বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইসলামি আইন বাস্তবায়নে অধিকাংশ আলেমদের মুনাফিকীকরণ
ভূমিকাঃ আল্লাহতায়ালা বলেন, “সঠিক পথ প্রদর্শনের পরও
যারা বিশ্বাসীদের ব্যতীত অন্য কারও অনুকরন করে (তথা ইসলামি দলের নেতাদের বাদ দিয়ে অনৈসলামিক
রাজনৈতিক দলের নেতাদের ও বিপথগামী কোনো আলেম, পীর, অলিদের অনুকরন/অনুসরণ করে) এবং মতানৈক্য ও বিরোধিতা করছে আল্লাহর রাসুল নবি করিম (সঃ) কে তবু তাদেরকে তিনি তার পছন্দ মতো বিপথে চলতে
দেবেন এবং (পরিশেষে তাদেরকে) জাহান্নামের অগ্নিতে জ্বালাবেন”। (সুরা আন নিসা ৪, আয়াত ১১৫)।
বিগত ২৭ জুন ২০২৬ তারিখে বিএনপির জোটসঙ্গী
ইসলামী দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ
ফারুক কাসেমি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘কাপড় খুলে ফেলা’র হুঁশিয়ারি
দিয়েছেন।
এ হুঁশিয়ারি দিয়ে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক
কাসেমি বক্তব্য রাখছেন এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক
কাসেমিকে বলতে শোনা যায়, ‘ইলেকশনের আগে হইছে না? এমন সাইক্লোন উঠাইছে যে, বিএনপিকে
একদম পঁচাইয়া হরফে ইল্লতহ বানাইয়া ফেলছে। এই অবস্থায় জমিয়তের উদ্যোগে ওলামা সম্মেলন
করে আমরা পুরা বাতাসের স্রোত উল্টায় ফেলছি।’
প্রবীন এ আলেম জামায়াতের প্রসঙ্গ স্পষ্ট করে
আরও বলেন, ‘আজকেও আমরা, এই সিদ্ধান্ত আমাদের সবার নিতে হবে যে, এই পাঁচ বছরে জামায়াতের
কাপড় শুইদ্ধা খুলে ফেলব আমরা। এদের সব নাজাসাত দুনিয়ার মানুষের সামনে আমরা ইয়ে করে
দেব ইনশাল্লাহ। এদের তরক্কির জিন্দেগী শেষ।’
বিগত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর
মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার
সাতটি ইসলামী দল ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। হেফাজতের আমির
আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নতুন
একটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সভায় জমিয়তে
উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম
পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তিনজন
করে প্রতিনিধি অংশ নেন। এ ছাড়া হেফাজতের অন্তত ২০ জন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ সূত্রে জানা যায় যে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এর আমির মাওলানা মামুনুল
হককে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট ছাড়তে অনেক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের সুপরিচিত একটি কৌশলী রাজনৈতিক দল
হচ্ছে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দেলন বাংলাদেশ । আমরা দেখে আসছি যে, চরমোনাই পীর একসময়
প্রায় চব্বিশ ঘন্টা জামায়াত শিবিরের বিরুদ্ধে কথা বলতো। তারা এমনও ঘোষণা দিয়েছে যে,
প্রয়োজনে শয়তানের সাথে জোট করবে তবুও জামায়াতের সাথে জোট করবে না।
সেই চরমোনাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের
আগে বিশেষ এক ষড়যন্ত্র করতে জামায়াতের সাথে জোট বাঁধে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরুতে
প্রায় ১৫০টি এবং পরবর্তীতে জোটের কাছে অন্তত ৫০ থেকে ১২০টি আসন ছাড়ের দাবি জানিয়েছিল।
কিন্তু জামায়াত ও শরিক দলগুলো সারা বাংলাদেশ জরিপ করে দেখে যে, চরমোনাই দল সর্বোচ্চ
৫টি আসন পেতে পারে। সেখানে তাদের বাহানা পূরণ করতে নির্বাচনী আসন সমঝোতার আলোচনায়
জামায়াতে ইসলামী চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ৪০টি আসন ছাড়তে
চেয়েছিল। কিন্তু চরমোনাই বিএনপির সাথে গোপন আঁতাত করায় আসন-ছলনায় জামায়াত জোট থেকে
বেরিয়ে একক নির্বাচন করায় মাত্র ১টি আসনে জয়লাভ করে।
উপরোক্ত আলোচনায় এটাই প্রমাণিত যে, জমিয়তে
ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম বনাম কওমী আলেম বনাম তাবলীগ জামায়াত ও চরমোনাই জামায়াত শিবিরের
ঘোর বিরোধী ও চরম শত্রু। অথচ উনারা সকলেই আলেম।
উক্ত আলেমগণ ছাড়াও আওয়ামীলীগ ও বিএনপিতে লক্ষ
লক্ষ আলেম আছেন যারা জেনেশুনে ও বুঝে জামায়াত শিবিরের বিরোধীতা করে আসছে।
এই বিরোধীতার মূল কারণ হচ্ছে, জামায়াত শিবিরের
মাধ্যমে এই দেশে যেনো আল্লাহর আইন কায়েম না হয়। অথচ যারা আল্লাহর আইন চায় না বা ইসলামি
শরিয়াহ আইনের যারা বিরোধীতা করে তারা সুস্পষ্ট কাফের, যালিম ও পাপিষ্ঠ বা ফাসিক।
বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি আহলে হাদিস আছে।
তারাও জামায়াত শিবিরের আকিদাহ ঠিক নাই এবং প্রচলিত গণতন্ত্র কুফরী মতবাদের দোহাই দিয়ে
জামায়াত শিবিরকে ভোট না দেয়া ও বিরোধীতা করাই তাদের স্বভাবে পরিনত হয়েছে। অথচ নির্বাচনের
সময় এই দেড় কোটি আহলে হাদিস হয় বিএনপিকে না হয় আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়ে অন্যায়ের সহযোগী
হয়ে আসছে।
তেমনি বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ পীর ও মুরিদ আছে
যারা জামায়াত শিবিরের ঘোর বিরোধী। তারা ভাবে জামায়াত শিবিরের মাধ্যমে এই দেশে ইসলামি
রাষ্ট্র কায়েম হলে তাদের দরবারী ইনকাম ও ভন্ডামী বন্ধ হবে। এই ভয়ে তারা আল্লাহর আইন
বাস্তবায়নের বিরোধীতা করে আসছে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, অনৈসলামিক রাজনৈতিক
দল তথা আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অনুরুপ অন্যান্য দলের নেতা-কর্মী যারা আছেন
তারা ইসলামি আইনের বিরোধীতা করবে এটা স্বাভাবিক কারণ তারা কুরআন হাদিসে তেমন অভিজ্ঞ
নয় কিন্তু যারা আলেম শ্রেণির তারা তো কুরআন হাদিসে অভিজ্ঞ, তারা কেনো ইসলামি শাসন ব্যবস্থা
গঠনের বিরোধীতা করবে? তারা কি আল্লাহ ও রাসুল সা. এর বিধানাবলী পড়ে নাই? অবশ্যই পড়েছে
তবে এইসব আলেম হচ্ছেন দুনিয়াবী আলেম।
এপ্রসঙ্গে রাসুল সা. বলেন,
(ক) আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, ’আলিমগণ যদি ’ইলমের হিফাযাত ও মর্যাদা রক্ষা করতেন, উপযুক্ত ও যোগ্য লোকেদের
কাছে ’ইলম সোপর্দ করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা তাদের ’ইলমের কারণে নিজেদের যুগের লোকেদের
নেতৃত্ব করতে পারতেন। কিন্তু তারা তা দুনিয়াদারদের কাছে বিলিয়ে দিয়েছেন, যাতে তারা
তাদের কাছ থেকে দুনিয়ার কিছু স্বার্থ লাভ করতে পারেন। তাই তারা দুনিয়াদারদের কাছে মর্যাদাহীন
হয়ে পড়েছেন। আমি তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছিঃ
যে ব্যক্তি নিজের সমস্ত চিন্তাকে এক মাকসুদ, অর্থাৎ- শুধুমাত্র আখিরাতের চিন্তায় নিবদ্ধ
করে নিবে- আল্লাহ তার দুনিয়ার যাবতীয় মাকসুদ পূরণ করে দিবেন। অপরদিকে যাকে দুনিয়ার
নানা দিক ব্যতিব্যাস্ত করে রাখবে, তার জন্য আল্লাহর কোন পরওয়াই নেই, চাই সে কোন জঙ্গলে
(দুনিয়ায় যে কোন অবস্থায়) ধ্বংস হোক না কেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২৬৩, ইবনু মাজাহ্ ২৫৭, হাকিম ৪/৩২৭-২৯)।
(খ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেদিন বেশি দূরে নয় যখন আমার উম্মাতের
কতক লোক দীনের ’ইলম অর্জনে তৎপর হবে ও কুরআন অধ্যয়ন করবে। তারা বলবে, আমরা আমীর-উমরাদের
কাছে যাবো এবং তাদের পার্থিব স্বার্থে কিছু ভাগ বসিয়ে আমাদের দীন নিয়ে আমরা সরে পড়বো।
কিন্তু তা কখনো হবার নয়। যেমন কাঁটার গাছ থেকে শুধু কাঁটাই পাওয়া যায়, কোন ফল লাভ করা
যায় না, ঠিক এভাবে আমীর-উমরাদের নৈকট্য দ্বারা। মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) বলেন,
গুনাহ ছাড়া কিছু অর্জিত হয় না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
২৬২, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২৫৫, সিলসিলাহ্ আয্ য‘ঈফাহ্ ১২৫০)।
(গ) সুয়ায়দ ইবনু গাফালা (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, ’আলী (রাঃ) বলেছেন, আমি যখন তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-এর কোন হাদীস বয়ান করি ’আল্লাহর শপথ! তখন তাঁর উপর মিথ্যা কথা আরোপ করার
চেয়ে আকাশ থেকে নিচে পড়ে যাওয়াটা আমার কাছে শ্রেয়। কিন্তু আমি যদি আমার ও তোমাদের মধ্যকার
বিষয় সম্পর্কে কিছু বলি, তাহলে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধ একটি কৌশল। আমি রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, শেষ যুগে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব
ঘটবে যারা হবে অল্পবয়স্ক যুবক, নির্বোধ। তারা সৃষ্টির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম কথা থেকে আবৃত্তি
করবে। অথচ ঈমান তাদের গলা অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন
তীর শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই তোমরা পাবে হত্যা করবে। কেননা তাদেরকে
হত্যা করলে হত্যাকারীর জন্য কিয়ামতের দিনে প্রতিদান আছে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৬৯৩০, ৩৬১১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৬১)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে কেউ পার্থিব জীবন ও এর সৌন্দর্য কামনা
করে, আমি দুনিয়াতে তাদের কর্মের পূর্ণ ফল প্রদান করে থাকি এবং সেখানে তাদেরকে কম প্রদান
করা হবে না। তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছু নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে
তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা বিফলে যাবে"। (সূরাঃ হুদ- ১৫, ১৬)।
প্রকৃত আলেম কারা?
সুফ্ইয়ান সাওরী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদা ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) কা’ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, প্রকৃত ’আলিম কারা?
তিনি [কা’ব (রাঃ)] বললেন, যারা অর্জিত ’ইলম অনুযায়ী ’আমল করে। ’উমার (রাঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস
করলেন, ’আলিমের অন্তর থেকে ’ইলমকে বের করে দেয় কোন্ জিনিস? তিনি বললেন, (সম্মান ও সম্পদের)
লোভ-লালসা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৬৬, দারিমী ৫৭৫)।
বিরোধী ঐসব আলেমগণ সারা জীবন ভর ইলম অর্জন
করে যাচ্ছেন বটে কিন্তু তাদের ভিতরে আমল নেই। যদি আমল থাকতো তাহলে ইসলাম বাস্তবায়নে
বিরোধীতা করতো না। এরা হচ্ছে আমলহীন মন্দ আলেম।
আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন আল্লাহর নিকট মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাধিক মন্দ সে ব্যক্তি
হবে, যে তার ’ইলমের দ্বারা উপকৃত হতে পারেনি। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২৬৮, দারিমী ২৬২)।
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের মুসলিম নেতা-কর্মী ও আলেমগণ কি হেদায়েতপ্রাপ্ত?
মানবতার হেদায়াতের জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে
নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। যাতে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে পরকালে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত না
হয়। সেই সাথে দিশারী হিসাবে বিভিন্ন সময় ইলাহী গ্রন্থ এসেছে মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের
জন্য। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল প্রদর্শিত সেই হেদায়াতের পথে চললে পরকালীন জীবনে
নাজাত লাভ করবে। পক্ষান্তরে হেদায়াতের রাস্তা থেকে বিচ্যুত হ’লে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত
হবে। তাই হেদায়াত লাভের পথ-পন্থা জানা মানুষের জন্য জরুরী।
রাসুল সা. বলেন,
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক কর্মের উদ্যম আছে এবং প্রত্যেক
উদ্যমের আছে নিরুদ্যমতা। সুতরাং যার নিরুদ্যমতা আমার সুন্নাহর গণ্ডির ভিতরেই থাকে সে
হেদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং যার নিরুদ্যমতা এ ছাড়া অন্য কিছুতে (সুন্নাত বর্জনে) অতিক্রম
করে সে ধ্বংস হয়ে যায়। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৫০৩,
ইবনে আবী আসেম, ইবনে হিব্বান, আহমাদ ৬৯৫৮, ত্বাহাবী, সহীহ তারগীব ৫৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
ইরবায বিন সারিয়াহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি
আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শুনেছেন, তিনি বলেছেন যে, অবশ্যই
তোমাদেরকে উজ্জল (স্পষ্ট দ্বীন ও হুজ্জতের) উপর ছেড়ে যাচ্ছি; যার রাত্রিও দিনের মতই।
আমার পর ধ্বংসোন্মুখ ছাড়া অন্য কেউ তা হতে ভিন্নপথ অবলম্বন করবে না। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৫০৫, ইবনে আবী আসেম, আহমাদ ১৭১৪২,
ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ৫৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সবার ভাগ্যে হেদায়েত নেইঃ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হেদায়াত করতে
পারবে না, তবে আল্লাহ্ তা‘আলাই যাকে ইচ্ছা হেদায়াতের পথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে,
সে সম্পর্কে তিনিই অধিক অবগত আছেন’’। (সূরা কাসাস: ৫৬)।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘‘আমি যদি ইচ্ছা করতাম
তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই সৎপথে আনয়ন করতাম’’। (সূরা
সাজদাহ: ১৩)।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা
পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হেদায়াত দান করেন’’। (সূরা
মুদ্দাছ্ছির: ৩১)।
আল্লাহ
তা‘আলা সূরা আন‘আমের ৩৯ নং আয়াতে বলেন, ‘‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন আবার যাকে
চান সত্য সরল পথে পরিচালিত করেন’’।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘আল্লাহর হুকুম ছাড়া
কেউ ঈমান আনতে পারে না’’। (সূরা ইউনূস: ১০০)।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব থেকে তার পিতার সূত্রে
বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে গেলেন এবং সেখানে তিনি আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়্যাহ্
ইবনু মুগীরাহকে উপস্থিত দেখতে পেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
(আবূ তালিবকে লক্ষ্য করে) বললেন, হে আমার চাচা! আপনি ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ কথাটি
বলুন। এর দ্বারাই আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য সাক্ষ্য দেব। তখন আবূ জাহল ও ’আবদুল্লাহ
ইবনু আবূ উমাইয়্যাহ বলে ওঠলো, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাত (দীন)
থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে? (অর্থাৎ সে দীন পরিত্যাগ করবে?) এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার বার তার কথাটি পেশ করতে থাকলেন। আবূ তালিব শেষ পর্যন্ত যে কথা
বললেন তা হলো, তিনি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরই অবিচল থাকবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে
তিনি “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ" বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর শপথ! যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হয় আমি আপনার জন্য
ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবো।
এ প্রসঙ্গে সুমহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করলেন,
“নবী এবং ঈমানদারদের পক্ষে মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা শোভা পায় না, যদিও
তারা (মুশরিকরা) নিকটাত্মীয় হয়। কেননা তারা যে জাহান্নামী হবে এটা সুস্পষ্ট হয়ে
গেছে* (সূরাহ আত তওবা ৯ঃ ১১৩)। আবূ তালিবের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন, "হে নবী নিশ্চয়ই হিদায়াত আপনার হাতে নয় যে, যাকে
আপনি চাইবেন হিদায়াত করতে পারবেন। বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন, আর
কে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে তিনিই বেশি জানেন** (সূরাহ আল কাসাস ২৮:৫৬)। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৪,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৯, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আরেকটি হাদীস ইমাম বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস
নবী-বংশের প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু নাওফাল ইবন আব্দুল
মুত্তালিব হাশিমী (৮৪ হি) থেকে উদ্ধৃত করেছেন,
‘আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) বলেন,
আমি একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আপনার চাচা আবূ
তালিবের কী উপকার করলেন অথচ তিনি আপনাকে দুশমনের সকল আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা
করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনি খুব ক্ষুব্ধ হতেন। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে পায়ের গোড়ালি
পর্যন্ত আগুনে আছে। যদি আমি না হতাম তাহলে সে জাহান্নামের একে বারে নিম্ন স্তরে থাকত।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৩৮৮৩, ৬২০৮, ৬৫৭২, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৩৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৫৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৩৬০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্য হাদীসে ইমাম বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য
মুহাদ্দিস তাবিয়ী আব্দুল্লাহ ইবন খাব্বাব আনসারী (১০০ হি)-এর সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন,
আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর
নিকট তাঁর চাচা আবূ তালিবের বিষয় উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন:
‘‘সম্ভবত আমার শাফাআত কিয়ামতে তার উপকার করবে;
ফলে তিনি পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত সামান্য আগুনের মধ্যে থাকবেন, তাতেই তাঁর মস্তিষ্ক ফুটতে
থাকবে।’’ (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪০১, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০৬, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪২০)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
উক্ত দলিলসমূহের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে,
হেদায়েত একমাত্র আল্লাহর হাতেই ন্যাস্ত। যেহেতু ইসলামী আইন বাস্তবায়ন বিরোধী আলেমগণ
আল্লাহর আইন কায়েম হোক এটা চায় না তাই তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত না, তারা লানতপ্রাপ্ত। আসলে
আল্লাহ তা’আলা যার কল্যাণ চান, তাকে দীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন। এপ্রসঙ্গে রাসুল সা.
বলেন,
মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যার কল্যাণ চান, তাকে দীনের
সঠিক জ্ঞান দান করেন। বস্ত্তত আমি শুধু বণ্টনকারী। আর আল্লাহ তা’আলা আমাকে দান করেন।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০০, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবঃ) ৭৩১২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১০৩৭,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২২৫৮, ইসলামীক সেন্টার ২২৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এরা হচ্ছে অযোগ্য লোক, এদেরকে ইলম শিক্ষা দেয়া আর শুকরের গলায় মণিমুক্তা
বা স্বর্ণ পরানো একই কথা
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’ইলম বা জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের
জন্য ফরয এবং অপাত্রে তথা অযোগ্য মানুষকে ’ইলম শিক্ষা দেয়া শুকরের গলায় মণিমুক্তা বা
স্বর্ণ পরানোর শামিল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত ২১৮,
সুনান ইবনু মাজাহ্ ২২৪, সহীহুল জামি‘ ৩৯১৩, য‘ঈফুল জামি‘ ৩৬২৬, বায়হাক্বী ১৫৪৪)।
এইসব আলেম শয়তান দ্বারা পরিচালিত
মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘আপনি বলুন: আমি কি তোমাদেরকে তাদের সন্ধান
দেব যাদের উপরে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় ? শয়তানতো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যুক ও পাপিষ্ঠের
উপর’’। (সূরা শু’আরা: ২২১-২২২)।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘শয়তান তাদের বশীভূত
করে নিয়েছে। অতঃপর আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা শয়তানের দল। সাবধান, শয়তানের
দলই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা মুজাদালা ১৯)।
এইসব আলেমদের নিকট থেকে ইলম শিক্ষা নেয়া যাবে না
ইবনু সীরীন (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই
এ (সানাদের) ’ইলম হচ্ছে দীন। অতএব তোমরা লক্ষ্য রাখবে যে, তোমাদের দীন কার নিকট হতে
গ্রহণ করছো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৩, মুক্বদ্দামাহ্
মুসলিম)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এইসব আলেমদের কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী তা পূর্ব থেকেই নির্ধারিত
উসমান (রহঃ) ... আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন, আমরা বাকীউল গারফাদ (কবরস্থানে) এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আগমণ করলেন। তিনি উপবেশন করলে আমরাও তাঁর চারদিকে বসে
পড়লাম। তাঁর হাতে একটি ছড়ি ছিল। তিনি নীচের দিকে তাকিয়ে তাঁর ছড়িটি দ্বারা মাটি খুদতে
লাগলেন। এরপর বললেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, অথবা বললেন, এমন কোন সৃষ্ট প্রাণী
নেই, যার জন্য জান্নাত ও জাহান্নামে জায়গা নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি আর এ কথা লিখে
দেওয়া হয়নি যে, সে দুর্ভাগা হবে কিংবা ভাগ্যবান। তখন এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তাহলে কি আমরা ভাগ্যলিপির উপর ভরসা করে আমল করা ছেড়ে দিব না? কেননা, আমাদের মধ্যে যারা
ভাগ্যবান তারা অচিরেই ভাগ্যবানদের আমলের দিকে ধাবিত হবে। আর যারা দুর্ভাগা তারা অচিরেই
দুর্ভাগ্যদের আমলের দিকে ধাবিত হবে। তিনি বললেন, যারা ভাগ্যবান, তাদের জন্য সৌভাগ্যের
আমল সহজ করে দেওয়া হয় আর ভাগ্যাহতদের জন্য দুর্ভাগ্যের আমল সহজ করে দেওয়া হয়। এরপর
তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, فَأَمَّا
مَنْ
أَعْطَى
وَاتَّقَى
কাজেই যে দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে ......। (সূরা লাইলঃ ৫-১০)। (সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১২৭৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahi।)।
মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে কুরআনের এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ
’’(হে মুহাম্মাদ!) আপনার রব যখন আদম সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের সব সন্তানদেরকে বের করলেন’’
(সূরাহ্ আল আ’রাফ ৭: ১৭২) (...আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তিনি
জবাবে বলেন, আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। অতঃপর আপন ডান হাত তাঁর পিঠ বুলালেন।
আর সেখান থেকে তাঁর (ভবিষ্যতের) একদল সন্তান বের করলেন। অতঃপর বললেন, এসবকে আমি জান্নাতের
জন্য সৃষ্টি করেছি, তারা জান্নাতীদের কাজই করবে। আবার আদমের পিঠে হাত বুলালেন এবং সেখান
থেকে (অপর) একদল সন্তান বের করলেন এবং বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি
এবং তারা জাহান্নামীদেরই ’আমল করবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে
’আমলের আর আবশ্যকতা কি? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন
আল্লাহ কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজই করিয়ে
নেন। শেষ পর্যন্ত সে জান্নাতীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে এবং আল্লাহ তাকে জান্নাতে
প্রবেশ করান। এভাবে আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা
জাহান্নামীদের কাজই করিয়ে নেন। পরিশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে, আর
এ কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৯৫, মুয়াত্ত্বা মালিক ১৩৯৫, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪০৮১, সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৩০০১)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(দুনিয়ায় মুসলমানদের বিভিন্ন কর্মকান্ড বা
আমল দেখেই বুঝা যায় পরকালে তার ফয়সালা কী হবে।)
উপরোক্ত দলিলের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারলাম
যে, রাসুল সাঃ এর উম্মত ৭৩ দলের মধ্যে ৭২ দল অথবা এক তৃতীয়াংশ বা এক চতুর্থাংশ বা অর্ধেক
কিংবা পরকালে কারো হিসেব নিলে তার জন্যে জাহান্নাম সুনিশ্চিত। জান্নাতে যে যাবেন তার
কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালার রহমত ছাড়া কারো কোনো আমল তাকে জান্নাতে
নিয়ে যাবে না। আর আল্লাহর রহমত পেতে চাইলে দুনিয়ায় থাকা অবস্থাতেই আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক
কাজ বা আমল চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ ও রাসুল সাঃ যেসব আদেশ নিষেধ দিয়েছেন তা মেনে চলতে
হবে। কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো মুসলমান হয়েও জেনে বা নাজেনে করে থাকে আর সেগুলো জাহান্নামের
কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসুন কোন কাজগুলো করলে মুসলমান হয়েও জাহান্নামে যেতে হবে সেগুলো বিস্তারিত
জেনে নেই।
এদের জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ব থেকেই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে
মহান আল্লাহ তায়ালা পূর্ব হতেই জাহান্নাম সৃষ্টি
করে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, “যদি তোমরা তা
(আনয়ন) না কর, এবং কখনই তা করতে পারবে না, তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে
মানুষ এবং পাথর, অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে”। (সুরা বাক্বারাহঃ ২৪)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “তোমরা সেই আগুনকে
ভয় কর, যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে”। (সুরা
আলে ইমরানঃ ১৩১)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা
করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা যখন জান্নাত তৈরি করলেন, তখন জিবরীল আলায়হিস
সালাম-কে বললেন, যাও জান্নাতখানা দেখে আসো। তিনি গিয়ে তা এবং তার অধিবাসীদের জন্য
যে সকল জিনিস আল্লাহ তা’আলা তৈরি করে রেখেছেন, সবকিছু দেখে এসে বললেন, হে আল্লাহ! তোমার
সম্মানের শপথ! যে কেউ এ জান্নাতের সম্পর্কে শুনবে, সে অবশ্যই তাতে প্রবেশ (আকাঙ্ক্ষা)
করবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা জান্নাতের চতুষ্পর্শ কষ্টসমূহ দ্বারা বেষ্টন করে দিলেন,
অতঃপর আবার জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে বললেন, হে জিবরীল! আবার যাও এবং পুনরায় জান্নাত
দেখে আসো। তিনি গিয়ে তা দেখে এসে বললেন, হে আমার প্রভু! এখন যা কিছু দেখলাম, তার প্রবেশপথ
যে,
কষ্টকর। এতে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, কেউই তাতে
প্রবেশ করবে না। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর আলাহ তা’আলা যখন জাহান্নামকে তৈরি করলেন, তখন
বললেন, হে জিবরীল! যাও জাহান্নামটি দেখে আসো, তিনি গিয়ে দেখলেন, অতঃপর এসে বললেন,
হে প্রভু! তোমার সম্মানের শপথ! যে কেউ এ জাহান্নামের ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা শুনবে, সে
কখনো তাতে প্রবেশ করবে না। অতঃপর জাহান্নামের চতুষ্পর্শ্বে আল্লাহ তা’আলা বেষ্টন করলেন
প্রবৃত্তির আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা এবং পুনরায় জিবরীল আলায়হিস সালাম -কে বললেন, আবার
যাও এবং দ্বিতীয়বার তা দেখে আসো। তিনি গেলেন এবং এবার দেখে এসে বললেন, হে প্রভু! তোমার
সম্মানের শপথ করে বলছি, আমার আশঙ্কা হচ্ছে, একজন লোকও তাতে প্রবেশ ব্যতীত অবশিষ্ট থাকবে
না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৯৬, সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত) ৪৭৪৪, সিলসিলাতুস সহীহাহ ১৮৬৬, সহীহুল জামি ৫২১০, মুসনাদে আহমাদ ৮৬৩৩,
সহীহ ইবনু হিব্বান ৭৩৯৪, আবূ ইয়া'লা ৫৯৪০, শুআবূল ঈমান ৩৮৪, তিরমিযী ২৬৯৮, ইবনু মাজাহ
১৮৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মহানবি সাঃ জাহান্নাম স্বচক্ষে দর্শন করেছেন।
সৃষ্টি করার পর মহান আল্লাহ জিবরীলকে দেখিয়েছেন।
(১) সামুরাহ ইবনু জুনদাব (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন,
তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? রাবী বলেন, যাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা, তারা রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত। তিনি একদিন সকালে আমাদেরকে
বললেনঃ গত রাতে আমার কাছে দু’জন আগন্তুক আসল। তারা আমাকে উঠাল। আর আমাকে বলল, চলুন।
আমি তাদের সঙ্গে চললাম। আমরা কাত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে আসলাম। দেখলাম, অন্য
এক লোক তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার
মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নিচে গিয়ে পড়ছে। এরপর আবার সে পাথরটি অনুসরণ করে তা আবার
নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত আবার ভাল হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার
তেমনি আচরণ করে, যা পূর্বে প্রথমবার করেছিল। তিনি বলেন, আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম,
সুবহান্নাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন।
তিনি বলেন, আমরা চললাম, এরপর আমরা চিৎ হয়ে
শোয়া এক লোকের কাছে আসলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক লোক লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে
রয়েছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমন্ডলের একদিক মাথার পিছনের দিক
পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র,চোখ ও মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। আওফ
(রহ.) বলেন, আবূ রাজা (রহ.) কোন কোন সময় ’ইয়ুশারশিরু’ শব্দের পরিবর্তে ’ইয়াশুক্কু’
শব্দ বলতেন। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ
করেছে তেমনি আচরণই অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের
মত ভাল হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মত আচরণ করে। তিনি বলেনঃ আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ্!
এরা কারা? তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং চুলার মত একটি গর্তের
কাছে পৌঁছলাম।
রাবী বলেন, আমার মনে হয় যেন তিনি বলেছিলেন,
আর তথায় শোরগোলের শব্দ ছিল। তিনি বলেন, আমরা তাতে উঁকি মারলাম, দেখলাম তাতে বেশ কিছু
উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে বের হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ
করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে।
তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। তিনি বলেন, আমরা
চললাম এবং একটা নদীর (তীরে) গিয়ে পৌঁছলাম। রাবী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন,
নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, এই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে
অন্য এক লোক আছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতারকারী
লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সে লোক কাছে এসে পৌঁছে যে নিজের নিকট পাথর একত্রিত
করে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়।
এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে; আবার তার কাছে ফিরে আসে, যখনইসে তার কাছে ফিরে
আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা
বলল, চলুন, চলুন। তিনি বরৈন, আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে এসে পৌঁছলাম,
যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে
জ্বালাচ্ছে ও তার চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ঐ লোকটি
কে? তারা বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে হাজির হলাম, যেখানে
বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উঁচু দীর্ঘকায়
একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চারপাশে এত বিপুল
সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত অধিক আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি
কে? এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে
পৌঁছলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি আর কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল,
এর ওপরে চড়ুন। আমরা ওপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রূপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা
হাজির হলাম।
আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম।
আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল, আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন
কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর
মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক এমনই কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী মনে হয়।
তিনি বলেন, সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়। আর সেটা ছিল প্রশস্ত প্রবাহিত
নদী, যার পানি ছিল দুধের মত সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর এরা আমাদের কাছে ফিরে
এল, দেখা গেল তাদের এ শ্রীহীনতা দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান। তিনি বলেন, আমি
বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মত একটি প্রাসাদ আছে। তিনি বলেন,
তারা আমাকে বলল, এটা আপনার বাসগৃহ। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, আল্লাহ্ তোমাদের
মাঝে বরকত দিন! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এতে প্রবেশ করি।
তারা বলল, আপনি অবশ্য এতে প্রবেশ করবেন। তবে
এখন নয়। তিনি বলেন, আমি এ রাতে অনেক বিস্ময়কর বিষয় দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী?
তারা আমাকে বলল, আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি
পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যক্তি যে কুরআন
গ্রহণ করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরজ সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে। আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে
দেখেছেন যে, তার মুখের এক ভাগ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার
পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল সে হল ঐ ব্যক্তি, যে সকালে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে
এমন কোন মিথ্যা বলে যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা চুলা সদৃশ
গর্তের ভিতর আছে তারা হল ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।
আর ঐ ব্যক্তি, যার কাছে পৌঁছে দেখেছিলেন যে,
সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে সে হল সুদখোর। আর ঐ কুশ্রী
ব্যক্তি, যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর সে এর চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, সে
হল জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশ্তা। আর এ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন,
তিনি হলেন, ইবরাহীম (আঃ)। আর তাঁর আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিত্রাতের
(স্বভাবধর্মের) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি বলেন, তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম জিজ্ঞেস করলেন,
হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও কি? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বললেন ঃ মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও। আর ঐসব লোক যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর
ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী তারা হল ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে।
আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৭০৪৭, ৮৪৫; মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৬২১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৮৩১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৭৫, সুনান আত তিরমিযী ৭০৪৮, ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১০৭৭৬,
‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ৬৮৪৫।আহমাদ ২০১১৫, আধুনিক প্রকাশনী ৬৫৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৬৫৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে সালাত আদায় করালেন।
অতঃপর মিম্বারে উঠলেন এবং মসজিদের কিবলার দিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেন, আমি এখন
তোমাদেরকে সালাত আদায় করার সময় জান্নাত ও জাহান্নামকে এ দেয়ালের সামনে এক বিশেষ
বিশেষ রূপ ও আকৃতিতে দেখতে পেয়েছি, কিন্তু আজকের মতো এত উত্তম এবং এত নিকৃষ্ট এর আগে
আর কখনো দেখতে পাইনি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৯৭,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭৪৯, ৯৩, মুসনাদে
আহমাদ ১৩৭৪৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ৭০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
এসব আলেমদের অন্যান্য আমল তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না
যেহেতু জামায়াত বিরোধী আলেমগণ ইসলামী শাসন
ব্যবস্থা গঠনের বিরোধীতা করে আসছেন তাই তারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ।
আর সেই কারণে তাদের অন্যান্য আমল তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না। মনে রাখবেন কিয়ামতে
আল্লাহর রহমত ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। আর দুনিয়ায় আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের
বিরোধীতা করে পরকালে আল্লাহর রহমত পাওয়া কিভাবে সম্ভব?
(ক) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল
জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়?
তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না
করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে
কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি
হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৬৭৩, ৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫২৭১, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৫৬৭৩, আধুনিক প্রকাশনী ৫২৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫১৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কস্মিনকালেও তোমাদের কাউকে তার
নিজের ’আমল কক্ষনো নাজাত দিবে না। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি
বললেনঃ আমাকেও না। তবে আল্লাহ্ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত রেখেছেন। তোমরা যথারীতি
’আমল করে নৈকট্য লাভ কর। তোমরা সকালে, বিকালে এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদাত কর।
মধ্য পন্থা অবলম্বন কর। মধ্য পন্থা তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৪৬৩, ৩৯; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০০৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৮১৬, আধুনিক প্রকাশনী ৬০১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬০১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(হাদীসটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর রহমত ব্যতীত
শুধু আমলের দ্বারা কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না-ফাতহুল বারী)।
(গ) কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ)....আবূ হুরাইরাহ
(রাযিঃ) এর সূত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
তোমাদের কোন লোকের আমলই তাকে পরিত্রাণ দিতে পারবে না। এ কথা শুনে এক লোক বললেন, হে
আল্লাহর রসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমাকেও না। তবে যদি আল্লাহ তা’আলা তার
করুণা দ্বারা আমাকে ঢেকে নেন। তোমরা অবশ্য সঠিক পন্থা অবলম্বন করবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০০৪, ৭০০৬, ৭০০৭, ৭০০৮, ৭০০৯,
৭০১০, ৭০১৪, ৭০১৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৫১, ইসলামিক সেন্টার
৬৯০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ)...আবূ হুরায়রা
(রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কোন
ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে জান্নাতে দাখিল করতে পারে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হল, ইয়া
রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমিও নই। তবে আমার পালনকর্তা যদি তার
অনুগ্রহের দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক
ফাউন্ডেশন) ৬৮৫২, ৬৮৫৫, ৬৮৬০, ৬৮৬১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হেদায়াত লাভের উপায়
জামায়াত-শিবির বিরোধী যেসব আলেম ও সাধারণ মুসলিম
ভোটার আছেন-যদিও তারা জামায়াত-শিবিরের বিরোধীতা করতে গিয়ে মূল ইসলাম থেকে বিচ্যূত হয়ে
গোমড়াহীর মধ্যে নিমজ্জিত এবং আল্লাহর হেদায়েতপ্রাপ্ত থেকে দূরে আছেন তবুও হেদায়েত লাভের
জন্য এখানে কিছু গাইড লাইন উল্লেখ করা হলো।
হেদায়াত লাভের নানা উপায় মহান আল্লাহ স্বীয়
কিতাব কুরআনে এবং তদীয় রাসূল (ছাঃ) স্বীয় হাদীছে উল্লেখ করেছেন। আশা করি, গোমড়াহী আলেম
ও সাধারণ মুসলিম ভোটারগণ নিম্নের গাইড লাইনগুলো অনুসরন করবেন ও খাঁটি তওবা করে দ্বীনের
সঠিক পথে ফিরে আসবেন।
(১) ঈমান আনয়ন করাঃ
প্রকৃত ঈমানদার লোকেরা হেদায়াত লাভে ধন্য হবে।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের পালনকর্তা তাদের পথ প্রদর্শন
করেন তাদের ঈমানের মাধ্যমে’। (সুরা ইউনুস ১০/৯)।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘বস্ত্ততঃ যে ব্যক্তি আল্লাহকে
বিশ্বাস করে, তিনি তার হৃদয়কে সুপথে পরিচালিত করেন। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে বিজ্ঞ’। (সুরা তাগাবুন ৬৪/১১)।
আর ঈমানের সাথে শিরক মিশ্রিত না করার নাম হচ্ছে
প্রকৃত মুমিন। বস্তুত তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং
তাদের ঈমানের সাথে শিরককে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে (জাহান্নাম থেকে) নিরাপত্তা
এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত’। (সুরা আন‘আম ৬/৮২)।
পক্ষান্তরে কেউ ঈমানহীন হলে সে হেদায়াতের আলোকিত
পথ থেকে ভ্রষ্টতার অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে।
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ঐসব আলেম
ও সাধারণ মুসলিম ভোটার ও সমর্থকদের দেখা যাচ্ছে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে শিরক ও কুফরের সাথে
জড়িত থাকায় আল্লাহর হেদায়েতপ্রাপ্ত থেকে বঞ্চিত। তাই হেদায়েত লাভ করতে চাইলে তাদেরকে
অনৈসলামিক কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়া, সমর্থন করা বা অন্য যেকোনোভাবে সাহায্য সহযোগিতা
করা যাবে না।
(২) অন্তরের প্রশস্ততাঃ
ইসলাম গ্রহণ ও তার শিক্ষা লাভের জন্য হৃদয়ের
প্রশস্ততা আবশ্যক। অন্তর প্রশস্ত হওয়ার অন্যতম উপায় হলো শিরক বিমুক্ত তাওহীদে বিশ্বাস।
সুতরাং তাওহীদপন্থী ব্যক্তির অন্তর আল্লাহ প্রশস্ত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অতএব
আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করতে চান, তিনি তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ ও সংকুচিত করে দেন”। (সুরা আন‘আম ৬/১২৫)।
বস্তুতঃ তাওহীদ হচ্ছে হেদায়াতের চাবি। আর নেক
আমল ও আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা হচ্ছে ঐ চাবির দাঁত। সুতরাং যে ব্যক্তি
সকল প্রকার ইবাদত সম্পাদন করে এবং আল্লাহর আনুগত্যের সকল দিক অনুসরণ করেন তার অন্তর
প্রশস্ত হয়। অপরদিকে যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং হারামে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে,
চোখ থাকতেও দুনিয়াতে সে অন্ধ এবং তার হৃদয় হয় সংকুচিত। যেরূপ মহান আল্লাহ উপরোক্ত আয়াতে
বলেছেন।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
"আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা
করে এবং তাঁর সীমা লঙ্ঘন করে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন, সেখানে সে চিরকাল থাকবে;
আর তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।" (সুরা আন-নিসা,
আয়াত ১৪)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
"কাজেই যারা তাঁর (রাসুলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ
করে, তারা সতর্ক হোক যে, বিপদ বা বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের
ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।" (সুরা আন-নূর, আয়াত
৬৩)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল,
সে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহ তা’আলার অবাধ্যতা
করল। আর যে আমীরের (নেতার) আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল। যে আমীরের অবাধ্যতা
করল, সে আমারই অবাধ্যতা করল। প্রকৃতপক্ষে ইমাম (নেতা) হলেন ঢাল স্বরূপ। তার পিছন থেকে
যুদ্ধ করা হয়, তার দ্বারা (শত্রুদের কবল থেকে) নিরাপত্তা পাওয়া যায়। সুতরাং শাসক যদি
আল্লাহর প্রতি ভয়প্রদর্শন পূর্বক প্রশাসন চালায় এবং ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে
এর বিনিময়ে সে সাওয়াব (প্রতিদান) পাবে। কিন্তু সে যদি এর বিপরীত কর্ম সম্পাদন করে,
তাহলে তার গুনাহও তার ওপর কার্যকর হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৩৬৬১, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
২৯৫৭, ৭১৩৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৩৫, আহমাদ ৮১৩৪, সহীহ
আল জামি‘ ৬০৪৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৭৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৭৪৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৩) সর্বদা আল্লাহর যিকর করাঃ
সর্বদা আল্লাহর যিকর করলে বান্দার অন্তর আল্লাহর
সাথে সংযুক্ত থাকে। বান্দার সাথে আল্লাহর সুসম্পর্ক তৈরী হয়। ফলে তার অন্তর প্রশান্ত
হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে স্মরণ
করলে যাদের অন্তরে প্রশান্তি আসে। মনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই কেবল হৃদয় প্রশান্ত হয়”।
(সুরা রা‘দ ১৩/২৮)।
তিনি আরো বলেন, “অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ কর
আমি তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, অকৃতজ্ঞ হয়ো না”।
(সুরা আল বাক্বারাহ ২/১৫২)।
আর যিকরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয়।
যাতে হেদায়াতের আলোকোজ্জ্বল রাজপথে অবিচল থাকা যায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘‘তোমার প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাকো,
আমি (তোমাদের ডাকে) সাড়া দেব। আরও তাঁর বাণীঃ যারা অহংকারবশতঃ আমার ‘ইবাদাত করে না,
নিশ্চিতই তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’’ (সূরা আল-মু’মিন ৪০/৬০)।
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি আমার
বান্দার ধারণার পাশে থাকি। (অর্থাৎ সে যদি ধারণা রাখে যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন,
তার তওবা কবুল করবেন, বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করবেন, তাহলে তাই করি।) আর আমি তার সাথে
থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে। সুতরাং সে যদি তার মনে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে
আমার মনে স্মরণ করি, সে যদি কোন সভায় আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম
ব্যক্তিদের (ফিরিশতাদের) সভায় স্মরণ করি।”
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭৪০৫, ৭৫০৫, ৭৫৩৬,
৭৫৩৬, ৭৫৩৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), ৬৬৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৫, সুনান
ইবনু মাজাহ ৩৮২২, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
২৩৮৮, ৩৬০৩, আহমাদ ৭৩৭৪, ৮৪৩৬, ৮৮৩৩, ৯০০১, ৯০৮৭, ৯৩৩৪, ৯৪৫৭, ১০১২০, ১০২৪১, ১০৩০৬,
১০৩২৬, ১০৪০৩, ১০৫২৬, ১০৫৮৫, ২৭২৭৯, ২৭২৮৩, সহীহাহ ২২৮৭, রিয়াযুস সালেহীন ২৮/১৪৪৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্যদিকে যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকর থেকে গাফেল
থাকে কিংবা আল্লাহর যিকরে অলসতা করে আল্লাহ শয়তানকে তার সাথী করে দেন।
তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়াময়ের স্মরণ থেকে
বিমুখ হয়, আমরা তার জন্য এক শয়তানকে নিযুক্ত করি। যে তার সাথী হয়’। (সুরা যুখরুফ ৪৩/৩৬)।
কিন্তু ইসলামি সংগঠন বিমুখ ও অনৈসলামিক রাজনৈতিক
দলের আলেম ও সাধারণ ভোটার বা সমর্থকদের দেখা যায়, তারা দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা জামায়াত
শিবির বা ইসলামি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে গীবত বা কুৎসা রটনা করতে থাকে। এইসব কুৎসা রটনায়
যে পরিমান সময় তারা ব্যয় করে সেই সময়ে যদি তারা আল্লাহর যিকির করতো তাহলে হয়তো আল্লাহ
দীদার লাভে তাদের খুব সহজ হতো।
(৪) কুরআন তেলাওয়াত করাঃ
অর্থ বুঝে বিনয়-নম্রতা ও একাগ্রতার সাথে কুরআন
তেলাওয়াত করার গুরুত্ব ও ফযীলত অপরিসীম। কেননা কুরআন মানবতার জন্য হেদায়াতের আলোকবর্তিকা।
যার মাধ্যমে সঠিক পথের দিশা পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা
দেয়, যা সবচাইতে সরল’। (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭/৯)।
তিনি আরো বলেন, ‘আর আমরা কুরআন নাযিল করি,
যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও রহমত স্বরূপ। কিন্তু পাপীদের জন্য তা কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি
করে’। (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭/৮২)।
মহান আল্লাহ কুরআনকে হেদায়াত বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এই কিতাব (কুরআন) মানবজাতির জন্য স্পষ্ট বর্ণনা এবং আল্লাহভীরুদের জন্য
পথপ্রদর্শক ও উপদেশবাণী’। (সুরা আলে ইমরান ৩/১৩৮)।
এ কুরআনেই হেদায়াতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘রামাযান হ’ল সেই মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। যা মানুষের জন্য সুপথ
প্রদর্শক ও সুপথের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী’। (সুরা বাক্বারাহ ২/১৮৫)।
সুতরাং হেদায়াত কুরআনেই তালাশ করতে হবে, অন্যত্র
নয়। হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সুপথ পেতে চায়, তার জন্য অপরিহার্য হলো
এই কুরআন। কেননা এটিই হলো তার জন্য নাজাত ও হেদায়াতের পথ। এর বাইরে কোন সুপথ নেই’।
(তাফসীর ইবনে কাছীর, ৮/৩৪০, সূরা তাকভীর ২৮নং আয়াতের ব্যাখ্যা
দ্র.)।
আমাদের দেশের আলেম-ওলামা ও সাধারণ মুসলিমদের
দেখা যায় তারা নিজ বাড়িতে হোক বা মসজিদ, মাদ্রাসায় হোক কুরআন পাঠ করেন কিন্তু কুরআনের
অর্থ বুঝে সেই মোতাবেক আমল করে না। বিশেষ করে যারা অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত
তারা ইসলামি শাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত যতো আয়াত আছে এর উপর তাদের কোনো আমল দেখা যায়
না। বরঞ্চ কুরআনের এইসব আদেশ নিষেধকে তারা আরও অবজ্ঞা করেন এবং বলেন যে, এগুলো তো
সেকেলে হয়ে গেছে, আধুনিক যুগে এগুলোর নাকি প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দ্বীনকে তাঁর কিতাব এবং
তাঁর রাসূলের সুন্নাতের মাধ্যমে পূর্ণ করেছেন। তার উম্মতের সকলের উপর এ দু’টি মেনে
চলা আবশ্যক করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং
যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা’।
(সুরা হাশর ৫৯/৭)।
আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি পূর্ণ কুরআন পরম
সত্যতার সাথে এ জন্যেই নাযিল করেছি যে, তুমি সে অনুযায়ী মানুষের উপর আল্লাহর প্রদর্শিত
পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং বিচার ফায়সালা করবে। (কুরআনকে যারা এ কাজে ব্যবহার
করতে চায় নি তারা এ মহান আমানতের খিয়ানত করে) তুমি এ খিয়ানতকারীদের সাহায্য পক্ষ সমর্থনকারী
হয়ো না”। (সুরা আন নিসা: ১০৫)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তোমরা সকলইে এখান হতে নেমে পড়। অতঃপর তোমাদের
কাছে আমার পক্ষ হতে জীবন বিধান (কুরআন) যেতে থাকবে। পরন্তু যারা আমার জীবন বিধান (কুরআন)
অনুসারে চলবে, তাঁদরে ভয় ও চিন্তার কোনো কারণ থাকবে না। (অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তিতে
তাঁরা আবার অনন্ত সুখের আধার এ বেহেশতেই ফিরে আসবে)। আর যারা তা অস্বীকার করে আমার
নিদর্শনসমুহকে মিথ্যে সাব্যস্ত করবে, তাঁরা হবে জাহান্নামের অধিবাসী এবং সেখানে তাঁরা
অনন্তকাল থাকবে”। (সূরা বাকারা, আয়াত নং ৩৮-৩৯)।
(৫) আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করাঃ
আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা
করা, ভূ-মন্ডল ও নভোমন্ডলের প্রতি লক্ষ্য করা এবং সমগ্র বিশ্ব ও সৌরজগৎ সম্পর্কে গবেষণা
করলে সে অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিনীত ও অনুগত হয়ে হেদায়াতের পথে ফিরে আসবে। আল্লাহ বলেন,
‘নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিবসের আগমন-নির্গমনে জ্ঞানীদের জন্য
(আল্লাহর) নিদর্শন সমূহ নিহিত রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে
স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বলে, হে আমাদের পালনকর্তা!
তুমি এগুলিকে অনর্থক সৃষ্টি করোনি। মহা পবিত্র তুমি। অতএব তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের
আযাব থেকে বাঁচাও! (সুরা আলে ইমরান ৩/১৯০-৯১)।
আয়েশা (রাঃ) বলেন, অত্র আয়াত নাযিল হ’লে রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) ছালাতে দাঁড়িয়ে যান। এমন সময় বেলাল আসেন আযান দিতে। তিনি দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) কাঁদছেন। বেলাল জিজ্ঞেস করলেন আপনি কাঁদছেন কেন? অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সব
গোনাহ মাফ করে দিয়েছেন! তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, হে বেলাল! ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো
না? অথচ আজ রাতে আমার প্রতি অত্র আয়াতটি তিনি নাযিল করেছেন। আয়াতটি পাঠ করে তিনি বললেন,
‘দুর্ভোগ ঐ ব্যক্তির জন্য যে এটি পাঠ করে অথচ এতে চিন্তা-গবেষণা করে না’। (সহিহ ইবনু হিববান হা/৬২০; ছহীহাহ হা/৬৮; ছহীহুত তারগীব হা/১৪৬৮)।
অতএব আল্লাহর সৃষ্টিতো বটেই, কেউ যদি কেবল
নিজের দৈহিক গঠন ও আকার-আকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তাহ’লে সে আল্লাহর এই সুনিপুন
সৃষ্টিকৌশল দেখে বিমোহিত হবে, তার ঈমান বেড়ে যাবে। ফলে হেদায়াত লাভ করার জন্য সে তৎপর
হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে রয়েছে নিদর্শনসমূহ। এবং
তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। অথচ তোমরা কি তা অনুধাবন করবে না’? (সুরা যারিয়াত ৫১/২১)।
(৬) সৎকর্মশীল ও উত্তম ব্যক্তিদের সাথী হওয়াঃ
বহু মানুষ স্বীয় সাথী ও বন্ধুর কারণে হেদায়াত
লাভ করে। তাই মুত্তাক্বী-পরহেযগার সৎকর্মশীল ব্যক্তিকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা কর্তব্য।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে গড়ে উঠে।
সুতরাং তার বন্ধু নির্বাচনের সময় এ বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত, সে কাকে বন্ধু নির্বাচন
করছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০১৯, সুনান আততিরমিযী
২৩৭৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৮৩৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯২৭, সহীহুল জামি‘ ৩৫৪৫, আহমাদ ৮৪১৭,
শু‘আবুল ঈমান ৯৪৩৮, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৩/১৬৫, আল মুসতাদরাক ৭৩১৯)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
মানবজীবনে সৎ ও অসৎ বন্ধুর প্রভাব অতি ব্যাপক।
এজন্য রাসূল (ছাঃ) সৎ বন্ধুকে আতরওয়ালা ও অসৎ বন্ধুকে হাফরওয়ালার সাথে তুলনা করেছেন।
আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সৎলোকের সাহচর্য ও অসৎলোকের
সাহচর্য যথাক্রমে কস্তুরী বিক্রেতা (আতরওয়ালা) ও কর্মকারের হাপরে ফুঁক দেয়ার মতো। কস্তুরী
বিক্রেতা হয়তো তোমাকে এমনিতেই কিছু দান করবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে কিছু কস্তুরী
ক্রয় করবে। আর অন্ততপক্ষ কিছু না হলেও তার সুঘ্রাণ তোমার অন্তর ও মস্তিষ্ককে সঞ্জীবিত
করবে। পক্ষান্তরে হাপরে ফুঁকদানকারী তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে। আর কিছু না হলেও তার
দুর্গন্ধ তুমি পাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০১০,
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২১০১, ৫৬৩৪;
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৮৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬২৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৮৩১,
সহীহুল জামি‘ ২৩৬৮, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৬৪, বাযযার ৩১৯০, আহমাদ ১৯৬৬০, আবূ ইয়া‘লা ৪২৯৫,
সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬১, আল মুসতাদরাক ৭৭৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৫৩, ইসলামিক সেন্টার
৬৫০৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
পার্থিব জীবনের অসৎ বন্ধুরা ক্বিয়ামত দিবসে
শত্রুতে পরিণত হবে। আল্লাহ বলেন, “বন্ধুরা সেদিন পরস্পরে শত্রু হবে মুত্তাক্বীরা ব্যতীত”।
(সুরা যুখরুফ ৪৩/৬৭)।
অতএব পার্থিব জীবনের সকল বন্ধু-সহচর, সঙ্গী-সাথী
যেনো মুত্তাক্বী হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনৈসলামিক রাজনৈতিক
দলের যারা নেতা বা আমির তারা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, অস্ত্রবাজি, টেন্ডারবাজি,
অর্থ পাচার, খুন, ধর্ষণ, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। আবার অধিকাংশ আলেম বা
সাধারণ মুসলিম ভোটারগণ এইসব নেতাদের আনুগত্য করে থাকে তথা এদেরকে জীবন দিয়ে ভালবাসে।
অথচ আল্লাহ তায়ালা এইসব নেতাদের আনুগত্য করা,
তাদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করা বা ভালবাসতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের
(নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন
করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
”আর তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের
সহায়তা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর আল্লাহকে ভয়
করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তি দাতা।” (সূরা মায়িদা:
২)।
এরপরও যারা ঐসব নেতাদের ভালবাসবে, তাদের প্রতি
আনুগত্যতা প্রকাশ করবে, ঐনেতাগণ যতো পাপ করবে তার অংশ এদের আমলনাময় যোগ হতে থাকবে।
আল্লাহ তাঁয়ালা এরশাদ করেন, ‘যে লোক সৎকাজের
জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য),
তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর
যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন
দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি
অংশ পাবে তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।
উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি শাসক হবে
যাদের কতগুলো কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কতগুলো কাজ অপছন্দ করবে। যে লোক (তাদের) অন্যায়ের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, আর যে লোক তাকে ঘৃণা করবে সেও
দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে লোক তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে
সে অন্যায়ের অংশীদার বলে গণ্য হবে। (সুনান আত তিরমীজী
২২৬৫, মিশকাতুল মাশাবিহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহিহ মুসলিম ১৮৫৪, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘
২৩৯৫)। হাদিসের মান সহিহ।
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক ও ভোটারগণ
এই দুনিয়ার মোহে পড়ে আজকে কিছু না বুঝলেও কিয়ামতে তারা নিজেদের হাত কমড়াবে আর আফসোস
করতে থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“অপরাধী সেদিন স্বীয় হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে
বলবে, ‘হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম। হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি
যদি অমুককে (ভাল না বাসতাম, সমর্থন না করতাম, ভোট না দিতাম) বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!
সে তো আমাকে উপদেশ বাণী থেকে (ইসলামী দল থেকে/ইসলামের পথ থেকে) বিভ্রান্ত করেছিল আমার
কাছে তা আসার পর, শয়ত্বান মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক”। (সুরা
আল ফুরকান ২৭-২৯)।
(৭) দো‘আ করাঃ
দো‘আ মুমিনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। মুমিন
সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে দো‘আ করবে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন,
তোমরা আমাকে ডাক। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা আমার ইবাদত থেকে অহংকার
করে। তারা সত্বর জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত অবস্থায়’। (সুরা গাফির/মুমিন ৪০/৬০)।
হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,‘হে আমার বান্দাগণ!
তোমাদের প্রত্যেকেই পথভ্রষ্ট। কিন্তু আমি যাকে পথ দেখাই (সে-ই পথের সন্ধান পায়)। সুতরাং
তোমরা আমার নিকট পথের সন্ধান কামনা কর, তাহলে আমি তোমাদেরকে পথের সন্ধান দেব’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৩২৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৬৬, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৫৭৭, ইবনু আবী শায়বাহ্ ২৯৫৫৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৬২৫, সহীহ আল জামি‘ ৪৩৪৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সুতরাং আল্লাহর কাছে হেদায়াতের জন্য দো‘আ করতে
হবে। যেমন আমরা ছালাতে সূরা ফাতিহায় পড়ি, ‘আপনি আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন’! (সুরা ফাতিহা ১/৬)।
অন্যত্র আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন, ‘(তারা প্রার্থনা
করে বলে) হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের পর আমাদের অন্তর সমূহকে
বক্র করো না। আর তুমি আমাদেরকে তোমার পক্ষ হতে বিশেষ অনুগ্রহ প্রদান কর। নিশ্চয়ই তুমি
সর্বাধিক দানকারী’। (সুরা আলে ইমরান ৩/৮)।
মুহাম্মাদ
ইবনুল মুসান্না, মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম, আবদ ইবনু হুমায়দ ও আবূ মা’ন আররাক্বাশী (রহঃ)
.... ’আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উন্মুল মু’মিনীন আয়িশাহ
(রাযিঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলা যখন সালাত
আদায় করতেন তখন কীভাবে তার সালাত শুরু করতেন? জবাবে আয়িশাহ (রাযিঃ) বললেনঃ রাতে যখন
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাত আদায় করতে উঠতেন তখন এ দু’আটি পড়ে সালাত
শুরু করতেনঃ
"আল্ল-হুম্মা রব্বা জিবরীলা
ওয়া মীকাঈলা ওয়া ইসরা-ফীলা ফা-তিরাস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযি আ-লিমাল গয়বি ওয়াশ্ব
শাহা-দাতি আনতা তাহকুমু বায়না ইবা-দিকা ফীমা কা-নূ ফীহি ইয়াখতালিফ নাহদিনী লিমাখ তুলিফা
ফীহি মিনাক হাক্কি বি ইযনিকা ইন্নাকা তাহদী মান তাশা-উ ইলা সিরা-ত্বিম মুসতাকীম"
(অর্থাৎ- হে আল্লাহ! জিবরীল, মিকাঈল ও ইসরাফীলের
প্রতিপালক, আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়সমূহের জ্ঞানের অধিকারী।
তোমার বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে তুমিই সেগুলোর ফায়সালা করবে। সত্য ও
ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে সে বিষয়ে তুমি আমাকে পথ দেখাও। তুমিই
তো যাকে ইচ্ছা সরল-সহজ পথ দেখিয়ে থাকো।)। (সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ১৬৯৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৭০, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৬৮১, ইসলামীক সেন্টার
১৬৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অনুরূপভাবে আমরা বিতর ছালাতের দো‘আ কুনূতে
হেদায়াতের জন্য দো‘আ করে থাকি।
হাসান ইবনু আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমার নানা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিতর সালাতের কুনূতে পড়ার
জন্য কতগুলো বাক্য শিক্ষা দিয়েছেঃ
’’আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইতা ওয়া’আ-ফিনী
ফীমান ’আ-ফাইতা ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইতা ওয়া বা-রিক লী ফীমা আ’তাইতা ওয়াক্বিনী
শাররা মা ক্বাদাইতা, ইন্নাকা তাক্বদী ওয়ালা ইউকদা ’আলাইকা ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু
মান ওয়ালাইতা ওয়ালা ইয়াইয্যু মান ’আ-দাইতা তাবা-রাকতা রববানা ওয়া তা’আলাইতা।’’
অর্থঃ হে আল্লাহ্! যাদের প্রতি তুমি উদারতা
প্রদর্শন করেছো, তাদের সাথে আমাকেও উদারতা প্রদর্শন করো, যাদের তুমি অভিভাবকত্ব গ্রহণ
করেছো, তাদের সাথে আমারও অভিভাবকত্ব গ্রহণ করো, যাদের তুমি হিদায়াত দান করেছো তাদের
সাথে আমাকেও হিদায়াত দান করো। তোমার নির্ধারিত অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করো। তুমি
আমাকে যা দান করেছো তাতে বরকত দাও। কেবল তুমিই নির্দেশ দিতে পারো, তোমার উপর কারো নির্দেশ
চলে না। তুমি যার পৃষ্ঠপোষকতা দাও, সে কখনও অপমানিত হয় না। হে আমাদের রব! তুমি পবিত্র,
কল্যাণময় ও সুউচ্চ। (সুনান ইবনু মাজাহ (তাওহীদ পাবঃ) ১১৭৮,
সুনান আততিরমিযী ,৪৬৪, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১২৭৩, সুনান আননাসাঈ,১৭৪৫, ১৭৪৬,
সুনান আবূ দাঊদ ১৪২৫, আহমাদ, ১৪২৫, ১৭২০, ২৭৮২০, ইরওয়াহ ৪২৯, তালীক ইবনু খুযাইমাহ ১০৯৫,
সহীহ আবী দাউদ ১১৮১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এভাবে হেদায়াতের জন্য প্রতিনিয়ত দো‘আ করা কর্তব্য।
যেভাবে রাসূল (ছাঃ) দো‘আ করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (দু’আয়) বলতেন,
’’আল্ল-হুম্মা ইন্নী আস্আলুকাল হুদা- ওয়াত্তুকা-
ওয়াল ’আফা-ফা ওয়াল গিনা-’’
(অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে হিদায়াত
(সঠিক পথ), তাকওয়া (পরহেযগারিতা), হারাম থেকে বেঁচে থাকা ও অমুখাপেক্ষিতা প্রত্যাশা
করি)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪৮৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৭৯৭, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৭২১, সুনান আততিরমিযী ৩৪৮৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৩৮৩২, ইবনু আবী শায়বাহ্ ২৯১৯২,
আহমাদ ৩৯৫০, সহীহ ইবনু হিব্বান ৯০০, সহীহ আল জামি‘ ১২৭৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনৈসলামিক দলের আলেম
ও সাধারণ মুসলিম ভোটারগণ নিজেদের হেদায়েতের জন্য বিভিন্ন দোয়া পাঠ করে আল্লাহর নিকট
আকুতি মিনতি করে না। যদি করতো তাহলে ইসলামি শরিয়াহ আইনের তারা বিরোধিতা করতো না।
(৮) হেদায়াত লাভের প্রচেষ্টা চালানোঃ
যে কোনো বস্তু, পদমর্যাদা, জীবনের বিভিন্ন
পর্যায়ে উন্নতি-অগ্রগতি লাভ করতে হলে চেষ্টা-সাধনার কোনো বিকল্প নেই। কেননা চেষ্টা
ব্যতীত কোনো কিছু লাভ করা যায় না।
আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষ কিছুই পায় না তার চেষ্টা
ব্যতীত’। (সুরা নাজম ৫৩/৩৯)।
তদ্রূপ হেদায়াত লাভের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত
ও রাসূল (ছাঃ) প্রদর্শিত পথে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আমাদের পথে প্রচেষ্টা
চালায়, তাদেরকে আমরা আমাদের পথ সমূহের দিকে পরিচালিত করি। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মশীলদের
সাথে থাকেন’। (সুরা আনকাবূত ২৯/৬৯)।
ইসলামের সঠিক পথে চলতে সেইসব আলেম, কর্মী ও
সমর্থকদের নিজ থেকে কোনো প্রচেষ্টা করছে তেমন কোনো লক্ষণ বুঝা যায় না। সামান্য কিছু
হলেই দেখা যায়, এরা এক যোগে অস্ত্র হাতে নিয়ে ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের মেরে আহত নিহত
করে। তাতে বুঝা যায়, এরা হেদায়েত লাভে কোনো প্রচেষ্টা চলাচ্ছে না।
(৯) আল্লাহকে আঁকড়ে ধরাঃ
আল্লাহকে তথা তাঁর বিধানকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে
হেদায়াতের আলোকোদ্ভাসিত পথে থাকার দৃঢ়তা অর্জন করা যায়।
আল্লাহ বলেন, ‘বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহকে
দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, সে ব্যক্তি অবশ্যই সরল পথে পরিচালিত হবে’। (সুরা আলে ইমরান ৩/১০১)।
এ আয়াতে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো আল্লাহর
বিধানকে আঁকড়ে ধরা। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ
(সা.) -এর সওয়ারীর পিছনে বসছিলাম। তখন তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে ছেলে! আল্লাহর
বিধানসমূহ যথাযথভাবে মেনে চল আল্লাহ তোমাকে হিফাযতে রাখবেন। আল্লাহর অধিকার আদায় কর,
তবে তুমি আল্লাহকে তোমার সম্মুখে পাবে। আর যখন তুমি কারো কাছে কিছু চাওয়ার ইচ্ছা করবে
তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে এবং যখন কারো সাহায্য চাইতে হয় তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য
চাইবে। জেনে রাখ, যদি সমস্ত সৃষ্টিজীব একত্র হয়ে তোমার কোন কল্যাণ করতে চায় তবে তারা
আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত তোমার কোন কল্যাণ করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি সমস্ত
সৃষ্টিজীব সমবেতভাবে তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ
ব্যতীত তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (তোমাদের ভাগ্যের সব কিছু লেখার পর) কলম তুলে
নেয়া হয়েছে এবং খাতাসমূহ শুকিয়ে গেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫৩০২, সুনান আততিরমিযী ২৫১৬, মুসনাদে
আহমাদ ২৬৬৯, সহীহুল জামি ৭৯৫৭, আবূ ইয়া'লা ২৫৫৬, শুআবূল ঈমান ১৯৫, আল মু'জামুল কাবীর
লিত্ব তবারানী ১১২৫৩, আল মু'জামুল আওসাত্ব ৫৪১৭, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৬৩০৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
মূলত এসব আলেম ও ভোটারগণ আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে
চলছে না। যদি আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে চলতো তাহলে এরা ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েমে বাঁধা
হয়ে দাঁড়াতো না।
(১০) আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য করাঃ
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য ব্যতিরেকে
ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ ও সফলতা লাভ করা সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে হেদায়াত লাভের অন্যতম
উপায় হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ করা।
আল্লাহ বলেন, ‘বল, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর
ও রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহ’লে তার দায়িত্বের জন্য
তিনি দায়ী এবং তোমাদের দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তাহ’লে
তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে। বস্তুতঃ রাসূলের উপর দায়িত্ব হ’ল কেবল সুস্পষ্টভাবে (আল্লাহর
বাণী) পৌঁছে দেওয়া’। (সুরা নূর ২৪/৫৪)।
মানুষকে মহান আল্লাহ তাঁর ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য
করার নির্দেশ দিয়েছেন। যারা এই আদেশ-উপদেশ মেনে চলবে মূলতঃ তারা হেদায়াত লাভ করবে।
আল্লাহ বলেন, ‘তবে তাদেরকে যেসব বিষয়ে উপদেশ
দেওয়া হয়েছে, সেগুলি যদি তারা করত, তাহ’লে সেটাই তাদের জন্য উত্তম ও অধিক দৃঢ়তর বিষয়
হ’ত। আর তখন আমরা আমাদের পক্ষ থেকে অবশ্যই তাদেরকে বড় পুরস্কারে ভূষিত করতাম। এবং তাদেরকে
আমরা অবশ্যই সরল পথ প্রদর্শন করতাম’। (সুরা নিসা ৪/৬৬-৬৮)।
বাংলাদেশে যেসব মুসলিম শাসকগোষ্ঠী আছে এবং
তাদের অধীনস্থ যতো নেতা-কর্মী-সমর্থক ও আলেম-ওলামা আছে এরা কেহই আল্লাহ ও রাসুল সা.
এর প্রতি পুরোপুরি আনুগত্যশীল নয়। যদি পূর্ণ আনুগত্যশীল হতো তাহলে এরা নিজেরাই ইসলামি
দল গঠন করে ইসলামি শরিয়াহ আইন মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা
যাচ্ছে, ঐসব নেতাগণ ইসলামি সংগঠনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে তারা মানবরচিত আইনে পরিচালিত
কুফরী মতবাদে বিশ্বাসী অনৈসলামিক রাজনৈতিক দল গঠন করে আল্লাহ ও রাসুল সা. এর নীতির
বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। অথচ তারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয়।
(১১) নবী-রাসূল ও ছাহাবী-তাবেঈগণের জীবনচরিত অধ্যয়ন করাঃ
নবী-রাসূল, ছাহাবী-তাবেঈ ও অন্যান্য সৎকর্মশীল
বান্দাদের জীবনচরিত অধ্যয়ন করলে হেদায়াত লাভ করা সহজ হয়।
আল্লাহ বলেন, ‘বিগত রাসূলগণের বৃত্তান্ত সমূহ
থেকে আমরা তোমার কাছে বিবৃত করলাম। যার দ্বারা আমরা তোমার চিত্তকে দৃঢ় করতে চাই’। (সুরা হূদ ১১/১২০)।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই নবীদের কাহিনীতে
জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ রয়েছে’। (সুরা ইউসুফ
১২/১১১)।
এতদ্ব্যতীত হেদায়াত প্রাপ্তির জন্য কুরআন-হাদীছ
ও ইসলামী বই-পুস্তক অধ্যয়ন করা, দ্বীনী ইলমের বৈঠকে অংশগ্রহণ করা, হেদায়াতপ্রাপ্তদের
সাহচর্য লাভ করা, অধিক হারে নেক আমল করা, মৃত্যু ও আখেরাত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা
এবং জান্নাত লাভের উপায় ও জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের জন্য চেষ্টা করা আবশ্যক।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব আলেম, নেতা-কর্মী,
সমর্থক ও ভোটারগণ ইসলামি বই বিশেষ করে এরা ইসলামি সংগঠনমূলক কোনো বই অধ্যয়ন করে না।
এগুলোকে এরা জিহাদী বা জঙ্গি বই বলে আখ্যায়িত করে থাকে। অথচ হেদায়েত লাভের একটা বড়
অংশ এইসব বইয়ে অন্তর্নিহিত আছে। এইসব বইয়ে আল্লাহ ও রাসুল সা. এর আদেশ নিষেধ, কর্মপন্থা
বা কর্মজীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বর্ণিত আছে। যারা এসবের বিরোধিতা
করবে তারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে।
আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধের বিরোধিতা
ও অবাধ্যতার শাস্তি হলো চিরকাল জাহান্নামের আগুনে পোড়া এবং লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। এছাড়া
দুনিয়াতেও তাদের জন্য কঠোর পরিণতি ও বিপদের সতর্কতা রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
"আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা
করে এবং তাঁর সীমা লঙ্ঘন করে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে
এবং তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি”। (সূরা আন-নিসা,
আয়াত নং ১৪)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, "রাসূল তোমাদের
যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর।
নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।" (সূরা আল-হাশর, আয়াত নং ৭)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে আমার নির্দেশ
অমান্য করল, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবঃ) ৫০৬৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩২৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪০১, সুনান আন-নাসাঈ ৪০৫৯ , আহমাদ ১৩৫৩৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৬৯০, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৪৬৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দল সমর্থিত আলেমদের করুন পরিনতি
(১) কুরআনকে রাষ্ট্রীয় সংবিধান হিসেবে
মেনে না নেয়ার পরিনতিঃ
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে মানবরচিত সংবিধান বা মানুষের তৈরী আইনে রাষ্ট্র
পরিচালনা করছে। অথচ রাসুল সাঃ এর আবির্ভাবই ঘটেছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর
আইন প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে। রাসুল সাঃ যদি শুধু দাওয়াতী কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতেন
তাহলে তাঁকে সশরীরে ১৯টি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হতো না, এতো রক্তপাত হতো না, তাঁকে
এতো নির্যাতিত হতে হতো না। অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর রাসুল সাঃ আরবে প্রতিষ্ঠিত
করেছেন একটি ইসলামি রাষ্ট্র সমাজ ব্যবস্থা। তিনি যেমন ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্র নেতা,
তেমনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শই পরবর্তীতে সাহাবাগণ অনুসরণ করে
রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। কিন্তু এখন রাসুল সাঃ নেই, সাহাবাগণ নেই, তাবেঈ ও তাবে তাবেঈগণ
নেই, কিন্তু রেখে গেছেন কুরআন ও হাদিস এবং উলিল আমর যারা রাসুল সাঃ এর অবর্তমানে তাঁর
প্রতিনিধিত্ব করবেন। উলিল আমর সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
“হে
বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো। রাসূল ও উলিল আমরের আনুগত্য করো। এরপর যদি
তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ ঘটে, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের নিকট ফিরে যাবে; যদি
তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস কর। এটাই তোমাদের জন্যে সুন্দর ও উত্তম উপায়”। (সূরা ৪/নিসা ৫৯)।
’’উলুল আমর’’ আভিধানিক অর্থে সে সমস্ত লোককে
বলা হয়, যাদের হাতে কোনো বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে। সে কারণেই ইবন
আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা, মুজাহিদ ও হাসান বসরী রাহিমাহুমাল্লাহ প্রমূখ মুফাসসিরগণ
ওলামা ও ফোকাহা সম্প্রদায়কে ‘উলুল আমর’ সাব্যস্ত করেছেন। তারাই হচ্ছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের নায়েব বা প্রতিনিধি ৷ তাদের হাতেই দ্বীনী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব
অর্পিত। মুফাসসিরীনের অপর এক জামা'আত-যাদের মধ্যে আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু
প্রমূখ সাহাবায়ে কেরামও রয়েছেন-বলেছেন যে, ’’উলুল আমর’’ এর অর্থ হচ্ছে সে সমস্ত লোক,
যাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। ইমাম সুদ্দী এ মত পোষণ করেন।
কিন্তু বর্তমান যুগের উলিল আমরগণ বা মুসলিম
রাষ্ট্রীয় নেতাগণ কী করছেন? তারা আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন না করে মানুষের তৈরী আইন
বাস্তবায়ন করে চলছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বার বার বলছেন তোমরা কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠিত
করো।
(ক)
আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি পূর্ণ কুরআন শরীফ পরম সত্যতার সাথে এ
জন্যেই নাযিল করেছি যে, তুমি সে অনুযায়ী মানুষের উপর আল্লাহর প্রদর্শিত পন্থায় রাষ্ট্র
পরিচালনা করবে এবং বিচার ফায়সালা করবে। (কুরআনকে যারা এ কাজে ব্যবহার করতে চায়নি তারা
এ মহান আমানতের খিয়ানত করে) তুমি এ খিয়ানতকারীদের সাহায্য পক্ষ সমর্থনকারী হয়ো না।
(সুরা নিসা:১০৫)।
(খ) আল্লাহ বলেন, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মানুষের
মধ্যে ফায়সালা করো, তাদের মনের খেয়াল খুশী ও ধারনা বাসনা অনুসরন করো না। (সুরা মায়েদা: ৪৯)।
(গ)
আল্লাহ বলেন, তুমি কি জান না যে, আকাশ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর। (সুরা বাকারাঃ ১০৭)।
(ঘ) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “হুকুম বা বিধান
একমাত্র আল্লাহরই”। (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০)।
(ঙ) তিনি আরও বলেন, “তারা কি তবে জাহেলিয়াতের
বিধান চায়? দৃঢ়-বিশ্বাসীগণের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা আর কে হতে পারে?” (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫০)।
(চ) তিনি আরও বলেন, “আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট
নিদর্শনাদি সহকারে পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব (বিধি-বিধান) ও মানদণ্ড পাঠিয়েছি
যাতে লোকেরা ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর আমি লৌহ অবতীর্ণ করেছি যাতে প্রচণ্ড
শক্তি ও মানবমণ্ডলীর জন্য বিবিধ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর এর উদ্দেশ্য হচ্ছে,আল্লাহ্
জেনে নেবেন,কে গায়েবকে আশ্রয় করে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্
মহাশক্তিধর ও মহা পরাক্রান্ত।” (সূরা হাদীদ: ২৫)।
(ছ) রাসুল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি এই বিধান
অনুসারে জীবন যাপন করবে, সে উহার প্রতিফল লাভ করবে। যে উহার অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা
করবে তার শাসন সুবিচার পূর্ণ হবে এবং যে উহাকে দৃঢ় রুপে আকড়িয়ে ধরবে সে সঠিক এবং সত্যিকার
কল্যাণের পথে পরিচালিত হতে পারবে।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, “আল্লাহই হলেন বিধান-দাতা, আর তাঁর নিকট থেকেই বিধান নিতে হবে”। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯৫৫; সুনান আননাসাঈ, (৮/২২৬);
বায়হাকি (১০/১৪৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মুসলিম রাষ্ট্রীয় নেতা, কর্মী, সমর্থক যারা
নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে কিন্তু কুরআনের কিছু অংশ মানে তথা এরাও সালাত আদায় করে,
কালিমা পাঠ করে, হজ্জে যায়, দান করে এবং জনকল্যাণমূলক কাজ করে আবার কুরআনের কিছু অংশ
মানে না তথা ইসলামি আইন, বিচার, জিহাদ ও দাওয়াত সংক্রান্ত যেসব আয়াত আছে তা মানে না
আর সেজন্যেই এদেরকে পরকালে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।
আল্লাহ বলেন,
“তোমরা কি কোরআনের কোনো কোনো অংশ (আয়াত) মানো
আর কোনো কোনো অংশ মানো না? অত:পর যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্য থেকে এরুপ কাজ করবে – পার্থিব জীবনে প্রকাশ্য লাঞ্চণা ভোগ করা
আর কিয়ামতের দিনে ভীষণ শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া তার আর কী সাজা হতে পারে!
আর আল্লাহ তো তোমাদের কার্য কলাপ সম্বন্ধেবে- খবর নন”। (সুরা
আল বাকারা-৮৫)।
উপরোক্ত দলীলের প্রেক্ষিতে এটাই প্রমাণিত যে,
রাষ্ট্র পরিচালনায় কুরআনকে সংবিধান হিসেবে মেনে নিতে হবে তথা আল্লাহর আইন দিয়ে রাষ্ট্র
শাসন করতে হবে। রাসুল সা. তিনি নিজে একজন রাষ্ট্র শাসক ছিলেন এবং তিনি সকল বিচারিক
কাজে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করতেন।
রাসুল সা. ইন্তেকালের পূর্বে বলে গেছেন তোমরা
কুরআন ও আমার সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবে তাহলে পথভ্রষ্ট হবে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এইসব
আলেমগণ কুরআনের আইন, নীতি ও দিক নির্দেশনা মানছে না এবং সুন্নাহ বলতে শুধু নামাজ, রোজা,
হজ্জ আর কিছু আমলকে মনে করে চলছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় শাসন কাজে যেসব সুন্নাহ আছে তা মেনে
চলছে না।
রাসুল সা. বলেন,
(ক) মালিক ইবনু আনাস (রাঃ) (রহঃ) হতে মুরসালরূপে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের
মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ
পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৬, মুয়াত্ত্বা মালিক ১৫৯৪)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
(খ) আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি,
যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ।
’হওয’ (কাওসারে) আমার নিকট অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৫০০, হাকেম ৩১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(গ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, বিদায়ী
হজ্জে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকেদের মাঝে খোতবা (ভাষণ) দিলেন।
তাতে তিনি বললেন, ’’শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে যে, তোমাদের এই মাটিতে তার উপাসনা
হবে। কিন্তু এতদ্ব্যতীত তোমরা যে সমস্ত কর্মসমূহকে অবজ্ঞা কর, তাতে তার আনুগত্য করা
হবে—এ নিয়ে সে সন্তুষ্ট। সুতরাং তোমরা সতর্ক থেকো! অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস
ছেড়ে যাচ্ছি; যদি তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করে থাকো তবে কখনই তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; আর
তা হল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ (কুরআন ও হাদীস)। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৫০১, হাকেম ৩১৮, সহীহ তারগীব ৩৬)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কুরআনের আইন বা দিক নির্দেশনা বা কুরআনকে যারা
অনুসরণ করবে না কিয়ামতে তাদেরকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।
রাসুল সা. বলেন,
আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত,
তিনি বলেন, এই কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; এর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। যে ব্যক্তি
এর অনুসরণ করবে সে তাকে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে তাকে বর্জন
করবে অথবা তার থেকে বিমুখ হবে তাকে ঘাড়-ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৫০২, সহীহ তারগীব ৪৩, ১৪২৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ পালন করা আবশ্যক
বা অপরিহার্য। কুরআনের অকাট্য দলীল বা সুনির্দিষ্ট হাদিসের মাধ্যমে তাঁর যে নির্দেশ
প্রমাণিত, তা পালন করা মুমিনের জন্য জরুরি। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।" (সুরা আন-নিসা: ৮০)।
আপনি নিজেকে যদি মুসলিম দাবী করেন তাহলে অবশ্যই
আপনাকে রাসুল সা. এর প্রতিটি আদেশ নিষেধ মেনে চলতে হবে, রাসুল সা. এর সুন্নাহর অনুসারী
হতে হবে, রাসুল সা. যেভাবে নিজের জীবন অতিবাহিত করেছেন তাঁর সেই আদর্শ নিজের মধ্যে
ধারণ করতে হবে। রাসুল সা. পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যেভাবে পরিচালনা করেছেন সেভাবে আমাদেরকেও
পরিচালনা করতে হবে। রাসুল সা. শুধু একজন ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না তিনি ছিলেন একজন সফল
রাষ্ট্র নায়ক। তাঁর প্রতি আনুগত্যশীল হওয়া মানেই ইসলাম মানা। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“রাসুল তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর
এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন
কর; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।” (সূরা আল-হাশর,
আয়াত: ৭)।
তিনি আরও বলেন,
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা
দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের কোনো রকম
(ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার থাকবে না। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করল,
সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্টভাবে গোমরাহ (পথভ্রষ্ট) হলো।” (সূরা
আল-আহযাব, আয়াত: ৩৬)।
রাসুল সাঃ বলেন,
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল,
সে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহ তা’আলার অবাধ্যতা
করল। আর যে আমীরের (নেতার) আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল। যে আমীরের অবাধ্যতা
করল, সে আমারই অবাধ্যতা করল। প্রকৃতপক্ষে ইমাম (নেতা) হলেন ঢাল স্বরূপ। তার পিছন থেকে
যুদ্ধ করা হয়, তার দ্বারা (শত্রুদের কবল থেকে) নিরাপত্তা পাওয়া যায়। সুতরাং শাসক যদি
আল্লাহর প্রতি ভয়প্রদর্শন পূর্বক প্রশাসন চালায় এবং ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে
এর বিনিময়ে সে সাওয়াব (প্রতিদান) পাবে। কিন্তু সে যদি এর বিপরীত কর্ম সম্পাদন করে,
তাহলে তার গুনাহও তার ওপর কার্যকর হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৩৬৬১, বুখারী ২৯৫৭, মুসলিম ১৮৩৫, আহমাদ ৮১৩৪, সহীহ আল জামি‘ ৬০৪৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলিমের (তার শাসনকর্তার নির্দেশ)
শোনা এবং আনুগত্য করা অপরিহার্য; তার মনঃপূত হোক বা না হোক, যতক্ষণ না তাকে গুনাহের
দিকে নির্দেশ করে। কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তা শোনা ও আনুগত্য
করা কর্তব্য নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬৪, সহিহ
বুখারী ৭১৪৪, সহিহ মুসলিম ১৮৩৯, সুনান আবূ দাঊদ ২৬২৬, সুনান আততিরমিযী ১৭০৭, সহীহ আল
জামি‘ ৩৬৯৩, আহমাদ ৬২৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত হাদিস দিয়ে অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেমগণ
হয়তো বলবেন, এখানে তো আওয়ামীলীগ বা বিএনপির শাসকদের আনুগত্য করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে
কিন্তু বিষয়টি আগে বুঝতে হবে যে, সেই রাজনৈতিক দলগুলো ইসলামি দল কিনা? যেহেতু ঐসব
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাগণ মুসলিম হওয়া সত্বেও কুরআনকে তারা সংবিধান হিসেবে মেনে নেয়নি
বরঞ্চ তারা মানবরচিত আইন দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করে থাকে তাই তাদের আনুগত্য করা যাবে না।
তাদের আনুগত্য যেমন করা যাবে না তেমনি ঐসব রাজনৈতিক দলকেও সমর্থন দেয়া বা তাদেরকে ভোট
দেয়া যাবে না।
(২) অনৈসলামিক দলের শাসকগোষ্ঠী যেহেতু
ইসলামি আইন অনুসারে বিচার করে না সেইহেতু তারা কাফির, জালিম ও ফাসিকঃ
বাংলাদেশে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েম নেই।
মানবরচিত আইন দিয়ে এই দেশটি শাসিত হয়ে আসছে। অথচ এই দেশটি যারা শাসন করে আসছে তারা
সকলেই মুসলিম নেতা বা শাসক। এইসব মুসলিম শাসক যেহেতু ইসলামি আইন দিয়ে রাষ্ট্র শাসন
করে না সেইহেতু এরা কাফির, জালিম ও ফাসিক এর মধ্যে গণ্য হবে। মূলত মুসলিম ভোটারদের
কারণেই অনৈসলামিক দলের শাসকগোষ্ঠী ইসলামি আইন দিয়ে বিচারিক কাজ করছে না। কারণ অনৈসলামিক
দলের সংবিধানে ইসলামি শাসনব্যবস্থার কোনো কথা লেখা নেই। আর মুসলিম ভোটারগণ অনৈসলামিক
দলের শাসকগোষ্ঠীকে ভোট প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম বিরোধী কাজে সহযোগিতা করায় তারাও কাফির,
ফাসিক ও জালিম হয়ে জাহান্নামে অবস্থান করবে।
যারা কুরআনের আইন মানে না তথা ইসলামি শরিয়াহ
আইন যারা বিশ্বাস করে না, মানে না তারা নিঃসন্দেহে কাফির। এইসব অনৈসলামিক রাজনৈতিক
দলে লক্ষ লক্ষ আলেম-ওলামা আছে। শুধুমাত্র দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য এইসব আলেমগণ কাফির,
জালিম ও ফাসিক শাসকদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না, কোনো ওয়াজ মাহফিল, বা জুমার খুতবায় কোনো বক্তব্য দেয় না, তাদের বিরুদ্ধে
কোনো ফতোয়া জারি করে না, ইসলামি আইন বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো দাবী পেশ করে না বা মিটিং
মিছিল করে না।
ইসলামি আইনের তিনটি পর্যায় আছে। এই তিনটি পর্যায়
যে মানবে না বা অস্বীকার করবে সে মুসলমান হয়েও কাফের বলে গণ্য হবে। পর্যায় তিনটি হচ্ছেঃ
(১) পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কুরআনকে
সংবিধান বা ইসলামি আইন গ্রন্থ হিসেবে মেনে নিতে হবে।
(২)
কুরআন ও সুন্নাহর আইন দিয়ে বিচারের রায় দিতে হবে।
(৩) কুরআন ও সুন্নাহর আইনে শাস্তি কার্যকর
করতে হবে।
ইসলামি দন্ডবিধির চারটি ধারা। যথাঃ
(১)
কিসাস ও জিনায়াত।
(২)
হুদুদ বা হদ্দ।
(৩)
তাযীর।
(৪) মুখালাফাত।
সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ
(১) কিসাস ও জিনায়াতঃ (মানব হত্যা ও জখম সম্পর্কে)
কিসাসঃ শাব্দিক অর্থ হল অনুরূপ করা বা সমান
করা। শরীআতের পরিভাষায়, “হত্যা বা জখমের ক্ষেত্রে অনুরূপতা নীতিভিত্তিক ন্যায়বিচারকে
কিসাস বলে”। কাজেই চোখের বদল চোখ, নাকের বদলে নাক, এবং হত্যার বদলা হত্যা এটাই হল কিসাস।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর আমরা তাদের উপর তাতে অত্যাবশ্যক করে দিয়েছিলাম
যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে
দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম। তারপর কেউ তা ক্ষমা করলে তা তার জন্য কাফফারা হবে।
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই যালিম”। (সূরা মায়িদাঃ ৪৫)।
জিনায়াত: জিনায়াত হচ্ছে “ব্যক্তির অধিকার এবং
ক্ষমা করারও অধিকারী”। মূলতঃ হত্যাকান্ড সংক্রান্ত ঘটনাগুলো হতে পারে তা বেআইনীভাবে
কিংবা দূর্ঘটনাবশতঃ, এবং নিহত ব্যক্তির স্বজন বা পরিবারের দিয়তের বিনিময়ে ক্ষমা করার
অধিকার এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত। উদাহরণ স্বরূপঃ
(ক) যে ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে খুন করে তার
ক্ষেত্রে দিয়ত হচ্ছে ১০০ উটের সমপরিমাণ যার মধ্যে ৪০টি হতে হবে গর্ভবতী।
(খ) যদি কোনো ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে কাউকে
খুন করে সেক্ষেত্রে তার দিয়ত হচ্ছে ১০০ উটের সমপরিমাণ।
ইমাম আন-নাসায়ী তার বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেন
যে, শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গের জন্য দিয়ত রয়েছে, যেমন চোখের জন্য রক্ত পণ হচ্ছে ৫০টি
উটের সমপরিমাণ।
ইসলামি আইন ও মানব রচিত আইনের পার্থক্য
(ক) ইসলামী আইনে হত্যার বদলা হিসাবে হত্যার
বিধান নিহত ব্যক্তির ওয়ারিছদের ওপর ন্যাস্ত।
(খ) ইসলামী আইনে কেবল কেসাস বা অনুরূপ শাস্তির
বিধান বর্ণিত হয়েছে।
(গ) ইসলামী আইনে ক্ষমা করার অধিকার নিহত ব্যক্তির
উত্তরাধিকারীকে দেয়া হয়েছে।
(ঘ) ইসলামী আইনে স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ
সা. কেও কেসাস বা দিয়ত মাফ করে দেয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। এটা বান্দার হক।
(ঘ) স্বয়ং আল্লাহও তা ক্ষমা করেন না, একমাত্র
খালেছ দিলে তওবা ব্যতীত।
অপর দিকে,
(ক) মানব রচিত আইনে রাষ্ট্রে মানোনীত ব্যক্তির
নিকট সমর্পিত।
(খ) প্রচলিত আইনে খুনের বদলা খুনের বিধানের
সাথে বিকল্প বিধান হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
(গ) প্রচলিত আইনে বিচারকের হাতে ন্যাস্ত।
(ঘ) আমাদের সংবিধানের ৪৯ নং অনুচ্ছেদে বলা
হয়েছে, “কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোন দন্ডের
মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যেকোন দন্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করিবার
ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে”। ইসলামি আইনে ক্ষমা করার অধিকার দেয়া হয়েছে নিহতের পরিবার
বা উত্তরাধিকারদের উপর আর মানবরচিত আইনে ক্ষমা করার অধিকার দেয়া হয়েছে রাষ্ট্র প্রধানের
উপর যা সম্পূর্ণ আল্লাহর আইন বিরোধী।
(২) হুদুদ বা হদ্দঃ
হুদুদ অর্থ নির্দষ্ট বা সীমারেখা। শরীআতে কিছু কিছু কাজের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির উল্লেখ
আছে। এগুলোকে হুদুদ বলে। যথা-
(ক) অবিবাহিত ব্যভিচারীকে ১০০টি
বেত্রাঘাত করা, বিবাহিত ব্যভিচারীকে রজম করে হত্যা করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে এক’শ ঘা করে
বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরী করবে এদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের অভিভূত না
করে। যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাক। ঈমানদারদের একটি দল যেন এদের শাস্তি
প্রত্যক্ষ করে।” (সূরা আন নূর ২৪:২)।
উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা আমার কাছ থেকে (দীনের বিধান) শিখে নাও। আল্লাহ তাদের (মহিলিাদের
জন্য একটি পথ করে দিয়েছেন। যদি অবিবাহিত পুরুষ অবিবাহিত নারীর সাথে যেনা করে তবে তাদের
প্রত্যেককে এক বছরের নির্বাসনসহ এক শত বেত্রাঘাত করতে হবে। আর যদি বিবাহিত পুরুষ বিবাহিত
নারীর সাথে যেনা করে তবে তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত এবং রজম করতে হবে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৫০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩০৬,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৯০, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৫৮, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৪৩৪, ১৪৫১, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪১৫, আহমাদ ২২১৫৮, ২২১৯৫, ২২২০৮, ২২২২৩, ২২২৭৪,
দারেমী ২৩২৭, ইরওয়া ২৩৪১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২৬৭, ইসলামিক সেন্টার ৪২৬৭)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
আবূ হুরায়রা, যায়েদ ইবনে খালিদ ও শিবল (রাঃ)
থেকে বর্ণিতঃ
তারা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললো, আমি
আপনাকে আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, আমাদের মধ্যে কিতাবুল্লাহর বিধান অনুযায়ী মীমাংসা
করে দিন। তার তুলনায় অধিক বিচক্ষণ তার প্রতিপক্ষ বললো, হাঁ আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব
অনুসারে ফায়সালা করে দিন এবং আমাকে বক্তব্য পেশের অনুমতি দিন। তিনি বলেনঃ বলো।
লোকটি বললো, আমার পুত্র এই ব্যক্তির শ্রমিক
ছিল, সে তার স্ত্রীর সাথে যেনা করেছে। আমি তার পক্ষ থেকে এক শত বকরী এবং একটি গোলাম
পরিশোধ করেছি। অতঃপর আমি কতক বিজ্ঞ লোককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আমাকে বলা হয় যে,
আমার পুত্রকে এক শত বেত্রাঘাত করতে হবে এবং এক বছরের নির্বাসন দিতে হবে, আর এই ব্যক্তির
স্ত্রীকে রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেনঃ সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি অবশ্যই তোমাদের দু’জনের মধ্যে আল্লাহর
কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করবো। তুমি তোমার এক শত বকরী ও গোলাম ফেরত লও এবং তোমার পুত্রকে
এক বছরের নির্বাসনসহ এক শত বেত্রাঘাত করা হবে। আর হে উনাইস! তুমি আগামী কাল সকালে তার
স্ত্রীর নিকট যাবে। সে যদি স্বীকারোক্তি করে তবে তাকে রজম করবে। অধস্তন রাবী হিশাম
বলেন, উনায়স (রাঃ) পরদিন সকালে তার নিকট গেলো এবং সে স্বীকারোক্তি করলে তিনি তাকে রজম
করেন। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৪৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৩১৫, ২৬৪৯, ২৬৯৬, ২৭২৫, ৬৬৩৩, ৬৮২৮, ৬৮৩২, ৬৮৩৩, ৬৮৩৬, ৬৮৪৩, ৬৮৬০, ৭১৯৫, ৭২৬০, ৭২৭৯,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪৪৫, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪৩৩, নাসায়ী ৫৪১০,
৫৪১১, আহমাদ ১৬৫৯০, মুয়াত্তা মালেক ১৫৫৬, দারেমী ২৩১৭, ইরওয়া ১৪৬৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ
২১৪৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২১৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) কারোও উপর ব্যভিচারের মিথ্যা
অভিযোগ আরোপকারীকে ৮০টি বেত্রাঘাত করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ
করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি বেত্ৰাঘাত কর এবং
তোমরা কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্ৰহণ করবে না; এরাই তো ফাসেক”। (সূরা নূর: ৪)।
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে
নির্দোষ প্রমাণ করে যখন কুরআনের আয়াত নাযিল হলো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে তা তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর মিম্বার হতে নেমে দু’জন পুরুষ ও একজন
মহিলাকে দণ্ড দেয়ার হুকুম করলেন। তখন লোকেরা তাদের ওপর (মিথ্যা অপবাদের) ’হাদ্দ’ জারি
করলেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৭৯, সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ৩১৮১, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪৭৪, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৬৭, আহমাদ
২৪০৬৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আল্লাহতায়ালা বলেন,
“নিশ্চয়ই যারা সতী-সাধ্বী সরলমনা মু’মিন মহিলাদেরকে
ব্যভিচারের অপবাদ দেয় তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য (আখিরাতে) রয়েছে
মহা শাস্তি”। (সুরা নূর : ২৩)।
(গ) পেশাদার চুরি ঠেকাতে চোরের হাত
কেটে দেওয়া।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত
কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। আর
আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। (সূরা মায়িদা: ৩৮)।
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক চোরকে ধরে আনা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ করলেন, তার (ডান) হাত কেটে দাও। সুতরাং তার হাত কেটে ফেলা
হলো। পরে পুনরায় চুরির দায়ে তাকে দ্বিতীয়বার আনা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, তার (বাম) পা কেটে দাও। সুতরাং তার পা কেটে ফেলা হলো। এরপর পুনরায় তৃতীয়বার
তাকে চুরির অপরাধে আনা হলো। এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিলেন,
তার (বাম) হাত কেটে দাও। সুতরাং তার হাত কেটে ফেলা হলো। পরে চতুর্থবার তাকে চুরির অপরাধে
আনা হলো। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিলেন, তার (ডান) পাও
কেটে দাও। সুতরাং তার পাও কেটে ফেলা হলো। তারপর পঞ্চমবার তাকে চুরির অপরাধে উপস্থিত
করা হলো। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবার তাকে হত্যার হুকুম দিলেন।
সুতরাং আমরা তাকে টেনে নিয়ে এসে একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলাম এবং তার ওপর পাথর নিক্ষেপ
করলাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), ৩৬০৩, সুনান আবূ দাঊদ
৪৪১০, সুনান আননাসায়ী ৪০৭, ৪৯৭৮। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(ঘ) সন্ত্রাস, অপহরণ, দস্যুতা/লুন্ঠন/ডাকাতি
কিংবা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা/ বিদ্রোহ সৃষ্টিকারীকে হত্যা করা বা শূলে চড়ানো বা বিপরীত
দিক থেকে হাত পা কেটে দেওয়া কিংবা দেশান্তরিত করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে
হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে বা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা
হবে বা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও আখেরাতে
তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে”। (সূরা মায়িদা: ৩৩)।
(ঙ) মদ্যপানকারীকে ৪০/৮০টি বেত্রাঘাত
করা বা জুতা মারা এবং ৪র্থ বার পান করলে হত্যা করা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং
ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কর্ম। অতএব তোমরা এগুলি থেকে বেঁচে থাক। যাতে
তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও। শয়তান তোমাদের মাঝে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শত্র“তা ও বিদ্বেষ
সঞ্চারিত করতে চায় এবং আল্লাহর যিক্র ও ছালাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে চায়। তাহলে
কি তোমরা বিরত থাকবে”? (সুরা মায়িদাহ ৯০-৯১)।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ মদ পানকারী
এ ব্যক্তিকে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকটে নিয়ে আসা হলো।
তিনি তাকে দু’খানা ছড়ি (এক যোগে ধরে তার) দ্বারা চল্লিশের মত কোড়া মারলেন। আনাস (রাঃ)
বলেনঃ ১ম খলিফা আবু বাকর (রাঃ) এরূপ কোড়া মেরেছেন, উমার (রাঃ) তার খিলাফতকালে এ ব্যাপারে
লোকদের সাথে পরামর্শ করলেন। আবদুর রহমান ইবনু আওফ বলেনঃ সর্বাপেক্ষা হালকা শাস্তি হচ্ছে
আশি (কোড়া)। ‘উমার (রাঃ) ঐ (৮০-র) আদেশই জারি করলেন। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৭৭৩, ৬৭৭৬; সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩৪৪, ৪৩৪৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭০৬, মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত), ৩৬১৪, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪৪৩, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪৭৯,
সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৭০, আহমাদ ১১৭২৯, ১২৩৯৪, ১২৪৪৪, ১২৮০৫ দারেমী ২৩১১, সহীহ আল-জামি
৪৯৭৪, আধুনিক প্রকাশনী ৬৩০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩১৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
অপর এক বর্ণনায়, আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ পানকারীকে জুতা ও খেজুরের ডাল দ্বারা চল্লিশবার
প্রহার করতেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬১৫, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
চতুর্থবার মদপানকারীর শাস্তিঃ
(ক) মুআবিয়াহ ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) সূত্রে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লোকেরা মদ
পান করলে, তাদের বেত্রাঘাত করো। পুনরায় পান করলে বেত্রাঘাত করো। আবারো পান করলে বেত্রাঘাত
করো, পুনরায় পান করলে বেত্রাঘাত করো, আবারো পান করলে তাদের হত্যা করো। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪৮২)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ মাতাল হলে তাকে বেত্রাঘাত
করো। আবার মাতাল হলে তাকে বেত্রাঘাত করো, আবার মাতাল হলে বেত্রাঘাত করো, চতুর্থবারও
যদি এর পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তাকে হত্যা করো। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, উমার ইবনু আবূ
সালামাহও পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
থেকে এরূপ বর্ণনা করেছেনঃ কেউ মদ পান করলে তাকে বেত্রাঘাত করো। চতুর্থবারও যদি এরূপ
করে তবে তাকে হত্যা করো। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, অনুরূপভাবে সুহাইল পর্যায়ক্রমে
আবূ সালিহ ও আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরূপ বর্ণনা
করেছেনঃ চতুর্থবার যদি তারা মদ পান করে তাহলে তাদের হত্যা করো।
একইভাবে ইবনু আবূ নুআইম ইবনু উমারের সূত্রে
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরূপ বর্ণনা করেছেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনু উমার
(রাঃ) এবং আশ-শারীদ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা
করেছেন। তবে আল জাদলী মুআবিয়াহ (রাঃ)-এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ সে তৃতীয় বার বা চতুর্থবার মদ পান করলে তাকে হত্যা
করো। (সুনান আবু দাউদ (তাহকীককৃত) ৪৪৮৪, সুনান ইবনে মাজাহ
২৫৭২, ২৫৭৩, আহমাদ ৭৭০৪, ৭৮৫১, ১০১৬৯, ১০৩৫১, দারেমী ২১০৫, আত-তালীকুর রাগীব ৩/১৮৭,
সহীহাহ ১৩৬০।) হাদিসের মানঃ হাসান সহীহ।
(চ) মুরতাদ অর্থাৎ ইসলাম পরিত্যাগকারী
ব্যক্তিকে ক্বতল করা।
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। ওহুদ যুদ্ধে এক
মহিলা মুরতাদ হয়ে যায়,তখন রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন,তাকে তওবা করানো হোক,আর যদি তওবা
না করে,তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। (সুনানে দারা কুতনী,
হাদীস নং-১২১, সুনানে বায়হাকী কুবরা,হাদীস নং-১৬৬৪৫,মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক,হাদীস
নং-১৮৭২৫,মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা,হাদীস নং-২৯৬০৭) ।
হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত।
উম্মে মারওয়ান নামের এক মহিলা মুরতাদ হয়ে গেলে রাসূল সাঃ আদেশ দেন যে, তার কাছে ইসলাম
পেশ করতে, যদি সে ফিরে আসে তাহলে ভাল, নতুবা তাকে হত্যা করা হবে। (সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী,হাদীস নং-১৬৬৪৩,সুনানে দারা কুতনী,
হাদীস নং-১২২)।
আহমদ ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ)...ইকরামা (রহঃ) থেকে
বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ
ইব্ন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌছলে, তিনি বলেনঃ যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে
আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ তোময়া আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য
আমি তাদেরকে আল্লাহ্র রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করতাম। কেননা, তিনি বলেছেনঃ যদি কেউ
দীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে। আলী (রাঃ) ইব্ন আব্বাস
(রাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে বলেনঃ ওয়াহ্! ওয়াহ্! ইব্ন আব্বাস (রাঃ) সত্য বলেহছেন। আর ইহাই
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ। (সুনান
আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৩০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আমর ইব্ন আওন (রহঃ)....আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ মুসলিমের
রক্ত হালাল নয়, যে এরূপ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহ্র
রাসূল”। তবে তিনটি কারণে কোন মুসলিমের রক্ত প্রবাহিত করা হালালঃ (১) যদি কোন বিবাহিত
ব্যক্তি যিনা করে; (২) যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তবে এর বিনিময়ে হত্যা এবং (৩) যে ব্যক্তি
দীন ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলিমের জামায়াত থেকে বেরিয়ে যায়। (সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৩০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আহমদ ইব্ন হাম্বাল (রহঃ)....আবূ বুর্দা (রহঃ)
থেকে বর্ণিত। আবূ মূসা (রাঃ) বলেনঃ যখন মু’আয (রাঃ) তার কাছে উপস্থিত হন, তখন তিনি
তাকে বসার জন্য অনুরোধ করেন এবং তার জন্য একটি বালিশ রেখে দেন। এ সময় মা’আয (রাঃ) তার
নিকট বন্ধনযুক্ত অবস্থায় এক-ব্যক্তিকে দেখতে পান। তিনি জিজ্ঞাসা করেন এ ব্যক্তি কে?
তখন আবূ মূসা (রাঃ) বলেনঃ এই ব্যক্তি আগে ইয়াহূদী ছিল, পরে সে ইসলাম কবূল করে, এরপর
সে ঐ খারাপ ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেছে। তখন মু’আয (রাঃ) বলেনঃ আমি ততক্ষণ বসবো না, যতক্ষণ
না এই ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করা হয়। তখন আবূ মূসা (রাঃ) বলেনঃ
হ্যাঁ, এরূপই হবে। আপনি বসুন। তখন মু’আয (রাঃ) তিন বার এরূপ বলেনঃ আমি ততক্ষণ বসবো
না, যতক্ষণ না এই ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করা হয়। এরপর আবূ মূসা
(রাঃ) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন এবং তা কার্যকর হয়। (সুনান
আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৩০৩-৪৩০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। কতকগুলো লোক মাদ্বীনায়
তাদের প্রতিকূল আবহাওয়া অনুভব করল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হুকুম
দিলেন, তারা যেন তাঁর রাখাল অর্থাৎ তাঁর উটগুলোর নিকট গিয়ে থাকে এবং উটের দুগ্ধ ও প্রস্রাব
পান করে। তারা রাখালের সাথে গিয়ে মিলিত হল এবং উটের দুধ ও পেশাব পান করতে লাগল। অবশেষে
তাদের শরীর সুস্থ হলে তারা রাখালটিকে হত্যা করে ফেলে এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যায়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি তাদের খোঁজে লোক পাঠান।
এরপর তাদের ধরে আনা হল। এরপর তিনি তাদের হাত পা কেটে দেন এবং তাদের চক্ষু ফুঁড়ে দেন।
রাবী আবূ কিলাবা (রহঃ) বলেনঃ তারা চুরি ও হত্যা
করেছিল এবং ঈমান আনার পর মুরতাদ হয়ে আল্লাহ্ ও রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৫৬৮৬, ২৩৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪২৪৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৭১, সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৩১৩,
আধুনিক প্রকাশনী- ৫২৭৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫১৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মূসা ইব্ন ইসমাঈল (রহঃ)...আবূ আইউব তার সনদে
এরূপ বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূঁচ গরম করার নির্দেশ
দেন, যা তাদের চোখে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং তাদের সম্পূর্ণরূপে
হত্যা করা হয়নি। (কারণ তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাখালকে এভাবে শাস্তি
দিয়ে হত্যা করেছিল।) (সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৩১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ছ) কোনো মানুষ পশুর সাথে কু-কর্মে লিপ্ত হলে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
কোনো পশুর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া হারাম ও
কবীরা গুনাহ্। আব্দুল্লাহ্ বিন্ ‘আববাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আল্লাহ্’র লা’নত সেই ব্যক্তির উপর যে কোন পশুর সাথে
সঙ্গমে লিপ্ত হয়। (আহমাদ ১/২১৭; আবূ ইয়া’লা ২৫২১; ইব্নু
হিববান ৪৪১৭ ’হাকিম ৪/৩৫৬; ত্বাবারানী/কাবীর ১১৫৪৬ বায়হাক্বী ৮/২৩১)।
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো জন্তু-জানোয়ারের
সাথে অপকর্ম করল, তাকে হত্যা করে দাও এবং তার সাথে ঐ জানোয়ারটিকেও হত্যা করে ফেল। ইবনু
’আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, জানোয়ারটি কেন হত্যাযোগ্য? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কিছুই শুনিনি। তবে আমি মনে করি
যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জানোয়ারটির গোশ্ত/গোশত খাওয়া বা কোনভাবে
তাত্থেকে উপকৃত হওয়াকে অপছন্দ করেন। যেহেতু জানোয়ারটির সাথে অপকর্ম হয়েছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৭৬, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৬৪, সুনান
আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪৬৪, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪৫৫, ৮/৩৩০, দারাকুতনী ৩/১২৭,
ইরওয়া ২৩৪৮, ২৩৫২, আত-তালীকুর রাগীব ৩/১৯৯, যইফ আল-জামি ৫৮৭৮, সহীহ আল জামি ৫৯৩৮, সহীহ
আত্ তারগীব ২৪২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতএব কুকর্মকারীকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে
অথবা আধুনিক যুগে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা ফায়ার করে হত্যা করতে হবে। তবে একাজ
রাষ্ট্র ছাড়া সাধারণ জনগণ করবে না।
(জ) পায়ুকাম বা সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
সমকামিতা অত্যন্ত ঘৃণ্য পাপ এবং কবীরা গুনাহ।
এই পাপের কারণেই বর্তমান পৃথিবীতে এইড্স-এর মত মরণ ব্যধি ছড়িয়ে পড়েছে। কারোর ব্যাপারে
সমকাম প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে ও তার সমকামী সঙ্গীকে শাস্তি স্বরূপ হত্যা করতে হয়। এ
অপরাধের কারণে বিগত যুগে আল্লাহ তা‘আলা কওমে লূতকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা
বলেন,
“আর আমি লূতকেও পাঠিয়েছিলাম। তিনি তার সম্প্রদায়কে
বলেছিলেন, “তোমরা কি এমন খারাপ কাজ করে যাচ্ছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি?
তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষের কাছে যাও, বরং তোমরা সীমালংঘনকারী
সম্প্রদায়। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বহিস্কার কর,
এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়। অতঃপর আমরা তাকে ও তার পরিজনদের সবাইকে উদ্ধার
করেছিলাম, তার স্ত্রী ছাড়া, সে ছিল পিছনে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত। আর আমরা তাদের
উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। কাজেই দেখুন, অপরাধীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছিল”।
(সুরা আরাফ ৮০-৮৪)।
আল্লাহ তাঁদেরকে এই কুকাজের শাস্তি স্বরূপ
তাঁদের ঘর বাড়ী উল্টে দিয়েছিলেন এবং আকাশ থেকে তাঁদের উপর বর্ষণ করেছিলেন পাথর।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
“আপনার জীবন, নিশ্চয় তারা তাদের নেশায় বিভ্রান্ত
হয়ে ঘুরছিল। অতঃপর সূর্যোদয়ের সময় প্রকাণ্ড চীৎকার তাদেরকে পাকড়াও করল; তাতে আমরা
জনপদকে উল্টিয়ে উপর-নীচ করে দিলাম এবং তাদের উপর পোড়ামাটির পাথর-কংকর বর্ষণ করলা।
নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে পর্যবেক্ষণ-শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য। আর নিশ্চয় তা
লোক চলাচলের পথের পাশেই বিদ্যমান”। (সুরা হিজর ১৫/৭২-৭৬)।
ইসলামি আইনে সমকামীর শাস্তি
(পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা)
(ক)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেনঃ তোমরা কাউকে লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত পেলে তাকে এবং যার সাথে তা করা হয়
তাকে হত্যা করো। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৫৬১, সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ১৪৫৬, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৪৬২,মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৭৫,
বায়হাকী ফিস সুনান ৮/২৩২, ইরওয়া ২৩৫০, সহীহ আল জামি ৬৫৮৯, সহীহ আত্ তারগীব ২৪২২)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লূত জাতির অনুরূপ
অপকর্মে লিপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে বলেনঃ তোমরা উপরের এবং নিচের ব্যক্তিকে অর্থাৎ উভয়কে
প্রস্তরাঘাতে হত্যা করো। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৬২, সুনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪৫৬, বায়হাকী ফিস সুনান ৮/২৩২, ইরওয়া ৬/১৭)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
(গ) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি আমার উম্মাতের
ব্যাপারে লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সর্বাধিক আশঙ্কা করি। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৬৩, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪৫৭,
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৭৭, বায়হাকী ফিস সুনান ২/২১৫, ৬/১০৬। আত-তালীকুর রাগীব
৩/১৯৭, ১৯৮, আহমাদ ১৫০৯৩, সহীহ আল জামি ১৫৫২, সহীহ আত্ তারগীব ২৪১৭)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
সুতরাং উক্ত সম্প্রদায়ের মতো কুকর্মে যে লিপ্ত
হবে সেও উপর্যুক্ত শাস্তির উপযুক্ত। তাই এমন দুরাচার প্রসঙ্গে কিছু সাহাবা (রাঃ) এর
ফতোয়া হলো, তাকে জ্বালিয়ে মারা হবে। কেউ কেউ বলেন, উঁচু জায়গা থেকে ধাক্কা দিয়ে নীচে
ফেলে তাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হবে। (ইবনে জিবরীন ৬২৬)।
রযীন-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, ইবনু ’আব্বাস
(রাঃ) হতে বর্ণিত, ’আলী (রাঃ) এরূপ অপকর্মে (সমকামিতায়) লিপ্ত উভয়কে (যে করে এবং যাকে
করে) জ্বালিয়ে দিয়েছেন এবং আবূ বকর উভয়ের উপর দেয়াল চাপা দিয়েছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫৮৪)।
(ঝ) রাসুল সাঃ এর বিরুদ্ধে কেহ কটুক্তি করলে তার শাস্তি
মৃত্যুদন্ড।
“অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে
আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের
জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি। আর যদি ভঙ্গ করে তারা তাদের শপথ প্রতিশ্রুতির পর
এবং বিদ্রুপ করে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে, তবে কুফর প্রধানদের সাথে যুদ্ধ কর। কারণ,
এদের কোন প্রতিশ্রুতি নেই যাতে তারা ফিরে আসে। তোমরা কি সেই দলের সাথে যুদ্ধ করবে
না; যারা ভঙ্গ করেছে নিজেদের শপথ এবং সঙ্কল্প নিয়েছে রসূলকে বহিস্কারের? আর এরাই প্রথম
তোমাদের সাথে বিবাদের সূত্রপাত করেছে। তোমরা কি তাদের ভয় কর? অথচ তোমাদের ভয়ের অধিকতর
যোগ্য হলেন আল্লাহ, যদি তোমরা মুমিন হও। (সূরা তওবা-১১-১৩)।
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহঃ এ আয়াতের
দ্বারা দলিল দিয়ে বলেন- যে ব্যক্তি ইসলাম বা কুরআনের বিরুদ্ধে খারাপ মন্তব্য করে,
অথবা রাসূল সাঃ এর ব্যাপারে মন্দ কথা বলে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। (মাহাসিনুত তাওয়ীল-৫/১৪২)।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
কোনো এক অন্ধ সাহাবীর একটা সন্তানের মাতা দাসী
ছিল, সে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে গালি দিত এবং তাঁর প্রসঙ্গে অশোভনীয়
মন্তব্য করত। সাহাবী তাকে নিষেধ করতেন কিন্তু সে বিরত হত না। এক রাত্রে অন্ধ সাহাবী
(তার এরূপ দূর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে) কুড়ালি জাতীয় এক অস্ত্র দিয়ে ঐ দাসীর পেটে বসিয়ে
দেন ও তার উপর বসে যান ও তাকে হত্যা করে ফেললেন। এ সংবাদ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) এর নিকটে পৌঁছালে তিনি বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক, এ খুন বাতিল এ জন্য কোন
খেসারত দিতে হবে না। (সুনান আবূ দাঊদ ৪৩৬১, সুনান আননাসায়ী
৪০৭০, বুলগুলমারাম, হাদিস নং ১২০৪, সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৩১০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahi)।
রাসুল সাঃ এর বিরুদ্ধে কেহ অবস্থান
নিলে তার শাস্তিঃ
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
এমন মুসলমানের রক্ত হালাল নয়, যে সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। তবে তিন শ্রেণীর মানুষকে হত্যা করতে
হয়। (১) এমন মানুষ যে বিবাহ করার পর যেনা করল। তাকে রজম করতে হবে। (২) এমন ব্যক্তি
যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে অবস্থান করল, তাকে হত্যা করা হবে, না হয় শূলী
দেওয়া হবে, না হয় যমীন হতে নির্বাসন করা হবে। (৩) এমন ব্যক্তি যে কাউকে হত্যা করল,
তাকে হত্যা করা হবে’। (সুনান আবুদাঊদ ৪৩৫৩, সুনান আবূ
দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৩০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(ঞ) গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সালাত পরিত্যাগকারীকেও অসংখ্য
আলিম মুরতাদ গণ্য করেন।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহ
এবং সাহাবিদের একটি দল বলেন, অলসতাবশত বা অবহেলা করে নিয়মিত সালাত ছেড়ে দিলেও ব্যক্তি
ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। তওবা করে সালাতে ফিরে না এলে তাকে মুরতাদের হুকুমে গণ্য করার
কথা বলা হয়েছে। আধুনিক যুগে শাইখ আবদুল আযীয বিন বাজ ও শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন
এই মতটি জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। আর মুরতাদ সাব্যস্ত হলে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন, যে জমিনে আল্লাহর একটি হদ (শাস্তি) প্রতিষ্ঠা করা হয়, তা সেখানকার অধিবাসীদের
জন্য চল্লিশ দিন (বা চল্লিশ রাত) বৃষ্টি হওয়ার চেয়েও বেশি কল্যাণকর। (সুনান আন-নাসাঈ ৪৯০৫, মিশকাত ৩৫৫৮, সহীহাহ ২৩১, সুনান ইবনে
মাজাহ এবং মুসনাদ আহমাদ)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
শাস্তির অর্থে হদ্দ কয়েক প্রকার। যেমন:
(ক) মৃত্যুদন্ড
(খ) বেত্রাঘাত করা
(গ) শূলীবিদ্দ করা
(ঘ) তরবারির দ্বারা শিরচ্ছেদ করা
(ঙ) পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা
(৩) তাযীরঃ এটি হচ্ছে “সমাজের অধিকার”।
যা কিছু সমাজের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে তা এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত, যেমন- রাস্তায়
দাঁড়িয়ে চিৎকার-চেচাঁমেচি করা বা রাস্তায় আবর্জনা ফেলা ইত্যাদি। রাষ্ট্রের অভিজ্ঞ আলিম
ফকীহরা বসে বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞা এবং শাস্তি নির্ধারণ করবেন।
(৪) মুখালাফাতঃ
আরবি শব্দ মুখালাফাত অর্থ বিরোধিতা, লঙ্ঘন, ভিন্নতা বা অমিল। ইসলামী শরীআত ও পরিভাষায়
কোনো নির্দেশ, বিধান, আদর্শ কিংবা সুন্নতের বিপরীতে চলা বা ভিন্ন পথ অবলম্বন করাকে
মুখালাফাত বলা হয়।
শরীয়তের পরিভাষায়:
আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) নির্দেশ বা সুন্নতের বিপরীত কাজ করা। যেমনঃ বিদআত বা শরীঅত
বিরোধী কোনো প্রথা চালু করা।
ইসলামি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রকারভেদ
(ক) যিনা বা ব্যভিচার,
(খ) যিনা এর উপর মিথ্যা অপবাদ,
(গ) চুরি,
(ঘ) ডাকাতি,
(ঙ) মাদক গ্রহণ,
(চ) ইসলাম ধর্ম ত্যাগ,
(ছ) ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। (বাদায়ে
উস সানায়ে, ৭ম খন্ড)।
(জ) সালাত পরিত্যাগকারীকেও অসংখ্য আলিম মুরতাদ
গণ্য করেন।
(তথ্য সূত্রঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত-
অপরাধ ও শাস্তি সংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়েল)।
উপরোক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে, ইসলামি শরিয়াহ আইন
যা দিয়ে রাসুল সা. রাষ্ট্রে বিচারিক কাজ পরিচালনা করতেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনৈসলামিক
রাজনৈতিক দলের মুসলিম শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা সরাসরি বলে থাকেন, তারা ইসলামি
শরিয়াহ আইন বিশ্বাস করে না, মানে না। আর এই স্বঘোষিত মুরতাদ শ্রেণির নেতাদের আমাদের
দেশের আলেম-ওলামা আর মুসলিম ভোটারগণ ভোট দিয়ে বা সমর্থন দিয়ে বা মিটিং মিছিলে গিয়ে
বা অর্থ ও সময় দিয়ে আনুগত্যতা প্রকাশ করে আসছে। অথচ এসব নেতাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা
বলেন,
“তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের)
আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ”আর তোমরা সৎকর্ম
ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সহায়তা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা
করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তি দাতা।” (সূরা মায়িদা: ২)।
এখন বাংলাদেশে এমন কথা প্রচলন শুরু হয়ে গেছে
যে, ইসলামি শরিয়াহ আইন নিয়ে যে কেউ কথা বললেই এক শ্রেণির মুরতাদ বলে যে, এরা জঙ্গি,
এরা মৌলবাদ, এরা রাজাকার, এরা জামায়াতি। অথচ যিনি আল্লাহ তায়ালা জান্নাত জাহান্নাম
দিবেন তিনিই বলছেন,
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে
না, তারা কাফির।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৪)।
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে
না, তারা যালেম।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৫)।
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে
না, তারা ফাসিক।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৭)।
তাই সকল আলেম-ওলামা ও মুসলিম সাধারণ ভোটারদের
বলছি, আপনি নিজেকে যদি মুসলিম বলে দাবী করেন তাহলে অবশ্যই আপনাকে ইসলামি দল ব্যতিত
অন্য কোনো দলকে ভোট দেয়া যাবে না। যারা ইসলামি শরিয়াহ আইন মানে না, তারা যেমন মুসলিম
থেকে খারিজ তেমনি তাদেরকে যারা ভোট দিবে তারাও সমঅপরাধে অপরাধী হবে।
(৩) ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ,
খুনী, ধর্ষক তথা অসৎ প্রার্থীকে ভোট দিলে কিয়ামত পর্যন্ত সেই পাপের অংশ ভোটারগণ পেতে
থাকবেঃ
জেনে শুনে অন্যায়ের পক্ষ নিলে মানুষের ঈমান
ও ইনসাফ নষ্ট হয়, সমাজে জুলুম ছড়িয়ে পড়ে এবং আল্লাহর কাছে কঠিন জবাবদিহিতা ও শাস্তির
মুখোমুখি হতে হয়।
অন্যায়ের পক্ষ নিলে পরকালে কেমন শাস্তি ভোগ
করতে হবে বা কতো পাপের বোঝা বহন করতে হবে আমাদের সমাজের আলেমগণ তা জানে। তারপরও তারা
শুধুমাত্র দুনিয়াবী লোভ লালসা আর জামায়াতকে ঠেকাতে তাদের ঈমান আমল অনৈসলামিক রাজনৈতিক
নেতাদের নিকট বিক্রি করে দিয়ে এই দুনিয়ায় ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে চলছে।
ভোট আপনার একটি আমানত। আপনি যাকে ভোট দিবেন,
সিল মারার সাথে সাথে আপনি বলে দিচ্ছেন যে, ঐ লোকটি ভালো, সৎ, যোগ্য ও জনগণের কল্যাণে
কাজ করবে। অর্থাৎ ভোট দেয়ার মাধ্যমে আপনি সত্য সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তার জন্য সুপারিশ করলেন।
কিন্তু আপনি ভোট দিয়ে যাকে নির্বাচন করলেন তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার পর যদি ঘুষ, দুর্নীতি,
চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে তাহলে ঐ এমপি যতো পাপ করবে ততো
পাপের ভাগ আপনিও বসে বসে পাবেন। যেহেতু অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেমগণ জেনেশুনে অন্যায়ের
সহযোগী হয়ে আসছে তাই এদের শাস্তি আরও কয়েকগুণ বেশী হবে।
আল্লাহ তাঁয়ালা এরশাদ করেন,
“যে লোক সৎকাজের জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য
দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য), তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো
কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ
করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর
বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি অংশ পাবে তথা তার আমলনামায়
ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।” (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।
উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি শাসক হবে
যাদের কতগুলো কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কতগুলো কাজ অপছন্দ করবে। যে লোক (তাদের) অন্যায়ের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, আর যে লোক তাকে ঘৃণা করবে সেও
দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে লোক তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে
সে অন্যায়ের অংশীদার বলে গণ্য হবে। (সুনান আত তিরমীজী
২২৬৫, মিশকাতুল মাশাবিহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহিহ মুসলিম ১৮৫৪, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘
২৩৯৫)। হাদিসের মান সহিহ।
জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে
বর্ণিত। তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলামে
যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ চালু করলো সে এ চালু করার সাওয়াব তো পাবেই, তার পরের লোকেরা
যারা এ নেক কাজের উপর ’আমল করবে তাদেরও সমপরিমাণ সাওয়াব সে পাবে। অথচ এদের সাওয়াব কিছু
কমবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করলো, তার জন্য তো এ কাজের গুনাহ
আছেই। এরপর যারা এ মন্দ রীতির উপর ’আমল করবে তাদের জন্য গুনাহও তার ভাগে আসবে, অথচ
এতে ’আমলকারীদের গুনাহ কম করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২২৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১৭)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি কাউকে কোন কল্যাণের দিকে পথপ্রদর্শন
করে, সে উক্ত কার্য সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৭৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৯৩,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৪৬, ইসলামিক সেন্টার ৪৭৪৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪) অন্যায়ের সহযোগী মুসলিম ভোটার
ও আলেমগণ ইসলাম থেকে খারিজঃ
আমাদের দেশের অনৈসলামিক মুসলিম ভোটারদের দেখা
যায় তারা দুনিয়ার কিছু স্বার্থসিদ্ধির জন্য খুব জেনে শুনেই তাদের এমপি, মন্ত্রী তথা
নেতাদের সাথে সার্বক্ষণিক জড়িত থাকে যে তারা ঐসব নেতাদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ
করে। জেনেশুনে যারা অত্যাচারী নেতা বা শাসকদের শক্তি বৃদ্ধিতে তাদের সাথে চলে তারা
মুসলিম থেকে খারিজ হবে এবং কিয়ামতে হাওযে কাওসারের নিকট আসতে পারবে না। রাসূল ﷺ বলেন,
(ক)
আওস ইবনু শুরাহবীল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
বলতে শুনেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অত্যাচারীর
সাথে এ উদ্দেশ্যে চলে যে, সে তার শক্তি বৃদ্ধি করবে; আর সে এটা জানে যে, সে জুলুমকারী,
তবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫১৩৫, বায়হাক্বী’র শু‘আবুল ঈমান ৭৬৭৫, আত্ তারগীব ১৩৬২, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী
৬১৮)।
রাসূল ﷺ আরও বলেন,
(খ) কা’ব ইবনু ’উজরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ নির্বোধ লোকেদের নেতৃত্ব
থেকে আমি তোমাকে আল্লাহ তা’আলার হিফাযাতে অর্পিত করলাম। তিনি (কা’ব) বললেনঃ হে আল্লাহর
রসূল! এটা কিরূপে হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ শীঘ্রই আমার পরে
বিভিন্ন যুগে তাদের (নির্বোধ ও যালিমরূপে আমীর ও শাসক) আবির্ভূত হবে আর যে ব্যক্তি
তাদের সান্নিধ্যে থাকবে এবং তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিবে এবং তাদের অন্যায়
ও জুলুমের সহযোগিতা করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং তাদের সাথে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই।
তারা আমার হাওযে কাওসারে* আসতে পারবে না। আর যে তাদের নিকট যাবে না এবং তাদের মিথ্যাকে
সত্যায়িত করবে না এবং তাদের অন্যায়ের কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে না। তারাই হবে আমার
দলভুক্ত। আর আমিও তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করি। আর তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট
আগমন করবে।
*হাওযে কাওসার দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাত। অর্থাৎ-জান্নাতে
তাদেরকে আমার নিকট আসতে দেয়া হবে না অথবা তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট আসার অনুমতি
পাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭০০, সুনান আন নাসায়ী
৪২০৭, সুনান আততিরমিযী ৬১৪, ২২৫৯, আহমাদ ১৮১২৬, সহীহ আত্ তারগীব ২২৪২)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(৫) জেনে শুনে নেতার অন্যায়মূলক
কাজে সহযোগিতা করলে তার স্থান হবে জাহান্নামেঃ
যারা ক্ষমতায় গেলে ইসলামি শরিয়াহ আইন মোতাবেক
রাষ্ট্র শাসন করবে না এমন দলকে ভোট দেয়া বা তাদের কোনো কাজে সাহায্য সহযোগিতা করা বা
তাদেরকে ভোট দেয়া বা সমর্থন করা জায়েজ নেই। অনৈসলামিক দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীই বিভিন্ন
অন্যায় বা অসৎ কাজের সাথে জড়িত। আপনি মুসলিম হিসেবে তাদেরকে ভোট দিলে, তাদের মিটিং
মিছিলে যোগদান করলে বা তাদেরকে অর্থ, সময় ও শ্রম দিয়ে সহযোগিতা করলে আপনাকে জাহান্নামে
নিক্ষিপ্ত করা হবে।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের
(নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন
করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা
কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না (যারা পাপিষ্ঠ ও অসৎ তাদেরকে
সমর্থন করা, ভোট দিয়ে সহযোগিতা করা বা অর্থ
দিয়ে সাহায্য করা যাবে না)। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি
কঠোর”। (সুরা আল মায়েদা-২)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা জালেমদের (অত্যাচারীর)
প্রতি ঝুঁকে পড়বে না (তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না), জালেমদের (অত্যাচারীদের) সহযোগী
হবে না, তাহলে আগুন (জাহান্নামের আগুন) তোমাদেরও স্পর্শ করবে।” (সূরা হূদ: ১১৩)।
ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে (অন্যায়মূলক কাজে) সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত (সেই ব্যক্তির অন্যায়মূলক
কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত) না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে।
(সুনান ইবনু মাজাহ ২৩২০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭,
ইরওয়া ৭/৩৫০, সহীহাহ ৪৩৮, ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
তাই যারা পাপিষ্ঠ ও অসৎ নেতাদেরকে ভোট দিয়ে,
শ্রম দিয়ে বা অর্থ দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন তারা সেই নেতার সঙ্গ ত্যাগ করুন।
নইলে যতোদিন সেই নেতার সাথে থাকবেন ততোদিন আপনার উপর আল্লাহর আযাব পতিত হতেই থাকবে
এবং পরিশেষে জাহান্নামে যেতে হবে।
(৬) অনৈসলামিক দলের সহযোগী বা সমর্থক
আলেম ওলামা ভোটারদের করুন পরিনতিঃ
যেসব আলেম, ওলামা, পীর আউলিয়া, গাউস কুতুব,
মাওলানা, হুজুর, মুফতি, শায়েখ, মুহাদ্দিস, ওস্তাদ, বাংলাদেশ ওলামালীগ, জাতীয়তাবাদি
ওলামা দল ও সাধারণ মুসলিম ভোটার ইসলামি দল ব্যতীত কোনো অনৈসলামিক দলকে ভোট দিয়ে চাঁদাবাজি,
দখলবাজি, অস্ত্রবাজি, ঘুষ দুর্নীতি, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, মারামারি, ক্ষমতার
দাপট প্রদর্শনসহ সকল অন্যায়ের সহযোগী হবে তারা জাহান্নামী। এইসব আলেমগণ নিজেরা কুরআন
হাদিসের কথা বলে অন্যকে উপদেশ দেয় অথচ নিজেরা কোনো কুফরি দলকে ভোট দিয়ে বা সমর্থন করে
সেই দলের নেতা কর্মীদের অন্যায় বা অসৎ কাজ করতে সহযোগিতা করে থাকে। এইসব আলেম ওলামা
তাদের সমর্থিত দলের নেতা-কর্মীদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন না। তাদেরকে
ইসলামের পথে আসার কোনো দাওয়াত প্রদান করেন না।
রাসূল ﷺ বলেন, “কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে
সেই শাসকের, যে জালিম; এবং সেই আলেমের, যে জুলুমকে সমর্থন করেছে। (তাবরানি)।
রাসূল ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি জালিমকে সাহায্য করে, সে
নিজেও জালিম।” (সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদিস নং ৪১০১, সহীহ
বুখারী (হাদিস নং ২৪৪৪ / ২২৮২, মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস নং ৪৯০৮, মুসনাদ আহমাদ)। হাদিসের
মান সহিহ।
অত্যাচারী শাসকের সহযোগীরা কিয়ামতের
দিন হাউজে কাউসারের পানি পান থেকে বঞ্চিত থাকবেঃ
হুযাইফাহ্ ও জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা
বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: ‘‘অচিরেই এমন আমীর আসবে যারা
হবে ফাসিক ও যালিম। যারা তাদের মিথ্যাকে সত্য এবং তাদের যুলুমে সহযোগিতা করবে তারা
আমার নয় আর আমিও তাদের নই। তারা কখনোই আমার হাউজে কাউসারে অবতরণ করবে না’’। (আহমাদ ৫/৩৮৪ হাদীস ১৫২৮৪ বায্যার, হাদীস ১৬০৬, ১৬০৭, ১৬০৯;
হা’কিম ৪/৪২২ ত্বাবারানী/কবীর, হাদীস ৩০২০)।
কিয়ামতে ঐসব আলেম ভোটারদের পেটের নাড়িভুঁড়ি
ঘুরপাক খেতে থাকবে যারা নিজেরা ন্যায় অন্যায়ের কথা বলতো কিন্তু নিজেরাই অন্যায়ের পক্ষে
ভোট দিয়ে অন্যায়ের সহযোগী হতো।
উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একজন লোককে
উপস্থিত করা হবে এবং তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, সাথে সাথেই তার পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি
বের হয়ে পড়বে। সে নাড়িভুঁড়িকে কেন্দ্র করে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেভাবে আটার চাক্কিকে
কেন্দ্র করে গাধা ঘুরতে থাকে। এটা দেখে জাহান্নামবাসীরা তার পাশে জমায়েত হয়ে তাকে বলবে
: হে অমুক! তোমার ব্যাপার কি? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতে এবং অসৎ কাজে নিষেধ
করতে? লোকটি বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজের জন্য আদেশ করতাম; কিন্তু নিজে সেটা করতাম
না। আর তোমাদেরকে অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতাম; কিন্তু নিজে সেটা থেকে বিরত থাকতাম না।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৩৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৩২৬৭, ৭০৯৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৩৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৮৯,
সহীহুল জামি‘ ৮০২২, সহীহ আত্ তারগীব ১২৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৯২, আহমাদ ২১৭৮৪, শু‘আবুল
ঈমান ৭৫৬৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭০৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০২৬, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৩০৩৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আর ঐসব আলেমদের দিয়ে জাহান্নাম
উদ্বোধন করা হবে যারা দুনিয়ার খ্যাতি অর্জনের জন্য আলেম হয়েছে কিন্তু ন্যায় অন্যায়
মেনে চলতো না”। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৫, মুসলিম
১৯০৫, সুনান আততিরমীজী ২৩৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, যখন
আমাকে মে‘রাজের রাতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমি কতিপয় লোককে দেখলাম, যাদের ঠোঁট আগুনের
কাঁচি দ্বারা কেটে দেওয়া হচ্ছে। আমি বললাম, হে জিব্রীল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা
আপনার উম্মতের বক্তাগণ, যারা মানুষকে ভাল কাজের জন্য আদেশ করত এবং নিজেদেরকে ভুলে যেত
তারা কুরআন তেলাওয়াত করত। কিন্তু তারা চর্চা করত না। (তারগীব
ওয়াত তারহীব হা/২৩২৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৯১)।
অনৈসলামিক দলের মধ্যে লক্ষ লক্ষ আলেম-ওলামা,
মাওলানা, মুহাদ্দিস, ঈমাম-মুয়াজ্জিন, মুফতি, হাফেজ আছে। তাদেরকে দেখা যায়, নিজ দলের
লোকদের বিভিন্ন অন্যায় অত্যাচার (যেমন চাঁদাবজি, খুন, ধর্ষণ, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি,
অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ) এর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলেও তারা
এর বিরোধীতা করে কোনো বক্তব্য দেয় না। প্রকাশ্যে ও গোপনে তারা নিজ দলের এইসব অপকর্মকে
সাপোর্ট করে যাচ্ছে। এইসব আলেমসহ তাদের সমর্থিত অন্যান্য মুসলিম ভোটারগণ যেহেতু অন্যায়ের
প্রতিবাদ করে না সেজন্য তাদের কোনো দোয়া বা
আমল আল্লাহ তাঁয়ালা কবুল করবেন না। বরঞ্চ তাদের কারণে এই পৃথিবীতে একর পর এক আল্লাহর
গযব পতিত হতেই থাকবে।
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ!
নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে
আল্লাহ তা’আলা শীঘ্রই তোমাদের উপর তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তার নিকট দুআ
করলেও তিনি তোমাদের সেই দু’আ গ্রহণ করবেন না। (সুনান আত
তিরমীজী ২১৬৯, সহীহাহ ২৮৬৮, তারগীব ৩৩০৭, মুসনাদে আহমাদ (হাদিস নম্বর ২৩৩০১, বুখারী,
মুসলিম)। হাদিসের মান সহিহ।
হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ পবিত্র সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ,
নিম্নোক্ত দু’টো বিষয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই হবে। হয় অবশ্যই তুমি সৎকাজের আদেশ দান করবে
এবং মন্দকাজ হতে নিষেধ করবে; নতুবা অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর ’আযাব নাযিল
করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে; কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা
হবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪০, সুনান আততিরমিযী
২১৬৯, সহীহুল জামি‘ ৭০৭০, সহীহ আত্ তারগীব ২৩১৩, আহমাদ ২৩৩০১, আবূ ইয়া‘লা ৫০৩৫, শু‘আবুল
ঈমান ৭৫৫৮ হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/২৭৯, আল মুজামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩৯৭, আল মু‘জামুল
আওসাত্ব ১৩৭৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৬৯৪)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে (অন্যায়মূলক কাজে) সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত (সেই ব্যক্তির অন্যায়মূলক
কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত) না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে।
(সুনান ইবনু মাজাহ ২৩২০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭,
ইরওয়া ৭/৩৫০, সহীহাহ ৪৩৮, ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতিতে কোন
লোক পাপে লিপ্ত থাকে, আর ঐ ব্যক্তিকে পাপ থেকে ফেরাতে জাতির লোকেদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও
না ফেরায়, তাহলে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও
করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪৩, সুনান আবূ দাঊদ
৪৩৩৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৯, সহীহ আত্ তারগীব ২৩১৬, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী
২০৬৮৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি সমবেত
লোকেদের উদ্দেশে বলেন, হে জনগণ! তোমরা নিশ্চয় এ আয়াতটি পাঠ করেছ, (অর্থাৎ-) ’’হে ঈমানদারগণ!
তোমরা নিজেদের ওপর এ কথা আবশ্যিক করে নাও, যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি
সাধন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা হিদায়াতের উপর স্থির থাকবে’’। এ সম্পর্কে
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন কোন খারাপ
কাজ হতে দেখে, সেটাকে পরিবর্তন করে না, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর তাঁর
’আযাব নাযিল করবেন। (ইবনু মাজাহ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি
সহীহ বলে বর্ণনা করেছেন।)
আর আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক বর্ণনায়
আছে যে, মানুষ যখন কোন অত্যাচারীকে অত্যাচার করতে দেখেও তার হাত ধরে না ফেলে, অনতিবিলম্বেই
আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। ইমাম আবূ দাঊদ-এর অপর এক বর্ণনায় আছে যে,
যে জাতির মধ্যে পাপাচার হয়, আর সে জাতির পরিবর্তন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেটার পরিবর্তন
না করে, তাহলে অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। তাঁর অপর এক বর্ণনায়
আছে যে, যে জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয়, আর পাপে লিপ্তদের তুলনায় সাধারণ লোক সংখ্যায় বেশি
হয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪২, সুনান ইবনু মাজাহ
৪০০৫, সুনান আততিরমিযী ২১৬৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৩৩৮, সহীহুল জামি ১৯৭৪, আহমাদ ৩০, আবূ
ইয়া‘লা ১৩১, অন্য রিওয়ায়তে আবূ দাঊদ ৪৩৩৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
পাপীষ্ঠ লোকদের কারণে মুমিন ব্যক্তিরাও
শাস্তি ভোগ করেঃ
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ মহীয়ান-গরীয়ান জিবরীল (আ.)-কে আদেশ
করেন যে, অমুক শহর বা জনপদটিকে সেটার বাসিন্দাসহ উল্টিয়ে দাও। তখন জিবরীল (আ.)বললেনঃ
হে প্রভু! ঐ জনপদে তোমার অমুক বান্দা রয়েছে, যে এক মুহূর্ত তোমার নাফরমানি করেনি। রসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, তার ও তাদের সকলের ওপর
শহরটিকে উল্টিয়ে দাও। কারণ ঐ ব্যক্তির মুখমণ্ডলে পাপীদের পাপাচার দেখে আমার সন্তুষ্টির
জন্য এক মুহূর্তের জন্যও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ সে অপরকে দাওয়াত প্রদান করে না, সে
শুধু নিজেকে রক্ষা করার জন্য ইবাদত করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫১৫২, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৯৫, বায়হাক্বী)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সেদিন (কিয়ামতের দিন)
জালিম ও তার সহযোগীদের একত্রে করে বলা হবে-তোমরা সবাই জাহান্নামের দিকে চলো।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২২–২৩)।
(৭) জাহান্নামে নেতাদের সাথে মুসলিম
ভোটারগণ তর্কেবিতর্কে লিপ্ত হবেঃ
আপনি যাকে ভালবাসেন, যাকে সমর্থন করেন, যাকে
ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসিয়ে কুরআর সুন্নাহ বিরোধী আইন পাশ করাতে
এবং তা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করতে সহযোগিতা করেছেন সেইসব নেতাসহ জাহান্নামে
গিয়ে আপনাদের মাঝে যেসব কথোপকথন হবে তা নিম্নরুপঃ
অসৎ ব্যক্তিদের সাথে চলাফেরা করায় দুনিয়াতে
ছোট হোক বা বড় হোক সকল অনুসৃত ব্যক্তি এবং তার অনুসারীদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো
হবে। জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা এবং আযাবের ভয়াবহতা দেখে জাহান্নামে প্রবেশের জন্য
পরস্পরকে দোষারোপ করবে। অনুসারীরা অনুসৃত ব্যক্তির কাছে জাহান্নামের আগুনের আযাব থেকে
পরিত্রাণ চাইবে। কিন্তু তাদের সেদিন কোন কিছুই করার ক্ষমতা থাকবে না। এমতাবস্থায় তাদের
মাঝে চরম তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হবে। যা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন
এভাবে-
“এ এক বাহিনী, তোমাদের সাথে (জাহান্নামে) প্রবেশকারী।
তাদের জন্য নেই কোন অভিনন্দন। বরং তারা জাহান্নামে জ্বলবে। (তখন অনুসারীরা) বলবে, বরং
তোমরাও তো (জাহান্নামী), তোমাদের জন্যও কোন অভিনন্দন নেই। তোমরাই তো পূর্বে আমাদের
জন্য ব্যবস্থা করেছ। কত নিকৃষ্ট এ আবাসস্থল। তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! এটা যে আমাদের
সম্মুখীন করেছে, জাহান্নামে তার শাস্তি দ্বিগুণ বর্ধিত করুন”। (সুরা ছোয়াদ ৩৮/৫৯-৬১)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
“যখন তারা জাহান্নামে পরস্পরে বিতর্কে লিপ্ত
হবে, তখন দুর্বলেরা অহংকারীদেরকে বলবে, আমরা তো তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম। এখন কি তোমরা
আমাদের থেকে জাহান্নামের (আযাবের) কিছু নিবারণ করবে? অহংকারীরা বলবে, আমরা তো সবাই
জাহান্নামে আছি। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন”। (সুরা মুমিন ৪৭/৪৮)।
পৃথিবীতে যারা মূর্খ ও পথভ্রষ্ট আলেম এবং তাদের
যারা অনুসারী ছিল জাহান্নামে তারা পরস্পরে তর্ক-বিতর্ক করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হ’য়ে জিজ্ঞাসাবাদ
করবে। তারা বলবে, তোমরা তো আমাদের ডান দিক থেকে আসতে। তারা বলবে, বরং তোমরাতো বিশ্বাসী
ছিলে না এবং তোমাদের উপর আমাদের কোন কর্তৃত্বও ছিল না। বস্তুত তোমরাই ছিলে সীমালঙ্ঘনকারী
সম্প্রদায়। আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিপালকের কথা সত্য হয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই শাস্তি
আস্বাদন করতে হবে। আমরা তোমাদের বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত ছিলাম।
সুতরাং তারা সকলেই সেইদিন শাস্তিতে শরীক হবে”। (সুরা ছা-ফফাত
৩৭/২৭-৩৩)।
(৮) অনৈসলামিক দলের নেতাকে ভোট দিলে
বা সমর্থন করলে সেই মুসলিম ভোটারদের সব আমল বরবাদ হয়ে যাবেঃ
অনৈসলামিক দলের নেতা-কর্মীদের দেখা যায়, এদের
মধ্যে শিরক, কুফর ও বিদআত বিদ্যমান। এরা পীর পূজারী ও মাজার পূজারী হয়ে থাকে। এরা কুরআন
অবমাননাকারী, আল্লাহ ও রাসুল সা. কে কটূক্তিকারীদের পক্ষ নেয় এবং তাদেরকে সমর্থন করে
থাকে। এইসব নেতা-কর্মীরা নামেমাত্র মুসলমান। এরা ইহকালে ভ্রান্ত পথে চলে এবং এদেরকে
ইসলামের সঠিক পথের সন্ধান দিলেও তা শুনেতে চায় না, মানতে চায় না। এরা ইসলামি শরিয়াহ
আইন সংক্রান্ত কুরআনের আয়াত ও হাদিস মানে না। তাই এদের সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে নবি বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না কোন্ কোন্ লোক নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ
ব্যর্থ? এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যারা ইহকালের জীবনে ভ্রান্ত পথে চলে এবং মনে করে যে
তারা ঠিক পথ ধরেই চলেছে। এরা তারাই, যারা তাদের প্রতিপালক প্রভুর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে
অস্বীকার করেছে এবং তার দরবারে প্রত্যাবর্তনের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করে। এ জন্যে তাদের
সকল আমল নষ্ট হয়ে গেছে এবং কিয়ামতের দিন তাদের কোনই গুরত্ব থাকবে না। তারা যে কুফরী
করেছিলো আর আমার আয়াত ও রাসুলগণের প্রতি ঠাট্টা
বিদ্রুপ করতো তার প্রতি দানে তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে”। (সুরা কাহাফঃ ১০৩-১০৫)।
(৯) যারা কুরআনের কিছু আয়াত মানে
আর কিছু আয়াত মানে না তারা জাহান্নামীঃ
অনৈসলামিক দলের নেতা কর্মীরা ইসলামকে শুধু
নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, তাসবিহ, পায়জামা পাঞ্জাবী আর টুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে।
ইসলামে যে আরো ফরজ কাজ আছে যেমন, ইসলামের পথে আহবান করা বা দাওয়াত দেয়া প্রত্যেক মুসলিমদের
জন্য ফরজ, খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা ফরজ, ইসলামি আইন অনুসারে বিচার করা ফরজ, জিহাদ করা
ফরজ ইত্যাদি আর এসব সংক্রান্ত অসংখ্য কুরআনের আয়াত রয়েছে। যিনি নিজেকে মুসলিম দাবী
করবেন তাকে অবশ্যই কুরআনের সকল আয়াতই বিশ্বাস করতে হবে, মানতে হবে। যদি কেউ কুরআনের
কোনো কোনো আয়াত মানে আর কোনো কোনো আয়াত না মানে তাহলে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতেও তাকে
প্রকাশ্য লাঞ্চণা ভোগ করাবেন আর কিয়ামতের দিনে ভীষণ শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত করবেন
তথা জাহান্নামে ছুড়ে মারবেন। বিএনপির মহাসচিব জনাব ফখরুল সাহেব বলেছেন, তারা ইসলামি
শরিয়াহ আইন বিশ্বাস করে না, মানে না। এই কথা বলা মানে কুরআনের আয়াত না মানা। যারা তার
কথার সাথে একমত, যারা তাকে বা তার দলকে ভোট দিবে তারা সকলেই কিয়ামতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত
হবে। কারণ এইসব কর্মী বা ভোটারগণ এইসব নেতাদের ভালোবাসে, তাদেরকে সমর্থন করে, তাদের
সাথেই উঠা-বসা আর এই ভালোবাসার কারণে কিয়ামতে তাদের সাথে হাশর হবে। তথা নেতা জাহান্নামে
গেলে কর্মী বা ভোটারগণও জাহান্নামে যাবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তোমরা কি কুরআনের কোন কোন অংশ (আয়াত) মানো
আর কোন কোন অংশ মানো না? অত:পর যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্য থেকে এরুপ কাজ করবে – পার্থিব জীবনে প্রকাশ্য লাঞ্চণা ভোগ করা
আর কিয়ামতের দিনে ভীষণ শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া তার আর কী সাজা হতে পারে!
আর আল্লাহ তো তোমাদের কার্য কলাপ সম্বন্ধেবে- খবর নন”। (সুরা
আল বাকারা-৮৫)।
(১০) ইসলামি দল ব্যতীত অন্য দলকে
ভোট দিলে সে জাহান্নামীঃ
ইসলামের রাজনীতি করা বা ইসলামি দল করা প্রত্যেক
মুসলিমদের জন্য ফরজ। মুসলিম হিসেবে ইসলামি আইন, পথ, মত বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী কোনো
আইন, পথ বা মতকে কোনোক্রমেই সমর্থন বা স্বীকার করা যাবে না। যেসব রাজনৈতিক দল ইসলামি
আইন বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে তাদেরকে ভোট দেয়া যাবে
না। কারণ তারা ইসলামি দল গঠন করেনি, তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়ে
কোনো ধারা উল্লেখ নেই। ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাদের কোনো লক্ষ্য উদ্দেশ্য নেই। এরপরও
জেনেশুনে যারা ইসলামি দল ব্যতীত অন্য দলকে ভোট দিবে বা সমর্থন করবে তাদের স্থান হবে
জাহান্নামে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া তথা ইসলামি দল ছাড়া
বা ইসলামি আইন ছাড়া বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন বা আইন বা অনৈসলামিক
দল বা ভিন্ন পথ, মত অবলম্বন করতে চাইবে, তার
থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না তথা তার সেই কাজ কবুল করা হবে না বা তাকে কোনো সওয়াব
দেয়া হবে না বা তার আমলনামা শূন্য হবে। আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত তথা যারা জাহান্নামি,
সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে তথা জাহান্নামি হবে”। (সুরা
আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।
(১১) জ্ঞান গোপন রাখার কারণে এদের
মুখে আগুনের লাগাম দেয়া হবেঃ
এই বইসহ অনুরুপ আরও কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে।
বইগুলোতে যেসব কুরআন-হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে তা অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেমগণ আরও
বেশী জানেন কিন্তু সেইসব জ্ঞান তারা গোপন করে কুরআন- হাদিসকে অপব্যাখ্যা দিয়ে পাপীষ্ঠ
নেতাদের উৎসাহিত করে আসছেন। এইজন্যে এসব আলেমগণের মুখে কিয়ামতে জ্ঞান গোপন করার অপরাধে
আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে।
(ক) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে এমন কোন জিনিস
সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় যা সে জানে, অথচ গোপন রাখে (বলে না), কিয়ামতের (কিয়ামতের)
দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৩, আহমাদ ৭৮৮৩, আবূ দাঊদ ৩৬৫৮, তিরমিযী ২৬৪৯, সহীহুল জামি‘ ৬২৮৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জন করে
’আলিমদের ওপর গৌরব করার জন্য অথবা জাহিল-মূর্খদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করার জন্য অথবা
মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৫, সুনান আততিরমিযী ২৬৫৪, সহীহুল
জামি‘ ১০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ’ইলম বা জ্ঞান দ্বারা
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কেউ সে জ্ঞান পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের অভিপ্রায়ে
অর্জন করলে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৭, আহমাদ ৮২৫২, সুনান আবূ দাঊদ
৩৬৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২৫২, সহীহুত্ তারগীব ১০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কুরআনের ব্যাপারে নিজের
বুদ্ধি খাটিয়ে কোন মতামত দিয়েছে সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে তৈরি করে নেয়। অপর
এক বর্ণনায় রয়েছে (শব্দগুলো হল), যে লোক কুরআন সম্পর্কে নিশ্চিত ’ইলম ছাড়া (মনগড়া)
কোন কথা বলে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্দিষ্ট করে নেয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৩৪, সুনান তিরমিযী ২৯৫০, ২৯৫১)।
(ঙ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআনের কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদে
লিপ্ত হওয়া কুফরী। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৩৬, সুনান
আবূ দাঊদ ৪৬০৩, আহমাদ ৭৭৮৯, সহীহুত্ তারগীব ১৪৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(চ) আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতার মাধ্যমে
তাঁর দাদা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দল সম্পর্কে
শুনলেন, তারা পরস্পর কুরআন নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে, ঝগড়া করেছে। তখন তিনি বললেন,
নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা আল্লাহর কিতাবের এক
অংশকে অন্য অংশের দ্বারা বাতিল করার চেষ্টা করছিল। অথচ আল্লাহর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে
তার এক অংশ অপর অংশের পরিপূরক হিসেবে ও সত্যতা প্রমাণ করার জন্য। তাই তোমরা এর এক অংশকে
অপর অংশের দ্বারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করো না, বরং তোমরা তার যতটুকু জানো
শুধু তা-ই বলো, আর যা তোমরা জানো না তা কুরআনের ’আলিমের নিকট সোপর্দ কর। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২৩৭, আহমাদ ২৭০২, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৮৫)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(ছ)
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে ভুল ফাতাওয়া দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ- বিনা ’ইলমে (বিদ্যায়)
ফাতাওয়া দেয়া হয়েছে এর গুনাহ তার ওপর বর্তাবে যে তাকে ফাতাওয়া দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি
তার কোন ভাইকে (অপরকে) এমন কোন কাজের পরামর্শ দিয়েছে, যা কল্যাণ হবে না বলে সে জানে,
সে নিশ্চয়ই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত ২৪২, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৫৭, সহীহুল জামি‘ ৬০৬৮, দারিমী ১৫৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(জ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা ’জুব্বুল হুযন’ থেকে
আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! ’জুব্বুল হুযন’
কী? তিনি বললেন, এটা হলো জাহান্নামের মধ্যে একটি গর্ত। এ গর্ত হতে বাঁচার জন্য জাহান্নামও
নিজেই দৈনিক চারশ’ বার আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর
রসূল! এতে (এ গর্তে) কারা যাবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যারা
দেখাবার উদ্দেশে ’আমল ও কুরআন অধ্যয়ন করে থাকে।
তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ মুক্বদ্দামাহ্; ইবনু
মাজার অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাও বলেছেন,
কুরআন অধ্যয়নকারী (’আলিম)-গণের মধ্যে তারাই আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত, যারা আমীর-উমারার
সাথে বেশী বেশী সাক্ষাৎ বা মেলামেশা করে। মুহারিবী বলেনঃ উমারা বলতে বুঝানো হয়েছে অত্যাচারী
শাসক। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৫, সুনান আততিরমিযী
২৩৮৩, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২৫৬, য‘ঈফুত্ তারগীব ১৬)।
(১২) আমলহীন আলেমদের শেষ পরিনতিঃ
আমলবিহীন আলেম সম্পর্কে কুরআন-হাদীছে অনেক
বর্ণনা রয়েছে। এখানে তা থেকে কতিপয় বর্ণনা উপস্থাপন করা হলো। দেখা যাচ্ছে, অনৈসলামিক
রাজনৈতিক দলের আলেমদের মধ্যে অনেকে মুফতি, মুহাদ্দিস, হাফেজ, ঈমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন,
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা প্রিন্সিপ্যাল ইত্যাদি। আবার অনেকে সারা বছর ওয়াজ করে
বেড়ায়। তারা কুরআন ও হাদিসে অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ কিন্তু কুরআনের দিক নির্দেশনা মানা
ও সুন্নাহ ভিত্তিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তাদের কোনো ভুমিকা নেই তথা আমলের দিক
থেকে তারা শূণ্য। এজন্যে কিয়ামতে এদেরকে পাকড়াও করা হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা
হবে। আসুন কুরআন-হাদিসে এদের সম্পর্কে কি বলা হয়েছে তা আমরা জেনে নেই।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা যা
কর না তা তোমরা কেন বল? তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসমেত্মাষজনক।
(সুরা ছফ ২-৩)।
আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, যখন
আমাকে মে‘রাজের রাতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমি কতিপয় লোককে দেখলাম, যাদের ঠোঁট আগুনের
কাঁচি দ্বারা কেটে দেওয়া হচ্ছে। আমি বললাম, হে জিব্রীল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা
আপনার উম্মতের বক্তাগণ, যারা মানুষকে ভাল কাজের জন্য আদেশ করত এবং নিজেদেরকে ভুলে যেত
তারা কুরআন তেলাওয়াত করত। কিন্তু তারা চর্চা করত না। (তারগীব
ওয়াত তারহীব হা/২৩২৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৯১)।
হাদীছে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
(১) শহীদের বিচারঃ
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিকে বিচারের
জন্য পেশ করা হবে সে হবে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর নিকট নিয়ে যাওয়া হবে। অতঃপর আল্লাহ
তাকে স্বায়ী নে‘মতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। তারপর আল্লাহ তাকে
জিজ্ঞেস করবেন, এত নে‘মতের বিনিময়ে তুমি কি আমল করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির
জন্য যুদ্ধ করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ,
বরং তুমি লড়াই করেছ এজন্য যে, তোমাকে বাহাদুর বলা হবে। এমনকি তোমাকে তা বলাও হয়েছে।
অতএব তার ব্যাপারে আদেশ করা হবে। তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা
হবে।
(২) আলেমের বিচারঃ
অতঃপর ঐ ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা
হবে, যে নিজে ইলম শিক্ষা করেছে ও অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন অধ্যয়ন করেছে। আল্লাহ
তাকে তাঁর নে‘মত স্মরণ করাবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন,
এ নে‘মতের জন্য তুমি কি আমল করেছ? সে বলবে আমি ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছি
এবং তোমার সুন্তুষ্টির জন্য কুরআন অধ্যয়ন করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং
তুমি এজন্য ইলম শিক্ষা করেছ, যেন তোমাকে বিদ্বান বলা হয় এবং এজন্য কুরআন পড়েছ যাতে
তোমাকে ক্বারী বলা হয়। তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারী বলা হয়েছে। অতঃপর তার সম্পর্কে আদেশ
করা হবে। তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
(৩) দানশীল ব্যক্তির বিচারঃ
তারপর এমন ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত
করা হবে, যাকে আল্লাহ বিপুল সম্পদ দান করেছেন। আল্লাহ প্রথমে তাকে তার নে‘মতের কথা
স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করবেন এত কিছু নে‘মতের
বিনিময়ে তুমি কি আমল করেছ? সে বলবে, যে সব ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পসন্দ কর তা
হাতছাড়া করিনি। তোমার সন্তুষ্টির জন্য সবক্ষেত্রেই সম্পদ ব্যয় করেছি। আল্লাহ বলবেন,
তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এ জন্য দান করেছ যে, তোমাকে দানবীর বলা হবে। এমনকি তোমাকে
তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্পর্কে আদেশ করা হবে, তাকে উপুড় করে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে
নিক্ষেপ করা হবে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৫; বাংলা
মিশকাত ১৯৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৮১৭,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৭০, ইসলামিক সেন্টার ৪৭৭১)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আলোচ্য হাদীছে তিন শ্রেণীর মানুষ ভাল আমল করেও
জাহান্নামে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) এমন মুজাহিদ যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
জিহাদ করেনি। বরং দুনিয়াবী স্বার্থে নিজের বিরত্ব প্রমাণ করার জন্য জিহাদ করেছে এবং
দুনিয়াতে সুখ্যাতি লাভ করেছে।
(২) এমন আলেম বা ক্বারী, যিনি দুনিয়া উপার্জনের
উদ্দেশ্যে শিক্ষা অর্জন করেছে এবং সমাজে নিজের সুনাম ছড়ানোর জন্য বিভিন্ন ভঙ্গিতে জাল
হাদীছ ও বানাওয়াট কিচ্ছা-কাহিনী বলে মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করেছে। সমাজে সুখ্যাতি
লাভের আশায় বিভিন্ন ক্বায়দায় কুরআন তিলাওয়াত করেছে। এরূপ বক্তা ও ক্বারী বর্তমান সমাজে
প্রচুর দেখা যাচ্ছে। যাদের থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
(৩) এমন দানশীল, যে সমাজে সুনাম অর্জনের জন্য
দানবীর হিসাবে খ্যাতি অর্জনের জন্য দান করে। হাদীছের বক্তব্য অনুযায়ী এ তিন শ্রেণীর
মানুষ যতই কুরআন -হাদীছসম্বলিত আমল করুক জান্নাতে যাবে না।
এই তিনজনকে দিয়েই প্রথমে জাহান্নাম
উদ্বোধন করা হবেঃ
তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমার হাটুতে হাত মেরে বললেনঃ হে আবূ হুরাইরা কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’আলার সৃষ্টির
মধ্য হতে এ তিনজন দ্বারাই প্রথমে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৩৮২, সহীহ তা’লীকুর রাগীব (১/২৯-৩০),
তা’লীক আলা ইবনে খুযাইমাহ (২৪৮২)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেমদের দেখা যায়
তারা অবৈধ ইনকাম করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন তাদের ধনসম্পদ বৃদ্ধি
পাচ্ছে। তবে এরা দুনিয়াবী আলেম হওয়ার কারণে আল্লাহই তাদের এসব সম্পদ দিয়ে থাকেন। আর
দুনিয়ার সুখ শান্তি ভোগ করার কারনে তারা কিয়ামতে নিঃস্ব হয়ে হাজির হবে এবং তাদেরকে
জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে কেউ পার্থিব জীবন ও এর সৌন্দর্য কামনা
করে, আমি দুনিয়াতে তাদের কর্মের পূর্ণ ফল প্রদান করে থাকি এবং সেখানে তাদেরকে কম প্রদান
করা হবে না। তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছু নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে
তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা বিফলে যাবে"। (সূরাঃ হুদ- ১৫, ১৬)।
ওসামা ইবনু যায়েদ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ)
বলেছেন, ‘এক ব্যক্তিকে ক্বিয়ামতের দিন নিয়ে আসা হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ
করা হবে। এতে করে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। আর সে তা নিয়ে ঘুরতে থাকবে যেমনিভাবে
গাধা আটা পিষা জাঁতার সাথে ঘুরতে থাকে। জাহান্নামীরা তার নিকট একত্রিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস
করবে, আপনি কি আমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করতেন না? সে বলবে, হ্যাঁ।
আমি তোমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করতাম, কিন্তু নিজেই তা করতাম না। আর খারাপ কাজ হ’তেতোমাদেরকে
নিষেধ করতাম, কিন্তু আমি নিজেই তা করতাম’। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫১৩৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৭০৯৮, ৩২৬৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৭৩৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৮৯, সহীহুল জামি‘ ৮০২২, সহীহ আত্ তারগীব ১২৪, সিলসিলাতুস্
সহীহাহ্ ২৯২, আহমাদ ২১৭৮৪, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৬৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭০৪,
আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঐ সব বক্তা
বা আলেম জাহান্নামে যাবে, যারা বক্তব্য অনুযায়ী নিজে আমল করে না এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে
সে অনুযায়ী আমল করতে বাধ্য করে না। যারা মিথ্যা এবং চুক্তিবদ্ধ হয়ে বক্তব্য দেয়, তারাও
বড় অপরাধী।
সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভ্যাস ছিল তিনি ফজরের সালাত শেষে প্রায়ই
আমাদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কেউ আজ রাতে কোন স্বপ্ন দেখেছ
কি? রাবী বলেন, আমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখে থাকলে তাঁর নিকট বলত। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তার তা’বীর করতেন। যথারীতি একদিন সকালে জিজ্ঞেস
করলেনঃ তোমাদের কেউ (আজ রাতে) কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ না।
তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেনঃ কিন্তু আমি দেখেছি, আজ রাতে দু’ ব্যক্তি আমার নিকট এলো এবং তারা উভয়ে আমার হাত
ধরে একটি পবিত্র ভূমির দিকে (সম্ভবত তা শাম বা সিরিয়া) নিয়ে গেল। দেখলাম, এক ব্যক্তি
বসে আছে আর অপর এক ব্যক্তি লোহার সাঁড়াশি হাতে দাঁড়ানো। সে তা ঐ উপবিষ্ট ব্যক্তির গালের
ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে তা দ্বারা চিরে গর্দানের পিছন পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর তার দ্বিতীয়
গালের সাথেও অনুরূপ ব্যবহার করার মাঝে প্রথম গালটি ভালো হয়ে যায়। আবার সে পুনরায় তাই
করে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? তারা উভয়ে বলল, সামনে চলুন।
সম্মুখের দিকে চললাম। এ পর্যায়ে আমরা এমন এক
ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম, যে ঘাড়ের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে, আর অপর এক ব্যক্তি একখানা
ভারী পাথর নিয়ে তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঐ পাথরের আঘাতে শায়িত ব্যক্তির মাথা
চূর্ণবিচূর্ণ করছে। যখনই সে পাথরটি নিক্ষেপ করে (মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে) তা গড়িয়ে দূরে
চলে যায়। তখন সে লোকটি পুনরায় পাথরটি তুলে আনতে যায় সে ফিরে আসার পূর্বেই ঐ ব্যক্তির
মাথাটি পূর্বের ন্যায় ঠিক হয়ে যায় এবং পুনরায় সে তা দ্বারা তাকে আঘাত করে। আমি জিজ্ঞেস
করলাম, এটা কী? তারা উভয়ে বলল, সামনে চলুন।
আমরা সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম। সেখানে একটি
গর্তের নিকট এসে পৌঁছলাম যা তন্দুরের মতো ছিল। এটার উপরিঅংশ ছিল সংকীর্ণ এবং ভিতরের
অংশটি ছিল প্রশস্ত। তার তলদেশে আগুন জ্বলছিল। আগুনের লেলিহান শিখা যখন উপরের দিকে উঠছে,
তখন তার ভিতরে যারা রয়েছে তারাও উপরে উঠে আসছে এবং গর্ত হতে বাইরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম
হচ্ছে। আর যখন অগ্নিশিখা কিছু স্তিমিত হচ্ছে তখন তারাও পুনরায় ভিতরের দিকে চলে যাচ্ছে।
তার মধ্যে রয়েছে কিছুসংখ্যক উলঙ্গ নারী ও পুরুষ। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? তারা উভয়ে
বলল : সামনে চলুন।
আমরা সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম এবং একটি রক্তের
নহরের নিকট পৌঁছলাম। দেখলাম, তার মধ্যস্থলে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে এবং নহরের তীরে
একজন লোক দণ্ডায়মান। আর তার সম্মুখে রয়েছে প্রস্তরখন্ড। নহরের ভিতরের লোকটি যখন তা
হতে বের হওয়ার উদ্দেশে কিনারার দিকে অগ্রসর হতে চাচ্ছে, তখন তীরে দাঁড়ানো লোকটি ঐ লোকটির
মুখ লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করছে এবং সে লোকটিকে ঐ স্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে যেখানে সে
ছিল। মোটকথা, লোকটি যখনই বাইরে আসার চেষ্টা করে, তখনই তার মুখের উপর পাথর মেরে সে যেখানে
ছিল পুনরায় সেখানে ফিরিয়ে দেয়। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? সঙ্গীদ্বয় বললেনঃ সামনে
চলুন।
আমরা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে শ্যামল সুশোভিত একটি
বাগানে পৌঁছলাম। বাগানে ছিল একটি বিরাট বৃক্ষ। ঐ বৃক্ষের গোড়ায় উপবিষ্ট ছিলেন একজন
বৃদ্ধ লোক এবং বিপুল সংখ্যক বালক। ঐ বৃক্ষটির সন্নিকটে আরেক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম,
যার সম্মুখে রয়েছে আগুন, যাকে সে প্রজ্জ্বলিত করছে। এরপর আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে ঐ বৃক্ষের
উপরে আরোহণ করাল এবং সেখানে তারা আমাকে বৃক্ষরাজির মাঝখানে এমন একখানা গৃহে প্রবেশ
করাল যেমন সুন্দর ও মনোরম ঘর আমি আর কখনো দেখিনি। তার মধ্যে ছিল কতিপয় বৃদ্ধ, যুবক,
নারী ও বালক। অনন্তর তারা উভয়ে আমাকে সে ঘর হতে বের করে বৃক্ষের আরো উপরে চড়াল এবং
এমন একখানা গৃহে প্রবেশ করাল যা প্রথমটি হতে আরো সুন্দর ও উত্তম। এতেও দেখলাম, কতিপয়
বৃদ্ধ ও যুবক।
অনন্তর আমি সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আপনারা উভয়েই
তো আমাকে আজ সারা রাতে অনেক কিছু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন। এখন বলুন, আমি যা কিছু দেখেছি
তার তাৎপর্য কী? তারা উভয়ে বলল : হ্যাঁ, (তা বলছি)। ঐ যে এক ব্যক্তিকে দেখেছেন সাঁড়াশি
দ্বারা যার গাল চেরা হচ্ছিল, সে মিথ্যাবাদী, সে মিথ্যা বলত এবং তার নিকট হতে মিথ্যা
রটানো হত। এমনকি তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত। অতএব তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ আচরণ করা
হতে থাকবে, যা করতে আপনি দেখেছেন।
আর যে ব্যক্তির মস্তকে পাথর মেরে ঘায়েল করতে
দেখেছেন, সে ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা’আলা কুরআন শিক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু সে কুরআন
হতে গাফিল হয়ে রাত্রে ঘুমাত এবং দিনেও তার নির্দেশ মোতাবেক ’আমল করত না। সুতরাং তার
সাথে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ আচরণই করা হবে, যা আপনি দেখেছেন।
আর (আগুনের) তন্দুরে যাদেরকে দেখেছেন তারা
হলো যিনাকার (নারী-পুরুষ)।
ঐ ব্যক্তি যাকে (রক্তের) নহরে দেখেছেন, সে
হলো সুদখোর।
ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি যাকে একটি বৃক্ষের গোড়ায় উপবিষ্ট
দেখেছেন, তিনি হলেন : ইবরাহীম (আ.)। তাঁর চতুষ্পার্শ্বের শিশুরা হলো মানুষের সন্তান-সন্ততি।
আর যে লোকটিকে অগ্নিকুন্ড প্রজ্জ্বলিত করতে
দেখেছেন তা শহীদদের ঘর। আর আমি হলাম জিবরীল (আ.) এবং ইনি হলেন মীকাঈল (আ.)।
এবার আপনি মাথাটি উপরের দিকে তুলে দেখুন। তখন
আমি মাথাটি তুলে দেখলাম, যেন আমার মাথার উপরে মেঘের মতো কোন একটি জিনিস রয়েছে। অপর
এক রিওয়ায়াতে আছে, একের পর এক স্তবকবিশিষ্ট সাদা মেঘের মতো কোন জিনিস দেখলাম। তাঁরা
বললেনঃ তা আপনারই বাসস্থান। আমি বললামঃ আমাকে সুযোগ দিন আমি আমার ঘরে প্রবেশ করি। তাঁরা
বললেনঃ এখনো আপনার হায়াত বাকি আছে, যা আপনি এখনো পূর্ণ করেননি। আপনার যখন নির্দিষ্ট
হায়াত পূর্ণ হবে, তখন আপনি আপনার বাসস্থানে প্রবেশ করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৪৬২১, সুনান আততিরমিযী ৭০৪৮, ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১০৭৭৬, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর
৬৮৪৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ
যাদেরকে ইলম দান করেছেন, তাদেরকে রাতে বিদ্যা চর্চা করতে হবে এবং দিনে বিদ্যা অনুযায়ী
আমল করতে হবে। অর্থাৎ অপরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হবে এবং দাওয়াত অনুযায়ী নিজেকে
আমল করতে হবে। যেসব আলেম বা বক্তা ইলম অনুযায়ী আমল করে না ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের মাথাকে
পাথর দ্বারা ভেঙ্গে চৌচির করা হবে।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে এমন কোন জিনিস সম্পর্কে
জিজ্ঞেস করা হয় যা সে জানে, অথচ গোপন রাখে (বলে না), কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার মুখে
আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
২২৩, আহমাদ ৭৮৮৩, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৫৮, সুনান আততিরমিযী ২৬৪৯, সহীহুল জামি‘ ৬২৮৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ’ইলম বা জ্ঞান দ্বারা আল্লাহর
সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কেউ সে জ্ঞান পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের অভিপ্রায়ে অর্জন করলে
কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৭, আহমাদ ৮২৫২, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২৫২, সহীহুত্
তারগীব ১০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জন করে ’আলিমদের
ওপর গৌরব করার জন্য অথবা জাহিল-মূর্খদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করার জন্য অথবা মানুষকে নিজের
প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৫, সুনান আততিরমিযী ২৬৫৪, সহীহুল
জামি‘ ১০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এখানে আলেমদের জাহান্নামে যাওয়ার তিনটি কারণ
উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনঃ
(১) যারা অন্য আলেমের সাথে বিতর্ক করে জয়লাভ
করার উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করে। অর্থাৎ যারা হক্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে বিতর্ক করে না
বরং প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে বাহাছ-মুনাযারা করে তারা জাহান্নামে প্রবেশ
করবে।
(২) মূর্খদের সাথে বাক-বিতন্ডা করার জন্য যারা
ইলম অর্জন করে তারা জাহান্নামে যাবে। কেননা এ বিদ্যা অর্জনের পিছনে অশুভ উদ্দেশ্য থকে।
(৩) সে সকল বক্তা বা দাঈ, যারা সাধারণ মানুষকে
আকৃষ্ট করার জন্য বক্তব্য প্রদান করে থাকে। তারা সাধারণ মানুষের মাঝে সুখ্যাতি অর্জনের
উদ্দেশ্যে সার্বিক চেষ্টা ও পরিকল্পনা করে থাকে। তাদের ঠিকানা জাহান্নামে।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে ভুল ফাতাওয়া দেয়া
হয়েছে, অর্থাৎ- বিনা ’ইলমে (বিদ্যায়) ফাতাওয়া দেয়া হয়েছে এর গুনাহ তার ওপর বর্তাবে
যে তাকে ফাতাওয়া দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি তার কোন ভাইকে (অপরকে) এমন কোন কাজের পরামর্শ
দিয়েছে, যা কল্যাণ হবে না বলে সে জানে, সে নিশ্চয়ই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪২, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৫৭, সহীহুল
জামি‘ ৬০৬৮, দারিমী১৫৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আলোচ্য হাদীছে দু’টি বড় পাপের কথা বর্ণিত হয়েছে।
(১) যারা শারঈ বিষয়ে তদন্ত না করে দাওয়াত প্রদান করে অথবা কোন ফৎওয়া প্রদান করে ঐ দাওয়াত
বা ফৎওয়ার উপর যত লোক আমল করবে এবং এতে যত পাপ হবে সমস্ত পাপ ঐ বক্তা অথবা মুফতীর উপর
বর্তাবে। (২) কোন লোক পরামর্শ চাইলে যাতে মঙ্গল নিহিত আছে সে পরামর্শই তাকে দিতে হবে।
জেনে শুনে কোন মন্দ পরামর্শ দিলে তা বিশ্বাসঘাতকতা বা খেয়ানত বলে গণ্য হবে।
আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, ’আলিমগণ যদি ’ইলমের হিফাযাত ও মর্যাদা রক্ষা করতেন, উপযুক্ত ও যোগ্য লোকেদের
কাছে ’ইলম সোপর্দ করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা তাদের ’ইলমের কারণে নিজেদের যুগের লোকেদের
নেতৃত্ব করতে পারতেন। কিন্তু তারা তা দুনিয়াদারদের কাছে বিলিয়ে দিয়েছেন, যাতে তারা
তাদের কাছ থেকে দুনিয়ার কিছু স্বার্থ লাভ করতে পারেন। তাই তারা দুনিয়াদারদের কাছে মর্যাদাহীন
হয়ে পড়েছেন। আমি তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছিঃ
যে ব্যক্তি নিজের সমস্ত চিন্তাকে এক মাকসুদ, অর্থাৎ- শুধুমাত্র আখিরাতের চিন্তায় নিবদ্ধ
করে নিবে- আল্লাহ তার দুনিয়ার যাবতীয় মাকসুদ পূরণ করে দিবেন। অপরদিকে যাকে দুনিয়ার
নানা দিক ব্যতিব্যাস্ত করে রাখবে, তার জন্য আল্লাহর কোন পরওয়াই নেই, চাই সে কোন জঙ্গলে
(দুনিয়ায় যে কোন অবস্থায়) ধ্বংস হোক না কেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২৬৩, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২৫৭,
হাকিম ৪/৩২৭-২৯)।
আলোচ্য হাদীছে দু’টি জিনিস সুস্পষ্ট হয়েছে।
(১) যে সমস্ত আলেম তাদের সমস্ত কাজ একমাত্র পরকালের চিন্তায় করে তাদের দুনিয়ার যাবতীয়
সমস্যার সমাধানের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট। (২) যারা দুনিয়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে বক্তব্য
পেশ করে অথবা দ্বীন শিক্ষা দেয় কিংবা যে কোন ধর্মীয় কাজ করে। আল্লাহ তার প্রতি রহমত
বর্ষণ করেন না। কেননা সে দুনিয়ার যে কোন স্থানে ধ্বংস হ’তেপারে। এরাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট
মানুষ।
যিয়াদ ইবনু হুদায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, একদা ’উমার (রাঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি বলতে পারো, ইসলাম ধ্বংস করবে
কোন্ জিনিসে? আমি বললাম, আমি বলতে পারি না। তখন তিনি [’উমার (রাঃ)] বললেন, ’আলিমদের
পদস্খলন, আর আল্লাহর কিতাব কুরআন নিয়ে মুনাফিক্বদের ঝগড়া-বিবাদ বা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত
হওয়া এবং পথভ্রষ্ট শাসকদের শাসনই ইসলামকে ধ্বংস করবে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২৬৯, সুনানে দারিমী ২১৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অত্র হাদীছে ওমর (রাঃ) তিন শ্রেণীর লোককে তীব্র
নিন্দা করেন।
(১) আলেমদের পদস্খলন, ইসলাম ধ্বংস করে অর্থাৎ
আলেম যখন ইসলামকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে, ধর্মের নামে দুনিয়া উপার্জন করে, না জেনে
না শুনে ফৎওয়া প্রদান করে এবং শরী‘আত তদন্ত না করে বক্তব্য পেশ করে।
(২) আল্লাহর কিতাব নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ করে অর্থাৎ
যারা মুনাফিক্ব আলেম তারা কুরআনের অস্পষ্ট আয়াতগুলির অর্থ বের করার চেষ্টা করে এবং
কুরআনের আয়াতে পরষ্পর বিরোধ প্রমাণের চেষ্টা করে। এ ধরনের মুনাফিক্ব আলেম হচ্ছে ইসলাম
ধ্বংসের কারণ।
(৩) ভ্রষ্ট নেতার শাসন অর্থাৎ স্বৈরাচারী অত্যাচারী
নেতা। যখন কুরআন এবং ছহীহ হাদীছ বিরোধী আমল করবে এবং অধীনস্থ লোককে কুরআন এবং ছহীহ
হাদীছ বিরোধী আমল করতে বাধ্য করবে, তখন ইসলাম ধ্বংস হবে।
রাসূল (ছাঃ)-এর দাস ছাওবান (রাঃ) বলেন, নবী
কারীম (ছাঃ) বলেছেন, আমি সবচেয়ে যাদের বেশী ভয় করি, তারা হচ্ছে- (১) তারা ভ্রান্ত আলেম
সমাজ (২) আর অচিরেই আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তিপূজা করবে (৩) আর অতি শীঘ্রই আমার
উম্মতের কিছু লোক হিন্দু বা বিজাতীদের সাথে মিশে যাবে। (সুনান
ইবনু মাজাহ ৩৯৫২, সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) ৪২৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আপনি কিসের দাওয়াতি কাজ করেন, আপনি কিসের দাঈ?
রাসুল সাঃ এর দাওয়াতি কাজের শেষ লক্ষ্য ছিলো
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত করা। আপনি তাসবিহর দানা গুণতে গুণতে
পরপারে চলে গেলেন আপনি টার্গেটে পৌঁছতে পারলেন না। আপনার দাওয়াতি কাজের মধ্যে সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
নেই। অতএব এটা কোনো দাওয়াতি কাজের মধ্যে পড়ে না। যে যাই বলুক, চরমোনাই পির সাহেব সেই
উপলব্ধি থেকে তিনি ইসলামি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, শুধু কথায় চিড়ে
ভিজে না। যদিও তার দরবার শিরক, কুফর আর বিদআতের কারখানা। হয়তো এক সময় এগুলো তারা সংশোধন
করে নিবেন।
আল্লাহ ও রাসুল সাঃ এর বিধিবিধান পরিবার, সমাজ
ও রাষ্ট্রে কায়েম করতে চাইলে কয়েকটি পর্যায়ের পর তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। মুসলমানদের
মধ্যে অতি ধর্মান্ধ কিছু লোক আছে যারা জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে ইসলাম কায়েম করতে চায়।
এটা বর্তমান যুগে কোনো দিনই সম্ভব নয়। আবার অনেকে বর্তমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হারাম
বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। তারা বলেন, ইসলামে গণতন্ত্র হারাম। বর্তমান যে গণতন্ত্র চালু আছে
এটা মুসলমানদের বানানো না। যেসব রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের নিকট থেকে এটা গ্রহণ করা হয়েছে
তারা কেহই মুসলমান নয়। বেশ কিছু কুফরী আকিদাহ এই গণতন্ত্রের মধ্যে তারা চালু রেখেছে।
তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে। অর্থাৎ সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। এটাই
হচ্ছে বর্তমান গনতন্ত্রের মূল স্লোগান। এজন্যেই ইসলামে গণতন্ত্র হারাম।
এখন কথা হচ্ছে বর্তমান গণতান্ত্রিক ধারায় ভোটা
প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচিত না হলে, কোন্ মাধ্যমে ইসলাম কায়েম হবে? আল্লাহ ও রাসুল
সাঃ এর বিপক্ষে অবস্থানকারী অনেক আলেমকে এই প্রশ্ন করে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। যারা
এই হারাম গণতন্ত্রের বিপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য তাহলে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে ইসলাম কায়েম
করা। কিন্তু তাতো সম্ভব নয়। কারণ ইসলাম এই পন্থায় আল্লাহর বিধান কায়েম করে নাই। তাই
বলি গণতন্ত্র হারাম হলেও এই পদ্ধতিই অবলম্বন করে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অবলম্বন করে সংসদে
যেতে হবে এবং সকল মাবন রচিত আইন সর্বসম্মতিক্রমে
বাতিল করে আল্লাহ বিধান আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এরপরই গঠিত হবে শূরা বোর্ড।
যাই হোক শূরা বোর্ড পর্যন্ত যেতে
চাইলে যে পর্যাগুলো পেরিয়ে যেতে হবে তাহলোঃ
(ক) নিজ ও পরিবারের সদস্যদেরকে আত্মাশুদ্ধি
করা। সকল ইবাদত শিরক, কুফর ও বিদআত মুক্ত করা। নিজেকে মুজাহিদ হিসেবে গড়ে তোলা। নিজের
আখলাক সংশোধন করা, হক্ব আদায় করা, লজ্জা স্থানের হেফাজত করা, আত্ম অহমিকা দূর করা,
পর্দার বিধান নিজ পরিবার থেকে চালু করা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে সকল ইবাদত সহিহভাবে
আদায় করা, হালাল উপার্জন করা, হারাম কাজ ত্যাগ করা, নেশা থেকে দূরে থাকা, সুদমুক্ত
জীবন গড়া, ইসলামে নিষিদ্ধ কাজগুলো এড়িয়ে চলা এবং কুরআন ও হাদিস বেশী বেশী অধ্যায়ণ করা।
(খ) একটি ইসলামি সংগঠন বা ইসলামি রাজনৈতিক
দল গঠন করা। যা করা প্রত্যেক মুসলমানতের জন্যে ফরজ।
(গ)
শিরক, কুফর ও বিদআতমুক্ত সমাজ গঠন এবং আল্লাহর বিধান কায়েমেরে লক্ষ্যে ব্যাপক দাওয়াতি
কাজ করা এবং কর্মী সংগ্রহ করা।
(ঘ) ভোটের সময় ভোট প্রদান করা।
কিন্তু এই কাজগুলো করা এতো সহজ নয়। এর সাথে
জিহাদ ও শহীদের বিষয় জড়িত। মূলত জিহাদ করতে হবে এবং শহীদ হতে হবে এই ভয়ে খানকা বাবারা
দরবার থেকে বের হয় না। বিদআতি আলেমরা এ নিয়ে কথাই বলে না। কখনো তাদের সামনে এসব কথা
উঠলে আতংকে পালিয়ে যায়।
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেমদের আল্লাহর পথে দাওয়াতী কাজ
আমরা জানি যে, অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোতে
লক্ষ লক্ষ আলেম-ওলামা আছেন। এদের মধ্যে মুফতি, মুহাদ্দিস, হাফেজ, ঈমাম, মুয়াজ্জিন ও
শিক্ষকসহ অলি, সুফি-সাধক, গাউস-কুতুব আছেন যারা নিজেদেরকে ইসলামের পথে আহবানকারী বা
দাঈ হিসেবে দাবী করেন। অথচ তারা কেহই ইসলাম বাস্তবায়নে কাজ করছে না। রাসুল সা. এর উত্তরসূরী
হচ্ছেন আলেমগণ কিন্তু তারা অনৈসলামিক রাজনৈতিক
দলের পক্ষে কুফরী মতবাদ ও মানুষের তৈরী আইন বাস্তবায়নে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে,
আর এটাই তাদের দাওয়াতী কাজ। তারা কুরআনের পক্ষের দাঈ না। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে রাসূল! তোমার প্রতি তোমার প্রভুর পক্ষ
হতে যা নাযিল হয়েছে (অর্থাৎ কুরআন), তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও। যদি না দাও, তাহ’লে
তুমি তাঁর রিসালাত পৌঁছে দিলে না”। (সুরা মায়েদাহ ৫/৬৭)।
আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার পক্ষ হতে (মানুষের কাছে)
একটি বাক্য হলেও পৌঁছিয়ে দাও। বনী ইসরাঈল হতে শোনা কথা বলতে পারো, এতে কোন আপত্তি নেই।
কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করবে, সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে
প্রস্তুত করে নেয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৯৮, সহিহ
বুখারী ৩৪৬১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মহানবী (ছাঃ)-এর অবর্তমানে দাওয়াতের এই গুরুভার
তাঁর উম্মতের উপর অর্পিত হয়েছে। সেকারণে এ মহান দায়িত্বে অবহেলা করা চলবে না, বরং তা
পালন করতে হবে যথাযথভাবে।
কাসীর বিন ক্বায়স (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসুল সা. বলেছেন, ’আলিমগণ হচ্ছে নবীদের ওয়ারিস।
নবীগণ কোন দীনার বা দিরহাম (ধন-সম্পদ) মীরাস (উত্তরাধিকারী) হিসেবে রেখে যান না। তাঁরা
মীরাস হিসেবে রেখে যান শুধু ’ইলম। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২১২, আহমাদ ২১২০৮, আবূ দাঊদ ৩৬৪১,
তিরমিযী ২৬৮২, ইবনু মাজাহ্ ২২৩, সহীহুত্ তারগীব ৭০, দারিমী ৩৫৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের কেউ অন্যায়
কাজ দেখলে সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি এটা তার দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহ’লে
মুখ দ্বারা বাধা দিবে, তাও সম্ভব না হ’লে অন্তর দ্বারা (তাকে ঘৃণা করবে)। আর এটাই হ’ল
দুর্বলতম ঈমান’। (সহিহ মুসলিম ৪৯)। হাদিসের মান সহিহ।
হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ পবিত্র সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ,
নিম্নোক্ত দু’টো বিষয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই হবে। হয় অবশ্যই তুমি সৎকাজের আদেশ দান করবে
এবং মন্দকাজ হতে নিষেধ করবে; নতুবা অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর ’আযাব নাযিল
করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে; কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা
হবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪০, সুনান আততিরমিযী
২১৬৯, সহীহুল জামি‘ ৭০৭০, সহীহ আত্ তারগীব ২৩১৩, আহমাদ ২৩৩০১, আবূ ইয়া‘লা ৫০৩৫, শু‘আবুল
ঈমান ৭৫৫৮ হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/২৭৯, আল মুজামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩৯৭, আল মু‘জামুল
আওসাত্ব ১৩৭৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৬৯৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতিতে কোন
লোক পাপে লিপ্ত থাকে, আর ঐ ব্যক্তিকে পাপ থেকে ফেরাতে জাতির লোকেদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও
না ফেরায়, তাহলে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও
করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪৩, সুনান আবূ দাঊদ
৪৩৩৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৯, সহীহ আত্ তারগীব ২৩১৬, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী
২০৬৮৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আল্লাহর পথে দাওয়াত দানকারীর যেসব গুণাবলী থাকা আবশ্যক
একজন দাঈ বা আল্লাহর পথে দাওয়াত দানকারীর যেসব
গুণাবলী থাকা আবশ্যক তা অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেমদের মধ্যে নেই। তারা পাপীষ্ঠ নেতাদের
সান্নিধ্যে থেকে নিজেরাও বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। মুসলিম হিসেবে তারা ইসলাম
বাস্তবায়নে বাঁধা সৃষ্টি করছে এবং ইসলামের অপব্যাখ্যা করছে। একজন দাঈর যেসব গুণাবলী
থাকা প্রয়োজন সেসব এখানে আলোচনা করা হলো। প্রিয় পাঠক, আপনারা মিলিয়ে দেখেন এইসব আলেমদের
সাথে কোনো মিল নেই।
সত্যবাদী হওয়াঃ
আল্লাহর পথের দাঈকে অবশ্যই সত্যবাদী হ’তে হবে।
দাঈর মধ্যে যদি মিথ্যার লেশমাত্র পাওয়া যায় তাহ’লে তার দাওয়াত ফলপ্রসু হবে না। কুরআন
ও হাদীছে সত্যবাদিতার বহু ফযীলত বর্ণিত হয়েছে এবং মুমিনদেরকে সত্যবাদীদের সাথী হওয়ার
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে
ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক’। (সুরা আততওবা ৯/১১৯)।
ধৈর্যশীল হওয়াঃ
ধৈর্য মহৎ গুণ। আল্লাহর পথের দাঈদের এই মহৎ
গুণে গুণান্বিত হ’তে হবে। নচেৎ দাওয়াত দানে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহর
রাস্তায় দাওয়াত দিতে গেলে অনেক বিপদ আসতে পারে, সেক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে তা মোকাবিলা
করতে হবে।
আল্লাহ বলেন, ‘সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। যাদের
উপরে কোন বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমরা ফিরে
যাব’। (সুরা আল বাক্বারাহ ২/১৫৫-১৫৬)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ধৈর্যশীল,
তারা তাদের পুরস্কার পায় অগণিত’। (সুরা যুমার ৩৯/১০)।
কোমল স্বভাবের অধিকারী হওয়াঃ
নম্রতা-ভদ্রতা ও কোমলতা আদর্শ মানুষের গুণ।
দ্বীনের দাঈর মধ্যে অবশ্যই এ গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়। এ গুণের অধিকারী দাঈগণ দাওয়াতী কাজে
সহজে মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলতে পারে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কোমলতা অর্জনের
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেরাঊনের সাথে কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা মূসা ও
হারূণ (আঃ)-এর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা উভয়ে ফেরাউনের নিকটে যাও, নিশ্চয়ই সে সীমালংঘণ
করেছে। অতঃপর তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বল। সম্ভবতঃ সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীতি অবলম্বন
করবে’। (সুরা ত্ব-হা ৩৯/৪৩-৪৪)।
রাসূল (ছাঃ)-কে আল্লাহ বলেন,
“আর আল্লাহর রহমতে তুমি তাদের প্রতি (অর্থাৎ
স্বীয় উম্মতের প্রতি) কোমল হৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হ’তে
তাহ’লে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত। কাজেই তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও ও তাদের জন্য
ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন তুমি সংকল্পবদ্ধ হবে, তখন
আল্লাহর উপর ভরসা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার উপর ভরসাকারীদের ভালবাসেন”। (সুরা আলে ইমরান ৩/১৫৯)।
দ্বীনী কাজে একনিষ্ঠ হওয়াঃ
দ্বীনি কাজে একনিষ্ঠতা ব্যতীত কখনও দাওয়াতী
কাজে সফলতা আসবে না। আর ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ
করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি’। (সুরা যুমার ৩৯/১১)।
কথায় ও কাজে মিল থাকাঃ
আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন
বল যা নিজেরা কর না? তোমরা যা কর না তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক’। (সুরা ছফ ৬১/২-৩)।
রাসূল (ছাঃ) বলেন,
‘যখন আমাকে মে‘রাজের রাতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন
আমি কিছু লোককে দেখলাম, যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কেটে দেওয়া হচ্ছে। আমি বললাম,
হে জিব্রীল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আপনার উম্মতের বক্তাগণ, যারা মানুষকে ভাল কাজের
জন্য আদেশ করত এবং নিজেদেরকে ভুলে যেত, অথচ তারা কুরআন তেলাওয়াত করত। কিন্তু তারা চর্চা
করত না’। (মিশকাতুল মাসাবিহ মিশকাত ৫১৪৯, মুসনাদে আহমাদ
১৩৪২১, বায়হাকীর শুআবুল ঈমানেও ৪৯৬৫, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৩২৭; সিলসিলা ছহীহাহ
হা/২৯১)। হাদিসের মান সহিহ।
অন্যত্র তিনি বলেন
উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একজন লোককে
উপস্থিত করা হবে এবং তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, সাথে সাথেই তার পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি
বের হয়ে পড়বে। সে নাড়িভুঁড়িকে কেন্দ্র করে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেভাবে আটার চাক্কিকে
কেন্দ্র করে গাধা ঘুরতে থাকে। এটা দেখে জাহান্নামবাসীরা তার পাশে জমায়েত হয়ে তাকে বলবে
: হে অমুক! তোমার ব্যাপার কি? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতে এবং অসৎ কাজে নিষেধ
করতে? লোকটি বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজের জন্য আদেশ করতাম; কিন্তু নিজে সেটা করতাম
না। আর তোমাদেরকে অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতাম; কিন্তু নিজে সেটা থেকে বিরত থাকতাম না।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৩৯, সহিহ বুখারী ৭০৯৮, সহিহ
মুসলিম ৫১-(২৯৮৯), সহীহুল জামি‘ ৮০২২, সহীহ আত্ তারগীব ১২৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৯২,
আহমাদ ২১৭৮৪, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৬৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭০৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইসলামি আইন না মানা ও বাস্তবায়ন না করার শাস্তি
(১) আল্লাহতায়ালা বলেন,
“হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি।
অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে
আল্লাহ্র পথ হতে বিচ্যুত করবে। যারা আল্লাহ্র পথ হতে ভ্রষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে
কঠিন শাস্তি। কারণ তারা বিচারদিবসকে ভুলে আছে”। (সূরা
ছদ (৩৮) : ২৬)।
(২) আল্লাহতায়ালা রাসুল সাঃ এর আদেশ নিষেধ
মানতে বলেছেন,
আল্লাহতায়ালা বলেন,
“রসুল (সঃ) তোমাদের জন্য যা কিছু দেন তা গ্রহণ
কর, আর যে জিনিস থেকে বিরত রাখেন (নিষেধ) করেন তা থেকে বিরত থাক। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই
আল্লাহ কঠিন শাস্তি দাতা। (সুরা হাশর -৭)।
(৩) যারা মানবে না তাদের শাস্তিঃ
আল্লাহতায়ালা বলেন, “যারা তাঁর (রাসুল সঃ) হুকুমের বিরুদ্ধাচারন করে এ বিষয় তাদের সতর্ক থাকা একান্ত কর্তব্য যে, তারা
মহাবিপদ গ্রস্ত হবে অথবা যন্ত্রনা দায়ক আযাব তাদেরকে পাকড়াও করবে”। (সুরা নূর-৬৩)।
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, “সঠিক পথ প্রদর্শনের
পরও যারা বিশ্বাসীদের ব্যতীত অন্য কারও অনুকরন করে এবং মতানৈক্য ও বিরোধিতা করছে আল্লাহর রাসুল নবি করিম (সঃ) কে তবু তাদেরকে তিনি তার পছন্দ মতো বিপথে চলতে
দেবেন এবং জাহান্নামের অগ্নিতে জ্বালাবেন”। (সুরা আন নিসা
৪, আয়াত ১১৫)।
(৪) যারা কুরআনের অর্ধেক হুকুম মানেঃ
আল্লাহতায়ালা বলেন,
“তোমরা কি কোরআনের কোন কোন অংশ (আয়াত) মানো
আর কোন কোন অংশ মানো না? অত:পর যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্য থেকে এরুপ কাজ করবে – পার্থিব জীবনে প্রকাশ্য লাঞ্চণা ভোগ করা
আর কিয়ামতের দিনে ভীষণ শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া তার আর কী সাজা হতে পারে!
আর আল্লাহ তো তোমাদের কার্য কলাপ সম্বন্ধেবে- খবর নন। (সুরা
আল বাকারা-৮৫)।
(৫) ইসলামি আইন ব্যতীত অন্য আইন গ্রহন করলেঃ
আল্লাহতায়ালা বলেন,
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অবলম্বন
করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না। আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত, সে
তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।
রাসুল সাঃ বলেন,
(৬)
আবদুল্লাহ্ ইব্নু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেছেনঃ আমি হাউজে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেই হাজির থাকবো। তোমাদের থেকে কিছু লোককে
আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তাদের পান করাতে উদ্যত হবো, তখন তাদেরকে আমার
নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। আমি বলবো, হে রব! এরা তো আমার সাথী। তখন তিনি বলবেন, আপনার
পর তারা নতুন (নতুন নতুন ধর্মীয় নিয়ম, যা আপনি করতে বলেননি) কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না। (সহিহ বুখারী-হাদিস
নং-৭০৪৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৬০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(৭) আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন,
আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম, এমন সময় নু’মান
ইব্নু আবূ আয়াস আমার নিকট হতে এ হাদীসটি শুনে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সাহ্ল থেকে হাদীসটি
এরূপ শুনেছেন। আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আবূ সা’ঈদ
খুদ্রী (রাঃ) - কে এ হাদীসে অতিরিক্ত বলতে শুনেছি যে, নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) তখন বলবেনঃ এরা তো আমারই অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয় জানেন না যে,
আপনার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কি পরিবর্তন করেছে (নতুন নতুন ধর্মীয় নিয়ম, যা আপনি করতে
বলেন নি) । এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে, তারা (বিদআতী পির-অলি ও
আলেম) দূর হোক, দূর হোক। (সহিহ বুখারী-হাদিস নং-৭০৫০,
আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(৮) নবি করিম সা: ইরশাদ করেছেন: হযরত হারিসুল
আশয়ারী (রঃ) হতে বর্ণিতঃ
হারিস আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ
করছি। যথা- ১. সর্বদা মুসলিম জামা’আতের সাথে থাকো, ২. আমীরের (শাসকদের) আদেশ-নিষেধ
মান্য করো, ৩. আমীরের (শাসকদের) আনুগত্য করো, ৪. হিজরত করো, ৫. আল্লাহর পথে জিহাদ করো।
আর যে ব্যক্তি মুসলিম জামা’আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যায়, সে যেন তার গর্দান
থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলল, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। আর যে ব্যক্তি জাহিলী
যুগের রসম-রিওয়াজের দিকে আহবান করে, সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে সওম পালন
করে, সালাত আদায় করে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৯৪, সুনান আততিরমিযী ২৮৬৩, আহমাদ ১৭১৭০, সহীহ আল জামি ১৭২৪, সহীহ
আত্ তারগীব ৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৯)
আবূ হুরায়রা(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেছেনঃ আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করে। তারা বললেনঃ
কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেনঃ যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর
যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে। (সহিহ বুখারী,
হাদিস নং-৭২৮০, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৭১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৮৩)। হাদিসের মান সহিহ।
(১০) জারীর বিন আব্দুল্লাহ(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বলেন, “যে সম্প্রদায় যখন বিভিন্ন পাপাচারে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি থাকে,
যার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি তারা তাদেরকে বাধা না দেয় (এবং ঐ পাপাচরণ
বন্ধ না করে), তাহলে (তাদের জীবদ্দশাতেই) মহান আল্লাহ তাদেরকে ব্যাপকভাবে তাঁর কোন
শাস্তি ভোগ করান।” (আহমাদ ৪/৩৬৪, সুনান আবূ দাউদ ৪৩৩৯,
সুনান ইবনে মাজাহ ৪০০৯, ইবনে হিব্বান, সহীহ আবূ দাউদ ৩৬৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(১১)
আবূ হুরাইরাহ(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বলেন, “যে ব্যক্তি (কাউকে) সৎপথের দিকে আহবান করবে, সে তার প্রতি আমলকারীদের সমান নেকী
পাবে। এটা তাদের নেকীসমূহ থেকে কিছুই কম করবে না। আর যে ব্যক্তি (কাউকে) ভ্রষ্টতার
দিকে আহবান করবে, তার উপর তার সমস্ত অনুসারীদের গোনাহ চাপবে। এটা তাদের গোনাহ থেকে
কিছুই কম করবে না।” (সহিহ মুসলিম ৬৯৮০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ হাদিস।
(১২)
আবূ যায়দ উসামাহইবনে যায়দ ইবনে হারেষাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
কে বলতে শুনেছি, “কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ
করা হবে। সেখানে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারিপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে,
যেমন গাধা তার চাকির চারিপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামীরা তার কাছে একত্রিত হয়ে তাকে
বলবে, ‘ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না (আমাদেরকে) সৎ কাজের আদেশ, আর অসৎ কাজে
বাধা দান করতে?’ সে বলবে, ‘অবশ্যই। আমি (তোমাদেরকে) সৎকাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি
তা নিজে করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দান করতাম; অথচ আমি নিজেই তা করতাম!” (সহিহ বুখারী ৩২৬৭, সহিহ মুসলিম ৭৬৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(১৩)
আনাস (রাঃ) থেকেবর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
“আমি মি’রাজের রাতে এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছি যারা আগুনের কাঁচি দ্বারা
নিজেদের ঠোঁট কাটছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে জিবরীল! ওরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘ওরা
আপনার উম্মতের বক্তাদল (বিদআতী পির-অলি ও আলেম); যারা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে
সৎকাজের নির্দেশ দিত, অথচ ওরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন করত, তবে কি ওরা বুঝত না।” (আহমাদ ১২২১১, ১২৮৫৬ প্রভৃতি, ইবনে হিব্বান ৫৩, ত্বাবারানীর
আওসাত্ব ২৮৩২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭৩, আবূ য়্যা’লা ৩৯৯২, সহীহ তারগীব ১২৫)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
(১৪)
আবূ হুরাইরাহ(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বলেছেন, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ আছে, সেই সত্তার কসম! এই উম্মতের যে কেউ---ইয়াহুদী
হোক বা খ্রিস্টান আমার কথা শুনবে, অতঃপর যা দিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তার প্রতি ঈমান
আনবে না, সেই জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সহিহ
মুসলিম ৪০৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(১৫)
আবূ উমামা (রাঃ)থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বলেছেন, “আমার উম্মতের দুই শ্রেণির লোক আমার সুপারিশ লাভ করতে পারবে না; (বিবেকহীন)
অত্যাচারী রাষ্ট্রনেতা এবং প্রত্যেক সত্যত্যাগী অতিরঞ্জনকারী।” (ত্বাবারানী ৮০০৫, সহীহুল জামে’ ৩৭৯৮ নং)। হাদিসের মানঃ সহিহ
হাদিস।
(১৬)
আবূ হুরাইরা(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মারা গেল অথচ সে জিহাদ করেনি এবং অন্তরে জিহাদ সম্পর্কে
কোন চিন্তা-ভাবনাও করেনি, সে মুনাফিক্বীর একটি শাখায় মৃত্যুবরণ করল।” (সহিহ মুসলিম ৫০৪০, সুনান আবূ দাঊদ ২৫০৪ নং)। হাদিসের মানঃ সহিহ
হাদিস।
আল্লাহ বলেন,
(১৭) যারা ইসলামি আইন বাদ দিয়ে অন্য আইন তথা
মানব রচিত আইন মানবে তারা শিরকের মধ্যে গণ্যঃ
অন্য কাউকে যদি আইন প্রদানের মালিক মনে করা
হয় তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেই রব মানা হয়; যা প্রকাশ্য বড় শির্ক। আর এ জন্যই আল্লাহ
তা‘আলা যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আইন মানবে তাদের সম্পর্কে বলেছেন:
“তারা কি জাহেলিয়াতের আইন চায়? দৃঢ়বিশ্বাসীগণের
জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুম-বিধান দাতা আর কে হতে পারে?” (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫০)।
এখানে জাহেলিয়্যাতের আইন বলতে আল্লাহ কর্তৃক
প্রণীত আইন ছাড়া যাবতীয় আইনকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রণীত আইনের
বাইরে যত প্রকার মানব রচিত আইন রয়েছে, তার সবই জাহেলী আইন, যেমন ইংরেজদের রেখে যাওয়া
আইন, রোমান আইন ইত্যাদি।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেনঃ "আল্লাহই হলেন আইনদাতা, আর তাঁর নিকট থেকেই আইন নিতে হবে"। (আবু দাউদ হাদীস নং(৪৯৫৫), নাসায়ী, (৮/২২৬), বায়হাকী (১০/১৪৫)
বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত)।
(১৮)
ইসলামী আইন বাস্তবায়ন না করা কুফুরী, যা ঈমান নষ্ট করে দেয়ঃ
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন,
“আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য
সম্পাদন করে না, তারা কাফির। (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত:
৪৪)।
তিনি আরও বলেন,
“আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য
সম্পাদন করে না, তারা যালিম।” (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত:
৪৫০)।
আরও বলেন,
“আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য
সম্পাদন করে না, তারা ফাসেক।” (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত:
৪৭)।
মূলত আল্লাহর আইন অনুসারে না চলার
কয়েকটি পর্যায় হতে পারেঃ
(ক) আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে বিচার-ফয়সালা
পরিচালনা জায়েয মনে করা।
(খ) আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কোনো আইন দ্বারা
শাসন কার্য পরিচালনা উত্তম মনে করা।
(গ) আল্লাহর আইন ও অন্য কোনো আইন শাসনকার্য
ও বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের মনে করা।
(ঘ) আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য
কোনো আইন প্রতিষ্ঠা করা।
উপরোক্ত যে কোনো একটি কেউ বিশ্বাস করলে সে
সর্বসম্মতভাবে কাফির হয়ে যাবে। (এর জন্য দেখুন: শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আল-শাইখ
প্রণিত গ্রন্থ ‘তাহকীমুল কাওয়ানীন’।)
অতএব পির-অলি, বড় পির, রাসুল সাঃ এর আওলাদ,
মুফতি, হাফেজ, মুহাদ্দিস, এ নেতা ও নেতা, বড় মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল ইত্যাদি ইত্যাদি
হয়ে পরকালে ১০০% কোনো মুক্তি নেই, যদি না আপনি ইসলামি আইন বিষয়ক কুরআন ও হাদিস না মানেন,
না প্রচার করেন, না বাস্তবায়নের কোনো পদক্ষেপ নেন।
আল্লাহতায়ালা বলেন,
“হে নবি বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না কোন কোন লোক নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ?
এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যারা ইহকালের জীবনে ভ্রান্ত পথে চলে এবং মনে করে যে তারা ঠিক
পথ ধরেই চলেছে। এরা তারাই, যারা তাদের প্রতিপালক প্রভুর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকার
করেছে এবং তার দরবারে প্রত্যাবর্তনের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করে। এ জন্যে তাদের সকল আমল
নষ্ট হয়ে গেছে এবং কিয়ামতের দিন তাদের কোনই গুরত্ব থাকবে না। তারা যে কুফরী করেছিলো
আর আমার আয়াত ও রাসুলগণের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ
করতো তার প্রতি দানে তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।” (সুরা
কাহাফঃ ১০৩-১০৫)।
আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক শতাব্দীতে ইসলামের একজন সংস্কারক পাঠান
(ক) আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
হতে অবগত হয়েছি যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা এ
উম্মাতের (কল্যাণের) জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর শেষে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন যিনি তাদের
দীনকে সংস্কার করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪৭,
সুনান আবূ দাঊদ ৪২৯১, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ৫৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) ইবরাহীম ইবনু ’আবদুর রহমান আল ’উযরী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক আগত জামা’আতের মধ্যে নেক, তাক্বওয়াসম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য মানুষ (কিতাব ও সুন্নাহর) এ জ্ঞান গ্রহণ করবেন। আর তিনিই এ জ্ঞানের মাধ্যমে (কুরআন-সুন্নাহ) সীমালঙ্ঘনকারীদের রদবদল, বাতিলপন্থীদের মিথ্যা অপবাদ এবং জাহিল অজ্ঞদের ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে বিদূরিত করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪৮, বায়হাক্বী ১০/২০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
বাংলাদেশে অনৈসলামিক রাজনৈতিক দল সমর্থিত যতো
আলেম-ওলামা, পীর, অলি, গাউস, কুতুব, দরবেশ, সুফি-সাধক, হাফেজ, মুহাদ্দিস, ঈমাম, মুয়াজ্জিন
ও বক্তা আছেন, এরা কেহই শেষ যামানার ইসলামের সংস্কারক হিসেবে গণ্য হবেন না। কারণ এরা
সকলেই কুফরী মতবাদে বিশ্বাসী, এরা শিরক লালন-পালন করে থাকে, এরা আল্লাহর আইন বাস্তবায়নে
কোনো কাজ করে না উল্টো এরা বিরোধিতা করে থাকে, ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা কায়েমে তাদের কোনো
ভূমিকা নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলাম বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।
(সমাপ্ত)
রিলেটেড আরও বিষয় জানতে এদের উপর ক্লিক করুন,
(ক)
কুরআনের নির্দেশনা আমল ও পরিনতি।
(খ)
অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের মুসলিম ভোটারদের করুণ পরিনতি।
(গ) যিনা/ব্যভিচার ও ধর্ষণ (ইসলামি আইন বনাম মানবরচিত
আইন)।
(ঘ) মুসলিম হিসেবে আপনি কোন্ দলকে ভোট দিবেন?
(ঙ) সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ।
(চ) ইসলামে নিষিদ্ধ কাজের সাথে অধিকাংশ মুসলমানজড়িত।
(ছ) অধিকাংশ মুসলমান যেসব গুণাহের সাথে জড়িত।
(জ) মুসলিম শাসকদের মুনাফিকীকরণ ও তাদের রাজত্ব।
(ঝ) নবি (সাঃ) এর উম্মত জাহান্নামে যাবে কেনো?(প্রথম অংশ)
কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে
PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।
Author and compiler:
Md. Izabul Alam-M.A., C.In. Ed. (Islamic Studies-Rangpur
Carmichael University College, Rangpur), prominent Islamic thinker, researcher,
writer and Blogger.
(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)
(2) GENERAL DIRECTOR- PURE MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER
(PMMRC),
(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS Coaching (BBC)
(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING INSTITUTE (PTI)
(5) GENERAL DIRECTOR AND CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION
SERVICES (PIS)
(6) EDITOR-BDC CRIME NEWS24
(7) GENERAL SECRETARY- BPEWS
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক
বইয়ের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য
করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন।
এজন্যে আপনি বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।
(ক) আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত,
মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে
এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।
(খ) তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর
কি হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ
মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।
(গ)
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ
সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে
না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু
গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৬৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে
কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই
তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮, রিয়াদুস
সলেহিন, হাদিস নং ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ আল বাজালী (রাঃ)
হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলামে যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ চালু করলো সে এ চালু করার
সাওয়াব তো পাবেই, তার পরের লোকেরা যারা এ নেক কাজের উপর ’আমল করবে তাদেরও সমপরিমাণ
সাওয়াব সে পাবে। অথচ এদের সাওয়াব কিছু কমবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির
প্রচলন করলো, তার জন্য তো এ কাজের গুনাহ আছেই। এরপর যারা এ মন্দ রীতির উপর ’আমল করবে
তাদের জন্য গুনাহও তার ভাগে আসবে, অথচ এতে ’আমলকারীদের গুনাহ কম করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২২৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ) আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, যে ব্যক্তি কাউকে কোন কল্যাণের দিকে পথপ্রদর্শন করে, সে উক্ত কার্য সম্পাদনকারীর
সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৯,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৭৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৪৬,
ইসলামিক সেন্টার ৪৭৪৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
Please Share On
