বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সালাতের গুরুত্ব, ফজিলত ও সালাত পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ শাস্তি
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন
সব জিনিসের পূর্বে লোকের যে আমলের হিসাব হবে, তা হলো সালাত। যদি তার সালাত সঠিক হয়
তাহলে সে সফলকাম হবে ও নাজাত পাবে। আর যদি সালাত বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে সে বিফল ও ক্ষতিগ্রস্ত
হবে। যদি ফরয সালাতে কিছু ভুল হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ তা’আলা মালায়িকাহ্-কে (ফেরেশতাগণকে)
বলবেন, দেখো! আমার বান্দার নিকট সুন্নাত ও নফল সালাত আছে কি-না? তাহলে সেখান থেকে এনে
বান্দার ফরয সালাতের ত্রুটি পূরণ করে দেয়া হবে। এরপর এ রকম বান্দার অন্যান্য হিসাব
নেয়া হবে। অন্য এক বিবরণ এসেছে, তারপর এ রকম যাকাতের হিসাব নেয়া হবে। অতঃপর অবশিষ্ট
সব ’আমলের হিসাব একের পর এক এ রকম নেয়া হবে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৩০, ১৬৭৮, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৪১৩, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৮৬৪, ৮৬৬, সুনান ইবনু মাজাহ ১৪২৫, সুনান আননাসায়ী ৪৬৫-৬৭, সহীহ আত্ তারগীব ৫৪০, ৩৭৬,
৩৭৭, সহীহ আল জামি ২০২০, আহমাদ ৭৮৪২, ৯২১০, ১৬৫০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আমরা মুসলমান সালাত, সাওম, হজ্ব, যাকাত, দান
খয়রাতসহ শত শত আমল বা ইবাদত করে থাকি কিন্তু সব আমল বা ইবাদতের মধ্যে যদি সালাত সঠিক
না হয় বা কেহ সালাত আদায় না করে থাকে তাহলে কিয়ামতে বাকি সব আমল বা ইবাদত কোনো উপকারে
আসবে না। সালাত সঠিক না হলে তাকে জাহান্নামে যেতেই হবে।
দুঃখের বিষয় আমাদের মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে
দেখা যায়, বিশেষ করে আপনি যখন শহর, বন্দর ও হাট-বাজারে যাবেন সেই সময় আজান হলে শত করা
এক ভাগ মুসলমানও সালাত আদায় করতে মসজিদে আসে না। একদিকে মসজিদে সালাত আদায় হচ্ছে অন্যদিকে
দেখবেন হাজার হাজার মুসলমান ঘোরাফেরা করছে। অনুরুপ বাংলাদেশের প্রতিটি অফিস, আদালত,
বিভিন্ন শিল্প কল-কারখানায় একই অবস্থা। একটা অফিসের এক কোনায় সালাতের জন্য একটু জায়গা
করে দিয়েছে সেখানে কয়েকজন মাত্র সালাত আদায় করছে আর বাকি সব অলসভাবে সেই সময়টুকু কেটে
দিচ্ছে। অথচ কুরআনের ৬২নং সুরা ‘সুরা জুমআ’র ৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে
ঘোষণা করেন-
“হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাজের আজান
দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের
জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ।” (সুরা জুমআ: আয়াত ৯)।
এর অর্থ হলো সালাতের জন্য আজান হলে, সকল কাজ
বন্ধ রেখে সালাত আদায়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
সালাত আদায় করার হুকুম
আদাদের দেশে এক শ্রেণির মুসলমান যারা মারেফত
বা সুফিপন্থী তথা ভন্ড পির, আউলিয়া, গাউস কুতুব ইত্যাদি এরা সালাতকে গুরুত্ব দেয় না।
এরা বলে থাকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের কথা কুরআনে নেই। তারা নিজেরা যেমন সালাত আদায় করে
না তেমনি মুরিদদের বলে থাকে সালাত বা সাওম পালন করতে হবে না, পির বাবার সেবা করলেই
জান্নাত পাওয়া যাবে। এদের সাথে তাল মিলিয়ে সাধারণ অনেক মুসলমানও সালাত আদায় করে না।
এদের মধ্যে অনেকে আবার জুমার সালাত আদায় করে নিজেকে সাপ্তাহিক মুসলমান পরিচয় দেয়। আবার
অনেকে আছে যারা সারা বছর ধরে সালাত আদায় করে না কিন্তু রমজান এলে ৩০টি সাওম আর তারাবিহর
সালাত কখনই ছাড়ে না। এরা হচ্ছে মৌসুমী মুসলমান। যাই হোক আপনি নিজেকে যদি মুসলমান পরিচয়
দেন তাহলে আপনি যতো অসুস্থই থাকেন না কেনো সালাত আপনাকে আদায় করতেই হবে। দাঁড়িয়ে না
পারলে বসে, বসে না পারলে শুয়ে তবুও সালাত ছাড়া যাবে না। সাময়িক কিছু কারণ ছাড়া কোনো
অযুহাত চলবে না।
সকল ফরজ ইবাদতের মধ্যে সালাত হচ্ছে অন্যতম।
কুরআনের প্রায় ৮২ জায়গায় সালাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এই সালাত নারী পুরুষ উভয়ের জন্য
ফরজ। শিশুদের বয়স সাত বছর হলেই সালাতের জন্য তাগিদ দিতে হবে।
আবদুল মালিক ইবনু রাবী’ ইবনু সাবুরাহ্ থেকে
পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শিশুর বয়স সাত বছর হলেই তাকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিবে এবং তার
বয়স দশ বছর হয়ে গেলে (সালাত আদায় না করতে চাইলে) এজন্য তাকে প্রহার করবে। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৯৪, ৪৯৫, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭২, সুনান আততিরমিযী
৪০৭, ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ, দারিমী ১৪৩৯, আহমাদ (৩/৪০৪), সহীহুল
জামি ৫৮৬৮, আহমাদ ২/১৮০ ও ১৮৭) । হাদিসের মানঃ হাসান।
কুরআনে সালাত আদায়ের হুকুম
(ক) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“নিশ্চয় সালাত মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে
ফরয”। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৩)।
(খ) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“আর
তাদেরকে কেবল এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ‘ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে
একনিষ্ঠ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়; আর এটিই হলো সঠিক দীন।” (সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫)।
(গ) নাফে‘ ইবন আযরাক ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু
‘আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কুরআনে পেয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ,
পেয়েছি। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন,
“অতএব, তোমরা আল্লাহর তাসবীহ কর, যখন সন্ধ্যায়
উপনীত হবে এবং সকালে উঠবে। আর অপরাহ্নে ও জোহরের সময়ে। আর আসমান ও যমীনে সকল প্রশংসা
একমাত্র তাঁরই। (সূরা আর-রূম, আয়াত: ১৭-১৮)।
(ঘ) আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ‘আর তোমরা আমার
স্মরণোদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা-২০ তহা, আয়াত:
১৪)।
(ঙ) আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (সা.)-কে সম্বোধন করে
বলেন, ‘তুমি সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করো এবং ফজরের
নামাজ (কায়েম করো)। নিশ্চয়ই ফজরের নামাজে সমাবেশ ঘটে।’ (সুরা
বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৮)।
এখানে সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার
পর্যন্ত জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার সালাতের কথা বলা হয়েছে। আর ফজরের সালাতকে আলাদাভাবে
উল্লেখ করা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব নির্দেশ করে। এই সালাতের বিশেষত্বের
আরেকটি দিক হলো, এ সালাতের সময় ফেরেশতাদের সমাবেশ ঘটে। যারা আল্লাহর দরবারে বান্দার
সালাতের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করে।
আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা’আলার
বাণীঃ “আর ফজরে কুরআন পাঠের স্থায়ী নীতি অবলম্বন কর। কেননা ফজরের কুরআন পাঠে উপস্থিত
থাকা হয়"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৭৮)। এ আয়াত প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেনঃ এ সময় রাতের ফেরেশতারা এবং দিনের ফেরেশতারা উপস্থিত হয়। (সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ৩১৩৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তুমি
নামাজ কায়েম করো দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে। নিশ্চয়ই নেক আমল মন্দ কর্মগুলোকে
দূর করে দেয়। স্মরণকারীদের জন্য এটি একটি স্মারক।’ (সুরা
হুদ, আয়াত : ১১৪)।
এই আয়াতে বর্ণিত দিনের দুই প্রান্ত ও রাতের
কিছু অংশের সালাত হলো ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশা।
পবিত্র কুরআনে সালাতের আদেশ করা হয়েছে কখনো
বহুবচনের শব্দে। যেমন—পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তোমরা নামাজ কায়েম
করো এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত
: ৪৩)।
একই সুরার অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তোমরা
নামাজ কায়েম করো ও জাকাত আদায় করো এবং (স্মরণ রেখো) তোমরা যেকোনো সৎকর্ম নিজেদের কল্যাণার্থে
সম্মুখে প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যেকোনো কাজ করো আল্লাহ তা
দেখছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১১০)।
(চ) নবী (সা.)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা অন্য
আয়াতে ইরশাদ করেছেন, ‘ওহির মাধ্যমে তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত
করো ও নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে আর আল্লাহর
জিকিরই সবচেয়ে বড়। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা
আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)।
(ছ) লোকমান হাকিম (রহ.) তাঁর সন্তানকে নানা বিষয়ের
উপদেশ দানের কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। প্রিয় সন্তানকে প্রদত্ত
অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ছিল সালাতের ব্যাপারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে বৎস, নামাজ
কায়েম করো, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করো, মন্দ কাজে বাধা দাও এবং তোমার যে কষ্ট দেখা
দেয়, তাতে সবর করো। নিশ্চয়ই এটা অত্যন্ত হিম্মতের কাজ।’ (সুরা
লুকমান, আয়াত : ১৭)।
এই আয়াতেও সালাতের আদেশ করা হয়েছে। ‘নিশ্চয়
এটা অত্যন্ত হিম্মতের কাজ।’ কেউ কেউ এই আয়াতের অর্থ করেছেন, ‘এগুলো বাধ্যতামূলক বিষয়াবলীর
অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এ বিষয় তিনটি তোমাদের প্রতি অবধারিত করে দেওয়া হয়েছে। এগুলো ঐচ্ছিক
ব্যাপার নয় যে পালন না করলেও চলবে। বরং এগুলো নিজের দ্বিন ও মানবিক পূর্ণতা বিধানের
জন্য অবশ্য পালনীয় হুকুম।
কুরআন-হাদিসে ইসলামী বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে
সাধারণত পুরুষদের সম্বোধন করেই আদেশ করা হয়। যাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সেই সব
বিধানের অন্তর্ভুক্ত থাকে। এতদসত্ত্বেও পবিত্র কুরআনে নারীদের সম্বোধন করে সালাত কায়েম
করা এবং জাকাত প্রদান করার আদেশ করা হয়েছে। নবীপত্নীদের বিশেষভাবে সম্বোধন করে সব নারীর
উদ্দেশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে নবী পত্নীরা, তোমরা সাধারণ কোনো নারীর মতো নও। যদি
তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তোমরা কোমলভাবে কথা বলো না, অন্যথায় যার অন্তরে ব্যাধি
আছে, সে লালসায় পড়বে। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলো এবং তোমাদের ঘরে অবস্থান করো। প্রাচীন
জাহিলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়িও না। এবং নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায় করো।
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা
দূর করতে এবং তোমাদের উত্তমভাবে পবিত্র করতে।’ (সুরা আহজাব,
আয়াত : ৩২-৩৩)।
(জ) আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাঠ করো কোরআন থেকে
যা তোমাদের জন্য সহজ হয়।’ (সুরা-৭৩ মুয্যাম্মিল, আয়াত:
২০)।
(ঝ) আল্লাহ তাআলা বলেন, এবং তোমরা আল্লাহর পথে
সাধনা কর, যেমন সাধনা করা উচিত। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের
প্রতি কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীন (-কে আঁকড়ে ধর)। তিনিই
তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম, পূর্বেও এবং এ কিতাবেও, যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী
হয় আর তোমরা (অন্যান্য) মানুষের জন্য সাক্ষী হও। সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত
আদায় কর এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে ধর। তিনিই তোমাদের অভিভাবক। তিনি কত উত্তম অভিভাবক
এবং কত উত্তম সাহায্যকারী। (সূরা হজ্ব (২২) : ৭৮)।
(ঞ) আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার যে বান্দাগণ ঈমান
এনেছে তুমি তাদেরকে বল, তারা যেন নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি,
তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে খরচ করে, সেই দিন আসার আগে, যে দিন কোনো বেচাকেনা থাকবে
না এবং বন্ধুত্বও থাকবে না। (সূরা ইবরাহীম (১৪): ৩১।
হাদিসে সালাত আদায়ের হুকুম
(ক) ইবন ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১.
আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. সালাত কায়িম করা। ৩. যাকাত আদায় করা।
৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমাযানের সিয়ামব্রত পালন করা। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৮, ৪৫১৪; সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬, আহমাদ ৬০২২, ৬৩০৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৭, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৭, সুনান আততিরমিযী ২৬০৯; সুনান আননাসাঈ ৫০০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ) আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
“যে ব্যক্তি ৫টি জিনিস ঈমানের সাথে বাস্তবায়ন
করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে: (১) যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের হেফাযত করবে অর্থাৎ
সঠিকভাবে ওযু করবে, ভালভাবে রুকূ’ ও সেজদা করবে এবং সঠিক সময়ে তা আদায় করবে, (২) রামাযান
মাসে ছিয়াম পালন করবে (৩) সাধ্য থাকলে আল্লাহর ঘরের হজ্জ করবে (৪) খুশি মনে যাকাত আদায়
করবে এবং (৫) আমানত আদায় করবে।
তাঁকে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রসূল! আমানত
আদায় করার অর্থ কি?
তিনি বললেন, “জানাবাত তথা নাপাকী থেকে গোসল
করা। কেননা আল্লাহ তা’আলা জানাবাতের গোসলের চাইতে কোন বস্ত্ত আদম সন্তানের ধর্মের মধ্যে
আমানত স্বরূপ রাখেন নি।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৯)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
(গ) ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
জনৈক ব্যক্তি এক মহিলাকে চুমু দিয়েছিল। তারপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
নিকট এসে বিষয়টি বললো। এ সময়ে আল্লাহ ওয়াহী নাযিল করেনঃ
“সালাত ক্বায়িম কর দিনের দু’ অংশে, রাতের কিছু
অংশে। নিশ্চয়ই নেক কাজ পাপ কাজকে দূর করে দেয়’’- (সূরাহ্ হূদ ১১: ১১৪)।
লোকটি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এটা
কি আমার জন্য? তিনি বললেন, এটি আমার সকল উম্মতের জন্য। অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে তিনি
বলেছিলেন, "আমার উম্মাহর মধ্যে যারা এটি মেনে চলে তাদের জন্যও”। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫২৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৮৯৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৭৬৩, সুনান আততিরমিযী ৩১১৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪২৫৪, আহমাদ ৩৬৫৩, সহীহ ইবনু
হিব্বান ১৭২৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবদুল্লাহ (রাঃ)] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে
বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্
কাজ (’আমল) আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,
সঠিক সময়ে সালাত আদায় করা। আমি বললাম, এরপর কোন্ কাজ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন্ কাজ? তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। রাবী [ইবনু মাস্’ঊদ
(রাঃ)] বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এসব উত্তর দিলেন। আমি যদি
আরও জিজ্ঞেস করতাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে আরও কথা বলতেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৮, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫২৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৫৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৫, সুনান আননাসায়ী ৬১০,
আহমাদ ৩৮৯০, ইরওয়া ১১৯৮, সহীহ আত্ তারগীব ৩৯৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, যা আল্লাহ
তা’আলা (বান্দার জন্য) ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি এ সালাতের জন্য ভালোভাবে উযূ করবে, সঠিক
সময়ে আদায় করবে এবং এর রুকূ’ ও খুশুকে পরিপূর্ণরূপে করবে, তার জন্য আল্লাহর ওয়া’দা
রয়েছে যে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যে তা না করবে, তার জন্য আল্লাহর ওয়া’দা নেই।
ইচ্ছা করলে তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন আর ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭০, আহমাদ ২২৭০৪, সুনান আবূ দাঊদ
৪২৫, মালিক ১৪, সুনান আননাসায়ী ৪৬১, সহীহ আত্ তারগীব ৩৭০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ) আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের ওপর ফরয করা পাঁচ ওয়াক্ত
সালাত আদায় কর, তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট করা মাসটির সিয়াম (রোযা) পালন কর, আদায় কর তোমাদের
ধন-সম্পদের যাকাত এবং তোমাদের নেতৃবৃন্দের আনুগত্য কর। তাহলে তোমাদের রবের জান্নাতে
প্রবেশ করতে পারবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭১, আহমাদ
২১৬৫৭, সুনান আততিরমিযী ৬১৬, সিলসিলাহ্ আস্ সহীহাহ্ ৮৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(ছ) আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমার বন্ধু (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উপদেশ দিয়েছেনঃ (১) তুমি
আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে খণ্ডবিখন্ড করা হয় বা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া
হয়; (২) ইচ্ছা করে কোন ফরয সালাত ত্যাগ করবে না, যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ফরয সালাত ত্যাগ
করবে তার ওপর থেকে ইসলাম প্রদত্ত নিরাপত্তা উঠে যাবে; (৩) মদ পান করবে না, কারণ মদ
হচ্ছে সকল মন্দের চাবিকাঠি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫৮০, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪০৩৪, সহীহ আত্ তারগীব ৫৬৭)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(জ) আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনসমক্ষে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময়
তাঁর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘ঈমান কী?’ তিনি বললেনঃ ‘ঈমান হল, আপনি বিশ্বাস
রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর মালাকগণের প্রতি, (কিয়ামতের দিন) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের
প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি।’ তিনি
জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলাম কী?’ তিনি বললেনঃ ‘ইসলাম হল, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর
সাথে অংশীদার স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ যাকাত আদায় করবেন এবং রমাযান-এর
সিয়ামব্রত পালন করবেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কী?’ তিনি বললেনঃ ‘আপনি এমনভাবে
আল্লাহর ‘ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে
(মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিয়ামত কবে?’ তিনি বললেনঃ
‘এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন। তবে
আমি আপনাকে কিয়ামতের আলামতসমূহ বলে দিচ্ছিঃ বাঁদী যখন তার প্রভুকে প্রসব করবে এবং উটের
নগণ্য রাখালেরা যখন বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে। (কিয়ামতের জ্ঞান) সেই
পাঁচটি জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ জানে না।’ অতঃপর আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেনঃ ‘কিয়ামতের জ্ঞান
কেবল আল্লাহরই নিকট......।’ (সূরাহ্ লুক্বমান ৩১/৩৪)
এরপর ঐ ব্যক্তি চলে গেলে তিনি বললেনঃ ‘তোমরা
তাকে ফিরিয়ে আন।’ তারা কিছুই দেখতে পেল না। তখন তিনি বললেন, ‘ইনি জিবরীল (আ)। লোকদেরকে
তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।’
আবূ ‘আবদুল্লাহ বুখারী (রহ.) বলেন, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব বিষয়কে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫০, ৪৭৭৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ৪৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৮, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৫১)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
সালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত
সালাত আদায় স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য
অতীব গুরুত্বপূর্ণ এমন এক ইবাদত যা বালেগ-বালেগা সকল মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক। এ
সালাত আদায়ে আখেরাতের অফুরন্ত কল্যাণের পাশাপাশি দুনিয়াবী নগদ কল্যাণও আছে।
কুরআন অনুযায়ী সালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত
(১) জান্নাতে সম্মানজনক আসন পাবেঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নামাযীরা পাবে জান্নাতে
সম্মানজনক আসন যারা নিজেদের সালাত হেফাযত করে, (পরকালে) তারা (অতীব) মর্যাদাসম্পন্ন
জান্নাতে অবস্থান করবে।” (সূরা ৭০; মা'আরিজ ৩৪৩৫)।
(২) সালাতের কারণে অপরাধ থেকে আল্লাহ নিজেই তাদেরকে হেফাযতে রাখেনঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিঃসন্দেহে সালাত (মানুষকে)
অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা ২৯; আনকাবুত
৪৫)।
(৩) সালাত আদায়কারীরা সফলতা লাভ করে ফেলেছেঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ঐসব মুমিন বান্দারা নিশ্চিত
সফলতা লাভ করে ফেলেছে, যারা তাদের সালাতে (খুশু-খুযূ ও) বিনয়াবনত থাকে”। (সূরা ২৩; মুমিনূন ১-২)।
এখানের আয়াতে ‘ফালাহ' শব্দের মধ্যে দুনিয়া
ও আখেরাত উভয় জাহানের কল্যাণ বুঝানো হয়েছে।
(৪) সালাত হলো এক উত্তম যিকির। আর এর মধ্যে রয়েছে আত্মার প্রশান্তিঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যারা (আল্লাহর ওপর) ঈমান
আনে এবং যাদের অন্তকরণ আল্লাহর যিকিরে প্রশান্ত হয়। জেনে রেখো, একমাত্র আল্লাহর যিকিরই
(মানুষের) অন্তরসমূহকে প্রশান্ত করে।” (সূরা ১৩; রা’দ
২৮)।
(৫) ইহ ও পরকালের কাজকর্মের সহায়ক হলো সালাত। এ জন্য আল্লাহ তাআলা
সবর ও সালাতের মাধ্যমে সহায়তা চাইতে বলেছেনঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “(হে ঈমানদার ব্যক্তিরা!)
তোমরা সবর ও নামাযের মাধ্যমে (আল্লাহর) কাছে সাহায্য চাও।” (সূরা ২; বাকারা ৪৫)।
এ জন্য যখন কোন সমস্যা আসতো বা বড় বড় কাজ
আসতো তখন রাসূলুল্লাহ (স) সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। আর এরই মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য
চাইতেন।
(৬) এ আমলের মধ্যে রুযী-রোজগারেরও প্রশস্ততা রয়েছে, যে প্রাপ্তি একেবারেই
নগদঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমার পরিবার-পরিজনকে
নামাযের আদেশ দাও এবং তুমি (নিজেও) তার ওপর অবিচল থেকো।” (সূরা
২০; ত্বা-হা ১৩২)।
(৭) ঈমান ও কাজকর্মে দৃঢ়তা এনে দেয় সালাতঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “(আসলে) মানুষকে সৃষ্টিই
করা হয়েছে ভীরু জীব হিসেবে, যখন তার ওপর কোন বিপদ আসে তখন সে ঘাবড়ে যায়, (আবার)
যখন তার সচ্ছলতা ফিরে আসে তখন সে কার্পণ্য করতে আরম্ভ করে। কিন্তু সেসব লোকদের কথা
আলাদা যারা সালাত আদায় করে। যারা নিজেদের সালাতে সার্বক্ষণিকভাবে কায়েম থাকে।” (সূরা ৭০; মাআরিজ ১৯-২৩)।
হাদিস অনুযায়ী সালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত
(১) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়কারীর
গুনাহসমূহ আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেনঃ
(ক) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবীগণের উদ্দেশে) বললেন, আচ্ছা বলো
তো, তোমাদের কারো বাড়ীর দরজার কাছে যদি একটি নদী থাকে, যাতে সে নদীতে দিনে পাঁচবার
গোসল করে তাহলে কি তার শরীরে কোন ময়লা থাকতে পারে? সাহাবীগণ উত্তরে বললেন, না, কোন
ময়লা থাকবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এ দৃষ্টান্ত হলো পাঁচ
ওয়াক্ত সালাতের। এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়কারীর
গুনাহসমূহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫৬৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫২৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪০৮, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৬৬৭, সুনান আননাসায়ী ৪৬২, সুনান আততিরমিযী ২৮৬৮, আহমাদ ৮৯২৪, সহীহ ইবনু হিব্বান
১৭২৬, ইরওয়া ১৫, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে একথা বলতে শুনেছেনঃ ’’পাঁচ ওয়াক্ত নামায তার মধ্যবর্তী
সময়ের পাপ সমূহের জন্য কাফ্ফারা স্বরূপ।’’ তারপর রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) বলেনঃ
“তুমি মনে কর যদি একজন লোক কোন কর্মে ব্যস্ত
থাকে আর তার কর্মস্থল ও বাড়ীর মাঝে পাঁচটি নদী থাকে। কর্মস্থলে পৌঁছে আল্লাহ যা চায়
তা কর্ম সম্পাদন করে। ফলে তার শরীরে ময়লা জমে বা ঘর্মাক্ত হয়। ফিরে আসার সময় প্রত্যেকটি
নদীতে একবার করে গোসল করে। এতে তার শরীরে কোনরূপ ময়লা অবশিষ্ট থাকবে কি? অনুরূপ উদাহরণ
হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের। যখনই কোন গুনাহের কাজ করে ফেলবে তখনই নামাযের মাধ্যমে দুআ
করবে ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তাহলে তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৫৫, বাযযার ৩৪৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(গ) আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ ও আবূ কুরায়ব
(রহঃ) ... জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, যিনি আবদুল্লাহর পুত্র। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে তোমাদের কারোর বাড়ীর দরজার পাশ দিয়ে
দু’কুল ছাপিয়ে উঠা প্রবহমান নদীর সাথে উপমা দেয়া যেতে পারে। আর ঐ নদীতে সে প্রতিদিন
পাঁচবার করে গোসল করে। বর্ণনাকারী বলেন, হাসান বলেছেনঃ এভাবে (গোসল করলে) কোন ময়লা
অবশিষ্ট থাকবে না। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪০৯,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৬৮, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৩৯৫, ইসলামীক সেন্টার ১৪০৭, আত্ তারগীব
ওয়াত্ তারহীব ৩৫৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, ছাহাবীদের মধ্যে দু’জন লোক পরস্পর ভাই ভাই ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন অন্য
জনের ৪০ দিন পূর্বে মৃত্যু বরণ করেন। তখন প্রথম ব্যক্তির মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ্
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে আলোচনা করা হয়। রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ
“শেষের জন কি মুসলমান ছিল না?’’ তারা বললেনঃ
হ্যাঁ, তাতে তো কোন অসুবিধা ছিল না।
রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বললেনঃ
“তোমরা কিভাবে জানতে পারবে শেষের ব্যক্তির
নামায তাকে কোথায় নিয়ে গেছে? কেননা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উদাহরণ হচ্ছে স্ববেগে প্রবাহমান
মিষ্টি পানির একটি নদীর সাথে। যা কারো ঘরের দরজায় থাকে এবং সে দৈনিক তাতে পাঁচবার গোসল
করে। তাহলে কি তোমরা মনে কর তার শরীরে কোন ময়লা থাকতে পারে? তোমরা জানো না ঐ ব্যক্তির
নামায তাকে কোন জায়গায় নিয়ে গেছে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্
তারহীব ৩৭১, হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ইমাম মালেক ১/১৭৪, আহমাদ ১/১৭৭, নাসাঈ, ইবনে খুযায়মা,
১/১৬০ হাদীছের বাক্য মালেকের)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এক জুমু’আহ্
হতে অপর জুমু’আহ্ পর্যন্ত সব গুনাহে্র কাফফারাহ্ হয়ঃ
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমু’আহ্
হতে অপর জুমু’আহ্ পর্যন্ত এবং এক রমাযান হতে আরেক রমাযান পর্যন্ত সব গুনাহে্র কাফফারাহ্
হয়, যদি কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকা হয়। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৩৩,
আহমাদ ৯১৯৭, সহীহাহ্ ৩৩২২, সহীহ আল জামি ৩৮৭৫, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৫৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩) গাছের ঝরা পাতার মতো গুণাহসমূহ ঝরে যায়ঃ
(ক) আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক শীতের
সময়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন, আর তখন গাছের পাতা ঝরে পড়ছিল। তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি গাছের দু’টি ডাল ধরে নাড়া দিলেন। বর্ণনাকারী
বলেন, তাতে গাছের পাতা ঝরতে লাগলো। আবূ যার (রাঃ) বলেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) আমাকে ডাকলেন, হে আবূ যার! উত্তরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি উপস্থিত।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কোন মুসলিম বান্দা যদি
আল্লাহর সন্তুষ্টির বিধানের জন্য খালিস মনে সালাত
আদায় করে, তার জীবন থেকে তার গুনাহসমূহ এভাবে ঝরে পড়তে থাকে যেভাবে গাছের পাতা
ঝরে পড়ে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৬, আহমাদ ২১০৪৬,
সহীহ আত্ তারগীব ৩৮৪)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(খ) আবু উছমান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা
সালমান ফারসী (রাঃ) এর সাথে এক গাছের নীচে বসে ছিলাম। এমন সময় তিনি একটি শুকনো ডাল
ধরলেন এবং ঝাকালেন তখন তার পাতাগুলো ঝরে পড়ে গেল। তিনি বললেন: হে আবু উছমান! আপনি কি
জিজ্ঞেস করবেন না কেন আমি এরূপ করলাম? আমি বললামঃ কেন এরূপ করলেন?
তিনি বললেনঃ এভাবেই রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার সাথে করেছিলেন। তখন আমি তাঁর সাথে একটি গাছের নীচে ছিলাম।
তিনি গাছের একটি শুকনা ডাল ঝাকালে তার সব পাতা ঝরে গেল। তিনি বললেনঃ হে সালমান তুমি
কি প্রশ্ন করবে না কেন আমি এরূপ করলাম? আমি বললাম, কেন এরূপ করলেন?
তিনি বললেনঃ ’’মুসলিম ব্যক্তি যখন ওযু করে
এবং ওযুকে সুন্দরভাবে সম্পাদন করে, অতঃপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, তাহলে তার গুনাহ
সমূহ ঝরে যায় যেমন করে এই পাতাগুলো ঝরে গেল। আর তিনি পাঠ করলেন আল্লাহ এই বাণীঃ
“তুমি সালাত আদায় করো দিনের উভয় প্রান্তে এবং
রাতের কিছু অংশে। নিশ্চয়ই নেক কাজ সমূহ গুনাহ সমূহকে শেষ করে দেয়। আর এটা হচ্ছে উপদেশ
গ্রহণ কারীদের জন্য একটি উপদেশ।’’ (সূরা হূদঃ ১১৪)। (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৩, আহমাদ ৫/৪৩৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪) যতো বেশী সিজদাহ ততো বেশী মর্যাদা বৃদ্ধি ও ততোটা গুণাহ কমতে থাকেঃ
(ক) মাদান ইবনু ত্বলহাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুক্তদাস সাওবান (রাঃ)-এর
সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, আমাকে এমন একটি কাজের সন্ধান দিন যে কাজ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ
করাবে। তিনি খামোশ থাকলেন। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। তিনি খামোশ (নীরব) রইলেন। তৃতীয়বার
তাকে আবার একই প্রশ্ন করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, আমি নিজেও এ বিষয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহকে বেশি বেশি সিজদা্
করতে থাকবে। কেননা আল্লাহকে তুমি যত বেশি সিজদা্ করতে থাকবে, আল্লাহ তোমার মর্যাদা
বাড়াতে থাকবেন। তোমার অতটা গুনাহ উক্ত সিজদা্
দিয়ে কমাতে থাকবেন। মা’দান বলেন, এরপর আবুদ্ দারদার সাথে দেখা করে তাকেও আমি
একই প্রশ্ন করি। তিনিও আমাকে সাওবান (রাঃ)যা বলেছিলেন তাই বললেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৮৯৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৯৮০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৮৮, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৪২৩, সুনান আততিরমিযী ৩৮৮, আহমাদ
২২৩৭৭, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৮৭, সুনান আননাসাঈ ২/২২৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৯৭৫,
ইসলামিক সেন্টারঃ ৯৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) উবাদা বিন সামেত (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে একথা বলতে শুনেছেন যে, “কোন বান্দা যখন আল্লাহর
জন্য একটি সেজদা করবে, তখন আল্লাহ বিনিময়ে তাকে একটি নেকী প্রদান করবেন, তার একটি গুনাহ
মুছে দিবেন এবং তার একটি মর্যাদা উন্নীত করবেন।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৮৬, সুনান ইবনে মাজাহ ১৪২৪ সনদ সহীহ্ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “বান্দা তার পালনকর্তার সর্বাধিক
নিকটবর্তী হয় যখন সে সেজদা অবস্থায় থাকে। সুতরাং তোমরা সে সময় বেশী করে দু’আ কর।’’
(আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৮৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৯৭০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৯৬৫, ইসলামিক সেন্টারঃ ৯৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(৫) বেশী বেশী সিজদাহর কারণে জান্নাতে রাসুল সাঃ এর সাহচার্য লাভ করা
যায়ঃ
রবীআহ্ ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি রাতের বেলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকতাম। উযূর পানিসহ
অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন মিসওয়াক, জায়নামায ইত্যাদি এগিয়ে দিতাম। একদিন তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন, (দীন-দুনিয়ার কল্যাণের জন্য যা কিছু
চাও) চেয়ে নাও। আমি নিবেদন করলাম, আমার তো শুধু জান্নাতে আপনার সাহচর্য লাভই একমাত্র
কাম্য। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (যে মর্যাদায় তুমি পৌঁছতে চাও
এটা তো বড় কথা) এছাড়া আর কিছু চাও? আমি বললাম, এটাই আমার একমাত্র আবেদন। তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি বেশি বেশি সিজদা্ করে (এ মর্যাদা লাভের জন্য) আমাকে
সাহায্য কর। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৮৯৬, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৯৮১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৮৯, সুনান আবূ দাঊদ ১৩২০, সুনান আননাসায়ী
১১৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৯৭৬, ইসলামিক সেন্টারঃ ৯৮৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৬) পায়ে হেঁটে মসজিদে গেলে প্রতি কদমে কদমে নেকিঃ
(ক) আওস ইবনু আওস আস-সাকাফী (রাঃ) বলেন, আমি নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি জুমুআহর দিন (স্ত্রী সহবাসজনিত)
গোসল করলো এবং নিজে গোসল করলো এবং সকাল সকাল যানবাহন ছাড়া পদব্রজে মসজিদে এসে ইমামের
কাছাকাছি বসলো, মনোযোগ সহকারে প্রথম থেকে খুতবাহ শুনলো এবং অনর্থক কিছু করলো না, তার
জন্য প্রতি কদমে এক বছরের সাওম রাখ ও তার রাত জেগে সালাত পড়ার সমান সওয়াব রয়েছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৮৮, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪৫, সুনান ইবনু মাজাহ ১০৮৭, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৪৯৯০, ইবনুর হিব্বান ২৭৮১, সুনানুল কুবরা
লিল বায়হাক্বী ৫৮৭৮, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১০৬৫, সহীহ আত্ তারগীব ৬৯০, সহীহ আল জামি‘ ৬৪০৫,
আত্ তিরমিযী ৪৯৬, নাসায়ী ১৩৮১, ১৩৮৪, ১৩৯৮, আহমাদ ১৫৭২৮, ১৫৭৩৯, ১৫৭৪২, ১৬৫১৩, ১৫৪৬-৪৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
প্রকাশ থাকে যে, যে ব্যক্তি গাড়ি করে জুমুআহ
পড়তে আসে, তার এ সওয়াব লাভ হয় না। বলা বাহুল্য, যে বাসা থেকে ১০০ কদম পায়ে হেঁটে জামে
মসজিদে পৌঁছবে, তার আমল-নামায় ১০০ বছরের রোযা-নামাযের সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে; যাতে
একটি গোনাহও থাকবে না। আর তা এখানেই শেষ নয়। এইভাবে সে প্রতি মাসে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০
এবং প্রতি বছরে প্রায় ৫২০০ বছরের নামায-রোযার সওয়াব অর্জন করবে ইনশাআল্লাহ। আর এ হলো
মুসলিম বান্দাদের প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।
(খ) আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তির জামা‘আতের সাথে
সালাতের সওয়াব, তার নিজের ঘরে ও বাজারে আদায়কৃত সালাতের সওয়াবের চেয়ে পঁচিশ গুণ বাড়িয়ে
দেয়া হয়। এর কারণ এই যে, সে যখন উত্তমরূপে উযূ করলো, অতঃপর একমাত্র সালাতের উদ্দেশে
মসজিদে রওয়ানা করল তখন তার প্রতি কদমের বিনিময়ে একটি মর্তবা বৃদ্ধি করা হয় এবং একটি
গুনাহ মাফ করা হয়। সালাত আদায়ের পর সে যতক্ষণ নিজ সালাতের স্থানে থাকে, মালাকগণ তার
জন্য এ বলে দু‘আ করতে থাকেন - ‘‘হে আল্লাহ! আপনি তার উপর রহমত বর্ষণ করুন এবং তার প্রতি
অনুগ্রহ করুন।’’ আর তোমাদের কেউ যতক্ষণ সালাতের অপেক্ষায় থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে সালাতে
রত বলে গণ্য হয়। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৪৭,
১৭৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৬১১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৬১৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) উক্ববা
বিন আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা
করেন। তিনি বলেনঃ “কোন ব্যক্তি যখন পবিত্রতা অর্জন করে সালাত আদায়ের লক্ষ্যে মসজিদে
আসে, তবে মসজিদের দিকে তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে লেখক ফেরেশতাদ্বয় বা লেখক ফেরেশতা
দশটি নেকী লিখে নেন। আর সালাতের উদ্দেশ্যে অপেক্ষমান উপবিষ্ট ব্যাক্তি কুনূতকারী তথা
সালাতরত ব্যাক্তির ন্যায় ছোয়াবের অধিকারী হবে। আর সে ব্যাক্তিকে তার বাড়ী হতে বের হয়ে
ফিরে আসা পর্যন্ত মুসল্লীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৯৮, আহমাদ ৪/১৫৭, আবু ইয়ালা ১৭৪৭,
ইবনু খুযায়মাহ্ ২/৩৭৪ ও ইবনু হিব্বান ২০৩৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যে ব্যাক্তি জামাআত
আদায় হয় এমন মসজিদে যাবে, তার এক পদক্ষেপে একটি পাপ মিটিয়ে দেয়া হবে, আর এক পদক্ষেপে
তার জন্য একটি নেকী লেখা হবে। যাওয়া এবং ফিরে আসা উভয় অবস্থায় এরুপ লিখা হবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৯৯, আহমদ ২/১৭২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(ঙ) সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
জনৈক আনসারী সাহাবীর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে একটি হাদীছ
শোনাবো। শুধুমাত্র ছওয়াবের আশাতেই আমি তোমাদের সামনে হাদীছটি বর্ণনা করব। আমি রাসুলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে একথা বলতে শুনেছিঃ
“তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন ওযু করে, অতঃপর
ওযুকে সুন্দররূপে সম্পাদন করে। তারপর নামাযের জন্যে বের হয় যখনই সে ডান পা উঠায় তখনই
তার জন্যে আল্লাহ্ একটি নেকী লিখে দেন। যখনই বাম পা রাখে তখনই আল্লাহ তার একটি গুনাহকে
মোচন করে দেন। সুতরাং তোমরা মসজিদের নিকটে বা দূরে বসবাস কর। (পদক্ষেপ অনুযায়ী ছওয়াব
পাওয়া যাবে) মসজিদে এসে সে জামাতের সাথে নামায আদায় করলে তাকে ক্ষমা করা হবে। মসজিদে
এসে যদি দেখে যে লোকেরা কিছু নামায পড়ে নিয়েছে এবং কিছু নামায বাকী রয়েছে, তবে যা পাবে
তা তাদের সাথে আদায় করবে এবং যা ছুটে গেছে তা পুরা করবে, তবে সে অনুরূপই ছোয়াব পাবে।
আর যদি মসজিদে এসে দেখতে পায় যে জামাত শেষ হয়ে গেছে, তবে সে নামাযকে পূর্ণ করবে তবে
সে অনুরূপই (জামাতের সাথে নামায পড়ার) ছোয়াব পাবে।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০১, সুনান আবু দাউদ ৫৬৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(চ) জাবের
(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ মসজিদের পাশে একটি স্থান খালি হলে বনু সালামা গোত্রের
লোকেরা মসজিদের নিকটবর্তী সে জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা করল। এ সংবাদ নবী (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট পৌঁছলে তিনি তাদেরকে বললেনঃ
“শুনলাম
তোমরা নাকি মসজিদের নিকটে স্থানান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা করেছ?’’ তারা বলল হ্যাঁ, হে আল্লাহর
রাসূল! আমরা এরুপ ইচ্ছা করেছি। তিনি বললেনঃ
’’হে বনু সালমা গোত্র! তোমরা পূর্বের স্থানেই থাক, তোমাদের পদক্ষেপ সমূহ লিখা হবে।
তোমরা তোমাদের আগের বাসস্থানেই রয়ে যাও, (মসজিদের প্রতি) তোমাদের পদক্ষেপ সমূহ লিখে
রাখা হবে।’’ একথা শুনে তারা বললঃ এতে আমরা যত খুশী হয়েছি, স্থানান্তরিত হয়ে গেলে এত
খুশী হতে পারতাম না।’’
(হাদীছটি বর্ণনা করেছেন মুসলিম ৬৬৫ প্রমূখ।
মুসলিমের অনুরূপ এক রেওয়ায়াতের শেষে রয়েছেঃ ’’তোমাদের প্রত্যেক পদক্ষেপে রয়েছে একটি
করে মর্যাদা।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০৪, ৩০৫, ৩০৬,
৩০৭, ৩০৮, ৩০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৭) জামা‘আতে সালাত আদায়ের ফজিলতসমূহঃ
জামা‘আতে সালাত পড়া ওয়াজিব হওয়ার পাশাপাশি
তাতে অনেকগুলো ফযীলতও রয়েছে। যা নিম্নরূপ:
(১) একা সালাত আদায়ের চাইতে জামা‘আতে সালাত পড়ায় বিশ গুণ বেশি সাওয়াব
রয়েছেঃ
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যাক্তির জামাআতে সালাত তার
ঘরে বা বাজারে পড়া সালাত অপেক্ষা বিশ গুণের অধিক মর্যাদাপূর্ণ। (সুনান ইবনু মাজাহ, ৭৮৬, সহিহ বুখারী ৪৭৭, ৬৪৭, ৬৪৯, ২১১৯, ৪৭১৭;
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), ১৩৬৫, ১৩৬৬, সুনান আততিরমিযী ২১৬, সুনান আননাসায়ী ৪৮৬,
৮৩৮; সুনান আবূ দাঊদ ৫৫৯, আহমাদ ৭৩৮২, ৭৫৩০, ৭৫৫৭, ৮১৪৯, ৮৯০৫, ৯৫৫১, ৯৭৬২, ৯৭৯৯, ৯৯২৬,
১০১২৬, ১০৪১৯; মুওয়াত্ত্বা মালিক ২৯১, দারিমী ১২৭৬, সুনান ইবনে মাজাহ ৭৮৭। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২) একা সালাত আদায়ের চাইতে জামা‘আতে সালাত পড়ায় সাতাশ গুণ বেশি সাওয়াব
রয়েছেঃ
(ক) ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যাক্তির জামাআতের সালাত
তার একাকী পড়া সালাত অপেক্ষা সাতাশ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ। (সুনান ইবনু মাজাহ, ৭৮৯, সহিহ বুখারী ৬৪৫, সহিহ মুসলিম ৬৫০/১-২,
সুনান আততিরমিযী ২১৫, সুনান আননাসায়ী ৮৩৭, আহমাদ ৪৬৫৬, ৫৩১০, ৫৭৪৫, ৫৮৮৫, ৬৪১৯; মুওয়াত্ত্বা
মালিক ২৯০, দারিমী ১২৭৭)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ).....আবদুল্লাহ
ইবনু উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
জামাআতের সাথে সালাত আদায় করা সালাত একাকী আদায় করা সালাত থেকে সাতাশগুণ অধিক মর্যাদাসম্পন্ন।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী),১৩৬৩, ১৩৬৩, ইসলামী ফাউন্ডেশন
১৩৫০, ইসলামীক সেন্টার ১৩৬২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(৩) কোনো কোনো হাদীসে আবার পঁচিশ গুণ সাওয়াবের কথাও বলা হয়েছেঃ
(ক) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জামাআতের ফযীলাত তোমাদের কারো একাকী সালাত পড়ার
তুলনায় পঁচিশ গুণ বেশি।
(সুনান ইবনু মাজাহ, ৭৮৭, বুখারী
৪৭৭, ৬৪৭, ৬৪৯, ২১১৯, ৪৭১৭; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), ১৩৫৮, তিরমিযী ২১৬, নাসায়ী
৪৮৬, ৮৩৮; আবূ দাঊদ ৫৫৯, আহমাদ ৭৩৮২, ৭৫৩০, ৭৫৫৭, ৮১৪৯, ৮৯০৫, ৯৫৫১, ৯৭৬২, ৯৭৯৯, ৯৯২৬,
১০১২৬, ১০৪১৯; মুওয়াত্ত্বা মালিক ২৯১, দারিমী ১২৭৬, মাজাহ ৭৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ) আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ (রহঃ).....আবূ হুরায়রাহ
(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জামা'আতের
সাথে সালাত আদায় করা একাকী সালাত আদায় করার চেয়ে পচিশগুণ বেশী উত্তম। তিনি আরো বলেছেনঃ
রাতের কর্তব্যরত মালায়িকাহ (ফেরেশতাগণ) এবং দিনের কর্তব্যরত মালায়িকাহ ফজরের সালাতের
সময় একত্র হয়। এ কথা বলে আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) বললেন, এক্ষেত্রে তোমরা ইচ্ছা করলে
কুরআনের আয়াতটি পাঠ করো- وَقُرْآنَ
الْفَجْرِ
إِنَّ
قُرْآنَ
الْفَجْرِ
كَانَ
مَشْهُودًا
অর্থাৎ- "ফজরের ওয়াক্তের কুরআন পাঠে উপস্থিত থাকে"- (সূরাহ ইসরা ১৭/৭৮)।
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), ১৩৫৯, ইসলামী ফাউন্ডেশন
১৩৪৬, ইসলামীক সেন্টার ১৩৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ ইবনু কানাব (রহঃ).....আবূ
হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ এক ওয়াক্ত সালাত জামা'আতের সাথে আদায় করা পঁচিশ ওয়াক্ত একাকী সালাত আদায়
করার সমান। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), ১৩৬১, ১৩৬২,
ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৩৪৮, ইসলামীক সেন্টার. ১৩৬০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যাক্তির জামাআতের
সালাত তার বাড়িতে পড়া সালাত অপেক্ষা পঁচিশ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ। (সুনান ইবনু মাজাহ,৭৮৮, সহিহ বুখারী ৬৪৬, সুনান আবূ দাঊদ ৫৬০,
আহমাদ ১১১২৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৮) যারা অন্ধকারে মসজিদের দিকে চলে তারা কিয়ামতে পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ
পাবেঃ
(ক) বুরায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ “যারা অন্ধকারে মসজিদের দিকে বেশী
বেশী চলে তাদেরকে কিয়ামত দিবসে পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩১৫, সুনান আবু দাউদ ৫৬১, সুনান আততিরমিযী
২২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ’’যারা অন্ধকারে বেশী বেশী মসজিদে গমণ করে,
নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’আলা তাদের জন্যে কিয়ামত দিবসে অতিশয় দীপ্তমান নূর প্রজ্জলিত করবেন।’’
(আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩১৭, মাযমাউল যাওয়ায়েদ ১০/৩০)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ ’’যে ব্যাক্তি রাতের আঁধারে মসজিদের
পানে গমণ করবে, সে ক্বিয়ামতের দিন একটি আলোকবর্তিকা নিয়ে মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাত
করবে।’’ (হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ত্বাবরানী [কাবীর] গ্রন্থে এবং ইবনু হিব্বান ২০৪৪ তাঁর
সহীহ্ গ্রন্থে)।
তবে তার বচনভঙ্গি এভাবেঃ “যে ব্যক্তি রাতের
আঁধারে মসজিদের পানে গমণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাকে একটি আলোকবর্তিকা দান করবেন।’’
(আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩১৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) সাহল বিন সাদ আস্ সায়েদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “অন্ধকারে মসজিদের
পানে গমণকারীগণ কিয়ামত দিবসে পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুক।’’ (হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ইবনু মাজাহ্ ৪৮০, ইবনু খুযায়মাহ্ ২/৩৭৭
তাঁর [সহীহ্] গ্রন্থে এবং হাকেম ১/২১২, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩১৯)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(৯) দুই সালাতের মাঝে কোনো
দুনিয়াবী কথা-বার্তা না বললে তার আমল ঈল্লীনে লিখে রাখা হবেঃ
আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “যে ব্যাক্তি পাক পবিত্র হয়ে ফরয সালাতের
উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হবে, তার জন্যে রয়েছে মুহরেম হজ্জ পালনকারীর ন্যায় ছোয়াব। আর
যে ব্যক্তি চাশতের সালাতের জন্যে বের হবে- এ সালাত ছাড়া অন্য কিছু তাকে ক্লান্ত করে
না তবে তার জন্যে রয়েছে উমরা পালনকারীর ন্যায় প্রতিদান। এক সালাতের পর আর এক সালাত
আদায় করলে- যে সালাতদ্বয়ের মাঝে কোন দুনিয়াবী কথা-বার্তা নেই, তবে তার এই আমল ঈল্লীনে
লিখে রাখা হবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩২০, আবু দাউদ
কাসেম বিন আবদুর রহমানের সনদে আবু উমামা হতে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ৫৫৮)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
(১০) কিয়ামতে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দিবেনঃ
আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে দিন আল্লাহর (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না,
সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন।
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক,
২. সে যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার প্রতিপালকের
ইবাদতের মধ্যে,
৩. সে ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত
রয়েছে,
৪. সে দু’ ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালবাসে আল্লাহর
ওয়াস্তে, একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য,
৫. সে ব্যক্তি যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী
নারী আহবান জানায়, কিন্তু সে এ বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’,
৬. সে ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার
ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানে না,
৭. সে ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকর করে,
ফলে তার দু’ চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৬০, ১৪২৩, ৬৪৭৯; সহিহ মুসলিম ১২/৩০, হাঃ ১০৩১,আহমদ ৯৬৭১, সুনান আননাসায়ী ৫৩৮০, সুনান আততিরমিযী ২৩৯১, আহমাদ
৯৬৬৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪৪৮৬, ইরওয়া ৮৮৭, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩২৬, আধুনিক প্রকাশনীঃ
৬২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৬২৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১১) সর্বাধিক পছন্দনীয় স্থান হল মসজিদ। আর আল্লাহর কাছে সর্বনিকৃষ্ট
স্থান হল বাজারঃ
(ক) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ তা’আলার কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় স্থান হল মসজিদ।
আর আল্লাহর কাছে সর্বনিকৃষ্ট স্থান হল বাজার।’’ (আত্ তারগীব
ওয়াত্ তারহীব ৩২৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৭১, হাদীস
সম্ভার ২৫৩৭, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৪০০, ইসলামীক সেন্টার ১৪১২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ) আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ইয়াহূদীদের একজন ’আলিম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্
জায়গা সবচেয়ে উত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নীরব রইলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যতক্ষণ জিবরীল (আঃ) আমীন না আসবেন আমি নীরব থাকবো। তিনি
নীরব থাকলেন। এর মধ্যে জিবরীল (আঃ) আসলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
জিবরীল (আঃ) কে ঐ প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করলেন। জিবরীল (আঃ) উত্তর দিলেন, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাকারীর
চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না। তবে আমি আমার রবকে জিজ্ঞেস করবো। এরপর জিবরীল
(আঃ) বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আল্লাহর এত নিকটে গিয়েছিলাম যা কোন দিন আর যাইনি। নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে হে জিবরীল? তিনি বললেন, তখন
আমার ও তাঁর মধ্যে মাত্র সত্তর হাজার নূরের পর্দা ছিল। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, দুনিয়ার
সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান হলো বাজার, আর সবচেয়ে উত্তম স্থান হলো মাসজিদ। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭৪১, তারগীব ১/১৩১, হাকিম ১/৭, ৮,
আহমাদ ৪/৮১, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১২) ‘হাদ্দ’ যোগ্য অপরাধও সালাত আদায়ের মাধ্যমে তা মিটে যায়ঃ
(ক) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক
এসে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি ‘হাদ্দ’ যোগ্য-এর কাজ (অপরাধ) করে ফেলেছি। আমার ওপর
তা প্রয়োগ করুন। বর্ণনাকারী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অপরাধ
সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করলেন। লোকটিও রসূলের
সাথে সালাত আদায় করলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাত শেষ করলে লোকটি
দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি হাদ্দ-এর কাজ করেছি। আমার ওপর আল্লাহর কিতাবের
নির্দিষ্ট হাদ্দ জারী করুন। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি
কি আমাদের সাথে সালাত আদায় করনি। লোকটি বলল, হ্যাঁ, করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বললেন, (এ সালাতের মাধ্যমে) আল্লাহ তোমার গুনাহ বা হাদ্দ মাফ করে দিয়েছেন।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৭, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬৮২৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৮৯৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৫০, ইসলামিক সেন্টার
৬৮০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আবদুল্লাহ (রাঃ) বিন মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, এক লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর
রসূল! আমি মদীনার উপকণ্ঠে এক মহিলার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া ছাড়া আর সব রসাস্বাদন করেছি।
আমি আপনার দরবারে উপস্থিত, তাই আমার প্রতি এ অপরাধের কারণে যা শাস্তি বিধান করার তা
আপনি করুন। ’উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তোমার অপরাধ ঢেকে রেখেছিলেন। তুমি নিজেও তা ঢেকে
রাখতে (আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে, তবে তা উত্তম হতো)। বর্ণনাকারী [’আবদুল্লাহ (রাঃ)]
বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথার কোন উত্তর দিলেন না। তাই লোকটি
উঠে চলে যেতে লাগলো। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিছনে লোক পাঠিয়ে
তাকে ডেকে আনলেন এবং তার সামনে এ আয়াত পাঠ করলেন- (অর্থ) ’’সালাত কায়িম কর দিনের দু’
অংশে, রাতের কিছু অংশে। নিশ্চয়ই নেক কাজ বদ কাজকে দূর করে দেয়, উপদেশ গ্রহণকারীদের
জন্য এটা একটা উপদেশ’’- (সূরাহ্ হূদ ১১: ১১৪)। এ সময় উপস্থিত এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো,
হে আল্লাহর নবী! এ হুকুম কি বিশেষভাবে তার জন্য। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বলেন, না, বরং সকল মানুষের জন্যই। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৮৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৬৩,
সহীহ আত্ তারগীব ৩১৬৩, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৭০৮৫, সুনান আততিরমিযী ৩১১২, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৬৭৪৫, ইসলামিক সেন্টার ৬৮০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১৩) সালাত আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমলঃ
(ক) আবদুল্লাহ (রাঃ) ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ কাজ (’আমল)
আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সঠিক সময়ে
সালাত আদায় করা। আমি বললাম, এরপর কোন্ কাজ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন্ কাজ? তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। রাবী [ইবনু মাস্’ঊদ
(রাঃ)] বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এসব উত্তর দিলেন। আমি যদি
আরও জিজ্ঞেস করতাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে আরও কথা বলতেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৮, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫২৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৫৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮৫, সুনান আননাসায়ী ৬১০,
আহমাদ ৩৮৯০, ইরওয়া ১১৯৮, সহীহ আত্ তারগীব ৩৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৫৬, ইসলামিক সেন্টারঃ
১৬২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ’’তোমরা দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। আর
তোমাদের আমলগুলোকে গণনা করিও না। জেনে রাখো তোমাদের সর্বোত্তম আমল হচ্ছে ’নামায’। আর
মুমিন ছাড়া অন্য কেউ ওযুর প্রতি যত্নবান হয় না।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৭৯, ৩৮০, হাকেম ১/১৩০, ইবনে হিব্বান ১০৩৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(১৪) ভালোভাবে অযু ও সঠিক সময়ে সালাত আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা তাকে
ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদা করেছেনঃ
(ক) উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত , যা আল্লাহ
তা’আলা (বান্দার জন্য) ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি এ সালাতের জন্য ভালোভাবে উযূ করবে, সঠিক
সময়ে আদায় করবে এবং এর রুকূ’ ও খুশুকে পরিপূর্ণরূপে করবে, তার জন্য আল্লাহর ওয়া’দা
রয়েছে যে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যে তা না করবে, তার জন্য আল্লাহর ওয়া’দা নেই।
ইচ্ছা করলে তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন আর ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭১, আহমাদ ২২৭০৪, সুনান আবূ দাঊদ
৪২৫, মালিক ১৪, সুনান আননাসায়ী ৪৬১, সহীহ আত্ তারগীব ৩৭০)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ) উছমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে একথা বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি ওযু
করবে এবং তা পরিপূর্ণ করবে। অতঃপর ফরয সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে (মসজিদে) গমণ করবে। তারপর
ইমামের সাথে তা আদায় করবে, তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০০, ইবনু খুযায়মাহ্ ২/৩৭৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih।
(গ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “আজ রাতে স্বপ্নযোগে আমার পালনকর্তা
সর্বোত্তম আকৃতিতে আমার কাছে এসে আমাকে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি কি জানেন নৈকট্যপ্রাপ্ত
ফেরেশতাগণ কি বিষয় নিয়ে পরস্পর বির্তক করছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তা হচ্ছে মর্যাদা উন্নীতকরণ,
পাপ মোচন, জামাআতে নামায আদায় করার জন্য পা উঠিয়ে মসজিদে যাওয়া, কঠিন ঠান্ডার সময় পরিপূর্ণরূপে
ওযু করা, এক নামায আদায় করার পর পরবর্তী নামাযের জন্য অপেক্ষা করা। যে ব্যক্তি এগুলোর
প্রতি যত্নবান হবে সে কল্যাণের সাথে জীবন-যাপন করবে এবং কল্যাণের মাঝে তার মৃত্যু হবে।
আর সে তার পাপ থেকে এমনভাবে মুক্ত হবে যেমন তার মাতা তাকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ট
করেছিল।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০২, সুনান আততিরমিযী
৩২৩১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ’’আমি কি তোমাদেরকে বলে দিব না, কোন্ কাজ
পাপসমূহ মিটিয়ে দেয় ও মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়?’’ তারা বললেন, হ্যাঁ বলুন, হে আল্লাহর রাসূল!
তিনি বললেনঃ
“প্রচন্ড ঠান্ডার কষ্ট স্বীকার করে পরিপূর্ণরূপে
ওযু করা, মসজিদের দিকে বেশী বেশী পদচারণা করা এবং এক সালাতের পর অপর সালাতের জন্য অপেক্ষা
করা এগুলোই হলো তোমাদের জন্য সীমান্ত পাহারা দেয়ার সমতুল্য, এটিই হলো তোমাদের জন্য
সীমান্ত পাহারা দেয়ার সমতুল্য, এগুলোই হলো তোমাদের জন্য সীমান্ত পাহারা দেয়ার সমতুল্য।’’
(হাদীছটি বর্ণনা করেছেন মালেক ১/১০৬১, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪৭৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৫১, সুনান
আততিরমিযী ৫১, সুনান আননাসাঈ ১/৮৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৪২৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৭৮,
ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে ইবনু মাজার শব্দরুপ এভাবেঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেনঃ “পাপসমূহ মোচনের মাধ্যম হল, অধিক ঠান্ডায় পরিপূর্ণরূপে ওযু সম্পাদন করা, পদ সমূহকে
মসজিদের দিকে চলার কাজে ব্যবহার করা এবং এক সালাতের পর অপর সালাতের জন্যে ইন্তেযার
(অপেক্ষা) করা।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩১০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) আলী বিন আবী তালেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “প্রচন্ড ঠান্ডার কষ্ট স্বীকার করে পরিপূর্ণরূপে
ওযু করা, পদযুগলকে মসজিদের দিকে ব্যবহার করা এবং এক সালাতের পর অপর সালাতের জন্য অপেক্ষা
করা- (এসব কাজ) পাপ সমূহকে ধুয়ে পরিস্কার করে দেয়।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩১৩, হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আবু ইয়ালা ৪৮৮, সহীহ্ সনদে বাযযার
৪৪৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(১৫) সহিহভাবে কেউ দুই রাকাত সালাত আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের
সব সগীরাহ গুণাহ মাফ করে দেনঃ
যায়দ বিন খালিদ আল জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দু’ রাক্’আত
সালাত আদায় করেছে, আর এতে ভুল করেনি, আল্লাহ
তার অতীত জীবনের সব গুনাহ (সগীরাহ্) ক্ষমা করে দিবেন। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৭, আহমাদ ২১১৮৩, সুনান আবূ দাঊদ ৯০৫, সহীহ আত্ তারগীব ২২৮)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
(১৬) যারা সিজদাহ করলো তারা
জান্নাতী আর অন্যরা জাহান্নামীঃ
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম সন্তানরা যখন সাজদার আয়াত পড়ে
ও সিজদা্ করে, শায়ত্বন (শয়তান) তখন কাঁদতে কাঁদতে একদিকে চলে যায় ও বলে হায় আমার কপাল
মন্দ। আদম সন্তান সাজদার আদেশ পেয়ে সিজদা্ করলো, তাই তার জন্য জান্নাত। আর আমাকে সাজদার
আদেশ দেয়া হয়েছিল আমি তা অমান্য করলাম। আমার জন্য তাই জাহান্নাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৮৯৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৪৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮১, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১০৫২, আহমাদ ৯৭১৩, সহীহ ইবনু হিব্বান
২৭৫৯, সহীহ আল জামি‘ ৭২৭, সহীহ আত্ তারগীব ৯৪৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৪৭, ইসলামিক সেন্টারঃ
১৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১৭) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এক ওয়াক্ত থেকে আরেক ওয়াক্তের গুণাহ ধুয়ে দেয়ঃ
(ক) আবদুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ’’তোমরা পাপের মাধ্যমে ধ্বংসের
দিকে এগিয়ে যাচ্ছ। যখন তোমরা সকালের নামায আদায় কর তখন ঐ নামায পাপগুলোকে ধুয়ে দেয়।
অতঃপর আবার পাপের মাধ্যমে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছ। যখন যোহরের নামায আদায়
কর তখন এই নামায পূর্বের ঐ পাপগুলোকে ধুয়ে দেয়। আবার তোমরা গুনাহ কর। যখন তোমরা আছরের
নামায পড় তখন তা পূর্বের গুনাহগুলোকে ধুয়ে দেয়। তারপর আবার তোমরা পাপ কর এবং ধ্বংসের
দিকে অগ্রসর হও। যখন মাগরিবের নামায আদায় কর তখন সেই নামায পূর্বের গুনাহগুলোকে ধুয়ে
দেয়। তারপর তোমরা পাপে লিপ্ত হয়ে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাও। যখন এশার নামায
আদায় কর তখন তা ঐ গুনাহগুলোকে ধৌত করে দেয়। অতঃপর তোমরা যখন নিদ্রা যাও তখন তোমাদের
কোন গুনাহ লেখা হয় না যতক্ষন তোমরা জাগ্রত না হও।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৫৭, ত্বাবরানী ২/৩৫৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(খ) উছমান (রাঃ) এর ক্রীতদাস হারেছ থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, একদা উসমান (রাঃ) বসলেন আমরাও তার সাথে বসলাম। এমন সময় মুআয্যিন এলেন। তখন
তিনি একটি পাত্রে পানি নিয়ে আসতে বললেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারনা হচ্ছে ঐ পাত্রে
এক মুদ (তথা প্রায় ৩৫০ গ্রাম) পরিমাণ পানি ছিল। অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি দেখেছি রাসুলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ওযুর মতোই ওযু করেছেন, অতঃপর তিনি (সালাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
“যে
ব্যক্তি আমার এই ওযুর ন্যায় ওযু করবে, অতঃপর যোহরের সালাত আদায় করবে, তার ফজর ও যোহর
সালাতের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করা হবে। অতঃপর আসর সালাত আদায় করলে একইভাবে
যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে গুনাহ সমূহকে ক্ষমা করা হবে। অতঃপর মাগরিব সালাত আদায়
করলে আসর ও মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ সমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। অতঃপর সে এশার
সালাত আদায় করবে, তবে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ সমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া
হবে। অতঃপর হয়ত সে রাতে গড়াগড়ি করে নিদ্রা যাবে। তারপর আবার যদি উঠে ওযু করে ফজরের
নামায আদায় করে তাহলে এশা থেকে নিয়ে ফজর পর্যন্ত গুনাহ সমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
এ সম্পর্কেই আল্লাহ বলেছেনঃ ’’নেক কাজ সমূহ গুনাহ গুলোকে দূরীভূত করে দেয়।’’
তাঁরা বললেনঃ হে উসমান (রাঃ)! এগুলোতো নেক
কাজ (যেগুলো মানুষের গুনাহ গুলোকে মিটিয়ে দেয়) সেই কর্মগুলো কি যা অবশিষ্ট থাকবে (যা
আল্লাহর কাছে জমা রাখা হবে)? তিনি বললেনঃ সেগুলো হচ্ছে এ কথা বলাঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ,
সুবহানাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা-হাওলা ওয়লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(১৮ প্রত্যেক সালাতের সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন আহবানকারী ফেরেশতা
প্রেরণ করা হয়ঃ
(ক) আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন
রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নামাযের সময় আল্লাহর
পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা নিয়োগ করা হয়। তিনি আহবান করেন: হে আদম সন্তান! উঠ এবং নির্বাপিত
কর সে আগুন যা তোমরা পাপের মাধ্যমে প্রজ্জ্বলিত করেছ।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৫৮, মাযমাউল যাওয়ায়েদ ১/২৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে।
তিনি রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ
“প্রত্যেক নামাযের সময় উপস্থিত হলে একজন আহবানকারী
(ফেরেশতা) প্রেরণ করা হয়। তিনি বলেন, হে আদম সন্তান! ওঠো এবং পাপ করে নিজেদের শাস্তির
জন্যে যে আগুন তোমরা জ্বালিয়েছো তা নামাযের মাধ্যমে নির্বাপিত কর। তখন তারা ওঠে এবং
পবিত্রতা অর্জন করে, তখন তাদের চোখ থেকে পাপগুলো ঝরে পড়ে যায়, তারা নামায আদায় করলে
দু’নামাযের মধ্যবর্তী সময়ের পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়া হয়। তারপর আবার তারা পাপের মাধ্যমে
আগুন জ্বালায়। যখন প্রথম নামাযের সময় হয় তখন ঐ ফেরেশতা আহবান করেন: হে আদম সন্তান!
তোমরা নির্বাপিত কর সেই আগুন যা (পাপের মাধ্যমে) নিজেদের জন্যে জ্বালিয়েছো। তখন তারা
ওঠে পবিত্র হয় এবং যোহর নামায আদায় করে। তখন তাদের পূর্বের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেয়া
হয়। একইভাবে যখন আছর, মাগরিব ও এশার নামায আদায় করা হয় তখন অনুরূপ করা হয়। শেষে তারা
নিদ্রা যায় এমন অবস্থায় যে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং কেউ রাত কাটায় কল্যাণের
মধ্যে এবং কেউ রাত কাটায় অকল্যাণ বা গুনাহের মধ্যে।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৫৯, মাযমাউল যাওয়ায়েদ ১/২৯৯)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(১৯) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পাপসমূহের কাফ্ফারাস্বরুপ বা ক্ষমা করে দেয়া
হয়ঃ
(ক) ত্বারেক্ব বিন শিহাব থেকে বর্ণিত। তিনি একদা
সালমান (রাঃ) এর নিকট রাত কাটালেন। উদ্দেশ্য তিনি কিরূপ ইবাদত করেন তা দেখা। তিনি বলেনঃ
তিনি রাতের শেষাংশে উঠে তাহাজ্জুদ নামায পড়লেন। তিনি (ত্বারেক্ব) তাঁর সম্পর্কে যেরূপ
ধারণা করছিলেন তা যেন দেখতে পেলেন না। তাই বিষয়টি তাঁর নিকট উত্থাপন করলেন। সালমান
(রাঃ) বললেনঃ
‘তোমরা এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের যথাযথভাবে হেফাজত
কর। কেননা এগুলো এ পাপ সমূহের কাফ্ফরা স্বরূপ, যতক্ষন পর্যন্ত এমন পাপে লিপ্ত না হও
যা তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলে (অর্থাৎ কাবীরা গুনাহে লিপ্ত না হও)।’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬০, মাযমাউল যাওয়ায়েদ ১/২৯৯)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) উছমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন একদিন আসরের নামায থেকে ফেরার সময় আমাদের কাছে
হাদীছ বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ
“জানিনা তোমাদেরকে হাদীছ বলব না কি চুপ থাকব?’’
উছমান (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি
ভাল হয় তবে বলুন। আর যদি অন্য কিছু হয় তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন।
তিনি বললেনঃ ’’কোন মুসলিম যখন পবিত্রতা অর্জন
করে- আল্লাহ্ তার জন্য যা লিখে রেখেছেন সে অনুযায়ী পরিপূর্ণরূপে পবিত্রতা অর্জন করে,
অতঃপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে তবে তা তার মধ্যবর্তী গুনাহ সমূহের জন্য কাফ্ফারা
হয়ে যায়।’’
অন্য রেওয়ায়াতে রয়েছে,
উছমান (রাঃ) বলেন, আমি তোমাদের কাছে একটি হাদীছ
বর্ণনা করবো, আল্লাহর কসম আল্লাহর কোরআনে যদি একটি আয়াত না থাকত তবে আমি হাদীছটি বর্ণনা
করতাম না। আমি রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে একথা বলতে শুনেছিঃ
“কোন ব্যক্তি যখন সুন্দর ও পরিপূর্ণ ভাবে ওযু
সম্পাদন করে, অতঃপর ছালাত আদায় করে, তবে তাকে পরবর্তী ছালাত পর্যন্ত ক্ষমা করে দেয়া
হয়।’’ (হাদীছটি বর্ণনা করেছেন বুখারী ১৬০ ও মুসলিম ২২৭)।
মুসলিমের অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, আমি শুনেছি
রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
“যে ব্যক্তি সালাতের জন্য ওযু করে, ওযুকে পূর্ণরূপে
সম্পাদন করে। তারপর ফরয সালাত আদায় করার জন্য মসজিদের পানে পথ চলে এবং মানুষের সাথে
বা জামাআতে বা মসজিদে সালাত আদায় করে, তবে তার গুনাহ্ সমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’’
মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে: আমি শুনেছি রাসুলুল্লাহ্
(সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একথা বলেছেন:
“কোন মুসলিম ব্যক্তির নিকট যখন ফরয ছালাতের
সময় উপস্থিত হয়, তখন সে সুন্দরভাবে ওযু করে এবং রুকু-সিজদাগুলো বিনয়-নম্রতার সাথে সম্পাদন
করে। তাহলে তা পূর্ববর্তী গুনাহ সমূহের জন্য কাফ্ফারা হয়ে যায়- যতক্ষণ সে কাবীরা গুনাহে
লিপ্ত না হয়। আর তা বছরের সকল সময়ের জন্য।’’ ( আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) আবু আইয়্যুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “প্রত্যেক নামায তার পূর্ববর্তী গুনাহ গুলোকে
মিটিয়ে দেয়।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৫, আহমাদ ৫/৪১৩)।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(২০) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি “সিদ্দীক এবং শহীদদের অন্তর্ভুক্ত
হবেঃ
আমর ইবনে মুররা আল জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন জনৈক ব্যক্তি নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর
রাসূল! আপনি কি মনে করেন, যদি আমি এ সাক্ষ্য দেই যে আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য
নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, রামাযানে
সিয়াম পালন করি এবং ক্বিয়ামুল্লাইল করি- তাহলে আমি কাদের অন্তর্ভুক্ত হব? তিনি বললেনঃ
“সিদ্দীক এবং শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬১, বাযযার ৪৫, ইবনে হিব্বান ৩৪২৯,
ইবনে খুযায়মা ২/২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২১) সিজদাহর সময় মাথার উপর লটকানো গুণাহসমূহ পড়ে য়ায়ঃ
সালমান ফারসী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন
রাসুলুল্লাহ্ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ’’মুসলিম ব্যক্তি নামায আদায়
করে অথচ তার গুনাহ সমূহ তার মাথার উপরে লটকানো থাকে। যখনই সে সেজদা করে তখনই তার গুনাহগুলো
পড়ে যায়। অতঃপর সে নামায শেষ করে এমন অবস্থায় যে তার সমস্ত গুনাহ পড়ে গেছে।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬২, ত্বাবরানী কাবীর ৬/২৫০ এবং ছগীর
গ্রন্থে ২/২৭২ উল্লেখ করেছেন)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(২২) যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করে সে আল্লাহর জিম্মাদারীর (নিরাপত্তার)
মধ্যে এসে যায়ঃ
জুনদুব বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামায
আদায় করে সে আল্লাহর জিম্মাদারীর (নিরাপত্তার) মধ্যে এসে যায়। সুতরাং আল্লাহ যেন তার
জিম্মাদারীর মধ্যে থেকে কোন কিছু তোমাদের কাছে চেয়ে না বসেন। কেননা তিনি যদি তার জিম্মাদারীর
ভিতর কিছু চেয়ে বসেন তাহলে তাকে পাকড়াও করবেন, অতঃপর তাকে মুখের উপর ভর দিয়ে জাহান্নামে
নিক্ষেপ করবেন।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৭, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩৭৯, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৬৫৭, সুনান আততিরমিযী ২২২, তালীকুর রাগীব (১/১৪১, ১৬৩, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৩৬৬,
ইসলামীক সেন্টার ১৩৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২৩) তিন ব্যক্তির যিম্মাদারী আল্লাহর উপরঃ
আবু উমামা (রাঃ) থেকেই বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “তিন ব্যক্তির যিম্মাদারী আল্লাহর উপর। তারা
যদি বেঁচে থাকে তবে রিযিকপ্রাপ্ত হয় এবং বিপদ-মুসিবত থেকে নিরাপদে থাকে। আর যদি মৃত্যু
বরণ করে তবে আল্লাহ্ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তারা হলঃ (১) যে ব্যাক্তি নিজ
বাড়ীতে প্রবেশ করার সময় সালাম দিবে, তার যিম্মাদারীত্ব আল্লাহর উপর। (২) যে ব্যাক্তি
সালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদের দিকে বের হবে, তার যিম্মাদারীত্ব আল্লাহর উপর। (৩) যে ব্যাক্তি
আল্লাহর পথে জিহাদে বের হবে, তার যিম্মাদারীত্ব আল্লাহর উপর।’’ (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩২১, হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ
২৪৯৪ ও ইবনু হিব্বান তাঁর সহীহ্ গ্রন্থে ৪৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২৩) পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের প্রতি যিনি যত্নবান হবেন তিনি জান্নাতীঃ
হানযালা আল কাতেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি শুনেছি রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একথা বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি
পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হবে অর্থাৎ তার রুকু, সেজদাগুলোকে যথাযথভাবে আদায়
করবে এবং সময়মত নামায আদায় করবে, আর এ কথা জেনে নিবে যে এই নামাযগুলো হক্ব বা আল্লাহর
পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরয। তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথবা তিনি বলেন তার জন্যে
জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে অথবা তিনি বলেন তার জন্যে জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে।’’ (আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৮১, এ হাদীছটি ইমাম আহমাদ উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন ৪/২৬৭)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
(২৪) সালাত হচ্ছে নূর বা জ্যোতিঃ
আবু মালেক আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। ’আলহামদুলিল্লাহ’
নেকীর পাল্লাকে পরিপূর্ণ করে। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ এই শব্দ দুটির নেকী আসমান
ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দেয়। নামায হচ্ছে নূর বা জ্যোতি। আর যাকাত
হচ্ছে দলীল। ধৈর্য হচ্ছে চেরাগ। আর কোরআন হচ্ছে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৮৩, ইমাম মুসলিম প্রমূখ হাদীছটি বর্ণনা
করেন ২২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ফজরের সালাত আদায়ের ফজিলত
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয। মুমিন মাত্রই
যত্নের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে থাকেন। তবে মানবজাতির চিরশত্রু ইবলিস সর্বদাই
চেষ্টা করে, যেন মুমিনগণ সালাত থেকে গাফেল হয়ে পড়ে। শয়তানের ধোঁকা ও গাফলতের কারণে
অনেকেই সালাতে অবহেলা করেন বা নামায ছেড়ে দেন; যা মুমিনের জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ।
বিশেষ করে ফজর ও আসরের সালাতে বেশি গাফলতি হয়ে থাকে। মহান রাব্বুল আলামীন তাই কুরআনুল
কারীমে এই দুই সালাতের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তোমরা সকল নামায এবং (বিশেষ করে) মধ্যবর্তী
(তথা আসরের) নামাযের প্রতি যত্নবান হও”। (সূরা বাকারা:
২৩৮)।
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“এবং স্বীয় রবের সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করতে
থাকুন; সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে”। (সূরা
ত্ব-হা : ১৩০)।
এই আয়াতে গাফলতের দুই ওয়াক্ত ফজর ও আসরের সালাতের
কথা উল্লেখ করে এর সবিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
যাইহোক, এ দুই গুরুত্বপূর্ণ সালাতের মধ্যে
আজ আমরা আলোচনা করবো ফজরের সালাত বিষয়ে; যে সালাতের মাধ্যমে মুমিনের দিবসের সূচনা হয়।
এই সালাতের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বেশ কিছু আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে; সেখান থেকে
কিছু বিষয় আলোচনা করব ইংশাআল্লাহ।
(এক) আল্লাহ কসম করেছেন ফজরেরঃ
প্রতি ওয়াক্ত সালাতই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফজরের
গুরুত্ব অন্য সব ওয়াক্তের তুলনায় বেশি। কুরআনে কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফজরের
কসম করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
“কসম ফজর-কালের। এবং দশ রাতের”। (সূরা ফাজর: ১-২)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের
উপরই কসম করেন। যেহেতু আল্লাহ ফজরের কসম করেছেন, তাই এটি সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ রাব্বুল
আলামীনের কাছে এই সময় এবং এই সময়ে আদায়কৃত নামাযের গুরুত্ব অন্য সময় ও সালাতের তুলনায়
বেশি।
ফজরের সালাত এবং ফজরের তিলাওয়াতের গুরুত্ব
প্রকাশ করে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
“(হে নবী!) সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার
পর্যন্ত নামায কায়েম করুন এবং ফজরের সময় কুরআন পাঠে যত্নবান থাকুন। স্মরণ রাখুন, ফজরের
তিলাওয়াতে ঘটে থাকে সমাবেশ”। (সূরা বনী ইসরাঈল: ৭৮)।
শায়খুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী
দামাত বারাকাতুহুম তাফসীরে তাওযীহুল কুরআনে এ আয়াতের টীকায় লেখেন
“মুফাসসিরগণ এর [অর্থাৎ ‘ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে
থাকে সমাবেশ-একথার] দুই রকম ব্যাখ্যা করেছেন :
(ক) অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, ফজরের নামাযে যে তিলাওয়াত
করা হয়, তাতে ফিরিশতাদের দল উপস্থিত থাকে। বিভিন্ন হাদীস দ্বারা জানা যায়, মানুষের
তত্ত্বাবধানের কাজে যেসকল ফিরিশতা নিয়োজিত আছে, তারা নিজেদের দায়িত্ব পালাক্রমে আঞ্জাম
দিয়ে থাকে। একদল আসে ফজরের সময়। তারা দিনের বেলা দায়িত্ব পালন করে। আরেক দল আসে আসরের
সময়। তারা রাতের বেলা দায়িত্ব পালন করে। প্রথম দল ফজরের নামাযে এসে শরীক হয় এবং কুরআন
মাজীদের তিলাওয়াত শোনে। আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে।
(খ) একদল মুফাসসির বলেন, এর দ্বারা মুসল্লীদের
উপস্থিতি বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ফজরের নামাযে মানুষ যেহেতু ঘুম থেকে উঠে শরীক হয়, তাই
তারা যাতে ঠিকভাবে নামায ধরতে পারে, সে লক্ষ্যে নামাযে তিলাওয়াত দীর্ঘ করা বাঞ্ছনীয়।”
সুতরাং ফজরের জামাতে উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে সবিশেষ
গুরুত্ব দেওয়া কাম্য।
আসলে ফজরের জামাতে উপস্থিত হতে না পারা বহু
কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার নামান্তর।
(দুই) ফজরের জামাতে উপস্থিত হতে পারা ঈমানী শক্তির পরিচায়কঃ
(ক) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যদি জানত আযান দেয়া ও সালাতের
প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর মধ্যে কী সাওয়াব রয়েছে এবং লটারী করা ছাড়া এ সুযোগ না পেত, তাহলে
লটারী করতো। আর যদি জানতো সালাত আদায় করার জন্য আগে আগে আসার সাওয়াব, তাহলে তারা এ
(যুহরের) সালাতে অন্যের আগে পৌঁছার চেষ্টা করতো। যদি জানতো ’ইশা ও ফজরের (ফজরের) সালাতের
মধ্যে আছে, তাহলে (শক্তি না থাকলে) হামাগুড়ি দিয়ে হলেও সালাতে উপস্থিত হবার চেষ্টা
করতো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬২৮, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৮৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৩৭, সুনান আননাসায়ী
৫৪০, মালিক ৩, সুনান আততিরমিযী ২২৫, আহমাদ ৭২২৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৬৫৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৮৬৩, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুনাফিক্বদের জন্য ’ইশা ও ফজরের
(ফজরের) সালাতের চেয়ে ভারী আর কোন সালাত নেই।
যদি এ দুই সালাতের মধ্যে কি রয়েছে, তারা জানতো তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও সালাতে আসতো।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬২৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৬৫৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৩৬৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫১, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৭৯৭, আহমাদ ৯৪৮৬, দারেমী
১৩০৯, ইসলামী ফাউন্ডেশন. ১৩৫৫, ইসলামীক সেন্টার ১৩৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(তিন) ফজরের নামায আদায় করুন, আল্লাহ তাআলার জিম্মায় দিনযাপন করুনঃ
জুনদুব আল ক্বসরী (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ফজরের (ফজরের) সালাত
আদায় করলো সে আল্লাহর যিম্মাদারিতে থাকলো। অতএব আল্লাহ যেন আপন যিম্মাদারীর কোন বিষয়
সম্পর্কে তোমাদের বিপক্ষে বাদী না হন। কারণ তিনি যার বিপক্ষে আপন দায়িত্বের কোন ব্যাপারে
বাদী হবেন, তাকে (নিশ্চিত) ধরতে পারবেনই। অতঃপর তিনি তাকে উপুড় করে জাহান্নামের আগুনে
ফেলবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬২৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩৭৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫৭, আহমাদ ১৮৮১৪, সহীহাহ্
২৮৯০, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৩৬৬, ইসলামীক সেন্টার ১৩৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চার) ফিরিশতাগণ আল্লাহর কাছে
আপনার পক্ষে সাক্ষী হবেনঃ
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাছে রাতে একদল ও দিনে
একদল মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) আসতে থাকেন। তারা ফাজর (ফজর) ও আসরের ওয়াক্তে মিলিত হন।
যারা তোমাদের কাছে থাকেন তারা আকাশে উঠে গেলে আল্লাহ তা’আলা তাদের কাছে (বান্দার) অবস্থা
সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, যদিও তিনি তাদের সম্পর্কে অধিক অবগত। বলেন, তোমরা আমার বান্দাদেরকে
কী অবস্থায় রেখে এসেছো? উত্তরে মালায়িকাহ্ বলেন, হে আল্লাহ! আমরা আপনার বান্দাদেরকে
সালাত আদায়ে রত অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। আর যে
সময় আমরা তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছেছি তখনও তারা সালাত আদায় করছিল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬২৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৫৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩১৮, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৬৩২, সুনান আননাসায়ী ৪৮৫, মালিক ১৮০/৫৯০, আহমাদ ১০৩০৯, সহীহ ইবনু হিব্বান
১৭৩৭, সহীহ আল জামি‘ ৮০১৯, আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬৮, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৩০৫, ইসলামীক
সেন্টার ১৩১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সুতরাং যে ব্যক্তি নিয়মিত ফজর ও আসরের নামায
জামাতে আদায় করছে ফিরিশতারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে তার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান
করছে আমরা যখন পৃথিবীতে গিয়েছি তাকে নামাযরত দেখেছি, আবার যখন পৃথিবী থেকে প্রস্থান
করেছি তখনও তাকে নামাযরত দেখেছি। বান্দার জন্য ফিরিশতাদের এ সাক্ষ্য কত মূল্যবান! এ
দুই নামাযে যত্নবান হওয়ার ফলে ফিরিশতারা এমনভাবে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে, যেন সে
সারাদিনই সালাত-ইবাদতে মগ্ন ছিল।
(পাঁচ) জান্নাতের সুসংবাদঃ
আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুই ঠাণ্ডা সময়ের সালাত (অর্থাৎ- ফাজর ও ’আসর) আদায় করবে সে জান্নাতে প্রবেশ
করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬২৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৫৭৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩২৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৩৫, আহমাদ
১৬৭৩০, দারেমী ১৪৬৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৮৫, সহীহ আল জামি ৬৩৩৭, ইসলামী
ফাউন্ডেশন ১৩১১, ইসলামীক সেন্টার ১৩২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জান্নাত অর্জন একজন মুমিনের পরম চাওয়া। যত
ইবাদত-রিয়াযত এবং মেহনত-মুজাহাদা সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
এবং জান্নাত লাভ। জান্নাত লাভের সুসংবাদ শুনতে মুমিন খুব পছন্দ করে। সুতরাং এশা ও ফজরের
ব্যাপারে যত্নবান হোন এবং নবীজীর যবানে জান্নাতের সুসংবাদ শুনে আনন্দিত হোন। আল্লাহ
সকল মুমিনকে জান্নাতের জন্য কবুল করে নিন।
(ছয়) সারা রাত ইবাদতের সওয়াব অর্জন করুনঃ
উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’ইশার সালাত জামা’আতের সাথে আদায়
করেছে, সে যেন অর্ধেক রাত সালাতরত থেকেছে। আর যে ব্যক্তি ফজরের (ফজরের) সালাত জমা’আতে
আদায় করেছে, সে যেন পুরো রাত সালাত আদায় করেছে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৬৩০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩৭৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫৬, সহীহ ইবনু হিব্বান
২০৬০, সহীহ আল জামি‘ ৬৩৪১, সুনান আততিরমিযী ২২১, আহমাদ ৪০৮, দারেমী ১২৬০, ইসলামী ফাউন্ডেশন
১৩৬৪, ইসলামীক সেন্টার ১৩৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এই হাদীসটি একজন মুমিনের জন্য বিশাল সুসংবাদ।
কারণ, সারা রাত ঘুমিয়ে থেকেও রাতভর নামায আদায়ের সওয়াব আমলনামায় লেখা হচ্ছে।
দুই নামায জামাতে আদায়ের মাধ্যমে সারা রাত
ইবাদতের সওয়াবের অধিকারী হতে পারা অবশ্যই একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। আল্লাহ
বড় মেহেরবান! কোনো বুদ্ধিমানই এ ফযীলত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে না।
(সাত) ফজরের নামায আদায়কারী লাভ করবে আল্লাহর দীদারঃ
জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, একরাতে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম।
তখন তিনি চৌদ্দ তারিখের রাতের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা যেমন এ চাঁদটি দেখতে
পাচ্ছ, তেমনিভাবে তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে এবং তাঁকে দেখার ব্যাপারে বাধা বিঘ্ন
হবে না। তাই তোমাদের সামর্থ্য থাকলে সূর্যোদয়ের আগে এবং সূর্যাস্তের আগের সালাতের ব্যাপারে
প্রভাবিত হবে না। তারপর তিনি পাঠ করলেন, “আপনার রবের প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা
করুন সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের পূর্বে’’- (সূরাহ ক্বাফ ৫০/৩৯)। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৮৫১, ৫৫৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ১৩২০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৩৩; আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৪৪৮৭) । হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আলোচ্য হাদীসটিতে বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়ার
মতো বাক্য হলো,
অর্থাৎ, তোমরা এ নামাযদ্বয়ের ব্যাপারে শয়তান
বা গাফলতের কাছে পরাস্ত হয়ো না।
বোঝা যাচ্ছে, আসর ও ফজরের নামায আদায়ের ক্ষেত্রে
মানবীয় দুর্বলতা ও গাফলতের একটা বিষয় রয়েছে। এসময় মানুষ ঘুমে বা বিশ্রামে থাকে এবং
গাফলতের শিকার থাকে। ফলে নফসের সাথে লড়াই করে নামাযের জন্য জামাতে উপস্থিত হওয়া কষ্টসাধ্য
হয়ে পড়ে। আর এর সাথে যুক্ত হয় মানবজাতির চিরশত্রু শয়তানের ওয়াসওয়াসা! শয়তান বলতে থাকে,
‘আজ না হয় থাক, কাল থেকে ইনশাআল্লাহ..., ‘বাসায় নামায আদায় করলেও তো হয়, সওয়াব একটু
কম হবে, কিন্তু নামায তো হয়ে যাবে’ ইত্যাদি। এসব কারণে বনী আদম কাবু হয়ে যায়। পরাস্ত
হয়ে যায় নফস ও শয়তানের কাছে। তাই এই দুই নামাযের ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ গুরুত্বারোপ
করেছেন।
যেহেতু নফস ও শয়তানের সাথে অনেক মুজাহাদা করে
একজন মুমিনকে এই দুই ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হয়, তাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম অনেক বড় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন; আল্লাহর দীদার লাভের পুরস্কার! বান্দা
আপন রবকে দেখতে পাবে, এর চেয়ে বড় পাওয়া ও বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে। এ পুরস্কার লাভের
জন্য তো বান্দা যেকোনো কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি।
(আট) জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরোয়ানাঃ
উমারাহ্ ইবনু রুআয়বাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এমন ব্যক্তি
জাহান্নামে যাবে না, যে সূর্য উঠার ও ডোবার আগে সালাত আদায় করেছে, অর্থাৎ- ফাজর (ফজর)
ও ’আসরের সালাত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬২৪, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩২২, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৬৩৪, সহীহ আল জামি‘ ৫২২৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪২৭, সুনান আননাসায়ী ৪৭১, সহীহ ইবনু
হিব্বান ১৭৩৮, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৩০৯, ইসলামীক সেন্টার ১৩২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
মানুষের বড় বড় সফলতার একটি হল, জাহান্নাম থেকে
বাঁচতে পারা। জান্নাতের আশাও যেমন থাকবে, তেমনি জাহান্নাম থেকে বাঁচার আকুতিও থাকতে
হবে; তবেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন,
“যাকে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দিয়ে জান্নাতে
দাখিল করা হল সে-ই সফলকাম হল”। (সূরা আলে ইমরান (৩): ১৮৫)।
(নয়) দুনিয়া ও দুনিয়ার মাঝের সবকিছুর চেয়ে দামী কিছু পেতে চাইঃ
মুহাম্মাদ ইবনু উবায়দ আল গুবারী (রহঃ)....আয়িশাহ
(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ফজরের
দু’ রাকাআত (সুন্নাত) সালাত দুনিয়া ও তার সব কিছুর থেকে উত্তম। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৫৭৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭২৫,
ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৫৫৮, ইসলামীক সেন্টার ১৫৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষ দুনিয়া কামাই
করার জন্য কত পরিশ্রমই না করে। অথচ এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। অতি শীঘ্রই তা শেষ হয়ে যাবে।
অপরদিকে আখেরাত চিরস্থায়ী। একজন মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরকালের জীবন শুরু হবে;
কিন্তু শেষ হবে না কোনোদিন অনিঃশেষ। এই জীবনের পাথেয় হল ইবাদত ও আমল। ফজরের দুই রাকাত
নামায এই অনিঃশেষ জীবনের এক মূল্যবান পাথেয়।
(দশ) কিয়ামতের দিন নূরপ্রাপ্তির সুসংবাদঃ
আখেরাত জীবনের কঠিন কঠিন ঘাটি পার হওয়ার জন্য
প্রয়োজন নূর ও আলোর। রাতের শেষ অন্ধকারে আদায় করা এই নামায আমার জন্য শেষ দিবসের আলো
হবে; যা আমাকে জান্নাত পর্যন্ত পথ চলতে সাহায্য করবে; যা না হলে আমি সেখানের অন্ধকারে
হারিয়ে যাব। যদি নূরের অধিকারী হতে পারি, তাহলেই পৌঁছতে পারব পরম কাক্সিক্ষত জান্নাতে।
বুরায়দাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যারা অন্ধকার রাতে মসজিদে যাতায়াত করে তাদেরকে কিয়ামতের
দিন পূর্ণজ্যোতির সুসংবাদ দাও। (সুনানে আবু দাউদ ৫৬১;
জামে তিরমিযী ২২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
সালাত পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ শাস্তি
ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হ’ল ছালাত।
সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণকে হৃদয়ে জাগ্রত রাখার প্রক্রিয়া হিসাবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের
জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছেন। ছালাত এমন একটি ইবাদত, কালেমায়ে শাহাদতের
পরেই যার স্থান। কেউ মুসলমান হলে তাকে প্রথমেই ছালাতে অভ্যস্ত হওয়া আবশ্যক। ছাহাবীগণের
মধ্যে কেউ ছালাতে না আসলে তাকে কাফের মনে করা হতো। ছালাত ত্যাগ করা কাফের ও মুনাফিকদের
কাজ। ছালাত ত্যাগকারীরা পরকালে ফেরাউন, হামান, কারূনের মত কাফেরদের সাথে জাহান্নামে
অবস্থান করবে।
আমরা জেনেছি যে, ছালাত সঠিক হলে কিয়ামতে তার
অন্যান্য আমলগুলো কাজে আসবে আর ছালাত সঠিক না হলে তার জীবনের অর্জিত অন্যান্য আমলগুলো
তাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে কোনো উপকারে আসবে না। এসব জানার পরও আমরা ছালাতে অবহেলা, অলসতা
ও পরিত্যাগ করেই চলছি। অথচ এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। নিম্নে ছালাত পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ
পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হলোঃ
(১) ছালাত পরিত্যাগ করা কুফরীঃ
ছালাত পরিত্যাগ করা কুফরী কাজ। ছালাত ত্যাগ
করাকে রাসূল (ছাঃ) কুফরী বলেছেন। যেমন হাদীছে এসেছে,
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মু’মিন) বান্দা ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হলো
সালাত পরিত্যাগ করা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৬৯,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৮২, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬৭৮, সুনান
আননাসায়ী ৪৬৪, সুনান আততিরমিযী ২৬২০, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১০৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
অন্য বর্ণনায় আছে, মানুষ ও শিরক-কুফরের মধ্যে
পার্থক্য হ’ল ছালাত। কোন বর্ণনায় আছে, ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো ছালাত। (ছহীহুত তারগীব হা/৫৬৩)।
অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘বান্দা, কুফর ও
ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হ’ল ছালাত। যখন সে ছালাত পরিত্যাগ করল, তখন সে শিরক করে ফেলল’।
(ছহীহুত তারগীব হা/৫৬৬)।
বুরায়দাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের ও তাদের (মুনাফিক্বদের) মধ্যে যে প্রতিশ্রুতি
রয়েছে, তা হলো সালাত। অতএব যে সালাত পরিত্যাগ করবে, সে (প্রকাশ্যে) কুফরী করলো (অর্থাৎ-
কাফির হয়ে যাবে)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৪, সুনান
আততিরমিযী ২৬২১, সুনান আননাসায়ী ৪৬৩, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১০৭৯ সহীহ আত্ তারগীব ৫৬৪,
আহমাদ ২২৯৩৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ বিন শাক্বীক্ব (রহঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ সালাত ছাড়া অন্য
কোন ’আমল পরিত্যাগ করাকে কুফরী বলে মনে করতেন না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৭৯, সুনান আততিরমিযী ২৬২২, সহীহ আত্ তারগীব ৫৬৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
শাদ্দাদ ইবনু মা‘কেল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
‘সর্বপ্রথম তোমরা তোমাদের দ্বীনের যা হারাবে তাহ’লে আমানত এবং সর্বশেষ দ্বীনের যা হারাবে
তা হ’ল ছালাত’। (তাবারানী কাবীর হা/৯৭৫৪; ছহীহাহ হা/১৭৩৯)।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, ‘ইসলাম
থেকে চলে যাওয়া সর্বশেষ বস্ত্ত যেহেতু ছালাত সেহেতু যে বস্ত্তর শেষ চলে যায় সে বস্ত্ত
সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। এজন্য আপনাদের উচিৎ দ্বীনের সর্বশেষ অংশ ছালাতকে যথাযথভাবে
আঁকড়ে ধরা, আল্লাহ আপনাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (ইমাম আহমাদ, কিতাবুছ ছালাত)।
জাবের বিন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো,
‘রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে আমলসমূহের মধ্যে কোন আমলটি আপনাদের নিকট ঈমান এবং কুফরের মধ্যে
পার্থক্যকারী হিসাবে বিবেচিত হ’ত? তিনি বললেন, ছালাত’। (ইবনু
বাত্ত্বা, আল-ইবানাতুল কুবরা হা/৮৭৬; মারওয়াযী, তা‘যীমু কাদরিছ ছালাত হা/৮৯৩)।
উল্লেখ্য যে, কুফরী করা ও কাফের হয়ে যাওয়া
এক বিষয় নয়। এক্ষণে কেউ যদি ছালাতকে অস্বীকার করে বা একেবারে ছেড়ে দেয় তাহ’লে সে কাফের
হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যদি অলসতাবশত ছালাত ত্যাগ করে এবং মাঝে-মধ্যে আদায় করে তাহ’লে
সে কাফের হবে না বরং কবীরা গুনাহগার হবে। তওবা না করলে তাকে জাহান্নামে কঠিন শাস্তি
ভোগ করতে হবে। (আলবানী, হুকমু তারিকিছ ছালাত ১/১০, ৫১;
উছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১২/৫৫-৫৬; ছহীহাহ হা/৩০৫৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)।
(২) ছালাত ত্যাগ করা হত্যাযোগ্য অপরাধঃ
ছালাতকে অবজ্ঞা করে তা ত্যাগ করা হত্যাযোগ্য
অপরাধ। কেউ ইচ্ছা করে ছালাত পরিত্যাগ করলে তাকে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিতে হবে। সে
এই বিধান অস্বীকার করলে সরকার তাকে শাস্তি দিবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমরা মুশরিকদের যেখানে
পাও হত্যা কর, পাকড়াও কর, অবরোধ কর এবং ওদের সন্ধানে প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে থাক।
কিন্তু যদি তারা তওবা করে, ছালাত আদায় করে ও যাকাত দেয়, তাহলে ওদের রাস্তা ছেড়ে দাও।
নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান”। (সুরা তওবা ৯/৫)।
এর তাফসীরে বলা হয়েছে, তারা ছালাত আদায় করলে
জান ও মালের নিরাপত্তা লাভ করবে। আর তা পরিহার বা অস্বীকার করলে তা হত্যাযোগ্য অপরাধ
হিসাবে গণ্য হবে। হাদীছে এসেছে,
আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমাকে লোকের বিরুদ্ধে জিহাদ
করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা “লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’’ স্বীকার করবে। যখন
তারা তা স্বীকার করে নেয়, আমাদের মত সালাত আদায় করে, আমাদের ক্বিবলা মুখী হয় এবং আমাদের
যবহ করা প্রাণী খায়, তখন তাদের জান-মালসমূহ আমাদের জন্যে হারাম হয়ে যায়। অবশ্য রক্তের
বা সম্পদের দাবীর কথা ভিন্ন। আর তাদের হিসাব আল্লাহর নিকট। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৯২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৭৯,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮৫, সুনান আননাসাঈ ৩৯৬৭; আহমাদ ১৩৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ..আবূ হুরাইরাহ
(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তিকালের
পর আবূ বকর (রাযিঃ) খলীফা নিযুক্ত হলেন। এ সময় আরবের একদল লোক (যাকাত অস্বীকার করে)
মুরতাদ হয়ে গেল। [আবূ বকর (রাযিঃ) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সংকল্প করলেন] ’উমার (রাযিঃ)
বললেন, আপনি কিরূপে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন?[1] অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আমি (আল্লাহর পক্ষ থেকে) লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে
আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা বলে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত
কোন ইলাহ নেই) আর যে ব্যক্তি ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বললো, সে তার জান-মাল আমার হাত
থেকে রক্ষা করলো। অবশ্য আইনের দাবী আলাদা। (অর্থাৎ ইসলামের বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয়
কোন অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে)। তবে তার আসল বিচারের ভার আল্লাহর
উপর ন্যস্ত।
আবূ বকর (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, যে ব্যক্তি
সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো [2] কেননা
যাকাত হচ্ছে মালের (উপর বঞ্চিতের) অধিকার। আল্লাহর কসম, যদি তারা আমাকে একখানা রশি
প্রদানেও অস্বীকৃতি জানায় যা তারা (যাকাত বাবদ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কে প্রদান করতো, তবে আমি এ অস্বীকৃতির কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। এবার
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, ব্যাপারটা এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে,
আল্লাহ তা’আলা আবূ বকরের হৃদয়কে যুদ্ধের জন্য প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। আমি স্পষ্টই
উপলদ্ধি করলাম, এটাই (আবূ বকরের সিদ্ধান্তই) সঠিক এবং যথার্থ। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৩২, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অত্র হাদীছে ছালাত আদায়কে নিরাপত্তার মাপকাঠি
বলা হয়েছে।
আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
কাছে এক প্রকার (রঙিণ) চামড়ার থলে করে সামান্য কিছু স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। তখনও এগুলো
থেকে সংযুক্ত মাটি পরিষ্কার করা হয়নি। আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার জনের মাঝে স্বর্ণখন্ডটি বণ্টন করে দিলেন। তারা হলেন, ‘উয়াইনাহ
ইবনু বাদর, আকরা ইবনু হাবিস, যায়দ আল-খায়ল এবং চতুর্থ জন ‘আলক্বামাহ কিংবা ‘আমির ইবনু
তুফায়ল (রাঃ)। তখন সাহাবীগণের মধ্য থেকে একজন বললেন, এটা পাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের অপেক্ষা
আমরাই অধিক হাকদার ছিলাম। (রাবী) বলেন, কথাটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম
পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি আমার
উপর আস্থা রাখ না অথচ আমি আসমানের অধিবাসীদের আস্থাভাজন, সকাল-বিকাল আমার কাছে আসমানের
সংবাদ আসছে। রাবী বলেন, এমন সময়ে এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল। লোকটির চোখ দু’টি ছিল কোটরাগত,
চোয়ালের হাড় যেন বেরিয়ে পড়ছে, উঁচু কপাল বিশিষ্ট, দাড়ি অতি ঘন, মাথাটি ন্যাড়া, পরনের
লুঙ্গী উপরে উত্থিত। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহকে ভয় করুন। নবী সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার জন্য আফসোস! আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে দুনিয়াবাসীদের
মধ্যে আমি কি অধিক হাকদার নই? রাবী আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, লোকটি চলে গেলে খালিদ
বিন ওয়ালীদ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেব না? রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, হতে পারে সে সালাত আদায় করে। খালিদ (রাঃ)
বললেন, অনেক সালাত আদায়কারী এমন আছে যারা মুখে এমন এমন কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে
নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে মানুষের দিল ছিদ্র
করে, পেট ফেড়ে দেখার জন্য বলা হয়নি। তারপর তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তখন লোকটি
পিঠ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। তিনি বললেন, এ ব্যক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হবে যারা
শ্রুতিমধুর কণ্ঠে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে অথচ আল্লাহর বাণী তাদের গলদেশের নিচে
নামবে না। তারা দ্বীন থেকে এভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে লক্ষ্যবস্তুর দেহ ভেদ করে তীর
বেরিয়ে যায়। (বর্ণনাকারী বলেন) আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছেন, যদি আমি তাদেরকে পাই
তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে সামূদ জাতির মতো হত্যা করে দেব। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৩৫১, ৩৩৪৪; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী
২৩৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৬৪, আহমাদ ১১৬৯৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০০৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৪০১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩) আল্লাহ ও রাসূলের যিম্মা থেকে মুক্তিঃ
কেউ ইচ্ছা করে ছালাত ত্যাগ করলে আল্লাহ ও তাঁর
রাসূল (ছাঃ)-এর যিম্মা থেকে সে বের হয়ে যায়। যেমন,
(ক) মুআ’য বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট জনৈক লোক আগমণ করে বলল,
হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন কিছু আমল শিখিয়ে দিন, উহা বাস্তবায়ন করলে যেন আমি জান্নাতে
প্রবেশ করি।
তিনি বললেনঃ ’’তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে
শরীক করবে না- যদিও তোমাকে শাস্তি দেয়া হয় বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পিতা-মাতার আনুগত্য
করবে- যদিও তারা তোমাকে তোমার সম্পদ ও তোমার মালিকানাধীন সকল বস্ত্ত থেকে বহিস্কার
করে দেয়। ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ করবে না। কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায
পরিত্যাগ করবে, তার থেকে আল্লাহর জিম্মাদারী মুক্ত হয়ে যাবে।’’ (হাদীছটি বর্ণনা করেছেন
ত্বাবরানী)। (তাবারানী আওসাত্ব হা/৭৯৫৬; ছহীহুত তারগীব হা/৫৬৯)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)
(খ) আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমার বন্ধু (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উপদেশ দিয়েছেনঃ (১) তুমি
আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে খণ্ডবিখন্ড করা হয় বা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া
হয়; (২) ইচ্ছা করে কোন ফরয সালাত ত্যাগ করবে না, যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ফরয সালাত ত্যাগ
করবে তার ওপর থেকে ইসলাম প্রদত্ত নিরাপত্তা উঠে যাবে; (৩) মদ পান করবে না, কারণ মদ
হচ্ছে সকল মন্দের চাবিকাঠি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫৮০, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪০৩৪, সহীহ আত্ তারগীব ৫৬৭)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(গ) অন্যত্র তিনি বলেন, উম্মে আয়মান (রাঃ) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “ইচ্ছাকৃতভাবে
কখনো নামায ছেড়ে দিবে না। কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয়, তার থেকে
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জিম্মাদারী মুক্ত হয়ে যায়।’’ (আহমাদ
৬/৪২১, ২৭৪০৪; ছহীহুত তারগীব হা/৫৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪) ছালাত ত্যাগকারীর ইসলামে কোনো অংশ নেইঃ
ছালাত ত্যাগ করা এমন ভয়াবহ পাপ যে, কেউ তা
করলে সে ইসলাম থেকে অনেক দূরে চলে যায়। যেমন আছারে এসেছে,
মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, যে
রাত্রে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে ছুরিকাঘাত করা হয়, সেই রাত্রে তিনি ওমর ইবনুল
খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করলেন। ওমর (রাঃ)-কে ফজরের ছালাতের জন্য জাগানো হ’ল।
ওমর (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমি এই অবস্থায়ও ছালাত আদায় করব। কারণ যে ব্যক্তি ছালাত ছেড়ে
দেয়, ইসলামে তার কোন অংশ নেই। অতঃপর ওমর (রাঃ) ছালাত পড়লেন অথচ তার জখম হ’তে তখনও রক্ত
প্রবাহিত হচ্ছিল। (বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/১৬৭৩;
ইবনুল খাল্লাল, আস-সুনাহ হা/১৩৮৮,; মারওয়াযী, তা‘যীমু কাদরিস ছালাত হা/৯২৯, সনদ ছহীহ,
জামে‘উল ঊছূল হা/৫২২৫)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি
ছালাত বিনষ্ট করে ইসলামে তার কোন অংশ নেই’। (দারাকুৎনী
হা/১৭৫০; মুয়াত্ত্বা হা/১০১; ইরওয়া হা/২০৯)।
(৫) ছালাত ত্যাগ করা মুশরিকদের কাজঃ
ছালাত পরিত্যাগ করা মূলতঃ মুশরিকদের কাজ। এজন্য
মুসলমান ব্যক্তি কখনো ছালাত পরিত্যাগ করতে পারে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তোমরা তাঁকে ভয় কর
ও ছালাত কায়েম কর এবং তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’। (সুরা রূম ৩০/৩১)।
ইবনু বাত্তা (রহঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ
ছালাত পরিত্যাগ- কারীকে মুশরিক এবং ঈমান থেকে খারিজ হিসাবে গণ্য করেছেন। কারণ এই সম্বোধনের
মাধ্যমে মুমিনদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে তারা ছালাত পরিত্যাগ না করে। আর তারা এটা
করলে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে এবং মুশরিকদের মত হয়ে যাবে’। (আল-ইবানাতুল কুবরা ২/৭৯২)।
ইবনু বাত্তা (রহঃ) আরো বলেন, ‘ঈমান, ছালাত
ও যাকাতের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি। যার ঈমান নেই তার ছালাত কোনো কাজে আসবে না।
যে ছালাত আদায় করে না তার ঈমান কোনো উপকারে আসবে না’। (আল-ইবানাতুল
কুবরা ২/৭৯২)।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিন বান্দা ও শিরক-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত বর্জন
করা। অতএব যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করলো, সে অবশ্যই শিরক করলো। (সুনানসুনান ইবনু মাজাহ ১০৮০, সহীহ তারগীব ৫৬৫, ১৬৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৬) ছালাত ত্যাগ করা অজ্ঞদের বৈশিষ্ট্যঃ
যারা ছালাত আদায় করে না তাদেরকে অজ্ঞদের সাথে
তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যখন তোমরা ছালাতের জন্য (আযানের মাধ্যমে)
আহবান করে থাকো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ ওরা একেবারেই নির্বোধ
সম্প্রদায়’। (সুরা মায়েদাহ ৫/৫৮)।
সুদ্দী (রহঃ) বলেন, ‘মদীনায় এক নাছারা ছিল
যে মুওয়াযযিনের আযানের সময় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর রাসূল!
বলতে শুনত, তখন সে বলত, মিথ্যাবাদী আগুনে পুড়ুক! এক রাতে সে পরিবারসহ ঘুমিয়ে ছিল। এমন
সময় তার দাসী সে ঘরে আগুন নিয়ে প্রবেশ করে। আগুনের একটি টুকরো ঘরে পড়ে যায় এবং আগুন
ধরে যায়। এতে তার বাড়ি পুড়ে যায় এবং সে পরিবারসহ পুড়ে মারা যায়’। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৩/১২৮)।
ছালাত ও আযানকে নিয়ে কটূক্তি করার কারণে আল্লাহ
তা‘আলা সপরিবারে তাকে ধ্বংস করে দেন। যখন আযান শেষে মুসলমানেরা ছালাতে দাঁড়াত তখন ইহূদীরা
হাঁসি-তামাশা করত। যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত নাযিল করে বলেন, এরাই নির্বোধ
সম্প্রদায়। (তাফসীরুল খাযেন ২/৫৭)।
(৭) ছালাত ত্যাগ করা যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার সমতুল্য অপরাধঃ
কোন এলাকায় যদি আযানের ধ্বনি শোনা যেত তাহ’লে
সে এলাকায় রাসূল (ছাঃ) বা ছাহাবায়ে কেরাম অভিযান পরিচালনা করতেন না। বরং মনে করা হতো
এরা ছালাত আদায়কারী। আর আযান শোনা না গেলে সে এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো। যেমন
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
যখনই আমাদের নিয়ে কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেতেন, ভোর না হওয়া পর্যন্ত অভিযান
পরিচালনা করতেন না বরং লক্ষ্য রাখতেন, যদি তিনি আযান শুনতে পেতেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে
অভিযান পরিচালনা করা হতে বিরত থাকতেন। আর যদি আযান শুনতে না পেতেন, তাহলে অভিযান চালাতেন।
আনাস (রাযি.) বলেন, আমরা খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম এবং রাতের বেলায় তাদের সেখানে
পৌঁছলাম। যখন প্রভাত হলো এবং তিনি আযান শুনতে পেলেন না; তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ার হলেন। আমি আবূ তালহা (রাযি.)-এর পিছনে সওয়ার হলাম। আমার পা,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পায়ের সাথে লেগে যাচ্ছিল। আনাস (রাযি.) বলেন,
তারা তাদের থলে ও কোদাল নিয়ে বেরিয়ে আমাদের দিকে আসলো। হঠাৎ তারা যখন নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেখতে পেলো, তখন বলে উঠল, ‘এ যে মুহাম্মাদ, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ
তাঁর পঞ্চ বাহিনী সহ!’ আনাস (রাযি.) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
তাদের দেখে বলে উঠলেনঃ ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন
কোন কাওমের আঙ্গিণায় অবতরণ করি, তখন সতর্কীকৃতদের প্রভাত হয় মন্দ।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১০, ৩৭১; সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৩৩৮৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৬৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ৫৭৫ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৫৮৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৮) ছালাত পরিত্যাগে আমীর বা নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অনুমতিঃ
ছালাত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যে, রাষ্ট্র
বা নেতারা যতদিন ছালাত কায়েম রাখবে ততদিন তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা জনগণের জন্য
হারাম। যদিও তারা অন্যান্য ক্ষেত্রে নিন্দনীয় হয়।
আওফ ইবনু মালিক আল আশজা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই
সর্বোত্তম, যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারা তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ
করো এবং তারাও তোমাদের জন্য দু’আ করে। আর তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বনিকৃষ্ট, যাদের
প্রতি তোমরা ক্রোধান্বিত হও এবং তারাও তোমাদের প্রতি ক্রোধ ও শত্রুতা পোষণ করে। আর
তাদের প্রতি তোমরা অভিসম্পাত করো এবং তারাও তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। রাবী বলেন,
তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এমতাবস্থায় কি আমরা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান
করব না (তবুও কি বায়’আতের উপর থাকব)? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ
না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। (পুনরায় বললেনঃ) না, যতক্ষণ
পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। সাবধান! যে ব্যক্তিকে তোমাদের প্রতি
শাসক নিযুক্ত করা হয় আর তার মধ্যে যদি আল্লাহ তা’আলার নাফরমানি পরিলক্ষেত হয়, তাহলে
তার সে নাফরমানির কাজটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু তার আনুগত্য থেকে
পিছপা হবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৭০, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৯৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫৫, আহমাদ ২৩৯৮১, দারিমী ২৮৩৯,
সহীহাহ্ ৯০৭, সহীহ আল জামি‘ ৩২৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৫২, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৫৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উম্মু
সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ তোমাদের ওপর এমন শাসকবর্গ নিযুক্ত হবে যারা ভালো-মন্দ উভয় প্রকারের কাজ করতে
দেখতে পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অসৎ কাজের প্রতিবাদ করল, সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
পেল। আর যে ব্যক্তি অন্তর থেকে ঘৃণা করল, সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু যে ব্যক্তি উক্ত
কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল ও শাসকের আনুগত্য করল, তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, এমতাবস্থায়
কি আমরা তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ
না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে। না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে।
রাবী বলেন, প্রতিবাদ ও মন্দ জানার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে ও অগ্রাহ্য
করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৪৬৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫৪, সুনান আততিরমিযী ২২৬৫, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ
আল জামি‘ ২৩৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৭, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৯) ছালাত ত্যাগ করা অন্যান্য আমল বিনষ্টের কারণঃ
ছালাত
পরিত্যাগ করা এমন অপরাধ যে, এ কারণে তার অন্যান্য সৎ আমল বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। যেমন
বুরায়দা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’আসরের সালাত ছেড়ে দিলো
সে তার ’আমল বিনষ্ট করলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫৯৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৫৩, সুনান আননাসায়ী ৪৭৪, আহমাদ ২২৯৫৭, সহীহ আত্
তারগীব ৪৭৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
অন্য হাদীছে এসেছে,
ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির ’আসরের সালাত ছুটে গেল তার গোটা পরিবার ও ধনসম্পদ যেন উজাড় হয়ে
গেল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৯৪, বুখারী ৫৫২, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৩০৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬২৬, সুনান আবূ দাঊদ ৪১৪, সুনান
আননাসায়ী ৫১২, সুনান আততিরমিযী ১৭৫, আহমাদ ৫৩১৩, সহীহ আল জামি‘ ৫৪৯১, সহীহ আত্ তারগীব
৪৮০, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১২৯১, ইসলামীক সেন্টার ১৩০৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কোনো কোনো বর্ণনায় আছর ছালাতের কথা উল্লেখ
নেই। বরং বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ছালাত পরিত্যাগ করে অবশ্যই তার আমল বিনষ্ট
হয়ে যায়’। (হায়ছামী, মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/১৬৩৯)।
অন্য হাদীছে এসেছে,
রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
এর আযাদকৃত দাসী উমাইমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি একদা রাসুলুল্লাহ (সালাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ওযুর পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম। এমন সময় একজন লোক প্রবেশ করল। বলল
আমাকে কিছু নসীহত করুন।
তিনি বললেনঃ ’’তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে
শরীক করবে না- যদিও তোমাকে কেটে টুকরো করে দেয়া হয় বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পিতা-মাতার
অবাধ্য হবে না- যদিও তারা তোমাকে তোমার পরিবার ও দুনিয়ার ধন-সম্পদ পরিত্যাগ করার নির্দেশ
দেয়। মদ্যপান করবে না। কেননা উহা সকল খারাপ কাজের চাবি। ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ
করবে না। কেননা যে এরূপ করবে, তার থেকে আল্লাহ্ ও রাসূলের জিম্মাদারী মুক্ত হয়ে যাবে।’’
(আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৫৭১)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
(১০) ছালাত ত্যাগে রিযিক থেকে বঞ্চিতঃ
ছালাত এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে রিযিক বৃদ্ধি
পায়। আল্লাহ তা‘আলা যে সকল স্থানে তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন তার পরপরই প্রায়
সব জায়গাতে রিযিকের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যেমন কুরআনে এসেছে, ‘আর তুমি তোমার পরিবারকে
ছালাতের আদেশ দাও এবং তুমি এর উপর অবিচল থাক। আমরা তোমার নিকট রুজি চাই না। আমরাই তোমাকে
রুজি দিয়ে থাকি। আর (জান্নাতের) শুভ পরিণাম তো কেবল মুত্তাক্বীদের জন্যই’। (সুরা ত্বোয়াহা ২০/১৩২)।
আল্লাহর বাণী, ‘আমরা তোমার নিকট রুজি চাই না।
আমরাই তোমাকে রুজি দিয়ে থাকি’-এর ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘তুমি যখন
ছালাত আদায় করবে তোমার নিকট এমন জায়গা থেকে রিযিক আসবে যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে
না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, ‘বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ
তার জন্য উপায় বের করে দেন। আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিযিক প্রদান করে থাকেন’।
(সুরা তালাক ৬৫/২-৩)।
তিনি আরো বলেন, ‘আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি
করেছি কেবল এজন্য যে, তারা আমার ইবাদত করবে। আমি তাদের নিকট থেকে কোন রিযিক চাই না
এবং চাই না যে তারা আমাকে আহার যোগাবে। নিশ্চয় আল্লাহ হলেন সবচেয়ে বড় রিযিকদাতা ও প্রবল
শক্তির অধিকারী’। (সুরা যারিয়াত ৫১/৫৬-৫৭)।
(১১) ফেরাউন, হামান, ক্বারূন ও উবাই বিন খালফের সাথে হাশরঃ
যারা ছালাত ত্যাগ করবে তাদের হাশর হবে বড় বড়
কাফেরদের সাথে। আর পরকালে বড় কাফেরদের অবস্থা হবে ভয়াবহ। যাদের মধ্যে রয়েছে ফেরাউন,
হামান, ক্বারূন, উবাই ইবনু খালফ ও তাদের দোসরেরা। এ মর্মে হাদীছে এসেছে,
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন ছালাতের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি তা (ছালাত)
হেফাযত করবে, ক্বিয়ামত দিবসে তা তার জন্য নূর, দলীল-প্রমাণ ও জাহান্নাম হ’তে মুক্তি
(এর উপায়) হবে। আর যে ব্যক্তি তা (ছালাত) হেফাযত করবে না, ক্বিয়ামত দিবসে তা তার জন্য
নূর, দলীল-প্রমাণ ও জাহান্নাম হ’তে মুক্তি (এর উপায়) হবে না। আর ঐ ব্যক্তি ক্বিয়ামত
দিবসে ক্বারূন, ফেরাউন, হামান ও উবাই ইবনু খালফ-এর সাথে থাকবে’। (দারেমী হা/২৭২১; আহমাদ হা/৬৫৭৬; ইবনু হিববান হা/১৪৬৭)। হাদিসের
মানঃ সহিহ)।
ইমাম আহমদ রহ. এ হাদীসকে সালাত পরিত্যাগকারীর
কুফুরীর ব্যাপারে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কেননা বড় বড় কাফিরদের সাথে বেনামাযীর হাশর
হওয়ার জন্য তার কুফুরী সাব্যস্ত হওয়া চাই। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, “এই চার জনকে বিশেষভাবে
এ জন্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা কাফিরদের নেতা।
(১২) বারযাখে ভয়াবহ শাস্তিঃ
যে ব্যক্তি ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে
বরং উদাসীন থাকে তার জন্য কবরে এবং জাহান্নামে ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভ্যাস ছিল তিনি ফজরের সালাত শেষে প্রায়ই
আমাদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কেউ আজ রাতে কোন স্বপ্ন দেখেছ
কি? রাবী বলেন, আমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখে থাকলে তাঁর নিকট বলত। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তার তা’বীর করতেন। যথারীতি একদিন সকালে জিজ্ঞেস
করলেনঃ তোমাদের কেউ (আজ রাতে) কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ না।
তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেনঃ কিন্তু আমি দেখেছি, আজ রাতে দু’ ব্যক্তি আমার নিকট এলো এবং তারা উভয়ে আমার হাত
ধরে একটি পবিত্র ভূমির দিকে (সম্ভবত তা শাম বা সিরিয়া) নিয়ে গেল। দেখলাম, এক ব্যক্তি
বসে আছে আর অপর এক ব্যক্তি লোহার সাঁড়াশি হাতে দাঁড়ানো। সে তা ঐ উপবিষ্ট ব্যক্তির গালের
ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে তা দ্বারা চিরে গর্দানের পিছন পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর তার দ্বিতীয়
গালের সাথেও অনুরূপ ব্যবহার করার মাঝে প্রথম গালটি ভালো হয়ে যায়। আবার সে পুনরায় তাই
করে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? তারা উভয়ে বলল, সামনে চলুন।
সম্মুখের দিকে চললাম। এ পর্যায়ে আমরা এমন এক
ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম, যে ঘাড়ের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে, আর অপর এক ব্যক্তি একখানা
ভারী পাথর নিয়ে তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঐ পাথরের আঘাতে শায়িত ব্যক্তির মাথা
চূর্ণবিচূর্ণ করছে। যখনই সে পাথরটি নিক্ষেপ করে (মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে) তা গড়িয়ে দূরে
চলে যায়। তখন সে লোকটি পুনরায় পাথরটি তুলে আনতে যায় সে ফিরে আসার পূর্বেই ঐ ব্যক্তির
মাথাটি পূর্বের ন্যায় ঠিক হয়ে যায় এবং পুনরায় সে তা দ্বারা তাকে আঘাত করে। আমি জিজ্ঞেস
করলাম, এটা কী? তারা উভয়ে বলল, সামনে চলুন।
আমরা সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম। সেখানে একটি
গর্তের নিকট এসে পৌঁছলাম যা তন্দুরের মতো ছিল। এটার উপরিঅংশ ছিল সংকীর্ণ এবং ভিতরের
অংশটি ছিল প্রশস্ত। তার তলদেশে আগুন জ্বলছিল। আগুনের লেলিহান শিখা যখন উপরের দিকে উঠছে,
তখন তার ভিতরে যারা রয়েছে তারাও উপরে উঠে আসছে এবং গর্ত হতে বাইরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম
হচ্ছে। আর যখন অগ্নিশিখা কিছু স্তিমিত হচ্ছে তখন তারাও পুনরায় ভিতরের দিকে চলে যাচ্ছে।
তার মধ্যে রয়েছে কিছুসংখ্যক উলঙ্গ নারী ও পুরুষ। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? তারা উভয়ে
বলল : সামনে চলুন।
আমরা সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলাম এবং একটি রক্তের
নহরের নিকট পৌঁছলাম। দেখলাম, তার মধ্যস্থলে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে এবং নহরের তীরে
একজন লোক দণ্ডায়মান। আর তার সম্মুখে রয়েছে প্রস্তরখন্ড। নহরের ভিতরের লোকটি যখন তা
হতে বের হওয়ার উদ্দেশে কিনারার দিকে অগ্রসর হতে চাচ্ছে, তখন তীরে দাঁড়ানো লোকটি ঐ লোকটির
মুখ লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করছে এবং সে লোকটিকে ঐ স্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে যেখানে সে
ছিল। মোটকথা, লোকটি যখনই বাইরে আসার চেষ্টা করে, তখনই তার মুখের উপর পাথর মেরে সে যেখানে
ছিল পুনরায় সেখানে ফিরিয়ে দেয়। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? সঙ্গীদ্বয় বললেনঃ সামনে
চলুন।
আমরা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে শ্যামল সুশোভিত একটি
বাগানে পৌঁছলাম। বাগানে ছিল একটি বিরাট বৃক্ষ। ঐ বৃক্ষের গোড়ায় উপবিষ্ট ছিলেন একজন
বৃদ্ধ লোক এবং বিপুল সংখ্যক বালক। ঐ বৃক্ষটির সন্নিকটে আরেক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম,
যার সম্মুখে রয়েছে আগুন, যাকে সে প্রজ্জ্বলিত করছে। এরপর আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে ঐ বৃক্ষের
উপরে আরোহণ করাল এবং সেখানে তারা আমাকে বৃক্ষরাজির মাঝখানে এমন একখানা গৃহে প্রবেশ
করাল যেমন সুন্দর ও মনোরম ঘর আমি আর কখনো দেখিনি। তার মধ্যে ছিল কতিপয় বৃদ্ধ, যুবক,
নারী ও বালক। অনন্তর তারা উভয়ে আমাকে সে ঘর হতে বের করে বৃক্ষের আরো উপরে চড়াল এবং
এমন একখানা গৃহে প্রবেশ করাল যা প্রথমটি হতে আরো সুন্দর ও উত্তম। এতেও দেখলাম, কতিপয়
বৃদ্ধ ও যুবক।
অনন্তর আমি সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আপনারা উভয়েই
তো আমাকে আজ সারা রাতে অনেক কিছু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন। এখন বলুন, আমি যা কিছু দেখেছি
তার তাৎপর্য কী? তারা উভয়ে বলল: হ্যাঁ, (তা বলছি)। ঐ যে এক ব্যক্তিকে দেখেছেন সাঁড়াশি
দ্বারা যার গাল চেরা হচ্ছিল, সে মিথ্যাবাদী, সে মিথ্যা বলত এবং তার নিকট হতে মিথ্যা
রটানো হত। এমনকি তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত। অতএব তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ আচরণ করা
হতে থাকবে, যা করতে আপনি দেখেছেন।
আর যে ব্যক্তির মস্তকে পাথর মেরে ঘায়েল করতে
দেখেছেন, সে ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা’আলা কুরআন শিক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু সে কুরআন
হতে গাফিল হয়ে রাত্রে ঘুমাত এবং দিনেও তার নির্দেশ মোতাবেক ’আমল করত না। সুতরাং তার
সাথে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ আচরণই করা হবে, যা আপনি দেখেছেন।
আর (আগুনের) তন্দুরে যাদেরকে দেখেছেন তারা
হলো যিনাকার (নারী-পুরুষ)।
ঐ ব্যক্তি যাকে (রক্তের) নহরে দেখেছেন, সে
হলো সুদখোর।
ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি যাকে একটি বৃক্ষের গোড়ায় উপবিষ্ট
দেখেছেন, তিনি হলেন : ইবরাহীম (আ.)। তাঁর চতুষ্পার্শ্বের শিশুরা হলো মানুষের সন্তান-সন্ততি।
আর যে লোকটিকে অগ্নিকুন্ড প্রজ্জ্বলিত করতে
দেখেছেন তা শহীদদের ঘর। আর আমি হলাম জিবরীল (আ.) এবং ইনি হলেন মীকাঈল (আ.)।
এবার আপনি মাথাটি উপরের দিকে তুলে দেখুন। তখন
আমি মাথাটি তুলে দেখলাম, যেন আমার মাথার উপরে মেঘের মতো কোন একটি জিনিস রয়েছে। অপর
এক রিওয়ায়াতে আছে, একের পর এক স্তবকবিশিষ্ট সাদা মেঘের মতো কোন জিনিস দেখলাম। তাঁরা
বললেনঃ তা আপনারই বাসস্থান। আমি বললামঃ আমাকে সুযোগ দিন আমি আমার ঘরে প্রবেশ করি। তাঁরা
বললেনঃ এখনো আপনার হায়াত বাকি আছে, যা আপনি এখনো পূর্ণ করেননি। আপনার যখন নির্দিষ্ট
হায়াত পূর্ণ হবে, তখন আপনি আপনার বাসস্থানে প্রবেশ করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৬২১, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৭, ৮৪৫,
সুনান আততিরমিযী ৭০৪৮, ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১০৭৭৬, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ৬৮৪৫,
৮৪৫; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৫৮৩১, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২২৭৫, আহমাদ ২০১১৫, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭১)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(১৩) ছালাত বিনষ্ট করা পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্যঃ
ছালাত ইসলামের প্রধান রুকন। এজন্য ছালাত ত্যাগকারী
কবীরা গুনাহগার এবং অস্বীকারকারী কাফের। আল্লাহ তা‘আলা ছালাত বিনষ্টককারী পূর্ববর্তী
এক সম্প্রদায়ের কথা আলোচনা করে আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের
পরে এলো তাদের (অপদার্থ) উত্তরসূরীরা। তারা ছালাত বিনষ্ট করল ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করল।
ফলে তারা অচিরেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে’। (সুরা মারিয়াম
১৯/৫৯)।
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ)-কে (সূরা মারিয়ামের ৫৯ আয়াত পাঠ করার পর) বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘ষাট বছর
পর কিছু (অপদার্থ) পরবর্তীগণ আসবে, তারা ছালাত নষ্ট করবে ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হবে। সুতরাং
তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। অতঃপর এক জাতি আসবে, যারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু
তা তাদের কণ্ঠনালী পার হবে না। (হৃদয়ে জায়গা পাবে না।) কুরআন তিন ব্যক্তি পাঠ করে-
মুমিন, মুনাফিক ও ফাজের (পাপী)। (হাকেম হা/৩৪১৬; আহমাদ হা/১১৩৫৮; ছহীহাহ হা/৩০৩৪)।
(১৪) ছালাত ত্যাগ করা জাহান্নামে যাওয়ার বড় কারণঃ
যে সকল পাপের কারণে মানুষ জাহান্নামে যাবে
তন্মধ্যে ছালাত ত্যাগ করা অন্যতম। যার স্বীকিৃতি স্বয়ং জাহান্নামীরাই দিয়েছে। আল্লাহ
তা‘আলা জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কথোপকথন তুলে ধরে বলেন, ‘কোন্ বস্তু তোমাদেরকে ‘সাক্বারে’
(জাহান্নামে) প্রবেশ করাল? তারা বলবে, আমরা মুছল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’। (সুরা
মুদ্দাছি্ছর ৭৪-৪২-৪৩)।
ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা কোন
কোন ঈমানের অধিকারীদের শাস্তি দিবেন। অতঃপর মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শাফা‘আতে তাদের বের
করে আনবেন। জাহান্নামে কেবল তারাই থেকে যাবে যাদের কথা আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে আলোচনা
করেছেন- ‘কোন্ বস্তু তোমাদেরকে ‘সাক্বারে’ প্রবেশ করাল? তারা বলবে, আমরা মুছল্লীদের
অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’। (মুদ্দাসসির ৭৪-৪২-৪৩; শরহ মুশকিলুল
আছার হা/৫৫৫৬, মুসনাদে আবী হানীফা হা/১২)।
(১৫) ছালাত ত্যাগকারীর ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের অবস্থান,
ইসলামে ছালাত পরিত্যাগকারীর কোন অবস্থান নেইঃ
যে সকল আমলের মাধ্যমে মানুষের ঈমান টিকে থাকে
তার মধ্যে সর্বাধিক বড় মাধ্যম হলো ছালাত। কেউ ছালাত ত্যাগ করলে ইসলামে কোন অংশ থাকবে
না বলে ছাহাবায়ে কেরাম সতর্ক করে দিয়েছেন। মুমূর্ষু অবস্থায় থাকাকালীন ছালাতের কথা
বলা হ’লে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তির ইসলামে কোন অবস্থান
নেই, যে ছালাত বিনষ্ট করে। অতঃপর ওমর (রাঃ) ছালাত পড়লেন অথচ তার জখম হ’তে তখনও রক্ত
প্রবাহিত হচ্ছিল’। (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৬৭৩; আবুবকর
ইবনুল খাল্লাল, আস-সুনাহ হা/১৩৮৮; মারওয়াযী, তা‘যীমু ক্বাদরিস ছালাত হা/৯২৯, জামে‘উল
ঊছূল হা/৫২২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ।
(১৫) ছালাত ত্যাগকারী ঈমানহীন মানুষঃ
ছালাতহীন মানুষ ঈমানহীন মানুষের মত। কেউ ছালাত
পরিত্যাগ করলে তার ঈমান থাকবে না। এজন্য ছালাত ত্যাগ করা যাবে না। যেমন আছারে এসেছে,
দ্দারদা (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত পড়ে না তার ঈমান নেই। আর যে ব্যক্তি ওযূ করেনি
তার ছালাত হবে না’। (ছহীহুত তারগীব হা/৫৭৫; আস-সুন্নাহ হা/১৩৮৪)।
ইবনে মাসউদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,
‘যে ব্যক্তি ছালাত ত্যাগ করে, তার দ্বীনই নেই’। (তাবারানী
কাবীর হা/৮৮৪৭-৪৮; ছহীহুত তারগবি হা/৫৭৪)।
মুছ‘আব বিন সা‘দ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি
আমার পিতাকে বললাম, হে পিতা! আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের ছালাত থেকে উদাসীন’। (সুরা মা‘ঊন ১০৭/৫)।
এই আয়াত সম্পর্কে আপনি কি বলেন? আমাদের মধ্যে
কে এমন আছে যার ছালাতে উদাসীনতা আসে না? কে এমন আছে ছালাত পড়তে গিয়ে যার মনে বিভিন্ন
কথা স্মরণ হয় না? তিনি বললেন, বিষয়টা এরকম নয়। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছালাত নষ্ট
করা। যারা আজে-বাজে (দুনিয়াবী) কাজে লিপ্ত থেকে ছালাতের সময়কে নষ্ট করে দিবে’। (আবু ইয়া‘লা হা/৭০৪; ছহীহুত তারগীব হা/৫৭৬; আল-আছারুছ ছহীহাহ
হা/৩৭৭)। হাদিসের মানঃ হাসান।
জাবের বিন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো ‘রাসূল
(ছাঃ)-এর আমলে আমলসমূহের মধ্যে কোন আমলটি আপনাদের নিকট ঈমান এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী
হিসাবে বিবেচিত হ’ত? তিনি বললেন, ছালাত’। (ইবনু বাত্ত্বা,
আল-ইবানাতুল কুবরা হা/৮৭৬; মারূযী, তা‘যীমু ক্বাদরিছ ছালাত হা/৮৯৩)।
যায়েদ বিন ওয়াহাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
‘একদা আমি হুযায়ফা (রাঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ করলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে
তার রুকূ‘-সিজদা পূর্ণ করছে না। সে ছালাত শেষ করলে তিনি তাকে ডেকে বললেন, তুমি কতদিন
থেকে এভাবে ছালাত আদায় কর? লোকটি বলল, চল্লিশ বছর। হুযায়ফা (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি
ছালাত আদায় করনি। শাক্বীক্ব বলেন, আমার মনে হয় হুযায়ফা এ কথাও বলেছেন, যদি তুমি এ অবস্থায়
মৃত্যুবরণ কর, তাহ’লে নবী করীম (ছাঃ)-কে যে প্রকৃতির উপর আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন,
তুমি তার বাইরে মৃত্যুবরণ করবে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৮৮৪, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৮০৮, ৩৮৯, ৭৯১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৭৪৭, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৭৫৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
অনুরূপ বর্ণনা রাসূল (ছাঃ) থেকেও এসেছে। আবু
মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার ছালাতে
পূর্ণভাবে রুকূ‘ করছে না এবং ঠকঠক করে (তাড়াতাড়ি) সিজদা করছে। এ দেখে তিনি বললেন, এ
ব্যক্তি যদি এই অবস্থায় মারা যায়, তাহ’লে তার মরণ মুহাম্মাদী মিল্লাতের উপর হবে না।
অতঃপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার রুকূ‘ সম্পূর্ণরূপে করে না এবং ঠকাঠক (তাড়াহুড়া করে)
সিজদা করে তার উদাহরণ সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মত, যে একটি অথবা দু’টি খেজুর তো খায়
অথচ তা তাকে মোটেই পরিতৃপ্ত করে না’। (আত্ তারগীব ওয়াত্
তারহীব ৫২৮, তাবারানী কাবীর হা/৩৮৪, আবু ইয়ালা
৭১৮৪ ও ইবনে খুযায়মা ১/৩৩২)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
বিলাল
(রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি একদা দেখলেন একজন লোক রুকূ‘-সিজদা পরিপূর্ণরূপে করছে না। তখন
তিনি বললেন, এ লোক (এ অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করলে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ধর্মের বাইরে মৃত্যুবরণ
করবে। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৫৩০, ত্বাবারনী হাদীছটি
বর্ণনা করেছেন ৩/১২৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ছালাত আদায় করার পরেও যখন ত্রুটি হওয়ার কারণে
মিল্লাতে মুহাম্মাদীর উপর টিকে থাকা যাচ্ছে না সেখানে ছালাত পরিত্যাগকারীর অবস্থা কতটা
ভয়াবহ হবে তা সহজে বুঝা যায়।
আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ
’যে ব্যক্তি নামায পড়ে না তার ঈমান নেই। আর যে ব্যক্তি ওযু করেনি তার নামায হবে না।’ (ইবনে আবদুল বার মাওকূফ সূত্রে বর্ণনা করেন)।
ইবনে আবী শায়বার বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ নবী (সালাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
“যে ব্যক্তি নামায পরিত্যাগ করবে, সে কুফরী
করবে।’’
মুহাম্মাদ বিন নসর মারওয়াযী বলেনঃ আমি ইসহাককে
বলতে শুনেছিঃ নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সহীহ্ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে
যে, নামায পরিত্যাগকারী কাফের।
অনুরূপভাবে নবী (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
থেকে নিয়ে সকল বিদ্বানের মত হচ্ছে বিনা ওযরে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগকারী কাফের।
হাম্মাদ বিন যায়দ থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি আইয়্যুব
থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ নামায পরিত্যাগ করা কুফরী, এতে কোন মতভেদ নেই। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৫৭৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু হাযম (রহঃ) বলেন, ‘ছাহাবীদের মধ্যে ওমর,
আব্দুর রহমান ইবনু আওফ, মু‘আয বিন জাবাল ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা এসেছে যে,
যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত একটি ফরয ছালাত পরিত্যাগ করবে এমতাবস্থায় যে, ওয়াক্ত অতিবাহিত
হয়ে গেল তাহ’লে সে কাফের মুরতাদ’। (মুহাল্লা ২/১৫)।
হাসান বছরী (রহঃ) বলেন, ‘আমার নিকট এ মর্মে
খবর পৌঁছেছে যে, রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবীরা বলতেন, বান্দা এবং শিরককারীর মধ্যে পার্থক্য
হ’ল এই যে, সে বিনা ওযরে ছালাত পরিত্যাগ করল’। (আবু বকর
ইবনু খাল্লাল, আস-সুন্নাহ হা/১৩৭২; ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাতুল কুবরা হা/৮৭৭)।
সূরা মা‘আরিজ ২৩ আয়াতের তাফসীরে ইমাম কাতাদা
(রহঃ) বলেন, ‘দানিয়াল (আঃ) উম্মতে মুহাম্মাদী (ছাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন,
তারা ছালাত আদায় করে। যদি নূহের সম্প্রদায় ছালাত আদায় করত তাহ’লে তারা ডুবে মরত না।
আ‘দ সম্প্রদায় ছালাত আদায় করলে তাদের প্রতি ঝড়-তুফান পাঠিয়ে ধ্বংস করা হ’ত না। ছামূদ
সম্প্রদায় ছালাত আদায় করলে তাদেরকে গর্জন-ভূমিকম্প পাকড়াও করত না। অতএব তোমাদের জন্য
ছালাত আদায় করা আবশ্যক। কারণ এটি মুমিনদের জন্য সুন্দর চরিত্রের অংশ’। (মুহাম্মাদ বিন নাছর মারূযী, তা‘যীমু কাদরিছ ছালাত হা/৬৮)।
ছালাত ত্যাগকারীর ব্যাপারে চার ইমামের অভিমত
হানাফী মাযহাবের অভিমতঃ
হানাফীদের অভিমত হ’ল অলসতাবশত ইচ্ছাকৃত ছালাত
পরিত্যাগকারী গুনাহগার। তাকে হত্যা করা যাবে না। বরং শিক্ষাদানের জন্য শাস্তি প্রদান
করা হবে এবং তাকে বন্দি করা যাবে, যতক্ষণ না মৃত্যুবরণ করে অথবা তওবা করে’। (আল মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়া ২৭/৫৪)।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর অভিমত উল্লেখ করার
পর মোল্লা আলী ক্বারী বলেন, ‘আবু হানীফা (রহঃ)-এর অভিমতটি কতই সুন্দর! যেখানে অন্যান্য
অভিমতগুলো দুর্বল। (মিরকাত ২/৫১০)।
মালেকী মাযহাবের অভিমতঃ
মালেকী মাযহাবের মতে, ‘অস্বীকার নয় বরং উদাসীনতা
এবং অলসতাবশত ছালাত পরিত্যাগকারীর ব্যাপারে মালেকী ও শাফেঈ মাযহাবের অভিমত এই যে, দন্ড
হিসাবে তাকে হত্যা করা হবে। তবে মৃত্যু পরবর্তীতে সে মুসলিমের বিধানে থাকবে। ফলে তাকে
গোসল দেওয়া হবে, জানাযার ছালাত আদায় করা হবে এবং মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা
হবে’। (আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়া ২৭/৫৪)।
মালেকী বিদ্বান মুহাম্মাদ ইবনু রুশদ আল-কুরতুবী
(রহঃ) বলেন, ‘বিশুদ্ধ মত হ’ল এই যে, সে কাফের হয়ে যাবে না। যদিও সে নিয়মিত ছালাত আদায়
না করে বা এ ব্যাপারে সীমালংঘনকারী হয় যতক্ষণ না সে এর ফরযিয়াতকে অস্বীকার করবে’। (আল-বায়ান ওয়াত তাহছীল ১৭/২৩৩)।
এরপর তিনি দলীল হিসাবে নিম্নের হাদীছ পেশ করেন, ইবনু মুহাইরীয (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। বনু কিনানাহর
আল-মুখদাজী সিরিয়াতে আবূ মুহাম্মাদ নামক এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, বিতর ওয়াজিব। মুখদাজী
বলেন, আমি ’উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বললেন, আবূ
মুহাম্মাদ মিথ্যা বলেছে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফারয করেছেন। যে ব্যক্তি তা যথাযথভাবে
পালন করবে, আর অবহেলাহেতু এর কোনটি পরিত্যাগ করবে না, মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ
করানোর অঙ্গীকার করেছেন। আর যে ব্যক্তি তা (যথাযথভাবে) আদায় করবে না, তার জন্য আল্লাহর
কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিবেন কিংবা জান্নাতে প্রবেশ
করাবেন। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ১৪২০; সুনান আননাসাঈ
৪৬১; ছহীহুল জামে ৩২৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
শাফেঈ মাযহাবের অভিমতঃ
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, ‘যদি কোন লোক এক ওয়াক্ত
ছালাতও ছেড়ে দেয় এবং এভাবে ওয়াক্ত পার হয়ে যায় তাহলে সে মন্দে নিপতিত হয়। তবে আল্লাহ
যদি ক্ষমা করে দেন’। (কিতাবুল উম্ম ১/২৩৯)।
তিনি
আরো বলেন, ‘ইসলামে প্রবেশ করার পরে যে ব্যক্তি ফরয ছালাক পরিত্যাগ করে তাকে বলা হবে,
কেন ছালাত আদায় করো না? যদি সে ভুলে যাওয়ার ওযর পেশ করে তাহ’লে আমরা তাকে বলব, যখন
তোমার স্মরণ হবে তখনই ছালাত আদায় করে নিবে। যদি সে অসুস্থতার কথা বলে তখন আমরা বলব,
সাধ্যমত তুমি দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে বা ইশারায় ছালাত আদায় করবে। সে যদি বলে, আমি সুন্দরভাবে
ছালাত আদায়ে সক্ষম কিন্তু ছালাত আদায় করি না। যদি সে স্বীকৃতি দেয় যে, আমার উপর ছালাত
ফরয। তাহ’লে তাকে বলা হবে, ছালাত তোমার জন্য এমন এক ফরয ইবাদত, যা তোমার পক্ষ থেকে
অন্য কেউ আদায় করতে পারবে না এবং এটা কেবল তোমার কাজের মাধ্যমে সম্ভব। তুমি ছালাত আদায়
কর অন্যথায় তোমার নিকট তওবা কামনা করছি। তুমি যদি তওবা কর তাহলে ভালো। অন্যথায় তোমাকে
হত্যা করা হবে। কারণ যাকাত অপেক্ষা ছালাতের গুরুত্ব অনেক বেশি’। (কিতাবুর উম্ম ১/২৯১)।
হাম্বলী মাযহাবের অবস্থানঃ
ছালাত পরিত্যাগকারীর বিধান সম্পর্কে হাম্বলী
মাযহাবে বলা হয়েছে, ‘অলসতাবশত ছালাত ত্যাগকারীকে তা আদায় করার জন্য আহবান করা হবে।
তাকে বলা হবে, ছালাত আদায় কর অন্যথায় তোমাকে হত্যা করা হবে। এমতাবস্থায় যদি সে ছালাত
আদায় করে তো ভালো। অন্যথায় তাকে হত্যা করা আবশ্যক। তবে তাকে হত্যার পূর্বে তিনদিন বন্দি
করে রাখতে হবে। আর প্রত্যেক ছালাতের সময় ছালাতের দিকে আহবান করতে হবে। এরপরেও যদি সে
ছালাত আদায় না করে তাহ’লে তাকে হদ্দ বা দন্ড হিসাবে বা কুফরী হিসাবে হত্যা করতে হবে।
অর্থাৎ তাকে গোসল দেওয়াবে না, তার জানাযা পড়বে না এবং মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করবে
না। তবে তার পরিবার-পরিজন এবং সন্তানকে দাস বানানো যাবে না এবং বন্দি করাও যাবে না।
যেমন মুরতাদের পরিবার ও সন্তানদের ক্ষেত্রে করা হয়ে থাকে’। (আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়া ২৭/৫৫)।
হাম্বলী মাযহাবের গ্রহণযোগ্য অভিমত হলৈা- ছালাত
পরিত্যাগকারী কাফের হয়ে যাবে না। বরং কবীরা গুনাহগার হবে এবং কালেমায় বিশ্বাসী হলে
হদ্দ বা দন্ড হিসাবে তাকে হত্যা করা হবে। যেমন ইবনু কুদামাহ (রহঃ) বলেন, ‘দ্বিতীয় অভিমত
হ’ল তাকে মুসলিমের বিধানে রেখেই দন্ড হিসাবে হত্যা করা হবে যেমন বিবাহিত যেনাকারকে
হত্যা করা হয়। আর এই অভিমতই গ্রহণ করেছেন আবু আব্দিল্লাহ ইবনু বাত্তাহ। তিনি ঐ সকল
বিদ্বানের অভিমত প্রত্যাখ্যান করেছেন যারা বলেন যে, ছালাত পরিত্যাগকারী কাফের হয়ে যাবে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, এর উপরেই হাম্বলী মাযহাব। তিনি এ ব্যাপারে মাযহাবে কোন মতপার্থক্য
পাননি’। (ইবনু কুদামাহ, মুগনী ২/৩৩১)।
মোট কথা- চার মাযহাবের চূড়ান্ত অভিমত হলো কেউ
ছালাতকে অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে। কিন্তু মাঝে মধ্যে আদায় করলে বা এর ফরযিয়াতকে
অস্বীকার না করলে কাফের হবেনা। বরং সে ছালাত ত্যাগ করায় মহাপাপী হবে।
পরিশেষে এই কথাই বলা যায় যে, সকল আমল বা ইবাদতের
মধ্যে ছালাত হচ্ছে মূল ইবাদত। যার ছালাত সঠিক আছে তার সকল আমল সঠিক থাকবে। ইচ্ছেকৃতভাবে
ছালাত পরিত্যাগকারী মহাপাপী হবে। এতো কিছু জানা সত্বেও আমাদের মুসলিম সমাজের অধিকাংশ
মুসলিম অলসতাবশতঃ ছালাত আদায় করে না। অফিস আদালত, হাট বাজারসহ সব জায়গায় দেখা যায়,
আজান হলো মসজিদে কিছু মুছ্ল্লী ছালাত আদায়ের জন্য যাচ্ছে আর বাকি সব মুসলমান ব্যস্ততার
দোহাই দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের পরিনতি হবে খুবই ভয়াবহ। আপনি যতোই দান করেন,
যতোই কুরবানী দেন আর যতো বারই হজ্জ করেন কিংবা যতোই অন্যান্য আমল করেন কিয়ামতে কোনো
কাজেই আসবে না। তাই মুসলমানদের প্রতি অনুরোধ সঠিক সময়ে সহিহভাবে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত
আদায় করুন। নিজে পড়ুন পরিবারকে পড়তে আদেশ করুন। (আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পাঁচ
ওয়াক্ত ছালাত আদায়কারীর অন্তর্ভুক্ত করুন, আমিন)।
“আকিমুস সলাত-সালাত প্রতিষ্ঠা করা” কে কোথায় করবে?
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি তাদেরকে পৃথিবীতে
(রাজ) ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং সৎ কাজের আদেশ
দিবে ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করবে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে”। (সূরাঃ আল-হজ্জ,
আয়াত ৪১)।
আলোচ্য আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য
ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্রে শাসকদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ৪টি। যথাঃ
(ক) রাষ্ট্রের
সর্বত্র সালাত কায়েম করা,
(খ) নিসাব পরিমান মালধারী ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নিকট
থেকে যাকাত আদায় করে গরিব মিসকিনদের মাঝে সমবন্টন করে দেয়া,
(গ) সৎ
কাজের আদেশ প্রদান করা ও
(ঘ) অসৎকার্য
হতে সকলকে নিষেধ করা।
এসবের বাস্তবায়ন খেলাফতে রাশেদা ও প্রথম শতাব্দীর
ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তাঁরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত উদ্দেশ্য
সাধন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর যার কারণে তাঁদের রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বিস্তার
লাভ করেছিল, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল এবং মুসলিমরা মাথা উঁচু করে জীবন যাপন করতে পেরেছিলেন।
বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে সফল রাষ্ট্র
কায়েম করার জন্য বড় হৈচৈ ও হাঙ্গামা শোনা যায় এবং প্রত্যেক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়করা
সফল রাষ্ট্রের দাবিও করে থাকেন। কিন্তু প্রত্যেক ইসলামী রাষ্ট্রে অশান্তি, বিশৃংখলা,
হত্যা, লুঠতরাজ, দুর্নীতি ও অবনতি ব্যাপক হয়ে আছে এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল থেকে
দুর্বলতর হয়ে চলেছে। এর একমাত্র কারণ এই যে, তাঁরা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান না মেনে পাশ্চাত্যের
গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ (ধর্মহীন) বিধান দ্বারা সাফল্য অর্জন করতে চান। যা আকাশ স্পর্শ
করা ও বাতাসকে মুষ্ঠিবদ্ধ করার মত অবাস্তব অপচেষ্টা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলোতে
কুরআনের বর্ণিত নিয়মানুসারে সালাত প্রতিষ্ঠা ও যাকাত প্রদান ব্যবস্থা, সৎ কাজের আদেশ
ও অসৎ কাজে বাধাদানের বিধান বাস্তবায়ন না করা হবে এবং এ লক্ষ্যকে রাজনীতির অন্যান্য
কার্যের উপর অগ্রাধিকার না দেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সফল রাষ্ট্র কায়েম করার স্বপ্ন
স্বপ্নই থেকে যাবে।
আমরা লক্ষ্য করে আসছি যে, বর্তমান সময়ে সর্বত্র সালাত কায়েম নেই। মুসলিম তার ব্যক্তি জীবনে সালাত প্রতিষ্ঠা নেই, তার পরিবারে নেই কিংবা সমাজেও সালাত প্রতিষ্ঠা নেই। সালাত প্রতিষ্ঠা সাধারণত দুই ধরণের হতে পারে। যথাঃ
(ক) ব্যক্তি জীবনে সালাত প্রতিষ্ঠা করা।
(খ) সমাজের সর্বত্র সালাত প্রতিষ্ঠা করা।
আমাদের দেশে এক শ্রেণির আলেম আছেন যারা যুগ
যুগ ধরে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ওয়াজ নসিহত করে যাচ্ছেন। কিছু ইসলামি দল আছে তারাও
ইসলামি দাওয়াতি কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে কোথাও সালাত প্রতিষ্ঠা হচ্ছে
না। বাংলাদেশে হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। টিফিন হলে শিক্ষকসহ কয়েকজন মাত্র
ছাত্রকে সালাত আদায় করতে দেখা যায়। আর বাকি সকলে এদিক ওদিক ঘুরে সময় কাটিয়ে দেয়। কিন্তু
এখানে যদি সরকারি এমন আদেশ থাকতো প্রত্যেক মুসলিম ছাত্রছাত্রীকে সালাতে শরিক হতে হবে
নইলে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে বা অনুরুপ অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাহলে দেখা
যেতো মসজিদে মুসল্লির অভাব হতো না। এভাবে শহর বন্দর, হাটে বাজারে, যানবাহন সর্বত্র
সরকারি আদেশের মাধ্যমে সালাত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
কিন্তু সরকারি এই আদেশটা জারি করবে কে? বর্তমানে
যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছেন বা পালাবদলে যারা আসেন তারা তো কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলের
নেতা নন। আর তাদের গঠনতন্ত্রে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা চালু করার কথা লেখা নেই। তারা রাষ্ট্র
শাসন করে মানবরচিত আইন দিয়ে। তারা নিজেরা যেমন নিজেদের মধ্যে সালাত প্রতিষ্ঠা করে না
তেমনি প্রজাদেরকেও মানতে বাধ্য করে না। তাহলে আপনি ভোটার তাদেরকে ভোট দেন কেনো? যারা
আপনার ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসে সালাত প্রতিষ্ঠা, যাকাত আদায়সহ ইসলামি অন্যান্য
আইন রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন না করে উল্টো ইসলাম বিরোধী কাজ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে তাহলে
আপনিও সেই ইসলামি বিরোধী কাজের সহযোগি হলেন।
এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, সৎকর্ম ও তাকওয়ায়
তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে
ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ আজাব প্রদানে কঠোর। (সুরা মায়েদা:
২)।
অতএব আপনি ভোটার কোন্ দলকে ভোট দিচ্ছেন, সেই
দলটি ইসলাম নিয়ে কাজ করে কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলো চিন্তাভাবনা করে ভোট প্রদান করতে হবে।
নইলে সালাত ব্যক্তি জীবন, পরিবার ও সমাজে আদৌ সালাত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনের অন্যান্য আয়াতে সালাত প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বলেন,
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমার বান্দাদের মধ্যে
যারা ঈমান এনেছে তাদের নামাজ কায়েম করতে বলুন”। (সুরা
ইবরাহিম ১৪:৩১)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর আপনার পরিবারবর্গকে
নামাজের আদেশ দিন এবং আপনি নিজেও এতে অবিচলিত থাকুন”। (সুরা
ত্বহা ১৩২)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা নামাজ কায়েম করো,
জাকাত প্রদান এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু করো”। (সুরা বাকারা
২:৪৩)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে আমার রব, আমাকে এবং
আমার বংশধরকে যথাযত নামাজ প্রতিষ্টাকারী কর”। (সূরা ইব্রাহীমের
৪০)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে বৎস! নামাজ কায়েম
করবে, সৎ কাজের নির্দেশ দেবে, অসৎ কাজ প্রতিরোধ করবে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে”। (সূরা লোকমান ১৭)।
সালাত ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠা করা যেমন ফরজ
তেমনি মুসলিম রাষ্ট্র শাসক যখন তারা ক্ষমতা প্রাপ্ত হোন তখন সমাজের সর্বত্র সালাত প্রতিষ্ঠা
করাও ফরজ। (সমাপ্ত)
লেখক ও সংকলকঃ
মো: ইজাবুল আলম-এম.এ, সি.ইন,এড
(ইসলামিক স্টাডিজ-রংপুর কারমাইকেল ইউনিভার্সিটি
কলেজ, রংপুর), বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক।
(মহাপরিচালক-পিএমএমআরসি, এমএসএইসআরসি,
গুলশান-২, ঢাকা, বাংলাদেশ।
...........................................................................................
কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে
PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।
Please Share On
No comments:
Post a Comment