বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
পীরের আস্তানা শয়তানের কারখানা
(প্রথম অংশ)
লেখকের কথাঃ ইসলামে পীর, সুফি, সাধক, গাউস, কুতুব
বলতে কিছু নেই। রাসুল সা. এর যুগে, সাহাবীগণের যুগে, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণের যুগেও
পীর প্রথা বা সুফিবাদের প্রচলন ছিল না। যারা রাসুল সা. এর সান্নিধ্যে ছিলেন বা যারা
সাহাবীদের সান্নিধ্য পেয়েছেন তারাও কখনো নিজেদেরকে পীর, সুফি, সাধক বা অলী বলে দাবী
করে প্রচার করেননি। অথচ এই ভারত উপমহাদেশসহ আরও কিছু রাষ্ট্রে শয়তানের উত্তরসুরীর জন্ম
লাভ করায় মুসলমানদের ঈমান আমল নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। দরবারী এইসব পীরেরা এমনভাবে নিজেকে
জাহির করে যেনো তিনি নিষ্পাপ ও জান্নাতী। যারফলে তার মুরিদরা নামাজ, কালাম, রোজা সব
ছেড়ে শুধু বাবাজান আর বাবাজানের ধ্যানে মগ্ন থাকে। মুরিদরা বিশ্বাস করে বাবাজান কিয়ামতে
তাদেরকে শাফায়েত করে জান্নাতে নিয়ে যাবে। অথচ এই পীরই কিয়ামতে দৌঁড়ের উপর থাকবে, আপনাকে
উদ্ধার করবে কিভাবে?
২০২০ সালের আগস্ট মাসে নিম্ন বই দুইটি লিখে
অনলাইনে প্রকাশ করেছি। সেই থেকে বই দুইটির হাজার হাজার ভিউয়ার দেখা যাচ্ছে। বই দুইটি
হচ্ছে, (ক) পিরতন্ত্র বা সুফিবাদ বনাম ইসলাম-(শয়তানের ওহী কার উপর নাযিল হয়?) ও (খ)
পির-অলিদের ভ্রান্ত আক্বিদাহসমূহ। বই দুইটির লিংক নিচে দেয়া আছে।
এরপর পীর নিয়ে আর কোনো বই লেখা হয়নি। কিন্তু
ফেসবুকে বেশ কিছু দরবারী গ্রুপ এর সাথে এ্যাড হওয়ায় দেখা যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মুসলমান
ঈমান হারা হয়ে শয়তানের পথে দৌঁড়াচ্ছে। এরপর “পীরের আস্তানা শয়তানের কারখানা” নামক বইটি
লিখতে আগ্রহী হই। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৩২। হয়তো এতোগুলো পৃষ্ঠা পড়ার সময় নেই। তবু
আমি অনুরোধ করছি প্রথমত শিরোনামগুলো দেখে নিবেন তাতেই অনেকটা আইডিয়া আসবে। নিজেদের
ঈমান আমল ঠিক রাখতে চাইলে বইটি সকল মুসলিমের জন্য পড়া আবশ্যক। নিজেরা পড়ুন ও শেয়ার
করে অন্যদের পড়ার সুযোগ করে দিয়ে অশেষ সওয়াব হাসিল করুন।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ
সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে
না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু
গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
পীর কাকে বলে? ইসলামে পীরের বিধান কী?
পীর শব্দটি ফারসী শব্দ। এর অর্থ বয়োজ্যেষ্ঠ। ব্যবহারিকভাবে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ উভয়কেই পীর বলা হয়। মূলত সূফীবাদী বা তাসাওউফপন্থীদের গুরুকে ‘পীর’ নামে অভিহিত করা হয় (পীরবাদের বেড়াজালে ইসলাম, পৃ. ৩৬)। তৃতীয় শতাব্দী হিজরীতে গ্রীক, পারসিক ও হিন্দু সভ্যতার সংমিশ্রণে পীর-মুরীদী প্রথার উৎপত্তি হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা একসময় তাদের ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা প্রদানকারী ব্যক্তিকে ‘পীর’ নামে অভিহিত করতো। যা এখনো বহু জায়গায় প্রচলিত আছে।
১৯৮১ সালের সরকারী হিসাব মতে এদেশে প্রায় দুই
লক্ষ আটানববই হাজার ‘পীর’ রয়েছে। যারা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে ‘অসীলা’ হিসাবে পূজিত
হচ্ছে। তারা নিজেদের তৈরি বিভিন্ন জঘন্য বুলি, নিয়ম-নীতি ও নোংরা দর্শনের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে
যেমন ধোঁকা দিচ্ছে, তেমনি ভ্রান্তিতে নিপতিত করে পকেট ছাপ করছে। জীবিত হৌক বা মৃত হৌক
তাদের সন্তুষ্টির উপরে মুরীদের ইহকালীন মঙ্গল ও পরকালীন মুক্তি নির্ভর করে বলে ব্যাপকভাবে
ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এদের মতে পীরকে কামনা করা আল্লাহকে কামনা করার শামিল (নাঊযুবিল্লাহ)।
অথচ ইসলামী শরী‘আতে পীর ধরা বা মুরীদ হওয়া
সম্পূর্ণ নাজায়েয কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবায়ে
কেরাম, তাবেঈ এমনকি তাবে-তাবেঈনের যুগে পীর-মুরীদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো পীরের অনুসরণ করার নির্দেশ দেননি। বরং মহান আল্লাহ তার ‘অসীলা’
তথা নৈকট্য অন্বেষণ করতে বলেছেন। (সুরা আল-মায়েদাহ, ৫/৩৫)।
এর অর্থ ‘পীর’ বা কোনো মাধ্যম ধরা নয়। বরং
এর অর্থ ‘তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে’ তাঁর নৈকট্য সন্ধান করা। (তাফসীরে ইবনে কাছীর, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্র.)।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি রসূল এ উদ্দেশেই প্রেরণ
করেছি, যেনো আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আনুগত্য করা হয়’। (সুরা
আন-নিসা ৪/৬৪)।
অপর আয়াতে তিনি বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা
আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের নেতার আনুগত্য করো’। (সুরা
আন-নিসা, ৪/৫৯)।
যিনি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা
করেন।
হাদিসঃ
উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোনো বিকলাঙ্গ কুৎসিত গোলামকেও
তোমাদের শাসক (নেতা) নিযুক্ত করা হয়। আর সে আল্লাহ তা’আলার কিতাব অনুযায়ী তোমাদেরকে
পরিচালিত করে, তাহলে অবশ্যই তোমরা তার কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)৩০২৯,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১২৯৮, সহীহ আল জামি ১৪১১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩০০৪, ইসলামীক সেন্টার
৩০০১)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
পীরও ধরতে বলেননি। বরং তিনি বলেন, “তোমরা আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে
শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো”।
হাদিসঃ
ইরবায ইবনু সারিয়াহ্] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সালাত আদায় করালেন। অতঃপর
আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে গেলেন। আমাদের উদ্দেশে এমন মর্মস্পর্শী নাসীহাত করলেন যাতে
আমাদের চোখ গড়িয়ে পানি বইতে লাগল। অন্তরে ভয় সৃষ্টি হলো মনে হচ্ছিল বুঝি উপদেশ দানকারীর
যেন জীবনের এটাই শেষ উপদেশ। এক ব্যক্তি আবেদন করলো, হে আল্লাহর রসূল! আমাদেরকে আরো
কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ
তা’আলাকে ভয় করার, (ইমাম বা নেতার) আদেশ শোনার ও (তাঁর) অনুগত থাকতে উপদেশ দিচ্ছি,
যদিও সে হাবশী (কৃষ্ণাঙ্গ) গোলাম হয়। আমার পরে তোমাদের যে ব্যক্তি বেঁচে থাকবে সে অনেক
মতভেদ দেখবে। এমতাবস্থায় তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নাতকে ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ি
রাশিদীনের সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধরা এবং এ পথ ও পন্থার উপর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে।
সাবধান! দীনের ভেতরে নতুন নতুন কথার (বিদ্’আত) উদ্ভব ঘটানো হতে বেঁচে থাকবে। কেননা
প্রত্যেকটা নতুন কথাই [বা কাজ শারী’আতে আবিষ্কার করা যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এবং সাহাবীগণ করেননি তা] বিদ্’আত এবং প্রত্যেকটা বিদ্’আতই ভ্রষ্টতা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৫, আহমাদ ১৬৬৯৪, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৭,
সুনান আততিরমিযী ২৬৭৬, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতএব, পরকালে জান্নাত পিয়াসী প্রত্যেক মুসলিম
সঠিক দ্বীন পাওয়ার জন্য পীর না ধরে বরং আল্লাহ, তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে জীবন চলার একমাত্র
পথপ্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
সুফি/সাধক কাকে বলে?
সুফি বা সাধক হলেন মূলত আধ্যাত্মিক সাধনায়
নিমগ্ন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি জাগতিক ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে স্রষ্টার (আল্লাহর) প্রতি
গভীর প্রেম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরমাত্মার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। ইসলামের মরমীবাদী
বা আধ্যাত্মিক দর্শন, যা ‘সুফিবাদ’ (তাসাউফ) নামে পরিচিত, তার অনুসারীদেরই সুফি বলা
হয়।
সুফীদের রয়েছে বিভিন্ন তরীকা। স্থান ও কাল
অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরীকা আত্ম প্রকাশ করার কারণে এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সুফী তরীকা আত্মপ্রকাশ করেছে। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি
তরীকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই সুফী তরীকার পীর ও মুরীদদের মুখে এ সমস্ত তরীকার
নাম উচ্চারণ করতে শুনা যায়। এ সমস্ত তরীকা হচ্ছেঃ
(১) কাদেরীয়া তরীকাঃ
আব্দুল কাদের জিলানীকে (মৃত ৫৬১ হিঃ) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুফীরা দাবী করে
থাকেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও তার জীবনী অধ্যায়ন করলে জানা যায় যে, তিনি কোনো
তরীকা প্রতিষ্ঠা করে যান নি। তার নামে যে সমস্ত কারামত বর্ণনা করা হয় তা সম্পূর্ণ বানোয়াট
ও ভিত্তিহীন।
(২) নকশবন্দীয়া তরীকাঃ
মুহাম্মাদ বাহাউদ্দ্বীন নকশবন্দীকে (মৃত ৭৯১ হিঃ) এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ
করা হয়।
(৩) চিশতিয়া তরীকাঃ
খাজা মঈন উদ্দ্বীন চিশতীকে (মৃত ৬২০ হিঃ) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভারতের আজমীরে তার মাজার রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সকলেই এ মাজার যিরারত করে থাকে।
(৪) মুজাদ্দেদীয়া তরীকাঃ
মুজাদ্দেদ আলফে ছানীকে (মৃত ১০৩৪ হিঃ) এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবী করা হয়।
(৫) সোহরাওয়ার্দী তরীকাঃ
শিহাব উদ্দ্বীন উমার সোহরাওয়ার্দীর (মৃত ৬৩২ হিঃ) নামে এই তরীকাটির নিসবত করা হয়। এই
পাঁচটি তরীকার নামই আমাদের দেশের সুফীদের মুখে ব্যাপকভাবে উচ্চারণ করতে শুনা যায়।
সুফীবাদের স্তর পরিক্রমাঃ
(ক) শরীয়তঃ
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যাবতীয় বিধানকে শরীয়ত বলা হয়। সর্বপ্রথম শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী
হতে হয়। শরীয়তের যাবতীয় বিধানের মধ্য দিয়ে সুফী তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে প্রতিটি
অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর অনুগত করেন। শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত কেউ সুফী হতে পারবে
না। সুফীরা এ কথাটি জোর দিয়ে বললেও তাদের আচার-আচরণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ অনেক
সুফীকেই দেখা যায় তারা মারেফতের দোহাই দিয়ে শরীয়তের বিধান মানতে আদৌ প্রস্ত্তত নন।
(খ) তরীকতঃ
সুফীদের পরিভাষায় তরীকত হচ্ছে; শরীয়তের যাবতীয় বিধান অনুশীলনের পর তাকে আধ্যাত্মিক
গুরুর শরণাপন্ন হতে হবে। এ পর্যায়ে তাকে বিনা প্রশ্নে গুরুর আনুগত্য করতে হবে।
(গ) মারেফতঃ
সুফীদের পরিভাষায় মারেফত হচ্ছে, এমন এক স্তর যার মধ্যে বান্দাহ উপনীত হলে সৃষ্টি রহস্য
সম্পর্কে অবগত হতে পারে। এ স্তরে পৌঁছতে পারলে তার অন্তর আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তখন
তিনি সকল বস্ত্তর আসল তত্ত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেন। মানব জীবন ও সৃষ্টি জীবনের গুপ্ত
রহস্য তার নিকট স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।
(ঘ) হাকিকতঃ
সুফীদের ধারণায় তাদের কেউ এ স্তরে পৌঁছতে পারলে আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রেমের স্বাদ
ও পরমাত্মার সাথে তার যোগাযোগ হয়। এটা হচ্ছে সুফী সাধনার চুড়ান্ত স্তর। এ স্তরে উন্নীত
হলে সুফী ধ্যানের মাধ্যমে নিজস্ব অস্তিত্ব আল্লাহর নিকট বিলীন করে দেন।
উপরোক্ত নিয়মে ভক্তদের নামকরণ করা ও স্তরভেদ
করা একটি বানোয়াট পদ্ধতি। ইসলামের প্রথম যুগে এগুলোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পরবর্তীতে
সুফীরা এগুলো নিজের খেয়াল খুশী মত তৈরী করেছে।
সুফীদের বিরাট একটি অংশ নবী-রাসূল এবং জীবিত
ও মৃত অলী-আওলীয়াদের কাছে দুআ করে থাকে। তারা বলে থাকেঃ ইয়া জিলানী, ইয়া রিফাঈ, ইয়া
রাসূলুল্লাহ ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁকে ছাড়া অন্যেকে আহবান করতে নিষেধ করেছেন।
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দুআ করবে, সে মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ
তাআলা বলেনঃ
‘‘তুমি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্ত্তকে ডাকবে না
যে তোমার উপকার কিংবা ক্ষতি কোনটিই করতে পারে না। যদি তুমি তাই কর তবে তুমি নিশ্চিত
ভাবেই জালেমদের মধ্যে গন্য হবে। (সূরা ইউনুসঃ ১০৬)।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ
‘‘এবং ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর কে বেশী পথভ্রষ্ট
যে আল্লাহ ব্যতীত এমন ব্যক্তিদেরকে আহবান করে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে
না এবং তারা তাদের ঐ আহবান থেকে সম্পূর্ণ বেখবর রয়েছে? (সূরা
আহকাফঃ ৫)।
গাউছ, কুতুব, আবদাল ও নুজাবায় বিশ্বাসঃ
সুফীরা বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীতে কতিপয় আবদাল,
কুতুব এবং আওলীয়া আছেন, যাদের হাতে আল্লাহ তাআলা পৃথিবী পরিচালনার কিছু কিছু দায়িত্ব
সোপর্দ করে দিয়েছেন। সুতরাং তারা তাদের ইচ্ছামত পৃথিবীর কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকেন।
তাবলীগি নেসাব ফাযায়েলে আমাল বইয়ে এই ধরণের
একটি ঘটনা উল্লেখ আছে। ঘটনার বিবরণ এই যে, হজরত শাইখুল বলেছেনঃ আমি আমার আব্বাজানের
নিকট প্রায়ই একটা ঘটনা শুনতাম। উহা এই যে, জনৈক ব্যক্তি বিশেষ কোন প্রয়োজনে পানি পথে
যাইতেছিল। পথিমধ্যে যমুনা নদী পড়িল, তাহার অবস্থা তখন এত ভয়ঙ্কর ছিল যে, নৌকা চলাও
মুশকিল ছিল, লোকটি পেরেশান হইয়া গেল। লোকজন তাহাকে বলিল অমুক জঙ্গলে একজন কামেল লোক
থাকেন, তাহার নিকট গিয়া স্বীয় প্রয়োজন পেশ কর। তিনি নিশ্চয়ই কোন ব্যবস্থা করিবেন। তবে
তিনি প্রথমে রাগ করিবেন। তাহাতে তুমি নিরাশ হইও না। লোকটি তাহাদের কথায় জঙ্গলের মধ্যে
গিয়া দেখিলেন সেই দরবেশ তাহার বিবি বাচ্চাসহ একটি ঝুপড়ির মধ্যে বাস করিতেছে। সেই ব্যক্তি
স্বীয় প্রয়োজন ও যমুনার অবস্থা বর্ণনা করিল, দরবেশ প্রথমে অভ্যাস মোতাবেক রাগ করিয়া
বলিল, আমার হাতে কি আছে? আমি কি করিতে পারি? লোকটি কান্নাকাটি করিয়া আপন সমস্যার কথা
বলিল, তখন দরবেশ বলিলঃ যাও, যমুনার কাছে গিয়া বলঃ আমাকে ঐ ব্যক্তি পাঠাইয়াছে, যে জীবনে
কখনও কিছু খায় নাই এবং বিবির সহিত সহবাস করে নাই.......শেষ পর্যন্ত। লোকটি যমুনায় গিয়া
দরবেশের কথা জানাইল। যমুনা তাহার কথা মত শান্ত হইয়া গেল। সেই লোকটি পার হইয়া যাওয়ার
পর যমুনা আবার ভীষণ আকার ধারণ করিল। (দেখুনঃ ফাযায়েলে আমাল, দ্বিতীয় খন্ড, ১৬২ পৃষ্ঠা)।
প্রিয় পাঠক বৃন্দ লক্ষ্য করুন, এটি এমন একটি
বিশ্বাস যা মক্কার মুশরিকরাও পোষণ করতো না। তারা যখন সাগর পথে ভ্রমণ করার সময় বিপদে
আক্রান্ত হত, তখন তারা সকল দেব-দেবীর কথা ভুলে গিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য এক মাত্র
আল্লাহকেই ডাকতো। আল্লাহ তাআলা মক্কার মুশরিকদের সেই কথা কুরআনে উল্লেখ করে বলেনঃ
‘‘তারা যখন জলযানে আরোহণ করে তখন একনিষ্ঠভাবে
আল্লাহ্কে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা শরীক করতে
থাকে।’’ (সূরা আনকাবুতঃ ৬৫)।
অথচ বর্তমান সময়ের অসংখ্য মুসলিমকে দেখা যায়
তারা চরম বিপদের সময়ও আল্লাহকে বাদ দিয়ে কল্পিত অলী-আওলীয়াদেরকে আহবান করে থাকে, যা
মক্কার মুশরিকদের শির্ককেও হার মানিয়েছে। কেননা মক্কার লোকেরা শুধু সুখের সময়ই আল্লাহর
সাথে অন্যকে শরীক করতো, কিন্তু বিপদের সময় তারা সেগুলোকে ভুলে গিয়ে এক মাত্র আল্লাহকেই
ডাকতো। আর বর্তমান সময়ের অনেক মুসলিম উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর সাথে শির্ক করছে। এদিক
থেকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় বর্তমানের মাজার পূজারী মুসলিমের শির্কের চেয়ে মক্কার
আবু জাহেল ও আবু লাহাবদের শির্ক অধিক হালকা ছিল। মোটকথা মক্কার মুশরিকদের তাওহীদে রুবুবীয়া
সম্পর্কে যে অগাধ বিশ্বাস ছিল তা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
হে নবী! আপনি জিজ্ঞেস করুন, তোমাদেরকে আসমান
থেকে ও যমীন থেকে কে রুযী দান করেন? কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে
জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে
করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো, তারপরেও
ভয় করছ না? (সূরা ইউনুসঃ ৩১)।
তিনি আরও বলেনঃ ‘‘তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত
সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন। (সূরা সাজদাঃ ৫)।
এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, غوث অর্থ হচ্ছে ত্রাণকর্তা।
এটি আল্লাহর গুণ। কোন মানুষ গাউছ হতে পারে না। ঢাকা শহরের মহাখালীতে মাসজিদে গাউছুল
আযম নামে বিশাল একটি মসজিদ রয়েছে। আমরা সকলেই জানি এখানে গাউছুল আযম দ্বারা বড়পীর আব্দুল
কাদের জিলানীকে বুঝানো হয়েছে। আল-গাউছুল আল-আযাম অর্থ হচ্ছে মহান ত্রাণকর্তা। যারা
আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)কে মহা ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে আমাদের
প্রশ্ন হলো, তারা কি এ ধরণের কথার মাধ্যমে আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)কে আল্লাহর সমান
করে দেন নি? শুধু তাই নয় সুফীদের একটি দল বিশ্বাস করে যে, আব্দুল কাদের জিলানী নিজ
হাতে লাওহে মাহফুযে নতুন করে বৃদ্ধি করতে বা তা থেকে কিছু কমানোরও অধিকার রাখেন। (নাউযুবিল্লাহ)।
সুফী তরীকার মাশায়েখগণ বিপদ হতে
উদ্ধার করতে পারেনঃ
সুফীরা বিশ্বাস করেন যে, তাদের মাশায়েখ ও অলীগণ
বিপদ হতে উদ্ধার করতে সক্ষম। তাই বিপদে তারা তাদের অলীদেরকে আহবান করে থাকে। তারা বলে
থাকে মদদ ইয়া আব্দুল কাদের জিলানী, হে উমুক, হে উমুক ইত্যাদি। এভাবে বিপদাপদে পড়ে আল্লাহ
ছাড়া অন্যকে আহবান করা প্রকাশ্য শির্কের অন্তর্ভূক্ত আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
‘‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তবে
তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারী কেউ নাই। পক্ষান্তরে যদি তোমার মঙ্গল করেন, তবে তিনি সবকিছুর
ওপর ক্ষমতাবান’’। (সূরা আনআমঃ ১৭)।
আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেনঃ
“আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের
এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ্ চান। আর আমি যদি গায়বের কথা জেনে নিতে
পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত
না। আমি তো শুধু একজন ভীতিপ্রদর্শক ও সুসংবাদাতা ঈমানদারদের জন্য”। (সূরা আ’রাফঃ ১৮৮)।
এবাদতের সময় সুফীদের অন্তরের অবস্থাঃ
সুফীরা দ্বীনের সর্বোচ্চ স্তর তথা ইহসানের
ক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ মাশায়েখদের দিকে মনোনিবেশ করে থাকে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
“ইহসান হলো, এমনভাবে তুমি আল্লাহ পাকের ইবাদত
করবে যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছ। যদি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করবে যে, তিনি তোমাকে
অবশ্যই দেখছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬৯৫, সুনান আননাসায়ী ৪৯৯০, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫১, আহমাদ ৩৬৭, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ১ম খণ্ড, ১; বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ১ম খণ্ড, ১)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
ব্যাপারে বাড়াবাড়িঃ
সুফীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে
নূরের তৈরী মনে করে। তারা নিম্নের বানোয়াট হাদীছটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।
অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি
করেছেন। বিভিন্ন শব্দে একই অর্থে সুফীদের কিতাবে সনদবিহীন ভাবে এই বানোয়াট হাদীছটি
উল্লেখিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো আমাদের দেশের অধিকাংশ সুন্নী মুসলমানও এই আকীদাই
পোষণ করে থাকে। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীছের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী ছিলেন না এবং তিনি সর্বপ্রথম সৃষ্টিও ছিলেন না। সহীহ
হাদীছ থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যে জিনিষটি
সৃষ্টি করেছেন, তা হচ্ছে কলম। তারপর কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত যা হবে তা লিখতে বললেন”।
(সিলসিলায়ে সাহীহা, হাদীছ নং- ১৩৩)।
তিনি আরও বলেনঃ
“আল্লাহ্ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে
বললেনঃ লিখ। কলম বললঃ হে আমার প্রতিপালক! কী লিখব? আল্লাহ্ বললেনঃ কিয়ামত পর্যন্ত আগমণকারী
প্রতিটি বস্তুর তাকদীর লিখ’’।
আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরীও ছিলেন না এবং তিনি প্রথম সৃষ্টিও নন। তিনি মাটির তৈরী মানুষ
ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
“হে নবী! আপনি বলুন যে, আমি তোমাদের মতই একজন
মানুষ”। (সূরা কাহাফঃ ১১০)।
এ ছাড়া কুরআনের আরও অনেক আয়াত দ্বারা প্রমাণিত
যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী আদমেরই একজন ছিলেন। সুতরাং সমস্ত বনী
আদম যেহেতু মাটির তৈরী, তাই তিনিও একজন মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন। কেবল ফেরেশতাকেই আল্লাহ
নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারীতে আয়েশা (রাঃ) এর হাদীছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে। জিনদেরকে
সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়া বিহীন অগ্নি থেকে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্ত্ত থেকে
যার বিবরণ তোমাদের কাছে পেশ করা হয়েছে।
সুতরাং তিনি মাটির তৈরী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্
তাকে নবুওয়ত ও রেসালাতের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে
সুফীরা আরও বিশ্বাস করে যে, তিনি হচ্ছেন সৃষ্টি জগতের কুববা তথা গম্বুজ। তিনি আরশে
সমুন্নত। সাত আসমান, সাত যমীন আরশ-কুরসী, লাওহে মাহফুয, কলম এবং সমগ্র সৃষ্টিজগত মুহাম্মাদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথার সত্যতা যাচাই
করতে বুসেরীর কাসীদাতুল বুরদার একটি লাইন দেখুনঃ
হে নবী! আপনার দয়া থেকেই দুনিয়া ও আখেরাত সৃষ্টি
হয়েছে। আর আপনার জ্ঞান থেকেই লাওহে মাহফুয ও কলমের জ্ঞান উদ্ভাসিত হয়েছে। সুফীদের কতিপয়
লোকের বিশ্বাস যে, তিনি হচ্ছেন সর্বপ্রথম সৃষ্টি। এটিই প্রখ্যাত সুফী সাধক ইবনে আরাবী
ও তার অনুসারীদের আকীদা। কতিপয় সুফীবাদের মাশায়েখ এ মতকে সমর্থন করেন না; বরং তারা
এ কথাগুলোর প্রতিবাদ করেন এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মানুষ মনে
করেন ও তাঁর রেসালাতের স্বীকৃতি প্রদান করেন। তবে তারা রাসূলের কাছে শাফাআত প্রার্থনা
করেন, আল্লাহর কাছে তাঁর উসীলা দিয়ে দুআ করেন এবং বিপদে পড়ে রাসূলের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা
করে থাকেন। আসুন দেখি বুসেরী তার কবিতায় কি বলেছেনঃ
“হে সৃষ্টির সেরা সম্মানিত! আমার জন্য কে আছে
আপনি ব্যতীত, যার কাছে আমি কঠিন বালা মসীবতে আশ্রয় প্রার্থনা করবো?” (নাউযুবিল্লাহে)।
সুফীবাদের সমর্থক ভাইদের কাছে প্রশ্ন হলো বুসেরীর
কবিতার উক্ত লাইন দু’টির মধ্যে যদি শির্ক না থাকে, তাহলে আপনারাই বলুন শির্ক কাকে বলে?
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাসে শির্ক মিশ্রিত
এ জাতীয় কবিতা পাঠ্য করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এগুলো পাঠ করে ইসলামী শিক্ষার
নামে শির্ক ও বিদআতী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষকগণ যদি শির্ক
মিশ্রিত সিলেবাসনির্ধারণ করে তা দিয়ে আমাদের জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন, তাহলে
আমরা তাওহীদের সঠিক শিক্ষা পাবো কোথায়?
সুফীদের যিকির ও অযীফাঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন
মুসলিম ঘুম থেকে উঠে, ঘুমানোর সময়, ঘরে প্রবেশ কিংবা ঘর হতে বের হওয়ার সময় থেকে শুরু
করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে সকল যিকির-আযকার পাঠ করতে হবে, তার সবকিছুই শিক্ষা
দিয়েছেন। কিন্তু সমস্ত সুফী তরীকার লোকেরা এ সমস্ত যিকির বাদ দিয়ে বিভিন্ন ধরণের বানোয়াট
যিকির তৈরী করে নিয়েছে। নকশবন্দী তরীকার লোকেরা যিকরে মুফরাদ তথা শুধু الله (আল্লাহ) الله (আল্লাহ) বলে যিকির করে।
শাযেলী তরীকার لاإلهإلاالله
এবং অন্যান্য তরীকার লোকে শুধু هوهو
হু হু বলে যিকির করে থাকে। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ এভাবে আওয়াজ করে বা আওয়াজবিহীন
একক শব্দ দ্বারা যিকির করার কোন দলীল নেই; বরং এগুলো মানুষকে বিদআত ও গোমরাহীর দিকে
নিয়ে যায়। (মাজমুআয়ে ফতোয়াঃ পৃষ্ঠা নং- ২২৯)।
আমাদের দেশের বিভিন্ন পীরদের মুরীদদেরকে যিক্রে
জলী ও যিক্রে খফী নামে বিভিন্ন ধরণের বিদআতী যিকির করতে দেখা যায়, যেগুলোর কোনো শরঈ
ভিত্তি নেই।
চুলে ও দাড়িতে জট বাঁধাঃ
সুফীবাদের নামে কতিপয় লোকের মাথায় ও দাড়িতে
ঝট বাঁধতে দেখা যায়, কারও শরীরে লোহার
শিকল, কাউকে উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় দেখা
যায়। এটি সাহাবী, তাবেয়ী বা তাদের পরবর্তী যুগের কোন আলেম বা সাধারণ সৎ লোকের নিদর্শন
ছিল না। এমন কি আব্দুল কাদের জিলানী, শাইখ আহমাদ রেফায়ী এবং সুফীরা যাদেরকে সুফীবাদের
প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করেন তাদের কেউ এ ধরণের লেবাস গ্রহণ করেননি।
গান-বাজনার মাধ্যমে জিকির করাঃ
সুফীবাদের দাবীদার কিছু লোক গান, বাজনা ও নৃত্যের
মাধ্যমে যিকির করে থাকে। অথচ ইসলাম এগুলোকে সুস্পষ্টভাবে হারাম বলে ঘোষণা করেছে। নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের
ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে
এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন
এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। (সুনান ইবনে
মাজাহ ৪০২০, সুনান আবূ দাউদ ৩৬৮৮, আহমাদ ২২৩৯৩, মিশকাত ৪২৯২, রাওদুন নাদীর ৪৫২, সহীহাহ
১/১৩৮-১৩৯, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯০৯১, সুনান
নাসায়ী ৫৬৫৮, সহীহুল জামি‘ ৮০৯১, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৩৭৮, মুসনাদে আহমাদ
১৮০৯৮, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৪৩৯০, দারিমী ২১০০, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১১০৬৫,
আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৭৮৪৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সুফীদের যাহেরী ও বাতেনীঃ
সুফীরা দ্বীনকে যাহেরী ও বাতেনী এই দু’টি স্তরে
ভাগ করে থাকে। শরীয়তকে তারা যাহেরী স্তর হিসেবে বিশ্বাস করে, যা সকলের জন্য মান্য করা
জরুরী। বাতেনী স্তর পর্যন্ত শুধু নির্বাচিত ব্যক্তিরাই পৌঁছতে পারে। ইসলামী শরীয়তে
যাহেরী ও বাতেনী বলতে কিছু নেই। কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে যা আছে, তাই ইসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের
নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাঁকে বলা হল,
হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি
প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন (একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দিন)। তিনি বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ভীতি
অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো (নেতৃ-আদেশ), যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে
অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত
খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে।
অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। (সুনান ইবনু মাজাহ (তাওহীদ পাবঃ) ৪২, সুনান আততিরমিযী ২৬৭৬, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৭, হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৪৮৬, আহমাদ ১৬৬৯২, দারিমী ৯৫, ইরওয়াহ ২৪৫৫, মিশকাত
১৬৫, ফিলাল ২৪-২৬, সালাতুত তারাবীহ ৮৮-৮৯, মাজমুওয়ায়ে ফাতাওয়া ১০/৩৫৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih।
ইলমে লাদুন্নী নামে কল্পিত এক বিশ্বাসঃ
সুফীরা বেশী বেশী ইলমে লাদুন্নীর কথা বলে থাকে।
ইলমে লাদুন্নী বলতে তারা বুঝাতে চায় যে, এটি এমন একটি ইলম যা আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষভাবে
সুফীরা পেয়ে থাকে। সাধনা ও চেষ্টার মাধ্যমে এটি অর্জন করা যায় না। তাদের কল্পিত কথা
হচ্ছে অলী-আওলীয়ারা আল্লাহর পক্ষ হতে ইলমে লাদুন্নী অর্জন করে থাকে।
তাদের বানোয়াট কথার মধ্যে এটিও একটি বানোয়াট
ও কল্পিত কথা এবং আল্লাহর নামে চরম মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। এই উম্মতের প্রথম কাতারের
সৎ লোক তথা সাহাবীদের মাঝে এ ধরণের কথা শুনা যায় নি। তারা ঈমান, আমল ও তাকওয়ায় এত বেশী
অগ্রগামী ছিলেন যে, আল্লাহ্ তাআলা তাদের প্রশংসায় কুরআনে একাধিক আয়াত নাযিল করেছেন
এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অনেককেই জান্নাতী বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
কারামাতে আওলীয়ার ক্ষেত্রে সুফীদের
বাড়াবাড়িঃ
কারামতে আওলীয়ার ব্যাপারে আহ্লুস্ সুন্নাতের
বিশ্বাস হচ্ছে আউলীয়াদের কারামত এবং আল্লাহ তা’আলা তাদের হাতে অলৌকিক ও সাধারণ অভ্যাসের
বিপরীত যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করে থাকেন আমরা তাতে বিশ্বাস করি। তবে অলী হওয়ার জন্য
কারামত প্রকাশিত হওয়া জরুরী নয়। আওলীয়াদের কারামত সত্য। আল্লাহ তাআলা তাদের হাতে অলৌকিক
ও সাধারণ নিয়মের বিপরীত এমন ঘটনা প্রকাশ করে থাকেন যাতে তাদের কোন হাত নেই। তবে কারামত
চ্যালেঞ্জ আকারে প্রকাশিত হয় না; বরং আল্লাহই তাদের হাতে কারামত প্রকাশ করেন। এমনকি
অলীগণ তা জানতেও পারেন না। পূর্ববর্তী যুগের অনেক সৎ লোক, সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তী
যুগের অনেক সৎ লোকের হাতে আল্লাহ্ কারামত প্রকাশ করেছেন। যেমন মারইয়াম (আঃ), আসহাবে
কাহাফ, জুরাইজ, আব্বাদ বিন বিশর, উমার বিন খাত্তাব, উসায়েদ ইবনে হুযায়ের এমনি আরও অনেক
সাহাবীর হাতে আল্লাহ তাআলা কারামত প্রকাশ করেছেন। যারা কুরআন ও হাদীছের অনুসরণ করেন,
তাদের হাতেই কারামত প্রকাশ হতে পারে। যে ব্যক্তি কুরআন ও হাদীছের অনুসরণ করে না, তার
হাতে যদি সাধারণ অভ্যাসের বিপরীতে কোন কিছু বের হয়, যেমন আগুনে প্রবেশ করা, শুণ্যে
উড়াল দেয়া, সাগরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে যে এগুলো ধান্দাবাজি,
শয়তানি ও ভন্ডামী। তা কখনও কারামত হতে পারে না। কারামত ও ভন্ডামীর মধ্যে পার্থক্য করার
জন্য কুরআন ও হাদীছ হচ্ছে একমাত্র মাপকাঠি।
সুফীরা তাদের জীবিত ও মৃত কল্পিত পীর ও অলীদের
মর্যাদা বাড়ানোর জন্য তাদের কারামত বর্ণনায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি
করে থাকে। এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, যে সমস্ত কাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ
করার ক্ষমতা রাখে না কিংবা যেগুলো আল্লাহর সিফাত, তা কখনও অলীদের কারামত হতে পারে না।
যেমন মৃতকে জীবিত করা, অলীদের আদেশে নদ-নদী ও আসমান-যমিনের কাজ পরিচালিত হওয়া ইলমে
গায়েবের দাবী করা ইত্যাদি। আমরা সুফীদের ধারণায় অলীদের কয়েকটি বানোয়াট কারামতের উদাহরণের
মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কার করার চেষ্টা করবো।
আসলে ইসলামে পীর বা সুফী সাধক বলতে কিছু নেই।
ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান বা তার প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কারো নিকট বায়াত নেয়া বা অন্য কারো
নিকট মুরিদ হওয়া ইসলামে নিষেধ। দ্বিতীয় কোনো প্রতিনিধি বা এরকম ভন্ড কথিত পীরের উত্থান
হলে ইসলামে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার হুকুম দিয়েছে।
আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন দু’ খলীফার বায়’আত করা হয়, তখন তাদের দ্বিতীয়জনকে
হত্যা করে ফেলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৭৬, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৪৬৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫৩, সহীহাহ্ ৩০৮৯, সহীহ আল জামি ৪২১,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৬, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sah।
’আরফাজাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ নিঃসন্দেহে শীঘ্রই কলহ-বিবাদ ও বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হবে। সুতরাং উম্মাতের
মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত থাকার পরও যে ব্যক্তি বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তাকে তরবারির আঘাতে
হত্যা করে ফেলো, সে যে কেউ হোক না কেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৩৬৭৭, ৩৬৭৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৫২,
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৭৬২, নাসায়ী ৪০২২, আহমাদ ১৮২৯৫, ইরওয়া ২৪৫২, সহীহ আল জামি
২৩৯৩, ৫৯৪৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih।
আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি খলীফার (ইমামের)
বায়’আত করল, স্বীয় হাতে হাত দিয়ে আনুগত্যের অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো এবং অন্তর দিয়ে সে বায়’আতের
প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করল। সে যেন পরিপূর্ণরূপে তার আনুগত্য করে। তথাপিও যদি কেউ
এসে (খিলাফাতের দাবি করে) প্রথম ইমামের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে তোমরা তার গর্দান
ভেঙ্গে দাও। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৭৯, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৪৬৭০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৪৪, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪২৪৮,
নাসায়ী ৪১৯১, আহমাদ ৬৫০৩, সহীহাহ্ ১৪১, সহীহ আল জামি‘ ২৪০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬২৪,
ইসলামিক সেন্টার ৪৬২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
এ হাদিসগুলো প্রত্যেকটি রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে
বাইআত করা সংক্রান্ত; এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
বিভিন্ন দলের হাতে বাইআত করা সম্পর্কে এক প্রশ্নের
জবাবে শাইখ সালেহ আল-ফাওযান বলেন: বাইআত শুধুমাত্র মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে করতে
হবে। এ ছাড়া যতো বাইআত আছে এগুলো বিদআত। এ বাইআতগুলো অনৈক্যের কারণ। একই দেশের একই
রাজ্যের মুসলমানদের উপর আবশ্যকীয় হলো একজন রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে বাইআত করা। একাধিক
বাইআত করা নাজায়েয। (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালেহ আল-ফাওযান ১/৩৬৭)।
অথচ বাংলাদেশে হাজার হাজার বায়াত গ্রহনকারী
ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র ভন্ড পীর বা সুফী সাধকের উত্থান হয়েছে।
পীরের দরবারগুলো শিরক, কুফর আর বিদায়াতে ভরপুর।
এসব জায়গায় গিয়ে মানত করা, পীরের নিকট বায়াত নেয়া বা মুরিদ হওয়া, তাকে সিজদা করা, পীর
ওলির নিকট সাহায্য চাওয়া, কিয়ামতে শাফায়েত করে জান্নাতে নিয়ে যাবে এই বিশ্বাস রাখা
এগুলো স্পষ্ট শিরক। যারা এসব করে তারা শয়তানের খপ্পরে পড়ে ঈমান হারা হয়ে যায় মানে হয়ে
গেছে।
৪০ বছর ধরে গোসল করে না, মাথায় চুলের জট, শরীরের
দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যায় না, নামাজ নেই, রোজা নেই এমন একটি উজবুক টাইপের লোককে আল্লাহ
কোন দুঃখে অলি বানাবে? অথচ আমাদের দেশের মূর্খ লোকগুলো এই লোকটির পা ধোয়া পানি পান
করে, তার পূজা করে। অধিকাংশ দরবারগুলোতে দেখা যায় বাদ্যযন্ত্র সহ নারী পুরুষের সম্মিলিত
গানের আসর বসাতে। আর লোকজনকে আকৃষ্ট করার এই গানই একটা উত্তম পন্থা।
কোথাকার কোন লোক ইরাক, ইরান দেশ থেকে বাংলাদেশে
এলো আর বলল সে নাকি আওলাদে রাসূল। আরে ভাই নবীর বংশের লোক হলে তিনি তো দরবার খুলে পীর
ব্যবসা করবে না, গানবাজনা করবে না, তিনি নিজেও বলবে না যে তিনি আল্লাহর অলি। কারণ কে
আল্লাহর অলি, কে মুত্তাকি সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই বলেছেন,
"তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন কে তাঁর পথে চলে (কে মুত্তাকি, কে অলি)"। (সূরা আন-নজম, আয়াত ৩২)।
পীর-অলির দরবার থেকে সবচেয়ে বেশী যে আশ্বাস
দেয়া হয় তাহলো, তোমরা আমার কাছে সাহায্য চাও আমি তোমাদেরকে সাহায্য করবো। এই বাক্যটি
বলা মানেই আল্লাহর সমকক্ষ হওয়া।
মুরিদরা পীর-অলির এই আশ্বাস পেয়ে আল্লাহর নিকট
সাহায্য না চেয়ে তারা এই পীর-অলিদের নিকট সাহায্য চায়। আসলে সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ।
আমরা কার নিকট সাহায্য চাইবো তা আল্লাহ তাঁয়ালা আমাদেরকে শিখে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন, "আমরা আপনারই ইবাদাত
করি এবং আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি’’। (সুরা ফাতি’হা
: ৫)।
আল্লাহ তাঁয়ালা আরও বলেন, “ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে
ও গোপনে তোমাদের প্রভুকে ডাক।” (সূরা আল আন’আমঃ আয়াত-৫৫)।
আমরা যখন কোনো বিপদ আপদ, বালা মুসিবত, দুঃখ
দুর্দশা, হতাশা, দুশ্চিন্তা, অভাব অনটনে পড়বো তখন আল্লাহর নিকট কীভাবে সাহায্য চাইবো
তা আল্লাহ তাঁয়ালা আমাদেরকে বলে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন, "তোমরা ধৈর্য্য
ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, আর তা আল্লাহভীরু ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য সকলের
কাছে নিশ্চিতভাবে কঠিন"। (সূরা আল বাকারাহ ৪৫)।
রাসূল সা. বলেন,
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সওয়ারীর পিছনে বসছিলাম। তখন তিনি আমাকে উদ্দেশ্য
করে বললেন, হে ছেলে! আল্লাহর বিধানসমূহ যথাযথভাবে মেনে চল আল্লাহ তোমাকে হিফাযতে রাখবেন।
আল্লাহর অধিকার আদায় কর, তবে তুমি আল্লাহকে তোমার সম্মুখে পাবে। আর যখন তুমি কারো
কাছে কিছু চাওয়ার ইচ্ছা করবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে এবং যখন কারো সাহায্য চাইতে
হয় তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে। জেনে রাখ, যদি সমস্ত সৃষ্টিজীব একত্র হয়ে তোমার
কোন কল্যাণ করতে চায় তবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত তোমার কোন কল্যাণ করতে
পারবে না। পক্ষান্তরে যদি সমস্ত সৃষ্টিজীব সমবেতভাবে তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তবে
তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (তোমাদের ভাগ্যের
সব কিছু লেখার পর) কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং খাতাসমূহ শুকিয়ে গেছে। (মিসকাতুল মিসকাত ৫৩০২, সুনান আত তিরমিযী ২৫১৬, মুসনাদে আহমাদ ২৬৬৯,
সহীহুল জামি ৭৯৫৭, আবূ ইয়া'লা ২৫৫৬, শুআবূল ঈমান ১৯৫, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী
১১২৫৩, আল মু'জামুল আওসাত্ব ৫৪১৭, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৬৩০৪)। হাদিসের মান সহিহ।
অতএব যেকোনো সমস্যায় পড়লে আল্লাহ ছাড়া কোনো
পীর-অলি, সুফী সাধক এর নিকট সাহায্য চাওয়া শিরক।
ইসলামের সঠিক পথ বা 'সিরাতাল মুস্তাকিম' হলো
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যে ব্যক্তি
ইসলাম ছাড়া অন্য পথে চলবে, সে সঠিক পথ হারা হয়ে যাবে এবং বিপদগামী হবে।
আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশে)
একটি (সরল) রেখা টানলেন এবং বললেন, এটা আল্লাহর পথ। এরপর তিনি এ রেখার ডানে ও বামে
আরো কয়েকটি রেখা টানলেন এবং বললেন, এগুলোও পথ। এসব প্রত্যেক পথের উপর শায়ত্বন (শয়তান)
দাঁড়িয়ে থাকে। এরা (মানুষকে) তাদের পথের দিকে আহবান করে। অতঃপর তিনি তাঁর কথার প্রমাণ
স্বরূপ কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেনঃ
‘‘এটিই আমার সঠিক পথ। সুতরাং তোমরা এই সঠিক
পথের অনুসরণ কর। অন্যান্য পথের অনুসরণ করনা। তাহলে সে সব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর সঠিক
পথ হতে বিপদগামী করে দিবে’’। (সূরা আনআমঃ ১৫৩)। (মিসকাতুল
মাশাবিহ ১৬৬, আহমাদ ৪১৩১, নাসায়ী তাঁর ‘কুবরা’ গ্রন্থে ১১১৭৪, দারিমী ২০২)। হাদিসের
মান সহিহ।
আল্লাহ তাঁয়ালা আরও বলেন,
"যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন
(পথ, মত, আইন, পীর, আওলিয়া) অবলম্বন করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না।
আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।
বাংলাদেশে যতগুলো ভন্ড পীরের দরবার আছে তার
মধ্যে চরমোনাই অন্যতম। এছাড়া দেওয়ানবাগি, মাইজভান্ডারী, কালান্দার বাবা ডাঃ আল জাহাঙ্গীর
দরবারসহ আরও হাজার হাজার দরবার ও মাজার রয়েছে। এদের দরবারে যাওয়া ও এদের আকিদাহ সম্পন্ন
বইগুলো পড়া মানেই সে মুশরেকে পরিণত হওয়া। তার ঈমান থাকবে না। খাঁটি তওবা ছাড়া তার ঈমান
ফিরে আসবে না। এদের আধ্যাত্বিক কোনো কেরামতি নেই। শুধু মিথ্যে গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলে
এদেশের সহজ সরল মুসলিমদের বিপথগামী করছে। আবার একদল গোপাল ভাঁড় আলেম আছে যারা এদের
গুনগান গেয়ে দুই পয়সা ইনকাম করছে। অনেকে বলে, অমুক দরবার বা মাজারে মানত করে তার এই
আশা পূরণ হয়েছে। আরে ভাই হিন্দুসহ অন্যান্য জাতীরাও তাদের দেবদেবীর নিকট মানত করে এবং
তাদেরও মনের আশা পূরণ হয়। একটা কলা গাছকে পীর বা দেবতা বানিয়ে প্রতিদিন তার পূজা করলে
এখানেও মনের আশা আল্লাহ পূরণ করে দিবেন। অতএব সবই ভণ্ডামি।
আল্লাহর অলী কারা?
অলি (বহুবচনে আউলিয়া) একটি আরবি শব্দ, যার
সাধারণ অর্থ হলো বন্ধু, অভিভাবক, কিংবা সাহায্যকারী।
ইসলামি পরিভাষায়, 'আল্লাহর অলি' (আউলিয়া
আল্লাহ) বলতে সেইসব পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার ও পুণ্যবান বান্দাদের বোঝায়, যারা একনিষ্ঠভাবে
আল্লাহর বিধান মেনে চলেন, ইসলামের মৌলিক নির্দেশনাবলি অনুসরণ করেন এবং যাবতীয় গুনাহ
ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকেন। সকল অলিগণ শিরক, কুফর, নিফাক ও বিদআত মুক্ত থাকবেন
এবং কোনো ব্যক্তি নিজেকে দাবী করবে না যে, তিনি অলি। (সুরা
নাজম, আয়াত ৩২)।
নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহর অলীর সংজ্ঞা ও পরিচয়
তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
“মনে রেখো যে, আল্লাহর অলীদের কোনো ভয় নেই।
আর তারা বিষন্নও হবে না। তারা হচ্ছে সেই সমস্ত লোক যারা ঈমান এনেছে এবং পরহেজগারিতা
(তাকওয়া) অবলম্বন করে থাকে। তাদের জন্যে সুসংবাদ রয়েছে পার্থিব জীবনে এবং পরকালেও’’।
(সূরা ইউনূসঃ ৬২-৬৪)।
ঈমান অর্থ তাওহীদ ও রিসালাতের প্রতি বিশুদ্ধ,
শিরক ও কুফর মুক্ত বিশ্বাস। “তাকওয়া” শব্দের অর্থ আত্মরক্ষা করা। যে কর্ম বা চিন্তা
করলে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেই কর্ম বা চিন্তা বর্জনের নাম তাকওয়া। মূলত সকল হারাম,
নিষিদ্ধ ও পাপ বর্জনকে তাকওয়া বলা হয়।
এখানে আমরা দেখছি যে, দুটি গুণের মধ্যে ওলীর
পরিচয় সীমাবদ্ধ। ঈমান ও তাকওয়া। এই দু’টি গুণ যার মধ্যে যত বেশি ও যত পরিপূর্ণ হবে
তিনি বেলায়াতের পথে তত বেশি অগ্রসর ও আল্লাহর তত বেশি ওলী বা প্রিয় বলে বিবেচিত হবেন।
এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রত্যেক মুসলিমই
আল্লাহর ওলী। ইমান ও তাকওয়ার গুণ যার মধ্যে যতো বেশি থাকবে তিনি ততো বেশি ওলী। প্রসিদ্ধ
হানাফী ফকীহ ইমাম আবু জা’ফর তাহাবী (৩২১হি) ইমাম আবু হানীফা, মুহাম্মাদ, আবু ইউসূফ
(রহঃ) ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা বা বিশ্বাস বর্ণনা করে বলেনঃ
“সকল মুমিন করুণাময় আল্লাহর ওলী। তাঁদের মধ্য
থেকে যে যত বেশি আল্লাহর অনুগত ও কুরআনের অনুসরণকারী সে ততবেশি আল্লাহর নিকট সম্মানিত
(ততবেশি বেলায়াতের অধিকারী)। (ইমাম তাহাবী, আল আকীদাহ (শারহ
সহ), পৃঃ ৩৫৭–৩৬২)।
আল্লাহ্ তাআ’লা আরও বলেনঃ
“আল্লাহই হচ্ছেন ঈমানদারদের অলী (বন্ধু)। তিনি
তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান। আর যারা কাফের তাদের বন্ধু হচ্ছে তাগুত
(শয়তান) তারা তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়”। (সূরা
বাকারাঃ ২৫৭)।
আল্লাহ্ তাআ’লা আরও বলেনঃ
“আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণই হচ্ছেন তোমাদের
অলী (বন্ধু)। যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং রুকু করে। আর যে আল্লাহ্ তাঁর রাসূল
এবং মুমিনদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে, (তারাই আল্লাহর দলভুক্ত) নিশ্চয়ই আল্লাহর দল
বিজয়ী’’। (সূরা মায়িদাঃ ৫৫-৫৬)।
এই আয়াতে আল্লাহর অলীর সংজ্ঞা ও পরিচয় তুলে
ধরা হয়েছে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পুরোপুরি অনুসারীর হাতে যদি আল্লাহ কারামাত বা অলৌকিক
কিছু বের করেন তবে তিনি আল্লাহর অলী হিসেবে গণ্য হবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেনঃ
‘‘অমুকের পিতার সন্তানেরা আমার বন্ধু নয়। মুত্তাকীরাই
কেবল আমার বন্ধু’’।
হাদিসঃ
আমর ইবনু ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে উচ্চস্বরে বলতে শুনেছি, আস্তে নয়। তিনি
বলেছেনঃ অমুকের বংশ আমার বন্ধু নয়। ’আমর বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবনু জা’ফরের কিতাবে বংশের
পরে জায়গা খালি রয়েছে। (কোন বংশের নাম নাই)। বরং আমার বন্ধু আল্লাহ ও নেককার মু’মিনগণ।
’আনবাসা অন্য সূত্রে ’আমর ইবনু ’আস (রাঃ) থেকে
বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমি শুনেছিঃ বরং তাদের সাথে
(আমার) আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, আমি সুসম্পর্কের রস দিয়ে তা প্রাণবন্ত রাখি। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৫৯৯০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২১৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১৯, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৫৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৫১, আল
জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ-হাদীস নং: ৫৫৬৪, আন্তর্জাতিক নং: ৫৯৯০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
হাসান (রাঃ) বলেনঃ একদল লোক আল্লাহর ভালবাসা
প্রকাশ করলে আল্লাহ্ তাদেরকে এই আয়াত দ্বারা পরীক্ষা করলেন।
“হে নবী! আপনি বলে দিনঃ তোমরা যদি আল্লাহকে
ভালবেসে থাক, তাহলে আমার অনুসরণ কর। তবেই আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন”। (সূরা আল-ইমরানঃ ৩১)।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেনঃ যখন তুমি দেখবে কোনো
লোক পানির উপর দিয়ে হাঁটছে অথবা শূণ্যে উড়ছে তখন তুমি তাকে অলী হিসেবে বিশ্বাস করো
না কিংবা তার দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। যতক্ষণ না তোমরা জেনে নিবে সে রাসূলের অনুসরণ
করে কি না। ইমাম শাফেয়ীর কথাটি ভন্ড অলী ও সঠিক অলী চেনার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাপকাঠি।
(বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল আদাব)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ বলেন, যে ব্যক্তি আমার
কোন ওলীর সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা যে সমস্ত
ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ঐ ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক
প্রিয় আর কোন ইবাদত নেই যা আমি তার উপর ফরয করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার
নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে,
আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর
আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে
যদি আমার কাছে কোন কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে
আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে
কোন দ্বিধা করি-না, যতটা দ্বিধা করি মু’মিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ
করে আর আমি তাকে কষ্ট দেওয়াকে অপছন্দ করি। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবঃ) ৬৫০২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬০৫২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬০৫৮)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আল্লাহর অলি হওয়ার
জন্যে যেসব শর্ত প্রযোজ্য তাহলোঃ
(১) ঈমানদার হতে হবে।
(২) পরহেজগার হতে হবে।
(৩) সালাত কায়েম করতে হবে।
(৪) যাকাত প্রদান করতে হবে।
(৫)
রুকু করতে হবে।
(৬) আল্লাহ্ তাঁর রাসূল এবং মুমিনদেরকে বন্ধু
হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
(৭) মুত্তাকী হতে হবে।
(৮) রাসুল সাঃ এর প্রতি আনুগত্যশীল হতে হবে
বা রাসুল সাঃ এর অনুসারী হতে হবে।
(৯) সকল ফরজ কাজ পালন করতে হবে।
(১০) সকল নফল ইবাদত পালন করতে হবে।
(১১) সকল প্রকার বিদআত, শিরক ও কুফরীমূলক কাজ
থেকে বিরত থাকতে হবে।
(১২) কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আমল ব্যতীত নিজেদের
বানানো আমল জারি করা যাবে না।
(১৩) কারো সিজদাহ গ্রহণ করা যাবে না, মানত
নেয়া যাবে না, গান-বাজনা করতে দেয়া যাবে না, নারী-পুরুষের সংমিশ্রণ করতে দেয়া যাবে
না, কোনো ওরস করতে দেয়া যাবে না, মিলাদ কিয়াম করা যাবে না তথা রাসুল সা., সাহাবীগণ,
তাবেঈগণ, তাবে-তাবেঈগণ যা করেনি সেসব কাজ থেকে যারা বিরত থাকবে তারাই আল্লাহর অলী।
এছাড়া বাকি সবগুলোই ভন্ড ও শয়তানের অনুসারী।
প্রিয় পাঠকঃ এই সব গুণাবলী বা শর্তাবলী বর্তমান
পির-অলি বা সুফি-সাধকও তাদের মুরিদ কিংবা আশেকে রাসুলদের মধ্যে কি আছে?
একটা কথা মনে রাখবেন, পীর বা সুফি-সাধক বলতে
ইসলামে কিছু নেই। যারা পীর বা সুফি-সাধক সেজে মাজার বা দরবার খুলে বসে আছে তারা মূলত
শয়তানের উত্তরসূরী। এরা শিরক, কুফর ও বিদআতে মশগুল থাকে। এরা যেমন নিজেরা জাহান্নামের
রাস্তায় হাঁটছে তেমনি অন্যদেরকেও সেই পথে টানছে। তবে ইসলামে আল্লাহর অলি আছে। যাদের
মধ্যে ঈমান ও তাকওয়া আছে তারা সকলেই আল্লাহর অলি। কিন্তু বাংলাদেশসহ আরও কিছু রাষ্ট্রে
দেখা যায়. এলাকা ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট অলি, যারা দরবার খুলে দিব্যি ধর্ম ব্যবসা চালিয়ে
যাচ্ছে। এদের মধ্যে একটা নীতি হলো অলি বা পীরের ছেলে অলি বা পীর হবে। কিন্তু ইসলাম
এসব সমর্থন করে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কেউ নিজেকে অলি দাবী করতে পারবে না, নিজেকে
সাহার্যকারী বলতে পারবে না, নিজেকে শাফায়েতকারী বলতে পারবে না। (সুরা নাজম, আয়াত ৩২)।
মুরশিদ কাকে বলে?
‘মুরশিদ’ শব্দের অর্থ পথ প্রদর্শনকারী। সূরা
কাহফের ১৭ নং আয়াতে মুরশিদ বলতে আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ মানুষের পথ প্রদর্শনকারী।
তিনি যাকে পথ দেখান সেই কেবল পথ প্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে
কেউ পথ প্রদর্শন করতে পারে না।
বাংলাদেশের পীর-ফকীর বা সুফী সাধকগণ নিজেদেরকে
মুরশিদ বলে দাবী করে থাকে। আসলে একসময় এইসব ভন্ড পীর ফকিরগণ কুরআন হাদিসের অপব্যাখ্যা
করে সাধারণ লোকজনকে যা বুঝাতো লোকজন তাই বুঝতো। বর্তমানে কুরআন হাদিস নিয়ে অধিক রিসার্চ
করার কারণে সঠিক বিষয়গুলো লোকজন বুঝতে সক্ষম হচ্ছে। আসলে কোনো পীর ফকির বা সুফী সাধক
কেউ মুরশিদ নয়। কারণ আল্লাহ তাঁয়ালা তাদেরকেও যদি সঠিক পথ না দেখান তাহলে তারাও সঠিক
পথ পাবে না। অর্থাৎ সকল মানুষের মুরশিদ আল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে বলেন,
"আপনি যাকে পছন্দ করেন তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না; বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে
সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন"। (সূরা ক্বাছাছ ৫৬)।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘‘আমি যদি ইচ্ছা করতাম
তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই সৎপথে আনয়ন করতাম’’। (সূরা সাজদাহ: ১৩)।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা
পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হেদায়াত দান করেন’’। (সূরা মুদ্দাছ্ছির:
৩১)।
আল্লাহর পক্ষ হতে হেদায়াতের অর্থ যদি কেবল
রাস্তা বর্ণনা করাই হতো, তাহলে ইচ্ছার সাথে শর্তযুক্ত করা হতো না। কেননা তিনি সকল সৃষ্টির
জন্যই সঠিক পথ বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘‘আমার রবের মেহেরবাণী
না হলে আমিও আটক ব্যক্তিদের মধ্যে শামিল হতাম’’। (সূরা সাফফাত:
৫৭)।
আল্লাহ তা‘আলা সূরা আন‘আমের ৩৯ নং আয়াতে বলেন,
“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন আবার যাকে
চান সত্য সরল পথে পরিচালিত করেন’’।
সুতরাং বুঝা গেল, আল্লাহ তা‘আলা যে বান্দাদের
শুধু হেদায়াতের পথ বর্ণনা করেন, তাই নয়; বরং তিনি হেদায়াতের তাওফীকও দান করেন।
রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হেদায়াতের
মালিক নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তা হচ্ছে হেদায়াতের তাওফীক দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত
অন্য কেউ এ প্রকার হেদায়াতের মালিক নয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ
ঈমান আনতে পারে না”। (সূরা ইউনূস: ১০০)।
অতএব পীর ফকির, সুফী সাধক, অলি আউলিয়া কেউ
মুরশিদ নয়।
রাসূল সা. কি মুরশিদ ছিলেন?
আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং রাসুল (সা.)-কে মুরশিদ
বা পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই আপনি সরল পথ প্রদর্শন
করেন"। (সূরা শুরা, আয়াত ৫২)।
এখানে রাসূল সা. কে মুরশিদ বলার কারণ হলো তিনি
শুধুমাত্র পথ দেখাতেন কিন্তু হেদায়েতের মালিক আল্লাহ তাঁয়ালা।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,
"আর আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্যই
সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না"। (সূরা সাবা ২৮ )।
আলোচ্য আয়াতে রেসালাতের বিষয় বর্ণিত হয়েছে
এবং বিশেষভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, আমাদের রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বিশ্বের সমগ্র জাতিসমূহের প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। (তাবারী, ইবন কাসীর)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে
কেবল তার নিজের দেশ বা যুগের জন্য নয় বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্ৰ মানব জাতির জন্য পাঠানো
হয়েছে, একথা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছেঃ “আর আমার প্রতি এ কুরআন অহীর
সাহায্যে পাঠানো হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে এবং যার কাছে এ বাণী পৌঁছে যায়
তাকেই সতর্ক করে দেই।” (সূরা আল আন’আম: ১৯৭)।
“হে নবী! বলে দিন, হে মানবজাতি, আমি হচ্ছি
তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল।” (সূরা আল-আরাফ: ১৫৮)।
“আর হে নবী! আমি পাঠিয়েছি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিকুলের
জন্যই রহমত হিসেবে।” (সূরা আল আম্বিয়া: ১০৭)।
“বড়ই বরকতসম্পন্ন তিনি যিনি তাঁর বান্দার
ওপর ফুরকান নাযিল করেছেন যাতে তিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য সতর্ককারীতে পরিণত হন।”
(সূরা আল-ফুরকান: ১)।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই
এই একই বক্তব্য বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্নভাবে পেশ করেছেন। যেমন, “আমাকে সাদা কালো সবার
কাছে পাঠানো হয়েছে।” (মুসনাদে আহমাদ: ৩/৩০৪, ৪/৪১৬)।
“আমাকে ব্যাপকভাবে সমস্ত মানুষের কাছে পাঠানো
হয়েছে অথচ আমার আগে যে নবীই অতিক্রান্ত হয়েছেন তাঁকে নির্দিষ্ট জাতির কাছে পাঠানো
হতো।” (মুসনাদে আহমাদ: ২/২২২)।
“প্ৰথমে প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে তার জাতির
কাছে পাঠানো হতো আর আমাকে সমগ্ৰ মানব জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে। (সহিহ বুখারী: ৩৩৫, সহিহ মুসলিম: ৫২১)।
“আমার আগমন ও কিয়ামতের অবস্থান এরূপ, একথা
বলতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের দু'টি আঙুল উঠান।” (সহিহ বুখারী: ৪৯৩৬, সহিহ মুসলিম: ৮৬৭)।
অন্যান্য নবী রাসূলগণকেও সতর্ককারী হিসেবে
প্রেরণ করা হয়েছে । আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,
"আর মূসাকে যখন আমরা ডেকেছিলাম তখনও আপনি
তুর পর্বতের পাশে উপস্থিত ছিলেন না। বস্তুত এটা আপনার রব-এর কাছ থেকে দয়াস্বরূপ, যাতে
আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারেন, যাদের কাছে আপনার আগে কোন সতর্ককারী আসেনি,
যেন তারা উপদেশ গ্ৰহণ করে"। (সূরা কাসাস ৪৬)।
অতএব নবী রাসূলগন ছিলেন শুধু মাত্র ভালো মন্দ
পথের দিশারী বা সতর্ককারী কিন্তু হেদায়েতকারী নয়। হেদায়াতের মালিক শুধু আল্লাহ তাঁয়ালা।
সকল পীর অলিরাই দাবী করে তারা আওলাদে রাসুলঃ
আমাদের দেশে যারা নিজেদেরকে পীর অলি দাবী করেন
তারা (যেমন-চরমোনাই, মাইজভান্ডার, দেওয়ানবাগী, আটরশি, চন্দ্রপাড়া, শর্শিনা ইত্যাদি)
সকলেই নিজেদেরকে আওলাদে রাসুল বা আহলে বাইয়েত বলে দাবী করেন।
আমরা জানি যে, ঐতিহাসিক ও নির্ভর যোগ্য বর্ণনা
মতে, ৬১ হিজরির ১০ই মহররম কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সাথে সর্বমোট
৭২ জন বীর সৈনিক শহীদ হয়েছিলেন। এই ৭২ জনের মধ্যে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পরিবারের সদস্য
(আহলে বাইত) ছিলেন ১৮ জন এবং বাকিরা তাঁর অনুগত সাহাবি ও ভক্ত।
উক্ত কারবালার ঘটনার পর আহলে বাইয়েত তো আর
থাকার কথা নয়।
আওলাদে রাসুল কী?
সাধারণত হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা হজরত
ফাতিমা (রা.) এবং তাঁর স্বামী হজরত আলী (রা.)-এর বংশধরদের 'সৈয়দ' বা 'শরীফ' বলা হয়।
এই বংশধারাকে আক্ষরিক অর্থে আওলাদে রাসুল বলা যায়।
সকল পীর কি আওলাদে রাসুল?
না, সকল পীর বংশগতভাবে রাসুল (সা.)-এর বংশধর
বা আওলাদ নন। অনেকে রাসুল সা. এর চাচার বংশের দিক থেকে বংশ ধারা বর্ণনা দিয়ে দাবী করে
তারা আওলাদে রাসুল। আসলে এসবই হচ্ছে বানোয়াট মিথ্যে তথ্য। এখন ইরাক-ইরান দেশ থেকে চামড়া
ফর্সা কোনো এদেশে এলেই তিনি হয়ে গেছেন আওলাদে রাসুল আর বিশ্ব অলি। তার মাজারকে কেন্দ্র
করে পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে বিশাল এক আস্তানা। সেই চামড়া ফর্সাওয়ালা লোকটি যদি এদেশে বিয়ে করে থাকে তাহলে সেই বংশ হয়ে গেলো ৩১ নং বংশ
থেকে ৪১/৪২তম আওলাদে রাসুল। আমাদের দেশের লোকেরা এতোই অজ্ঞ যে, তারা এসব হিসাব নিকাশ
বুঝতে চায় না।
পীর অলিরা কি মুত্তাকী?
আমাদের দেশের কথিত পীর, অলি, সুফি সাধকগণ নিজেদেরকে
এমনভাবে উপস্থাপিত করেন যেনো তারা সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলেন, যেকোনো সমস্যা সমাধান
করতে পারেন, তারা আল্লাহর খাঁটি বন্ধু ইত্যাদি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে নবী! তুমি যে-অবস্থায়ই থাক এবং কুরআনের
যে-অংশই তিলাওয়াত কর এবং (হে মানুষ!) তোমরা যে-কাজই কর, তোমরা যখন তাতে লিপ্ত থাক,
তখন আমি তোমাদের দেখতে থাকি। তোমার প্রতিপালকের কাছে অণু-পরিমাণ জিনিসও গোপন থাকে না
না পৃথিবীতে, না আকাশে এবং তার চেয়ে ছোট এবং তার চেয়ে বড় এমন কিছু নেই, যা এক স্পষ্ট
কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই।
স্মরণ রেখ, যারা আল্লাহর বন্ধু তাদের কোনো
ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা সেইসব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া
অবলম্বন করেছে। তাদের দুনিয়ার জীবনেও সুসংবাদ আছে এবং আখেরাতেও। আল্লাহর কথায় কোনো
পরিবর্তন হয় না। এটাই মহাসাফল্য। (হে নবী!) তাদের কথা যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়। নিশ্চয়ই
সমস্ত শক্তিই আল্লাহর। তিনি সব কথার শ্রোতা সব কিছুর জ্ঞাতা।
স্মরণ রেখ, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যত প্রাণী
আছে, সব আল্লাহরই মালিকানাধীন। যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকে, তারা আল্লাহর (প্রকৃত)
কোনো শরীকের অনুসরণ করে না। তারা কেবল ধারণারই অনুসরণ করে। আর তাদের কাজ কেবল আনুমান-নির্ভর
কথা বলা”। (সূরা ইউনুস ৬১-৬৬)।
এখানে পীর বা অলি হওয়ার জন্য দুইটি প্রধান
শর্ত হচ্ছে যার মধ্যে ঈমান ও তাকওয়া থাকবে তারাই হবে আল্লাহর অলি।
এখন কথা হলো, আমাদের দেশের দাবীকৃত পীর-অলিগণ
প্রকৃত ঈমানদার ও মুত্তাকী কিনা? তা যাচাই করা দরকার।
ঈমানঃ
ইসলামি পরিভাষায় ঈমান অর্থ হলো বিশ্বাস, স্বীকৃতি
এবং তদনুযায়ী আমল করা। সংক্ষেপে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে আনীত যাবতীয়
বিষয় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং সে অনুযায়ী বাস্তবে মেনে চলার
নামই হলো ঈমান।
ইসলামি পরিভাষায় যিনি আল্লাহর একত্ববাদ, রাসুলগণের
নবুয়ত এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো অন্তরে বিশ্বাস করেন, মুখে স্বীকার করেন এবং সেই
অনুযায়ী আমল করেন, তাকে ঈমানদার বা মুমিন বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারাই প্রকৃত মুমিন যারা
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পরে আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না”। (সুরা হুজুরাত ৪৯/১৫)।
মহান
আল্লাহ বলেন,
“তোমরা বল, আমরা ঈমান রাখি আল্লাহর প্রতি এবং
যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব এবং তাদের বংশধরের
প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং মূসা ও ঈসা-কে যা প্রাদান করা হয়েছিল এবং অন্যান্য নবীগণকে
তাদের প্রভু হ’তে যা দেয়া হয়েছিল। আমরা তাদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা
তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী”। (সুরা বাক্বারাহ ২/১৩৬)।
ঈমানের মূল ভিত্তি হলো ছয়টিঃ
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস: তাঁর একত্ববাদ ও গুণাবলিতে
পূর্ণ আস্থা রাখা।
ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস: সৃষ্টিকুলের প্রতি
তাদের দায়িত্ব ও অস্তিত্ব মেনে নেওয়া।
আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস: আল্লাহর
পক্ষ থেকে প্রেরিত সকল ঐশী গ্রন্থে বিশ্বাস করা।
নবী-রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস: আদম (আ.) থেকে
শুরু করে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবী-রাসুলকে সত্য বলে জানা।
পরকালের প্রতি বিশ্বাস: মৃত্যুর পরের জীবন,
হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের ওপর আস্থা রাখা।
তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস: ভালো-মন্দ সব কিছুই
আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত-এই সত্যটি মেনে নেওয়া।
ঈমানদারের সাধারণ বৈশিষ্ট্যঃ
(ক) অন্তরে কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই আল্লাহ
ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ মেনে চলা।
(খ) নিয়মিত সালাত (নামাজ), সাওম (রোজা), জাকাত
ও হজের মতো ইবাদতগুলো পালন করা।
(গ) সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে
বিরত থাকা।
(ঘ) মানুষের হক বা অধিকার আদায় করা এবং নিজের
সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে অবিচল থাকা।
তাকওয়াঃ
যাঁর মধ্যে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) থাকে, তাঁকে
মুত্তাকি বলা হয়। তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়ে সব ধরণের অন্যায় ও গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত
রাখা এবং তাঁর হুকুম মেনে চলা। ইসলামী চিন্তাবিদ ও হাদিস অনুযায়ী, যাঁদের মধ্যে তাকওয়া
আছে তাঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্য:
তাঁরা সবসময় আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলেন। আল্লাহ
তাঁদের অভিভাবক হোন এবং সর্বদা তাঁদের সাথে থাকেন।
উত্তম চরিত্র:
তাঁরা মিথ্যা, পরনিন্দা ও খারাপ আচরণ থেকে
দূরে থাকেন।
ফরজ পালন ও হারাম বর্জনঃ
তাঁরা সব সময় হালাল-হারামের পার্থক্য বজায়
রাখেন এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করে সৎকর্মশীল জীবনযাপন করেন। তাঁরা নামাজ, রোজা,
হজ্জ, যাকাতসহ সকল ফরজ বিধান মেনে চলেন, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ইবাদত তাঁরা যথাযথভাবে
পালন করেন। সকল প্রকার শিরক, কুফর ও বিদআত থেকে তাঁরা মুক্ত থাকেন।
তাকওয়া-সংক্রান্ত ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে মহান
আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন,
“হে মানব, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী
থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে
পরিচিতি হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেজগার।
নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন”। (সুরা হুজরাত
আয়াত: ১৩)।
তাকওয়া অবলম্বনকারীর ভাগ্যে আল্লাহর নাজাত
মিলে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “(আগেও) যারা ইমান গ্রহণ করেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে
তাদের আমি রক্ষা করেছি (নাজাত দিয়েছি)”। (সুরা হামিম আয়াত
: ১৮)।
তাকওয়া অবলম্বনকারী বান্দার আমল কবুল হয়। আল্লাহ
শুধু মুত্তাকিদের ইবাদত কবুল করেন। (সুরা মায়িদা আয়াত: ২৭)।
মহান
আল্লাহ বলেন,
“যারা সত্যসহ উপস্থিত হয়েছে এবং সত্যকে সত্য
বলে মেনে নিয়েছে তারাই তো মুত্তাক্বী, তারা যা চাইবে সব কিছুই আছে তাদের প্রতিপালকের
নিকট। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান”। (সুরা যুমার ৩৯/৩৩-৩৪)।
আমরা অতি সংক্ষেপে ঈমান ও তাকওয়া সম্পর্কে
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারলাম। উল্লেখিত তথ্য মোতাবেক আমাদের দেশের কথিত পীর-অলিরা
কেহই ঈমানদার বা পরহেজগার বা মুমিন বা মুত্তাকী নয়। কারণ তারা দরবার ও মাজারকে কেন্দ্র
করে যতোসব শিরক, কুফর ও বিদআতী কর্মকান্ড চালু রেখেছে সেসব কর্মকান্ড দেখে শয়তানও লজ্জা
পায় সেখানে তারা কী করে ঈমানদার বা পরহেজগার বা মুমিন বা মুত্তাকী হয়। তারা কেনো ঈমানদার
বা পরহেজগার বা মুমিন বা মুত্তাকী নয় তার বিস্তারিত বর্ণনা নিচে উল্লেখ করা হয়েছে।
হায়াতুন্নবীতে বিশ্বাস করা যাবে কি? অলী-আওলিয়া
কবরে জীবিত থেকে মানুষের উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন এমন বিশ্বাস করা যাবে কি?
উক্ত বিশ্বাস সঠিক নয়। খানকা ও মাজার ব্যবসায়ীরা
উক্ত ভ্রান্ত আক্বীদা সমাজে চালু রেখেছে। তারা কতিপয় হাদীছের অপব্যাখ্যা করে থাকে।
যেমন- রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নবীগণ তাদের কবরে জীবিত
থেকে ছালাত আদায় করছেন’। (মুসনাদে বাযযার, হা/৬৮৮৮; মুসনাদে
আবী ইয়ালা, হা/৩৪২৫; বায়হাক্বী, হায়াতুল আম্বিয়া, পৃ. ৩; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ,
হা/৬২১)।
অন্য হাদীছে বলেন, ‘মি‘রাজের রাত্রে আমি যখন
লাল টিলার নিকট দিয়ে মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি তাঁর কবরে
দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছিলেন’। (ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৭৫, ‘মর্যাদা’
অধ্যায়, ‘মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-৪২)।
রাসুল সা. বলেন, ‘নিশ্চয় মহান আল্লাহ যমীনের
উপর নবীগণের শরীরকে হারাম করে দিয়েছেন’।
মূল হাদিসঃ
আওস ইবনু আওস (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুমু’আর দিন হলো তোমাদের সর্বোত্তম
দিন। এ দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তাঁর রূহ কবয করা হয়েছে। এ দিনে প্রথম
শিঙ্গা ফুঁৎকার হবে। এ দিন দ্বিতীয় শিঙ্গা ফুঁৎকার দেয়া হবে। কাজেই এ দিন তোমরা আমার
উপর বেশী বেশী দরূদ পাঠ করবে। কারণ তোমাদের দরূদ আমার নিকট পেশ করা হবে। সাহাবীগণ আরয
করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের দরূদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে। অথচ আপনার হাড়গুলো
পচে গলে যাবে? বর্ণনাকারী বলেন, أَرَمْتَ
(আরামতা) শব্দ দ্বারা সাহাবীগণ بَلِيْتَ
(বালীতা) অর্থ বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ আপনার পবিত্র দেহ পঁচে গলে মাটিতে মিশে যাবে। তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা’আলা নবী-রসূলদের শরীর মাটির জন্য
হারাম করে দিয়েছেন (অর্থাৎ মাটি তাদের দেহ নষ্ট করতে পারবে না)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৬১, সুনান আবূ দাঊদ ১০৪৭, সুনান আননাসায়ী
১৩৭৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১০৮৫, ১৬৩৬, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৬৯৭, আহমাদ ১৬১৬২, দারিমী ১৬১৩,
ইবনু খুযায়মাহ্ ১৭৩৩, ইবনু হিব্বান ৯১০, মুসতাদরাক লিল হাকিম ১০২৯, দা‘ওয়াতুল কাবীর
৫২৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৯৯৩, ইরওয়া ৪, সহীহ আত্ তারগীব ৬৯৬, ১৬৭৪, সহীহ
আল জামি ২২১২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা জুমু’আর দিন আমার ওপর বেশী
পরিমাণ করে দরূদ পড়ো। কেননা এ দিনটি হাজিরার দিন। এ দিনে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) হাজির
হয়ে থাকেন। যে বক্তি আমার ওপর দরূদ পাঠ করে তার দরূদ আমার কাছে পেশ করা হতে থাকে, যে
পর্যন্ত সে এর থেকে অবসর না হয়। আবুদ্ দারদা বলেন, আমি বললাম, মৃত্যুর পরও কি? তিনি
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা নবীদের শরীর ভক্ষণ করা মাটির
জন্য হারাম করে দিয়েছেন। অতএব নবীরা কবরে জীবিত এবং তাদেরকে রিযক্ব (রিজিক/রিযিক) দেয়া
হয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৩৬৬, সুনান ইবনু মাজাহ্
১৬৩৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৭২)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
মূলত রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) মারা গেছেন এটিই সঠিক আক্বীদা। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম)-কে লক্ষ্য করে বলেন,
‘আপনিও মারা যাবেন এবং তারাও মারা যাবে। অতঃপর
ক্বিয়ামত দিবসে তোমরা পরস্পর তোমাদের প্রতিপালকের সামনে বাক-বিতণ্ডা করবে’। (সূরা আয-যুমার
: ৩০-৩১)।
আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ
গ্রহণ করবে’। (সুরা আলে ইমরান ৩/১৮৫)।
৬৩ বছর বয়সে রাসূল (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করার পর
আবুবকর (রাঃ) বলেছিলেন, ‘যারা মুহাম্মাদ-এর ইবাদত করে তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ
মারা গেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি
অমর’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৩৬৬৮, ১২৪২, আ. প্র. ৩৩৯৫
প্রথমাংশ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪০২ প্রথমাংশ)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে উপরে বর্ণিত হাদীছগুলোও ছহীহ। কিন্তু তা
বারযাখী জীবনের বিষয় অর্থাৎ দুনিয়াবী জীবন ও পরকালীন জীবনের মাঝের জীবন। দুনিয়াবী জীবনের
সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
উল্লেখ্য, কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট
উম্মতের দরূদ ও সালাম পৌঁছানো হয় (নাসাঈ; মিশকাত হা/৯২৪) দ্বারা তাঁর জীবিত থাকার প্রমাণ
পেশ করেন। অথচ এখানে সালাম অর্থ দো‘আ। চাই তা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হৌক বা দূর থেকে হৌক।
দ্বিতীয়তঃ বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বারযাখী জীবনের অন্তর্ভুক্ত। যেখানে মানুষের হায়াত বা
মঊত বলে কিছু নেই। তাই রূহ ফেরত দেওয়ার অর্থ তাঁকে অবহিত করানো এবং তিনি তা বুঝতে পারেন।
আর সেটাই হ’ল তাঁর উত্তর দেওয়া। (মির‘আত হা/৯৩১-এর ব্যাখ্যা,
৪/২৬২-৭৪)।
বারযাখী জীবন দুনিয়াবী জীবনের সাথে তুলনীয়
নয়। অতএব এ হাদীছগুলির মাধ্যমে ‘হায়াতুন্নবী’ প্রমাণের কোন অবকাশ নেই। বরং এটা পরিষ্কারভাবে
শিরকী আক্বীদা। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কবরের নিকটে গিয়ে দরূদ পাঠ করলে তিনি শুনতে
পান মর্মে বায়হাক্বী বর্ণিত হাদীছটি ‘জাল’। (সিলসিলা যঈফাহ
হা/২০৩)।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি শুনাতে পারো না
কোন মৃত ব্যক্তিকে’। (সুরা নামল ২৭/৮০)। আর ‘তুমি
শুনাতে পারো না কোন কবরবাসীকে’। (সুরা ফাত্বির ৩৫/২২)।
কবরবাসী দুনিয়ার মানুষের কথা শুনতে পান না,
উপকার বা ক্ষতিও করতে পারেন না। তাই কুরআন ও ছহীহ হাদীছে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, ঠিক
সেভাবেই বিশ্বাস করতে হবে। কারণ এগুলো গায়েবের বিষয়। যেমন- রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে কবরে ছালাত আদায় করতে দেখলেন কিন্তু একটু
পরে ৬ষ্ঠ আসমানে দেখা হলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৮৬২,
সহিহ বুখারী ৩২০৭, সহিহ মুসলিম ২৬৪-(১৬৪), সুনান আন নাসায়ী ৪৪৮, সহীহুল জামি' ২৮৬৬,
মুসনাদে আহমাদ ১৭৮৬৭, সহীহ ইবনু খুযায়মা ৩০১, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪৮, আস্ সুনানুস্
সুগরা ২২৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এরপর যখন ফিরে আসলেন, তখন বায়তুল মাক্বদেছে
সকল নবী-রাসূল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর ইমামতিতে ছালাত আদায় করলেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭২, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৩২৭, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৩৮)।
সুতরাং এগুলোর কোনো কল্পিত ব্যাখ্যা করা যাবে
না।
দ্বিতীয়তঃ কবরে ছালাত আদায়ের বিষয়টি কেবল নবীদের
সাথেই খাছ। অন্যদের ব্যাপারে নয়। কারণ মৃত্যুর পর কোনো ইবাদত নেই। তাছাড়া কবরস্থানে
ছালাত আদায় করা নিষেধ। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭১২, সহিহ
বুখারী ১৩৯০, মুসলিম ৫২৯, আহমাদ ২৪৫১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অথচ তাঁরা সেখানে ছালাত আদায় করছেন। তাই এগুলো
দুনিয়াবী বিষয়ের সাথে মিলানো যাবে না।
তৃতীয়তঃ সাধারণ মানুষকে কবরে রাখার পর লোকেরা
যখন চলে আসে, তখনও মৃত ব্যক্তি তাদের পায়ের জুতার শব্দ শুনতে পায়।
মূল হাদিসঃ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দাকে যখন কবরে রেখে তার সঙ্গীগণ (আত্মীয়-স্বজন,
পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব) সেখান থেকে চলে আসে, আর তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে
পায়। তার নিকট (কবরে) দু’জন মালাক (ফেরেশতা) পৌঁছেন এবং তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, তুমি
দুনিয়াতে এই ব্যক্তির (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) ব্যাপারে কী জান?
এ প্রশ্নের উত্তরে মু’মিন বান্দা বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসন্দেহে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল। তখন তাকে বলা হয়, ঐ দেখে
নাও, তোমার ঠিকানা জাহান্নাম কিরূপ (জঘন্য) ছিল। তারপর আল্লাহ তা’আলা তোমার সে ঠিকানা
(জাহান্নামকে) জান্নাতের সাথে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তখন সে বান্দা দু’টি ঠিকানা (জান্নাত-জাহান্নাম)
একই সঙ্গে থাকবে। কিন্তু মুনাফিক্ব ও কাফিরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, দুনিয়াতে এ ব্যক্তি
(মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে তুমি কী ধারণা পোষণ করতে? তখন
সে উত্তর দেয়, আমি বলতে পারি না (প্রকৃত সত্য কী ছিল)। মানুষ যা বলতো আমিও তাই বলতাম।
তখন তাঁকে বলা হয়, তুমি বিবেক-বুদ্ধি দিয়েও বুঝতে চেষ্টা করনি এবং (আল্লাহর কুরআন)
পড়েও জানতে চেষ্টা করনি। এ কথা বলে তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে কঠিনভাবে মারতে থাকে, এতে
সে তখন উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে। এ চীৎকারের শব্দ (পৃথিবীর) জিন আর মানুষ ছাড়া নিকটস্থ
সকলেই শুনতে পায়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১২৬, সহিহ বুখারী ১৩৭৪, ১৩৩৮, সহিহ মুসলিম ২৮৭০,
সুনান আননাসায়ী ২০৫১, আহমাদ ১২২৭১, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩১২০, সহীহ আল জামি‘ ১৬৭৫, সহীহ
আত্ তারগীব ৩৫৫৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২৯১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কিন্তু কুরআন-হাদীছ থেকে এর বেশী কিছু জানা
যায় না। তাই যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই বিশ্বাস করতে হবে।
মূলত উক্ত বিষয়গুলো কোনটিই দুনিয়াবী জীবনের
সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। কারণ ছাহাবায়ে কেরাম উক্ত হাদীছগুলো জানা সত্ত্বেও কখনোই রাসূলুল্লাহ
(ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরের কাছে গিয়ে কোনো কিছু চাননি কিংবা তাঁর
কাছে কোনো অভিযোগ করেননি এবং তাঁকে অসীলা মেনে দু‘আও করেননি। বরং দুর্ভিক্ষের কারণে
তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরের কাছে না গিয়ে তাঁর জীবিত
চাচা আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গিয়ে দু‘আ চেয়েছেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ১০১০, ৩৭১০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৯৫০,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৯৫৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কারণ কবরে যাওয়ার পর দুনিয়ার সাথে যেমন কোনো
সম্পর্ক থাকে না, তেমনি কারো কোনো উপকার বা ক্ষতি করারও ক্ষমতা থাকে না।
তাই ‘হায়াতুন্নবী’ কথাটিও সঠিক নয়। বিনা পূঁজির
ব্যবসা করার জন্য পীরপূজারী ও কবরপূজারীরা এই বাক্যটির আমদানি করেছে। এছাড়া শিরকের ব্যবসাকে আরো জোরদার
করার জন্য তথাকথিত পীর-ফকীর ও অলীরাও কবরে জীবিত আছে এবং মানুষের উপকার বা ক্ষতি করতে
পারে বলে প্রচার করে থাকে। এগুলো সব ধর্মের নামে ভণ্ডামি। এ সমস্ত প্রতারণা থেকে আমাদের
সতর্ক থাকতে হবে। যেখানে সাহাবীগণ বিপদ-আপদে পড়ে রাসুল সা. এর কবরের পাশে গিয়ে কিছু
চাইতেন না সেখানে শিরক, কুফর আর বিদআতে নিমজ্জিত মৃত পীর-অলি কীভাবে উপকার করবে বা
তারা কীভাবে কবরে জীবিত থাকে?
মূল কথা হলো, কোনো পীর, অলি, সুফি ও সাধক কবরে
জীবিত থাকেন না, আর একথা বিশ্বাস করা শিরক, তারা কবরে থেকে তাদের মুরিদদের কোনো উপকার
বা ক্ষতি করার কোনো ক্ষমতাও রাখেন না।
রাসুল সা. এর ভালোবাসা পেতে কি পীর অলিদের সান্নিধ্যে থাকা প্রয়োজন?
রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কোনো
নির্দিষ্ট পীর বা আউলিয়ার সান্নিধ্যে থাকা বাধ্যতামূলক বা অপরিহার্য নয়। তবে যারা জ্ঞানী,
কুরআন হাদিসে যারা পারদর্শী, যারা প্রকৃত ঈমানদার, মুত্তাকী ও মুমিন তাদের সান্নিধ্যে
থেকে সুন্নতের অনুসরণ, আত্মশুদ্ধি, ইবাদতে একাগ্রতা অর্জন তথা ইসলামের সঠিক পথে চলার
গাইড লাইন নেয়া যাবে।
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহালের ৪৩ নম্বর আয়াতে
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "ফাসআলূ আহলাজ-যিকরি ইন কুনতুম লা তা'লামূন" (তোমরা
যদি না জানো, তবে যারা জ্ঞান রাখে তাদের কাছ থেকে জেনে নাও)।
কথিত ভন্ড পির অলি, সুফি-সাধকগণ উক্ত আয়াতের
দলিল দিয়ে সাধারণ মুসলিমদের বুঝিয়ে বলেন যে, তারাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী, তাদের
সাথে আল্লাহ-রাসলের কথা-বার্তা হয় তথা তারা দিব্য জ্ঞানের অধিকারী, যেকোনো সমস্যা তারা
সমাধান করতে পারে, এজন্যেই নাকি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘‘সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা
করো, যদি তোমরা না জেনে থাক’’ (সূরা নাহল-৪৩)। তারা বলে, অত্র আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা
নির্দেশ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি জানেন না তিনি যেন তার চেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির (পির-অলী-সুফি-সাধকদের)
কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নেন। আর তারা বলেন যে, আমাদের একথার পেছনে অত্র আয়াতটি দলীল।
আসলে পির-অলি, সুফি-সাধকগণ যারা মাজার খুলে
বসে বা দরবারী ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করছে এরা কেহই ইসলামি বিষয়ে সর্বাধিক
জ্ঞানী ব্যক্তি নন। তারা কোনো দিব্য জ্ঞানের অধিকারী নন, তাদের সাথে আল্লাহ ও রাসুল
সা. এর কোনো কথা-বার্তাও হয় না। তারা যা বলে সবই ভন্ডামী। মূল বিষয়টি হচ্ছে তাদের সাথে
শয়তানের কথা-বার্তা হয় এবং শয়তানের অহি তাদের উপর নাযিল হয়। এজন্যে এসব মুশরেক ও বিদআতীদের
সাথে কোনো সংস্রব বা ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলা যাবে না। আর এদের মাধ্যমে
রাসুল সা. এর ভালোবাসাও অর্জন করা যাবে না। রাসুল সা. এর ভালোবাসা পেতে চাইলে রাসুল
সা. এর আদেশ নিষেধ মেনে চললেই তাঁর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব, কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই।
পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে এমনকি নিজের, নিজ পরিবারের
ও সন্তান-সন্ততির চাইতেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সর্বাধিক ভালবাসা প্রত্যেক মুসলমানের
উপর অবশ্য কর্তব্য। আর রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসার দাবী হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত
সকল বাণী ও বিধানকে মেনে নেওয়া এবং এগুলির কোনো একটিকেও উপেক্ষা না করা। অথচ রাসূল
(ছাঃ)-এর উপর পবিত্র এই ভালবাসার ক্ষেত্রে কতিপয় মুসলমান অতিভক্তির আতিশয্যে বিভিন্ন
রকম শিরক-বিদ‘আতে লিপ্ত হয়ে থাকে। যেমন, দরবার ও মাজারপন্থীরা রাসুল সা. কে অতিরিক্ত
ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত তথা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ইবাদত
ছেড়ে দিয়ে দিন রাত শুধু মিলাদ-কিয়াম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এইসব বিদআতিরা কুরআন-হাদিস থেকে
জেনেছে যে, রাসুল সা.কে ভালোবাসলে সে জান্নাতী। এখন জান্নাতে যাওয়ার আশায় এরা ভন্ড
পীর-অলিদের মাধ্যম বানিয়েছে। এরা দলিল পেশ করে যে,
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের
আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যকার নেতৃবর্গের”। (সুরা নিসা
৪/৫৯)।
এখানে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে নেতৃবর্গ বলতে
কথিত ভন্ড পীর অলি বাবাদের বুঝাবে না। তারা হচ্ছেন ইসলামি দলের শাসকবৃন্দ বা নেতৃবৃন্দ।
অতএব রাসুল সা.কে ভালোবাসতে হলে কোনো মাধ্যম
প্রয়োজন পড়ে না। রাসুল সা. যেসব কাজ করতে আদেশ করেছেন তা যথাযথ পালন করা আর যেসব কাজ
করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে রাসুল সা.কে ভালোবাসা। এজন্যে মিলাদ কিয়াম
আর ভন্ড বাবাদের বানানো দরুদ পাঠ করতে হবে না।
রাসুল সা. এর উপর দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা
হয় নামাজে তাশাহুদ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতো ও দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করে আর হাদিসে বর্ণিত
যেসব দরুদ আছে তা সকাল বিকেল বা নামাজের পর আমল করলে অশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। সেই বলে
ফরজ বিধান বাদ দিয়ে শুধু দরুদ পাঠ বা মিলাদ কিয়াম করে রাসুল সা. এর ভালোবাসা পাওয়া
যাবে না এবং জান্নাতেও যাওয়া যাবে না।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বল, যদি তোমরা আল্লাহকে
ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহ’লে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন ও তোমাদের গোনাহসমূহ
ক্ষমা করে দিবেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’। (সুরা
আলে ইমরান ৩/৩১)।
এখানে অনুসরণ করা মানে রাসুল সা. যেভাবে ফরজ,
ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ইবাদত পালন করতেন আমাদেরকেও সেভাবে পালন করতে হবে। তাঁর আদেশ
নিষেধ মেনে চলতে হবে।
রাসুল সা.কে ভালোবাসার ধরণ হচ্ছে,
ইরবায ইবনু সারিয়াহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সালাত আদায় করালেন। অতঃপর
আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে গেলেন। আমাদের উদ্দেশে এমন মর্মস্পর্শী নাসীহাত করলেন যাতে
আমাদের চোখ গড়িয়ে পানি বইতে লাগল। অন্তরে ভয় সৃষ্টি হলো মনে হচ্ছিল বুঝি উপদেশ দানকারীর
যেন জীবনের এটাই শেষ উপদেশ। এক ব্যক্তি আবেদন করলো, হে আল্লাহর রসূল! আমাদেরকে আরো
কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ
তা’আলাকে ভয় করার, (ইমাম বা নেতার) আদেশ শোনার ও (তাঁর) অনুগত থাকতে উপদেশ দিচ্ছি,
যদিও সে হাবশী (কৃষ্ণাঙ্গ) গোলাম হয়। আমার পরে তোমাদের যে ব্যক্তি বেঁচে থাকবে সে অনেক
মতভেদ দেখবে। এমতাবস্থায় তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নাতকে ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ি
রাশিদীনের সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধরা এবং এ পথ ও পন্থার উপর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে।
সাবধান! দীনের ভেতরে নতুন নতুন কথার (বিদ্’আত) উদ্ভব ঘটানো হতে বেঁচে থাকবে। কেননা
প্রত্যেকটা নতুন কথাই [বা কাজ শারী’আতে আবিষ্কার করা যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এবং সাহাবীগণ করেননি তা] বিদ্’আত এবং প্রত্যেকটা বিদ্’আতই ভ্রষ্টতা। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
১৬৫, আহমাদ ১৬৬৯৪, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৭, সুনান আততিরমিযী ২৬৭৬, সুনান ইবনু মাজাহ্
৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের কসম!
তারা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হ’তে পারে না, যতক্ষণ তারা তাদের মীমাংসার বিষয়ে তোমাকে
ফায়ছালাকারী হিসাবে মেনে না নিবে। অতঃপর তোমার প্রদত্ত সিদ্ধান্তে তাদের অন্তরে কোনরূপ
কুটিলতা রাখবে না এবং সম্পূর্ণরূপে তা মেনে নিবে’। (সুরা
নিসা ৪/৬৫)।
অতএব রাসূল (ছাঃ)-কে দ্বীন ও শরী‘আতের সর্বোচ্চ
ধারক ও বাহক হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং সর্বান্তকরণে রাসূল (ছাঃ)-এর ছহীহ হাদীছ সমূহ
বাস্তব জীবনে মেনে নিতে হবে।
রাসুল সা. কে ভালোবাসার গুরুত্ব ও ফজিলত
নিজের জীবনের চেয়ে বেশী রাসূল (ছাঃ)-কে ভালোবাসা
হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু হিশাম (রাঃ)
হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা একদা নবী (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি যখন উমর ইবনু খাত্তাব
(রাঃ)-এর হাত ধরেছিলেন। উমর (রাঃ) তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমার প্রাণ
ব্যতীত আপনি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। তখন নবী (ছাঃ) বললেন, না। ঐ মহান সত্তার কসম,
যার হাতে আমার প্রাণ! এমন কি তোমার কাছে তোমার প্রাণের চেয়েও আমাকে অধিক প্রিয় হ’তে
হবে। তখন উমর (রাঃ) তাকে বললেন, এখন আল্লাহর কসম! আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়ে
অধিক প্রিয়। নবী (ছাঃ) বললেন, হে উমর! এখন (তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে)। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৬৬৩২, ৩৬৯৪, আধুনিক প্রকাশনী- ৬১৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১৭৮)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সম্পদের চেয়ে বেশী ভালোবাসা
হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হ’তে
বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হ’তে পারবে না,
যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার সন্তান-সন্ততি, পিতামাতা এবং অন্য লোকদের চাইতে
অধিক প্রিয় না হব’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭২, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৪৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৭৪, ইসলামিক সেন্টারঃ ৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশী রাসূল (ছাঃ)-কে ভালোবাসা
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বলে দাও, তোমাদের
নিকট যদি তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, স্বগোত্র ও ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন কর,
ব্যবসা যা তোমরা বন্ধ হবার আশংকা কর এবং বাড়ী-ঘর যা তোমরা পসন্দ কর- আল্লাহ, তাঁর রাসূল
ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা হ’তে অধিক প্রিয় হয়। তাহ’লে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহর নির্দেশ
(আযাব) আসা পর্যন্ত। বস্ত্ততঃ আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’।
(সুরা তাওবাহ ৯/২৪)।
হাফেয ইবনু কাছীর স্বীয় গ্রন্থে বলেন, أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا ‘এবং বাড়ী-ঘর যা
তোমরা পসন্দ কর- আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা হতে অধিক প্রিয় হয়’ অর্থাৎ
তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তোমাদের কিভাবে শাস্তি প্রদান করেন এবং তোমাদের সাথে কিরূপ
আচরণ করেন’। (ইবনু কাছীর ২/৩২৪)।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ ও হাসান (রহঃ)
বলেছেন, حَتَّى
يَأْتِيَ
اللَّهُ
بِأَمْرِهِ
‘তাহ’লে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহর নির্দেশ (আযাব) আসা পর্যন্ত’ অর্থাৎ তাদের শাস্তি
অতি সন্নিকটে’। (তাফসীরে কুরতুবী ৮/৯৫-৯৬ পৃঃ)।
আল্লামা যামাখশারী বলেন, এই আয়াতটি কঠিন শাস্তির
কথা বর্ণনা করে’। (তাফসীরে কাশশাফ ২/১৮১)।
ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, এই আয়াত দ্বারা দলীল
সাব্যস্ত হয় যে, আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাঃ)-কে ভালোবাসা ওয়াজিব। এর ব্যতিরেকে কোন উপায়
নেই। আর যে কোন ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা অগ্রাধিকার পাবে’। (তাফসীরে কুরতুবী ৮/৯৫; আইসারুত তাফাসীর ২/১৭৭)।
রাসূল (ছাঃ)-কে ভালোবাসার ফলাফল
(১) আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমাঃ
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বল, যদি তোমরা আল্লাহকে
ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহ’লে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন ও তোমাদের গোনাহসমূহ
ক্ষমা করে দিবেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’। (সুরা
আলে ইমরান ৩/৩১)।
(২) ঈমানের স্বাদ আস্বাদনঃ
হাদীছে এসেছে, আনাস ইবন মালিক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তিনটি জিনিস এমন যার মধ্যে সেগুলো পাওয়া যাবে,
সে ঈমানের স্বাদ পাবে। ১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছু থেকে প্রিয় হওয়া।
২. কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। ৩. জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে যেভাবে
অপছন্দ করে, তেমনি পুনরায় কুফরির দিকে প্রত্যাবর্তন করাকে অপছন্দ করে’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৬০৪১, ১৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬০৬, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৫৫০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩) পরকালে রাসূলের সঙ্গী হওয়ার
সৌভাগ্যঃ
হাদীছে এসেছে, আবু যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি
একদিন বলেন, হে আললাহর রাসূল (ছাঃ)! এক ব্যক্তি কোন জাতিকে ভালোবাসে, কিন্তু তাদের
অনুরূপ আমল করে না। তখন তিনি বললেন, হে আবু যার! তুমি তাদের সাথী হবে, যাদেরকে তুমি
ভালোবাসো। তখন আবু যার (রাঃ) বলেন, আমি তো আল্লাহ এবং তার রাসূলকে ভালোবাসি। নবী করীম
(ছাঃ) বললেন, তুমি তার সাথী হবে, যাকে তুমি ভালোবাসো। রাবী বলেন, আবু যার (রাঃ) পুনরায়
এরূপ বললে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একইরূপ জবাব দেন’। (সুনান আবূ
দাউদ (আলবানী একাডেমী) ৫১২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অপর হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হ’তে
বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল
(ছাঃ)! ক্বিয়ামত কবে সংঘটিত হবে? তিনি বললেন, তুমি সেদিনের জন্য কী পাথেয় সঞ্চয় করেছ?
সে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই তুমি তার সঙ্গে
উঠবে যাকে তুমি ভালোবাসো।
আনাস (রাঃ) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পরে আমরা এত
বেশী খুশী হইনি যতটা নবী করীম (ছাঃ) -এর বাণী,فَإِنَّكَ
مَعَ
مَنْ
أَحْبَبْتَ
‘তুমি তার সঙ্গেই থাকবে যাকে তুমি ভালোবাসো’ দ্বারা আনন্দ লাভ করেছি। আনাস (রাঃ) বলেন,
আমি আল্লাহ, তার রাসূল, আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ)-কে ভালোবাসি। সুতরাং আমি আশা করি
যে, ক্বিয়ামত দিবসে আমি তাদের সঙ্গে থাকব, যদিও আমি তাদের মত আমল করতে পারব’। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬০৩-৬৬০৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
২৬৩৯, সলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৭০, ইসলামিক সেন্টার ৬৫২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসায় বাড়াবাড়ি না করা
পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের নিয়ে তাদের উম্মতের
অতিভক্তি, মতানৈক্য ও বাড়াবাড়িতে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৫০৫, সহিহ মুসলিম ১৩৩৭, সুনান আন নাসায়ী
২৬১৯, আহমাদ ১০৬০৭, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২৫০৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৭০৪, সুনানুল কুবরা
লিল বায়হাক্বী ৮৬১৫, ইরওয়া ৯৮০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তাদের উক্ত বিষয়ে সাবধান করে রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) বলেন,
উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খ্রিষ্টানরা মারইয়াম-এর পুত্র ’ঈসা (আ.)-এর
প্রশংসায় যেভাবে বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা সেভাবে আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না। আমি
তো আল্লাহর বান্দা। তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহর রসূল বলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৪৮৯৭, সহিহ বুখারী ৩৪৪৫, ৬৮৩০; সহীহুল জামি‘ ১৩৩১৯, মুসন্নাফ আবূ ইয়া‘লা ১৫৩,
সহীহ ইবনু বিবান ৬২৩৯, শু‘আবুল ঈমান ১৪৯১, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ১৯৩৭)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুশয্যায় বলেছেনঃ আল্লাহর অভিশাপ ইয়াহূদী
ও খৃষ্টানদের প্রতি। তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৭১২, সহিহ বুখারী ১৩৯০, সহিহ মুসলিম ৫২৯, আহমাদ ২৪৫১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
এ কথা বলে তিনি মুসলমানদেরকে ভক্তির আতিশয্যে
কবর পূজার শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করেছিলেন।
আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি
বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে আলাপচারিতার সময় বলল,‘যা আল্লাহ ও আপনি
ইচ্ছা করেন’। জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘তুমি তো আমাকে আল্লাহর সমতুল্য গণ্য করলে।
বরং (বল) একমাত্র আল্লাহ ইচ্ছা করেন’। (আহমাদ হা/৩২৪৭; মুছান্নাফ
ইবনু আবী শায়বাহ হা/২৯৫৭৩; ছহীহাহ হা/১০৯৩)।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে বলল, ‘হে মুহাম্মাদ, হে আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার
পুত্র। আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান’। তখন রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) বললেন, ‘হে জনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে।
বরং আমি আব্দুল্লাহর পুত্র ‘মুহাম্মাদ’। আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর
কসম! আমি পছন্দ করিনা যে, মহান আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদা প্রদান করেছেন, তোমরা অতিরঞ্জিত
করে আমাকে তার ঊর্ধ্বে উঠাবে’। (আহমাদ হা/১৩৫৫৩; নাসাঈ কুবরা
হা/১০০০৭; ছহীহাহ হা/১৫৭২)।
পরিশেষে একথাই চূড়ান্ত যে, নিজের জীবন, পিতা-মাতা,
সন্তান, স্ত্রী, ধন সম্পদ এর চেয়েও রাসুল সা.কে ভালোবাসতে হবে। আর এই ভালোবাসার অর্থ
হচ্ছে, তাঁর আদেশ নিষেধসমূহ মেনে চলা এবং জীবনের প্রতি পদক্ষেপে তাঁর সুন্নাহকে অনুসরণ
করে চলতে হবে। এজন্যে কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই।
ভন্ড পীর অলি, সুফি-সাধকগণ তাদের মুরিদদের
সব সময় বলে যে, রাসুল সা.কে পেতে হলে পীর ধরতে হবে, পীরের মহববতে থাকতে হবে, পীরের
কথা মতো চলতে হবে, দরবার ছাড়া যাবে না, সব ধরণের মানত দরবারে আদায় করতে হবে তাহলে রাসুল
সা.কে পাওয়া যাবে। আসলে এগুলো হচ্ছে শয়তানের অহি ও ভন্ডামী।
আল্লাহকে পেতে কি কোনো মাধ্যম প্রয়োজন?
ইসলামে মহান আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য বা সন্তুষ্টি
লাভের জন্য কোনো ধরণের মধ্যস্থতাকারী (যেমন: পীর, অলি, সুফি-সাধক, গাউস, কুতুব, মাজার
বা অন্য কোনো ব্যক্তি) বা মাধ্যম প্রয়োজন নেই। বান্দা সরাসরি তাঁর ইবাদত ও দোয়ার
মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বান্দার এতই নিকটবর্তী যে, তিনি
ঘাড়ের রগ বা তার চেয়েও কাছে অবস্থান করেন।
রাসুল সা. বলেন,
আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খাইবার যুদ্ধের জন্য বের হলেন কিংবা
রাবী বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খাইবারের দিকে যাত্রা
করলেন, তখন সাথী লোকজন একটি উপত্যকায় পৌঁছে এই বলে উচ্চস্বরে তাকবীর দিতে শুরু করল-আল্লাহু
আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। (আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ব্যতীত
কোন প্রকৃত ইলাহ নেই)। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা
নিজেদের প্রতি দয়া কর। কারণ তোমরা এমন কোন সত্তাকে ডাকছ না যিনি বধির বা অনুপস্থিত।
বরং তোমরা তো ডাকছ সেই সত্তাকে যিনি শ্রবণকারী ও অতি নিকটে অবস্থানকারী, যিনি তোমাদের
সঙ্গেই রয়েছেন। আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বলেন] আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-এর সাওয়ারীর পেছনে ছিলাম। তিনি আমাকে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’
বলতে শুনে বললেন, হে ‘আবদুল্লাহ ইবনু কায়স! আমি বললাম, আমি উপস্থিত হে আল্লাহর রাসূল!
তিনি বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি কথা শিখিয়ে দেব কি যা জান্নাতের ভান্ডারসমূহের মধ্যে
একটি ভান্ডার? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল। আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান
হোক। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হল ‘লা হাওলা ওয়ালা
কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪২০২, ২৯৯২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৭৫৫-৬৭৬০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭০৪, আধুনিক
প্রকাশনীঃ ৩৮৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৮৮৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ).....আবু
হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন, আমি বান্দার ধারণা অনুযায়ী নিকটে আছি। যখন সে আমার
যিকর (স্মরণ) করে সে সময় আমি তার সাথে থাকি। বান্দা আমাকে একাকী স্মরণ করলে আমিও তাকে
একাকী স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে কোন সভায় আমার কথা স্মরণ করে তাহলে আমি তাকে তার
চেয়ে উত্তম সভায় স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয় তাহলে আমি তার দিকে
এক হাত এগিয়ে আসি। যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়িয়ে আসি। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৬৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬১, ইসলামিক সেন্টার
৬৬১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ ঘোষণা করেন, আমি সে রকমই,
যে রকম বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি বান্দার সঙ্গে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে।
যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে; আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে জন-সমাবেশে আমাকে
স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক
বিঘত এগিয়ে আসে, তবে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর
হয়; আমি তার দিকে দু’ হাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে
দৌড়ে যাই। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৭৪০৫, ৭৫০৫, ৭৫৩৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৬৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৫, আহমাদ ৭৪২৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৮৮৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৬৯০১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর আপনি আপনার রব্বকে স্মরণ করুন মনে মনে,
মিনতি ও ভীতিসহকারে, অনুচ্চস্বরে; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবেন
না।” (সূরা আল-আ‘রাফ: ২০৫)।
মুমিনদের সর্ম্পকে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
“যারা আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় এবং চিন্তা-ভাবনা
করে আসমান যমিন সৃষ্টির বিষয়ে। হে আমাদের প্রতিপালক! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি”।
(সূরা আলে ইমরান : ১৯১)।
ইসলামে আল্লাহকে পাওয়ার বা তাঁর নৈকট্য লাভের
সঠিক মাধ্যম হলো সৎ আমল, একনিষ্ঠ ঈমান, এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দেখানো পথ অনুসরণ
করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “অতঃপর যখন তোমরা সলাত
সম্পন্ন করো, তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো। অতঃপর যখন
বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন সলাত ঠিক করে পড়ো। নিশ্চয় সলাত মুসলমানদের উপর ফরজ নির্দিষ্ট
সময়ের মধ্যে”। (সুরা নিসা ১০৩)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “অতএব তোমরা আমাকেই স্মরণ
করো, (তাহলে) আমিও তোমাদের স্মরণ করবো, তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করো এবং কখনো তোমরা
আমার অকৃতজ্ঞ হয়ো না”। (সুরা বাকারা: ১৫২)।
কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আল্লাহকে ডাকা বা
স্মরণ করা তথা আল্লাহকে পাওয়ার দলিলঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
(১) ‘‘তোমার প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাকো,
আমি (তোমাদের ডাকে) সাড়া দেব। আরও তাঁর বাণীঃ যারা অহংকারবশতঃ আমার ‘ইবাদাত করে না,
নিশ্চিতই তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’’ (সূরা আল-মু’মিন ৪০/৬০)।
(২) ‘আমি বলেছি- ‘তোমরা তোমাদের রবেবর কাছে
ক্ষমা চাও, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের উপর বৃষ্টি
বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন সম্পদ ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি
করবেন এবং তোমাদের জন্য নদ্বীনালা প্রবাহিত করবেন।।’’ (সূরা
নূহ ৭১/১০-১২)।
(৩) ‘‘যারা কোন পাপ কাজ করে ফেললে কিংবা নিজেদের
প্রতি যুল্ম করলে আল্লাহ্কে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে…..।’’
(সূরা আলে ‘ইমরান ৩/১৩৫)।
(৪) ‘‘তোমরা সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর
কাছে তাওবাহ করো।’’ (সূরাহ আত্-তাহরীম ৬৬/৮)।
(৫) মহান আল্লাহ বলেছেন, “অবশ্যই আল্লাহর স্মরণ
সর্বশ্রেষ্ঠ।” (সূরা আনকাবূত ৪৫ আয়াত)।
(৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “তোমরা আমাকে স্মরণ
কর; আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।” (সূরা বাকারা ১৫২ আয়াত)।
(৭) তিনি অন্য জায়গায় বলেন, “আল্লাহকে অধিক-রূপে
স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা জুমআ ১০ আয়াত)।
(৮) তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী
(মুসলিম) পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, অনুগত
পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী,
বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ ও রোযা
পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী (সংযমী) নারী,
আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী---এদের জন্য আল্লাহ
ক্ষমা ও মহা প্রতিদান রেখেছেন।” (সূরা আহযাব ৩৫ আয়াত)।
(৯) তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ!
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।”
(সূরা আহযাব ৪১-৪২ আয়াত)।
রাসুল সাঃ বলেন,
(১)
মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ)....আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা
যখন আল্লাহর কাছে তওবা করে তখন আল্লাহ ঐ লোকের চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে
নিজ সওয়ারীর উপর আরোহিত ছিল। তারপর সওয়ারটি তার হতে হারিয়ে যায়। আর তার উপর ছিল
তার খাদ্য ও পানীয়। এরপর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় এসে আরাম করে এবং তার উটটি
সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হঠাৎ উটটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়।
অমনিই সে, তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে উঠে, হে আল্লাহ! তুমি
আমার বান্দা, আমি তোমার রব। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ভুল করে ফেলেছে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৬৮৫৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৪৭, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৩০৯, আধুনিক
প্রকাশনী ৫৮৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৭৫৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(২) আবদুল্লাহ ইবনু বাররাদ আশ'আরী ও মুহাম্মাদ
ইবনুল আ'লা (রহঃ).....আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ঘরে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় আর যে ঘরে আল্লাহকে স্মরণ করা হয়
না এরূপ দুটি ঘরের তুলনা করা যায় জীবিত ও মৃতের সঙ্গে। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৭০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৭৯, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪০৭, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৬৯৩, ইসলামীক সেন্টার ১৭০০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩) আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি আমার
বান্দার ধারণার পাশে থাকি। (অর্থাৎ সে যদি ধারণা রাখে যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন,
তার তওবা কবুল করবেন, বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করবেন, তাহলে তাই করি।) আর আমি তার সাথে
থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে। সুতরাং সে যদি তার মনে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে
আমার মনে স্মরণ করি, সে যদি কোন সভায় আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম
ব্যক্তিদের (ফিরিশতাদের) সভায় স্মরণ করি।”
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭৪০৫, ৭৫০৫, ৭৫৩৬,
৭৫৩৬, ৭৫৩৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), ৬৬৯৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৫, সুনান
ইবনু মাজাহ ৩৮২২, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
২৩৮৮, ৩৬০৩, আহমাদ ৭৩৭৪, ৮৪৩৬, ৮৮৩৩, ৯০০১, ৯০৮৭, ৯৩৩৪, ৯৪৫৭, ১০১২০, ১০২৪১, ১০৩০৬,
১০৩২৬, ১০৪০৩, ১০৫২৬, ১০৫৮৫, ২৭২৭৯, ২৭২৮৩, সহীহাহ ২২৮৭, রিয়াযুস সালেহীন ২৮/১৪৪৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪)
মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না ও ইবনু বাশশার (রহঃ).....আগার আবূ মুসলিম (রহঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আবু হুরাইরাহ ও আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযিঃ) তারা
উভয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন জাতি আল্লাহ
সুবহানাহ ওয়াতা’আলার যিকর করতে বসলে একদল ফেরেশতা তাদেরকে ঘিরে ফেলে এবং রহমত তাদেরকে
ঢেকে নেয়। আর তাদের উপর শান্তি নাযিল হয় এবং আল্লাহ তা’আলা তার নিকটস্থ ফেরেশতাগণের
মধ্যে তাদের আলোচনা করেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৭৪৮,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭০০, ২৬৯৯, সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ১৪২৫, ১৯৩০, ২৬৪৬, ২৯৪৫, আবূ দাঊদ ১৪৫৫, ৩৬৪৩, ৪৯৪৬,
সুনান ইবনু মাজাহ ২২৫, আহমাদ ৭৩৭৯, ৭৮৮২, ৮১১৭, ১০১১৮, ১০২৯৮, দারেমী ৩৪৪, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৬৬১০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬৬৩, রিয়াযুস সালেহীন-২/১৪৫৬, সহীহ্ তারগীব ১/৩১/৬৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উপরোক্ত দলিলসমূহে কোনো মাধ্যমের কথা বলা হয়নি।
যখনই কোনো বিপদ আপদ, বালা-মুসিবত, দুঃখ, দুর্দশা, অভাব-অনটন আসবে তখন সরাসরি আল্লাহকে
স্মরণ করতে হবে। আল্লাহকে স্মরণ করার বিভিন্ন উপায় আছে। যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত,
নামাজের মধ্যে ও নামাজের বাহিরে বিভিন্ন যিকির করা ইত্যাদি। মনে রাখবেন, আল্লাহকে পেতে
কোনো পির, অলি বা সুফি সাধকের বা অন্য কোনো লোককে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেয়া
যাবে না। যদি কেউ কোনো সমস্যায় পড়ে কোনো পির-অলি, মাজার বা সুফি সাধকের নিকট যায় তাহলে
সে শিরক করলো।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু
পাশাপাশি তারা (ইবাদতে) শিরক করে”। (সুরা ইউসুফ ১০৬)।
ইবনে কাসীর বলেনঃ যেসব মুসলিম ঈমান সত্ত্বেও
বিভিন্ন প্রকার শির্কে লিপ্ত রয়েছে, তারাও এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমি তোমাদের জন্য যেসব বিষয়ের আশঙ্কা করি,
তন্মধ্যে সবচাইতে বিপজ্জনক হচ্ছে ছোট শির্ক। সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের উত্তরে তিনি
বললেনঃ রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত) হচ্ছে ছোট শির্ক। (মুসনাদে
আহমাদ ৫/৪২৯)।
এমনিভাবে অন্য এক হাদীসে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের
কসম করাকেও শির্ক বলা হয়েছে। (সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ১০/১৯৯,
হাদীস নং ৪৩৫৮)।
আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে মান্নত করা এবং
যবেহ্ করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে আরও এসেছে, মুশরিকরা তাদের হজের তালবিয়া পাঠের
সময় বলত: ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা, ইল্লা শারীকান
হুয়া লাকা তামলিকুহু ওমা মালাক। (অর্থাৎ আমি হাযির আল্লাহ আমি হাযির, আমি হাযির, আপনার
কোন শরীক নেই, তবে এমন এক শরীক আছে যার আপনি মালিক, সে আপনার মালিক নয়) এটা বলত। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এ শির্কী তালবিয়া পড়ার সময় যখন তারা (লাব্বাইক
আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা) পর্যন্ত বলত, তখন তিনি বলতেন যথেষ্ট
এতটুকুই বল। [মুসলিম: ১১৮৫] কারণ এর পরের অংশটুকু শির্ক। তারা ঈমানের সাথে শির্ক মিশ্রিত
করে ফেলেছে। (ইবন কাসীর)।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা বান্দার সব গোনাহ ক্ষমা
করে দিতে পারেন, তবে তিনি একমাত্র শিরক (আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক বা অংশীদার করা)
এবং তওবা না করে মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট করলে তা ক্ষমা করেন না।
কুরআনের সূরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে
বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে কখনোই ক্ষমা করবেন
না, তবে এর চেয়ে ছোট গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করতে পারেন”।
পীর অলিরা কি রাসুল সা. এর উত্তরসূরী আলেম? তারা কি ধর্ম প্রচারক বা দাঈ?
কাসীর বিন ক্বায়স (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি দিমাশক-এর মসজিদে আবুদ্ দারদা (রাঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার নিকট একজন
লোক এসে বললো, হে আবুদ্ দারদা! আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর
মদীনাহ্ থেকে শুধু একটি হাদীস জানার জন্য আপনার কাছে এসেছি। আমি শুনেছি আপনি নাকি রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া আর কোন উদ্দেশে
আমি আপনার কাছে আসিনি। তার এ কথা শুনে আবুদ্ দারদা (রাঃ) বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বলেছেন, যে ব্যক্তি (কুরআন ও হাদীসের) ’ইলম সন্ধানের উদ্দেশে কোন পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ
তা’আলা তাকে জান্নাতের পথসমূহের একটি পথে পৌঁছিয়ে দিবেন এবং মালায়িকাহ্ ’ইলম অনুসন্ধানকারীর
সন্তুষ্টি এবং পথে তার আরামের জন্য তাদের পালক বা ডানা বিছিয়ে দেন। অতঃপর ’আলিমদের
জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলেই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও দু’আ করে থাকেন, এমনকি
পানির মাছসমূহও (ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে)। ’আলিমদের মর্যাদা মূর্খ ’ইবাদাতকারীর চেয়ে
অনেক বেশী। যেমন পূর্ণিমা চাঁদের মর্যাদা তারকারাজির উপর এবং ’আলিমগণ হচ্ছে নবীদের
ওয়ারিস। নবীগণ কোন দীনার বা দিরহাম (ধন-সম্পদ) মীরাস (উত্তরাধিকারী) হিসেবে রেখে যান
না। তাঁরা মীরাস হিসেবে রেখে যান শুধু ’ইলম। তাই যে ব্যক্তি ’ইলম অর্জন করেছে সে পূর্ণ
অংশগ্রহণ করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১২, আহমাদ ২১২০৮,
সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৪১, সুনান আততিরমিযী ২৬৮২, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২২৩, সহীহুত্ তারগীব
৭০, দারিমী ৩৫৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আলেমদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই (যারা দ্বীনী
বিষয়ে জ্ঞানী) কেবল তাঁকে ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)।
কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জন করে ’আলিমদের
ওপর গৌরব করার জন্য অথবা জাহিল-মূর্খদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করার জন্য অথবা মানুষকে নিজের
প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৫, সুনান আততিরমিযী ২৬৫৪, সহীহুল
জামি‘ ১০৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ’ইলম বা জ্ঞান দ্বারা আল্লাহর
সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কেউ সে জ্ঞান পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের অভিপ্রায়ে অর্জন করলে
কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৭, আহমাদ ৮২৫২, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৬৪, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২৫২, সহীহুত্
তারগীব ১০৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ সে ব্যক্তির মুখ উজ্জ্বল
করুন যে আমার কোন কথা শুনেছে, অতঃপর এ কথাকে স্মরণ রেখেছে ও রক্ষা করেছে এবং যা শুনেছে
হুবহু তা মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছে। কারণ জ্ঞানের অনেক বাহক নিজে জ্ঞানী নয়। আবার
কেউ কেউ এমন আছে যারা নিজেরা জ্ঞানী হলেও, নিজের তুলনায় বড় জ্ঞানীর নিকট জ্ঞান বহন
করে নিয়ে যায়। তিনটি বিষয়ে মুসলিমের অন্তর বিশ্বাসঘাতকতা (অবহেলা) করতে পারে নাঃ (১)
আল্লাহর উদ্দেশে নিষ্ঠার সাথে কাজ করা, (২) মুসলিমের কল্যাণ কামনা করা এবং (৩) মুসলিমের
জামা’আতকে আঁকড়ে ধরা। কারণ মুসলিমের দু’আ বা আহবান তাদের পরবর্তী (মুসলিমদেরও) শামিল
করে রাখে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৮, তিরমিযী ২৬৫৮,
মুসনাদে শাফি‘ঈ ১৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
বর্তমান যুগে রাসুল সা. নেই। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে
ইসলাম প্রচারের কাজ কে করবে। এখানে সহজ উত্তর হচ্ছে, প্রত্যেক মুসলমানকেই ইসলামের দাওয়াতী
কাজ করা ফরজ।
আল্লাহ তা‘আলার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ‘আর তোমাদের
মধ্যে একটা দল থাকা চাই, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ
করবে। বস্ত্ততঃ তারাই হলো সফলকাম’। (আলে ইমরান ৩/১০৪)।
আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে
কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই
তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮, রিয়াদুস
সলেহিন, হাদিস নং ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ
সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে
না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু
গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে আলেমগণ যেহেতু সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে
বেশী শিক্ষিত ও জ্ঞানী সেহেতু তাদের মর্যাদা ভিন্ন।
আল্লাগ তায়ালা বলেন, “বলুন, যারা জানে এবং
যারা জানে না, তারা কি সমান? বোধশক্তি সম্পন্ন লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্ৰহণ করে”। (সুরা আস জুমার ৯)।
এখানে একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, কথিত পীর, অলি,
সুফি সাধকগণ নিজেদেরকে কখনই আলেম বলে দাবী করতে পারবে না। কারণ আলেম হতে গেলে যেসব
বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা থাকতে হয় সেসব বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা তাদের মধ্যে নেই।
অতএব পীর অলিরা রাসুল সা. এর কখনই উত্তরসূরী আলেম নয় এবং আলেম ভেবে তাদের নিকট গিয়ে
ইসলাম বিচ্যূত বা পথভ্রষ্ট হওয়া যাবে না। কারণ এরা কুরআন-হাদিসে বিশেষজ্ঞ নয়। শয়তানের
অহির মাধ্যমে এরা ধর্মীয় কথা-বার্তা বলে থাকে।
এরা শেষ জামানায় মনগড়া হাদিস বর্ণনা করবে
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শেষ যামানায় এমন মিথ্যুক দাজ্জাল
(ভন্ড পীর, অলি, সুফী, সাধক, আলেম ওলামা, মুফতি, মুহাদ্দিস) লোক হবে, যারা তোমাদের
কাছে এমন সব (মনগড়া) হাদীস নিয়ে উপস্থিত হবে যা তোমরা শুনোনি, তোমাদের বাপ-দাদারাও
শুনেননি। অতএব সাবধান! তাদের থেকে দূরে থাকবে, যাতে তারা তোমাদেরকে গুমরাহ করতে বা
বিপদে ফেলতে না পারে। (মিশকাতুল মিসকাত ১৫৪, সহীহ মুসলিম
৭, সহীহ আল জামি ৮১৫১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এরা শেষ জামানায় মনগড়া ফতোয়া দিবে
উরওয়াহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ্
ইব্নু ‘আম্র (রাঃ) আমাদের এ দিক দিয়ে হাজ্জে যাচ্ছিলেন। আমি শুনতে পেলাম, তিনি বলেছেন
যে, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) - কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ তোমাদেরকে
যে ইল্ম দান করেছেন, তা হঠাৎ ছিনিয়ে নেবেন না বরং উলামাগণকে তাদের ইল্মসহ ক্রমশ তুলে
নেয়ার মাধ্যমে তা ছিনিয়ে নেবেন। তখন কেবল মূর্খ লোকেরা অবশিষ্ট থাকবে। তাদের কাছে ফাত্ওয়া
চাওয়া হবে। তারা মনগড়া ফাত্ওয়া দেবে। ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট
করবে। ‘উরওয়াহ (রাঃ) বলেন,আমি এ হাদীসটি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) - এর
স্ত্রী ‘আয়িশা (রাঃ)-কে বললাম। তারপর ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু আম্র (রাঃ) আবার হজ্জ করতে
এলেন। তখন ‘আয়িশা (রাঃ) আমাকে বললেন, হে ভাগ্নে! তুমি ‘আবদুল্লাহ্র কাছে যাও এবং তার
থেকে যে হাদীসটি তুমি আমাকে বর্ণনা করেছিলেন, তাঁর নিকট থেকে যাচাই করে আস। আমি তাঁর
নিকট গেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে ঠিক সে রকমই বর্ণনা করলেন, যেরকম আগে বর্ণনা
করেছিলেন। আমি ‘আয়িশা (রাঃ) - ’র কাছে ফিরে এসে তাকে জানালাম। তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন
এবং বললেন, আল্লাহ্র কসম! ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু আম্র (রাঃ) মনে রেখেছে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৭৩০৭, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৯৭, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৬৮০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
ভুল ফতোয়া দেয়ার পরিনতি
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে ভুল ফাতাওয়া দেয়া
হয়েছে, অর্থাৎ- বিনা ’ইলমে (বিদ্যায়) ফাতাওয়া দেয়া হয়েছে এর গুনাহ তার ওপর বর্তাবে
যে তাকে ফাতাওয়া দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি তার কোন ভাইকে (অপরকে) এমন কোন কাজের পরামর্শ
দিয়েছে, যা কল্যাণ হবে না বলে সে জানে, সে নিশ্চয়ই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪২, সুনান আবূ দাঊদ ৩৬৫৭, সহীহুল জামি‘
৬০৬৮)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
প্রত্যেক শতাব্দীর শেষে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন
যিনি তাদের দীনকে সংস্কার করবেনঃ
(ক) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অবগত হয়েছি যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা এ উম্মাতের (কল্যাণের) জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর
শেষে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন যিনি তাদের দীনকে সংস্কার করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪৭, সুনান আবূ দাঊদ ৪২৯১, সিলসিলাহ্
আস্ সহীহাহ্ ৫৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) ইবরাহীম ইবনু ’আবদুর রহমান আল ’উযরী (রহঃ)
হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক
আগত জামা’আতের মধ্যে নেক, তাক্বওয়াসম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য মানুষ (কিতাব ও সুন্নাহর)
এ জ্ঞান গ্রহণ করবেন। আর তিনিই এ জ্ঞানের মাধ্যমে (কুরআন-সুন্নাহ) সীমালঙ্ঘনকারীদের
রদবদল, বাতিলপন্থীদের মিথ্যা অপবাদ এবং জাহিল অজ্ঞদের ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে বিদূরিত
করবেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪৮, বায়হাক্বী ১০/২০৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কথিত সুফি সম্রাট মাহবুব এ খোদা দেওয়ানবাগী
নিজেকে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি হচ্ছেন মোহাম্মদী ইসলামের পূণর্জীবনদানকারী। তাদের রচিত
সকল বই-পুস্তক ও কথা-বার্তায় তারা “মোহাম্মদী ইসলামের পূণর্জীবনদানকারী” এই বাণীটিই
প্রচার করে থাকে। শুধু দেওয়ানবাগীই নয় পৃথীবীর সকল কথিত পীর-অলি, সুফি-সাধক, গাউস,
কুতুব ও আবদালগণ নিজেদেরেকে শেষ জামানার রাহবার দাবী করেন। দলীল হিসেবে তারা উপরোক্ত
হাদিস দুইটি পেশ করে থাকেন।
এছাড়া দরবারে মুরিদদের ডেকে এনে তাদের বানানো
বিভিন্ন বিষয়ে তালিম দেয় বলে হাদিস অনুসারে তারা নিজেদেরেকে সবচেয়ে বেশী মর্যাদাবান
দাবী করেন। দলিল হিসেবে তারা নিম্নের হাদিসটি পেশ করে থাকেন।
হাসান আল বসরী (রহঃ) হতে মুরসালরূপে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বনী ইসরাঈলের দু’জন
লোক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তাদের একজন ছিলেন ’আলিম, যিনি ওয়াক্তিয়া ফরয সালাত আদায়
করার পর বসে বসে মানুষকে তা’লীম দিতেন। আর দ্বিতীয়জন দিনে সিয়াম পালন করতেন, গোটা রাত
’ইবাদাত করতেন। (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হল) এ দু’ ব্যক্তির
মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে উত্তম কে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
ওয়াক্তিয়া ফরয সালাত আদায় করার পরপরই বসে বসে যে ব্যক্তি তা’লীম দেয়, সে ব্যক্তি যে
দিনে সিয়াম পালন করে ও রাতে ’ইবাদাত করে তার চেয়ে তেমন বেশী মর্যাদাবান। যেমন- তোমাদের
একজন সাধারণ মানুষের ওপর আমার মর্যাদা। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২৫০, দারিমী ৩৪০)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
মুসলমানেরা নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য
ইসলামকে বিভিন্নভাবে বিকৃতি ঘটিয়ে আসছে। হাদিস অনুসারে আমরা জানতে পেরেছি যে, শেষ জামানায়
এমন এমন হাদিস বর্ণনা করবে যা আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষরা জীবনেও শোনেনি এবং মনগড়া
ফতোয়া দিবে। আমরা বাস্তবে কথিত পীর-অলি, সুফি-সাধকদের নিকট থেকে তেমনি হাদিস ও মনগড়া
ফতোযা জানতে পারছি।
কথিত পীর-অলি, সুফি-সাধকগণ যারা নিজেদেরকে
শেষ জামানার রাহবার দাবী করছেন আসলে তারা কেহই হাদিসে বর্ণিত সেই রাহবার নন। এরা হচ্ছে
দলিলবিহীন অন্ধ অনুসরণকারী মুকাল্লিদ।
আমরা উদাহরণ হিসেবে যদি জানতে চাই তাহলে আমি
বলবো বর্তমান জামানার ইসলাম সংস্কারক, সীমালঙ্ঘনকারীদের রদবদল, বাতিলপন্থীদের মিথ্যা
অপবাদ এবং জাহিল অজ্ঞদের ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে বিদূরণকারী ডা. জাকির নায়েক। পৃথিবীর
বিভিন্ন দেশে এরকম আরও অনেক রাহবার আছেন।
একজন ধর্ম প্রচারক বা দাঈর যেসব গুণাবলী থাকা
প্রয়োজন সব গুণাবলী ডা. জাকির নায়েকের মধ্যে আছে। যা কথিত পীর, অলি, সুফি সাধকদের মধ্যে
নেই।
বিপদ আপদে পড়ে পীর-অলি, সুফি-সাধকদের নিকট সাহায্য চাওয়া যাবে কি?
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, কল্যাণ, রিজিক, সন্তান
বা বিপদ থেকে মুক্তির মতো অলৌকিক বিষয়ের জন্য একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই সাহায্য
চাওয়া যাবে। জীবিত বা মৃত কোনো পীর বা বুজুর্গকে এসব বিষয়ের ‘ক্ষমতাধর’ মনে করে তাদের
কাছে সরাসরি সাহায্য প্রার্থনা করা শিরক বা অংশীদারিত্বের শামিল।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির নিকট কোনো বিপদ অথবা
কোনো বিষয়ে ভীত হয়ে সে তার পীরের মাধ্যমে উদ্ধার কামনা করে, যেন উক্ত আপতিত বিষয়ে তার
অন্তর সুদৃঢ় থাকে, প্রকৃতপক্ষে এটা শির্কের অন্তর্গত। আর এটা নাসারাদের দীনের কর্মের
মত। কেননা কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই রহমত বর্ষণ করেন ও অনিষ্ট দূর করেন। মহান আল্লাহ
বলেন,
“আর যদি আল্লাহ আপনাকে কোনো ক্ষতির স্পর্শ
করান, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি আল্লাহ আপনার মঙ্গল চান, তবে তাঁর
অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌঁছান।
আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু”। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৭)।
“আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো অনুগ্রহ অবারিত
করলে কেউ তা নিবারণকারী নেই এবং তিনি কিছু নিরুদ্ধ করতে চাইলে পরে কেউ তার উন্মুক্তকারী
নেই।”([সূরা ফাতির, আয়াত: ২)।
“বলুন, ‘তোমরা আমাকে জানাও, যদি আল্লাহর শাস্তি
তোমাদের ওপর আপতিত হয় বা তোমাদের কাছে কিয়ামত উপস্থিত হয়, তবে কি তোমরা আল্লাহ ছাড়া
অন্য কাউকেও ডাকবে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও? ‘না, তোমরা শুধু তাঁকেই ডাকবে, তোমরা যে
দুঃখের জন্য তাঁকে ডাকছ তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদের সে দুঃখ দুর করবেন এবং যাকে তোমরা
তাঁর শরীক করতে তা তোমরা ভুলে যাবে।” (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত:
৪০, ৪১)।
“বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে
কর তাদেরকে ডাক, অতঃপর দেখবে যে, তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করার বা পরিবর্তন করার শক্তি
তাদের নেই; তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে,
তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে, আর তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে
ভয় করে। নিশ্চয় আপনার রবের শাস্তি ভয়াবহ।” (সূরা আল-ইসরা,
আয়াত: ৫৬, ৫৭)।
ফলে সুস্পষ্ট যে, ফিরিশতা, নবী কিংবা অন্যান্য
যাদেরকে ডাকা হয়, তরা তাদের থেকে অনিষ্ট দুর করতে সক্ষম নয়। আর পরিবর্তনও করতে পারে
না।
সুতরাং যখন কারও বক্তব্য এটা হয় যে, আমি পীর
সাহেবকে ডাকি যেন তিনি আমার জন্য শাফা‘আতকারী হন। তখন সেটা নাসারাদের দো‘আর অনুরূপ
হবে। কেননা তারা মারইয়াম, তাদের পণ্ডিত ও দরবেশদের নিকট দো‘আ চাইত। অপরদিকে মুমিন তো
কেবল তার প্রভুর কাছেই প্রত্যাশা করে, তাকেই ভয় করে এবং তাকেই একনিষ্ঠভাবে ইবাদতের
জন্য ডাকে। আর ছাত্রের ওপর তার উস্তাদের হক হলো তার জন্য দো‘আ করা এবং তার ওপর রহমত
প্রত্যাশা করা। কেননা সর্বশ্রেষ্ট মর্যাদাবান সৃষ্টি হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তার সাহাবীগণ তার নির্দেশাবলী ও মর্যাদা সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত
এবং সর্বাধিক তার অনুগত্যপরায়ন মানুষ। তাদের মধ্য হতে কাউকে তিনি আশ্রয়ের ও ভয়ের সময়
আদেশ করেননি এটা বলতে: হে আমার নেতা! হে আল্লাহর রাসূল! (এটা বলে শাফা‘আত চাওয়ার নির্দেশ
রাসূল দেন নি।)। আর সাহাবীগণের কেউই রাসূলের জীবদ্দশায় কিংবা মৃত্যুর পর এমনটি করেননি;
বরং তিনি তাদেরকে আল্লাহর যিকির ও দো‘আ পাঠ এবং তার ওপর সালাত ও সালাত পেশ করতে আদেশ
দিয়েছেন। (যাতে আল্লাহর কাছে তাদের দো‘আ কবুল হয়, শাফা‘আত চাওয়ার মাধ্যমে নয়) দেখুন,
কীভাবে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেন বিপদে বলার জন্য। তিনি বলেন,
“এদেরকে লোকেরা বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক
জড়ো হয়েছে, কাজেই তোমরা তাদেরকে ভয় কর; কিন্তু এ কথা তাদের ঈমানকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল
এবং তারা তারপর তারা আল্লাহর নি‘আমত ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিল, কোনো অনিষ্ট তাদেরকে
স্পর্শ করে নি এবং আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট তারা তারই অনুসরণ করেছিল এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
বলেছিল, ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক!” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৩, ১৭)।
সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা
হতে বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয় এ বাক্যগুলো ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার
সময় বলেছিলেন। আর তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণ যখন তাদেরকে
মানুষ বলেছিল যে, ‘নিশ্চয় মানুষ তোমাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছে’ তখন তারা বলেছিলেন।
অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিপদের সময় বলতেন,
মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না, ইবনু বাশশার ও উবাইদুল্লাহ
ইবনু সাঈদ (রহঃ).....ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেন,) নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠিন বিপদাপদের সময় বলতেনঃ “লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হুল আযীমুল হালীমু
লা ইলাহা ইল্লাল্ল-হু রব্বুল আরশিল আযীমি লা ইলাহা ইল্লাল্ল-হু রব্বুস সামা ওয়া-তি
ওয়া রব্বুল আরযি ওয়া রব্বুল আরশিল কারীম", অর্থাৎ- “মহান, ধৈর্যশীল আল্লাহ ছাড়া
কোন মা’বুদ নেই। মহান আরশের পালনকর্তা আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর
রব এবং সম্মানিত আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই।" (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪১৭, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৩৪৬, ৬৩৪৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৮১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৩০, আহমাদ ২০১২,
মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১০৭৭২, সহীহ আল জামি‘ ৪৯৪০, আল কালিমুত্ব ত্বইয়্যিব
১১৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৬৭২, ইসলামিক সেন্টার ৬৭২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এমনকি কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, তিনি এ দো‘আটি
তাঁর আহলে বাইত তথা পরিবারের কোনো কোনো সদস্যকেও শিখিয়েছেন।
তাছাড়া সুনান গ্রন্থসমূহে এসেছে, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো বিপদে পতিত হতেন, তখন বলতেন, “হে চিরঞ্জীব,
হে চিরস্থায়ী, তোমার রহমতের দ্বারা আমি উদ্ধার প্রার্থনা করছি।”
হাদিসঃ
আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে কঠিন কাজ হাযির হলে তিনি
বলতেনঃ “হে চিরজীবি, হে চিরস্থায়ী! আমি তোমার রহমতের ওয়াসীলায় সাহায্য প্রার্থনা
করি”।
একই সনদসূত্রে আনাস (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সবসময় “ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম"
পাঠ করাকে অপরিহার্য করে নাও। (জামে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫২৪,
আল-কালিমুত তাইয়্যিব ১১৮/৭৬, সহীহাহ১৫৩৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি তার কন্যা ফাতিমাকে
নিন্মোক্ত দো‘আ শিখিয়েছেন,
“হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, হে আসমান ও যমীনের
স্রষ্টা, তুমি ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বুদ নেই, তোমার রহমত দ্বারা আমি উদ্ধার প্রার্থনা
করছি। আমার সকল কর্ম সংশোধন করে দাও। আমাকে আমার নিজের কাছে ক্ষনিকের জন্যও ন্যস্ত
করো না এবং তোমার কোনো সৃষ্টজীবের কাছেও নয়।” (তাবরানী (১/১৫৯)।
তাছাড়া মুসনাদে ইমাম আহমাদ ও সহীহ আবী হাতেম
আল-বুস্তি রহ. আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে,
“কোনো লোক যখন কোনো বিপদ ও দুঃশ্চিন্তায় পড়ে
বলে, হে আল্লাহ আমি আপনার বান্দা, আপনার এক বান্দার পুত্র এবং আপনার এক বাঁদীর পুত্র।
আমার কপাল আপনার হাতে, আমার ওপর আপনার নির্দেশ কার্যকর, আমার ব্যাপারে আপনার ফয়সালা
ন্যায়পূর্ণ। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনার নামের উসীলায়, যে নাম আপনি নিজের জন্য
নিজে রেখেছেন অথবা আপনি আপনার কিতাবে নাযিল করেছেন অথবা আপনার সৃষ্টজীবের কাউকে শিখিয়েছেন
অথবা নিজ গায়েবী ইলমে নিজের জন্য একান্ত করে রেখেছেন-আপনি কুরআনকে বানিয়ে দিন আমার
হৃদয়ের প্রশান্তি, আমার বক্ষের জ্যোতি, আমার দুঃখের অপসারণকারী এবং দুশ্চিন্তা দূরকারী।
এটা বললে তার যাবতীয় বিপদ ও দুঃশ্চিন্তা দুর করে দিবেন, সেটার স্থান খুশিতে ভরপুর করে
দিবেন। সাহাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হলো, হে আল্লাহর
রাসূল, আমরা কি তা মানুষদের শিখিয়ে দিবো না? রাসূল বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ, যে কেউ তা
শুনবে তার উচিত সেটা শিক্ষা গ্রহণ করা।” (মুসনাদে আহমাদ
(১/৪৫২); ইবন হিব্বান, হাদীস নং ২৩৭২)।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাতকে বলেছেন,
’আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে সূর্যগ্রহণ হলে নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে নিয়ে সালাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। অতঃপর রুকূ’ করে
আবার দাঁড়ালেন। আবার রুকূ’ করলেন এবং আবার দাঁড়ালেন। অতঃপর রুকূ’ করলেন। এভাবে দু’
রাক’আত সালাত আদায় করলেন এবং প্রত্যেক রাক’আতে তিনটি করে রুকূ’ করার পর সিজদা্ করলেন।
সালাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে কতিপয় লোক অজ্ঞান হয়ে যায় এবং তাদের উপর পানি ঢালা
হয়।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রুকূ’
করার সময় ’আল্লাহু আকবার; আর রুকূ’ হতে মাথা উঠানোর সময় ’সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’
বলেছেন এবং তাঁর সালাত অবস্থায়ই সূর্য গ্রহণ শেষ হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বললেনঃ সূর্য
কিংবা চন্দ্রগ্রহণ কারোর জন্ম বা মৃর্তু্যর কারণে হয় না, বরং তা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর
নিদর্শনসমূহের দু’টি নিদর্শন। তিনি এর দ্বারা স্বীয় বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকেন। সুতরাং
কখনো গ্রহণ হলে তোমরা সালাত আদায়ে মনোনিবেশ করবে। (সুনান
আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) ১১৭৭, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৪৮২, ১৪৮৩, ১৪৮৪, সহিহ বুখারী ৫১৯৭, ১০৪৪, সহিহ মুসলিম ৯০৭, ৯০৩,
সুনান আননাসায়ী ১৪৯৩, ১৪৭৪, ১৪৬৯, মুয়াত্ত্বা মালিক ৬৩৯, ৬৪০, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক্ব
৪৯২৫, আহমাদ ২৭১১, দারিমী ১৫২৮, আবূ দাঊদ ১১৮৯, ইবনু খুযায়মাহ্ ১৩৭৭, ইবনু হিব্বান
২৮৩২, ২৮৫৩, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৬৩০২, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১১৪০, মুসনাদ আল বায্যার
৫২৮৬, ইবনু হিব্বান ২৮৪৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৬৩৫৯, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১১৪২,
আহমাদ (৬/৭৬), ইবনু খুযাইমাহ ১৩৮৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতএব বিপদ-আপদ বা অন্য কোনো কিছুর জন্য কোনো
পির-অলি, সুফি-সাধক বা কোনো বুজুর্গ লোকের সিকট সাহায্য চাওয়া যাবে না। যা কিছু চাইতে
হবে তা সরাসরি আল্লাহর নিকট নামাজ ও বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহকে
ছেড়ে অন্য কারো নিকট সাহায্য চাওয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
মাজার বা কবর সংক্রান্ত শিরকসমূহ এবং কবরবাসীর নিকট সাহায্য চাওয়া
ইসলামে কবর বা মাজার জিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য
হলো মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং পরকালের প্রস্তুতি নেওয়া। এটি করার বিধান হলো সুন্নত। তবে
মাজারে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া, সিজদা করা বা মানত করার মতো শিরক ও কুসংস্কারমূলক
কাজ করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ।
কবর শব্দের অর্থ দাফনস্থল অর্থাৎ যে স্থানে
মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। আর মাযার শব্দের অর্থ দুটি : যিয়ারত করা এবং যিয়ারত স্থল।
তাই যে কোনো মুসলমানের দাফনস্থলকে যেমন কবর বলা যায় তেমনি যে কোনো মুসলমানের কবরকে
আভিধানিক অর্থে মাযারও বলা যায়। কেননা, সকল মুসলমানের কবরই যিয়ারত করা বৈধ। বুযুর্গ,
নেককার ও ওলিদের দাফনস্থলকে কবর বলা যাবে না এমন কোনো বিধান শরীয়তে নেই। ওলি-বুযুর্গদের
কবরের জন্য কুরআন-হাদীসে কোথাও মাযার শব্দ ব্যবহার হয়নি। হাদীসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ
নবীদের দাফনস্থলকেও কবর বলা হয়েছে। এমনকি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
কবরকেও কবর শব্দেই উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, সহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
’উবাইদুল্লাহ ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবন ’উতবাহ
(রহ.) হতে বর্ণিত। ’আয়িশাহ ও ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যু পীড়া শুরু হলে তিনি তাঁর একটা চাদরে নিজ মুখমণ্ডল আবৃত
করতে লাগলেন। যখন শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো, তখন মুখ হতে চাদর সরিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায়
তিনি বললেনঃ ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের (নবীদের)
কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। (এ বলে) তারা যে (বিদ’আতী) কার্যকলাপ করত তা হতে তিনি সতর্ক
করেছিলেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৪৩৫, ১৩৩০, ১৩৯০, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪১, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪,
৫৮১৫, ৫৮১৬; মুসলিম ৫/৩, হাঃ ৫৩১, আহমাদ ১৮৮৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৪২৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এই হাদীসে নবীদের দাফনস্থলকে কবর বলা হয়েছে।
অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের ব্যাপারেই বলেন,
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে
কবরস্থান বানিও না, আর আমার কবরকেও উৎসবস্থলে পরিণত করো না। আমার প্রতি তোমরা দরূদ
পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌঁছে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৯২৬, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪২, সহীহ আল জামি ৭২২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সুতরাং বোঝা গেল, যত সম্মানিত ব্যক্তিই হোক
তার দাফনস্থলকে কবর বলা দোষণীয় নয়। তাই ওলি-বুযুর্গদের দাফনস্থলকেও কবর বলা যাবে। আর
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাফনস্থলকে রওযা বলার কারণ হল, রওযা
শব্দের অর্থ বাগান। এখানে রওযা দ্বারা উদ্দেশ্য, ‘জান্নাতের একটি বাগান।’
যেহেতু তাঁর কবরটি জান্নাতের নেয়ামতে ভরপুর
একটি পবিত্র বাগান। তাই এ অর্থে তাঁর কবরকে ‘রওযা আতহার’ (পবিত্র বাগান) বলা হয়।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হচ্ছে কবরের সঙ্গে কৃত আচরণ
কবর ইবাদত বা উপাসনার স্থান নয়। কবর সংক্রান্ত যে সব বিষয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন (যথা যিয়ারত, সালাম ও দুআ) সেগুলো ছাড়া অন্য কোনো
কিছু করা বৈধ নয়।
কবরকে সিজদা করা, চুমু খাওয়া, তাতে বাতি জ্বালানো-এগুলো
বড় গুনাহ ও শিরকী কাজ।
কবরে নিষিদ্ধ কর্ম সমূহঃ
(১)
কবর এক বিঘতের বেশী উঁচু করা, পাকা ও চুনকাম করা, সমাধি সৌধ নির্মাণ করা, গায়ে নাম
লেখা, কবরের উপরে বসা, কবরের দিকে ফিরে ছালাত আদায় করা।
হাদিসঃ
(ক)
আমর ইবনু হাযম (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
একদিন আমাকে কবরে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখে বললেন, তুমি এ কবরবাসীকে কষ্ট দিও না।
অথবা বললেন, তুমি একে কষ্ট দিও না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
১৭২১, আহমাদ ২৪০০৯/৩৯, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৬৬)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(খ)
জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে সিমেন্ট চুন দিয়ে কোন কাজ করতে, তার উপর কিছু লিখতে অথবা খোদাই
করে কিছু করতে নিষেধ করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
১৭০৯, সুনান আত্ তিরমিযী ১০৫২, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ)
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারো অঙ্গারের উপর বসা, আর এ অঙ্গারে (পরনের) কাপড়-চোপড়
পুড়ে শরীরে পৌঁছে যাওয়া তার জন্য উত্তম হবে কবরের উর বসা হতে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৯৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২১৩৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৭১, সুনান আবূ দাঊদ ৩২২৮, সুনান আননাসায়ী ২০৪৪, সুনান
ইবনু মাজাহ্ ১৫৬৬, আহমাদ ৮১০৮, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১৪, শারহুস্ সুন্নাহ্
১৫১৯, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৬৩, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৫০৪২, ইসলামী ফাউন্ডেশন ২১১৭,
ইসলামীক সেন্টার ২১২০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ)
আবূ মারসাদ আল গানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কবরের উপর বসবে না এবং কবরের
দিকে মুখ করে সালাত আদায় করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
১৬৯৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২১৪০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৭২, ইসলামী ফাউন্ডেশন
২১১৯. ইসলামীক সেন্টার ২১২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(ঙ) জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে চুনকাম করতে, এর উপর ঘর বানাতে এবং বসতে নিষেধ
করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৯৭, মুসলিম ৯৭০, ইবনু
আবী শায়বাহ্ ১১৭৬৪, ইরওয়া ৭৫৭, মুসান্নাফ ইবনু ‘আবদুর রাযযাক্ব ৬৪৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ)
আবুল হাইয়্যাজ আল আসাদী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী (রাঃ) আমাকে বলেছেন,
’’আমি কি তোমাকে এমন একটি কাজের জন্য পাঠাব না, যে কাজের জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তা হলো যখন তোমার চোখে কোন মূর্তি পড়বে তা একেবারে
নিশ্চিহ্ন না করে ছাড়বে না। আর উঁচু কোন কবর দেখলে তা সমতল না করে রাখবে না।’’ (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৯৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২১৩৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৬৯, আহমাদ ৭৪১, ইরওয়া ৭৫৯, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৫৭, সহীহ
আল জামি আস্ সগীর ৭২৬৪, ইসলামী ফাউন্ডেশন ২১১২, ইসলামীক সেন্টার ২১১৫)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(২) ধুয়ে-মুছে সুন্দর করা, কবরে মসজিদ নির্মাণ
করা, সেখানে মেলা বসানো, ওরস করা ও কবরকে তীর্থস্থানে পরিণত করা।
হাদিসঃ
জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, সাবধান! তোমাদের আগে যারা ছিল তারা
তাদের নবী ও বুজুর্গ লোকেদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। সাবধান! তোমরা কবরসমূহকে মসজিদে
পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ হতে নিশ্চিতভাবে নিষেধ করছি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭১৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১০৭৫,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৩২, ইরওয়া ২৮৬, সহীহ আল জামি‘ ২৪৪৫, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১০৬৯,
ইসলামীক সেন্টার ১০৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৩) কবরের নিকটে গরু-ছাগল-মোরগ ইত্যাদি যবেহ
করা। জাহেলী যুগে দানশীল ও নেককার ব্যক্তিদের কবরের পাশে এগুলি করা হ’ত।
হাদিসঃ
আনাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইসলামে কোনো বলিদান নেই। ’আব্দুর রাযযাক (রহঃ)
বলেন, জাহিলী যুগে লোকেরা কবরের কাছে গরু ছাগল বলি দিতো। (সুনান
আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩২২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪) কবরে ফুল দেওয়া, গেলাফ চড়ানো, শামিয়ানা
টাঙ্গানো ইত্যাদি। (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৯৫)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ আমাদেরকে ইট,
পাথর ও মাটি ইত্যাদিকে কাপড় পরিধান করাতে নির্দেশ দেননি’।
হাদিসঃ
আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একবার নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক যুদ্ধে রওয়ানা হয়ে গিয়েছেন। আর আমি (তাঁর অবর্তমানে) একখানা
কাপড় নিয়ে পর্দাস্বরূপ ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। যখন তিনি সফর শেষে ফিরে এলেন এবং
পর্দাটি দেখলেন, তখন এটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। অতঃপর বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে
এ আদেশ করেননি যে, আমরা ইট ও পাথরকেও যেন কাপড়-চোপড় পরিধান করাই। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৪৯৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৪১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২১০৭, আস্ সুনানুস্ সুগরা ২৭১৪, শু‘আবুল ঈমান ৬৫৭৬, আস্
সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৪৯৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৩৪১, ইসলামিক সেন্টার ৫৩৫৮)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi।
এগুলি স্পষ্টভাবে কবরপূজার শামিল। রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন,
‘তুমি কোন মূর্তিকে ছেড় না নিশ্চিহ্ন না করা
পর্যন্ত এবং কোন উঁচু কবরকে ছেড় না মাটি সমান না করা পর্যন্ত’।
হাদিসঃ
আবুল হাইয়্যাজ আল আসাদী (রহঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, ’আলী (রাঃ) আমাকে বলেছেন, ’’আমি কি তোমাকে এমন একটি কাজের জন্য পাঠাব না,
যে কাজের জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তা হলো
যখন তোমার চোখে কোন মূর্তি পড়বে তা একেবারে নিশ্চিহ্ন না করে ছাড়বে না। আর উঁচু কোন
কবর দেখলে তা সমতল না করে রাখবে না।’’ (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ১৬৯৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২১৩৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৬৯, আহমাদ
৭৪১, ইরওয়া ৭৫৯, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৫৭, সহীহ আল জামি আস্ সগীর ৭২৬৪, ইসলামী ফাউন্ডেশন
২১১২, ইসলামীক সেন্টার ২১১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ক) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রার্থনা করেছেন,
‘হে আল্লাহ! তুমি আমার কবরকে ইবাদতের স্থানে পরিণত করো না। আল্লাহর গযব কঠোরতর হয় ঐ
জাতির উপরে, যারা তাদের নবীর কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করে।
হাদিসঃ
আত্বা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’আ করলেনঃ ’’হে আল্লাহ! তুমি
আমার কবরকে ভূত বানিও না যা লোকেরা পূজা করবে। আল্লাহর কঠিন রোষাণলে পতিত হবে সেই জাতি
যারা তাদের নবীর কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।’’ (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৭৫০, মালিক ৪১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(খ) আজকাল কবরকে ‘মাযার’ বলা হচ্ছে। যার অর্থ:
পবিত্র সফরের স্থান। অথচ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে গেছেন, ‘(নেকী হাছিলের উদ্দেশ্যে) তিনটি
স্থান ব্যতীত সফর করা যাবে না, মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুল আক্বছা ও আমার এই মসজিদ’।
হাদিসঃ
আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন মাসজিদ ছাড়া অন্য কোন
মসজিদে সফর করা যায় নাঃ (১) মসজিদে হারাম, (২) মসজিদে আক্বসা (আকসা) ও (৩) আমার এই
মাসজিদ (মসজিদে নাবাবী)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬৯৩,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১১৯৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩১৫২, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৮২৭, সুনান আততিরমিযী ৩২৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৬১৭, ইরওয়া ৭৭৩, সহীহ আল জামি‘
৭৩৩২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩১২৭, ইসলামীক সেন্টার ৩১২৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তিনি তাঁর উম্মতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা
আমার কবরকে তীর্থস্থানে পরিণত করো না’।
হাদিসঃ
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে
কবরস্থান বানিও না, আর আমার কবরকেও উৎসবস্থলে পরিণত করো না। আমার প্রতি তোমরা দরূদ
পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌঁছে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৬, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪২, সহীহ আল
জামি‘ ৭২২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তিনি উম্মতকে সাবধান
করে বলেন, ‘সাবধান! তোমরা কবর সমূহকে সিজদার স্থানে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ
ব্যাপারে নিষেধ করে যাচ্ছি’।
হাদিসঃ
জুনদুব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, সাবধান! তোমাদের আগে যারা ছিল তারা
তাদের নবী ও বুজুর্গ লোকেদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। সাবধান! তোমরা কবরসমূহকে মসজিদে
পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ হতে নিশ্চিতভাবে নিষেধ করছি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭১৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১০৭৫,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৩২, ইরওয়া ২৮৬, সহীহ আল জামি‘ ২৪৪৫, ইসলামী ফাউন্ডেশন ১০৬৯,
ইসলামীক সেন্টার ১০৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) কবরে মসজিদ নির্মাণকারী ও সেখানে মৃতব্যক্তির
ছবি, মূর্তি ও প্রতিকৃতি স্থাপনকারীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘এরা ক্বিয়ামতের
দিন আল্লাহর নিকটে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হিসাবে গণ্য হবে’।
হাদিসঃ
আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অসুস্থতার সময় তাঁর এক সহধর্মিণী হাবাশা দেশে তাঁর
দেখা ‘মারিয়া’ নামক একটি গীর্জার কথা বললেন। উম্মু সালামাহ এবং উম্মু হাবীবাহ (রাযি.)
হাবাশায় গিয়েছিলেন। তাঁরা দু’জন ঐ গীর্জাটির সৌন্দর্য এবং তার ভিতরের চিত্রকর্মের বিবরণ
দিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা তুলে বললেনঃ সে সব দেশের
লোকেরা তাদের কোন নেক্কার ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর কবরে মাসজিদ নির্মাণ করত এবং তাতে
ঐ সব চিত্রকর্ম অংকণ করত। তারা হলো, আল্লাহ্র নিকট নিকৃষ্ট সৃষ্টি। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১৩৪১, ৪২৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৫৩,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২৬০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) কবরের বদলে কোন গৃহে বা রাস্তার ধারে বা
কোন বিশেষ স্থানে মৃতের পূর্ণদেহী বা আবক্ষ প্রতিকৃতি নির্মাণ করে বা স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন
করে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা ও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা পরিষ্কারভাবে মূর্তিপূজার শামিল।
যা স্পষ্ট শিরক এবং যা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
উল্লেখ্য যে, মাথাসহ আবক্ষ ছবি ও মূর্তি পুরা
মূর্তির শামিল, যা সর্বদা নিষিদ্ধ।
হাদিসঃ
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল আমার নিকট এসে বলেন, গত
রাতে আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু আমি প্রবেশ করিনি। কারণ ঘরের দরজায় ছবি ছিলো।
ঘরের মধ্যে ছিলো ছবিযুক্ত পর্দা এবং ঘরের ভিতরে ছিলো কুকুর। সুতরাং আপনি ঘরে ঝুলানো
ছবির মাথা কেটে দেয়ার আদেশ করুন, তাহলে তা গাছের আকৃতিতে পরিণত হবে।
আর পর্দাটি কেটে দু’টি বালিশের ভিতরের কাপড়
বানাতে আদেশ করুন এবং কুকুরটিকে বের করে দেয়ার হুকুম দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপদেশ মতো কাজ করলেন। কুকুরটি ছিলো হাসান বা হুসাইনের এবং তা তাদের
খাটের নীচে শুয়ে ছিলো। তিনি সেটাকেও বের করে দেয়ার আদেশ দেন এবং তা বের করে দেয়া হলো।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আন-নাযাদ হচ্ছে কাপড় রাখার বস্তু, গদি সদৃশ। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪১২৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কবরে প্রচলিত শিরক সমূহঃ
(১) কবরে সিজদা করা
(২) সেদিকে ফিরে ছালাত আদায় করা
(৩) সেখানে বসা ও আল্লাহর কাছে সুফারিশের জন্য
তার নিকট প্রার্থনা করা
(৪) সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা
(৫) কবরবাসীর নিকটে কিছু কামনা করা
(৬) তার অসীলায় মুক্তি প্রার্থনা করা
(৭) তাকে খুশী করার জন্য কবরে নযর-নেয়ায ও
টাকা-পয়সা দেওয়া
(৮) সেখানে মানত করা
(৯) ছাগল-মোরগ ইত্যাদি হাজত দেওয়া
(১০) সেখানে বার্ষিক ওরস ইত্যাদি করা
(১১) মাযারে নযর-নেয়ায না দিলে মৃত পীরের বদ
দো‘আয় ধ্বংস হয়ে যাবে, এই ধারণা পোষণ করা
(১২) সেখানে নযর-মানত করলে পরীক্ষায় বা মামলায়
বা কোন বিপদে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা
(১৩) খুশীর কোন কাজে মৃত পীরের মাযারে শুকরিয়া
স্বরূপ টাকা-পয়সা না দিলে পীরের বদ দো‘আ লাগবে, এমন ধারণা করা
(১৪) নদী ও সাগরের মালিকানা খিযির (আঃ)-এর
মনে করে তাকে খুশী করার জন্য সাগরে বা নদীতে হাদিয়া স্বরূপ টাকা-পয়সা নিক্ষেপ করা
(১৫) মৃত পীরের পোষা কুমীর, কচ্ছপ, গজাল মাছ,
কবুতর ইত্যাদিকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ও ক্ষমতাশালী মনে করা
(১৬) এই বিশ্বাস রাখা যে, মৃত পীর কবরে জীবিত
আছেন ও ভক্তদের ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন
(১৭) তিনি ভক্তের ডাক শোনেন এবং তার জন্য আল্লাহর
নিকট সুফারিশ করেন
(১৮) বিপদে কবরস্থ পীরকে ডাকা ও তার কবরে গিয়ে
কান্নাকাটি করা
(১৯) খুশীতে ও নাখুশীতে পীরের কবরে পয়সা দেওয়া
(২০) কবরস্থ ব্যক্তি খুশী হবেন ভেবে তার কবরে
সৌধ নির্মাণ করা, তার সৌন্দর্য বর্ধন করা ও সেখানে সর্বদা আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা
(২১) কবর আযাব মাফ হবে মনে করে পীরের কবরের
কাছাকাছি কবরস্থ হওয়া
(২২) কবরস্থানের পাশ দিয়ে কোন মুত্তাক্বী আলেম
হেঁটে গেলে ঐ কবরবাসীদের চল্লিশ দিনের গোর আযাব মাফ হয় বলে বিশ্বাস রাখা
(২৩) কবরে বা ছবি ও প্রতিকৃতিতে বা স্মৃতিসৌধে
বা বিশেষ কোন স্থানে ফুলের মালা দিয়ে বা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে বা
স্যালুট জানিয়ে মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা অথবা একই উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে মীলাদ
ও কুরআনখানী করা ইত্যাদি।
জানা আবশ্যক যে, মানুষকে জাহান্নামে নেওয়ার
জন্য শয়তান সর্বদা পিছনে লেগে থাকে। এজন্য সে অনেক সময় নিজেই মানুষের রূপ ধারণ করে
অথবা অন্য মানুষের মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য হাছিল করে। যেমন হঠাৎ করে শুনা যায় অমুক স্থানে
স্বপ্নে পাওয়া শিকড়ে বা তাবীযে মানুষের সব রোগ ভাল হয়ে যাচ্ছে। অমুক দুধের বাচ্চা কিংবা
পুরুষ বা মহিলার ফুঁক দানের মাধ্যমে দুরারোগ্য ব্যাধি ভাল হয়ে যাচ্ছে। এমনকি পেট কেটে
নাড়িভুঁড়ি বের করে চোখের সামনে চিকিৎসা শেষে তখনই সুস্থ হয়ে রোগী বাড়ী ফিরছে। অতঃপর
দু’পাঁচ মাস দৈনিক লাখো মানুষের ভিড় জমিয়ে মানুষের ঈমান হরণ করে কথিত ঐ অলৌকিক চিকিৎসক
হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এগুলি সবই শয়তানী কারসাজি। সাময়িকভাবে এরূপ করার ক্ষমতা আল্লাহ
ইবলীসকে দিয়েছেন।
হাদিসঃ
আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ ইবনু কা’নাব (রহঃ)....আনাস
(রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীগণের
কোন একজনের সাথে ছিলেন, সে সময় তার নিকট দিয়ে এক লোক যাচ্ছিল। তিনি তাকে ডাকলেন।
সে (কাছে) আসলে তিনি বললেন, ওহে! এটা আমার অমুক স্ত্রী। সে বলল, হে আল্লাহর রসূল! অপর
কারো সম্বন্ধে আমি মন্দ ধারণা করলেও হয়ত করতাম, কিন্তু আপনার সম্বন্ধে তো মন্দ ধারণা
করতাম না। সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ শাইতান মানুষের
রক্ত সঞ্চারণের শিরায় শিরায় চলাফেরা করে থাকে। (সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৫৫৭১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২১৭৪, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬৮, সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২০৩৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৭১৯, আহমাদ ১২১৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৫৪৯১, ইসলামিক সেন্টার ৫৫১৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে জীবিত শয়তানের ধোঁকার জাল ছিন্ন হ’লেও
মৃত পীর পূজার শয়তানী ধোঁকার জাল বিস্তৃত থাকে যুগের পর যুগ ধরে। যেখান থেকে আল্লাহর
বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই কেবল কদাচিৎ বেরিয়ে আসতে পারেন।
আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তাদের মিথ্যা ওয়াদা দেয়
ও আশার বাণী শুনায়। অথচ শয়তান তাদেরকে প্রতারণা ব্যতীত কোনই প্রতিশ্রুতি দেয় না’। (সুরা নিসা ৪/১২০)।
কিন্তু শত প্রতারণার জাল বিছিয়েও শয়তান আল্লাহর
কোন মুখলেছ বান্দাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। (সুরা হিজর ১৫/৪০)।
পৃথিবীর প্রাচীনতম শিরক হ’ল মৃত মানুষের পূজা।
যা নূহ (আঃ)-এর যুগে শুরু হয়। অথচ তাওহীদের মূল শিক্ষা ছিল মানুষকে মানুষের পূজা হতে
মুক্ত করে সরাসরি আল্লাহর দাসত্বের অধীনে স্বাধীন মানুষে পরিণত করা। কিন্তু মৃত সৎ
লোকের অসীলায় আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করা ও পরকালে জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচার ভিত্তিহীন
ধারণার উপর ভর করে শয়তানের কুমন্ত্রণায় নূহ (আঃ)-এর সমাজে প্রথম শিরকের সূচনা হয়। যা
মুর্তিপূজা, কবরপূজা, স্থানপূজা, ছবি ও প্রতিকৃতি পূজা ইত্যাদি আকারে যুগে যুগে মানব
সমাজে চালু রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহকে ছেড়ে এরা নারীদের আহবান
করে। বরং এরা বিদ্রোহী শয়তানকে আহবান করে’। (সুরা নিসা ৪/১১৭)।
উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বলেন, ‘প্রত্যেক মূর্তির
সাথে একজন করে নারী জিন থাকে’। (আহমাদ হা/২১২৬৯, সনদ হাসান;
ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা নিসা ৪/১১৭)।
মক্কা বিজয়ের পরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশে
খালেদ ইবনু ওয়ালীদ বিখ্যাত ‘উয্যা’ মূর্তি ধ্বংস করার সময় সেখান থেকে বেরিয়ে আসা ঘোর
কৃষ্ণবর্ণ বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট একটা নগ্ন নারী জিনকে দ্বিখন্ডিত করেন। (নাসাঈ কুবরা হা/১১৫৪৭; তাবাক্বাত ইবনু সা‘দ ২/১৪৫-৪৬)।
এরা অলক্ষ্যে থেকে মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে
গাফেল করে এবং তাদেরকে মূর্তিপূজা, কবরপূজা, স্থানপূজা ও সৃষ্টি পূজার প্রতি প্রলুব্ধ
করে। অথচ এই শিরক থেকে তওবা না করার কারণেই নূহ (আঃ)-এর কওমকে আল্লাহ সমূলে ধ্বংস করেছিলেন।
এ যুগেও যদি আমরা এই মহাপাপ থেকে তওবা না করি, তাহ’লে আমরাও আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে
যাব। আল্লাহ বলেন,
‘তারা কি দেখে না যে, তাদের পূর্বের কত সম্প্রদায়কে
আমরা ধ্বংস করেছি, যারা তাদের নিকটে আর ফিরে আসবে না’। ‘আর অবশ্যই তাদের সকলকে আমাদের
নিকট উপস্থিত করা হবে’। (সুরা ইয়াসীন ৩৬/৩১-৩২)।
অন্যত্র তিনি বলেন
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল, আল্লাহ
তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন এবং তার ঠিকানা হ’ল জাহান্নাম। আর সেখানে মুশরিকদের
কোন সাহায্যকারী থাকবে না’। (সুরা মায়েদাহ ৫/৭২)।
তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ কখনোই শিরকের গোনাহ
মাফ করেন না। এতদ্ব্যতীত বান্দার যেকোন গোনাহ তিনি মাফ করে থাকেন, যাকে তিনি ইচ্ছা
করেন’। (সুরা নিসা ৪/৪৮, ১১৬)।
কবরে আলোকসজ্জা করা
কবরে বাতি দেওয়া নিষেধের হাদীছটি যঈফ।
হাদিসঃ
’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন ঐ সকল স্ত্রী
লোককে যারা (ঘন ঘন) কবর যিয়ারত করতে যায় এবং ঐ সব লোককেও অভিশাপ দিয়েছেন যারা কবরের
উপর মাসজিদ নির্মাণ করে বা তাতে বাতি জ্বালায়। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৭৪০, সুনান আবুদাঊদ ৩২৩৬, সুনান আততিরমিযী ৩২০, সুনান আননাসায়ী ২০৪৩,
য‘ঈফ আত্ তারগীব ২০৭৫, তামামুল মিন্নাহ ২৯৮)। হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai'f)।
তবে এটি কয়েকটি কারণে নিকৃষ্টতম বিদ‘আত।
(১) এটি নবাবিষ্কৃত বিষয়, যা ইসলামের প্রাথমিক
যুগে ছিল না।
(২) এটি অগ্নি উপাসক মজূসীদের অনুকরণ।
(৩) এতে স্রেফ মালের অপচয় হয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে
নিষিদ্ধ
(৪) একে আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের মাধ্যম বলে
ধারণা করা হয়। (তালখীছ ৯০ পৃঃ)।
যা ভিত্তিহীন ও ইসলাম বিরোধী আক্বীদা। রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ) বলেন, ‘প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম’।
(নাসাঈ হা/১৫৭৯; ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১৭৮৫)।
আল্লাহ বলেন,
‘আপনি বলে দিন, আমি কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত
আমলকারীদের সম্পর্কে খবর দিব? দুনিয়ার জীবনে যাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়েছে। অথচ তারা
ভাবে যে, তারা সুন্দর আমল করে যাচ্ছে’। (সুরা কাহ্ফ ১৮/১০৩-৪)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের
শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।
হাদিসঃ
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন
করেছে যা এতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
১৪০, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৩৮৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ১৭১৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৬, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৪, আহমাদ ২৬০৩৩, সহীহ ইবনু
হিব্বান ২৬, ইরওয়া ৮৮, সহীহ আল জামি‘ ৫৯৭০, সহীহাহ্ ২৩০২, সহীহ আত্ তারগীব ৪৯, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৪৩৪৩, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৪৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই যে সকল বস্ত্ত
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণের সময়ে দ্বীন হিসাবে গণ্য ছিল না, এ যুগে তা দ্বীন
হিসাবে গণ্য হবে না’। (আবু বকর জাবের আল-জাযায়েরী, আল-ইনছাফ
(মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, তাবি) পৃঃ ৩২)।
কবর যিয়ারতের মাসনূন তরীকা কবর যিয়ারতের সুন্নত
তরীকা হচ্ছে কবরের কাছে গিয়ে সালাম দেয়া।
বুরায়দাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে গেলে এ দু’আ পড়তে শিখিয়েছেনঃ
“আস্সালা-মু ’আলায়কুম আহলাদ দিয়া-রি
মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা ওয়া ইন্না- ইনশা-আল্ল-হু বিকুম লালা-হিকূনা নাসআলুল্ল-হা
লানা- ওয়ালাকুমুল ’আ-ফিয়াহ্’’
(অর্থাৎ
হে কবরবাসী মু’মিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ অবশ্যই আমরাও
তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি। আমরা আমাদের ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা
প্রার্থনা করছি।)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭৬৪, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২১৪৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৭৫, সুনান আননাসায়ী ২০৪০, সুনান
ইবনু মাজাহ্ ১৫৪৭, আহমাদ ২২৯৮৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১২, আল কালিমুত্ব ত্বইয়্যিব
১৫১, ইরওয়া ৭৭৬, ইসলামী ফাউন্ডেশন ২১২৬, ইসলামীক সেন্টার ২১২৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahi।
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে দিন
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে আসতেন, সেদিন শেষ রাতে উঠে তিনি
বাক্বী’তে (মদীনার কবরস্থান) চলে যেতেন। (ও স্থানে) তিনি বলতেন,
“আস্সালা-মু ’আলায়কুম দা-রা ক্বওমিন
মু’মিনীন, ওয়া আতা-কুম মা- তূ’ইদূনা গাদান মুআজ্জালূনা, ওয়া ইন্না- ইনশা-আল্ল-হু বিকুম
লা-হিকূন, আল্ল-হুম্মাগফির লিআহলি বাক্বী’ইল গারক্বদ’’
(অর্থাৎ হে মু’মিনের দল! তোমাদের ওপর শান্তি
বর্ষিত হোক। তোমাদেরকে আগামীকালের (কিয়ামতের (কিয়ামতের)) যে প্রতিশ্রুতি (সাওয়াব অথবা
শাস্তি) দেয়া হয়েছিল তা তোমরা কি পেয়ে গেছ? যে ব্যাপারে তোমাদেরকে সুযোগ দেয়া হয়েছিল
(ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত)। আর নিশ্চয়ই আমরাও আল্লাহ চাইলে তোমাদের সাথে মিলিত হবই।
হে আল্লাহ! বাক্বী’ গারক্বদ্বাসীদেরকে মাফ করে দিন!)। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭৬৬, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ২১৪৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৭৪, সুনান আননাসায়ী ২০৩৯, ইবনু হিব্বান ৩১৭২,
সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১০, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫৫৬, ইসলামী ফাউন্ডেশন ২১২৪,
ইসলামীক সেন্টার ২১২৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি
বললাম, হে আল্লাহর রসূল! কবর যিয়ারতে আমি কি বলব? তিনি বললেন, তুমি বলবে,
“আস্সালা-মু ’আলা- আহলিদ দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা
ওয়াল মুসলিমীনা, ওয়া ইয়ারহামুল্ল-হুল মুসতাক্বদিমীনা মিন্না- ওয়াল মুস্তা’খিরীনা,
ওয়া ইন্না- ইনশা-আল্ল-হু বিকুম লালা-হিকূন’’
(অর্থাৎ সালাম বর্ষিত হোক মু’মিন মুসলিমের
বাসস্থানের অধিবাসীদের প্রতি! আর আল্লাহ আমাদের রহম করুন যারা প্রথমে চলে গেছে আর যারা
পরে আসবে তাদের উপর, ইনশাআল্লাহ আমরাও শীঘ্রই তোমাদের সাথে মিলিত হব।)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭৬৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২১৪৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৭৪, ৯৭৪, সুনান আননাসায়ী ২০৩৭, ইবনু হিব্বান ৭১১০, সুনানুল
কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১১, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৪৪২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে (অর্থাৎ- মদীনার বাকী’তে) উপস্থিত
হলেন এবং সেখানে (মৃতদের উদ্দেশে) বললেনঃ
“আসসালামু ‘আলায়কুম দা-রা ক্বাওমিন
মু’মিনীনা, ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা-হেকূনা; আল্লা-হুম্মাগফিরলাহুম”
অর্থঃ মুমিন কবরবাসীদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক। আল্লাহ চাহে
তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি। হে আল্লাহ! তুমি তাদেরকে ক্ষমা করে
দাও”।
সাহাবীগণ আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা
কি আপনার ভাই নই? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা আমার বন্ধু।
আমার ভাই তারা যারা এখনো দুনিয়ায় আসেনি (পরে আসবে)। সাহাবীগণ আবেদন করলেন, হে আল্লাহর
রসূল! আপনার উম্মাতদের যারা এখনো আসেনি, তাদের আপনি কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন কিভাবে
চিনবেন? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, বল দেখি, যদি কোন ব্যক্তির
একদল নিছক কালো রঙের ঘোড়ার মধ্যে ধবধবে সাদা কপাল ও সাদা হাত-পা সম্পন্ন ঘোড়া থাকে,
সে কি তার ঘোড়াগুলো চিনতে পারবে না? তারা বললেন, হাঁ, নিশ্চয়ই চিনতে পারবে, হে আল্লাহর
রসূল! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বললেন, আমার উম্মাত উযূর কারণে (কিয়ামতের
(কিয়ামতের) দিন) সাদা ধবধবে কপাল ও সাদা হাত-পা নিয়ে উপস্থিত হবে এবং আমি হাওযে কাওসারের
নিকট তাদের অগ্রগামী হিসেবে উপস্থিত থাকবো। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২৯৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৭২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৪৯, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৪৭৫, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৯১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi।
এরপর কবরকে পিছনে রেখে কিবলামুখী হয়ে দাড়িয়ে
নিজের জন্য এবং কবরবাসীর জন্য মাগফিরাতের দুআ করতে হবে।
কবরবাসীর নিকট সাহায্য চাওয়া যাবে কি?
যারা মাজারপন্থী তাদেরকে দেখা যায় মাজারে গিয়ে
হাউমাউ করে কাঁদে আর বাবাজানকে ডাকে এবং তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরে ও সমাধান চায়। মূলত
এরা আল্লাহর নিকট কোনো কিছু না চেয়ে সরাসরি মৃত ব্যক্তির নিকট সাহায্য যায়। এপ্রসঙ্গে
আল্লাহ বলেন,
“বলে দাও, আমি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) তোমাদের কোনো ক্ষতি করার এখতিয়ার রাখি না এবং কোনো উপকার করারও না”।
(সূরা জিন : ২১)।
অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
“আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো কষ্ট দেন তবে এমন কেউ নেই তিনি ছাড়া, যে তা দূর করবে আর তিনি
যদি তোমার কোনো মঙ্গলের ইচ্ছা করেন তবে এমন কেউ নেই, যে তার অনুগ্রহ রদ করবে। তিনি
নিজ বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। তিনি অতিক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। (সূরা ইউনুস : ১০৭)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
যখন নাযিল হলো, (وَأَنْذِرْ
عشيرتك
الْأَقْرَبين)“হে
নবী! তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সাবধান করে দাও”- (সূরা আশ শুআরা ২৬ : ২১৪); তখন নবী
(সা.) কুরায়শদেরকে আহ্বান করলে তারা সমবেত হলো। তিনি (সা.) সতর্কবাণী শুনালেন। তিনি
(সা.) বললেন, হে কা’ব ইবনু লুয়াই-এর বংশধর! হে মুররাহ্ ইবনু কা’ব-এর বংশধর! তোমরা
নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর! হে ’আবদ শামস্-এর বংশধর! তোমরা নিজেদেরকে
আগুন হতে বাঁচাও! হে ’আবদ মানাফ-এর বংশধর! তোমরা নিজেদেরকে আগুন থেকে মুক্ত কর! হে
হাশিম-এর বংশধর! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর! হে ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর
বংশধর! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচাও! হে ফাতিমাহ্! তুমি তোমার দেহকে
জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচাও! কেননা, আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই।
তবে তোমাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, তা আমি (দুনিয়াতে) ভালো আচরণ দ্বারা
সিক্ত করব।
বুখারী ও মুসলিম-এর যৌথ বর্ণনায় আছে, নবী
(সা.) বললেন: হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমাদের জানকে খরিদ করে নাও (অর্থাৎ- আমার ওপরে
ঈমান এনে জাহান্নামের আগুন হতে আত্মরক্ষা কর)। আমি তোমাদের ওপর থেকে আল্লাহর শাস্তি
কিছুই দূর করতে পারব না। হে আবদ মানাফ-এর বংশধর! আমি তোমাদের ওপর হতে আল্লাহর শাস্তি
কিছুই দূর করতে পারব না। হে রাসূলুল্লাহর ফুফী সফিয়্যাহ! আমি তোমাকে আল্লাহর ’আযাব
হতে বাঁচাতে পারব না। হে মুহাম্মাদ-এর মেয়ে ফাতিমাহ! আমার কাছে দুনিয়াবী ধন-সম্পদ
হতে যা ইচ্ছা তা চাইতে পার, কিন্তু আমি তোমাকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারব
না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৩৭৩, সহিহ বুখারী ২৭৫৩, সহিহ মুসলিম ৩৪৮-(২০৪),
সুনান আততিরমিযী ৩১৮৫, সুনান আননাসায়ী ৩৬৪৪, সহীহুল জামি ৭৯০৩, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত
তারহীব ৩৬৫৮, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ৩৪, মুসনাদে আহমাদ ৮৩৮৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৪৬,
আস্ সুনানুল কুবরা লিন্ নাসায়ী ৬৪৭১, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ১৩৫০, আল মু'জামুল
আওসাত্ব ৮৫১১, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ৪৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ বলেন, হে নবী! তুমি বলে দাও, আমি আমার
নিজের কোন উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখি না, আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত। আর আমি যদি
গায়েব জানতাম, তাহ’লে অধিক অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করতে
পারত না। (সুরা আ‘রাফ ৭/১৮৮)।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সওয়ারীর পিছনে বসছিলাম। তখন তিনি আমাকে উদ্দেশ্য
করে বললেন, হে ছেলে! আল্লাহর বিধানসমূহ যথাযথভাবে মেনে চল আল্লাহ তোমাকে হিফাযতে রাখবেন।
আল্লাহর অধিকার আদায় কর, তবে তুমি আল্লাহকে তোমার সম্মুখে পাবে। আর যখন তুমি কারো
কাছে কিছু চাওয়ার ইচ্ছা করবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে এবং যখন কারো সাহায্য চাইতে
হয় তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে। জেনে রাখ, যদি সমস্ত সৃষ্টিজীব একত্র হয়ে তোমার
কোন কল্যাণ করতে চায় তবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত তোমার কোন কল্যাণ করতে
পারবে না। পক্ষান্তরে যদি সমস্ত সৃষ্টিজীব সমবেতভাবে তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তবে
তারা আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (তোমাদের ভাগ্যের
সব কিছু লেখার পর) কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং খাতাসমূহ শুকিয়ে গেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫৩০২, সুনান আততিরমিযী ২৫১৬, মুসনাদে আহমাদ ২৬৬৯, সহীহুল জামি ৭৯৫৭, আবূ ইয়া'লা
২৫৫৬, শুআবূল ঈমান ১৯৫, আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ১১২৫৩, আল মু'জামুল আওসাত্ব
৫৪১৭, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৬৩০৪, তাফসীরে রূহুল মাআনী ৬/১২৮; আলবাহরুর রায়েক ২/২৯৮;
হাশিয়াতুত তহতাবী আলালমারাকী ৩৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
যে রাসূল নিজের কোন উপকার করার ক্ষমতা রাখেন
না, মৃত্যুর পরে তাঁর পক্ষে অপরের উপকার করা কিভাবে সম্ভব? তাহ’লে তো তিনি জামাতা আলী
এবং নাতি হাসান ও হোসাইনকে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারতেন।
অতএব মনে রাখতে হবে, কোনো মাজারে গিয়ে বা কারো
কবরের নিকট গিয়ে বিভিন্ন দোয়া পাঠ করে বরঞ্চ সেই কবরবাসীর জন্য দোয়া করে আসতে হবে।
তার নিকট কোনো সাহায্য চাওয়া যাবে না। এমনকি রাসুল সা. এর রওজার নিকট গিয়েও রাসুল সা.
এর নিকট সাহায্য চাওয়া যাবে না।
রাসুল সা. এর ওফাতের পর তৎকালীন সাহাবীগণ বিপদ
আপদে রাসুল সা. এর কবরের নিকট গিয়ে সাহায্য না চেয়ে তাঁরা রাসুল সা. এর চাচার মাধ্যমে
আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতেন।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব
(রাঃ), লোকেরা অনাবৃষ্টির কবলে পতিত হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
চাচা ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর ওয়াসীলায় আল্লাহর নিকট বৃষ্টির জন্য দু’আ
করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! তোমার নিকট এতদিন আমরা আমাদের নবীর মধ্যমতা পেশ করতাম।
তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি দিয়ে পরিতৃপ্ত করতে। এখন আমরা তোমার নিকট আমাদের নবীর চাচার ওয়াসীলা
পেশ করছি। তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করো। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ১৫০৯, সহিহ বুখারী ১০১০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৬৪২৭, শারহুস্ সুন্নাহ্
১১৬৫, সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৯৫৫
, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih।
কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ
প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যের বিখ্যাত নানা
দর্শনীয় স্থান রয়েছে কিশোরগঞ্জে। শহরের পশ্চিমে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত প্রায় আড়াইশ
বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক এই পাগলা মসজিদ। এর ইমরাত খুবই সুন্দর এবং নির্মাণশৈলীও বেশ
চমৎকার। তিন তলা বিশিষ্ট পাগলা মসজিদের ছাদে তিনটি বড় গম্বুজ এবং ৫ তলা ভবনের সমান
একটি মিনার বহুদূর থেকে সহজেই দৃষ্টি কাড়ে।
জনশ্রুতি আছে, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক হয়বতনগর
জমিদার বাড়ির ঈসা খানের বংশধর দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে জিল কদর ‘পাগলা সাহেব’ নামক
একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি নরসুন্দা নদীর তীরে বসে নামাজ পড়তেন। পরবর্তীতে স্থানটিতে
মসজিদটি নির্মত হয়। জিল কদর পাগলার নামানুসারে মসজিদটি ‘পাগলা মসজিদ’ হিসেবে পরিচিতি
পায়। সূত্র: উইকিপেডিয়া।
অনেকে আবার বলেন, ‘পাগলা সাহেব’ খরস্রোতা নরসুন্দা
নদীর মধ্যস্থলে মাদুর পেতে ভেসে এসে বর্তমান মসজিদের কাছে স্থিত হন এবং তাকে ঘিরে আশেপাশে
অনেক ভক্তকূল সমবেত হন। তার ইবাদত-বন্দেগির জন্য দেওয়ান পরিবারের পক্ষ থেকে পাগলা সাহেবের
নিজের পছন্দের স্থান নরসুন্দা নদীর মাঝখানে টিলার ওপর একটি টিনের ঘর তৈরি করে দেওয়া
হয়। ওই ঘরটি পরবর্তীতে ‘পাগলা মসজিদ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
অপর জনশ্রুতি অনুসারে, তৎকালীন কিশোরগঞ্জের
হয়বতনগর জমিদার পরিবারের এক নিঃসন্তান বেগমকে জনগণ ‘পাগলা বিবি’ বলে ডাকত। দেওয়ানবাড়ির
এ বেগম নরসুন্দার তীরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে ‘পাগলা বিবির মসজিদ’
নামে পরিচিতি পায়।
আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটির
বর্তমান জমির পরিমাণ ৩ একর ৮৮ শতাংশ। যা নির্মাণ কালে ছিল কেবল ১০ শতাংশ জমির ওপর।
পাগলা মসজিদটি শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীর কাছে
নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও এর আশেপাশের অঞ্চলে সব ধর্মাবলম্বীর কাছে অত্যন্ত পবিত্র ধর্মীয়
স্থান হিসেবে পরিগণিত। এই মসজিদে মানত কিংবা দান খয়রাত করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়- এমন
বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন বয়সী হিন্দু-মুসলিমসহ নানা ধর্ম-বর্ণের নারী-পুরুষ মানত নিয়ে
এখানে আসেন।
বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার এ মসজিদে মানত নিয়ে
আসা বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের ঢল নামে। সাধারণ মানুষ এমন বিশ্বাসের আলোকে পাগলা মসজিদে
প্রচুর দান-খয়রাত করে থাকেন। নগদ টাকা-পয়সা, স্বর্ণ ও রুপার অলংকারের পাশাপাশি গরু,
ছাগল, হাঁস-মুরগি দান করেন। অধিক দান-খয়রাতের কারণে পাগলা মসজিদ ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম
আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
জানা যায়, সাধারণত প্রতি চারমাস পরপর মসজিদের
দানবাক্স খোলা হয়। প্রতিবার দানবাক্স খোলার পর কোটি কোটি টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়াও আরো
পাওয়া যায় ডলার, ইউরো, সৌদি রিয়েল, ইয়েন, দিনারসহ ইত্যাদি বিদেশি মুদ্রা। এমনকি
বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে দান বাক্স থেকে।
৬ মে ২০২৩ তারিখে পাগলা মসজিদের আটটি দানবাক্স
খোলা হয়। এতে রেকর্ড ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার
৬৮৯ টাকা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একটি ডায়মন্ডের নাকফুলসহ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার
পাওয়া গেছে।
তার আগে গত ৭ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে দানবাক্স
খোলা হয়েছিল। ২০টি বস্তায় তখন ৪ কোটি ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৪৪ টাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রা
ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গিয়েছিল। সাধারণত ৩/৪ মাস পর পর মসজিদের দানবাক্স খোলা হয় এতে
গড়ে প্রায় ৪ কোটি ওপরে টাকা পাওয়া যায়।
বিগত ২৬ জুন ২০২৬ তারিখে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক
পাগলা মসজিদের ১৩টি দানের সিন্দুক খুলে এবার অন্তত ৪৩ বস্তা টাকা, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক
মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। প্রায় ছয় মাস পর আজ শনিবার সকাল ৭টায় দানের সিন্দুকগুলো
খোলা হয়। বর্তমানে চলছে টাকা গণনার কাজ। মসজিদ কর্তৃপক্ষের আশা, এবার দানের পরিমাণ
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই পাগলা মসজিদে কেনো এতো লোক আসে, কেনো এতো
লোকের সমাগম, কেনো এতো দান করে বা মানত করে? এখানে দান করলে বা মানত করলে কি মনের
আশা পূরণ হয়?
কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদসহ এরকম আরও হাজার
হাজার মাজার ও মাজার সংলগ্ন মসজিদ আছে যেখানে প্রতিদিন বিশেষ করে জুমার দিনে অন্ধবিশ্বাসে
লোকজনের সমাগম বেশী ঘটে থাকে।
লোকজন যেমন মনের আশা পূরণ ও পরকালে মুক্তি
পেতে মাজার ও দরবারগুলোতে যাতায়াত করে তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজনসহ অন্যান্য
ধর্মের লোকজনও তাদের তীর্থস্থানগুলোতে তাদের মনের আশা পূরণ ও পরকালে মুক্তি পেতে যাতায়াত
করে থাকে। তারাও মানত করে, দান করে থাকে।
তেমনি বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু নাম করা তীর্থ
স্থান এখানে উল্লেখ করা হলো,
(ক) বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম
(বারদী):
সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত এই বারদী লোকনাথ আশ্রম
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি প্রধান তীর্থস্থান। ১৮৬৩ সালে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী
এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পুণ্যার্থী আসেন। এই প্রতিষ্ঠানে
শত শত মুসলমানও এসে তাদের মানত পূরণ করে থাকে ও এখানকার প্রসাদ ভক্ষণ করে।
(খ) প্রধান তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে
অন্যতম হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিখ্যাত লাঙ্গলবন্দ তীর্থস্থানঃ এখানেও
বিভিন্ন ধর্মের লোক যাতায়াত করে।
(গ) চন্দ্রনাথ মন্দির ও সীতাকুণ্ড:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত
চন্দ্রনাথ মন্দিরটি অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান তীর্থস্থান। প্রতি বছর শিবরাত্রি বা ফাল্গুনী
পূর্ণিমা উপলক্ষে এখানে বিশাল মেলা ও তীর্থযাত্রীদের সমাবেশ ঘটে।
(ঘ) ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির:
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই মন্দিরটি বাংলাদেশের
জাতীয় মন্দির। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতাব্দীতে বল্লাল সেন এটি নির্মাণ করেছিলেন।
দুর্গাপূজার সময় এটি দেশের প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।
(ঙ) আদিনাথ মন্দির:
কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপে পাহাড়ের চূড়ায়
অবস্থিত। ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই মন্দিরটি ঘিরে প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে বিশাল
মেলা বসে।
(চ) কান্তজিউ মন্দির:
দিনাজপুরের কান্তনগরে অবস্থিত এই মন্দিরটি
পোড়ামাটির টেরাকোটার কাজের জন্য বিশ্বখ্যাত। এটি ১৮ শতকে মহারাজা প্রাণনাথ রায় নির্মাণ
শুরু করেছিলেন।
হিন্দু ধর্মে ভারতের প্রধান তীর্থস্থান এবং
পবিত্র স্থানগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন,
(১) চার ধাম (Char Dham):
আদি শঙ্কর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই চারটি স্থান
আধ্যাত্মিক ঐক্যের প্রতীক। যেমন,
(ক)
বদ্রীনাথ (উত্তরাখণ্ড): হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ভগবান বিষ্ণুর প্রধান মন্দির।
(খ)
দ্বারকা (গুজরাট): ভগবান কৃষ্ণের প্রাচীন রাজ্য ও মন্দির।
(গ) পুরী (ওড়িশা): ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র
ও সুভদ্রার প্রধান মন্দির।
(ঘ) রামেশ্বরম (তামিলনাড়ু): ভারতের দক্ষিণ
প্রান্তে অবস্থিত ভগবান শিবের জ্যোতির্লিঙ্গ।
(২) ছোট চার ধাম (Chota Char
Dham):
উত্তরাখণ্ডের হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত চারটি
অত্যন্ত পবিত্র স্থান হলো,
(ক)
গঙ্গোত্রী ও (খ) যমুনোত্রী (গঙ্গা ও যমুনা নদীর উৎস)।
(গ)
কেদারনাথ (ভগবান শিব)।
(ঘ)
বদ্রীনাথ। [
(৩) সপ্ত পুরী (সাতটি পবিত্র শহর):
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এই সাতটি শহর
মোক্ষদায়ী। যেমন,
(ক)
বারাণসী (কাশী): বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত শহর, যা ভগবান শিবের শহর হিসেবে
পরিচিত।
(খ)
মথুরা ও বৃন্দাবন (উত্তর প্রদেশ): ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান ও লীলাভূমি।
(গ)
দ্বারকা ও
(ঘ)
হরিদ্বার।
(ঙ)
অযোধ্যা (উত্তর প্রদেশ): ভগবান রামচন্দ্রের জন্মস্থান।
(চ)
উজ্জয়িন (মধ্যপ্রদেশ): মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ ও কুম্ভমেলার স্থান।
(ছ)
কাঞ্চিপুরম (তামিলনাড়ু): মন্দির শহর।
(৪) দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ (Jyotirlinga):
ভগবান শিবের বারোটি পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গ সারা
ভারতে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,
(ক)
সোমনাথ মন্দির (গুজরাট)।
(খ)
মহাকালেশ্বর (উজ্জয়িন)।
(গ)
কাশী বিশ্বনাথ (বারাণসী)।
(৫) অন্যান্য সর্বাধিক পরিদর্শিত
মন্দিরগুলো হলো,
(ক)
তিরুপতি বালাজি (অন্ধ্রপ্রদেশ): বিশ্বের অন্যতম ধনী ও দর্শনার্থীপূর্ণ মন্দির।
(খ)
বৈষ্ণো দেবী (জম্মু ও কাশ্মীর): পাহাড়ের গুহায় অবস্থিত দেবী দুর্গার মন্দির।
(গ)
কামাক্ষ্যা মন্দির (আসাম): শক্তিপীঠ।
(ঘ)
সিদ্ধি বিনায়ক (মুম্বাই, মহারাষ্ট্র)।
বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১০,০০০টি স্বতন্ত্র ধর্ম
বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান ধর্ম বা বৃহৎ ধর্মগুলোর
সংখ্যা মাত্র ১২টি। অনুসারীর সংখ্যার ভিত্তিতে প্রধান পাঁচটি ধর্ম হলো-খ্রিস্টধর্ম,
ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং ইহুদিধর্ম।
প্রত্যেক ধর্মেরই নিজেস্ব তীর্থ স্থান আছে।
সেসব জায়গায় লোকজন যায় তাদের ধর্ম মতে আরাধনা করতে, কেউ যায় বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে,
কেউ যায় মনের আশা পূরণ করতে। ঠিক একইভাবে মুসলমানরাও বিভিন্ন মাজার ও দরবারে যায় বিভিন্ন
বিষয়ে মুক্তি পেতে। একজন মুসলমান যদি হিন্দুদের তীর্থ স্থানে গিয়ে যেমন লোকনাথ ব্রহ্মচারী
আশ্রমবারদী, নারায়ণগঞ্জে এসে কোনো মানত করে তার মনের আশা পূরণ হয়। তেমনি হিন্দুরাও
মুসলমানদের মাজার, দরগা বা দরবারে এসে মানত করলে তারও মনের আশা পূরণ হয়।
এখানে মূল বিষয়টি দেখতে হবে যে, ধর্ম মতে তার
চাওয়াটা সঠিক আছে কিনা? আপনি যেখানে খুশি যেতে পারেন, যেখানে গিয়ে চাইতে পারেন তথা
আপনি যেভাবে চলতে চান আল্লাহ আপনাকে সেভাবেই চালাবেন। আল্লাহ বলেন,
“আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে তাই সে পায়”।
(সুরা নাজম ৩৯)।
আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free
Will) দিয়েছেন। বান্দা যেপথ বেছে নিতে চায়, আল্লাহ তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেন। আপনি
সৎ পথে চলতে চাইলে আল্লাহ আপনাকে সৎ পথের দিশা দেবেন। আপনি যদি খারাপ পথে পা বাড়াতে
চান, তবে সেটাও আপনার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। যেহেতু আপনার বিবেক বুদ্ধি আছে, স্বাধীন
ইচ্ছেশক্তি আছে তাই আপনাকে বেছে নিতে হবে কোনটি সঠিক পথ। ইসলাম যেহেতু চায় না মাজারে
যাওয়া, দরগা বা দরবারে যাওয়া, পীর ধরা তাই আপনাকে সেই পথগুলো পরিহার করে চলতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আর যারা আমাদের পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়,
আমরা তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের হিদায়াত দিব। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ মুহসিনদের সঙ্গে
আছেন”। (সুরা আল আনকাবুত ৬৯)।
কবরকে যেহেতু তীর্থ স্থান বানাতে নিষেধ করা
হয়েছে সেহেতু মুসলিমদের অবশ্যই তা মেনে চলতে হবে।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে
কবরস্থান বানিও না, আর আমার কবরকেও উৎসবস্থলে পরিণত করো না। আমার প্রতি তোমরা দরূদ
পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌঁছে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৬, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪২, সহীহ আল
জামি‘ ৭২২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
’আত্বা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’আ করলেনঃ ’’হে আল্লাহ! তুমি
আমার কবরকে ভূত বানিও না যা লোকেরা পূজা করবে। আল্লাহর কঠিন রোষাণলে পতিত হবে সেই জাতি
যারা তাদের নবীর কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।’’ ইমাম মালিক মুরসাল হিসেবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭৫০,মালিক ৪১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, সাবধান! তোমাদের আগে যারা ছিল তারা
তাদের নবী ও বুজুর্গ লোকেদের কবরকে মসজিদে বা সিহজদার স্থানে পরিণত করেছে। সাবধান!
তোমরা কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ হতে নিশ্চিতভাবে নিষেধ করছি।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭১৩, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১০৭৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৩২, ইরওয়া ২৮৬, সহীহ আল জামি‘ ২৪৪৫, ইসলামী ফাউন্ডেশন
১০৬৯, ইসলামীক সেন্টার ১০৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সকল নেকীর কাজের দ্বারা মানত করা যায়। মানত
হচ্ছে জরুরী নয় এমন কিছু কাজকে নিজের উপর জরুরী করে নেয়া। নেকীর কাজের মানত করলে তা
পালন করতে হবে। আর পাপের কাজের মানত করলে তা পালন করতে হবে না।
হাদিসঃ
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের মানৎ
করে, সে যেন অবশ্যই তা আদায় করে। আর যে ব্যক্তি তাঁর নাফরমানীর মানৎ করে, সে যেন অবশ্যই
তা না করে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৪২৭, বুখারী ৬৬৯৬,
৬৭০০, সুনান আবূ দাঊদ ৩২৮৯, সুনান আননাসায়ী ৩৮০৬, সুনান আততিরমিযী ১৫২৬, সুনান ইবনু
মাজাহ ২১২৬, আহমাদ ২৪০৭৫, দারিমী ২৩৮৩, ইরওয়া ৯৬৭, সহীহ আল জামি ৬৫৬৫)।হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
জাবির ইবনু ’আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি মক্কা বিজয়ের দিন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি মহান
আল্লাহ তা’আলার নিকট এই মানৎ করেছি যে, আল্লাহ তা’আলা যদি আপনাকে মক্কা বিজয় দান করেন,
তাহলে আমি বায়তুল মাকদিসে দু’ রাক্’আত সালাত আদায় করব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, এখানে (মসজিদুল হারামে) সালাত আদায় করে নাও। লোকটি পুনরায় আবেদন করল। এবারও
বললেন, এ জায়গায় সালাত আদায় করে নাও। লোকটি তৃতীয়বারও সে কথার পুনরাবৃত্তি করল। এমতাবস্থায়
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার মনোষ্কামনা পূরণ কর। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৪৪০, সুনান আবূ দাঊদ ৩৩০৫, দারিমী
২৩৩৯, আহমাদ ১৪৯১৯, ইরওয়া ৯৭২)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
শিরক ও বিদ‘আতী কোনো দিবস বা স্থানে কোনো মানত
করা যাবে না।
হাদিসঃ
সাবিত ইবনুয্ যহহাক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে বুওয়ানাহ্
নামক স্থানে একটি উট যাবাহ করার মানৎ করল। অতঃপর সে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
জিজ্ঞেস করলেন, জাহিলিয়্যাত যুগে কি সেখানে কোনো প্রতিমার পূজা-অর্চনা হত? সাহাবীগণ
বললেন, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো জিজ্ঞেস করলেন, সে অঞ্চলে কি
কাফিরদের কোনো মেলা বসত। সাহাবীগণ বললেন, না। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার মানৎ আদায় কর। কেননা, যে কাজে আল্লাহ তা’আলার
নাফরমানী হয়, এমন মানৎ পূরণ করতে নেই এবং আদম সন্তান যে জিনিসের মালিক নয়, সেই জিনিসের
মানৎ করলে তা পূর্ণ করতে হয় না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৩৪৩৭, ৩৪৩৮, সুনান আবূ দাঊদ ৩৩১৩)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
যুহায়র ইবনু হারব ও ইসহাক ইবন ইবরাহীম (রহঃ).....আবদুল্লাহ
ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
কোন এক সময় আমাদেরকে মানৎ করতে বারণ করতেন এবং বলতেন যে, তা (তাকদীরের) কিছুই ফিরিয়ে
দেয় না। তবে এর মাধ্যমে কৃপণের হাত থেকে কিছু বের করা হয়। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪১২৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৩৯,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪০৯১, ইসলামিক সেন্টার ৪০৯০)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ মানত আদম সন্তানকে এমন কিছু এনে দিতে পারে
না যা তাক্দীরে নির্ধারিত নেই অথচ সে যে মানতটি করে তাও আমি তাক্দীরে নির্ধারিত করে
দিয়েছি যাতে এর মাধ্যমে কৃপণের নিকট হতে (মাল) বের করে নেই। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৬৬০৯, ৬৬৯৪; আহমাদ ৯৩৫১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪১৩৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৪০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৪০৯৫ ইসলামিক সেন্টার ৪০৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতএব মাজার, দরগা বা দরবারে দান করলে বা মানত
করলে পীর বাবা/অলি বাবা সন্তুষ্ট হয়ে আপনার মনের আশা পূরণ করে দিবে এই আশা পোষণ করা
মানে আল্লাহর সাথে শিরক করা। আর মৃত্যুর আগে খাঁটি তওবা ছাড়া এই শিরকের গুণাহ আল্লাহ
তায়ালা মাফ করবেন না।
আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর সাথে
শিরক করার গোনাহ ক্ষমা করেন না। এছাড়া যে কোনো পাপ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন’।
(সুরা আন-নিসা, ৪/৪৮)।
আমাদের সর্বদা প্রার্থনা হবে, “আমাদেরকে সরল
পথের হিদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদেরকে আপনি নিয়ামত দিয়েছেন, যাদের উপর আপনার ক্রোধ
আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়”। (সুরা ফাতিহা ৬-৭)।
পীর-অলি ও সুফি-সাধকদের কি অসিলা ধরা যাবে?
ইসলামে অসিলা বা মাধ্যম গ্রহণের বিষয়টি একটি
অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত ফিকহী (আইনগত) ও আকিদাগত বিষয়। বৈধ অসিলার মধ্যে নিজের
নেক আমলের অসিলা ধরে দোয়া করা, আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলির দ্বারা অসিলা ধরে দোয়া
করা আর জীবিত নেককার ব্যক্তির অসিলা ধরে দোয়া করা। এছাড়া মৃত কোনো ব্যক্তি বা পীর আউলিয়া,
সুফি-সাধকের অসিলা ধরে দোয়া করা শিরক। এমনকি রাসুল সা. এর অসিলা ধরেও দোয়া করা যাবে
না। তবে জীবিত কোনো পীর বা অলি যিনি মুত্তাকী বা পরহেজগার, যিনি দরবার খুলে টাকা ইনকাম
করে না, যার দরবারে শিরক, কুফর, নিফাক ও বিদআত নেই তার অসিলা ধরে দোয়া করা যাবে। আবার
ঐ ব্যক্তিই মারা গেলে তার আর অসিলা ধরা যাবে না। এতদবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে
তুলে ধরা হলোঃ
অসিলা ধরার শির্ক বলতে যে কোনো উদ্দেশ্য হাসিল
অথবা যে কোনো প্রয়োজন মেটানোর জন্য সরাসরি আল্লাহ্ তা’আলার নিকট আবেদন না করে শরীয়ত
অসম্মত কোনো ব্যক্তি বা বস্ত্তকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করাকে বুঝানো হয়।
অসিলার প্রকারভেদ:
শরীয়তের দৃষ্টিতে অসিলা দু’ প্রকার। যা নিম্নরূপ:
শরীয়ত সম্মত অসিলাঃ
শরীয়ত সম্মত অসিলা বলতে সে সকল বস্ত্তকে বুঝানো
হয় যেগুলোকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা কুর’আন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত। যেগুলো নিম্নরূপ:
(ক) আল্লাহ্ তা’আলার সকল নাম অথবা যে কোনো বিশেষ নামের অসিলা ধরা:
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘‘আল্লাহ্ তা’আলার অনেকগুলো সুন্দর নাম রয়েছে
যেগুলোকে মাধ্যম বানিয়ে তোমরা তাঁর নিকট দো’আ করতে পারো। তোমরা ওদেরকে প্রত্যাখ্যান
করবে যারা আল্লাহ্ তা’আলার নামকে বিকৃত করে। অতিসত্বর তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি
দেয়া হবে’’। (সুরা আ’রাফ ১৮০)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার নিরানব্বই-এক কম
একশ’টি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি এ নামগুলো মুখস্থ করবে সে জান্নাতে যাবে। অপর বর্ণনায়
আছে, তিনি বিজোড়, (তাই) বিজোড়কে ভালবাসেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২২৮৭, সহিহ বুখারী ২৭৩৬, ৭৩৯২, সহিহ মুসলিম ২৬৭৭, সুনান আততিরমিযী ৩৫০৬, সুনান
ইবনু মাজাহ ৩৮৬০, আহমাদ ৭৬২৩, আদ্ দা‘ওয়াতুল কাবীর ২৯২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী
১৯৮১৬, ইবনু হিব্বান ৮১৭, সহীহ আল জামি‘ ২১৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস’ঊদ্ (রা.) থেকে বর্ণিত
তিনি বলেন: রাসূল (সা.) এভাবে দো’আ করেন:
‘‘হে আল্লাহ্! নিশ্চয়ই আমি আপনার বান্দাহ্
এবং আপনার বান্দাহ্ ও বান্দির সন্তান। আমার ভাগ্য আপনার হাতে। আমার ব্যাপারে আপনার
আদেশ অবশ্যই কার্যকর এবং আপনার ফায়সালা আমার ব্যাপারে নিশ্চয়ই ইনসাফপূর্ণ। আপনার সকল
নামের অসিলায় যা আপনি নিজের জন্য চয়ন করেছেন অথবা যা আপনি নিজ মাখলূকের কাউকে শিক্ষা
দিয়েছেন অথবা যা আপনি নিজ কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন অথবা যা আপনি আপনার গায়েবী ইল্মে সংরক্ষণ
করেছেন আপনার এ সকল নামের অসিলায় আমি আপনার নিকট এ আবেদন করছি যে, আপনি কুর’আন মাজীদকে
আমার অন্তরের সজীবতা, আমার বুকের নূর এবং আমার সকল চিন্তা ও ভাবনা দূরীকরণের সহায়ক
বানাবেন’’। (আহমাদ : ১/৩৯১)।
আল্লাহ্ তা’আলার বিশেষ কোন নামের অসিলা ধরার
মানে, আপনি যে জাতীয় আবেদন আল্লাহ্ তা’আলার নিকট করতে চান সে জাতীয় আল্লাহ্ তা’আলার
কোনো একটি গুণবাচক নামের অসিলা ধরবেন। যেমন: আপনার কোনো অনুগ্রহের প্রয়োজন হলে আপনি
বলবেন: ‘‘হে দয়ালু! আপনি আমার উপর দয়া করুন’’।
বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, ’হে আল্লাহ! আমি
তোমার কাছে প্রার্থনা করছি এবং জানি যে, তুমিই আল্লাহ। তুমি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কোন
মা’বূদ নেই। তুমি এক ও অনন্য। তুমি অমুখাপেক্ষী ও স্বনির্ভর। যিনি কাউকে জন্মও দেননি।
কারো থেকে জন্মও নন। যার কোন সমকক্ষ নেই।’ তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেন, এ ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলাকে তার ইস্মে আ’যম বা সর্বাধিক বড় ও সম্মানিত নামে
ডাকল। এ নামে ডেকে তাঁর কাছে কেউ কিছু প্রার্থনা করলে, তিনি তাকে তা দান করেন এবং কেউ
ডাকলে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
২২৮৯, সুনান আবূ দাঊদ ১৪৯৩, সুনান আততিরমিযী ৩৪৭৫, সুনান ইবনু মাজাহ ৩৮৫৭, আহমাদ ২২৯১৫,
ইবনু হিব্বান ৮৯১, শু‘আবূল ঈমান ২৩৬৬, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৪০)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মসজিদে নাবাবীতে বসে ছিলাম। তখন জনৈক
ব্যক্তি সালাত আদায় করছিল এবং সালাতের পর বলছিল, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা
করছি। কারণ তোমারই জন্য সব প্রশংসা। তুমি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মা’বূদ নেই। তুমিই সবচেয়ে
বড় দয়ালু, বড় দাতা। তুমিই আসমান জমিনের স্রষ্টা। হে মর্যাদা ও দান করার মালিক! হে চিরঞ্জীব,
হে প্রতিষ্ঠাতা! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, যে আল্লাহকে ইস্মে আ’যম-এর সাথে ডাকে তিনি তাতে সাড়া দেন এবং যখন তাঁর কাছে
প্রার্থনা করা হয় তখন তিনি তা দান করেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ২২৯০, সুনান আবূ দাঊদ ১৪৯৫, সুনান আততিরমিযী ৩৪৭৫, সুনান আননাসায়ী ১৩০০, আহমাদ
১২২০৫, ইবনু আবী শায়বাহ্ ২৯৩৬১, ইবনু মাজাহ ৩৮৫৮, ইবনু হিব্বান ৮৯৩, সহীহ আত্ তারগীব
১৬৪১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর ইস্মে আ’যম এই দু’ আয়াতের
মধ্যে রয়েছে,
“ওয়া ইলা-হুকুম ইলা-হূ ওয়া-হিদ, লা- ইলা-হা
ইল্লা- হুওয়ার রহমা-নুর রহীম”।
এছাড়াও সূরা আ-লি ’ইমরান-এর শুরুতে “আলিফ লা-ম
মী-ম আল্ল-হু লা- ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যূম”। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৯১, সুনান আবূ দাঊদ ১৪৯৬, সুনান আততিরমিযী
৩৪৭৮, সুনান ইবনু মাজাহ ৩৮৫৫, ইবনু আবী শায়বাহ্ ২৯৩৬৩, দারিমী ৩৪৩২, মু‘জামুল কাবীর
৪৪০, সহীহ আত্ তারগীব ১৬৪২, সহীহ আল জামি‘ ৯৮০)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ’ইশার সালাতের সময় মসজিদে
প্রবেশ করলাম। তখন দেখি জনৈক ব্যক্তি (সালাতে) কুরআন পড়ছেন এবং তার নিজের গলার স্বর
উচ্চ করছেন। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রসূল! এভাবে (সালাতে) কুরআন পড়াকে কি আপনি রিয়া
বা প্রদর্শনী বলবেন? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না। বরং
এ ব্যক্তি একজন বিনয়ী মু’মিন। বুরায়দাহ্ (রাঃ) বলেন, আবূ মূসা আল আশ্’আরীই কুরআন পড়ছিলেন
এবং তা উচ্চস্বরে পড়ছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কিরাআত
শুনছিলেন। তারপর আবূ মূসা বসে এ দু’আ করতে লাগলেন, ’’হে আল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি,
তুমি আল্লাহ, তুমি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মা’বূদ নেই, তুমি এক ও তুমি সকলের নির্ভরস্থল,
অমুখাপেক্ষী। যিনি কাউকে জন্মও দেননি, কারো থেকে জন্মও নন এবং যার কোন সমকক্ষও নেই।’’
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, নিশ্চয়ই সে আল্লাহর ঐ নামের সাথে তাঁর কাছে প্রার্থনা করল, যে নাম ধরে যখন যা
প্রার্থনা করা হয়, তখন তিনি তা দান করেন এবং ঐ নামের সাথে যখন তাঁকে ডাকে, তখন তিনি
সে ডাকে সাড়া দেন। বুরায়দাহ্ (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি তাকে
এটা বলব, যা আপনার কাছে শুনলাম? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
হ্যাঁ (বলো)। অতঃপর আমি তাঁকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন
তা বলে শুনালাম। তখন আবূ মূসা (রাঃ) আমাকে বললেন, আজ থেকে আপনি আমার প্রিয় ভাই। কারণ
আপনি আমাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সব কথা শুনালেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২২৯৩, আহমাদ ২২৯৫২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ ও মুহাম্মাদ ইবনু রুমহ
(রহঃ).....আবু বাকর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এর নিকট বললেন, আপনি আমাকে এমন একটি দু’আ শিখিয়ে দিন, যা দ্বারা আমি আমার সালাতে দু’আ
করব। তিনি বললেন, তুমি বলো, "আল্ল-হুম্মা ইন্নী যলামতু নাফসী যুলমান কাবীরা"
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের উপর বড় যুলুম করেছি। কুতাইবাহ (রহঃ) বলেন,
"কাসীরা, ওয়ালা- ইয়াগফিরুয়ু যুনুবা ইল্লা-আনতা ফাগফিরলী মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা
ওয়ার হামনী ইন্নাকা আনতাল গফুরুর রহীম" অর্থাৎ- অনেক। আপনি ছাড়া কেউ পাপরাশি
মার্জনা করতে পারে না। সুতরাং আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে মাফ করুন এবং আমার উপর দয়া
করুন। অবশ্যই আপনি একমাত্র ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৭৬২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭০৫, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৭৩৮৮, ৮৩৪, আহমাদ ৮, আধুনিক প্রকাশনী ৬৮৭২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৮৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
উক্ত দো’আর শেষাংশে আল্লাহ্ তা’আলার দু’টি
গুণবাচক নাম তথা ‘‘গাফূর’’ ও ‘‘রাহীম’’ এর অসিলা ধরা হয়েছে।
(খ) আল্লাহ্ তা’আলার যে কোনো গুণের
অসিলা ধরা:
সকল গুণের অসিলা ধরা। যেমন:
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার সকল গুণের অসিলা ধরে
এ প্রার্থনা করছি যে, আপনি আমার সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন’’।
কোনো বিশেষ গুণের অসিলা ধরা। যেমন:
আবূ তাহির ও হারমালাহ্ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ)
..... উসমান ইবনু আবূল আস-সাকাফী (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একটি ব্যথার অভিযোগ করলেন, যা তিনি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে
তার দেহে অনুভব করছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার
শরীরের যে অংশ ব্যথাযুক্ত হয়, তার উপরে তোমার হাত রেখে তিনবার ’বিসমিল্লা-হ’ বলবে
এবং সাতবার বলবে-أَعُوذُ
بِاللَّهِ
وَقُدْرَتِهِ
مِنْ
شَرِّ
مَا
أَجِدُ
وَأُحَاذِرُ
"আল্লাহ এবং তার ক্ষমতার আশ্রয় প্রার্থনা করছি- যা আমি অনুভব করি এবং যা ধারণা
করি তার অনিষ্ট হতে।" (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৬৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২০২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৫৫১, ইসলামিক সেন্টার ৫৫৭৪)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত দো’আয় আল্লাহ্ তা’আলার নাম ও তাঁর বিশেষ
গুণ ‘‘কুদরত’’ এর অসিলা ধরা হয়েছে।
(গ) আল্লাহ্ তা’আলার যে কোন কাজের অসিলা ধরা:
মুহাম্মাদ ইবনু আল মুসান্না ও মুহাম্মাদ ইবনু
বাশশার (রহঃ) ..... ইবনু আবূ লাইলা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কাব ইবনু উজরাহ (রাযিঃ)
আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমি কি তোমাকে কিছু উপহার দিব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন, আমরা বললাম, আমরা আপনাকে কিভাবে সালাম করব তা
জানতে পেরেছি কিন্তু আপনার উপর কিভাবে দুরূদ পাঠ করব?
তিনি বললেনঃ তোমর বল,
“আল্লাহুম্মা সল্লি আলা- মুহাম্মাদিন ওয়া
আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- সল্লাইত আলা- আ-লি ইবরহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ, আল্লাহুম্মা
রা-রিক আলা- মুহাম্মাদিন ওয়া আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা- বা-রাকতা আলা- আ-লি ইবর-হীমা
ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।"
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার বংশধরদের উপর ঐরূপ রহমত নাযিল কর যেমনটি করেছিলে ইবরাহীম
(আঃ) এর বংশধরদের উপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার বংশধরদের উপর ঐরূপ বারাকাত নাযিল কর যেমনটি
করেছিলে ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরদের উপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়।"
(সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭৯৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ
৪০৬, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৩৩৭০, ৪৭৯৭, ৬৩৫৭, আহমাদ ১৮১৫৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৭৯১, ইসলামিক সেন্টারঃ ৮০৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত দুরূদে ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের
উপর রহমত বর্ষণের অসিলা ধরা হয়েছে।
(ঘ) আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূলের
উপর ঈমানের অসিলা ধরা:
যেমন বলবে:
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার ও আপনার রাসূলের উপর
ঈমানের অসিলায় আপনার নিকট এ প্রার্থনা করছি যে, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন’’।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘‘আমার বান্দাহ্দের এক দল এমন ছিলো যে, তারা
বলতো: হে আমাদের প্রভু! আমরা ঈমান এনেছি। অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের
উপর দয়া করুন। আপনি তো দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ’’। (সুরা মু’মিনূন:
১০৯)।
উক্ত আয়াতে ঈমানের অসিলা ধরা হয়েছে।
(ঙ) নিজের দীনতা, অক্ষমতা ও প্রয়োজন উল্লেখ করে আল্লাহ্ তা’আলার নিকট দো’আ
করা:
যেমন বলবে:
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট খাদ্য কামনা
করছি। আমি আপনার মুখাপেক্ষী’’।
আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আ.) সম্পর্কে বলেন:
‘‘অতঃপর মূসা (আ.) বললেন: হে আমার প্রতিপালক!
আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি উহার কাঙ্গাল’’। (সুরা
ক্বাসাস্: ২৪)।
আল্লাহ্ তা’আলা যাকারিয়া (আ.) সম্পর্কে বলেন:
‘‘তিনি বললেন: হে আমার প্রভু! আমার অস্থি শীর্ণ
প্রায় এবং আমার মাথা বার্ধক্যের দরুন শুভ্রোজ্জ্বল। হে আমার প্রভু! এরপরও আমার আস্থা
এতটুকু যে, আপনার নিকট দো’আ করে কখনো আমি ব্যর্থ হইনি’’। (সুরা
মারইয়াম ৪)।
(চ) জীবিত কোনো নেক বান্দাহ্’র
দো’আর অসিলা ধরা:
যেমন: রাসূল (সা.) এর জীবদ্দশায় সাহাবারা যে
কোন সমস্যায় তাঁর দো’আ কামনা করতেন।
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, ইয়াহইয়া ইবনু
আইয়ুব, কুতায়বাহ ও ইবনু হুজুর (রহঃ)....আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত জনৈক
ব্যক্তি জুমুআর দিন মসজিদে নবাবীতে দারুল কাযার দিকে স্থাপিত দরজা দিয়ে প্রবেশ করল।
এ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে খুতবাহ দিচ্ছিলেন। সে
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! (অনাবৃষ্টির ফলে) মাল সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জীবিকার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অতএব আল্লাহর কাছে দু’আ করুন যেন তিনি আমাদেরকে বৃষ্টি
দান করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন,
“আল্ল-হুম্মা আগিসনা- আল্ল-হুম্মা আগিসনা-,
আল্ল-হুম্মা আগিসনা-”
(অর্থাৎ- হে আল্লাহ আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ
করুন, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন।)। [৩ বার]
আনাস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! এ সময় আসমানে
কোন মেঘ বা মেঘের চিহ্নও ছিল না। আর আমাদের ও সালই পাহাড়ের মাঝে কোন ঘর-বাড়ী কিছুই
ছিল না। (ক্ষণিকের মধ্যে) তার পেছন থেকে ঢালের ন্যায় অখণ্ড মেঘ উদিত হ’ল। একটু পর
তা মাঝ আকাশে এলে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং বৃষ্টি শুরু হ’ল। বর্ণনাকার বলেন, এরপর
আল্লাহর শপথ আমরা সপ্তাহকাল যাবৎ আর সূর্যের মুখ দেখিনি।
অতঃপর পরবর্তী জুমুআয় আবার এক ব্যক্তি ঐ দরজা
দিয়ে প্রবেশ করল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে খুতবাহ দিচ্ছিলেন।
সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর
রসূল! মাল সম্পদ সব বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অতএব, আল্লাহর কাছে
দু’আ করুন যেন বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার হাত উঠিয়ে দুআ করলেন,
“আল্ল-হুম্মা হাওলানা- ওয়ালা- আলায়না- আল্ল-হুম্মা
’আলাল আ-কা-মি ওয়ায় যিরা-বি ওয়া বুতনিল আওদিয়াত ওয়া মানা-বিতিশ শাজার”
(অর্থাৎ-
হে আল্লাহ আমাদের অবস্থা পাল্টে দাও আমাদের ওপর এ অবস্থা চাপিয়ে দিও না। হে আল্লাহ!
পাহাড়ী এলাকায়, মালভূমিতে মাঠের অভ্যন্তরে ও গাছপালা গজানো স্থলে তা ফিরিয়ে নিয়ে
যাও।)।
এরপর বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে গেল। আমরা বের হয়ে
সূর্য তাপের মধ্যে চলাচল করতে লাগলাম। শারীক বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিককে জিজ্ঞেস করলাম,
এ ব্যক্তি কি প্রথম ব্যক্তি? আনাস বললেন, আমার জানা নেই। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৯৬৩, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৮৯৭, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ১০২১, ৯৩২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৯৬০, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ৯৬৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অনুরূপভাবে নবী (সা.) যখন সাহাবাদেরকে এ বলে
হাদীস শুনালেন যে, আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে তখন
’উক্কাশা বিন্ মিহ্’সান (রা.) রাসূল (সা.) কে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘‘হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনি আল্লাহ্’র দরবারে দো’আ
করুন, আমি যেন তাদের একজন হই। রাসূল (সা.) বললেন: তুমি তাদেরই একজন’’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৫৭৫২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪১৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪২০, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৩৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে এ কথা ভালোভাবে জেনে রাখা প্রয়োজন যে,
শরীয়তে কোনো মৃত ব্যক্তির দো’আর অসিলা ধরা জায়েয নেই। কারণ, সে মৃত। সে আপনার জন্য
কিছুই করতে পারবে না। এ কারণেই ’উমর বিন্ খাত্তাব (রা.) এর খিলাফতকালে অনাবৃষ্টি দেখা
দিলে সাহাবারা রাসূল (সা.) এর কবরে গিয়ে তাঁর দো’আ কামনা না করে বরং তাঁর চাচা ’আব্বাস
(রা.) এর দো’আ কামনা করেন।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব
(রাঃ), লোকেরা অনাবৃষ্টির কবলে পতিত হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
চাচা ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর ওয়াসীলায় আল্লাহর নিকট বৃষ্টির জন্য দু’আ
করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! তোমার নিকট এতদিন আমরা আমাদের নবীর মধ্যমতা পেশ করতাম।
তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি দিয়ে পরিতৃপ্ত করতে। এখন আমরা তোমার নিকট আমাদের নবীর চাচার ওয়াসীলা
পেশ করছি। তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করো। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ১৫০৯, সহিহ বুখারী ১০১০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৬৪২৭, শারহুস্ সুন্নাহ্
১১৬৫, সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৯৫৫
, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১০)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih।
উক্ত হাদীস আল্লাহ্ তা’আলার নিকট কোনো সম্মানজনক
ব্যক্তির অস্তিত্বের অসিলা ধরা অথবা কোনো মৃত মহান ব্যক্তির দো’আর অসিলা ধরা নাজায়িয
হওয়া প্রমাণ করে। তা না হলে ’উমর বিন্ খাত্তাব (রা.) কর্তৃক রাসূল (সা.) এর চাচা ’আব্বাস
(রা.) এর দো’আর অসিলা ধরে বৃষ্টির জন্য দো’আ করার কোনো মানে হয় না। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলার
নিকট ’আব্বাস (রা.) এর সম্মান কোনোভাবেই রাসূল (সা.) এর সম্মানের ঊর্ধ্বে নয়।
(ছ) যে কোনো নেক আমলের অসিলা ধরা:
’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
তিনি বলেন: আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন:
‘‘পূর্ববর্তী উম্মতের তিন ব্যক্তি সফরে বের
হলো। পথিমধ্যে তারা রাত্রি যাপনের জন্য এক গিরি গুহায় অবস্থান নিলো। হঠাৎ পাহাড়ের উপর
থেকে এক প্রকান্ড পাথর গড়িয়ে এসে তাদের গিরি গুহার মুখ বন্ধ করে দিলো। তখন তারা পরস্পর
বলাবলি করলো যে, নিশ্চয়ই তোমরা নিজ নেক আমলের অসিলা ধরে দো’আ করলে আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদেরকে
এ জগদ্দল পাথর হতে মুক্তি দিবেন। অতঃপর তাদের একজন বললো: হে আল্লাহ্! আমার বৃদ্ধ মাতা-পিতা
ছিলো। আর আমি তাদেরকে সন্ধ্যার পানীয় পান না করিয়ে নিজ স্ত্রী পরিজনকে পান করাতাম না।
একদা আমি কোন এক প্রয়োজনে বহু দূর চলে গেলাম। ফিরে এসে দেখলাম আমার মাতা-পিতা ঘুমিয়ে
গেছে। অতঃপর আমি তাদের জন্য সন্ধ্যার পানীয় তথা দুধ দোহালাম। কিন্তু তারা ঘুমিয়ে রয়েছে
বলে আমি তাদেরকে তা পান করাতে পারিনি। অন্য দিকে তাদেরকে তা পান না করিয়ে নিজ স্ত্রী
পরিজনকে পান করানো আমার একেবারেই অপছন্দ। তাই আমি তাদের ঘুম থেকে জাগার অপেক্ষায় দুধের
পেয়ালা হাতে নিয়ে ফজর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম। অতঃপর তারা ঘুম থেকে জেগে দুধ পান করলো।
হে আল্লাহ্! আমি যদি তা একমাত্র আপনাকে পাওয়ার জন্য করে থাকি তাহলে আপনি আমাদের এ জগদ্দল
পাথরটি সরিয়ে দিন। তখন পাথরটি একটু করে সরে গেলো। কিন্তু তারা এতটুকুতে গুহা থেকে বের
হতে পারলো না।
অপর জন বললো: হে আল্লাহ্! আমার একটি চাচাতো
বোন ছিলো যাকে আমি খুবই ভালোবাসতাম। অতঃপর আমি তার সাথে ব্যভিচার করতে চাইলে সে তা
করতে অস্বীকার করে। তবে হঠাৎ সে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে আমার নিকট সাহায্য কামনা করলে
আমি তাকে ১২০ দীনার দেই ব্যভিচার করার শর্তে। এতে সে রাজি হলো। অতএব আমি যখন শর্তানুযায়ী
ব্যভিচারে উদ্যত হলাম তখন সে আমাকে বললো: আমি তোমাকে শরীয়ত সম্মত অধিকার ছাড়া আমার
সতীত্ব নষ্ট করতে দেবো না। তখন আমি তার সঙ্গে ব্যভিচার করতে কুণ্ঠাবোধ করলাম। অতএব
আমি তাকে এমতাবস্থায় ছেড়ে আসলাম। অথচ আমি তাকে খুবই ভালোবাসি। এমনকি আমি তার কাছ থেকে
টাকাগুলোও ফেরত নিলাম না। হে আল্লাহ্! আমি যদি তা একমাত্র আপনাকে পাওয়ার জন্য করে থাকি
তাহলে আপনি আমাদের এ জগদ্দল পাথরটি সরিয়ে দিন। তখন পাথরটি একটু করে সরে গেলো। কিন্তু
তারা এতটুকুতে গুহা থেকে বের হতে পারলো না।
তৃতীয় জন বললো: হে আল্লাহ্! আমি কোন এক কাজের
জন্য কয়েক জন দিন মজুর নিয়েছিলাম এবং তাদের সবাইকে দিন শেষে নির্ধারিত দিন মজুরি দিয়ে
দিয়েছি। তবে তাদের একজন মজুরি না নিয়ে চলে গেলো। অতঃপর আমি তার মজুরিটুকু লাভজনক খাতে
খাটালে সম্পদ প্রচুর বেড়ে যায়। কিছুদিন পর সে আমার নিকট এসে বললো: হে আল্লাহ্’র বান্দাহ্!
আমার মজুরি দিয়ে দাও। আমি তাকে বললাম: তুমি উট, গরু, ছাগল, গোলাম যাই দেখতে পাচ্ছো
সবই তোমার মজুরি। সে বললো: হে আল্লাহ্’র বান্দাহ্! তুমি আমার সাথে ঠাট্টা করো না। আমি
বললাম: আমি তোমার সাথে এতটুকুও উপহাস করছি না। অতঃপর সে সবগুলো পশু হাঁকিয়ে নিয়ে গেলো।
একটি পশুও ছেড়ে যায়নি। হে আল্লাহ্! আমি যদি তা একমাত্র আপনাকে পাওয়ার জন্য করে থাকি
তাহলে আপনি আমাদের এ জগদ্দল পাথরটি সরিয়ে দিন। তখন পাথরটি সম্পূর্ণরূপে সরে গেলো এবং
তারা গুহা থেকে সুস্থভাবে বের হয়ে পথ চলতে শুরু করলো’’। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ২২১৫, ২২৭২ ২৩৩৩, ২৪৬৫, ৫৯৭৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৮৪২,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৪৩, আহমাদ ৫৯৮১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৫৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
২০৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
শরীয়ত বিরোধী অসিলা:
শরীয়ত বিরোধী অসিলা বলতে ও সকল ব্যক্তি বা
বস্ত্তকে বুঝানো হয় যেগুলোকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা কুর’আন ও হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত
নয়। যে গুলো নিম্নরূপ:
(ক) কোনো সম্মানিত ব্যক্তি সত্তার অসিলা ধরা:
যেমন: নবী (সা.) এর অসিলা ধরে এভাবে দো’আ করা,
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার নবীর মর্যাদার অসিলায়
আপনার জান্নাত কামনা করছি। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যে কোন মৃত ব্যক্তির সম্মান
ও মর্যাদা শুধু তাঁরই কাজে আসবে। অন্যের কাজে নয়। জীবিত ব্যক্তির কাজে আসবে শুধু তারই
আমল ও প্রচেষ্টা এবং আল্লাহ্ তা’আলার নিকট তার ব্যক্তিগত সম্মান ও মর্যাদা’’।
তবে এমন বলা যেতে পারে,
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার রাসূলের উপর ঈমান
ও তাঁর আনুগত্যের অসিলায় আপনার নিকট এ কামনা করছি যে, আপনি আমার সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে
দিবেন’’।
কেউ কেউ ব্যক্তি সত্তার অসিলা ধরা জায়িয হওয়ার
ব্যাপারে নিম্নোক্ত প্রমাণগুলো উল্লেখ করে থাকে। যা নিম্নরূপ:
(১) আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয়
করো। তাঁর সান্নিধ্য (তাঁর আনুগত্য ও নেক আমলের মাধ্যমে) অন্বেষণ করো এবং তাঁর পথে
জিহাদ করো। আশাতো, তোমরা সফলকাম হবে’’। (সুরা মা’য়িদাহ্:
৩৫)।
পীর পূজারীরা বলে থাকে: উক্ত আয়াতে অসিলা বলতে
পীর বুযুর্গদেরকেই বুঝানো হচ্ছে। অতএব তাদের নিকট বায়’আত হতে হবে। তাদের অসিলা ধরতে
হবে।
মূলতঃ উক্ত আয়াতে অসিলা বলতে আল্লাহ্ তা’আলার
আনুগত্য এবং নেক আমলকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা কোর’আন মাজীদের অসংখ্য
আয়াতে ঈমান ও নেক আমলকে জান্নাত পাওয়ার একান্ত মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্য কিছুকে
নয়। অতএব আমাদেরকে উক্ত আয়াতের অসিলা শব্দ থেকে ঈমান ও নেক আমলই বুঝতে হবে। অন্য কিছু
নয়।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘‘যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তারাই
জান্নাতী। তম্মধ্যে তারা চিরকাল থাকবে’’। (সুরা বাক্বারাহ্:
৮২)।
তিনি আরো বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে।
অনুরূপ যারা একান্তভাবে নিজ প্রতিপালক অভিমুখী হয়েছে। তারাই জান্নাতী। তাতে তারা অনন্তকাল
থাকবে’’। (সুরা হূদ্ : ২৩)।
তিনি আরো বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে
জান্নাতুল্ ফিরদাউস্ হবে তাদের আপ্যায়ন’’। (সুরা কাহ্ফ :
১০৭)।
তিনি আরো বলেন:
‘‘সুতরাং যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে
তাদের জন্য রয়েছে একান্ত ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা’’। (সুরা
হাজ্জ : ৫০)।
তিনি আরো বলেন:
‘‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে
তাদের জন্য রয়েছে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাত’’। (সুরা লোকমান: ৮)।
উক্ত আয়াতসমূহ বিবেচনা করলে এটাই প্রমাণিত
হয় যে, অসিলা বলতে আল্লাহ্ তা’আলা নেক আমলকেই বুঝিয়েছেন। কোন পীর-বুযুর্গকে নয়।
তেমনিভাবে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সা.
ও হাদীসের মধ্যে ঈমান ও নেক আমলকে জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক বেদুইন
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন
যদি আমি তা সম্পাদন করি তবে জান্নাতে প্রবেশ করবো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে আর তার সাথে অপর কোন কিছু শরীক করবে না। ফরয সালাত আদায়
করবে, ফরয যাকাত প্রদান করবে, রমাযান মাসে সিয়াম পালন করবে। সে বলল, যাঁর হাতে আমার
প্রাণ রয়েছে তার শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে বেশী করবো না। যখন সে ফিরে গেল, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে পছন্দ করে সে যেন
এই ব্যক্তিকে দেখে নেয়। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ১৩৯৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩০৭, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১৩১২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩, আহমাদ
৫৮৩২, আধুনিক প্রকাশনীঃ নাই, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো এটাই প্রমাণ করে যে,
আল্লাহ্ তা’আলা অসিলার আয়াতে অসিলা বলতে ঈমান ও নেক আমলকেই বুঝিয়েছেন। পীর-বুযুর্গ
জাতীয় অন্য কিছুকে নয়।
(২) তারা বলে থাকে: আদম (আ.) জান্নাতে থাকাবস্থায়
নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেন। তখন তিনি
‘‘মুহাম্মাদ’’ নামের অসিলায় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ক্ষমা চাইলে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে
ক্ষমা করে দেন।
উক্ত হাদীস সকল হাদীস গবেষকের ঐকমত্যে একেবারেই
জাল ও বানোয়াট। কোনভাবেই তা বিশুদ্ধ নয়।
(৩) তারা বলে থাকে:
উসমান ইবনু হুনাইফ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে,
এক অন্ধ ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর
নবী। আমার জন্য আল্লাহ তা’আলার নিকট দু’আ করুন, যেন আমাকে তিনি আরোগ্য দান করেন। তিনি
বললেনঃ তুমি কামনা করলে আমি দুআ করব, আর তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ করতে পার, সেটা হবে
তোমার জন্য উত্তম। সে বলল, তার নিকটে দু’আ করুন।
বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে উত্তমভাবে উযূ
করার হুকুম করলেন এবং এই দুআ করতে বললেন, “হে আল্লাহ! তোমার নিকট আমি প্রার্থনা করি
এবং তোমার প্রতি মনোনিবেশ করি তোমার নবী, দয়ার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর (দু’আর) মাধ্যমে। আমি তোমার দিকে ঝুঁকে পড়লাম, আমার প্রয়োজনের জন্য আমার
প্রভুর দিকে ধাবিত হলাম, যাতে আমার এ প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়া হয়। হে আল্লাহ! আমার
প্রসঙ্গে তুমি তার সুপারিশ কবুল কর”। (সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ৩৫৭৮, সুনান ইবনু মাজাহ ১৩৮৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
মূলতঃ
উক্ত হাদীসে রাসূল (সা.) এর দো’আর অসিলা ধরা হয়েছে। তাঁর ব্যক্তি সত্তার নয়। তা না
হলে রাসূল (সা.) এর নিকট এসে তাঁর দো’আ চাওয়ার কোন মানে হয়না। কারণ, রাসূল (সা.) এর
ব্যক্তি সত্তার অসিলা তাঁর অনুপস্থিতিতেও দেয়া যেতে পারে। তাঁর উপস্থিতির প্রয়োজন হয়
না। উপরন্তু রাসূল (সা.) তার জন্য দো’আ করার ওয়াদা দিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তি সত্তার অসিলা
যথেষ্ট হলে তিনি কখনো তার জন্য দো’আ করার ওয়াদা করতেন না। তেমনিভাবে সেও আল্লাহ্ তা’আলার
নিকট তার ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর দো’আ কবুল হওয়ার মিনতি জানাতো না। কারণ, রাসূল (সা.)
এর ব্যক্তি সত্তার অসিলাই তখন তার জন্য যথেষ্ট ছিলো।
এ ছাড়াও নবী (সা.) তাঁর পুরো জীবদ্দশায় নিজ
দো’আর মধ্যে কখনো তিনি ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা বা অন্যান্য কোন সম্মানিত নবীর অসিলা ধরেননি।
তেমনিভাবে সাহাবাদের কেউ নিজ দো’আয় কখনো রাসূল (সা.) এর ব্যক্তি সত্তার অসিলা ধরেননি
অথবা তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁর মাধ্যমে কারোর জন্য আল্লাহ্ তা’আলার
নিকট দো’আ করান নি।
(খ) কোনো মৃত ব্যক্তির দো’আর অসিলা ধরা:
যেমন: রাসূল (সা.) এর কবরের পাশে গিয়ে বলা:
হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনি আমার জন্য আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে দো’আ করুন, আমি যেন অতিসত্বর
ধনী হয়ে যাই। কারণ, কোন ব্যক্তির ইন্তেকালের পর সে কোন ধরনের ইবাদাত করতে পারে না।
এ কারণেই সাহাবারা রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর পর তাঁর দো’আর অসিলা না ধরে হযরত ’আব্বাস
(রা.) এর দো’আর অসিলা ধরেছেন।
একদা ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ্) জনৈক
ব্যক্তিকে কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে শুনেছেন। সে বলছে: হে কবরবাসীরা! তোমরা
কি জানো না আমি কয়েক মাস যাবৎ তোমাদের কবরের নিকট এসে তোমাদেরকে দিয়ে শুধু আল্লাহ্
তা’আলার নিকট আমার জন্য দো’আ করাতে চাচ্ছি। তোমরা জানো কি জানোনা? ইমাম আবু হানীফা
(রাহিমাহুল্লাহ্) তার এ কথা শুনে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তারা তোমার কথার কোনো উত্তর
দেয়নি? সে বললো: না। তখন ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ্) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
‘‘দূর হও এবং তোমার হস্তদ্বয় কর্দমাক্ত হোক!
কিভাবে তুমি এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলছো যারা তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম নয়।
যারা কোনো কিছুর মালিক নয়। যারা কোন আওয়াজ শুনতে পায় না। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত
পাঠ করেন যার অর্থ: হে নবী! আপনি কবরবাসীকে কিছু শুনাতে সক্ষম হবেন না’’। (ফাতির : ২২, কিতাবুত্ তাওহীদঃ ইক্ববাল কিলানী)।
(গ) জীবিত কিংবা মৃত ওলী অথবা কোনো মূর্তির ইবাদাতের অসিলা ধরা:
এটি জঘন্যতম শির্ক। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘‘জেনে রেখো, অবিমিশ্র আনুগত্য একমাত্র আল্লাহ্
তা’আলারই জন্য। আর যারা আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কাউকে অভিভাবক বা সাহায্যকারী হিসেবে
গ্রহণ করেছে তারা বলে: আমরা তো এদের পূজা এ জন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার
সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। তারা যে বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয়ই আল্লাহ্
তা’আলা সে বিষয়ের সঠিক ফায়সালা দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা ঐ ব্যক্তিকে সঠিক পথে
পরিচালিত করেননা যে মিথ্যাবাদী ও কাফির’’। (সুরা যুমার: ৩)।
উপরোক্ত কুরআন-হাদিসের দলিল ভিত্তিক আলোচনায়
এটাই প্রমানিত যে, কোনো মৃত ব্যক্তি তথা মাজারে গিয়ে মৃত বাবাজানের অসিলা ধরে সাহায্য
চাওয়া যাবে না বা সরাসরি তাকে ডাকলে সে শুনবে না। আবার বর্তমানে বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে
যেসব কথিত পীর, অলি, সুফি সাধক আছে এরা যেহেতু কেউ নেক্কার বান্দা নয় বা মুত্তাকী নয়
তাই এদের অসিলাও ধরা যাবে না। এদের দরবারগুলো শিরক আর বিদআতে নিমজ্জিত। যেনো শয়তানের
আড্ডাখানা।
কিয়ামতে পীর অলিরা কি মুরিদদের শুপারিশ বা শাফায়েত করে জান্নাতে নিয়ে যেতে
পারবে?
শয়তান মুসলিমদেরকে পথভ্রষ্ট করে তার অভীষ্ট
লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য কৌশল হিসেবে দ্বিতীয় যে বিষয়টিকে বেছে নিয়েছে তা হচেছ-পার্থিব
ও পরকালীন বিষয়ে অলিগণের শাফা‘আত সম্পর্কিত বিষয়টি। মানুষ জীবিত থাকলে কারো পার্থিব
কোনো বিষয়ে অপর কোনো মানুষের কাছে সুপারিশ করতে পারে। অনুরূপভাবে কারো কোনো বিষয়ে আল্লাহর
কাছে দো‘আও করতে পারে। কিন্তু কোনো মানুষ মরে যাওয়ার পরেও কি জীবিত থাকার ন্যায় তার
কাছে অপর কোনো মানুষ বা আল্লাহর কাছে কোনো বিষয়ে শাফা‘আতের জন্য তার নিকট আবেদন করা
যায়? শয়তান এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ আর ওলিদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে। ইসলাম
পূর্ব যুগে খ্রিষ্টানদের মধ্যে তাদের সৎ মানুষদের ব্যাপারে এবং আরবের মুশরিকদের মধ্যেও
সৎ মানুষ ও ফেরেশতাদের নামে নির্মিত দেব-দেবীদের ব্যাপারে শাফা‘আত সম্পর্কে শয়তান যে
ধারণা দিয়েছিল, সাধারণ মুসলিমদের মাঝে ওলিদের ব্যাপারেও সে অনুরূপ ধারণা দিতে সক্ষম
হয়েছে।
শাফা‘আত সম্পর্কে আরবের মুশরিক ও খ্রিস্টানদেরকে শয়তানের দেয়া ধারণাঃ
ইসলাম পূর্ব যুগে খ্রিষ্টান এবং আরবের মুশরিকদের
মাঝে শয়তান সৎ মানুষ ও ফেরেশ্তাদের নামে নির্মিত পাথর ও গাছের মূর্তি ও প্রতিমাসমূহের
ব্যাপারে এ ধারণা দিয়েছিল যে, মানুষেরা যেমন একে অপরের নিকট তাদের মর্যাদা বলে সাধারণত
পরস্পরের পূর্বানুমতি ছাড়াই সুপারিশ করতে পারে, তেমনি তাদের এ-সব মূর্তি ও দেব-দেবীসমূহ
আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা বলে আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই মানুষের কল্যাণে সুপারিশ করতে
পারে। (ইবনু আবিল ইয্য আল-হানাফী, প্রাগুক্ত; পৃ.২৬০)।
এ ধারণার ভিত্তিতেই বিশেষ করে আরবের মুশরিকরা
তাদের দেব-দেবীদেরকে সাহায্য ও সুপারিশের জন্য আহ্বান করতো। আল্লাহ তাদের এ-জাতীয় ধারণা
ও আহবানের সমালোচনা করে বলেন:
‘‘আর তারা আল্লাহকে ব্যতীত এমন কিছুর উপাসনা
করে যারা তাদের কোনো লাভ ও ক্ষতি করতে পারে না, আর তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের
জন্য শাফা‘আতকারী’’। (আল-কুরআন, সূরা ইউনুস: ১৮)।
প্রথম অধ্যায়ে আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের ক্ষেত্রে
শির্কের বর্ণনা প্রসঙ্গে আমরা এ বিষয়টি আলোচনা করে প্রমাণ করে দেখিয়েছি যে, আল্লাহর
এ জগতে তাঁর পূর্বানুমতি ব্যতীত নিজ মর্যাদার ওসীলায় কেউ তাঁর কাছে কারো ব্যাপারে শাফা‘আত
করতে পারে-এমন ধারণা করা পরিচালনাগত শির্কের একটি প্রকার। আল্লাহর এ-জগতে কেউ এ-ভাবে
শাফা‘আত করতে পারে বলে যারা ধারণা করে, তাদের প্রশ্ন করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
‘‘এমন মর্যাদার অধিকারী কে আছে যে তাঁর (আল্লাহর)
পূর্বানুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে (কারো জন্যে) শাফা‘আত করতে পারে?’’ (আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ : ২৫৫)।
ইসলামে মৃত মানুষের এ-জাতীয় শাফা‘আতের কোনো
অস্তিত্ব না থাকলেও শয়তান পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে সাধারণ মুসলিম জনমনে তাদের ওলীদের
ব্যাপারে অনুরূপ বা এর কাছাকাছি ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে।
অলিগণের শাফা‘আত সম্পর্কে সাধারণ মুসলিমদের মাঝে শয়তানের দেয়া ধারণা
শয়তান সাধারণ মুসলিম জনমনে অলিগণের শাফা‘আতের
ব্যাপারে নিম্নরূপ ধারণা দিয়েছে:
(ক) ওলিগণ আল্লাহ তা‘আলা ও সাধারণ মানুষের
মাঝে মধ্যস্থতাকারী হওয়ায় মৃত্যুর পরেও তাঁরা নিজ নিজ মর্যাদা বলে মানুষের পার্থিব
সমস্যাদি সমাধানের ক্ষেত্রে আল্লাহর নিকট শাফা‘আত করে থাকেন।
(খ) আখেরাতে তাঁদের কোনো ভয়-ভীতি না থাকায়
সে-দিন তাঁরা কেবল তাঁদের ভক্তদের মুক্তির চিন্তায় ব্যস্ত থাকবেন।
(গ) তাঁদের অনুসারী বা ভক্তদের মাঝে যারা জাহান্নামে
যাওয়ার ফয়সালা প্রাপ্ত হবে, তাদেরকে তাঁরা নিজ নিজ মর্যাদা বলে শাফা‘আত করে জাহান্নামে
প্রবেশ করা থেকে রেহাই দিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাবেন।
ওলিদের শাফা‘আতের ব্যাপারে এ-জাতীয় ধারণা সাধারণ
মুসলিম জনমনে অত্যন্ত প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। যার কারণে পার্থিব
সমস্যাদি সমাধানের জন্য যেমন তাদেরকে জীবিত ও মৃত ওলি ও পীরদের দরবার ও কবরে যেতে দেখা
যায়, তেমনি ওলিদের পরকালীন শাফা‘আত প্রাপ্তির আশায় তাদেরকে দেশের বাইরের বড় বড় ওলিদের
কবরে গমন করা ছাড়াও দেশের মধ্যকার মৃত ওলিদের কবর এবং জীবিত তথাকথিত ওলি সাঈদাবাদী
ও দেওয়ানবাগী ...ইত্যাদি পীরের দরবারেও ভীড় জমাতে দেখা যায় এবং সেখানে যেয়ে নানাভাবে
তাঁদের তা‘যীম ও সম্মান করে তাদের ইহ-পরকালীন সমস্যাদির ক্ষেত্রে তাঁদের নিকট সুপারিশ
কামনা করতে দেখা যায়। হাজীগণ যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কা‘বা শরীফের উদ্দেশ্যে
হজ্জের সময় কুরবানীর জন্তু সাথে নিয়ে মিনা উপত্যকায় গমন করেন, তেমনিভাবে অনেক মুসলিমদেরকে
ওলিদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে বার্ষিক ওরস উপলক্ষে ওরসের স্থলে
বা দরবারে গরু, ছাগল, ভেড়া ও টাকা-কড়ি মানত ও হাদিয়া হিসেবে নিয়ে যেয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতা
ও নিষ্ঠার সাথে কুরবানী করতে দেখা যায়। এ-ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরো কিছু ভণ্ড
পীর রয়েছে, যাদেরকে শরী‘আতের চেয়ে মা‘রিফাত নিয়েই অধিক ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। আখেরাতে
বড়পীর আব্দুল কাদির জীলানী ও খাজা মঈনুদ্দিন চিশ্তীর শাফা‘আতে মুক্তির আশায় তাঁদের
মৃত্যু দিবস উপলক্ষে তাদেরকে ওরস পালন করতেও দেখা যায়। মাঝে-মধ্যে তাঁদের কবর যিয়ারতে
যাওয়ার সময় তা পত্রিকান্তরে প্রচার করেও যেতে দেখা যায়।
শয়তানের দেয়া এ তিনটি ধারণার অসারতা:
শয়তানের দেয়া এ তিনটি ধারণার মধ্যকার প্রথমটির
অসারতা আমরা এ অধ্যায়েরই দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণনা করেছি। বাকী দু’টি ধারণার অসারতা
ইন-শাআল্লাহ শাফা‘আত সম্পর্কে ইসলামের মূলকথা কী, তা বর্ণনার সময় প্রমাণ করবো।
কোনো কোনো শরী‘আতী পীরদের দৃষ্টিতে শাফা‘আতঃ
শরী‘আত পালন করেন এমন এক শ্রেণীর পীরগণকেও
শয়তান তাঁদের নিজেদের এবং তাদের শাফা‘আতের ব্যাপারে তাদেরকে মারাত্মক বিভ্রান্তির মধ্যে
ফেলে রেখেছে। তাদের নিজেদের ব্যাপারে তাদেরকে এমন ধারণা দিয়েছে যে, তারা আল্লাহর উপাসনা
ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করার ফলে আল্লাহর ওলিতে পরিণত হয়েছেন। যার ফলে আখেরাতে তাদের
নিজেদের মুক্তির বিষয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। সে দিন তারা শুধু নিজেদের মুরীদদের মুক্তির
ব্যাপার নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকবেন। হাশরের ময়দানে হিসাব-নিকাশ চলাকালে তাদের কোনো ভক্তের
পা পিছলে গেলে তাঁরা তাকে হাত ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। উদাহরণস্বরূপ চরমোনাইর
পীর মাওলানা মুহাম্মদ এছহাক মরহুমের কথাই বলা যায়, তিনি একাধিক পীরের হাতে বায়‘আত করা
বৈধ হওয়া ও এর উপকারিতা বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বীয় পীর মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.)
সাহেবের একটি বক্তব্য উপস্থাপন করেন। মাওলানা কারামত আলী বলেন:
‘‘একদা আমার পীর মাওলানা সৈয়দ আহমদ সাহেব-এর
কাছে কোনো এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন যে, হুজুর যেসব লোক দুই তিন পীরের কাছে মুরীদ
হন, কেয়ামতের দিন পীরগণ ঐ মুরীদকে আপন আপন দিকে টানাটানি করিয়া ছিড়িয়া ফেলিবে নাকি
? তখন উত্তর করিলেন, কেয়ামতের দিন পা পিছলাইয়া যাওয়ার দিন; টানাটানি করিয়া ছিঁড়িয়া
ফাড়িয়া ফেলিবার দিন নহে। যখন কোনো ব্যক্তির পা পিছলাইয়া যায়, তখন একা এক ব্যক্তি হাত
ধরিয়া তাহাকে সাহায্য করিলে তাহার খুব শক্তি হয়, কিন্তু যখন দুই-তিন ব্যক্তি তাহার
হাত ধরে, তখন তাহার শক্তি আরও বাড়িয়া যায়। মাওলানা কারামত আলী মরহুম সাহেব এই কথার
উত্তরে বলেন, ছোবহানাল্লাহ ! কি সুন্দর দেল আকর্ষণীয় উত্তর দিয়াছেন। সত্যই কেয়ামতের
অবস্থা এইরূপ হইবে এবং আল্লাহর হুকুমে সেই দিন নিঃসন্দেহে পীরগণ থেকে সাহায্য পাওয়ার
আশা করা যায় এবং তিনি দো‘আ করিয়া বলেন, আল্লাহ পাক হক্কানী পীরদের উপর মুরীদদের এ‘তেকাদ
ঠিক রাখুন’’। (মাওলানা মুহাম্মদ এছহাক, ভেদে মা‘রেফত; পৃ.২৫-২৬)।
হাশরের ময়দানে পীরদের কর্তৃক মুরীদদের সাহায্য
ও সহযোগিতা সংক্রান্ত.কোন কোনো পীরগণের উক্ত বিশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য করলে কয়েকটি বিষয়
প্রমাণিত হয়। যেমন:
ওলি ও পীরগণ নিজেদেরকে একেকজন কামিল মানুষ
বলে মনে করেন। অথচ কুরআনের শিক্ষানুযায়ী কারো পক্ষে নিজের ব্যাপারে এমন ধারণা করা সঠিক
নয়।
হাশরের ময়দানের ভয়াবহ অবস্থা দৃশ্যে তাদের
মনে নিজেদের মুক্তির ব্যাপারে কোনো ভয়-ভীতির উদ্রেক হবে না। অথচ কুরআন শরীফে হাশরের
ময়দানে সকল মানুষের যে অবস্থার কথা বর্ণিত হয়েছে, তা সে বর্ণনার পরিপন্থী।
তারা হাশরের ময়দানে বিচার চলাকালীন সময়ে তাদের
বিপদগ্রস্ত মুরীদদের ব্যাপারে সুপারিশ করার অনুমতি পাবার ব্যাপারে নিশ্চিত। অথচ হাদীসের
বর্ণনানুযায়ী হাশরের ময়দানে কোনো ওলির এ-জাতীয় শাফা‘আত স্বীকৃত নয়। বরং তাঁদের শাফা‘আত
স্বীকৃত হয়েছে কেবল জাহান্নামীদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ব্যাপারে। যা আমরা পরবর্তী
আলোচনার দ্বারা জানতে পারবো।
কোনো মানুষই নিজেকে সৎ মানুষ বা মুত্তাকী বা জান্নাতী হওয়ার সনদ দিতে পারে
না
মানুষ যতই আল্লাহর উপাসনা ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন
করুক না কেন, বেশী হলে সে তার ‘আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে
পারে। কোনো অবস্থাতেই তা গৃহীত হয়েছে বলে নিশ্চিত হতে পারেনা। তার ‘আমলের অবস্থা যা-ই
হোক না কেন, তিনি এ নিয়ে কোনো প্রকার আত্মতৃপ্তিও বোধ করতে পারেন না। নিজেকে আল্লাহর
কাছে অতি সম্মানী ও মর্যাদাবান বলেও মনে করতে পারেন না। কেননা, কে প্রকৃত মুত্তাকী
ও পরহেজগার তা কেবল আল্লাহই ভাল করে জানেন। কেউই নিজেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার সনদ দিতে
পারে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
অতএব তোমরা নিজেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার সনদ দান করো না, তোমাদের মধ্যে কে মুত্তাকী তা তিনিই ভাল করে জানেন’’। (আল-কুরআন, সূরা: নাজম: ৩২)।
একজন মু’মিন যখন এ-কথা বলতে পারে না যে, আমি
একজন মুত্তাকী ও পরহেজগার হয়ে গেছি, তখন সে তো কখনও নিজেকে আল্লাহর কাছে বড় মর্যাদার
অধিকারী বলেও ভাবতে পারে না। সে নিজের মর্যাদার ওসীলায় আখেরাতে মানুষের মুক্তির জন্য
শাফা‘আত করা নিয়ে ভাবা তো দুরের কথা, এ দুনিয়াতেও সে তার নিজের মর্যাদা ও সম্মানের
দোহাই দিয়ে আল্লাহর কাছে তার নিজের বা পরের জন্য কিছু চাওয়াকেও বৈধ মনে করতে পারে না।
বরং এ-জাতীয় চাওয়াকে সে আল্লাহর সমীপে বেআদবী ও অনধিকার চর্চা করা বলেই গণ্য করবে।
এ-সব চিন্তা-ভাবনা করার বদলে একজন মু’মিনের অন্তর সর্বদা আল্লাহর কাছে বিনয়ী হয়ে থাকবে।
আল্লাহর শাস্তির ভয়ে তার অন্তর সর্বদা আতঙ্কিত থাববে। কখনও নিজেকে আল্লাহর শাস্তি থেকে
নিরাপদ ভাবতে পারবে না।
যেমন এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
‘‘এবং যারা প্রতিফল দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস
করে এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তি সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত, নিশ্চয় তাদের পালনকর্তার
শাস্তি থেকে শঙ্কাহীন থাকা যায় না’’। (আলকুরআন, সূরা: মা’আরিজ:২৭-২৯)।
এই যদি হয় একজন প্রকৃত মু’মিনের বৈশিষ্ট্য
তখন একজন পীর আখেরাতে কীভাবে নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে এতো নিরাপদ ভাবতে পারেন।
সত্যিই তা আশ্চর্যের বিষয়!
কুরআন ও হাদীসের আলোকে শাফা‘আতের মূলকথা
কুরআন ও হাদীস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে,
ইসলাম শাফা‘আত বা সুপারিশকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছে:
(এক) দুনিয়াবী বিষয়ে শাফা‘আত।
(দুই) পরকালীন বিষয়ে শাফা‘আত।
দুনিয়াবী বিষয়ে পরস্পরের নিকট শাফা‘আত করা
বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ:
শাফা‘আত যদি পার্থিব কোনো বিষয়ে কোনো জীবিত
মানুষের কাছে চাওয়া হয়, তবে নিম্নে বর্ণিত শর্ত সাপেক্ষে তা চাওয়া ও করার বৈধতা রয়েছে:
প্রথম শর্ত:
এ শাফা‘আতটি কোনো উপকারী বিষয়ে এবং কারো এমন
কোনো অধিকারের ক্ষেত্রে হতে হবে যা নষ্ট হয়ে গেছে অথবা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় শর্ত:
তা যেন কোনো অপরাধমূলক কাজে বা শরী‘আতের কোনো
হদ (শাস্তি) রহিতকরণের ক্ষেত্রে না হয়।
তৃতীয় শর্ত:
যার নিকট শাফা‘আত চাওয়া হবে তিনি স্বাভাবিক
কার্যক্রমের মাধ্যমে শাফা‘আত করবেন এমন ধারণার ভিত্তিতে তার নিকট শাফা‘আত কামনা করতে
হবে। কোনো প্রকার কারামত বা অলৌকিক পন্থা অবলম্বনের ধারণায় নয়।
কারো শাফা‘আত যদি উক্ত শর্তসমূহ পূর্ণ করে
তা হলে তা যেমন একটি কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য কাজ হবে, তেমনি এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার
নিকট থেকে পুণ্য পাওয়ারও আশা করা যাবে। অন্যথায় তা পাপের কাজ হিসেবে গণ্য হবে। এ-জাতীয়
শাফা‘আত প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘যে লোক সৎ কাজের জন্য কোনো শাফা‘আত করবে,
তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক কোনো মন্দ কাজের জন্য শাফা‘আত করবে, সে তার বোঝারও
একটি অংশ পাবে’’। (আল-কুরআন, সূরা নিসা : ৮৫)।
উল্লেখ্য যে, এ-জাতীয় শাফা‘আত কোনো জীবিত অনুপস্থিত
অথবা মৃত মানুষের নিকট চাওয়া যায় না। কেননা, তা তাদের নিকট কামনা করা তাদেরকে গায়েবের
জ্ঞানী বলে বিশ্বাস করার নামান্তর। আর কারো ব্যাপারে এমন ধারণা করা জ্ঞানগত শির্কের
অন্তর্গত।
দুনিয়াবী বিষয়ে আল্লাহর কাছে শাফা‘আত
কোন জীবিত মানুষের নিকট যেয়ে দুনিয়াবী কোনো
বিষয়ে আল্লাহর কাছে সুপারিশ বা শাফা‘আত করার জন্য তাকে বলা যেতে পারে। তিনিও দু’টি
কথা বলে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তির জন্য শাফা‘আত করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শাফা‘আতকারীর
সবচেয়ে পরহেজগার হওয়া কোনো জরুরী ব্যাপার নয়। বরং অপেক্ষাকৃত কম পরহেজগার লোকের কাছেও
এ-জাতীয় শাফা‘আত চাওয়া যেতে পারে। কেননা, আল্লাহর কাছে শাফা‘আতের ক্ষেত্রে মূল ওসীলা
হচ্ছে ব্যক্তির মুখের দুটি কথা, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, তার মর্যাদা ও সম্মান নয়। কোনো
দুনিয়াবী বিষয়ে শাফা‘আত করার জন্য কোনো অনুপস্থিত বা মৃত মানুষের কাছে কোনো আবদার করা
যায়না। কেননা, জীবিতরা কোনো গায়েবের আওয়াজ শুনতে পারেন না। আর মৃতদের কবরের পার্শ্বে
যেয়ে তাদের কাছে সুপারিশের জন্য কোনো আবেদন করলে কুরআনের কথানুযায়ী তারা কারো কোনো
আবেদন শুনতে পান না, পেলেও তারা কারো আবেদনে সাড়া দিতে পারেন না। এ সম্পর্কে কুরআনে
বলা হয়েছে:
মৃত মানুষেরা উপকার করতে পারে এ ধারণার ভিত্তিতে
তাদের নামে নির্মিত মূর্তিকে লক্ষ্য করে ‘‘তোমরা যদি তাদেরকে উপকারের জন্য আহবান কর,
তা হলে তারা তোমাদের আহবান শ্র্রবণ করবে না, শুনলেও তারা তোমাদের আহবানে সাড়া দেবে
না। (তাদেরকে আহবানজনিত কারণে তোমরা যে শির্ক করেছ) কেয়ামতের দিন তারা তোমাদের সে শির্ককে
অস্বীকার করবে’’। অর্থাৎ বলবে: আমরা তোমাদেরকে আমাদেরকে আহবানের কথা শিক্ষা দেই নি।
এটি তোমাদের মনগড়া কাজ বৈ আর কিছুই নয়। (আল-কুরআন, সূরা ফাত্বির : ১৪)।
সকল মানুষই মরে যাওয়ার পর বরযখী জীবনে তারা
নিজের বা পরের উপকারে আসতে পারে এমন কোনো কর্ম করতে পারেন না। তাদের রূহ স্বেচ্ছা প্রণোদিত
হয়ে আমাদের জন্যে কোনো কল্যাণ কামনা করে দো‘আ করলেও আল্লাহর নিকট এর কোনো কার্যকারিতা
নেই। কেননা, কবরের জীবন সে রকম কোনো ‘আমলের জীবন নয়। এ-জন্যই রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-বা কোনো ওলির কবরে গিয়ে বা দূর থেকে তাঁদের কাছে নিজের জন্য কোনো দো‘আ করার
আবেদন করা যায় না। সাহাবা ও তাবেঈগণের যুগে মুসলিমরা বহুবিধ সমস্যায় পতিত হয়েছিলেন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা কখনও রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর
মুবারকে যেয়ে তাঁর নিকট সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করার ব্যাপারে কোনো
আবেদন করেছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
আখেরাতে আল্লাহর কাছে শাফা‘আত
জীবিত থাকাবস্থায় কোনো দুনিয়াবী বিষয়ে শাফা‘আতের
ক্ষেত্রে বিষয়টি যদি উপরে বর্ণিত শর্ত পূর্ণ করে, তা হলে এমন বিষয়ে আল্লাহর কাছে শাফা‘আত
করার ব্যাপারে তাঁর আগাম অনুমতি রয়েছে। আমরা ইচ্ছা করলেই পরস্পরের জন্য এমন কোনো বিষয়ে
আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করতে পারি। কিন্তু আখেরাতে আল্লাহর কাছে শাফা‘আতের বিষয়টি দুনিয়াবী
শাফা‘আত থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কেননা, এ দিনে শাফা‘আতের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে
আল্লাহ তা‘আলার হাতে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই তিনি বলেছেনঃ
‘‘আপনি বলে দিন- শাফা‘আতের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে
আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন’’। (আল-কুরআন, সূরা দুখান: ৩৯)।
এ দিনে কেউ তার নিজের মর্যাদা ও সম্মানের দিক
বিবেচনা করে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে তার নিজের বা পরের জন্য কোনো সুপারিশ
করাতো দুরের কথা, এ দিনে কেউ তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোনো কথাই বলতে পারবে না। এ দিবসের
অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘যখন সেই দিন আসবে, তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত
কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না।’’ (আল-কুরআন, সূরা হুদ: ১০৫)।
আল্লাহর ভাষায়ঃ
‘‘সে দিন সকল মানুষেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে,
যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে’’। (আল-কুরআন, সূরা আবাসা:
৩৭)।
সে দিন কাফির ও মু’মিন নির্বিশেষে কারো জন্যে
কারো শাফা‘আত থাকবে না। সে-জন্য সে দিনে কারো শাফা‘আতের আশায় না থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
গ্রহণ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরক নির্দেশ করে বলেছেন:
‘‘হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে জীবিকা দান
করেছি তাত্থেকে তোমরা ব্যয় কর সে-দিন আগমনের পূর্বে যেদিন থাকবে না কোনো (পুণ্যের)ক্রয়-বিক্রয়,
কোনো বন্ধুত্ব ও শাফা‘আত’’। (আল-কুরআন, সূরা বাকারা: ২৫৪)।
সে-দিনটি এমন যে, সে-দিনে একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত
মানুষের জন্য কোনো বন্ধু ও শাফা‘আতকারী থাকবে না। যেমন আল্লাহ বলেন:
‘‘এ কুরআনের দ্বারা আপনি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন
করুন যারা তাদের প্রতিপালকের কাছে এমন অবস্থায় একত্রিত হওয়াকে ভয় করে যখন তাদের কোনো
বন্ধু ও শাফা‘আতকারী থাকবে না, হতে পারে এতে তারা ভীত হবে’’। (আল-কুরআন, সূরা আন‘আম: ৫১)।
সে দিন এমন যে, জান্নাতীদের জান্নাতে চলে যাওয়ার
পর যখন তারা তাদের জাহান্নামবাসী আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের জন্য শাফা‘আত করার অনুমতি
পাবেন, তখন তারা তাদের স্বজনদের অপরাধের খবর না জেনে কোনো দেবতা, প্রতিমা, কবর ও কবর
পূজারী আত্নীয়ের জন্য আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করলে তাদের সে শাফা‘আত আল্লাহ তা‘আলার নিকট
গৃহীত হবে না। যেমন আল্লাহ বলেন:
‘‘অতএব (মুশরিকদের জন্য) কোনো সুপারিশকারীদের
সুপারিশ কাজে আসবে না’’। (আল-কুরআন, সূরা মুদ্দাসি্সর: ৪৮)।
মুশরিকরা আজ যাদেরকে আল্লাহর শরীক করে নিয়েছে
এবং যাদেরকে আজ তাদের মর্যাদার ওসীলায় তাদের দুনিয়াবী উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আল্লাহর
কাছে শাফা‘আতকারী বলে ভাবছে, কাল আখেরাতের ভয়াবহ দিনে তারা তাদের কথা স্মরণ করলেও তারা
তাদেরকে শাফা‘আতকারী হিসেবে পাবে না। বরং সে দিন সবকিছু তাদের ধারণার বাইরে দেখে মুশরিকরা
তাদের শরীকদের অস্বীকার করবে। আত্মরক্ষার জন্য তারা বলবে:আমরা তাদেরকে আল্লাহর সাথে
কখনও শরীক করিনি। যেমন আল্লাহ বলেন:
‘‘আর যেদিন আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করব,
অতঃপর যারা শির্ক করেছিল, তাদেরকে বলব: যাদেরকে তোমরা অংশীদার বলে ধারণা করতে, তারা
(এখন) কোথায়? অতঃপর তাদের শির্কের পরিণাম এ-কথা ব্যতীত আর কিছুই হবে না যে, তারা বলবে:
হে আমাদের প্রতিপালক ! আল্লাহর শপথ, আমরা মুশরিক ছিলাম না। লক্ষ্য করে দেখ, কিভাবে
তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলবে। আর তারা তাদের দেবতাদের শাফা‘আতের ব্যাপারে
যে মিথ্যা কথা রচনা করেছিল, তা (এখন) তাদের থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে’’। (আল-কুরআন, সুরা আন’আম: ২২-২৫)।
অর্থাৎ তা মিথ্যায় প্রতিফলিত হলো।
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন: ‘‘যেদিন কেয়ামত সংঘটিত
হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে। তারা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করে নিয়েছিল তাদের মধ্যকার
কেউ তাদের সুপারিশকারী হবে না, (অবস্থা বেগতিক দেখে) তারা তাদের শরীকদের অস্বীকার করবে’’।
(আল-কুরআন, সূরা রুম : ১২)।
অর্থাৎ তখন তারা মিছেমিছি বলবে: আমরা তাদেরকে
আল্লাহর সাথে কখনও শরীক করিনি।
যারা ওলিদেরকে আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী মনে
ক’রে তাঁদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে, আখেরাতে ওলিগণ সে-সব লোকদের শত্রুতে পরিণত
হবেন।
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ
‘‘সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে
পারে যে আল্লাহকে ব্যতীত এমন কাউকে আহ্বান করে যে কেয়ামত পর্যন্ত তার আহবানে সাড়া দেবে
না? তাঁরা তো তাদের আহ্বান সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর। যখন মানুষদেরকে হাশরের দিন একত্রিত
করা হবে, তখন তাঁরা তাদের শত্রু হবে এবং তাঁরা তাদের উপাসনাকে অস্বীকার করবে’’। (আল-কুরআন, সূরা আহক্বাফ: ৫-৬)।
সাধারণ মুশরিক ও মুসলিম মুশরিকরা আখেরাতে যে অবস্থায় হাজির হবে
সেদিন ইসলাম পূর্ব যুগের মুশরিক এবং ইসলাম
পরবর্তী যুগের মুসলিম মুশরিক সকলেই আল্লাহর সমীপে তাদের সুপারিশকারীগণ ছাড়াই একাকী
হাজির হবে, তাদের সাথে তাদের সম্পর্ক পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাদের এ অবস্থা
দৃশ্যে মহান আল্লাহ্ বলবেন:
‘‘তোমরা আমার কাছে এমনভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে এসেছ
যেমনভাবে আমি প্রথমবার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছিলাম তা তোমরা
পশ্চাতেই রেখে এসেছ। আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সুপারিশকারীদেরকে দেখছি না, যাদের
সম্পর্কে তোমাদের দাবী ছিল যে, তারা তোমাদের ব্যাপারে (আমার) অংশীদার। বাস্তবিকই তোমাদের
পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমাদের দাবী উধাও হয়ে গেছে’’। (আল-কুরআন, সূরা আনআম: ৯৪)।
সে দিন এমন যে, তাতে একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত
কারো জন্যে অন্য কোনো সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী থাকবে না।
যেমন আল্লাহ বলেন: ‘‘তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য
কোনো সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী নেই’’। (আল-কুরআন, সূরা সেজদা:
৪)।
এ-সব আয়াতসমূহ দ্বারা যে-সব বিষয়াদি প্রমাণিত
হয় তা হলো নিম্নরূপঃ
১. আখেরাতে শাফা‘আতের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে
আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাপার। সে দিন কেবল তিনি ব্যতীত মানুষের জন্য স্বেচ্ছা প্রনোদিত
অপর কোনো বন্ধু বা সুপারিশকারী থাকবে না।
২. সে দিন একমাত্র রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ব্যতীত অন্যান্য সকল নবী ও ওলিগণ সাধারণ মানুষের ন্যায় নিজের পরিণতি
নিয়েই উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্যে সময় অতিবাহিত করবেন। তাঁরা আল্লাহর শাস্তির ভয়ে আতঙ্কিত
থাকবেন। আখেরাতে সৎমানুষ বা অলিগণের জন্য আল্লাহর অভয়বাণী থাকলেও তাদের জন্য জান্নাতের
ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তারা এ উৎকন্ঠার মধ্যেই সময় অতিবাহিত করবেন। সে-জন্য এ সময়ে
তাঁদের পক্ষে অন্যের মুক্তির ব্যাপারে চিন্তা করারও কোনো অবকাশ থাকবে না।
২. সেদিন মুশরিক ও মু’মিন নির্বিশেষে সকল মানুষের
জন্য তাদের ঈমান ও ‘আমল ব্যতীত অপর কোনো সাহায্যকারী, শাফা‘আতকারী ও বন্ধু থাকবে না।
৩. সে দিন কেউই আল্লাহর কাছে তার নিজের মর্যাদা
ও সম্মানের দিক বিবেচনা করে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তার নিজের বা অপর কারো কোনো বিষয়ে
কোনো কথা বলতে পারবে না।
৪. সেদিন প্রত্যেক মানুষ নিজের কর্মের হিসেব
প্রদানের জন্য আল্লাহর সম্মুখে একাকী হাজির হবে। কারো সাথে কোনো সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী
থাকবে না।
৫. মুশরিকরা যে-সব মৃত সৎ মানুষ ও ফেরেশ্তাদের
দেব-দেবী এবং জিনদেরকে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী ব’লে মনে করে তাদেরকে সাহায্যের
জন্য আহ্বান করতো, আখেরাতে তারা তাঁদেরকে সুপারিশকারী হিসেবে পাবে না। এমনকি সে দিন
তাদের পরস্পরের মধ্যে কোনো সম্পর্কও থাকবে না। অনুরূপভাবে ইসলাম পরবর্তী যুগে তথাকথিত
অলি, গউছ ও কুতুব নামের যাদেরকে ইহকাল ও আখেরাতে সাধারণ মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে
সুপারিশাকরী বলে মনে করে তাঁদেরকে সুপারিশের জন্য আহ্বান করা হচ্ছে, আখেরাতে তাঁদেরকেও
সুপারিশকারী হিসেবে পাওয়া যাবে না। বরং যারা তাঁদেরকে উক্ত ধারণার ভিত্তিতে সাহায্য
ও সুপারিশের জন্য আহ্বান করছে, আখেরাতে তারা তাঁদের সুপারিশ পাওয়া তো দুরের কথা, তখন
তাঁরা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবেন।
৬. যারা জান্নাতে যাওয়ার পর অন্যের জন্য সুপারিশের
অনুমতি পাবেন, তাঁরা না জেনে কোনো মুশরিকদের জন্য সুপারিশ করলে তাদের সে সুপারিশ কারো
কোনো উপকারে আসবে না।
কারা আখেরাতে শাফা‘আতের অনুমতি পাবেন
আখেরাতে কেবল তারাই শাফা‘আতের অনুমতি পাবেন
যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা শাফা‘আতের অনুমতি প্রদান করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
‘‘তাঁর কাছে কেবল তাদের সুপারিশই উপকারী হবে,
যাদেরকে তিনি সুপারিশ করার জন্য অনুমতি দেবেন’’। (আল-কুরআন,
সূরা সাবা: ২৩)।
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন:
‘‘দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার
কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন, কেবল সে ব্যতীত সে দিন কারো সুপারিশ সেদিন কারো উপকারে আসবে
না’’। (আল-কুরআন, সূরা ত্বা-হা: ১০৯)।
আখেরাতে যারা শাফা‘আতের অনুমতি পাবেন কুরআন
ও হাদীসের বর্ণনানুযায়ী তাঁরা হলেন: রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-,
মু’মিন, মু’মিনদের মৃত নাবালক শিশু, কুরআন, রোযা, জান্নাত, জাহান্নাম ও শহীদগণ। তবে
সকলের শাফা‘আতের সময় এক নয়। বরং তাদের শাফা‘আত দু’টি পর্যায়ে বিভক্ত।
শাফা‘আতের প্রথম পর্যায়ঃ
শাফা‘আতে ছুগরাঃ
শাফা‘আতে ছুগরা বলতে জান্নাত প্রাপ্তির জন্য,
মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য বা শাস্তি লাঘবের জন্য যে সুফারিশ
করা হবে সে সুফারিশকে শাফা‘আতে ছুগরা বলা হয়। এই শাফা‘আত যেমন স্বয়ং আল্লাহ, তার নবী-রাসূল,
মুমিনগণ, শহীদগণ বা শিশুকালে মৃত বাচ্চারা করবে, তেমনি সৎ আমল, কুরআন ও ছিয়ামও শাফা‘আত
করবে।
(১) আল্লাহর শাফা‘আতঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ
তা‘আলা তার বিশেষ রহমতের মাধ্যমে বহু লোককে ক্ষমা করে দিবেন। সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে
শাফা‘আত হিসাবে গণ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তুমি বল, সকল প্রকার সুফারিশ কেবল আল্লাহর
ইচ্ছাধীন। তারই জন্য নভোমন্ডল ও ভূমলন্ডলের রাজত্ব। অতঃপর তাঁর নিকটেই তোমরা ফিরে যাবে।
(সুরা যুমার ৩৯/৪৪)।
অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ তার নিকট
কোনো সুপারিশ করতে পারে না। (সুরা বাক্বারাহ ২/২৫৫; আয়াতুল
কুরসী)।
তাহ’লে আউলিয়ারা সুফারিশ করবেই। এরূপ নিশ্চয়তা
মুশরিকরা পেল কোথায়?
আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে,
তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আমাদের কাছে না আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা
এ স্থানে অপেক্ষা করব। যখন আমাদের রব আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারব। আর আবূ সাঈদ
(রাঃ)-এর বর্ণনাতে আছে, আল্লাহ তআলা প্রশ্ন করবেন, তোমাদের এবং তোমাদের প্রভুর মধ্যে
এমন কোন চিহ্ন আছে কি, যাতে তোমরা তাকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যা, তখন আল্লাহ তা’আলা
স্বীয় পায়ের নলা উন্মোচিত করবে। তখন যে ব্যক্তি সচ্ছতার সাথে আল্লাহ তা’আলাকে সিজদাহ্
করত, শুধু তাকেই আল্লাহ তা’আলা সিজদার অনুমতি দেবেন। আর যারা কারো প্রভাবে বা ভয়ে
কিংবা মানুষকে দেখানোর জন্য সিজদাহ্ করত, তারা থেকে যাবে। তাদের মেরুদণ্ডের হাড়কে
আল্লাহ তা’আলা একটি তক্তার মতো শক্ত করে দেবেন, বরং যখনই সিজদাহ্ করতে চাবে, তখনই পিছনের
দিকে চিৎ হয়ে পড়ে যাবে। অতঃপর জাহান্নামের উপর দিয়ে পুলসিরাত পাতা হবে এবং শাফা’আতের
অনুমতি দেয়া হবে। তখন নবী-রাসূলগণ (স্ব-স্ব উম্মতের জন্য) এ ফরিয়াদ করবেন, হে আল্লাহ!
নিরাপদে রাখ! নিরাপদে রাখ! এ পুলসিরাতের উপর দিয়ে মু’মিনদের কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুতের
গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ পাখির গতিতে এবং কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে আবার কেউ
উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ নিরাপদে বেঁচে যাবে। আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে
যে, তার দেহ ক্ষত-বিক্ষত হবে এবং কেউ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে জাহান্নামে পড়বে।
অবশেষে মু’মিনগণ যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি
লাভ করবে। সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের যে কেউ নিজের অধিকারের
দাবিতে কত কঠোর, তা তো তোমাদের কাছে পরিষ্কার। কিন্তু কিয়ামতের দিন মু’মিনগণ তাদের
সেই সকল ভাইদের মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে আরো অধিক ঝগড়া করবে, যারা তখনো জাহান্নামে
পড়ে রয়েছে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! এ সকল আমাদের সাথে সিয়াম রাখত, সালাত আদায়
করত এবং হজ্জ আদায় করত। (অতএব তুমি তাদেরকে মুক্তি দাও) তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন,
যাও তোমরা। যাদেরকে চিন তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে আন, তাদের চেহারা-আকৃতি পরিবর্তন
করা জাহান্নামের আগুনের উপর হারাম করা হবে। তখন তারা জাহান্নাম থেকে বহু সংখ্যক লোককে
বের করে আনবে। অতঃপর বলবে, হে আমাদের প্রভূ! এখন সেখানে এমন আর একজন লোকও অবশিষ্ট নেই
যাদেরকে বের করার জন্য আপনি আদেশ দিয়েছেন। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আবার যাও, যাদের
হৃদয়ে এক দানার পরিমাণ ঈমান পাবে তাদের সকলকে বের করে আন। তাতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে
বের করে আনবে।
তারপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আবার যাও, যাদের
হৃদয়ে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে তাদের সকলকে বের করে আন। অতএব তাতেও বহু সংখ্যককে
বের করে আনবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আবারো যাও, যাদের হৃদয়ে এক বিন্দু পরিমাণ
ঈমান পাবে তাদের সকলকে বের করে আন। এবারও তারা বহু সংখ্যককে বের করে এনে বলবে, হে আমাদের
প্রভু! ঈমানদার কোন ব্যক্তিকেই আমরা আর জাহান্নামে রেখে আসিনি।
তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ),
নবীগণ এবং মুমিনগণ সকলেই শাফা’আত করেছেন, এখন এক ’আরহামুর রহিমীন’ তথা আমি পরম দয়ালু
ছাড়া আর কেউই অবশিষ্ট নেই- এই বলে তিনি মুষ্টিভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের
করবেন যারা কখনো কোন ভালো কাজ করেনি। যারা জ্বলে-পুড়ে কালো কয়লা হয়ে গেছে। অতঃপর
তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখ ভাগের একটি নহরে নিক্ষেপ করবেন, যার নাম হলো ’নহরে হায়াত’।
এটাতে থেকে তারা স্রোতের ধারে যেমনভাবে ঘাসের বীজ গজায় তেমনিভাবে বের হয়ে আসবে এবং
তারা মুক্তার মতো (চকচকে অবস্থায় বের হবে) তাদের স্কন্দ্বে সিলমোহর থাকবে। জান্নাতবাসীগণ
তাদের দেখে বলবে, এরা পরম দয়ালু আল্লাহর আজাদকৃত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ
করিয়েছেন, অথচ তারা পূর্বে কোন ’আমল বা কল্যাণকর কাজ করেনি। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে,
এই জান্নাতে তোমরা যা দেখছ, তা তোমাদেরকে দেয়া হলো এবং এর সাথে অনুরূপ পরিমাণ আরো
দেয়া হলো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৫৭৯, সহিহ বুখারী
৮০৬, সহিহ মুসলিম ২৯৯-(১৮২), আবূ দাউদ ৭৭০৩, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২০৮৫৬, সহীহ আত্
তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৬১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হাশরের ময়দানে যারা শাফা‘আতের অনুমতি পাবেন
যারা হাশরের ময়দানে হিসাব-নিকাশ চলাকালীন শাফা‘আত
করবেন, বিভিন্ন হাদীসের বর্ণানানুযায়ী তারা হলেন নিম্নরূপঃ
রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
শাফা‘আত:
বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হাশরের
ময়দানে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একাধিক শাফা‘আত রয়েছে। সেগুলো
হলো:
(২) শাফা‘আতে কুবরা বা বড় শাফা‘আত:
তাঁর প্রথম এ শাফা‘আতটি হবে হাশরের মাঠের ভয়াবহ
অবস্থা থেকে সমগ্র হাশরবাসীদের মুক্তির জন্যে। হাশরবাসীরা যখন আদম আলাইহিসি সালাম থেকে
আরম্ভ করে একে একে নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম-এর কাছে গিয়ে তাদের এ
অবস্থা থেকে উত্তরণ করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করার জন্য আবেদন করবেন, তখন
তাঁরা সবাই নিজেদের ত্রুটি বিচ্যুতির কথা স্মরণ করে সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন।
অবশেষে যখন হাশরবাসীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যেয়ে সুপারিশ
করার জন্য আবেদন করবে, তখন তিনি বলবেন: আমি এ-কাজের উপযুক্ত। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩৭০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯৫,
(ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭৮, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৮৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে যেহেতু আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত সেখানে কোনো
কথা বলা যাবে না, সে-জন্য তিনি মাকামে মাহমূদে আরোহণ করে সেজদা রত হয়ে এমন মনোরম ও
মনোমুগ্ধকর ভাষায় আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করবেন যেমনটি তিনি অতীতে কখনও করেননি। এমতাবস্থায়
আল্লাহ তাঁকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন। তিনি বিচারকার্য আরম্ভ করার জন্য আল্লাহর
কাছে শাফা‘আত করলে আল্লাহ তা মঞ্জুর করবেন এবং বিচার কার্য শুরু করবেন।
(২) দ্বিতীয় শাফা‘আত হবে তাঁর উম্মতের মধ্যকার
কিছু লোকদেরকে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করাবার জন্যে। শাফা‘আতের ব্যাপারে যে দীর্ঘ
হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাতে এ-জাতীয় শাফা‘আতের কথা এ মর্মে রয়েছে যে, আল্লাহ বলবেন:
‘‘তোমার উম্মতের মধ্যকার যাদের কোনো হিসাব
নেই তাদেরকে জান্নাতের ডানের দরজা দিয়ে প্রবেশ করাও’’। (আহমদ,
প্রাগুক্ত; ২/৪৩৫)।
(৩) তৃতীয় শাফা‘আত হবে তাঁর উম্মতের মধ্যকার এমন
সব লোকদের জন্যে যাদের পাপ ও পূণ্য সমান হয়ে যাবে। এরাও ইন-শাআল্লাহ তাঁর শাফা‘আতে
জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ বিষয়ে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,
‘‘অগ্রগামীরা বিনা হিসেবে আর মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারীরা
আল্লাহর রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করবে, যারা নিজেদের নফসের উপর জুলুম করেছে এবং যাদের
পাপ ও পূণ্য সমান হয়ে গেছে তারাও রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা‘আতে
জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। (শিববীর আহমদ উছমানী, ফতহুল মুলহিম
বি শরহে সহীহ মুসলিম; (করাচী: মাকতাবাতুল হেজায, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), ১/৩৬১;
ফতহুল বারী বি শরহিল বুখারী; ১১/৪২৮)।
(৪) চতুর্থ শাফা‘আত হবে তাঁর উম্মতের মধ্যকার
এমন সব লোকদের জন্য যাদের পুণ্যের চেয়ে পাপের সংখ্যা অল্প পরিমাণে বেশী হবে। আক্বীদা
বিষয়ক কিতাবাদিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ-জাতীয় শাফা‘আতের
কথা পাওয়া গেলেও কোনো কিতাবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণের বর্ণনা পাওয়া যায় না। সম্ভবত
শাফা‘আত সংক্রান্ত সাধারণ হাদীসসমূহ বিবেচনা করেই এ শাফা‘আতের কথা বলা হয়ে থাকে। যেমন
রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেছেন:
‘‘আমার উম্মতের মধ্যকার কবীরা গুনাহকারীদের
জন্য আমার শাফা‘আত হবে’’। (তিরমিযী, প্রাগুক্ত; (অধ্যায়:
সিফতিল কিয়ামাঃ, পরিচ্ছেদ নং: ১১), ৪/৬২৫)।
অপর হাদীসে বলেন:
‘‘প্রত্যেক নবীর জন্য আল্লাহর নিকট একটি আহ্বান
রয়েছে যা তাঁরা করবেন। আর আমি আমার সে শাফা‘আত আখেরাতে আমার উম্মতদের শাফা‘আত করার
জন্য জমা রাখতে চাই’’। (মুসলিম, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল ঈমান,
বাব: ইখতেবাউন নাবীয়্যি দাওয়াতাশ শাফা’আতি লি উম্মাতিহি), ১/১৮৮)।
উক্ত ধরনের হাদীসসমূহ দ্বারা এ শাফা‘আতের কথা
প্রমাণিত হলেও তা সকল অপরাধীদের জন্য সমানে পাইকারীভাবে হবে না। বরং তা হবে এমন সব
অপরাধীদের জন্যে যাদের পাপের সংখ্যা পুণ্যের চেয়ে অল্প পরিমাণে বেশী হয়েছে। তাদের অবস্থা
এমন যে, একজন পরীক্ষার্থীকে যেমন অল্প নম্বর যোগ দিলে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যেতে
পারে, তেমনি তাদেরকেও অল্প পুণ্য যোগ দিলে তারাও জান্নাতে চলে যেতে পারে। এমনি ধরনের
পাপীদেরকে পূণ্য গ্রেস দেয়া স্বরূপ আল্লাহর অনুমতিক্রমে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-তাদের জন্য শাফা‘আত করবেন। পরীক্ষায় যারা আদৌ গ্রেস পাবার যোগ্য নয়, তাদের
যেমন কোনো গ্রেস দেয়া হয় না, তেমনি যারা পুণ্য গ্রেস পাওয়ার যোগ্য নয়, তাদের জন্যেও
হাশরের মাঠে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো শাফা‘আত হবে না।
বরং এ ধরনের লোকেরা তাদের অপরাধের মাত্রানুযায়ী
অল্প-বেশী সময়ের জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অল্প ও বেশী অপরাধী সকলেই যদি তাঁর শাফা‘আত
পেয়ে হাশরের মাঠেই জাহান্নামে যাওয়া থেকে মুক্তি পেয়ে যায়, তা হলে অপরাধীদের ব্যাপারে
শাস্তির ভয় প্রদর্শন করে যে-সব আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সে-সবের কী অর্থ দাঁড়াবে?
সকল অপরাধীরা যদি সেদিন তাঁর শাফা‘আত পেয়ে মু’মিন ও সৎকর্মশীলদের সাথেই জান্নাতে চলে
যায়, তা হলে দুনিয়ায় মু’মিনদের এত কষ্ট করারই-বা কী হেতু থাকতে পারে? তা ছাড়া ফাছিক
ও নাফরমান মু’মিনদের জাহান্নামে যাওয়া সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহেরই-বা কী অর্থ থাকতে পারে
?
(৫) পঞ্চম শাফা‘আত হবে সকল জান্নাতীদেরকে জান্নাতে
প্রবেশ করাবার জন্যে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘‘জান্নাতে প্রবেশ করার ব্যাপারে আমি হবো প্রথম
শাফা‘আতকারী...’’। (মুসলিম, প্রাগুক্ত;১/১৮৮; আহমদ, প্রাগুক্ত;
৩/১৪০; ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম ৪/৬৬)।
হাশরের ময়দানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর এ-কয়টি শাফা‘আতের কথাই কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। তবে এ-ছাড়াও অপরাধী মু’মিনদের
জাহান্নামে প্রবেশের পর সেখান থেকে তাদেরকে পুনরায় বের করে নিয়ে আসার জন্যেও রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরো কিছু শাফা‘আত রয়েছে, যা আমরা পরে বর্ণনা করবো।
যে সকল আমলের জন্য রাসূল (ছাঃ) সুফারিশ করবেন
তার কতিপয় আমল নিম্নে প্রদান করা হলো,
(ক) আযানের দো‘আ পাঠ:
যে ব্যক্তি আযান শেষে দো‘আ পাঠ করবে রাসূল
(ছাঃ) তার জন্য শাফা‘আত করবেন। যেমন তিনি বলেন,
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আযান শুনে (ও এর উত্তর দেয়ার ও
দরূদ পড়ার পর) এ দু’আ পড়ে, তার জন্য সুপারিশ করা আমার অবশ্য করণীয় হয়ে পড়ে। দু’আ হলোঃ
“আল্লা-হুম্মা রব্বা হা-যিহিদ্
দা’ওয়াতিত্ তা-ম্মাতি ওয়াস্ সলা-তিল ক্ব-য়িমাতি আ-তি মুহাম্মাদা-নিল ওয়াসীলাতা ওয়াল
ফাযীলাহ্, ওয়াব্’আসহু মাক্বা-মাম্ মাহমূদা-নিল্লাযী ওয়া’আদতাহ্’’
[অর্থাৎ- হে আল্লাহ! এ পরিপূর্ণ আহবান ও প্রতিষ্ঠিত
সালাতের প্রভু! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দান কর ওয়াসীলা;
সুমহান মর্যাদা ও প্রশংসিত স্থানে পৌঁছাও তাঁকে (মাক্বামে মাহমূদে), যার ওয়া’দা তুমি
তাঁকে দিয়েছ।] কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার জন্য আমার শাফা’আত আবশ্যকীয়ভাবে হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৬৫৯, সহিহ বুখারী ৬১৪, সুনান আননাসায়ী ৬৮০, সুনান আবূ দাঊদ ৫২৯, ইরওয়া ২৪৩,
সহীহ আল জামি‘ ৬৪২৩, তিরমিযী ২১১, ইবনু মাজাহ্ ৭২২, আহমাদ ১৪৮১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন,
আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনলে
উত্তরে সে শব্দগুলোরই পুনরাবৃত্তি করবে। আযান শেষে আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে। কারণ যে
ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে (এর পরিবর্তে) আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ
করবেন। এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ’ওয়াসীলা’ প্রার্থনা করবে। ’ওয়াসীলা’ হলো জান্নাতের
সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজন পাবেন। আর আমার আশা
এ বান্দা আমিই হব। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ’ওয়াসীলা’র দু’আ করবে, কিয়ামতের (কিয়ামতের)
দিন তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে পড়বে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৬৫৭, সহিহ মুসলিম ৩৮৪, সুনান আবূ দাঊদ ৫২৩, সুনান আননাসায়ী ৬৭৮, সুনান
আততিরমিযী ৩৬১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৬৯০, ইরওয়া ২৪২, সহীহ আল জামি‘ ৬১৩)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(খ) বিপদে ধৈর্যশীলদের জন্য:
রাসূল (ছাঃ) বিপদে-আপদে ধৈর্যশীলদের জন্য শাফা‘আত
করবেন। যেমন হাদীছে এসেছে তিনি বলেন,
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি
মদীনায় অভাব-অনটন ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করবে আমি অবশ্যই কিয়ামতের দিন তার জন্য সুপারিশকারী
হবো। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৩০, সহিহ মুসলিম ১৩৭৮,
আহমাদ ৯১৬১, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৭৩৯, সহীহ আত্ তারগীব ১১৮৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
তিনি আরো বলেন, কুতায়বাহ্ ইবনু সাঈদ (রহঃ)
..... আবূ সাঈদ মাওলা আল মাহরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি আল হাররার রাতগুলোতে আবূ
সাঈদ আল খুদরী (রাযিঃ) এর নিকট এলেন এবং মদীনাহ থেকে (কোথাও) চলে যাওয়ার পরামর্শ করলেন।
তিনি তার কাছে এখানকার দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও নিজের বৃহৎ পরিবারের অভিযোগ করলেন।
তিনি তাকে আরও জানালেন যে, তিনি এখানকার ক্লেশ ও রুক্ষ আবহাওয়া বরদাশত করতে পারছেন
না। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) তাকে বললেন, তোমার জন্য দুঃখ হয়, আমি তোমাকে মদীনাহ ত্যাগের
পরামর্শ দিতে পারি না। কারণ, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে
শুনেছি, যে ব্যক্তি এখানকার কষ্ট সহ্য করে মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন অবশ্যই আমি
তার জন্য শাফা’আত করব অথবা সাক্ষী হব, যদি সে মুসলিম হয়ে থাকে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৩২৩০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৭৪,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২০৫, ইসলামীক সেন্টার ৩২০১-৩২০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) একনিষ্ঠভাবে তাওহীদে বিশ্বাসীঃ
যারা একনিষ্ঠভাবে তাওহীদে বিশ্বাস করবে, রাসূল
(ছাঃ) তাদের মুক্তির জন্য শাফা‘আত করবেন। যেমন হাদীছের মধ্যে এসেছে-
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা
করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমার শাফা’আত লাভের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তিই
সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যবান হবে, যে তার অন্তর বা মন থেকে একান্ত সচ্ছতা সহকারে ’লা- ইলা-হা
ইল্লাল্লা-হ’ বলেছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৫৭৪, সহিহ
বুখারী ৯৯, ৬৫৭০, মুসনাদে আহমাদ ৮৮৪৫, সহীহুল জামি' ৯৬৭, আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব ১৫২০,
মুসনাদে বাযযার ৮৪৬৯, আস সুনানুল কুবরা লিন্ নাসায়ী ৫৮৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(৩) কুরআন ও রোযার শাফা‘আতঃ
যারা বেশী বেশী কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং ফরয
রোযা পালন ছাড়াও প্রতি মাসে নফল রোযা পালন করেন, হাশরের ময়দানে কুরআন ও রোযা তাদের
জন্য শাফা‘আত করবে।
আল-কুরআন তার পাঠকদের আল্লাহর নিকট শাফা‘আত
করবে। তবে কেবল পাঠ করলেই সুফারিশ পাওয়া যাবে না। বরং তদানুযায়ী আমল করতে হবে।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘এই কুরআন (ক্বিয়ামতে) সুফারিশকারী;
তার সুফারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে
রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে
পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে’। (তাবারানী কাবীর হা/৮৬৫৫; ছহীহাহ হা/২০১৯)।
আবু উমামাঃ আলবাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন:
আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা কুরআন পড়। কারণ
কুরআন পাঠ কিয়ামতের দিন তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে। তোমরা দু’ উজ্জ্বল
সূরা আল বাকারাহ্ ও আ-লি ’ইমরান পড়বে। কেননা কিয়ামতের দিন এ সূরা দু’টি মেঘখণ্ড অথবা
দু’টি সামিয়ানা অথবা দু’টি পক্ষ প্রসারিত পাখির ঝাঁকরূপে আসবে। এ দু’ সূরার পাঠকদের
জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। বিশেষ করে তোমরা সূরা আল বাকারাহ্ পড়বে। কারণ সূরা
আল বাকারাহ্ পড়া বারাকাত আর তা না পড়া আক্ষেপ। এ সূরা দু’টি পড়তে পারবে না অলস বেকুবরা।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১২০, সহিহ মুসলিম ৮০৪, শু‘আবূল
ঈমান ১৮২৭, সহীহ ইবনু হিববান ১১৬, সহীহাহ্ ৩৯৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তিনি অন্যত্র বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন কুরআন
উপস্থিত হয়ে বলবে, হে প্রভু! ওকে (কুরআন পাঠকারীকে) অলংকৃত করুন। সুতরাং ওকে সম্মানের
মুকুট পরানো হবে। পুনরায় কুরআন বলবে, হে প্রভু! ওকে আরো অলংকার প্রদান করুন। সুতরাং
ওকে সম্মানের পোশাক পরানো হবে। অতঃপর বলবে, হে প্রভু! আপনি ওর উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।
সুতরাং আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি পাঠ করতে থাকো আর মর্যাদায়
উন্নীত হতে থাক। আর প্রত্যেকটি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে ছওয়াব বৃদ্ধি করা হবে’।
(সুনান আততিরমিযী হা/২৯১৫; ছহীহুত তারগীব হা/১৪২৫; ছহীহুল
জামে‘ হা/৮০৩০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-বলেন:
আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফা’আত করবে।
সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা
দিয়েছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার শাফা’আত কবূল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে
রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের
সুপারিশই কবূল করা হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৯৬৩,
মুসতাদারাক লিল হাকিম ২০৩৬, শু‘আবূল ঈমান ১৮৩৯, সহীহ আল জামি‘ ৩৮৮২, সহীহ আত্ তারগীব
৯৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সূরা মুলক : কুরআনের মধ্যে সূরা মুলক একটি
গুরুত্বপূর্ণ সূরা, যার শাফা‘আত কবুল করা হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
‘কুরআনে ত্রিশ আয়াতের একটি সূরা আছে, যা এক
ব্যক্তির জন্য সুফারিশ করেছে। ফলে তাকে মাফ করে দেয়া হয়েছে। সে সূরাটি হচ্ছে, ‘তাবা-রাকাল্লাযী
বিইয়াদিহিল মুলক’। (আহমদ হা/৭৯৬২; তিরমিযী হা/২৮৯১; আবু দাঊদ
হা/১৪০০; ছহীহুত তারগীব হা/১৪৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে-
‘কুরআনে তিরিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা রয়েছে।
সূরাটি তার পাঠকের জন্য সুফারিশ করবে, শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। সূরাটি
হচ্ছে ‘তাবারকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক’। (সুনান আবুদাউদ হা/১৪০০)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(৪) জান্নাত ও জাহান্নামের শাফা‘আতঃ
যারা দুনিয়ায় থাকাকালে আল্লাহর নিকট অধিকহারে
জান্নাত কামনা করবে এবং জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে, কেয়ামতের দিন জান্নাত
ও জাহান্নাম তাদের জন্য শাফা‘আত করবে। জান্নাত বলবে: হে আল্লাহ! এ লোকটি দুনিয়ায় থাকাকালে
তোমার কাছে আমাকে অধিকহারে কামনা করেছে, তাই তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আর জাহান্নাম
বলবে: হে আল্লাহ! এ লোকটি আমার শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য তোমার কাছে অধিক হারে আশ্রয়
চেয়েছে, সুতরাং তাকে আমার কাছে দেবেন না। জান্নাত ও জাহান্নামের শাফা‘আত প্রসঙ্গে আবু
হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন:
‘‘আল্লাহর কাছে অধিকহারে জান্নাত কামনা কর
এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাও। কেননা, জান্নাত ও জাহান্নাম শাফা‘আতকারী হবে এবং তাদের
শাফা‘আত গৃহীত হবে’’।
জান্নাত পাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের দোয়া
“আল্লা-হুম্মা আদখিলনিল জান্নাতা ওয়া আজিরনী মিনান্ না-র”। (৩
বার)
অর্থঃ হে আল্লাহ তুমি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ
করাও এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ দাও!
হাদিসটি নিম্নরুপঃ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে জান্নাতের
প্রত্যাশা করে; জান্নাত বলবে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। আর যে ব্যক্তি
তিনবার জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করবে; জাহান্নাম বলবে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম
থেকে মুক্তি দাও। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), ২৪৭৮, সহীহ
তিরমিযী ৫৫২১, নাসায়ী ৫৫২১, সহীহ ইবনু হিববান ১০৩৪, সহীহ আল জামি‘ ৬২৭৫)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
অথবা
“আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ’উযু বিকা মিনান্নার”।
(৩ বার)।
অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত
চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই”।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেনঃ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জান্নাত প্রার্থনা
করে, জান্নাত আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর
কাছে ৩ বার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে দুয়া করে,
হে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও”।
হাদিসঃ-
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে জান্নাতের
প্রত্যাশা করে; জান্নাত বলবে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। আর যে ব্যক্তি
তিনবার জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করবে; জাহান্নাম বলবে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম
থেকে মুক্তি দাও। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৪৭৮, সূনান
আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৫৭২, সুনান ইবনু মাজাহ ৪৩৪০, নাসায়ী ৫৫২১, সহীহ ইবনু হিববান
১০৩৪, সহীহ আল জামি ৬২৭৫, মুখতাসারুশ শামাইল ৪/২২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
একটি জাঈফ হাদিসঃ আল্লাহুম্মা আজরনি মিনান্নার।
উল্লেখ্য–সকাল সন্ধ্যায় ৭ বার “আল্লাহুম্মা
আজিরনি মিনান্নার” পড়ার হাদীসটা জয়ীফ বা দুর্বল, শায়খ আলবানী সিলসিলা জয়ীফাহঃ ১৬২৪।
যেহেতু “আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার” জয়ীফ
বা দুর্বল তাই ইহার আমল না করে "আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ’উযু
বিকা মিনান্নার" সকাল সন্ধ্যায় তিনবার করে পাঠ করবো।
(৫) মৃত সন্তানাদির শাফা‘আতঃ
আখেরাতে হাশরের ময়দানে শাফা‘আতকারীদের মাঝে
রয়েছে মু’মিনদের সেই সব সন্তানাদি যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছে।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : কোন মুসলিমের তিনটি সন্তান সাবালিগ
হবার পূর্বে মারা গেলে তাদের প্রতি তাঁর রহমত স্বরূপ অবশ্যই আল্লাহ্ তা‘আলা ঐ ব্যক্তিকে
জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ১২৪৮,
১৩৮১,সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৩২, আধুনিক প্রকাশনীঃ
১১৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১১৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ
সা‘ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, মহিলাগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
-এর নিকট নিবেদন করলেন, আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিন। অতঃপর তিনি একদা তাদের
ওয়ায-নসীহত করলেন এবং বললেনঃ যে স্ত্রী লোকের তিনটি সন্তান মারা যায়, তারা তার জন্য
জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হবে। তখন এক মহিলা প্রশ্ন করলেন, দু’টি সন্তান মারা গেলে? তিনি
বললেন, দু’টি সন্তান মারা গেলেও। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
১২৪৯, ১২৫১, ১০১, ৭৩১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৯২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৩২-২৬৩৩,
আধুনিক প্রকাশনীঃ ১১৬৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১১৭৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোন বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন মহান আল্লাহ
স্বীয় ফিরিশতাদেরকে বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জীবন হনন করেছ কি? তাঁরা বলেন,
হ্যাঁ। তিনি বলেন, তোমরা তার হৃদয়ের ফলকে হনন করেছ? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন,
সে সময় আমার বান্দা কী বলেছে? তারা বলে, সে আপনার হাম্দ (প্রশংসা) করেছে ও ইন্না লিল্লাহি
অইন্না ইলাইহি রা-জিঊন (অর্থাৎ, আমরা তোমার এবং তোমার কাছেই অবশ্যই ফিরে যাব) পাঠ করেছে।
মহান আল্লাহ বলেন, আমার (সন্তানহারা) বান্দার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি গৃহ নির্মাণ
কর, আর তার নাম রাখ, ’বায়তুল হামদ’ (প্রশংসাভবন)। (হাদীস
সম্ভার (ওয়াহীদিয়া) ১৩৭৮, তিরমিযী ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তবে মুশরিক, বিদ‘আতী, ছালাত আদায় করে না এমন
পিতা-মাতার জন্য শিশু সন্তানের সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে না। (সুরা আম্বিয়া ২৮; বুখারী, কিতাবুত তাওহীদ ৭৪-৭৬ পৃঃ)।
(৬) শহীদদের শাফা‘আতঃ
বিশুদ্ধ হাদীসে হাশরের ময়দানে শহীদদের পক্ষ
থেকে তাঁদের নিকটাত্মীয়দের মধ্যকার সত্তর জনের ব্যাপারে শাফা‘আত করার কথা বর্ণিত হয়েছে।
যেমন বিশিষ্ট সাহাবী মিকদাম ইবন মা‘দিই কারিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শহীদের ফযীলত
সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ বলেন: ‘‘আল্লাহর নিকট শহীদের জন্য মোট
ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে’’। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে- ‘‘শহীদ তাঁর পরিবারের
মধ্য থেকে সত্তর ব্যক্তির ব্যাপারে শাফা‘আত করবে’’।
হাদিসঃ
মিকদাম ইবনে মাদীকারিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ শহীদের জন্য আল্লাহর নিকট ছয়টি বৈশিষ্ট্য
রয়েছে।
(১) তার দেহের রক্তের প্রথম ফোঁটাটি বের হতেই
তিনি তাকে ক্ষমা করেন এবং জান্নাতে তার ঠিকানা তাকে দেখানো হয়,
(২) কবরের আযাব থেকে তাকে রক্ষা করা হয়,
(৩) (কিয়ামতের) ভয়ংকর ত্রাস থেকে সে নিরাপদ
থাকবে;
(৪) তাকে ঈমানের চাদর পরানো হবে;
(৫) আয়তলোচনা হুরের সাথে তার বিবাহ দেয়া হবে
এবং
(৬) তার নিকট আত্মীয়দের মধ্য থেকে সত্তরজনের
পক্ষে তাকে শাফা’আত করার অনুমতি দেয়া হবে। (সুনান ইবনু মাজাহ
২৭৯৯, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৮৩৪, সুনান আততিরমিযী ১৬৬৩, সহীহাহ্ ৩২১৩, আহমাদ
১৬৭৩০, বায়হাকী ফিস সুনান ৯/১৬৪, বায়হাকী ফিশ শুআব ১০৮২৩, ১০৮২৪, আল-আহকাম ৩৬ নং পৃষ্ঠা,
মিশকাত আত-তালীকুর রাগীব ২/১৯৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
(৭) জানাযার ছালাত আদায়কারীঃ
কোনো মাইয়েতের জানাযায় যদি চল্লিশ বা ততোধিক
লোক অংশগ্রহণ করে এবং তারা মাইয়েতের জন্য শাফা‘আত করে তাহ’লে আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাফা‘আত
কবুল করেন।
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর আযাদ করা গোলাম কুরায়ব
’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। ইবনু ’আব্বাস-এর এক ছেলে (মক্কার নিকটবর্তী)
’কুদায়দ’ অথবা ’উসফান’ নামক স্থানে মারা গিয়েছিল। তিনি আমাকে বললেন, হে কুরায়ব! জানাযার
জন্য কেমন লোক জমা হয়েছে দেখো। কুরায়ব বলেন, আমি বের হয়ে দেখলাম, জানাযার জন্য কিছু
লোক একত্রিত হয়েছে। অতঃপর তাকে আমি এ খবর জানালাম। তিনি বললেন, তোমার হিসেবে তারা কি
চল্লিশজন হবে? আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) তখন বললেন, তাহলে সালাতের
জন্য তাকে বের করে আনো। কারণ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে
শুনেছি, কোন মুসলিম মারা গেলে আল্লাহর সাথে শরীক করেনি এমন চল্লিশজন যদি তার জানাযার
সালাত আদায় করে তাহলে আল্লাহ তা’আলা এ মৃত ব্যক্তির জন্য তাদের সুপারিশ কবূল করেন।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৬০, সহিহ মুসলিম ৯৪৮, সুনান
আবূ দাঊদ ৩১৭০, আহমাদ ২৫০৯, ইবনু হিব্বান ৩০৮২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৬২১,
সহীহ আত্ তারগীব ৩৫০৫, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৫৭০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্যত্র তিনি বলেন, আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির সালাতে জানাযায়
একশতজন মুসলিমের দল হাযির থাকবে, তাদের প্রত্যেকেই তার জন্য শাফা’আত (মাগফিরাত কামনা)
করবে। তাহলে তার জন্য তাদের এ শাফা’আত (কবূল) হয়ে যাবে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৬১, মুসলিম ৯৪৭, নাসায়ী ১৯৯১, ইবনু আবী শায়বাহ্ ১১৬২২, আহমাদ ১৩৮০৪,
সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৬৯০৩, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫০৪, আত্ তিরমিযী ১০২৯)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
শাফা‘আতের দ্বিতীয় পর্যায়:
জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের পর যারা
শাফা‘আতের অনুমতি পাবেনঃ
হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাদের
মাঝে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে ফয়সালা করবেন, তখন তাঁর অনুমতিক্রমে জান্নাতবাসীরা জান্নাতে
প্রবেশ করবে, আর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা
পুনরায় শাফা‘আতের অনুমতি প্রদান করবেন।
(১) দ্বিতীয় পর্যায়ে জান্নাতবাসীদের জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-এর শাফা‘আত:
এ পর্যায়ে জান্নাতবাসীদের মর্যাদা বৃদ্ধির
জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি শাফা‘আত থাকার বর্ণনা আক্বীদা
বিষয়ক কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। তবে কোনো কিতাবেই এর পিছনে কী দলীল রয়েছে, অনেক চেষ্টা
করেও আমি এর কোনো দলীল খোঁজে পাই নি। (শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-উসাইমীন বলেন, এগুলো
মুমিনদের পক্ষ থেকে পরস্পরের দো‘আ থেকে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বুখারীতে (হাদীস নং ৪০৬৭;
মুসলিম, ২৪৯৮) এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইদ আবি আমেরের জন্য
জান্নাতে উঁচু মর্যাদার দো‘আ করেছিলেন। অনুরূপভাবে আবদুল্লাহ ইবন কাইস আবু মূসার জন্যও
রাসূল সে রকম দো‘আ করেছিলেন। তদ্রূপ আবু সালামার জন্য রাসূলের অনুরূপ দো‘আ ছিল। (সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৯২০)।
(২) জাহান্নামবাসীদের জন্য শাফা‘আতঃ
হাশরের ময়দানে যারা শির্কের অপরাধে দন্ডিত
হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ না করে অন্যান্য অপরাধজনিত কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তাদের
জন্য এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তিন থেকে চারটি শাফা‘আতের
কথা আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত শাফা‘আত
সংক্রান্ত সুদীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-তাঁর জাহান্নামী উম্মতদের জন্য আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি ও অনুনয় বিনয় করে
বলবেন:
‘‘...প্রভু আমার উম্মত! আমার উম্মত! তখন আল্লাহ
তাঁকে (কিছু লোকদের) শাফা‘আতের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দেবেন, ফলে তিনি তাদেরকে
জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’’। (বুখারী, প্রাগুক্ত; (ঈমান অধ্যায়),
৩/৬/৪৩)।
আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত
হাদীস অনুযায়ী এ-ভাবে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-পরপর তিনবার আমার
উম্মত আমার উম্মত এ-কথা বলে আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকতে থাকবেন এবং প্রতিবারেই আল্লাহ তা‘আলা
তাঁকে নির্দিষ্ট কিছু লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে এনে জান্নাতে প্রবেশ করানোর
অনুমতি দেবেন। তবে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এ ধরনের শাফা‘আত চার
বার হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। (মুসলিম, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল
ঈমান, বাব:সবচেয়ে নিম্ন স্তরের জান্নাতির মর্যাদা), ১/১৮০-১৮১)।
হাদীস দু’টি খুবই দীর্ঘ হওয়ার কারণে এখানে
তা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকলাম।
(৩) জাহান্নামীদের জন্য ফেরেশ্তা, নবী ও মু’মিনদের শাফা‘আত:
মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান (রহ.)....আত্বা ইবনু
ইয়াযীদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এবং আবু সাঈদ (রাঃ)-এর
নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তাদের একজন শাফা’আতের হাদীস বর্ণনা করলেন, আর অন্যজন ছিলেন নিশ্চুপ।
তিনি বলেন, অতঃপর মালাক (ফেরেশতা) এসে সুপারিশ করবেন এবং রসূলগণ সুপারিশ করবেন, অতঃপর
তিনি পুলসিরাতের উল্লেখ করে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যাদেরকে সুপারিশ করার
অনুমতি দেয়া হবে তাদের মাঝে আমিই হব প্রথম। এরপর যখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টির বিচারকার্য
হতে অবসর গ্রহণ করবেন এবং জাহান্নাম হতে যাকে বের করতে ইচ্ছা করবেন তাকে বের করবেন।
আল্লাহ তা’আলা মালাক ও রসূলগণকে আদেশ করবেন সুপারিশ করার জন্যে। তখন তারা তাদের চিহ্ন
দ্বারা চিনে নিবেন যে, আদাম সন্তানের সিজদার স্থান ব্যতীত আর সব কিছুই আগুন জ্বালিয়ে
ফেলেছে। অতঃপর তাদের ওপর জান্নাতের পানি ঢেলে দেয়া হবে। তখন তারা নবজীবন লাভ করবে
যেরূপ নালার ধারে বীজ গজিয়ে উঠে। (সুনান আন-নাসায়ী (তাহকীককৃত)
১১৪০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১৪১, সহিহ বুখারী ৬৫৭৩, ৭৪৩৭; সহিহ মুসলিম ১৮২, তা'লীকুর
রাগীব ৪/২০৩-২০৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
পর পর তিন থেকে চার বার শাফা‘আতে তাঁর উম্মতের মধ্যকার শির্ক ব্যতীত অন্যান্য অপরাধে
জাহান্নামবাসী অসংখ্য মু’মিন নর-নারী মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁর উম্মতের মধ্যকার কিছু
লোক জাহান্নামে থেকে যাবে। তখন জান্নাতবাসী মু’মিনরা তাদের পরিচিত অনেককে শেষ পর্যন্ত
জান্নাতে দেখতে না পেয়ে তারা সে-সব লোকদের জন্যে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানাবে। তখন আল্লাহ
তাদেরকে সে-সব লোকদের জন্য শাফা‘আতের অনুমতি প্রদান করবেন।
আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত
হাদীসে এ কথাগুলো এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
‘‘...অবশেষে যখন (নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য
জাহান্নামে প্রবেশকারী) মু’মিনরা (রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা‘আতে)
নাযাত পাবে, তখন আল্লাহর শপথ যার হাতের মধ্যে আমার আত্মা! তোমাদের প্রত্যেকেই কেয়ামতের
দিন তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে আদায়ের লক্ষ্যে তাদের জাহান্নামবাসী ভাইদের মুক্তির জন্য
আল্লাহর কাছে অধিকভাবে অনুনয়-বিনয় করতে থাকবে। তারা বলবে: প্রভু হে! তারা আমাদের সাথে
রোযা পালন করতো, নামায আদায় করতো ও হজ্জ করতো। তখন তাদেরকে বলা হবে:তোমরা যাদের চিনতে
পারো, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে এসো। এ-সময়ে তাদের পরিচিত জনদের মুখমণ্ডল
জাহান্নামের উপর হারাম করা হবে, তখন তারা তাদের চিনতে পেরে অসংখ্য লোকদের বের করে নিয়ে
আসবে এমতাবস্থায় যে, তাদের কারো উভয় পায়ের জঙ্ঘার অর্ধ পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত
আগুনে পুড়ে গেছে। এরপর তারা বলবে:প্রভু হে! যাদের আপনি বের করে নিয়ে আসার জন্য আমাদেরকে
আদেশ করেছিলেন, তাদের কাউকেই আমরা রেখে আসিনি।
তখন আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় বলবেন: ফিরে যাও,
যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ওজনের কল্যাণ পাও তাদেরকে বের করে নিয়ে এসো। এবারও তারা
অনেক লোককদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। অতঃপর বলবে: আল্লাহ আপনি যাদেরকে বের করে নিয়ে আসতে
আদেশ করেছিলেন, তাদের একজনকেও আমরা সেখানে রেখে আসিনি। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে
আবার বলবেন: ফিরে যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ কল্যাণ পাও, তাদেরকেও বের করে নিয়ে
এসো। এবারও তারা অনেক লোককে বের করে নিয়ে এসে বলবে: প্রভু হে! কল্যাণ আছে এমন কাউকে
আমরা জাহান্নামে রেখে আসিনি। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: ফেরেশ্তা, নবীগণ ও মু’মিনরা
শাফা‘আত করলো, শুধুমাত্র রহমানুর রাহীম ব্যতীত আর কারো শাফা‘আত অবশিষ্ট থাকেনি। এ-কথা
বলে আল্লাহ একমুষ্টি আগুন তাঁর হাতে নেবেন এবং সেখান থেকে এমন কিছু লোকদের বের করে
আনবেন যারা কখনও কোনো ভাল কাজ করেনি’’। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৫৭৯, সহিহ বুখারী ৮০৬, সহিহ মুসলিম
২৯৯-(১৮২), সুনান আবূ দাউদ ৭৭০৩, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২০৮৫৬, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্
তারহীব ৩৬১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের
এ অংশ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ফেরেশ্তা, নবী, ওলি ও সালেহীনদের শাফা‘আত
হবে সে সকল অপরাধীদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে, যারা নির্দিষ্ট সময়ের
জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। কাউকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে না দেয়ার জন্য তাঁদের
কোনো শাফা‘আত হবে-এ জাতীয় কোনো কথার প্রমাণ নেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে,
পীর ও মাশায়েখগণ আখেরাতে কারো জন্যে শাফা‘আতের অনুমতি পাবেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে
না জানা সত্ত্বেও তারা তাদের ভক্তদেরকে তাদের শাফা‘আতের ব্যাপারে আশ্বস্ত করে থাকেন।
মু’মিন ও অলিগণের শাফা‘আত জাহান্নামবাসীদেরকে
জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে হয়ে থাকলেও তারা হাশরের ময়দানেই তাদের মুরীদদেরকে
জাহান্নামে যেতে না দেবার জন্যে শাফা‘আত করবেন বলে প্রচার করেন। অথচ আমরা দেখতে পাই
যে, আখেরাতের ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে- এ দিনে কারো রক্তের সম্পর্ক কারো কোনো
উপকারে আসবে না।
আল্লাহ বলেন: “কেয়ামতের দিন তোমাদের বংশের
সম্পর্ক ও সন্তানাদি কোনই কাজে আসবে না’’। (আল-কুরআন, সূরা
মুমতাহিনাঃ: ২)।
সে দিন কোনো পিতা তার সন্তানের এবং কোনো সন্তান
তার পিতার কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ বলেন:
‘হে লোক সকল ! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর,
এবং এমন এক দিনকে ভয় কর যেদিন কোন পিতা তার সন্তান এবং কোন সন্তান তার পিতার কোন উপকারে
আসবে না’’। (আল-কুরআন, সূরা লুক্বমান: ৩৩)।
যেখানে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-তাঁর নিকটাত্মীদেরকে এই বলে সাবধান করে দিয়েছিলেন:
আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, “তোমার নিকটতম
স্বজনবর্গকে তুমি সতর্ক করে দাও।” (শুআ’রা ২১৪) এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আত্মীয় ও বংশকে সম্বোধন করে বললেন, “হে কুরাইশদল!
তোমরা আল্লাহর নিকট নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নাও, আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কোন
উপকার করতে পারব না। হে বানী আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন উপকার
করতে পারব না। হে (চাচা) আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে আপনার কোন
কাজে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের ফুফু সাফিয়্যাহ! আমি আপনার জন্য আল্লাহর দরবারে কোন
উপকারে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের মেয়ে ফাতেমা! আমার কাছে যে ধন-সম্পদ চাইবে চেয়ে নাও,
আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন উপকার করতে পারব না” | (হাদিস
সম্ভার ১২, সহিহ বুখারী ৩৫২৭, সহিহ মুসলিম ৫২২, ৫২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হে কুরাইশদল! তোমরা আল্লাহর নিকট নিজেদেরকে
বাঁচিয়ে নাও, আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কোন উপকার করতে পারব না। হে বানী আব্দুল
মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে (চাচা) আব্বাস বিন
আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে আপনার কোন কাজে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের ফুফু
সাফিয়্যাহ! আমি আপনার জন্য আল্লাহর দরবারে কোন উপকারে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের মেয়ে
ফাতেমা! আমার কাছে যে ধন-সম্পদ চাইবে চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন উপকার করতে
পারব না”। (হাদিস সম্ভার ৭৫, সহিহ বুখারী ২৭৫৩, সহিহ মুসলিম
৫২৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সেখানে পীর ও মাশায়েখগণ তাঁদের নিকটাত্মীয়
ও ভক্তদের জন্য কিভাবে শাফা‘আত করার আশ্বাস দিতে পারেন, সত্যিই তা হতবাক করার মত বিষয়।
আখেরাতে ওলিগণকে অভয় প্রদানের তাৎপর্য:
কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ অলিগণের সংজ্ঞা
প্রদান পূর্বক তাঁদেরকে একটি অভয় বাণী এ মর্মে দান করেছেন যে,
‘‘জেনে রেখো! নিশ্চয় আল্লাহর অলিগণের কোনো
ভয় নেই, তাঁরা চিন্তিতও হবেনা। ওলিগণ তাঁরাই যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে’’।
(আল-কুরআন, সূরা: ইউনুস: ৬২)।
অনেক সাধারণ লোকেরা এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থের
প্রতি লক্ষ্য করে মনে করেন যে, যেহেতু অলিগণের আখেরাতে কোনো ভয় ও ভীতি নেই, সুতরাং
আখেরাতে তারা শুধু তাঁদের ভক্তদের মুক্তির জন্য সুপারিশ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। এমনকি
এ আয়াতের ভিত্তিতে একদিন আমি নিজেই একজনের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলাম।
আসলে আখেরাতের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে তাদের
যথার্থ জ্ঞান না থাকার কারণেই তারা মূলত এ ধরনের উক্তি করে থাকেন। এ আয়াতের সারকথা
হচ্ছে: যারা মু’মিন ও মুত্তাক্বী, তারাই হলো আল্লাহর ওলি। আর তাঁদের জন্যেই রয়েছে আখেরাতে
এ অভয়বাণী। এ জন্যে কারো আব্দুল কাদির জীলানী ও মঈনুদ্দীন চিশ্তীর মত সর্বজনের নিকট
ওলি হিসেবে পরিচিত হওয়া কোনো জরুরী ব্যাপার নয়। বরং আল্লাহ তা‘আলার দৃষ্টিতে যারাই
মু’মিন ও মুত্তাক্বী বলে বিবেচিত হবে, তারাই হবে আল্লাহর ওলি এবং এ অভয়বাণী পাওয়ার
যোগ্য। এ অভয়বাণী মূলত সে রকমেরই একটি অভয়বাণী যেমনটি কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে
অন্যান্য সৎকর্মশীলদেরকেও দান করা হয়েছে। (আমরা যে-সব সৎকর্মশীলদেরকে সাধারণত আল্লাহ
তা‘আলার ওলি বলে মনে করি না, সেরকম সৎকর্মশীলদের জন্য অনুরূপ অভয়বাণী উচ্চারণের বিষয়টি
জানার জন্য প্রয়োজনে দেখুন: সূরায়ে বাক্বারাঃ এর ৩৮, ১১২,
২৬২, ২৭৭ নং আয়াত, সূরায়ে আলে ইমরানের ১৭০ নং আয়াত, সূরায়ে নিসা এর ৮৩ নং আয়াত, সূরায়ে
আন‘আমের ৪৮ নং আয়াত ও সূরায়ে আ‘রাফের ৩৫ ও ৩৯ নং আয়াত। এ-সব আয়াত বাংলা অর্থসহ
পাঠ করলে যে কেউই বুঝতে পারবে যে, ‘আখেরাতে আল্লাহর অলিদের কোন ভয় ও চিন্তা নেই’ এ
অভয়বাণী শুধু তথাকথিত ওলি আল্লাহদের জন্যেই নয়, বরং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এরকম
অভয়বাণী যে কোন মু‘মিন ও সৎকর্মশীলদের জন্যেও রয়েছে)।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা অপর আয়াতে বলেন:
‘‘হে আদম সন্তানরা! যদি তোমাদের কাছে তোমাদেরই
মধ্য থেকে রাসূলগণ আগমন করে তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করে, তবে যে ব্যক্তি তাক্বওয়ার
পথ অবলম্বন করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাদের কোনো আশঙ্কা নেই এবং তারা দুঃখিত
হবেনা’’। (আল-কুরআন, সূরা আ‘রাফ: ৩৫)।
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যারা তাক্বওয়ার
পথ অবলম্বন করবে এবং নিজেকে সংশোধন করে নিবে তাদের জন্যেও ওলিদের ন্যায় সমান অভয়বাণী
প্রদান করা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, যারাই এ আয়াতে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে
তাঁরাই আল্লাহর ওলি হিসেবে গণ্য হবে। যদিও সাধারণ মানুষের নিকট তাঁরা ওলি হিসেবে পরিচিত
নাও হতে পারেন।
এ জাতীয় আয়াতসমূহে এ অভয়বাণী প্রদানের অর্থ
হচ্ছে-মু’মিন, মুত্তাক্বী তথা সৎকর্মশীলদেরকে এ মর্মে আশ্বস্ত করা যে, আখেরাতে তাঁদের
ভয়ের কোনো কারণ নেই, তাঁদেরকে অবশ্যই সে-দিন তাঁদের কর্মের বিনিময় স্বরূপ সম্মানজনক
স্থানে পৌঁছে দেয়া হবে। এর অর্থ এ-নয় যে, তাঁরা আল্লাহর ওলি হয়েছেন বলে আখেরাতে হিসাব-নিকাশের
পূর্বে তাঁরা যেমন খুশী তেমন করে ঘুরে বেড়াবেন। নিজের পরিণতির ব্যাপারে কোনো চিন্তা
না করে কেবল পরের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবেন। আখেরাতে যেখানে রাসূলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ব্যতীত অন্যান্য সকল নবীগণ নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবেন, সেখানে কী
করে ওলিগণ পরের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবেন? তা ছাড়া কে সত্যিকারের অলি, তা তো প্রমাণিত
হবে হিসাব-নিকাশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তাই হিসাবের পূর্বে সাধারণ মানুষের ন্যায় তাঁরাও
নিজের কী হয়, তা নিয়ে কম-বেশী উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্যে থাকবেন। তাঁদের অন্তরে অন্যের
চিন্তা আসলেও সে-দিনে আল্লাহর ক্রোধ ও প্রচণ্ড প্রতাপ দেখে জান্নাতে না যাওয়া পর্যন্ত
মনের কথা মনের মধ্যেই থেকে যাবে। তা বের করার মত কারো সাহস হবে না।
এ অভয়বাণীকে একজন ভাল পরীক্ষা দানকারীর ভাল
ফলাফল লাভের আশার সাথে তুলনা করা যায়। ভাল পরীক্ষা দানকারীর অন্তরে ভাল ফলাফল লাভের
আশা থাকলেও ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তার অন্তরে সে আশার পাশাপাশি তার নিজের
অজান্তে কোনো ভুল হয়ে যাওয়ার কারণে নম্বর কমে যায় কী না, তা নিয়ে অনেক উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা
থাকে, তেমনি ওলিগণ এ সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়ে থাকলেও মানুষ হিসেবে তাঁদের ভুল-ভ্রান্তি
হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হিসেব নিকাশের মাধ্যমে নিজেদের জান্নাতবাসী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত
না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অন্তর আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে এবং সে ভয়ই
তাঁদেরকে অন্যের মুক্তির ব্যাপারে চিন্তা করা থেকে বিরত রাখবে। নবীগণ যেখানে আল্লাহর
ভয়ে নফসী নফসী করবেন, সেখানে অলীগণ অন্যের চিন্তা করবেন, এটা কী করে সম্ভব হতে পারে!?
তবে হ্যাঁ, নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে জান্নাতে যাওয়ার পর তাঁরা অন্যের ব্যাপারে চিন্তা
করবেন এবং শাফা‘আতের সুযোগ আসলেই তাঁরা তাঁদের সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করবেন, তাতে সন্দেহের
কোনো অবকাশ নেই। কেননা, এটিই কুরআন, সুন্নাহ ও যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত।
সাধারণ মু’মিনরগণও শাফা‘আত করবে:
হিসাব-নিকাশের পর জান্নাতীগণ জান্নাতে চলে
যাওয়ার পর জাহান্নামীদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরপর তিন থেকে চারটি শাফা‘আতের পর যখন মু’মিনদের শাফা‘আতের সুযোগ
আসবে, হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সে শাফা‘আতের
সুযোগ কেবল আমাদের কাছে পরিচিত ওলিদের জন্যেই হবে না, বরং তখন বেহেশ্তবাসী যে কোনো
সাধারণ মু’মিনরাও তাদের পরিচিতজনদের জন্য শাফা‘আত করার সুযোগ পাবে।
আবু বাকরা হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, ক্বিয়ামতের
দিন লোকদেরকে পুলছিরাতের উপর বহন করা হবে। তারা পতঙ্গের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ন্যায়
ছিরাতের দুই পাশে ভিড় জমাবে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার রহমতের মাধ্যমে হেফাযত করবেন।
এরপর ফেরেশতা, নবীগণ, শহীদগণ ও ছিদ্দীকগণকে শাফা‘আতের অনুমতি দেওয়া হবে। তারা শাফা‘আত
করবে এবং জাহান্নাম থেকে বের করতে থাকবে। অতঃপর যাদের অন্তরে যার্রা পরিমাণ ঈমান আছে
তাদেরকেও শাফা‘আতের মাধ্যমে তারা বের করবে। (আহমাদ হা/২০৪৭৫৭;
বাযযার হা/৩৬৭১)।
মুমিনগণের পরস্পরের জন্য শাফা‘আতঃ
ক্বিয়ামতের দিন মুমিনগণ তার পরিচিত সৎআমলকারী
মুমিনদের জন্য সুপারিশ করবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে,
তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের
সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে ছালাত আদায় করত, ছওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন
আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে,
তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ তাদের মুখমন্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে
দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু‘পা ও দু‘পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।
তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ আবার
তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের
করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর
আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান
পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে।
বর্ণনাকারী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহ’লে আল্লাহর
এ বাণীটি পড়; আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ
করেন। (সুরা নিসা ৪/৪০)। তারপর নবী, ফেরেশতা ও মুমিনগণ সুপারিশ করবে’। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৭৪৩৯, ২২; সহিহ মুসলিম ১/৮১, হাঃ ১৮৩,
আহমাদ ১১১২৭, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯২১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯৩২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
যারা কারো শাফা‘আত পাবে না:
মূলত শাফা‘আত হচ্ছে জাহান্নামীদের উপর আল্লাহ
তা‘আলার করুণা নাযিলের একটি বিশেষ মাধ্যম। তবে এ করুণা লাভের সৌভাগ্য কেবল তাদেরই নসীব
হবে যারা শির্কের মত মহা অপরাধে আল্লাহর বিচারে দন্ডিত না হয়ে অন্যান্য কবীরা গুনাহের
অপরাধে দন্ডিত হয়ে জাহান্নামী হবে। আর যারা শির্কে আকবারের অপরাধে দন্ডিত হয়ে জাহান্নামী
হবে তাদের জন্য সে দিন আল্লাহর কোনো করুণা নেই। কেননা, জান্নাত তাদের জন্য চিরতরে হারাম
করে দেয়া হয়েছে। তাই তাদের যেমন রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা‘আত
পাওয়ার সৌভাগ্য হবেনা, তেমনি তাদের অপর কোনো মু‘মিনদেরও শাফা‘আত প্রাপ্ত হওয়ার সৌভাগ্য
হবেনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘‘আমার শাফা‘আত লাভে সে লোকই ধন্য হবে যে নিজ
থেকে একনিষ্ঠভাবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর স্বীকৃতি দান করেছে’’। (বুখারী, প্রাগুক্ত; (কিতাবুল ইলম, বাবুল হিরসি আলাল হাদীস, হাদীস
নং-৪০), ১/১/৫৯)।
এ কালিমার স্বীকৃতি একনিষ্ঠভাবে তারাই দিয়ে
থাকবে, যারা শির্ক না করে মৃত্যুবরণ করবে। অপর হাদীসে রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘‘আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একজন আগন্তুক
আগমন করলেন এবং আমাকে আমার অর্ধেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করা আর শাফা‘আত করার মধ্য
থেকে যে কোনো একটিকে গ্রহণ করার জন্য এখতিয়ার দিলেন, তখন আমি শাফা‘আতকেই বেছে নিলাম।
এ শাফা‘আত হবে কেবল তাদের জন্যেই যারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করেনি’’। (তিরমিযী, প্রাগুক্ত; (কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাঃ, বাব: মা জা-আ ফীশ
শাফা‘আতি); পৃ.৬২৭-৬২)।
যারা শির্কের অপরাধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফা‘আত থেকে বঞ্চিত হবে, তারা যে অন্যান্য সকল শাফা‘আতকারীদের
শাফা‘আত পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এমন ব্যক্তিদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ না
জেনে কেউ তাদের জন্য সুপারিশ করলেও সে সুপারিশ তাদের জন্য কোনো কাজে আসবে না। তারা
চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অধিবাসী হিসেবে সেখানে অনন্তকাল পর্যন্ত শাস্তির পর শাস্তি
ভোগ করতেই থাকবে। نعوذ بالله
من
الشرك
ومن
عذابه.
উল্লেখ্য যে, হাশরের ময়দানে কোনো ওলি ও মু’মিনদের শাফা‘আত করার সুযোগ না থাকা এবং জাহান্নামে
প্রবেশকারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসার ব্যাপারে তাদের শাফা‘আত হওয়া প্রসঙ্গে
আমি উপরে যা বললাম, এটি আমার নিজস্ব কোনো ইজতেহাদী কথা নয়। এটি যেমন উপর্যুক্ত হাদীস
দ্বারা প্রমাণিত, তেমনি তা মুসলিম মনীষীদের লেখনী দ্বারাও প্রমাণিত। আল্লামা ইবনু আবিল
‘ইয্য আল-হানাফী (রহ.)ও তাঁর কিতাবে মু’মিনদের শাফা‘আত প্রসঙ্গে উক্ত ধরনের কথাই বলেছেন।
(তিনি রাসূল এর শাফা’আতের আট নং শাফা’আতের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: দেখুন : ইবনু আবিল ইয্য আল- হানাফী, প্রাগুক্ত; পৃ. ২৫৪-২৫৯)।
আখেরাতে রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা‘আতের সংখ্যা
আখেরাতে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কতবার
শাফা‘আত করবেন, এ-নিয়ে মুসলিম মনীষীদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফীর
(রহ.) মতে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-মোট আটবার শাফা‘আত করবেন। (তদেব)।
ইমাম নববী (রহ.) এর মতে মোট পাঁচবার। (ইমাম নববী, শরহু সহীহ মুসলিম; (স্থান বিহীন: ১ম সংস্করণ, ১৯২৯
খ্রি.), ১/৩/৩৫)।
এবং ‘তাইসীরুল আযীযিল হামীদ’ এর গ্রন্থকার
মোট ছয়বারের কথা বলেছেন। (শেখ সুলাইমান ইবনে আব্দিল্লাহ,
প্রাগুক্ত; পৃ. ২৯৪-২৯৫)।
তাঁরা সংখ্যা বর্ণনার ক্ষেত্রে মতবিরোধের পাশাপাশি
উভয় পর্যায়ের শাফা‘আতকে একত্রিত করে বর্ণনা করেছেন। কতটি হাশরের ময়দানে এবং কতটি পরে
হবে, তা ভিন্নভাবে উল্লেখ করেননি। ফলে এ বিষয়ে যাদের গভীর জ্ঞান থাকবে না, তারা তা
অধ্যয়ন করলে এ-কথা ভাবতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বোধ
হয় হাশরের ময়দানে তাঁর শাফা‘আতের মাধ্যমে সকল অপরাধীদেরকে মুক্ত করে নেবেন। ফলে মুশরিক
নয় এমন সকল অপরাধী মু’মিনরাই জাহান্নামে প্রবেশের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। অনুরূপভাবে
তাদের আরো মনে হবে যে, মু’মিনগণ তাঁদের ভক্তদের জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-এর মতই হাশরের ময়দানে শাফা‘আত করবেন। অথচ এ ধারণা যে আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু
আনহু এবং আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসদ্বয়ের পরিপন্থী, তা সে হাদীস অধ্যয়ন করলে যে
কেউই বুঝতে পারবে।
বেলায়তের দাবীদারদের দ্বারা কিছু তেলেশমাতি প্রকাশ
আমাদের এ বিষয়টি জানা আবশ্যক যে, যারা ঈমান
ও সৎ কর্ম করে বা না করে ওলি হওয়ার দাবী করে এবং বাহ্যিকভাবে চমক সৃষ্টিকারী কিছু কাজ-কর্ম
দ্বারা তারা জনগণকে নিজেদের ওলি হওয়ার কথা প্রচার করতে চায়, তারা কোনো দিনই আল্লাহর
ওলি নয়। প্রকৃত পক্ষে তারা শয়তানেরই ওলি। এদের দ্বারা কিছু আশ্চর্যজনক কাজ-কর্ম সংঘটিত
হয়ে থাকলেও তা মূলত শয়তানেরই তেলেশমাতি। শয়তান এদের কারো অবগতি এবং কারো অবগতির বাইরে
তাদের রক্ত-মাংসের সাথে মিশে গিয়ে তাদের দ্বারা অনেক অদ্ভূত কর্ম সংঘটিত করায়। অনেক
সময় তাদের কাছে কেউ আগমন করলে তারা আগমনকারীকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তার নাম ও আগমনের
উদ্দেশ্য বলে দিতে পারে।
অনেক সময় তাদের সামনে উপস্থিত লোকদেরকে তারা
কারো আগমনের আগাম সংবাদ দেয়। বাস্তবের সাথে তাদের কথা মিলেও যায়। অনেকে যখন পাগলের
বেশে গোরস্থান ও বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় তখন মস্তবড় একজন আল্লাহওয়ালা ও অচেনা মানুষের
আকৃতিতে এসে শয়তান নিজেকে তাদের কাছে খিযির--এর পরিচয় দিয়ে কিছু উপদেশবাণী দিয়ে যায়।
কখনও খিযির এর পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা করার জন্য কোনো গাছ বা কোনো বস্তু দিয়ে
যায়। আবার কাউকে স্বপ্নের মাঝে কিছু দিয়ে জনগণকে তা তা‘বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়ার
উপদেশ দিয়ে যায়। আবার যখন তারা কোনো ওলির কবরের পার্শ্বে বসে মুরাকাবা করে তখন অদৃশ্যে
থেকে সে তাদের সাথে অনেক সময় কথাও বলে।
শয়তানের এ ধরনের তেলেশমাতি প্রকাশ প্রসঙ্গে
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাঃ (রহ.) বলেন, ‘‘যারা শয়তাদের পছন্দনীয় কর্ম যেমন: শির্ক, ফাসেকী
ও অপরাধমূলক কাজ করে, শয়তান তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। ফলে তাদের বন্ধু যাতে
তার কাশফ প্রকাশ করতে পারে সে-জন্যে কখনও তারা তাকে গায়েব সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের তথ্য
প্রদান করে। কখনও যাকে সে কষ্ট দিতে চায় তাকে তারা হত্যা, অসুস্থতা ইত্যাদি দ্বারা
কষ্ট দেয়, কখনও কোনো মানুষকে সে ধরে আনতে চাইলে তারা তাকে ধরে নিয়ে আসে, কখনও তারা
তার জন্য মানুষের কোনো অর্থ সম্পদ, খাদ্য দ্রব্য ও পোশাক ইত্যাদি চুরি করে এনে দেয়
এবং সে এ-সবকে ওলিদের কারামত বলে মনে করে, কখনও তারা তাকে বাতাসে উড়িয়ে অনেক দূরবর্তী
কোনো স্থানে নিয়ে যায়, কখনও ‘আরাফার দিন বিকেলে মক্কা শরীফে নিয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকই
আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং সে এটাকে (নিজের) কারামত বলে মনে করে, অথচ সে মুসলিমদের হজ্জ
করেনি, হজ্জের জন্য কোনো এহরামও বাঁধেনি, তলবিয়াও পাঠ করেনি, কা‘বা শরীফের তাওয়াফ এবং
সাফা ও মারওয়াতে সা‘য়ীও করেনি, অথচ সর্বজন বিদিত ব্যাপার যে, এ ধরনের কর্ম মারাত্মক
ধরনের পথ ভ্রষ্টতা ’’। (ইবনে তাইমিয়্যাঃ, আল-ক্বা’ইদাতুল
জালীলাঃ ফিত তাওয়াসসুলি ওয়াল অছীলাঃ; সম্পাদনায় সৈয়দ রশীদ রেজা, (...: মাকতাবাতিছ ছেক্বাফাতিত
দ্বীনিয়্যাঃ, স্ংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীণ), পৃ. ২৯)।
তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেন:
‘‘মুশরিকদের পথভ্রষ্টতার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে
সেই সব বিষয়াদি যা তারা কবর নামের প্রতিমার কাছে দেখতে বা শুনতে পায়। উদাহরণস্বরূপ
সে-সব বিষয়ের কথা বলা যায় যা তারা কোনো অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমন সম্পর্কে আগাম সংবাদ
অথবা এমন কোনো বিষয় যার দ্বারা কোনো প্রয়োজন পূর্ণ হয়েছে বা অনুরূপ কিছু শুনতে বা দেখতে
পায়। সেই সব মুশরিকদের মধ্যকার কেউ যখন কোনো কবর ফেটে উজ্জ্বল কোনো শেখকে বেরিয়ে এসে
তাকে আলিঙ্গন করতে অথবা তার সাথে কথা বলতে দেখে, তখন সে মনে করে এই শেখ হলেন কবরস্থ
নবী। অথচ প্রকৃতপক্ষে নবীর কবর ফেটে যায় নি, শয়তানই তাকে তা নাটক করে দেখিয়েছে’’। (ইবনে তাইমিয়্যাঃ, আত্তাওয়াস্সুল ওয়াল ওসীলাতু ; পৃ.৩১, ৩২)।
তিনি আরো বলেন:
‘‘যারা মৃত কোনো নবী বা অপর কাউকে আহ্বান করতে
বা তাদের নিকট সাহায্যের জন্য আবেদন করতে অভ্যস্ত হয়েছে তারা দূর থেকে যখন তাঁদেরকে
সাহায্যের জন্য আবেদন করে তখন তারা তাঁদের আকৃতিতে কাউকে দেখতে পায় অথবা যাকে তারা
দেখতে পায় তাকে তারা তাঁদের আকৃতির মত বলে মনে করে এবং সে দৃশ্যমান লোক তাদেরকে বলে:
আমি অমুক, এই বলে সে তাদের সাথে কথা বলে, তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়, তখন তারা মনে
করে: যে মৃত ব্যক্তিকে তারা সাহায্যের জন্য আহ্বান করেছিল সেই ব্যক্তিই তাদের সাথে
কথা বলেছে ও তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করে দিয়েছে, অথচ এ কথোপকথনকারী হচ্ছে জিন ও শয়তান’’।
(তদেব; পৃ.৩০)।
এভাবে বিভিন্ন উপায়ে শয়তান তার তেলেশমাতি প্রকাশ
করে এদেরকে ও সাধারণ লোকদেরকে তাদের ওলি হওয়া এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত বিষয়াদিকে তাদের
ওলি হওয়ার নিদর্শন বা কারামত বলে বুঝাতে চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে যারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর
ওলি সাধারণত তাঁদের দ্বারা কোনো কারামত প্রকাশিত না হওয়ায় এবং তাঁদের দ্বারা শয়তানের
কোনো তেলেশমাতিও প্রকাশিত না হওয়ায় অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে সাধারণ মানুষ হিসেবে গণ্য করে।
অপরদিকে যে সকল সৎ ব্যক্তিদের দ্বারা তাঁদের
জীবনকালে আল্লাহ কোনো কারামত প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের কবরগুলোকেও শয়তান তার তেলেশমাতি
প্রকাশের আস্তানায় পরিণত করে। তাঁদের কবরের খাদিমদের রক্ত-মাংসে মিশে যেয়ে যেমন তাদের
দ্বারা অনেক তেলেশমাতি প্রকাশ করে, তেমনি কবরে অবস্থান গ্রহণকারী বা যিয়ারতকারীদেরকেও
নানাভাবে তেলেশমাতি দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে। সময়ের পরিবর্তনে ধর্মের ক্ষেত্রে মানুষের
অজ্ঞতা যতই বাড়ছে শয়তানের তেলেশমাতী প্রকাশের ধরনও ততই বাড়ছে। যারা ফকিরী বেশে রাস্তায়
উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায়, শয়তান তাদের সাথেও মিশে তার তেলেশমাতি প্রকাশ
করছে। এ অবস্থায় কবরে যারা ঘুরে বেড়ায়, অজ্ঞ লোকদের দৃষ্টিতে তাদেরকেও ওলি বানিয়ে ছাড়ে।
এ-জাতীয় ওলিদের প্রসঙ্গে মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) বলেন:
‘‘কেউ যদি তার কাশফ দ্বারা অদৃশ্য কোনো বিষয়
বা ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ের সংবাদ দেয়, তা হলে এটি সে ব্যক্তির কামিল হওয়ার কোনো দলীল
নয় এবং এটি তার আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ারও প্রমাণ বহন করেনা। কারণ, কারো কাশফ হওয়ার
জন্য সে ব্যক্তির মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। কেননা, কাশফ একজন পাগল ও কাফির ব্যক্তিরও হতে
পারে। প্রকৃত কথা হলো: অদৃশ্য সম্পর্কে কাশফ হওয়ার বিষয়টি শরীরের একটি গোপন শক্তির
সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি একজন কাফির, ফাসিক ও পাগলেরও হতে পারে এবং তাদের অধিকাংশ কাশফ
বাস্তবের সাথে মিলেও যায়।
এ-জাতীয় কাশফ প্রকাশকারীদের আল্লাহর নিকটবর্তী
হওয়ার সাথে কোনই সম্পর্ক নেই। তবে সাধারণ লোকেরা বর্তমানে এ ধরনের কাশফের দ্বারাই আকৃষ্ট
হয়। যখনই এমন কোনো ব্যক্তির দ্বারা কোনো কাশফ হতে দেখে, তখনই তারা সে ব্যক্তিকে কামিল
মানুষ বলে মনে করে, ফলে নিজেরা এতে বিভ্রান্ত হয়, অপরকেও বিভ্রান্ত করে’’। (মুহাম্মদ
শফী’, মাজালিসু হাকীমিল উম্মাত; (দিল্লী: রববানী বুক ডিপো, সংস্করণ বিহীন, ১৩৯৬হি:),
পৃ. ৪৯-৫০)।
তাই কারো দ্বারা কোনো কাশফ হওয়া বা কোনো ধরনের
তেলেসমাতি প্রকাশিত হওয়া দেখলেই আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া চলবে না। এ-জাতীয় লোকদের ব্যাপারে
সতর্ক থাকার জন্য ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলেন:=
‘‘যখন তোমরা কোনো ব্যক্তিকে পানির উপর চলতে
এবং বাতাসে উড়ে বেড়াতে দেখ, তখন কুরআন ও সুন্নাতের সাথে সে ব্যক্তির কর্ম ও আচরণ মিলিয়ে
না দেখে তার দ্বারা প্রতারিত হবে না।’’। (ইবনু আবিল ইয্য
আল-হানাফী, প্রাগুক্ত ; পৃ.৫৭৩)।
মানুষের ঘাড়ে শয়তানের সওয়ার হওয়ার প্রমাণ
যারা ওলি না হয়েও বেলায়তের মিথ্যা দাবী করে,
শয়তান যে তাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে তেলেশমাতি দেখায় এর প্রমাণে মহান আল্লাহ বলেন:
‘‘আপনি বলুন: আমি কি তোমাদেরকে তাদের সন্ধান
দেব যাদের উপরে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় ? শয়তানতো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যুক ও পাপিষ্ঠের
উপর’’। (আল-কুরঅন, সূরা শু’আরা: ২২১-২২২)।
শয়তান মানুষদের পথভ্রষ্ট করার জন্য যেমন বেলায়তের
মিথ্যা দাবীদার ও পাপিষ্ঠদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে, তেমনি সে অনেক ভাল মানুষদেরকেও
বিভ্রান্ত করার জন্য তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করে। যারা শরী‘আতের জ্ঞানে
পরিপক্ক থাকেন আল্লাহর রহমতে তারা তার বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা পান। কিন্তু যাদের
জ্ঞানের পরিধি স্বল্প তারা অনেক সময় তার বিভ্রান্তির শিকার হন। একদা আব্দুল কাদির জীলানী
(রহ.)-কেও শয়তান বিভ্রান্ত করতে এসেছিল। তিনি বলেন:
‘‘একদা আমি উপাসনায় লিপ্ত ছিলাম, হঠাৎ করে
একটি বড় আরশ দেখতে পেলাম, যার উপরে রয়েছে একটি নূর, সে নূর থেকে আমাকে সম্বোধন করে
বলা হলো: হে আব্দুল কাদির ! আমি তোমার রব, অন্যের উপর আমি যা হারাম করেছি, তোমার জন্য
তা হালাল করে দিলাম। এ-কথা শুনার পর আব্দুল কাদির বললেন: (أنت
الله
الذي
لا
إله
إلا
هو)
তুমি কি সেই আল্লাহ যিনি ব্যতীত অপর কোনো ইলাহ নেই? হে আল্লাহর শত্রু ! দূর হও এখান
থেকে। তিনি বলেন: এ-কথার পর আরশের সেই আলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল এবং তা অন্ধকারে পরিণত
হল। অবশেষে আমাকে লক্ষ্য করে শয়তান বললো : দ্বীনের ব্যাপারে তোমার অগাধ জ্ঞান ও তোমার
নিজের অবস্থা সম্পর্কে তোমার সম্যক অবগতির দ্বারা আমার চক্রান্ত থেকে তুমি বেঁচে গেলে।
আমি এই প্রক্রিয়ায় সত্তর ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করেছি’’। (ইবনে তাইমিয়্যাহ, আত-তাওয়াসসুলু
ওয়াল ওসীলাতু; পৃ. ৩১। আব্দুল কাদির জীলানী (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল : এ আলো যে
শয়তানের, তা আপনি কী করে বুঝলেন? জবাবে তিনি বলেন : আমি তার কথা এর দ্বারা তাকে বুঝতে
পেরেছি। কেননা, আমি জানি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরী’আত রহিত
ও পরিবর্তন হবার নয়। তা ছাড়া সে বলেছিল: আমি তোমার রব। কিন্তু তার পক্ষে এ কথা বলা
সম্ভব হয়নি। এত্থেকেও তার শয়তান হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরেছি)।’’
শয়তান যদি আব্দুল কাদির জীলানীর মত ব্যক্তিকে
বিভ্রান্ত করার জন্য চেষ্টা করতে পারে, তা হলে যারা জ্ঞান ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর
সমতুল্য নয়, তাদের কাছে যে সে কতভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে থাকবে, তা সহজেই অনুমান
করা যায়। বস্তুত যারা নিজেদেরকে আল্লাহর ওলি বলে প্রচার করে, যারা বেলায়ত লাভের ফিকির
নিয়ে বিভিন্ন কবর ও জঙ্গলে পাগল বা মজ্যুব হয়ে ঘুরে বেড়ায়, শয়তান এদেরকে অধিক হারে
তার তেলেশমাতী দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে। সে জঙ্গলে ও কবরে তাদের নিকট খিযির এর পরিচয় দিয়ে
আগমন করে। আবার কারো কাছে আব্দুল কাদির (রহ.)-এর নিকট আগমনের ন্যায় আল্লাহর পরিচয় দিয়ে
আগমন করে। যেমন মাহবুবে খোদা দেওয়ানবাগী এমনটি দাবী করেছে। সে নাকি আল্লাহ তা‘আলাকে
একটি যুবকের মত দেখেছে। (দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪০ নং টীকা দ্রষ্টব্য)।
মোটকথা যারাই আল্লাহর ওলি হওয়ার শরী‘আত নির্ধারিত
ঈমান ও তাকওয়ার পথ বাদ দিয়ে বৈরাগ্য অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর ওলি হতে চায় এবং এ অবস্থায়
আল্লাহ, রাসূল, খিযির ও কোনো ওলির সাথে সাক্ষাৎ পেতে চায়, শয়তান তাদের সাথে কোনো একটি
আকর্ষণীয় আকৃতিতে এসে বলে- আমি আল্লাহ বা রাসূল বা খিযির অথবা সেই অলি, যার সাথে তুমি
সাক্ষাতের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছো। কিন্তু তারা তাদের অজ্ঞতার কারণে এ কথা বুঝে
উঠতে পারেনা যে, আসলে তাদের সাথে যে সাক্ষাত করেছে সে হলো শয়তান।
মোদ্দা কথা, পীর, অলি, গাউস, কুতুব, সুফি,
সাধক বা আলেম ওলামা, মুফতি, মুহাদ্দিস, ঈমাম যেই হোক না কেনো তারা যদি শিরক, কুফর,
নিফাক ও বিদআতমুক্ত হোন এবং রাসুল সা. এর তরীকা মোতাবেক জীবন অতিবাহিত করেন তাহলে কিয়ামাতে
আল্লাহ তায়ালা তাদের কাউকে সুপারিশ করার ক্ষমতা দিতে পারেন। আর এটা পুরোটাই আল্লাহ
তায়ালার হাতে। তিনি যাকে ইচ্ছে দিবেন, যাকে ইচ্ছে দিবেন না। তাই দুনিয়ার পীর অলি সুফি
সাধকগণ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে, তারা সুপারিশ করে তাদের মুরিদদেরকে জান্নাতে
নিয়ে যাবে। আর চাক্ষুষ আমরা যেসব শিরকি ও বিদআতি যেসব কর্মকান্ড বিভিন্ন মাজার, দরগা
আর দরবারে দেখতে পাচ্ছি তাতে এসব পীর অলি সুফি সাধক সুপারিশ তো দূরে থাক তারা নিজেরাই
জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে না। তাই এসব শয়তানের খপ্পরে পড়ে নিজেদের ঈমান আমল নষ্ট করে
কেউ জাহান্নামে যাওয়ার রাস্তা ক্লিয়ার করবেন না।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘‘(হে নবী!) আপনি বলে দিন: যাবতীয় সুপারিশ
একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলারই জন্য তথা তাঁরই ইখতিয়ারে। অন্য কারোর ইখতিয়ারে নয়’’। (সুরা যুমার : ৪৪)।
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘তিনি ছাড়া তোমাদের
জন্য কোন অভিভাবকও নেই এবং সুপারিশকারীও। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’’ (সুরা সাজদাহ্ : ৪)।
তিনি আরো বলেন: ‘‘তিনি ছাড়া তাদের না কোন সাহায্যকারী
থাকবে না কোন সুপারিশকারী। এতে করে হয়তোবা তারা আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করবে’’। (সুরা আন্’আম : ৫১)।
কিয়ামতের দিন কেউ কারোর জন্য সুপারিশ করতে
চাইলে তাকে সর্বপ্রথম আল্লাহ্ তা’আলার অনুমতি নিতে হবে।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘কে আছে এমন যে আল্লাহ্
তা’আলার অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট কারোর জন্য সুপারিশ করতে পারে?’’ (সুরা বাক্বারাহ্ : ২৫৫)।
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:
‘‘আল্লাহ্ তা’আলার অনুমতি ছাড়া সে দিন কোন
সুপারিশকারী থাকবে না’’। (সুরা ইউনুস: ৩)।
সুপারিশ তো দূরের কথা সে দিন তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে
কেউ কোন কথাই বলার অধিকার রাখবে না। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘সে দিন কোন ব্যক্তি তাঁর
(আল্লাহ্ তা’আলার) অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না’’। (সুরা
হূদ : ১০৫)।
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘সে দিন দয়াময় প্রভুর
অনুমতি ছাড়া কেউ কোন কথা বলতে পারবে না’’। (সুরা নাবা : ৩৮)।
সে দিন কেউ আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে সুপারিশ
করার অনুমতি পেলেও সে নিজ ইচ্ছানুযায়ী যে কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবে না।
বরং সে এমন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবে যার উপর আল্লাহ্ তা’আলা সন্তুষ্ট।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘ফিরিশতাগণ শুধু ওদের
জন্যই সুপারিশ করবে যাদের প্রতি আল্লাহ্ তা’আলা সন্তুষ্ট’’। (সুরা আম্বিয়া : ২৮)।
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘আকাশে অনেক ফিরিশ্তা
এমন রয়েছে যাদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা’আলা সুপারিশের অনুমতি
দিবেন যাকে ইচ্ছা তাকে এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তার জন্য’’। (সুরা নাজম: ২৬)।
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:
‘‘সে দিন কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। তবে
শুধু ওর সুপারিশই ফলপ্রসূ হবে যাকে দয়াময় প্রভু সুপারিশের অনুমতি দিবেন এবং যার জন্য
আল্লাহ্ তা’আলা সুপারিশ করা পছন্দ করবেন’’। (সুরা ত্বাহা
: ১০৯)।
এমনকি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) ও
সে দিন আল্লাহ্ তা’আলার নিকট সুপারিশের অনুমতি চাবেন। অতঃপর তাঁকে সুপারিশের অনুমতি
দেয়া হবে এবং সাথে সাথে তাঁর জন্য সুপারিশের গন্ডিও ঠিক করে দেয়া হবে। অতএব আল্লাহ্
তা’আলার অনুমতি ছাড়া এবং তাঁর নির্ধারিত গন্ডির বাইরে সে দিন তিনিও কারোর জন্য সুপারিশ
করতে পারবেন না।
তবে বিশেষভাবে জানার বিষয় এইযে, আল্লাহ্ তা’আলা
শুধুমাত্র খাঁটি তাওহীদপন্থীদের জন্যই সুপারিশের অনুমতি দিবেন। অন্য কারোর জন্য নয়।
আল্লাহ্ তা’আলা মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন:
‘‘ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না’’। (সুরা
মুদ্দাস্সির : ৪৮)।
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: ‘‘আল্লাহ্ তা’আলা
এককভাবে ফায়সালা করেন। তাঁর ফায়সালা দ্বিতীয়বার পর্যালোচনা করার অধিকার কারোর থাকে
না। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’’। (সুরা রা’দ্ : ৪১)।
তিনি আরো বলেন: ‘‘(হে মুহাম্মাদ (সা.)!) আপনি
ওদেরকে বলে দিন: আল্লাহ্ তা’আলা যদি ঈসা (আ.) ও তাঁর মা এবং দুনিয়ার সবাইকে ধ্বংস করে
দিতে চান তাহলে কে আছে এমন যে তাঁদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে?’’
(সুরা মায়িদাহ্ : ১৭)।
শয়তানের অহী কার উপর নাযিল হয়?
ভন্ড পীর অলি সুফী সাধকগণ এমন কতক শব্দ ও বাক্য
উচ্চারণ করে যা আপনি জীবনেও শোনেননি। তাদের রচিত বই পুস্তকেও সেগুলো পাওয়া যায়। এইসব
শব্দ আর বাক্যগুলো শুনলে বা পড়লে মনে হয় এগুলো সত্যিই ঐশী বাণী। লোকজন বিশ্বাস করে
বাবা বাবা বলে পা ধরে। এই সুযোগে বাবারাও বলে তুই দরবার ছাড়বি না, বাবাকে আঁকড়ে ধরে
থাকবি নইলে তুই ধ্বংস হবি। আবার অনেকে দিব্য জ্ঞানে মুরীদের অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের
কথা যখন বলে মুরিদ তখন চিৎকার দিয়ে বলে বাবা আপনি সঠিক। আপনার চরণতলে আমাদের ঠাঁই দেন।
পরকালে সাথে করে জান্নাতে নিয়ে যাবেন।
সব কিছুই ঠিক আছে মানলাম। এখন কথা হলো, এরা
এই সুন্দর সুন্দর কথাগুলো কোথা থেকে পায়। আল্লাহর তরফ থেকে নাকি শয়তানের তরফ থেকে।
আসুন আল্লাহ তাঁয়ালা এসম্পর্কে কি বলেন তা জেনে নেই।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,
"আর নিশ্চয় শয়তান তার বন্ধুদের উপর (পীর,
অলি, সুফী, সাধকদের উপর) ওহী নাজিল করে যাতে তারা তোমাদের সাথে তর্ক করতে পারে, যদি
তোমরা তাদের (পীর, অলি, সুফী, সাধকদের) আনুগত্য করো (তাদের মুরিদ হয়ে যাও), তবে তোমরা
নিশ্চিতভাবেই মুশরিক হয়ে যাবে।" (সূরা আনআম, আয়াত ১২১)।
বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে পির বা সুফি
আছে। এরা প্রত্যেকেই নিজেদেরকে আওলাদে রাসুল বলেও দাবী করে। আবার আওলাদে রাসুল ছাড়াও
পির বা সুফি আছে। এরা দাবী করে যে, এরাই আসল অলি যাদেরকে নাকি আল্লাহ বিশেষ দায়িত্ব
দিয়ে প্রেরণ করেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, এইসব পির বা সুফিদের দরবারগুলোতে রাসুল
সাঃ এর কোনো সুন্নাহ নেই। কুরআন ও হাদিসের কোনো নির্দেশনা নেই। তারা ইসলাম প্রচারের
অন্তরালে শিরক, কুফর আর বিদআত প্রচার কাজে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত। ইসলামকে তারা নিজেদের
মতো সাজিয়ে দিব্যি ধর্ম ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই ধর্ম ব্যবসা অব্যাহত রাখার
জন্যে এরাও অনেক দলিল উপস্থাপন করে আসছে। শত
শত বই লিখেছে। লক্ষ লক্ষ মুরিদ বানিয়েছে। এক দল আলেম তাদের পক্ষ নিয়ে মাঠে-ময়দানে ওয়াজ
করে বেড়াচ্ছে। অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আর দলিল দিয়ে প্রমাণ করছে যে, তাদের এই পির ব্যবসা
নাকি বৈধ। অনেক সময় এরা মুরিদকে অনেক কেরামতিও দেখায় আর বলে, এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে।
মুরিদগণ তাদের এই কর্মকান্ড দেখে মনে প্রাণে বিশ্বাসও করে। আসলে তাদের এই কেরামতি আর
দলিলগুলো আসে কোথা থেকে? আমাদের নিকট এটা সুস্পষ্ট যে, এইসব পির বা সুফিগণ আল্লাহ
ও রাসুল সাঃ এর প্রতি ১০০% আনুগত্যশীল নয়। মূলত এদের প্রতি যে ওহী আসে ইবলিশ শয়তানের
পক্ষ থেকে। নিম্নে দলিলগুলো তার প্রমাণঃ
(ক) তুমি যেমন আমাকে বিপথগামী করেছো, তেমনি আমিও এখন
থেকে তাদের (আদম ও তার সন্তানদের বিপথগামী করার জন্যে) তোমার সিরাতুল মুস্তাকিমে ওঁৎ
পেতে বসে থাকবো। সামনে পেছনে, ডানে বাঁয়ে সবদিক থেকে তাদের ঘেরাও করে নেবো। ফলে তাদের
অধিকাংশকেই তুমি কৃতজ্ঞ (তোমার অনুগত) পাবেনা। (সূরা ৭ আ’রাফ
: আয়াত ১৬-১৭)।
(খ) সে
(ইবলিস) বললো : আপনার ক্ষমতার শপথ আমি তাদের (পির-মুরিদ ও বিদআতি আলেমদের) সবাইকে পথভ্রষ্ট
করে ছাড়বো, আপনার একান্ত অনুগত দাসদের ছাড়া। (আল কুরআন, সূরা ৩৮ সোয়াদ : আয়াত ৮২-৮৩)।
(গ) ‘আমি
অবশ্যই (পির-মুরিদ ও বিদআতি আলেম) তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, মিথ্যা আশ্বাস দেব, তাদের
নির্দেশ দেব, যার ফলে তারা পশুর কর্ণ ছেদ করবে এবং তাদের নির্দেশ দেব ফলে তারা আল্লাহর
সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৯)।
সে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং মানুষের মনে মিথ্যা
বাসনার সৃষ্টি করে। আসলে শয়তান তাদের যে ওয়াদা দেয় তা প্রতারণা মাত্র। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১২০)।
(ঘ) শয়তান
তাদের মন্দ কাজসমূহকে তাদের দৃষ্টিতে চমৎকার ও মনোহরী করে তোলে এবং এভাবে তাদের সরল
সঠিক পথ অবলম্বনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (সূরা ২৯ আনকাবুত
: আয়াত ৩৮)।
(ঙ) হিদায়াত
সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত ও প্রমাণিত হবার পর যারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তাদেরকে
তাদের এ আচরণ শোভন ও চমৎকার করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা আকাংখায় লিপ্ত করে রাখে।
(সূরা ৪৭ মুহাম্মদ : আয়াত ২৫)।
(চ)
তাদের উপমা হলো শয়তান। শয়তান মানুষকে (প্ররোচনা দিয়ে) বলে : ‘কুফুরি (আল্লাহর হুকুম
অমান্য) করো।’ অতপর সে যখন কুফুরি করে বসে, তখন শয়তান তাকে বলে : ‘তোমার সাথে আমার
কোনো সম্পর্ক নাই, আমি তো আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে ভয় করি।’ ফলে উভয়ের পরিণতিই হবে জাহান্নাম।
(সূরা ৫৯ হাশর : আয়াত ১৬-১৭)।
(ছ) (হে
মানুষ!) আমি কি তোমাদের সংবাদ দেবো, শয়তানরা কাদের উপর নাযিল হয় (কাদের ঘাড়ে চেপে বসে)?
-তারা চেপে বসে ঘোরতর মিথ্যাবাদী পাপাসক্তদের ঘাড়ে; যারা কান পেতে থাকে এবং মিথ্যা
কথা ছড়ায়। (সূরা ২৬ আশ্ শোয়ারা : আয়াত ২২১-২২৩)।
(জ)
“শয়তান তাদের উপর প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে। ফলে সে তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে
আল্লাহর স্মরণ। এরাই শয়তানের দল। সাবধান হও, শয়তানের দল অবশ্যি পরাস্ত-ক্ষতিগ্রস্ত
হবে।” (সূরা ৫৮ মুজাদালা : আয়াত ১৪-১৯)।
(ঝ) হে
আদম সন্তানেরা (সতর্ক হও)! শয়তান যেনো ধোকা প্রতারণার (ফবপবরাব) মাধ্যমে তোমাদের দায়িত্ব
কর্তব্য পালন থেকে বিচ্যুত করে) ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে, যেভাবে সে (ধোকা প্রতারণার
মাধ্যমে) তোমাদের (আদি) পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল। তাদের পরস্পরকে
তাদের গোপন অংগ দেখানোর জন্যে সে তাদের বিবস্ত্র করে দিয়েছিল। সে এবং তার দলবল এমনভাবে
(বা এমন স্থান থেকে) তোমাদের দেখতে পায় যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাওনা। আমি শয়তানগুলোকে
সেই সব লোকদের অলি (অভিভাবক) বানিয়ে দিয়েছি, যারা ঈমান আনেনা, ঈমানের পথে চলেনা। (সূরা ৭ আল আ’রাফ : আয়াত ২৭)।
(ঞ) তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করোনা, নিশ্চয়ই সে তোমাদের
ডাহা দুশমন। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ১৬৮)।
(ট) হে
মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা হক (সত্য); সুতরাং এই পৃথিবীর জীবন যেনো কিছুতেই তোমাদের
প্রলুব্ধ ও প্রতারিত না করে এবং সেই মহা প্রতারক (শয়তান) ও যেনো আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের
ধোকায় না ফেলে। শয়তান তো তোমাদের ডাহা শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো।
সে তো তার অনুসারীদের (এমন সব কাজের) আহবান জানায়, যাতে তারা জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনের
অধিবাসী হয়ে যায়। (সূরা ৩৫ ফাতির : আয়াত ৫-৬)।
(ঠ) সে বললো : ‘পুনরুত্থান দিবস
পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।’ তিনি (আল্লাহ) বললেন : যা তুই অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
(আল কুরআন, সূরা ৭ আ’রাফ : আয়াত ১৪-১৫; সূরা ১৫ হিজর : আয়াত
৩৬-৩৭; সূরা ৩৮ সোয়াদ : আয়াত ৭৯-৮০)।
(ড) আদম
সন্তানদের মধ্যে যারাই তোর অনুসরণ করবে, তোর সাথে তাদেরকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভর্তি
করবো। (সূরা ৭ আ’রাফ : আয়াত ১৮)।
(ঢ) ‘আমি আশ্রয় চাই খান্নাসের
কুমন্ত্রণার ক্ষতি থেকে।’ অর্থাৎ সে এতোটা বদ যে, বারবার সামনে এসে কুমন্ত্রণা দেয়
এবং পিছিয়ে যায়, বারবার প্রকাশ হয়ে কুমন্ত্রণা দেয় এবং গোপন হয়ে যায়। (সূরা ১১৪ আন্ নাস : আয়াত ৪)।
(ণ)
কতক লোক এমন আছে যারা অজ্ঞতা নিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অনুসরণ করে
প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। (সূরা ২২ হজ্জ: আয়াত ৩)।
(ত) নিশ্চয়ই
শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হতে অহি করে (উস্কে দেয়)। তোমরা যদি তাদের আনুগত্য করো,
তবে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে। (সূরা ৬ আল আনআম : আয়াত
১২১)।
(থ) যখন আল্লাহর বিচার ফায়সালা
শেষ হবে, তখন শয়তান (একটি বিবৃতি দিয়ে) বলবে : আল্লাহ তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন
তা-ই ছিলো সত্য প্রতিশ্রুতি। আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে
দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছি। তোমাদের উপর তো আমার (ধ)
কোনো কর্তৃত্ব ছিলনা; আমি তো কেবল তোমাদের আহবান করেছি, আর তোমরা আমার আহবানে সাড়া
দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করোনা; বরং তোমরা নিজেদেরকেই তিরস্কার করো।
আমি (আল্লাহর শাস্তি থেকে) তোমাদের রক্ষা করতে পারবোনা, আর তোমরাও আমাকে রক্ষা করতে
পারবেনা। ইতোপূর্বে তোমরা যে আমাকে আল্লাহর শরিক ও সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলে আমি সেটা
(সে মর্যাদা) অস্বীকার করছি। নিশ্চয়ই যালিমদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা ১৪ ইবরাহিম : আয়াত ২২)।
(দ) শয়তান
তো কেবল তাদের উপরই কর্তৃত্ব ও আধিপত্য করে, যারা তাকে বন্ধু ও অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ
করে, আর যারা আল্লাহর সাথে শরিক করে। (সূরা ১৬ আন নহল : আয়াত
১০০)।
(ধ) যারা আখিরাতে বিশ্বাস করেনা,
তাদেরকে নিজের প্রতি অনুরক্ত ও পরিতুষ্ট করা এবং নিজেরা যেসব অপকর্ম করে, তাদেরকে দিয়েও
সেসব অপকর্ম করানোর উদ্দেশ্যেই শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়। (সূরা
আনআম : আয়াত ১১৩)।
(ন) যে
কেউ আল্লাহর যিকর (কুরআন এবং আল্লাহর ইবাদত) থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, আমরা তার সাথি-বন্ধু
হিসেবে শয়তানকে নিয়োগ করি। তখন তারাই ঐ লোকদেরকে আল্লাহর পথে চলা থেকে বিরত রাখে; অথচ
তারা মনে করে তারা সঠিক পথেই চলছে। অবশেষে যখন (কিয়ামতের দিন) আমার কাছে উপস্থিত হবে,
তখন সে শয়তানকে বলবে : ‘হায়, (পৃথিবীতে) আমার ও তোমার মধ্যে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব
থাকতো।’ কতইনা নিকৃষ্ট সাথি এই শয়তান। (তখন তাদের বলা হবে) আজ তোমাদের অনুতাপ তোমাদের
কোনো কাজেই আসবেনা। যেহেতু তোমরা তো যুলুম-সীমালংঘন করে এসেছো, তাই তোমরা সকলেই আযাবের
শরিকদার। (হে নবী!) তুমি কি শুনাতে পারবে বধিরকে? কিংবা পথ দেখাতে পারবে কি অন্ধকে?
আর ঐ ব্যক্তিকে যে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত? (সূরা
৪৩ যুখরুফ : আয়াত ৩৬-৪০)।
(প) সে শুধুই তোমাদেরকে জঘন্য
এবং অনৈতিক কাজ করতে বলে-(আল-বাক্বারাহ ১৬৯)।
সে এবং তার অনুসারিরা তোমাদেরকে তাদের জায়গা
থেকে দেখতে পায়, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পাওনা। (আল-আ’রাফ
৭:২৭)।
(ফ) আনাস
(রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের
মধ্যে শায়ত্বন (শয়তান) (তার) শিরা-উপশিরায় রক্তের মধ্যে বিচরণ করে থাকে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬৮, সহিহ বুখারী ২০৩৮, ২০৩৫, সহিহ মুসলিম
২১৭৪, সুনান আবূ দাঊদ ৪৭১৯, আহমাদ ১২১৮২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
১৯০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
যেহেতু পীর, অলি, সুফি, সাধকগণ রাসুল সা. এর
তরীকা মোতাবেক আমল করেন না বা ইবাদত করেন না সেই হেতু এইসব লোকদেরকেই শয়তান পথভ্রষ্ট
করে বিশাল একটি দল গঠন করেছে। তাই জেনেশুনে এইসব শয়তানের দলে গিয়ে নিজেদের ঈমান আমল
নষ্ট করে কেউ জাহান্নামে যাওয়ার রাস্তা ক্লিয়ার করবেন না।
উসমান ইবনু আবূ শায়বা ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম
(রহঃ) ... জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, আরব ভূখণ্ডে মুসল্লীগণ শয়তানের উপাসনা করবে, এ
বিষয়ে শয়তান নিরাশ হয়ে পড়েছে। তবে তাদের এক জনকে অন্যের বিরুদ্ধে উসকিয়ে দেয়ার ব্যাপারে
(নিরাশ হয়নি)। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৬৮৪৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি?
আবূ কুরায়ব মুহাম্মাদ ইবনুল আ’লা ও ইসহাক ইবনু
ইবরাহীম (রহঃ) ... জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ইবলীস পানির উপর তার আরশ স্থাপন করে তার বাহিনী প্রেরণ করে। তাদের
মধ্যে তার সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত সেই যে সর্বাধিক ফিতনা সৃষ্টিকারী। তাদের একজন এসে
বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। সে বলে, তুমি কিছুই করনি। অতঃপর অন্যজন এসে বলে, অমুকের
সাথে আমি সকল প্রকার ধোঁকার আচরণই করেছি। এমনকি তার থেকে তার স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন না
করা পর্যন্ত আমি তাকে ছেড়ে দেই নি। অতঃপর শয়তান তাকে তার নিকটবর্তী করে নেয় এবং বলে
হ্যাঁ, তুমি একটি বড় কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছেনঃ অতঃপর
শয়তান তাকে তার বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক
ফাউন্ডেশন) ৬৮৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এর পরের হাদিসে আছে, হযরত জাবির (রা.) থেকে
বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ শয়তান তার সৈন্য বাহিনীকে
প্রেরণ করতঃ লোকদেরকে ফিতনায় লিপ্ত করে। তাদের মধ্যে সে-ই তার নিকট সর্বাধিক মর্যাদার
অধিকারী যে অধিক ফিতনা সৃষ্টিকারী। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক
ফাউন্ডেশন) ৬৮৪৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
পির বা সুফিগণ শয়তান পক্ষ থেকে যে দিক নির্দেশনা পায় তার প্রমাণ
সুফীদের
বিরাট এক দলের লেখনী থেকে জানা যায় যে, তারা শয়তানের কাছ থেকেও বিভিন্ন বিষয়ে
দিক নির্দেশনা পেয়ে থাকেন। তাবলিগী নিসাব ফাযায়েলে আমাল বইয়ে হজরত জুনাইদ (রঃ) হইতে
বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি একবার শয়তানকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, মানুষের
সামনে উলঙ্গ হইয়া থাকিতে তোর কি লজ্জা হয় না? শয়তান বলিল, ইহারা কি মানুষ? মানুষ তো
উহারা, যাহারা শোনিযিয়ার মসজিদে বসা আছেন। যাহারা আমার শরীরকে দুর্বল করিয়াছি, আমার
কলিজাকে পুড়িয়া কাবাব করিয়া দিয়াছে। হজরত জুনাইদ (রহঃ) বলেন, আমি শোনিজিয়ার মসজিদে
গিয়া দেখিলাম কয়েকজন বুযুর্গ হাঁটুর উপর মাথা রাখিয়া মোরাকাবায় মশগুল রহিয়াছেন। তাঁহারা
আমাকে দেখিয়া বলিতে লাগিলেন, খবীস শয়তানের কথায় কখনও ধোকায় পড়িও না।
মাসূহী (রহঃ) হইতেও অনুরূপ বর্ণনা করা হইয়াছে
যে, তিনি শয়তানকে উলঙ্গ দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, মানুষের মধ্যে এইভাবে উলঙ্গ হইয়া চলাফেরা
করিতে তোর লজ্জা হয় না? সে বলিতে লাগিল, খোদার কসম, ইহারা তো মানুষ নয়। যদি মানুষ হইত
তবে ইহাদের সহিত আমি এমনভাবে খেলা করিতাম না, যেমন বাচ্চারা ফুটবল নিয়া খেলা করে। মানুষ
ঐ সমস্ত লোক, যাহারা আমাকে অসুস্থ করিয়া দিয়াছে। এই কথা বলিয়া সে সুফিয়ায়ে কেরামের
জামাতের দিকে ইশারা করিল। (দেখুনঃ ফাযায়েলে আমাল, দ্বিতীয়
খন্ড, ৩৭৬-৩৭৭ পৃষ্ঠা, দারুল কিতাব, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে ২০০১ সালে প্রথম প্রকাশিত)।
পির-মুরিদ ও বিদআতিদের তরিকা হচ্ছে শয়তানের তরিকা
আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশে)
একটি (সরল) রেখা টানলেন এবং বললেন, এটা আল্লাহর পথ। এরপর তিনি এ রেখার ডানে ও বামে
আরো কয়েকটি রেখা টানলেন এবং বললেন, এগুলোও পথ। এসব প্রত্যেক পথের উপর শায়ত্বন (শয়তান)
দাঁড়িয়ে থাকে। এরা (মানুষকে) তাদের পথের দিকে আহবান করে। অতঃপর তিনি তাঁর কথার প্রমাণ
স্বরূপ কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেনঃ ’’নিশ্চয়ই এটাই আমার সহজ সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথের
অনুসরণ করে চলো .....’’ (সূরাহ্ আল আন্’আম ৬: ১৬৩) আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
১৬৬, আহমাদ ৪১৩১, নাসায়ী তাঁর ‘কুবরা’ গ্রন্থে ১১১৭৪, দারিমী ২০২)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
আল্লাহ (সুব:) বলেন:
অর্থ: “আর সঠিক পথ বাতলে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব,
এবং পথের মধ্যে কিছু আছে বক্র। আর তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদের সকলকে হিদায়াত
করতেন।” (সুরা নহল ১৬:৯)।
স্বপ্নে তারা কাকে দেখে?
পির-মুরিদ
বা সুফিগণের অনেক দলিলের মধ্যে একটা দলিল হচ্ছে, এদের প্রতি রাতের স্বপ্ন। এদের গোসল,
অযু ও সালাতসহ সকল ইবাদত সহিহ নয়। বানানো দোয়া, দরুদ আর মিলাদ কিয়াম হচ্ছে এদের মূল
ইবাদত। যা ১০০% বিদআত। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে না, সে নাকি প্রায় রাতেই রাসুল সাঃকে
স্বপ্নে দেখে। আসলে স্বপ্নে যাকে দেখে সে হলো শয়তান।
“‘দেওয়ানবাগী স্বপ্নে দেখেন ঢাকা এবং ফরিদপুরের
মধ্যবর্তী স্থানে এক বিশাল বাগানে ময়লার স্তূপের উপর বিবস্ত্র অবস্থায় নবীজীর প্রাণহীন
দেহ পড়ে আছে (নাওযুবিল্লাহ)। মাথা দক্ষিণ দিকে, পা উত্তর দিকে প্রসারিত। বাম পা হাঁটুতে
ভাঁজ হয়ে খাড়া আছে। আমি উদ্ধারের জন্য পেরেশান হয়ে গেলাম। তাঁর বাম পায়ের হাঁটুতে
আমার ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথে দেহে প্রাণ ফিরে এল। এবং তিনি আমাকে বললেন,
”হে ধর্মের পুনর্জীবনদানকারী, ইতিপূর্বে আমার ধর্ম পাঁচবার পুনর্জীবন লাভ করেছে।”
(সূত্র: রাসূল কি সত্যিই গরিব ছিলেন-দেওয়ানবাগ থেকে প্রকাশিত)। অনেকেই স্বপ্ন দেখে।
এখানে একটা দলিল দেয়া হলো মাত্র।
এই স্বপ্ন আসলেই কি সত্য?
রাসুল সাঃ কি বলেন,
(ক) আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় আর খারাপ স্বপ্ন
শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৬৯৮৪, ৩২৯২, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫০০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-
৬৫১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
(খ) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে লোক আমাকে স্বপ্নে দেখে
সে শীঘ্রই জাগ্রত অবস্থাতেও আমাকে দেখবে। কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৬৯৯৩, ১১০; সহিহ মুসলিম ৪২/১, হাঃ ২২৬৬, আহমাদ ৮৫১৬, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫০৮,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫২২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
পির-মুরিদ ও বিদআতিরা শয়তানের দল, তাই এরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘শয়তান তাদের বশীভূত
করে নিয়েছে। অতঃপর আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা শয়তানের দল। সাবধান, শয়তানের
দলই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত : ১৯)।
পিরের দরবারের কোনো অনুষ্ঠানে গেলে পির-মুরিদগণ
যখন ওয়াজ শুরু করেন তখন অনেক স্বপ্নের কথা বলে থাকে। তারা বলেন যে, অমুক জাকের ভাই
বা অমুক আশেকে রাসুল স্বপ্নে আল্লাহ ও রাসুল সাঃকে দেখেছেন। বাবাজানকে দেখেছেন ইত্যাদি
ইত্যাদি। সাধারণ মুসলমান এসব স্বপ্ন দেখুক আর না দেখুক এরা কিন্তু হরহামেশাই দেখে থাকে।
অথচ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সঠিকভাবে আদায় করে না। তাদের এই স্বপ্ন আসলেই কি সত্য? মিথ্যে
স্বপ্ন বর্ণনাকারী কিয়ামতে কঠিন আজাব ভোগ করবে।
’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি এমন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করবে, যা সে দেখেনি,
তাকে (কিয়ামতের দিন) দু’টি যবের বীজে গিঁট লাগানোর জন্য বাধ্য করা হবে। অথচ সে কিছুতেই
গিঁট লাগাতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি অন্য লোকেদের আলোচনা কান পেতে শুনবে, অথচ তারা
এ ব্যক্তির শোনাটা পছন্দ করে না অথবা তারা এ ব্যক্তি হতে দূরে থাকতে চায়, কিয়ামতের
দিন তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেয়া হবে। আর যে লোক (কোন প্রাণীর) ছবি তৈরি করবে, তাকে
শাস্তি দেয়া হবে এবং এগুলোতে প্রাণ দান করার জন্য বাধ্য করা হবে, অথচ সে কিছুতেই প্রাণ
ফুঁকতে পারবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৪৯৯, সহিহ
বুখারী ৭০৪২, আহমাদ ২২১৩, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৭৩২, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব
ত্ববারানী ১১৭৫৫, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৩৫৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইমাম মুনাবি (রহ.) বলেন, ‘দুইটি গমের মাঝে
তাকে গিরা দিতে বলা হবে’ এই কথার অর্থ হচ্ছে, তাকে সর্বদা শাস্তি দেওয়া হবে। জাগ্রত
অবস্থার মিথ্যা কথা বললে যে শাস্তি, ঘুমন্ত অবস্থায় মিথ্যা বললে তারচেয়েও বেশি শাস্তি।
এর কারণ কী? কারণ স্বপ্নে ব্যাপারে মিথ্যা বলার অর্থ হলো আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলা। কারণ,
স্বপ্ন নবুয়তের একটি অংশ। তাই নবুওয়তের অংশও আল্লাহর পক্ষ থেকেই। সবার নিকট বিদিত যে,
মানুষের ওপর মিথ্যা বলার চেয়ে আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলার শাস্তি ভয়াবহ ও কঠিন। ’ (ফায়জুল কাদির, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা : ৯৯)।
মূলত এরা স্বপ্নে শয়তানকে দেখেই বলে অমুক অমুক
দেখেছি। এসব শয়তানী স্বপ্নের ছড়াছড়ি ভন্ড পিরের দরবারে গেলে শোনা যায়।
সতর্ক লোকগণ যেভাবে সতর্ক হয়
যারা সতর্ক সচেতন লোক, শয়তানের পক্ষ থেকে যখনই
তারা কোনো কুচিন্তা, কুমন্ত্রনা ও প্ররোচনা অনুভব করে, তখনই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে
এবং সাথে সাথে তাদের চোখ খুলে যায়, তারা সজাগ সতর্ক হয়ে যায় এবং সত্য পথ ও সঠিক কর্মপন্থা
স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। (সূরা ৭ আ’রাফ : ২০।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটাই প্রমাণিত
যে, প্রথম দুই প্রকার ওহী ছাড়াও আরো এক প্রকার
ওহী আছে। তাহলো ওহীশ শয়তান। শয়তান তার ওহী কথিত পির-মুরিদ ও বিদআতিদের উপর নাজিল করে
থাকে।
ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত
‘জন্মের সময়কাল’কে আরবীতে ‘মীলাদ’ বা ‘মাওলিদ’ বলা হয়। সে হিসাবে ‘মীলাদুন্নবী’-র অর্থ
দাঁড়ায় ‘নবীর জন্ম মুহূর্ত’। নবীর জন্মের বিবরণ, কিছু ওয়ায ও নবীর রূহের আগমন কল্পনা
করে তার সম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে ‘ইয়া নাবী সালামু আলায়কা’ বলা ও সবশেষে জিলাপী বিতরণ-
এই সব মিলিয়ে ‘মীলাদ মাহফিল’ ইসলাম প্রবর্তিত ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুল আযহা’ নামক দু’টি
বার্ষিক ঈদ উৎসবের বাইরে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নামে তৃতীয় আরেকটি ধর্মীয় (?) অনুষ্ঠানে
পরিণত হয়েছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব মতে, রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ)-এর সঠিক জন্মদিবস হয় ৯ই রবীউল আউয়াল সোমবার। ১২ রবীউল আউয়াল সোমবার ছিল তাঁর
মৃত্যুদিবস। অথচ ১২ রবীউল আউয়াল রাসূলের মৃত্যুদিবসেই তাঁর জন্মবার্ষিকী বা ‘মীলাদুন্নবী’র
অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।
“ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত
কেনো” নামক বইটি বিস্তারিত পড়তে চাইলে “ঈদে মিলাদুন্নব “ এর উপর ক্লিক করুন। “ঈদে মিলাদুন্নবী”
মাজারে ওরস পালন করা কি জায়েজ?
ওরস’ একটি বিদ‘আতী প্রথা। ‘ওরস’ শব্দের মূল
অর্থ নবদম্পতির বাসর। এখান থেকে রূপকার্থে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে পীরের আত্মার সাথে
আল্লাহর পরমাত্মার মিলনের আনন্দঘন মুহূর্ত। আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌভী হানাফী (রহঃ) বলেন,
‘ওরসে’র মত কোনো অনুষ্ঠানের অস্তিত্ব নবী সা. সাহাবী, তাবেই, তাবে-তাবেই যুগে ছিল না
(ফাতাওয়া আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌভী, পৃঃ ৯১)। সুতরাং যেসব মসজিদে এরূপ বিদ‘আতী কাজ হয়,
সেখানে ছালাত আদায় করা বা দান করা মোটেই সিদ্ধ নয়। তাদের কোনো কাজে সহযোগিতা করা বা
তাবার্রুকের নামে তাদের দেওয়া খাবার খাওয়া যাবে না। (সুরা
মায়েদাহ ৫/২; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ ১৬/১৭৬, ২/২৫৭-২৬৪)।
নির্দিষ্ট দিন-তারিখ ঠিক করে কবরের পাশে ওরস
বা বার্ষিক উৎসব পালন করা ইসলামে বৈধ নয়। ইসলামিক এডুকেশন তাদের যুক্তি অনুযায়ী, মৃত্যুর
পরে বাৎসরিক উৎসব বা মেলা করার বিধান ইসলামে নেই এবং এটি বিদআত বা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
ওরস উপলক্ষে মাজার, দরগা এলাকায় গান-বাজনা,
মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালানো, এবং পীর বা মাজারে মানত করার মতো ইসলামবিরোধী কাজগুলো
সকল আলেমের মতেই সম্পূর্ণ হারাম।
পীরের দরবারের বেশ কয়েকটি আকর্ষণ আছে। যেমন:
(১) নারী পুরুষ সম্মিলিত ভক্তিমূলক গানের আসর
বসানো।
(২) প্রতি বছর ওরসের আয়োজন করা এবং ওরস উপলক্ষে
মেলার আয়োজন করা, গাঁজা টানার আসর বসানো ইত্যাদি।
(৩) মধুর সুরে মিলাদ কিয়াম করা।
(৪) প্রায় মাসেই ছোট হুজুর, বড় হুজুর, মেজো
হুজুর, কুত্তা-বিড়াল এর জন্ম বার্ষিকী ও মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা।
পীর অলি, সুফী সাধকদের এসব উৎসব পালনের মূল
টার্গেট হচ্ছে টাকা ইনকাম। এইসব উৎসবে লক্ষ লক্ষ ভক্তরা জামায়েত হয়। তারা এসে কয়েক
স্তরে ভিক্ষা দেয়। বিভিন্ন বাক্স থাকে। যেমন, দরবারি বাক্স, ছোট হুজুর, বড় হুজুর বাক্স,
বড় মা, ছোট মা বাক্স ইত্যাদিতে ভক্তরা নজরানা, মানতসহ বিভিন্ন ভিক্ষা এইসব বাক্সে ফেলে।
তাতে দেখা যায়, কোনো একটা উৎসব পালন করলেই কোটি কোটি টাকা ইনকাম হয়। তবে সরকারের উচিত
এইসব টাকায় ৬০% আয়কর বসানো।
যাইহোক, পীরের দরবারে যাওয়া, পীরের মুরিদ হওয়া,
মানত করা, নজরানা দেয়া, তবারুক খাওয়া, ওরসে হাজির হওয়া, মিলাদ কিয়াম করা, পীর অলিকে
সাহায্যকারী ও শাফায়াতকারী ভাবা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। এগুলো করা বা মানা শিরক।
দরবার ও মাজারগুলোতে গান-বাজনা, নৃত্য ও নারী পুরুষ একত্রিত হয়ে যিকির
করা যাবে কি?
সুফীবাদের দাবীদার কিছু লোক গান, বাজনা ও নৃত্যের
মাধ্যমে যিকির করে থাকে। যেমন মিরপুর শাহ আলীর মাজার, মাইজভান্ডারীসহ ভারত উপমহাদেশের
প্রায় সব মাজারেই গান-বাজনা করা হয়। বিশেষ করে ওরস বা বিশেষ অনুষ্ঠানে অধিকহারে গান-বাজনার
আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে লালন ফকিরের কথিত মাজারকে কেন্দ্র করে গান-বাজনা করা আর গাঁজা
টানার দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। অথচ ইসলাম এগুলোকে সুস্পষ্টভাবে হারাম বলে ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর
পথ থেকে ভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অন্ধভাবে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করে এবং তা
নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি’। (সুরা লুক্বমান ৬)।
আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম!
তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে
শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী
কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে
বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে
ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই
আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের
দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবঃ) ৫৫৯০, আধুনিক প্রকাশনী- ৫১৮০, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন- ৫০৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মদপান করা,
জুয়া খেলা এবং ঢোল বাজানো হারাম করেছেন এবং বলেছেনঃ প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু
হারাম। কেউ কেউ বলেছেনঃ কূবাহ্ অর্থ ’’তবলা’’। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৫০৩, শু‘আবুল ঈমান ৫১১০, আবূ দাঊদ ৩৬৯৬, আহমাদ ২৪৭৬, মা‘রিফাতুস্
সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী ৬১৬৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৩৬৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল
বায়হাক্বী ২১৫১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা গায়িকা বেচা-কেনা করো না
তাদেরকে (মেয়েদেরকে) গান শিক্ষাও দিয়ো না, এর মূল্য হারাম। এ জাতীয় কাজ যারা করে তাদের
ব্যাপারেই কুরআন মাজীদের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ- “কতক মানুষ আল্লাহ্র পথ থেকে
বিচ্যুত করার উদ্দেশে অজ্ঞতাবশত অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে আর আল্লাহ্র পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ
করে। ওদের জন্যই আছে অবমাননাকর শাস্তি।’’- (সূরা লুকমান ৩১ : ৬)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৮০, সুনান আততিরমিযী ১২৮২, সুনান
ইবনু মাজাহ ২১৬৮, সহীহ আল জামি‘ ৫০৯১)।
অত্র হাদীছে গান-বাজনার যে কোনো মাধ্যম হারাম
করা হয়েছে। কাজেই সিনেমা, যাত্রা, ভিসিডি, থিয়েটার আরো যত মাধ্যম আছে সবগুলির ব্যবসা
হারাম।
নাফে‘ (রাঃ) বলেন, একদা ইবনু ওমর (রাঃ) বাদ্যযন্ত্রের
শব্দ শুনতে পেলে তিনি তাঁর দুই কানে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। তারপর
তিনি আমাকে বললেন, নাফে‘ তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ কি? আমি বললাম, না। তিনি তার দুই আঙ্গুল
দুই কান হতে বের করে বললেন, আমি একদা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বাদ্যযন্ত্রের
শব্দ শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গিয়েছিলেন এবং আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন
যেভাবে আজ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম। (সুনান আবূ দাউদ (আলবানী
একাডেমী) ৪৯২৪, বায়হাক্বী)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অত্র হাদীছে বুঝা যাচ্ছে গান বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের
শব্দ যেনো কানে না আসে তার সম্ভবপর চেষ্টা করতে হবে।
আনাস (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যখন
আমার উম্মত নেশাদার দ্রব্য পান করবে, গায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হবে এবং বাদ্যযন্ত্র
নিয়ে ব্যস্ত হবে তখন অবশ্যই তিনটি ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে- (১) বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ধসে
যাবে (২) উপর থেকে অথবা কোন জাতির পক্ষ থেকে যুলুম অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়া হবে (৩) অনেকের
পাপের দরুণ আকার-আকৃতি বিকৃত করা হবে। আর এ গজবের মূল কারণ তিনটি। (ক) মদ পান করা
(খ) নায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হওয়া (গ) বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী হওয়া।
ইবনে আববাস (রা.) বলেন, রাসূল(সা.) বলেছেন,
অবশ্য অবশ্যই আমার উম্মতের কিছু সম্প্রদায় রাত্রী অতিবাহিত করবে বিভিন্ন ধরণের খাদ্য-পানীয়তে
ভোগ বিলাসী হয়ে এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদন আনন্দ প্রমোদে। এমতাবস্থায় তাদের সকাল হবে
শুকুর ও বানরের আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে। (সিলসিলা ছাহীহাহ
হা/১৬০৪/২৬৯৯)।
অত্র হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, এক শ্রেণীর
অর্থশালী মানুষেরা নানা ধরনের মদ ও পানীয়ের ব্যবস্থা করে অতি ভোগ-বিলাসে দিনাতিপাত
করবে। নানা ধরণের আমোদ-প্রমোদে ও বিনোদনে রাত্রী যাপন করবে। এর মাধ্যম হবে নায়িকা,
মদ ও বাদ্যযন্ত্র। এ ধরণের লোকেরা শুকুর ও বানরে পরিণত হবে। হয় তাদের আকৃতি শুকুর ও
বানরের মত হবে, অথবা তাদের হালাল-হারামের বিবেচনা থাকবে না। এজন্য নবী করীম (সা.) তাদেরকে
শুকুরের সাথে তুলনা করেছেন। তাদের চাল-চলন হবে বিজাতিদের মত অর্থাৎ তাদের স্ত্রী ও
মেয়েরা বিজাতিদের মত নানা পোশাক পরবে। আর এদের কাছে যেনা হবে সাধারণ কাজ। এদের বাড়ী-গাড়ি
হবে কুকুর ও বিভিন্ন ধরনের মূর্তিতে পরিপূর্ণ। তাই তাদেরকে বানরের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
কারণ তারা বিজাতিদের অনুকরণ করবে।
আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের
ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে
এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন
এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। (সুনান ইবনে
মাজাহ ৪০২০, ৩৩৮৪, সুনান আবূ দাউদ ৩৬৮৮, আহমাদ ২২৩৯৩, ১৮০৯৮, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪২৯২, রাওদুন নাদীর ৪৫২,
সহীহাহ ১/১৩৮-১৩৯, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯০৯১, সুনান আননাসায়ী ৫৬৫৮, সহীহুল জামি‘ ৮০৯১,
সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৩৭৮, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৪৩৯০, দারিমী ২১০০, আল মু‘জামুল
কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১১০৬৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৭৮৪৪)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
হাদীছে বুঝা গেল মানুষ মদ্যপান করবে, তবে মদের
নাম অন্য হবে। আর নেতা ও দায়িত্বশীলদের সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা।
এদের চরিত্র হবে নোংরা, এদের প্রিয় কাজ হবে অশ্লীলতা। তাদের স্বভাব ও কৃষ্টি-কালচার
হবে শুকুর ও বানোরের ন্যায়। এরা স্বপরিবারে পাশ্চাত্যদের স্বভাব চরিত্র গ্রহণ করবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
-এর মুক্তদাস সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমার জন্য পৃথিবীকে গুটিয়ে দেয়া হলো। ফলে আমি তার পূর্ব-পশ্চিম সবদিক দেখতে
পেলাম। আমাকে হরিদ্রাভ বা লাল এবং সাদা বর্ণের দু’টি খনিজ ভান্ডার অর্থাৎ সোনা-রূপার
ভান্ডার দেয়া হয়েছে।
আমাকে বলা হলো, পৃথিবীর যতখানি তোমার জন্য
গুটানো হয়েছিল, তোমার রাজত্ব সেই সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অতঃপর আমি মহান আল্লাহর
নিকট তিনটি জিনিস প্রার্থনা করলামঃ আমার উম্মাত যেন ব্যাপকভাবে দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে
তার দ্বারা ধ্বংস না হয়। তাদেরকে দলে উপদলে বিচ্ছিন্ন করে তাদের এক দলকে অপর দলের সশস্ত্র
সংঘর্ষের স্বাদ আস্বাদন না করানোর আবেদন করলাম। আমাকে বলা হলো, ’’আমি কোন ফয়সালা করলে
তা মোটেও পরিবর্তিত হওয়ার নয়। তবে আমি তোমার উম্মাতকে দুর্ভিক্ষপীড়িত করে তাদের ধ্বংস
করবো না এবং তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সকল বিরোধী শক্তিকে যুগপৎ একত্র করবোনা, যতক্ষণ
না তারা পরস্পরকে ধ্বংস করে এবং একে অপরকে হত্যা করে’’।
আমার উম্মাতের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হলে
কিয়ামত পর্যন্ত আর অস্ত্রবিরতি হবে না। আমি আমার উম্মাতের ব্যাপারে অধিক ভয় করছি পথভ্রষ্ট
নেতৃবৃন্দের। অচিরেই আমার উম্মাতের কোন কোন গোত্র বা সম্প্রদায় প্রতিমা পূজায় লিপ্ত
হবে এবং আমার উম্মাতের কতক গোত্র মুশরিকদের সাথে যোগ দিবে। অচিরেই কিয়ামতের নিকটবর্তী
সময়ে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী দাবি
করবে। আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে,
মহান আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশ (কিয়ামত) না আসা পর্যন্ত। তাদের বিরুদ্ধবাদীরা তাদের
কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
আবূ হাসান (রাঃ) বলেন, অতঃপর আবূ আবদুল্লাহ
(রাঃ) এ হাদীস বর্ণনা শেষে বললেন, কতই না ভয়াবহ এ হাদীস। (সুনান
ইবনে মাজাহ ৩৯৫২, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭১৫০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮৮৯, সুনান
আততিরমিযী ২১৭৬, ২২২৯; সুনান আবূ দাঊদ ৪২৫২, আহমাদ ২১৮৮৮, ২১৮৯৭, ২১৯৪৬; দারিমী ২০৯,
রাওদুন নাদীর ৬১, ১১৭০, সহীহাহ ৪/২৫২, ১৯৫৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর বিক্রির মূল্য ও গান গায়িকাদের উপার্জন
গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২৭৮৯,
শারহুস্ সুন্নাহ্ ২৯৩৮, সহীহাহ্ ৩২৭৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত কুরআন ও হাদিসসমূহ দ্বারা এটাই প্রমাণিত
যে, বাদ্যযন্ত্রসহ সকল প্রকার গান হারাম। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যুগ যুগ ধরে কথিত পির
অলিদের দরবারে বা মাজারে হারমোনিয়াম, ঢোল, তবলা, শানাই, বাঁশি, করতাল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র
বাজিয়ে ভক্তিমূলক গান তথা জারি, সারি, মুরশিদী, লালন গীতির আসর বসিয়ে থাকে। এইসব গানের
আসরে নারী-পুরুষের সংমিশ্রন থাকে। তারা মনে করে এভাবে গান-বাজনা করলে ধ্যানে মগ্ন হওয়া
যায় এবং পির বাবা, অলি বাবার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। যারা এসব করে
এরা কেহই পাঁচ ওয়াক্ত সালাম সময় মতো আদায় করে না, রোজা রাখে না, যাকাত দেয় না, হজ্জ
করে না। আবার এসব মাজারে জটাধারী অনেক পাগলা পাগলী দেখতে পাওয়া যায়। এরা নাকি সুফি
সাধক। অথচ এরা ৫০ বছর ধরে গোসল করে না, পেশাব করে পানি নেয় না আর এরাই নাকি আল্লাহর
অলি।
গাদিরে খুমকে উৎসব হিসেবে পালন করা কি জায়েজ?
গাদিরে খুমের ঘটনাটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। তবে
একে শরিয়তে নতুন কোনো উৎসব (ঈদ) বা বাৎসরিক ইবাদতের দিন হিসেবে পালনের বিধান নেই।
শিয়া সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি: শিয়া মুসলমানরা
জিলহজ মাসের ১৮ তারিখে দিনটিকে 'ঈদুল গাদীর' হিসেবে অত্যন্ত আনন্দ ও উৎসবের সাথে পালন
করেন। তাদের মতে, এই দিনে হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত
ও উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
সুন্নি সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি: সুন্নি আলেম
ওলামাদের মতে, গাদিরে খুমের ভাষণে হযরত আলী (রা.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত
হয়, তবে একে শরিয়তে নতুন কোনো উৎসব (ঈদ) বা বাৎসরিক ইবাদতের দিন হিসেবে পালনের বিধান
নেই।
গাদিরে খুম এর ঘটনা
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশম হিজরি জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখে আরাফাতের বিশাল ময়দানে উপস্থিত
প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার সাহাবীর সম্মুখে ইহজীবনের অন্তিম ভাষণ দান করেন, যা ‘বিদায় হজ্বের
ঐতিহাসিক ভাষণ’ নামে পরিচিত। তিনি ১০ই যিলহাজ্জ কুরবানীর দিন ‘মিনা’য় অবস্থানকালে সকালে
সূর্য উপরে উঠলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সাদা-কালো মিশ্রিত
বাহনে আরোহন করে (কংকর নিক্ষেপের পর) জামরায়ে আক্বাবায় অপর একটি ভাষণ দেন। বিদায় হজে¦র
সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফ
হতে মদীনা শরীফের দিকে যাত্রা করেন এবং ১৮ই যিলহজ¦ ‘গাদীরে খুম’ বা জলাশয়ের নিকটে পৌঁছে
সেখানে যাত্রা বিরতি করেন। তিনি এখানে ভাষণ প্রদান করেন। এটাকে গদির এ খুমের ভাষণ বলা
হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
তিনশ যোদ্ধার এক বাহিনী আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নেতৃত্বে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন। হযরত
আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র পরিচালনাধীন সৈন্যবাহিনী ইয়েমেনে অত্যন্ত সফল হয়েছিলো এবং
সেখানে সে দলটি বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমতের মালামাল) লাভ করে। আলী রাদিয়াল্লাহু
‘আনহু গণিমতের অংশ থেকে খুমুস (পাঁচভাগের এক অংশ) আলাদা করে রাখেন যার ভিতরে বিপুল
পরিমাণ শণজাত (লিলেনের) কাপড়ও ছিলো। যা গোটা সেনাবাহিনীর চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিলো।
সাহাবীদের ভেতর থেকে অনেকে সেই কাপড় থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তাদের কিছুটা ধার
দেয়ার জন্য আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে অনুরোধ করেন। এর কারণ হলো দলটি সেখানে তিনমাস
অবস্থান করছিলো এবং তাদের ব্যবহার্য কাপড়ও যথেষ্ট ছিলো না। কিন্তু আলী রাদিয়াল্লাহু
‘আনহু তা দিতে অস্বীকার করেন এবং তা সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
ইবনু হিশামের বর্ণনায় আছে,
ইয়েমেন বিজয়ের পর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু
তাঁর বাহিনীর সহ-অধিনায়ককে সেখানকার দায়িত্ব হস্তান্তর করে মক্কার উদ্দেশ্যে চলে যান।
আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু চলে যাবার পর সেই সহ-অধিনায়ক সবদিক বিবেচনা করে সৈন্যদলকে লিলেনের
কাপড় ধার দেবার সিদ্ধান্ত নেন। অল্পদিন পরে পুরো দলটিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর সাথে যোগ দেয়ার জন্য রওয়ানা করে। দলটির আগমনের খবর পেয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু
‘আনহু মক্কা থেকে বেরিয়ে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে আসেন। কাছে এসে তিনি দেখতে পান তাদের
গায়ে সেই লিলেনের পোষাক। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হন এবং তাদের
নির্দেশ দেন তৎক্ষণাৎ সে পোষাক খুলে পুরাতন পোষাক পরার জন্য। আলীর নির্দেশ মান্য করলেও
দলটির নেতাসহ সকলেই খুব ক্ষুব্ধ হয় এবং গোটা বাহিনীর মাঝে বড় ধরনের ক্ষোভের সঞ্চার
হয়।
খবরটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
কাছে গিয়েও পৌঁছায়। শুনে তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন,
“হে মানব সকল, আলীকে দোষারোপ কোরো না; কেননা
সে আল্লাহর পথে (ন্যায়ের পক্ষে) এতোই বিবেকবান যে তাকে দোষারোপ করা চলে না।’
বুরায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি
বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে খুমুস (গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) নিয়ে আসার জন্য খালিদ রাদিয়াল্লাহু
আনহুর কাছে পাঠালেন। (রাবী, বুরায়দা বলেন, কোন কারণে) আমি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’র
প্রতি নারাজ ছিলাম, আর তিনি গোসলও করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
কাছে ফিরে আসলে আমি তাঁর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বললেন, হে বুরায়দা! তুমি
কি আলীর প্রতি অসন্তুষ্ট? আমি উত্তর করলাম, জ্বী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার উপর অসন্তুষ্ট
থেকো না। কারন খুমুসের ভিতরে তার প্রাপ্য অধিকার এ অপেক্ষাও বেশি রয়েছে।
কিন্তু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
এই কথা কিছু মানুষ হয়তো মেনে নেন। কিন্তু সাহাবী বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ অনেকের
ক্ষোভ এতে মিটে যায়নি। দোষারোপ চলতেই থাকলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
হজ্জ শেষে মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ ফেরার পথে এ দলটি গাদির খুম নামের এক কুপের কাছে
যাত্রাবিরতি করলো। সেখানে হযরত আলীর নামে আবার অভিযোগ তোলা হলো। এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামও ক্ষুব্ধ হলেন ও লোকদের ডেকে আলী সম্পর্কে বললেন।
‘আমি কি তোমাদের জীবনের চেয়ে আওলা’ (শ্রেয়তর,
অধিকতর মূল্যবান) নই?’ আসহাবে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম যখন উত্তরে বলেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ,
জি, (আপনি শ্রেয়তর)’, তখন তিনি বলেন, ‘তাহলে আমি যার মওলা, আলীও তার মওলা।’ যাত্রার
পরবর্তী পর্যায়ে গাদীরে খুমে বিশ্রামের জন্যে থামলে তিনি সবাইকে সমবেত করেন এবং হযরত
আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র হাত ধরে ওই একই কথা (আমি যার মওলা, আলী-ও তার মওলা) পুনর্ব্যক্ত
করেন। অতঃপর এ দুআ যোগ করেন:
‘হে আল্লাহ! আপনিও তাকে ভালোবাসুন, যে আলীকে
ভালোবাসে; আর তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করুন, যে তার প্রতি শত্রুতাভাব পাষেণ করে।’ এরই
ফলশ্রুতিতে হযরত আলী’র বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ প্রশমিত ও স্তব্ধ হয়ে যায়।”
অন্য আরেকটি কারণঃ ইবনে ক্বাসীর তাঁর ‘আল-বেদায়া
ওয়ান-নেহায় কিতাবে লিখেন,
হযরত আলী’র অধীনস্থ সৈন্যরা বস্ত্রের পরিবর্তন
নিয়েই কেবল ক্ষুব্ধ ছিলেন না, বরং তাঁরা সামগ্রিকভাবে গনীমতের মালামাল বণ্টন নিয়ে অসন্তুষ্ট
ছিলেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের বদৌলতে মুসলমানবৃন্দ অনেক উট লাভ করেন (গনীমত হিসেবে),
কিন্তু তিনি সবাইকে সেগুলোর মালিকানা ও দখল নিতে বারণ করেন। আল-বায়হাক্বী বর্ণনা করেন
হযরত আবূ সাঈদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে এ মর্মে যে, হযরত আলী তাঁদেরকে ওই উটগুলোতে
চড়তেও নিষেধ করেন। কিন্তু তিনি যখন মক্কার উদ্দেশ্যে ইয়েমেন ত্যাগ করেন, তখন তাঁর সহ-অধিনায়ক
মানুষের দাবির মুখে আত্মসমর্পণ করেন এবং সৈন্যদেরকে উটগুলোতে চড়ার অনুমতি দেন। হযরত
আলী এটা দেখার পর রাগান্বিত হন এবং সহ-অধিনায়ককে দোষারোপ করেন।
হযরত আবূ সাঈদ (রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু) বলেন:
“আমরা মদীনা প্রত্যাবর্তনকালে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র কাছে হযরত
আলী হতে আমাদের প্রত্যক্ষকৃত কঠোরতা সম্পর্কে উল্লেখ করি। তিনি (উত্তরে) বলেন: ‘থামো…আল্লাহর
কসম, আমি জেনেছি সে আল্লাহরই ওয়াস্তে (বা খাতিরে) ভালো কাজ করেছে’।”
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত
আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’কে (গনীমতের) খুমুস্ (তথা রাষ্ট্রীয় অংশ) আনতে হযরত খালেদ
বিন ওয়ালীদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে প্রেরণ করেন, আর আমি তাঁর প্রতি বৈরিতা রাখতাম।
(ওই সময়) তিনি গোসল করেছিলেন। আমি হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদকে বলি: ‘আপনি কি এটা দেখতে
পাচ্ছেন না?’ আমরা যখন হুজূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির হই,
তখন বিষয়টি তাঁর কাছে পেশ করি। তিনি উত্তরে বলেন, “হে বোরায়দা, তুমি কি আলীর প্রতি
শত্রুতাভাব পোষণ করো?” আমি উত্তরে বলি: ‘জি।’ তিনি বলেন: “বৈরিতা রেখো না, কেননা সে
খুমুস্ হতে অধিকতর পাওয়ার হক্কদার।”
হযরত বোরায়দা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা
করেন, আমি হযরতে ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র সাথে ইয়েমেন অভিযানে যাই এবং
তাঁর তরফ থেকে শীতলতা প্রত্যক্ষ করি; তাই আমি (ফেরার পরে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম’এর কাছে এসে হযরত ইমামে আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু)’র কথা উল্লেখ
করে তাঁর সমালোচনা করি; এমতাবস্থায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র চেহারা
মোবারক বদলে যেতে দেখি। আর তিনি বলেন: “ওহে বোরায়দা, আমি কি ঈমানদারদের তাদের নিজেদের
চেয়েও কাছে নই?” আমি (উত্তরে) বলি: জি, এয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
অতঃপর তিনি বলেন: “আমি যার মওলা, আলী-ও তার মওলা।”
হযরত বোরায়দা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন,
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে হযরত আলী (কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহু
রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র সাথে ইয়েমেন অভিযানে প্রেরণ করেন এবং আমি তাঁর (হযরত আলীর) তরফ
থেকে শীতলতা লক্ষ্য করি; আমি যখন প্রত্যাবর্তন করি, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আপন শির মোবারক (তাঁর দিকে) উঠিয়ে বলেন: “আমি যার মওলা, এই আলী-ও তারই মওলা।”
উক্ত ভাষণের মাধ্যমে আহলে বাইতের প্রতি সকলের
মোহাব্বতের সম্পর্ক রাখার তাকীদ করা হয়েছে। এর দ্বারা বুরাইদা আসলামী রাঃ এর মন থেকে
হযরত আলী রাঃ এর প্রতি যে ধারণা ছিল তা দূরিভূত হয়ে যায়।
ব্যাস এতটুকুই। উক্ত খুতবার কোথাও নবীজী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর হযরত আলী রাঃ কে খলীফা নিযুক্ত করতে হবে এমন কোন কথা নেই। শুধু
মোহাব্বতের তাকীদ করা হয়েছে। আর মোহাব্বত কখনোই নেতৃত্বের হকদার হবার মানদণ্ড নয়।
মোহাব্বততো মা বাবাকেও করতে হয়। মোহাব্বত স্ত্রী
সন্তানকেও করতে হয়। কিন্তু এর মানে কি এ মোহাব্বত নেতৃত্বের গুণ?
যদি শুধু নবী পরিবারের সদস্য হওয়া এবং অধিক
মোহাব্বতই নেতৃত্ব পাবার যোগ্যতা হয়, তাহলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
পর হযরত ফাতিমা রাঃ প্রথম খলীফা হবার প্রথম হকদার। তারপর হযরত হাসান রাঃ, তারপর হযরত
হুসাইন রাঃ, তারপর হযরত আলী রাঃ।
শিয়া সম্প্রদায়ের মূলনীতি অনুপাতে নবী পরিবারের
সদস্য হওয়া এবং মোহাব্বতই খলীফা হবার মানদণ্ড হলেও হযরত আলী রাঃ চতুর্থ খলীফা। তাহলে
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারীগণ হযরত আলী রাঃ কে চতুর্থ খলীফা নিযুক্ত করা অপরাধ
মনে করা হয় কেন?
গাদীরে খুমের ঘটনাকে হযরত আলী রাঃ এর প্রথম
খলীফা হবার দলীল হিসেবে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে, এবং সাহাবায়ে
কেরামের যুগে কেউ পেশ করেনি। এমন কি আহলে বাইতের কোন সদস্য গাদীরে খুমের ভাষণকে খলীফা
হবার দলীল হিসেবে কখনোই পেশ করেননি।
এটা পরবর্তী যুগের কট্টরপন্থী শিয়াদের উর্বর
মস্তিস্কের ফসল।
এমন কি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
ইন্তেকালের পর যখন সাকীফায়ে বনী সা’আদে খিলাফত বিষয়ে মাশোয়ারা হচ্ছিল। তখন গাদীরে খুমে
উপস্থিত সাহাবাগণও ছিলেন। ছিলেন আহলে বাইতের সদস্যগণও। কিন্তু কেউ গাদীরে খুমের ভাষণকে
খিলাফতের দলীল হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
এর মানে গাদীরে খুমের ঘটনাটি কেবলি আহলে বাইতের
প্রতি একটি মোহাব্বতের তাগীদ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। যা যেমন সকল সাহাবাগণ জানতেন,
তেমনি আহলে বাইতের সদস্যগণও জানতেন। তাই এ বিষয়কে সামনে কেউ আনেননি। (সীরাতে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-৩/১৪৯-১৫১, ইদ্রিস
কান্ধলবী রহঃ কৃত)।
আলী রাঃ কে ভালবাসার গুরুত্ব
আলী (রাঃ) খোলা ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণকে উদ্দেশ্য
করে বললেন, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গাদিরে খুমের
ভাষণ শুনেছে সে যেন উঠে দাঁড়ায়। এ কথা শুনে সাঈদের পক্ষ থেকে ছয়জন এবং যায়িদের
পক্ষ থেকে ছয়জন উঠে দাঁড়ালো। তারা সাক্ষ্য দিল যে, তারা গাদিরে খুমে আলী (রাঃ) কে
উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছে, আল্লাহ কি
মুমিনদের জন্য অধিকতর আপনজন নন? সবাই বললো, অবশ্যই। তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ, আমি যার
আপনজন, আলীও তার আপনজন। হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আলীর বন্ধু হয়, তুমি তার বন্ধু হও।
আর যে ব্যক্তি আলীর শত্রু হয়, তুমি তার শত্রু হও।” (মুসনাদে
আহমাদ (ইসলামিক সেন্টার) ৯৬১, ৯৫০, )। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi।
রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ)-এর ছাহাবায়ে কেরাম এবং পরিবারবর্গকে ভালবাসা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।
অথচ মুসলিম নামধারী শী‘আরা হাতে গোণা কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত বাকীদেরকে ‘কাফের’ গণ্য
করার ধৃষ্টতা দেখাতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। এবিষয়ে প্রকৃত মুমিনদের কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ
বলেন, ‘যারা পরে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও
আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর, যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রবর্তী। আর যারা ঈমান এনেছে
তাদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনরূপ হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক!
নিশ্চয়ই তুমি অতিশয় করুণাময়, পরম দয়ালু’। (সুরা হাশর ৫৯/১০)।
যুহায়র ইবনু হারব ও শুজা ইবনু মাখলাদ (রহঃ)......ইয়াযীদ
ইবনু হাইয়্যান (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি, হুসায়ন ইবনু সাবরাহ এবং উমার ইবনু
মুসলিম- আমরা যায়দ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) এর কাছে গেলাম। যখন আমরা তার নিকট বসি তখন হুসায়ন
(রাযিঃ) তাকে বললেন, হে যায়দ আপনি তো অনেক কল্যাণ লক্ষ্য করেছেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছেন, তার হাদীস শ্রবণ করেছেন, তার সাথে থেকে যুদ্ধ করেছেন
এবং তার পেছনে সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করেছেন। আপনি অনেক কল্যাণ অর্জন করেছেন,
হে যায়দ। আপনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে যা শ্রবণ করেছেন তা
আমাদের বলুন। যায়দ (রাযিঃ) বললেন, ভাতুস্পুত্র আমার বয়স বেড়েছে, আমি পুরনো যুগের
মানুষ। অতএব রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হতে যা আমি সংরক্ষণ
করেছিলাম এর কিয়দংশ ভুলে গেছি। তাই আমি যা বলি তা গ্রহণ করো আর আমি যা না বলি সে সম্বন্ধে
আমাকে কষ্ট দিও না।
এরপর তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম একদিন মক্কাহ ও মদীনার মাঝামাঝি খুম্ম’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে
বক্তৃতা দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা শেষে ওয়ায-নাসীহাত করলেন। অতঃরপর বললেন,
হুঁশিয়ার, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষ, অতি সত্বরই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা
আসবে, আর আমিও তার আহানে সাড়া দিব। আমি তোমাদের নিকট ভারী দুটাে জিনিস রেখে যাচ্ছি।
এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং আলোকবর্তিকা আছে। অতএব তোমরা আল্লাহর
কিতাবকে অনুসরণ করো, একে শক্ত করে আঁকড়ে রাখো। তারপর তিনি কুরআনের প্রতি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা
দিলেন।
এরপর বলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো আমার আহলে বায়ত।
আর আমি আহলে বায়তের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। আহলে বায়তের ব্যাপারে
তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বায়তের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহর কথা
মনে করিয়ে দিচ্ছি।
হুসায়ন (রাযিঃ) বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহলে বায়ত কারা, হে যায়দ? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর বিবিগণ কি আহলে বায়তের অধিভুক্ত নন? যায়দ (রাযিঃ) বললেন, বিবিগণও
আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু আহলে বায়ত তারাই তার (মৃত্যুর) পর যাদের উপর যাকাত
নেয়া নিষিদ্ধ। হুসায়ন (রাযিঃ) বললেন, এসব লোক কারা? যায়দ (রাযিঃ) বললেন, এরা আলী,
আকীল, জাফার ও আব্বাস (রায়িঃ) এর পরিবার-পরিজনেরা। হুসায়ন (রাযিঃ) বললেন, এদের সবার
জন্য যাকাত গ্রহণ নাজায়িয? যায়দ (রাযিঃ) বললেন, হ্যাঁ। (সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬১১৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৪০৮, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৬১৩১, মুসনাদে আহমাদ ২৬৬২২, সিলসিলাতুস সহীহাহ্
১৫৯৪, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৫৩৫৭, যিলাযুল জান্নাহ ১৪১২; কারণ ইবনু ইসহাক ‘আন দ্বারা
হাদীস বর্ণনা করেছেন আর তিনি মুদাল্লিস রাবী, হিদায়াতুর রুওয়াত ৫/৪৪২, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৬০০৭, ইসলামিক সেন্টার ৬০৪৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গের যথাযথ
সম্মান বজায় রাখতে হবে।
অথচ এই ভালবাসার অপব্যবহার করে আমাদের দেশে
‘আওলাদে রাসূল’ বা রাসূলের বংশধর হওয়ার দাবীদারগণ ধর্মপ্রাণ জনগণের নযর-নেয়াযের প্রতি
প্রলুব্ধ হয়ে স্ব-ঘোষিত ‘আওলাদে রাসূল’-এর মিথ্যা ফযীলত বর্ণনা করে থাকেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে
তারা বংশপরম্পরায় রাসূল (ছাঃ)-এর বংশের সাথে মিলেও যায়নি অথবা তারা রাসূল (ছাঃ)-এর
পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ-অনুকরণও করেন না। বরং তাদের কর্মকান্ড সমূহ বিভিন্ন শিরক-বিদ‘আতে
ভরপুর।
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, নবী (সা.) বলেছেন: তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ করো না। কেননা তোমাদের কেউ
যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর পথে খরচ করে, তবুও তাঁদের মর্যাদার এক মুদ কিংবা
অর্ধ মুদ (যব গম খরচ)-এর সমান সাওয়াব পৌছতে পারবে না। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৬০০৭, সহিহ বুখারী ৩৬৭৩, সহিহ মুসলিম ২২১-(২৫৪০), ২২২-(২৫৪১), সুনান
আততিরমিযী ৩৮৬১, সুনান আবূ দাউদ ৪৬৫৮, সুনান ইবনু মাজাহ ১৬১, সহীহুল জামি' ৭৩১০, সিলসিলাতুস
সহীহাহ ১৯২৩, মুসনাদে আহমাদ ১১০৯৪, মুসনাদে আবদ ইবনু হুমায়দ ৯১৮, আবূ ইয়া'লা ১০৮৭,
সহীহ ইবনু হিব্বান ৭২৫৩, শু’আবূল ঈমান ১৫০৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিন্ নাসায়ী ৮৩০৮,
আল মু'জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩০৩, আল মু'জামুস সগীর লিত্ব তবারানী ৯৮২, আল মু'জামুল
আওসাত্ব ৬৮৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অতএব ছাহাবায়ে কেরাম, রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গ
থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের সৎকর্মশীল দাঈ ও কর্মীগণকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসা মুমিনগণের
জন্য অবশ্য কর্তব্য। আমরা সেভাবেই সম্মান করে আসছি। কিন্তু মাঝখান খেকে অতিভক্তি চোরের
লক্ষণ এমন কিছু সুফিবাদী শিয়াদের সাথে তাল মিলিয়ে শুধু হযরত আলী রা: কে নিয়ে প্রতি
বছর অতি বাড়াবড়ি করে। যা ইসলাম সমর্থন করে না। এখন কথা হচ্ছে, হযরত আলী রাঃ কে শুধু
মিছিল করে ভালবাসা দেখালেই তো হবে না। তিনি যে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন এবং আল্লাহর
আইন দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করেছেন, সেই ভালবাসার লোকগুলো কোথায় যারা হযরত আলী রাঃ এর শাসন
ব্যবস্থা অনুসরণ করছে না, ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েমে কোনো ইসলামি দল বা সংগঠন করে
না, ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমে ইসলামি দলকে ভোট দেয় না।
হযরত আলী রাঃ কে শুধু মুখে মুখে ভালবাসলেই
চলবে না তা তাঁর কথা ও নীতিকে অনুসরণ করতে হবে। যেমন,
আলী (রাঃ) মিম্বারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন।
বললেনঃ আল্লাহর কসম, আল্লাহর কিতাব ছাড়া আমাদের নিকট আর কোন কিতাব নেই, যা আমরা তোমাদের
সামনে পাঠ করি। আর এই পুস্তিকাটি (কিছু হাদীসের সংকলন তার তরবারীর সাথে ঝুলন্ত)। এটি
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে গ্ৰহণ করেছি। এতে যাকাতের
বিধানসমূহ লেখা রয়েছে। এটি তাঁর একটি তরবারীর সাথে ঝুলন্ত রয়েছে যার খাপ ছিলো লোহার।
(মুসনাদে আহমাদ (ইসলামিক সেন্টার) ৭৮২)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahi।
এখানে আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনের শাসন ব্যবস্থা
ঐ ভালবাসার লোকগুলো মেনে চলে না।
মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ)...আলী (রাঃ) থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
থেকে বর্ণিত এই সহীফা ছাড়া আর কিছুই নাই। তিনি আরো বলেন, ’আয়ির নামক স্থান থেকে অমুক
স্থান পর্যন্ত মদিনা হল হারাম। যদি কেউ এতে কুরআন–সুন্নাহর খেলাফ অসঙ্গত কোন কাজ করে
অথবা কুরআন-সুন্নাহর খেলাফ, আচরণকারী আশ্রয় দেয়, তাহলে তাঁর উপর আল্লাহর লা’নত এবং
সকল ফেরেশতা এবং মানুষের। সে ব্যক্তির কোন নফল এবং ফরজ ইবাদাত কবুল করা হবে না।
তিনি আরো বলেন, মুসলিম কর্তৃক নিরাপত্তাদানের
অধিকার সকলের ক্ষেত্রে সমান। তাই যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দেওয়া নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন
করবে, তাঁর প্রতি আল্লাহর লা’নত এবং সকল মানুষের ও ফিরিশতাদের। আর কবুল করা হবে না
তাঁদের কোন নফল এবং ফরজ ইবাদাত। যে ব্যক্তি তাঁর মাওলার (মিত্রের) অনুমতি ব্যতীত অন্য
অন্য কাওমের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তাঁর প্রতিও আল্লাহর লা’নত এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের।
সে ব্যক্তির কোন নফল এবং ফরজ ইবাদাত কবুল করা হবে না। আবূ ’আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন,
"আদলুন" অর্থ বিনিময়। (সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১৭৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এখানে হযরত আলী রাঃ এর ভাষ্য অনুযায়ী ঐসব ভালবাসার
লোকগুলো, পীর অলি ও অন্যান্য মাজহাবীদের কুরআর-সুন্নাহর বিপরীত কাজ তথা বিদআতী কর্মকান্ডের
কারণে তারা লানত প্রাপ্ত । তাদের ফরজ নফল ইবাদত কবুল হবে না।
মুহাম্মদ ইবনু কাসীর (রহঃ) ... আলী (রাঃ) থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআন এবং
এ কাগজে যা লিখা আছে তা ছাড়া কোন কিছু লিপিবদ্ধ করিনি। (উক্ত লিপিতে রয়েছে) নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আয়ির পর্বত থেকে এ পর্যন্ত মদিনার হারাম এলাকা। যে কেউ দ্বীনের
ব্যাপারে বিদআত উদ্ভাবন করে কিংবা কোন বিদআতীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ তা’’আলা
ফিরিশতা ও সকল মানুষের লা’নত। তা কোন ফরয কিংবা নফল ইবাদত কবূল হবে না। আর সকল মুসলিমের
পক্ষ থেকে নিরাপত্তা একই পর্যায়ের। সাধারণ মুসলিম নিরাপত্তা দিলে সকলকে তা রক্ষা করতে
হবে। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দেওয়া নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে তার উপর আল্লাহ তা’আলা লা’নত
এবং ফিরিশতাগণ ও সকল মানুষের। তার কোন নফল কিংবা ফরয ইবাদত কবূল হবে না। আর যে স্বীয়
মনীবের অনুমতি ব্যতীত অন্যদের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি করে, তার উপর আল্লাহ তা’’আলার
লা’নত এবং ফিরিশ্তাগণ ও সকল মানুষের। তার কোন নফল কিংবা ফরয ইবাদত কবূল হবে না। (সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১৭৪৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৭০)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ মূসা (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, অমুসলিমদের কাছে থেকে (জিযিয়া স্বরূপ) একটি দ্বীনার বা দিরহামও
তোমরা পাবে না, তখন তোমাদের কি অবস্থা হবে? তাকে বলা হল, হে আবূ হুরায়রা (রাঃ) আপনি
কিভাবে মনে করেন যে, এমন অবস্থা দেখা দিবে, তিনি বললেন, হ্যাঁ, কসম সে মহান সত্তার
যাঁর হাতে আবূ হুরায়রার প্রাণ, যিনি সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলে স্বীকৃত (অর্থাৎ মুহাম্মদ)
এর উক্তি থেকে আমি বলছি। লোকেরা বলল, কি করণে এমন হবে? তিনি বলেন, আল্লাহ তা’’আলা ও
তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদত্ত নিরাপত্তা ক্ষুন্ন করা হবে।
ফলে আল্লাহ তা’আলা যিম্মিদের অন্তরকে কঠোর করে দিবেন; তারা তাদের হাতে সম্পদ দিবে না।
(সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ২৯৫৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩১৭৯ – ৩১৮০)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
মুহাম্মদ
ইবনু কাসীর (রহঃ) ... আলী (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে
বলতে শুনেছি যে, শেষ যামানায় এমন একদল মানুষের আবির্ভাব ঘটবে, যারা হবে অল্পবয়স্ক এবং
যাদের বুদ্ধি হবে স্বল্প। ভাল ভাল কথা বলবে; কিন্তু তারা ইসলাম থেকে এমন ভাবে বেরিয়ে
যাবে যেমন তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদের ঈমান গলদেশের নীচে পৌঁছবে না। সুতরাং তোমরা
তাদের যেখানে পাও, হত্যা কর। এদের হত্যাকারীর জন্য কিয়ামতে পুরস্কার রয়েছে। (সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৬৯২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫০৫৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত হাদিস অনুযায়ী প্রমান পাওয়া
যায় যে, গাদিরে খুম, ঈদে মিলাদুন্নবী, মিলাদ কিয়াম, আশুরাসহ অনুরুপ বিদআতী উৎসব পালনে
এখন অল্প বয়স্ক লোকদের দেখা যাচ্ছে যারা এসব কর্মকান্ডে অগ্রগামী।
আলী রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ’’যে কোন মুসলিম অন্য
কোন (অসুস্থ) মুসলিমকে সকাল বেলায় কুশল জিজ্ঞাসা করতে যাবে, তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত
সত্তর হাজার ফিরিশ্তা কল্যাণ কামনা করবেন। আর যদি সে সন্ধ্যা বেলায় তাকে কুশল জিজ্ঞাসা
করতে যায়, তাহলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফিরিশ্তা তার মঙ্গল কামনা করে। আর তার জন্য
জান্নাতের মধ্যে পাড়া ফল নির্ধারিত হবে। (রিয়াযুস স্বা-লিহীন
(রিয়াদুস সালেহীন) ৯ি০৪, সহিহ মুসলিম ২৫৬৮,
সুনান আততিরমিযী ৯৬৭, আহমাদ ২১৮৬৮, ২১৮৮৪, ২১৮৯৮, ২১৯১৬, ২১৯৩৩, ২১৯৩৮)। হাদিসের মানঃ
হাসান (Hasan)।
উক্ত হাদিস অনুসারে ভালবাসার
ঐ লোকগুলো কি কোনো অনুস্থ মুসলিমকে দেখতে যায়?
আলী রাদিয়াল্লাহু ’আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
’বিতরের নামায, ফরয নামাযের ন্যায় অপরিহার্য নয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এটিকে প্রচলিত করেছেন (অর্থাৎ এটি সুন্নত)। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ বিতির (বিজোড়)
সেহেতু তিনি বিতির (বিজোড়কে) ভালবাসেন। অতএব হে কুরআনের ধারক-বাহকগণ! তোমরা বিতির পড়।”
(রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন) ১১৩৯, সুনান আবূ দাউদ
১৪১৬, সুনান আততিরমিযী ৪৫৩, সুনান আননাসায়ী ১৬৭৫, সুনান ইবনু মাজাহ ১১৬৯)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
উক্ত হাদিস অনুযায়ী ঐ ভালবাসার
লোকগুলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতসহ বিতর আদায় করেন তো?
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, একদা নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও ফাতেমার নিকট রাত্রি বেলায় আগমন করলেন এবং বললেন,
“তোমরা স্বামী-স্ত্রী কি (তাহাজ্জুদের) নামায পড় না?” (রিয়াযুস
স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন) ১১৬৯, সহিহ বুখারী ১১২৭, ৪৭২৪, ৭৩৪৭, ৭৪৬৫, সহিহ মুসলিম
৭৭৫, নাসায়ী ১৬১১, ১৬১২, আহমাদ ৫৭২, ৭০৭, ৯০২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু যেহেতু
বলেছেন তাহলে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন তো?
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাযের জন্য দণ্ডায়মান হতেন, তখন তাশাহহুদ
ও সালাম ফিরার মধ্যখানে শেষ বেলায় অর্থাৎ সালাম ফিরবার আগে) এই দো’আ পড়তেন, “আল্লা-হুম্মাগফিরলী
মা ক্বাদ্দামতু অমা আখ্খারতু অমা আসরারতু অমা আ’লানতু অমা আসরাফতু অমা আন্তা আ’লামু
বিহী মিন্নী, আন্তাল মুক্বাদ্দিমু অ আন্তাল মুআখখিরু লা ইলা-হা ইল্লা আন্ত্।”
অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মার্জনা কর,
যে অপরাধ আমি পূর্বে করেছি এবং যা পরে করেছি, যা গোপনে করেছি এবং যা প্রকাশ্যে করেছি,
যা অতিরিক্ত করেছি এবং যা তুমি আমার চাইতে অধিক জান। তুমি আদি, তুমিই অন্ত। তুমি ব্যতীত
কেউ সত্য উপাস্য নেই। (রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন) ১৪৩২, সহিহ মুসলিম ৭৭১, সুনান আতিরমিযী ৩৪২২, ৩৪২৩,
সুনান আবূ দাউদ ৭৬০, ১৫০৯, সুনান আননাসায়ী ১৬১৯, সুনান ইবনু মাজাহ ১৩৫৫)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
গাদিরে খুম উৎসব পালনকারীদের বলছি, উক্ত হাদিস অনুসারে আমল করেন তো?
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা তাঁকে ও ফাতেমাকে বললেন, “যখন তোমরা বিছানায় যাবে,
তখন ৩৩ বার ’আল্লাহ আকবার’, ৩৩ বার ’সুবহানাল্লাহ’ এবং ৩৩ বার ’আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ
করবে।” অন্য এক বর্ণনা অনুপাতে ৩৪ বার ’সুবহানাল্লাহ’, আর এক বর্ণনা অনুপাতে ৩৪ বার
’আল্লাহু আকবার’ পড়তে আদেশ করেছিলেন। (রিয়াযুস স্বা-লিহীন
(রিয়াদুস সালেহীন) ১৪৬৭, সহীহুল বুখারী ৩১১৩,
৩৭০৫, ৫৩৬১, ৫৩৬২, ৬৩১৮, মুসলিম ২৭২৭, তিরমিযী ৩৪০৮, ৩৪০৯, আবূ দাউদ ২৯৮৮, ৫০৬২, আহমাদ
৬০৫, ৭৪২, ৮৪০, ৯৯৯, ১১৪৪, ১২৩৩, ১২৫৩, ১৩১৫, দারেমী ২৬৮৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
গাদিরে খুম উৎসব পালনকারীদের বলছি, উক্ত হাদিস
অনুসারে আমল করেন তো?
হযরত আলী রা. এরকম মোট ৫৮৬টি হাদিস বর্ণনা
করেছে যা অনুযায়ী গাদিরে খুম উৎসব পালনকারী লোকগুলো আমল করে না। দেখবেন, প্রতিবছর
জিলহজ মাসের ১৮ তারিখ এলে শিয়াদের সাথে আমাদের দেশের পীর-অলি, সুফি-সাধক ও তাদের অনুসারীগণ
হযরত আলী রা. এর প্রতি মিছিল মিটিংসহ বিভিন্নভাবে ভালবাসার বহি:প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে।
অথচ এরা সঠিকভাবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে না, পেশাব করে পানি নেয় না, বাড়ির মহিলারা
বেপর্দায় চলাফেরা করে ইত্যাদি।
মোদ্দা কথা হলো, আলী রা.সহ সকল সাহাবী, রাসুল সা. তাঁর স্ত্রীগণ ও তাঁর
পরিবারবর্গ, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈগণের প্রতি আমাদের ভালবাসা থাকবে। তবে শুধূ একজনের প্রতি
ইসলাম বহির্ভুত কর্মকান্ড চালিয়ে ভালবাসা দেখালে চলবে না। গাদিরে খুম রাসুল সা. এর
সময়েই ঘটেছে, সেসময় সাহাবাগণ জীবিত ছিলেন, তাঁরা যেহেতু কোনো উৎসব পালন করেননি তাই
বর্তমানে বিদআতী পন্থায় উৎসব পালন ১০০% বর্জনীয়।
মাজার বা কবর জিয়ারত করার সহিহ বিধান কি?
সমাজের অনেকেই বলে থাকেন অলি-আউলিয়া বা বুজুর্গদের
কবরকে কবর না বলে মাজার বলতে হবে। এভাবে কবর বলাতে অলি-আউলিয়াদের অসম্মান হয়। বিষয়টি
ইসলাম সমর্থন করে না।
কবর শব্দের অর্থ দাফনস্থল অর্থাৎ যে স্থানে
মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়।
আর মাজার শব্দের অর্থ দু’টি- জিয়ারত করা এবং
জিয়ারত স্থল। তাই যে কোনো মুসলমানের দাফনস্থলকে যেমন কবর বলা যায় তেমনি যে কোনো মুসলমানের
কবরকে আভিধানিক অর্থে মাজারও বলা যায়।
কেননা, সকল মুসলমানের কবরই জিয়ারত করা বৈধ।
অলি-আউলিয়া, বুজুর্গ ও নেককারদের দাফনস্থলকে কবর বলা যাবে না এমন কোনো বিধান ইসলামি
শরিয়তে নেই।
অলি-বুজুর্গদের কবরের জন্য কোরআন-হাদিসে কোথাও
মাজার শব্দ ব্যবহার হয়নি।
হাদিসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নবীদের দাফনস্থলকেও
কবর বলা হয়েছে। এমনকি হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরকেও
কবর শব্দেই উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সহিহ বোখারিতে বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ
(সা.) ইরশাদ করেছেন,
আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে রোগে মৃত্যু হয়েছিল, সে রোগাবস্থায় তিনি বলেছিলেনঃ
ইয়াহূদী ও নাসারা সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহ্র অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরকে
মসজিদে পরিণত করেছে। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) বলেন, সে আশঙ্কা না থাকলে তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর) কবরকে উন্মুক্ত রাখা হত, কিন্তু আমি আশঙ্কা করি যে, (উন্মুক্ত
রাখা হলে) একে মসজিদে পরিণত করা হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবঃ) ১৩৩০, ৪৩৫, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১০৭১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫২৯, আহমাদ ২৪১১৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৪২, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১২৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
বর্ণিত হাদিসে নবীদের দাফনস্থলকে কবর বলা হয়েছে।
অন্য এক হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তার
নিজের ব্যাপারেই বলেন,
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে
কবরস্থান বানিও না, আর আমার কবরকেও উৎসবস্থলে পরিণত করো না। আমার প্রতি তোমরা দরূদ
পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌঁছে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৯২৬, সুনান আবূ দাঊদ ২০৪২, সহীহ আল
জামি ৭২২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সুতরাং বোঝা গেল, যত সম্মানিত ব্যক্তিই হোক
তার দাফনস্থলকে কবর বলা দোষণীয় কিছু নয়। তাই অলি-বুজুর্গদের দাফনস্থলকেও কবর বলা যাবে।
তবে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাফনস্থলকে
রওজা বলা হয়। এর কারণ হলো, রওজা শব্দের অর্থ বাগান। এখানে রওজা দ্বারা উদ্দেশ্য, ‘জান্নাতের
একটি বাগান। ’
যেহেতু হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কবরটি জান্নাতের
নেয়ামতে ভরপুর একটি পবিত্র বাগান। তাই এ অর্থে তার কবরকে ‘রওজা আতহার’ (পবিত্র বাগান)
বলা হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কবর ইবাদত বা উপাসনার
স্থান নয়। কবর সংক্রান্ত যে সব বিষয় হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন (যথা জিয়ারত,
সালাম ও দোয়া) সেগুলো ছাড়া অন্য কোনো কিছু করা বৈধ নয়।
কবরকে সিজদা করা, চুমু খাওয়া, তাতে বাতি জ্বালানো-
গুনাহ ও শিরকি কাজ। এ বিষয়ে শরিয়তের অনেক দলিল রয়েছে।
বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে গেলে এ দু’আ পড়তে শিখিয়েছেনঃ
“আস্সালা-মু ’আলায়কুম আহলাদ দিয়া-রি মিনাল
মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা ওয়া ইন্না- ইনশা-আল্ল-হু বিকুম লালা-হিকূনা নাসআলুল্ল-হা
লানা- ওয়ালাকুমুল ’আ-ফিয়াহ্’’
(অর্থাৎ হে কবরবাসী মু’মিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের
ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি। আমরা আমাদের
ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭৬৪, সহিহ মুসলিম ৯৭৫, সুনান আননাসায়ী
২০৪০, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৫৪৭, আহমাদ ২২৯৮৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১২, আল
কালিমুত্ব ত্বইয়্যিব ১৫১, ইরওয়া ৭৭৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
অথবা
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি
বললাম, হে আল্লাহর রসূল! কবর যিয়ারতে আমি কি বলব? তিনি বললেন, তুমি বলবে,
“আস্সালা-মু ’আলা- আহলিদ দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা
ওয়াল মুসলিমীনা, ওয়া ইয়ারহামুল্ল-হুল মুসতাক্বদিমীনা মিন্না- ওয়াল মুস্তা’খিরীনা,
ওয়া ইন্না- ইনশা-আল্ল-হু বিকুম লালা-হিকূন’’
(অর্থাৎ সালাম বর্ষিত হোক মু’মিন মুসলিমের
বাসস্থানের অধিবাসীদের প্রতি! আর আল্লাহ আমাদের রহম করুন যারা প্রথমে চলে গেছে আর যারা
পরে আসবে তাদের উপর, ইনশাআল্লাহ আমরাও শীঘ্রই তোমাদের সাথে মিলিত হব।)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭৬৭, মুসলিম ৯৭৪, নাসায়ী ২০৩৭, ইবনু
হিব্বান ৭১১০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২১১, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৪৪২১)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
অন্য এক হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ
করেছেন, আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম
তাঁর সেই রোগাবস্থায় যাত্থেকে তিনি আর সেরে উঠেননি- বলেন, ইয়াহূদীদের প্রতি আল্লাহ
লা’নত করেছেন। তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরগুলোকে সিজদার জায়গা করে নিয়েছে। ‘আয়িশাহ
(রাঃ) মন্তব্য করেন, তা না হলে তবে তাঁর কবরকেও সিজদার জায়গা বানানোর আশঙ্কা ছিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৪৪৪১, ৪৩৫, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০৯১,
ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০৯৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কবরের উপর প্রদীপ অথবা
হারিকেন অথবা তৈলস্ফটিক যা মোমবাতির মত এসবের কোনটিই রাখা বৈধ নয়। কেননা এ সবই শিরকের
উপকরণ। মৃতকে দাফনের সময় আলোর প্রয়োজন হলে প্রদীপ অথবা লন্ঠন ব্যবহার করতে পারে। তবে
কবরস্থানে বাতি অথবা আলো প্রজ্বলন করে রাখা নিষেধ।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারাতকারী মহিলাদের অভিসম্পাত করেছেন।
যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে এবং কবরে বাতি জ্বালায় তাদেরকেও অভিসম্পাত করেছেন।
(সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী) ৩২৩৬, সুনান আততিরমীযি
৩২০)।
আরেক হাদিসে এসেছে,
আবুত তহির আহমাদ ইবনু আমর ও হারূন ইবনু সাঈদ
আল আয়লী (রহঃ) ..... সুমামাহ ইবনু শুফাই (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার
রোম সাম্রাজ্যের রূদিস নামক উপদ্বীপে ফুযালাহ ইবনু উবায়দ এর সঙ্গে ছিলাম। আমাদের একজন
সঙ্গী মারা গেলে ফুযালাহ তাকে কবরস্থ করতে আদেশ দিলেন। অতঃপর তার কবরকে সমান করে তৈরি
করা হল। অতঃপর তিনি বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি,
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরকে সমতল করে তৈরি করতে আদেশ করেছেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২১৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৬৮,
ইসলামী ফাউন্ডেশন ২১১১, ইসলামীক সেন্টার ২১১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, আবূ বকর ইবনু আবূ
শায়বাহ ও যুহারর ইবনু হারব (রহঃ) ...... আবূল হাইয়্যাজ আল আসাদী (রহঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, ’আলী (রাযিঃ) বলেন, আমি কি তোমাকে এমনভাবে পাঠাব না, যে কাজে রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তা হচ্ছে কোন (জীবের) প্রতিকৃতি
বা ছবি দেখলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবে এবং কোন উঁচু কবর দেখলে তা ভেঙ্গে দিবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২১৩৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৯৬৯, জামে তিরমিজি ১০৪৯, আল আহকাম (২০৭), ইরওয়া (৭৫৯), তাহযীরুস্ সাজিদ
(১৩০), ইসলামী ফাউন্ডেশন ২১১২, ইসলামীক সেন্টার ২১১৫, সুনান আননাসায়ী ২০৩১, সুনান আবূ
দাউদ ৩২১৮, আহমাদ ৬৮৫, ৭৪৩, ৮৯১, ১০৬৭, ১১৭৪, ১১৭৯, ১২৪৩, ১২৮৬, রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন) ১৬৯৬)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইসলামি আইনসমৃদ্ধ প্রসিদ্ধ কিতাব তাহতাবি আলা
মারাকিল ফালাহতে বলা হয়েছেম, কবর মুছবে না, কবরে চুমু দিবে না এবং কবরকে স্পর্শ করবে
না। কেননা, এটা নাসারাদের (খ্রিস্টান) রীতি।
উল্লেখ্য কবরে চুমু খাওয়া, সিজদা করা, তাওয়াফ
করা, কবরের ওপর ইমারত বানানো, গিলাফ চড়ানো, মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো ইত্যাদি একদিকে
যেমন শরিয়তের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ, অপরদিকে তা কবরবাসী অলি-আউলিয়াদের প্রতি চরম অবিচার।
কেননা, তারা পুরো জীবন শিরক-বিদআতের বিরুদ্ধে
সংগ্রাম করেছেন অথচ মৃত্যুর পর তাদরে প্রতি ভক্তি নিবেদনের নামে ওই সব কাজই করা হচ্ছে!
প্রকৃতপক্ষে সাহাবা, তাবেয়িন এবং অলি-বুজুর্গদের
পথ-নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের ঈমান-আমল ঠিক করা, তাওহিদ ও সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা এবং শিরক-বিদআত
ও সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমেই তাদেরকে প্রকৃত সম্মান করা যায়।
কবর জিয়ারতের সুন্নত পদ্ধতি হলো, প্রথম কবরের
কাছে গিয়ে সালাম দেবে। এরপর কবরকে পিছনে রেখে কিবলামুখি হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য এবং
কবরবাসীর জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে। যেকোনো পীর, অলি, সুফি-সাধকদের কবর বা মাজারে
গিয়ে তার নিকট কিছু না চেয়ে বরঞ্চ তার জন্যেই মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করে আসবেন। কারণ
যার কাছে গেছেন তিনিই কিন্তু কবরে আছেন মহাবিপদে। তিনি নিজের বিপদ দূর করবেন নাকি আপনাকে
সাহায্য করবেন?
বিভিন্ন দরবারে সংরক্ষিত পাথর পূজা একটি সুস্পষ্ট শিরক
কাবা শরীফে অবস্থিত দুইটি পাথরকে ইসলামে খুবই
গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যেমন:
হাজরে আসওয়াদ (Black Stone): এটি জান্নাত থেকে
পৃথিবীতে আগত পবিত্র পাথর, যা কাবা শরীফের পূর্ব কোণে
স্থাপন করা হয়েছে। হজ ও ওমরাহ পালনকালে এই পাথর চুম্বন করা বা স্পর্শ করা সুন্নত।
মাকামে ইব্রাহিম: পাথরটি সাধারণ রত্নপাথর না
হলেও ইসলামে এটি অত্যন্ত সম্মানিত। কারণ এতে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পায়ের ছাপ রয়েছে
এবং আল্লাহ তাআলা এটিকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আল-বাকারাহ,
আয়াত ১২৫)।
তবে এসব পাথরের কোনো কল্যাণ বা অকল্যাণ বলতে
কিছু নেই।
উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি হাজরে আসওয়াদের
কাছে এসে তা চুম্বন করে বললেন, আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র, তুমি কারো
কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তোমায় চুম্বন
করতে না দেখলে কখনো আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। (সহিহ বুখারী
১৫৯৭, ১৬০৫, ১৬১০, মুসলিম ১৫/৪১, হাঃ ১২৭০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
১৪৯৯)। হাদিসের মান সহিহ।
যেখানে কাবার ঘরের পাথরের কোনো শক্তি নেই সেখানে
বাংলাদেশের বিভিন্ন দরবার বা মাজারে অবস্থিত কাল্পনিক পাথর, ডেকসি আরও কিছুকে শক্তি
মনে করা, এসবের নিকট কল্যাণ আশা করা সম্পূর্ণ শিরক।
তাই যেসব মাজার বা দরবারে এসব কাল্পনিক পদার্থ
আছে সেগুলো রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলতে হবে। এগুলো শয়তানী কাজ।
রাসুল সা. কি গায়েব জানতেন?
“রাসুল (সাঃ) কি গায়েব জানতেন? কুরআন ও সহিহ
হাদিস ভিত্তিক দ্বন্দ্ব নিরসন” নামক বইটি বিস্তারিত পড়তে চাইলে গায়েব এর উপর ক্লিক
করুন। “গায়েব”
কদমবুচি করা কি জায়েজ?
আমাদর দেশে পীর দরবেশ, বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ী,
উস্তাদকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুছি করা হয়। কিন্তু এটা জায়েয হবার ভিত্তি খুবই
দুর্বল। তাছাড়া কদমবুছি হল, সম্মানের মধ্যে অতিরঞ্জিত করা যা শির্কের আহ্বায়ক। সর্বসিদ্ধান্ত
মাসআলা হল, ‘সম্মানে অতিরঞ্জিত করা, শির্কের আহ্বায়ক, আর শির্কের আহ্বায়ক হারাম, আর
হারামের আহবায়কও হারাম। তাই শির্ক যেহেতু হারাম, তার আহ্বায়কও হারাম, বিধায় উক্ত শির্ক
ও হারাম মিশ্রিত কাজ থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলিম ও ঈমানদারের জন্য অত্যন্ত জরুরী
তথা ওয়াজিব। অন্যথায় ক্রমান্বয়ে ইহা সিজদার সাথে সামঞ্জস্যমান হয়ে যাবে, বর্তমান যমানায়
যার প্রমাণও পরিলক্ষিত হয়।
কদম্বুছি বা পা চুম্বন কিছু কিছু আলেমগণের
নিকট জায়েয হলেও অনেক ফেকাহবিদগণের নিকট তা জায়েয নয়। ফেকাহবিদগণের নিয়ম ভিত্তিক সর্বসিদ্ধান্ত
মাসআলা হল জায়েয এবং নাজায়েযের মধ্যে মত বিরোধ হলে নাজায়েযই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।
সুতরাং তাকে কেউ জায়েয বললেও নিয়মভিত্তিক সিদ্ধান্ত অনুসারে তা না করাই ভালো, বরং তা
বিদ‘আতের বেশি নিকটবর্তী।
জানা আবশ্যক যে, অফদে আব্দুল কায়েছ এর হাদীস
উপস্থাপনে যারা কদমবুছিকে জায়েয বলেন, তার উত্তর হল- সেই হাদীসটি বিশুদ্ধ হওয়া সাপেক্ষে
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথেই নির্দিষ্ট। অন্য কারও জন্য তা কোনো সাহাবী
করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি। আর শরীয়তে মুহাম্মদী যেহেতু অবিনশ্বর ও চিরন্তন শরীয়ত,
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে যেহেতু নবুওয়ত ও রিসালতের পরিসমাপ্তি
ঘটেছে এবং তাঁর শরীয়তই যেহেতু সর্বশেষ শরীয়ত, সেহেতু একে বিকৃতি ও মূলচ্যুতি থেকে বাঁচাবার
এমন প্রতিটি ছিদ্র পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে শির্ক ও পৌত্তলিকতা প্রবেশ করতে
না পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সে সব বিষয়ও এ শরীয়তে হারাম করে দেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী
কোনো যুগে শির্ক ও মূর্তিপূজার উৎস বা কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল। ছবি ও চিত্রাঙ্কণ এবং তার
ব্যবহারও এজন্য হারাম করা হয়েছে। আর এমন সময়ে নামায পড়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যে সময়ে
মুশরিক ও কাফিরগণ নিজেদের তথাকথিত উপাস্যদের পূজা ও উপাসনা করত। কারণ এ বাহ্যিক সাদৃশ্য
পরিণামে যেন শির্কের সামঞ্জস্য না হয়ে দাঁড়ায়। একই কারণে কদমবুছিও জায়েয হবে না।
তাছাড়া কদমবুছির মাধ্যমে শরীয়ত অনুমোদিত সালাম
বাদ পড়ে যায়। কারণ একটি বিদ‘আত চালু হলে একটি সুন্নাত বাদ পড়ে যায়।
শিক্ষক পিতা-মাতাসহ যেকোনো সম্মানিত ব্যক্তির
কদমবুচি করা যাবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কোনো ছাহাবী কিংবা তার আদরের কন্যা ফাতেমা রযিয়াল্লাহু আনহা তাঁর
এগার জন স্ত্রীর কেউ তাঁর কদমবুচি করেছেন এর কোনো প্রমাণ নেই। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান করাকে অপছন্দ করতেন। আনাস রযিয়াল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, ছাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
চেয়েও প্রিয় কোনো ব্যক্তি ছিল না। কিন্তু তাঁকে দেখেও তারা দাঁড়াতেন না। কেননা, তাঁরা
জানতেন যে, তিনি দাঁড়ানো পছন্দ করেন না’
মূল হাদিসঃ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবায়ে
কিরামের নিকট রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ব্যক্তি
আর কেউ ছিল না। কিন্তু তবুও তাদের অবস্থা এই ছিল যে, যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-কে আগমন করতে দেখতেন তার সম্মানার্থে তাঁরা দাঁড়াতেন না। কেননা তারা জানতেন
যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পছন্দ করেন না। [তিরমিযী; আর ইমাম
তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৬৯৮, সুনান আত তিরমিযী ২৭৫৪,
আল আদাবুল মুফরাদ ৯৪৬, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৩৭৮৪, আহমাদ ১২৩৭০, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্
২৫৫৮৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৩৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
পিরকে সিজদাহ করা জায়েজ কি?
সিজদার উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তাআলা। উদ্দেশ্য
যা-ই হোক না কেন, আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা যাবে না। কেননা, অন্য কাউকে
সিজদা ভক্তির উদ্দেশ্যে হলে হারাম হবে। আর ইবাদতের উদ্দেশ্যে হলে সে মুশরিক হয়ে যাবে।
এর দলিল হলো,
(ক) আল্লাহ তাআলা বলেন,
নিশ্চয়ই সিজদার স্থানসমূহের মালিক আল্লাহ
তাআলা। অতএব তোমরা তার সাথে কারো ইবাদত করো না। (সূরা জিন
১৮)।
উক্ত আয়াতের তাফসিরে বিশিষ্ট তাবিঈ সাঈদ ইবনু
জুবাইর রহ. বলেন, ‘উক্ত আয়াতের সিজদার স্থানসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য সিজদার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
অর্থাৎ এগুলোর মালিক আল্লাহ। অতএব এগুলো দ্বারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করো না।
(তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৬৭৬)।
(খ) আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা রাযি. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন,
মুআয রাযি. সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী ﷺ
-কে সিজদা করেন। নবী ﷺ বলেনঃ হে মু‘আয! এ কী? তিনি
উত্তর দিলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে
সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। তখন রসূলুল্লাহ
ﷺ
বললেন, তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা
করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। (সুনান ইবনু মাজাহ ১৮৫৩, বাইহাকি ১৪৭১১)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
(গ) কায়স ইবন সা‘দ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন,
তিনি বলেন, আমি (ইরাকে অবস্থিত, কূফার সন্নিকটবর্তী)
’হীরা’ শহরে গিয়ে দেখতে পেলাম যে, তারা তাদের নেতাকে সম্মানার্থে সিজদা করছে। এটা দেখে
আমি মনে মনে বললাম, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সিজদা পাওয়ার
সর্বাধিক উপযুক্ত। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে
বললাম, আমি হীরা’র সফরে দেখতে পেলাম যে, সেখানকার অধিবাসীরা তাদের নেতাকে সিজদা করে।
আমি স্থির করেছি যে, আপনিই সাজদার অধিক হকদার। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, (তবে কি আমার মৃত্যুর পরে) তুমি আমার কবরের সম্মুখ দিয়ে
গমনকালে কবরকে সিজদা করবে? উত্তরে আমি বললাম, (নিশ্চয়) না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বললেন, না, (কস্মিনকালেও) করো না। কেননা আমি যদি (আল্লাহ ব্যতিরেকে) অপর
কাউকে সিজদা করতে বলতাম তবে স্বামীদের জন্য রমণীদেরকে সিজদা করার নির্দেশ করতাম। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩২৬৬, সুনান আবূ দাঊদ ২১৪০, দারিমী
১৫০৪, মুসতাদরাক লিল হাকিম ২৭৬৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(ঘ) আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ ﷺ
এক আনসারির বাগানে প্রবেশ করলেন, তখন সেখানে দুটি উট লড়াই করছিল এবং কাঁপছিল। রাসুলুল্লাহ
ﷺ
তাদের নিকটে গেলেন তখন উট দুটি তাদের ঘাড় জমিনে ঝুঁকিয়ে দিল। সঙ্গের লোকটি বলে উঠলেন,
উট আপনাকে সিজদা করেছে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ
বললেন, যদি কেউ কাউকে সিজদা করার অনুমতি থাকত তাহলে আমি স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার
স্বামীকে সিজদা করার। তা এইজন্য যে, আল্লাহ্ তাআলা স্বামীর হক স্ত্রীর উপর অনেক বড়
করেছেন। (সহিহ ইবন হিব্বান ৪১৬২)।
পীর-অলি, সুফি-সাধকগণ কি রাসুল সা. এর প্রতি আনুগত্যশীল?
রাসূল সা.-এর প্রতি আনুগত্যশীল হওয়া অর্থ হলো
তাঁর আদেশগুলো মেনে চলা, তাঁর নিষেধ করা কাজগুলো থেকে দূরে থাকা এবং জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাহ বা আদর্শ অনুসরণ করা। এটি মূলত মহান আল্লাহরই আনুগত্যের সমতুল্য।
কিন্তু আমরা দেখছি যে, পীর-অলি, সুফি-সাধকগণ
বা সুফিবাদী বা মারেফতপন্থীগণ রাসুল সা. এর প্রতি আনুগত্যশীল হওয়া থেকে অনেক দূর সরে
গেছেন। তারা রাসুল সা. এর তরীকা বাদ দিয়ে নিজেদের বানানো তরীকা মোতাবেক ধর্ম প্রচার
করছে যা ইসলামে নেই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।
আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্ৰহণ করে তারা বলে, আমরা তো এদের
ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে। তারা
যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা
করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না”। (সুরা আয যুমার ৩)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তারা কী আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন
চায়? যখন আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সমস্তই ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ
করেছে। আর তাঁর দিকেই তারা প্রত্যাবর্তিত হবে”। (সুরা আলে
ইমরান ৩/৮৩)।
আবদুল্লাহ্
ইব্নু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমি হাউযে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেই হাজির থাকব। তোমাদের থেকে কিছু লোককে
আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তাদের পান করাতে উদ্যত হব, তখন তাদেরকে আমার
নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব, হে রব! এরা তো আমার সাথী। তখন তিনি বলবেন, আপনার
পর তারা নতুন কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৯, ৬৫৭৫, আধুনিক প্রকাশনী ৬৫৬০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৭৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
সাহ্ল ইব্নু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) – কে বলতে শুনেছি যে, আমি হাউজের ধারে তোমাদের আগে হাজির থাকব। যে সেখানে
হাজির হবে, সে সেখান থেকে পান করার সুযোগ পাবে। আর যে একবার সে হাউজ থেকে পান করবে
সে কখনই পিপাসিত হবে না। অবশ্যই এমন কিছু দল আমার কাছে হাজির হবে যাদের আমি (আমার উম্মাত
বলে) চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। কিন্তু এরপরই তাদের ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা
দাড় করে দেয়া হবে।
আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন, আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম,
এমন সময় নু’মান ইব্নু আবূ আয়াস আমার নিকট হতে এ হাদীসটি শুনে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি
কি সাহ্ল থেকে হাদীসটি এরূপ শুনেছেন। আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি
যে, আমি আবূ সা’ঈদ খুদ্রী (রাঃ) - কে এ হাদীসে অতিরিক্ত বলতে শুনেছি যে, নবী (সাল্লালাহু
‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন বলবেনঃ এরা তো আমারই অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয় জানেন
না যে, আপনার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কি পরিবর্তন করেছে (নতুন নতুন ধর্মীয় নিয়ম, যা
আপনি করতে বলেননি) । এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে, তারা (বিদআতী পির-অলি
ও আলেম) দূর হোক, দূর হোক। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭০৫০-৭০৫১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
আবূ হুরায়রা(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেছেনঃ আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করে। তারা বললেনঃ
কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেনঃ যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর
যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৭২৮০,আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৭১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৮৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা একের পর এক ধারাবাহিকভাবে
তাঁর রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছেন, যাতে তাঁরা পথহারা মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে
বের করে নিয়ে যেতে পারেন। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের অনুসরণ করাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন।
আল-কুরআনের ভাষায়:
“আল্লাহর অনুমতিক্রমে কেবলমাত্র আনুগত্য করার
জন্যই আমরা রাসূলদের প্রেরণ করেছি।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত:
৬৪)।
আর নবী-রাসূল প্রেরণের ধারাবহিকতায় নবীদের
মাঝ থেকে আমাদের জন্য বরাদ্ধ হয়েছেন মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম, যেমনিভাবে উম্মাতগণের মধ্য থেকে আমরা হলাম তাঁর ভাগের উম্মাত; এই জন্য
তাঁর আনুগত্য করা ছাড়া আর কোনো আনুগত্যই শুদ্ধ হবে না। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে আল-কুরআনুল কারীম অনেকভাবে বক্তব্য
পেশ করেছে, যেগুলোকে সুস্পষ্ট আয়াত বলে গণ্য করা হয়:
(ক) রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের
প্রতি ঈমান আনার আবশ্যকতা নিয়ে বর্ণিত আয়াত:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
“কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর
রাসূল উম্মী নবীর প্রতি, যিনি আল্লাহ্ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ
কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।” (সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত:
১৫৮)।
আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার
বিষয়টির সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য
ও অনুসরণ করার বিষয়টিকে; সুতরাং জানা গেল যে, ব্যক্তির সকল অবস্থায় এই শর্তটি পূরণ
করা আবশ্যক।
(খ) যে আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা মানে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করা; কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য হয় না:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
“কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই
আনুগত্য করল।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮০)।
(গ) যে আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করার
নির্দেশের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার বিষয়টিকে সংযুক্ত
করে দেওয়া হয়েছে:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর,
রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
‘এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। অতএব যে আল্লাহ
ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে
নদী প্রবাহিত; যেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটা মহাসাফল্য’। (সুরা নিসা ৪/১৩)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
‘যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করল সে ঐ ব্যক্তিদের
সঙ্গী হবে, যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নবীগণ, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ
এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী’। (সুরা নিসা ৪/৬৯)।
(ঘ) যেসব আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার বিষয়টিকে আল্লাহর বন্দাগণের জন্য তাঁর রহমত পাওয়ার উপলক্ষ্য
বানিয়ে দেওয়া হয়েছে:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
“আর তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে
তোমরা কৃপা লাভ করতে পার।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩২)।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন:
“আর তোমরা রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের
উপর রহম করা হয়।” (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৬)।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
“আর তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে;
তারাই, যাদেরকে আল্লাহ্ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
(সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৭১)।
(ঙ) যে আয়াত হেদায়াতের বিষয়টিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার শর্তের সাথে সংযুক্ত করেছে:
“বলুন,
‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও,
তবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনিই দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য
তোমরাই দায়ী; আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, মূলত: রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে
পৌঁছে দেওয়া।” (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৪)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
‘তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান
আনলাম এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করলাম; কিন্তু এর পর তাদের একদল মুখ ফিুরিয়ে নেয়; বস্ত্ততঃ
তারা মুমিন নয়’। (সুরা নূর ২৪/৪৭)।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের
আনুগত্যের বিষয়টি তখনই প্রকৃত রূপে ফুটে উঠবে, যখন মুসলিম ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে হুবহু প্রাধান্য দিবে; কেননা, সে নিশ্চিতভাবে জানে
যে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মানব জীবনের
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (তার জন্ম থেকে কবরে মাটি চাপা দেওয়া পর্যন্ত) ছোট ও বড় সকল
বিষয়কে নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি এই কাজটি করবে, সে যেন গুনাহ্
মাফ ও পাপ মোচনের সুসংবাদ গ্রহণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
“বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে
অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত
ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
‘বলুন! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য
কর। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তো কাফেরদেরকে পসন্দ করেন না’। (সুরা আলে ইমরান ৩/৩২)।
আর যখন একদল জিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনতে পায় এবং জানতে পারে যে, তাঁর অনুসরণ করা গুনাহ্ মাফের
উপায়, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের নিকট ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে ফিরে যায়। আল-কুরআনের
ভাষায়:
“হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর
প্রতি সাড়া দাও এবং তাঁর উপর ঈমান আন, তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক
শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন।” (সূরা আল-আহকাফ, আয়াত:
৩১)।
আর এই জন্যই খাঁটি মুমিনদেরকে দেখা যায়— তারা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা
ও মিনতি করে, যাতে তিনি তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন, পাপসমূহ মোচন করে দেন এবং সর্বোত্তমভাবে
মৃত্যু তথা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান; আল-কুরআনের ভাষায়:
“হে আমাদের রব! আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে
আহ্বান করতে শুনেছি, ‘তোমরা তোমাদের রবের উপর ঈমান আন।’ কাজেই আমরা ঈমান এনেছি। হে
আমাদের রব! আপনি আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করুন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূরীভূত করুন এবং
আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে মৃত্যু দিন।” (সূরা আলে
ইমরান, আয়াত: ১৯৩)।
আর এই ধরনের অসীলা করাটা শরী‘য়তসম্মত অসীলার
এক প্রকার; কেননা, সে সৎকাজ দ্বারা অসীলা করেছে।অতএব, হে আমাদের রব! তোমার নবীর প্রতি
আমাদের ভালবাসা এবং কথায় ও কাজে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করার কারণে আপনি আমাদের অন্তরকে
আপনার দীনের উপর অটল রাখুন; আর আপনি এক মুহূর্তের জন্যেও আমাদেরকে আমাদের নিজেদের দায়িত্বে
ছেড়ে দিবেন না; আর আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদের প্রতি দয়া করুন, আপনিই আমাদের
অভিভাবক। অতএব কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন।
এতদ বিষয়ে আল-কুরআনুল কারীম থেকে আরও দলিল
হচ্ছে,
(১) ‘রাসূল ও মুমিনগণ তাঁর (মুহাম্মাদ) প্রতি
তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপর ঈমান এনেছেন। তাদের সকলে আল্লাহ,
তাঁর ফেরেশতামন্ডলী, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছে। (তারা
বলে) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং
মান্য করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ক্ষমা চাই। আর প্রত্যাবর্তন তো আপনার
নিকটেই’। (সুরা বাক্বারাহ ২/২৮৫)।
(২) ‘আর আমি এসেছি তাওরাতে যা আছে তার সত্যায়নকারীরূপে
ও তোমাদের জন্য যা হারাম ছিল তার কিছুকে হালাল করতে এবং আমি তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে
তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর আর আমাকে অনুসরণ কর’। (সুরা আলে ইমরান ৩/৫০)।
(৩) ‘স্মরণ কর! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ
এবং যে অঙ্গীকারে তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছেন তা। যখন তোমরা বলেছিলে, শুনলাম ও মান্য
করলাম এবং আল্লাহকে ভয় কর। অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তো সবিশেষ অবহিত’। (সুরা মায়েদা ৫/৭)।
(৪) ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের
আনুগত্য কর এবং সতর্ক হও; যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ, আমাদের রাসূলের একমাত্র
কর্তব্য শুধু প্রচার করা’। (সুরা মায়েদা ৫/৯২)।
(৫) ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য
কর এবং তোমরা যখন তার কথা শ্রবণ করছ, তখন তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না’। (সুরা আনফাল ৮/২০)।
(৬) ‘হারূন তাদেরকে পূর্বেই বলেছিল, হে আমার
সম্প্রদায়! এটা দ্বারা তো কেবল তোমাদের পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। তোমাদের প্রতিপালক তো
দয়াময়; সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আদেশ মেনে চল’। (সুরা
ত্বহা ২০/৯০)।
(৭) ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর
এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আর (তাদের অমান্য করে) তোমাদের কর্ম বিনষ্ট কর না’। (সুরা মুহাম্মাদ ৪৭/৩৩)।
(৮) ‘তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা
শোন, মেনে নাও ও ব্যয় কর তোমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্য; যারা তাদের অন্তরের কার্পণ্য
হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম’। (সুরা তাগাবুন ৬৪/১৬)।
(৯) ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য
করবে ও নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত
হবে। তোমরা ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন’। (সুরা আনফাল ৮/৪৬)।
হাদীছে নববী থেকে দলিল হচ্ছে,
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা শুনো এবং আনুগত্য করো, যদিও তোমাদের ওপর হাবশী গোলাম
শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিসমিসের ন্যায়। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬৩, সহিহ বুখারী ৭১৪২,সুনান ইবনু মাজাহ ২৮৬০, আহমাদ ১২১২৬, সহীহ আল জামি‘ ৯৮৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাঁর কথা শোনার,
তাঁকে মান্য করার ও সকল মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনার বিষয়ে বায়’আত করলাম। তিনি আমাকে
এ কথা বলতে শিখিয়ে দিলেন যে, যতটা করতে আমি সক্ষম হই। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৭২০৪, ৫৭, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭১১)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ওবাদা ইবনু ছামেত (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ
(ছাঃ)-এর নিকট এই মর্মে বায়‘আত করলাম যে, আমরা আপনার কথা শুনব ও মেনে চলব স্বচ্ছলতায়
ও অস্বচ্ছলতায়, সন্তুষ্টিতে ও অসন্তুষ্টিতে। আমরা আমাদের উপর কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার
ব্যাপারে ঝগড়া করব না এবং আমরা যেখানেই থাকি হক্ব বা সত্য কথা বলব। আর এক্ষেত্রে কোন
নিন্দাকারীর নিন্দাকে পরোয়া করব না। (মুসনাদে আহমাদ হা/২২৭৭৭,
সনদ ছহীহ)।
ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলিমের (তার শাসনকর্তার নির্দেশ)
শোনা এবং আনুগত্য করা অপরিহার্য; তার মনঃপূত হোক বা না হোক, যতক্ষণ না তাকে গুনাহের
দিকে নির্দেশ করে। কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তা শোনা ও আনুগত্য
করা কর্তব্য নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৬৬৪, সহিহ বুখারী
৭১৪৪, সহিহ মুসলিম ১৮৩৯, সুনান আবূ দাঊদ ২৬২৬, সুনান আততিরমিযী ১৭০৭, সহীহ আল জামি‘
৩৬৯৩, আহমাদ ৬২৭৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের ওপর ফরয করা পাঁচ ওয়াক্ত
সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় কর, তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট করা মাসটির সিয়াম (রোযা)
পালন কর, আদায় কর তোমাদের ধন-সম্পদের যাকাত এবং তোমাদের নেতৃবৃন্দের আনুগত্য কর। তাহলে
তোমাদের রবের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৫৭১, আহমাদ ২১৬৫৭, তিরমিযী ৬১৬, সিলসিলাহ্
আস্ সহীহাহ্ ৮৬৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
রাসুল সা. এর এরকম হাজার হাজার আদেশ নিষেধমূলক
বানী আছে যেগুলো আমাদের মেনে চলতে হয়। রাসুল সা. যা বলেন নি তা বানিয়ে বানিয়ে প্রচার
করা আর নতুন নতুন মরগড়া হাদিস প্রচার করা জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“তোমরা আমার উপর মিথ্যা বলো না। যেহেতু যে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন দোযখে
প্রবেশ করল।” (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৬, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৪, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি আমি যা বলিনি তা বানিয়ে বলে, সে যেন নিজের ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নেয়। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৭, ইসলামিক
ফাউন্ডেশনঃ ১১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শেষ যামানায় এমন মিথ্যুক দাজ্জাল
লোক হবে, যারা তোমাদের কাছে এমন সব (মনগড়া) হাদীস নিয়ে উপস্থিত হবে যা তোমরা শুনোনি,
তোমাদের বাপ-দাদারাও শুনেননি। অতএব সাবধান! তাদের থেকে দূরে থাকবে, যাতে তারা তোমাদেরকে
গুমরাহ করতে বা বিপদে ফেলতে না পারে। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ১৫৪, সহিহ মুসলিম ৪৪, সহীহ আল জামি‘ ৮১৫১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
পথভ্রষ্টকারী ও ভিন্ন তরিকাপন্থী পীর-অলির উদ্ভব হবে
সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন: আমি আমার উম্মাতের ব্যাপারে পথভ্রষ্টকারী পীর-অলিদের খুব বেশি আশঙ্কা
করছি। আর আমার উম্মতের ওপর যখন একবার তলোয়ার চালু হবে, তখন আর কিয়ামত অবধি তাদের
হতে উঠবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৩৯৪, সুনান আবূ
দাউদ ৪২৫২, সুনান আততিরমিযী ২২২৯, সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৫২, সিলসিলাতুস সহীহাহ ১১০-১৯৫৭,
সহীহুল জামি ১৭৭৩, মুসনাদে আহমাদ ২২৪৪৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৭১৪, দারিমী ২৭৫২)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া তথা ইসলামি দল ছাড়া
বা ইসলামি আইন ছাড়া বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন বা আইন বা অনৈসলামিক
দল বা ভিন্ন পথ, মত অবলম্বন করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না তথা তার
সেই কাজ কবুল করা হবে না বা তাকে কোনো সওয়াব দেয়া হবে না বা তার আমলনামা শূন্য হবে।
আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত তথা যারা জাহান্নামি, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে তথা জাহান্নামি
হবে”। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।
অতএব সার্বিক দৃষ্টিকোণ ও সকল প্রমাণাদির প্রেক্ষিতে
বলা যায় যে, মারেফত বা সুফিবাদ কোনো ইসলামের সঠিক পথ নয়। কথিত পির অলি, গাউস কুতুব,
সুফি-সাধকগণ রাসুল সা. এর প্রতি অতিরিক্ত ভালবাসা এবং তাঁকে নিয়ে যতোই গীত-বন্দনা করুক
না কেনো আসলে তারা প্রকৃতভাবে রাসুল সা. এর প্রতি আনুগত্যশীল নয়। যদি আনুগত্যশীল হতোই
তাহলে তারা দরবার খুলে ধম্যব্যবসায় লিপ্ত থাকতো না, মাজার ও দরবারে শিরক, কুফর আর বিদআতী
কর্মকান্ডে ব্যস্ত থাকতো না।
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত রাখেন
(গ্রহণ করেন না), যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার বিদআত বর্জন না করেছে।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৪২০২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৯৪৫৭, সহীহ
তারগীব ৫৪নং)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
পীর-অলি, সুফি-সাধক ও মুরিদরা অন্যায়ের সহযোগী হওয়ায় এরা জাহান্নামী
যারা ক্ষমতায় গেলে ইসলামি শরিয়াহ আইন মোতাবেক
রাষ্ট্র শাসন করবে না এমন দলকে ভোট দেয়া বা তাদের কোনো কাজে সাহায্য সহযোগিতা করা বা
তাদেরকে ভোট দেয়া বা সমর্থন করা জায়েজ নেই। অনৈসলামিক দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীই বিভিন্ন
অন্যায় বা অসৎ কাজের সাথে জড়িত। আপনি মুসলিম হিসেবে তাদেরকে ভোট দিলে, তাদের মিটিং
মিছিলে যোগদান করলে বা তাদেরকে অর্থ, সময় ও শ্রম দিয়ে সহযোগিতা করলে আপনাকে জাহান্নামে
নিক্ষিপ্ত করা হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা
কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না (যারা পাপিষ্ঠ ও অসৎ তাদেরকে
সমর্থন করা, ভোট দিয়ে সহযোগিতা করা বা অর্থ
দিয়ে সাহায্য করা যাবে না)। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি
কঠোর”। (সুরা আল মায়েদা-২)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা জালেমদের (অত্যাচারীর)
প্রতি ঝুঁকে পড়বে না (তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না), জালেমদের (অত্যাচারীদের) সহযোগী
হবে না, তাহলে আগুন (জাহান্নামের আগুন) তোমাদেরও স্পর্শ করবে।” (সূরা হূদ: ১১৩)।
ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে (অন্যায়মূলক কাজে) সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত (সেই ব্যক্তির অন্যায়মূলক
কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত) না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে।
(সুনান ইবনু মাজাহ ২৩২০, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৩৫৯৭,
ইরওয়া ৭/৩৫০, সহীহাহ ৪৩৮, ১০২১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih।
তাই যারা পাপিষ্ঠ ও অসৎ নেতাদেরকে ভোট দিয়ে,
শ্রম দিয়ে বা অর্থ দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছেন তারা সেই নেতার সঙ্গ ত্যাগ করুন।
নইলে যতোদিন সেই নেতার সাথে থাকবেন ততোদিন আপনার উপর আল্লাহর আযাব পতিত হতেই থাকবে
এবং পরিশেষে জাহান্নামে যেতে হবে।
কিন্তু আমাদের দেশের সকল কথিত পীর-অলি, সুফি-সাধক,
গাউস, কুতুব, দরবেশ এরা কখনই দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু হোক এটা তারা চায় না।
আমরা প্রত্যক্ষভাবে দেখে আসছি যে, মাইজভান্ডার দরবার, দেওয়ানবাগ দরবার এরাসহ আরও অনেকে
আওয়ামীলীগকে সমর্ন ও ভোট দিয়ে মানবরচিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি সহযোগিতা করে
আসছে। অথচ আমরা প্রমাণ পাচ্ছি যে, অনৈসলামিক কোনো দল যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে তখন তারা
চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, মারামারি, ক্ষমতার দাপট
প্রদর্শন, নারী কেলেংকারী তথা সকল অপরাধের সাথে দলীয় নেতা কর্মীগণ জড়িয়ে পড়ে। আর সেই
অপরাধগুলো সংঘটিত হওয়ার পিছনে এইসব কথিত পীর-অলিরা দায়ী। যেহেতু তারা অন্যায়ের সহযোগী
তাই তারা সেইসব পাপের একটা অংশ কিয়ামত পর্যন্ত পেতেই থাকবে।
আল্লাহ তাঁয়ালা এরশাদ করেন, ‘যে লোক সৎকাজের
জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য),
তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর
যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন
দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি
অংশ পাবে তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।
উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তি শাসক হবে
যাদের কতগুলো কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কতগুলো কাজ অপছন্দ করবে। যে লোক (তাদের) অন্যায়ের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, আর যে লোক তাকে ঘৃণা করবে সেও
দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যে লোক তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তার অনুসরণ করবে
সে অন্যায়ের অংশীদার বলে গণ্য হবে। (সুনান আত তিরমীজী ২২৬৫,
মিশকাতুল মাশাবিহ (মিশকাত) ৩৬৭১, সহিহ মুসলিম ১৮৫৪, আহমাদ ২৬৫২৮, সহীহ আল জামি‘ ২৩৯৫)।
হাদিসের মান সহিহ।
অন্যায়ের সহযোগী পীর-অলি, সুফি-সাধকগণ ইসলাম থেকে খারিজ
আমাদের দেশের অনৈসলামিক মুসলিম ভোটারদের দেখা
যায় তারা দুনিয়ার কিছু স্বার্থসিদ্ধির জন্য খুব জেনে শুনেই তাদের এমপি, মন্ত্রী তথা
নেতাদের সাথে সার্বক্ষণিক জড়িত থাকে যে তারা ঐসব নেতাদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ
করে। জেনেশুনে যারা অত্যাচারী নেতা বা শাসকদের শক্তি বৃদ্ধিতে তাদের সাথে চলে তারা
মুসলিম থেকে খারিজ হবে এবং কিয়ামতে হাওযে কাওসারের নিকট আসতে পারবে না।রাসূল ﷺ
বলেন,
(ক)
আওস ইবনু শুরাহবীল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
বলতে শুনেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অত্যাচারীর
সাথে এ উদ্দেশ্যে চলে যে, সে তার শক্তি বৃদ্ধি করবে; আর সে এটা জানে যে, সে জুলুমকারী,
তবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
৫১৩৫, বায়হাক্বী’র শু‘আবুল ঈমান ৭৬৭৫, আত্ তারগীব ১৩৬২, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী
৬১৮)।
রাসূল ﷺ
আরও বলেন,
(খ) কা’ব ইবনু ’উজরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ নির্বোধ লোকেদের নেতৃত্ব
থেকে আমি তোমাকে আল্লাহ তা’আলার হিফাযাতে অর্পিত করলাম। তিনি (কা’ব) বললেনঃ হে আল্লাহর
রসূল! এটা কিরূপে হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ শীঘ্রই আমার পরে
বিভিন্ন যুগে তাদের (নির্বোধ ও যালিমরূপে আমীর ও শাসক) আবির্ভূত হবে আর যে ব্যক্তি
তাদের সান্নিধ্যে থাকবে এবং তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিবে এবং তাদের অন্যায়
ও জুলুমের সহযোগিতা করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং তাদের সাথে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই।
তারা আমার হাওযে কাওসারে* আসতে পারবে না। আর যে তাদের নিকট যাবে না এবং তাদের মিথ্যাকে
সত্যায়িত করবে না এবং তাদের অন্যায়ের কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে না। তারাই হবে আমার
দলভুক্ত। আর আমিও তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করি। আর তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট
আগমন করবে।
*হাওযে কাওসার দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাত। অর্থাৎ-জান্নাতে
তাদেরকে আমার নিকট আসতে দেয়া হবে না অথবা তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট আসার অনুমতি
পাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭০০, সুনান আন নাসায়ী
৪২০৭, সুনান আততিরমিযী ৬১৪, ২২৫৯, আহমাদ ১৮১২৬, সহীহ আত্ তারগীব ২২৪২)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
অনৈসলামিক দলের নেতাকে ভোট দিলে বা সমর্থন করলে সেই মুসলিম ভোটারদের সব
আমল বরবাদ হয়ে যাবে, সে মুসলিম থেকে খারিজ
অনৈসলামিক দলের নেতা-কর্মীদের দেখা যায়, এদের
মধ্যে শিরক, কুফর ও বিদআত বিদ্যমান। এরা পীর পূজারী ও মাজার পূজারী হয়ে থাকে। এরা কুরআন
অবমাননাকারী, আল্লাহ ও রাসুল সা. কে কটূক্তিকারীদের পক্ষ নেয় এবং তাদেরকে সমর্থন করে
থাকে। এইসব নেতা-কর্মীরা নামেমাত্র মুসলমান। এরা ইহকালে ভ্রান্ত পথে চলে এবং এদেরকে
ইসলামের সঠিক পথের সন্ধান দিলেও তা শুনেতে চায় না, মানতে চায় না। এরা ইসলামি শরিয়াহ
আইন সংক্রান্ত কুরআনের আয়াত ও হাদিস মানে না। তাই এদের সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে নবি বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না কোন্ কোন্ লোক নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ
ব্যর্থ? এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যারা ইহকালের জীবনে ভ্রান্ত পথে চলে এবং মনে করে যে
তারা ঠিক পথ ধরেই চলেছে। এরা তারাই, যারা তাদের প্রতিপালক প্রভুর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে
অস্বীকার করেছে এবং তার দরবারে প্রত্যাবর্তনের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করে। এ জন্যে তাদের
সকল আমল নষ্ট হয়ে গেছে এবং কিয়ামতের দিন তাদের কোনই গুরত্ব থাকবে না। তারা যে কুফরী
করেছিলো আর আমার আয়াত ও রাসুলগণের প্রতি ঠাট্টা
বিদ্রুপ করতো তার প্রতি দানে তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে”। (সুরা কাহাফঃ ১০৩-১০৫)।
ইসলামি দল ব্যতীত অন্য দলকে ভোট দিলে সে জাহান্নামী
ইসলামের রাজনীতি করা বা ইসলামি দল করা প্রত্যেক
মুসলিমদের জন্য ফরজ। মুসলিম হিসেবে ইসলামি আইন, পথ, মত বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী কোনো
আইন, পথ বা মতকে কোনোক্রমেই সমর্থন বা স্বীকার করা যাবে না। যেসব রাজনৈতিক দল ইসলামি
আইন বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে তাদেরকে ভোট দেয়া যাবে
না। কারণ তারা ইসলামি দল গঠন করেনি, তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়ে
কোনো ধারা উল্লেখ নেই। ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাদের কোনো লক্ষ্য উদ্দেশ্য নেই। এরপরও
জেনেশুনে যারা ইসলামি দল ব্যতীত অন্য দলকে ভোট দিবে বা সমর্থন করবে তাদের স্থান হবে
জাহান্নামে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া তথা ইসলামি দল ছাড়া
বা ইসলামি আইন ছাড়া বা ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন বা আইন বা অনৈসলামিক
দল বা ভিন্ন পথ, মত অবলম্বন করতে চাইবে, তার
থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না তথা তার সেই কাজ কবুল করা হবে না বা তাকে কোনো সওয়াব
দেয়া হবে না বা তার আমলনামা শূন্য হবে। আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত তথা যারা জাহান্নামি,
সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে তথা জাহান্নামি হবে”। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।
এতদবিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক আরো বিস্তারিত
জানতে ক্লিক করুন,
এরা পর্দার বিধান মেনে না চলা
বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ নারী পর্দা
করে চলাকে ঝামেলা মনে করছে। পথে ঘাটে, হাটে বাজারে, মাজার, দরগা, দরবার, স্কুল, কলেজ,
বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় অধিকাংশ মেয়েরা ওড়না ব্যবহার করে না। সামনের আপেল দুইটা কে
কতো উঁচু করে পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় তার প্রতিযোগিতা করে এরা বাহিরে বেড়ায়।
টাইট গেঞ্জি আর টাইট জিনসের প্যান্ট এখন মেয়েদের নতুন ফ্যাশন। এসব মেয়েরা অতিরিক্ত
সাজসজ্জা করে বাহিরে বের হওয়ায় অনেক পুরুষ বিমোহিত হয়ে রাতে স্বপ্নদোষ ঘটায়।
তবে যারা ইসলামী দল করে সেইসব মেয়ে বা তাদের
পরিবার ১০০% পর্দা করে চলে। যেমন, জামায়াত শিবির, ইসলামী আন্দোলন চরমোনাই।
যারা বেপর্দা করে চলাফেরা করে তাদের মধ্যে
অনৈসলামিক দল, বামপন্থী দল, হিজবুত তাওহীদ, মাজার পূজারী পীর, অলি, সুফী সাধক, বাউল
শিল্পী, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি মনা ইত্যাদি লোক ও তাদের পরিবার অন্যতম।
দরবার ও মাজার পূজারীরা নাকি ইসলাম প্রচার
করে। অথচ তাদের দরবার আর মাজারগুলোতে নারী পুরুষের মোলাকাত দেখা যায়। বেপর্দা নারীদের
নিয়ে বসে গানের আসর। পর্দা করা যে ফরজ সেই ফরজ বিধান এরা মানে না।
পর্দা ব্যবস্থার প্রথমত দু’টি প্রকার রয়েছে।
নিম্নে প্রকারদ্বয় ও তার হুকুম সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. ঘরোয়া জীবনে পর্দা:
পর্দার হুকুমের প্রথম পর্যায় হচ্ছে ঘরোয়া জীবনের
পর্দা। অর্থাৎ ঘরের অভ্যন্তরে পালনীয় ও অনুসরণীয় পর্দার বিধি-বিধান। এ সম্পর্কে আল্লাহ
তা‘আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন, “তোমরা তোমাদের ঘরের মধ্যে অবস্থান কর এবং পূর্বকালীন
জাহেলিয়াতের মতো তোমরা ঘুরে বেড়াবে না।” (সূরাহ আহযাব, আয়াত
: ৩৩)।
অনুমতি না নিয়ে অপর কারো ঘরে প্রবেশ না করাও
ঘরের পর্দা বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কালামে হাকীমে ইরশাদ
ফরমান, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের ঘর ছাড়া অপর কারো ঘরে প্রবেশ করো না – যতক্ষণ
না গৃহবাসীর অনুমতি পাবে এবং সালাম বিনিময় করবে। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।” (সূরাহ নূর, আয়াত : ২৭)।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন, "তোমরা তাঁর পত্নীগণের
কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।" (সূরা আহযাব,
আয়াত ৫৩)।
এ আয়াতের শানে নুযূলের বর্ননায় বিশেষভাবে
নবী-পত্নীগণের উল্লেখ থাকলেও এ বিধান সমগ্র উম্মতের জন্য নাযিল হয়েছে । (মা’আরিফুল কুরআন-৭/১৩১)।
উক্ত আয়াতের বিধানের সারমর্ম এই যে, বেগানা
মহিলাদের নিকট থেকে পরপুরুষদের কোনো ব্যবহারিক বস্তু, পাত্র ইত্যাদি নেয়া জরুরী হলে
পুরুষগণ সামনে এসে নিবে না; বরং আড়াল থেকে চাইবে । আরও বলা হয়েছে যে, পর্দার এই বিধান
পুরুষ ও নারী উভয়ের অন্তরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে পবিত্র রাখার উদ্দেশ্যে দেয়া
হয়েছে ।
এখানে প্রানিধানযোগ্য বিষয় এই যে, উক্ত আয়াতে
রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর পুণ্যাত্মা পত্নীগণকে পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে, যাদের অন্তরকে
পাক-সাফ রাখার দায়িত্ব আল্লাহ্ তা’আলা স্বয়ং গ্রহণ করেছেন।
অপরদিকে যেসব পুরুষকে সম্বোধন করে এই বিধান
দেয়া হয়েছে, তারা হলেন রাসূলে করীম (সঃ) এর সাহাবায়ে কেরাম, যাদের মর্যাদা নবীগণের
(আঃ) পরে সকলের উর্ধে। সকল মুসলমান, গওস, কুতুব ও আবদালের মর্তবা একজন সর্বনিম্ন মর্যাদার
সাহাবীর সমান হতে পারে না, এ কথার উপর উম্মতের ইজমা হয়ে গেছে; কিন্তু এতদসত্তেও তাঁদের
আন্তরিক পবিত্রতা রক্ষা এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য পুরুষ ও নারী সাহাব
(রাঃ)গনের মধ্যে পর্দার ব্যবস্থা করা জরুরী ঘোষনা করা হয়েছে।
পরপুরুষের সামনে কোমল কণ্ঠে কথা
না বলা:
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,
"হে নবী পত্নীগন ! (উদ্দেশ্য উম্মতের
সকল মহিলা) তোমরা অন্য নারীদের মত নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাহলে পরপুরুষের
সাথে এমন কোমল ও আকর্ষনীয় ভঙ্গীতে কথা বলো না, যার ফলে যে ব্যক্তির অন্তরে ব্যধি রয়েছে
সে কু-বাসনা করবে । আর তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলন "। (সূরা আহযাব, আয়াত ৩২)।
উক্ত আয়াতটিও নারীদের পর্দা সম্পর্কিত, তাঁদের
কন্ঠ ও বাক্যালাপ নিয়ন্ত্রন সংক্রান্ত । আয়াতে فَلَا
تَخْضَعْنَ
بِالْقَوْلِ
এর ব্যাখ্যা হচ্ছে যদি পরপরুষের সাথে পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলা প্রয়োজনীয়তা দেখা
দেয়, তাহলে বাক্যালাপের সময় নারী কন্ঠের স্বভাবসুলভ কোমলতা ও লাজুকতা কৃত্রিমভাবে
পরিহার করবে । অর্থাৎ, এমন কোমলতা বা শ্রোতার মনে অবাঞ্ছিত কামনা সঞ্চার করে, তার কোন
সুযোগ দিবে না । যেমন এর পরে এরশাদ হয়েছে فَيَطْمَعَ
الَّذِي
فِي
قَلْبِهِ
مَرَضٌ
অর্থাৎ এরুপ কোমল কন্ঠে বাক্যালাপ করো না, যা ব্যধিগ্রস্থ অন্তর বিশিষ্ট লোকের মনে
কু-লালসা ও আকর্ষন সৃষ্টি করে ।
মোদ্দাকথা, নারীদেরকে পরপুরুষের থেকে নিরাপদ
দূরত্বে অবস্থান করে পর্দার এমন উন্নত স্তর অর্জন করা উচিত, যাতে কোন অপরিচিত দূর্বল
ঈমান বিশিষ্ট লোকের অন্তরে কোন কামনা ও লালসা সৃষ্টি করা তো দূরের কথা, তার নিকটেও
ঘেষবা না । বরং তার বিরুদ্ধে অবস্থা ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে । (মা’আরিফুল কোরআন-৭/১৩২)।
স্বর্ণযুগের সোনার মানুষ পুন্যাত্মা নবী-পত্নীগনকে
যদি স্বর্ণযুগের স্বর্ণমানব সাহাবায়ে কেরামের সাথে পর্দার আড়াল করা সত্ত্বেও কথা
বলার ক্ষেত্রে এমন কড়া নির্দেশ দেয়া হয়ে থাকে যে, তাঁদের কন্ঠ ও বাক্যালাপও নিয়ন্ত্রণে
রাখতে হবে । তাহলে আধুনিক যুগের নারী-পুরুষদের কি পর্দার প্রয়োজন নেই ? অথবা পর্দার
প্রয়োজন থাকলেও তাঁদের কন্ঠ ও বাক্যালাপ নিয়ন্ত্রন রাখার প্রয়োজন নেই ? অবশ্যই প্রয়োজন
রয়েছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না; বরং বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষনের পর সে প্রয়োজন
আরো তীব্রভাবে অনুভূত হয় ।
২. ঘরের বাইরে পর্দা:
পর্দার দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে, ঘরের বাইরে গেলে
বয়স্ক নারী-পুরুষকে যে পর্দাব্যবস্থা মেনে চলতে হয় তা অবলম্বন করা। নিম্নে এতদসংক্রান্ত
বিধান আলোচনা করা হলো :
(ক) নির্লজ্জভাবে না চলা :
নারীকে প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হতে পারে।
তখন হায়া-পর্দা বজায় রাখতে হবে। ইসলাম তাদেরকে জাহেলিয়া যুগের নারীদের মতো নির্লজ্জভাবে
চলাফেরা করতে নিষেধ করেছে। (দ্রষ্টব্য : সূরাহ আহযাব, আয়াত
: ৩৩)।
(খ) সৌন্দর্য প্রকাশ না করা :
সূরাহ নূরে মহিলাদেরকে তাদের রূপ-লাবণ্য ও
যৌন-দেহাঙ্গ এবং তাদের অলঙ্কারের সাজ-সজ্জাকে প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। চেহারা,
বক্ষ ও মাথাসহ সারা দেহ ঢেকে রাখার বিধান বলে দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,
"ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের
দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান,
তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে
ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা,
ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক,
যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ
না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ,
তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও"। (সুরা নুর ২৪:৩১)।
আল্লাহ তাঁয়ালা বলেন,
"হে নবী! তোমার স্ত্রী, কন্যা ও মুসলিম
মহিলাদেরকে বল, তারা যেন সকলে ঘর থেকে বাহিরে যাবার সময় মাথার উপর তাদের চাদর ঝুলিয়ে
দেয়। এভাবে বের হলে তাদেরকে চেনা খুব সহজ হবে, ফলে কেউ তাদেরকে উত্ত্যক্ত করবেনা"।
(সূরা- আল্ আহযাব, আয়াত-৫৯)।
আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, "আমি যখন ঘুমিয়ে
ছিলাম তখন সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আমাকে দেখে চিনে ফেলল। কেননা সে আমাকে হিজাবেব হুকুম
হওয়ার আগে দেখেছিল।
তখন সে ইন্নালিল্লাহ বলে উঠল, আমি তার ইন্নালিল্লাহ
বলার শব্দে আমি জেগে উঠি তখন আমি ওড়না দিয়ে আমার মুখ ঢেকে ফেলি।" (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৯১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৭০,
জামে তিরমিযী হাদিস ৩১৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৬৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৮১৮)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
এই হাদিসটিও অকাট্য দলিল-
উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন যে, তিনি ও মাইমূনা
(রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে হাযির ছিলেন। তিনি বলেন,
আমরা দু'জন তার নিকটে অবস্থানরত থাকতেই ইবনু উম্মু মাকতুম (রাঃ) তার নিকট এলেন। এটা
পর্দার নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার পরের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ তোমরা উভয়ে তার থেকে পর্দা কর। আমি (উম্মু সালামা) বললাম, হে আল্লাহর রাসূল!
তিনি কি অন্ধ নন? তিনি তো আমাদেরকে দেখতেও পারছেন না চিনতেও পারছেন না। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরাও কি অন্ধ, তোমরাও কি তাকে দেখতে পাচ্ছ
না। (সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৭৭৮, সুনান আবূ দাউদ
(তাহকিককৃত) ৪১১২, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩১১৬, ইরওয়া ১৮০৬, আহমাদ ২৬৫৩৭, রিয়াযুস্
সলিহীন ১৬৩৫)।
নারী পর্দার সাথে বাইরে বের হলেও সাথে মাহরাম পুরুষ থাকা জরুরী:
আর দূরে সফরের ক্ষেত্রে এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ
যে হাদিসে মাহরাম পুরুষ ছাড়া নারীকে বের হতেই নিষেধ করা হয়েছে!
(ক) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল
(সাঃ) বলেছেন,
"মহান আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী
ঈমান রাখে,তার মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিনী এক দিন ও এক রাতের দূরত্ব সফর করা বৈধ নয়"।
(সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ১০৮৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৩১৫৭-৩১৫৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৩৯, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ১৭২৩,
সুনান ইবনে মাজাঃ ২৮৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
(খ) আনাস ইব্নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, যয়নাব বিন্ত জাহশ্কে যখন রাসূলুল্লাহ্
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ে করেন, তখন তিনি লোকদের দাওয়াত দিলেন। লোকেরা
আহারের পর বসে কথাবার্তা বলতে লাগল। তিনি উঠে যেতে উদ্যত হচ্ছিলেন, কিন্তু লোকেরা উঠছিল
না। এ অবস্থা দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তিনি উঠে যাওয়ার পর যারা উঠবার তারা উঠে গেল।
কিন্তু তিন ব্যক্তি বসেই রইল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে প্রবেশের
জন্য ফিরে এসে দেখেন, তারা তখনও বসে রয়েছে [তাই নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
চলে গেলেন]। এরপর তারাও উঠে গেল। আমি গিয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে
তাদের চলে যাওয়ার সংবাদ দিলাম। অতঃপর তিনি এসে প্রবেশ করলেন। এরপর আমি প্রবেশ করতে
চাইলে তিনি আমার ও তাঁর মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। তখন আল্লাহ্ তা‘আলা নাযিল করেনঃ
“হে মু’মিনগণ! তোমরা নবীর গৃহে প্রবেশ করো না...শেষ পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৪৭৯১, ৪৭৯২, ৪৭৯৩, ৪৭৯৪, ৫১৫৪,
৫১৬৩, ৫১৬৬, ৫১৬৮, ৫১৭০, ৫১৭১, ৫৪৬৬, ৬২৩৮, ৬২৩৯, ৬২৭১, ৭৪২১; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩৯২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪২৮, আহমাদ ১৩৪৭৮, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ
৪৪২৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ) ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মাহ্রামের বিনা উপস্থিতিতে কোন পুরুষ কোন নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
করবে না। এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ্র রসূল! আমার স্ত্রী হাজ্জ
করার জন্য বেরিয়ে গেছে এবং অমুক অমুক জিহাদে অংশগ্রহনের জন্য আমার নাম তালিকাভুক্ত
করা হয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ফিরে যাও এবং তোমার স্ত্রীর
সঙ্গে হাজ্জ সম্পন্ন কর। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫২৩৩, ১৮৬২, আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৮৫৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
অভিভাবকের করণীয়ঃ
উপরোক্ত কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক আলোচনায়
আমরা পর্দা করা সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসুল সাঃ এর হুকুম ও পর্দার গুরুত্ব জানতে পারলাম।
আমরা মুসলমান ইসলামকে শুধু সালাত, সাওম, হজ্জ, জিকির ও লোক দেখানো দান খয়রাতের মধ্যে
সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। এর বাহিরে আল্লাহ ও রাসুল সাঃ এর যে আরো শত শত হুকুম তথা ফরজ
ইবাদত আছে সেগুলো মানতে চাই না। এসবের মধ্যে পর্দা একটি অন্যতম। পর্দাকে কতিপয় মুসলিম
অভিভাবক সামান্য পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে খেল তামাশায় পরিনত করেছে। আবার অধিকাংশ
নারী পর্দার নামে টাইট ফ্যাশন ড্রেস পরিধান করে বাহিরে বের হচ্ছে। পর্দা করার নিয়ম
জানা সত্বেও সেইসব নারীগণ পরপুরুষের মনোরঞ্জনের জন্যে নিজেকে সেইভাবেই উপস্থাপন করে।
যাই হোক, আপনার পরিবার পর্দা করে কিনা সেইটা আগে ভাবতে হবে। আপনি যদি দাইউস হয়ে জাহান্নামে
যেতে না চান, নিজ পরিবারকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে চান তাহলে সন্তানকে ছোট বেলা
থেকেই পর্দার বিধান শিক্ষা দিন। ছোট বেলা থেকেই কালিমা, সালাত ও সাওম পালনের অভ্যাস
গড়ে তুলুন। কুরআন ও হাদিস শিক্ষা দিন। সহিহ হাদিস গ্রন্থ ও হাদিসের গল্পের বই ঘরে রাখুন।
সেগুলো পড়ার তাগিদ দিন। যারা বড় হয়েছে তাদেরকে ইসলামের বিধিবিধানগুলো মানার জোড় তাগিদ
দিন এবং সেগুলো যথাযথ পালন করছে কিনা তা ফলোআপ করুন।
৩. দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ ও লজ্জাস্থানের
হিফাজত করা :
চোখের দৃষ্টি হচ্ছে এমন একটি শাণিত তীর, যা
নারীর বা পুরুষের অন্তর ভেদ করে তাদেরকে অনেক নাজায়িয কর্মে নিয়ে যেতে পারে। অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা
ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করার মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে এটি। তাই আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষ
উভয়কেই চোখের দৃষ্টি হিফাজতের নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ
করেন : “হে নবী! মুমিন পুরুষগণকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং যৌন
পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয়ই তারা যা কিছুই করে,
আল্লাহ তা জানেন এবং মুমিন নারীগণকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং
নিজেদের যৌন পবিত্রতা রক্ষা করে চলে।” (সূরাহ নূর, আয়াত
: ৩০-৩১)।
পর্দা সংক্রান্ত অন্যান্য বিধান:
মাহরামের সাথে দেখা দেয়া জায়িযঃ
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, একবার হযরত আয়িশা
(রা.) তার দুধচাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সে সম্পর্কে
জানতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার দুধচাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দানে
তোমার আপত্তি কোথায়? হযরত আয়িশা (রা.) জবাবে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পুরুষটি তো আমাকে
দুধপান করাননি, দুধপান করিয়েছেন তার ভাই আবু কুয়াইসের স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন,
(সতর্কতার জন্য) আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন, এতে তিনি তোমার দুধচাচা হয়ে গিয়েছেন। সুতরাং
তোমার চাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দাও। (সহীহ বুখারী, হাদীস
নং ৫১০৩)।
সতর্কতার স্থানে পর্দা করতে হবেঃ
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে, উম্মুল মুমিনীন
হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, হযরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ভাই হযরত উতবা (রা.)
সা‘দ (রা.)কে বললেন, জাম‘আর দাসীর গর্ভে যে সন্তানটি আছে, তা আমার সন্তান। কাজেই সে
সন্তানের চাচা হিসেবে আপনি তাকে নিয়ে নেবেন। সেই হিসেবে উতবার মৃত্যুর পর সন্তানটি
হযরত সা‘দ (রা.) নিয়ে নিলেন। তখন জাম‘আর ছেলে দাবী করেন যে, সে আমার ভাই। কেননা, সে
আমার পিতার দাসীর ঔরসজাত। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) ফয়সালা দিলেন, ছেলে তার হবে,
ছেলের মা যার দাসী ছিল। তখন জাম‘আর ছেলে আবদের কাছে তাকে ফেরত দেয়া হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ
(সা.) হযরত সাওদা (রা.)কে (তিনি যাম‘আর মেয়ে ছিলেন) বললেন, “হে সাওদা! (আপন ভাই ফয়সালা
হওয়া সত্ত্বেও) তুমি তার থেকে পর্দা করবে।”
ছেলেটিকে জাম‘আর সন্তান বলে ফয়সালা করার পরও
যেহেতু তার সাথে উতবার ঔরশের সম্ভাবনা ছিল, তাই তিনি সতর্কতার জন্য সাওদা (রা.)কে তার
সাথে দেখা দিতে নিষেধ করেছিলেন। আর এ নির্দেশ তিনি যথাযথ পালন করেন। এ ব্যাপারে হযরত
আয়িশা (রা.) সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, তিনি (হযরত সাওদা রা.) মৃত্যু পর্যন্ত তাকে (ছেলেটিকে)
দেখা দেননি।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৫৪)।
পর্দার জন্য ঘরে অবস্থান করা কর্তব্যঃ
সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী
(রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের গোত্রের এক সদ্য বিবাহিত যুবক আমাদের সাথে খন্দকের
যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রতিদিন দুপুরে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতি নিয়ে
স্ত্রীর কাছে যেতেন। একদিন অনুমতি চাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তোমার অস্ত্র
সাথে নিয়ে যাও। বনু কুরাইযার লোকেরা তোমাকে আক্রমণ করতে পারে। যুবকটি অস্ত্র নিয়ে বাড়ী
গিয়ে দেখতে পেলেন, তার স্ত্রী ঘরের বাইরে দরজার সামনে দাঁড়ানো। স্ত্রীকে এভাবে পর্দা
লঙ্ঘন করতে দেখে তিনি তাকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। স্ত্রী বললেন, থামুন! আগে দেখুনÑআমি
কেন ঘর থেকে বাইরে এসেছি। তখন তিনি ঘরে গিয়ে দেখলেন : একটি বিরাট সাপ তার বিছানায় কুন্ডলি
পাকিয়ে বসে আছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৩৬)।
এতে বুঝা যাচ্ছে, পর্দার জন্য মহিলাদের ঘরে
অবস্থান করতে হবে। বিনা কারণে ঘর থেকে বের হওয়া তাদের জন্য উচিত নয়।
চোখকে বেগানা থেকে হিফাজত করতে হবেঃ
সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)
ইরশাদ করেন : “চোখের যেনা হলো দৃষ্টিপাত করা।” (সহীহ বুখারী,
হাদীস নং ৬৬১২)।
তেমনি তাবরানী শরীফে রয়েছেÑহযরত আবদুল্লাহ
ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন : “কুদৃষ্টি
হলো ইবলিসের বিষাক্ত তীর।” (মু‘জামুল কাবীর, তাবরানী, হাদীস
নং ১০৩৬২)।
তেমনিভাবে আল মারগীনানী কিতাবে বর্ণিত রয়েছে,
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন : “যে ব্যক্তি কোনো গাইরে মাহরাম নারীর প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষেপ
করবে, কিয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত শিশা ঢেলে দেয়া হবে।” (আল-মারগীনানী, ৪র্থ খ-, ৩৬৮ পৃষ্ঠা)।
বেগানা মহিলাদের প্রতি পুরুষদের এবং বেগানা
পুরুষদের প্রতি মহিলাদের দৃষ্টিপাত করা ইসলাম হারাম করে দিয়েছে। সুতরাং কোনো পুরুষ
বা মহিলার জন্য তার মাহরাম ব্যতীত অন্য কারো দিকে দৃষ্টিপাত করা বৈধ নয়।
মেয়েদের জন্যও পুরুষদেরকে দেখা জায়িয
নয়ঃ
সুনানে আবু দাউদ শরীফে রয়েছে, উম্মুল মুমিনীন
হযরত উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার আমি ও মাইমুনা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর
কাছে ছিলাম। এমন সময় সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) আসতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ
(সা.) আমাদেরকে বললেন, “তোমরা তার থেকে পর্দা কর। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি
তো অন্ধ। তিনি আমাদেরকে দেখবেন না। জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরাও কি অন্ধ?
তোমরা কি তাকে দেখবে না?” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪১১২)।
হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে
ফিরিয়ে নিতে হবেঃ
যদি বেগানার প্রতি হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যায়, তাহলে
সাথে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, হযরত ইবনে
বুরাইদা (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)কে বলেন,
হে আলী! হঠাৎ অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি পড়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে নিবে এবং পুনঃ দৃষ্টি
দিবে না। কারণ, তোমার জন্য অনিচ্ছাকৃত প্রথমটি মাফ, ইচ্ছাকৃত দ্বিতীয়টি নয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১৪৯)।
হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আল বাজালী (রা.)
থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে ইচ্ছা ছাড়া হঠাৎ দৃষ্টি সম্পর্কে
জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে নির্দেশ দেন যে, “সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৫৯)।
নির্জনে বেগানা নারী-পুরুষের একত্রিত
হওয়া নিষেধঃ
সহীহ ইবনে হিব্বানে রয়েছে, হযরত সুলাইমান আত-তাইমী
(রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবু সালিহ (রা.) থেকে শুনেছি, আমর ইবনুল আস
(রা.) একবার হযরত আলী (রা.)-এর বাড়ীতে এসে অনেক ডাকাডাকি করলেন। পরে জানতে পারলেন,
হযরত আলী (রা.) বাড়ীতে নেই। তাই চলে গেলেন। দ্বিতীয়বার এসে তার সাক্ষাৎ পেলেন। তখন
তার উপস্থিতিতে হযরত ফাতিমা (রা.)কে ডেকে এনে কতিপয় মাসআলা নিয়ে আলোচনা করলেন। হযরত
আলী (রা.) বললেন, মনে হচ্ছেÑআপনি এখানে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন নি, এসেছেন এ মহিলার
(অর্থাৎ আমার স্ত্রীর) সাথে মাসআলা সংক্রান্ত কথাবার্তা বলতে। তাহলে তখন আমি নেই বলে
ফিরে গেলেন কেন? তিনি তা স্বীকার করে বললেন, আপনি না থাকা অবস্থায় আমি এ জন্য ফিরে
গিয়েছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরকম মহিলার কাছে যেতে নিষেধ করেছেন, যার স্বামী বাড়ীতে
নেই। একথা শুনে হযরত আলী (রা.) বললেন, “হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরকম মহিলার কাছে
যেতে নিষেধ করেছেন, যার স্বামী বাড়ীতে নেই।” (সহীহ ইবনে হিব্বান,
হাদীস নং ৫৫৮৪)।
সহীহ ইবনে হিব্বানে আরো রয়েছে, একবার এক ব্যক্তি
হযরত উমর (রা.)-এর কাছে এসে বললেন : “আমার ভাই যুদ্ধে গেছেন। আমাকে তার পরিবার-পরিজনের
খোঁজ-খবর নিতে বলেছেন। আমি কি তাদের নিকট যেতে পারব? একথা শুনে উমর (রা.) চাবুক দিয়ে
সতর্ক করে বললেন, অবশ্যই আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না। দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করবেন,
তাদের কোনো কিছু প্রয়োজন আছে কি না।” (সহীহ ইবনে হিব্বান,
হাদীস নং ৫৫৮৫)।
বেপর্দা ও বিধর্মী মহিলাদের থেকে মুসলিম মহিলাদের
পর্দা করতে হবে। বেপর্দা ও অমুসলিম মহিলা থেকে মুসলিম মহিলাদের পর্দা করার জন্য ইসলাম
নির্দেশ দিয়েছে।
এ সম্পর্কে মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক শরীফে
রয়েছে, হযরত কাইস ইবনুল হারিস (রহ.) থেকে বর্ণিত, হযরত উমর (রা.) হযরত আবু ওবায়দা ইবনুল
জাররাহ (রা.)কে লিখেছিলেন, “আমি শুনতে পেলাম মুসলিম মহিলারা আহলে কিতাব মহিলাদের সাথে
গোসলখানায় গিয়ে একত্রে গোসল করে। মুসলিম মহিলাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করবেন এবং তাদেরকে
বিরত রাখবেন।” (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস নং ১১৩৬)।
ইসলামের এ পর্দা বিধান পালন করা ফরজ। তা লঙ্ঘন
করা কবীরা গুনাহ ও হারাম। পর্দা পালন না করলে, পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘দুই প্রকার জাহান্নামী লোক আমি (এখন পর্যন্ত) প্রত্যক্ষ করিনি
(অর্থাৎ পরে তাদের আবির্ভাব ঘটবে) : (১) এমন এক সম্প্রদায় যাদের কাছে গরুর লেজের মত
চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা জনগণকে প্রহার করবে। (২) এমন এক শ্রেণীর মহিলা, যারা (এমন
নগ্ন) পোশাক পরবে যে, (বাস্তবে) উলঙ্গ থাকবে, (পর পুরুষকে) নিজেদের প্রতি আকর্ষণ করবে
ও নিজেরাও (পর পুরুষের প্রতি) আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা হবে উটের হেলে যাওয়া কুঁজের মত।
এ ধরনের মহিলারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তার সুগন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ
এত এত দূরত্বের পথ থেকে পাওয়া যাবে।’’ (সহীহ মুসলিম (হাদীস
একাডেমী) ৫৪৭৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২১২৮, রিয়াদুস সলেহীন ১৬৪১, আহমাদ ৮৪৫১, ৯৩৩৮৮)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
কারো আমল তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না
(ক) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল
জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়?
তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না
করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে
কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি
হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৫৬৭৩, ৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫২৭১, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ৫৬৭৩, আধুনিক প্রকাশনী ৫২৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫১৫৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(খ) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কস্মিনকালেও তোমাদের কাউকে তার
নিজের ’আমল কক্ষনো নাজাত দিবে না। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি
বললেনঃ আমাকেও না। তবে আল্লাহ্ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত রেখেছেন। তোমরা যথারীতি
’আমল করে নৈকট্য লাভ কর। তোমরা সকালে, বিকালে এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদাত কর।
মধ্য পন্থা অবলম্বন কর। মধ্য পন্থা তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬৪৬৩, ৩৯; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০০৪, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৮১৬, আধুনিক প্রকাশনী ৬০১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬০১৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(হাদীসটি
প্রমাণ করে যে, আল্লাহর রহমত ব্যতীত শুধু আমলের দ্বারা কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে
না-ফাতহুল বারী)।
(গ) কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ)....আবূ হুরাইরাহ
(রাযিঃ) এর সূত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
তোমাদের কোন লোকের আমলই তাকে পরিত্রাণ দিতে পারবে না। এ কথা শুনে এক লোক বললেন, হে
আল্লাহর রসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমাকেও না। তবে যদি আল্লাহ তা’আলা তার
করুণা দ্বারা আমাকে ঢেকে নেন। তোমরা অবশ্য সঠিক পন্থা অবলম্বন করবে। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০০৪, ৭০০৬, ৭০০৭, ৭০০৮, ৭০০৯, ৭০১০,
৭০১৪, ৭০১৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৫১, ইসলামিক সেন্টার ৬৯০৭)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ)...আবূ হুরায়রা
(রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কোন
ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে জান্নাতে দাখিল করতে পারে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হল, ইয়া
রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমিও নই। তবে আমার পালনকর্তা যদি তার
অনুগ্রহের দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক
ফাউন্ডেশন) ৬৮৫২, ৬৮৫৫, ৬৮৬০, ৬৮৬১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) আবুল ইয়ামান (রহঃ)...আবূ হুরায়রা (রাঃ)
বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি তোমাদের কাউকে
তার নেক আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম হবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ!
আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তার করুণা ও মেহেরবানীর
দ্বারা ঢেকে না দেন। কাজেই মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে যাও।
আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বেশী বয়স পাওয়ার
দরুন) তার নেক আমল বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পাবে। পক্ষান্তরে মন্দ লোক হলে সে লজ্জিত হয়ে
তওবা করার সুযোগ লাভ করতে পারবে। (সহীহ বুখারী (ইসলামিক
ফাউন্ডেশন) ৫২৭১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ) মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না (রহঃ).....আবু
হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
তোমাদের মাঝে এমন কোন লোক নেই, যার আমল তাকে নাযাত দিতে পারে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন,
হে আল্লাহর রসূল! আপনিও কি নন? জবাবে তিনি বললেন, আমিও নই। তবে যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে
তার মার্জনা ও করুণা দ্বারা ঢেকে নেন।
রাবী ইবনু আওন (রহঃ) নিজ হাত দ্বারা নিজ মাথার
দিকে ইশারা করে বললেন, আমিও না। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা’আলা তার মার্জনা ও করুণা দ্বারা
আমাকে ঢেকে ফেলেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০০৭, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৮১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৫৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৯১০)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ছ) যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ).....আবু হুরাইরাহ
(রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এমন কোন লোক
নই, যার আমল তাকে মুক্তি দিতে পারে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনিও কি নন? তিনি
বলেন, আমিও নই। একমাত্র প্রত্যাশা এই যে, যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে তার করুণা দ্বারা
সহায়তা করেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০০৮, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৮১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৫৪, ইসলামিক সেন্টার ৬৯১১)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
(জ) মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র
(রহঃ)....আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সঠিক পথে কায়িম থাকো এবং কমপক্ষে তার কাছাকাছি থাক। নিশ্চিতভাবে
তোমরা জেনে রাখো, তোমাদের কেউ আমলের দ্বারা মুক্তি পাবে না। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমিও নই। তবে আল্লাহ
তা’আলা যদি স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে ঢেকে রাখেন। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০১০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮১৬,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৫৬, ইসলামিক সেন্টার ৬৯১৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঝ) সালামাহ্ ইবনু শাবীব (রহঃ)....জাবির (রাযিঃ)
থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে,
তোমাদের কোন লোক তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জাহান্নাম থেকে
মুক্তি পাবে না। আর আল্লাহর রহমত ব্যতীত আমি নিজেও বাঁচতে পারব না। (সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৭০১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮১৭,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৮৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৯১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
সহিহ মুসলিমে এরকম আরও অনেক
হাদিস আছে। যেখানে রাসুল সা. স্বয়ং বলেছেন, তাঁর আমল তাঁকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না,
জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে না, সেখানে পীর-অলিরা কিভাবে বলেন, তারা সুপারিশ করে তাদের
মুরিদদের জান্নাতে নিয়ে যাবে? সেই জন্যেই চরমোনাই পীর বলেছেন, বাবারে কারো পীরের বাবারও
শক্তি নাই সে সুপারিশ করে কোনো মুরিদকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। তিনি এই হাদিসগুলো অবশ্যই
পড়েছেন বলে ঐ কথা বলেছেন।
কে জান্নাতী কে জাহান্নামী সেটা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত
মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে কুরআনের এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ
’’(হে মুহাম্মাদ!) আপনার রব যখন আদম সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের সব সন্তানদেরকে বের করলেন’’
(সূরাহ্ আল আ’রাফ ৭: ১৭২) (...আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তিনি
জবাবে বলেন, আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। অতঃপর আপন ডান হাত তাঁর পিঠ বুলালেন।
আর সেখান থেকে তাঁর (ভবিষ্যতের) একদল সন্তান বের করলেন। অতঃপর বললেন, এসবকে আমি জান্নাতের
জন্য সৃষ্টি করেছি, তারা জান্নাতীদের কাজই করবে। আবার আদমের পিঠে হাত বুলালেন এবং সেখান
থেকে (অপর) একদল সন্তান বের করলেন এবং বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি
এবং তারা জাহান্নামীদেরই ’আমল করবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে
’আমলের আর আবশ্যকতা কি? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন
আল্লাহ কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজই করিয়ে
নেন। শেষ পর্যন্ত সে জান্নাতীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে এবং আল্লাহ তাকে জান্নাতে
প্রবেশ করান। এভাবে আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা
জাহান্নামীদের কাজই করিয়ে নেন। পরিশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে, আর
এ কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ
(মিশকাত) ৯৫, মুয়াত্ত্বা মালিক ১৩৯৫, সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪০৮১, সুনান আত তিরমিজী
(তাহকীককৃত) ৩০০১)।হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
উসমান (রহঃ) ... আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন, আমরা বাকীউল গারফাদ (কবরস্থানে) এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আগমণ করলেন। তিনি উপবেশন করলে আমরাও তাঁর চারদিকে বসে
পড়লাম। তাঁর হাতে একটি ছড়ি ছিল। তিনি নীচের দিকে তাকিয়ে তাঁর ছড়িটি দ্বারা মাটি খুদতে
লাগলেন। এরপর বললেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, অথবা বললেন, এমন কোন সৃষ্ট প্রাণী
নেই, যার জন্য জান্নাত ও জাহান্নামে জায়গা নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি আর এ কথা লিখে
দেওয়া হয়নি যে, সে দুর্ভাগা হবে কিংবা ভাগ্যবান। তখন এক ব্যাক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তাহলে কি আমরা ভাগ্যলিপির উপর ভরসা করে আমল করা ছেড়ে দিব না? কেননা, আমাদের মধ্যে যারা
ভাগ্যবান তারা অচিরেই ভাগ্যবানদের আমলের দিকে ধাবিত হবে। আর যারা দুর্ভাগা তারা অচিরেই
দুর্ভাগ্যদের আমলের দিকে ধাবিত হবে। তিনি বললেন, যারা ভাগ্যবান, তাদের জন্য সৌভাগ্যের
আমল সহজ করে দেওয়া হয় আর ভাগ্যাহতদের জন্য দুর্ভাগ্যের আমল সহজ করে দেওয়া হয়। এরপর
তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, فَأَمَّا
مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى কাজেই যে দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে ......। (সূরা লাইলঃ ৫-১০)।
(সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ১২৭৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahi।
(দুনিয়ায় মুসলমানদের বিভিন্ন
কর্মকান্ড বা আমল দেখেই বুঝা যায় পরকালে তার ফয়সালা কী হবে।)
উপরোক্ত দলিলের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারলাম
যে, রাসুল সাঃ এর উম্মত ৭৩ দলের মধ্যে ৭২ দল অথবা এক তৃতীয়াংশ বা এক চতুর্থাংশ বা অর্ধেক
কিংবা পরকালে কারো হিসেব নিলে তার জন্যে জাহান্নাম সুনিশ্চিত। জান্নাতে যে যাবেন তার
কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালার রহমত ছাড়া কারো কোনো আমল তাকে জান্নাতে
নিয়ে যাবে না। আর আল্লাহর রহমত পেতে চাইলে দুনিয়ায় থাকা অবস্থাতেই আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক
কাজ বা আমল চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ ও রাসুল সাঃ যেসব আদেশ নিষেধ দিয়েছেন তা মেনে চলতে
হবে। কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো মুসলমান হয়েও জেনে বা না জেনে করে থাকে আর সেগুলো জাহান্নামের
কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বিবেক বুদ্ধি দিয়েছেন তাই আমাদেরকে হালাম
হারাম তথা সঠিক পথ বেছে চলতে হবে।
পীর-অলিদের সাথে এদের মুরিদদের হাশর হবে এবং জাহান্নামে এরা তর্ক বিতর্ক
করবে
কিয়ামতে পীর, অলি, সুফী-সাধকদের
সাথে মুরিদদের হাশর হবে এবং জাহান্নামে তারা তর্কবিতর্কে লিপ্ত হবে:
আপনি যখন কোনো পীর অলি সুফী সাধকের নিকট যাবেন,
তাদের নিকট সমস্যা সমাধান চাইবেন, নজরানা দিবেন, মানত করবেন, তাদেরকে বা মাজারে সিজদাহ
করবেন, তাদের মুরিদ হবেন তাহলে বুঝা যাবে যে আপনি তাদেরকে ভালবাসেন, পছন্দ করেন, তাদেরকে
আপনি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। আপনি কি জানেন, দুনিয়ার এই ভালবাসা বা বন্ধুত্ব
কিয়ামতেও থাকবে। তথা আপনি যেই পীর, অলি, সুফী সাধককে ভালবাসেন সেই পীরেরা জান্নাতে
গেলে আপনিও জান্নাতে যাবেন আর সেই পীরেরা জাহান্নামে গেলে তার সাথে আপনিও জাহান্নামে
যাবেন। তাই আপনাকে দুনিয়ায় থাকতেই এমন পীর বা অলি নির্বাচন করে নিয়ে তার সাথে চলাফেরা
করতে হবে যিনি আপনাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আর পীর অলিরা যে, অরজিনাল পীর বা অলি সেটা
একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। কোনো পীর বা অলি দাবী করে বলতে পারবে না যে, তিনি জান্নাতী
এবং তার মুরিদরাও জান্নাতী। কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী সেটাও একমাত্র আল্লাহই জানেন।
রাসূল সা. আল্লাহর পক্ষ থেকে যাদেরকে তিনি জান্নাতী বলে গেছেন তারা ব্যতীত দুনিয়ার
আর কারো এখতিয়ার নেই সে অন্য কাউকে জান্নাতী বলে।
বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাসুল
সা. বলেন,
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে গড়ে উঠে।
সুতরাং তার বন্ধু নির্বাচনের সময় এ বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত, সে কাকে বন্ধু নির্বাচন
করছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০১৯, সুনান আততিরমিযী
২৩৭৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৮৩৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯২৭, সহীহুল জামি‘ ৩৫৪৫, আহমাদ ৮৪১৭,
শু‘আবুল ঈমান ৯৪৩৮, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৩/১৬৫, আল মুসতাদরাক ৭৩১৯)। হাদিসের মানঃ হাসান
(Hasan)।
কিন্তু দেখা যায়, আপনি এমন একজন পীর বা অলিকে
ভালবাসেন বা সমর্থন করেন যিনি ঘুষ, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, মদ, জুয়া, যিনা/ব্যভিচার,
চাঁদাবাজিসহ সকল অপকর্মের সাথে জড়িত এমন একটি দলকে ভোট দেয় বা সমর্থন করে অথবা সেই
পীর অলিরা শিরক, কুফর, গানবাজনা ও বিদয়াতি কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।
তাহলে অন্যায়ের সহযোগী হিসেবে
ঐসব পীর অলি ও মুরিদরা কিয়ামত পর্যন্ত পাপের অংশের ভাগ পেতে থাকবে।
আল্লাহ তাঁয়ালা এরশাদ করেন, ‘যে লোক সৎকাজের
জন্য কারো পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দেবে (বা তাকে সুপারিশ করবে যে লোকটি ভালো, সৎ ও যোগ্য),
তাহলে সেই লোকটি যতোদিন ভালো কাজ করবে ততোদিন তা থেকে সেও একটি সওয়াবের অংশ পাবে। আর
যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে (তথা আপনি জানেন যে এই লোকটিকে ভোট দিলে বা সমর্থন
দিলে সে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিভিন্ন পাপ কাজের সাথে জড়িত হবে), তাহলে সে তার পাপের একটি
অংশ পাবে তথা তার আমলনামায় ঐ পাপ কিয়ামত পর্যন্ত যোগ হতে থাকবে)।’ (সুরা নিসা, আয়াত-৮৫)।
কিয়ামতে আপনার সেই পীর অলির
সাথেই হাশর হবে যাকে আপনি ভালবাসেন, যার আপনি মুরিদ হয়েছেন।
এপ্রসঙ্গে রাসুল সাঃ বলেন,
আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ এক ব্যক্তি একদলকে ভালবাসে, কিন্তু
(’আমলে) তাদের সমপর্যায়ের হতে পারেনি। তিনি বললেনঃ মানুষ যাকে ভালবাসে, সে তারই সাথী
হবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৬১৭০, সহীহ মুসলিম
(হাদীস একাডেমী) ৬৬১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৪১, হাদীস সম্ভার ৩৪১৩, আধুনিক প্রকাশনী-
৫৭৩০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬২৬)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
তিনি আরো বলেন,
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক ব্যক্তি
জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! কিয়ামত কখন হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বললেনঃ তোমার জন্য পরিতাপ। কিয়ামতের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? সে জবাবে বলল, আমি
কিছুই করিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসী।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি তার সাথেই হবে যাকে তুমি ভালোবাসো।
(রাবী) আনাস (রাঃ) বলেনঃ ইসলাম আবির্ভাবের পর মুসলিমদেরকে আমি কোন কথায় এতটা খুশি হতে
দেখিনি, যতটা তারা খুশি হয়েছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণীতে।
(মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০০৯, (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬১৬৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬০৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৩৯, সহীহ আত্ তারগীব
৩০৩২, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ২৭০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৩৪৯৭, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক
২০৩১৭, আহমাদ ১২০১৩, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৩৫৫৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৮, দারাকুত্বনী ৩,
হিলইয়াতুল আওলিয়া ৭/৩০৯, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৪১০, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর
২৯৯২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৭০, ইসলামিক সেন্টার ৬৫২১, হাদীস সম্ভার ৩৪১৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
তিনি আরো বলেন,
আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে
জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার কি অভিমত? যে কোন কওম বা
দলকে ভালোবাসে; কিন্তু তাদের সাথে (কখনো) সাক্ষাৎ হয়নি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে ব্যক্তি তার সাথেই আছে, যাকে সে ভালোবাসে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০০৮, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬১৬৮, ৬১৬৯, ৬১৭০; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬১১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৪০, সুনান
আততিরমিযী ২৩৮৭, সুনান আবূ দাঊদ ৫১২৭, সহীহুল জামি‘ ৬৬৮৯, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৩৩, বাযযার
৩০১৪, আহমাদ ১৩৩৮৮, আবূ ইয়া‘লা ৫১৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৫৭, শু‘আবুল ঈমান ৪৯৭, সুনানুর
নাসায়ী আল কুবরা ১১১৭৮, দারাকুত্বনী ২, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৭২০৮, মুসান্নাফ
‘আবদুর রাযযাক ৭৯৫, হাদীস সম্ভার ৩৪১৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪৭৭, ইসলামিক সেন্টার ৬৫২৯)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
আবু হুরাইরাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে
দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে। (হাদীস
সম্ভার ৩৪১২, আহমাদ ৮০২৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৮৩৫, সুনান আততিরমিযী ২৩৭৮)। হাদিসের মানঃ
সহিহ (Sahih)।
ভন্ড পীর অলি সুফী সাধকদের মুরিদ হলে কিয়ামতে
তাকে করুন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“অপরাধী সেদিন স্বীয় হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে
বলবে, ‘হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম। হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি
যদি অমুককে (ভাল না বাসতাম, সমর্থন না করতাম, ভোট না দিতাম) বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!
সে তো আমাকে উপদেশ বাণী থেকে (ইসলামী দল থেকে/ইসলামের পথ থেকে) বিভ্রান্ত করেছিল আমার
কাছে তা আসার পর, শয়ত্বান মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক”। (সুরা
আল ফুরকান ২৭-২৯)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন,
আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সৎলোকের সাহচর্য ও অসৎলোকের
সাহচর্য যথাক্রমে কস্তুরী বিক্রেতা (আতরওয়ালা) ও কর্মকারের হাপরে ফুঁক দেয়ার মতো। কস্তুরী
বিক্রেতা হয়তো তোমাকে এমনিতেই কিছু দান করবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে কিছু কস্তুরী
ক্রয় করবে। আর অন্ততপক্ষ কিছু না হলেও তার সুঘ্রাণ তোমার অন্তর ও মস্তিষ্ককে সঞ্জীবিত
করবে। পক্ষান্তরে হাপরে ফুঁকদানকারী তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে। আর কিছু না হলেও তার
দুর্গন্ধ তুমি পাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫০১০, (সহীহ
বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ২১০১, ৫৬৩৪; সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৫৮৬, আন্তর্জাতিক
নাম্বারঃ ২৬২৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৮৩১, সহীহুল জামি‘ ২৩৬৮, সহীহ আত্ তারগীব ৩০৬৪, বাযযার
৩১৯০, আহমাদ ১৯৬৬০, আবূ ইয়া‘লা ৪২৯৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬১, আল মুসতাদরাক ৭৭৪৯, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন ৬৪৫৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৫০৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
হুযায়ফাহ্ (রাঃ) বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নিকট কল্যাণ
সম্পর্কে প্রশ্ন করত। আর আমি ক্ষতিকর বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতাম এই ভয়ে যেন আমি
তাতে লিপ্ত না হই। হুযায়ফাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা
এক সময় মূর্খতা ও অকল্যাণের মাঝে নিমজ্জিত ছিলাম অতঃপর আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এই
কল্যাণ (দীন-ইসলাম) দান করেন। তবে কি এ কল্যাণের পর পুনরায় অকল্যাণ আসবে? তিনি (সা.)
বললেন, হ্যা, আসবে। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম সেই অকল্যাণের পরে কি আবার কল্যাণ আসবে?
তিনি (সা.) বললেন, হ্যা আসবে, তবে তা হবে ধোঁয়াযুক্ত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেই ধোঁয়া
কি ধরনের? তিনি (সা.) বললেন, লোকেরা আমার সুন্নত বর্জন করে অন্য তরীকাহ্ গ্রহণ করবে
এবং আমার পথ ছেড়ে লোকদেরকে অন্য পথে পরিচালিত করবে। তখন তুমি তাদের মধ্যে ভালো কাজও
দেখতে পাবে এবং মন্দ কাজও। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, সেই কল্যাণের পরও কি অকল্যাণ আগমন
করবে? তিনি (সা.) বললেন, হ্যাঁ, জাহান্নামের পাশে দাঁড়িয়ে কতক আহ্বানকারী লোকেদেরকে
সেই দিকে ডাকবে। যারা তাদের আহ্বানে সাড়া দেবে তাদেরকে তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে
ছাড়বে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাদেরকে তাদের পরিচয় অবহিত করুন। তিনি (সা.)
বললেন, তারা আমাদের মতোই মানুষ হবে এবং আমাদের ভাষায় কথা বলবে। আমি বললাম, আমি সে
অবস্থায় উপনীত হলে তখন আমাকে কি কি অদেশ দেন? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি মুসলিমদের
দল ও মুসলিমদের ইমামকে আঁকড়ে ধরবে। আমি বললাম, সে সময় যদি কোন মুসলিম জামা’আত ও মুসলিম
ইমাম না থাকে (তখন আমাকে কি করেতে হবে)? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি সেই সমস্ত বিচ্ছিন্ন
দলকে বর্জন করবে, যদিও তোমাকে গাছের শিকড়ের আশ্রয় নিতে হয় এবং তুমি এই নির্জন অবস্থায়
থাকবে যতক্ষণ না তোমার মৃত্যু উপস্থিত হয় (অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত বাতিল থেকে দূরে
অবস্থান করতে হবে, এতে যে কোন দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারে তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে)।
সহীহ মুসলিম-এর এক রিওয়ায়াতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন: আমার (ওফাতের) পরে এমন কতিপয় ইমাম ও বাদশাহর আগমন ঘটবে যারা আমার নির্দেশিত
পথে চলবে না এবং আমার সুন্নাত ও তরীকানুযায়ী আমল করবে না। আবার তাদের মধ্যেও এমন কিছু
লোকের আগমন ঘটবে যারা শরীরে গঠনে এবং চেহারা আকৃতিতে মানুষই হবে, কিন্তু তাদের অন্তরসমূহ
হবে শয়তানের মতো। হুযায়ফাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! যদি
আমি সেই অবস্থায় পতিত হই তখন আমার কর্তব্য কি হবে? তিনি (সা.) বললেন, তোমার আমির
(শাসক) যা বলে তা মানবে এবং তার অনুসরণ করবে, যদিও তোমার পিঠে আঘাত করা হয় এবং তোমার
ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়, তবুও তার নির্দেশ মেনে চলবে এবং তার আনুগত্য করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৫৩৮২, সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৬০৬, ৩৬০৭, ৭০৮৪, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৭৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৪৭, সুনান
আবূ দাউদ ৪২৪৪, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ১৭৯১, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২০৭১১, মুসান্নাফ
ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩৭১১৩, মুসনাদে বাযযার ২৯৬০, মুসনাদে আহমাদ ২৩৪৭৬, সহীহ ইবনু হিব্বান
৫৯৬৩, আস্ সুনানুল কুবরা লিন্ নাসায়ী ৮০৩৩, হিলয়াতুল ১/২৭২, আস্ সুনানুল কুবরা লিল
বায়হাকী ১৭০৫৩, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩৪৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ
(Sahih)।
আবদুল্লাহ্ ইব্নু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমি হাউযে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেই হাজির থাকব। তোমাদের থেকে কিছু লোককে
আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তাদের পান করাতে উদ্যত হব, তখন তাদেরকে আমার
নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব, হে রব! এরা তো আমার সাথী। তখন তিনি বলবেন, আপনার
পর তারা (পীর, অলি, সুফী সাধকগণ) নতুন কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৯, ৬৫৭৫, আধুনিক প্রকাশনী ৬৫৬০,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
সাহ্ল ইব্নু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) – কে বলতে শুনেছি যে, আমি হাউজের ধারে তোমাদের আগে হাজির থাকব। যে সেখানে
হাজির হবে, সে সেখান থেকে পান করার সুযোগ পাবে। আর যে একবার সে হাউজ থেকে পান করবে
সে কখনই পিপাসিত হবে না। অবশ্যই এমন কিছু দল আমার কাছে হাজির হবে যাদের আমি (আমার উম্মাত
বলে) চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। কিন্তু এরপরই তাদের ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা
দাড় করে দেয়া হবে।
আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন,
আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম, এমন সময় নু’মান
ইব্নু আবূ আয়াস আমার নিকট হতে এ হাদীসটি শুনে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সাহ্ল থেকে হাদীসটি
এরূপ শুনেছেন। আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আবূ সা’ঈদ
খুদ্রী (রাঃ) - কে এ হাদীসে অতিরিক্ত বলতে শুনেছি যে, নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) তখন বলবেনঃ এরা তো আমারই অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয় জানেন না যে,
আপনার পরে এরা (পীর, অলি, সুফী, সাধকগণ) দ্বীনের মধ্যে কি পরিবর্তন করেছে (নতুন নতুন
ধর্মীয় নিয়ম, যা আপনি করতে বলেননি) । এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে,
তারা (বিদআতী পির-অলি ও আলেম) দূর হোক, দূর হোক। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৫০-৭০৫১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
কিয়ামতে সেই পীর, অলি, সুফী, সাধকগণই পরস্পর
শত্রু হবে। এপ্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বন্ধুরা (পীর, অলি, সুফী, সাধকগণ) সেদিন
হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকীরা ছাড়া”। (সূরা আয্-যুখরুফ-
৬৭ )।
জাহান্নামে পীর, অলি, সুফী, সাধকদের সাথে মুরিদগণ
তর্কেবিতর্কে লিপ্ত হবেঃ
আপনি যাকে ভালবাসেন, যার মুরিদ হয়েছেন, যার
কাছে গিয়ে সমস্যা সমাধানের কথা বলেন তারা শিরক, কুফর আর বিদয়াতি কর্মকান্ডের সাথে জড়িত
থাকার কারণে জাহান্নামে যাবে। সেই সাথে আপনিও জাহান্নামে যাবেন। জাহান্নামে গিয়ে আপনাদের
মাঝে যেসব কথোপকথন হবে তা নিম্নরুপঃ
অসৎ ব্যক্তিদের সাথে চলাফেরা করায় দুনিয়াতে
ছোট হোক বা বড় হোক সকল অনুসৃত ব্যক্তি এবং তার অনুসারীদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো
হবে। জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা এবং আযাবের ভয়াবহতা দেখে জাহান্নামে প্রবেশের জন্য
পরস্পরকে দোষারোপ করবে। অনুসারীরা অনুসৃত ব্যক্তির কাছে জাহান্নামের আগুনের আযাব থেকে
পরিত্রাণ চাইবে। কিন্তু তাদের সেদিন কোনো কিছুই করার ক্ষমতা থাকবে না। এমতাবস্থায় তাদের
মাঝে চরম তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হবে। যা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন
এভাবে-
“এ এক বাহিনী, তোমাদের সাথে (জাহান্নামে) প্রবেশকারী।
তাদের জন্য নেই কোনো অভিনন্দন। বরং তারা জাহান্নামে জ্বলবে। (তখন অনুসারীরা) বলবে,
বরং তোমরাও তো (জাহান্নামী), তোমাদের জন্যও কোনো অভিনন্দন নেই। তোমরাই তো পূর্বে আমাদের
জন্য ব্যবস্থা করেছ। কত নিকৃষ্ট এ আবাসস্থল। তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! এটা যে আমাদের
সম্মুখীন করেছে, জাহান্নামে তার (পীর অলি, সুফী সাধকদের) শাস্তি দ্বিগুণ বর্ধিত করুন”।
(সুরা ছোয়াদ ৩৮/৫৯-৬১)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
“যখন তারা জাহান্নামে পরস্পরে বিতর্কে লিপ্ত
হবে, তখন দুর্বলেরা (মুরিদরা) অহংকারীদেরকে (পীর অলি, সুফী সাধকদের) বলবে, আমরা তো
তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম। এখন কি তোমরা আমাদের থেকে জাহান্নামের (আযাবের) কিছু নিবারণ
করবে? অহংকারীরা বলবে, আমরা তো সবাই জাহান্নামে আছি। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের বিচার
করে ফেলেছেন”। (সুরা মুমিন ৪৭/৪৮)।
পৃথিবীতে যারা মূর্খ ও পথভ্রষ্ট আলেম এবং তাদের
যারা অনুসারী ছিল জাহান্নামে তারা পরস্পরে তর্ক-বিতর্ক করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হ’য়ে জিজ্ঞাসাবাদ
করবে। তারা বলবে, তোমরা তো আমাদের ডান দিক থেকে আসতে। তারা বলবে, বরং তোমরাতো বিশ্বাসী
ছিলে না এবং তোমাদের উপর আমাদের কোনো কর্তৃত্বও ছিল না। বস্তুত তোমরাই ছিলে সীমালঙ্ঘনকারী
সম্প্রদায়। আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিপালকের কথা সত্য হয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই শাস্তি
আস্বাদন করতে হবে। আমরা তোমাদের বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত ছিলাম।
সুতরাং তারা সকলেই সেইদিন শাস্তিতে শরীক হবে”। (সুরা ছা-ফফাত ৩৭/২৭-৩৩)।
পীর-অলি তথা বিদআতিদের শেষ পরিনতি জাহান্নাম, হাউসে কাওসার থেকে এদের বিতাড়িত
করা হবে
পীর-অলিরা নতুন নতুন বিদআত সৃষ্টি করার কারণে
তাদের থেকে সমপরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন বিধায় তারা রাসুল সা. ও সাহাবাগণের সুন্নাহ
থেকে বিরত থাকেন।
হাসসান (ইবনু ’আতিয়্যাহ্) (রহঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, কোন জাতি যখন দীনের মধ্যে কোন বিদ্’আত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের
থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে
ফিরিয়ে দেয়া হয় না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৮, দারিমী
৯৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
এজন্যে তাদেরকে কিয়ামতে হাউসে কাউসারের পানি
পান করা থেকে বিরাত রাখা হবে এবং পরিশেষে তাদেরকে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নাতে নিয়ে যাওয়া
হবে।
আবদুল্লাহ্ ইব্নু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমি হাউযে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেই হাজির থাকব। তোমাদের থেকে কিছু লোককে
আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তাদের পান করাতে উদ্যত হব, তখন তাদেরকে আমার
নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব, হে রব! এরা তো আমার সাথী। তখন তিনি বলবেন, আপনার
পর তারা নতুন কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না। (সহীহ বুখারী
(তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৯, ৬৫৭৫, আধুনিক প্রকাশনী ৬৫৬০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৭৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ হাদিস।
সাহ্ল ইব্নু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) – কে বলতে শুনেছি যে, আমি হাউজের ধারে তোমাদের আগে হাজির থাকব। যে সেখানে
হাজির হবে, সে সেখান থেকে পান করার সুযোগ পাবে। আর যে একবার সে হাউজ থেকে পান করবে
সে কখনই পিপাসিত হবে না। অবশ্যই এমন কিছু দল আমার কাছে হাজির হবে যাদের আমি (আমার উম্মাত
বলে) চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। কিন্তু এরপরই তাদের ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা
দাড় করে দেয়া হবে।
আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন, আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম,
এমন সময় নু’মান ইব্নু আবূ আয়াস আমার নিকট হতে এ হাদীসটি শুনে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি
সাহ্ল থেকে হাদীসটি এরূপ শুনেছেন। আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি
যে, আমি আবূ সা’ঈদ খুদ্রী (রাঃ) - কে এ হাদীসে অতিরিক্ত বলতে শুনেছি যে, নবী (সাল্লালাহু
‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন বলবেনঃ এরা তো আমারই অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয় জানেন
না যে, আপনার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কি পরিবর্তন করেছে (নতুন নতুন ধর্মীয় নিয়ম, যা
আপনি করতে বলেননি) । এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে, তারা (বিদআতী পির-অলি
ও আলেম) দূর হোক, দূর হোক। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭০৫০-৭০৫১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
ভন্ড পির-অলি ও বিদআতী আলেমদের তওবাও কবুল হয় না যতক্ষণ না---
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত রাখেন (গ্রহণ করেন না),
যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার বিদআত বর্জন না করেছে।” (ত্বাবারানীর
আওসাত্ব ৪২০২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৯৪৫৭, সহীহ তারগীব ৫৪নং)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।
৭৩টি দলের মধ্যে ১টি দল জান্নাতী। সেই জান্নাতী দল কোনটি?
(ক) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহূদী জাতি একাত্তর ফেরকায় (উপদলে)
বিভক্ত হয়েছে এবং আমার উম্মাত তিয়াত্তর ফেরকায় বিভক্ত হবে। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৯১, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৬৪০, সুনান
আবূ দাউদ (তাহকিককৃত) ৪৫৯৬, আহমাদ ২৭৫১০, রাওদুন নাদীর ৫০, সহীহাহ ২০৩, আত-তালীক আলাত
তানকীল ২/৫৩)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
(খ) আওফ ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহূদী জাতি একাত্তর ফেরকায়
বিভক্ত হয়েছে। তার মধ্যে একটি ফেরকা জান্নাতী এবং অবশিষ্ট সত্তর ফেরকা জাহন্নামী। খৃস্টানরা
বাহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছে। তার মধ্যে একাত্তর ফেরকা জাহান্নামী এবং একটি ফেরকা
জান্নাতী। সেই মহান সত্তার শপথ যাঁর হতে মুহাম্মাদের প্রাণ! অবশ্যই আমার উম্মাত তিয়াত্তর
ফেরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে একটি মাত্র ফেরকা হবে জান্নাতী এবং অবশিষ্ট বাহাত্তরটি
হবে জাহান্নামী। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ফেরকাটি জান্নাতী। তিনি বলেনঃ জামাআত
(একতাবদ্ধ দলটি)। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৯২, আয-যিলাল ৬৩, সহীহাহ
১৪৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(গ)
আনাস মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ বনী ইসরাঈল একাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মাত বাহাত্তর ফেরকায়
বিভক্ত হবে। একটি ফেরকা ব্যতীত সকলেই হবে জাহান্নামী। সেটি হচ্ছে জামাআত। (সুনান ইবনু মাজাহ ৩৯৯৩, আহমাদ ১১৭৯৮, ১২০৭০, আয-যিলাল ৬৪, সহীহাহ
২০৪, ১৪৯২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতের
ওপর এমন একটি সময় আসবে যেমন বনী ইসরাঈলের ওপর এসেছিল। যেমন এক পায়ের জুতা অপর পায়ের
জুতার ঠিক সমান হয়। এমনকি বনী ইসরাঈলের মধ্যে যদি কেউ তার মায়ের সাথে প্রকাশ্যে কুকর্ম
করে থাকে, তাহলে আমার উম্মাতের মধ্যেও এমন লোক হবে যারা অনুরূপ কাজ করবে। আর বনী ইসরাঈল
৭২ ফিরক্বায় (দলে) বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমার উম্মাত বিভক্ত হবে ৭৩ ফিরক্বায়। এদের মধ্যে
একটি ব্যতীত সব দলই জাহান্নামে যাবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! জান্নাতী
দল কারা? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যার ওপর আমি ও আমার
সাহাবীগণ প্রতিষ্ঠিত আছি, যারা তার উপর থাকবে। (মিশকাতুল
মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭১, সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ২৬৪১, সহীহুল জামি‘ ৫৩৪৩)। হাদিসের
মানঃ সহিহ/যঈফ [মিশ্রিত]।
জান্নাতী দলের পরিচয়
যে দলটি জান্নাতে যাবে তাদের পরিচয় সম্পর্কে
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আজকের দিনে আমি ও আমার ছাহাবীগণ যে নীতির উপরে আছি, তার অনুসারী
দল। (হাকেম ১/১২৯)।
মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত।
তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাব বাহাত্তর দলে বিভক্ত
হয়েছে এবং এ উম্মত অদূর ভবিষ্যতে তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে বাহাত্তর দল জাহান্নামে
যাবে এবং একটি জান্নাতে যাবে। আর সে দল হচ্ছে আল-জামা’আত। ইবনু ইয়াহইয়া ও আমর (রহঃ)
বলেন, ’’বিষয়টি হলো, আমার উম্মাতের মধ্যে এমন এমন দলের আর্বিভাব ঘটবে যাদের সর্বশরীরে
(বিদ’আতের) প্রবৃত্তি এমনভাবে অনুপ্রবেশ করবে যেমন পাগলা কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্ক রোগীর
সর্বশরীরে সঞ্চারিত হয়। (সুনান আবূ দাউদ (আলবানী একাডেমী)
৪৫৯৭, আহমাদ, হাকিম, ইবনু আবূ আসিম ‘আস-সুন্নাহ)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আহমাদ ও আবূ দাঊদে মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)হতে (কিছু
পার্থক্যের সাথে) বর্ণনা করেন যে, ৭২ দল জাহান্নামে যাবে। আর একটি দল জান্নাতে যাবে।
আর সে দলটি হচ্ছে জামা’আত। আর আমার উম্মাতের মধ্যে কয়েকটি দলের উদ্ভব হবে যাদের শরীরে
এমন কুপ্রবৃত্তি (বিদ্’আত) ছড়াবে যেমনভাবে জলাতংক রোগ রোগীর সমগ্র শরীরে সঞ্চারণ করে।
তার কোন শিরা-উপশিরা বাকি থাকে না, যাতে তা সঞ্চার করে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭২, আহমাদ ১৬৪৯০, আবূ দাঊদ ৪৫৯৭, সহীহুত্
তারগীব ৫১)। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
এঁদের বাহ্যিক পরিচয় হলো,
(১) তারা সর্বদা হক-এর উপরে জামা‘আতবদ্ধ থাকবে।
(সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৪৯২),
(২) তারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মিটে যাওয়া
সুন্নাতগুলো জীবিত করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭০,
সুনান আততিরমিযী ২৬৩০),
(৩) তারা নবী (ছাঃ) এবং তাঁর ছাহাবীগণের বৈশিষ্ট্যের
উপর অটল থাকবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭১, সুনান তিরমিযী
২৬৪১, সহীহুল জামি‘ ৫৩৪৩)।
উক্ত দলিলগুলোর প্রেক্ষিতে এটাই প্রমাণিত যে,
যারা রাসুল সা. ও সাহাবাগণের নীতির উপর অটল থাকবে তথা সুন্নাহসশূহ মেনে চলবে এবং বিদআত,
কুফর, নিফাক ও শিরক পরিহার করে চলবে তারাই হবে সেই মুক্তিপ্রাপ্ত দল। আমাদের দেশে আহলে
সুন্নাত ওয়াল জামাত দাবীকারী একদল সুন্নী যারা বিদআত, কুফর, নিফাক ও শিরক এ নিমজ্জিত
তারা নাকি জান্নাতী দল। বিষয়টি হাস্যকর। তেমনি কোনো পীর-অলি, সুফি-সাধক, দরবেশ এরা
কোনোক্রমেই হাদিসে বর্ণিত জামায়াত নয়। কারণ এরা প্রকাশ্যে বিদআত, কুফর, নিফাক ও শিরক
এ নিমজ্জিত। এরা রাসুল সা. ও সাহাবাগণের সুন্নাহর অনুসারী দল নয়। আর সেজন্যে এদের অনুসারী
হওয়া যাবে না।
আমরা কোন্ তরিকা মানবো? রাসুল সা. এর তরিকা নাকি পিরের তরিকা?
ইসলামের সঠিক পথ বা 'সিরাতাল মুস্তাকিম' হলো
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যে ব্যক্তি
ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো পথে চলবে, সে সঠিক পথ হারা হয়ে যাবে এবং বিপদগামী হবে।
'সিরাতাল মুস্তাকিম’ পথটি হচ্ছে দ্বীন ইসলামের
পথ, যা দিয়ে আল্লাহ্ তাআলা সমস্ত রাসূল প্রেরণ করেছেন, যার জন্যেই সমস্ত কিতাব নাযিল
করেছেন, যে দ্বীন ব্যতীত আল্লাহ্ অন্য কোন দ্বীন কবুল করবেন না, যে দ্বীনের পথে না
চললে কেউ নাজাত পাবে না। যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য পথে চলবে, সে সঠিক পথ হারা হয়ে
যাবে এবং বিপদগামী হবে।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ
‘‘এটিই আমার সঠিক পথ। সুতরাং তোমরা এই সঠিক
পথের অনুসরণ কর। অন্যান্য পথের দিকে গমণ করোনা। তাহলে সে সব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর সঠিক
পথ হতে বিপদগামী করে দিবে। (সূরা আনআমঃ ১৫৩)।
আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীছে
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতের ব্যাখ্যা অতি সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেনঃ
‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের
সামনে মাটিতে একটি রেখা টানলেন। সে রেখার উপর হাত রেখে বললেন, এটি হল আল্লাহর পথ। অতঃপর
সে রেখার ডানে ও বামে আরো অনেক গুলো রেখা অঙ্কন করে বললেন, এ সবগুলোই পথ। তবে এ সব
পথের মাথায় একটি করে শয়তান দাঁড়িয়ে আছে। সে সদাসর্বদা মানুষকে ঐ পথের দিকে আহবান করছে।
(মিসকাতুল মাশাবিহ ১৬৬, আহমাদ ৪১৩১, নাসায়ী তাঁর ‘কুবরা’
গ্রন্থে ১১১৭৪, দারিমী ২০২)। হাদিসের মান সহিহ।
একথা বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেনঃ
‘‘এটিই আমার সঠিক পথ। সুতরাং তোমরা এই সঠিক
পথের অনুসরণ কর। অন্যান্য পথের অনুসরণ করনা। তাহলে সে সব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর সঠিক
পথ হতে বিপদগামী করে দিবে’’। (সূরা আনআমঃ ১৫৩)।
অন্য এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ তাআলা সীরাতুল মুস্তাকীম তথা সঠিক পথের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন।
মনে করুন একটি সোজা পথ। পথের উভয় পাশে রয়েছে দু’টি প্রাচীর। পথের দুই পাশের প্রাচীরের
দরজাগুলো খোলা রয়েছে। দরজাগুলোর উপর পর্দা ঝুলন্ত আছে। সোজা রাস্তার দরজার মুখে একজন
আহবানকারী ডেকে বলছেঃ হে লোক সকল! তোমরা সকলেই সোজা পথে প্রবেশ কর। এদিক সেদিক যেয়ো
না। আর একজন আহবানকারী রাস্তার উপর থেকে আহবান করছে। কোন মানুষ যখন দুই পাশের প্রাচীরের
দরজাগুলোর কোন একটি দরজা খুলতে চায়, তখন সেই আহবানকারী ডেকে বলতে থাকেঃ অমঙ্গল হোক
তোমার! দরজা খুলো না। কেননা তুমি যখন উহা খুলবে তখন তাতে প্রবেশ করবে। উপরোক্ত উপমার
মধ্যে সোজা পথটি ইসলাম। প্রাচীর দু’টি হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। উন্মুক্ত
দরজাগুলো হচ্ছে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্ত্তসমূহ। রাস্তার মাথায় আহবানকারীটি হচ্ছে আল্লাহর
কিতাব। রাস্তার উপরের আহবানকারীটি হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ হতে একজন নসীহতকারী, যা প্রত্যেক
মুসলিমের অন্তরে বিদ্যমান। (মুসনাদে আহমাদ, (৪/১৮২), হাকেম,
(১/৭৩)। হাকেম বলেনঃ হাদীছটি ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ)।
আল্লাহ (সুব:) আরো বলেন:
অর্থ: “আর সঠিক পথ বাতলে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব,
এবং পথের মধ্যে কিছু আছে বক্র। আর তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদের সকলকে হিদায়াত
করতেন।” (সুরা নহল ১৬:৯)।
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন,
“হে নবি বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না কোন কোন লোক নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ?
এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত লোক যারা ইহকালের জীবনে ভ্রান্ত পথে চলে এবং মনে করে যে তারা ঠিক
পথ ধরেই চলেছে। এরা তারাই, যারা তাদের প্রতিপালক প্রভুর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকার
করেছে এবং তার দরবারে প্রত্যাবর্তনের প্রতি অবিশ্বাস পোষন করে। এ জন্যে তাদের সকল আমল
নষ্ট হয়ে গেছে এবং কিয়ামতের দিন তাদের কোনই গুরত্ব থাকবে না। তারা যে কুফরী করেছিলো
আর আমার আয়াত ও রাসুলগণের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ
করতো তার প্রতি দানে তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে”। (সুরা
কাহাফঃ ১০৩-১০৫)।।
অতএব রাসুল সা. এর তরিকা বা পথ ব্যতীত অন্য
কোনো পথ মত (পির, অলি, গাউস, কুতুবদের বানানো পথ, মত বা তরিকা) যারা মেনে নিবে তাদের
থেকে তা কবুল করা হবে না এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।
আল্লাহ তাঁয়ালা আরও বলেন,
"যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন
(পথ, মত, আইন, পীর-আওলিয়াদের তরিকা) অবলম্বন করতে চাইবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা
হবে না। আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)।
আমাদের করণীয়ঃ
আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ
“আর যারা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা
ঐ সমস্ত লোকের সাথে থাকবে, যাদের উপর আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নবীগণ, সত্যবাদীগণ,
শহীদগণ এবং সৎকর্মশীলগণের সাথে থাকবেন। কতই না উত্তম বন্ধু তারা”। (সূরা নিসাঃ ৬৯)।
এই আয়াতে যেসমস্ত নেয়ামতপ্রাপ্ত লোকদের কথা
বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, সূরা ফাতিহায় তাদেরকে সরল পথের অনুসারী হিসাবে আখ্যায়িত
করা হয়েছে।
আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ
“আমাদেরকে সরল সঠিক পথ দেখাও। সে সমস্ত লোকের
পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের উপর তোমার গযব নাযিল হয়েছে এবং
যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে”। (সূরা ফাতিহাঃ ৬-৭)।
পৃথিবীতে বান্দার জন্যে সবচেয় বড় নেয়ামত হচ্ছে,
সীরাতে মুস্তাকীমের সন্ধান পাওয়া এবং গোমরাহীর পথ হতে পরিত্রাণ পাওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মাতকে এই সীরাতে মুস্তাকীমের উপরই রেখে গেছেন।
তিনি বলেনঃ
“আমি তোমাদেরকে একটি উজ্জ্বল পথে রেখে যাচ্ছি,
যাতে রাত দিনের মতই। অর্থাৎ তাতে কোন প্রকার অন্ধকার এবং অস্পষ্টতা নেই। আমার পরে বদনসীব
ব্যতীত অন্য কেউ তা থেকে দূরে থাকতে পারে না”। (মুসনাদে আহমাদ।
ইমাম আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন। হাদীছ নং ৯৩৭)।
রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:
মালিক ইবনু আনাস (রাঃ) (রহঃ) হতে মুরসালরূপে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের
মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ
পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৮৬, মুয়াত্ত্বা মালিক ১৫৯৪)। হাদিসের
মানঃ হাসান (Hasan)।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেনঃ আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে। তারা বললেন,
কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেনঃ যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর
যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ
পাবলিকেশন) ৭২৮০, সহিহ আল জামী ৪৫১৩, আহমদ ৮৭২৮, সহীহাহ ৩১৪১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৭১,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৮৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
ইরবায ইবনু সারিয়াহ্] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সালাত আদায় করালেন। অতঃপর আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে গেলেন। আমাদের উদ্দেশে এমন মর্মস্পর্শী নাসীহাত করলেন যাতে আমাদের চোখ গড়িয়ে পানি বইতে লাগল। অন্তরে ভয় সৃষ্টি হলো মনে হচ্ছিল বুঝি উপদেশ দানকারীর যেন জীবনের এটাই শেষ উপদেশ। এক ব্যক্তি আবেদন করলো, হে আল্লাহর রসূল! আমাদেরকে আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার, (ইমাম বা নেতার) আদেশ শোনার ও (তাঁর) অনুগত থাকতে উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে হাবশী (কৃষ্ণাঙ্গ) গোলাম হয়। আমার পরে তোমাদের যে ব্যক্তি বেঁচে থাকবে সে অনেক মতভেদ দেখবে। এমতাবস্থায় তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নাতকে ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ি রাশিদীনের সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধরা এবং এ পথ ও পন্থার উপর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দীনের ভেতরে নতুন নতুন কথার (বিদ্’আত) উদ্ভব ঘটানো হতে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রত্যেকটা নতুন কথাই [বা কাজ শারী’আতে আবিষ্কার করা যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ করেননি তা] বিদ্’আত এবং প্রত্যেকটা বিদ্’আতই ভ্রষ্টতা। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ) কিন্তু এ বর্ণনায় তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ সালাত আদায়ের কথা উল্লেখ করেননি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৫, আহমাদ ১৬৬৯৪, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৭, সুনান আততিরমিযী ২৬৭৬, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এসব ভ্রান্ত পীরদের ভন্ডামী
থেকে আমাদের দেশের সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান ও আমলকে হিফাযত করুন। আমীন।
উক্ত বইয়ের দ্বিতীয় অংশ দেখতে এখানে ক্লিক করুন- (দ্বিতীয় অংশ)
রিলেটেড আরও বিষয় জানতে এদের উপর ক্লিক করুন,
(ক) পিরতন্ত্র বা সুফিবাদ বনাম ইসলাম-(শয়তানেরওহী কার উপর নাযিল হয়?)।
(খ) পির-অলিদের ভ্রান্ত আক্বিদাহসমূহ।
কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।
Author and compiler:
Md. Izabul Alam-M.A., C.In. Ed. (Islamic Studies-Rangpur
Carmichael University College, Rangpur), prominent Islamic thinker, researcher,
writer and Blogger.
(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)
(2) GENERAL DIRECTOR- PURE MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER
(PMMRC),
(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS Coaching (BBC)
(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING INSTITUTE (PTI)
(5) PRINCIPAL- BANGLADESH ONLINE UNIVERSITY (BOU)
(6) GENERAL DIRECTOR AND CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION
SERVICES (PIS)
(7) EDITOR-BDC CRIME NEWS24
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক
বইয়ের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য
করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন।
এজন্যে আপনি বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।
(ক) আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত,
মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে
এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।
(খ) তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর কি
হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের
মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।
(গ) আবূ
হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ
সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে
না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু
গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের
মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে
কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই
তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮, রিয়াদুস
সলেহিন, হাদিস নং ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(ঙ) জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে
বর্ণিত।
তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলামে যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ চালু করলো সে এ চালু করার
সাওয়াব তো পাবেই, তার পরের লোকেরা যারা এ নেক কাজের উপর ’আমল করবে তাদেরও সমপরিমাণ
সাওয়াব সে পাবে। অথচ এদের সাওয়াব কিছু কমবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির
প্রচলন করলো, তার জন্য তো এ কাজের গুনাহ আছেই। এরপর যারা এ মন্দ রীতির উপর ’আমল করবে
তাদের জন্য গুনাহও তার ভাগে আসবে, অথচ এতে ’আমলকারীদের গুনাহ কম করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২১০, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২২৪১,
আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।
(চ) আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ)
হতে বর্ণিত।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, যে ব্যক্তি কাউকে কোন কল্যাণের দিকে পথপ্রদর্শন করে, সে উক্ত কার্য সম্পাদনকারীর
সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ২০৯, সহীহ
মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৭৯৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৭৪৬,
ইসলামিক সেন্টার ৪৭৪৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

No comments:
Post a Comment