Saturday, March 21, 2026

কুরআনের নির্দেশনা, আমল ও পরিনতি।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

কুরআনের নির্দেশনা, আমল ও পরিনতি

কুরআন হলো মহান আল্লাহর পবিত্র বাণী এবং সর্বশেষ আসমানি কিতাব, যা মানুষের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে । 'কুরআন' শব্দের আভিধানিক অর্থই হলো 'পঠিতব্য' বা 'যা বারবার পাঠ করা হয়'। এটি শুধুমাত্র পড়ার বই নয়, বরং এটি জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন এবং একমাত্র সংরক্ষিত গ্রন্থ।  

আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ কুরআনের হাফেজসহ লক্ষ লক্ষ আলেম আছেন যারা কুরআন হাদিসের উপর অধিক অভিজ্ঞ। এছাড়াও যারা নিরক্ষর বাংলা জানেন না তারাও আরবী পড়তে পারেন। দেখা যায় এদের মধ্যে অনেকেই কুরআনের অর্থ বাংলায় বুঝে পড়েন না আবার যারা অর্থ জানেন তারা কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন না। বিশেষ করে যারা অনৈসলামিক মুসলিম রাজনীতিবিদ, যারা পির পূজারী বা মাজার পূজারী, বামপন্থী মুসলিম, কবি সাহিত্যিক, অভিনয় শিল্পিসহ অনুরুপ মুসলিমগণ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ক কুরআনে যেসব নির্দেশনা আছে সেগুলো তারা মেনে চলেন না। যেমন, চুরি, ডাকাতি, রাষ্ট্রে বিশৃংখলা সৃষ্টিকরা, যিনা বা ধর্ষণ, খুন, ইসলাম অবমাননা তথা ইসলামি আইন, পর্দা, জিহাদ ইত্যাদি সংক্রান্ত কুরআনের নির্দেশনা। এসব নির্দেশনা অনৈসলামিক মুসলিম শাসক বা রাজনীতিবিদ বা নেতাগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলেও মেনে চলে না।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলমান কুরআনের নির্দেশনা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন না করে তারা কুরআনকে ঝাড়-ফুঁক (রুকইয়াহ) ও তাবিজ বানিয়ে গলায় ঝুলে নিয়ে বেড়ানোর বস্তু বানিয়ে ফেলেছে। অথচ কুরআন নাযিলের যে উদ্দেশ্য তা আমরা মুসলিম হিসেবে ভুলে গেয়েছি।

কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনা, আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে হিদায়াত বা সঠিক পথ নির্দেশনা প্রদান করা এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, যা শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ, এবং আগের কিতাবসমূহের সত্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দ্বীনকে তাঁর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাতের মাধ্যমে পূর্ণ করেছেন। তার উম্মতের সকলের উপর এ দু’টি মেনে চলা আবশ্যক করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা’। (সুরা হাশর ৫৯/৭)।

মূলত আল্লাহ তায়ালা রাসুল সা.কে প্রেরণ করেছেন শিরক ও কুফর উচ্ছেদ করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান বা আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্যই। আর আমাদেরকেও সেই পথেই চলতে হবে।

কুরআন নাযিলের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো নিচে দেওয়া হলো

হেদায়েত বা পথনির্দেশনাঃ মানবজাতির জন্য সৎ ও সত্যের পথ নির্দেশনা দেওয়া।

তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শির্ক বিনাশঃ একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা এবং অংশীদারিত্ব (শির্ক) থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা।

পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানঃ মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সমস্যার সমাধান দেওয়া।

গবেষণা ও শিক্ষা গ্রহণঃ মানুষ যেন এর অর্থ বোঝে, চিন্তা করে এবং উপদেশ গ্রহণ করে আমল করে।

রহমত ও শিফাঃ মুমিনদের জন্য এটি রহমত এবং আত্মিক ও শারীরিক ব্যাধির আরোগ্য (শিফা) হিসেবে কাজ করে।

পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নঃ আগের আসমানী কিতাবগুলোর সত্যতাকে সমর্থন ও সংরক্ষণ করা।

পরকালের স্মরণঃ মানুষের কাছে কিয়ামত ও পরকালের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

সারসংক্ষেপে, কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য হলো, এটি পড়ে, বুঝে ও আমল করে মানুষ যেন দুনিয়াতে শান্তি এবং আখেরাতে মুক্তি লাভ করতে পারে।

কুরআন কি? কুরআন কেনো মানতে হবে?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“তোমরা সকলইে এখান হতে নেমে পড়। অতঃপর তোমাদের কাছে আমার পক্ষ হতে জীবন বিধান (কুরআন) যেতে থাকবে। পরন্তু যারা আমার জীবন বিধান (কুরআন) অনুসারে চলবে, তাঁদরে ভয় ও চিন্তার কোনো কারণ থাকবে না। (অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তিতে তাঁরা আবার অনন্ত সুখের আধার এ বেহেশতেই ফিরে আসবে)। আর যারা তা অস্বীকার করে আমার নিদর্শনসমুহকে মিথ্যে সাব্যস্ত করবে, তাঁরা হবে জাহান্নামের অধিবাসী এবং সেখানে তাঁরা অনন্তকাল থাকবে”। (সূরা বাকারা, আয়াত নং ৩৮-৩৯)।

আল্লাহ বলেন,

“নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি পূর্ণ কুরআন পরম সত্যতার সাথে এ জন্যেই নাযিল করেছি যে, তুমি সে অনুযায়ী মানুষের উপর আল্লাহর প্রদর্শিত পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং বিচার ফায়সালা করবে। (কুরআনকে যারা এ কাজে ব্যবহার করতে চায় নি তারা এ মহান আমানতের খিয়ানত করে) তুমি এ খিয়ানতকারীদের সাহায্য পক্ষ সমর্থনকারী হয়ো না”। (সুরা আন নিসা: ১০৫)।

আল্লাহ বলেন,

“আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মানুষের মধ্যে ফায়সালা করো, তাদের মনের খেয়াল খুশী ও ধারনা বাসনা অনুসরন করো না”। (সুরা আল মায়েদা: ৪৯)।

আল্লাহ বলেন,

“তুমি কি জান না যে, আকাশ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর”। (সুরা আল বাকারাঃ ১০৭)।

আল্লাহ বলেন,

“হুকুম বা বিধান একমাত্র আল্লাহরই”। (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০)।

আল্লাহ বলেন,

“আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি সহকারে পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব (বিধি-বিধান) ও মানদণ্ড পাঠিয়েছি যাতে লোকেরা ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর আমি লৌহ অবতীর্ণ করেছি যাতে প্রচণ্ড শক্তি ও মানবমণ্ডলীর জন্য বিবিধ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্ জেনে নেবেন, কে গায়েবকে আশ্রয় করে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ মহাশক্তিধর ও মহা পরাক্রান্ত।” (সূরা হাদীদ: ২৫)।

মানবরচিত আইন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করা বা কোনো অপরাধের শাস্তির রায় দেয়া মুসলিম বিচারকদের জন্যে সম্পূর্ন নিষেধ। যারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইনে বিচারের রায় দেয় তারা মুসলমান হয়েও কাফের, জালেম ও ফাসেক। এরা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ বলেন,

(ক) “আর আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার-ফয়সালা ও শাসনকার্য পরিচালনা করেনি,তারা কাফের।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৪)।

(খ) “আর আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করে নি তারা জালেম।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৫)।

(গ) “আর আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করে নি তারা ফাসেক (পাপাচারী)।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৭)।

(ঘ) “(হে নবী!) অতএব,আল্লাহ্ তায়ালা যা নাযিল করেছেন,তার ভিত্তিতে আপনি তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করুন এবং আপনার নিকট যে সত্যের আগমন ঘটেছে,তার পরিবর্তে তাদের প্রবৃত্তির (দাবীর) অনুসরণ করবেন না।” (সূরা মায়েদাহ্: ৪৮)।

(ঙ) “তারা কি জাহেলীয়াতের (মূর্খতাজাত) বিচার-ফয়সালা পেতে চায়? প্রত্যয়ের অধিকারী লোকদের জন্য বিচার-ফয়সালা প্রদানের প্রশ্নে আল্লাহর চেয়ে কে অধিকতর উত্তম হতে পারে?” (সূরা মায়েদাহ্: ৫০)।

(চ) “হে রাসূল! তাদের বলে দিন:) আর তোমরা এ বিষয়ে (আল্লাহর অভিভাবকত্ব সম্বন্ধে) যে মতভেদই করো না কেনো, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছেই সোপর্দ। তিনিই আল্লাহ্-আমার প্রতিপালক; আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তাঁরই অভিমুখী হই।” (সূরা শুরা: ১০)।

(ছ) “হে ঈমানদারগণ! ন্যায়কে আশ্রয় করে আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসাবে দণ্ডায়মান হয়ে যাও এমনকি যদি তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও ঘনিষ্ঠ জনদের বিরুদ্ধেও হয়; সে ব্যক্তি ধনীই হোক বা গরীব হোক তাদের উভয়ের (বিরোধে লিপ্ত পক্ষদ্বয়ের) জন্য আল্লাহ্ই অধিকতর ঘনিষ্ঠ। অতএব,ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি বজায় রাখার ব্যাপারে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর তোমরা যদি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল বা পাশ কাটিয়ে যাও,তা হলে (জেনে রাখ) তোমরা যা কিছু করছ অবশ্যই আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে অবহিত।” (সূরা নিসা: ১৩৫)।

(জ) “(হে নবী!) অবশ্যই আমি সত্য সহকারে আপনার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আল্লাহ্ আপনাকে যা প্রদর্শন করেছেন তার সাহায্যে লোকদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করেন। আর আপনি খেয়ানতকারীদের (অন্যায়কারীদের) সপক্ষে বিতর্ককারী হবেন না।” (সূরা নিসা: ১০৫)।

(ঝ) “হে দাউদ! নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে ধরণির বুকে (আমার) প্রতিনিধি বানিয়েছি, অতএব, সত্যতা সহকারে লোকদের মাঝে বিচার-ফয়সালা কর।” (সূরা সাদ: ২৬)।

(ঞ) নবি (সাঃ) বলেন, আল্লাহর কুরআন- আল্লাহর দেয়া বিধানই বাঁচবার একমাত্র উপায়। তাতে অতীতের জাতিগুলোর ইতিহাস আছে, ভবিষ্যতের  মানব বংশের অবস্থা ও ঘটনাবলী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে এবং বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে তোমাদের পারস্পরিক বিষয় সম্পর্কীয় রাষ্ট্রীয় আইন কানুন ও তাতে রয়েছে। বস্তুতঃ উহা এক চূড়ান্ত বিধান, উহা কোন বাজে জিনিস নহে। (সুনান আততিরমিজি)।

(ট) রাসুল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি এই বিধান অনুসারে জীবন যাপন করবে, সে উহার প্রতিফল লাভ করবে। যে উহার অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তার শাসন সুবিচার পূর্ণ হবে এবং যে উহাকে দৃঢ় রুপে আকড়িয়ে ধরবে সে সঠিক এবং সত্যিকার কল্যাণের পথে পরিচালিত হতে পারবে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহই হলেন বিধান-দাতা, আর তাঁর নিকট থেকেই বিধান নিতে হবে”। (সুনান আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪৯৫৫; সুনান আননাসাঈ, (৮/২২৬); বায়হাকি (১০/১৪৫)। হাদিসের মান সহিহ।

জাতীর ভাগ্য পরিবর্তনে কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর মানুষের জন্য রয়েছে তাঁর সামনে ও পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী; তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।

নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা (স্বয়ং) নিজেদের অবস্থা (রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ইলেকশন বা সিলেকশন এর মাধ্যমে) নিজেরা পরিবর্তন করে।

আর কোনো জাতির জন্য যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছে করেন তবে তা রদ হওয়ার নয় এবং তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই”। (সুরা রাদ ১১)।

বর্তমানে আধুনিক গণতান্ত্রিক যুগে ভোট প্রদানের মাধ্যমে একটি জাতি বা এক দল শাসকগোষ্ঠী নিজেদের শাসনব্যবস্থার ধরণ পরিবর্তন করে নিতে পারে। কিন্তু সেই শাসনব্যবস্থা যদি শোষনে পরিনত হয় বা স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রে পরিনত হয়ে অপহরন, গুম, খুন, মামলা-হামলা, নির্যাতনসহ অন্যায়-অত্যাচার করতে থাকে তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দমন করতে আরেকটি শাসকদল তাদের উপর চাপিয়ে দেন বা বন্ধুত্ব বানিয়ে দেন।

যারা তাদেরকে তাদের কর্মের কারণে পথভ্রষ্টতার দিকে চালিত করবে। আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুমা, ইবন যায়েদ, মালেক ইবনে দীনার রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমূখ মুফাসসিরীন থেকে এ অর্থের দিক দিয়ে আয়াতের তাফসীর এরূপ বর্ণিত আছে যে,

আল্লাহ তা'আলা একজন যালিমকে অপর যালিমের উপর শাসক হিসেবে চাপিয়ে দেন এবং এভাবে এক কে অপরের হাতে শাস্তি দেন। তাদের অপরাধের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর এমন কাউকে বসাবেন, এমন কাউকে সাথে জুড়ে দেবেন যারা তাদেরকে হক পথে চলা থেকে দূরে রাখবে, হক পথের প্রতি ঘৃণা ছড়াবে। খারাপ কাজের প্রতি উৎসাহ দেবে।

এভাবেই মানুষের মধ্যে যখন ফাসাদ ও যুলমের আধিক্য হয়, আর আল্লাহর ফরয আদায়ে মানুষের মধ্যে গাফিলতি সৃষ্টি হয় তখনই আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের উপর তাদের গোনাহের শাস্তিস্বরূপ এমন কাউকে বসিয়ে দেন যারা তাদেরকে কঠোর শাস্তি প্রদান করবে। (বাগভী; ইবন কাসীর; সা’দী)।

এতদবিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘‘আর এভাবেই আমরা যালিমদের কতককে কতকের বন্ধু বানিয়ে দেই, তারা যা অর্জন করত তার কারণে”। (সুরা আল আন আম ১২৯)।

(এখানে একটি বাস্তবতা যে, শেখ হাসিনা ও তার দলীয় লোকজন এবং অনুগত আইন শৃংখলা বাহিনী বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ জনগণের উপর যে পরিমাণ অন্যায় অত্যাচার করেছে যার মাত্রা আল্লাহ তায়ালাও সহ্য করতে না পেরে মজলুমের দোয়া কবুল করে নেন এবং শেখ হাসিনাসহ তার দলীয় নেতা-কর্মী এবং অনুগত বাহিনীকে দমন করতে পঙ্গপালের মতো লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতা তাদের পিছনে জুড়িয়ে দেন যারা কয়েকদিনের আন্দোলনেই ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে তার দলবলসহ বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, গুম, খুন, অর্থপাচার, আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি করে ছাত্র-জনতা হত্যাসহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে কয়েক হাজার মামলা দায়ের হয়। এপর্যন্ত কয়েকটি মামলায় অনেককে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে এবং আওয়ামীলীগসহ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করা হয়।

বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি ২১২টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। এখানেও একটা লক্ষণীয় বিষয় যে, নির্বাচণের পরের দিনই পঞ্চগড় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আওয়ামীলীগ অফিসের তালা খুলে দেন। এরপর বিএনপির জাতীয় নেতা ও মাননীয় এমপি জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার কথাও ব্যক্ত করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে জনাব তারেক রহমানও শেখ হাসিনা পুত্র জয়ের রাজনীতির কথা নিয়ে কথা বলেন।

তাদের এসব কথা বার্তা ও কর্মকান্ডে এটাই কি প্রমাণিত হচ্ছে না যে, পলাতক ফ্যাসিস্ট ও ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের সাথে তাদের একটা গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে। আল্লাহ তায়ালা তো অগ্রিম সবকিছু জানেন, বিএনপি সরকার আওয়ামীলগের চেয়েও হয়তো আরও বেশী ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে তাই তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করতে আওয়ামীলীগের সাথে গভীর সখ্যতা গঠন করে দিচ্ছে যাতে আওয়ামীলীগ দিয়েই বিএনপি ধ্বংস হয়।)

শাসকগোষ্ঠী ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পর অন্যায় অত্যাচার বা জুলুমের মাত্রা চরম আকারে বাড়তে থাকলে আল্লাহ যেমন অন্য একটি দলকে জুড়িয়ে দিয়ে বা চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করেন ঠিক এরপরই আল্লাহ তায়ালা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেন। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

“বলুন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান”। (সুরা আলে ইমরান ২৬)।

বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। দেশের অধিকাংশ জনগন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে একটি শাসকগোষ্ঠীকে ভোট দিয়েছে। অধিকাংশ জনগন যা চাইবে আল্লাহ তাদেরকে সেটাই দিবেন। তবে শাসকগোষ্ঠী যদি জনকল্যাণমুখী না হয় তাহলে আল্লাহ তাদের নিকট থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে তাদেরকে দমন করতে পারবে এমন একটি জাতিকে শক্তিশালী করে তাদের পিছনে লেলিয়ে দিবেন।

এর বাস্তবতা আমরা ৫ আগস্ট ২০২৪ এ শেখ হাসিনার ভারতে পলায়ন ও আওয়ামীলীগ নামক দলটি ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে দেখছি। এখনো শত শত নেতা বিভিন্ন দেশে পলাতক আছে।

এখন নতুন শাসকগোষ্ঠী যদি ভালো কাজ করে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার সাথে থাকবেন আর যদি জুলুম ও অবিচার করতে থাকে, তাহলে আল্লাহর সাহায্য তার ওপর থেকে সরে যাবে এবং শয়তান তার সহচর হবে।

হাদিসঃ

আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শাসক যে পর্যন্ত না জুলুম ও অবিচার করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা তার সাথে থাকেন। কিন্তু যখন সে জুলুম ও অবিচার করতে থাকে, তখন আল্লাহর সাহায্য তার ওপর থেকে সরে যায় এবং শায়ত্বন তার সহচর হয়।

আর ইবনু মাজাহ্-এর অপর বর্ণনাতে আছে, যখন সে জুলুম ও অবিচার করে তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে তার নাফসের প্রতি অর্পণ করেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭৪১, সুনান আততিরমিযী ১৩৩০, সুনান ইবনু মাজাহ ২৩১২, সহীহ আল জামি‘ ১২৫৩, সহীহ আত্ তারগীব ২১৯৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

রাসুল সাঃ আরও বলেন,

সা’ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক মুসলিম ও এক ইয়াহূদীর মধ্যে পরস্পর বিবাদ নিয়ে ’উমার (রাঃ)-এর নিকট আসলো। এমতাবস্থায় ’উমার (রাঃ) তা সত্যায়িত করে ইয়াহূদীর পক্ষে রায় দিয়ে দিলেন। তখন ইয়াহূদী ’উমার (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললঃ আল্লাহর কসম! আপনি হক বিচার করেছেন। অতঃপর ’উমার তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করে বললেনঃ তুমি কিভাবে জানলে (হক বিচার হয়েছে)? উত্তরে ইয়াহূদী বললঃ আল্লাহর কসম! আমরা তাওরাত কিতাবে পেয়েছি, যে শাসক ন্যায়বিচার করে তার ডানপাশে একজন মালাক (ফেরেশতা) থাকেন এবং বামপাশে একজন মালাক থাকেন। তারা তার কাজটিকে সহজসাধ্য করে দেন এবং ন্যায় ও সঠিক কাজ করার মধ্যে সাহায্য করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ন্যায়ের সাথে থাকেন। কিন্তু যখন তিনি ন্যায় ও হক পন্থা পরিহার করেন, তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতারা) উপরে চলে যান এবং তার সঙ্গ পরিত্যাগ করেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭৪২, মালিক ১৪৬১, সহীহ আত্ তারগীব ২১৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi।

দেখা যায়, শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর তাদের দেয়া পূর্বের প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে নেতা কর্মীরা চাঁদাবাজী, দখলবাজী, অস্ত্রবাজী, ঘুষ, দুর্নীতি, অসৎ পথে যাওয়া, নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দলীয় কোন্দল,, আদৰ্শহীনতা, উগ্রমেজাজ দেখানো, নেতার প্রতি অনানুগত্যশীলতা, চরম বেয়াদবী, অভদ্রতা, মব সৃষ্টি করা, অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা, ধর্ষণ করা, নির্যাতন করা, নারী পুরুষ অবাধে মেলামেশঅ করা, নারীর দেহ ভোগ করা, নারী ব্যবসা করা, নারী পাচার করা, শ্লীলতাহানি করা, নারী হেনস্থা করা, ইভটিজিং করা, টেন্ডারবাজী করা, ভূমিদস্যুতা করা, ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন করা, নেশা করা, মদের ব্যবসা করা, নিয়োগ বাণিজ্য করা, বিদেশে অর্থ পাচার করা, অবৈধ উপায়ে টাকা উপার্জন করা, কোনো কাজের কমিশন নেয়া, মিথ্যে ওয়াদা করা, কথায় কথায় মিথ্যে কথা বলা, নির্বাচনকালীন বক ধার্মিক সাজা, আমানতের খেয়ানত করা, ঋণখেলাপী হওয়া, ব্যাংক লুট করা, লোক দেখানো ইবাদত করা, ইসলামের বিরোধীতা করা, ইসলাম অবমাননাকরা, আলেমদের অপমান করা, কাফির নাস্তিকদের অনুসরণ করা বা পক্ষাবলম্বন করা, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া বা পুনর্বাসন করা, ধোঁকাবাজী করা, মুনাফিকী করা, বিরোধী দলীয় নেতা কর্মীদের অপহরন, গুম, খুন, অন্যায়-অত্যাচার করাসহ সকল অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তখন আল্লাহ তায়ালা এদেরকে কিছুদিন অবকাশ দিয়ে থাকেন। এরপর পাকড়াও করবেন। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ও রাসুল সাঃ বলেন,

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা অত্যাচারীকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তাকে এমনভাবে পাকড়াও করেন যে, সে আর ছুটে যেতে পারে না। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আয়াত পাঠ করলেন- অর্থাৎ- এরূপ তোমার প্রভুর পাকড়াও যে, যখন তিনি অত্যাচারী গ্রামবাসীদের পাকড়াও করেন।  (সূরাহ হূদ ১১/১০২)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১২৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৬৮৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৭৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৮৩, সুনান আততিরমিযী ৩১১০, ‘নাসায়ী’র কুবরা ১১২৪৫, সুনান ইবনু মাজাহ ২৪০১৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৩৫১২, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৭৩২২, শু‘আবুল ঈমান ৭৪৬৭, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১১৮৪১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৩২৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৩২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“অতঃপর তারা যখন সে উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি যখন তাদের প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, আমি অকস্মাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। ফলে তারা সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেল। এভাবে যারা জুলুম করেছিল, তাদের মূলোচ্ছেদ করা হলো”। (সুরা আনআম: ৪৪-৪৫)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আমি কত জনপদকেই ধ্বংস করেছি, যখন তারা জুলুমে রত ছিল। এসব জনপদ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কত কূপ হয়েছে পরিত্যক্ত এবং কত সুদৃঢ প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে”। (সুরা হজ: ৪৫)।

আল্লাহ ছাড় দেন, ছেড়ে দেন না। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

“আমি কত জনপদকেই তো অবকাশ দিয়েছিলাম, এরা ছিল জালিম। অবশেষে আমি তাদের পাকড়াও করেছি”। (সুরা হজ: ৪৮)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

আবূ শাম্মাখ আল আযদী (রহঃ) তার এক চাচাতো ভাই হতে বর্ণনা করেন। যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ছিলেন। একদিন তিনি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে মানুষের কোনো কাজের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর সে মুসলিম, মাযলূম অথবা দুস্থ লোকেদের জন্য তার প্রবেশদ্বার বন্ধ করে রাখেন, আল্লাহ তা’আলাও তার প্রয়োজন বন্ধ করে দেবেন যখন সে চরম অভাবে নিপতিত হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৯, ৩৭২৮, শু‘আবুল ঈমান ৬৯৯৯, আহমাদ ৩/৪৪১, সহীহ আবূ দাউদ ২৬১৪, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৩৩২, ১৩৩৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

আবূ বকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুলুম এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার মত মারাত্মক আর কোন গুনাহ নাই, যার শাস্তি আল্লাহ ত্বরিতে দুনিয়াতে দেন এবং আখেরাতের জন্যও জমা রাখেন। (সুনান ইবনু মাজাহ ৪২১১, সুনান আততিরমিযী ২৫১১, সুনান আবূ দাউদ ৪৯০২, সহীহাহ ৯১৭, আত-তালীকুর রাগীব ৩/২২৮, সুনান ইব্নু মাজাহ্ ৪২৮৬; ইব্নু হিববান ৪৫৫, ৪৫৬ বায্যার, হাদীস ৩৬৯৩; আহমাদ ২০৩৯০, ২০৩৯৬, ২০৪১৪, ১৯৮৬১, ১৯৮৮৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

যালিমরা কখনো সফল হয় না। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “জালিমরা কখনো সফলকাম হয় না”। (সুরা: আনআম, আয়াত: ৫৭)।

আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:

“আমি যালিমদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি। যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানি চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানি। যা তাদের মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দিবে। এটা কতই না নিকৃষ্ট পানীয় এবং সে জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়”। (সুরা কাহ্ফ : ২৯)।

আল্লাহ্ তা‘আলা আরো বলেন: “অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোথায় তাদের গন্তব্যস্থল!’’ (সুরা শু‘আরা’: ২২৭)।

আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

“কাজেই মানুষকে সতর্ক কর সেদিনের ব্যাপারে যেদিন তাদের উপর ‘আযাব আসবে। যারা জুলুম করেছিল তারা তখন বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে অল্পদিনের জন্য সময় দাও, আমরা তোমার আহবানে সাড়া দিব আর রাসূলদের কথা মেনে চলব।’ (তখন তাদেরকে বলা হবে) তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলনি যে, তোমাদের কক্ষনো পতন ঘটবে না? অথচ তোমরা সেই লোকগুলোর বাসভূমিতে বসবাস করছিলে যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল আর তোমাদেরকে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়া হয়েছিল আমি তাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিলাম। আর আমি বহু উদাহরণ টেনে তোমাদেরকে বুঝিয়েও দিয়েছিলাম। তারা যে চক্রান্ত করেছিল তা ছিল সত্যিই ভয়ানক, কিন্তু তাদের চক্রান্ত আল্লাহ্র দৃষ্টির ভিতরেই ছিল, যদিও তাদের চক্রান্তগুলো এমন ছিল যে, তাতে পর্বতও টলে যেত। (অবস্থা যতই প্রতিকূল হোক না কেন) তুমি কক্ষনো মনে কর না যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে দেয়া ওয়া‘দা খেলাপ করবেন, আল্লাহ মহা প্রতাপশালী, প্রবল প্রতিশোধ গ্রহণকার “। (সুরা ইবরাহীমঃ ৪২-৪৭)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তিকে যদি আল্লাহ তা’আলা প্রজাপালনের দায়িত্ব প্রদান করেন। আর সে তাদের জন্য কল্যাণকর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা না পারে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৮৭, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৫৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪২, দারিমী ২৮৩৮, সহীহাহ্ ২৬৩১, সহীহ আল জামি ৫৭৪০,আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬৫)।  হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অন্য হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

হাসান বাসরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মা’কিল ইবনু ইয়াসারের কাছে তার সেবা-শুশ্রূষার জন্য আসলাম। এ সময় উবাইদুল্লাহ্ প্রবেশ করল। তখন মালিক (রাঃ) বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করে শোনাব, যা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করল এবং তার মৃত্যু হল এ হালতে যে, সে ছিল খিয়ানাতকারী, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৫১, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত ৩৬৮৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৫৯-২৬১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪২, আহমাদ ২০১৩১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৫২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুলুম বা অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারের কারণ হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১২৩, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন ২৪৪৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৭০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৭৮, সুনান আততিরমিযী ২০৩০, সহীহ আত্ তারগীব ২২১৬, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ৩৭৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৮৫৮ মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩৫২৪৪, আহমাদ ৫৮৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫১৭৮, শু‘আবুল ঈমান ১০৮৩২, দারিমী ২৫১৬, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ১৬৪৫৭, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১১৮৩৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এখন কথা হলো, ভোটে নির্বাচিত হয়ে শাসকগোষ্ঠী যদি ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে তাহলে সেই দায়ভার ভোটারদের নিতে হবে। কারণ ভোট দেয়ার আগেই আপনি তার সম্পর্কে জেনেশুনে ভোট দেয়ার মাধ্যমে সুপারিশ করেছেন এবং সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ভালো লোক, সৎ লোক, যোগ্য লোক ইত্যাদি।

আবার এটাও আপনি জানেন যে,, যাকে ভোট দিয়েছেন তিনি সৎ লোক নয়, অতীতে তার অনেক ব্যাড রিপোর্ট আছে। তাকে ভোট দেয়া মানে, তার সকল অপকর্ম ও পাপ কাজকে সমর্থন করা বা মেনে নেয়া। তাই অসৎ বা পাপিষ্ঠ নেতা বা প্রার্থীকে ভোট দিলে সেই ভোটারকে জাহান্নামে যেতে হবে। যখন প্রমানিত হবে যে, আপনার ভোটে নির্বাচিত সেই নেতা বিভিন্ন অপরাধ বা অপকর্মের সাথে জড়িত তখন আপনার সেই সুপারিশ বা সাক্ষ্য মিথ্যে সাক্ষ্যতে পরিনত হবে এবং আপনাকে পাকড়াও করা হবে।

এখন আপনার ভোটে নির্বাচিত নেতা যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন এর বিনিময়ে একটা সওয়াবের অংশ পেতে থাকবেন আর মন্দ কাজ করলে ততোদিন পাপের একটি অংশ পেতে থাকবেন তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে যদি সেই পাপ কাজ কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকে। এই সওয়াব বা পাপের অংশ মৃত্যুর পরও কবরে পেতে থাকবেন।

আল্লাহ তাঁয়ালা এরশাদ করেন,

‘যে লোক সৎকাজের জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য), তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি অংশ পাবে তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।

রাসুল সাঃ বলেন,

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি শাসক হবে যাদের কতগুলো কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কতগুলো কাজ অপছন্দ করবে। যে লোক (তাদের) অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, আর যে লোক তাকে ঘৃণা করবে সেও দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে লোক তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে সে অন্যায়ের অংশীদার বলে গণ্য হবে। (সুনান আত তিরমীজী ২২৬৫, মিশকাতুল মাশাবিহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহিহ মুসলিম ১৮৫৪, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘ ২৩৯৫)। হাদিসের মান সহিহ।

কবীরা গুনাহের অন্যতম হলো মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ)-কে কবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৬৫৩, ৫৯৭৭, ৬৮৭১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৬১-১৬২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৮, আহমাদ ১২৩৩৮, আধুনিক প্রকাশনী ২৪৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৪৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi)।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।’ (সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত ৮)।

পাপিষ্ঠ নেতাদের আনুগত্য করা ইসলামে নিষেধ

আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।

পাপিষ্ঠ নেতাকে ভোট দিয়ে সহযোগিতা করা ইসলামে নিষেধ

আল্লাহ বলেন,

”আর তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সহায়তা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তি দাতা।” (সূরা মায়িদা: ২)।

অন্যায়ের সহযোগী মুসলিমরা ইসলাম থেকে খারিজ

রাসূলু সাঃ বলেছেনঃ

(ক)  আওস ইবনু শুরাহবীল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অত্যাচারীর সাথে এ উদ্দেশে চলে যে, সে তার শক্তি বৃদ্ধি করবে; আর সে এটা জানে যে, সে জুলুমকারী, তবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৩৫, বায়হাক্বী’র শু‘আবুল ঈমান ৭৬৭৫, আত্ তারগীব ১৩৬২, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৬১৮)।

রাসূলু সাঃ আরো বলেছেনঃ   

(খ) কা’ব ইবনু ’উজরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ নির্বোধ লোকেদের নেতৃত্ব থেকে আমি তোমাকে আল্লাহ তা’আলার হিফাযাতে অর্পিত করলাম। তিনি (কা’ব) বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! এটা কিরূপে হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ শীঘ্রই আমার পরে বিভিন্ন যুগে তাদের (নির্বোধ ও যালিমরূপে আমীর ও শাসক) আবির্ভূত হবে আর যে ব্যক্তি তাদের সান্নিধ্যে থাকবে এবং তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিবে এবং তাদের অন্যায় ও জুলুমের সহযোগিতা করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং তাদের সাথে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আমার হাওযে কাওসারে* আসতে পারবে না। আর যে তাদের নিকট যাবে না এবং তাদের মিথ্যাকে সত্যায়িত করবে না এবং তাদের অন্যায়ের কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে না। তারাই হবে আমার দলভুক্ত। আর আমিও তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করি। আর তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট আগমন করবে।

*হাওযে কাওসার দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাত। অর্থাৎ-জান্নাতে তাদেরকে আমার নিকট আসতে দেয়া হবে না অথবা তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট আসার অনুমতি পাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭০০, সুনান আন নাসায়ী ৪২০৭, সুনান আততিরমিযী ৬১৪, ২২৫৯, আহমাদ ১৮১২৬, সহীহ আত্ তারগীব ২২৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অন্যায়ের সহযোগী হলে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে

আমরা এবিষয়ে অবগত আছি যে, অধিকাংশ দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার পর চাঁদাবাজী, ঘুষ, দুর্নীতি, কমিশন নেয়া, নিয়োগ বাণিজ্য করা তথা মদ বা নেশা, নারীপ্রীতি ও অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে থাকে। আপনি জেনেশুনে ভোট দেয়ার মাধ্যমে যেহেতু এই অন্যায়মূলক কাজ করতে সহযোগিতা করেছেন তাই অন্যায়ের সহযোগী হিসেবে আপনাকে জাহান্নামে যেতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা জালেমদের (অত্যাচারীর) প্রতি ঝুঁকে পড়বে না (তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না), জালেমদের (অত্যাচারীদের) সহযোগী হবে না, তাহলে আগুন (জাহান্নামের আগুন) তোমাদেরও স্পর্শ করবে।’ (সূরা হূদ: ১১৩)।

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে (অন্যায়মূলক কাজে) সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত (সেই ব্যক্তির অন্যায়মূলক কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত) না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৩২০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭, ইরওয়া ৭/৩৫০, সহীহাহ ৪৩৮, ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

তাই যারা পাপিষ্ঠ ও অসৎ নেতাদেরকে ভোট দিয়ে, শ্রম দিয়ে বা অর্থ দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন তারা সেই নেতার সঙ্গ ত্যাগ করুন। নইলে যতোদিন সেই নেতার সাথে থাকবেন ততোদিন আপনার উপর আযাব পতিত হতেই থাকবে। কোনো কাজে রহমত বা বরকত আসবে না। সবসময় হায়হুতাশা লেগেই থাকবে।

শাসকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ফরজ

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি শাসক হবে যাদের কতগুলো কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কতগুলো কাজ অপছন্দ করবে। যে লোক (তাদের) অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, আর যে লোক তাকে ঘৃণা করবে সেও দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে লোক তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে সে অন্যায়ের অংশীদার বলে গণ্য হবে। প্রশ্ন করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করব না? তিনি বললেন, না, তারা যে পর্যন্ত নামায আদায় করে। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)২২৬৫,সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫৪, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘ ২৩৯৫, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৭১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৭, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে তার কোনো দোয়া বা আমল আল্লাহ তাঁয়ালা কবুল করবেন না

হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ তা’আলা শীঘ্রই তোমাদের উপর তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তার নিকট দুআ করলেও তিনি তোমাদের সেই দু’আ গ্রহণ করবেন না। (সুনান আত তিরমীজী ২১৬৯, সহীহাহ ২৮৬৮, বুখারী, মুসলিম)। হাদিসের মান সহিহ।

সেদিন পাপিষ্ঠদের পা ও মাথার ঝুঁটি ধরে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। বাধা দেওয়ার মত কেউ থাকবে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,         

‘সেদিন অপরাধীদের চেনা যাবে তাদের (মলিন) চেহারা দেখে। তাদেরকে সেখানে পাকড়াও করা হবে তাদের পা ও মাথার ঝুঁটি ধরে’। (সুরা আর-রহমান ৫৫/৪১)।

এখন অধিকাংশ ভোটারগণ দুনিয়ার স্বার্থের জন্য একটি দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসালো আর তারা যদি কুরআনের নির্দেশ মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা না করে তাহলে এই পুরো জাতির উপর আল্লাহর গযব নাযিল হবে। তখন পাপী নিষ্পাপ সকলেই সেই আযাব ভোগ করবে। বিপদ আপদ বা বালা মুসিবত আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের উপর নেমে আসে। কখনো আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্যে ইচ্ছেকৃতভাবে বিপদে ফেলেন আবার মানুষের কৃত কর্মের জন্যে বিভিন্ন সময় বিপদ আপদ দিয়ে থাকেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে”। (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ৪১)।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“সুতরাং তাদের কৃতকর্মের মন্দ ফল তাদের উপর আপতিত হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা যুলুম করে তাদের উপরও শীঘ্রই আপতিত হবে তারা যা অর্জন করেছে তার মন্দ ফল এবং তারা অপারগ করতে পারবে না”। (সুরা আয যুমার ৫১)।

এখন আমরা জেনে নেই কোন্ কোন্ পাপের কারণে পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালা আযাব প্রেরণ করে থাকেন।

(১) পাঁচটি পাপ কাজের জন্য আল্লাহর গযব নাযিল হয়ঃ

আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেনঃ হে মুহাজিরগণ! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেনো তোমরা তার সম্মুখীন না হও।

(ক)  প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়লেঃ

যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায় নি (যেমন: করোনা)।

(খ) ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করলেঃ

যখন কোন জাতি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করে তখন তাদের উপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, কঠিন বিপদ-মুসীবত এবং

(গ)  যাকাত আদায় না করলেঃ

যাকাত আদায় করে না তখন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেয়া হয়। যদি ভু-পৃষ্ঠে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকতো তাহলে আর কখনো বৃষ্টিপাত হতো না।

(ঘ)  আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করলেঃ

যখন কোন জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের উপর তাদের বিজাতীয় দুশমনকে ক্ষমতাসীন করেন এবং সে তাদের সহায়-সম্পদ সবকিছু কেড়ে নেয়।

(ঙ) আল্লাহর কিতাব মোতাবেক বিচার ফয়সালা না করলেঃ

যখন তোমাদের শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব মোতাবেক মীমাংসা করে না (তথা ইসলামি আইন মোতাবেক বিচারিক কার্যক্রম ও রাষ্ট্র শাসন করে না) এবং আল্লাহর নাযীলকৃত বিধানকে গ্রহণ করে না (তথা কুরআনকে সংবিধান হিসেবে মেনে নেয় না), তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেন।  (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৪০১৯, সহীহাহ ১০৬)। হাদিসের মানঃ হাসান হাদিস।

(২) অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে তার উপর গজব নাজিল হয়ঃ

(ক)  কায়েস ইবনে আবূ হাযেম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) দাঁড়ালেন, আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন, অতঃপর বলেন, হে লোকসকল! তোমরা তো এই আয়াত তিলাওয়াত করো (অনুবাদঃ) ’’হে ঈমানদারগণ! আত্মসংশোধন করাই তোমাদের কর্তব্য, তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না’’ (সূরা মাইদাঃ ১০৫)।

আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ লোকেরা মন্দ কাজ হতে দেখে তা পরিবর্তনের চেষ্টা না করলে অচিরেই আল্লাহ তাদের উপর ব্যাপকভাবে শাস্তি পাঠান। আবূ উসামা (রাঃ) -এর অপর সনদে এভাবে উক্ত হয়েছেঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি। (সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৫, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪২, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২১৬৮, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৩৩৮, তাখরীজুল মুখতার ৫৪-৫৮, সহীহাহ ১৫৬৪, সহীহুল জামি ১৯৭৪, আহমাদ ৩০, আবূ ইয়া‘লা ১৩১, অন্য রিওয়ায়তে আবূ দাঊদ ৪৩৩৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(খ) জারীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে পাপাচার হতে থাকে এবং তাদের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষমতা থাকা সত্বেও তাদের পাপাচারীদের বাধা দেয় না, তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর ব্যাপকভাবে শাস্তি পাঠান। (সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৯, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৩৩৯, আহমাদ ১৮৭৩১, ১৮৭৬৮, আত-তালীকুর রাগীব ৩/১৭০)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(গ) আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি সমবেত লোকেদের উদ্দেশে বলেন, হে জনগণ! তোমরা নিশ্চয় এ আয়াতটি পাঠ করেছ, (অর্থাৎ-) ’’হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ওপর এ কথা আবশ্যিক করে নাও, যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা হিদায়াতের উপর স্থির থাকবে’’। এ সম্পর্কে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন কোন খারাপ কাজ হতে দেখে, সেটাকে পরিবর্তন করে না, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর তাঁর ’আযাব নাযিল করবেন।

আর আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক বর্ণনায় আছে যে, মানুষ যখন কোন অত্যাচারীকে অত্যাচার করতে দেখেও তার হাত ধরে না ফেলে, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন।

ইমাম আবূ দাঊদ-এর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, যে জাতির মধ্যে পাপাচার হয়, আর সে জাতির পরিবর্তন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেটার পরিবর্তন না করে, তাহলে অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। তাঁর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, যে জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয়, আর পাপে লিপ্তদের তুলনায় সাধারণ লোক সংখ্যায় বেশি হয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৪২, সুনান ইবনু মাজাহ ৪০০৫, সুনান আততিরমিযী ২১৬৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৩৩৮, সহীহুল জামি‘ ১৯৭৪, আহমাদ ৩০, আবূ ইয়া‘লা ১৩১, অন্য রিওয়ায়তে আবূ দাঊদ ৪৩৩৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(৩) সমকামিতার জন্য আল্লাহর গযব নাযিল হয়ঃ

পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে সমকামিতা বা ট্রান্সজেন্ডারকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। কিছু রাষ্ট্রে যেমন অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, মাল্টা, বলিভিয়া, তাইওয়ান এ  ট্রান্সজেন্ডার এর মধ্যে বিয়ে করাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সরকারিভাবে এর বৈধতা না দিলেও গোপনে এই পাপ কার্য় চালু আছে।

সমকামিতা একটি ঘৃণ্য অপরাধ এবং কবীরা গুনাহ। এই পাপের কারণেই বর্তমান পৃথিবী এইডস-এর মত মরণ ব্যধিতে ভরে গেছে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একপ্রকার গযব যা মানুষের কৃতকর্মের ফল এ অপরাধের কারণে বিগত যুগে আল্লাহ তা‘আলা কওমে লূতকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। (সুরা আ‘রাফ ৭/৮০-৮৪; সুরা হিজর ১৫/৭২-৭৬)।

এর শাস্তি হলো সমকামীদের উভয়কে হত্যা করা।

ইকরিমাহ্ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যে ব্যক্তিকেই লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের মতো (সমকামী) দেখতে পাও, তখন তাদের উভয়কে (যে করে এবং যার সাথে করা হয়) হত্যা কর। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)  ৩৫৭৫, সুনান আবু দাঊদ ৪৪৬২, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৬, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫৬১, ইরওয়া ২৩৫০, সহীহ আল জামি‘ ৬৫৮৯, সহীহ আত্ তারগীব ২৪২২)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তা‘আলা কওমে লূতের ন্যায় অপকর্মকারীদের প্রতি লা‘নত করেছেন, তিনি একথাটি তিনবার বললেন। (আহমাদ হা/২৯১৫; ছহীহাহ হা/৩৪৬২)।

তবে এ শাস্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের (কুরতুবী)। না করলে সরকার গোনাহগার হবে।

এখন কথা হলো, অনৈসলামিক সরকার যতোদিন তথা কিয়ামত পর্যন্ত থাকলেও সমকামী অপরাধের জন্য কাউকে মৃত্যুদন্ড দিবে না। এজন্যে দরকার ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিক পরিচালিত সরকার।

(৪) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা হলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হোন এবং আযাব প্রেরণ করেনঃ

অন্যায়ভাবে হত্যা করা হারাম। কথিত আছে, হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল যেদিন হাবিলকে হত্যা করে, সেদিনই পৃথিবীতে প্রথম ভূমিকম্প হয়। কেননা  অন্যায়ভাবে হত্যাকাণ্ড আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। তিনি ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হলো জাহান্নাম, সে সদা সেখানে  অবস্থান করবে।’ (সুরা নিসা: ৯৩)।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বেঁচে থাক। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী? তিনি বললেনঃ আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, জাদু, যথার্থ কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ্ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল খাওয়া, জিহাদের ময়দান থেকে পিঠ ফিরিয়ে নেয়া, সাধ্বী বিশ্বাসী সরলমনা নারীদের প্রতি অপবাদ দেয়া। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), ৬৮৫৭, ২৭৬৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৩৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৩৯৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ফজরের নামায পড়লো, সে আল্লাহর যিম্মায় থাকলো। অতএব তোমরা আল্লাহর যিম্মাদারিকে নষ্ট করো না। যে ব্যক্তি তাকে হত্যা করবে, আল্লাহ তাকে তলব করে এনে উল্টো মুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৪৫)।  হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবদুল্লাহ ইবনে ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম যিম্মীকে হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধ অবশ্যই চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৬৮৬, ২৬৮৭, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩১৬৬, ৬৯১৪, নাসায়ী ৪৭৫০, গায়াতুল মারাম ৪৪৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯২৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৩৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

রিফা’আ ইবনে শাদ্দাদ আল-কিতবানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমর ইবনুল হামিক আল-খুযাঈ (রাঃ) -র নিকট আমি যে বাক্যটি শুনেছি তা না থাকলে আমি মুখতারের মাথা ও দেহের মাঝখান দিয়ে হাঁটাচলা করতাম (তাকে হত্যা করতাম)। আমি তাকে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোকের জানের নিরাপত্তা দেয়ার পর তাকে হত্যা করলো সে কিয়ামতের দিন বিশ্বাসঘাতকতার ঝান্ডা বয়ে বেড়াবে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৬৮৮, আহমাদ ২১৪৩৯, ২১৪৪, রাওদুন নাদীর ৭৫১, ৭৫২, সহীহাহ ৪৪১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

“নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল”। (সূরা আল-মায়িদা ৩২)।

আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন মানুষের (অপরাধের) মধ্যে সর্বপ্রথম নরহত্যার (অপরাধের) বিচার করা হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৫৩৩, ৬৮৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ ২৬১৫, ২৬১৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪২৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৭৮, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৩৯৬, ১৩৯৭, সুনান আননাসায়ী ২৯৯১, ২৯৯২, ২৯৯৩, ২৯৯৪, ২৯৯৬, আহমাদ ৩৬৬৫, ৪২০১, সহীহাহ ১৭৪৮, আধুনিক প্রকাশনী ৬০৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬০৮৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো সরকার ফ্যাসিস্ট হলে তারা নিজেদের ক্ষমতা চিরদিন ধরে রাখতে বিরোধী দল বা বিরোধী মতের লোকজনকে অপহরণ, গুম ও খুন করে থাকে। আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনা শাসনামলের খুন-খারাবির হিসেব নিকাশ সম্পর্কে সব জানি।

মূলত এইসব জালিমদের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় আল্লাহর গযব পতিত হয়েছিলো।

পাপিষ্ঠ লোকদের কারণে আযাব এলে নিষ্পাপ লোকগুলোও আযাব ভোগ করে

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,

“তোমরা এমন ফিতনাকে ভয় করো, যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা জালিম (অত্যাচারী-অপরাধী) কেবল তাদিগকেই ক্লিষ্ট করবে না এবং জেনে রাখো নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।” (সুরা-৮ আনফাল, আয়াত: ২৫)।

 যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোকজন থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হাঁ যখন পাপকাজ অতি মাত্রায় বেড়ে যাবে।  (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৩৪৬, ৩৫৯৮, ৭০৫৯, ৭১৩৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)  ৭১২৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮৮০, আহমাদ ২৭৪৮৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

কোনো জালিম বা অত্যাচারী বা পাপীষ্ঠ লোক মারা গেলে মানুষ, জনপদ, গাছ-পালা ও পশু-পক্ষী সবাই স্বস্তিলাভ করে। এমন পাপীষ্ঠ লোকের মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ বলা যাবে।

ক্বাতাদাহ ইবনু রিবঈ আনসারী (রাঃ) বর্ণনা করেন। ‘যখন একজন পাপাচারী মারা যায়, তখন মানুষ, জনপদ, গাছ-পালা ও পশু-পক্ষী সবাই স্বস্তিলাভ করে’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)  ৬৫১২, ৬৫১৩; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২০৯১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৫০, আহমাদ ২২৬৩৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৬০৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬০৬৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উপরে বর্ণিত হাদীছে অত্যাচারী, পেশী শক্তি ব্যবহারকারী যালিমের মৃত্যুতে মুমিন বান্দার শান্তি লাভের কথা বলা হয়েছে। আর শান্তি ও খুশির খবরে আল-হামদুলিল্লাহ বলতে কোন সমস্যা নেই। (শারহুল মুসলিম লিন নববী, ৭/২০-২১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/৩৩৮ পৃ.)।

সুতরাং কোন চিহ্নিত, পরিচিত, প্রসিদ্ধ ও সুনির্দিষ্ট যুলুমকারী, অত্যাচারী, নির্যাতনকারী ও পেশী শক্তি ব্যবহারকারী যালিমের মৃত্যুতে খুশি হওয়া জায়েয। সেই হিসাবে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলাও যাবে।

কিয়ামতে অত্যাচারীরা আমলের দিক থেকে নিঃস্ব হবে

শাসকগোষ্ঠী যদি অন্যায় অত্যাচারী বা জুলুমবাজ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎকারী ইত্যাদি পাপের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে তাহলে মৃত্যুর আগে অন্যের সম্পদ যদি ফিরিয়ে না দেয় বা মাফ চেয়ে না নেয় এমনকি সামান্য কথা দ্বারাও যদি কেউ আঘাত প্রাপ্ত হয়ে থাকে আর যদি মাফ চেয়ে না নেয় তাহলে কিয়ামতে তার সওয়াব থেকে তা পরিশোধ করা হবে। মজলুম ব্যক্তিকে বলা হবে তুমি আজ যা মন চায় অত্যাচারী লোকের নিকট থেকে সওয়াব নিতে থাকো, একসময় অত্যাচারী ব্যক্তি সওয়াব বা আমলের  দিক থেকে নিঃস্ব হবে এবং পরিশেষে মজলুম ব্যক্তির গুণাহ ঐ অত্যাচারী ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। যার ফলে মজলুম ব্যক্তি পরিপূর্ণ সওয়াব নিয়ে জান্নাতে যাবে আর অত্যাচারী ব্যক্তি নিঃস্ব হয়ে জাহান্নামে যাবে। আসুন রাসুল সা. এবিষয়ে কী বলেছেন তা আমরা জেনে নেই।

(ক) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি জানো, (প্রকৃত) গরীব কে? সহাবায়ে কিরাম বললেনঃ আমরা তো মনে করি, আমাদের মধ্যে যার টাকা-পয়সা, ধনদৌলত নেই, সে-ই গরীব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কিয়ামতের দিন আমার উম্মাতের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি গরীব হবে, যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে সালাত, সিয়াম ও যাকাত আদায় করে আসবে; কিন্তু সাথে সাথে সেসব লোকেদেরকেও নিয়ে আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো অপবাদ রটিয়েছে, কারো সম্পদ খেয়েছে, কাউকে হত্যা করেছে এবং কাউকে প্রহার বা অত্যাচার করেছে; এমন ব্যক্তিদেরকে তার নেকীগুলো দিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর যখন তার পুণ্য শেষ হয়ে যাবে অথচ পাওনাদারদের পাওনা তখনো বাকি, তখন পাওনাদারদের গুনাহ তথা পাপ তার ওপর ঢেলে দেয়া হবে, আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মিসকাতুল মাশাবিহ মিসকাত ৫১২৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৮১, সুনান আততিরমিযী ২৪১৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৮৪৫, সহীহুল জামি‘ ৮৭, সহীহ আত্ তারগীব ২২২৩, শু‘আবুল ঈমান ৩৩, আহমাদ ৮০২৯, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৬৪১৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪৪১১, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ৫৬১, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ২৭৭৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১১৮৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৯৩)। হাদিসের মান সহিহ।

(খ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন হকদারদের হক আদায় করা হবে, এমনকি যে বকরীর শিং নেই, তার জন্য শিংওয়ালা বকরী থেকে বিনিময় আদায় করে দেয়া হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১২৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৪৭৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫৮২, সুনান আততিরমিযী ২৪২০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৫৮৮, সহীহুল জামি‘ ৫০৬২, সহীহ আত্ তারগীব ৩৬০৩, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ১৩৬, আহমাদ ৭২০৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৭৩৬৩, আস্ সুনানুল কুবরা ১১৮৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৪৪, ইসলামিক সেন্টার ৬৩৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(গ)  ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ)...আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মু’মিনগণ যখন জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে, তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে এক পুলের উপর তাদের আটকে রাখা হবে। তখন পৃথিবীতে একের প্রতি অন্যের যা যা জুলুম ও অন্যায় ছিল, তার প্রতিশোধ গ্রহণের পরে যখন তারা পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যেকে পৃথিবীতে তার আবাসস্থল যেরূপ চিনত, তার চাইতে অধিক তার জান্নাতের আবাসস্থল চিনতে পারবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪৪০, ৬৫৩৫, সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ২২৭৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৪৪০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৬১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

 (ঘ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির কোন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অত্যাচারঘটিত; যেমন- মানহানি বা অন্য কোন বিষয়ের কোন হক থাকে, তবে সে যেন সেদিনের পূর্বেই তার কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নেয়, যেদিন তার কাছে কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না। যদি তার নেক আমল থাকে, তাহলে অত্যাচারিতের হক অনুসারে তার কাছ থেকে নেক ’আমল নিয়ে নেয়া হবে। আর যদি তার নেক না থাকে, তবে অত্যাচারিত ব্যক্তির পাপকে তার ওপর চাপানো হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১২৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৪৪৯, ৬৫৩৪, সহীহুল জামি ৬৫১১, সহীহ আত্ তারগীব ২২২২, আহমাদ ১০৫৭৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ৭৩৬১, শু‘আবুল ঈমান ৭৪৭০, আর মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১৩৫, আল মু‘জামুস্ সগীর লিত্ব ত্ববারানী ৩৪৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১১৭৮০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৮৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঙ) আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমলনামা তিন প্রকার-

১. ঐ ’আমলনামা, যাকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করবেন না। আর তা হলো, আল্লাহ তা’আলার সাথে শরীক করা। আল্লাহ মহীয়ান-গরীয়ান বলেন-  অর্থাৎ- “অংশীবাদীদেরকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করবেন না’’,

২. ঐ ‘আমলনামা, যাতে মানুষের পারস্পরিক জুলুম-অত্যাচার লিপিবদ্ধ আছে। সে আমলনামাকে আল্লাহ তা’আলা এমনিতেই ছাড়বেন না। এমনকি একজনের কাছ থেকে অপরজনের প্রতিশোধ নেবেন এবং

৩. ঐ ’আমলনামা, যার প্রতি আল্লাহ তা’আলা ভ্রূক্ষেপ করবেন না। এ আমলনামা হলো বান্দা ও আল্লাহ তা’আলার মধ্যকার জুলুম সংক্রান্ত বিষয়। এটা আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যদি তিনি ইচ্ছে করেন, তাকে শাস্তি দেবেন। আর যদি ইচ্ছে করেন, তাকে ক্ষমা করে দেবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৩৩, শু‘আবুল ঈমান ৭৪৭৩, য‘ঈফুল জামি ৩০২২)।

বিশ্বাসঘাতক মুসলিম শাসকদের পরিনতি

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, মুসলিম শাসকদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দান করলে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বত্র সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করে গরিবদের মাঝে সমবন্টন করবে, সৎকাজের আদেশ দিবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে তথা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা চালূ করবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাওয়ার পর সেই মুসলিম শাসকগণ ইসলামি শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে তারা মানবরচিত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। এজন্যে কিয়ামতে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য একটি করে পতাকা খাড়া করে রাখা হবে, যাতে তাদেরকে চেনা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলিত (খাড়া) করা হবে, আর বলা হবে- এটা অমুকের পুত্র, অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১৭৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৫, সুনান আবূ দাঊদ ২৭৫৬, সুনান আততিরমিযী ১৫৮১, আহমাদ ৪৬৪৮, সহীহ আল জামি‘ ১৬৮৩, সহীহ আত্ তারগীব ৩০০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

তিনি আরো বলেছেন,

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা দেখা যাবে, যার মাধ্যমে তার পরিচয় পাওয়া যাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩১৮৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪২৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৭, আহমাদ ১২৪৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

তিনি আরো বলেছেন,

আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের নিতম্বের সাথে তার জন্য (অপরাধ অনুপাতে) একটা করে পতাকা রাখা হবে।

অপর বর্ণনাতে আছে, কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ অনুপাতে পতাকা উত্তোলিত হবে। সাবধান! রাষ্ট্র প্রধানের বিশ্বাসঘাতকতাই হবে সর্ববৃহৎ (অপরাধ)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৭,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)  ৪৪২৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৮, সুনান আততিরমিযী ২১৯১, আহমাদ ১১৩০৩, সহীহাহ্ ১৬৯০, সহীহ আল জামি ৫১৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ)....আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক ধোকাবাজের জন্য কিয়ামত দিবসে একটি পতাকা থাকবে আর তা তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ অনুযায়ী উচু করা হবে। সাবধান জনগণের শাসক হয়ে যে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তার চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক আর নেই। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩৮৮, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

শাসকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, নিকৃষ্ট ও অত্যাচারী শাসকদের শেষ পরিনতি

শাসকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার পরিনাম

নির্বাচন এলে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ভোট পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা করে থাকে। যেমন, ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী পলাতক শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে বলেছিলো, মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলবে, দশ টাকায় চাল দিবে, ঘরে  ঘরে চাকরি দিবে ইত্যাদি। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর আমরা কি তার কোনো বাস্তবতা দেখেছি? তারা যেসব ওয়াদা করেছিলো তার একটাও পূরণ করেনি। তেমনি বিএনপিও নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চালাবে, কুরআন বিরোধী কোনো আইন করবে না, নবিজীর জীবনাদর্শ অনুসরণ করবে, প্রথম দেড় বছরেই এক কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে, ব্যাংকের উন্নয়ন করবে ইত্যাদি। এখানে একটা বিষয় পরিস্কার যে, বিএনপির গঠনতন্ত্রে ইসলাম বিষয়ক কোনো কথা লেখা নেই। তাদের গঠনতন্ত্রের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে “মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চালাবে, কুরআন বিরোধী কোনো আইন করবে না” এসব লেখা নেই। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠা করা।

আমরা নির্বাচনের আগে দেখলাম এক নেতা মাথায় টুপি দিয়ে আলেমদের নিকট গিয়ে বলে ধর্মের কথা, আরেক নেতা সরাসরি বলে আমরা ইসলামি শরিয়াহ আইন বিশ্বাস করি না, মানিনা। আরেক নেতা বলে, আমি হিন্দুও না মুসলমানও না। আবার আরেক নেত্রী ইসলামে চার বিয়ে নিয়ে কটূক্তি করে। আরেক নেতা হিন্দুদের পূজাকে শয়তানের সাথে তুলনা করে। আসলে এসবই হচ্ছে জনগণের সাথে ধোঁকাবাজি। এইসব নেতাদের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়া, জনগণের সাথে ধোকবাজি করা ও তাদেরকে ভোট দিয়ে যারা সহযোগিতা করে তাদের কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে।

মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরিণামঃ

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

অর্থাৎ “আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সূরা বানী ইস্রাঈল ৩৪ আয়াত)।

তিনি অন্যত্র বলেছেন,

অর্থাৎ “তোমরা যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর।” (সূরা নাহল ৯১ আয়াত)।

তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,

অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর।” (সূরা মাইদাহ ১ আয়াত)।

তিনি আরো বলেছেন,

অর্থাৎ “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যা কর না, তা তোমরা বল কেন? তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক।” (সূরা স্বাফফ ২-৩ আয়াত)।

নেতাগণ জনগণের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে বা অঙ্গিকার করে বা ওয়াদা দিয়ে তা পূরণ না করলে তাদের মৃত্যু হবে মুনাফিকীর মৃত্যু।

‘আবদুল্লাহ ইবনু‘ আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়।

(ক)  আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে;

(খ)  কথা বললে মিথ্যা বলে;

(গ)  প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে;  এবং

(ঘ) বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪, ২৪৫৯, ৩১৭৮; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৮,  মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬, সুনান আততিরমিযী ২৬৩২, সুনান আননাসায়ী ৫০২০, সুনান আবূদাউদ ৪৬৮৮, আহমাদ ৬৭২৯, ৬৮২৫, ৬৮৪০, ৬৭৮২, সহীহ ইবনু হিব্বান ২৫৪, সহীহ আত্তারগীব ২৯৩৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩)। হাদিসেরমানঃ সহিহ (Sahih)।

আল্লাহ বলেন,

আল্লাহ এবং মুমিনদেরকে তারা প্রতারিত করে। বস্তুতঃ তারা নিজেদেরকেই নিজেরা প্রতারিত করছে, অথচ তারা তা বুঝে না। (সুরা বাক্বারাহ২/৯)।

আল্লাহ বলেন,

মুনাফেক পুরুষ ও মুনাফেক নারী একে অপরের অংশ, তারা অসৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং সৎকাজে নিষেধ করে, তারা তাদের হাতগুটিয়ে রাখে, তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে তিনিও তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন; মুনাফেকরা তো ফাসিক। (সুরা তওবা-মাদানী ৯/৬৭)।

হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন,

এক শ্রেণীর যিনদীক্ব রয়েছে যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম ও রাসূলগণের অনুসরণের কথা প্রকাশ করে এবং মনের মাঝে কুফর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতিশত্রুতা লুকিয়ে রাখে। এরাই মূলত মুনাফিক এবং এদেরই আবাসস্থল হবে জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে’। (সুরা নিসা ৪/১৪৫)।

মুনাফিকদের সখ্যতা ও সম্প্রীতি মুমিনদের সাথে নয় বরং কাফেরদের সাথে। কাফেরদের সাথে তাদের এই দহরম মহরমের জন্য আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’। ‘যারা মুমিনদের ছেড়ে কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কিতাদের কাছে সম্মান কামনা করে? অথচ সকল সম্মান কেবল আল্লাহরই জন্য’। (সুরা নিসা ৪/১৩৮-১৩৯)।

জনগণের সাথে ধোঁকাবাজি করার পরিণামঃ

নেতাগণ জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ না করে ধোঁকা দিয়ে থাকে। নেতাদের ধোঁকাবাজির কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। ধোঁকাবাজিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

ইবনু’ উমার ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।

আর ইমাম মুসলিম (রহঃ) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, আর যে ব্যক্তি  আমাদের সাথে প্রতারণা করে বা ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৫২০, বুখারী ৭০৭, মুসলিম ১০১, সুনান আননাসায়ী ৪১০০, সুনান আততিরমিযী ১৪৫৯, সুনান ইবনুমাজাহ ২৫৭৫, আহমাদ ৯৩৯৬, সহীহ আলজামি‘ ৬২১৭, সহীহ আত্তারগীব ১৭৬৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

কেউ কাউকে ধোঁকা দিলে সেই ধোঁকাবাজের আমলনামায় একটি করে পাপ লেখা হয়ঃ

আব্দুল্লাহ ইবনু আমির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ এক দিন রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে বসা অবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে দিবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেনঃ তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা করছে? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে একারণে তোমার আমল নামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ হতো। (সুনান আবূদাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯৯১, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৮৮২, সিলসিলাতুস্সহীহাহ্ ৭৪৮, সহীহ আত্তারগীবওয়াত্তারহীব ২৯৪৩, মুসান্নাফ ইবনু আবূশায়বাহ্ ২৫৬০৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলিত (খাড়া) করা হবে, আর বলা হবে- এটা অমুকের পুত্র, অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৫, ৩৭২৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১৭৮, ৩১৮৮,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)   ৪৪২১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৫, সুনান আবূদাঊদ ২৭৫৬, সুনান আততিরমিযী ১৫৮১, আহমাদ ৪৬৪৮, সহীহ আলজামি‘ ১৬৮৩, সহীহ আত্তারগীব ৩০০১, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৭৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের নিতম্বের সাথে তার জন্য (অপরাধ অনুপাতে) একটা করে পতাকা রাখা হবে।

অপর বর্ণনাতে আছে, কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ অনুপাতে পতাকা উত্তোলিত হবে। সাবধান! রাষ্ট্রপ্রধানের বিশ্বাসঘাতকতাই হবে সর্ববৃহৎ (অপরাধ)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৪৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৮, সুনান আততিরমিযী ২১৯১, আহমাদ ১১৩০৩, সহীহাহ্ ১৬৯০, সহীহ আলজামি‘ ৫১৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

জনগণের সাথে যারা ধোঁকাবাজি করে তারা জান্নাতে যাবে নাঃ

জান্নাত হচ্ছে মুমিনের জন্য। ঈমানদারের জন্য। সচ্চরিত্র মানুষের জন্য। জান্নাতে চিরস্থায়ী সুখময় জীবন উপহার দেওয়া হবে মুমিনকে। ধোঁকাবাজ জান্নাতে যেতে পারবে না। তার জন্য জান্নাতের দরজাবন্ধ। ধোঁকার হৃদয় জান্নাতে প্রবেশের ন্যূনতম যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। আবুবকর সিদ্দিক (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনোকৃপণ, ছদ্ম বেশধারী ধোঁকাবাজ, খিয়ানতকারী ও অসচ্চরিত্র ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না। প্রথম যারা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়বে, তারা হবে দাস-দাসী, যদি তারা আল্লাহ ও তাদের মনিবের সঙ্গে ন্যায় সংগত আচরণ করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩২)।

অনৈসলামিক দলকে ভোট দিয়ে বা নেতাদের অন্যায়মূলক কাজে  সহযোগিতা করলে তার স্থান হবে জাহান্নামেঃ

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না (যারা পাপিষ্ঠ ও অসৎ তাদেরকে সমর্থন করা, ভোট দিয়ে সহযোগিতা করা বা অর্থ  দিয়ে সাহায্য করা  যাবে না)। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে অতি কঠোর”। (সুরা আল মায়েদা-২)।

যে মুসলিম শাসক ইসলামি শরিয়াহ আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা  করে না তার প্রতি আনুগত্য করা যাবে না

আনুগত্য হবে শুধু বৈধ ও ভালো কাজে। অন্যায় ও অবৈধ কাজে কারো আনুগত্য চলবে না। মন্দ কাজে আনুগত্য করা নিষিদ্ধ।

যেকোনো মুসলমানদের জন্য কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা নিষিদ্ধ। এটা মহান আল্লাহ তাআলার ঘোষণা-

“আর তুমি কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না এবং তাদের যন্ত্রণাকে মনে স্থান দিও না, আর নির্ভর কর আল্লাহর উপর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” (সুরা আহজাব : আয়াদ ৪৮)।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

“তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের আনুগত্য কর তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে, তারা তো কেবল আন্দাজ-অনুমানের অনুসরণ করে চলে, তারা মিথ্যাচার ছাড়া কিছু করে না।” (সুরা আনআম: আয়াত ১১৬)।

তিনি বলেন,

“তুমি তার অনুসরণ কর না, যে বেশি বেশি কসম খায় আর যে (বার  বার মিথ্যা কসম খাওয়ার কারণে মানুষের কাছে) লাঞ্ছিত।” (সুরা কলম :আয়াত ১০)।

আল্লাহতাআলাবলেন-

“যে ভাল কাজে বাধা দেয়, সীমালঙ্ঘনকারী, পাপিষ্ঠ (তাদের প্রতি আনুগত্য করা যাবে না)।” (সুরা ক্বলম : আয়াত ১২)

পাপিষ্ঠ নেতাদের আনুগত্য করা ইসলামে নিষেধঃ

আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (সূরা আশশুয়ারা ১৫১-১৫২)।

আল্লাহ তাআলা উদাসীন ও গাফেলের আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,

“আর ওই ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমি আমার জিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে এবং যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে।” (সুরা কাহফ : আয়াত ২৮)।

আল্লাহবলেন, “আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং বিশ্বাসীদের পথ ভিন্ন (ইসলামি দল ব্যতীত) অন্য পথ (অনৈসলামিক দল) অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!”। (সুরা নিসা ১১৫)।

যে শাসক আল্লাহ তা’আলার কিতাব অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে তার কথা শোনা ও তার আনুগত্য করা ফরজঃ

উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোনো বিকলাঙ্গ কুৎসিত গোলামকেও তোমাদের শাসক (নেতা) নিযুক্ত করা হয়। আর সে আল্লাহ তা’আলার কিতাব অনুযায়ী তোমাদেরকে পরিচালিত করে, তাহলে অবশ্যই তোমরা তার কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬২, ৩৬৬৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১২৯৮, সহীহ আলজামি ১৪১১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩০০৪, ইসলামীক সেন্টার ৩০০১)। হাদিসেরমানঃ সহিহ (Sahih)।

কোনো শাসক ইসলামি শরিয়াহ বিরোধী কোনো কাজ করলে তার কথা শোনা বা আনুগত্য করা বা তার অনুসরণ করা কর্তব্য নয়ঃ

ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলিমের (তার শাসনকর্তার নির্দেশ) শোনা এবং আনুগত্য করা অপরিহার্য; তার মনঃপূত হোক বা না হোক, যতক্ষণ না তাকে গুনাহের দিকে নির্দেশ করে। কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তা শোনা ও আনুগত্য করা কর্তব্য নয়।  (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭১৪৪, ২৯৫৫,  সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৫৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ১৮৩৯, সুনান আবূদাউদ (তাহকিককৃত) ২৬২৬, সুনান আততিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৭০৭, সহীহ আলজামি‘ ৩৬৯৩, আহমাদ ৬২৭৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৪৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬৫৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ অচিরেই আমার পরে এমন সব লোক তোমাদের নেতা হবে, যারা সুন্নাতকে বিলুপ্ত করবে, বিদআতের অনুসরণ করবে এবং নামায নির্দিষ্ট ওয়াক্ত থেকে বিলম্বে পড়বে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি তাদের (যুগ) পাই, তবে কী করবো? তিনি বলেনঃ হে উম্মু আবদ-এর পুত্র! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো যে, তুমি কী করবে? যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করে, তার আনুগত্য করা যাবে না। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৮৬৫, আহমাদ ৩৭৮০, সহীহাহ ২/১৩৯, সহীহ আবুদাউদ ৪৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi।

’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নাফরমানির ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎকর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬৫, সহিহ বুখারী ৭২৫৭, সহিহ মুসলিম ১৮৪০, সুনান আবূ দাঊদ ২৬২৫, সুনান আননাসায়ী ৪২০৫, আহমাদ ৭২৪)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

নিকৃষ্ট ও উৎকৃষ্ট শাসক

আয়িয ইবনু ’আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ শাসকদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট শাসক সে, যে অত্যাচারী ও নিপীড়নকারী। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৮৮, সহিহ মুসলিম ১৮৩০, আহমাদ ২০৬৩৭, সহীহাহ্ ২৮৮৫, সহীহ আল জামি‘ ২০৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

’আওফ ইবনু মালিক আল আশজা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বোত্তম, যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারা তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ করো এবং তারাও তোমাদের জন্য দু’আ করে। আর তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বনিকৃষ্ট, যাদের প্রতি তোমরা ক্রোধান্বিত হও এবং তারাও তোমাদের প্রতি ক্রোধ ও শত্রুতা পোষণ করে। আর তাদের প্রতি তোমরা অভিসম্পাত করো এবং তারাও তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। রাবী বলেন, তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এমতাবস্থায় কি আমরা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করব না (তবুও কি বায়’আতের উপর থাকব)? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। (পুনরায় বললেনঃ) না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। সাবধান! যে ব্যক্তিকে তোমাদের প্রতি শাসক নিযুক্ত করা হয় আর তার মধ্যে যদি আল্লাহ তা’আলার নাফরমানি পরিলক্ষেত হয়, তাহলে তার সে নাফরমানির কাজটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু তার আনুগত্য থেকে পিছপা হবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)  ৩৬৭০, সহিহ মুসলিম ১৮৫৫, আহমাদ ২৩৯৮১, দারিমী ২৮৩৯, সহীহাহ্ ৯০৭, সহীহ আল জামি‘ ৩২৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সহনশীল ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হবেন আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী। আর কিয়ামতের দিন যালিম ও অত্যাচারী শাসক হবে আল্লাহর নিকট সকল মানুষের মধ্যে নিকৃষ্টতম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭১৯, শু‘আবুল ঈমান ৬৯৮৬, য‘ঈফাহ্ ১১৫৭)।

অত্যাচারী শাসকের সাথে অন্যায় ও অসৎকাজের প্রতি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেয়ার জন্য একজন পরামর্শক থাকে

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যাঁকে নবী অথবা খলীফাহ্ নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন, তখন তাঁর জন্য দু’জন অদৃশ্য পরামর্শদাতা থাকে। এক পরামর্শদাতা তাকে সর্বদা সৎ ও ন্যায়সঙ্গত কাজ করার উৎসাহ-অনুপ্রাণিত করে। আর অপর পরামর্শদাতা তাকে অন্যায় ও অসৎকাজের প্রতি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেয়। আর নিষ্পাপ থাকবে সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা’আলা রক্ষা করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)  ৩৬৯১, সহিহ বুখারী ৭১৯৮, সুনান আননাসায়ী ৪২০২, আহমাদ ১১৩৪২, সহীহ আল জামি‘ ৫৫৭৯, সহীহ আত্ তারগীব ২২৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

কিয়ামতে প্রত্যেক শাসকদের তাদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল, সুতরাং প্রত্যেকে অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্বশীলতা ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, অতএব সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের দায়িত্বশীলা, কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। দাস তার প্রভুর সম্পদের দায়িত্বশীল, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতা ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৫৫৮, ৮৯৩, ২৪০৯, ২৫৫৪, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫২০০, ৭১৩৮,  মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৮৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬১৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮২৯, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৭০৫, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ২৯২৮,  আহমদ ৪৪৮১, ৫১৪৮, ৫৮৩৫, ৫৮৬৭, ৫৯৯০, আল লুলু ওয়াল মারজান-১১৯৯, সহীহ আত্ তারগীব ১৯২২)।হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

অত্যাচারী শাসকদের শেষ পরিনতি

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে জুলুম কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এর পরিণাম ভয়াবহ। শাসক যদি অত্যাচারী হয়, তাহলে দেশের জনগণ যেমন শান্তি পায় না, অত্যাচারী ব্যক্তি নিজেও শান্তিতে থাকতে পারে না। দীর্ঘদিনের অন্যায়-অবিচারে জনমনে তার ওপর চাপা ক্ষোভ জন্ম নেয় এবং ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। এ ক্ষোভের বিস্ফোরণ যখন হয়, তখন অত্যাচারীর শক্তিশালী মসনদ উল্টে যায় নিমেষেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমনই একজন ফ্যাসিস্টকে দেখেছি যাকে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সম্মিলিত ছাত্র-জনতা বিদ্রোহের মাধ্যমে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। বর্তমানে সেই ফ্যাসিস্ট এর দলীয় নেতা কর্মীরাও পলাতক, তার দলসহ সার্বিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ রয়েছে। অথচ এই দলটি একসময় নিজেদেরকে প্রভু ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল এবং তাদের অন্যায় অত্যাচারের মাত্রা এমনি বেড়ে গিয়েছিল যে, মাজলুমদের কান্না আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তাদের দোয়া কবুল করে আল্লাহ এক গজব নাযিল করে দেন।

জুলুমের পরিণতিঃ

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জুলুমের পরিণাম সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জালিম কেয়ামত দিবসে ঘোর অন্ধকারে নিপতিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৭)।

অন্য হাদিসে হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজ সত্তার উপর জুলুম হারাম করেছি, অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৪৬৬)।

জুলুমের শাস্তি ভয়াবহ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ জুলুমের কাজে জড়িত, তাকে আমি গুরুতর শাস্তি আস্বাদন করাব।” (সুরা ফুরকান: ১৯)।

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “আর যারা জালিম, তাদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।” (সুরা শুরা: ০৮)।

অত্যাচারী শাসকের শাস্তিঃ

পরকালে অত্যাচারী শাসকদের শাস্তি তো অবশ্যম্ভাবী। কখনো ইহকালেও তারা বিভিন্ন শাস্তির সম্মুখীন হয়। আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর বিভিন্ন বিপদ চাপিয়ে দেন। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা অত্যাচারীকে ঢিল দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন, আর ছাড়েন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করেন, ‘যে-সব জনপদ জুলুমে লিপ্ত হয়, তোমার প্রতিপালক যখন তাদের ধরেন, তখন তার ধরা এমনই হয়ে থাকে। নিশ্চয় তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক, বড় কঠোর।’ (সহিহ বুখারি : ৪৬৮৬; সুরা হুদ: ১০২)।

আল্লাহ তায়ালা অত্যাচারী অবাধ্যদের ইহকালীন বিভিন্ন শাস্তির কথা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কয়েকটি হলোঃ

এক. জুলুম কখনো স্থায়ী হয় না। অত্যাচারের মূলোৎপাটন হবেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর তারা যখন সে উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি যখন তাদের প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, আমি অকস্মাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। ফলে তারা সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেল। এভাবে যারা জুলুম করেছিল, তাদের মূলোচ্ছেদ করা হলো।’ (সুরা আনআম: ৪৪-৪৫)।

অত্যাচারীদের এ আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে, তারা যেন পার্থিব শাস্তি থেকে নিজেদের নিরাপদ মনে না করে। পার্থিব জীবনেও তারা বিভিন্ন শাস্তির সম্মুখীন হতে পারে, যেমনটা পূর্ববর্তী লোকেরা হয়েছে।

দুই. জালিমের ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কত জনপদকেই ধ্বংস করেছি, যখন তারা জুলুমে রত ছিল। এসব জনপদ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কত কূপ হয়েছে পরিত্যক্ত এবং কত সুদৃঢ প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে।’ (সুরা হজ: ৪৫)।

তিন. আল্লাহ ছাড় দেন, ছেড়ে দেন না। বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি কত জনপদকেই তো অবকাশ দিয়েছিলাম, এরা ছিল জালিম। অবশেষে আমি তাদের পাকড়াও করেছি।’ (সুরা হজ : ৪৮)।

চার. অত্যাচারী ফেরাউনের পরিণতি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘ফেরাউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহমিকা প্রদর্শন করছিল। তারা মনে করেছিল, তারা আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে না। অতঃপর আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম এবং সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। এবার দেখ জালিমদের পরিণতি কী হয়েছে।’ (সুরা কাসাস : ৩৯-৪০)।

আত্মসাৎকারী শাসক জাহান্নামীঃ

মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মুসলিম জনতার ওপর যদি কোনো শাসক নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে আত্মসাৎকারীরূপে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৮৬, বুখারী ৭১১৫, মুসলিম ১৪২)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

যে শাসক কল্যাণকর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তার ইহকালীন পরকালীন শাস্তিঃ

বাংলাদেশে এপর্যন্ত অনৈসলামিক যতোজন শাসক এসেছে কেহই প্রজাদের কল্যাণে কাজ করেনি। আমরা দেখে আসছি, প্রত্যেক শাসক যতটুকু সুযোগ সুবিধা দিয়েছে তা নিজ দলের লোকদের জন্যেই করেছে। সর্বক্ষেত্রে তারা দলীয়করণ করে থাকে। ভিন্ন মতের ও সাধারণ জনগণের জন্য তেমন কল্যাণকর কাজ করতে দেখা যায় না। উল্টো অপহরণ, গুম, খুন, হামলা, মামলা, অন্যায় অত্যাচার করে জনজীবণ বিষিয়ে তোলে। কোথায় কোনো ন্যায় বিচার পাওয়া যায় না। এরুপ শাসকদের রয়েছে করুণ পরিনতি।

মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তিকে যদি আল্লাহ তা’আলা প্রজাপালনের দায়িত্ব প্রদান করেন। আর সে তাদের জন্য কল্যাণকর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা না পারে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৮৭, বুখারী ৭১৫০, মুসলিম ১৪২, দারিমী ২৮৩৮, সহীহাহ্ ২৬৩১, সহীহ আল জামি‘ ৫৭৪০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে আল্লাহ! যে ব্যক্তিকে আমার উম্মাতের শাসক (ইমাম, পরিচালক, সচিব) নিযুক্ত করা হয় এবং সে যদি তাদের ওপর এমন কিছু চাপিয়ে দেয় যা তাদের জন্য বিপদগ্রস্ত ও কষ্টদায়কের কারণ হয়, তবে তুমিও তার ওপর অনুরূপ চাপিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তিকে আমার উম্মাতের ওপর শাসক নিযুক্ত করা হয় এবং সে তাদের সাথে নম্র ও উত্তম আচরণ করে, তুমিও তার সাথে অনুরূপ নম্রতা প্রদর্শন করো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৮৯, মুসলিম ১৮২৮, আহমাদ ২৪৬২২, সহীহাহ্ ৩৪৫৬, সহীহ আল জামি‘ ১৩১২, সহীহ আত্ তারগীব ২০০২)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দশজন লোকেরও আমীর (শাসক) নিযুক্ত হবে, কিয়ামতের দিনে তাকে এমন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে যে, তার গলায় বেড়ি পড়ানো থাকবে। তার গলার বেড়ি থেকে তার ন্যায়-নীতি ও ইনসাফ তাকে মুক্ত করবে অথবা তার কৃত জুলুম ও নির্যাতন তাকে ধ্বংস করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)  ৩৬৯৭, আহমাদ ৯৫৭৩, দারিমী ২৫১৮, সহীহাহ্ ২৬২১, সহীহ আল জামি‘ ৫৬৯৫, সহীহ আত্ তারগীব ২১৯৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

 আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দশ বা ততোধিক লোকের অভিভাবক বা জিম্মাদার হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তার গলায় শিকল পরা অবস্থায় উপস্থিত করবেন। তার হাত গর্দানের সাথে বাঁধা অবস্থায় থাকবে, তার নেক ’আমল তাকে রক্ষা করবে অথবা তার কৃত অপরাধ তাকে ধ্বংস করবে। নেতৃত্বের প্রথম অবস্থা তিরস্কার ও নিন্দা, মধ্যম অবস্থায় লজ্জা, আর অবশেষে কিয়ামতের দিন অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭১৪, আহমাদ ২২৩০০, সহীহাহ্ ৩৪৯, সহীহ আল জামি‘ ৫৭১৮, সহীহ আত্ তারগীব ২১৭৫)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

আবূ শাম্মাখ আল আযদী (রহঃ) তার এক চাচাতো ভাই হতে বর্ণনা করেন। যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ছিলেন। একদিন তিনি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে মানুষের কোনো কাজের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর সে মুসলিম, মাযলূম অথবা দুস্থ লোকেদের জন্য তার প্রবেশদ্বার বন্ধ করে রাখেন, আল্লাহ তা’আলাও তার প্রয়োজন বন্ধ করে দেবেন যখন সে চরম অভাবে নিপতিত হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)  ৩৭২৯, শু‘আবুল ঈমান ৬৯৯৯, আহমাদ ৩/৪৪১)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

আমর ইবনু মুররাহ্(রহঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-কে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা মুসলিমদের মধ্যে যে ব্যক্তিকে কোনো কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন, আর সে তাদের প্রয়োজন, চাহিদা ও অভাব-অভিযোগের প্রতি পরোয়া করে না (গাফিল থাকে); আল্লাহ তা’আলাও তার প্রয়োজন, চাহিদা ও অভাব-অভিযোগ (মিটানো) থেকে আড়ালে থাকেন। অতঃপর মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) মানুষের প্রয়োজন ও অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য একজন লোক নিয়োগ করেন। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)।

তিরমিযী’র অপর এক বর্ণনা ও আহমাদ-এর বর্ণনাতে আছে, আল্লাহ তা’আলা ঐ শ্রেণীর লোকের চাহিদা, প্রয়োজন ও অভাব মোচনের ব্যাপারে আকাশমন্ডলীর সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২৮, সুনান আততিরমিযী ১৩৩২, সুনান আবূ দাঊদ ২৯৪৮, আহমাদ ১৮১৯৬, সহীহ আত্ তারগীব ২২০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি যদি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি এমন দৃষ্টিতে তাকায়, যাতে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২০, শু‘আবুল ঈমান ৭০৬৪, য‘ঈফাহ্ ২২৭৯)।

আল্লাহর অবাধ্য শাসকদের করুন পরিনতিঃ

আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং ঘোষণা করেনঃ আমি হলাম সর্বশক্তিমান, আমি ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। আমি রাজা-বাদশাহদের মালিক ও রাজাধিরাজ। সকল বাদশাহদের অন্তর আমার হাতের মুঠোতে। নিশ্চয় বান্দারা যখন আমার আনুগত্য করে, তখন আমি রাজা-বাদশাহদের অন্তরকে দয়া ও কোমলতার সাথে তাদের দিকে ফিরিয়ে দেই। আর বান্দারা যখন আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন আমি তাদের অন্তরকে প্রজাদের জন্য কঠোর নিষ্ঠুর করে দেই। ফলে তারা প্রজাদেরকে কঠিন অত্যাচার করতে থাকে। সুতরাং তোমরা তখন তোমাদের শাসকদের জন্য বদ্দু’আ করো না; বরং নিজেদেরকে আল্লাহর জিকির ও ভারাক্রান্ত অন্তরে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকো, যাতে আমি তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাই। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭২১, হিলইয়াতুল আওলিয়া ২/৩৮৮, মু‘জামুল আওসাত ৮৯৫৭, য‘ঈফাহ্ ৬০২)।

তবে ন্যায়পরায়ন শাসক বা বিচারকদের পুরস্কার আছেঃ

’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় সত্যনিষ্ঠ বিচারক আল্লাহ তা’আলার নিকট তাঁর ডানপাশে নূরের মিম্বারের উপর অবস্থান করবে। যদিও আল্লাহ তা’আলার উভয় হাতই ডান (কল্যাণকর)। তারা হলো সে সমস্ত বিচারক- যারা তাদের বিচারালয়ে, নিজেদের পরিবার-পরিজনদের মাঝে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায় ও ইনসাফ কায়িম করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৯০, মুসলিম ১৮২৭, নাসায়ী ৫৩৭৯, আহমাদ ৬৪৯২, সহীহ আল জামি‘ ১৯৫৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৯৫০)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অত্যাচারী শাসক বা নেতাদের সহযোগিদের শাস্তিঃ

শুধু অত্যাচারী না, বরং যাদের সহযোগিতায় সে সাধারণ মানুষের উপর জুলুম নির্যাতন করবে, জালিম শাসককে যারা সাহায্য করবে, তাদেরও ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হবে। আমাদের দেশে দেখা যায়, জেনে শুনে অন্যায়-অত্যাচারী বা জালিম শাসক বা নেতা যারা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অস্ত্রবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ দুর্নীতি, ধর্ষণ, খুন, অপহরণ, গুমসহ সকল পাপের সাথে জড়িত এমন শাসক বা নেতাদের যারা ভোট দেয়, যারা কর্মী বা সমর্থক তাদেরকে কিয়ামতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এবং তোমরা ঐ জালিমদের প্রতি একটুও ঝুঁকবে না, অন্যথায় জাহান্নামের আগুন তোমাদেরও স্পর্শ করবে।” (সুরা হুদ : ১১৩)।

আল্লাহ বলেন,

”আর তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সহায়তা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তি দাতা।” (সূরা মায়িদা: ২)।

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে (অন্যায়মূলক কাজে) সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত (সেই ব্যক্তির অন্যায়মূলক কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত) না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৩২০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭, ইরওয়া ৭/৩৫০, সহীহাহ ৪৩৮, ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,

‘যে লোক সৎকাজের জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য), তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি অংশ পাবে তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি শাসক হবে যাদের কতগুলো কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কতগুলো কাজ অপছন্দ করবে। যে লোক (তাদের) অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, আর যে লোক তাকে ঘৃণা করবে সেও দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে লোক তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে সে অন্যায়ের অংশীদার বলে গণ্য হবে। (সুনান আত তিরমীজী ২২৬৫, মিশকাতুল মাশাবিহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহিহ মুসলিম ১৮৫৪, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘ ২৩৯৫)। হাদিসের মান সহিহ।

রাসূল বলেন,

“কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে সেই শাসকের, যে জালিম; এবং সেই আলেমের, যে জুলুমকে সমর্থন করেছে।” (তাবরানি)।

রাসূল বলেন,

“যে ব্যক্তি জালিমকে সাহায্য করে, সে নিজেও জালিম।” (মুসনাদ আহমাদ)।

পাপিষ্ঠ নেতাদের আনুগত্য করা বা তাদের পক্ষ নেয়া ইসলামে নিষেধঃ

আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।

এরপরও যারা অন্যায় অত্যাচারী শাসকদের ভোট দিয়ে, সময় দিয়ে অর্থ দিয়ে, দলীয় মিটিং মিছিলে গিয়ে সহযোগিতা করবে তাদেরকে সেদিন পা ও মাথার ঝুঁটি ধরে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, বাধা দেওয়ার মত কেউ থাকবে নাঃ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘সেদিন অপরাধীদের চেনা যাবে তাদের (মলিন) চেহারা দেখে। তাদেরকে সেখানে পাকড়াও করা হবে তাদের পা ও মাথার ঝুঁটি ধরে’। (সুরা আর-রহমান ৫৫/৪১)।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“সেদিন জালিম ও তার সহযোগীদের একত্রে করে বলা হবে-তোমরা সবাই জাহান্নামের দিকে চলো।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২২–২৩)।

অন্যের ক্ষতি করলে আল্লাহও তার অনুরুপ ক্ষতি করবেন

যেসব শাসক বা নেতা-কর্মী  দুর্বলদের উপর অন্যায় অত্যাচার করছে, বিভিন্নভাবে কষ্ট দিচ্ছে, গালি দিচ্ছে, অপমান করছে, অপহরণ, গুম, খুন করছে, ধর্ষণ করছে, জোড়পূর্বক সম্পদ দখল করছে, চাঁদাবজি করছে তথা যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে আল্লাহ তায়ালাও সে ব্যক্তির অন্য যেকোনোভাবে ক্ষতি করবেন।

(১) কুতায়বা ইবন সাঈদ (রহঃ).....আবূ সারমা (রাঃ), যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ছিলেন, তার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউ অন্যের ক্ষতি করবে, মহান আল্লাহ্ তার ক্ষতি করবেন। আর যে কেউ অকারণে অন্যের প্রতি শত্রুতা করবে, আল্লাহ্ তার শত্রু হয়ে যাবেন। (সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৩৫৯৬, হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(২) আবূ সিরমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দিবে আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন। (সুনান ইবনু মাজাহ ২৩৪২, সুনান আততিরমিযী ১৯৪০, সুনান আবূ দাউদ ৩৬৩৫, আহমাদ ১৫৩২৮, ইরওয়া ৮৯৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৩) কুতায়বা (রহঃ)...আবূ সিরমা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করে আল্লাহ তা দিয়েই তার ক্ষতি করেন। যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দেয় আল্লাহও তাকে কষ্ট দেন। (সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১৯৪৬, ইরওয়া ৮৯৬, সুনান আততিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৯৪০)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৪) আবূ সিরমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক অন্য কারো ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহ তা’আলা তা দিয়েই তার ক্ষতিসাধন করেন। যে লোক অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তা’আলা তাকে কষ্টের মধ্যে ফেলেন। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৯৪০, ইরওয়া ৮৯৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৫) আবূ সিরমাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি (কোন মুসলিমকে) কষ্ট দেবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে কষ্ট দেবেন এবং যে ব্যক্তি (কোন মুসলিমকে) বিপদে ফেলবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে বিপদে ফেলবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০৪২, সুনান ইবনু মাজাহ ২৩৪২, সুনান আততিরমিযী ১৯৪০, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৩৫, ইরওয়া ৮৯৬, সহীহুল জামি‘ ৬৩৭২, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৫০, আল মুসতাদরাক ২৩৪৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১১৭১৯, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১৮২৭৫)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৬) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথী আবূ সিরমাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ অপরের ক্ষতি করলে আল্লাহ তার ক্ষতিসাধন করবেন। কেউ অযৌক্তিকভাবে কারো বিরোধিতা করলে আল্লাহ তার বিরোধী হবেন। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৬৩৫,)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৭) আবূ সিরমাহ (রাঃ) হতে বৰ্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের ক্ষতি করবে প্রতিদানে আল্লাহ তা’আলাও তার ক্ষতি করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে কষ্ট দেবে আল্লাহ তার প্রতিদানে তাকে কষ্ট দেবেন। (বুলগুল মারাম ১৫০১, সুনান আবূ দাউদ ৩৬৩৫, সুনান আততিরমিযী ১৯৪০, সুনান ইবনু মাজাহ ২৩৪২, আহমাদ ১৫৩২৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

আল্লাহর জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করার কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে যমীনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর এরপর যারা কুফরী করবে তারাই ফাসিক”। (সুরা আন নূর ৫৫)।

(১) উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাথীরা যখন মদীনায় তাশরীফ আনলেন এবং আনসারগণ তাদেরকে আশ্রয় দিলেন, তখন সমস্ত আরব এক বাক্যে তাদের শক্রতে পরিণত হলো। সাহাবাগণ তখন রাতদিন অস্ত্ৰ নিয়ে থাকতেন। তখন তারা বললোঃ আমরা কি কখনো এমনভাবে বাঁচতে পারবো যে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় না করে সন্তুষ্ট চিত্তে ঘুমাতে পারবো? তখন এ আয়াত নাযিল হয়।” (ত্ববারানী, মুজামুল আওসাত ৭/১১৯, হাদীস ৭০২৯, হাকীম- মুস্তাদরাকঃ ২/৪০১, দ্বিয়া আল-মাকদেসীঃ মুখতারাহঃ ১১৪৫)।

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনটি বিষয়ের ওয়াদা দিয়েছেন।

(১) আপনার উম্মতকে যমীনের বুকে খলীফা ও শাসনকর্তা করা হবে,

(২) আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলামকে প্রবল করা হবে এবং

(৩) মুসলিমদেরকে এমন শক্তি ও শৌর্যবীর্য দান করা হবে যে, তাদের অন্তরে শক্রর কোন ভয়ভীতি থাকবে না। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর এই ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূণ্যময় আমলে মক্কা, খাইবার, বাহরাইন, সমগ্র আরব উপদ্বীপ ও সমগ্ৰ ইয়ামান তারই হাতে বিজিত হয় এবং তিনি হিজারের অগ্নিপূজারী ও শাম দেশের কতিপয় অঞ্চল থেকে জিযিয়া কর আদায় করেন।

রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মিসর ও আলেকজান্দ্ৰিয়ার সম্রাট মুকাউকিস, আম্মান ও আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাসী প্রমুখ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপঢৌকন প্রেরণ করেন ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। তার ওফাতের পর আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু খলীফা হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তিনি তা খতম করেন এবং পারস্য, সিরিয়া ও মিসর অভিমুখে সৈন্যাভিযান প্রেরণ করেন। বসরা ও দামেস্ক তারই আমলে বিজিত হয় এবং অন্যান্য দেশেরও কতক অংশ করতলগত হয়। আবু বকর সিদ্দীকের ওফাতের খলীফা নিযুক্ত করার ইলহাম করেন।

উমার ইবনুল খাত্তাব খলীফা নিযুক্ত হয়ে শাসনব্যবস্থা এমনভাবে সুবিন্যস্ত করলেন যে, নবীগণের পর পৃথিবী এমন সুন্দর ও সুশৃংখল শাসন ব্যবস্থা আর প্রত্যক্ষ করেনি। তার আমলে সিরিয়া পুরোপুরি বিজিত হয়। এমনিভাবে মিসর ও পারস্যের অধিকাংশ এলাকা তার করতলগত হয়। তার হাতে কায়সার ও কিসরা সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়। এরপর উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ইসলামী বিজয়ের পরিধি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পাশ্চাত্য দেশসমূহ, আন্দালুস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত, দূরপ্রাচ্য চীন ভূখণ্ড পর্যন্ত এবং ইরাক, খোরাসান ও আহওয়ায ইত্যাদি সব তার আমলেই মুসলিমদের অধিকারভুক্ত হয়। (দেখুন: কুরতুবী)।

সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আমাকে সমগ্ৰ ভূখণ্ডের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত একত্রিত করে দেখানো হয়েছে।” (সহীহ মুসলিমঃ ২৮৮৯)।

আল্লাহ তা'আলা এই প্রতিশ্রুতি উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর আমলেই পূর্ণ করে দেন। অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ “খেলাফত আমার পরে ত্রিশ বছর থাকবে।” (সুনান আবু দাউদ ৪৬৪৬, সুনান আততিরমিযী ২২২৬, আহমাদ ৫/২২১)।

কুরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব

কুরআন তেলাওয়াত বুঝে করুক বা না বুঝে করুক প্রতিটি হরফের বিনিময়ে দশটি নেকী রয়েছে।

হাদিসঃ

আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের কোন একটি অক্ষরও পাঠ করবে, সে নেকী পাবে। আর নেকী হচ্ছে ’আমলের দশ গুণ। আমি বলছি না যে,(الٓمٓ) ’আলিফ লাম মীম’ একটি অক্ষর। বরং ’আলিফ’ একটি অক্ষর, ’লাম’ একটি অক্ষর ও ’মীম’ একটি অক্ষর। (তাই আলিফ, লাম ও মীম বললেই ত্রিশটি নেকী পাবে)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১৩৭, সুনান আততিরমিযী ২৯১০, সহীহাহ্ ৩৩২৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৪১৬, সহীহ আল জামি‘ ৬৪৬৯, দারিমী ৩৩১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

তবে বুঝে পাঠ করলে অতিরিক্ত ছওয়াব পাওয়া যাবে। কেননা কুরআন তেলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো উপদেশ গ্রহণ করা, যার জন্য কুরআন বুঝা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, ‘এটি এক বরকতমন্ডিত কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে লোকেরা এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে’। (সুরা ছোয়াদ ৩৮/২৯)।

তিনি আরও বলেন, তবে কি তারা কুরআন গবেষণা করে না? নাকি তাদের হৃদয়গুলি তালাবদ্ধ? (সুরা মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)।

ছাহাবায়ে কেরাম কুরআনের দশটি আয়াত শুনলে তা না বুঝে আর দশটি আয়াতের দিকে অগ্রসর হতেন না। (বায়হাক্বী হা/৫৪৯৫, ৩/১১৯; হাকেম হা/২০৪৭, ১/৭৪৩)।

তাছাড়া যারা কুরআন বুঝেনা তাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেন, আর তাদের মধ্যে একদল নিরক্ষর ব্যক্তি রয়েছে, যারা আল্লাহর কিতাবের কিছুই জানে না কেবল একটা ধারণা ব্যতীত। তারা স্রেফ কল্পনা করে মাত্র। (সুরা আল বাক্বারা ২/৭৮)।

সুতরাং কুরআন না বুঝে তেলাওয়াত করলে ছওয়াব পাওয়া যাবে। তবে বুঝে পড়া, অনুধাবন করা ও তদনুযায়ী আমল করাই কুরআন তেলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য ও অধিক ছওয়াবের কারণ। সুতরাং প্রত্যেক মুসলামানের উচিৎ সাধ্যমত কুরআন বুঝে ও অনুধাবন করে পড়া এবং তদনুযায়ী আমল করা। (ইবনুল ক্বাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘দাহ ১/১৮৭; উছায়মীন, ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব ৪৭)।

আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না?” (সুরা আল বাকারা ৪৪)।

কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক চলার ফজিলত

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“এটা সেই কিতাব; যাতে কোনো সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই। মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শক। (মুক্তাকিদের পরিচয়) যারা গায়েবে (অদৃশ্যে) বিশ্বাস করে, (ঠিকভাবে) নামাজ প্রতিষ্ঠা করে ও তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) খরচ করে।

যারা বিশ্বাস করে আপনার (রাসুলের) প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি এবং তোমার আগে যা অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি এবং যারা পরকালের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। উহারাই স্বীয় রবের প্রদর্শিত পথে অবস্থিত এবং তাহারাই মুক্তি পাবে।” (সুরা বাকারা: আয়াত ২-৫)।

কুরআন মহান আল্লাহর পবিত্র কালাম। যারা আল্লাহকে ভালোবাসে, তারা পবিত্র কুরআনকে ভালোবাসে। কেননা পবিত্র কুরআনকে ভালোবাসাও ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। কুরআন ঈমানদারকে আলোকিত করে।

কুরআন ঈমানদারের অন্তরকে পাপের মরিচা থেকে পরিষ্কার করে। কুরআন ঈমানদারকে সত্য উপলব্ধি করতে সহযোগিতা করে। কুরআনের প্রেমে ঈমানদারের চোখ থেকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অশ্রু ঝরে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন,

“এবং যখন তারা রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা শ্রবণ করে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য তুমি তাদের চক্ষু অশ্রুবিগলিত দেখবে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বিশ্বাস করেছি। অতএব, তুমি আমাদের (সত্যের) সাক্ষীদের দলভুক্ত করো।” (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮৩)।

যারা দুনিয়াতে কুরআন চর্চা করবে, সে অনুযায়ী জীবন সাজাবে, কুরআনের প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করবে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাদের সম্মানিত করবেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কুরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি (আখিরাতে) সম্মানিত নেককার লিপিকার ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে ব্যক্তি তা পাঠ করে এবং এটা তার পক্ষে খুবই কঠিন ও কষ্টকর, সে দুটি পুরস্কার পাবে।’ (সুনান আততিরমিজি ২৯০৪, সহীহ আবূ দাউদ ১৩০৭, বুখারী ও মুসলিম)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, কিয়ামতের দিন কুরআন, তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে। (হাদীস সম্ভার ১৪১০, মুসলিম)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন এই কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে। (হাদীস সম্ভার ১৪১১, ইবনে হিব্বান ১২৪, সহীহ তারগীব ১৪২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সাহল ইবনু মু’আয আল-জুহানী (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তদনুযায়ী আমল করে, ক্বিয়ামতের দিন তার পিতা-মাতাকে এমন মুকুট পরানো হবে যার আলো সূর্যের আলোর চাইতেও উজ্জল হবে। ধরে নাও, যদি সূর্য তোমাদের ঘরে বিদ্যমান থাকে (তাহলে তার আলো কিরূপ হবে?)। তাহলে যে ব্যক্তি কুরআন অনুযায়ী আমল করে তার ব্যাপারটি কেমন হবে, তোমরা কি তা ধারণা করতে পার! (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ১৪৫৩, আহমাদ (৩/৪৪০)।

আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআন পাঠকারীকে কিয়ামতের দিন বলা হবে, পাঠ করতে থাকো আর উপরে উঠতে থাকো। (অক্ষরে অক্ষরে ও শব্দে শব্দে) সুস্পষ্টভাবে পাঠ করতে থাকো, যেভাবে দুনিয়াতে স্পষ্টভাবে পাঠ করতে। কারণ তোমার স্থান (মর্যাদা) হবে যা তুমি পাঠ করবে শেষ আয়াত পর্যন্ত (আয়াত পাঠের তুলনাগত দিক থেকে)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১৩৪, সুনান আবূ দাঊদ ১৪৬৪, সুনান আততিরমিযী ২৯১৪, সহীহাহ্ ২২৪০, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৭৯০, সহীহ আত্ তারগীব ১৪২৬, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২৪২৫)।  হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

আলী ইবনু আবূ ত্বলিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে ও একে মুখস্থ করে, এর হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম মেনে চলে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তার পরিবারের এমন দশ ব্যক্তির জন্য তার সুপারিশ কবূল করবেন, যাদের প্রত্যেকেরই নিশ্চিত ছিল জাহান্নাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১৪১,  সুনান আততিরমিযী ২৯০৫, সুনান ইবনু মাজাহ ২১৬, আহমাদ ১২৬৮, শু‘আবূল ঈমান ১৭৯৬)।

যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ)....আমির ইবনু ওয়াসিলাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। নাফি’ ইবনু আবদুল হারিস (রাযিঃ) উসফান নামক স্থানে উমর (রাযিঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। উমর (রাযিঃ) তাকে মক্কায় (রাজস্ব আদায়কারী) নিয়োগ করলেন। অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি প্রাস্তরবাসীদের জন্য কাকে কাজে নিয়োগ করেছ? সে বলল- ইবনু আবযা-কে। উমর (রাযিঃ) বললেন, ইবনু আবযা কে? সে (নাফি’) বলল, আমাদের আযাদকৃত ক্রীতদাসের একজন। উমর (রাযিঃ) বললেন, তুমি একজন ক্রীতদাসকে তাদের জন্য তোমার স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ করেছ? নাফি বললেন- সে (ক্রীতদাসটি) মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কিতাবের একজন ভাল কারী বা আলিম। আর সে ফারায়িয শাস্ত্রেও অভিজ্ঞ।

তখন উমর (রাযিঃ) বললেনঃ তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা এ কিতাব দ্বারা অনেক জাতিকে মর্যাদায় উন্নীত করেন আর অন্যদের অবনত করেন। অর্থাৎ যারা এ কিতাবের অনুসারী হবে তারা দুনিয়ায় মর্যাদাবান এবং আখিরাতে জান্নাত লাভ করবে। আর যারা একে অস্বীকার করবে তারা দুনিয়ায় লাঞ্ছিত পরকালে জাহান্নামে পতিত হবে।  (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)  ১৭৮২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮১৭,  মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১১৫, সুনান ইবনু মাজাহ ২১৮, আহমাদ ২৩২, দারিমী ৩৪০৮, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫১২৫, শু‘আবূল ঈমান ২৪২৮, সহীহাহ্ ২২৩৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

“আমার পক্ষ হতে তোমাদের কাছে সৎ পথের নির্দেশ আসলে যে ব্যক্তি আমার সেই নির্দেশ মেনে চলবে সে বিভ্রান্ত হবে না এবং দুঃখ-কষ্ট পাবে না। আর যে ব্যক্তি আমার যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্য হবে দুনিয়ায় সংকীর্ণ জীবন এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? দুনিয়ায় আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। তিনি বলবেন, এভাবেই তো আমার আয়াত তোমার কাছে এসেছিল। কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। এভাবেই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হচ্ছে’’। (সূরা তোহা: ১২৩)।

কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক আমল না করার পরিনতি

অনৈসলামিক দলগুলোর মধ্যে হাজার হাজার আলেম ওলামা, পীর-মাশায়েখ তথা কুরআন ও হাদিসে অধিক অভিজ্ঞ আলেম আছেন। একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কীভাবে চলবে তা কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, কুরআনের এইসব নির্দেশনা অনৈসলামিক দলগুলোর আলেমগণ জানা সত্বেও তারা মেনে চলছে না। অনেকে জানা ইলম গোপন রাখছে, অনেকে ভুল ফতোয়া দিয়ে ইসলামি শাসন ব্যবস্থাকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করছে। কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় সংস্কার করতে যারা চায় না সেইসব আলেম, শাসক বা নেতাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।

 (১) ইলম অনুযায়ী আমল না করা আল্লাহর ক্রোধের কারণঃ

জ্ঞানার্জন নিঃসন্দেহে এক মহৎ ইবাদত, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ জ্ঞানীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, ‘তুমি বল, যারা জানে (বিজ্ঞ) এবং যারা জানে না (অজ্ঞ), তারা কি সমান?’ (সুরা যুমার ৩৯/৯)।

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন’। (সুরা মুজাদালা ৫৮/১১)।

অত্র আয়াত দু’টির মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের মর্যাদা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ইলম হাছিলের এই মহৎ ইবাদতটিই এক ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হয়, যখন তা কর্মে রূপান্তরিত না হয়। যে জ্ঞান ব্যক্তিকে আল্লাহর অনুগত করার কথা, আমলের অভাবে সেই জ্ঞানই তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে ক্রোধের পাত্র বানিয়ে দেয়। কথা ও কাজের এই অমিলকে আল্লাহ সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করেন। যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নিকটে বড় ক্রোধের বিষয় হ’ল, তোমরা যা বল তা কর না?’ (সুরা ছফ ১১৪/৩)।

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি লোকদের সৎকাজের আদেশ দাও এবং নিজেদের বেলায় তা ভুলে যাও? অথচ তোমরা আল্লাহর কিতাব (তাওরাত) পাঠ করে থাকো। তোমরা কি বুঝো না?’ (সুরা বাক্বারাহ ২/৪৪)।

অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী, ইমাম ইবনে কাছীর, ইমাম বাগাভী সহ প্রমুখ মুফাসসিরীনে কেরাম নিম্নের হাদীছটি উল্লেখ করেছেন।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘মে‘রাজের রাতে আমি এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাদের ঠোঁটগুলো আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে জিবরীল! এরা কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এরা আপনার উম্মতের সেই সব বক্তা, যারা এমন কথা বলত যা তারা নিজেরা করত না। তারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করত, কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করত না’। (বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৪৬১৩; ছহীহুত তারগীব হা/১২৫)।

এই কথাগুলো কোন সাধারণ পাপীর জন্য নয়। এটা একজন ব্যবসায়ীর জন্য নয়, যে মাপে কম দিয়েছে। এটা একজন শ্রমিকের জন্য নয়, যে কাজে ফাঁকি দিয়েছে। এটা সরাসরি সেইসব জ্ঞান বহনকারী, বক্তা ও উপদেশদাতাদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। যারা অন্যদের জন্য মিম্বর সাজায়, কিন্তু নিজেদের জন্য কোন ইবাদতের আসন পাতে না। যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, তার মর্ম বুঝে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করতে গেলেই তাদের হৃদয় পাথরের মত শক্ত হয়ে যায়। তাদের বলা প্রতিটি কথা, লেখা প্রতিটি অক্ষর, তাদের দেওয়া প্রতিটি নছীহত, ফেইসবুকে দেওয়া প্রতিটি স্ট্যাটাস কি আমাদের মুক্তির জন্য সুফারিশ করবে, নাকি আগুনের কাঁচি হয়ে তাদেরই ধরবে? এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আগে দুনিয়াতেই তাদের সংশোধন হওয়া উচিত। তারা মানুষকে দেখায়, কীভাবে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হয়, অথচ তাদের নিজেদের ভেতরের পাপের আগুন নেভানোর কোন চেষ্টা করে না। তারা লোকদের বলে, ‘ছালাত কায়েম কর’। অথচ তাদের নিজেদের ছালাতে সেই খুশূ-খুযূ নেই।

তাছাড়া কোন ব্যক্তি বা সমাজের ওপর থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যাওয়ার একটি স্পষ্ট লক্ষণ হ’ল- তাদের মধ্যে আমলের চেয়ে তর্কের প্রাধান্য বেড়ে যাওয়া। তারা আত্মশুদ্ধি ও কর্মের ময়দান ছেড়ে অপ্রয়োজনীয় বাহাছ ও বিতর্কের চোরাগলিতে হারিয়ে যায়। ইমাম আওযাঈ (৮৮-১৫৭হি.) এই আধ্যাত্মিক ব্যাধিকে চিহ্নিত করে বলেন, ‘মহান আল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের অকল্যাণ চান, তখন তাদের মাঝে তর্ক-বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং আমল সম্পাদনের তাওফীক্ব থেকে তাদের বঞ্চিত করেন’। (ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার‘ঈয়্যাহ (দামেশক : মাকতাবাতু ‘আলামিল কুতুব, তাবি), ১/২০২)।

একইভাবে মা‘রূফ আল-কারখী (মৃ. ২০০হি.) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ কোন বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তার জন্য আমলের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং তার জন্য তর্ক-বিতর্কের দুয়ার বন্ধ করে দেন। আর যখন তিনি কোন বান্দার অকল্যাণের ইচ্ছা করেন, তার জন্য আমলের দরজা বন্ধ করে দেন এবং তর্ক-বিতর্কের দরজা উন্মুক্ত করে দেন’। (আবূ নু‘আইম আস্ফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৮/৩৬১)।

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা সালাফদের এই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই। ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন গ্রুপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতের পর রাত ধরে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। কে সঠিক আর কে বেঠিক, তা প্রমাণ করার জন্য যে পরিমাণ মেধা, সময় ও শক্তি ব্যয় করা হয়, তার সামান্য অংশও যদি আত্মশুদ্ধি বা কোন গঠনমূলক কাজে ব্যয় করা হ’ত, তাহ’লে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের চেহারাই পাল্টে যেত। আবার দেখা যায়, অনেকেই ফিক্বহের সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে তর্কে লিপ্ত, কিন্তু নিজেরা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতে উদাসীন। অনেকেই অন্যের আক্বীদা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ব্যস্ত, কিন্তু নিজের চরিত্র ও আখলাক সংশোধনে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। এই অবস্থাই প্রমাণ করে, আমরা তর্কের দ্বার উন্মুক্ত করেছি, কিন্তু আমলের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছি।

এ প্রসঙ্গে রাসুল সা. বলেন,

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তোমরা উলামাগণের সাথে তর্ক-বাহাস করার উদ্দেশ্যে ইল্ম শিক্ষা করো না, ইল্ম দ্বারা মূর্খ লোকেদের সাথে বাগ্বিতণ্ডা করো না এবং তদ্বারা আসন, পদ বা নেতৃত্ব) লাভের আশা করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তা করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।” (সুনান ইবনে মাজাহ ২৫৪, ইবনে হিব্বান ৭৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭১, সহীহ তারগীব ১০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

(২) আলেমের কথার প্রভাব কমে যায়ঃ

আমল হ’ল আলেমের কথার প্রাণ। একজন আমলকারী আলেমের মুখ থেকে নিঃসৃত সাধারণ কথাও মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে, অন্যদিকে আমলহীন আলেমের জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও শ্রোতার কানে প্রবেশ করলেও অন্তরে পৌঁছাতে পারে না। তার কথায় কোন আধ্যাত্মিক প্রভাব বা ‘নূর’ থাকে না। ফলে মানুষ তার দ্বারা বাহ্যিকভাবে প্রভাবিত হ’লেও আত্মিকভাবে উপকৃত হয় না। কথা ও কাজের এই বিচ্ছিন্নতা আল্লাহর কাছে যেমন নিন্দনীয়, মানুষের কাছেও তা গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মালেক ইবনু দীনার (রহঃ) এ অবস্থাকে একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘যখন আলেম তার ইলম অনুযায়ী আমল করে না তখন তার উপদেশ মানুষের অন্তর থেকে পিছলে যায়, যেভাবে মসৃণ পাথরের ওপর থেকে বৃষ্টি ফোঁটা পিছলে পড়ে’। (আহমাদ ইবনে হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাশিয়া: মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম শাহীন (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, প্রথম মুদ্রণ, ১৯৯৯খৃ.), পৃ. ২৬২; ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া,তাহক্বীক: আহমাদ ইবনে আলী (কায়রো: দারুল হাদীছ, ২০০০খ্রিঃ), ২/১৬৭)।

এই উপমাটি আজকের ডিজিটাল যুগের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিভিন্ন প্লাটফর্মে আমরা অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনি। বক্তার উপস্থাপনা, ভাষার মাধুর্য আর তথ্যের গভীরতায় আমরা বিমুগ্ধ হই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেই প্রভাব হারিয়ে যায়। কিন্তু এটা হয় কেন? কারণ শ্রোতার অন্তর অবচেতনভাবেই বক্তার কথা ও কাজের মিল খোঁজে। যখন শ্রোতা জানতে পারে বা অনুভব করে যে, যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সততা, বিনয় বা আল্লাহর ভয় নিয়ে কথা বলছেন, তার ব্যক্তিগত জীবনে এগুলোর ছিটেফোঁটাও নেই, তখন তার অন্তর সেই উপদেশকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কথাগুলো মসৃণ পাথরের ওপর পড়া বৃষ্টির ফোঁটার মতই হয়। মুহূর্তের জন্য ভেজা মনে হ’লেও পরক্ষণেই শুকিয়ে যায়, কোন দাগ বা প্রভাব রেখে যায় না। অন্তর সেই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তা প্রাণহীন ও কপটতায় পূর্ণ।

আমলহীন আলেমের চূড়ান্ত পরিণতি কতটা ভয়াবহ, তা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক মর্মান্তিক উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে কল্যাণ শিক্ষা দেয়, কিন্তু নিজেকে ভুলে যায়, তার উদাহরণ হ’ল সেই প্রদীপের মতো, যা অন্যকে আলো দেয়, কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে’। (ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১৩১; সনদ হাসান। রাবী সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ))।

এর চেয়ে বড় আফসোস আর কী হ’তে পারে? একজন আলেম বা দাঈ, যার কথায় প্রভাবিত হয়ে শত শত মানুষ নিজেদের জীবন পরিবর্তন করেছে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছে। অথচ ক্বিয়ামতের দিন দেখা যাবে, সেই আলেম নিজেই ধ্বংসপ্রাপ্ত। তার জ্ঞান অন্যদের জন্য আলো হ’লেও, নিজের জন্য হয়েছে আগুন। সে ছিল কেবল একটি মাধ্যম, একটি প্রদীপ, যা অন্যকে আলোকিত করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকেই জ্বালিয়ে শেষ করে দিয়েছে। এই আত্মপ্রবঞ্চনা ও আত্মঘাতী পরিণতি থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।

আমলহীন জ্ঞানী ব্যক্তি শুধু আল্লাহর কাছেই নয়, মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মানুষের ফিৎরাত বা স্বভাব-প্রকৃতি সত্য ও সততাকে ভালোবাসে। তারা এমন নেতা বা আলেমকে অনুসরণ করতে চায়, যার কথা ও কাজের মধ্যে কোন ফারাক নেই।

এই শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরে ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী (৫০-১২৪হি.) বলেন, ‘মানুষ কখনোই এমন আলেমের কথায় সন্তুষ্ট হবে না, যে ইলম অনুযায়ী আমল করে না। অনুরূপ এমন আমলকারীর প্রতিও সন্তুষ্ট হয় না, যার ইলম নেই’। (খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমি ওয়াল-আমাল, মুহাক্কিক্ব: নাছিরুদ্দীন আলবানী (বৈরূত : আল-মাকতাব আল-ইসলামী, ৫ম মুদ্রণ, ১৪০৪হি./১৯৭৪খৃ.), পৃ. ২৫)।

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘মানুষের কাছে এমন আমলকারীর কথা গ্রহণযোগ্য হয় না, যে আমল করে না। অনুরূপভাবে আমলহীন আলেমের কথার উপরেও মানুষ সন্তুষ্ট হতে পারে না’। (ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব, তাহক্বীক: আমর আল-আমরী (বৈরূত : দারুল ফিক্র, ১৪১৫হি./১৯৯৫খৃ.) ৪৯/২১৬)।

অর্থাৎ শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না, আমলও করতে হবে। আবার শুধু আমল করলেও চলবে না, সেটা হ’তে হবে সঠিক জ্ঞানভিত্তিক।

আমরা যারা দ্বীনের কথা বলি, জ্ঞানের কথা শেয়ার করি, হোক তা পরিবারের ক্ষুদ্র পরিসরে বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিশাল জগতে, আমাদের প্রত্যেকের জন্য এই বাণীগুলো এক একটি আয়না। আমাদের কথাগুলো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করছে, নাকি মসৃণ পাথর থেকে পিছলে পড়ছে? আমরা কি অন্যদের জন্য আলো বিলিয়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলছি? সব সময় এই প্রশ্নগুলো মনে রাখা প্রয়োজন। কারণ মানুষের প্রতিটি কথার শক্তি লুকিয়ে থাকে তার আমলের মাঝে। আমল যত বিশুদ্ধ ও আন্তরিক হবে, তার কথার প্রভাবও তত গভীর ও স্থায়ী হবে।

(৩) আমলহীন মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ঃ

ইলম বা জ্ঞান হ’ল গন্তব্যে পৌঁছার জন্য মানচিত্র স্বরূপ। কোন মুসাফির যদি মানচিত্র হাতে পেয়েও তদনুযায়ী পথ না চলে, তিনি যেমন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না, ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেন কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করেন না, তিনিও হেদায়াতের পথে থেকেও বিচ্যুত হয়ে যান। এটি এক ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ জ্ঞানের অহংকার তাকে ভাবতে বাধ্য করে যে তিনি সঠিক পথেই আছেন, অথচ বাস্তবে তিনি বিভ্রান্তির এক গভীর সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন। যাদের কথার সাথে কাজের মিল থাকে না এবং জ্ঞানের সাথে আমলের সমন্বয় থাকে না তাদের উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাওরাত বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, অতঃপর তারা তা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হ’ল গাধার মত, যে কিতাবের বোঝাসমূহ বহন করে। (সুরা জুম‘আ ৬২/৫)।

অত্র আয়াতটি ইহুদীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে তাকালে বর্তমান সমাজের মুসলিমদের এক অদ্ভুত চিত্রায়ণ দেখা যায় এই আয়াতে। সমাজে এমন অসংখ্য পুরুষকে দেখা যায়, যারা জুম‘আর খুৎবায় সূদকে জাহান্নামের আগুন জেনেও অবলীলায় সূদী লেনদেনে ডুবে থাকে। যারা ছালাতের গুরুত্ব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করেন, কিন্তু ফজরটা তাদের ঘুমের কাছে পরাজিত হয়। মানুষকে ভালো কাজ করার সবক দেন, কিন্তু নিজের জীবনে সেই ভালো কাজের প্রভাব অনুপস্থিত। একইভাবে, এমন অগণিত নারী আছেন, যারা পর্দার প্রতিটি আয়াত ও হাদীছ মুখস্থ জানেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্দার পক্ষে শত শত পোস্ট শেয়ার করেন, কিন্তু পারিবারিক অনুষ্ঠানে বা ব্যক্তিগত জীবনে সেই পর্দার লেশমাত্র অবশিষ্ট থাকে না। তারা উত্তম স্ত্রী ও মায়ের গুণাবলী বিষয়ক লেকচার শুনে চোখে পানি আনেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে স্বামী, সন্তান-সন্ততি এবং শ^শুর-শাশুড়ী, পুত্রবধুর সাথে তাদের আচরণে সেই জ্ঞানের কোন কোমলতা বা ধৈর্য ফুটে ওঠে না। এই মানুষগুলো যেন সেই জ্ঞান বহনকারী গাধার আধুনিক সংস্করণ। তাদের স্মার্টফোনে, ল্যাপটপে আর বইয়ের সেলফে জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার সংরক্ষিত আছে। তারা জ্ঞানের ভারে ন্যুব্জ, কিন্তু সেই জ্ঞানের আলো তাদের অন্তরকে আলোকিত করতে পারেনি, তাদের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করতে পারেনি, তাদের লেনদেনকে পবিত্র করতে পারেনি। গাধা যেমন তার পিঠের ওপর রাখা বইয়ের ভার অনুভব করে মাত্র, বইয়ের ভেতরের জ্ঞান থেকে সে চিরকাল বঞ্চিত, তেমনি এই আমলহীন জ্ঞানীরাও কেবল তথ্যের বোঝা বহন করে বেড়ায়; হেদায়াতের নূর তাদের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছায় না।

সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (২০৩-২৮৩হি.) বলেন, ‘আলেমগণ ছাড়া সকল মানুষ দিকভ্রান্ত। আর অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমলকারী ছাড়া সকল আলেম দিশেহারা’। (আব্দুর রঊফ মুনাভী, ফায়যুল ক্বাদীর (মিসর : আল-মাকাবাতুত তিজারিইয়াহ আল-কুবরা, ১ম মুদ্রণ, ১৩৫৬হি.) ৫/৫১০; ইক্বতিযাউল ইলমি ওয়াল আমাল, পৃ. ২৮)।

অর্থাৎ সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, আর আলেমরা জ্ঞানের বিশালতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই দিশেহারা অবস্থা থেকে কেবল তারাই মুক্তি পায়, যারা তাদের জ্ঞানকে কর্মে রূপান্তরিত করে পথের দিশা খুঁজে নেয়। মালেক ইবনে দীনার (মৃ. ১৪০ হি.) বলেন, ‘বান্দা যখন আমলের জন্য ইলম অন্বেষণ করে, তখন তার ইলম তাকে চূর্ণবিচূর্ণ (বিনয়ী) করে দেয়। আর যখন সে অন্য কোন উদ্দেশ্যে তা অন্বেষণ করে, তখন এর দ্বারা তার পাপাচার ও অহংকারই বৃদ্ধি পায়’। (ইক্বতিযাউল ইলমি ওয়াল আমাল, পৃ. ৩২)।

বর্তমান সময়ে অনেকেই সামান্য জ্ঞান অর্জন করেই নিজেকে অন্যদের চেয়ে জ্ঞানী ভাবতে শুরু করেন। তাদের জ্ঞান তাদেরকে আল্লাহর সামনে নত করার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সামনে অহংকারী করে তোলে। তারা তাদের জ্ঞানকে মানুষের ভুল ধরা এবং নিজেকে যাহির করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। মূলত এমন ব্যক্তিরাই জ্ঞানের অহংকার করে থাকেন, ফলে এই জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের গুনাহের পাল্লা ভারী হ’তে থাকে। যারা খালেছ নিয়তে ইলম শিখে না, তাদের ক্ষেত্রেই সাধারণত এমনটা ঘটে থাকে। অন্যদিকে যারা একনিষ্ঠ নিয়তে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করেন, তারা যতই জানেন ততই নিজের অজ্ঞতা ও দ্বীনতা উপলব্ধি করেন। তাদের জ্ঞান তাদেরকে আল্লাহর বিশালতার সামনে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়, ফলে তারা হন বিনয়ী, কোমল ও ক্ষমাশীল প্রকৃতির মানুষ।

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘বিদ্যা নিয়ে গর্ব করা আল্লাহর নিকট সম্পদ ও মর্যাদা নিয়ে গর্ব করার চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা সে (জ্ঞানের অহংকারী) আখেরাতের উপকরণকে দুনিয়ার জন্য ব্যবহার করেছে। আর সম্পদ ও মর্যাদার মালিক তো দুনিয়ার উপকরণকে দুনিয়ার জন্যই কাজে লাগিয়েছে এবং সেখানেই প্রতিযোগিতা করেছে’। (ইবনুল ক্বাইয়িম, উদ্দাতুছ ছাবেরীন (মদীনা মুনাওয়ারা: মাকতাবাতুত তুরাছ, ২য় সংস্করণ, ১৪০৯হি./১৯৮৯খৃ.), পৃ. ১৭১)।

(৪) আমল না করলে ইলম থাকে নাঃ

জ্ঞান বা ইলম কোন জড় বস্ত্ত নয় যে, তা অর্জন করার পর আজীবন সিন্দুকে জমা থাকবে। বরং ইলম এক জীবন্ত সত্তার মত, যার প্রাণ হ’ল ‘আমল’। যখন আমলের মাধ্যমে এর যত্ন নেওয়া হয়, তখন তা বৃদ্ধি পায়, আলোকিত হয় এবং ব্যক্তির জীবনে স্থিতি লাভ করে। কিন্তু মানুষ যখন আমল থেকে বিমুখ হয়, তখন অভিমানী অতিথির মত ইলম বিদায় নেয়, রেখে যায় কেবল শূন্যতা আর আফসোস। এজন্য আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলতেন, ‘তোমরা ইলম শেখ, জ্ঞান অর্জন কর। আর যখন ইলম অর্জন হয়ে যাবে, তখন আমল করতে থাক’। (ইবনু আব্দিল বার্র, জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী (সঊদী আরব: দারু ইবনিল জাওযী, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৪হি./১৯৯৪খৃ.) ১/৭০৫)।

সুফিয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.) বলেন,‌‌ ‘ইলম আমলকে কানে কানে আহবান জানায়। আমল যদি তার ডাকে সাড়া দেয়, তবে সে উপস্থিত থাকে, অন্যথা সে (ব্যক্তির কাছ থেকে) প্রস্থান করে’। (ইবুল ক্বাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাত (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি), ১/১০০; ইবনু কুতাইবা আদ্দীনওয়ারী, উয়ূনুল আখবার (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, ১৪১৮হি.), ২/১৪০)।

একবার ভাবুন, কী গভীর কথা! জ্ঞান যেন নিজ থেকেই তার অধিকার দাবী করে। যদি আমরা সেই ডাকে সাড়া দেই, তবে সেই জ্ঞান আমাদের অন্তরে গেঁথে যায়, আমাদের পথ দেখায় এবং বরকতে পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু যদি সাড়া না দেই? তখন জ্ঞান আমাদের থেকে প্রস্থান করে।

একজন ব্যক্তির জীবন থেকে জ্ঞানের প্রস্থান বিভিন্নভাবে হ’তে পারে। যেমন :

(ক) স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার মাধ্যমে। কারণ যে জ্ঞান ব্যবহার করা হয় না, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে তা ভুলে যায়। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম।

(খ) তাওফীক্ব কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে। অনেক সময় জ্ঞান মাথায় থাকে, কিন্তু তদনুযায়ী আমল করার ইচ্ছা বা তাওফীক্ব আল্লাহ কেড়ে নেন। জ্ঞান তখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং পথ দেখানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

(গ) বরকত নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে। জ্ঞানটি হয়ত আমাদের মুখস্থ থাকে, আমরা অন্যদের বলতেও পারি, কিন্তু সেই জ্ঞানের নূর ও আধ্যাত্মিক প্রভাব আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। অন্তর সেই জ্ঞানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না।

আমল না করলে যে ইলম থাকে না, তা উপলব্ধির জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন কেউ অনেক মেহনত করে সকাল-সন্ধ্যার পঠিতব্য দো‘আগুলো মুখস্থ করল। এখন তিনি যদি নিয়মিত এই দো‘আগুলো পাঠের মাধ্যমে জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ না করেন, তবে অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সব দো‘আ ভুলে যাবেন। আর এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

(৫) আমল ছাড়া ইলমের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় নাঃ

ইলম বা জ্ঞানের এক আধ্যাত্মিক স্বাদ রয়েছে, যা বইয়ের পাতায়, মুখস্থের প্রতিযোগিতায় বা বিতর্কের আসরে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ইলাহী স্বাদ ও তৃপ্তি কেবল তখনই অনুভূত হয়, যখন জ্ঞানকে কর্মে বা আমলে বাস্তবায়ন করা হয়। যে ব্যক্তি তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী নিজের জীবনকে সাজায়, তার অন্তর এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি, আনন্দ এবং নূর দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। এই অনুভূতিটা আমলকারী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ উপলব্ধি করতে পারে না।

জ্ঞান অর্জনের পর তা দু’টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হ’তে পারে। একটি পথ আনন্দের, অন্যটি অহংকারের। আর এই পার্থক্য নির্ভর করে ব্যক্তির নিয়তের ওপর, তিনি কি আমল করার জন্য শিখছেন, নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্যে? এই বিষয়টি তুলে ধরে মালেক ইবনু দীনার (রহঃ) বলেন, ‘যখন কোন ব্যক্তি আমল করার জন্য ইলম অর্জন করে, তখন তার ইলম তাকে আনন্দিত করে। আর যখন সে আমল করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করে, তখন সেই ইলম তার অহংকার বাড়িয়ে দেয়’। (ইবনু হিববান (আবূ হাতেম বুস্তী), রাওযাতুল উক্বালা (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি), পৃ. ৩৫)।

ধরুন! আপনি শিখলেন যে, কোন ভাইয়ের সাথে মুচকি হেসে কথা বলা ছাদাক্বা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৯১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৮৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬২৬, সুনান আত্ তিরমিযী ১৯৭০, আহমাদ ১৪৮৭৭, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৬৪২, সহীহ আত্ তারগীব ২৬৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৫১, ইসলামিক সেন্টার ৬৫০২)।  হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এই জ্ঞানটুকু জানার মধ্যে এক প্রকার আনন্দ আছে। কিন্তু যখন আপনি বাস্তবে একজন ভারাক্রান্ত মুসলিম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আন্তরিকভাবে হাসবেন এবং তার চেহারায় এক ঝলক স্বস্তি ফুটে উঠতে দেখবেন, তখন আপনার অন্তরে যে নির্মল আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভূত হবে সেটাই হ’ল ইলমের আসল স্বাদ। আপনার জ্ঞান তখন জীবন্ত হয়ে উঠবে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি কেবল বিতর্কে জেতার জন্য, নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করার জন্য বা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্ট পাওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জন করে, তার জ্ঞান তাকে আনন্দ দেয় না; বরং অহংকারী করে তোলে। সে হয়তো কুরআন-হাদীছের অসংখ্য রেফারেন্স মুখস্থ বলতে পারে, কিন্তু তার আচরণে বিনয় থাকে না, ক্ষমা থাকে না, দয়া থাকে না। তার জ্ঞান তার জন্য এক ভারী বোঝা, যা তাকে আল্লাহর কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে অহংকারী বানায়।

তবে নতুন কিছু জানা, অজানাকে বোঝা- এতে এক ধরনের দুনিয়াবী আনন্দ আছে। কিন্তু সেই আনন্দকে যখন আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা আখেরাতের সীমাহীন আনন্দের পাথেয় হয়ে যায়। সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (২০৩-২৮৩হি.) বলেন, ‘জ্ঞান দুনিয়ার অন্যতম উপভোগ্য বিষয়। আর সেই জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমল করা হয়, তবে সেটা আখেরাতের জন্যও উপভোগ্য হয়ে যায়’। (ইক্বতিযাউল ইলমি আল-আমাল, পৃ. ২৯)।

যেমন কোন বান্দা তাহাজ্জুদের ফযীলত সম্পর্কে জানল, সেটা তার জন্য দুনিয়ার একটি জ্ঞানগত আনন্দ। কিন্তু যখন তিনি নিশুতি রাতে অলসতা ছুড়ে ফেলে ছালাতে দাঁড়াবেন, সিজদায় আল্লাহর সাথে একান্তে কথা বলবেন, হৃদয় খুলে নিজের আর্জিগুলো সৃষ্টিকর্তার কাছে ব্যক্ত করবেন, তখন তিনি যে অপার্থিব স্বাদ ও প্রশান্তি পেলেন, তা সরাসরি আখেরাতের সাথে যুক্ত হয়ে গেল।

বান্দা যখন অর্জিত জ্ঞানের আলোকে আমল করেন এবং এর জ্ঞানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন, তখন তিনি তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতির ময়দানে বিচরণ করতে পারেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সেই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেম বা জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’। (সুরা ফাতির ৩৫/২৮)।

এই আয়াত প্রমাণ করে, সত্যিকারের জ্ঞানের চূড়ান্ত ফলাফল হ’ল আল্লাহভীতি বা পরহেযগারিতা, যা অন্তরের একটি আমল এবং বাহ্যিক সকল আমলের চালিকাশক্তি। যার জ্ঞান তাকে আল্লাহর ভয়ে ভীত করতে পারে না, সে ইলমের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।

সুতরাং ইসলামে জ্ঞান অর্জন কোন বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি পবিত্র আমানত এবং একটি গুরু দায়িত্ব। এই আমানতের হক তখনই আদায় হয়, যখন জ্ঞানকে আমলে রূপান্তরিত করা হয়। নতুবা সেই জ্ঞানই ব্যক্তির জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাত্বার আল-ওয়া‌র্রাক (মৃ. ১২৯ হি.) বলেন,‌ ‘সর্বোত্তম জ্ঞান সেটাই, যা উপকার করে। আর আল্লাহ তো কেবল সেই ব্যক্তিকেই জ্ঞানের দ্বারা উপকৃত করেন, যে তা শিখেছে এবং সে অনুযায়ী আমল করেছে। তিনি সেই ব্যক্তিকে এর দ্বারা উপকৃত করেন না, যে তা শিখেছে, কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করেছে’। (বায়হাক্বী, আল-মাদখাল ইলা সুনানিল কুবরা, পৃ. ৩২৬)।

অর্থাৎ জ্ঞানের পরিমাণ দিয়ে তার উপকারিতা মাপা হয় না; বরং তার প্রভাব ও আমল দিয়ে মাপা হয়। যে জ্ঞান ব্যক্তিকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, তার চরিত্রকে সুন্দর করে এবং তাকে আরও বিনয়ী করে তোলে, সেটাই প্রকৃত উপকারী জ্ঞান।

ইয়াহ্ইয়া ইবনে মু‘আয আর-রাযী (মৃ. ২৫৮ হি.) বলেন, ‘সেই ব্যক্তি কতই না দুর্ভাগা, যার জ্ঞানই (কিবয়ামতের দিন) তার বিপক্ষে বিতর্ককারী হবে, যার জিহবা তার প্রতিপক্ষ হবে এবং যার বোধশক্তিই তার (আমল না করার) পক্ষে চূড়ান্ত অজুহাত পেশকারী হবে’। (খতীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমি আল আমল, পৃ. ৫৩)।

সুতরাং আমরা যেন জ্ঞানকে কেবল মস্তিষ্কের অলংকার না বানাই; বরং এটাকে আত্মার খোরাক ও কর্মের চালিকাশক্তিতে পরিণত করি। প্রতিটি জ্ঞানের পর যেন আমাদের একটি আমল বৃদ্ধি পায়। তবেই আমরা ইলমের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাদ লাভ করতে পারব, যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতকেই আলোকিত করবে।

(৬) আমল ছাড়া ইলমের নূর নিভে যায়ঃ

ইলম কোন সাধারণ জাগতিক বস্ত্ত নয়। এটি আসমান থেকে নেমে আসা এক ইলাহী নূর, যা আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের অন্তরে দান করেন। এই পবিত্র নূরকে ধারণ করার জন্য আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে একটি পাত্র দিয়েছেন। আর তা হ’ল আমাদের ক্বলব বা হৃদয়। আর ‘আমল’ বা কর্ম হ’ল সেই পাত্রের যত্নশীলতা ও পবিত্রতা রক্ষা করার মাধ্যম। যখন কর্মবিমুখতার পাপ, অলসতার কালিমা আর অহংকারের ধুলো সেই হৃদয়পাত্রকে কলুষিত ও অন্ধকার করে ফেলে, তখন ইলাহী জ্ঞানের পবিত্র আলো আর সেখানে স্থির থাকতে পারে না, ধীরে ধীরে সে আলো নিভে যায়, রেখে যায় কেবল জ্ঞানের খোলসটুকু। জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদ বাগদাদী (২১৫-২৯৮হি.) বলেন, ‘যখন তুমি ইলমের ওপর তোমার যে হক রয়েছে তা আদায় করার আগেই ইলমের মাধ্যমে সম্মানিত হ’তে চাইবে, এর সাথে সম্পর্কিত হ’তে চাইবে এবং এর ধারক-বাহক হিসাবে পরিচিত হ’তে চাইবে, তখন ইলমের নূর তোমার থেকে আড়ালে চলে যাবে এবং তোমার ওপর কেবল তার বাহ্যিক রূপ ও প্রকাশই অবশিষ্ট থাকবে (যেমন সার্টিফিকেট, লক্বব, উপাধি, মানুষের প্রশংসা)। সেই ইলম তোমার পক্ষে না হয়ে, তোমার বিপক্ষের দলীল হবে। কারণ ইলম তো তার ওপর আমল করার দিকেই ইঙ্গিত করে। যখন তুমি ইলমের বিভিন্ন স্তরে আমল করবে না, তখন তার বরকতসমূহ চলে যাবে’। (আবূ নু‘আইম ইস্ফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ১৩/২৬৯)।

দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, আমাদের সমাজে ইলমের খোলসের অন্বেষী অনেক, কিন্তু তার নূরের অন্বেষণকারী খুবই কম। একজন ছাত্র যখন মাদ্রাসায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন এই নিয়তে ভর্তি হয় যে, সে একজন বড় আলেম হবে, মানুষ তাকে সম্মান করবে, তার অনেক ফ্যান-ফলোয়ার বা অনুসারী থাকবে, চারদিকে নাম-ডাক থাকবে- তখন সে মূলত ইলমের হক (আমল ও ইখলাছ) আদায়ের আগেই তার সম্মানটুকু চেয়ে বসে। এর ফলে আল্লাহ তার থেকে ইলমের নূর কেড়ে নেন। তার কাছে তখন শুধু খোলস অবশিষ্ট থাকে। সে হয়তো বড় আলেম বা বক্তা হয়, বড় লেখক হয়, কিন্তু তার কথায় বা লেখায় সেই আধ্যাত্মিক প্রভাব থাকে না, যা মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করতে পারে এবং নিজের ব্যক্তি জীবনে বাস্তবায়িত হয়। তার জ্ঞান তখন তাকে বিনয়ী করতে পারে না; বরং তার অহংকার বৃদ্ধি করে।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মুনাফিকদের একটি উদাহরণ দিয়েছেন, যা আমলহীন আলেমের অবস্থার সাথে মিলে যায়।

আল্লাহ্ বলেন, “তাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালালো। অতঃপর যখন তা চারদিক আলোকিত করল, তখন আল্লাহ সে আলো ছিনিয়ে নিলেন ও তাদেরকে এমন গাঢ় অন্ধকারে নিক্ষেপ করলেন যে তারা আর কিছুই দেখতে পায় না”। (সুরা বাক্বারাহ ২/১৭)।

আমলহীন আলেমের অবস্থাও তাই। সে জ্ঞানের আলো জ্বালায়, কিন্তু তার কপটতা ও আমলহীনতার কারণে আল্লাহ সেই আলোর নূর কেড়ে নেন। তার কাছে কেবল জ্ঞানের শব্দ আর তথ্য অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু হেদায়াতের পথ দেখার ক্ষমতা থাকে না। সে অন্ধকারে পথ হাতড়ে বেড়ায়।

যখন আমরা কোন মাসআলা শিখি বিতর্কে জেতার জন্য, অথবা কোন একটি আয়াত বা হাদীছ মুখস্থ করি মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য, তখন মূলত আমরা ইলমের হক আদায় করি না। ফলে সেই জ্ঞান আমাদের অন্তরকে আলোকিত করে না। আমাদের মুখস্থের ভান্ডার বাড়ে, কিন্তু অন্তরের অন্ধকার দূর হয় না। উপরন্তু এই ইলম আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে যায়।

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তোমরা উলামাগণের সাথে তর্ক-বাহাস করার উদ্দেশ্যে ইল্ম শিক্ষা করো না, ইল্ম দ্বারা মূর্খ লোকেদের সাথে বাগ্বিতণ্ডা করো না এবং তদ্বারা আসন, পদ বা নেতৃত্ব) লাভের আশা করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তা করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।” (সুনান ইবনে মাজাহ ২৫৪, ইবনে হিব্বান ৭৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭১, সহীহ তারগীব ১০১)-হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

কা‘ব ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে তর্ক বাহাছ করা অথবা জাহেল-মূর্খদের সাথে বাকবিতন্ডা করার জন্য এবং মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে ইলম অন্বেষণ করেছে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জাহানণামে নিক্ষেপ করবেন’। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৬৫৪, ছহীহুত তারগীব হা/১০৬, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) (২২৩-২২৫),সহীহুল জামি‘ ১০৬, তা’লীকুর রাগীব (১/৬৮)।হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

(৭) ইলম অনুযায়ী আমল না করা মুনাফিক্বীর লক্ষণঃ

কথা ও কাজের এই অমিল, জ্ঞান ও কর্মের এই বৈপরীত্য মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যকার সুস্পষ্ট বিভেদরেখা। মুমিনের প্রতিটি জ্ঞানবিন্দু তার আমলে পরিণত হওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে; তার সত্তা অর্জিত ইলমের আলোকে নিজেকে সাজাতে নিরন্তর চেষ্টা করে। অন্যদিকে মুনাফিক জ্ঞানকে ব্যবহার করে এক মুখোশ হিসাবে। তার জিহবা জ্ঞানের মুক্তা ঝরায়, কিন্তু তার অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকে আমলের নূর থেকে বিমুখ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার জ্ঞান অন্যের বাহবা কুড়ানোর জন্য, নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণের জন্য, কিন্তু নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য নয়। জ্ঞান তার কাছে এক সুন্দর পুষ্প, যাতে কোন সুগন্ধ নেই; এক প্রজ্জ্বলিত মোমবাতি, যা অন্যকে আলো দেয়, কিন্তু নিজের ভিতরকার অন্ধকার দূর করতে পারে না। প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বাছরী (রহঃ) এক অসামান্য কথায় সেই সত্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘মুনাফিকের জ্ঞান তার কথায় (ভাষণে), আর মুমিনের জ্ঞান তার কর্মে (আমল-আখলাক্বে)’। (খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৩৭)।

অর্থাৎ আমাদের জ্ঞান যদি শুধু আমাদের জিহবা, কি-বোর্ড আর অনলাইন প্রোফাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা মুমিনের জ্ঞান নয়; বরং তা মুনাফিকের জ্ঞানেরই প্রতিচ্ছবি। মুমিনের জ্ঞান তার কর্মের মাধ্যমে কথা বলে। তার ইবাদত-বন্দেগী, সততা, তার বিশস্ততা, পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি তার সহানুভূতিই হ’ল তার জ্ঞানের আসল সাক্ষী। তার কর্মই তার জ্ঞানের সবচেয়ে বড় মুখপাত্র।

যেদিন আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করবেন, ‘তোমাকে আমি জানিয়েছিলাম যে, গীবত করা হারাম, কিন্তু তুমি তোমার বন্ধু মহলে বসে তা উপভোগ করতে। তোমাকে শিখিয়েছিলাম যে, ছালাত ফরয, কিন্তু তুমি পার্থিব ব্যস্ততার অযুহাতে তা পরিত্যাগ করতে। তোমাকে শিখিয়েছিলাম পিতা-মাতার খেদমত জান্নাতের চাবিকাঠি, কিন্তু তুমি তাদের অবহেলা করতে’। এরকম আমাদের প্রতিটি জানা বিষয় ক্বিয়ামতের দিন হয় মুক্তির কারণ হবে, নয়তো শাস্তির কারণ হবে। জেনে-বুঝে আমল না করাটা আল্লাহর সাথে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা, যা মুনাফিকের কাজ। কারণ মুনাফিকরা সত্যকে জানার পরও কেবল দুনিয়াবী স্বার্থে তা এড়িয়ে চলে। তাই বিশিষ্ট ছাহাবী আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, ‘আমি যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশী ভয় করি, তা হ’ল- যখন আমাকে (ক্বিয়ামতের দিন) হিসাবের জন্য দাঁড় করানো হবে, তখন আমাকে বলা হবে যে ‘তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে। সেই জ্ঞান অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ’? (আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ওয়ার রাক্বায়েক্ব, পৃ. ১৪; আহমাদ ইবনে হাম্বল, আয-যুহদ, পৃ. ১১২)।

হাসান বাছরী (রহ.) বলেন, ‘মানুষকে তাদের কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন কর, তাদের কথার ভিত্তিতে নয়। কারণ আল্লাহ এমন কোন কথা রাখেননি, যার উপর তিনি কাজের মাধ্যমে একটি প্রমাণ দেননি’ সেটা হয় কথাকে সত্যায়ন করে, নয়তো তা মিথ্যা প্রমাণ করে। তাই যখন তুমি কোন চমৎকার কথা শোনবে, তখন তার কথায় মুগ্ধ হওয়ার আগে একটু থাম (একটু ভেবে দেখ)। যদি তার কথা ও কাজ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহ’লে সেটা খুবই উত্তম ও প্রশংসনীয়’। (শাতেবী, আল-মুওয়াফাক্বাত (কায়রো : দারু ইবনে আফ্ফান, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭হি./১৯৯৭খৃ.) ১/৭২)।

একজন মানুষ সারাদিন সততার বুলি আওড়াতে পারে, কিন্তু যখন ব্যবসার সুযোগ আসে, তখন যদি সে ওযনে কম দেয় বা পণ্যে ভেজাল মেশায়, তবে তার মুখের কথা মূল্যহীন। একজন নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে জনগণের সেবার অঙ্গীকার করতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসে যদি তিনি দুর্নীতি করেন, তবে তার অঙ্গীকার প্রতারণা মাত্র। হাসান বছরী (রহঃ) আমাদের এক চিরন্তন সত্য শিখিয়েছেন আমল হ’ল কথার আয়না। যার কথা ও কাজে মিল নেই, তার সুন্দর কথাগুলো আসলে এক ধরনের ধোঁকা। এই বাহ্যিক ধার্মিকতা ও অভ্যন্তরীণ কপটতাই হ’ল মুনাফিকের চরিত্র, যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, ‘আমি যা জানি, সে অনুযায়ী যদি আমি আমল করি, তবে আমিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। আর আমি যা জানি, সে অনুযায়ী যদি আমল না করি, তবে দুনিয়াতে আমার চেয়ে বড় মূর্খ আর কেউ নেই’। (খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি-আখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি, মুহাক্কিক্ব : ড. মাহমূদ আত-তাহ্হান (রিয়াদ : মাকতাবাতুল মা‘আরেফ, তাবি) ১/৯০)।

কথায় ও কাজে আল্লাহর বান্দা হওয়ার চেষ্টা করা প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কেননা আমরা প্রতিদিন আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করি যে, আমরা কার গোলাম- আল্লাহর, নাকি আমাদের প্রবৃত্তির? মুখে আল্লাহর বান্দা দাবী করা সহজ, কিন্তু প্রতিটি কাজে সেই দাসত্বের প্রমাণ দেওয়াই প্রকৃত ঈমানের পরিচায়ক। আর এর ব্যতিক্রমই হ’ল মুনাফিক্বী। ইয়াহইয়া ইবনে মু‘আয (মৃ.২৫৮হি.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের আমলের মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা হওয়ার চেষ্টা কর ঠিক সেই ভাবে, যেভাবে তোমরা কথার মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা হওয়ার দাবী করে থাক’। (ইবনুল জাওযী, আত-তাযকিরাহ ফীল ওয়ায (বৈরূত : দারুল মা‘রেফাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৬হি.), পৃ. ৯৬)।

(৮)  আমল বিহীন ইলম পরিতাপের কারণঃ

জ্ঞান হ’ল আত্মার খোরাক। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি আমলে পরিণত না হয়, তবে তা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই এক অন্তহীন পরিতাপ ও আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে ব্যক্তি তার সামনে রাখা সুস্বাদু খাবার মুখে না দিয়ে বারবার পিঠের পেছনে ফেলতে থাকে, সে যেমন নিজের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না, তেমনি যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে কিন্তু জীবনে তার প্রতিফলন ঘটায় না, সে কখনো সেই জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হ’তে পারে না; বরং সেটা তার জন্য বোঝা ও লজ্জার কারণ হয়।

ইসহাক্ব ইবনে ইবরাহীম আত-তাবারী (রহঃ) বলেন, আমি একবার ফুযাইল ইবনে ইয়ায (১০৭-১৮৭হি.)-এর কাছে হাদীছ শিখতে চাইলাম। তখন তিনি বললেন, ‘যদি তুমি আমার কাছে স্বর্ণমুদ্রা চাইতে, তবে তা আমার জন্য সহজ ছিল, কিন্তু তুমি আমার কাছে হাদীছ শিখতে চাচ্ছ’। আমি বললাম, আপনি যদি এমন কিছু হাদীছ আমাকে শুনিয়ে দেন, যা এখনো আমার কাছে নেই, তবে তা আমার কাছে অধিক সংখ্যক স্বর্ণমুদ্রা পাওয়ার চেয়েও অধিক প্রিয় হবে। তখন তিনি বললেন, ‘তুমি তো পাগল হয়ে গেছ! আল্লাহর কসম, তুমি যদি শোনা (হাদীছ) অনুযায়ীই আমল করতে, তবে যা শোননি সে সম্পর্কে জানার সুযোগই পেতে না’। এরপর তিনি বললেন, আমি সুলায়মান ইবনে মেহরান আল-আ‘মাশ (৬১-১৪৮হি.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যখন তোমার সামনে খাবার রাখা হয়, আর তুমি এক লোকমা তুলে নিলে, তারপর তা খাওয়ার বদলে পেছনে ফেলে দিলে, এরপর আবার প্রতিটি লোকমাই এভাবে পেছনে ফেলে দিলে, তবে কি তুমি কখনো পরিতৃপ্ত হ’তে পারবে?’ (হাফেয জামালুদ্দীন মিযযী, তাহযীবুল কামাল ফী আস্মাইর রিজাল, মুহাক্কিক্ব : ড. বাশশার আওয়াদ মা‘রূফ (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০০হি./১৯৮০খৃ.), ২৩/২৯৩)।

আজ আমরা তথ্যের এক মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমাদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালগুলো জ্ঞান ও তথ্যের এক বিশাল ভোজনালয়। আমরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইসলামিক আলোচনা শুনি, আর্টিকেল পড়ি, বইয়ের পিডিএফ সংগ্রহ করি এবং সুন্দর সুন্দর উক্তি শেয়ার করি। আমরা প্রতিনিয়ত জ্ঞানের লোকমা তুলছি, কিন্তু তা আমাদের আত্মার ভেতরে প্রবেশ না করিয়ে আমলের অভাবে পিঠের পেছনে ছুড়ে ফেলছি। অতএব কেবল ইলম সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; বরং তা হজম করতে হয় আমলের মাধ্যমে। কারণ যে আলেম বা ছাত্র প্রতিদিন নতুন নতুন হাদীছ শেখে, নতুন নতুন কিতাব পড়ে, কিন্তু নিজের অন্তরে ও জীবনে তার প্রতিফলন ঘটায় না- সে যেন শুধু লুকমা জমাচ্ছে অথচ মুখে দিচ্ছে না। হয়ত একসময় সে জ্ঞানের ভারে নত হবে, কিন্তু অন্তর থাকবে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত।

যাঁরা ছিলেন ইলমের সাগর, সেই মহান ইমামগণ ইলমের আমানত বা দায়িত্বের কথা ভেবে সর্বদা ভীত থাকতেন। তাঁদের কাছে ইলম অর্জন কোন সম্মান বা খ্যাতির বিষয় ছিল না, বরং ছিল আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার এক আমানত। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ও তাবেঈ ইমাম শু‘বা ইবনে হাজ্জাজ (৮৫-১৬০হি.) মাঝে মাঝে আশংকা করে বলতেন, ‘আমি এমন কিছু করি না, যার কারণে জাহান্নামের ভয় করি- শুধু এটাকে ছাড়া। এর মাধ্যমে তিনি হাদীছ বর্ণনাকেই উদ্দেশ্য করতেন’। (ইবনু সা‘দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা (কায়রো : মাকতাবাতুল খানজী, ১ম মুদ্রণ, ১৪২১হি./২০০১খৃ.) ৯/২৮০)।

 

যে হাদীছ চর্চাকে আমরা নাজাতের উপায় মনে করি, সেই হাদীছ চর্চাই তাঁর জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হ’তে পারে বলে তিনি ভয় পেতেন। কারণ তিনি জানতেন, প্রতিটি হাদীছ যা তিনি শিখেছেন বা শিক্ষা দিয়েছেন, তার প্রত্যেকটি সম্পর্কে তাঁকে ক্বিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে তিনি নিজে এর ওপর কতটুকু আমল করেছেন?

সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না (১০৭-১৯৮হি.) নিজের ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা নিয়ে এতটাই চিন্তিত ছিলেন যে, তিনি বলতেন, ‘যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন তুমি হাদীছ অন্বেষণ করেছ? তবে আমি জানিনা, কী জবাব দেব’। (ইবনু শাহীন, তারীখু আসমাইছ ছিক্বাত, মুহাক্কিক্ব : ছুবহী সামিরাঈ (কুয়েত : আদ-দারুস সালাফিইয়াহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৪হি./১৯৮৪খৃ.) পু. ১০৫)।

অথচ আমরা সামান্য জ্ঞান অর্জন করেই নিজেকে ‘শায়েখ’, ‘আলেম’, ‘মুফতী’ হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। অথচ এই মহান ইমাম নিজের নিয়ত নিয়েই সন্দিহান থাকতেন। তাঁদের এই ভয় প্রমাণ করে, তাঁরা ইলমকে কেবল তথ্য হিসাবে দেখেননি, বরং দেখেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক গুরুতর আমানত হিসাবে, যার খেয়ানত ধ্বংস ডেকে আনবে।

(৯) ইলম আলেমের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবেঃ

মহাবিচারের সেই ভয়ংকর দিনে, যখন মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার নিজের বিরুদ্ধেই কথা বলবে, তখন এক অপ্রত্যাশিত সাক্ষী আল্লাহর আদালতে দাঁড়াবে। আর সেটা হ’ল আমাদের অর্জিত ইলম। সেদিন আমাদের ইলম হবে একটি দ্বিমুখী ধারালো তরবারী; হয় তা আমাদের পক্ষে সুপারিশ করে মুক্তির কারণ হবে, অথবা আমাদের বিপক্ষেই সবচেয়ে শক্তিশালী অভিযোগকারী হিসাবে আবির্ভূত হয়ে ধ্বংসের কারণ হবে।

আমাদের অর্জিত জ্ঞানের মূল উৎস হ’ল আল্লাহর অহি তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ। কুরআন সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য অবতীর্ণ। এটি নিছক পাঠ করার জন্য বা মুখস্থ করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি; এটি এসেছে জীবন পরিচালনার এক পূর্ণাঙ্গ সংবিধান হিসাবে। যে এই সংবিধান মেনে চলবে, কুরআন তার জন্য সুপারিশকারী হবে। আর যে একে পাঠ করবে, বুঝবে, কিন্তু জীবনে বাস্তবায়ন করবে না, তার বিরুদ্ধে কুরআনই হবে প্রধান সাক্ষী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘(ক্বিয়ামতের দিন) কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল হবে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৮১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)  ৪২২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২৩, আহমাদ ৫/৩৪২-৪৩, দারিমী ৬৫৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২য় খণ্ড, ৪২৫; ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৪১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, ‘যে কুরআন পাঠ করে, তার দ্বারা তোমরা প্রতারিত হয়ো না। এটা তো কেবলই কালাম, যা দিয়ে কথা বলা হয়। বরং লক্ষ্য কর! (কুরআন পাঠের পর) কে সেই অনুযায়ী আমল করে’। (সুনানে সা‘দ ইবনে মানছূর ২/৩৯৩; ইক্বতিযাউল ইলমি আল-আমল, পৃ. ৭১)।

ক্বিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাঁর উম্মতের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে দাঁড়াবেন। আর সেই অভিযোগটি হবে কুরআনকে পরিত্যাগ করা নিয়ে। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) কুরআন পরিত্যাগ করার বিভিন্ন স্তর বর্ণনা করেছেন, যা আমাদের অন্তরকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করে না, সে কুরআনকে পরিত্যাগ করল। যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করে, কিন্তু তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে না, সেও কুরআনকে পরিত্যাগ করল। আর যে কুরআন তেলাওয়াত করল এবং তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করল, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করল না, সে ব্যক্তিও কুরআনকে পরিত্যাগ করল’। তারা সবাই আল্লাহর সেই আয়াতের শামিল হবে, যেখানে তিনি বলেছেন, ‘(সেদিন) রাসূল বলবে, হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় তো এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছিল’। (সুরা ফুরক্বান ২৫/৩০)। (আবূ যর ক্বালামূনী, ফাফির্রূ ইলাল্লাহ (কায়রো : মাকতাবাতুছ ছাফা, ৫ম মুদ্রণ, ১৪২৪হি.), পৃ. ২৯৫; ই‘লামুল আছহাব, পৃ. ৬০৬)।

সুতরাং আমরা আজ কোন শ্রেণীতে পড়ছি? আমাদের ঘরে সুন্দর গিলাফে মোড়ানো কুরআন আছে, মোবাইল অ্যাপে কুরআন আছে, কিন্তু তেলাওয়াত নেই। তেলাওয়াত থাকলেও তাদাববুর বা গভীর চিন্তা নেই। আর চিন্তা থাকলেও জীবনে তার বাস্তবায়ন নেই। আমরা কি জেনে বা না জেনে সেই হতভাগা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছি না, যাদের বিরুদ্ধে স্বয়ং আমাদের নবী (ছাঃ) আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করবেন? আল্লাহুল মুস্তা‘আন।

বিশর ইবনুল হারেছ আল-হাফী (১৭৯-২২৭হি.) বলেন, ‘জ্ঞান তার জন্যই কল্যাণকর যে সে অনুযায়ী আমল করে। আর যে আমল করে না, জ্ঞান তার কী পরিমাণ ক্ষতিই না করে! তিনি আরও বলেন, এই জ্ঞান প্রমাণস্বরূপ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জন করেছে, (আমল না করলে) এই জ্ঞান তার বিরুদ্ধেই দলীল হবে’। (খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৪৪)।

আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনে সাম‘ঊন (৩০০-৩৮৭হি.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের দিকে দৃষ্টি দেয় না, তার অর্জিত জ্ঞান তার বিরুদ্ধেই প্রমাণ এবং ধ্বংসের কারণ হবে’। (ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া, তাহক্বীক: আহমাদ ইবনে আলী (কায়রো: দারুল হাদীছ, ২০০০খ্রিঃ/১৪২১হিঃ), ১/৫৫০; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্বক, ৫১/১২)।

ইলমের এই ভয়াবহ দায়িত্বের কথা ভেবে সালাফে ছালেহীন সর্বদা ভীত থাকতেন। তাদের জ্ঞান ছিল পাহাড়সম, আর আমল ছিল তার চেয়েও উঁচু। তবুও তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়ে থর থর করে কাঁপতেন। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, ‘হায়! আমি যদি জ্ঞান লিপিবদ্ধ না করতাম! আর আমি যদি আমার অর্জিত জ্ঞান থেকে কোন মতে বেঁচে যেতে পারতাম, এমনভাবে যে তা না আমার পক্ষে থাকবে, আর না আমার বিপক্ষে যাবে’। (খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৫৫)।

একবার ভাবুন, তিনি কেবল ‘সমান সমান’ হয়ে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছেন! অর্থাৎ তার বিশাল জ্ঞান যেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী না হয়, এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ আকুতি। ইমাম শা‘বী (রহঃ) জ্ঞানের দায়বদ্ধতার কথা ভেবে বলেন, ‘হায়! আমি যদি এই জ্ঞানের কিছুই না জানতাম!’। (শামসুদ্দীন যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, মুহাক্কিক্ব : শু‘আইব আরনাউত্ব ও অন্যান্য (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ৩য় মুদ্রণ, ১৪০৫হি./১৯৮৫খৃ.) ৪/৩০৩)।

এইসব কথা তাদের জ্ঞানবিমুখতার কারণে ছিল না, বরং জ্ঞানের বিশাল দায়িত্বের গভীর উপলব্ধি থেকে ছিল। তারা জানতেন, যখন তুমি জ্ঞান অনুযায়ী আমল করবে না, তখন তা তোমার বিরুদ্ধেই প্রমাণ হবে। সার্রী আস-সাক্বাতী (১৬০-২৫৩হি.) বলেন, ‘তুমি জ্ঞান-গরিমায় যত সমৃদ্ধ হবে, তোমার বিরুদ্ধে দলীল ততই জোরালো হবে’। (খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলম, পৃ. ৫৩)।

তাদের এই ভয় আর আমাদের নির্ভয় বিচরণ- এই দুইয়ের মধ্যে কতই না পার্থক্য! কতই না ব্যাবধান! আমরা অল্প জেনে অহংকারী হয়ে উঠি, আর তারা জ্ঞানের গভীরে পৌঁছেও আল্লাহর ভয়ে কতই না বিনয়ী থাকতেন। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।

আসুন! একবার নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার অর্জিত জ্ঞান আজ কোথায় বাস করছে? আমার জিহবার ডগায়? নাকি কী-বোর্ডের বোতামে? আমার জ্ঞান কি কেবল কিছু সুন্দর কথা আর আকর্ষণীয় আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি তা আমার চরিত্র, আমার আচরণ এবং প্রতিটি পদক্ষেপে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠছে?

যে জ্ঞানের ভার আমরা বহন করছি, তা আল্লাহর আদালতে আমার-আপনার বিরুদ্ধে এক অকাট্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেদিন কোন ওযর বা অজুহাত গৃহীত হবে না। সেদিন বলা হবে, ‘তুমি তো জানতে!’ এই একটি বাক্যই সমস্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের পথ রুদ্ধ করে দেবে। আল্লাহুল মুস্তা‘আন।

তাই আমরা সারাদিন যে জ্ঞান অর্জন করলাম, হোক তা একটি আয়াতের তাফসীর, একটি হাদীছের মর্ম বা কোন আলেমের আলোচনা- তার কতটুকু আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছে? আমার আজকের জ্ঞান কি আমার কোন একটি বদ অভ্যাসকে বদলে দিতে পেরেছে? আমার কোন একটি পাপকে প্রতিহত করার শক্তি জুগিয়েছে? আমার অহংকারকে চূর্ণ করে আমাকে আরও বিনয়ী করেছে?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে হৃদয়ে কাঁপন অনুভব করুন! এখনই সময় অশ্রুসজল চোখে আল্লাহর কাছে তওবা করার এবং জ্ঞানকে জীবনে ধারণ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার। কারণ ক্বিয়ামতের সেই কঠিন দিনে আমাদের অর্জিত ইলম হয় আমাদের মুক্তির জন্য সুফারিশকারী হবে, নতুবা আমাদের বিপক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। সেদিন আমাদের জ্ঞান যদি আমাদের বিপক্ষে না গিয়ে আমাদের পক্ষে থাকে, তবে মুমিনের জন্য সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সফলতা।

(১০) ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর শাস্তিঃ

আমলবিহীন ইলমের সকল পরিণতির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও চূড়ান্ত পরিণতি অপেক্ষা করছে ক্বিয়ামতের সেই মহাবিচারের ময়দানে। দুনিয়ার অপমান, অন্তরের অশান্তি, জ্ঞানের স্বাদ থেকে বঞ্চনা- এসব সেই আখেরাতের ভয়ংকর শাস্তির তুলনায় অতি তুচ্ছ। সেদিন অর্জিত জ্ঞান ব্যক্তির মুক্তির জন্য সুপারিশকারী না হয়ে, তার বিপক্ষেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসাবে দাঁড়াবে এবং তাকে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করার কারণ হবে। ক্বিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রায় ঘোষণা করা হবে। তাদেরকে উল্টোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা হ’লেন : শহীদ, ক্বারী বা আলেম এবং দানশীল।

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘(ক্বিয়ামতের দিন যার বিরুদ্ধে বিচারের প্রথম রায় ঘোষিত হবে তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল) সেই ব্যক্তি সে ইলম অর্জন করেছিল ও অন্যদের শিক্ষা দিয়েছিল এবং কুরআন পড়েছিল। তাকে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে যত নে‘মত দিয়েছিলেন তা অবহিত করবেন। সে তা স্বীকার করবে। তখন তিনি বলবেন, এসব নে‘মত পেয়ে তুমি কী করেছিলে? সে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছিলাম, অন্যদের তা শিখিয়েছিলাম এবং তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলাম। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি বরং (জনগণের মাঝে) আলেম বা বিদ্বান বলে আখ্যায়িত হবে সেজন্য বিদ্যা শিখেছিলে এবং ক্বারী বলে পরিচিত হবে সেজন্য কুরআন তেলাওয়াত করেছিলে। তোমাকে তো সেসব বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। তারপর তার সম্পর্কে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে অধোমুখী করে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৮১৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৭০, ইসলামিক সেন্টার ৪৭৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এ হাদীছ এতটাই ভারী ও গুরুত্ববহ যে আবু হুরায়রা (রাঃ) এই হাদীছটি বর্ণনার সময় অজ্ঞান হয়ে যেতেন। মিসরের প্রখ্যাত তাবেঈ শুফাই আল-আছবাহী (মৃ. ১০৫ হি.)-এর নিকটে এই হাদীছটি বর্ণনা করতে গিয়ে আবূ হুরায়রা (রাঃ) ভয়ে তিন বার বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন। (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৩৮২, হাকেম ১৫২৭; ছহীহ ইবনু হিববান ৪০৮, সহীহ তা’লীকুর রাগীব ১/২৯-৩০, তা’লীক আলা ইবনে খুযাইমাহ ২৪৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আবূ ওয়াইল (রহ.) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, উসামাহ (রাঃ)-কে বলা হল, কত ভাল হত! যদি আপনি ঐ ব্যক্তির (উসমান (রাঃ)-এর নিকট যেতেন এবং তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন। উত্তরে তিনি বললেন, আপনারা মনে করছেন যে আমি তাঁর সঙ্গে আপনাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলব। অথচ আমি তাঁর সঙ্গে (দাঙ্গা দমনের ব্যাপারে) গোপনে আলোচনা করছি, যেন আমি একটি দ্বার খুলে না বসি। আমি দ্বার উন্মুক্তকারীর প্রথম ব্যক্তি হতে চাই না। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে কিছু শুনেছি, যার পরে আমি কোন ব্যক্তিকে যিনি আমাদের আমীর নির্বাচিত হয়েছেন এ কারণে তিনি আমাদের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি এ কথা বলতে পারি না। লোকেরা তাঁকে বলল, আপনি তাঁকে কী বলতে শুনেছেন? উসামাহ (রাঃ) বললেন, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন আগুনে পুড়ে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। এ সময় সে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা তার চাকা নিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামবাসীরা তার নিকট একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, হে অমুক ব্যক্তি! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতে আর অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতে? সে বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজে আদেশ করতাম বটে, কিন্তু আমি তা করতাম না আর আমি তোমাদেরকে অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতাম, অথচ আমিই তা করতাম। এ হাদীসটি গুনদার (রহ.) শুবা (রহ.) সূত্রে আ‘মাশ (রহ.) হতে বর্ণনা করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩২৬৭, ৭০৯৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৩৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৮৯, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫১৩৯,সহীহুল জামি ৮০২২, সহীহ আত্ তারগীব ১২৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৯২, আহমাদ ২১৭৮৪, শু‘আবুল ঈমান ৭৫৬৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০৭০৪, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৩৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।

একবার চোখ বন্ধ করে সেই ভয়াবহ দৃশ্যটি কল্পনা করুন। যে আলেম, যে বক্তা, যে দ্বীনের দাঈ দুনিয়ার বুকে মানুষের কাছে সম্মানিত ছিল, ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছে আর সে পেষণের চাকায় বাঁধা গাধার মতো অন্তহীন যন্ত্রণায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার এই অপমানজনক পরিণতি দেখে জাহান্নামীরাও অবাক হয়ে প্রশ্ন করছে, ‘আপনি না আমাদের সৎ পথের দিশা দিতেন?’ এই দৃশ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যে জ্ঞান ও উপদেশ নিজের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে না, তা আল্লাহর কাছে কতখানি মূল্যহীন ও ঘৃণিত। আমাদের প্রতিটি উপদেশ, প্রতিটি স্ট্যাটাস, প্রতিটি লেকচার প্রথমে আমাদের নিজেদের আত্মার জন্য হওয়া উচিত। নতুবা যে জ্ঞান আমাদের মুক্তির আলো হওয়ার কথা ছিল, সেই জ্ঞানই ক্বিয়ামতের দিন আমাদের কপটতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে এবং জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত হবে। তাই আজ নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে- আমার অর্জিত জ্ঞান কি আমার মুক্তির অছীলা, নাকি আমারই বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে সবচেয়ে বড় অভিযোগকারী?

অতএব যারা মুসলিম শাসক বা নেতা হিসেবে রাষ্ট্র শাসন করছে এবং তাদের অনুসারী আলেম যারা কুরআন হাদিসে অভিজ্ঞ কিন্তু রাষ্ট্র শাসন সংক্রান্ত কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে চলছে না তাদেরকে কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালা কঠিন শাস্তি দিবেন। এসব লোক ইহকাল ও পরকালে অপমান অপদস্ত হবে।

ভুল ফতোয়া বা উপদেশ দেয়ার পরিনতি

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে ভুল ফাতাওয়া দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ- বিনা ’ইলমে (বিদ্যায়) ফাতাওয়া দেয়া হয়েছে এর গুনাহ তার ওপর বর্তাবে যে তাকে ফাতাওয়া দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি তার কোন ভাইকে (অপরকে) এমন কোন কাজের পরামর্শ দিয়েছে, যা কল্যাণ হবে না বলে সে জানে, সে নিশ্চয়ই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪২, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৫৭, সহীহুল জামি‘ ৬০৬৮, দারিমী ১৫৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

তাবেঈ যিয়াদ ইবনু হুদাইর (রাঃ) বলেন, ওমর (রাঃ) আমাকে বলেছেন, তুমি কি জান, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আলেমদের পদস্খলন, আল্লাহর কিতাব নিয়ে মুনাফিকের বাদ-প্রতিবাদ এবং নেতাদের শোষণ’। (দারেমী, মিশকাত হা/১৬৯)। সনদ ছহীহ।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যাকে ধর্মীয় জ্ঞান বিষয়ক কোন কথা জিজ্ঞাসা করা হয়, আর সে (যদি উত্তর না দিয়ে) তা গোপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে (জাহান্নামের) আগুনের লাগাম পরানো হবে।” (সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৬০, সুনান আততিরমিযী ২৬৪৯, সুনান ইবনে মাজাহ ২৬৪, ইবনে হিব্বান, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৪৩, হাকেম অনুরূপ।)

ইবনে মাজার এক বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি তার সংরক্ষিত (ও জানা) ইল্ম গোপন করবে, সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন মুখে আগুনের লাগাম দেওয়া অবস্থায় হাযির করা হবে।” (সুনান ইবনে মাজাহ ২৬১, সহীহ তারগীব ১১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তোমরা উলামাগণের সাথে তর্ক-বাহাস করার উদ্দেশ্যে ইল্ম শিক্ষা করো না, ইল্ম দ্বারা মূর্খ লোকেদের সাথে বাগ্বিতণ্ডা করো না এবং তদ্বারা আসন, পদ বা নেতৃত্ব) লাভের আশা করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তা করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।” (সুনান ইবনে মাজাহ ২৫৪, ইবনে হিব্বান ৭৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭১, সহীহ তারগীব ১০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

কা’ব বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, “যে ব্যক্তি উলামাদের সাথে তর্ক করার জন্য, অথবা মূর্খ লোকেদের সাথে বচসা করার জন্য এবং জন সাধারণের সমর্থন (বা অর্থ) কুড়াবার জন্য ইল্ম অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ জাহান্নাম প্রবেশ করাবেন।” (সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৬৫৪, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৫, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, হাকেম ২৯৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭২, সহীহ তারগীব ১০০, সহীহুল জামি ১০৬, তা’লীকুর রাগীব ১/৬৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ’স (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, “নিঃসন্দেহে আল্লাহ লোকদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইল্ম তুলে নেবেন না; বরং উলামা সম্প্রদায়কে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে ইল্ম তুলে নেবেন (অর্থাৎ, আলেম দুনিয়া থেকে শেষ হয়ে যাবে।) অবশেষে যখন কোন আলেম বাকি থাকবে না, তখন জনগণ মূর্খ অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরকে নেতা বানিয়ে নেবে এবং তাদেরকে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হবে, আর তারা না জেনে ফতোয়া দেবে, ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অপরকেও পথভ্রষ্ট করবে।” (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭৩০৭, ১০০০,  সহিহ মুসলিম ৬৯৭১, আধুনিক প্রকাশনী ৬৭৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোনো লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৬৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ ২৫২, আহমাদ ৮২৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমি যা বলিনি তা বানিয়ে বলে, সে যেন নিজের ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নেয়। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা আমার উপর মিথ্যা বলো না। যেহেতু যে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন দোযখে প্রবেশ করল।” (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হতে হবে

আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলমান বিশেষ করে যারা অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের আলেম তারা কুরআনের কিছু অংশ মানে আর কিছু অংশ মানে না। এজন্যে এদেরকে কিয়ামতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা কি কুরআনের কোনো কোনো অংশ (আয়াত) মানো আর কোনো কোনো অংশ মানো না? অত:পর যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্য থেকে এরুপ কাজ  করবে – পার্থিব জীবনে প্রকাশ্য লাঞ্চণা ভোগ করা আর কিয়ামতের দিনে ভীষণ শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া তার আর কী সাজা হতে পারে! আর আল্লাহ তো তোমাদের কার্য কলাপ সম্বন্ধেবে- খবর নন”। (সুরা আল বাকারা-৮৫)।

এইসব লোক যারা অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বা সমর্থক তারা মনে করে তাদের চলার এই পথটাই সঠিক অথচ তারা যে ভ্রান্ত পথে চলছে সেটা বুঝতে পারছে না। আর এই ভ্রান্ত পথে চলার কারণে তাদের সকল আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে নবি বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না  কোন কোন লোক নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ? এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যারা ইহকালের জীবনে ভ্রান্ত পথে চলে এবং মনে করে যে তারা ঠিক পথ ধরেই চলেছে। এরা তারাই, যারা তাদের প্রতিপালক প্রভুর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং তার দরবারে প্রত্যাবর্তনের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করে। এ জন্যে তাদের সকল আমল নষ্ট হয়ে গেছে এবং কিয়ামতের দিন তাদের কোনই গুরত্ব থাকবে না। তারা যে কুফরী করেছিলো আর আমার আয়াত  ও রাসুলগণের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো তার প্রতি দানে তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে”। (সুরা কাহাফঃ ১০৩-১০৫)।

যেহেতু তাদেরকে সত্য পথ উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছে যে, কোন্ পথে হাঁটলে জান্নাত আর কোন্ পথে হাঁটলে জাহান্নাম, তারপরও তারা তাদের সেই ভ্রান্ত পথেই হাঁটছে তাই আল্লাহ তায়ালাও তাদেরকে সেই পথেই চলতে দিবেন এবং পরিশেষে তাদেরকে জাহান্নামে দগ্ধ করাবেন। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!” (সুরা আন নিসা ৪:১১৫)।

জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে চাইলে আমাদেরকে পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হতে হবে। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মোতাবেক চলতে হবে। আল্লাহ ও রাসুল সা. যা করতে বলেছেন এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আপনি নিজেকে অনেক বড় আলেম পরিচয় দিবেন আবার ভোটের সময় এমন একটি দলকে ভোট দিবেন যে দলটি কুরআন বিরোধী আইন মেনে চলে, যারা ইসলামি শরিয়াহ আইন বিশ্বাস করে না, মেনে চলে না, যারা মানবরচিত আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে তাহলে আপনি কেমন মুসলমান আর কয় নম্বর আলেম। এজন্যে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “হে ইমানদারগন, আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ তেমনই ভাবে ভয় করতে থাকো, এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যু বরণ করো না”। (সুরা আলে ইমরানঃ ১০২)।

আপনি যদি নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবী করেন তাহলে আপনাকে ইসলামি পথ ছেড়ে অন্য পথে চলা যাবে না। যারা এরুপ করে তাদের কোনো আমল আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না। পরিশেষে তারা হবে জাহান্নামী। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া তথা ইসলামি দল ছাড়া বা ইসলামি আইন ছাড়া বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন বা আইন বা অনৈসলামিক দল বা ভিন্ন পথ, মত  অবলম্বন করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না তথা তার সেই কাজ কবুল করা হবে না বা তাকে কোনো সওয়াব দেয়া হবে না বা তার আমলনামা শূন্য হবে। আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত তথা যারা জাহান্নামি, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে তথা জাহান্নামি হবে”। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।

বাংলাদেশে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েম নেই। মানবরচিত আইন দিয়ে এই দেশটি শাসিত হয়ে আসছে। অথচ এই দেশটি যারা শাসন করে আসছে তারা সকলেই মুসলিম নেতা বা শাসক। এইসব মুসলিম শাসক যেহেতু ইসলামি আইন দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করে না সেইহেতু এরা কাফির, জালিম ও ফাসিক এর মধ্যে গণ্য হবে। মূলত মুসলিম ভোটারদের কারণেই অনৈসলামিক দলের শাসকগোষ্ঠী ইসলামি আইন দিয়ে বিচারিক কাজ করছে না। কারণ অনৈসলামিক দলের সংবিধানে ইসলামি শাসনব্যবস্থার কোনো কথা লেখা নেই। আর মুসলিম ভোটারগণ অনৈসলামিক দলের শাসকগোষ্ঠীকে ভোট প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম বিরোধী কাজে সহযোগিতা করায় তারাও কাফির, ফাসিক ও জালিম হয়ে জাহান্নামে অবস্থান করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৪)।

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা যালেম।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৫)।

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৭)।

কতিপয় কুরআনের নির্দেশনা

(১) আল্লাহ বলেন,

“আমি তাদেরকে পৃথিবীতে (রাজ) ক্ষমতা দান করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে”। (সুরা আল হজ্জ ৪১)।

(২) আল্লাহ বলেন, “যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সাক্ষ্য (সৎ লোক) বর্তমান রয়েছে তা যদি সে গোপন করে (অসৎ লোককে ভোট দেয়) তবে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে? জেনে রেখ, তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ মোটেই বেখবর নন।” (সূরা আল বাকারাহ ১৪০)।

(৩)  আল্লাহ তাঁয়ালা এরশাদ করেন, ‘যে লোক সৎকাজের জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য), তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি অংশ পাবে তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।

(৪) আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারপর সেই দিনের কথা মনে করো যেদিন আমি মানুষের প্রত্যেক দলকে তাদের নেতা সহকারে ডাকব। সেদিন যাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে দেওয়া হবে তারা নিজেদের কার্যকলাপ পাঠ করবে এবং তাদের ওপর সামান্যতম জুলুমও করা হবে না। (সুরাঃ ১৭/ আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) ৭১)।

(৫) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে বা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে বা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও আখেরাতে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে”। (সুরা আল মায়েদা ৩৩)।

(৬) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে নবি বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না  কোন্ কোন্ লোক নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ? এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যারা ইহকালের জীবনে ভ্রান্ত পথে চলে এবং মনে করে যে তারা ঠিক পথ ধরেই চলেছে। এরা তারাই, যারা তাদের প্রতিপালক প্রভুর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং তার দরবারে প্রত্যাবর্তনের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করে। এ জন্যে তাদের সকল আমল নষ্ট হয়ে গেছে এবং কিয়ামতের দিন তাদের কোনই গুরত্ব থাকবে না। তারা যে কুফরী করেছিলো আর আমার আয়াত  ও রাসুলগণের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো তার প্রতি দানে তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে”। (সুরা কাহাফঃ ১০৩-১০৫)।

(৭) আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান”। (সূরাঃ আলে-ইমরান  ২৬)

(৮) আল্লাহ বলেন, “আর মানুষের জন্য রয়েছে তাঁর সামনে ও পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী; তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। আর কোন সম্প্রদায়ের জন্য যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছে করেন তবে তা রদ হওয়ার নয় এবং তিনি ছাড়া তাদের কোন অভিভাবক নেই”। (সূরাঃ আর-রাদ ১১)।

(৯)  আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, “এটা এজন্যে যে, যদি কোন সম্প্রদায় নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ এমন নন যে, তিনি ওদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন, তাতে পরিবর্তন আনবেন। (সূরা আল আনফালঃ ৫৩)।

(১০) আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন(৩); তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তারই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তারই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ কত বরকতময়”। (সুরা আল আরাফ ৫৪)।

(১১) আল্লাহ বলেন, “তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তার অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; কাজেই তোমরা তারই ইবাদাত কর। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” (সুরা ইউনুস ৩)।

(১২) আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ উপরে স্থাপন করেছেন খুঁটি ছাড়া, তোমরা তা দেখছ। তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করেছেন; প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন, আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন(৬), যাতে তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাত সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।” (সুরা আর রাদ ২)।

(১৩) আল্লাহ বলেন, “তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন। তিনিই রাহমান, সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” (সুরা আল ফুরকান ৫৯)।

(১৪) আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ করবে না?” (সুরা আস সাজদাহ ৪)।

(১৫) আল্লাহ বলেন, ‘তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন—তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।” (সুরা আল হাদিদ ৪)।

(১৬) আল্লাহ তা’আলা কুরআনে শাসনব্যবস্থা, শাসক ও শাসিত সম্পর্কে বহু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সে সকল দিকনির্দেশনা অবলম্বনেই তৈরি ইসলামী রাজ্য-শাসন নীতিমালা। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাগ্রে লক্ষণীয় আয়াতটি হলো-

“(হে নবী, তুমি) বল, হে আল্লাহ! সার্বভৌম শক্তির মালিক! আপনি যাকে চান ক্ষমতা দান করেন, আর যার থেকে চান ক্ষমতা কেড়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে চান লাঞ্ছিত করেন। সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।” (সূরা আলে ইমরান: ২৬)।

(১৭) আল্লাহ তায়ালা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

আল্লাহ বলেন-

“তিনিই আল্লাহ। যিনি আকাশমণ্ডলীকে উঁচুতে স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ছাড়া, যা তোমরা দেখতে পাও। অতঃপর তিনি আরশে ‘ইসতিওয়া’ গ্রহণ করেন। সূর্য এবং চাঁদকে নিয়োজিত রেখেছেন বিশেষ কাজে। প্রতিটি বস্তু এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে। তিনি যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি এসব নিদর্শন সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার, (একদিন) তোমাদের স্বীয় প্রতিপালকের কাছে উপস্থিত হতে হবে।” (সূরা : রা’দ: ০২)।

(১৮) মহান রব নিজেই নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন ঠিক এভাবেই-

“তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব। সর্বস্বত্বার ধারক। তাকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তারই। কে আছে যে, তার অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করবে? মানুষের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত। তিনি যা ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তার জ্ঞানের কিছুই তারা (সৃষ্টি) আয়ত্ত্ব করতে পারে না। তার ‘কুরসি’ আকাশ ও পৃথিবীময় পরিব্যাপ্ত। এদের রক্ষণাবেক্ষণ তাকে বিন্দুমাত্রও ক্লান্ত করে না। আর তিনি মহান শ্রেষ্ঠ।” (সূরা : বাকারা, আয়াত : ৫৫)।

(১৯) মহান আল্লাহ বলেন, "তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।" (সুরাহ আল-বাকারাহঃ আয়াত-২৫৫)।

(২০) মহান আল্লাহ বলেন, "নভোমন্ডল, ভূমন্ডল এবং এতদুভয়ে অবস্থিত সবকিছুর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।" (সুরাহ আল-মায়েদাহঃ আয়াত-১২০)।

(২১) মহান আল্লাহ বলেন, "যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য।" (সুরাহ আল-বাকারাহঃ আয়াত-১৬৫)।

(২২) আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করলে তিনি যে কোনো সময় তাদেরকে এ দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে আবার অন্য কাউকে তা দান করতে পারেন। পৃথিবীর ইতিহাস এভাবেই চলে আসছে। আল্লাহ তাআলার নীতি হল, আল্লাহর নেক বান্দাগণই যমীনে শাসনভারের প্রকৃত হকদার।

কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে: “আমি যাবুরে উপদেশের পর লিখে দিয়েছিলাম, ভূমির উত্তরাধিকারী হবে আমার নেক বান্দাগণ।” (সূরা আম্বিয়া : ১০৫)।

(২৩) যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান রাখে, আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই একসময় তাদেরকে বিজয়ী করবেন, শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। এটা আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি।

কুরআন কারীমে তিনি ইরশাদ করেন: “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে নিজ খলীফা বানাবেন, যেমন খলীফা বানিয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তাদের জন্য তিনি সেই দ্বীনকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দান করবেন, যে দ্বীনকে তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তারা যে ভয়-ভীতির মধ্যে আছে, তার পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। এর পরও যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য সাব্যস্ত হবে।” (সূরা নূর : ৫৫)।

(২৪) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই’। (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭/১১১)। 

(২৫) তিনি আরো বলেন, ‘তুমি বল, হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন’। (সুরা আলে ইমরান ৩/২৬)।

(২৬) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘বরকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান’। (সুরা মূলক ৬৭/১)।

(২৭) মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘যার হাতে রয়েছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব। যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেন না এবং তাঁর রাজত্বে কোন শরীক নেই’। (সুরা ফুরক্বান ২৫/২)।

(২৮) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা তাদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত।” (সূরা রূম: ৩২)।

(২৯) মহান আল্লাহ বলেন,

ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বাকারা, ০২ : ২০৮)।

(৩০) আল্লাহ আরও বলেন,

ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করার মতো ভয় করো এবং প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আলে ইমরান, ০৩ : ১০২)।

(৩১) আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, আমি দুনিয়াতেই তাদেরকে তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব  এবং এতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবে না। এরাই হলো সে সকল লোক যাদের জন্য আখিরাতে আগুন ছাড়া আর কিছু নেই। (সূরা হুদ, আয়াত ১৫-১৬)।

(৩২) আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা হবে চরম লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত”। (সুরা আল মুজাদালা ২০)।

(৩৩) আল্লাহ বলেন, “আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং বিশ্বাসীদের পথ ভিন্ন (ইসলামি দল ব্যতীত) অন্য পথ (অনৈসলামিক দল) অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!”। (সুরা নিসা ১১৫)।

(৩৪) আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।

(৩৫) আল্লাহ আরও বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর এবং তাঁর রাসূলের আর সেই সব লোকের , তোমাদের মধ্যে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত (আমীর) হয়েছে।” (সূরা আন নিসা ৫৯)।

(৩৬) আল্লাহ বলেন, “যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সাক্ষ্য (সৎ লোক) বর্তমান রয়েছে তা যদি সে গোপন করে (অসৎ লোককে ভোট দেয়) তবে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে? জেনে রেখ, তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ মোটেই বেখবর নন।” (সূরা আল বাকারাহ ১৪০)।

(৩৭) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত ৮)।

(৩৮) আল্লাহ বলেন, “মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না।” (সূরা আলে ইমরান ২৮)।

(৩৯) আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর জন্য সত্যের সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করো।” (সূরা আত তালাক ২)।

(৪০) আল্লাহ আরও বলেন, “তোমরা কখনই সাক্ষ্য গোপন করবে না, যে সাক্ষ্য গোপন করে তার মন পাপের কালিমাযুক্ত।” (সূরা আল বাকারাহ ২৮৩)।

(৪১) আল্লাহ বলেন, “হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন”। (সুরা নিসা ১৩৫)।

(৪২) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া তথা ইসলামি দল ছাড়া বা ইসলামি আইন ছাড়া বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন বা আইন বা অনৈসলামিক দল বা ভিন্ন পথ, মত  অবলম্বন করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না তথা তার সেই কাজ কবুল করা হবে না বা তাকে কোনো সওয়াব দেয়া হবে না বা তার আমলনামা শূন্য হবে। আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত তথা যারা জাহান্নামি, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে তথা জাহান্নামি হবে”। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।

(৪৩) আল্লাহ বলেন,

”আর তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সহায়তা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তি দাতা।” (সূরা মায়িদা: ২)।

(৪৪) আল্লাহ বলেন,

“হে মুমিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তোমরা মুসলিম (পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না”। (সুরা আলে ইমরান ১০২)।

(৪৫) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের আলিম ও ধর্ম-যাজকদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়ামের পুত্র মাসীহকেও অথচ তাদের প্রতি শুধু এ আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মা‘বূদের ইবাদাত করবে, যিনি ব্যতীত মা‘বূদ হওয়ার যোগ্য কেউ নয়। তিনি তাদের অংশী স্থাপন করা হতে পবিত্র।” (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩১)।

(৪৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তারা সে সমস্ত বিষয়ের উপর ঈমান এনেছে। তারা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের জন্য শয়তানের কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, তোমরা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান এবং তাঁর রাসূলের দিকে এসো তখন আপনি মুনাফিকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তখন কেমন হবে? অতঃপর তারা আল্লাহর নামে কসম খেয়ে ফিরে আসবে যে, কল্যাণ ও সমঝোতা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অবগত।

অতএব, আপনি ওদেরকে উপেক্ষা করুন এবং ওদেরকে সদুপদেশ দিয়ে এমন কোনো কথা বলুন, যা তাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুতঃ আমি একমাত্র এ উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাদের (রাসূলগণের) আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবান রূপে পেত। অতএব, তোমার রবের কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর আপনার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা সন্তুষ্ট চিত্তে কবূল করে নিবে।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬০-৬৫)।

(৪৭) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “জেনে রাখো! তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ করা। আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের রব।” (সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪)।

(৪৮) আল্লাহ বলেন,

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।” (সূরা আল মায়েদা, আয়াত: ৪৪)।

(৪৯) আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা যালেম।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৫)।

(৫০) আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।” (সূরা আলমায়েদা, আয়াত: ৪৭)।

(৫১) আল্লাহ বলেন, “তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফুরী করেছে এবং ফাসিক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।” (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৮৪)।

(৫২) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“অপরাধী সেদিন স্বীয় হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, ‘হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম। হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে (ভাল না বাসতাম, সমর্থন না করতাম, ভোট না দিতাম) বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! সে তো আমাকে উপদেশ বাণী থেকে (ইসলামী দল থেকে/ইসলামের পথ থেকে)  বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে তা আসার পর, শয়ত্বান মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক”। (সুরা আল ফুরকান ২৭-২৯)।

(৫৩) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকীরা ছাড়া”। (সূরা আয্-যুখরুফ ৬৭ )।

(৫৪) আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন এভাবে-

“এ এক বাহিনী, তোমাদের সাথে (জাহান্নামে) প্রবেশকারী। তাদের জন্য নেই কোন অভিনন্দন। বরং তারা জাহান্নামে জ্বলবে। (তখন অনুসারীরা) বলবে, বরং তোমরাও তো (জাহান্নামী), তোমাদের জন্যও কোন অভিনন্দন নেই। তোমরাই তো পূর্বে আমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছ। কত নিকৃষ্ট এ আবাসস্থল। তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! এটা যে আমাদের সম্মুখীন করেছে, জাহান্নামে তার শাস্তি দ্বিগুণ বর্ধিত করুন”। (সুরা ছোয়াদ ৩৮/৫৯-৬১)।

(৫৫) আল্লাহ বলেন,

“যখন তারা জাহান্নামে পরস্পরে বিতর্কে লিপ্ত হবে, তখন দুর্বলেরা অহংকারীদেরকে বলবে, আমরা তো তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম। এখন কি তোমরা আমাদের থেকে জাহান্নামের (আযাবের) কিছু নিবারণ করবে? অহংকারীরা বলবে, আমরা তো সবাই জাহান্নামে আছি। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন”। (সুরা মুমিন ৪৭/৪৮)।

(৫৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হ’য়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, তোমরা তো আমাদের ডান দিক থেকে আসতে। তারা বলবে, বরং তোমরাতো বিশ্বাসী ছিলে না এবং তোমাদের উপর আমাদের কোন কর্তৃত্বও ছিল না। বস্তুত তোমরাই ছিলে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিপালকের কথা সত্য হয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই শাস্তি আস্বাদন করতে হবে। আমরা তোমাদের বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত ছিলাম। সুতরাং তারা সকলেই সেইদিন শাস্তিতে শরীক হবে”। (সুরা ছা-ফফাত ৩৭/২৭-৩৩)।

(৫৭) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা (পীর আউলিয়া/শিক্ষক/মুরুব্বী/হুজুর ইত্যাদি) ও বড় লোকদের অনুসরণ করেছিলাম এবং তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রভু! তাদের দ্বিগুণ আযাব প্রদান করুন এবং তাদের উপর মহা লা‘নত বর্ষণ করুন”। (সুরা আহযাব ৩৩/৬৭-৬৮)।

(৫৮) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  “দুর্বলরা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হ’তাম। অতঃপর ক্ষমতাদর্পীরা দুর্বলদের বলবে, তোমাদের নিকট সৎপথের দিশা আসার পরেও আমরা কি তোমাদেরকে ওটা হতে নিবৃত করেছিলাম? বস্তুতঃ তোমরাই তো ছিলে অপরাধী। অতঃপর দুর্বল লোকেরা পুনরায় বলবে, বরং প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো রাত-দিনে চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি। যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে এবং আমি কাফেরদের গলায় শৃঙ্খল পরিয়ে দেব। সুতরাং তাদেরকে (দুর্বলদেরকে) তারা (ক্ষমতাদর্পীরা) যা করতো তারই প্রতিফল দেওয়া হবে”। (সুরা সাবা ৩৪/৩১-৩৩)।

(৫৯) আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তুমি তার আনুগত্য করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে”। (সুরা আল কাহফ ২৮)।

(৬০) মহান আল্লাহ বলেন,

“তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য কর। অতঃপর কোনো বিষয়ে সে দায়িত্বশীলদের সাথে তোমরা মতবিরোধ করলে সত্যিকারার্থে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনে থাকলে বিরোধপূর্ণ সে বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, এটা তোমাদের জন্য উত্তম এবং পরিণতির দিক থেকে তা খুবই ভাল”। (সূরা আন নিসা  ৫৯)।

(৬১) আল্লাহ বলেন,

“আর তুমি কাফের ও মুনাফিকদের অনুসরণ কর না। তাদের দেওয়া কষ্টসমূহ উপেক্ষা কর এবং আল্লাহর উপর ভরসা কর। বস্তুতঃ তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট’। (সুরা আহযাব ৩৩/৪৮)।

(৬২) আল্লাহ বলেন, কাফেরদের আনুগত্য না করে বরং তাদের সাথে জিহাদ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “অতএব তুমি কাফেরদের আনুগত্য করো না এবং তুমি তাদের বিরুদ্ধে এর সাহায্যে কঠোর সংগ্রাম কর”। (সুরা ফুরক্বান ২৫/৫২)।

(৬৩) তিনি বলেন,

“হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আহলে কিতাবদের কোন একটি দলের কথা মেনে নাও, তাহ’লে ওরা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর পুনরায় কাফের বানিয়ে ফেলবে”। (সুরা আলে ইমরান ৩/১০০)।

(৬৪) আল্লাহ বলেন,

“আর তুমি ওদের মধ্যকার কোন পাপিষ্ঠ অথবা কাফেরের আনুগত্য করবে না”। (সুরা দাহর ৭৬/২৪)।

(৬৫) পাপিষ্ঠ নেতাদের আনুগত্য করা ইসলামে নিষেধ:

আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (সূরা আশ শুয়ারা ১৫১-১৫২)।

(৬৬) উদাসীন ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের আনুগত্য করতে নিষেধ করে তিনি বলেন,

“আর তুমি ঐ ব্যক্তির আনুগত্য কর না যার অন্তরকে আমরা আমাদের স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং সে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও তার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে গেছে”। (সুরা কাহ্ফ ১৮/২৮)।

(৬৭) আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের বিরোধিতা করে কাফের-মুশরিকদের আনুগত্য করলে স্পষ্ট ভ্রষ্টতায় নিপতিত হতে হবে। আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, সে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে পতিত হবে”। (সুরা আহযাব ৩৩/৩৬)।

(৬৮) আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে কাফেরদের আনুগত্য করলে পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে এবং তাঁর সীমাসমূহ লংঘন করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে চিরদিন থাকবে। আর তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি”। (সুরা নিসা ৪/১৪)।

(৬৯) যারা আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতা করে কাফেরদের অনুসরণ করে তাদের আমলসমূহ বাতিল হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই যারা কুফরী করে ও মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখে এবং তাদের নিকট হেদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাবার পরেও রাসূলের বিরোধিতা করে, তারা কখনোই আল্লাহর কোনরূপ ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ সত্বর তাদের সকল কর্ম বিনষ্ট করবেন”। (সুরা মুহাম্মাদ ৪৭/৩২)।

(৭০) বর্তমানে আমাদের মাঝে রাসুল সা. নেই, সাহাবা, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণ নেই তাহলে মুসলমান হিসেবে আমরা এখন কার আনুগত্য করবো? এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো। রাসূল ও উলিল আমরের (ইসলামি দলের নেতাদের) আনুগত্য করো। এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ ঘটে, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের নিকট ফিরে যাবে; যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস কর। এটাই তোমাদের জন্যে সুন্দর ও উত্তম উপায়”। (সূরা ৪/নিসা – ৫৯)।

(৭১) আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা হবে চরম লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত”। (সুরা আল মুজাদালা ২০)।

(৫৫) আল্লাহ বলেন, “আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং বিশ্বাসীদের পথ ভিন্ন (ইসলামি দল ব্যতীত) অন্য পথ (অনৈসলামিক দল) অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!”। (সুরা নিসা ১১৫)।

(৭২) আল্লাহ বলেন,  “হে মানবগণ! পৃথিবীর মধ্যে যা বৈধ-

পবিত্র, তা হতে ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদঙ্ক অনুসরণ করো না, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”। (সুরা আলবাক্বারাহ  ১৬৮)।

(৭৩) আল্লাহ বলেন,

“হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যা জীবিকা স্বরূপ দান করেছি তা হতে পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর যদি তোমরা তারই ইবাদত করে থা”। (সুরা আলবাক্বারাহ  ১৭২)।

(৭৪)  আল্লাহ বলেন,

“হে রাসূলগণ! আপনারা পবিত্র বস্তু হতে আহার করুন ও সৎকর্ম করুন; আপনারা যা করেন সে সম্বন্ধে আমি অবগত”। (সুরা মুমিনূন ৫১)।

(৭৫) আল্লাহ বলেন, “আর আমি যা নাযিল করেছি তোমরা তাতে ঈমান আন। এটা তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী। আর তোমরাই এর প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না। আর তোমরা শুধু আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর।” (সুরা আল বাকারা ৪১)।

(৭৬) আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।” (সুরা আল বাকারা ৪২)।

(৭৭) জাহান্নামে জাহান্নামীকে প্রবেশ করানোর জন্য সত্তর হাত আগুনের শিকল দিয়ে শৃঙ্খলিত করা হবে এবং তাকে আগুনের ভারী বেড়ী পরিধান করানো হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাকে ধর এবং গলায় বেড়ী পরিয়ে দাও। তারপর জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। অতঃপর সত্তর হাত শৃঙ্খল দ্বারা তাকে শৃঙ্খলিত কর। কেননা সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না আর ইয়াতীমদের খাদ্যদানে উৎসাহিত করত না’। (সুরা হা-ক্কাহ ৬৯/৩০-৩৪)।

(৭৮) জাহান্নামে অসংখ্য অগ্নিনির্মিত লম্বা লম্বা খুঁটি থাকবে। যাতে বিভিন্ন অপরাধীদের অত্যন্ত মযবূত করে বেঁধে রেখে আযাব দেওয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘কখনো নয়, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়। আপনি কি জানেন হুতামা কি? এটি আল্লাহর জ্বলন্ত প্রজ্বলিত আগুন। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। নিশ্চয়ই তা তাদের আবদ্ধ করে রাখবে লম্বা লম্বা স্তম্ভসমূহে’। (সুরা হুমাযাহ ১০৪/৪-৯)।

(৭৯) আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাগণ কাফেরদেরকে উল্টো করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তারা অন্ধ, মূক ও বধির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ ‘নিশ্চয়ই অপরাধীরা বিভ্রান্ত ও বিকারগ্রস্ত। যেদিন তাদেরকে উপুড় অবস্থায় মুখের উপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের দিকে, সেদিন বলা হবে, জাহান্নামের যন্ত্রণা আস্বাদন কর’। (সুরা ক্বামার ৫৪/৪৭-৪৮)।

(৮০) অন্যত্র তিনি আরো বলেন,. ‘ক্বিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখের উপর ভর দিয়ে চলা অবস্থায় অন্ধ, মূক ও বধির করে। আর তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। যখনই তা স্তিমিত হওয়ার উপক্রম হবে, তখনই তাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দেব’। (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭/ ৯৭)।

(৮১) সেদিন পাপিষ্ঠদের পা ও মাথার ঝুঁটি ধরে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। বাধা দেওয়ার মত কেউ থাকবে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘সেদিন অপরাধীদের চেনা যাবে তাদের (মলিন) চেহারা দেখে। তাদেরকে সেখানে পাকড়াও করা হবে তাদের পা ও মাথার ঝুঁটি ধরে’। (সুরা আর-রহমান ৫৫/৪১)।

(৮২) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তাদের জন্য থাকবে লৌহ নির্মিত (ভারী) হাতুড়িসমূহ। যখনই তারা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হ’তে চাইবে, তখনই তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং বলা হবে, আস্বাদন কর দহন যন্ত্রণা’। (সুরা হজ্জ ২২/২১-২২)।

(৮৩) আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ‘যেদিন তাদের মুখমন্ডল জাহান্নামের আগুনে ওলট-পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করতাম’। (সুরা আহযাব ৩৩/৬৬)।

(৮৪) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘সেদিন তুমি অপরাধীদের দেখবে শৃঙ্খলিত অবস্থায়, তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং আগুন দগ্ধিভূত করবে তাদের মুখমন্ডলকে’। (সুরা ইবরাহীম ১৪/৪৯-৫০)।

(৮৫) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন তার মুখমন্ডল দ্বারা কঠিন আযাব ঠেকাতে চাইবে, (সে কি তার মতো যে নিরাপদ?) অতঃপর যালেমদের বলা হবে, তোমরা যা অর্জন করতে তার আযাব আস্বাদন কর’। (সুরা যুমার ৩৯/২৪)।

(৮৬) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘হায় আফসোস! কাফেররা যদি সেই সময়ের কথা জানতে পারত যেদিন তারা জাহান্নামের অগ্নিশিখা সম্মুখ ও পশ্চাৎ দিক থেকে প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে (একাজে) কোন সাহায্যও করা হবে না’। (সুরা আম্বিয়া ২১/৩৯)।

(৮৭) জাহান্নামীরা যখন আল্লাহর নিকটে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আবেদন করবে, তখন আল্লাহ ও তাদের মাঝে যে কথোপকথন হবে তা নিম্নরূপ-

‘তোমাদের নিকট কি আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হ’ত না, অথচ তোমরা ওগুলো অস্বীকার করতে? তখন তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদেরকে পেয়ে বসেছিল এবং আমরা ছিলাম এক পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়। (তারা বলবে) হে আমাদের প্রতিপালক! এই আগুন হ’তে আমাদেরকে রক্ষা করুন, অতঃপর আমরা যদি পুনরায় কুফরী করি তাহ’লে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী হব। আল্লাহ বলবেন, ‘তোমরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলো না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রভু! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের উপর দয়া করুন, আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে তোমরা এত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। বস্ত্ততঃ তোমরা তো তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হ’ল সফলকাম। আল্লাহ বলবেন, তোমরা পৃথিবীতে কত বছর অবস্থান করেছিলে? তারা বলবে, আমরা অবস্থান করেছিলাম একদিন অথবা একদিনের কিয়দংশ, আপনি না হয় গণনাকারীদের জিজ্ঞেস করুন! তিনি বলবেন, তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে। তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না?’ (সুরা মুমিনূন ২৩/১০৫-১১৫)।

(৮৮) অন্যত্র আরো বর্ণিত হয়েছে, ‘হায়! তুমি যদি দেখতে যখন তাদের প্রভুর সামনে দন্ডায়মান করা হবে। তখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, ক্বিয়ামত কি সত্য নয়? উত্তরে (জাহান্নামীরা) বলবে, হে আমাদের প্রভু! আমরা আমাদের প্রতিপালকের শপথ করে বলছি, এটা বাস্তব সত্য বিষয়। তখন আল্লাহ বলবেন, তবে তোমরা এটাকে অস্বীকার করার ফলস্বরূপ শাস্তি আস্বাদন কর’। (সুরা আন‘আম ৬/৩০)।

(৮৯) মহান আল্লাহ বলেন,

‘ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে, যখনই তাতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, (জাহান্নামের) রক্ষীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসেনি? তারা বলবে, অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল। আমরা তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেননি। তোমরা তো স্পষ্টতঃ মহাভ্রান্তিতে রয়েছ। তারা আরো বলবে, আমরা যদি শুনতাম এবং বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহ’লে আমরা জাহান্নামবাসী হ’তাম না। তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে, অভিশাপ জাহান্নামীদের জন্য!’ (সুরা মুলক ৬৭/৮-১১)।

(৯০) এ মর্মে অন্যত্র বলা হয়েছে,

‘কাফেরদের জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জাহান্নামের নিকট উপস্থিত হবে তখন তার প্রবেশদ্বারগুলো খুলে দেওয়া হবে। আর জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি কি তোমাদের মধ্য থেকে রাসূলগণ আসেনি? যারা তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত তেলাওয়াত করত এবং তোমাদের এ দিনের সাক্ষাৎ সম্পর্কে সাবধান করত। তখন তারা বলবে, অবশ্যই এসেছিল। বস্ত্তত কাফেরদের প্রতি শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়েছে। তাদের বলা হবে, জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ করো তাতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। আর কতই না নিকৃষ্ট উদ্ধতদের আবাসস্থল’। (সুরা যুমার ৩৯/৭১-৭২)।

(৯১) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘আর যারা জাহান্নামে থাকবে তারা জাহান্নামের দারোয়ানদেরকে বলবে, তোমাদের রবকে একটু ডাক না! তিনি যেন একটি দিন আমাদের আযাব লাঘব করে দেন। তারা বলবে, তোমাদের নিকট কি সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তোমাদের রাসূলগণ আসেননি? জাহান্নামীরা বলবে, হ্যাঁ অবশ্যই। দারোয়ানরা বলবে, তবে তোমরাই দো‘আ কর। আর কাফিরদের প্রার্থনা কেবল নিষ্ফলই হয়’। (সুরা মুমিন ৪০/৪৯-৫০)।

(৯২) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হ’য়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, তোমরা তো আমাদের ডান দিক থেকে আসতে। তারা বলবে, বরং তোমরাতো বিশ্বাসী ছিলে না এবং তোমাদের উপর আমাদের কোন কর্তৃত্বও ছিল না। বস্ত্ততঃ তোমরাই ছিলে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিপালকের কথা সত্য হয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই শাস্তি আস্বাদন করতে হবে। আমরা তোমাদের বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত ছিলাম। সুতরাং তারা সকলেই সেইদিন শাস্তিতে শরীক হবে’। (সুরা ছা-ফফাত ৩৭/২৭-৩৩)।

(৯৩) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী মুমিনদের বলবে, তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম। যেন আমরা তোমাদের জ্যোতির কিছু অংশ গ্রহণ করতে পারি। বলা হবে, তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং আলো তালাশ কর। অতঃপর উভয়ের মাঝামাঝি স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর। সেখানে একটি দরজা থাকবে, যার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত ও বহির্ভাগে থাকবে আযাব। মুনাফিক্বরা মুমিনদের ডেকে বলবে, আমরা কি পৃথিবীতে তোমাদের সাথে ছিলাম না? তারা বলবে, হ্যাঁ, তবে তোমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছ। তোমরা প্রতীক্ষা করেছিলে, সন্দেহ পোষণ করেছিলে এবং অলীক আকাঙ্খা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল আল্লাহর হুকুম (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের ধোঁকা দিয়েছিল এক মহা প্রতারক’ (শয়তান)। (সুরা হাদীদ ৫৭/১৩-১৪)।

(৯৪) মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘যখন সবকিছুই মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান (তার অনুসারীদের) বলবে, আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি। আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। তবে আমি তোমাদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের উপর কোন ক্ষমতা ছিল না। আমি শুধুমাত্র তোমাদের আহবান করেছিলাম। আর তোমরা আমার আহবানে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ কর না। তোমরা তোমাদের প্রতিই দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমাকে উদ্ধার করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করেছিলে, তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্য তো বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে’। (সুরা ইবরাহীম ১৪/২২)।

(৯৫) আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:

‘‘নবী ও হিদায়াতপ্রাপ্তদের পর আসলো এমন এক অপদার্থ বংশধর যারা নামায বিনষ্ট করলো এবং প্রবৃত্তির পূজারী হলো। সুতরাং তারা ‘‘গাই’’ নামক জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। তবে যারা এরপর তাওবা করে নিয়েছে, ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তারাই তো জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ যুলুম করা হবে না’’। (সুরা মার্ইয়াম: ৫৯-৬০)।

(৯৬) আল্লাহ্ তা‘আলা আরো বলেন:

‘‘সুতরাং ওয়াইল্ নামক জাহান্নাম সেই মুসল্লীদের জন্য যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে গাফিল। যারা লোক দেখানোর জন্যই তা আদায় করে এবং যারা গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় ছোটখাট বস্ত্ত অন্যকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়’’। (সুরা মা’ঊন: ৪-৭)।

(৯৭) আল্লাহ্ তা‘আলা আরো বলেন:

‘‘প্রতিটি ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে সে দিন আবদ্ধ থাকবে। তবে তারা নয় যারা নিজ আমলনামা ডান হাতে পেয়েছে। তারা জান্নাতেই থাকবে। তারা অপরাধীদের সম্পর্কে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এমনকি তারা জাহান্নামীদেরকে জিজ্ঞাসা করবে: কেন তোমরা সাক্বার নামক জাহান্নামে আসলে? তারা বলবে: আমরা তো নামাযী ছিলাম না এবং আমরা মিসকিনদেরকেও খাবার দিতাম না। বরং আমরা সমালোচনাকারীদের সাথে সমালোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। এমনকি আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম। আর এমনিভাবেই হঠাৎ আমাদের মৃত্যু এসে গেলো’’। (সুরা মুদ্দাস্সির: ৩৮-৪৭)।

(৯৮) আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:

‘‘যাদেরকে আল্লাহ্ তা‘আলা অনুগ্রহ করে কিছু সম্পদ দিয়েছেন; অথচ তারা উহার কিয়দংশও আল্লাহ্ তা‘আলার রাস্তায় সদকা করতে কার্পণ্য করে তারা যেন এ কথা মনে না করে যে, তাদের এ কৃপণতা তাদের কোন উপকারে আসবে। বরং এ কৃপণতা তাদের জন্য সমূহ অকল্যাণ বয়ে আনবে। তারা যে সম্পদ আল্লাহ্ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করতে কৃপণতা করেছে তা কিয়ামতের দিন তাদের কণ্ঠাভরণ হবে। একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলাই ভূমন্ডল ও নভোমন্ডলের স্বত্বাধিকারী এবং তোমরা যা করছো তা আল্লাহ্ তা‘আলা ভালোভাবেই জানেন’’। (সুরা আ’লি ইমরান: ১৮০)।

(৯৯) আল্লাহ্ তা‘আলা আরো বলেন:

‘‘যারা স্বর্ণ-রুপা সংরক্ষণ করে এবং তা আল্লাহ্ তা‘আলার রাস্তায় একটুও ব্যয় করেনা তথা যাকাত দেয়না আপনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে কঠিন শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সে দিন যে দিন জাহান্নামের আগুনে ওগুলোকে উত্তপ্ত করে তাদের কপাল, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে এবং বলা হবে: এ হচ্ছে ওসম্পদ যা তোমরা নিজের জন্যে সংরক্ষণ করেছিলে। সুতরাং তোমরা এখন নিজ সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ করো’’। (সুরা তাওবাহ্: ৩৪-৩৫)।

(১০০) আল্লাহ্ তা‘আলা আরো বলেন:

‘‘যারা আল্লাহ্ তা‘আলাকে দেয়া দৃঢ় অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ্ তা‘আলা আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে তাদের জন্য রয়েছে লা’নত ও অভিসম্পাত এবং তাদের জন্যই রয়েছে মন্দ আবাস’’। (সুরা রা’দ্: ২৫)।

(সমাপ্ত)

রিলেটেড অন্যান্য বিষয় জানতে এদের উপর ক্লিক করুন,

(ক)  অনৈসলামিক রাজনৈতিক দলের মুসলিম ভোটারদের করুণ পরিনতি।

(খ)  মুসলিম হিসেবে আপনি কোন্ দলকে ভোট  দিবেন?

কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।

(PMMRC)

 Author and Compiler:

Md. Izabul Alam-M.A., C.In., Ed. (Islamic Studies-Rangpur Carmichael University College, Rangpur), Prominent Islamic Thinker, Researcher, Political Analyst, Writer and Blogger.

(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)

(2) GENERAL DIRECTOR- PURE MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER (PMMRC),

(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS Coaching (BBC)

(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING INSTITUTE (PTI)

(5) PRINCIPAL- BANGLADESH ONLINE UNIVERSITY (BOU)

(6) GENERAL DIRECTOR AND CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION SERVICES (PIS)

(7) EDITOR-BDC CRIME NEWS24

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক

বইয়ের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। এজন্যে  আপনি বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।

(ক) আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।

(খ) তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর কি হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।

(গ)  আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস  সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮,  রিয়াদুস  সলেহিন,  হাদিস নং  ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

Please Share On

কুরআনের নির্দেশনা, আমল ও পরিনতি।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম কুরআনের নির্দেশনা, আমল ও পরিনতি কুরআন হলো মহান আল্লাহর পবিত্র বাণী এবং সর্বশেষ আসমানি কিতাব, যা মানুষের হেদা...