিক
(রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো কৃপণ, ছদ্মবেশধারী ধোঁকাবাজ, খিয়ানতকারী ও অসচ্চরিত্র
ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না। প্রথম যারা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়বে, তারা হবে দাস-দাসী,
যদি তারা আল্লাহ ও তাদের মনিবের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩২)।
হাসান
বাসরী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, উবাইদুল্লাহ্ ইবনু যিয়াদ (রহ.) মাকিল ইবনু ইয়াসারের মৃত্যুশয্যায়
তাকে দেখতে গেলেন। তখন মাকিল (রাঃ) তাকে বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করছি
যা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি যে, কোন বান্দাকে যদি আল্লাহ্ জনগণের নেতৃত্ব প্রদান করেন,
আর সে (প্রজাদের) কল্যাণ কামনার সঙ্গে তাদের তত্ত্বাবধান (কল্যাণ কামনা) না করে তথা
খিয়ানাতকারী বা প্রতারক হিসেবে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫০, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ২৫৯-২৬২, ৪৬২৩-৪৬২৫, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৪২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(২৫) অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তোমরা
নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ
জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিও না”। (সুরা আল বাকারা ১৮৮)।
আল্লাহ
তায়ালা আরো বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; কিন্তু তোমরা পরস্পর রাযী
হয়ে(৩) ব্যবসা করা বৈধ এবং নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম
দয়ালু”। (সুরা আন নিসা ২৯)।
অন্যের
সম্পদ দখল করা আর জাহান্নামের টিকিট বুকিং দেয়া এক জিনিস।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ প্রত্যেক
মুসলিমের জান-মাল ও মান-সম্মানে হস্তক্ষেপ করা অপর মুসলিমের জন্য হারাম। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৩৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাসলামাহ ইবনু কা’নাব (রহঃ).....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পর
ধোকাবাজি করো না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশে অগোচরে
শত্রুতা করো না এবং একে অন্যের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয়ের চেষ্টা করবে না।
তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার
উপর অত্যাচার করবে না, তাকে অপদস্ত করবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না। তাকওয়া এখানে,
এ কথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার তার বক্ষের প্রতি ইঙ্গিত
করলেন। একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় জ্ঞান করে।
কোন মুসলিমের উপর প্রত্যেক মুসলিমের জান-মাল ও ইযযত-আবরু হারাম। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৩৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৬৪,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩০৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তাঁর এবং কয়েকজন লোকের মধ্যে একটি
বিবাদ ছিল। ‘আয়িশাহ (রাযি.)-এর কাছে উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন, হে আবূ সালামাহ! জমির
ব্যাপারে সতর্ক থাক। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি
এক বিঘত জমি অন্যায়ভাবে নিয়ে নেয়, (কিয়ামতের দিন) এর সাত তবক জমি তার গলায় লটকিয়ে দেয়া
হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪৫৩, ৩১৯৫, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ২২৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৯১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্য
সাধারণ গুনাহ করলে বা আল্লাহর হকের সাথে জড়িত কোনো হুকুম লঙ্ঘন করলে এত বড় সমস্যা নেই
যত বড় সমস্যা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করলে রয়েছে। কারণ এটি বান্দার হক। আর বান্দার
হক নষ্ট করলে সেটি আল্লাহ নিজে মাফ করবেন না। কিন্তু আল্লাহর হক নষ্ট করলে চাইলে আল্লাহ
মাফও করতে পারেন, আবার শাস্তিও দিতে পারেন।
হক
দুই প্রকারঃ
(এক) আল্লাহর হকঃ
আল্লাহর
হক নষ্ট করলে আল্লাহ চাইলে শিরক ব্যতীত অন্য যে কোনো গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন বলে আমাদের
বলেছেন! নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তার সঙ্গে কাউকে শরীক করে! এছাড়া যাকে
ইচ্ছা, ক্ষমা করেন! যে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়! (সূরা নিসা: ১১৬)।
তবে
এই আয়াতে উল্লেখিত গুনাহ হচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত যেগুলো আল্লাহর হক সেগুলো পালন
না করার গুনাহ!
(দুই) বান্দার হকঃ
বান্দার
হক নষ্ট করার গুনাহ ক্ষমা করার এখতিয়ার আল্লাহ নিজ হাতে রাখেননি! যেমন, আমি যদি একজনকে
ধোঁকা দিয়ে ১ টি টাকাও নিয়ে নিই, কোনো কথা বা গালির সাহায্যে মনে কষ্ট দেই, তবে একমাত্র
সেই লোক (যার হক নষ্ট করলাম) সে বাদে আর কেউ ক্ষমা করতে পারবে না!
বান্দার
হকের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন,
আবদুল্লাহ্
ইবনু ’আমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিম
(প্রকৃত) সেই, যার যবান ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে। আর (প্রকৃত) মুহাজির সেই,
আল্লাহ্ যা নিষেধ করেছেন তা যে পরিত্যাগ করে। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৪৮৪, ১০, আধুনিক প্রকাশনী ৬০৩৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬০৪০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্যত্র
রাসূল (সা:) বলেন,
একজন
মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে! এক মুসলিমের
রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম! (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৩৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩০৯,
ইসলামিক সেন্টার ৬৩৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মহান
আল্লাহ, সুরা হুজুরাত-এর পরপর তিনটি আয়াতে হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক সম্পর্কে বিশদ
আলোচনা করেছেন!
(২৬) সূদ খাওয়াঃ
বর্তমানে
আমাদের এই সমাজটা সুদী কারবারী অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। তথা কেন্দ্রিয়
ব্যাংক থেকে শুরু করে সকল ব্যাংক, সকল এনজিও, সকল সমিতি, সকল লাইফ ইন্সুরেন্সসহ সকল
অনুরুপ প্রতিষ্ঠানে সুদভিত্তিক অর্থ লেনদেন করা হয়। এছাড়া প্রতিটি অঞ্চলে দাদন ব্যবসা
প্রথা চালূ আছে। যারা চড়া সুদে এই কারবারী করে থাকে। সম্প্রতি কিছু ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত
হয়েছে যারা সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে বের হয়ে ইসলামি প্রথা মোতাবেক লেনদেন করার প্রচেষ্টা
চালিয়ে আসছে। এছাড়া অন্যান্য সুদী ব্যাংকে আপনার যদি একটি একাউন্ট থাকে আর একাউন্টে
টাকা জমা থাকলে বছর শেষে পাঁচ পয়সা হলেও সুদের অংশ আপনার একাউন্টে জমা হচ্ছে। যতো চাকরিজীবি
আছে তাদের বেতন হয় ব্যাংকের মাধ্যমে, তারাও সুদের অংশ উত্তোলন করছে। এছাড়া পেনশনে আসার
পর ৯৮% চাকরিজীবিই যে প্রতিষ্ঠান বেশী সুদ দেয় সেখানে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখে
মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিক সুদের অংশ তুলে সংসার চালায়। আবার এদিকে লম্বা তসবিহ হাতে,
মাথায় টুপি পড়ে আল্লাহু আল্লাহ জিকির করে, অনেকে হজ্জে যায় তথা উপরি উপরি পাক্কা ঈমানদার
সেজে সমাজে ঘুরে বেড়ায়। ইচ্ছে না থাকলেও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার কারণে জনগণ সুদীকারবারীর
সাথে জড়িয়ে পড়েছে। ইচ্ছে অনিচ্ছে যাই থাকুক না কেনো সুদ প্রথা যেহেতু চালু আছে তাই
সরকার যেমন দায়ী তেমনি আপনি ভোটার হিসেবে আরো বেশী দায়ী। কারণ আপনার সমর্থন নিয়েই সরকার
এই সুদী সমাজ ব্যবস্থা চালু করেছে। আসুন আল্লাহ
তায়ালা ও রাসুল সাঃ সুদ সম্পর্কে কী বলেন তা জেনে নেই।
আল্লাহ
তা‘আলা সূদখোর ব্যতীত আর কারো বিরুদ্ধে স্বয়ং যুদ্ধের ঘোষণা দেননি। তিনি বলেন,
“হে
বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর তাকাওয়া অবলম্বন কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ
কর যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যদি তোমরা তা না কর, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ
থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শোন” । (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৮-২৭৯)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা
সফলকাম হতে পার”। (সূরা আ-লি ইমরা-ন ৩ : ১৩০-১৩১)।
আল্লাহর
নিকট সূদ খাওয়া যে কত মারাত্মক অপরাধ তা অনুধাবনের জন্য উক্ত আয়াতদ্বয়ই যথেষ্ট। সূদবৃত্তি
দারিদ্র্য, মন্দা ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি, বহু কোম্পানী
ও প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়াত্ব ইত্যাদির ন্যায় কত যে জঘন্য ক্ষতি ও ধ্বংসের দিকে ব্যক্তি,
সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঠেলে দিচ্ছে তা পর্যবেক্ষক মাত্রই অনুধাবন করতে সক্ষম। প্রতিদিনের
ঘাম ঝরানো শ্রমের বিনিময়ে যা অর্জিত হয়, সূদের অতলগহ্বর পূরণেই তা নিঃশেষ হয়ে যায়।
সূদের ফলে সমাজে একটি বিশেষ শ্রেণির উদ্ভব হয়। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে ব্যাপক সম্পদ
পুঞ্জীভূত হয়ে পড়ে। সম্ভবতঃ এসব কারণেই আল্লাহ তা‘আলা সূদীকারবারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
ঘোষণা করেছেন। সূদী কারবারে মূল দু’পক্ষ, মধ্যস্থতাকারী, সহযোগিতাকারী ইত্যাকার যারাই
এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তারা সবাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানীতে
অভিশপ্ত।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
জাবির
(রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন, যে ব্যক্তি সুদ খায়, যে সুদ দেয়, যে সুদের কাগজপত্র
লিখে, যে দু’জন সুদের সাক্ষী হয় তাদের সকলের ওপর। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
আরো বলেছেন, (গুনাহের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে) তারা সকলেই সমান। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৮০৭, সুনান ইবনু মাজাহ ২২৭৭, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯৮৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৯৭, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৩৩৩, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২০৬, সহীহ আত্ তারগীব ১৮৪৭, আহমাদ ৩৭২৯, ৩৭৯৯,
৩৮৭১, ৪০৭৯, ৪২৭১, ৪৩১৫, ৪৩৮৯, ৪৪১৪, দারেমী ২৫৩৫, ইরওয়া ৫/১৮৪, আত-তালীকুর রাগীব ৩/৪৯,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৯৪৭, ইসলামিক সেন্টার ৩৯৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ
কারণেই সূদ লিপিবদ্ধ করা, এর আদান-প্রদানে সহায়তা করা, সূদী দ্রব্য গচ্ছিত রাখা ও এর
পাহারাদারীর কাজে নিযুক্ত হওয়া জায়েয নেই। মোটকথা, সূদের সূদের কাজে অংশগ্রহণ ও যে
কোনোভাবে এর সাহায্য-সহযোগিতা করা হারাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মহাঅপরাধের
কদর্যতা ফুটিয়ে তুলতে বড়ই আগ্রহী ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ সুদের গুনাহর সত্তরটি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্তর হলো আপন মাকে
বিবাহ (যেনা) করা। (সুনান ইবনু মাজাহ ২২৭৪, আত-তালীকুর
রাগীব ৩/৫০, ৫১, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ২২৫৯; সহীহুল জামে‘, হাদীস নং ৩৫৩৯)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
আবদুল্লাহ
(রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সুদের পাপের তিয়াত্তরটি
স্তর রয়েছে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২২৭৫, ইবনুস সালাম এর তাখরিজুল
ঈমান ৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ
ইবন হানযালা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন,
“জেনেশুনে
কোনো লোকের সূদের এক টাকা ভক্ষণ করা ৩৬ বার ব্যভিচার করা থেকেও কঠিন”। (মুসনাদে আহমদ ৫/২২৫; সহীহ আল-জামে‘ ৩৩৭৫)।
সূদ
ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সর্বদা হারাম। সবাইকে তা পরিহার করতে হবে। কত ধনিক-বণিক
যে এ সূদের কারণে দেউলিয়া হয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সূদের সর্বনিম্ন ক্ষতি হলো,
মালের বরকত উঠে যাবে, পরিমাণে তা যতই স্ফীত হউক না কেন।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“সূদের
দ্বারা সম্পদ যতই বৃদ্ধি পাক না কেন তার শেষ পরিণতি হলো নিঃস্বতা”। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ২২৬২)।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ইবনে
মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সূদের
দ্বারা সম্পদ বাড়িয়েছে, পরিণামে তার সম্পদ হ্রাসপ্রাপ্ত হবেই। (সুনান ইবনু মাজাহ ২২৭৯, আত-তালীক ৩/৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
সূদের
হার কমই হোক আর চড়াই হোক সবই হারাম। যেমন করে শয়তান দুনিয়াতে তার স্পর্শে কাউকে পাগল
করে দেয়, তেমনি সূদখোর পাগল হয়ে হাশরের ময়দানে উত্থিত হবে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“যারা
সুদ খায় তারা তার ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে(৩)। এটা এ জন্য
যে তারা বলে(৪), ‘ক্রয়-বিক্রয় তো সুদেরই মত। অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে
হারাম করেছেন। অতএব যার নিকট তার রব-এর পক্ষ হতে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে
যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে
তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে”। (সূরা
আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫)।
যদিও
সূদের লেনদেন গুরুতর অন্যায় তবুও মহান রাব্বুল আলামীন দয়াপরবশ হয়ে বান্দাকে তা থেকে
তওবার উপায় বলে দিয়েছেন।
তিনি
বলেন,
“যদি
তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা তোমাদের মূলধন ফিরে পাবে। তোমরা না অত্যাচার করবে, আর না
অত্যাচারিত হবে”। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৯)।
মুমিনের
অন্তরে সূদের প্রতি ঘৃণা এবং তার খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে তীব্র অনুভূতি থাকা একান্ত
আবশ্যক। এমনকি যারা টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সম্পদ চুরি হয়ে যাওয়া কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার
ভয়ে সূদী ব্যাংকে জমা রাখে, তাদের মধ্যেও নিতান্ত দায়েপড়া ব্যক্তির ন্যায় অনুভূতি থাকতে
হবে, যেন তারা মৃত জীব ভক্ষণ কিংবা তার থেকেও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। তাই
তারা সব সময় আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং সূদী ব্যাংকের বিকল্প সূদহীন ভালো
কোনো উপায় অবলম্বনের চেষ্টা করবে। তাদের আমানতের বিপরীতে সূদী ব্যাংকের নিকট সূদ দাবী
করা জায়েয নেই। বরং যে কোনো উপায়ে তার থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টা করবে, তা (ছওয়াবের
নিয়তে) দান করবে না। কেননা আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র বস্তু ছাড়া তিনি দানের স্বীকৃতি দেন
না। নিজের কোনো কাজে সূদের অর্থ ব্যয় করা যাবে না। না পানাহারে, না পরিধেয়ে, না সওয়ারীতে,
না বাড়ী-ঘর তৈরীতে, না পুত্র-পরিজন, স্বামী-স্ত্রী, মাতা-পিতার ভরণ-পোষণে, না যাকাত
আদায়ে, না ট্যাক্স পরিশোধে, না নিজের ওপর অন্যায়ভাবে আরোপিত অর্থ পরিশোধে। সূদের অর্থ
কেবল আল্লাহর শাস্তির ভয়ে দায় মুক্তির জন্য এমনিতেই কাউকে দিয়ে দিতে হবে।
কোনো
শাসক বা বিচারকের নিকট সুপারিশের পর কোনো হাদিয়া (উপহার) গ্রহণ করলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত
হবে।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
আবূ
উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো শাসক বা বিচারকের নিকট সুপারিশ করে, আর সে সুপারিশ স্বরূপ
তার নিকট কোনো হাদিয়া (উপহার) পাঠায় এবং তিনি তা গ্রহণ করেন। তাহলে সে সুদের দরজাসমূহের
মধ্য থেকে কোনো একটি বিরাট দরজায় প্রবেশ করল। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭৫৭, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৪১, সহীহাহ্ ৩৪৬৫, সহীহ আল জামি‘
৬৩১৬, সহীহ আত্ তারগীব ২৬২৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(২৭) ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ ও অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করাঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, ‘যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের ধন-সম্পদ গ্রাস করে, নিশ্চয়ই তারা স্বীয় উদরে
অগ্নি ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং তারা সত্বর জাহান্নামে প্রবেশ করবে’। (সুরা আন নিসা ১০)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
বিধবা ও মিসকীনদের অভাব দূর করার জন্য সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর ন্যায়।
[ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন] আমার ধারণা যে কা’নবী (বুখারীর উস্তাদ ’আবদুল্লাহ) সন্দেহ
প্রকাশ করেছেনঃ সে রাতভর দাঁড়ানো ব্যক্তির মত যে (’ইবাদাতে) ক্লান্ত হয় না এবং এমন
সিয়াম পালনকারীর মত, যে সিয়াম ভঙ্গ করে না। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০০৭, ৫৩৫৩, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৬৯)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ
তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বেঁচে থাক। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী?
তিনি বললেনঃ আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, জাদু, যথার্থ কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ্
হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল খাওয়া, জিহাদের ময়দান থেকে পিঠ ফিরিয়ে নেয়া,
সাধ্বী বিশ্বাসী সরলমনা নারীদের প্রতি অপবাদ দেয়া। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৫৭, ২৭৬৬, সুনান আবূ দাঊদ : ২৮৭৪, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৮০,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২৮) জুয়া খেলাঃ
জুয়া
বলতে সে সকল খেলাকে বুঝানো হয় যাতে বাজি কিংবা হারজিতের প্রশ্ন রয়েছে। জুয়া যে ধরনেরই
হোক না কেন তা হারাম।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘হে
ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ (নেশাকর দ্রব্য), জুয়া, মূর্তি ও লটারীর তীর এ সব নাপাক ও গর্হিত
বিষয়। শয়তানের কাজও বটে। সুতরাং এগুলো থেকে তোমরা সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকে। তা হলেই
তো তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো এটিই চায় যে, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের
মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হোক এবং আল্লাহ্ তা‘আলার স্মরণ ও নামায থেকে তোমরা বিরত
থাকো। সুতরাং এখনো কি তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকবে না?’’ (সুরা
আল মা’য়িদাহ্ : ৯০-৯১)।
(২৯) মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াঃ
আপনার
পছন্দের প্রার্থীকে প্রথমে ভোট দেয়ার মাধ্যমে সত্য সাক্ষ্য দিলেন যে, “ফুল মিয়া ভাইয়ের
চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র”, কিন্তু পরবর্তীতে যখন প্রমানিত হবে যে, সেই এমপি একজন চাঁদাবাজ,
ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ তথা অনেক অপকর্মের হোতা তখন আপনার সেই প্রথম সাক্ষ্য মিথ্যে সাক্ষ্যতে
পরিণত হবে। আর মিথ্যে সাক্ষ্য দেয়া কবিরাহ গুনাহ। এজন্যে আপনাকে শাস্তি পেতে হবে।
আল্লাহ
তা‘আলার বাণী,
“তোমরা
সাক্ষ্য গোপন করো না। যারা তা গোপন করবে তাদের অন্তর অপরাধী আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ
তা সব জানেন”। (সূরা আল-বাকারাহঃ ২৮৩)।
কবীরা
গুনাহের অন্যতম হলো মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
নবী করীম (ছাঃ)-কে কবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে
শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৬৫৩, ৫৯৭৭, ৬৮৭১, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ১৬১-১৬২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৮, আহমাদ ১২৩৩৮, আধুনিক প্রকাশনী ২৪৬১,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৪৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi)।
আবূ
বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একদা তিনবার
বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সকলে বললেন,
হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা এবং পিতা-মাতার
অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন; এবার সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, শুনে রাখ!
মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, এ কথাটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। এমনকি আমরা বলতে লাগলাম, আর
যদি তিনি না বলতেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৩৫৪,
৫৯৭৬-৬২৭৩-৬২৭৪-৬৯১৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৬০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৭, আহমাদ ১২৩৩৮, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ২৪৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মহান
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘হে
ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান
কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয়
তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশি।
অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে
কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।’
(সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫)।
আল্লাহ
তায়ালা আরো বলেন,
‘হে
মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন
সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির
অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।’
(সূরা: আল মায়েদা, আয়াত ৮)।
অনৈসলামিক
দলের এমপিরা যেহেতু তাদের সততা ধরে রাখতে পারে না এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে
পড়ে তাই তাদেরকে ভোট দেয়া যাবে না।
মনে
রাখবেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ফরজ। ভোট দেয়ার মাধ্যমেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়।
আর এধরণের প্রতিবাদ করাও এক প্রকার জিহাদ।
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জিহাদে অংশগ্রহণ করেনি এবং জিহাদের নিয়্যাত না করে মৃত্যুবরণ করে,
সে প্রকৃতপক্ষে মুনাফিক হয়েই মৃত্যুবরণ করল। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৮১৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৮২৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯১০,
সুনান আবূ দাঊদ ২৫০২, সুনান আননাসায়ী ৩০৯৭, মুসনাদ আহমাদ ৮৮৬৫, সহীহ আল জামি‘ ৬৫৪৮,
সহীহ আত্ তারগীব ১৩৯০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৭৮, ইসলামিক সেন্টার ৪৭৭৯)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“এটাই
বিধান এবং কেউ আল্লাহর সম্মানিত বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তার রব-এর কাছে
তার জন্য এটাই উত্তম। আর যেগুলো তোমাদেরকে তিলাওয়াত করে জানানো হয়েছে তা ব্যতীত তোমাদের
জন্য হালাল করা হয়েছে চতুষ্পদ জন্তু। কাজেই তোমরা বেঁচে থাক মূর্তিপূজার অপবিত্রতা
থেকে এবং বর্জন কর মিথ্যা কথা”। (সূরা আল হাজ্জ ২২: ৩০)।
(৩০) শরীয়তের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করাঃ
ইসলামী
শরীয়তের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা হলো পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার অবজ্ঞা এবং
ঈমানের পরিপন্থী একটি জঘন্য অপরাধ। ইসলামের শত্রুরা সর্বদা মুসলমানদের ঈমান ও শরীয়ত
ধ্বংসের জন্য সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করে আসছে, যা মূলত শয়তানি কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“যারা
মুমিন তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, আর যারা কাফের তারা তাগূতের পথে যুদ্ধ করে। কাজেই
তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; শয়তানের কৌশল অবশ্যই দুর্বল”। (সুরা আন নিসা ৭৬)।
আয়াতে
বলা হয়েছে যে, যারা মুমিন বা ঈমানদার তারা জিহাদ করে আল্লাহর পথে। আর যারা কাফের তারা
যুদ্ধ করে শয়তানের পথে। সুতরাং পরিপূর্ণ কোন মুমিন ব্যক্তি যখন যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়,
তখন তার সামনেই এ উদ্দেশ্য বিদ্যমান থাকে যে, আমি আল্লাহর পথেই এ কাজ করছি। তার নির্দেশ
ও নিষেধকে বাস্তবায়নই আমার জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু এর বিপরীতে যারা কাফের তাদের বাসনা
থাকে কুফরের প্রচলন, কুফরের বিজয় এবং পৈচাশিক শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যাতে করে
বিশ্বময় কুফরী ও শির্কী বিস্তার লাভ করতে পারে। আর কুফরী ও শির্কী যেহেতু শয়তানের
পথ, সুতরাং কাফেররা শয়তানের কাজেই সাহায্য করে থাকে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
স্মরণ করুন, যখন কাফেররা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আপনাকে বন্দী করার জন্য, বা
হত্যা করার অথবা নির্বাসিত করার জন্য। আর তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও (তাদের ষড়যন্ত্রের
বিপক্ষে) ষড়যন্ত্র করেন; আর আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী”। (সুরা আল আনফাল ৩০)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা সেসব বিষয়ে প্রশ্ন করো না যা তোমাদের কাছে প্রকাশ হলে তা তোমাদেরকে
কষ্ট দেবে। আর কুরআন নাযিলের সময় তোমরা যদি সেসব বিষয়ে প্রশ্ন কর তবে তা তোমাদের
কাছে প্রকাশ করা হবে। আল্লাহ সেসব(৩) ক্ষমা করেছেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল”। (সুরা আল মায়েদা ১০১)।
আলোচ্য
আয়াতসমূহে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, কিছু সংখ্যক লোক আল্লাহর বিধিবিধানে অনাবশ্যক চুলচেরা
ঘাটাঘাটি করতে আগ্রহী হয়ে থাকে এবং যেসব বিধান দেয়া হয়নি সেগুলো নিয়ে বিনা প্রয়োজনে
প্রশ্নের উপর প্রশ্ন তুলতে থাকে। আয়াতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন
এরূপ প্রশ্ন না করে, যার ফলশ্রুতিতে তারা কষ্টে পতিত হবে কিংবা গোপন রহস্য ফাঁস হওয়ার
কারণে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে।
আবূ
ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিমদের
সর্বাপেক্ষা বড় অপরাধী ঐ লোক যে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করে যা আগে হারাম ছিল না, কিন্তু
তার প্রশ্ন করার কারণে তা হারাম করা হয়েছে। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭২৮৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬০১০-৬০১১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৩৫৮, আহমাদ ১৫৪৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৯১)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(৩১) স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রয় করে মূল্য গ্রহণ করাঃ
কোন
স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য খাওয়া হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ
তা‘আলা ঘোষণা করেছেন যে, কিয়ামতের দিবসে আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হবো।
এক ব্যক্তি, যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করল। আরেক ব্যক্তি, যে কোন আযাদ মানুষকে
বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল। আর এক ব্যক্তি, যে কোন মজুর নিয়োগ করে তার হতে পুরো
কাজ আদায় করে এবং তার পারিশ্রমিক দেয় না। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ২২২৭, সুনান ইবনু মাজাহ
: ২৪৪২, মুসনাদ আহমাদ : ৮৬৭৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২০৮৬)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
বর্তমান
যুগে ডাকাত কিংবা সন্ত্রাসী কর্তৃক কোন এলাকার সুঠাম দেহ স্বাধীন পুরুষ এবং স্বাধীনা
যুবতী মহিলাকে জোরপূর্বক কিংবা অর্থের লোভ দেখিয়ে সম্মানজনক কাজের কথা বলে অবৈধ কাজ
কিংবা নীচু কাজের জন্য অন্য এলাকার কারোর নিকট কাজের লোক হিসেবে বিক্রি করে দিয়ে সে
পয়সা খাওয়াও এরই শামিল।
(৩২) অন্যায়ভাবে মালিকানা দাবি করাঃ
যুহারর
ইবনু হারব (রহ)..আবূ যার (রযিঃ) বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি জেনে শুনে নিজ পিতার পরিবর্তে অন্য কাউকে পিতা বলে, সে
কুফুরী করল। আর যে ব্যক্তি এমন কিছুর দাবী করে যা তার নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং
সে যেন জাহান্নামে তার আবাসস্থল বানিয়ে নেয়। আর কেউ কাউকে কাফির বলে ডাকলে বা আল্লাহর
দুশমন’ বলে ডাকল, যদি সে তা না হয় তাহলে এ কুফুরী সম্বোধনকারীর প্রতি ফিরে আসবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৫০৮, ৬০৩৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১২০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬১, সুনান ইবনু মাজাহ
২৩১৯, আহমাদ ২০৯৫৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২১, ইসলামিক সেন্টারঃ ১২৫, সহীহ ইবনু হিববান
: ১৫৩৩৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩৩) মানুষের সাথে প্রতারণা করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; কিন্তু তোমরা পরস্পর রাযী
হয়ে ব্যবসা করা বৈধ এবং নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম
দয়ালু”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৯)।
আর
ইমাম মুসলিম (রহঃ) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, আর যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে বা ধোঁকা দেয়, সে আমাদের
দলভুক্ত নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫২০, সহিহ বুখারী
৭০৭, সহিহ মুসলিম ১০১, সুনান আননাসায়ী ৪১০০, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৯, সুনান ইবনু মাজাহ
২৫৭৫, আহমাদ ৯৩৯৬, সহীহ আল জামি‘ ৬২১৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কেউ
কাউকে ধোঁকা দিলে সেই ধোঁকাবাজের আমলনামায় একটি করে পাপ লেখা হয়।
আব্দুল্লাহ
ইবনু আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে বসা অবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে দিবো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেনঃ তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা
করছে? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ
যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে এ কারণে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ
হতো। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯৯১, মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৪৮৮২, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৪৮, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৯৪৩, মুসান্নাফ
ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৬০৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(৩৪) মিথ্যা ক্বসম করে পণ্য বিক্রয় করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা আল্লাহ্র সাথে করা প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য খরিদ
করে, আখেরাতে তাদের কোন অংশ নেই। আর আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে
তাকাবেন না কেয়ামতের দিন। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না; এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মম্ভদ
শাস্তি”। (সূরা আ-লি ইমরা-ন ৩: ৭৭)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর
লোকের সাথে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি তাকাবেনও না।
(এক) যে ব্যক্তি কোন মাল সামানের ব্যাপারে মিথ্যা কসম খেয়ে বলে যে, এর দাম এর চেয়ে
বেশী বলেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও সে তা বিক্রি করেনি। (দুই) যে ব্যক্তি আসরের সালাতের
পর একজন মুসলিমের মাল-সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশে মিথ্যা কসম করে। (তিন) যে ব্যক্তি
তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি মানুষকে দেয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন (কিয়ামতের দিন) আজ
আমি আমার অনুগ্রহ হতে তোমাকে বঞ্চিত রাখব যেরূপ তুমি তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি
হতে বঞ্চিত রেখেছিলে অথচ তা তোমার হাতের তৈরী নয়। ‘আলী (রহ.) আর সালিহ (রহ.) হতে বর্ণিত
যে, তিনি হাদীসের সনদটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৩৬৯, ২৩৫৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ
২১৯৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩৫) অন্যায় উদ্দেশে পণ্য মজুদ করাঃ
অধিক
মুনাফা লাভের আশায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী খাদ্য দ্রব্য বা অন্যান্য মালামাল গোপনে মজুদ করে
রাখে। এতে রাষ্ট্রে খাদ্য দ্রব্য বা অন্যান্য মালামালের সংকট দেখা যায় ও দুর্ভিক্ষ
শুরু হয়। যারা এরুপ কাজ করে তারা পাপিষ্ঠ লোক।
মা’মার
ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে নাদলা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না। (সুনান ইবনু মাজাহ ২১৫৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪০১৪,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬০৫, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২৬৭, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪৪৭, আহমাদ ১৫৩৩১, ২৬৭০৩, দারেমী ২৫৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
সাঈদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি মু’মিন
ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো (পাপীষ্ঠ লোকের) সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার
লোকে খায়। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৮৩২)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
আদী
ইবনু কা’ব (রাঃ)-এর এক পুত্র মা’মার ইবনু আবূ মা’মার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জঘণ্য অপরাধী ছাড়া কেউই নিত্যপ্রয়োজনীয়
দ্রব্যাদি (মূল্য বৃদ্ধির আশায়) গুদামজাত করে না। আমি (মুহাম্মাদ ইবনু ’আমর) সাঈদ ইবনুল
মুসাইয়্যাব (রহঃ)-কে বলি, আপনি তো গুদামজাত করেন। তিনি বলেন, মা’মারও গুদামজাত করতেন।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আমি আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, (কোন বস্তু)
গুদামজাত করা নিষেধ? তিনি বললেন, মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ)
বলেন, আওযাঈ’ (রহঃ) বললেন, গুদামজাতকারী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে বাজারজাত করার পথে প্রতিবন্ধক
হয়। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৪৪৭, সুনান ইবনু মাজাহ
(২১৫৪)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩৬) মিথ্যা শপথ করাঃ
মিথ্যা
শপথ বা কসম খাওয়াও একটি কবীরা গুনাহ্। চাই তা কোন বিপদ থেকে বাঁচার জন্যই হোক অথবা
কারোর কোন সম্পদ অবৈধভাবে আত্মসাৎ করার জন্যই হোক।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা আল্লাহ্র সাথে করা প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য খরিদ
করে, আখেরাতে তাদের কোন অংশ নেই। আর আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে
তাকাবেন না কেয়ামতের দিন। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না; এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মম্ভদ
শাস্তি”। (সূরা আ-লি ইমরা-ন ৩: ৭৭)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ আমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কবীরা
গুনাহ্গুলো হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, অবৈধভাবে
কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া’’। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৬৭৫, ৬৮৭০, ৬৯২০, আধুনিক প্রকাশনী- ৬২০৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬২১৯)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু উনায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ গুনাহের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট গুনাহ হলো- ১. আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা, ২.
মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, ৩. মিথ্যা কসম করা। (সাবধান) যখন কোনো কসমকারী নিরুপায় হয়ে আল্লাহর
কসম করে এবং তাতে মাছির ডানার পরিমাণও মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখনই তার অন্তরে একটি দাগ
পড়ে যায় যা কিয়ামত অবধি থাকবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৩৭৭৭, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩০২০, সহীহ আল জামি ২২১৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৮৩২)।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
মিথ্যা
কসম খেয়ে পণ্য বিক্রেতার সাথে আল্লাহ্ তা‘আলা কিয়ামতের দিন কোন কথা বলবেন না, তার দিকে
তাকাবেনও না এমনকি তাকে গুনাহ্ থেকে পবিত্রও করবেন না উপরন্তু তার জন্য রয়েছে কঠিন
শাস্তি।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শাইবাহ, মুহাম্মাদ ইবনু আল মুসান্না ও ইবনু বাশশার (রহঃ)....আবূ যার
(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের
দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র
করবেন না। বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি। বর্ণনাকারী বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাটি তিনবার পাঠ করলেন। আবূ যার (রাযিঃ) বলে উঠলেন, তার তো ধ্বংস
হবে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহর রাসূল! এরা কারা? তিনি বললেন, যে লোক পায়ের গোছার
নীচে কাপড় ঝুলিয়ে চলে, কোন কিছু দান করে খোটা দেয় এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্যদ্রব্য
বিক্রি করে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
১৯৫, ইসলামিক সেন্টারঃ ২০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন মাস্’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কেউ
কারোর সম্পদ অবৈধভাবে আহরণের জন্য মিথ্যা কসম খেলে সে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা‘আলার
সাথে এমতাবস্থায় সাক্ষাৎ দিবে যে, তিনি (আল্লাহ্) তার উপর খুবই রাগান্বিত’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৩৫৬, ২৪১৬, ২৫১৫, ২৬৬৬, ২৬৬৯,
২৬৭৩, ২৬৭৬, ৪৫৪৯, ৬৬৫৯, ৬৬৭৬, ৭১৮৩, ৭৪৪৫, ২৩৫৩, ২৪১৭, ২৫১৬, ২৬৬৭, ২৬৭০, ২৬৭৭, ৪৫৫০,
৬৬৬০, ৬৬৭৭, ৭১৮৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২৫২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৮, আহমাদ ৩৫৭৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৮৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
২২০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইমরান
ইবনু হুসাইন (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
যে ব্যক্তি বন্দী থাকা অবস্থায় মিথ্যা শপথ করলো, সে যেন নিজের বাসস্থান জাহান্নামে
নির্ধারণ করে নিলো। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩২৪২,
সহীহাহ ২৩৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইয়াহইয়া
ইবনু আইয়ুব, কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ ও আলী ইবনু হুজুর (রহঃ) ..... আবূ উমামাহ্ (রাযিঃ)
থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি কসমের
মাধ্যমে কোন মুসলিমের হক বিনষ্ট করে তার জন্য আল্লাহ জাহান্নাম ওয়াজিব করে রেখেছেন
এবং জান্নাত হারাম করে রেখেছেন। তখন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! অতি
সামান্য বস্তু হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আরাক (বাবলা
গাছের মত এক ধরনের কাঁটাযুক্ত) গাছের ডাল হলেও এ শাস্তি দেয়া হবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৫০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৭,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৫২. ইসলামিক সেন্টারঃ ২৬১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩৭) দোষ গোপন ও মিথ্যা কথা
বলে পণ্য বিক্রয় করাঃ
হাকীম
ইবনু হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যতক্ষণ
বিচ্ছিন্ন না হবে ততক্ষণ ক্রেতা-বিক্রেতার ইখতিয়ার থাকবে। যদি তারা সত্য বলে ও যথাযথ
অবস্থা বর্ণনা করে তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে, আর যদি পণ্যের প্রকৃত অবস্থা গোপন
করে ও মিথ্যা বলে তবে ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত চলে যাবে। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২০৮২, ২০৭৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৭৫০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৩২, সুনান আবূ দাঊদ
৩৪৫৯, সুনান আননাসায়ী ৪৪৬৪, সুনান আততিরমিযী ১২৪৬, আহমাদ ১৫৩২৭, দারিমী ২৫৮৯, সহীহ
আল জামি‘ ২৮৯৬, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৮৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৩৭ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
১৯৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩৮) হারাম ব্যবসা করাঃ
হালাল
ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সূদকে হারাম
করেছেন’। (সুরা বাক্বারাহ ২/২৭৫)।
অন্যত্র
এরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, কেবলমাত্র
তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ’। (সুরা
নিসা ৪/২৯)।
হারাম উপায়ে উপার্জিত কিছু খাত
(ক) রাফি’ বিন খাদীজ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুকুর বিক্রয়লব্ধ মূল্য ঘৃণিত
বস্তু, যিনা-ব্যভিচারের বিনিময়ও ঘৃণিত, শিঙ্গা লাগানোর (রক্তমোক্ষণের) ব্যবসা ঘৃণিত।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৩৯০৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৬৮, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত ৩৪২১, সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২৭৫, আহমাদ ১৫৮২৭, দারিমী ২৬৬৩, সহীহ আল জামি‘ ৩০৭৭, সহীহাহ্
৩৬২২, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫১৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আবূ মাসঊদ আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারের বিনিময় এবং গণকের
পারিতোষিক (গ্রহণ করা) হতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ২২৩৭, ২২৮২, ২৩৪৬, ৫৭৬১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯০১, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৫৬৭, সুনান ইবনু মাজাহ ২১৫৯, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬৪, সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ২২৩৭, ২২৮২, ৫৩৪৬, ৫৭৬১, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১১৩৩, ১২৭৬,
নাসায়ী ৪২৯২, ৪৬৬৬, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৪২৮, ৩৪৮১, আহমাদ ১৬৬২২, ১৬৬২৬,১৬৬৩৯
মুয়াত্তা মালেক ১৩৬৩, দারেমী ২৫৬৮, ইরওয়া ১২৯১,
সহীহ ইবনু হিব্বান ৫১৫৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২০৯৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরের মূল্য ও পাঠার ভাড়া গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।
(সুনান ইবনু মাজাহ ২১৬০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৪৮৪,
নাসায়ী ৪২৯৩, ৪৬৭৩, আহমাদ ৭৯১৬, ৮১৮৯, ৯১০৮, ১০১১১, দারেমী ২৬২৩, ২৬২৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(ঘ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়ালের মূল্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। (সুনান ইবনু মাজাহ ২১৬১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯০৭,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৬৯, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২৭৯, নান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪৮০, নাসায়ী ৪২৯৫, ৪৬৬৮, আহমাদ ১৪২৪২, ১৪৩৫৩, ১৪৭২৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) আবূ জুহায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রক্তমোক্ষণ কাজের বিনিময়, কুকুর বিক্রয় মূল্য ও
যিনা-ব্যভিচারের বিনিময় মূল্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) লা’নাত (অভিসম্পাত) করেছেন সুদগ্রহীতা ও সুদদাতার প্রতি। তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো লা’নাত করেছেন ওই ব্যক্তির প্রতি যে দেহের কোনো অংশে নাম বা
চিত্রাঙ্কন করে ও করায়। তাছাড়াও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছবি অঙ্কনকারীর
প্রতিও লা’নাত করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬৫,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৯৬২, ২০৮৬, আহমাদ ১৮৭৬৮, আধুনিক প্রকাশনী ৫৫২৯, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৫৪২৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ) আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা গায়িকা বেচা-কেনা করো না তাদেরকে (মেয়েদেরকে)
গান শিক্ষাও দিয়ো না, এর মূল্য হারাম। এ জাতীয় কাজ যারা করে তাদের ব্যাপারেই কুরআন
মাজীদের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ- ’’কতক মানুষ আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত করার
উদ্দেশে অজ্ঞতাবশত অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে আর আল্লাহ্র পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে।
ওদের জন্যই আছে অবমাননাকর শাস্তি।’’- (সূরা লুকমান ৩১ : ৬)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৮০, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১২৮২, সুনান ইবনু মাজাহ ২১৬৮, সহীহ আল জামি ৫০৯১, সহিহাহ ২৯২২)। (হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)-ইবনে মাজাহ সূত্রে)।
(ছ) আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা
আবূ বকর (রাঃ)-এর একটি ক্রীতদাস ছিল। দাসটি তাঁর জন্য রুযী-রোজগার করতো এবং তিনি তা
খেতেন। একবার সেই ক্রীতদাসটি কোনো খাবার নিয়ে এলে আবূ বকর (রাঃ) তা খেলেন। ক্রীতদাসটি
তাঁকে বললেন, আপনি কি জানেন- এটা কিভাবে উপার্জিত হয়েছে? আবূ বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,
এ মাল কিভাবে উপার্জিত? তখন ক্রীতদাসটি বললো, জাহিলী যুগে একবার আমি এক ব্যক্তির কাছে
গণকের কাজ করেছিলাম, অথচ আমি গণনার কাজও ভালো করে জানতাম না। আমি গণনার ভান করে তাকে
ধোঁকা দিয়েছিলাম। ঐ ব্যক্তির সাথে আজ আমার দেখা হলে সে আমাকে আগের ঐ গণনার বিনিময়ে
বস্তুটি দান করেছে, আপনি তাই খেয়েছেন। তিনি বলেন, (এ কথা শুনামাত্র) আবূ বকর(রাঃ) গলার
ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে পেটের সব জিনিস বমি করে ফেলে দিলেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৮৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৮৪২, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৩৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(জ) আনাস
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন পথে পড়ে থাকা
একটি খেজুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ
এ খেজুর যাকাত বা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হবার সন্দেহ না থাকলে আমি উঠিয়ে খেয়ে নিতাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮২১, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৪৩১, ২০৫৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৩৬৮,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৭১, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক্ব ১৮৬৪২, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৩৬,
ইরওয়া ১৫৫৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঝ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাতি হাসান ইবনু ’আলী (রাঃ) সদাক্বার
খেজুর হতে একটি খেজুর উঠিয়ে মুখে পুরলেন। (তা দেখে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, খেজুরটি মুখ থেকে বের করে ফেলো, বের করে ফেলো। (তিনি এ কথাটি এভাবে বললেন যেন
হাসান তা মুখ থেকে বের করে ফেলে দেয়)। তারপর তিনি তাঁকে বললেন, তুমি কি জানো না যে,
আমরা (বানী হাশিম) সদাক্বার মাল খেতে পারি না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮২২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৩৬৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬৯,
আহমাদ ৯৩০৮, দারিমী ১৬৮২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৩২৩১, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর
৪৪৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(ঞ) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর তথায় অবস্থানকালে
বলেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মদ, মৃতজমত্ত, শুকর ও মূর্তির ক্রয়-বিক্রয় হারাম করেছেন।
তাঁকে বলা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মৃত জন্তুর চর্বি সম্পর্কে কী বলেন? কারণ এটি নৌকায়
লাগানো হয়, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যবহৃত হয় এবং লোকেরা তা দিয়ে বাতিও জ্বালায়।
তিনি বলেনঃ না, এগুলোও হারাম। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
আল্লাহ ইহূদীদের ধ্বংস করুন। আল্লাহ তাদের জন্য চর্বি হারাম করলে তারা এটি গলিয়ে বিক্রয়
করে এবং এর মূল্য ভোগ করে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২১৬৭, সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২২৩৬, ৪৬৩৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯৪০, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৫৮১, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১২৯৭, নাসায়ী ৪২৫৬, ৪৬৬৯, সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত) ৩৪৮৬, বায়হাকী ৯/৩৫৫, ইবনু হিব্বান ৪৯৩৭, ইরওয়া ১২৯০, রাওদুন নাদীর ৪৪৬,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৭৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২০৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এগুলো
ছাড়াও হারাম উপায়ে অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন খাত রয়েছে, যেমন সুদ খাওয়া, সুদীকারবারী
প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা, ঘুষ নেয়া, দুর্নীতি করা, সুপারিশের করে টাকা নেয়া, নাটক সিনেমায়
অভিনয় করা, চাঁদাবাজি করা, টেন্ডারবাজি করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, অপহরণ করে মুক্তিপণ
আদায় করা, যেকোনো অবৈধ ব্যবসা করা, ডাক্তার সরকারি হাসপাতালে কর্মরত থাকা অবস্থায় আলাদাভাবে
রোগী দেখে টাকা নেয়া কিংবা অন্য কোথাও রেফার্ড করে বা টেস্ট করিয়ে তার কমিশন নেয়া,
ঘুষ নিয়ে রায় দেয়া, ঘুষ নিয়ে মামলার রিপোর্ট পরিবর্তন করা আর কতো লিখবো এরকম হাজার
হাজার অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের খাত আছে। যারা এসব খাতের সাথে জড়িত তাদের উপার্জিত
অর্থ হারাম। হারাম খেলে দেহও হারাম হয়ে যায়। তাদের ইবাদত, আমল বা দান খয়রাত আল্লাহ
তায়ালা কখনো কবুল করবেন না। রাসুল সাঃ বলেন,
ইবনু
উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আল্লাহ পবিত্রতা ছাড়া সালাত কবূল করেন না এবং হারাম পন্থায় উপার্জিত মালের দান-খয়রাত
কবূল করেন না। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৭২, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪২৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৪, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১, আহমাদ ৪৬৮৬,
৪৯৪৯, ৫১০২, ৫১৮৩, ৫৩৯৬, ইরওয়াহ ১২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪২৬, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৪২)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সকল
মুমিন নর-নারীর উচিত হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
জাবির
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
যে দেহের গোশত/গোশত হারাম উপার্জনে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম
ধন-সম্পদে গঠিত ও লালিত পালিত দেহের জন্য জাহান্নামই উপযোগী। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৭২, আহমাদ ১৪৪১, শু‘আবুল ঈমান
৮৯৭২, দারিমী ২৭৭৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) আরও বলেন,
কাব
ইবনু উজরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমাকে বললেনঃ হে কা’ব ইবনু উজরা! আমার পরে যেসব নেতার উদয় হবে আমি তাদের (খারাবী)
থেকে তোমার জন্য আল্লাহ তা’আলার সহায়তা প্রার্থনা করি। যে ব্যক্তি তাদের দ্বারস্থ
হলো (সান্নিধ্য লাভ করলো), তাদের মিথ্যাকে সত্য বললো এবং তাদের স্বৈরাচার ও যুলুম-নির্যাতনে
সহায়তা করলো, আমার সাথে এ ব্যক্তির কোন সম্পর্ক নেই এবং এ ব্যক্তির সাথে আমারো কোন
সংস্রব নেই। এ ব্যক্তি কাওসার’ নামক হাউজের ধারে আমার নিকট আসতে পারবে না।
অপরদিকে
যে ব্যক্তি তাদের দ্বারস্থ হলো (তাদের কোন পদ গ্রহণ করলো) কিন্তু তাদের মিথ্যাকে সত্য
বলে মানল না এবং তাদের স্বৈরাচার ও যুলুম-নির্যাতনে সহায়তা করলো না, আমার সাথে এ ব্যক্তির
সম্পর্ক রয়েছে এবং এ ব্যক্তির সাথে আমারও সম্পর্ক রয়েছে। শীঘ্রই সে কাওসার’ নামক
হাউজের কাছে আমার সাথে দেখা করবে। হে কা’ব ইবনু উজরা নামায হলো (মুক্তির) সনদ, রোযা
হলো মজবুত ঢাল (জাহান্নামের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক) এবং সাদাকা (যাকাত বা দান-খয়রাত)
গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। হে কাব ইবনু উজরা! হারাম
(পস্থায় উপার্জিত সম্পদ) দ্বারা সৃষ্ট ও পরিপুষ্ট মাংস (দেহ)-এর জন্য (জাহান্নামের)
আগুনই উপযুক্ত। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৬১৪, তালীকুর
রাগীব (৩/১৫, ১৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) আরও বলেন,
আবূ
বারযা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ
কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে? কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত
করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে
ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কি কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৪১৭, তাখরীজ ইকতিযাউল ইলমি আল-আমল
(১৫/১), দারেমী ৫৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তাই
আসুন, আমরা হারাম থেকে বেঁচে থাকি এবং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ মোতাবেক আমাদের
সার্বিক জীবন পরিচালনা করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!
(৩৯) যুলুম করে (অন্যায়ভাবে)
কোন কিছু গ্রহণ করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আল্লাহ্
মুশরিকদের বলবেন) তোমরা যা বলতে তারা তো মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে। কাজেই তোমরা শাস্তি
প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং সাহায্যও পাবে না। আর তোমাদের মধ্যে যে যুলুম তথা শিৰ্ক
করবে আমরা তাকে মহাশাস্তি আস্বাদন করাব”। (সূরা আল ফুরক্বান
২৫ : ১৯)।
আল্লাহ
আরও বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)।
সাঈদ
ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারো জমির অংশ জুলুম করে কেড়ে নেয়, কিয়ামতের দিন এর সাত তবক
জমিন তার গলায় লটকিয়ে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ২৪৫২, ৩১৯৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৯০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ)....আদী ইবনু উমাইরাহ্ আল-কিন্দী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ আমরা তোমাদের
মধ্যে যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি, আর সে একটি সূচ পরিমাণ বা তার চাইতেও কম মাল আমাদের
কাছে গোপন করে, তাই আত্মসাৎ বলে গণ্য হবে এবং তা নিয়েই কিয়ামতের দিন সে উপস্থিত হবে।
রাবী বলেন, তখন একজন কৃষ্ণকায় আনসারী (সাহাবী) তার দিকে অগ্রসর হলেন, আমি যেন তাকে
দেখতে পাচ্ছি। তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার দায়িত্বভার আপনি বুঝে নিন।
তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি আরয করলেন,
আমি আপনাকে এরূপ এরূপ (কঠিন ভাষা) বলতে শুনেছি। তখন তিনি বললেন, আমি এখনও বলছি, তোমাদের
মধ্যকার যাকেই আমি কর্মচারী নিযুক্ত করি আর সে অল্প বিস্তর যা-ই আদায় করে এনে উপস্থিত
করে, তারপর তাকে যা-ই দেয়া হয় তা-ই গ্রহণ করে এবং যা থেকে নিষেধ করা হয় তা থেকে
বিরত থাকে (তার জন্য ভয়ের কারণ নেই)। (সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪৬৩৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৯১, ইসলামিক সেন্টার
৪৫৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কুতাইবাহ
ইবনু সাঈদ ও ’আলী ইবনু হুজর (রহঃ).....আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন,
আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন,
আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও
যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ
দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর
সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি
পাওনাদারের হাক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ
তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৮১,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪০) সাক্ষ্য গোপন করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত বন্ধক রাখবে। অতঃপর তোমাদের
একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করলে, যার কাছে আমানত রাখা হয়েছে সে যেন আমানত প্রত্যার্পণ
করে এবং তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। আর যে
কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবগত”। (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৮৩)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ তিন রজঃস্রাব কাল প্রতীক্ষায় থাকবে। আর তারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখলে তাদের গর্ভাশয়ে আল্লাহ্ যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন রাখা তাদের পক্ষে হালাল নয়। আর যদি তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চায় তবে এতে তাদের পুনঃ গ্রহণে তাদের স্বামীরা বেশী হকদার। আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; আর নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা আছে। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ২২৮)।
(৪১) জমিনের সীমানা/খুঁটি অন্যায়ভাবে পরিবর্তন করাঃ
কারোর
জমিনের সীমানা ঠেলে তার কিয়দংশ নিজের অধিকারভুক্ত করে নেয়াও আরেকটি কবীরা গুনাহ্।
যুহায়র
ইবনু হারব ও সুরায়জ ইবনু ইউনুস (রহঃ)....আবূ তুফায়ল আমির ইবনু ওয়াসিলাহ্ (রাযি.)
হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আলী ইবনু আবূ তালিব (রাযিঃ) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক
লোক তার নিকট এসে বলল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে আড়ালে কি বলেছিলেন?
রাবী বলেন, তিনি রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের
কাছ থেকে গোপন রেখে আমার নিকট একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি (বিশেষ শিক্ষণীয়)
কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল- হে আমীরুল মুমিনীন! সে চারটি কথা কি?
তিনি বললেনঃ ১. যে লোক তার পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করে, আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করেন,
২. যে লোক আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন কারো নামে যাবাহ করে আল্লাহ তার উপরও অভিসম্পাত করেন,
৩. ঐ ব্যক্তির উপরও আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, যে কোন বিদ’আতী লোককে আশ্রয় দেয় এবং ৪.
যে ব্যক্তি জমিনের (সীমানার) চিহ্নসমূহ অন্যায়ভাবে পরিবর্তন করে, তার উপরও আল্লাহ
অভিসম্পাত করেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫০১৮-৫০২০,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৯৬২, ইসলামিক সেন্টার ৪৯৬৮; আহমাদ ২৯১৩;
হা’কিম ৪/১৫৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সালিম
(রহ.)-এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সামান্য পরিমাণ জমিও নিয়ে নিবে, কিয়ামতের দিন তাকে সাত তবক জমিনের
নীচ পর্যন্ত ধসিয়ে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৪২৪, ৩১৯৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ
২২৭৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ক কাবীরা গুনাহঃ
(৪২) অধীনস্থদের ওপর অত্যাচার করাঃ
কোন
ক্ষমতাশীল ব্যক্তির জন্য তার অধীনস্থদের উপর যুলুম করা অথবা তাদেরকে যে কোন ব্যাপারে
ধোঁকা দেয়া কখনোই জায়িয নয়। বরং তা কবীরা গুনাহ্গুলোর অন্যতম। কোন ব্যক্তির জাহান্নামে
যাওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘শুধুমাত্র
তাদের বিরুদ্ধেই (শাস্তির) ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে এবং
পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়। বস্ত্তত: এদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি’’।
(সুরা শূরা: ৪২)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাসলামাহ্ ইবনু কা’নাব (রহঃ)....জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা অত্যাচার করা থেকে বিরত থাক।
কেননা কিয়ামত দিবসে অত্যাচার অন্ধকারে পরিণত হবে। তোমরা কৃপণতা থেকে সাবধান হও। কেননা
এ কৃপণতাই তোমাদের আগেকার কাওমকে ধ্বংস করেছে। এ কৃপণতা তাদের খুন-খারাবী ও রক্তপাতে
উৎসাহ যুগিয়েছে এবং হারাম বস্তুসমূহ হালাল জ্ঞান করতে প্রলোভন দিয়েছে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৭০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৭৮,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৪০, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৯০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হাসান
বাসরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মা’কিল ইবনু ইয়াসারের কাছে তার সেবা-শুশ্রূষার
জন্য আসলাম। এ সময় ’উবাইদুল্লাহ্ প্রবেশ করল। তখন মালিক (রাঃ) বললেন, আমি তোমাকে এমন
একটি হাদীস বর্ণনা করে শোনাব, যা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করল
এবং তার মৃত্যু হল এ হালতে যে, সে ছিল খিয়ানাতকারী, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাত
হারাম করে দেবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫১,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৫৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪২, আহমাদ ২০১৩১, আবূ ‘আওয়ানাহ
৭০৪৫, ৭০৪৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন:
‘‘যে
কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার অধীনস্থ প্রজাদেরকে ধোঁকা দিলে সে জাহান্নামে যাবে’’। (সা’হীহুল্ জা’মি’, হাদীস ২৭১৩)।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কোন
ব্যক্তি দশ জনের আমীর হলেও তাকে (কিয়ামতের দিন) গলায় হাত বেঁধে উপস্থিত করা হবে। তার
ইনসাফ তাকে ছাড়িয়ে নিবে অথবা তার যুলুম তাকে ধ্বংস করবে’’। (আহমাদ ৯৫৭৩ ইব্নু আবী শাইবাহ্, হাদীস ১২৬০২ বায্যার, হাদীস
১৬৩৮, ১৬৩৯, ১৬৪০, দারিমী ২/২৪০ বায়হাক্বী ৩/১২৯)।
অত্যাচারী
প্রশাসক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুপারিশ পাবে না।
আবূ
উমামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘আমার
উম্মাতের মধ্য থেকে দু’ জাতীয় মানুষই (কিয়ামতের দিন) আমার সুপারিশ পাবে না। তাদের একজন
হচ্ছে বড় যালিম প্রশাসক এবং অন্যজন হচ্ছে প্রত্যেক ধর্মচ্যুত হঠকারী ব্যক্তি’’। (ত্বাবারানী/কাবীর খন্ড ৮ হাদীস ৮০৭৯ আর্রোয়ানী, হাদীস ১১৮৬
সা’হীহুত্ তারগীবি ওয়াত্ তারহীব, হাদীস ২২১৮)।
অত্যাচারী
আমীরের সহযোগীরাও কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পানি পান থেকে বঞ্চিত থাকবে।
’হুযাইফাহ্
ও জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘অচিরেই
এমন আমীর আসবে যারা হবে ফাসিক ও যালিম। যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য এবং তাদের যুলুমে
সহযোগিতা করবে তারা আমার নয় আর আমিও তাদের নই। তারা কখনোই আমার হাউজে কাউসারে অবতরণ
করবে না’’। (আহমাদ ৫/৩৮৪ হাদীস ১৫২৮৪ বায্যার, হাদীস ১৬০৬,
১৬০৭, ১৬০৯; হা’কিম ৪/৪২২ ত্বাবারানী/কবীর, হাদীস ৩০২০)।
(৪৩) পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়াঃ
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘আপনার
প্রভু এ বলে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত করবেনা এবং মাতা-পিতার
সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়জন তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তুমি
তাদেরকে বিরক্তি সূচক কোন শব্দ বলবেনা এবং তাদেরকে ভৎর্সনাও করবেনা। বরং তাদের সাথে
সম্মান সূচক নম্র কথা বলবে। দয়াপরবশ হয়ে তাদের প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকবে এবং সর্বদা
তাদের জন্য এ দো‘আ করবে যে, হে আমার প্রভু! আপনি তাদের প্রতি দয়া করুন যেমনিভাবে শৈশবে
তারা আমার প্রতি অশেষ দয়া করে আমাকে লালন-পালন করেছেন’’। (সুরা
ইস্রা/বানী ইসরাঈল্: ২৩-২৪)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘তোমার
মাতা-পিতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বস্ত্ত বা ব্যক্তিকে শরীক করতে পীড়াপীড়ি করে যে
ব্যাপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই তথা কুর‘আন ও হাদীসের কোন সাপোর্ট নেই তাহলে তুমি এ ব্যাপারে
তাদের কোন আনুগত্য করবেনা। তবে তুমি এতদ্সত্ত্বেও দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার
করবে এবং সর্বদা তুমি আমি (আল্লাহ্) অভিমুখী মানুষের পথ অনুসরণ করবে। কারণ, পরিশেষে
তোমাদের সকলকে আমার নিকটই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন আমি তোমাদের কর্ম সম্পর্কে তোমাদেরকে
অবশ্যই অবগত করবো’’। (সুরা লুক্বমান: ১৫)।
মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া একটি গুরুতর অপরাধঃ
আবূ
বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একদা তিনবার
বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সকলে বললেন,
হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা এবং পিতা-মাতার
অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন; এবার সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, শুনে রাখ!
মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, এ কথাটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। এমনকি আমরা বলতে লাগলাম, আর
যদি তিনি না বলতেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৬৫৪,
৫৯৭৬-৬২৭৩-৬২৭৪-৬৯১৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৬০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৭, আহমাদ ১২৩৩৮, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ২৪৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ্
ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা
গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া অথবা বলেছেন, মিথ্যা কসম
করা। শু’বাহ (রহ.) তাতে সন্দেহ করেন। এবং মুয়ায (রহ.) বলেন, শু’বাহ আমাদেরকে বর্ণনা
করেছেন, কবীরা গুনাহ্ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, মিথ্যা কসম করা আর মাতা-পিতার
অবাধ্য হওয়া অথবা বলেছেন প্রাণ হত্যা করা। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৭০, ৬৬৭৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৯১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪০৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মুগীরাহ
ইবনু শু‘বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন মায়ের নাফরমানী, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত
কবর দেয়া, কারো প্রাপ্য না দেয়া এবং অন্যায়ভাবে কিছু নেয়া আর অপছন্দ করেছেন অনর্থক
বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা, আর মাল বিনষ্ট করা। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪০৮, ৮৪৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৩১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৪৮)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন:
‘‘তিন
ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবেনা: যে ব্যক্তি কাউকে অনুগ্রহ করে পুনরায় খোঁটা দেয়, মাতা-পিতার
অবাধ্য এবং মদপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি’’। (জা’মিউস্ সাগীর
: ৬/২২৮)।
তিনি
আরো বলেন:
‘‘তিন
ব্যক্তির উপর আল্লাহ্ তা‘আলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাতা-পিতার
অবাধ্য ব্যক্তি’’। (জা’মিউস্ সাগীর : ৩/৬৯)।
তিনি
আরো বলেন:
‘‘তিন
ব্যক্তি বাইতুল্ মাক্বদিসে প্রবেশ করতে পারবেনা: অভ্যস্ত মদ্যপায়ী, মাতা-পিতার অবাধ্য
এবং যে ব্যক্তি কাউকে অনুগ্রহ করে পুনরায় খোঁটা দেয়’’। (সিল্সিলাতুল্
আহা’দীসিস্ সাহীহাহ্:২/২৮৯)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ‘আমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘সর্ববৃহৎ
অপরাধ হচ্ছে নিজ মাতা-পিতাকে লা’নত করা। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! মানুষ
কিভাবে নিজ মাতা-পিতাকে লা’নত করতে পারে? তিনি বললেন: তা এভাবেই সম্ভব যে, সে কারোর
মাতা-পিতাকে গালি দিলো। অতঃপর সে ব্যক্তি এর মাতা-পিতাকে গালি দিলো’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৯৭৩; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৫১৪১, আহমাদ ৬৫৪০, আধুনিক
প্রকাশনী- ৫৫৪০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৩৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪৪) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাঃ
মানুষ
একে অপরের সাথে বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িত। মানুষের মাঝের এই সম্পর্কের নাম হচ্ছে ‘আত্মীয়তা’।
পরস্পরের সাথে জড়িত মানুষ হচ্ছে একে অপরের ‘আত্মীয়’। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে আত্মীয়তার
সম্পর্ক সর্বতোভাবে জড়িত। আত্মীয় ছাড়া এ জীবন অচল। আত্মীয়দের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও
ভালবাসা নিয়েই মানুষ এ পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় না থাকলে
জীবন হয়ে যায় নীরস, আনন্দহীন, একাকী ও বিচ্ছিন্ন। তাই পার্থিব জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ক
রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
(ক) আল্লাহ বলেন,
“পক্ষান্তরে
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন
রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের
জন্যই রয়েছে লা’নত এবং তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের মন্দ আবাস”। (সুরা রাদ ২৫)।
(খ)
আল্লাহ বলেন,
“ক্ষমতায়
অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন
ছিন্ন করবে। ওরা তো তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিশপ্ত করে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন”।
(সুরা মোহাম্মাদ ২২-২৩)।
(গ)
আবূ বকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ (ন্যায়পরায়ণ শাসকের বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার মত মারাত্মক
আর কোন গুনাহ নাই, যার শাস্তি আল্লাহ ত্বরিতে দুনিয়াতে দেন এবং আখেরাতের জন্যও জমা
রাখেন। (সুনান ইবনু মাজাহ ৪২১১, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
২৫১১, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯০২,আহমাদ ১৯৮৬১, ১৯৮৮৫, সহীহাহ ৯১৭, আত-তালীকুর
রাগীব ৩/২২৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ)
যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
বলতে শুনেছেনঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৯৮৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৫৬, আহমাদ ১৬৭৩২, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৫৪৪৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ)
আবু মূসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তিন ব্যক্তি
জান্নাতে যাবে না। অভ্যস্ত মদ্যপায়ী, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ও যাদুতে বিশ্বাসী”।
(আহমদ, হাদীস নং ১৯৫৮৭; হাকিম, হাদীস নং ৭২৩৪; ইবন হিব্বান,
হাদীস নং ৫৩৪৬)।
(চ)
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আদম
সন্তানের আমলসমূহ প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে (আল্লাহ তা‘আলার নিকট) উপস্থাপন
করা হয়। তখন আত্মীয়তার বন্ধন বিচ্ছিন্নকারীর আমল গ্রহণ করা হয় না”। (আহমদ, হাদীস নং ১০২৭৭)।
(ছ)
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ মহান আল্লাহ বিদ্রোহী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর মতো অন্য কাউকে দুনিয়াতে
অতি দ্রুত আযাব দেয়ার পরও আখিরাতের আযাবও তার জন্য জমা করে রাখেননি। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(জ)
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ্
তা’আলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেন। এ থেকে তিনি নিস্ক্রান্ত হলে ’রাহিম’ (রক্ত সম্পর্কে)
দাঁড়িয়ে পরম করুণাময়ের আঁচল টেনে ধরল। তিনি তাকে বললেন, থামো। সে বলল, আত্মীয়তার বন্ধন
ছিন্নকারী লোক থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়েছি। আল্লাহ্ বললেন, যে তোমাকে
সম্পর্কযুক্ত রাখে, আমিও তাকে সম্পর্কযুক্ত রাখব; আর যে তোমার হতে থেকে সম্পর্ক ছিন্ন
করে, আমিও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করব এতে কি তুমি খুশী নও? সে বলল, নিশ্চয়ই, হে আমার
প্রভু। তিনি বললেন, যাও তোমার জন্য তাই করা হল। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, ইচ্ছে হলে
তোমরা পড়, ’’ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার
বাঁধন ছিন্ন করবে।’’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪৮৩০, ৪৮৩১, ৪৮৩২, ৫৯৮৭, ৭৫০২; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪১২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৫৫৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(ঝ)
আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, আ’মাশ এ হাদীস মারফূ’রূপে
বর্ণনা করেননি। অবশ্য হাসান (ইবনু ’আমর) ও ফিতর (রহ.) একে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম থেকে মারফূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ প্রতিদানকারী আত্মীয়তার হক সংরক্ষণকারী নয়। বরং আত্মীয়তার হক সংরক্ষণকারী সে
ব্যক্তি, যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হবার পরও তা বজায় রাখে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৯৯১, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৫৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঞ)
মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ)....আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!
আমার আত্মীয়-স্বজন আছেন। আমি তাদের সাথে সদাচরণ করি; কিন্তু তারা আমাকে বিচ্ছিন্ন
করে রাখে। আমি তাদের উপকার করে থাকি; কিন্তু তারা আমার অপকার করে। আমি তাদের সহনশীলতা
প্রদর্শন করে থাকি আর তারা আমার সঙ্গে মূৰ্খসুলভ আচরণ করে। তখন তিনি বললেন, তুমি যা
বললে, তাহলে যদি প্রকৃত অবস্থা তাই হয় তুমি যেন তাদের উপর জলন্ত অঙ্গার নিক্ষেপ করছ।
আর সর্বদা তোমার সঙ্গে আল্লাহর তরফ থেকে তাদের বিপক্ষে একজন সাহায্যকারী (ফেরেশতা)
থাকবে, যতক্ষণ তুমি এ অবস্থায় বহাল থাকবে। (সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৬৪১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬২৯৪, ইসলামিক
সেন্টার ৬৩৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আত্মীয়তার
সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহ তায়ালাও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) বলেন,
আবু
হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন
মহামহিম আল্লাহ যাবতীয় মাখলুকের সৃষ্টি সম্পন্ন করলেন তখন “রেহেম” (আত্মীয়তার বন্ধন)
উঠে দাড়ালো। তিনি বলেন, কি ব্যাপার! সে বললো, এ হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
থেকে আশ্রয় প্রার্থনাকারীর স্থান। তিনি বলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যে তোমাকে
যুক্ত রাখবে আমিও তাকে যুক্ত রাখবো এবং যে তোমাকে ছিন্ন করবে আমিও তাকে ছিন্ন করবো?
রেহেম বললো, হে প্ৰভু! তিনি বলেন, এটাই তোমার প্রাপ্য। অতঃপর আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন,
তোমরা চাইলে পড়তে পারোঃ “তোমরা আধিপত্য লাভ করলে হয়তো পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে
এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে”। (মুহাম্মাদ ৪৭/২২)। (আল-আদাবুল মুফরাদ ৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) আরো বলেন,
আবদুর
রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ
মহামহিম আল্লাহ বলেন, আমার নাম রহমান, দয়াময়। আমি রেহেম (জরায়ু, আত্মীয় সম্পর্ক)-কে
সৃষ্টি করেছি এবং আমার নাম থেকে তার নাম নির্গত করেছি। সুতরাং যে তাকে যুক্ত রাখবে
আমিও তাকে আমার সাথে যুক্ত রাখবো এবং যে তাকে ছিন্ন করবে আমিও তাকে আমার থেকে ছিন্ন
করবো। (আল-আদাবুল মুফরাদ ৫৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৪৫) কারো বংশ নিয়ে কটাক্ষ
করাঃ
বংশ
নিয়ে অন্যের সাথে গর্ব করা হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
ঈমানদারগণ! কোন মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোন মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা
যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য
নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে
উত্তম পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্ৰতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে
ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম”৷ (সূরা আল হুজুরাত ৪৯: ১১)।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শায়বাহ, ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) [শব্দাবলী তার]....আবূ মালিক আল আশ’আর
(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার উন্মাতের
মধ্যে জাহিলী যুগের চারটি কু-প্রথা রয়ে গেছে যা লোকেরা পরিত্যাগ করতে চাইবে না। (১)
বংশের গৌরব, (২) অন্যকে বংশের খোটা দেয়া, (৩) নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা
করা, (৪) মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা। তিনি আরও বলেন, বিলাপকারী যদি মৃত্যুর
পূর্বে তওবা না করে তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে এভাবে উঠানো হবে যে, তার গায়ে আলকাতরার
(চাদর) খসখসে চামড়ার ওড়না থাকবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ২০৪৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৩৪, হা-কিম : ১/৩৮৩ ত্বাবারানি/কাবীর, হাদীস
৩৪২৫, ৩৪২৬ বায়হাক্বী: ৪/৬৩; বাগাওয়ী ১৫৩৩ ইব্নু আবী শাইবাহ্ : ৩/৩৯০; আহমাদ : ৫/৩৪২,
৩৪৩, ৩৪৪ ‘আব্দুর রায্যাক : ৩/৬৬৮৬, ইসলামী ফাউন্ডেশন ২০২৮, ইসলামীক সেন্টার ২০৩৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে
সমস্ত সম্প্রদায় তাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব করে, তারা যেন অবশ্যই তা হতে বিরত
থাকে। কেননা তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। নতুবা তারা আল্লাহ তা’আলার দরবারে
গোবরে পোকার তুলনায় বেশি অপমানিত হবে, যা নিজের নাক দিয়ে গোবরের ঘুটা তৈরী করে। তোমাদের
হতে আল্লাহ তা’আলা জাহিলী যুগের গর্ব-অহংকার ও পূর্বপুরুষদের নিয়ে আত্মগৰ্ব প্রকাশ
দূরীভূত করেছেন। এখন সে মু’মিন-মুত্তাকী অথবা পাপাত্মা-দূরাচার। সমস্ত মানুষ আদম (আঃ)-এর
সন্তান। আর আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি হতে। (সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩৯৫৫, তা’লীকুর রাগীব (৪/২১, ৩৩, ৩৪), গাইয়াতুল মারাম ৩১২)।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(৪৬) বিনা কারণে মুসলিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাঃ
আবূ
আইউব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কোন লোকের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাই-এর সাথে তিন দিনের অধিক এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন
রাখবে যে, দু’জনে দেখা হলেও একজন এদিকে আরেকজন ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখবে। তাদের মধ্যে
যে আগে সালাম দিবে, সেই উত্তম লোক। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬০৭৭, ৬২৩৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৬০,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯১১, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৯৩২, আহমাদ ২৩৬৫৪,
মুসতাদ্রাক হাকীম : ৭২৯২, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫৩৫)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত হাদীছটি কোন দ্বীনী কারণ ব্যতীত পরস্পর সম্পর্ক
ছিন্নতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু দ্বীনের ত্রুটির কারণে শিক্ষা দেয়ার স্বার্থে সম্পর্ক
ছিন্ন করা যাবে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাবুকের যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা তিন ব্যক্তির
সাথে পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে রেখেছিলেন। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৪১৮; ২৭৫৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৯০৯, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৭৬৯, আহমাদ ১৫৭৭০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০৭৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
মুজাহিদ
(রহঃ) ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ কেউ যেন তার স্ত্রীকে মসজিদে আসতে বাধা না দেয়। (এ কথা শুনে)
’আবদুল্লাহ (রাঃ) এর এক ছেলে (বিলাল) বললেন, আমরা তো অবশ্যই তাদেরকে বাধা দিব। (এ সময়)
’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) তাকে বললেন, আমি তোমাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস বর্ণনা করছি। আর তুমি বলছ এ কথা? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ’আবদুল্লাহ
ইবনু ’উমার (রাঃ) মৃত পর্যন্ত আর তার সাথে কথা বলেননি। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১০৮৪, আহমাদ ৪৯১৩৩, আস্ সামার আল মুসতাত্বব ২/৭৩০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
তবে
সাক্ষাতে অবশ্যই সালাম ও কুশল বিনিময় এবং সম্ভবপর উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কারণ
এর মাধ্যমে ঐ ব্যক্তি বিদ‘আত ছেড়েও দিতে পারে। ইসলাম সর্বদা মানবীয় সম্পর্ককে উজ্জীবিত
করে।
আবূ
হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই
দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা
অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু
অংশে (’ইবাদাত সহযোগে) সাহায্য চাও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৩৯, ৫৬৭৩, ৬৪৬৩, ৭২৩৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪৭) মন্দ নামে ডাকাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
ঈমানদারগণ! কোন মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোন মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা
যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য
নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে
উত্তম পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্ৰতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে
ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম”৷ (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ১১)।
আবদুল্লাহ
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তাকে হত্যা করা কুফুরী। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৪৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী ৪৪০৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৪৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬০৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫০৫, সুনান ইবনু মাজাহ : ৬৯, সুনান
আন্ নাসায়ী : ৪১০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪৮) প্রতিবেশীর সাথে দুর্ব্যবহার করা বা কষ্ট দেয়াঃ
নিজ
প্রতিবেশীকে যে কোনভাবে কষ্ট দেয়াও আরেকটি কবীরা গুনাহ্। যে ব্যক্তি নিজ প্রতিবেশীকে
কষ্ট দেয় সে সত্যিকারের মু’মিন নয়।
আবূ
শুরায়হ্ (রাঃ) থেকে বণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলছিলেনঃ আল্লাহর
শপথ! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি
মু’মিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! কে সে লোক? তিনি বললেনঃ যে লোকের প্রতিবেশী
তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬০১৬, আহমাদ ৮৮৬৪, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ে জান্নাতে যাওয়া যাবে নাঃ
ইয়াহইয়া
ইবনু আইয়ুব, কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ ও আলী ইবনু হুজর (রহঃ)....আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) হতে
বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে
তার প্রতিবেশী নিরাপদ না থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭৮, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
নিজ প্রতিবেশীর প্রতি দয়াশীল হওয়া সত্যিকারের ঈমানের পরিচায়কঃ
হারমালাহ
ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ)....আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন ভালো
কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহর আখিরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীকে
সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানদের সমাদর
করে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৪৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭৯, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রাযিঃ)....আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে
সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয় এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের উপর
ঈমান রাখে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের
উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে নতুবা চুপ থাকে। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৮০, ইসলামিক
সেন্টারঃ ৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণঃ
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
‘‘রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হলো: হে আল্লাহ্’র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম! অমুক মহিলা রাত্রিবেলায় নফল নামায পড়ে এবং দিনের বেলায় নফল রোযা রাখে অথচ
সে কর্কশভাষী তথা নিজ মুখ দিয়ে অন্যকে কষ্ট দেয়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন: তার মধ্যে কোন কল্যাণ নিহিত নেই। সে জাহান্নামী’’। (হা’কিম ৪/১৬৬)।
জিব্রীল
(আঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিজ প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি লক্ষ্য
রাখতে এতো বেশি তাকিদ দিয়েছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ প্রতিবেশীকে
তাঁর ওয়ারিশ বানিয়ে দেয়ার আশঙ্কা পোষণ করেছেন।
ইবনু
’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
জিবরীল (আঃ) সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত করে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয়
যে, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন ৬০১৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৮১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৬২৫, আহমাদ ২৬০৭২, আধুনিক প্রকাশনী ৫৫৮১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৪৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
জিনিস
যতই সামান্য হোক না কেন তা প্রতিবেশীকে দিতে লজ্জাবোধ করবেন না। কারণ, কিছু না দেয়ার
চাইতে সামান্য দেয়াই ভালো।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ
হে মুসলিম মহিলাগণ! কোন প্রতিবেশী মহিলা যেন তার অপর প্রতিবেশী মহিলাকে (হাদিয়া ফেরত
দিয়ে) হেয় প্রতিপন্ন না করে। তা ছাগলের পায়ের ক্ষুরই হোক না কেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০১৭, ২৫৬৬, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৫৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৭৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
কামিল আল জাহদারী ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ)...আবু যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আবু যার! যখন তুমি তরকারি
রান্না করবে তখন তাতে পানি (শুরুয়া বা ঝোল) বেশি দিও এবং তোমার প্রতিবেশীকে কিছু প্রদান
করো। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৮২, ৬৫৮৩, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৬২৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৪৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৫০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জিনিস কম হলে তা নিকটতম প্রতিবেশীকেই দিবেঃ
আয়িশাহ
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু’জন প্রতিবেশী আছে।
আমি তাদের কার কাছে হাদিয়া পাঠাব? তিনি বললেনঃ যার দরজা তোমার বেশি কাছে, তার কাছে।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০২০, ২২৫৯, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৫৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উপরোক্ত
দলিলের ভিত্তিতে এটাই প্রমাণিত যে, প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরন করতে হবে, তাদের সাথে
ঝগড়া করা যাবে না, অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা যাবে না, প্রতিবেশীকে সাহায্য সহযোগীতা করতে
হবে পক্ষান্তরে যারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দিবে তারা জাহান্নামী।
(৪৯) মানুষকে কষ্ট দেয়াঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা মুমিন নরনারীকে বিপদাপন্ন করেছে তারপর তাওবা করেনি তাদের জন্য আছে জাহান্নামের
যন্ত্রণা”। (সূরা আল বুরূজ ৮৫ : ১০)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা
অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো”। (সূরা আল আহযাব
৩৩ : ৫৮)।
আবদুল্লাহ
ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মিম্বারের উপর উঠলেন এবং উচ্চস্বরে ডেকে বললেনঃ ’’হে মুসলিমগণ! যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ
করেছ এবং অন্তরে ইসলামের প্রভাব রাখোনি, তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লজ্জা
দিয়ো না এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। কেননা যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ অন্বেষণ
করে, আল্লাহ তা’আলা তার দোষ অন্বেষণ করেন। আল্লাহ তা’আলা যার দোষ খুঁজবেন, তাকে অপমান
করবেন, যদি সে নিজের ঘরের মধ্যেও থাকে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫০৪৪, সুনান আততিরমিযী ২০৩২, সহীহ আত্ তারগীব ২৩৩৯, গয়াতুল মারাম ৪২০, সহীহ
ইবনু হিব্বান ৫৭৬৩, আহমাদ ১৯৭৭৬, শু‘আবুল ঈমান ৬৭০৪, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী
১১২৮১)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(৫০) এমন কথা বলা যা বললে আল্লাহ
তা‘আলা রাগান্বিত হনঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম।
বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে? (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৬৫-৬৬)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় বান্দা
কখনও আল্লাহর সন্তুষ্টির কোন কথা বলে অথচ সে কথা সম্পর্কে তার চেতনা নেই। কিন্তু এ
কথার দ্বারা আল্লাহ্ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আবার বান্দা কখনও আল্লাহর অসন্তুষ্টির
কথা বলে ফেলে যার পরিণতি সম্পর্কে তার ধারণা নেই, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে
নিক্ষিপ্ত হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৪৭৮,
৬৪৭৭; আধুনিক প্রকাশনী- ৬০২৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬০৩৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কুতাইবাহ
ইবনু সাঈদ (রহঃ)...আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, বান্দা এমন কথা বলে, যার কারণে সে জাহান্নামের
মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমাকাশের মধ্যস্থিত দূরত্বের তুলনায়ও বেশি দূরে গিয়ে নিপতিত হবে।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৩৭১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৯৮৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭২১১, ইসলামিক সেন্টার ৭২৬৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৫১) মুসলিমকে কাফির বলাঃ
কোন
মুসলিমকে কাফের বলে অভিহিত করা কবীরা গোনাহ। কারণ রাসূল (ছাঃ) বলেন, যাকে কাফের বলা
হবে সে সত্যিকারে কাফের না হ’লে যে কাফের বলল তার দিকেই সেটা ফিরে আসবে।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন
কেউ তার মুসলিম ভাইকে ’হে কাফির’ বলে ডাকে, তখন তা তাদের দু’জনের কোন একজনের উপর বর্তায়।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১০৩, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৬৩৭, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৬৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫৬০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সাবিত
ইবনুয্ যহহাক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের নামে শপথ করে, তাহলে সে যেন তদ্রূপ
হয়ে যায় যা সে বলেছে। কোনো আদম সন্তানের পক্ষে ঐরূপ মানৎ পূর্ণ করা ওয়াজিব নয়, যার
সে সত্তা নয়। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস দ্বারা দুনিয়াতে আত্মহত্যা করল, কিয়ামত দিবসে তাকে
ঐ জিনিসের মাধ্যমেই শাস্তি দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মু’মিনকে লা’নাত (অভিসম্পাত)
করল, সে যেন তাকে হত্যাই করল। আর যে কোনো মু’মিনকে কাফির বলে অপবাদ দিল, সে যেন তার
হত্যাযজ্ঞের শামিল। যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে,
আল্লাহ তা’আলা তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধির পরিবর্তে বরং কমিয়ে দেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৪১০, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬০৪৭, ১৩৬৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১০, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৬১২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৫২) বিনা প্রয়োজনে ভিক্ষাবৃত্তি করাঃ
সাধারণ
অবস্থায় ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করা হারাম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি
একটি হীন ক্লেশকর কাজ। এর দ্বারা মানুষ তার চেহারাকেই ক্লান্ত করে ফেলে। তবে শাসকের
নিকট কিছু চাওয়া বা এমন অবস্থায় চাওয়া, যখন কোন গত্যন্তর নেই, তাহ’লে সেটি ভিন্ন কথা।
সামুরা ইবনু জুনদাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অন্য কারো নিকটে হাত পাতাটা ক্ষতের
সমতুল্য (হীন ও শ্রান্তিকর)। সাহায্য প্রার্থী নিজের মুখমণ্ডলকে এর দ্বারা ক্ষতবিক্ষত
(লাঞ্ছিত) করে। কিন্তু শাসকের নিকটে কোন কিছু চাওয়া বা যে লোকের হাত পাতা ব্যতীত আর
কোন উপায় নেই তার কথা ভিন্ন। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৬৮১, ছহীহুত তারগীব হা/৭৯২, সহীহ তা’লীকুর রাগীব (২/২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইসলাম
সর্বাবস্থায় হাত পাততে নিরুৎসাহিত করেছে। যুবায়র ইবনুল ’আও্ওয়াম (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ এক আঁটি লাকড়ি
রশি দিয়ে বেঁধে পিঠে বহন করে এবং তা বিক্রি করে। আল্লাহ তা’আলা এ কাজের দ্বারা তার
ইযযত সম্মান বহাল রাখেন (যা ভিক্ষা করার মাধ্যমে চলে যায়)। এ কাজ মানুষের কাছে হাত
পাতা অপেক্ষা তার জন্য অনেক উত্তম। মানুষ তাকে কিছু দিতে পারে আবার নাও দিতে পারে।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৪১, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ১৪৭০, ১৪৭১, ১৪৮০, ২০৭৪, ২৩৭৪,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৭৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩৮২, সুনান আননাসায়ী ২৫৮৯, সুনানুল কুবরা
লিল বায়হাক্বী ২৩৮১, সহীহ আল জামি‘ আস্ সহীহ ৭০৬৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করার উদ্দেশে মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায়, সে নিশ্চয় (জাহান্নামের)
আগুন কামনা করে। (এটা জানার পর) সে কম বা অধিক চাইতে থাকুক। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৩৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২২৮৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৪১, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৮৩৮, ইবনু আবী শায়বাহ্ ১০৬৭৩,
সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭৮৭১, সহীহ আল জামে আস্ সগীর ৬২৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
২২৬৭, ইসলামীক সেন্টার ২২৬৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সব সময় মানুষের কাছে চেয়ে থাকে, সে কিয়ামতের দিন এমনভাবে উপস্থিত
হবে যে, তার চেহারায় কোন গোশ্ত থাকবে না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৪৭৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৮০,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৫৩) স্বামীর অবাধ্য হওয়াঃ
কোন
মহিলা নিজ স্বামীর অবাধ্য হওয়াও কবীরা গুনাহ্’র অন্যতম। তাই তো আল্লাহ্ তা‘আলা এ জাতীয়
মহিলাদের জন্য পর্যায়ক্রমে কয়েকটি শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন,
‘‘আর
যে নারীদের তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদেরকে সদুপদেশ দাও তথা আল্লাহ্ তা‘আলার আযাবের
ভয়-ভীতি দেখাও, তাদেরকে শয্যায় পরিত্যাগ করো এবং প্রয়োজনে তাদেরকে প্রহার করো। এতে
করে তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের ব্যাপারে আর অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করো না।
নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা সমুন্নত মহীয়ান’’। (সুরা আননিসা
৩৪)।
কোন
মহিলা তার স্বামীর প্রয়োজনের ডাকে সাড়া না দিলে যদি সে তার উপর রাগান্বিত হয়ে রাত্রি
যাপন করে তা হলে ফিরিশ্তারা তার উপর লা’নত করতে থাকেন যতক্ষণ না সে সকালে উপনীত হয়।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায়
আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে,
তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। শুবা, আবূ হামযাহ,
ইবনু দাউদ ও আবূ মু‘আবিয়াহ (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় আবূ আওয়ানাহ (রহ.)-এর
অনুসরণ করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩২৩৭,
৫১৯৩, ৫১৯৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৪৩০,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৩৬, আহমাদ ৯৬৭৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৩০০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোন
মহিলা নিজ স্বামীর সমূহ অধিকার আদায় না করলে সে আল্লাহ্ তা‘আলার সমূহ অধিকার আদায় করেছে
বলে ধর্তব্য হবে না।
’আবদুল্লাহ্
ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেনঃ হে মু’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের
ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার
সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না।
কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে
স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের
প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য
অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে
জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত। (সুনান ইবনু মাজাহ ১৮৮০, ইরওয়াহ ৭/৫৫-৫৬, আদাবুয যিফাফ ১৭৮,
সহিহাহ ১২০৩, আহমাদ ৪/৩৮১, ইব্নু হিববান/ইহ্সান ৪১৫৯, বায়হাক্বী ৭/২৯২)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
স্বামীর সন্তুষ্টিতেই স্ত্রীর জান্নাত এবং তার অসন্তুষ্টিতেই স্ত্রীর
জাহান্নামঃ
একদা
জনৈকা সাহাবী মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার স্বামীর কথা
উল্লেখ করলে তিনি তাকে বলেন: ‘‘ভেবে দেখো তার সাথে তুমি কি ধরনের আচরণ করছো! কারণ,
সেই তো তোমার জান্নাত এবং সেই তো তোমার জাহান্নাম’’। (আহমাদ
৪/৩৪১, নাসায়ী/’ইশ্রাতুন্ নিসা’, হাদীস ৭৬, ৭৭, ৭৮, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮২, ৮৩, ইব্নু আবী
শাইবাহ্ ৪/৩০৪, হাকিম ২/১৮৯, বায়হাক্বী ৭/২৯১)।
কোন
মহিলা তার স্বামীর অবদানসমূহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে আল্লাহ্ তা‘আলা তার প্রতি
কখনো সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে তাকাবেন না।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘আল্লাহ্
তা‘আলা এমন মহিলার দিকে (সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে) তাকান না যে নিজ স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা
প্রকাশ করে না; অথচ সে তার স্বামীর প্রতি সর্বদাই মুখাপেক্ষিণী’’। (নাসায়ী/’ইশ্রাতুন্ নিসা’, হাদীস ২৪৯, ২৫০; হা’কিম ২/১৯০ বায়হাক্বী
৭/২৯৪ খতীব ৯/৪৪৮)।
কোন
মহিলা তার স্বামীকে দুনিয়াতে কষ্ট দিলে তার জান্নাতী অপরূপা সুন্দরী স্ত্রী তথা ’হূররা
সে মহিলাকে তিরস্কার করতে থাকে।
মুআয
ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যখন কোন স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতে তার আয়তালোচনা হুর স্ত্রীগণ
বলতে থাকেঃ ওহে! আল্লাহ্ তোমার সর্বনাশ করুন। তুমি তাকে কষ্ট দিও না। সে তো তোমার নিকট
অল্প দিনের মেহমান। অচিরেই সে তোমাকে ত্যাগ করে আমাদের নিকট চলে আসবে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২০১৪, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১১৭৪,
সহীহা ১৭৩, আদাবুল যিফাফ ১৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ্
তা‘আলা, তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং স্বামীর আনুগত্যহীনতার কারণেই
অধিকাংশ মহিলারা জাহান্নামে যাবে।
‘ইমরান
ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি জান্নাতের
অধিবাসী সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছি। আমি জানতে পারলাম, জান্নাতে অধিকাংশ অধিবাসী হবে দরিদ্র
লোক। জাহান্নামীদের সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছি, আমি জানতে পারলাম, এর বেশির ভাগ অধিবাসী
নারী।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩২৪১, ৫১৯৮, ৬৪৪৯,
৬৫৪৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৮৩৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৩৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ
৩০০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৯, আহমাদ ৫৪৪৩, আ.প্র. ২৯৩, ই.ফা. ২৯৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৫৪) স্ত্রীর ওপর অত্যাচার করা বা একাধিক স্ত্রীর প্রতি সমঅধিকার না
দেয়াঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তোমরা যতই ইচ্ছে কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনই পারবে না,
তবে তোমরা কোন একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না ও অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখো
না; যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল,
পরম দয়ালু”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১২৯)।
নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“আর
তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরার হাড়
থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরার ওপরের হাড়। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে
যাবে। আর যদি তা যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদেরকে ওসীয়ত
করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার জন্য”। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫১৮৬, ৩৩৩১, আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি
দুই’জন স্ত্রী থাকা অবস্থায় তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো, কিয়ামতের দিন সে পঙ্গু
অবস্থায় উপস্থিত হবে। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ২১৩৩,
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১১৪১, সুনান ইবনু মাজাহ ১৯৬৯, সুনান আননাসায়ী ৩৯৪২, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩২৩৬, আহমাদ ৮৩৬৩, ৯৭৪০,
৭৯৩৬, দারেমী ২২০৬, ইরওয়াহ ২০১৭, গয়াতুল মারাম ২২৯, সহীহাহ ২০৭৭, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫১,
আত-তা'লীকুর রাগীব ৩/৭৯, সহীহ আল জামি‘ ৭৬১, সহীহ আত্ তারগীব ১৯৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৫৫) স্বামীর ডাকে সাড়া না দেয়াঃ
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে
ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর
সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। শুবা, আবূ হামযাহ, ইবনু দাউদ ও আবূ মু‘আবিয়াহ (রহ.)
আ‘মাশ (রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় আবূ আওয়ানাহ (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩২৩৭, ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৪৩০-৩৪৩৩, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৪৩৬, রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন) ২৮৭ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮১,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ২১৪১, আহমাদ ৯৬৭৭,
৭৪২২, ৮৩৭৩, ৮৭৮৬, ৯৭০২, ৯৮৬৫, ১০৫৬৩, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৩০০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৫৬) মুত্‘আহ্ (সাময়িক চুক্তিভিত্তিক)বিবাহ করাঃ
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘আর
যারা নিজ যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী। তবে যারা নিজ স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের সঙ্গে যৌনকর্ম
সম্পাদন করে তারা অবশ্যই নিন্দিত নয়। এ ছাড়া অন্যান্য পন্থায় যৌনক্রিয়া সম্পাদনকারীরা
অবশ্যই সীমালংঘনকারী’’। (মা‘আরিজ ২৯-৩১)।
উক্ত
আয়াতের মর্মানুযায়ী যে মহিলার সাথে মুত্‘আ করা হচ্ছে সে প্রথমত: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির
নিয়মিত স্ত্রী নয়। কারণ, এ জাতীয় মহিলা বিধিসম্মতভাবে তার পক্ষ থেকে কোনো মিরাস পায়
না, চুক্তি শেষে তাকে তালাকও দিতে হয় না এবং তাকে ইদ্দতও পালন করতে হয় না। এমনকি সে
তার অধিকারভুক্ত দাসীও নয়। সুতরাং তার সাথে যৌনক্রিয়া সম্পাদন করা সীমালংঘনই বটে।
কুতায়বাহ
ইবনু সাঈদ (রহঃ)....রাবী’ ইবনু সাবরাহ আল জুহানী (রহঃ) থেকে তার পিতা সাবরাহ (রাযিঃ)
এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মুত্’আর
অনুমতি দিলেন। অতঃপর আমি ও অপর এক ব্যক্তি বানু আমির গোত্রের একটি মহিলার নিকট গেলাম।
সে ছিল দেখতে লম্বা ঘাড় বিশিষ্ট তরুণ উষ্ট্রীর ন্যায়। আমরা নিজেদেরকে তার নিকট (মুত্’আহ
বিবাহের জন্য) পেশ করলাম। সে বলল, আমাকে কী দিবে? আমি বললাম, আমার চাঁদর। আমার সাথীও
বলল, আমার চাঁদর। আমার চাঁদরের তুলনায় আমার সঙ্গীর চাঁদরটি ছিল উৎকৃষ্টতর, কিন্তু
আমি ছিলাম তুলনায় কম বয়সের যুবক। সে যখন আমার সঙ্গীর চাঁদরের প্রতি তাকায় তখন তা
তার পছন্দ হয় এবং বলল, তুমি এবং তোমার চাঁদরই আমার জন্য যথেষ্ট।
অতএব
আমি তার সাথে তিনদিন অতিবাহিত করলাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ কারো কাছে মুত্’আহ বিবাহের সূত্রে কোন স্ত্রী লোক থাকলে সে যেন তার পথ ছেড়ে
দেয় (ত্যাগ করে)। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৩১০,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪০৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৮৫, ইসলামীক সেন্টার ৩২৮৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত
বিবাহ্ ইসলামের শুরু যুগে কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধকালীন সময়ে সাহাবায়ে কিরাম যখন নিজ স্ত্রীদের
থেকে বহু দূরে অবস্থান করতেন তখন তাঁদেরই নিতান্ত প্রয়োজনে চালু করা হয়। যা মক্কা বিজয়ের
সময় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয় এবং যা কিয়ামত পর্যন্ত এ দীর্ঘ কালের যে কোন
সময় তার যতোই প্রয়োজন হোক না কেন তা আর চালু করা যাবে না।
মুহাম্মাদ
ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র আল হামদানী (রহঃ)....কায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এর সঙ্গে জিহাদে অংশগ্রহণ করতাম এবং আমাদের সঙ্গে আমাদের স্ত্রীগণ থাকত না। আমরা বললাম,
আমরা কি খাসী হব না? তিনি আমাদের তা থেকে নিষেধ করলেন। অতঃপর তিনি পরিধেয় বস্ত্র দানের
বিনিময়ে আমাদের নির্দিষ্ট কালের জন্য নারীদের বিবাহ করার রুখসত দিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ
(রাযিঃ) পাঠ করলেনঃ “হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য উৎকৃষ্ট যেসব বস্তু হালাল করেছেন,
সে সমুদয়কে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ
করেন না”— (সূরা আল মায়িদাহ ৫:৮৭)। (সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৩৩০১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৭৬, ইসলামীক সেন্টার
৩২৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
খাইবারের
যুদ্ধ পর্যন্ত সাধারণভাবে এ নিয়ম চালু ছিলো। অতঃপর তা উক্ত যুদ্ধেই সর্ব প্রথম নিষিদ্ধ
করে দেয়া হয়।
ইয়াহইয়া
ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ)....আলী ইবনু আবূ তালিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বরের যুদ্ধের দিন মুত্’আহ ও গৃহপালিত গাধার গোশত নিষিদ্ধ করেছেন।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৩২২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
১৪০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৯৭, ইসলামীক সেন্টার ৩২৯৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মক্কা
বিজয়ের সময় তা আবার কিছু দিনের জন্য চালু করা হয়। অতঃপর তা আবার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ
করে দেয়া হয়।
সাব্রাহ্
আল-জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
‘‘রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় প্রবেশ করে আমাদেরকে মুত্‘আ
করতে আদেশ করেন। অতঃপর মক্কা থেকে বের হতে না হতেই তা আবার নিষেধ করে দেন’’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৩১৩-৩৩২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
১৪০৬)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সকল
সাহাবায়ে কিরাম মুত্‘আ হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত ছিলেন। তবে ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আববাস্
(রা.) থেকে তা হালাল হওয়ার মতও পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি মৃত্যুর পূর্বে উক্ত মত পরিহার
করেছেন। অতএব তা সাহাবাদের সর্ব সম্মতিক্রমে হারামই প্রমাণিত হলো। নিম্নে সাহাবাগণের
কয়েকটি উক্তি উল্লিখিত হলো:
‘আলী
(রাঃ) বলেন: রমযানের রোযা অন্যান্য বাধ্যতামূলক রোযাকে রহিত করে দিয়েছে যেমনিভাবে তালাক,
ইদ্দত ও মিরাস মুত্‘আ বিবাহ্কে রহিত করে দিয়েছে। (মুস্বান্নাফি
আব্দির রায্যাক্ব ৭/৫০৫)।
‘আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্’ঊদ্ (রাঃ) বলেন: তালাক, ইদ্দত ও মিরাস মুত্‘আ বিবাহ্কে রহিত করে দিয়েছে।
(মুস্বান্নাফি আব্দির রায্যাক্ব ৭/৫০৫)।
‘আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) কে উক্ত মুত্‘আ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: তা ব্যভিচার।
(মুস্বান্নাফি আব্দির রায্যাক্ব ৭/৫০৫)।
‘আব্দুল্লাহ্
বিন্ যুবাইর (রা.) কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনিও বলেন: তা ব্যভিচার। (মুস্বান্নাফি ইব্নি আবী শাইবাহ্ ৩/৫৪৬)।
‘আব্দুল্লাহ্
বিন্ ‘আববাস্ (রা.) বলেন: মুত্‘আ বিবাহ্ হারাম। এর প্রমাণ সূরাহ মা‘আরিজের উনত্রিশ
থেকে একত্রিশ নম্বর আয়াত। (বায়হাক্বী ৭/২০৬)।
জা’ফর
বিন্ মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ্) কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: তা হুবহু
ব্যভিচার। এতে কোন সন্দেহ নেই। (বায়হাক্বী ৭/২০৭)।
ইমাম
নাওয়াওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন: ‘আল্লামাহ্ মাযিরী (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন: মুত্‘আ
বিবাহ্ ইসলামের শুরু যুগে জায়িয ছিলো। যা পরবর্তী যুগে বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা রহিত করা
হয় এবং এর হারামের উপর সকল গ্রহণযোগ্য আলিম একমত।
‘আল্লামাহ্
ক্বাযী ’ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন: শুধু রাফিযী ছাড়া সকল আলিম তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে
একমত এবং সবাই এ ব্যাপারেও একমত যে, এখনো কোন ব্যক্তি তা সম্পাদন করলে সাথে সাথেই তা
বাতিল হয়ে যাবে। চাই সে উক্ত মহিলার সাথে সঙ্গম করুক বা নাই করুক। (মুসলিম/ইমাম নাওয়াওয়ীর ব্যাখ্যা ৯-১০/১৮৯)।
শিয়া সম্প্রদায় এখনো উক্ত মুত্‘আ বিবাহ্কে হালাল মনে করে। যা কুর‘আন-সুন্নাহ্’র সম্পূর্ণ বিরোধী। কোনো কোনো বর্ণনা মতে ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আববাস্ (রা.) ও তাঁর কিছু ভক্তরা উক্ত বিবাহ্ জায়িয বললে বা করলে তা জায়িয হয়ে যাবে না। কারণ, কুর‘আন-সুন্নাহ্’র সামনে কোনো সাহাবার কথা গ্রহণযোগ্য নয়। উপরন্তু অন্যান্য সকল সাহাবা তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত এবং তিনিও পরিশেষে উক্ত মত থেকে ফিরে এসেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। মূলতঃ আজও যারা উক্ত অগ্রহণযোগ্য মতকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা নিশ্চয়ই নিজ কুপ্রবৃত্তির অদম্য পূজারী। নতুবা হারাম হওয়ার ব্যাপারটি সুনিশ্চিত হওয়ার পরও একটি বিচ্ছিন্ন মতকে আঁকড়ে ধরার আর অন্য কোন মানে হয় না।
(৫৭) গায়রে মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ বৈধ) মহিলার সাথে বিবাহহীন অবস্থায়
নির্জনে অবস্থান করাঃ
নারী-পুরুষের
কোনো নির্জন স্থানে একাকী বাস, কিছুক্ষণের জন্যও লোক-চক্ষুর অন্তরালে, ঘরের ভিতরে,
পর্দার আড়ালে একান্তে অবস্থান শরীয়তে হারাম। যেহেতু তা ব্যভিচার না হলেও ব্যভিচারের
নিকটবর্তী করে, ব্যভিচারের ভূমিকা অবতারণায় সহায়িকা হয়।
উমার
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো পুরুষ
অপর (মাহরাম নয় তথা বিবাহ বৈধ এমন) নারীর সাথে নিঃসঙ্গে দেখা হলেই শয়তান সেখানে তৃতীয়
জন হিসেবে উপস্থিত হয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩১১৮,
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১১৭১, ২১৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ
ব্যাপারে সমাজে অধিক শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয় দেওর-ভাবী ও শালী-বুনাই-এর ক্ষেত্রে। অথচ
এদের মাঝেই বিপর্যয় ঘটে অধিক। কারণ ‘পর চোরকে পার আছে, ঘর চোরকে পার নাই।’ তাই তো আল্লাহর
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের পক্ষে তাদের দেওরকে মৃত্যুর সাথে তুলনা
করেছেন।”
উক্বা
ইবনে আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তোমরা (বেগানা) নারীদের নিকট
(একাকী) যাওয়া থেকে বিরত থাক।’’ (এ কথা শুনে) জনৈক আনসারী নিবেদন করল, ‘স্বামীর আত্মীয়
সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?’ তিনি বললেন, ‘‘স্বামীর আত্মীয় তো মুত্যুসম (বিপজ্জনক)।’’
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫২৩২, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৫৫৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২১৭২, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১১৭১, আহমাদ
১৬৮৯৬, ১৬৯৪৫, দারেমী ২৬৪২, রিয়াদুস সলেহীহ-১৬৩৬, আধুনিক প্রকাশনী ৪৮৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৪৮৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
অতএব
দেবরের সাথে মায়ের বাড়ি, ডাক্তারখানা, অনুরূপ বুনাই-এর সাথে বোনের বাড়ি, ডাক্তারখানা
বা কোনো বিলাস-বিহারে যাওয়া-আসা এক মারাত্মক বিস্ফোরক প্রথা বা ফ্যাশন।
তদনুরূপ
তাদের সাথে কোনো কামরা বা স্থানে নির্জনতা অবলম্বন, বাড়ির দাসী বা দাসের সাথে গৃহকর্তা
বা কর্ত্রী অথবা তাদের ছেলে-মেয়ের সাথে নিভৃত বাস, বাগদত্তা বরকনের একান্তে আলাপ বা
গমন, বন্ধু-বান্ধবীর একত্রে নির্জন বাস, লিফটে কোনো বেগানা যুবক-যুবতীর একান্তে উঠা-নামা,
ডাক্তার ও নার্সের একান্তে চেম্বারে অবস্থান, টিউটর ও ছাত্রীর একান্তে নির্জন-বাস ও
পড়াশোনা, স্বামীর অবর্তমানে কোনো বেগানা আত্মীয় বা বন্ধুর সাথে নির্জন-বাস, ট্যাক্সি
ড্রাইভারের সাথে বা রিক্সায় রিকশাচালকের সাথে নির্জনে গমন, তথাকথিত পীর ও তথাকথিত মহিলা
মুরিদের একান্তে বয়াত ও তা‘লীম প্রভৃতি একই পর্যায়ের; যাদের মাঝে শয়তান কুটনি সেজে
অবৈধ বাসনা ও কামনা জাগ্রত করে কোনো পাপ সংঘটিত করতে চেষ্টা করে।
বারুদের
নিকট আগুন রাখা হলে বিস্ফোরণ তো হতেই পারে। যেহেতু মানুষের মন বড় মন্দ প্রবণ এবং দুর্নিবার
কামনা ও বাসনা মানুষকে অন্ধ ও বধির করে তোলে। তা ছাড়া নারীর মাঝে রয়েছে মনোরম কমনীয়তা,
মোহনীয়তা এবং চপলতা। আর শয়তান তো মানুষকে অসৎ কাজে ফাঁসিয়ে দিয়ে আনন্দ বোধ করে থাকে।
অনুরূপ কোনো বেগানা মহিলার সাথে নির্জনে নামায পড়াও বৈধ নয়।
তালাক
প্রাপ্তা স্ত্রীর নিকট নিজের সন্তান দেখতে গিয়ে বা কোনো কাজে গিয়ে তার সাথে নির্জনতাও
অনুরূপ। কারণ, সে আর স্ত্রী নেই। আর এমন মহিলার সাথে বিপদের আশঙ্কা বেশী। শয়তান তাদেরকে
তাদের পূর্বের স্মৃতিচারণ করে ফাঁসিয়ে দিতে পারে।
বৃদ্ধ-বৃদ্ধার
একান্তে বা তাদের সাথে যুবতী-যুবকের নির্জন বাস, কোনো হিজরে বা খাসি করা নারী-পুরুষের
আপসে বা তাদের সাথে যুবক-যুবতীর, একাধিক মহিলার সাথে কোনো একটি যুবক অথবা একাধিক পুরুষের
সাথে এক মহিলার, কোনো সুশ্রী কিশোরের সাথে যুবকের নির্জন বাসও অবৈধ। প্রয়োজন হলে এবং
মহিলার মাহরাম না পাওয়া গেলে কোনো মহিলার জামাতে একজন পুরুষ থেকে সফর করায় অনেকের নিকট
অনুমতি রয়েছে। প্রকাশ যে, মহিলার সাথে কোনো নাবালক শিশু থাকলে নির্জনতা কাটে না।
ব্যভিচার
থেকে সমাজকে দূরে রাখার জন্যই ইসলামে নারী-পুরুষে অবাধ মেলা-মেশা, নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একই অফিসে, মেসে, ক্লাসরুমে, বিয়ে ও মরা বাড়িতে, হাসপাতালে, বাজারে প্রভৃতি ক্ষেত্রে
উভয় জাতির একত্রে অবাধ মেলা-মেশা করা অবৈধ।
মুসলিম
নারীর শিক্ষার অর্থ এই নয় যে, তাকে বড় ডিগ্রী, সুউচ্চ পদ, মোটা টাকার চাকুরী পেতে হবে।
তার শিক্ষা জাতি গঠনের জন্য, সমাজ গড়ার জন্য, মুসলিম দেশ ও পরিবেশ গড়ার জন্য যতটুকু
দরকার ততটুকু শিখতে পারলেই যথেষ্ট; যদিও তা ঘরে বসেই হয়। তাছাড়া পৃথক গার্লস স্কুল-কলেজ
না থাকলে মিশ্র শিক্ষাঙ্গনে মুসলিম নারীর শিক্ষায় ‘জল খেতে গিয়ে ঘটি হারিয়ে যাওয়ার
ঘটনাই অধিক ঘটে থাকে; যে সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত হওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু আদর্শ
মুসলিম হওয়া যায় না। নারীর স্বনির্ভরশীলা হয়ে জীবন-যাপন করায় গর্ব আছে ঠিকই, কিন্তু
সুখ নেই। প্রকৃতির সাথে লড়ে আল্লাহর আইনকে অবজ্ঞা করে নানান বিপত্তি ও বাধাকে উল্লঙ্ঘন
করে অর্থ কামিয়ে স্বাধীনতা আনা যায় ঠিকই; কিন্তু শান্তি আনা যায় না। শান্তি আছে স্বামীর
সোহাগে, স্বামীর প্রেম, ভালোবাসা ও আনুগত্যে। পরিত্যক্তা বা নিপীড়িতা হলে এবং দেখার
কেউ না থাকলে মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজে তার কালাতিপাত করার যথেষ্ট সহজ উপায় আছে। যেখানে
নেই সেখানকার কথা বিরল। অবশ্য দ্বীন ও দুনিয়ার প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারলে এ সমস্যার
সমাধান সহজ হয়ে উঠবে। যারা পরকালের চিরসুখে বিশ্বাসী তারা জাগতিক কয়েকদিনের সুখ-বিলাসের
জন্য দ্বীন ও ইজ্জত বিলিয়ে দেবে কেন?
(৫৮) সন্তানদের মাঝে সমতা বিধান না করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তোমরা
সুবিচার কর। ইহা আল্লাহভীতির অধিকতর নিকটবর্তী। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর”।
(সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮)।
আমির
(রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি
যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা (রাঃ)
বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই।
তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা
বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে সাক্ষী
রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ?
তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে আল্লাহকে
ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। [নু‘মান (রাঃ)] বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে
গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ২৫৮৭, ২৫৮৬, সুনান আন্ নাসায়ী
: ৩৬৮১; সহীহ ইবনু হিববান : ৫১০৩, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৪১৬,
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৩৫০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সুলায়মান
ইবন হারব (রহঃ)....হাজিব ইবন মুফাযযাল তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমি
নু’মান ইবন বাশীর (রাঃ)-কে এরূপ বর্ণনা করতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করবে, তোমরা তোমাদের
সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করবে। (সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক
ফাউন্ডেশন) ৩৫০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৫৯) দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তারা
মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি তাদের সংগেই
আছেন রাতে যখন তারা, তিনি যা পছন্দ করেন না- এমন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং তারা যা করে
আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০৮)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কিয়ামতের দিন তুমি আল্লাহর কাছে ঐ লোককে সব থেকে খারাপ পাবে, যে দু’মুখো। সে এদের সম্মুখে
এক রূপ নিয়ে আসতো, আর ওদের সম্মুখে অন্য রূপে আসত। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৫৮, ৩৪৯৪; আহমাদ ১০৭৯৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬২৩, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৫৫১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হারমালাহ
ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ)....আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ব্যক্তিদের খনিজ ও গুপ্তধনের ন্যায় দেখতে পাবে।
অতএব যারা জাহিলী যুগে উত্তম ছিল তারা ইসলামেও উত্তম বলে বিবেচিত হবে। যখন তারা দীনী
জ্ঞানের অধিকারী হবে। কিংবা তোমরা এ ব্যাপারে অর্থাৎ ইসলামে উত্তম ব্যক্তি দেখতে পাবে
যারা তার পূর্বে চরমভাবে ইসলামকে ঘৃণা করত। আর তোমরা সবচেয়ে খারাপ ব্যক্তি হিসেবে
দেখতে পাবে সে সকল লোককে, যারা দ্বিমুখী চরিত্রের লোক- এরা এ দলের নিকট একমুখী কথা
বলে পুনরায় অপর এক দলের নিকট এসে আরেক ধরনের রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৩৪৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫২৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬২২৪, ইসলামিক সেন্টার ৬২৭২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইয়াহইয়া
ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ).....আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষের মধ্যে দু’ রূপধারী লোক সবচেয়ে নিকৃষ্ট। যে এ দলের
নিকট আসে একরূপ নিয়ে এবং অন্য দলের নিকট আসে অন্য আরেক রূপ নিয়ে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫২৪-৬৫২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৫২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৯২, ইসলামিক সেন্টার ৬৪৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ) চারিত্রিক কাবীরা গুনাহঃ
(৬০) মিথ্যা বলাঃ
মিথ্যা
বলা অথবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া একটি মারাত্মক অপরাধ।
আল্লাহ
তা‘আলার বাণীঃ ‘‘ওহে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত
হও।’’ (সূরাহ আত্-তাওবাহ ৯/১১৯)।
কোনো
বিষয়ে নিশ্চিত জানাশোনা না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে অনুমান ভিত্তিক কোনো কথা বলা সত্যিই
অপরাধ এবং তা অধিকাংশ সময় মিথ্যা হতেই বাধ্য।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘যে
বিষয়ে তোমার পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পেছনে পড়ো না তথা অনুমানের ভিত্তিতে কখনো
পরিচালিত হয়ো না। নিশ্চয়ই তুমি কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় এ সবের ব্যাপারে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত
হবে’’। (সুরা ইস্রা’/বানী ইস্রাঈল : ৩৬)।
আল্লাহ্
তা‘আলা আরো বলেন: ‘‘(অনুমান ভিত্তিক) মিথ্যাচারীরা ধ্বংস হোক’’। (সুরা যারিয়াত: ১০)।
মিথ্যুক
আল্লাহ্ তা‘আলার লা’নত পাওয়ার উপযুক্ত। মুবাহালার আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: ‘‘অতঃপর
আমরা সবাই (আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট) এ মর্মে প্রার্থনা করি যে, মিথ্যুকদের উপর আল্লাহ্
তা‘আলার লা’নত পতিত হোক’’। (সুরা আ’লি ’ইমরান : ৬১)।
মুলা‘আনার
আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: ‘‘পঞ্চমবার পুরুষ এ কথা বলবে যে, তার উপর আল্লাহ্ তা‘আলার
লা’নত পতিত হোক যদি সে (নিজ স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে) মিথ্যাবাদী
হয়ে থাকে’’। (সুরা নূর : ৭)।
মিথ্যা
কখনো কখনো মিথ্যাবাদীকে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয় এবং মিথ্যা বলতে বলতে পরিশেষে
সে আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট মিথ্যুক হিসেবেই পরিগণিত হয়।
আবদুল্লাহ
(রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সত্য নেকীর দিকে পরিচালিত
করে আর নেকী জান্নাতে পৌঁছায়। আর মানুষ সত্যের উপর কায়িম থেকে অবশেষে সিদ্দীক-এর দরজা
লাভ করে। আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, পাপ তাকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। আর
মানুষ মিথ্যা কথা বলতে বলতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাচারী প্রতিপন্ন হয়ে যায়।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৯৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৬৫৩১-(১০৩/২৬০৭), হাদীস সম্ভার ৩৫৪৮,
আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬৫৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫৫১)। হাদিসের মান সহিহ (Sahih)।
সামুরাহ্
বিন্ জুন্দুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: ’’একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সাহাবাদেরকে নিজ স্বপ্ন বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: গত রাত আমার নিকট দু’ জন ব্যক্তি এসেছে।
তারা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললো: চলুন, তখন আমি তাদের সাথেই রওয়ানা করলাম। যেতে যেতে
আমরা এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছুলাম যে চিত হয়ে শায়িত। অন্য আরেক জন তার পাশেই দাঁড়িয়ে
একটি মাথা বাঁকানো লোহা হাতে। লোকটি বাঁকানো লোহা দিয়ে শায়িত ব্যক্তির একটি গাল, নাকের
ছিদ্র এবং চোখ ঘাড় পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলছে। এরপর সে উক্ত ব্যক্তির অন্য গাল, নাকের ছিদ্র
এবং চোখটিকেও এমনিভাবে ছিঁড়ে ফেলছে। লোকটি শায়িত ব্যক্তির এক পার্শ্ব ছিঁড়তে না ছিঁড়তেই
তার অন্য পার্শ্ব পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে এবং লোকটি শায়িত ব্যক্তিটির সাথে সে ব্যবহারই
করছে যা পূর্বে করেছে। ফিরিশ্তাদ্বয় উক্ত ঘটনার ব্যাখ্যায় বলেন: উক্ত ব্যক্তির দোষ
এই যে, সে ভোর বেলায় ঘর থেকে বের হয়েই মিথ্যা কথা বলে বেড়ায় যা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে
ছড়িয়ে পড়ে’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৭, ৮৪৫;
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২২৭৫, আহমাদ ২০১১৫,
আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭১)। হাদিসের মান সহিহ (Sahih)।
বিশেষ
আফসোসের ব্যাপার এই যে, অনেক রসিক ব্যক্তি শুধুমাত্র মানুষকে হাসানোর জন্যই মিথ্যা
কথা বলে থাকেন। তাতে তার ইহলৌকিক অন্য কোন ফায়েদা নেই। অথচ সে অন্যকে ফুর্তি দেয়ার
জন্যই এমন জঘন্য কাজ করে থাকে।
হিযাম
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: ‘‘অকল্যাণ
হোক সে ব্যক্তির যে মানুষকে হাসানোর জন্যই মিথ্যা কথা বলে। অকল্যাণ হোক সে ব্যক্তির;
অকল্যাণ হোক সে ব্যক্তির’’। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
২৩১৫, গাইয়াতুল মারাম ৩৭৬, মিশকাত ৪৮৩৮, সহিহুল
জ’মে ৭০১৩)। হাদিসের মান হাসান (Hasan)।
উম্মু
কুলসুম বিনতে ‘উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন, সে ব্যক্তি মিথ্যাচারী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা
করার জন্য ভালো কথা পৌঁছে দেয় কিংবা ভালো কথা বলে। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৬৯২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী ৬৫২৭-(১০১/২৬০৫), আহমাদ
২৭৩৪১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৪৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৫১০)। হাদিসের মান সহিহ
(Sahih)।
উম্মে
কুল্সূম বিন্তে ’উক্ববাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র তিনটি ব্যাপারেই মিথ্যা বলার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলতেন:
‘‘আমি
মিথ্যা মনে করি না যে, কোন ব্যক্তি মানুষের পরস্পর বিরোধ মীমাংসার জন্য কোন কথা বানিয়ে
বলবে। তার উদ্দেশ্য কেবল বিরোধ মীমাংসাই। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি শত্রু পক্ষের সঙ্গে
যুদ্ধে জেতার জন্য কোন কথা বানিয়ে বলবে। তেমনিভাবে কোন পুরুষ নিজ স্ত্রীর সঙ্গে এবং
কোন মহিলা নিজ স্বামীর সঙ্গে কোন কথা বানিয়ে বলবে’’। (সুনান
আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯২১)। হাদিসের মান সহিহ (Sahih)।
ইব্নু
শিহাব যুহ্রী বলেন: আমার শুনাজানা মতে তিন জায়গায়ই মিথ্যা কথা বলা যায়। আর তা হচ্ছে
যুদ্ধ, মানুষের পরস্পর বিরোধ মীমাংসা এবং স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর কথা।
মিথ্যা
সাক্ষ্য প্রদানও কবীরা গুনাহ্গুলোর অন্যতম।
আল্লাহ্’র
খাঁটি বান্দাহ্দের বৈশিষ্ট্য তো এই যে, তারা কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দিবেন না। আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন: ‘‘আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না’’। (সুরা
ফুরকান : ৭২)।
মিথ্যেবাদী
মুসলমান একজন মুনাফিক।
আবদুল্লাহ
ইবনু‘ আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব
যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা
পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়।
(ক) আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে;
(খ) কথা বললে মিথ্যা বলে;
(গ) প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং
(ঘ)
বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪, ২৪৫৯, ৩১৭৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১১৩, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৫৮, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬,
সুনান আততিরমিযী ২৬৩২, সুনান আননাসায়ী ৫০২০, সুনান আবূদাউদ ৪৬৮৮, আহমাদ ৬৭২৯, ৬৮২৫,
৬৮৪০, ৬৭৮২, সহীহ ইবনু হিব্বান ২৫৪, সহীহ আত্তারগীব ২৯৩৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৩৩)। হাদিসেরমানঃ সহিহ (Sahih)।
(৬১) সতী-সাধ্বী নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়াঃ
মিথ্যে
অপবাদ হলো কারো ব্যাপারে অন্যের নিকটে এমন কথা বলা যা তার মাঝে নেই। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৮২৮, মুসলিম ৭০-(২৫৮৯), সহীহুল
জামি ৮৬, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৮৪৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৪১৯, সহীহ ইবনু
হিব্বান ৫৭৫৮, শু‘আবুল ঈমান ৬৭১৯, সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ১১৫১৮, আস্ সুনানুল কুবরা
২১৬৯৫, সুনানুদ্ দারিমী ২৭১৪, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৬৪৯৩, আহমাদ ৮৯৮৫, তিরমিযী ১৯৩৪,
আবূ দাঊদ ৪৮৯৪, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৫৩৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ক)
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,
‘‘নিশ্চয়ই
যারা সতী-সাধ্বী সরলমনা মু’মিন মহিলাদেরকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয় তারা দুনিয়া ও আখিরাতে
অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য (আখিরাতে) রয়েছে মহা শাস্তি’’। (সুরা
আননূর ২৩)।
(খ)
আল্লাহ্ তা‘আলা আরো বলেন,
‘‘যারা
সতী-সাধ্বী কোন মহিলাকে ব্যভিচারের অপবাদ দিলো; অথচ চারজন সাক্ষীর মাধ্যমে তা প্রমাণিত
করতে পারেনি তা হলে তোমরা ওদেরকে আশিটি করে বেত্রাঘাত করো, কারোর ব্যাপারে তাদের সাক্ষ্য
আর কখনো গ্রহণ করো না এবং তারাই তো সত্যিকার ফাসিক। তবে যারা এরপর তাওবা করে নিজেদেরকে
সংশোধন করে নেয় (তারা সত্যিই অপরাধমুক্ত)। কারণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল
ও পরম দয়ালু’’। (সুরা আননূর ৪-৫)।
(গ)
আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার সমর্থনে যখন আয়াত অবতীর্ণ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত
করেন। অতঃপর তিনি মিম্বার থেকে নেমে এসে দু’ জন পুরুষ ও একজন নারী সম্পর্কে নির্দেশ
দিলে তাদের উপর হাদ্দ কার্যকর করা হয়। (সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত) ৪৪৭৪, সুনান আততিরমিযী ৩১৮১; সুনান ইবনে মাজাহ্ ২৬১৫)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
(ঘ) আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
‘‘যারা
নিজ স্ত্রীদেরকে ব্যভিচারের অপবাদ দিলো অথচ তাদের সপক্ষে তারা ব্যতীত অন্য কোন সাক্ষী
নেই তা হলে তাদের প্রত্যেককে চার চার বার এ বলে সাক্ষ্য দিতে হবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদী।
পঞ্চমবার সে এ কথা বলবে যে, তার উপর আল্লাহ্ তা‘আলার লা’নত পতিত হোক সে যদি এ ব্যাপারে
মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে। তবে স্ত্রীর শাস্তি রহিত হবে সে এ ব্যাপারে চার চার বার সাক্ষ্য
দিলে যে, তার স্বামী নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী। পঞ্চমবার সে এ কথা বলবে যে, তার উপর আল্লাহ্
তা‘আলার গযব পতিত হোক যদি তার স্বামী এ ব্যাপারে সত্যবাদী হয়ে থাকে’’। (সুরা আননূর ৬-৯)।
(ঙ)
বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপবাদের অভিযোগের দণ্ড স্বরূপ এক ব্যক্তিকে বন্দী
করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭৮৫, সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত) ৩৬৩০, সুনান আননাসায়ী ৪৮৭৬, সুনান আততিরমিযী ১৪১৭, ইরওয়া ২৩৯৭)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
ইবনু
হাজার (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে ঐক্যমত রয়েছে যে, সতী-সাধ্বী নারীর উপর অপবাদ দেওয়ার
শাস্তি পুরুষের উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। (ফৎহুল বারী ১২/১৮১০)।
(৬২) গীবত ও চোগলখোরী করাঃ
অন্য
মানুষের অধিকার নষ্টের একটি বিশেষ দিক গীবত বা পরনিন্দা করা। কোনো মানুষের অনুপস্থিতিতে
তার কোনো সত্যিকারের দোষত্রুটি বলাই ইসলামের পরিভাষায় গীবত। যেমন,- একজন মানুষ বেটে,
রগচটা, অহঙ্কারী, তোতলা, বিলাসী, অল্প শিক্ষিত, জামাত কাযা করে, ধুমপান করে, স্ত্রী
পর্দা করে না, দ্বীনের অমুক কাজে অবহেলা করে ..., ইত্যাদি কোনো দোষ বা দৃষ্টিকটু বিষয়
সত্যিই তার মধ্যে রয়েছে। তার অনুপস্থিতিতে তার এই দোষ উল্লেখ করা গীবত ও কঠিন পাপ।
মুমিনের
পুণ্য বিনষ্ট করার অন্যতম কারণ গীবত। কুরআনে গীবতকে ‘মৃতভাইয়ের মাংস খাওয়া’-এর সাথে
তুলনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই পাপের ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে অগণিত হাদীসে
উম্মতকে সাবধান করেছেন। সবচেয়ে কঠিন বিষয় গীবত করা বান্দার হক্ক সংশিলষ্ট পাপ। সংশিলষ্ট
ব্যক্তি ক্ষমা না করলে এই অপরাধের কারণে আমাদের পুণ্য তাকে প্রদান করতে হবে।
মহান
আল্লাহ এরশাদ করেছেনঃ
“হে
মুমিনগণ তোমরা অধিকাংশ অনুমান-ধারণা পরিত্যাগ কর; কারণ কোনো কোনো অনুমান-ধারণা পাপ।
এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অপরের অনুপস্থিতিতে নিন্দা
করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মতৃ ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করতে চাইবে? বস্তুত তোমরা
তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।”
(সূরা হুজরাতঃ ১২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
আপনি আনুগত্য করবেন না প্ৰত্যেক এমন ব্যক্তির যে অধিক শপথকারী, লাঞ্ছিত, পিছনে নিন্দাকারী,
যে একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, কল্যাণের কাজে বাধা দানকারী, সীমালঙ্ঘনকারী,
পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত”। (সুরা আল কলম
১০-১৩)।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার।
তোমরা দোষ তালাশ করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পর হিংসা পোষণ করো না, একে অন্যের
প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর
বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৬৪, ৫১৪৩, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬২৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৫৫২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এভাবে
আমরা জানতে পারছি যে, অনুমানে কথা বলা এবং অন্যের দোষ অনুসন্ধান করা হারাম। শুধু তাই
নয়, অনুসন্ধান ছাড়াও যদি অন্যের কোনো দোষত্রুটি মানুষ জানতে পারে তা তার অনুপস্থিতিতে
উল্লেখ করা গীবত ও হারাম।
গীবত
১০০% সত্য কথা। কোনো ব্যক্তির ১০০% সত্য দোষত্রুটির কথা তার অনুপস্থিতিতে উল্লেখ করার
নামই গীবত।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস
করলেনঃ তোমরা কি জান গীবত কাকে বলে? সাহাবীগণ বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভালো জানেন।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার মুসলিম ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা,
যা তার কাছে খারাপ লাগবে। জিজ্ঞেস করা হলো, যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সে ত্রুটি বিদ্যমান
থাকে, তুমি যে দোষ-ত্রুটির কথা বললে, তার মধ্যে সে দোষ-ত্রুটি থাকলেই তো তুমি গীবত
করলে। আর যদি দোষ-ত্রুটি বর্তমান না থাকে, তবে তুমি ’’বুহতান’’ (মিথ্যারোপ) করলে।
(মুসলিম)
অপর
এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যদি তুমি তোমার ভাইয়ের এমন দোষের কথা বলো, যা তার মধ্যে রয়েছে,
তবে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তার সম্পর্কে এমন দোষের কথা বলো, যা তার মধ্যে নেই,
তবে তুমি তার প্রতি ’’বুহতান’’ (মিথ্যা অপবাদ) দিলে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৮২৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৬৪৮৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৮৯,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৮৭৪, সহীহুল জামি‘ ৮৬, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৮৪৪,
সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৪১৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৭৫৮, শু‘আবুল ঈমান ৬৭১৯, সুনানুন্ নাসায়ী
আল কুবরা ১১৫১৮, আস্ সুনানুল কুবরা ২১৬৯৫, সুনানুদ্ দারিমী ২৭১৪, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা
৬৪৯৩, আহমাদ ৮৯৮৫, তিরমিযী ১৯৩৪, আবূ দাঊদ ৪৮৯৪, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৫৩৮)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইসলামে অন্যের দোষ তার অনুপস্থিতিতে বলতে যেমন নিষেধ
করা হয়েছে, অপরদিকে তা গোপন করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
ইয়াহয়া
ইবনে বুকাইর (রাহঃ) .... আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)
বলেছেনঃ মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না এবং তাকে জালিমের হাতে সোপর্দ
করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পুরণ করবে আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। যে ব্যক্তি
(পৃথিবীতে) কোন মুসলমানের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর
করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন
করবেন। (সহিহ বুখারী ২২৮০, আন্তর্জাতিক নং: ২৪৪২, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৬৪৭২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৮০,
সুনান আততিরমিযি ১৪২৬, সুনান আননাসায়ি ৪৮৯৩, আহমদ ৫৩৩৪, ৫৬১৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৪২,
ইসলামিক সেন্টার ৬৩৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাসলামা ইবনু কানাব (রহঃ)...আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পরস্পরে হিংসা পোষণ করো না, পরস্পর
ধোঁকাবাজী করো না, পরস্পর বিদেষ পোষন করো না। একে অপরের (ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে) পশ্চাতে
শত্রুতা করো না এবং একের বেচাকেনার উপর অন্যে বেচা-কেনার চেষ্টা করবে না। তোমরা আল্লাহর
বান্দা রূপে ভাই ভাই হয়ে থাক।
এক
মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং হেয় করবে
না। তাকওয়া এইখানে, এই কথা বলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সীনার
প্রতি ইশারা করলেন তিনবার। একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে
হেয় করে। কোন মুসলিমের উপর (প্রত্যেক) মুসলিমের সবকিছু জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু হারাম।
(সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৬৩০৯)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
মিশরের
গভর্নর সাহাবী উকবা ইবনু আমির (রাঃ) এর সেক্রেটারী ‘আবুল হাইসাম দুখাইন’ বলেন, আমি
উকবা (রাঃ) কে বললামঃ, আমাদের কয়েকজন প্রতিবেশী মদপান করছে। আমি এখনি যেয়ে পুলিশ ডাকছি
যেন তাদের ধরে নিয়ে যায়। উকবা বলেন, তুমি তা করো না। বরং তুমি তাদেরকে উপদেশ দাও এবং
ভয় দেখাও।.... আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি কোনো মুমিন ব্যক্তির
দোষ গোপন করল, সে যেন জীবন্ত প্রেথিত একটি কন্যাকে তার কবর থেকে উঠিয়ে জীবন দান করল।”
(হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/৪২৬; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ২/২৭৫;
হাইসামী, মাওয়ারিদুয যামআন ৫/৩৫)। হাদিসটি সহীহ।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“পেছনে ও সামনে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ-ধ্বংস”।
(সুরা হুমাজাহ, আয়াত: ০১)।
একই
সুরায় শাস্তির কথা বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়
(জাহান্নামের একটি স্তর)। আর কিসে তোমাকে জানাবে হুতামা কি? আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন।
যা হৃদপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। নিশ্চয় তা তাদের আবদ্ধ করে রাখবে। প্রলম্বিত স্তম্ভসমূহে।’
(সুরা হুমাজাহ, আয়াত: ০৪)।
হুযায়ফাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে
শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ চোগলখোর বা নিন্দাকারী জান্নাতে
যাবে না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৫৬, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
১০৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৭৬৫, তিরমিযী ২০২৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১০৩৪, আবূ দাঊদ ৪৮৭১,
সহীহুল জামি‘ ৭৬৭২, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৮২১, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ২৪৫,
মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী ৬৩৭০, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৬৫৮৬,
মুসনাদুল হুমায়দী ৪৪৩, মুসনাদুল বাযযার ২৯৫৪, মুসনাদে আহমাদ ২৩৩০৫, শু‘আবুল ঈমান ১১১৯৫,
সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ১১৬১৪, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৪/১৭৯, আল মু‘জামুল কাবীর ২৯৫০,
আল মু‘জামুস্ সগীর ৫৬১, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৪১৯২, আস্ সুনানুল কুবরা ১৭১১৬, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১৯২, ইসলামিক সেন্টারঃ ১৯৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৬৩) আমানতের খিয়ানত করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও
খেয়ানত করো ন “। (সূরাঃ আল-আনফাল ২৭)।
আমানতের
খেয়ানত করা এবং কারো গোপন কথা প্রকাশ করা কবীরা গুনাহ এবং তা মুনাফিকের আলামত।
আবদুল্লাহ
ইবনু‘ আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব
যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা
পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়।
(ক) আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে;
(খ) কথা বললে মিথ্যা বলে;
(গ) প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং
(ঘ)
বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪, ২৪৫৯, ৩১৭৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১১৩, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৫৮, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬,
সুনান আততিরমিযী ২৬৩২, সুনান আননাসায়ী ৫০২০, সুনান আবূদাউদ ৪৬৮৮, আহমাদ ৬৭২৯, ৬৮২৫,
৬৮৪০, ৬৭৮২, সহীহ ইবনু হিব্বান ২৫৪, সহীহ আত্তারগীব ২৯৩৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৩৩)। হাদিসেরমানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“মুনাফিকরা
তো জাহান্নামের নিম্নতমস্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কখনো কোন সহায় পাবেন ন “।
(সুরা আন নিসা ১৪৫)।
(৬৪) অভিশাপ দেয়াঃ
কাউকে
অভিশাপ দেওয়া ইসলামে বড় পাপ ও গর্হিত কাজ, যা মূলত অভিশাপদাতার নিজের ক্ষতি করে। অকারণে
বা অন্যায়ভাবে অভিশাপ দিলে তা অনেক সময় অভিশাপকারীর ওপরই ফিরে আসে।
অনেকেই
রাগের সময় জিহবাকে সংযত রাখতে পারে না। ফলে বেদিশা হয়ে লা‘নত করে বসে। তাদের লা‘নতের
কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। মানুষ, পশু, জড় পদার্থ, দিন-ক্ষণ এমনকি নিজের সন্তান-সন্ততিদেরও
তারা লা‘নত করে বসে। দেখা যায়, স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে লা‘নত করে, আবার স্ত্রীও স্বামীকে
লা‘নত করে। এটি একটি মারাত্মক অন্যায়।
সাবিত
ইবনুয্ যহহাক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের নামে শপথ করে, তাহলে সে যেন তদ্রূপ
হয়ে যায় যা সে বলেছে। কোনো আদম সন্তানের পক্ষে ঐরূপ মানৎ পূর্ণ করা ওয়াজিব নয়, যার
সে সত্তা নয়। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস দ্বারা দুনিয়াতে আত্মহত্যা করল, কিয়ামত দিবসে তাকে
ঐ জিনিসের মাধ্যমেই শাস্তি দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মু’মিনকে লা’নাত (অভিসম্পাত)
করল, সে যেন তাকে হত্যাই করল। আর যে কোনো মু’মিনকে কাফির বলে অপবাদ দিল, সে যেন তার
হত্যাযজ্ঞের শামিল। যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে,
আল্লাহ তা’আলা তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধির পরিবর্তে বরং কমিয়ে দেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৪১০, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৪৭, ১৩৬৩,
আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬১২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মহিলাদেরকে বেশি বেশি লা‘নত করতে দেখা যায়ঃ
আবূ
সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈদুল ফিতর কিংবা কুরবানীর ঈদের দিন রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে গেলেন এবং নারীদের নিকট পৌঁছলেন। অতঃপর তাদের
উদ্দেশে বললেন, ’’হে নারী সমাজ! তোমরা দান-সদাক্বাহ্ (সাদাকা) কর। কেননা আমাকে অবগত
করানো হয়েছে যে, জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী নারী সমাজেরই হবে।’’ (এ কথা শুনে) তারা
বলল, হে আল্লাহর রসূল! এর কারণ কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,
’’তোমরা অধিক মাত্রায় অভিসম্পাত করে থাক এবং নিজ স্বামীদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে
থাক। বুদ্ধি ও দীনদারীতে দুর্বল হবার পরও বিচক্ষণ ও সচেতন পুরুষদের বেওকুফ বানিয়ে দেবার
জন্য তোমাদের চেয়ে অধিক পারঙ্গম আমি আর কাউকে দেখিনি।’’
(এ
কথা শুনে) নারীরা আরয করলো, হে আল্লাহর রসূল! বুদ্ধি ও দীনের ব্যাপারে আমাদের কী দুর্বলতা
রয়েছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ’’একজন নারীর সাক্ষ্য কি একজন
পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়?’’ তারা বলল, জি হাঁ! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, ’’এটাই হলো নারীদের বুদ্ধিমত্তার দুর্বলতা। আর নারীরা মাসিক ঋতু অবস্থায় সালাত
আদায় করতে ও সিয়াম পালন করতে পারে না। এটা কি সত্য নয়?’’ তারা উত্তরে বলেন, হাঁ তা-ই।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’এটাই হলো তাদের দীনের দুর্বলতা।’’
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৯, আহমাদ ৫৪৪৩, মুসলিম
৮০, সহীহাহ্ ১৯০, সহীহ আল জামি‘ ৭৯৮০, ইরওয়া ৯২৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৪৫, ইসলামিক
সেন্টারঃ ১৪৯-১৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এমনিভাবে
লা‘নতকারীরা কিয়ামত দিবসে সুপারিশকারীও হতে পারবে না।সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার এ যে, অন্যায়ভাবে
লা‘নত করলে তা লা‘নতকারীর ওপর বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। তাতে লা‘নতকারী মূলতঃ নিজকেই আল্লাহর
রহমত থেকে বঞ্চিত করার জন্য প্রার্থনাকারী হয়ে দাঁড়ায়।
(৬৫) সাহাবীদেরকে গালি দেয়াঃ
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাদেরকে গালি দেয়া আরেকটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ্।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘তোমরা
আমার সাহাবাদেরকে গালি দিও না। তোমরা আমার সাহাবাদেরকে গালি দিও না। সেই সত্তার কসম
যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমাদের কেউ আল্লাহ্ তা‘আলার রাস্তায় উহুদ্ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণ
সাদাকা করলেও তাদের কারোর এক অঞ্জলি সমপরিমাণ অথবা তার অর্ধেকের সাওয়াব পাবে না’’।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৩৮১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৫৪০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬২৫৬, ইসলামিক সেন্টার ৬৩০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
সাঈদ্ খুদ্রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা খালিদ বিন্ ওলীদ (রাঃ) ও আব্দুর রহমান
বিন্ ‘আউফ (রাঃ) এর মাঝে কোন একটি ব্যাপার নিয়ে মনোমালিন্য হলে খালিদ বিন্ ওলীদ (রাঃ)
আব্দুর রহমান বিন্ ‘আউফ (রাঃ) কে গালি দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা
শুনতে পেয়ে খালিদ বিন্ ওলীদ (রাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
‘‘তোমরা
আমার (প্রথম যুগের) কোন সাহাবাকে গালি দিও না। কারণ, তোমাদের কেউ আল্লাহ্ তা‘আলার রাস্তায়
উহুদ্ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণ সাদাকা করলেও তাদের কারোর এক অঞ্জলি সমপরিমাণ অথবা তার
অর্ধেকের সাওয়াব পাবে না’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৬৭৩; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৩৮২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৪১, সুনান ইবনু মাজাহ
১৬১, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৬৫৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৩৪০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
যারা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাদেরকে গালি দেয় তাদের উপর আল্লাহ্ তা‘আলা,
ফিরিশ্তা ও সকল মানুষের লা’নত পতিত হবে।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ‘আববাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘যে
ব্যক্তি আমার কোন সাহাবাকে গালি দিলো তার উপর আল্লাহ্ তা‘আলা, ফিরিশ্তা ও সকল মানুষের
লা’নত পতিত হোক’’। (ত্বাবারানী/কবীর ১২৭০৯ সা’হীহুল্ জামি’,
হাদীস ৫২৮৫)।
‘আলী,
আন্সারী সাহাবীগণ এমনকি যে কোন সাহাবীকে ভালোবাসা ঈমানের পরিচায়ক।
‘আলী
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
‘‘সে
সত্তার কসম যিনি বীজ থেকে উদ্ভিদ এবং সকল প্রাণী করেছেন! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন: একমাত্র মু’মিনই তোমাকে ভালোবাসবে এবং একমাত্র মুনাফিকই
তোমার সাথে শত্রুতা পোষণ করবে’’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ১৪৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৪৪, ইসলামিক সেন্টারঃ
১৪৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আনাস্
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘‘আন্সারী
সাহাবাগণকে ভালোবাসা ঈমানের পরিচায়ক এবং তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা মুনাফিকির পরিচায়ক’’।
(বুখারী ১৭, ৩৭৮৪; মুসলিম ৭৪)।
বারা
(রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,
মু’মিন ছাড়া আনসারদেরকে কেউ ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ তাঁদের প্রতি ঘৃণা পোষণ
করে না। যে ব্যক্তি তাঁদেরকে ভালবাসবে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে ভালবাসবেন আর যে ব্যক্তি
তাঁদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে ঘৃণা করবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৭৮৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫, আহমাদ ১৮৬০০, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ৩৫০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৫০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৬৬) অসমীচীন ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
ঈমানদারগণ! কোন মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোন মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা
যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য
নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে
উত্তম পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্ৰতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে
ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম”৷ (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ১১)।
দ্বীন
নিয়ে হাসি-ঠাট্টা’ বলতে বুঝায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে
নিয়ে অথবা দ্বীনের কোন বিধি-বিধানকে ঠাট্টা করা ও ব্যঙ্গ করা। যেমন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল
(ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গালি দেয়া, ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করা, আল-কুরআন ও
হাদীছ নিয়ে হাসি-তামাসা করা ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস
করেন, তাহলে তারা নিশ্চয় বলবে যে, ‘আমরা তো শুধু আলাপ-আলোচনা ও হাসি-তামাশা করছিলাম।’
আপনি বলে দিন, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তঁঅর রাসূলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ
করছিলে?’ তোমরা এখন (বাজে) অজুহাত পেশ কর না, তোমরা তো নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার পর
কুফরী করেছ, যদিও আমি তোমাদের মধ্য হতে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবুও কতককে শাস্তি দিব,
কারণ তারা অপরাধী’। (সূরা আত-তওবাহ : ৬৫-৬৬)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তারা
তোমাদের কাছে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হও। অতঃপর তোমরা তাদের প্রতি
সন্তুষ্ট হলেও আল্লাহ তো ফাসিক সম্প্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না”। (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৬৬)।
(৬৭) সীমালঙ্ঘন করাঃ
সীমালংঘন
একটি মারাত্মক অপরাধ।পৃথিবীর বুকে মানুষ নিজ প্রতিষ্ঠিত অধিকারে পুরোপুরি শক্তিশালী।
কেউ এর ব্যতিক্রম করতে চাইলে তা হয় আইনের পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো কোনো
ক্ষেত্রে তা সীমালংঘনে পরিণত হয়। অতএব মানুষের উপর আল্লাহর সুপ্রতিষ্ঠিত অধিকারে কারো
হস্তক্ষেপ যে কত বড় সীমালংঘন তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“শুধু
তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে যারা মানুষের উপর যুলুম করে এবং যমীনে অন্যায়ভাবে
বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদেরই জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”। (সূরা আশ্ শূরা ৪২ : ৪২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“বলুন,
নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা। আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালংঘন
এবং কোন কিছুকে আল্লাহ্র শরীক করা- যার কোন সনদ তিনি নাযিল করেননি। আর আল্লাহ্ সম্বন্ধে
এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না”। (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ৩৩)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ মহান আল্লাহ বিদ্রোহী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর মতো অন্য কাউকে দুনিয়াতে
অতি দ্রুত আযাব দেয়ার পরও আখিরাতের আযাবও তার জন্য জমা করে রাখেননি। (সুনান আবূ দাঊদ : ৪৯০২, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৫১১;
সুনান ইবনু মাজাহ : ৪২১১, আহমাদ ১৯৮৬১, ১৯৮৮৫, সহীহাহ ৯১৭, আত-তালীকুর রাগীব ৩/২২৮)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৬৮) অত্যাচার ও শত্রুতা করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
বলুন, সত্য তোমাদের রব-এর কাছ থেকে; কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে কুফরী
করুক। নিশ্চয় আমরা যালেমদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি আগুন, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন
করে রেখেছে। তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়, যা তাদের
মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে; এটা নিকৃষ্ট পানীয়! আর জাহান্নাম কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল”! (সূরা আল কাহ্ফ ১৮ : ২৯)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আদেশ
করা হবে, তোমরা উভয়ে(১) জাহান্নামে নিক্ষেপ কর প্রত্যেক উদ্ধত কাফিরকে”। (সূরা কফ ৫০ : ২৪-২৬)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“এরূপই
আপনার রবের পাকড়াও! যখন তিনি পাকড়াও করেন অত্যাচারী জনপদসমূহকে নিশ্চয় তার পাকড়াও
যন্ত্রণাদায়ক, কঠিন”। (সূরা হূদ ১১ : ১০২)।
আবূ
মূসা আশ’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা যালিমদের ঢিল দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন তাকে ধরেন, তখন আর ছাড়েন
না। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এ আয়াত পাঠ
করেন- ’’আর এরকমই বটে আপনার রবের পাকড়াও, যখন তিনি কোন জনপদবাসীকে পাকড়াও করেন তাদের
জুলুমের দরুন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও বড় যন্ত্রণাদায়ক, অত্যন্ত কঠিন’’- (সূরাহ হূদ
১১/১০২)। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৬৮৬, সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩১১০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৩২৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৩২৬)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৬৯) মারাত্মক ঝগড়া বিবাদ করাঃ
কারোর
সাথে কোন বিষয় নিয়ে অমূলক ঝগড়া-ফাসাদ করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তা এভাবে যে, কোন সত্য
প্রকাশ করার উদ্দেশ্য নেই বরং অন্যকে অপমান করা এবং নিজের কৃতিত্ব প্রকাশ করার উদ্দেশ্যেই
কারোর কথায় দোষ-ত্রুটি বের করার চেষ্টা করা।
আল্লাহ্
তা‘আলা কুর‘আন মাজীদে এ জাতীয় লোকদের লুক্কায়িত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ্ তা‘আলা
বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই
যারা কোন দলীল ছাড়াই আল্লাহ্ তা‘আলার নিদর্শনসমূহ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয় তাদের অন্তরে
রয়েছে শুধু অহঙ্কার যা সফল হবার নয়। অতএব তুমি আল্লাহ্ তা‘আলার শরণাপন্ন হও। তিনিই
তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা’’। (সুরা গাফির/মু’মিন : ৫৬)।
কারোর
সাথে তর্ক করলে তা একমাত্র সত্য অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যেই এবং সুন্দর পন্থায় হতে হবে।
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
‘‘তোমরা
ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সাথে একমাত্র উত্তম পন্থায়ই তর্কে লিপ্ত হবে’’। (সুরা আন্কাবূত ৪৬)।
কারোর
সাথে অনর্থক ঝগড়া-ফাসাদকারী আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট একেবারেই ঘৃণিত এবং তারাই তাঁর কোপানলে
পতিত।
আয়িশাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক হলো অতিমাত্রায় ঝগড়াটে, অর্থাৎ বেশী বেশী সর্বদা
ঝগড়া করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭৬২, সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪৫৭, ৪০২৩, ৭১৮৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৬৮, নাসায়ী ৫৪২৩,
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৯৭৬, আহমাদ ২৪২৭৭, সহীহাহ্ ৩৯৭০, সহীহ আত্ তারগীব ১৪২,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৯৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘যে
ব্যক্তি জেনেশুনে কারোর সাথে বাতিল কোন জিনিস নিয়ে ঝগড়া-ফাসাদ করলো আল্লাহ্ তা‘আলা
সত্যিই তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন যতক্ষণ না সে তা ছেড়ে দেয়’’। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭; আহমাদ ৫৩৮৫)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
কুর‘আন নিয়ে অমূলক ঝগড়া-ফাসাদ করা কুফরিঃ
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কুর‘আন
নিয়ে অমূলক ঝগড়া-ফাসাদ করা কুফরি’’। (সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত ৪৬০৩; আহমাদ ৭৮৪৮ ইব্নু হিববান/মাওয়ারিদ্, হাদীস ৫৯ হাকিম ২/২২৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোন
ব্যক্তি হিদায়াতের রাস্তা থেকে ফসকে গেলেই অহেতুক ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত হয়।
আবূ
উমামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কোন
জাতি হিদায়াত পাওয়ার পর আবারো পথভ্রষ্ট হয়ে গেলে (আল্লাহ্ তা‘আলা) তাদেরকে অহেতুক ঝগড়া-ফাসাদে
ব্যস্ত করে দেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত
করেন: যার মর্মার্থ: তারা শুধু বাক-বিতন্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে এমন কথা বললো। বস্ত্তত
তারা বাক-বিতন্ডাকারী সম্প্রদায়’’। সুরা যুখরুফ : ৫৮। (সুনান
আত তিরমিযী ৩২৫৩; আহমাদ ৫/২৫২-২৫৬; সুনান ইব্নু মাজাহ্ ৪৮, হাকিম ২/৪৪৮)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ উম্মতের মধ্যে এ জাতীয় বাকপটু মুনাফিকের আশঙ্কাই
করেছিলেন।
’ইমরান
বিন্ ’হুস্বাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন:
‘‘আমি
আমার উম্মতের ব্যাপারে প্রত্যেক বাকপটু মুনাফিকেরই বেশি আশঙ্কা করছি’’। (ত্বাবারানী/কবীর খন্ড ১৮ হাদীস ৫৯৩; ইব্নু হিববান ৮০ বায্যার,
হাদীস ১৭০)।
(৭০) অশ্রাব্য গালিগালাজ করাঃ
কোনো
মুসলিমকে গালি বা যে কোনভাবে কষ্ট দেয়া আরেকটি কবীরা গুনাহ্। যদিও সে লোকটি মৃত হোক
না কেনো।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘যারা
মু’মিন পুরুষ ও মহিলাদেরকে কোন অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয় তারা অপবাদ ও সুপষ্ট গুনাহ্’র
বোঝা বহন করে’’। (সুরা আহযাব : ৫৮)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্’ঊদ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন:
আবদুল্লাহ
ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তাকে হত্যা করা কুফরী। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১২৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৬৪, সুনান আততিরমিযী ১৯৮৩, ২৬৩৪, ২৬৩৫, সুনান আননাসায়ী ৪১০৫, ৪১০৬, ৪১০৭,
৪১০৮, ৪১০৯, ৪১১০,৪১১১ ৪১১২, ৪১১৩, আহমাদ ৩৬৩৯, ৩৮৯৩, ৩৯৪৭, ৪১১৫, ৪১৬৭, ৪২৫০, ৪৩৩২,
তাখরীজুল ঈমান লি ইবনুস সালাম ৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২৫, ইসলামিক সেন্টারঃ ১২৯)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আয়িশাহ্
(রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা
মৃতদের গালি দিও না। কারণ, তারা স্বীয় কর্মফল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। [ইমাম বুখারী (রহ.)
বলেন] ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুল কুদ্দুস ও মুহাম্মাদ ইবনু আনাস (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) হতে
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ‘আলী ইবনু জা‘দ, ইবনু আর‘আরা ও ইবনু আবূ ‘আদী (রহ.) শু‘বাহ
(রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় আদম (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৩৯৩, ৬৫১৬, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ১৩০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোনো
কোনো মানুষ অন্যের অনিষ্ট করতে বা তাকে কষ্ট দিতে সিদ্ধহস্ত। তাই অন্যরা সাধ্যমতো তার
থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে। এমন মানুষ আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট।
আয়িশাহ
(রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রবেশের
অনুমতি চাইল। তিনি লোকটিকে দেখে বললেনঃ সে সমাজের নিকৃষ্ট লোক এবং সমাজের দুষ্ট সন্তান।
এরপর সে যখন এসে বলল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দ সহকারে তার সাথে
মেলামেশা করলেন। লোকটি চলে গেলে ’আয়িশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যখন
আপনি লোকটিকে দেখলেন তখন তার ব্যাপারে এমন বললেন, পরে তার সাথে আপনি আনন্দচিত্তে সাক্ষাৎ
করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’আয়িশাহ! তুমি কখন
আমাকে অশালীন দেখেছ? কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে
নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার দুষ্টামির কারণে মানুষ তাকে ত্যাগ করে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৩২, ৬০৫৪, ৬৪৩১; সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৬৪৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৯১, আহমাদ ২৪১৬১, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৯৭,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
একজন
মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই। সুতরাং সে তার উপর যুলুম করতে পারে না, তার অসহযোগিতা করতে
পারে না এবং তাকে নীচও ভাবতে পারে না।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাসলামাহ ইবনু কা’নাব (রহঃ).....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পর
ধোকাবাজি করো না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশে অগোচরে
শত্রুতা করো না এবং একে অন্যের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয়ের চেষ্টা করবে না।
তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার
উপর অত্যাচার করবে না, তাকে অপদস্ত করবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না। তাকওয়া এখানে,
এ কথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার তার বক্ষের প্রতি ইঙ্গিত
করলেন। একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় জ্ঞান করে।
কোন মুসলিমের উপর প্রত্যেক মুসলিমের জান-মাল ও ইযযত-আবরু হারাম। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৩৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৬৪,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩০৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা
অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো”। (সূরা আল আহযাব
৫৮)।
(৭১) হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করাঃ
ইসলামে
হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা একটি জঘন্যতম কবীরা গুনাহ, যা মানুষের সমস্ত নেক আমল বা পুণ্যকে
আগুনের মতো জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়। এটি সামাজিক শান্তি নষ্ট করে, ঈমান দুর্বল করে
এবং পরকালে কঠিন শাস্তির কারণ হয়, এমনকি হিংসুকের গুনাহ মাফ করাও স্থগিত রাখা হয়।
আল্লাহ
সুবহানাহু তা'আলা বলেন, ‘এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে যখন সে হিংসা করে। (সূরা আল ফালাক, আয়াত : ৫)।
অন্যত্র
বলা হয়েছে,
‘এরা
কি শুধু মানুষের প্রতি এজন্য হিংসা পোষণ করে যে, আল্লাহ তাদরেকে বিশেষ অনুগ্রহ দান
করেছেন? (সূরা আন নিসা, আয়াত : ৫৪)।
আবদুল্লাহ
ইবনু মাসলামাহ ইবনু কা’নাব (রহঃ).....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পর
ধোকাবাজি করো না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশে অগোচরে
শত্রুতা করো না এবং একে অন্যের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয়ের চেষ্টা করবে না।
তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার
উপর অত্যাচার করবে না, তাকে অপদস্ত করবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না। তাকওয়া এখানে,
এ কথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার তার বক্ষের প্রতি ইঙ্গিত
করলেন। একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় জ্ঞান করে।
কোন মুসলিমের উপর প্রত্যেক মুসলিমের জান-মাল ও ইযযত-আবরু হারাম। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৩৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৬৪,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩০৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা
ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ তালাশ করো না, গোয়েন্দাগিরি
করো না, পরস্পর হিংসা পোষণ করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না এবং পরস্পর
বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৬৪, ৫১৪৩, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৬২৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৭২) গর্ব ও অহংকার করাঃ
গর্ব,
দাম্ভিকতা, অহঙ্কার ও অহংবোধ একটি মারাত্মক অপরাধ। যা আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট খুবই অপছন্দনীয়
এবং যা আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অসন্তুষ্টি ও জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণও বটে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর
না, নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না”। (সূরা লুক্বমান ৩১: ১৮)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই
তিনি (আল্লাহ্ তা‘আলা) অহংকারীদেরকে ভালোবাসেন না’’। (সুরা
না'হল : ২৩)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কোন
ব্যক্তি গর্বভরে চলাফেরা করলে এবং যে সত্যিই আত্মম্ভরী সে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ্ তা‘আলার
সাথে সাক্ষাৎ করবে অথচ আল্লাহ্ তা‘আলা তখন তার উপর খুবই অসন্তুষ্ট থাকবেন’’। (আহমাদ ৫৯৯৫ বুখারী/আল্-আদাবুল্ মুফ্রাদ্, হাদীস ৫৪৯; হা’কিম
১/৬০)।
আহমাদ
ইবনু ইউসুফ আল আযদী (রহঃ).....আবু সাঈদ আল খুদরী ও আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত।
তারা উভয়ে বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইজ্জত ও সম্মান
আল্লাহর ভূষণ এবং গর্ব ও অহংকার তার চাদর। যে লোক এ ক্ষেত্রে আমার সাথে টানা-হেঁচড়া
করবে আমি তাকে অবশ্যই সাজা দিব। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৭৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৬৪৪১, ইসলামিক সেন্টার ৬৪৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মূসা
(আঃ) সকল গর্বকারীদের থেকে আল্লাহ্ তা‘আলার আশ্রয় কামনা করেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
‘‘মূসা
(আঃ) বললো: যারা হিসাব দিবসে বিশ্বাসী নয় সে সকল অহঙ্কারী ব্যক্তি থেকে আমি আমার ও
তোমাদের প্রভুর আশ্রয় কামনা করছি’’। (সুরা গাফির/মু’মিন
: ২৭)।
সর্ব
প্রথম গুনাহ্ যা আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে করা হয়েছে তা হচ্ছে অহঙ্কার। আল্লাহ্ তা‘আলা
বলেন:
‘‘যখন
আমি ফিরিশ্তাদেরকে বললাম: তোমরা আদমকে সিজদাহ্ করো। তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই সিজদাহ্
করলো। শুধুমাত্র সেই অহঙ্কার বশত সিজদাহ্ করতে অস্বীকার করলো। আর তখনই সে কাফিরদের
অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো’’। (সুরা আল বাক্বারাহ্ : ৩৪)।
দলীল
বিহীন যারা কুর‘আন ও হাদীস নিয়ে অন্যের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় তারা অহঙ্কারীই বটে। আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘যারা
দলীল বিহীন আল্লাহ্ তা‘আলার আয়াতসমূহ নিয়ে ঝগড়া করে তাদের অন্তরে রয়েছে শুধু অহঙ্কারই
অহঙ্কার। তারা তাদের উদ্দেশ্যে কখনো সফলকাম হবে না। অতএব তুমি আল্লাহ্ তা‘আলার শরণাপন্ন
হও। তিনিই তো সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা’’। (সুরা গাফির/মু’মিন
: ৫৬)।
গর্বকারীরা
সত্যিই জাহান্নামী এবং যাদেরকে নিয়ে জাহান্নাম জান্নাতের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়েছে।
হারিস
ইবনু ওয়াহাব খুযাঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা দুর্বল এবং অসহায়;
কিন্তু তাঁরা যদি কোন ব্যাপারে আল্লাহর নামে কসম করে বসেন, তাহলে তা পূরণ করে দেন।
আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা রূঢ় স্বভাব, অধিক মোটা এবং
অহংকারী তারাই জাহান্নামী। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪৯১৮, ৬০৭১, ৬৬৫৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০৭৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮৫৩, আহমাদ
১৮৭৫৩, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৫৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৫৫৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
ইবনু আবূ উমর (রহঃ)....আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নাম ও
জান্নাত পরস্পর বাক-বিতণ্ডা করল। অতঃপর জাহান্নাম বলল, প্রতিপত্তি সম্পন্ন অহংকারী
লোকেরা আমার মাঝে প্রবেশ করবে। জান্নাত বলল, দুর্বল ও নিঃস্ব লোকেরা আমার মাঝে প্রবেশ
করবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা জাহান্নামকে বললেন, তুমি আমার আযাব, যাকে ইচ্ছা আমি তোমার
দ্বারা ’আযাব দিব। কোন কোন সময় তিনি বলেছেন, যাকে ইচ্ছা আমি তোমার দ্বারা বিপদে ফেলব।
তারপর তিনি জান্নাতকে বললেন, তুমি আমার রহমত, আমি যাকে ইচ্ছা তোমার দ্বারা রহমত করব।
তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই পেট ভর্তির ব্যবস্থা থাকবে। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০৬৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৮৪৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৯০৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৯৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
মুহাম্মাদ
ইবনু আল মুসান্না, মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার ও ইবরাহীম ইবনু দীনার (রহঃ)....আবদুল্লাহ
ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যার অন্তরে
অণুপরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, মানুষ
চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এ-ও কি অহঙ্কার? রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার
হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৬৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
১৬৭, ইসলামিক সেন্টারঃ ১৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
গর্বকারীদেরকে
আল্লাহ্ তা‘আলা কিয়ামতের দিন মানুষের আকৃতিতেই ছোট পিপীলিকার ন্যায় উঠাবেন। তখন তাদের
লাঞ্ছনার আর কোন সীমা থাকবে না।
আমর
ইবনু শু’আইব (রহঃ) হতে ক্রমানুসারে তার বাবা ও দাদার সুত্রে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাম্ভিক ব্যাক্তিদের কিয়ামত দিবসে ক্ষুদ্র পিপড়ার ন্যায়
মানুষের রূপে সমবেত করা হবে। তাদেরকে চারদিক হতে অপমান ও লাঞ্ছনা ছেয়ে ফেলবে। জাহান্নামের
বুলাস’ নামক একটি কারাগারের দিকে তাদেরকে টেনে নেয়া হবে, আগুন তাদেরকে গ্রাস করবে,
জাহান্নামীদের গলিত রক্ত ও পুঁজ তাদেরকে পান করানো হবে। (সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৪৯২, আহমাদ ৬৬৭৭ দায়লামী ৮৮২১ বায্যার ৩৪২৯, মিশকাত তাহকীক
সানী ৫১১২, তা’লীকুর রাগীব ৪/১৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
একদা
বানী ইস্রা’ঈলের জনৈক ব্যক্তি গর্ব করলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে কঠিন শাস্তি দেন। রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগেও এমন একটি ঘটনা ঘটে যায়।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
অথবা আবুল কাসিম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি আকর্ষণীয় জোড়া কাপড় পরিধান করতঃ চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে
পথ অতিক্রম করছিল; হঠাৎ আল্লাহ তাকে মাটির নীচে ধ্বসিয়ে দেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) অবধি
সে এভাবে ধ্বসে যেতে থাকবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৭৮৯, ৫৭৯০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৩৫৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৮৮, আহমাদ ১০০৪০,
আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৬০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সালামাহ্
বিন্ আকওয়া’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন,
‘‘জনৈক
ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বাম হাতে খাচ্ছিলো। তখন রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: ডান হাতে খাও। সে বললো: আমি ডান হাতে খেতে
পারবো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ঠিক আছে; তুমি আর পারবেও না।
দম্ভের কারণেই সে তা করতে রাজি হয়নি। অতএব সে আর কখনো ডান হাত মুখ পর্যন্ত উঠাতে পারেনি’’।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫১৬৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২০২১, ইব্নু হিববান খন্ড ১৪ হাদীস ৬৫১২, ৬৫১৩ বাইহাক্বী, হাদীস ১৪৩৮৮ ইব্নু আবী শাইবাহ্,
হাদীস ২৪৪৪৫; দা’রামী ২০৩২ আবূ ‘আওয়ানাহ্, ৮২৪৯, ৮২৫১, ৮২৫২; আহমাদ ১৬৫৪০, ১৬৫৪৬, ১৬৫৭৮
ত্বাবারানী/কাবীর খন্ড ৭ হাদীস ৬২৩৫, ৬২৩৬; ইব্নু ’হুমাইদ্ ৩৮৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৫০৯৬, ইসলামিক সেন্টার ৫১০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কিয়ামতের
দিন আল্লাহ্ তা‘আলা দাম্ভিকের সাথে কথা বলবেন না, তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন
না, তাকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করবেন না এবং তার জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আবূ
বকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ)...আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা কথা বললেন
না, তাদের (গুনাহ থেকে) পবিত্র করবেন না। রাবী আবূ মু’আবিয়াহ বলেন, তাদের প্রতি তাকাবেন
না। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (এরা হলো) (ক) ব্যভিচারী বুড়ো, (খ) মিথ্যাবাদী
শাসক বা রাষ্ট্রপ্রধান ও (গ) অহঙ্কার দরিদ্র ব্যক্তি। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী ১৯৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
১০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৯৭, ইসলামিক সেন্টারঃ ২০৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
আবদুল্লাহ
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, যে ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে পরনের কাপড় টাখ্নুর নিম্নভাগে ঝুলিয়ে চলাফিরা করে,
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দিবেন না। এ শুনে আবূ বকর (রাঃ) বললেন,
আমার অজ্ঞাতে কাপড়ের একপাশ কোন কোন সময় নীচে নেমে যায়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তো ফখরের সঙ্গে তা করছ না। মূসা (রহ.) বলেন, আমি সালিমকে
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কি ‘যে ব্যক্তি তার লুঙ্গি ঝুলিয়ে চলল’ বলেছেন? সালিম
(রহ.) বললেন, আমি তাকে শুধু কাপড়ের কথা উল্লেখ করতে শুনেছি। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৬৬৫, ৫৭৮৩, ৫৭৮৪, ৫৭৯১, ৬০৬২, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৫৩৪৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৮৫,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ কিয়ামতের
দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টি দিবেন না, তাদেরকে পবিত্রও
করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা
কারা? তারা তো বিফল হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেনঃ (১) যে ব্যক্তি পায়ের
গোছার নিচে পরিধেয় ঝুলিয়ে পরে, (২) যে ব্যক্তি দান করার পর খোঁটা দেয় এবং (৩) যে ব্যক্তি
মিথ্যা শপথ করে নিজের মাল বিক্রয় করে। (সুনান ইবনু মাজাহ
২২০৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬, সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ১২১১, নাসায়ী ২৫৬৩, ২৫৬৪, ৪৪৫৮, ৪৪৫৯, ৫৩৩৩, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৪০৮৭, আহমাদ ২০৮১১, ২০৮৯৫, ২০৯২৫, ২০৯৭০, ২১০৩৪, দারেমী ২৬০৫, গায়াতুম নারাম ১৭০, ইরওয়া
৯০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে
আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে”। (সূরা গাফির/আল মু’মিন ৪০ : ৬০)।
(৭৩) কৃপণতা করাঃ
সমাজে
এমন কিছু লোক আছে, যাদের অঢেল টাকা-পয়সা থাকলেও কৃপণতা তাদের পিছ ছাড়ে না। ফরয যাকাত
তো দূরে থাক সামান্য সায়েল কাতর কণ্ঠে কিছু চাইলেও তাদের হৃদয়ে সামান্যতম আঁচড় কাটে
না। দূর দূর করে বরং তাড়িয়ে দেয়। অথচ মহান আল্লাহ বলেন, “আর সাহায্য প্রার্থীকে ধমকাবে
না”। (সুরা যোহা ৯৩/১০)।
কৃপণদের
কঠিন শাস্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয় এবং উত্তম
বিষয়কে মিথ্যা মনে করে, অচিরেই আমরা তাকে কঠিন পথের জন্য সহজ করে দিব’। (সুরা লায়ল
৯২/৮-১০)। অর্থাৎ জাহান্নামের জন্য সহজ করে দিব।
আবদুল্লাহ
ইবনু ’আমর রাযিয়াল্লাহু ’আনহু সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন এবং বললেনঃ তোমরা কৃপণতার ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা
তোমাদের পূর্ববর্তীরা কৃপণতার কারণে ধ্বংস হয়েছে। অর্থলোভ তাদেরকে কৃপণতার নির্দেশ
দিয়েছে, ফলে তারা কৃপণতা করেছে, তাদেরকে আত্মীয়তা ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে, তখন তারা
তাই করেছে এবং তাদেরকে পাপাচারে প্ররোচিত করেছে, তখন তারা তাতে লিপ্ত হয়েছে। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ১৬৯৮, আহমাদ (হাঃ ৬৪৮৭) আহমাদ শাকির বলেন, এর সানাদ
সহীহ। ইবনু হিববান হাঃ ৫১৫৪), বায়হাক্বী)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কৃপণতা ও অসদাচরণ এক মুমিনের
মধ্যে একত্রে থাকতে পারে নাঃ
(ক)
আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ মু’মিনের মধ্যে দু’টি স্বভাব একত্রে জমা হতে পারে না, কৃপণতা এবং অসদাচরণ।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৭২, সুনান আততিরমিযী ১৯৬২,
সহীহ আত্ তারগীব ২৬০৮, শু‘আবুল ঈমান ১০৩৩৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ)
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ মানুষের মধ্যে যেসব স্বভাব পাওয়া যায় তার মধ্যে দু’টো স্বভাব সবচেয়ে গর্হিত।
একটি হলো চিত্ত অস্থিরকারী কৃপণতা, আর দ্বিতীয়টি হলো ভীতিকর কাপুরুষতা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৭৪, সুনান আবূ দাঊদ ২৫১১, ইবনু
আবী শায়বাহ্ ২৬৬০৯, আহমাদ ৮২৬৩, ইবনু হিব্বান ৩২৫০, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ৫৬০, সহীহ
আত্ তারগীব ২৬০৫, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৩৭০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেনঃ
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিদিন সকালে
দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান
দিন আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৪৪২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২২২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
১০১০, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৬০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
১৩৫৫, হাদীস সম্ভার ৯২৯, সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী ৯১৩৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী
৭৮১৬, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৬৫৮, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ৯২০, সহীহ আত্ তারগীব ৯১৪, সহীহ
আল জামি আস্ সগীর ৫৭৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
আর
আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তাদের জন্য তা মঙ্গল,
এমনটি যেন তারা কিছুতেই মনে না করে। বরং তা তাদের জন্য অমঙ্গল। যেটাতে তারা কৃপণতা
করবে কেয়ামতের দিন সেটাই তাদের গলায় বেড়ী হবে।(১) আসমান ও যমীনের সত্ত্বাধিকার একমাত্র
আল্লাহরই। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা বিশেষভাবে অবহিত। (সূরা
আ-লি ‘ইমরা-ন ১৮০)।
অতএব
আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ তাঁর পথে ব্যয় করতে কার্পণ্য করা চরম সীমালংঘন।
(৭৪) বাড়াবাড়ি করাঃ
আল্লাহ
তাআলা বলেনঃ ‘‘হে আহলে কিতাব! তোমরা তোমাদের
দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘন করোনা’’। (সূরা নিসাঃ ১৭১)।
আল্লাহ
তাআলা বলেনঃ
“বলুন,
হে কিতাবীরা! তোমরা তোমাদের দ্বীনে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না। আর যে সম্প্রদায় ইতোপূর্বে
পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের প্রবৃত্তির
অনুসরণ করো না”। (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৭৭)।
’আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্’ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
‘‘সীমা
লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক! রাসূল (সা.) এ বাক্যটি তিন বার উচ্চারণ করেন’’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৭৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭০,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৬০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৭৫) বিশ্বাসঘাতকতা করাঃ
বিশ্বাসঘাতক
ও ধোঁকাবাজিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
মুমিনের
অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সে অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করে এবং কারো সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা
করে না। মুনাফিকের চরিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মুনাফিকরা অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে।
আমানতের খেয়ানত করে। বিশ্বাসঘাতকতা করে ইসলামে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ
ইবাদত। কারো সঙ্গে কোনো বিষয়ে অঙ্গীকার করলে বা কাউকে কোনো কথা দিলে তা পালন করার নাম
ওয়াদা। জীবন চলার পথে প্রতিনিয়ত মানুষকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিতে হয়, সেগুলো পূরণের ব্যাপারে
ইসলাম জোরালো তাগিদ দিয়েছে। এ ব্যাপারে সামান্যতম শৈথিল্য প্রদর্শন মানবসমাজে মহাবিপর্যয়
ডেকে আনতে পারে। এ জন্য পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করবে,
নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে”।
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৪)।
প্রতিশ্রুতি
পূরণ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। ইরশাদ হয়েছে, “যে ব্যক্তি অঙ্গীকার পূরণ
করে, যা সে আল্লাহর সঙ্গে করছে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন”। (সুরা : ফাতহ, আয়াত
: ১০)।
প্রতিশ্রুতি
রক্ষা করা নবী-রাসুলদের বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, “এ কিতাবে ইসমাইলের বৃত্তান্তও
বিবৃত করো। নিশ্চয়ই সে ছিল প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে সত্যবাদী এবং রাসুল ও নবী”। (সুরা : মারইয়াম, আয়াত
: ৫৪)।
ইবনু
’উমার ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।
আর
ইমাম মুসলিম (রহঃ) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, আর যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে বা ধোঁকা দেয়, সে আমাদের
দলভুক্ত নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫২০, বুখারী
৭০৭, মুসলিম ১০১, সুনান আননাসায়ী ৪১০০, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৯, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৭৫,
আহমাদ ৯৩৯৬, সহীহ আল জামি‘ ৬২১৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কেউ
কাউকে ধোঁকা দিলে সেই ধোঁকাবাজের আমলনামায় একটি করে পাপ লেখা হয়।
আব্দুল্লাহ
ইবনু আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে বসা অবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে দিবো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেনঃ তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা
করছে? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ
যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে এ কারণে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ
হতো। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯৯১, মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৪৮৮২, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৪৮, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৯৪৩, মুসান্নাফ
ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৬০৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
ইবনু
উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলিত (খাড়া) করা হবে,
আর বলা হবে- এটা অমুকের পুত্র, অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৫, ৩৭২৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬১৭৮, ৩১৮৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪৪২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৫,
সুনান আবূ দাঊদ ২৭৫৬, সুনান আততিরমিযী ১৫৮১, আহমাদ ৪৬৪৮, সহীহ আল জামি‘ ১৬৮৩, সহীহ
আত্ তারগীব ৩০০১, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৭৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবূ
সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের
দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের নিতম্বের সাথে তার জন্য (অপরাধ অনুপাতে) একটা করে পতাকা
রাখা হবে।
অপর
বর্ণনাতে আছে, কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ
অনুপাতে পতাকা উত্তোলিত হবে। সাবধান! রাষ্ট্র প্রধানের বিশ্বাসঘাতকতাই হবে সর্ববৃহৎ
(অপরাধ)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৭, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৪৪৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৮, সুনান আততিরমিযী ২১৯১, আহমাদ ১১৩০৩,
সহীহাহ্ ১৬৯০, সহীহ আল জামি‘ ৫১৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জনগণের সাথে যারা ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করে তারা জান্নাতে যাবে নাঃ
জান্নাত
হচ্ছে মুমিনের জন্য। ঈমানদারের জন্য। সচ্চরিত্র মানুষের জন্য। জান্নাতে চিরস্থায়ী সুখময়
জীবন উপহার দেওয়া হবে মুমিনকে। ধোঁকাবাজ জান্নাতে যেতে পারবে না। তার জন্য জান্নাতের
দরজা বন্ধ। ধোঁকার হৃদয় জান্নাতে প্রবেশের ন্যূনতম যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। আবু বকর সিদ্দিক
(রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো কৃপণ, ছদ্মবেশধারী ধোঁকাবাজ, খিয়ানতকারী ও অসচ্চরিত্র
ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না। প্রথম যারা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়বে, তারা হবে দাস-দাসী,
যদি তারা আল্লাহ ও তাদের মনিবের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩২)।
হাসান
বাসরী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, উবাইদুল্লাহ্ ইবনু যিয়াদ (রহ.) মাকিল ইবনু ইয়াসারের মৃত্যুশয্যায়
তাকে দেখতে গেলেন। তখন মাকিল (রাঃ) তাকে বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করছি
যা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি যে, কোন বান্দাকে যদি আল্লাহ্ জনগণের নেতৃত্ব প্রদান করেন,
আর সে (প্রজাদের) কল্যাণ কামনার সঙ্গে তাদের তত্ত্বাবধান (কল্যাণ কামনা) না করে তথা
খিয়ানাতকারী বা প্রতারক হিসেবে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫০, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ২৫৯-২৬২, ৪৬২৩-৪৬২৫, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৪২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৭৬) অপকৌশল ও ঠকবাজি করাঃ
অপকৌশল
ও ঠকবাজি করা একপ্রকার কবিরাহ গুণাহ।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“যে
কেউ সম্মান-প্রতিপত্তি চায়, তবে সকল সম্মান-প্রতিপত্তির মালিক তো আল্লাহই। তাঁরই দিকে
পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত এবং সৎকাজ, তিনি তা করেন উন্নীত। আর যারা মন্দ কাজের
ফন্দি আঁটে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। আর তাদের ষড়যন্ত্র, তা ব্যর্থ হবেই”। (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ১০)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“যমীনে
ঔদ্ধত্য প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে। আর কূট ষড়যন্ত্র তার উদ্যোক্তাদেরকেই পরিবেষ্টন
করবে তবে কি এরা প্ৰতীক্ষা করছে পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রযুক্ত পদ্ধতির? কিন্তু আপনি
আল্লাহর পদ্ধতিতে কখনো কোন পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর পদ্ধতির কোন ব্যতিক্রমও লক্ষ্য
করবেন না”। (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ৪৩)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“নিশ্চয়
মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করে বস্তুতঃ তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন
তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে দাঁড়ায়, শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে
তারা অল্পই স্মরণ করে”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৪২)।
(৭৭) অন্যায়ভাবে মানুষকে হত্যা করাঃ
কাউকে
অবৈধভাবে হত্যা করাও কবীরা গুনাহ্। তবে উক্ত হত্যা আরো ভয়ঙ্কর বলে বিবেচিত হয় যখন তা
এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয় যাকে বাঁচানো সবার নৈতিক দায়িত্ব এবং যাকে হত্যা করা একেবারেই
অমানবিক। যেমন: নিষ্পাপ শিশু, নিজ মাতা-পিতা, নবী-রাসূল, ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রপতি
অথবা উপদেশদাতা আলিমকে হত্যা করা।
আবদুল্লাহ
(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কিয়ামতের দিন মানুষের (অপরাধের) মধ্যে সর্বপ্রথম নরহত্যার (অপরাধের) বিচার করা হবে।
(সুনান ইবনু মাজাহ ২৬১৫, ২৬১৭, সহীহুল বুখারী ৬৫৩৩, ৬৮৬৪,
মুসলিম ১৬৭৮, তিরমিযী ১৩৯৬, ১৩৯৭, নাসায়ী ২৯৯১, ২৯৯২, ২৯৯৩, ২৯৯৪, ২৯৯৬, আহমাদ ৩৬৬৫,
৪২০১, সহীহাহ ১৭৪৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই
যারা আল্লাহ্ তা‘আলার আয়াত ও নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে, অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা
করে এবং মানুষদের মধ্য থেকে যারা ন্যায় ও ইন্সাফের আদেশ করে তাদেরকেও। (হে নবী) তুমি
তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। এদেরই আমলসমূহ ইহকাল ও পরকালে নষ্ট হয়ে
যাবে এবং এদেরই জন্য তখন আর কেউ সাহায্যকারী হবে না’’। (সুরা
আ’লি ইমরা’ন: ২১-২২)।
আল্লাহ্
তা‘আলা উক্ত হত্যাকারীকে চির জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তিনি তার উপর অত্যন্ত
অসন্তুষ্ট। তেমনিভাবে তার উপর তাঁর অভিশাপ ও আখিরাতে তার জন্য দ্বিগুণ শাস্তির ব্যবস্থা
রয়েছে।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘আর
যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন মু’মিনকে হত্যা করে তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। তার মধ্যে
সে সদা সর্বদা থাকবে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তার প্রতি ক্রদ্ধ হবেন ও তাকে অভিশাপ দিবেন।
তেমনিভাবে তিনি তার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন ভীষণ শাস্তি’’। (সুরা নিসা: ৯৩)।
আল্লাহ্
তা‘আলা নিজ বান্দাহ্দের গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
‘‘আর
যারা আল্লাহ্ তা‘আলার পাশাপাশি অন্য কোন উপাস্যকে ডাকে না। আল্লাহ্ তা‘আলা যাকে হত্যা
করতে নিষেধ করেছেন যথার্থ (শরীয়ত সম্মত) কারণ ছাড়া তাকে হত্যা এবং ব্যভিচার করে না।
যারা এগুলো করবে তারা অবশ্যই শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি
দেয়া হবে এবং তারা ওখানে চিরস্থায়ীভাবে লাঞ্ছিতাবস্থায় থাকবে। তবে যারা তাওবা করে,
(নতুনভাবে) ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে; আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের পাপগুলো পুণ্য দিয়ে পরিবর্তন
করে দিবেন। আল্লাহ্ তা‘আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’’। (সুরা ফুর্কান: ৬৮-৭০)।
উক্ত
হত্যার ভয়াবহতার কারণেই আল্লাহ্ তা‘আলা শুধুমাত্র এক ব্যক্তির হত্যাকারীকে সকল মানুষের
হত্যাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন,
“উক্ত
কারণেই আমি বানী ইস্রাঈল্কে এ মর্মে নির্দেশ দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে হত্যার
বিনিময় অথবা ভূপৃষ্ঠে ফাসাদ সৃষ্টির হেতু ছাড়া অন্যায়ভাবে হত্যা করলো সে যেন সকল মানুষকেই
হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি কাউকে অবৈধ হত্যাকান্ড থেকে রক্ষা করলো সে যেন সকল মানুষকেই
রক্ষা করলো’’। (সুরা আল মা’য়িদাহ্ : ৩২)।
উক্ত
হত্যাকান্ডকে হাদীসের পরিভাষায় সর্ববৃহৎ গুনাহ্ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আনাস্
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
‘‘সর্ববৃহৎ
কবীরা গুনাহ্ হচ্ছে চারটি: আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা, কোন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে
হত্যা করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা কথা বলা। বর্ণনাকারী বলেন: হয়তো বা রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: মিথ্যা সাক্ষী দেয়া’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৭১; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৯২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪০৫)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
নিম্নোক্ত
হাদীসগুলোতে হত্যাকান্ডের ভয়াবহতা ও ভয়ঙ্করতা আরো সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
ইবনু
আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের
দিন নিহত ব্যক্তি নিজ হাতে তার হত্যাকারীকে তার কপালের চুল ও মাথা ধরে নিয়ে আসবে।
তার ঘাড়ের কর্তিত রগসমূহ হতে রক্ত বের হতে থাকবে। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! এ লোক
আমাকে হত্যা করেছে। এমনকি সে তার হত্যাকারীকে নিয়ে আরশের নিকট পৌছে যাবে।
আমর
ইবনু দীনার বলেন, লোকেরা ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর নিকট (হত্যাকারীর) তাওবার বিষয়ে আলোচনা
করলে তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন (অনুবাদ) “কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে
হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি
রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন"-
(সূরা আন-নিসাঃ ৯৩)। তিনি বলেন, এ আয়াত মানসূখও হয়নি বা তার বিধান পরিবর্তিতও হয়নি।
অতএব তার আর তাওবা কিসের। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩০২৯, মিশকাত তাহকীক সানী ৩৪৬৫, তা’লীকুর রাগীব
৩/২০৩, সুনান ইব্নু মাজাহ্ ২৬৭০; সুনান আননাসায়ী ৪৮৬৬)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘মু’মিন
ব্যক্তি সর্বদা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ভোগ করবে যতক্ষণ না সে কোন অবৈধ রক্তপাত
করে’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৬২, ৬৮৬৩, আধুনিক
প্রকাশনী- ৬৩৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ’উমর (রা.) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘এমন
ঝামেলা যা থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই তা হচ্ছে অবৈধভাবে কারোর রক্তপাত করা’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৬৩, ৬৮৬২, আধুনিক প্রকাশনী-
৬৩৮৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৯৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
সা’ঈদ ও আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন:
‘‘যদি
আকাশ ও পৃথিবীর সকলে মিলেও কোন মু’মিন হত্যায় অংশ গ্রহণ করে তবুও আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের
সকলকে মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’’। (সুনান আত
তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৩৯৮, রাওযুন-নায়ীর ৯২৫,
তা’লীকুর রাগীব ৩/২০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্ঊদ (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন:
‘‘কোন
মুসলিমকে গালি দেয়া আল্লাহ্’র অবাধ্যতা এবং তাকে হত্যা করা কুফরি’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৮, ৬০৪৪,৭০৭৬; সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ১২৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৪, আহমাদ ৩৬৪৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জারীর
বিন্ ‘আব্দুল্লাহ্ আল্-বাজালী, আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর, আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আববাস্ ও
আবূ বাক্রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘আমার
ইন্তিকালের পর তোমরা কাফির হয়ে যেও না। পরস্পর হত্যাকান্ড করো না’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১২১, ১৭৩৯, ৪৪০৫, ৬১৬৬, ৬৭৮৫,
৬৮৬৮, ৬৮৬৯, ৭০৮০; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫, আহমাদ ১৯২৩৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১১৯, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ‘আমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘আল্লাহ্
তা‘আলার নিকট পুরো বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়া অধিকতর সহজ একজন মুসলিম হত্যা অপেক্ষা’’।
(সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৩৯৫; সুনান আন নাসায়ী
৩৯৮৭; সুনান ইব্নু মাজাহ্ ২৬৬৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ‘আমর (রা.) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন,
‘‘যে
ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ কোন কাফিরকে হত্যা করলো সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না; অথচ জান্নাতের
সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়’’। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৯১৪, ৩১৬৬; সুনান ইব্নু মাজাহ্ ২৬৮৬, সুনান আননাসায়ী ৪৭৫০,
গায়াতুল মারাম ৪৪৯, (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৩৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৪৬)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
তারীফ
আবূ তামীমা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাফওয়ান (রহ.), জুনদাব (রাঃ) ও তাঁর সাথীদের
কাছে ছিলাম। তখন তিনি তাদের নাসীহাত করছিলেন। তারা জিজ্ঞেস করল, আপনি কি রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- থেকে কোন কথা শুনেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি তাঁকে
বলতে শুনেছি যে, যারা মানুষকে শোনাবার জন্য কোন কাজ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার
এ কথা শুনিয়ে দেবেন। আর যারা অন্যের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্
তা’আলা তার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করবেন। তাঁরা পুনরায় বলল, আমাদেরকে কিছু নাসীহাত করুন।
তিনি বললেন, মানুষের দেহের যে অংশ প্রথম দুর্গন্ধময় হবে, তা হল তার পেট। কাজেই যে ব্যক্তি
সামর্থ্য রাখে যে একমাত্র পবিত্র (হালাল) খাদ্য ব্যতীত আর কিছু সে আহার করবে না, সে
যেন তাই করতে চেষ্টা করে। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে যে এক আঁজলা পরিমাণ রক্তপাত
ঘটিয়ে তার ও জান্নাতের মাঝে বাধা সৃষ্টি করবে না, সে যেন অবশ্যই তা করে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫২, ৬৪৯৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৬৬৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হত্যাকারী এবং হত্যাকৃত উভয় ব্যক্তিই জাহান্নামীঃ
আহনাফ
ইবনু কায়স (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (সিফফীনের যুদ্ধে) এ ব্যক্তিকে [আলী (রাযি.)-কে]
সাহায্য করতে যাচিছলাম। আবূ বকরাহ্ (রাযি.)-এর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি বললেনঃ ’তুমি
কোথায় যাচ্ছ?’ আমি বললাম, ’আমি এ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে যাচ্ছি।’ তিনি বললেনঃ ’ফিরে
যাও। কারণ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, দু’জন
মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হলে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে
যাবে।’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল্! এ হত্যাকারী (তো অপরাধী), কিন্তু নিহত ব্যক্তির
কী অপরাধ? তিনি বললেন, (নিশ্চয়ই) সেও তার সাথীকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩১, ৬৮৭৫, ৭০৮৩; সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৭১৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮৮৮, আহমাদ ২০৪৪৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ্
তা‘আলার নিকট ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর ক্ষমার আশা খুবই ক্ষীণ।
মু‘আবিয়া
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি
তিনি বলেন:
‘‘প্রতিটি
গুনাহ্ আশা করা যায় আল্লাহ্ তা‘আলা তা ক্ষমা করে দিবেন। তবে দু’টি গুনাহ্ যা আল্লাহ্
তা‘আলা ক্ষমা করবেন না। আর তা হচ্ছে, কোন মানুষ কাফির অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে অথবা
ইচ্ছাকৃত কেউ কোন মু’মিনকে হত্যা করলে’’। (সুনান আননাসায়ী
৩৯৮৪; আহমাদ ১৬৯০৭; হা’কিম ৪/৩৫১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোন
মহিলার গর্ভ ধারণের চার মাস পর দরিদ্রতার ভয়ে তার গর্ভপাত করাও কাউকে অবৈধভাবে হত্যা
করার শামিল।
’আবদুল্লাহ
(ইবনু মাস’ঊদ) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার
দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম,
তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে
তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর
স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১,
৭৫২০, ৭৫৩২; আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪১১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪১২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
তবে
শরীয়ত সম্মত তিনটি কারণের কোন একটি কারণে শাসক গোষ্ঠীর জন্য কাউকে হত্যা করা বৈধ।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘এমন
কোন মুসলিমকে হত্যা করা জায়িয নয় যে এ কথা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা ছাড়া কোন
মা’বূদ নেই এবং আমি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্’র রাসূল। তবে তিনটি
কারণের কোন একটি কারণে তাকে হত্যা করা যেতে পারে অথবা হত্যা করা শরীয়ত সম্মত। তা হচ্ছে,
সে কাউকে হত্যা করে থাকলে তাকেও হত্যা করা হবে। কোন বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচার করলে।
কেউ ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করলে এবং জামা‘আত চ্যুত হলে’’। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৭৮; সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৪২৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৭৬; সুনান আবূ দাউদ ৪৩৫২; সুনান আততিরমিযী
১৪০২; সুনান ইব্নু মাজাহ্ ২৫৮২; ইব্নু হিববান ৪৪০৮ ইব্নু আবী শাইবাহ্, হাদীস ৩৬৪৯২;
আহমাদ ৩৬২১, ৪০৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কেউ
কাউকে অবৈধভাবে হত্যা করলে গুনাহ্’র কিয়দংশ আদম (আঃ) এর প্রথম সন্তান কাবিলের উপর বর্তাবে।
কারণ, সেই সর্ব প্রথম মানব সমাজে হত্যাকান্ড চালু করে।
আবদুল্লাহ
(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কোন মানুষ অন্যায়ভাবে নিহত হলেই তার পাপের একটি অংশ আদম (রাঃ) এর প্রথম সন্তানের (কাবীলের)
আমলনামায় যোগ হয়। কারণ সে-ই সর্বপ্রথম নরহত্যার প্রচলন করেছিল। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৬১৬,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৬৭, ৭৩২১, ৩৩৩৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪২৭১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৭৭, সুনান আততিরমিযী
২৬৭৩, সুনান আননাসায়ী ৩৯৮৫, আহমাদ ৩৬২৩, ৪০৮১, ৪১১২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৮১০, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৬৮২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৭৮) আত্মহত্যা করাঃ
আত্মহত্যা
একটি মহাপাপ। যেভাবেই সে আত্মহত্যা করুক না কেন।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; কিন্তু তোমরা পরস্পর রাযী
হয়ে ব্যবসা করা বৈধ এবং নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম
দয়ালু”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৯)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যে কেউ সীমালংঘন করে অন্যায়ভাবে তা করবে, অবশ্যই আমরা তাকে আগুনে পোড়াবো; এসব আল্লাহর
পক্ষে সহজ”। (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৩০)।
হাসান
(বসরী) (রহ.) বলেন, জুনদুব ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বসরার এক মসজিদে আমাদের নিকট হাদীস
বর্ণনা করেন। সে দিন হতে আমরা না হাদীস ভুলেছি না আশংকা করেছি যে, জুনদুব (রহ.) নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যারোপ করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পূর্ব যুগে জনৈক ব্যক্তি আঘাত পেয়েছিল,
তাতে কাতর হয়ে পড়েছিল। অতঃপর সে একটি ছুরি হাতে নিল এবং তা দিয়ে সে তার হাতটি কেটে
ফেলল। ফলে রক্ত আর বন্ধ হল না। শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। মহান আল্লাহ্ বললেন, আমার
বান্দাটি নিজেই প্রাণ দেয়ার ব্যাপারে আমার হতে অগ্রগামী হল। কাজেই, আমি তার উপর জান্নাত
হারাম করে দিলাম। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪৬৩,
১৩৬৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
মুহাম্মাদ
ইবনু রাফি’ (রহঃ)....শাইবান (রহঃ) বলেন যে, আমি হাসান (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, পূর্বের
যুগে এক ব্যক্তির ফোঁড়া হয়েছিল, ফোঁড়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তার তূণ থেকে
একটি তীর বের করলো। আর তা দিয়ে আঘাত করে করে ফোড়াটি চিড়ে ফেলল। তখন তা থেকে সজোরে
রক্তক্ষরণ শুরু হলো, অবশেষ সে মারা গেল। তোমাদের প্রতিপালক বলেন, আমি তার উপর জান্নাত
হারাম করে দিয়েছি। তারপর হাসান আপন হাত মসজিদের দিকে প্রসারিত করে বললেন, আল্লাহর
কসম! জুনদাব (ইবনু ’আবদুল্লাহ বাজালী) এ মসজিদেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম থেকে এ হাদীসটি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২০৮, ইসলামিক
সেন্টারঃ ২১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সাবিত
ইবনু যাহহাক সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে
ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের (অনুসারী হবার) ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা হলফ করে
সে যেমন বলল, তেমনই হবে আর যে ব্যক্তি কোন ধারালো লোহা দিয়ে আত্মহত্যা করে, তাকে তা
দিয়েই জাহান্নামে ‘আযাব দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ১৩৬৩, ৪১৭১, ৪৮৪৩, ৬০৪৭, ৬১০৫, ৬৬৫২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০২,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২৮০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক পাহাড়ের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের
আগুনে পুড়বে, চিরকাল সে জাহান্নামের ভিতর ঐভাবে লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে লোক বিষপানে
আত্মহত্যা করবে, তার বিষ জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামের
মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে লোক লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের ভিতর
সে লোহা তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে তা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৭৭৮, ১৩৬৫; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৯, আহমাদ ১০৩৪১০, আধুনিক
প্রকাশনী- ৫৩৫৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
যে ব্যক্তি ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে (অনুরূপভাব) নিজেকে ফাঁস লাগাতে
থাকবে আর যে ব্যক্তি বর্শার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে (অনুরূপভাবে) বর্শা
বিদ্ধ হতে থাকবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৩৬৫, ৫৭৭৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০৭, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১১৩, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২৮১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৭৯) অপচয় করাঃ
ইসলামসহ
বিভিন্ন নীতিতে অপচয়কে "শয়তানের ভাই" বা গুরুতর পাপ (হারাম) হিসেবে গণ্য
করা হয়েছে এবং এটি মানুষের জীবনে অশান্তি ও অনটন ডেকে আনে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহন কর। আর খাও এবং পান কর কিন্তু
অপচয় কর না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না”। (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ৩১)।
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
‘তোমরা
এগুলির ফল খাও যখন তা ফলবন্ত হয় এবং এগুলির হক আদায় কর ফসল কাটার দিন। আর তোমরা অপচয়
করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালবাসেন না’। (সুরা
আন‘আম ৬/১৪১)।
ইবনু
আববাস (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনর্থক কাজে এক দিরহামও খরচ করল সেটাই অপচয়’। (ইমাম কুরতুবী, আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন (বৈরূত : দারু ইহয়াইত
তুরাছিল আরাবী, ১৯৮৫ খ্রি./১৪০৫ হি.), ১৩তম খন্ড, পৃঃ ৭৩)।
(৮০) অপব্যয় করাঃ
অপব্যয়
হলো প্রয়োজন ছাড়া, অযৌক্তিক, অনুচিত বা অবৈধ উপায়ে অর্থ, সম্পদ, সময় বা মেধা খরচ করা।
এটি অপচয়ের চেয়েও ভয়াবহ, কারণ এটি অপাত্রে বা পাপকাজে সম্পদ ব্যয়কে বোঝায়। ইসলামে অপব্যয়কারীকে
'শয়তানের ভাই' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্ৰস্ত ও মুসাফিরদেরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয়
কর না”। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭ : ২৬)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“নিশ্চয়
যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রাবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ”। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭ : ২৭)।
আমর
ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললো, আমি গরীব মানুষ। আমার কোনো সম্পদ
নেই। তবে আমার অধীনে একজন ইয়াতীম আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি
ইয়াতীমের সম্পদ থেকে খেতে পারো। কিন্তু কোনো অপচয় করবে না, অতিরিক্ত গ্রহণ করবে না
এবং তোমার নিজের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করবে না। (সুনান আবূ
দাঊদ ২৮৭২, সুনান ইবনু মাজাহ ২৭১৮, সহীহ আবু দাউদ ২৫৫৬, ইরওয়া ১৪৫৬)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
(৮১) স্বেচ্ছাচারিতা করাঃ
স্বেচ্ছাচারিতা
বলতে নিজের ইচ্ছা বা বাতিক অনুযায়ী, কোনো নিয়ম, যুক্তি বা নীতি না মেনে কাজ করাকে বোঝায়।
এটি যথেচ্ছাচার বা স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ, যেখানে ব্যক্তি অন্যের অধিকার বা মতামতের
তোয়াক্কা না করে নিজের খুশিমতো আচরণ করে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“এটাই।
আর নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নাম, সেখানে
তারা অগ্নিদগ্ধ হবে, কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল! (সূরা সোয়াদ
৩৮ : ৫৫-৫৬)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“সুতরাং
যে সীমালঙ্ঘন করে, এবং দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়। জাহান্নামই হবে তার আবা “। (সূরা আন্ নাযি‘আত
৭৯ : ৩৭-৩৯)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
জাহান্নাম ওৎ পেতে অপেক্ষমান; সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রত্যাবর্তনস্থল”। (সূরা আন্ নাবা ৭৮ : ২১-২২)।
(৮২) গোয়েন্দাগিরি করাঃ
কারোর
দোষ অনুসন্ধান অথবা তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তাই তো আল্লাহ্
তা‘আলা মু’মিনদেরকে এমন করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
‘‘হে
ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ, কিছু কিছু অনুমান তো পাপ এবং তোমরা
কারোর গোপনীয় দোষ অনুসন্ধান করো না’’। (সুরা হুজুরাত
: ১২)।
ইবনু
উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মিম্বারে উঠে চিৎকার দিয়ে বললেনঃ
হে
মুসলিমগণ! যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং অন্তরে ইসলামের প্রভাব রাখোনি, তোমরা মুসলিমদেরকে
কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লজ্জা দিয়ো না এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। কেননা যে ব্যক্তি
কোন মুসলিমের দোষ অন্বেষণ করে, আল্লাহ তা’আলা তার দোষ অন্বেষণ করেন। আল্লাহ তা’আলা
যার দোষ খুঁজবেন, তাকে অপমান করবেন, যদি সে নিজের ঘরের মধ্যেও থাকে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০৪৪, সুনান আততিরমিযী ২০৩২, সহীহ আত্ তারগীব ২৩৩৯,
গয়াতুল মারাম ৪২০, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৭৬৩, আহমাদ ১৯৭৭৬, শু‘আবুল ঈমান ৬৭০৪, আল মু‘জামুল
কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১১২৮১, তা’লীকুর রাগীব ৩/২৭৭)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
হুরাইরাহ
হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ধারণা করা
থেকে বিরত থাকো। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ তালাশ করো না, গোয়েন্দাগিরি করো
না, পরস্পর হিংসা পোষণ করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না এবং পরস্পর
বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৬৪, ৫১৪৩, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৬২৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু
আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন,
যে লোক এমন স্বপ্ন দেখার ভান করল যা সে দেখেনি তাকে দু’টি যবের দানায় গিট দেয়ার জন্য
বাধ্য করা হবে। অথচ সে তা কখনও পারবে না। যে কেউ কোন এক দলের কথার দিকে কান লাগাল।
অথচ তারা এটা পছন্দ করে না অথবা বলেছেন, অথচ তারা তার থেকে পলায়নপর। কিয়ামতের দিন তার
উভয় কানে সীসা ঢেলে দেয়া হবে। আর যে কেউ প্রাণীর ছবি আঁকে তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং
তাতে প্রাণ ফুঁকে দেয়ার জন্য বাধ্য করা হবে। কিন্তু সে প্রাণ ফুঁকতে পারবে না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৫২,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মু‘আবিয়া
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি
তিনি বলেন: ‘‘নিশ্চয়ই তুমি মানুষের দোষ অনুসন্ধান করলে তাদেরকে ধ্বংস করে দিবে অথবা
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছিয়ে দিবে’’। (সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত) ৪৮৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্’ঊদ্ (রাঃ) এর নিকট জনৈক ব্যক্তিকে আনা হলো যার দাড়ি থেকে তখনো মদের ফোঁটা
ঝরছিলো অতঃপর তিনি বললেন:
‘‘আমাদেরকে
গোয়েন্দাগিরি বা কারোর দোষ অনুসন্ধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আমাদের নিকট কোন কিছু
প্রকাশ পেলেই তখন সে জন্য আমরা তাকে পাকড়াও করতে পারি’’। (সুনান
আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৮৯০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পরস্পরকে ঘৃণা করো না, পরস্পর হিংসা
করো না, একে অপরের গোয়েন্দাগিরী করো নাম বরং আল্লাহর বান্দারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।
যে কোনো মুসলিমের জন্য তার কোনো ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশী সম্পর্ক বিচ্ছেদ করা জায়িয
নয়। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯১০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
কেউ
কারোর ঘরে তার অনুমতি ছাড়াই উঁকি মারলে ঘরের মালিক কোন বস্ত্ত দিয়ে তার চোখ ফুটো করে
দিলে এর জন্য তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘কোন
ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া তোমার ঘরে উঁকি মারলে অতঃপর তুমি কুঁচি পাথর অথবা কঙ্কর মেরে তার
চোখ ফুটো করে দিলে এতে তোমার কোন গুনাহ্ হবে না’’। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৯০২; ৬৮৮৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৫৩৫, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২১৫৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪২৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৩৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৮৩) অন্যায়ভাবে রাগান্বিত হওয়াঃ
অন্যায়
বা অযৌক্তিকভাবে রাগান্বিত হওয়া একটি ক্ষতিকর মানসিক অবস্থা, যা নিজের ও অপরের ক্ষতি
করে এবং সম্পর্ক নষ্ট করে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন। নিশ্চয়
তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। (সূরা আল আ‘রাফ ৭:২০০)।
আবূ
হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট বললঃ
আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেনঃ তুমি রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার তা বললেন,নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বারেই বললেনঃ রাগ করো না। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১১৬, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৬৭৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবু
ওয়ায়েল কাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমরা উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ সা’দী
(রাযিঃ)-এর নিকট যাই। সে সময় তাঁর সাথে কোন এক ব্যক্তি এরূপ কথা বলে, যাতে তিনি রাগান্বিত
হন। তখন তিনি উঠে যান এবং উযু করেন এবং বলেনঃ আমার পিতা, আমার দাদা আতীয়া (রাযিঃ) থেকে
বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)
বলেছেনঃ শয়তানের কারণে রাগের সৃষ্টি হয়, আর শয়তানকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং
পানি দ্বারাই আগুন নির্বাপিত হয়। কাজেই তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, তখন সে যেন উযু
করে। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) হাদীস নং: ৪৭০৯, আন্তর্জাতিক নং: ৪৭৮৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইয়াহয়া
ইবনে ইয়াহয়া ও মুহাম্মাদ ইবনুল আলা (রাহঃ).....সুলাইমান ইবনে সূরাদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর কাছে এসে দু’ব্যক্তি ঝগড়া-ঝাটিতে
প্রবৃত্ত হল। তখন তাদের একজনের দু’চক্ষু (রাগে) লাল হয়ে গেল এবং তার শিরা-উপশিরা ফুলে
উঠল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আমি এমন একটি কালেমা
জানি, যা পাঠ করলে ক্রোধ দুর হয়ে যায়। আর তা হচ্ছে أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
(আমি বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই)। (এ কথা শুনে) সে ব্যক্তি
বলল, আপনি কি আমাকে পাগল দেখতে পাচ্ছেন? ইবনুল আ’লা (রাহঃ) বলেন, সে বলল, অর্থাৎ তিনি
الرَّجُل শব্দটি
বলেননি। (আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ (সহীহ মুসলিম)
হাদীস নং: ৬৪০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৮৪) অশ্লীল ভাষায় কথা বলাঃ
কারোর
সাথে তর্কের সময় তাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করাও আরেকটি কবীরা গুনাহ্।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“বলুন,
নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা(১)। আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালংঘন
এবং কোন কিছুকে আল্লাহ্র শরীক করা- যার কোন সনদ তিনি নাযিল করেননি। আর আল্লাহ্ সম্বন্ধে
এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।” (সূরা আল আ‘রাফ ৭:৩৩)।
আল্লাহ
তায়ালা অন্যত্র বলেন,
“নিশ্চয়
আল্লাহ্ আদল (ন্যায়পরায়ণতা), ইহসান (সদাচরণ), ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন,
এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালজ্ঞান থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন
যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর”। (সূরা আন্ নাহল ১৬ : ৯০)।
আবদুল্লাহ
ইবনু ‘আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব
যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা
পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা
হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে
লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। শু‘বা আ‘মাশ (রহ.) থেকে হাদীস বর্ণনায় সুফইয়ান
(রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৪, ২৪৫৯,৩১৭৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৮, আহমাদ ৬৭৮২,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আয়িশাহ
(রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রবেশের
অনুমতি চাইল। তিনি লোকটিকে দেখে বললেনঃ সে সমাজের নিকৃষ্ট লোক এবং সমাজের দুষ্ট সন্তান।
এরপর সে যখন এসে বলল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দ সহকারে তার সাথে
মেলামেশা করলেন। লোকটি চলে গেলে ’আয়িশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যখন
আপনি লোকটিকে দেখলেন তখন তার ব্যাপারে এমন বললেন, পরে তার সাথে আপনি আনন্দচিত্তে সাক্ষাৎ
করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’আয়িশাহ! তুমি কখন
আমাকে অশালীন দেখেছ? কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে
নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার দুষ্টামির কারণে মানুষ তাকে ত্যাগ করে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬০৩২, ৬০৫৪, ৬৪৩১; সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৬৪৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৯১, আহমাদ ২৪১৬১, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৯৭,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৮৫) আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিরাপদ মনে করাঃ
আল্লাহ
তাআলা বলেন,
‘‘তারা
কি আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে? ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ্রায় ছাড়া আল্লাহ্র পাকড়াও
থেকে অন্য কেউ নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবতে পারেনা’’। (সূরা
আরাফঃ ৯৯)।
আল্লাহ
তাআলা বলেন,
“যারা
কুকর্মের ষড়যন্ত্র করে তারা কি এ বিষয়ে নির্ভয় হয়েছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ভূগর্ভে
বিলীন করবেন না অথবা তাদের উপর আসবে না শাস্তি এমনভাবে যে, তারা উপলব্ধিও করবে না।
অথবা চলাফেরা করতে থাকাকালে তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন না? অতঃপর তারা তা ব্যর্থ করতে
পারবে না। অথবা তাদেরকে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় পাকড়াও করবেন না? নিশ্চয় তোমাদের
রব অতি দয়াদ্র, পরম দয়াল “। (সূরা আন্ নাহল ১৬ : ৪৫-৪৭)।
আল্লাহ
তাআলা আরো বলেন, ‘‘একমাত্র পথভ্রষ্ট লোকেরা
ব্যতীত স্বীয় রবের রহমত থেকে আর কে নিরাশ হতে পারে’’? (সূরা
হিজরঃ ৫৬)।
আব্দুল্লাহ
ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ
‘‘সবচেয়
বড় কবীরাহ গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর পাকড়াও হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা, আল্লাহর রহমত হতে
নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর করুণা থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা’’। ইমাম আব্দুর রাজ্জাক স্বীয়
মুসান্নাফে এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (মুসান্নাফে আব্দুর
রাজ্জাক (১০/৪৫৯), তাফসীরে তাবারী, হাদীছ নং- ৬১৯১ এবং তাবরানী আলকাবীর, হাদীছন নং-৮৭৮৩)।
হাদিসের মান সহিহ।
আল্লাহ
তাআলা বলেনঃ
‘‘নিশ্চয়ই
যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরষ্কার’’।
(সূরা মুলকঃ ১২)।
আল্লাহ
তাআলা আরও বলেনঃ
‘‘তারা
ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ পরিবর্তন হয়ে যাবে’’। (সূরা নূরঃ ৩৭)।
(৮৬) আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াঃ
ইসলামে
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কবিরা গুনাহ এবং এটি কাফের বা পথভ্রষ্টদের বৈশিষ্ট্য।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, "হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ,
তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন"। (সূরা যুমার: ৫৩)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
আমার পুত্ৰগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার সহোদরের সন্ধান কর এবং আল্লাহর রহমত হতে তোমরা
নিরাশ হয়ো না। কারণ আল্লাহর রহমত হতে কেউই নিরাশ হয় না, কাফির সম্প্রদায় ছাড়া”।
(সূরা ইউসুফ ১২ : ৮৭)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘একমাত্র
পথভ্রষ্টরাই নিজ প্রভুর করুণা থেকে নিরাশ হয়ে থাকে’’। (সুরা
হিজর:৫৬)।
তিনি
আরো বলেন:
‘‘তোমরা
আল্লাহ্ তা‘আলার করুণা থেকে কখনোই নিরাশ হয়ো না। কারণ, একমাত্র কাফিররাই আল্লাহ্ তা‘আলার
করুণা থেকে নিরাশ হয়ে থাকে’’। (সুরা ইউসুফ : ৮৭)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ মাস্ঊদ (রাঃ) বলেন:
‘‘সর্ববৃহৎ
পাপ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা, তাঁর শাস্তি থেকে নিজকে নিরাপদ ভাবা
এবং তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া’’। (‘আব্দুর রায্যাক, হাদীস
১৯৭০১)।
তবে
মঙ্গলজনক নিয়ম হচ্ছে এই যে, সুস্থতার সময় আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় পাওয়া এবং অসুস্থতা বা
মৃত্যুর সময় আল্লাহ্ তা‘আলার রহমতের আশা করা। আর উভয়টির মধ্যে সর্বদা সমতা বজায় রাখাই
তো সর্বোত্তম।
জাবির
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাঁর মৃত্যুর
তিন দিন আগে বলতে শুনেছি তিনি বলেন:
‘‘তোমাদের
প্রত্যেকেই যেন আল্লাহ্ তা‘আলার উপর সুধারণা নিয়েই মৃত্যু বরণ করে’’। (সহিহ মুসলিম ২৮৭৭; সুনান আবূ দাউদ ৩১১৩; সুনান ইব্নু মাজাহ্
৪২৪২)। হাদিসের মান সহিহ।
আনাস্
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
‘‘একদা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক যুবকের নিকট গেলেন তখন সে মুমূর্ষু অবস্থায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি অবস্থায় আছো? সে
বললো: হে আল্লাহ্’র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্’র কসম! আমি আল্লাহ্
তা‘আলার রহমতের আশা করছি এবং নিজের গুনাহ্’র ব্যাপারে ভয় পাচ্ছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এমন সময় কোন বান্দাহ্’র অন্তরে এ দু’ জিনিস থাকলে আল্লাহ্
তা‘আলা তার আশা পূরণ এবং তার ভয় দূরীভূত করবেন’’। (সুনান
আত তিরমিযী ৯৮৩; সুনান ইব্নু মাজাহ্ ৪৩৩৭)। হাদিসের মান সহিহ।
মানুষ
যতই গুনাহ্ করুক না কেন তবুও সে কখনো আল্লাহ্ তা‘আলার রহমত হতে নিরাশ হতে পারে না।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘আপনি
আমার বান্দাহ্দেরকে এ বাণী পৌঁছিয়ে দিন যে, হে আমার বান্দাহ্রা! তোমরা যারা গুনাহ্’র
মাধ্যমে নিজেদের প্রতি অধিক অত্যাচার- অবিচার করেছো আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহ থেকে কখনো
নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয়ই
তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তোমরা নিজ প্রতিপালক অভিমুখী হও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ
করো শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার বহু পূর্বে। জেনে রাখো, এরপর কিন্তু তোমাদেরকে আর সাহায্য
করা হবে না’’। (সুরা যুমার : ৫৩-৫৪)।
আশা
ও ভয়ের সংমিশ্রণকেই ঈমান বলা হয়। নবী ও রাসূলদের ঈমান এ পর্যায়েরই ছিল। আল্লাহ্ তা‘আলা
বলেন:
‘‘তারা
(নবী ও রাসূলরা) সৎকর্মে দৌড়ে আসতো এবং আমাকে ডাকতো আশা ও ভয়ের মাঝে। তেমনিভাবে তারা
ছিলো আমার নিকট সুবিনীত’’। (সুরা আম্বিয়া : ৯০)।
তিনি
আরো বলেন:
’’তারা
যাদেরকে ডাকে তারাই তো নিজ প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় অনুসন্ধান করে বেড়ায়। এ প্রতিযোগিতায়
যে, কে কতটুকু আল্লাহ্ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং তারা আল্লাহ্ তা‘আলার দয়া
কামনা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় পায়। আপনার প্রতিপালকের শাস্তি সত্যিই ভয়াবহ’’। (সুরা ইসরা/বানী ইসরাঈল:৫৭)।
(৮৭) অপরের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করাঃ
ইসলামে
অহেতুক অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা বা কুধারণা পোষণ করা হারাম এবং এটি একটি জঘন্যতম পাপ।
মহান
আল্লাহ বলেন,
‘হে
বিশ্বাসীগণ! তোমরা অন্যের ব্যাপারে বেশি বেশি আন্দাজ-অনুমান করা থেকে বিরত থাকো। কেননা
কোন কোন আন্দাজ-অনুমান গোনাহের কাজ। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করো না।
কারও অনুপস্থিতিতে পরনিন্দা করো না।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত
১২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যাতে তিনি মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী যারা আল্লাহ সম্বন্ধে
মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদেরকে শাস্তি দেন। অমঙ্গল চক্ৰ তাদের উপরই আপতিত হয়। আর আল্লাহ
তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন এবং তাদেরকে লা'নত করেছেন; আর তাদের জন্য জাহান্নাম প্ৰস্তুত
রেখেছেন। আর সেটা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল”! (সূরা
আল ফাত্হ ৪৮ : ৬)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
তোমরা কিছুই গোপন করতে না এ বিশ্বাসে যে, তোমাদের কান, চোখ ও ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দিবে না—বরং তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা করতে তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন
না। আর তোমাদের রব সম্বন্ধে তোমাদের এ ধারণাই
তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা হয়েছ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ “। (সূরা ফুসসিলাত ৪১ : ২২-২৩)।
আল্লাহ
তাআলা বলেনঃ
‘‘তারা
জাহেলী যুগের ধারণার মত আল্লাহ সম্পর্কে অসত্য ধারণা পোষণ করে। তারা বলেঃ আমাদের জন্য
কিছু করণীয় আছে কি? হে রাসূল! তুমি বলে দাওঃ সব বিষয়ই আল্লাহর হাতে। তারা তাদের মনের
মধ্যে এমন কিছু লুকিয়ে রাখে, যা তোমার নিকট প্রকাশ করেনা। তারা বলে আমাদের যদি কিছু
করার থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতামনা। তুমি বলোঃ তোমরা যদি নিজেদের ঘরে থাকতে
তাহলেও যাদের মৃত্যু লিখে দেয়া হয়েছিল, তারা নিজেরাই নিজেদের বধ্যভূমির দিকে এগিয়ে
আসতো। আর যে বিষয়টি সংঘটিত হলো তা এ জন্য যে, তোমাদের বুকে যা কিছু গোপন রয়েছে, আল্লাহ
তাআলা তা পরীক্ষা করে নেবেন আর তোমাদের অন্তরে যে দোষ-ত্রুটি রয়েছে তা পরিষ্কার করবেন।
আল্লাহ্ মনের অবস্থা খুব ভাল করে জানেন’’। (সূরা আল-ইমরানঃ
১৫৪)।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা
অনুমান থেকে বেঁচে চলো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারো দোষ খুঁজে বেড়িও না,
গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পরকে ধোঁকা দিও না, আর পরস্পরকে হিংসা করো না, একে অন্যের
প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না এবং পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করো না। বরং সবাই
আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬০৬৬, ৫১৪৩, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬৩১,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৫২৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৮৮) উপকার করে খোঁটা দেয়াঃ
কারোর
প্রতি কোন প্রকার অনুগ্রহ করে অথবা তাকে কোন কিছু দান করে অতঃপর তা উল্লেখ পূর্বক খোঁটা
দেয়া আরেকটি কবীরা গুনাহ্ এবং হারাম কাজ। এমন কান্ড করলে উক্ত দান বা অনুগ্রহের কখনোই
কোন সাওয়াব মিলবে না।
আল্লাহ
তাআলা বলেন:
“যারা
নিজ সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে আর ব্যয় করার পর খোঁটা দেয় না এবং কোনো কষ্টও দেয়
না, তারা নিজ প্রতিপালকের কাছে তাদের প্রতিদান পাবে। তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা
দুঃখিতও হবে না”। (সূরা বাকারা : ২৬২)।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘হে
ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের দান-সাদাকা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে বিনষ্ট করো না সে ব্যক্তির
ন্যায় যে নিজ ধন-সম্পদ ব্যয় করে মানুষকে দেখানোর জন্য উপরন্তু সে আল্লাহ্ তা‘আলা এবং
পরকালেও বিশ্বাসী নয়। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত এমন এক মসৃণ পাথরের ন্যায় যার উপর কিছু
মাটি জমেছে অতঃপর ভারি বর্ষণ হয়ে সে মাটি সরে গিয়ে শুষ্ক মসৃণ হয়ে গেলো। তারা যা অর্জন
করেছে তা আর কিছুই পেলো না। মূলতঃ আল্লাহ্ তা‘আলা কাফির সম্প্রদায়কে সঠিক পথ দেখান
না’’। (সুরা আল বাক্বারাহ্ : ২৬৪)।
যে
ব্যক্তি কিছু দান করে অতঃপর খোঁটা দেয় আল্লাহ্ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার সাথে কোন কথা
বলবেন না, তার দিকে তাকাবেনও না এমনকি তাকে গুনাহ্ থেকে পবিত্র করবেন না উপরন্তু তার
জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আবূ
যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ কিয়ামতের
দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টি দিবেন না, তাদেরকে পবিত্রও
করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা
কারা? তারা তো বিফল হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেনঃ (১) যে ব্যক্তি পায়ের
গোছার নিচে পরিধেয় ঝুলিয়ে পরে, (২) যে ব্যক্তি দান করার পর খোঁটা দেয় এবং (৩) যে ব্যক্তি
মিথ্যা শপথ করে নিজের মাল বিক্রয় করে। (সুনান ইবনু মাজাহ
২২০৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬, সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ১২১১, সুনান আননাসায়ী ২৫৬৩, ২৫৬৪, ৪৪৫৮, ৪৪৫৯, ৫৩৩৩, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৪০৮৭, আহমাদ ২০৮১১, ২০৮৯৫, ২০৯২৫, ২০৯৭০, ২১০৩৪, দারেমী ২৬০৫, গায়াতুম নারাম ১৭০, ইরওয়া
৯০০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৯৫, ইসলামিক সেন্টারঃ ২০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে উপকার করে খোটা দেয়। (সুনান আননাসাঈ ৫৬৮৮)।
আবদুল্লাহ
বিন আমর (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘উপকার করে খোঁটা দানকারী, মা-বাবার অবাধ্য
সন্তান, সর্বদা মদপানকারী এই তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সুনান আননাসায়ি : ৫৫৭৭)।
(৮৯) আল্লাহর ওয়ালীদের সাথে শত্রুতা করাঃ
কোন
আল্লাহ্’র ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করা অথবা তাঁকে যে কোনভাবে কষ্ট দেয়াও আরেকটি কবীরা
গুনাহ্। কারণ, তাদেরকে কষ্ট দেয়া মানে স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেয়া। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা‘আলা ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দিবে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর রহমত থেকে
বঞ্চিত করবেন এবং আখিরাতে রয়েছে তার জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই
যারা আল্লাহ্ তা‘আলা ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেয় আল্লাহ্
তা‘আলা তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লা’নত করবেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্ত্তত রেখেছেন
লাঞ্ছনাকর শাস্তি’’। (সুরা আহযাব : ৫৭)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আল্লাহ্ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে
যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা যে সমস্ত ইবাদতের
মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ঐ ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয়
আর কোন ইবাদত নেই যা আমি তার উপর ফরয করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য
অর্জন করতে থাকে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই
তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই
তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার
কাছে কোন কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা
করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে কোন দ্বিধা করি-না,
যতটা দ্বিধা করি মু’মিন বান্দার প্রাণ নিতে।
সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তাকে কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৫০২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬০৫২,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬০৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
‘আয়িয
বিন্ ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আবূ সুফ্য়ান নিজ দলবল নিয়ে সাল্মান, স্বুহাইব
ও বিলাল (রাঃ) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। তখন তাঁরা আবূ সুফ্য়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
আল্লাহ্ তা‘আলার কসম! আল্লাহ্’র তরবারি এখনো তাঁর এ শত্রুর গর্দান উড়িয়ে দেয়নি। তখন
আবূ বকর (রাঃ) তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা কুরাইশ নেতার ব্যাপারে এমন কথা বলতে
পারলে?! অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ঘটনাটি জানানো হলে তিনি বললেন,
‘‘হে
আবূ বকর! সম্ভবত তুমি তাদেরকে রাগিয়ে দিলে! যদি তুমি তাদেরকে রাগান্বিত করে থাকো তা
হলে যেন তুমি আল্লাহ্ তা‘আলাকে রাগান্বিত করলে’’। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৩০৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬১৮৬,
ইসলামিক সেন্টার ৬২৩০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতঃপর
আবূ বকর (রাঃ) তাঁদের নিকট এসে বললেন: হে আমার ভাইয়েরা! আমি তো তোমাদেরকে রাগিয়ে দিয়েছি।
তাঁরা বললেন: না, হে আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাই! বরং আমরা আপনার জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট
দো‘আ করছি তিনি যেন আপনাকে ক্ষমা করে দেন।
তবে
একটি কথা না বললেই হয় না। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলার ওলী হওয়ার জন্য এ ব্যাপারে
কারোর ইজাযত বা খিলাফত পেতে হবে কি? তার বংশটি কোনো ওলীর বংশ হতে হবে কি? ওলী হওয়ার
জন্য সুফিবাদের ধরা-বাঁধা নিয়মানুযায়ী রিয়াযত-মুজাহাদা করতে হবে কি? উক্ত পথ পাড়ি দিতে
কোন ইযাযতপ্রাপ্ত ওলীর হাত ধরতে হবে কি? ইত্যাদি ইত্যাদি।
না,
এর কিছুই করতে হবে না। বরং আল্লাহ্ তা‘আলা ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এর দেয়া ওলীর নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদেরকে উক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে।
আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন:
‘‘জেনে
রেখো, (কিয়ামতের দিন) নিশ্চয়ই আল্লাহ্’র ওলীদের কোনো ভয় থাকবে না। না থাকবে তাঁদের
কোন চিন্তা ও আশঙ্কা। তাঁরা হচ্ছেন খাঁটি ঈমানদার এবং সত্যিকার আল্লাহ্ভীরু। তাঁদের
জন্য রয়েছে বিশেষ সুসংবাদ দুনিয়া এবং আখিরাতেও। আল্লাহ্ তা‘আলার কথায় কোন হেরফের নেই।
এটাই হচ্ছে চূড়ান্ত সফলতা’’। (সুরা ইউনুস: ৬২-৬৪)।
উক্ত
আয়াতে ওলী হওয়ার জন্য খাঁটি ঈমান এবং সত্যিকার আল্লাহ্ভীরুতার শর্ত দেয়া হয়েছে। তথা
সকল ফরজ কাজসমূহ পালন করা এবং সকল পাপ-পঙ্কিলতা থেকে দূরে থাকা। কখনো হঠাৎ কোন পাপকর্ম
ঘটে গেলে তাওবার মাধ্যমে তা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা নেয়া। উপরন্তু নফল আমলসমূহের প্রতি
বেশি মনযোগী হওয়া এবং আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা।
মু‘আয
বিন্ জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘আল্লাহ্
তা‘আলা বলেন: আমার কর্তব্য ওদেরকে ভালোবাসা যারা আমার জন্য অন্যকে ভালোবাসে, আমার জন্য
অন্যের সাথে উঠে-বসে, আমার জন্য অন্যের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং আমারই জন্য কাউকে দান
করে’’। (ইব্নু হিববান/মাওয়ারিদ, হাদীস ২৫১০; বাগাওয়ী ৩৪৬৩
কোযায়ী, হাদীস ১৪৪৯, ১৪৫০)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা মুমিন নরনারীকে বিপদাপন্ন করেছে তারপর তাওবা করেনি তাদের জন্য আছে জাহান্নামের
যন্ত্রণা”। (সূরা আল বুরূজ ৮৫:১০)।
(৯০) আল্লাহর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করাঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আপনি
পাবেননা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমানদার এমন কোন সম্প্রদায়, যারা ভালবাসে তাদেরকে যারা
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে—হোক না এ বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্ৰ,
ভাই অথবা এদের জ্ঞাতি-গোত্র। এদের অন্তরে আল্লাহ লিখে দিয়েছেন ঈমান এবং তাদেরকে শক্তিশালী
করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে রূহ দ্বারা। আর তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার
পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে; আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট
হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহ্র দল। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্র
দলই সফলকাম”। (সূরা আল মুজাদালাহ্ ৫৮ : ২২)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পর পরস্পরের
বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহন করলে সে নিশ্চয় তাদেরই একজন।
নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না”। (সূরা
আল মায়িদাহ্ ৫ : ৫১)।
অপরদিকে
মুমিনদের উদ্দেশে বলেন-
“মুমিন
নর ও মুমিন নারী পরস্পরে একে অন্যের সহযোগী। তারা সৎকাজের আদেশ করে, অসৎ কাজে বাধা
দেয়, নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তারা
এমন লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ নিজ রহমত বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান“। (সূরা তাওবা (৯) :
৭১)।
অন্যত্র
ইরশাদ করেছেন-
“হে
মুমিনগণ! তোমরা মুসলিমদের ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধু বানিয়ো না। তোমরা কি আল্লাহর কাছে
নিজেদের বিরুদ্ধে (অর্থাৎ নিজেদের শাস্তিযোগ্য হওয়া সম্পর্কে) সুস্পষ্ট প্রমাণ দাঁড়
করাতে চাও?” (সূরা
নিসা (৪):১৪৪)।
শুধু
কাফের নয়। কাফেরদের সঙ্গে যারা মিলেমিশে থাকে এবং ঈমানের উপর কুফরকে প্রাধান্য দেয়-
এমন লোকদের সাথেও বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেই ব্যক্তি যদি নিজের বাবা কিংবা
ভাই হন তবুও। ইরশাদ হয়েছে,
“হে
মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভাইয়েরা যদি ঈমানের বিপরীতে কুফরকে পছন্দ করে, তবে তাদেরকে
নিজেদের বন্ধু বানিয়ো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারাই জালেম”।
(সূরা তাওবা (৯):২৩)।
এমনিভাবে
যারা মুসলমানদের ক্ষতি করার চেষ্টায় থাকে এবং মুসলমানদের ক্ষতি দেখলে খুশি হয়, তাদের
সাথে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের বাইরের কোনো ব্যক্তিকে
অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ো না। তারা তোমাদের অনিষ্ট কামনায় কোনো রকম ত্রুটি করে না। তারা
মনে-প্রাণে কামনা করে- তোমরা কষ্ট ভোগ কর। তাদের মুখ থেকে আক্রোশ বের হয়ে পড়ে। আর তাদের
অন্তর যা-কিছু (বিদ্বেষ) গোপন রাখে, তা আরও গুরুতর। আমি আসল বৃত্তান্ত তোমাদের কাছে
স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলাম- যদি তোমরা বুদ্ধিকে কাজে লাগাও!” (সূরা আলে ইমরান(৩):১১৮)।
এক
আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইহুদী ও মুশরিকরাই মুসলমানদের সবচে কঠিন শত্রু। আল্লাহ
তাআলা বলেন,
“আপনি
অবশ্যই মানুষের মধ্যে মুসলমানদের শত্রুতায় সর্বাপেক্ষা কঠোর পাবেন ইহুদীদেরকে এবং সেই
সমস্ত লোককে, যারা শিরক করে”। (সূরা মায়িদা(৫):৮২)।
মুসলমানদের
জন্য কত বড় সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, তাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজের বন্ধু হিসেবে ঘোষণা
করেছেন। ঘোষণা করেছেন তাঁর রাসূল এবং অপরাপর মুমিনদেরও বন্ধু হিসেবে। ইরশাদ হয়েছে,
“হে
মুসলিমগণ!) তোমাদের বন্ধু তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা (আল্লাহর সামনে)
বিনীত হয়ে সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয়”। (সূরা মায়িদা(৫):৫৫)।
শুধু
তাই নয়। ঘোষণা করেছেন- যারা আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ
করবে তাদের বিজয় ও সফলতা সুনিশ্চিত। ইরশাদ হয়েছে,
“আর
যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে বন্ধু বানাবে (সে আল্লাহর দলভুক্ত হয়ে যাবে)।
আর নিশ্চয় আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে”। (সূরা মায়িদা (৫):৫৬)।
আবু
উমামা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে
ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে (কাউকে) ভালোবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে (কাউকে) ঘৃণাবাসে, আল্লাহর
ওয়াস্তে (কিছু) প্রদান করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই (কিছু প্রদান করা হতে) বিরত থাকে সে
ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ঈমান লাভ করেছে। (হাদীস সম্ভার ৩৫৬২, সুনান আবু দাঊদ ৪৬৮৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৯১) হারামের মধ্যে ডুবে থাকাঃ
হারামের
মধ্যে ডুবে থাকা বলতে ইসলামে আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ, বস্তু বা আচরণে লিপ্ত থাকাকে
বোঝায়, যা অন্তরকে অন্ধ করে দেয় এবং হালাল বা পবিত্র কাজের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে।
এটি মূলত গুনাহ বা পাপের পথে নিমজ্জিত হওয়া, যা শয়তানের প্ররোচনা এবং ঈমান দুর্বলতার
লক্ষণ।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়
যারা কুফরী করেছে ও মানুষকে বাধা দিয়েছে আল্লাহর পথ থেকে ও মসজিদুল হারাম থেকে, যা
আমরা করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সব মানুষের জন্য সমান, আর যে সেখানে অন্যায়ভাবে ইলহাদ
তথা দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছে করে, তাকে আমরা আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”।
(সূরা আল হাজ্জ ২২ : ২৫)।
ইবনু
’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে
সবচেয়ে ঘৃণিত লোক হচ্ছে তিনজন। যে লোক হারাম শরীফে অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়। যে লোক
ইসলামী যুগে জাহিলী যুগের রেওয়াজ অন্বেষণ করে। যে লোক ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কারো রক্তপাত
দাবি করে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৮৮২, আধুনিক
প্রকাশনী- ৬৪০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪১৬, বায়হাক্বী : ১৫৯০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
নু’মান
ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। আর এ উভয়ের মধ্যে এমন অনেক সন্দেহভাজন
বিষয় বা বস্ত্ত আছে, যে ব্যাপারে অনেক মানুষই এগুলো হালাল, কি হারাম- এ বিষয়ে অবগত
নয়। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় হতে বিরত থাকবে, তার দীন ও মান-মর্যাদা পুত-পবিত্র
থাকবে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহে পতিত থাকবে, সে সহসাই হারামে জড়িয়ে পড়বে। বিষয়টি সেই
রাখালের ন্যায়, যে রাখাল তার পশুপালকে নিষিদ্ধ এলাকার সীমার কাছাকাছি নিয়ে চরালো, তার
পাল অজান্তেই নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
সাবধান!
প্রত্যেক দায়িত্বশীলেরই (প্রশাসন বা সরকারেরই) চারণভূমি (নিষিদ্ধ এলাকা) আছে, আর আল্লাহ
তা’আলার নিষিদ্ধ চারণভূমি হারামসমূহকে নির্ধারিত করেছেন। মনে রাখতে হবে, মানব দেহের
ভিতরে একটি মাংসপিন্ড আছে, যা ভালো থাকলে গোটা শরীরই ভালো থাকে। আর এটি নষ্ট হয়ে গেলে
বা বিকৃতি ঘটলে সমস্ত শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়। সেই মাংসপিন্ডটিই হলো ’কলব’ (অন্তঃকরণ)।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৬২, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৫২, ২০৫১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৯৮৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৯৯, সুনান আনতিরমিযী ১২০৫, সুনান আবূ দাঊদ ৩৩৩০, দারিমী
২৫৭৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৩১, আহমাদ ১৮৩৯৬, ১৮৪০২, ১৮৩৭৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫০,ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৫০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৯২) ওয়াদা ভঙ্গ করাঃ
কারোর
সাথে কোন ব্যাপারে চুক্তি বা ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করা আরেকটি কবীরা গুনাহ্। তাই তো এ
জাতীয় ব্যক্তিকে মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ
ইবনু ‘আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব
যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা
পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা
হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে
লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। শু‘বা আ‘মাশ (রহ.) থেকে হাদীস বর্ণনায় সুফইয়ান
(রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪, ২৪৫৯,৩১৭৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১১৩,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৮, আহমাদ ৬৭৮২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কিয়ামতের
দিন প্রত্যেক চুক্তি ভঙ্গকারী বা ওয়াদা খেলাফীর পাছার নিকট একটি করে ঝান্ডা প্রোথিত
থাকবে এবং যা দিয়ে সে কিয়ামতের দিন বিশ্ব জন সমাবেশে পরিচিতি লাভ করবে।
মুহাম্মাদ
ইবনু মুসান্না ও উবাইদুল্লাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ)....আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক অঙ্গীকার ভঙ্গকারীর জন্য
কিয়ামত দিবসে একটি পতাকা থাকবে, যেটা দিয়ে তাকে চেনা যাবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪২৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৭ , ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৪৩৮৬, ইসলামিক সেন্টার, ৪৩৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
সাঈদ খুদ্রী (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন:
‘‘কিয়ামতের
দিন প্রত্যেক চুক্তি ভঙ্গকারীর একটি করে ঝান্ডা হবে যা তার চুক্তি ভঙ্গের পরিমাণ অনুযায়ী
উত্তোলন করা হবে। জেনে রাখো, সে ব্যক্তি অপেক্ষা বড় চুক্তি ভঙ্গকারী আর কেউ হতে পারে
না যে সাধারণ জনগণের দায়িত্বভার হাতে নিয়ে তাদের সঙ্গেই চুক্তি ভঙ্গ করে’’। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৮৭২, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩১৮৭,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪২৯, ৪৪৩৫, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৭৩৮, ১৭৩৬, আহমাদ ৩৮৯০, ৬৯৪৯, দারেমী ২৫৪২, রাওদুন নাদীর ৫৫২, আধুনিক প্রকাশনীঃ
২৯৪৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“যারা
আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, আর যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন
রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই
ক্ষতিগ্রস্ত”। (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৭)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“পক্ষান্তরে
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন
রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের
জন্যই রয়েছে লা’নত এবং তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের মন্দ আবাস”। (সূরা আর্ রা‘দ ১৩ : ২৫)।
আল্লাহ
তায়ালা অন্যত্র বলেন,
“অতঃপর
তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য আমরা তাদেরকে লা'নত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠিন করেছি; তারা
শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ
তারা ভুলে গেছে। আর আপনি সবসময় তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে
দেখতে পাবেন, কাজেই তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মুহসিনদের
ভালবাসেন”। (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ১৩)।
(৯৩) মাদকাসক্ত হওয়াঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“হে
মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয় করার শর তো কেবল ঘৃণার বস্তু,
শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা সেগুলো বর্জন কর-যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো চায়,
মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শক্রতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে
ও সালাতে বাধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না? (সূরা
আল মায়িদাহ্ ৫ : ৯০-৯১)।
আবদুল্লাহ
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদ পান করেছে অতঃপর তাত্থেকে তওবা করেনি, সে আখিরাতে তাত্থেকে বঞ্চিত
থাকবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৫৭৫, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৫১১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০০৩, আহমাদ ৪৬৯০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫১৬৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫০৬২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৯৪) যিনা বা ব্যভিচার করাঃ
যিনা
বা ব্যভিচার বলতে সাধারণত বিবাহবহির্ভূত সম্মতিসূচক যৌন মিলনকে বোঝায়। ইসলাম ধর্মসহ
প্রায় সকল ধর্মেই এটি একটি মারাত্মক অপরাধ এবং মহাপাপ বা 'কবিরা গুনাহ' হিসেবে গণ্য
করা হয়।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
যিনার ধারে-কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ”। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭ : ৩২)।
যিনাকারীদের
শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ব্যভিচারিণী
ও ব্যভিচারী-তাদের প্ৰত্যেককে একশত বেত্ৰাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের
প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং আখেরাতের উপর
ঈমানদার হও; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্ৰত্যক্ষ করে। ব্যভিচারী পুরুষ-ব্যভিচারিণীকে
অথবা মুশরিক নারীকে ছাড়া বিয়ে করে না এবং ব্যভিচারিণী নারী, তাকে ব্যভিচারী অথবা
মুশরিক ছাড়া কেউ বিয়ে করে না, আর মুমিনদের জন্য এটা হারাম করা হয়েছে”। (সূরা আন্ নূর ২৪ : ২-৩)।
(৯৫) সমকামিতায় লিপ্ত হওয়াঃ
ইসলামি
শরিয়ত অনুযায়ী সমকামিতা (নারী-নারী বা পুরুষ-পুরুষ) একটি কবিরা গুনাহ, জঘন্য অপরাধ
ও হারাম কাজ। কুরআন ও হাদীসের আলোকে, সমকামী প্রমাণিত হলে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড
বা কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
আমি লূতকেও পাঠিয়েছিলাম। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, “তোমরা কি এমন খারাপ কাজ
করে যাচ্ছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি? তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারীদের
ছেড়ে পুরুষের কাছে যাও, বরং তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। উত্তরে তার সম্প্রদায়
শুধু বলল, এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বহিস্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে
চায়। অতঃপর আমরা তাকে ও তার পরিজনদের সবাইকে
উদ্ধার করেছিলাম, তার স্ত্রী ছাড়া, সে ছিল পিছনে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত। আর আমরা
তাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। কাজেই দেখুন, অপরাধীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছি“।
(সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ৮০-৮৪)।
কারোর
ব্যাপারে সমকাম প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে ও তার সমকামী সঙ্গীকে শাস্তি স্বরূপ হত্যা করতে
হয়।
আব্দুল্লাহ
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন,
“কাউকে
সমকাম করতে দেখলে তোমরা উভয় সমকামীকেই হত্যা করবে”। (সুনান
আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৬২; সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪৫৬; মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৩৫৭৫, সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৬১; বায়হাক্বী,
হাদীস নং ১৬৭৯৬; হাকিম, হাদীস নং ৮০৪৭, ৮০৪৯, বায়হাকী ফিস সুনান ৮/২৩২, ইরওয়া ২৩৫০,
সহীহ আল জামি ৬৫৮৯, সহীহ আত্ তারগীব ২৪২২)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
উক্ত
হত্যার ব্যাপারে সাহাবীগণের ঐকমত্য রয়েছে। তবে হত্যার ধরনের ব্যাপারে তাদের পরস্পরের
মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে
লিপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে বলেনঃ তোমরা উপরের এবং নিচের ব্যক্তিকে অর্থাৎ উভয়কে প্রস্তরাঘাতে
হত্যা করো। (সুনান ইবনে মাজাহ ২৫৬২, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৬,
বায়হাকী ফিস সুনান ৮/২৩২, ইরওয়া ৬/১৭)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আবু
বকর, ‘আলী, ‘আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এবং হিশাম ইবন আব্দুল মালিক
রহ. সমকামীদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন।
মুহাম্মাদ
ইবন মুনকাদির রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“খালিদ
ইবন ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু একদা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এ মর্মে একটি চিঠি
পাঠালেন যে, তিনি আরবের কোনো এক মহল্লায় এমন এক ব্যক্তিকে পেয়েছেন যাকে দিয়ে যৌন উত্তেজনা
নিবারণ করা হয় যেমনিভাবে নিবারণ করা হয় মহিলা দিয়ে। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু
সকল সাহাবীগণকে একত্রিত করে এ ব্যাপারে তাদের পরামর্শ চেয়েছেন। তাদের মধ্যে ‘আলী রাদিয়াল্লাহু
আনহুও তখন উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি গুনাহ যা বিশ্বে শুধুমাত্র একটি
উম্মতই সংঘটন করেছে। আল্লাহ তা‘আলা ওদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন তা সম্পর্কে আপনারা
অবশ্যই অবগত। অতএব আমার মত হচ্ছে, তাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। উপস্থিত সকল সাহাবারাও
উক্ত মতের সমর্থন করেন। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার
ফরমান জারি করেন।” (বায়হাক্বী/শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং
৫৩৮৯০)।
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, ’আলী (রাঃ) এরূপ অপকর্মে (সমকামিতায়) লিপ্ত উভয়কে (যে করে এবং যাকে করে) জ্বালিয়ে দিয়েছেন এবং আবূ বকর উভয়ের উপর দেয়াল চাপা দিয়েছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৮৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ।
আব্দুল্লাহ
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“সমকামীকে
মহল্লার সর্বোচ্চ প্রাসাদের ছাদ থেকে উপুড় করে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর তার উপর পাথর
মারা হবে।” (ইবন আবী শাইবাহ, হাদীসং ২৮৩২৮; বায়হাক্বী:
৮/২৩২)।
সমকামীর
জন্য পরকালের শাস্তি হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে কখনো তাকাবেন না।
আব্দুল্লাহ
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন,
“আল্লাহ
তা‘আলা এমন ব্যক্তির প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে কখনো তাকাবেন না যে সমকামে লিপ্ত হয় অথবা
কোনো মহিলার মলদ্বারে গমন করে।” (ইবন আবী শাইবাহ ১৬৮০৩;
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৮৫, সুনান আততিরমিযী ১১৬৫, আবী সহীহ আত্ তারগীব ২৪২৪,
সহীহ আল জামি ৭৮০১)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
ইবনু
’আব্বাস ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ন্যায় অপকর্মে লিপ্ত হয়, তার ওপর আল্লাহর
লা’নাত (অভিশাপ)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৮৩, সুনান
আততিরমিযী ১৪৫৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
জাবির
ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমি আমার উম্মাতের ব্যাপারে লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সর্বাধিক
আশঙ্কা করি। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৬৩, মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৩৫৭৭, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৭, বায়হাকী ফিস সুনান ২/২১৫, ৬/১০৬। আত-তালীকুর
রাগীব ৩/১৯৭, ১৯৮, আহমাদ ১৫০৯৩, সহীহ আল জামি‘ ১৫৫২, সহীহ আত্ তারগীব ২৪১৭)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
(৯৬) চুরি করাঃ
ইসলামে
চুরি করা একটি কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ। পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, চুরির অপরাধ
প্রমাণিত হলে অপরাধীর (নারী বা পুরুষ) হাত কেটে ফেলার বিধান রয়েছে। এটি আল্লাহর পক্ষ
থেকে নির্ধারিত একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“আর
পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ
থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে(১)। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫:৩৮)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী
মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী
মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ
তুলে তাকিয়ে থাকে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪৭৫,
৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৯৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৩১৩)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
আয়িশাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
নিকট এক চোরকে আনা হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার হাত কেটে দিলেন।
তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা বুঝতে পারিনি যে, আপনি তার হাত
কেটে দেবেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি (আমার মেয়ে) ফাত্বিমাহ্ও
হত, তবুও আমি তার হাত কেটে দিতাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৩৬০৭, সুনান আননাসায়ী ৪৯০০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
হাম্মাদ
ইবনু আবূ সুলায়মান বলেন: কাফন চোরের হাত কাটা যাবে। কারণ সে মৃত ব্যক্তির ঘরে (চুরির
উদ্দেশে) প্রবেশ করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬০৯,
সুনান আবূ দাঊদ ৪২৬১, ইরওয়া ২৪৫১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু
উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঢাল চুরির
অপরাধে এক চোরের হাত কেটে ছিলেন। যার মূল্য ছিল তিন দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৯১, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭৯৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪২৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৮৬, সুনান আবূ দাঊদ
৪৩৮৫, সুনান আননাসায়ী ৪৯০৮, আহমাদ ৪৫০৩, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩২৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৬৩৪১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জাবির
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক
চোরকে ধরে আনা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ করলেন, তার (ডান)
হাত কেটে দাও। সুতরাং তার হাত কেটে ফেলা হলো। পরে পুনরায় চুরির দায়ে তাকে দ্বিতীয়বার
আনা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার (বাম) পা কেটে দাও। সুতরাং
তার পা কেটে ফেলা হলো। এরপর পুনরায় তৃতীয়বার তাকে চুরির অপরাধে আনা হলো। এবার তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিলেন, তার (বাম) হাত কেটে দাও। সুতরাং তার
হাত কেটে ফেলা হলো। পরে চতুর্থবার তাকে চুরির অপরাধে আনা হলো। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিলেন, তার (ডান) পাও কেটে দাও। সুতরাং তার পাও কেটে ফেলা
হলো। তারপর পঞ্চমবার তাকে চুরির অপরাধে উপস্থিত করা হলো। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবার তাকে হত্যার হুকুম দিলেন। সুতরাং আমরা তাকে টেনে নিয়ে এসে
একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলাম এবং তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করলাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬০৩, আবূ দাঊদ ৪৪১০, নাসায়ী ৪০৭)।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আর
ইমাম বাগাবী (রহঃ) শারহুস্ সুন্নাহ্-তে ’চোরের হাত কাটা প্রসঙ্গে’ নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, ’তার হাত কেটে দাও এবং গরম তেল দিয়ে তা দাগিয়ে
দাও।’ (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬০৪, শারহুস্ সুন্নাহ্
২৬০২, মুসতাদরাক লিল হাকিম ৮১৫০)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
ফাযালাহ্
ইবনু ’উবায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
নিকট এক চোরকে আনা হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার হাত কাটার নির্দেশ
দিলেন। পরে তিনি হুকুম দিলেন এবার তার হাত কেটে যেন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয় (যাতে
অন্যেরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে)। অতএব ঐ হাত তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬০৫, সুনান আবূ দাঊদ ৪৪১১, সুনান
আততিরমিযী ১৪৪৭, সুনান আননাসায়ী ৪৯৮৫, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৮৭, আহমাদ ২৩৯৪৬, ইরওয়া ২৪৩২)।
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আল্লাহ তা’আলা ঐ সকল চোরের ওপর অভিসম্পাত করেছেন, যে একটি ডিম চুরির অপরাধে তার হাত
কাটা হয়। আর যে একটি রশি চুরি করে এবং তারও হাত কাটা হয়। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৯২, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৭৯৯, ৬৭৮৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪৩০০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৮৭, সুনান আননাসায়ী ৪৮৭৩, সুনান ইবনু মাজাহ
২৫৮৩, আহমাদ ৭৪৩৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৭৪৮, সহীহ আল জামি ৯০৫৭, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৩০
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৯৭) ডাকাতি করাঃ
ইসলামে
ডাকাতি বা লুটতরাজকে 'হিরাবাহ' (Hirabah) বলা হয়, যা একটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। পবিত্র
কুরআনের সূরা আল-মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে ডাকাতির অপরাধের ধরণ অনুযায়ী চারটি ভিন্ন
ভিন্ন শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠন করলেঃ
ডাকাত
যদি কাউকে হত্যা করে এবং সম্পদও লুট করে, তবে তার শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড।
শুধুমাত্র সম্পদ লুণ্ঠন করলেঃ
যদি
কাউকে হত্যা না করে শুধু সম্পদ ডাকাতি করে, তবে অপরাধীর বিপরীত দিকের হাত ও পা কেটে
ফেলা হবে (যেমন: ডান হাত ও বাম পা)।
শুধুমাত্র হত্যা করলেঃ
যদি
সম্পদ না নিয়ে শুধু কাউকে হত্যা করে, তবে ডাকাতকে কিসাস স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
পথিমধ্যে ভয় দেখালে বা আতঙ্ক সৃষ্টি করলেঃ
যদি
ডাকাতি বা হত্যা কোনোটিই না করে শুধু অস্ত্র প্রদর্শন করে পথে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বা
অরাজকতা ছড়ায়, তবে তাকে দেশান্তর বা কারারুদ্ধ করা হবে।
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“যারা
আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক (ডাকাতি/ লুটতরাজ/
দাঙ্গা হাঙ্গামা/অস্ত্র নিয়ে মারামারি ইত্যাদি) কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল
এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে বা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত
ও পা কেটে ফেলা হবে বা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা
ও আখেরাতে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে”। (সূরা আল মায়িদাহ্
৫:৩৩)।
(১)
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, যে কেউ ইসলামের শৃঙ্গে হাতিয়ার ব্যবহার করবে,
যাতায়াতকে ভীতিপ্রদ করে দিবে, (ডাকাতি রাহাজানি করবে) তারপর যদি তাদেরকে পাকড়াও করা
সম্ভব হয়, তবে মুসলিম শাসকের এ ব্যাপারে ইখতিয়ার থাকবে, তিনি ইচ্ছা করলে তাকে হত্যা
করবেন, নতুবা শুলে চড়াবেন, অথবা তার হাত-পা কেটে দিবেন। (তাবারী)।
আনাস
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উরাইনা গোত্রের কতিপয় লোকের মদ্বীনার আবহাওয়া প্রতিকূল
হওয়ায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যাকাতের উটের কাছে গিয়ে
উটের দুধ ও পেশাব পান করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা রাখালকে (নির্মমভাবে) হত্যা করে
এবং উট হাঁকিয়ে নিয়ে (পালিয়ে) যায়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের
পশ্চাদ্ধাবনে লোক প্রেরণ করেন, তাদেরকে ধরে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাদের হাত পা কেটে দেন
এবং তাদের চোখে তপ্ত শলাকা বিদ্ধ করেন আর তাদেরকে হাররা নামক উত্তপ্ত স্থানে ফেলে রাখেন।
তারা (যন্ত্রণায়) পাথর কামড়ে ধরে ছিল। আবূ কিলাবাহ, সাবিত ও হুমাইদ (রহ.) আনাস (রাঃ)
হতে হাদীস বর্ণনায় কাতাদাহ (রহ.)-এর অনুসরণ করেন। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৫০১, ২৩৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪২৪৫-৪২৪৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৭১, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ১৪০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৪১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২)
ইসলামী শরীআতে অপরাধের শাস্তিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছেঃ হুদূদ, কিসাস ও তা’যীরাত।
তন্মধ্যে যেসব অপরাধের শাস্তি কুরআন ও সুন্নাহ নির্ধারণ করে দিয়েছে তা হচ্ছে, হুদুদ
ও কিসাস। পক্ষান্তরে যেসব অপরাধের কোন শাস্তি কুরআন ও সুন্নাহ নির্ধারণ করেনি; বরং
বিচারকদের অভিমতের উপর ন্যস্ত করেছে, সেসব শাস্তিকে শরীআতের পরিভাষায় ‘তাযিরাত’ তথা
দণ্ড বলা হয়। কুরআনুল কারীম হুদুদ ও কিসাস পূর্ণ বিবরণ ব্যাখ্যা সহকারে নিজেই বর্ণনা
করে দিয়েছে।
আর
দণ্ডনীয় অপরাধের বিবরণকে রাসূলের বর্ণনা ও সমকালীন বিচারকদের অভিমতের উপর ছেড়ে দিয়েছে।
বিশেষ বিশেষ অপরাধ ছাড়া অবশিষ্ট অপরাধসমূহের শাস্তির কোন পরিমাণ নির্ধারণ করেনি; বরং
বিচারকের অভিমতের উপর ছেড়ে দিয়েছে। বিচারক স্থান, কাল ও পরিবেশ বিবেচনা করে অপরাধ
দমনের জন্য যেরূপ ও যতটুকু শাস্তির প্রয়োজন মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন।
আলেমরা
বলেন, কুরআনুল কারীম যেসব অপরাধের শাস্তিকে আল্লাহর হক হিসাবে নির্ধারণ করে জারি করেছে,
সেসব শাস্তিকে ‘হুদুদ’ বলা হয় এবং যেসব শাস্তিকে বান্দার হক হিসেবে জারি করেছে, সেগুলোকে
‘কিসাস’ বলা হয়। কিসাসের শাস্তি হুদূদের মতই সুনির্ধারিত। প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ
সংহার করা হবে এবং জখমের বিনিময়ে সমান জখম করা হবে। কিন্তু পার্থক্য এই যে, হুদূদকে
আল্লাহর হক হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা করলেও তা ক্ষমা হবে না।
কিন্তু কিসাস এর বিপরীত। কিসাসে বান্দার হক প্রবল হওয়ার কারণে হত্যা প্রবল হওয়ার
পর হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর এখতিয়ারে ছেড়ে দেয়া হয়। সে ইচ্ছা করলে
কেসাস হিসাবে তাকে মৃত্যুদণ্ডও করাতে পারে। যখমের কেসাসও তদ্রুপ।
পক্ষান্তরে
যেসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেনি, সে জাতীয় শাস্তিকে বলা হয় ‘তাযীর’ তথা ‘দণ্ড’।
শাস্তির এ প্রকার তিনটির বিধান অনেক বিষয়েই বিভিন্ন। তন্মধ্যে তাযীর বা দণ্ডগত শাস্তিকে
অবস্থানুযায়ী লঘু থেকে লঘুতর, কঠোর থেকে কঠোরতর এবং ক্ষমাও করা যায়। এ ব্যাপারে বিচারকদের
ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক কিন্তু হুদূদের বেলায় কোন বিচারকই সামান্যতম পরিবর্তন, লঘু
অথবা কঠোর করার অধিকারী নয়। স্থান ও কাল ভেদেও এতে কোন পার্থক্য হয় না। শরীআতে হুদুদ
মাত্র পাঁচটিঃ ডাকাতি, চুরি, ব্যভিচার ও ব্যভিচারের অপবাদ- এ চারটির শাস্তি কুরআনে
বর্ণিত রয়েছে। পঞ্চমটি মদ্যপানের হদ। এটি বিভিন্ন হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা তথা
ঐকমত্য দ্বারা প্রমাণিত। এভাবে মোট পাঁচটি অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত ও হুদূদরূপে চিহ্নিত
হয়েছে। (কুরতুবী থেকে সংক্ষেপিত)।
(৯৮) চেহারায় দাগ কাটা ও চিহ্ন দেয়াঃ
ইসলামি
শরিয়তে দেহের কোথাও এমন উল্কি আঁকার অবকাশ নেই। কেননা, তা মহান আল্লাহর স্বাভাবিক সৃষ্টি
সৌন্দর্যের বিকৃতি। জুমহুর তথা অধিকাংশ ফিকাহবিদ ও আইনজ্ঞরা এটিকে হারাম ও গর্হিত কাজ
আখ্যায়িত করেছেন।
পবিত্র
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘শয়তান বলল, আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কিছু
মানুষকে অবলম্বন করবো।…তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ
আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৮-১১৯)।
আবদুল্লাহ্
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ্ লা’নাত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের
শরীরে উল্কি অংকণ করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকণ করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভূরু-চুল উপড়িয়ে
ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। সে সব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়ন করে।
এরপর বানী আসাদ গোত্রের উম্মু ইয়াকূব নামের এক মহিলার কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে সে এসে বলল,
আমি জানতে পারলাম, আপনি এ ধরনের মহিলাদের প্রতি লা’নত করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার প্রতি লা’নাত করেছেন, আল্লাহর কিতাবে যার
প্রতি লা’নাত করা হয়েছে, আমি তার প্রতি লা’নাত করব না কেন? তখন মহিলা বলল, আমি দুই
ফলকের মাঝে যা আছে তা (পূর্ণ কুরআন) পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলেছেন, তা তো এতে পাইনি।
আবদুল্লাহ্
বললেন, যদি তুমি কুরআন পড়তে তাহলে অবশ্যই তা পেতে, তুমি কি পড়নি রাসূল সাল্লাল্লাহু
’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ
করেন তা হতে বিরত থাক। মহিলাটি বলল, হাঁ নিশ্চয়ই পড়েছি। ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) বললেন, রাসূল
সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তখন মহিলা বলল, আমার মনে
হয় আপনার পরিবারও এ কাজ করে তিনি বললেন, তুমি যাও এবং ভালমত দেখে এসো। এরপর মহিলা গেল
এবং ভালভাবে দেখে এলো। কিন্তু তার দেখার কিছুই দেখতে পেলো না। তখন ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ)
বললেন, যদি আমার স্ত্রী এমন করত, তবে সে আমার সঙ্গে একত্র থাকতে পারত না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৮৮৬, ৪৮৮৭, ৫৯৩১, ৫৯৩৯, ৫৯৪৩,
৫৯৪৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৪৬৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২১২৫, আহমাদ ৪৩৪৩]
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৫১৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৫২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৯৯) সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করাঃ
আধুনিক
কালে গার্হস্থ্য জিনিসপত্রের এমন কোনো দোকান পাওয়া যাবে না, যেখানে সোনা-রূপার পাত্র
অথবা সোনা-রূপার প্রলেপযুক্ত পাত্রাদি নেই। ধনীদের গৃহে এমনকি অনেক হোটেলেও এসব পাত্র
পরিবেশন করা হয়। এ জাতীয় পাত্র বিভিন্ন অনু্ষ্ঠানে প্রদত্ত মূল্যবান উপঢোকনে পরিণত
হয়েছে। অনেকে নিজ বাড়িতে সোনা-রূপার পাত্র রাখে না বটে কিন্তু অন্যের বাড়ীতে ‘ওয়ালীমা’
ইত্যাদি অনুষ্ঠানে পরিবেশিত সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহারে কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ নিজ বাড়ীতে
হোক কিংবা অন্যের বাড়ীতে হোক, শরী‘আতে এসব পাত্র ব্যবহার হারাম ঘোষিত হয়েছে।
আবদুর
রহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার তাঁরা হুযাইফাহ -এর কাছে
উপস্থিত ছিলেন। তিনি পানি পান করতে চাইলে এক অগ্নি উপাসক তাঁকে পানি এনে দিল। সে যখনই
পাত্রটি তাঁর হাতে রাখল, তিনি সেটি ছুঁড়ে ফেললেন এবং বললেন, আমি যদি একবার বা দু’বারের
অধিক তাকে নিষেধ না করতাম, তাহলেও হতো। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইলেন, তা হলেও আমি এমন করতাম
না। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা
রেশম বা রেশম জাত কাপড় পরিধান করো নাএবং সোনা ও রূপার পাত্রে পান করো না এবং এগুলোর
বাসনে আহার করো না।কেননা দুন্ইয়াতে এগুলো কাফিরদের জন্য আর আখিরাতে তোমাদের জন্য। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৪২৬, ৫৬৩২, ৫৬৩৩, ৫৮৩১, ৫৮৩৭;
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫২৮৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৬৭, আহমাদ ২৩৩৭৪, আধুনিক
প্রকাশনী- ৫০২৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ
জাতীয় পাত্র ব্যবহার কঠোর শাস্তির কথা হাদীসে এসেছে। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা
থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যে
ব্যক্তি রূপা ও সোনার পাত্রে খাবে কিংবা পান করবে সে যেন তার পেটে জাহান্নামের আগুন
ঢক ঢক করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে”। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫২৭৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫২১২, ইসলামিক সেন্টার ৫২২৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ
বিধান খাবারের পাত্র সহ যেকোনো ধরনের সোনা-রূপার পাত্রের জন্য প্রযোজ্য। যেমন-প্লেট,
ডিস, কাঁটা চামচ, চামচ, ছুরি, মেহমানদারীর জন্য প্রস্তুত খাদ্য প্রদানের পাত্র, বিবাহ
ইত্যাদিতে মিষ্টি প্রভৃতি পরিবেশনের ডালা বা বারকোশ ইত্যাদি।কিছু লোক শোকেসের মধ্যে
সোনা-রূপার পাত্র রেখে বলে, এগুলো আমরা ব্যবহার করি না, কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য
রেখে দিয়েছি। হারামের পথ রুদ্ধ করার জন্য তাদের উক্ত কাজও অনুমোদনযোগ্য নয়। (শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বাযের জবানী থেকে সরাসরি প্রাপ্ত)।
(১০০) পুরুষের রেশম/সিল্ক বা স্বর্ণের পোশাক পরিধান করাঃ
ইসলামি
শরিয়ত অনুযায়ী পুরুষদের জন্য স্বর্ণ (সোনা) এবং খাঁটি রেশমি পোশাক পরিধান করা হারাম
বা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সোনা ও রেশমকে উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের
জন্য হালাল করেছেন।
কোন
পুরুষের জন্য স্বর্ণ বা সিল্কের কাপড় পরিধান করা হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
আবূ
মূসা আশ্‘আরী, ‘আলী ও আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘‘সিল্ক
ও স্বর্ণ আমার পুরুষ উম্মতের উপর হারাম করে দেয়া হয়েছে এবং তা হালাল করা হয়েছে মহিলাদের
জন্য’’। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৭২০ সুনান ইবনু
মাজাহ ৩৫৯৫, সুনান আবূ দাউদ ৪০৫৭, ইরওয়া ২৭৭, আদাবুয যিফাফ ১৫০, গায়াতুল মারাম ৭৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আব্দুল্লাহ্
বিন্ ‘আববাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:.
‘‘একদা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির হাতে একটি সোনার আংটি দেখতে পেলেন।
তখন তিনি সোনার আংটিটি তার হাত থেকে খুলে ফেলে দিলেন এবং বললেন: তোমাদের কেউ ইচ্ছে
করে আগুনের জ্বলন্ত কয়লা হাতে নিতে চায়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে
গেলে লোকটিকে বলা হলো: আংটিটা নিয়ে নাও। অন্য কোন কাজে লাগাতে পারবে। লোকটি বললো: আল্লাহ্
তা‘আলার কসম! আমি তা কখনোই কুড়িয়ে নিতে পারবো না যা একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম খুলে ফেলে দিলেন’’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৩৬৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৯০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫২৯৬, ইসলামিক সেন্টার ৫৩১১)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সোনা,
রুপার প্লেট-বাটি এবং হাল্কা বা ঘন সিল্ক দুনিয়াতে কাফির পুরুষরাই ব্যবহার করবে। মুসলিমরা
নয়। কারণ, তাদের জন্য তা প্রস্ত্তত রয়েছে আখিরাতে।
’হুযাইফাহ্
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:.
‘‘তোমরা
হাল্কা বা ঘন সিল্ক পরিধান করো না। তেমনিভাবে সোনা রুপার পেয়ালায় পান করো না এবং এ
গুলোর প্লেটে খেও না। কারণ, সেগুলো দুনিয়াতে কাফিরদের জন্য এবং আখিরাতে আমাদের জন্য’’।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৪২৬, ৫৬৩২, ৫৬৩৩, ৫৮৩১,
৫৮৩৭; মুসলিম ২০৬৭, আহমাদ ২৩৩৭৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫০২৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯১৯)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উমর
ও আব্দুল্লাহ্ বিন্ যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘‘যে
ব্যক্তি দুনিয়াতে সিল্ক পরিধান করবে সে আর আখিরাতে তা পরিধান করবে না’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৮৩৩, ৫৮৩৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
‘আয়িশা
(রাযিয়াল্লাহু আন্হা) থেকেও বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ইরশাদ করেন:
‘‘দুনিয়াতে
সিল্কের কাপড় সেই পরিধান করবে যার জন্য আখিরাতে এ জাতীয় কিছুই থাকবে না’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৮৩৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪০৯,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১০১) অস্ত্র দিয়ে কারো দিকে ইশারা করাঃ
কারোর
দিকে দা, ছুরি বা অন্য কোন অস্ত্র দিয়ে ইঙ্গিত করাও আরেকটি কবীরা গুনাহ্।
আমর
আন নাকিদ ও ইবনু আবু উমর (রহঃ....ইবনু সীরীন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু
হুরাইরাহ (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি (লৌহ নির্মিত) মরণাস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করে সে
তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাকে অভিসম্পাত করতে থাকে যদিও সে তার আপন ভাই
হয়। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৬১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৬৪২৮, ইসলামিক সেন্টার ৬৪৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য হাদীসে এ নিষেধের কারণও উল্লেখ করেছেন।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ
যেন তার অন্য কোন ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র উঠিয়ে ইশারা না করে। কারণ সে জানে না হয়ত শয়তান
তার হাতে ধাক্কা দিয়ে বসবে, ফলে (এক মুসলিমকে হত্যার কারণে) সে জাহান্নামের গর্তে পতিত
হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৭২, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৬৫৬২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৬১৭, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(১০২) জানা সত্ত্বেও অন্যকে পিতা দাবী করাঃ
নিশ্চিতভাবে
জানা সত্ত্বেও নিজ পিতাকে ছেড়ে অন্য কাউকে নিজ পিতা হিসেবে গ্রহণ করা বা পরিচয় দেয়া
(যদিও তা শুধু কাগজপত্রে এবং যে কোন কারণেই হোক না কেন) হারাম ও কবীরা গুনাহ্।
সা‘আদ্
বিন্ আবী ওয়াক্কাস এবং আবূ বাকরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘‘যে
ব্যক্তি নিজ পিতাকে ছেড়ে অন্য কাউকে নিজ পিতা হিসেবে পরিচয় দেয়; অথচ সে জানে যে, এ
ব্যক্তি নিশ্চয়ই তার পিতা নয় তা হলে জান্নাত তার উপর হারাম হয়ে যাবে’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৩২৬, ৪৩২৭, ৬৭৬৬; ৬৭৬৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১২২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৩, আধুনিক প্রকাশনীঃ
৩৯৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৯৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
‘আলী
(রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘‘যে
ব্যক্তি নিজ পিতাকে ছেড়ে অন্য কাউকে নিজ পিতা হিসেবে পরিচয় দেয় অথবা নিজ মনিবকে ছেড়ে
অন্য কাউকে নিজ মনিব হিসেবে পরিচয় দেয় তার উপর আল্লাহ্ তা‘আলা, ফিরিশ্তা ও সকল মানুষের
লা’নত পতিত হোক। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা‘আলা তার কোনো নফল অথবা ফরয আমল কবুল করবেন
না’’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩২১৮, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৩৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩১৯৩, ইসলামীক সেন্টার ৩১৯০)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কোনো
কোনো সন্তান তো এমনও আছে যে, ছোট বেলায় তার পিতা তার প্রতি বহু অবহেলা দেখিয়েছে। এমনকি
তার কোন খবরা খবরই সে রাখেনি। তখন বড় হয়ে সে সন্তান তার পিতাকেই অস্বীকার করে বসে অথবা
পরিচয় দিতে সঙ্কোচ বোধ করে। হয়তো বা সে কখনো তার সৎ বাবাকেই আপন বাবা হিসেবে পরিচয়
দেয়। এমতাবস্থায় সত্যিই সে মারাত্মক অপরাধী। পিতার কৃতকর্মের জন্য সে আখিরাতে শাস্তি
ভোগ করবে অবশ্যই। তবে তাতে সন্তানের নিজ পিতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন:
‘‘তোমরা
নিজ পিতার প্রতি অনীহা প্রকাশ করো না। কারণ, যে ব্যক্তি নিজ পিতার প্রতি অনীহা প্রকাশ
করলো সে কুফরি করলো’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭৬৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬২, আহমাদ ১৮০১৫, আধুনিক
প্রকাশনী-৬২৯৯ , ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১০৩) বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ ও বাজনা শোনাঃ
গান-বাজনা
ও বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তির শাস্তি খুব অপমানজনক। যেহেতু এসব কাজের ভাল-মন্দ
স্বাদ চোখ ও কানের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়, সেহেতু আল্লাহ তা‘আলা এমন শাস্তি নির্ধারণ
করেছেন যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং বড় অপমানজনক। অবৈধ ক্রীড়া-কৌতুক, টিভি-সিনেমা, পেপার
ও রাস্তা-ঘাটের অশ্লীল ছবি প্রদর্শন হারাম। অশ্লীল ক্যাসেট, বই-পুস্তক ক্রয়-বিক্রয়
করা হারাম। অশ্লীল কবিতা, উপন্যাস এবং বাতিলপন্থীদের পুস্তক পাঠ করাও হারাম। বর্তমানে
অধিকাংশ যুবক-যুবতী অশ্লীল ক্যাসেট,বই, গান-বাজনা, উপন্যাস, পেশাদার অপরাধীদের কাহিনী
অথবা অশ্লীল কবিতা পাঠে অভ্যস্ত। এ সবের শাস্তি উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘এক
শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অন্ধভাবে গান-বাজনা
ও বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর
শাস্তি’। (সুরা লুক্বমান ৬)।
আবদুর
রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ
মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন
কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান
করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা
পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে
তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি
ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৫৯০, আধুনিক প্রকাশনী-
৫১৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫০৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
বদুল্লাহ
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মদপান করা, জুয়া খেলা এবং ঢোল বাজানো হারাম করেছেন এবং বলেছেনঃ
প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম। কেউ কেউ বলেছেনঃ কূবাহ্ অর্থ ’’তবলা’’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৫০৩, শু‘আবুল ঈমান ৫১১০, আবূ দাঊদ
৩৬৯৬, আহমাদ ২৪৭৬, মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী ৬১৬৪, সহীহ ইবনু হিব্বান
৫৩৬৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৫১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ তোমরা গায়িকা বেচা-কেনা করো না তাদেরকে (মেয়েদেরকে) গান শিক্ষাও দিয়ো না, এর
মূল্য হারাম। এ জাতীয় কাজ যারা করে তাদের ব্যাপারেই কুরআন মাজীদের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে,
অর্থাৎ- ’’কতক মানুষ আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত করার উদ্দেশে অজ্ঞতাবশত অবান্তর কথাবার্তা
ক্রয় করে আর আল্লাহ্র পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ওদের জন্যই আছে অবমাননাকর শাস্তি।’’-
(সূরা লুকমান ৩১ : ৬)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৮০,
সুনান আত তিরমিযী ১২৮২, সুনান ইবনু মাজাহ ২১৬৮, সহীহ আল জামি ৫০৯১)।
অত্র
হাদীছে গান-বাজনার যে কোন মাধ্যম হারাম করা হয়েছে। কাজেই সিনেমা, যাত্রা, ভিসিডি, থিয়েটার
আরো যত মাধ্যম আছে সবগুলির ব্যবসা হারাম।
নাফে‘
(রাঃ) বলেন, একদা ইবনু ওমর (রাঃ) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেলে তিনি তাঁর দুই কানে
দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, নাফে‘ তুমি কিছু
শুনতে পাচ্ছ কি? আমি বললাম, না। তিনি তার দুই আঙ্গুল দুই কান হতে বের করে বললেন, আমি
একদা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে
রাস্তা হতে সরে গিয়েছিলেন এবং আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন যেভাবে আজ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস
করলাম। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯২৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
অত্র
হাদীছে বুঝা যাচ্ছে গান বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দ যেন কানে না আসে তার সম্ভবপর চেষ্টা
করতে হবে।
আনাস
(রা.) বলেন, নবী করীম(সা.) বলেছেন, যখন আমার উম্মত নেশাদার দ্রব্য পান করবে, গায়িকাদের
নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হবে এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত হবে তখন অবশ্যই তিনটি ভয়াবহ বিপদ
নেমে আসবে- (১) বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ধসে যাবে (২) উপর থেকে অথবা কোন জাতির পক্ষ থেকে
যুলুম অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়া হবে (৩) অনেকের পাপের দরুণ আকার-আকৃতি বিকৃত করা হবে।
আর এ গজবের মূল কারণ তিনটি। (ক) মদ পান করা (খ) নায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হওয়া
(গ) বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী হওয়া।
ইবনে
আববাস (রা.) বলেন, রাসূল(সা.) বলেছেন, অবশ্য অবশ্যই আমার উম্মতের কিছু সম্প্রদায় রাত্রী
অতিবাহিত করবে বিভিন্ন ধরণের খাদ্য-পানীয়তে ভোগ বিলাসী হয়ে এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদন
আনন্দ প্রমোদে। এমতাবস্থায় তাদের সকাল হবে শুকুর ও বানরের আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে।
(সিলসিলা ছাহীহাহ হা/১৬০৪/২৬৯৯)।
অত্র
হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, এক শ্রেণীর অর্থশালী মানুষেরা নানা ধরনের মদ ও পানীয়ের
ব্যবস্থা করে অতি ভোগ-বিলাসে দিনাতিপাত করবে। নানা ধরণের আমোদ-প্রমোদে ও বিনোদনে রাত্রী
যাপন করবে। এর মাধ্যম হবে নায়িকা, মদ ও বাদ্যযন্ত্র। এ ধরণের লোকেরা শুকুর ও বানরে
পরিণত হবে। হয় তাদের আকৃতি শুকুর ও বানরের মত হবে, অথবা তাদের হালাল-হারামের বিবেচনা
থাকবে না। এজন্য নবী করীম(সা.) তাদেরকে শুকুরের সাথে তুলনা করেছন। তাদের চাল-চলন হবে
বিজাতিদের মত অর্থাৎ তাদের স্ত্রী ও মেয়েরা বিজাতিদের মত নানা পোশাক পরবে। আর এদের
কাছে যেনা হবে সাধারণ কাজ। এদের বাড়ী-গাড়ি হবে কুকুর ও বিভিন্ন ধরনের মূর্তিতে পরিপূর্ণ।
তাই তাদেরকে বানরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ তারা বিজাতিদের অনুকরণ করবে।
আবূ
মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত
অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ
তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন।
(সুনান ইবনু মাজাহ ৪০২০, সুনান আবূ দাউদ ৩৬৮৮, আহমাদ ২২৩৯৩,
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪২৯২, রাওদুন নাদীর
৪৫২, সহীহাহ ১/১৩৮-১৩৯) সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯০৯১, সুনান আননাসায়ী ৫৬৫৮, সহীহুল জামি
৮০৯১, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৩৭৮, মুসনাদে আহমাদ ১৮০৯৮, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা
৪৩৯০, দারিমী ২১০০, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১১০৬৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল
বায়হাক্বী ১৭৮৪৪। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হাদীছে
বুঝা গেল মানুষ মদ্যপান করবে, তবে মদের নাম অন্য হবে। আর নেতা ও দায়িত্বশীলদের সর্বক্ষণের
সঙ্গী হবে বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা। এদের চরিত্র হবে নোংরা, এদের প্রিয় কাজ হবে অশ্লীলতা।
তাদের স্বভাব ও কৃষ্টি-কালচার হবে শুকুর ও বানোরের ন্যায়। এরা স্বপরিবারে পাশ্চাত্যদের
স্বভাব চরিত্র গ্রহণ করবে।
রাসূল(সা.)
-এর দাস ছাওবান (রা.) বলেন, নবী করীম(সা.) বলেছেন, আমি সবচেয়ে যাদের বেশি ভয় করি তারা
হচ্ছে নেতা ও এক শ্রেণীর আলেম সমাজ। অচিরেই আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তিপূজা করবে।
আর অতি শীঘ্রই আমার উম্মতের কিছু লোক হিন্দু বা বিজাতিদের সাথে মিশে যাবে। কিয়ামতের
নিকটবর্তী সময়ে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে
নবী দাবী করবে। আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত
থাকবে। মহান আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশ (ক্বিয়ামত) না আসা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধবাদীরা
তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৫২, সুনান আততিরমিযী ২১৭৬, ২২২৯; সুনান
আবূ দাঊদ ৪২৫২, আহমাদ ২১৮৮৮, ২১৮৯৭, ২১৯৪৬; দারিমী ২০৯, রাওদুন নাদীর ৬১, ১১৭০, সহীহাহ
৪/২৫২, ১৯৫৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১০৪) কবরের উপর বসাঃ
কারোর
কবরের উপর হাঁটা বা বসা আরেকটি কবীরা গুনাহ্ এবং হারাম।
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ তোমাদের কারো অঙ্গারের উপর বসা, আর এ অঙ্গারে (পরনের) কাপড়-চোপড় পুড়ে শরীরে
পৌঁছে যাওয়া তার জন্য উত্তম হবে কবরের উর বসা হতে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৯৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২১৩৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৭১,
সুনান আবূ দাঊদ ৩২২৮, সুনান আননাসায়ী ২০৪৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৫৬৬, আহমাদ ৮১০৮, সুনানুল
কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১৪, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫১৯, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৬৩, সহীহ আল জামি‘
আস্ সগীর ৫০৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উকবা
ইবনু আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ কোন মুসলিমের কবরের উপর দিয়ে আমার হেঁটে যাওয়া অপেক্ষা জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর
দিয়ে অথবা তরবারির উপর দিয়ে আমার হেঁটে যাওয়া অথবা আমার জুতাজোড়া আমার পায়ের সাথে সেলাই
করা আমার নিকট অধিক প্রিয়। কবরস্থানে পায়খানা করা এবং বাজারের মাঝখানে পায়খানা করার
মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। (সুনান ইবনু মাজাহ ১৫৬৭, ইরওয়াহ ৬৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোন
কবরস্থানে প্রয়োজনের তাগিদে হাঁটতে চাইলে জুতোগুলো খুলে কবরগুলোর মাঝে খালি পায়েই হাঁটবে।
বাশীর ইবনুল খাসাসিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে পায়চারি করছিলাম। তিনি
বলেনঃ হে ইবনুল খাসাসিয়া! তুমি আল্লাহর নিকট এর চাইতে বড় নিয়ামত আর কী আশা করো যে,
তুমি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সকালবেলা পায়চারি করছো। আমি
বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহর নিকট এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করি না। কেননা আল্লাহ্
আমাকে সব ধরনের কল্যাণ দান করেছেন। অতঃপর তিনি মুসলিমদের কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার
সময় বলেনঃ এসব লোক বিপুল কল্যাণ লাভ করেছে। অতঃপর তিন মুশরিকদের কবরস্থানের পাশ দিয়ে
যাওয়ার সময় বলেনঃ এসব লোক ইতোপূর্বে প্রচুর কল্যাণ লাভ করেছে। রাবী বলেন, তিনি এক ব্যক্তিকে
জুতা পরিহিত অবস্থায় কবরস্থান অতিক্রম করতে দেখে বলেনঃ হে জুতা পরিধানকারী! তোমার জুতা
জোড়া খুলে ফেলো। (সুনান ইবনু মাজাহ ১৫৬৮, সুনান আননাসায়ী
২০৪৮; সুনান আবূ দাউদ ৩২৩০; আহমাদ ২০২৬০, আহকাম ১৩৬-১৩৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
জাবির
ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
কবরে সিমেন্ট চুন দিয়ে কোন কাজ করতে, তার উপর কিছু লিখতে অথবা খোদাই করে কিছু করতে
নিষেধ করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭৯০, সুনান
আত্ তিরমিযী ১০৫২, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১০৫) টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়াঃ
লুঙ্গি,
পায়জামা, প্যান্ট ইত্যাদি কাপড় যদি পায়ের কিঞ্চিৎ নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করা হয় এবং তাঁর
উদ্দেশ্য হয় অহংকার করা, তবে তাঁর শাস্তি হল – কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর দিকে
দৃষ্টি দিবেন না, তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে
যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর যদি অহংকারের সাথে নয় বরং সাধারণভাবে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, তবে
তাঁর শাস্তি হল –তাঁর টাখনুদ্বয়কে জাহান্নামের আগুনে পোড়ানো হবে।
আবূ
যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ কিয়ামতের
দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টি দিবেন না, তাদেরকে পবিত্রও
করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা
কারা? তারা তো বিফল হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেনঃ
(১)
যে ব্যক্তি পায়ের গোছার নিচে পরিধেয় ঝুলিয়ে পরে,
(২)
যে ব্যক্তি দান করার পর খোঁটা দেয় এবং
(৩)
যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে নিজের মাল বিক্রয় করে। (সুনান
ইবনু মাজাহ ২২০৮, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৯৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৭৮৭, সুনান আততিরমিযী ১২১১, সুনান আননাসায়ী ২৫৬৩,
২৫৬৪, ৪৪৫৮, ৪৪৫৯, ৫৩৩৩, সুনান আবূ দাউদ ৪০৮৭, আহমাদ ২০৮১১, ২০৮৯৫, ২০৯২৫, ২০৯৭০, ২১০৩৪,
দারেমী ২৬০৫, গায়াতুম নারাম ১৭০, ইরওয়া ৯০০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৫২৫৮, সহীহ আত্ তারগীব ১৭৮৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি
অহংকার বশতঃ নিজের পোশাক ঝুলিয়ে চলবে, আল্লাহ তার প্রতি কিয়ামতের দিন (দয়ার) দৃষ্টি
দিবেন না। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার লুঙ্গির এক পাশ ঝুলে থাকে,
আমি তাতে গিরা না দিলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ, যারা অহঙ্কারবশতঃ
এমন করে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৫৭৮৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৩৪৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৮৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৫৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৫২৫৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
টাখনুর নিচে ইযারের যে অংশ থাকবে তা জাহান্নামে। (অর্থাৎ- কিয়দংশের জন্য সারা শরীরই
আগুনে প্রজ্জ্বলিত হবে।) (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৩১৪,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৭৮৭, মুসনাদে আহমাদ ৯৩১৯, সুনান আননাসায়ী ৫৩৩১, সহীহ
আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২০২৯, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২০৩৭, মুসান্নাফ ইবনু আবী শারবাহ্
২৪৮২৪, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ২৭২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ জনৈক ব্যক্তি অহংকারবশতঃ তার ইযার (লুঙ্গি) হেঁচড়িয়ে যাচ্ছিল, এমতাবস্থায় তাকে
জমিনে ধসিয়ে দেয়া হলো। সে কিয়ামত পর্যন্ত যমীনের ভেতর তলিয়ে যেতে থাকবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৩১৩, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৪৮৫, সুনান আননাসায়ী ৫৩২৬, মুসনাদে আহমাদ ৫৩৪০, সহীহুল জামি‘ ২৮৭২, আল জামি‘উস্ সগীর
৫১৮৩, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৯১৩, শু‘আবুল ঈমান ৩১২৪, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৬৪৮৪,
সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৫০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১০৬) পুরুষদের মহিলার বেশ এবং মহিলাদের পুরুষদের বেশ ধারণ করাঃ
পুরুষকে
আল্লাহ তা‘আলা যে পুরুষালী স্বভাবে সৃষ্টি করছেন তাকে তা বজায় রাখা এবং নারীকে যে নারীত্ব
দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তাকে তা ধরে রাখাই আল্লাহর বিধান। এটা এমনি এক ব্যবস্থা, যা না
হলে মানব জীবন ঠিকঠাক চলবে না। পুরুষের নারীর বেশ ধারণ এবং নারীর পুরুষের বেশ ধারণ
স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। এর ফলে অশান্তির দুয়ার খুলে যায় এবং সমাজে উচ্ছৃংখলতা ও বেলেল্লাপনা
ছড়িয়ে পড়ে। শরী‘আতে এ জাতীয় কাজকে হারাম গণ্য করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে যে আমল করার
দরুন শর‘ঈ দলীলে অভিশাপ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেই দলীলেই প্রমাণ করে যে উক্ত কাজ হারাম
ও কবীরা গুনাহ।
(ক)
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর
সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষ এবং পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণকারিণী নারীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন
এবং বলেছেনঃ তাদেরকে তোমাদের ঘর হতে বের করে দাও। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৪২৮, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৮৮৫, ৫৮৮৬, দারিমী ২৬৪৯, সুনান
আবূ দাঊদ ৪৯২৯, সুনান ইবনু মাজাহ ১৯০৪, ইরওয়া
১৭৯৭, মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী ৫৩১৫, মুসনাদে আহমাদ ১৯৮২, আল মু‘জামুল
আওসাত্ব ৪৫৯০, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১১৫৮০, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী
১৭৪৩৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩৫৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ)
আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আল্লাহর লা’নাত সে পুরুষদের ওপর যারা নারী সাদৃশ্য ধারণ করে এবং সে সকল নারীদের
ওপর যারা পুরুষ সাদৃশ্য ধারণ করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৪৪২৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৮৮৫, সহীহুল জামি‘ ৫১০০, আল জামি‘উস্
সগীর ৯২৩১, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২০৬৮, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৬৪৯৩,
আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১১৪৮১, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ১৪৩৫, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৪৫৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৩৫৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অনেকে
দৈহিকভাবে মেয়েলী বেশ ধারণ করে, কথাবার্তা ও চলাফেরায় মেয়েলীপনা অবলম্বন করে কিংবা
পুরুষের বেশ ধারণ করে আবার পোশাক ও অলংকার পরিধানেও অনুকরণ করে। সুতরাং পুরুষের জন্য
গলার হার, হাতের চুড়ি, পায়ের মল, কানের দুল পরা চলবে না। অনুরূপভাবে মহিলারাও পুরুষদের
জামা, পাজামা, প্যান্ট, শার্ট, পাঞ্জাবী পরতে পারবে না। নারীদের পোশাকের ডিজাইন পুরুষদের
থেকে ভিন্নতর হবে।
(গ)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এমন পুরুষের ওপর লা’নাত করেছেন যে নারীর পোশাক পরিধান করে এবং এমন নারীর ওপর যে পুরুষের
পোশাক পরিধান করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৪৬৯, সুনান
আবূ দাঊদ ৪০৯৮, সুনান ইবনু মাজাহ ১৯০৩, সহীহুল জামি‘উস্ সগীর ৫০৯৫, আহমাদ ৮৩০৯, সহীহ
আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২০৬৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৭৫১, শু‘আবুল ইমান ৭৮০২, সুনানুন্
নাসায়ী আল কুবরা ৯২৫৩, মুসতাদরাক ইবনু হাকিম ৭৪১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১০৭) ছায়ায় ও রাস্তায় প্রসাব-পায়খানা করাঃ
ছায়া,
পানির ঘাট এবং চলাচলের রাস্তায় প্রস্রাব-পায়খানা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং
এটি অভিশাপ বা লা'নতের কারণ।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা দু’টি
অভিশপ্ত কাজ থেকে দূরে থাকবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, অভিশপ্ত কাজ দু’টি কি হে আল্লাহর
রসূল? তিনি বলেন, মানুষের যাতায়াতের পথে অথবা (বিশ্রাম নেয়ার) ছায়া বিশিষ্ট জায়গায়
পেশাব পায়খানা করা। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ২৫, সহীহ
ইবনু খুযায়মাহ্: ৬৭; শারহুস্ সুন্নাহ্ বাগাভী : ১৯১, সহীহ তারগীব ১৪১)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
মু’আয
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি
অভিশপ্ত হওয়ার যোগ্য কাজ- (১) পানির ঘাটে, (২) চলাচলের পথে ও (৩) কোন কিছুর ছায়ায় পায়খানা
করা- এমন করা হতে বেঁচে থাকবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৫, সুনান আবূ দাঊদ ২৬, সুনান ইবনু মাজাহ ৩২৮,
সহীহ তারগীব ১৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসুল
(ﷺ)
বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে ব্যক্তির উপরে তাদের
অভিশাপ অনিবার্য হয়ে যায়।’’ (সহীহ তারগীব ১৪৩)।
(১০৮) মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কোন জন্তুকে আটকে রাখাঃ
ইসলামি
শরীয়াহ অনুযায়ী কোনো প্রাণীকে অকারণে বা অন্যায়ভাবে কষ্ট দিয়ে আটকে রাখা বা হত্যা
করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি একটি কবিরাহ গুণাহ।
ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক নারী একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গিয়েছিল,
সে তাকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবারও দেয়নি, ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে যমীনের পোকা মাকড়
খেতে পারত। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অনুরূপ
হাদীস বর্ণিত আছে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৩১৮,
২৩৬৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৭২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৮১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(১০৯) কোনো জন্তুকে তীর বা গুলি লাগানোর ট্রেনিং-এর লক্ষ্য বস্তু বানানোঃ
কোনো
জীবন্ত প্রাণীকে তীর বা গুলি লাগানোর ট্রেনিং-এর লক্ষ্যবস্তু (Target) হিসেবে ব্যবহার
করা অমানবিক, আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং অধিকাংশ নৈতিকতার পরিপন্থী।
সা’ঈদ
ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ আমি ইবনু ’উমার -এর কাছে ছিলাম। এরপর আমরা
একদল তরুণ কিংবা তিনি বলেছেন, একদল মানুষের কাছ দিয়ে যাবার সময় দেখলাম, তারা একটি মুরগী
বেঁধে তার দিকে তীর ছুঁড়ছে। তারা যখন ইবনু ’উমার -কে দেখতে পেল, তখন তারা তা থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে গেল। ইবনু ’উমার বললেনঃ এ কাজ কে করেছে? এ কাজ যে করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম তাঁর উপর অভিশাপ দিয়েছেন।
শু’বাহ
(রহ.) থেকে সুলাইমান এ রকমই বর্ণনা করেছেন। মিনহাল ইবনু উমার এর সূত্রে বলেন, যে ব্যক্তি
জীব-জন্তুর অঙ্গহানি করে তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৫১৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৫১০৯,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫০০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১১০) বিনা কারণে কুকুর পোষাঃ
হারা
দেওয়া ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে কুকুর রাখলে প্রতিদিন আমলনামা থেকে এক বা দুই 'কিরাত' (অনেক
বড় পরিমাণ) সওয়াব কমে যায়।
আবদুল্লাহ
ইবনু উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি শিকারী
কুকুর কিংবা পশু রক্ষাকারী কুকুর ছাড়া অন্য কোন কুকুর পোষে, সে ব্যক্তির সাওয়াব থেকে
প্রতিদিন দু’ কীরাত পরিমাণ কমে যায়। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৫৪৮১, ৫৪৮০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫০৭৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯৭৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
হাসান
ইবন আলী (রহঃ).....আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যে ব্যক্তি পশুদের রক্ষণাবেক্ষণ, শিকারের উদ্দেশ্যে বা ক্ষেত-খামারের
সংরক্ষণের প্রয়োজন ছাড়া কুকুর প্রতিপালন করে তার সওয়াব হতে প্রত্যহ এক ’কিরাত’ কম হবে।
(সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ২৮৩৫)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(১১১) মৃত জন্তু ও রক্ত খাওয়াঃ
আল্লাহ
তায়ালা বলেন,
“তোমাদের
জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু(১), রক্ত(২), শূকরের গোস্ত(৩), আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের
নামে যবেহ করা পশু(৪), গলা চিপে মারা যাওয়া জন্তু(৫), প্রহারে মারা যাওয়া জন্তু(৬),
উপর থেকে পড়ে মারা যাওয়া জন্তু(৭), অন্যপ্রাণীর শিং এর আঘাতে মারা যাওয়া জন্তু(৮)
এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু(৯); তবে যা তোমরা যবেহ করতে পেরেছ তা ছাড়া(১০), আর যা
মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলী দেয়া হয় তা(১১) এবং জুয়ার তীর দিয়ে ভাগ নির্ণয় করা(১২),
এসব পাপ কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে(১৩); কাজেই তাদেরকে
ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম
এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম(১৪), আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে
পছন্দ করলাম(১৫)। অতঃপর কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তবে নিশ্চয়
আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫:৩)।
আল্লাহ
তায়ালা আরও বলেন,
“তিনি
আললাহ্ তো কেবল তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত এবং যার উপর
আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নাম উচচারিত হয়েছে, কিন্তু যে নিরুপায় অথচ নাফরমান এবং সীমালঙ্ঘনকারী
নয় তার কোন পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। (সুরা আল বাক্বারাহ ৩/১৭৩)।
এখানে
তিনটি হারামের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যথা (১) মৃত জন্তু (২) রক্ত এবং (৩) শূকরের গোশত।
এক্ষণে আমরা দেখব মৃত জন্তু ও রক্তে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কি কি ক্ষতি রয়েছে। মৃত জন্তু
দুই প্রকার যথা (১) শিকার করে হত্যাকৃত (২) অন্যভাবে মৃত। শিকার করে হত্যার ব্যাপারে
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশনা রয়েছে।
আদী
ইবনু হাতিম (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
জিজ্ঞেস করি, ’আমরা এসব কুকুর দ্বারা শিকার করে থাকি। তিনি আমাকে বললেনঃ যখন তোমার
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরগুলো আল্লাহর নাম নিয়ে শিকারে পাঠাবে, সেগুলো তোমার জন্য যা
ধরে আনবে তা খাও, এমন কি শিকার মেরে ফেললেও। কুকুর যদি তা থেকে না খেয়ে থাকে তাহলে
খাও। আর যদি খেয়ে থাকে তবে খেও না। কেননা আমার আশঙ্কা হচ্ছে, ঐ শিকার সে নিজের জন্য
ধরেছে। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ২৮৪৮)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
আদী
ইবনু হাতিম (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি যদি
আল্লাহর নাম নিয়ে তোমার তীর ছুঁড়ো এবং ঐ শিকারকৃত পশু পরের দিন এমন অবস্থায় পাও যে,
তা পানিতে পড়েনি এবং তাতে তোমার তীরের আঘাত ছাড়া অন্য কোনো চিহ্নও নেই, তবে তা খাও।
আর যদি তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের সাথে অন্য কুকুর দেখো তাহলে শিকার খেও না। কেননা
তুমি অবহিত নয় যে, হয় তো অন্য কোনো কুকুর শিকার হত্যা করেছে। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ২৮৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
উপরের
দু’টি হাদীছে লক্ষণীয় যে, শিকার দ্বারা নিহত পশুর ক্ষেত্রে দু’টি নির্দেশনা (১) তীর
শিকারের গায়ে লাগার পর রক্ত বের না হ’লে সে পশুর গোশত ভক্ষণ করা যাবে না। (২) কুকুর
যদি শিকারকৃত পশুর কিছু অংশ খেয়ে ফেলে তবে ঐ পশুর গোশত খাওয়া যাবে না। জীবিত পশুর শরীরে
তীর লাগলে তা হ’তে রক্ত বের হবে কিন্তু মৃত পশুর শরীরে তীর লাগলে তা হ’তে রক্ত বের
হবে না। কারণ মৃত্যুর পর দেহের রক্ত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় বা জমাট বেধে যায়। দেহের সক্রিয়তা
বন্ধের সাথে সাথে দূষিত পদার্থ এসে রক্তে মিশ্রিত হ’তে থাকে। দূষিত পদার্থ যেমন- কার্বন
ডাই অক্সাইড, ল্যাকটিক এসিড সহ অন্যান্য বস্ত্ত। জীবিত অবস্থায় এগুলো কিডনি ও ফুসফুসের
মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়। রক্তে ক্ষারের মাত্রা (pH) স্বাভাবিক অবস্থা থেকে পরিবর্তিত
হয়ে যায় এবং রক্ত জমাট বেধে যায়। ফলে মৃত দেহ হ’তে রক্ত বের হয় না। তাই রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন পশুর শরীরে তীর বিদ্ধ হওয়ার পর যদি রক্ত প্রবাহিত না হয়, তবে
সেই পশুর গোশত খাওয়া যাবে না কারণ তা আগে থেকেই মৃত।
মৃত পশুর গোশত খাওয়া কেন শরীরের জন্য ক্ষতিকারক?
২০১৮
সালের ২রা ফেব্রুয়ারী নিউজ ২৪-এ একটি ঘটনা প্রকাশিত হয় যে, আফ্রিকার মোপজো গ্রামের
প্রায় ৫০ জন লোককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যারা সাপে কাটা একটি মৃত গরুর গোশত খেয়েছিল।
এদের মধ্যে ১৬ জন শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং এদের মধ্য থেকে ৮ জনকে নেলসন ম্যান্ডেলা
একাডেমিক হাসপাতালের শিশু বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়। রোগীরা ডায়রিয়া, বমি, মাথাব্যথা
এবং পেটে ব্যথা অনুভব করেছিল, যা মূলত বিষক্রিয়ার লক্ষণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে
একটি পশু যে কারণে মারা যায় পশুর মৃত্যুর পর তার কারণ ঐ পশুর শরীরে বর্তমান থাকে। নিম্নে
এর বিবরণ দেওয়া হলোঃ
(১)
বিষক্রিয়ায় মৃত্যু : যখন একটি পশু সাপের কামড়ে, কুকুরের কামড়ে, বিষাক্ত ফল খেয়ে বা
রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করে তখন ঐ পশুর শরীরে সেই বিষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে
মানুষ যখন ঐ পশুর গোশত ভক্ষণ করে তখন সে ঐ বিষে আক্রান্ত হয়।
(২)
রোগ-বালাই : পশুরা বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যেমন: জলাতংক, ব্লাস্টোমাইকোসিস
(এক ধরনের ফাংগাল ইনফেকশন) ও ব্যাক্টেরিয়া জনিত রোগ ইত্যাদি। কোন পশু যখন একটি রোগে
মারা যায় তখন ঐ রোগ পশুর শরীরে ছেয়ে যায়। ফলে যখন মানুষ ঐ পশুর গোশত ভক্ষণ করে তখন
মানুষ ঐ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
(৩)
সীসার গুলি : অনেক সময় গুলি করে পশু হত্যা করা হয় এবং এই সবগুলি অনেক সময় সীসার তৈরী
হয়ে থাকে। এই গুলিতে হত্যাকৃত পশুর গোশতে সীসার প্রভাব বিদ্যমান থাকে। গবেষকরা জানিয়েছেন
যে, যখন সীসার বুলেট দ্বারা একটি পশু হত্যা করা হয় এবং গোশত ভক্ষণ করা হয় তখন মানুষের
শরীরে সীসার প্রভাব চলে আসে। আর সীসা হ’ল একটি বিষাক্ত ধাতু যা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ
করলে মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয় এবং কিডনি নষ্ট হয়ে যায়।
(৪)
ব্যাকটেরিয়া : যখন একটি প্রাণী মৃত পাওয়া যায়, তখন কেউ নিশ্চিত হ’তে পারে না যে পশুর
শরীরের টিস্যু কতক্ষণ ধরে ক্ষয় হচেছ। এটি প্রধানত ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে
হয়, যা গোশতকে মানুষের খাওয়ার জন্য অনুপযোগী করে তোলে। Escherichia coli (E. coli)
ব্যাকটেরিয়া প্রায়ই মানুষের মধ্যে অসুস্থতা সৃষ্টি করে। কাঁচা বা কম রান্না করা গোশতে
এই ব্যাক্টেরিয়া তৈরী হয়। লিস্টেরিওসিস হ’ল আরেকটি খাদ্য-বাহিত ব্যাকটেরিয়া যা মৃত
পশুর শরীরে তৈরী হয়। যা গুরুতর অসুস্থতার কারণ হ’তে পারে, বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা কম।
(৫)
পরজীবী : মৃত পশুর গোশত অনেক সময় পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হ’তে পারে যেমন- কৃমি। এই
ধরনের গোশত দূষিত হয়। যেমন- টেপওয়ার্ম, বিশেষ করে টেনিয়া সাগিনাটা (গরুর গোশতের ফিতাকৃমি)
এবং টেনিয়া সোলিয়াম (শূকরের গোশতের ফিতাকৃমি)। এই পরজীবীগুলি বিশেষভাবে অল্প রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য যেমন খুব অল্প বয়স্ক ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিকারক।
কারণ এটি লিভারকে প্রভাবিত করতে পারে এবং গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এরূপ
বিভিন্ন কারণে একটি পশু মারা যাতে পারে এবং মৃত পশুর শরীরে উপরোক্ত সমস্যা থাকতে পারে।
ফলে একজন মানুষ মৃত পশুর গোশত ভক্ষণ করলে সে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
(১১২) মুসলিম হিসেবে অনৈসলামিক দলকে সমর্থন করা/ভোট দেয়াঃ
যেসব
আলেম ওলামা, পীর আউলিয়া, গাউস কুতুব, মাওলানা, হুজুর, মুফতি, শায়েখ, মুহাদ্দিস, ওস্তাদ
ও সাধারণ মুসলিম ভোটার ইসলামি দল ব্যতীত কোনো অনৈসলামিক দলকে ভোট দিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি,
অস্ত্রবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, মারামারি, ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনসহ
সকল অন্যায়ের সহযোগী হবে তারা জাহান্নামী। অন্যায়ের সহযোগী সকল মুসলিম ইসলাম থেকে খারিজ
হবে।
এদের
কোনো আমল আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না। এরা পাপিষ্ঠ, এরা জালিম, এরা সকল পাপের অংশীদার।
এতদবিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক বিস্তারিত জানতে "অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের
মুসলিম ভোটারদের করুন পরিণতি" নামক বইটি পড়ুন।
এর উপর ক্লিক করুন
সব গুনাহ কি মাফ হয়?
অনেকের
মনেই প্রশ্ন জাগে, কাবীরা ও সগীরা সকল গুনাহ-ই কি মাফ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে বলবো,
হ্যাঁ, আল্লাহ চাইলে সকল গুনাহ-ই মাফ করতে পারেন। তবে তিনি কুরআনে বলে দিয়েছেন যে,
তিনি শির্কের গুনাহ মাফ করবেন না। এছাড়া অন্যান্য গুনাহ মাফ করবেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা
বলেন,
‘‘নিশ্চয়
আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শির্ক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে
ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।’’ (সূরা আন্ নিসা ০৪ : ৪৮, ১১৬)।
শির্ক
ছাড়া অন্যান্য কাবীরা গুনাহগুলো মাফ পেতে সাধারণত তাওবাহ্ করার দরকার হয়। কিন্তু সগীরা
গুনাহ মাফের জন্য সবসময় তাওবার প্রয়োজন হয় না। দৈনন্দিন কিছু ‘আমলের মাধ্যমে এসব ছোট-খাট
গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়। তাই কাবীরা গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকলে সগীরা গুনাহগুলো আল্লাহ
মাফ করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন,
‘‘তোমরা
যদি নিষেধকৃত কাবীরা গুনাহগুলো বা গুরুতর/বড় পাপসমূহ পরিহার করো তাহলে আমরা তোমাদের
(ছোট) লঘুতর পাপগুলোকে মোচন করে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে (জান্নাতে) প্রবেশ
করাবো।’’ (সূরা আন্ নিসা ০৪ : ৩১)।
অন্য
আয়াতে তিনি বলেন,
‘‘যারা
ছোট-খাট অপরাধ ছাড়া কাবীরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজ হতে বিরত থাকে। নিশ্চয় তোমার রব অপরিসীম
ক্ষমাশীল।’’ (সূরা আন্ নাজ্ম ৫৩:৩২)।
হযরত
আবূ হুরায়রা রাযি.থেকে আরও বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
ইরশাদ করেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমু'আ তার পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত এবং এক রমযান
তার পরবর্তী রমযান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহ মোচন করে, যখন কবীরা গুনাহসমূহ
পরিহার করা হয়। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৩৩; জামে তিরমিযী, হাদীছ
নং ২১৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ৯১৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪১, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৫৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অর্থাৎ
কেউ যদি ফজরের সলাত আদায় করে, তারপর যোহরের সময় যোহরের সলাত আদায় করে তাহলে সে ফজরের
সলাতের পর থেকে যোহরের সলাত পর্যন্ত যে সব সগীরা গুনাহ করেছে, যোহরের সলাত আদায় করার
সাথে সাথে তার সেই গুনাহগুলো মাফ হয়ে যাবে। এ রকমই এক সপ্তাহে জুমু‘আহর সলাত আদায় করে
পরের সপ্তাহের জুমু‘আর সলাত আদায় করলে এই দুই জুমু‘আর মধ্যবর্তী সাত দিনের সগীরা গুনাহগুলো
মাফ হয়ে যাবে।
আবূ
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি
রমাযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ
করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে
দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। সুলায়মান ইবনু
কাসীর (রহ.) যুহরী (রহ.) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪০২৩, ৩৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৭১, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১৮৮৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি উযূ করবে এবং উত্তমভাবে উযূ করবে, তারপর জুমু‘আর সালাতে যাবে। চুপচাপ
খুত্ববাহ্ (খুতবা) শুনবে। তাহলে তার এ জুমু‘আহ্ হতে ওই জুমু‘আহ্ পর্যন্ত সব গুনাহ ক্ষমা
করা হবে, অধিকন্তু আরো তিন দিনের। আর যে ব্যক্তি খুত্ববার সময় ধূলা বালি নাড়ল সে অর্থহীন
কাজ করল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৮৩, সুনান ইবনু
মাজাহ ১০৯০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৮৭২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৫৭, সুনান আবূ
দাউদ (তাহকিককৃত) ১০৫০, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৪৯৮, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৫০২৭,
আহমাদ ৯৪৮৪, ইবনু খুযায়মাহ্ ১৭৫৬, ১৮১৮, ইবনু হিব্বান ২৭৭৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী
৫৮৪৯, শু‘আবুল ঈমান ২৭২৬, শারহুস্ সুন্নাহ্ ৩৩৬, সহীহ আত্ তারগীব ৬৮৩, সহীহ আল জামি‘
৬১৭৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
একইভাবে
এ বছর যারা রমাযান মাসের সিয়াম পালন করেছে এবং পরবর্তী বছরও রযামানের সিয়াম পালন করলে
তার এই দুই রমাযানের মাঝের এক বছরের সগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হচ্ছে এই সময়গুলোতে
কাবীরা গুনাহ করা যাবে না।
আরও
একটি বর্ণনায় এসেছে,
উসমান
(রাঃ) হতে বণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে
ব্যক্তি উযূ করে এবং উত্তমভাবে উযূ করে, তার শরীর হতে তার সকল গুনাহ বের হয়ে যায়, এমনকি
তার নখের নিচ হতেও তা বের হয়ে যায়। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২৮৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৪৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৬৯, ইসলামিক সেন্টারঃ
৪৮৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্যত্র
এসেছে,
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যখন কোন মুসলিম অথবা মু’মিন বান্দা উযূ করে এবং তার চেহারা ধুয়ে নেয়, তখন তার
চেহারা হতে পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে তার চোখের দ্বারা কৃত সকল গুনাহ
বের হয়ে যায় যা সে চোখ দিয়ে দেখেছে। যখন সে তার দুই হাত ধোয় তখন তার দুই হাত দিয়ে করা
গুনাহ পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায় যা তার দু’ হাত দিয়ে ধরার
কারণে সংঘটিত হয়েছে। অনুরূপভাবে সে যখন তার দুই পা ধোয়, তার পা দ্বারা কৃত গুনাহ পানির
সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায় যে পাপের জন্যে তার দু’ পা হাঁটছে। ফলে
সে উযূর জায়গা হতে উঠার সময়) সকল গুনাহ হতে পাক-পবিত্র হয়ে যায়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত ২৮৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৬৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৪৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক শীতের সময়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বের হলেন, আর তখন গাছের পাতা ঝরে পড়ছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি
গাছের দু’টি ডাল ধরে নাড়া দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাতে গাছের পাতা ঝরতে লাগলো। আবূ
যার (রাঃ) বলেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে ডাকলেন, হে আবূ যার!
উত্তরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি উপস্থিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কোন মুসলিম বান্দা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির বিধানের জন্য খালিস
মনে সালাত আদায় করে, তার জীবন থেকে তার গুনাহসমূহ এভাবে ঝরে পড়তে থাকে যেভাবে গাছের
পাতা ঝরে পড়ে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৬, আহমাদ
২১০৪৬, সহীহ আত্ তারগীব ৩৮৪)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
যায়দ
বিন খালিদ আল জুহানী (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দু’ রাক্’আত সালাত আদায় করেছে, আর এতে ভুল করেনি, আল্লাহ তার অতীত
জীবনের সব গুনাহ (সগীরাহ্) ক্ষমা করে দিবেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৭, আহমাদ ২১১৮৩, আবূ দাঊদ ৯০৫, সহীহ আত্ তারগীব ২২৮)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
সাধারণভাবে
ভালো কাজ খারাপ কাজকে মুছে ফেলে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘নিশ্চয়
ভালো কাজগুলো মন্দকাজগুলোকে মিটিয়ে দেয়।’’ (সূরা হূদ ১১:১১৪)।
উপরিউক্ত
আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, কাবীরা গুনাহ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ আল্লাহ তা‘আলা
সাধারণ নেক কাজের মাধ্যমে এমনিতেই ক্ষমা করে দেন। এর জন্য বিশেষ তাওবাহ্ জরুরি নয়।
বিভিন্ন ‘আমলের মাধ্যমেই এসব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন হাদীস দ্বারা জানা যায়
যে, কিছু কিছু কাবীরা গুনাহও বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা‘আলা সৎকর্মের মাধ্যমে ক্ষমা
করে দেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসছে।
রাসূলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন :
‘‘তিনি
জিবরীল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন, ‘আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে
শরীক না করে (অর্থাৎ শির্ক না করে) মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ বর্ণনাকারী
বলেন, আমি বললাম, ‘যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও?’ তিনি বললেন, ‘যদিও সে ব্যভিচার
করে ও চুরি করে তবুও’।’’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬২৬৮, ১২৩৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৪, আহমাদ ২১৪৭১,
আধুনিক প্রকাশনী- ৫৮২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৭২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ্
ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সবশেষে
যে লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে এবং সবশেষে যে ব্যক্তি জান্নাতে দাখিল হবে তার সম্পর্কে
আমি জানি। এক ব্যক্তি হামাগুড়ি দেয়া অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। তখন আল্লাহ্ বলবেন,
যাও জান্নাতে দাখিল হও। তখন সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে, জান্নাত ভরতি
হয়ে গেছে এবং সে ফিরে আসবে ও বলবে, হে প্রতিপালক! জান্নাত তো ভরতি দেখতে পেলাম। আবার
আল্লাহ্ বলবেন, যাও জান্নাতে দাখিল হও। তখন সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে,
জান্নাত ভর্তি হয়ে গেছে। তাই সে ফিরে এসে বলবে, হে প্রতিপালক! জান্নাত তো ভর্তি দেখতে
পেলাম।
তখন
আল্লাহ বলবেন, যাও জান্নাতে দাখিল হও। কেননা জান্নাত তোমার জন্য দুনিয়ার সমতুল্য এবং
তার দশগুণ। অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়ার দশ গুণ। তখন লোকটি
বলবে, (হে প্রতিপালক)! তুমি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা বা হাসি-তামাশা করছ? (রাবী বলেন)
আমি তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর মাড়ির দাঁত প্রকাশ করে
হাসতে দেখলাম। এবং তিনি বলছিলেন এটা জান্নাতীদের সর্বনিম্ন অবস্থা। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৫৭১, ৭৫১১; সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৩৪৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৬, আহমাদ ৩৫৯৫] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬১১৬, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৬১২৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কয়েকজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের
দিন আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? উত্তরে তিনি বললেনঃ সূর্যের নিচে যখন কোন
মেঘ না থাকে তখন তা দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল!
তিনি বললেনঃ পূর্ণিমার চাঁদ যদি মেঘের আড়ালে না থাকে তবে তা দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা
হয়? তারা বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ তোমরা অবশ্যই কিয়ামতের দিন আল্লাহকে
ঐরূপ দেখতে পাবে। আল্লাহ্ মানুষকে একত্রিত করে বলবেন, (দুনিয়াতে) তোমরা যে যে জিনিসের
’ইবাদাত করেছিলে সে তার সঙ্গে চলে যাও।
অতএব
সূর্যের পূজারী সূর্যের সঙ্গে, চন্দ্রের পূজারী চন্দ্রের সঙ্গে এবং মূর্তি পূজারী মূর্তির
সঙ্গে চলে যাবে। অবশিষ্ট থাকবে এ উম্মাতের লোকেরা, যাদের মাঝে মুনাফিক সম্প্রদায়ের
লোকও থাকবে। তারা আল্লাহকে যে আকৃতিতে জানত, তার আলাদা আকৃতিতে আল্লাহ্ তাদের কাছে
হাযির হবেন এবং বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন তারা বলবে, আমরা তোমার থেকে আল্লাহর
কাছে আশ্রয় চাই। আমাদের প্রতিপালক না আসা পর্যন্ত আমরা এ স্থানেই থেকে যাব। আমাদের
প্রতিপালক যখন আমাদের কাছে আসবেন, আমরা তাকে চিনে নেব। এরপর যে আকৃতিতে তারা আল্লাহকে
জানত সে আকৃতিতে তিনি তাদের কাছে হাযির হবেন এবং বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন
তারা বলবে (হাঁ) আপনি আমাদের প্রতিপালক। তখন তারা আল্লাহর অনুসরণ করবে। অতঃপর জাহান্নামের
পুল স্থাপন করা হবে।
রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, সর্বপ্রথম আমি সেই পুল অতিক্রম করব। আর সেই
দিন সমস্ত রাসূলের দু’আ হবে اللهُمَّ سَلِّمْ سَلِّمْ অর্থাৎ
হে আল্লাহ্! রক্ষা কর, রক্ষা কর। সেই পুলের মাঝে সা’দান নামক (এক রকম কাঁটাওয়ালা) গাছের
কাঁটার মত কাঁটা থাকবে। তোমরা কি সা’দানের কাঁটা দেখেছ? তারা বলল, হ্যাঁ, ইয়া রাসূরাল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
এ কাঁটাগুলি সা’দানের কাঁটার মতই হবে, তবে তা যে কত বড় হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ ছাড়া
কেউ জানে না। সে কাঁটাগুলি মানুষকে তাদের ’আমল অনুসারে ছিনিয়ে নেবে। তাদের মাঝে কতক
লোক এমন হবে যে তাদের ’আমলের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর কতক লোক এমন হবে যে তাদের ’আমল
হবে সরিষার মত নগণ্য। তবুও তারা নাজাত পাবে। এমন কি আল্লাহ্ বান্দাদের বিচার সমাপ্ত
করবেন এবং لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ এর
সাক্ষ্যদাতাদের থেকে যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার ইচ্ছা করবেন আল্লাহ্ তাদেরকে
বের করার জন্য ফেরেশতাদেরকে আদেশ করবেন। সিজদার চিহ্ন দেখে ফেরেশতারা তাদেরকে চিনতে
পারবে।
আর
আল্লাহ্ বানী আদমের ঐ সিজদার স্থানগুলোকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। কাজেই
ফেরেশ্তারা তাদেরকে এমন অবস্থায় বের করবে যে, তখন তাদের দেহ থাকবে কয়লার মত। তারপর
তাদের দেহে পানি ঢেলে দেয়া হবে। যাকে বলা হয় ’মাউল হায়াত’ জীবন-বারি। সাগরের ঢেউয়ে
ভেসে আসা আবর্জনায় যেমন গাছ জন্মায়, পরে এগুলো যেমন সজীব হয় তারাও সেরকম সজীব হয়ে যাবে।
এ সময় জাহান্নামের দিকে মুখ করে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকবে আর বলবে, হে প্রভু! জাহান্নামের
লু হাওয়া আমাকে ঝলসে দিয়েছে, এর তেজ আমাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সুতরাং
তুমি আমার চেহারাটা জাহান্নামের দিক থেকে ঘুরিয়ে দাও। এভাবে সে আল্লাহকে ডাকতে থাকবে।
তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ আমি যদি তোমাকে এটা দিয়ে দেই তবে তুমি আর অন্যটি চাইবে? লোকটি বলবে,
না। আল্লাহ্, তোমার ইয্যতের কসম! আর অন্যটি চাইব না। তখন তার চেহারাটা জাহান্নামের
দিক থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে। এরপর সে বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে জান্নাতের দরজার
কাছে পৌঁছে দাও। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বলনি যে, তুমি আমার কাছে আর অন্য কিছু চাইবে
না? আফসোস তোমার জন্য আদম সন্তান! তুমি বড়ই বিশ্বাসঘাতক! সে এরূপই প্রার্থনা করতে থাকবে।
তখন
আল্লাহ বলবেনঃ সম্ভবত আমি যদি তোমাকে এটা দিয়ে দেই তবে তুমি অন্য আরেকটি আমার কাছে
চাইবে। লোকটি বলবে, না, তোমার ইয্যাতের কসম! অন্যটি আর চাইব না। তখন সে আল্লাহর সাথে
ওয়াদা করবে যে, সে আর কিছুই চাইবে না। তখন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের দরজার নিকটে নিয়ে
দিবেন। সে যখন জান্নাতের ভিতরের নিয়ামতগুলো দেখতে পাবে, তখন আল্লাহ্ যতক্ষণ চাইবেন
ততক্ষণ সে চুপ থাকবে। এরপরই সে বলতে থাকবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ
করাও। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি কি বল নাই যে তুমি আর কিছু চাইবে না? আফসোস তোমার জন্য
হে আদম সন্তান! তুমি কতইনা বিশ্বাসঘাতক।
লোকটি
বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে তোমার সৃষ্ট জীবের মাঝে সবচেয়ে হতভাগ্য কর না। এভাবে
সে চাইতেই থাকবে। শেষে আল্লাহ্ হেসে দিবেন। আর আল্লাহ্ যখন হেসে দিবেন, তখন তাকে জান্নাতে
প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেবেন। এরপর সে যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাকে বলা হবে,
তোমার যা ইচ্ছে হয় আমার কাছে চাও। সে চাইবে, এমনকি তার সব চাহিদা ফুরিয়ে যাবে। তখন
আল্লাহ্ বলবেনঃ এগুলো তোমার এবং আরো এতটা তোমার। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, ঐ লোকটি
হচ্ছে সবশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী। রাবী বলেন যে, এ সময় আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) আবূ
হুরাইরাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৫৭৩, ৮০৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৬১১৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১২৬)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
উপরিউক্ত
বর্ণনা দ্বারা বোঝা গেলো আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ প্রেক্ষাপটে কিছু কাবীরা গুনাহ বান্দার
অজান্তে তাওবাহ্ ছাড়াও মাফ করেন।
একই পাপ বার বার করার পরেও কি আল্লাহ সেই গুণাহ
মাফ করেন?
একই
পাপ একাধিক বার করা জঘন্য অন্যায়। এতে এক সময় ব্যক্তি পাপের অনুভূতিশূন্য হয়ে যায় এবং
তওবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এজন্য পাপ থেকে বিরত থাকার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে
এবং প্রতিমুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে ও তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। যদি খালেছ নিয়তে
তওবা করে তবে তা কবুলযোগ্য হবে ইনশাআল্লাহ। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে,
আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ কোন বান্দা গুনাহ করে বলে, ’হে আমার রব! আমি গুনাহ করে ফেলেছি। তুমি আমার এ
গুনাহ ক্ষমা করে দাও।’ তখন আল্লাহ তা’আলা বলেন, (হে আমার মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)!) আমার
বান্দা কি জানে, তার একজন ’রব’ আছেন? যে ’রব’ গুনাহ মাফ করেন অথবা (এর জন্য) তাকে শাস্তি
দেন? (তোমরা সাক্ষী থেক) আমি তাকে মাফ করে দিলাম। অতঃপর যতদিন আল্লাহ চাইলেন, সে গুনাহ
না করে থাকল। তারপর আবার সে গুনাহ করল ও বলল, ’হে রব’! আমি আবার গুনাহ করে ফেলেছি।
আমার এ গুনাহ মাফ করো। তখন আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমার বান্দা কি জানে, তার একজন ’রব’
আছেন, যে রব গুনাহ মাফ করেন অথবা এর জন্য শাস্তি দেন। আমি আমার বান্দাকে মাফ করে দিলাম।
অতঃপর আল্লাহ যতদিন চাইলেন, সে কোন গুনাহ না করে থাকল। তারপর সে আবারও গুনাহ করল এবং
বলল, হে রব! আমি আবার গুনাহ করেছি। তুমি আমার এ গুনাহ ক্ষমা করো। তখন আল্লাহ তা’আলা
বলেন, আমার বান্দা কি জানে, তার একজন ’রব’ আছেন, যে রব গুনাহ মাফ করেন অথবা অপরাধের
জন্য শাস্তি দেন? আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করলাম। সে যা চায় করুক। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৩৩৩, বুখারী ৭৫০৭, মুসলিম ২৭৫৮,
আহমাদ ৭৯৪৮, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭৬৪, শু‘আবূল ঈমান ৬৬৮৫, সহীহ আত্ তারগীব
৩১৪০, ইবনু হিব্বান ৬২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত
হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী বলেন, বান্দা যদি একশ’ বার বা হাযার বার বা তার চেয়ে বেশীবারও
পাপ করে আর প্রত্যেকবার তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। (নববী, শরহ মুসলিম হা/২৭৫৭, ১৭/৭৫; ফাৎহুল বারী ১৩/৪৭২)।
অতএব
নিরাশ না হয়ে পুনরায় পাপ না করার দৃঢ় ইচ্ছার সাথে তওবা করতে হবে। সাথে সাথে সৎ ও নেককার
মানুষদের সাথে উঠা-বসা করবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি নিজেকে ধরে রাখো তাদের সাথে যারা
সকালে ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে ডাকে তাঁর দীদার লাভের কামনায় এবং তুমি তাদের থেকে
তোমার দু’চোখ ফিরিয়ে নিয়ো না পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনায়’। (সুরা কাহফ ১৮/২৮)।
গুণাহ মাফের উপায়
গুণাহ থেকে মুক্তি পেতে “পাপ, তওবা ও মুক্তির
উপায়” নামক বইটি পড়ুন। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন-
(সমাপ্ত)
রিলেটেড
বইগুলো পড়তে এদের উপর ক্লিখ করুন,
(ক)নবি (সাঃ) এর উম্মত জাহান্নামে যাবে কেনো? (প্রথম অংশ)।
(খ)নবি সাঃ এর উম্মত জাহান্নামে যাবে কেনো? (দ্বিতীয় অংশ)।
(গ)
যেসব কারণে অধিকাংশ নারী জাহান্নামী।
(ঘ)জাহান্নামের বর্ণনা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়।
(ঙ)গুণাহ মাফ ও জান্নাত পাওয়ার সহজ আমল।-১
(চ)
গুণাহ মাফ ও জান্নাতে যাওয়ার অধিক ফজিলতপূর্ণ
আমলসমূহ-২
কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য
সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।
Author and Compiler:
Md. Izabul Alam-M.A., C.In.,
Ed. (Islamic Studies-Rangpur Carmichael University College, Rangpur), Prominent
Islamic Thinker, Researcher, Political Analyst, Writer and Blogger.
(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA
SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)
(2) GENERAL DIRECTOR- PURE
MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER (PMMRC),
(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS
Coaching (BBC)
(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING
INSTITUTE (PTI)
(5) PRINCIPAL- BANGLADESH
ONLINE UNIVERSITY (BOU)
(6) GENERAL DIRECTOR AND
CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION SERVICES (PIS)
(7) EDITOR-BDC CRIME NEWS24
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক
বইয়ের
লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের
Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির
লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। এজন্যে আপনি
বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।
(ক) আল্লাহ
তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে।
তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।
(খ) তিনি
আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর কি হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে
নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।
(গ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ
কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে,
অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে
আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা
অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবদুল্লাহ
ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়।
আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার
উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস সম্ভার, হাদিস
নং ১৫৪৮, রিয়াদুস সলেহিন,
হাদিস নং ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
Please Share On
