Friday, August 2, 2019

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত কেনো?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত কেনো?

সংজ্ঞাঃ

‘জন্মের সময়কাল’কে আরবীতে ‘মীলাদ’ বা  ‘মাওলিদ’ বলা হয়। সে হিসাবে ‘মীলাদুন্নবী’-র অর্থ দাঁড়ায় ‘নবীর জন্ম মুহূর্ত’। নবীর জন্মের বিবরণ, কিছু ওয়ায ও নবীর রূহের আগমন কল্পনা করে তার সম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে ‘ইয়া নাবী সালামু আলায়কা’ বলা ও সবশেষে জিলাপী বিতরণ- এই সব মিলিয়ে ‘মীলাদ মাহফিল’ ইসলাম প্রবর্তিত ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুল আযহা’ নামক দু’টি বার্ষিক ঈদ উৎসবের বাইরে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নামে তৃতীয় আরেকটি ধর্মীয় (?) অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

উৎপত্তিঃ

ক্রুসেড বিজেতা মিসরের সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী (৫৩২-৫৮৯ হিঃ) কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের ‘এরবল’ এলাকার গভর্ণর আবু সাঈদ মুযাফফরুদ্দীন কুকুবুরী (৫৮৬-৬৩০ হিঃ) সর্বপ্রথম কারো মতে ৬০৪ হিঃ ও কারো মতে ৬২৫ হিজরীতে মীলাদের প্রচলন ঘটান রাসূলের মৃত্যুর ৫৯৩ বা ৬১৪ বছর পরে। এই দিন তারা মীলাদুন্নবী উদযাপনের নামে চরম স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হ’তেন। গভর্ণর নিজে তাতে অংশ নিতেন। (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (দারুল ফিকর, ১৯৮৬) পৃঃ ১৩/১৩৭)।

আর এই অনুষ্ঠানের সমর্থনে তৎকালীন আলেম সমাজের মধ্যে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন আবুল খাত্ত্বাব ওমর বিন দেহিইয়াহ (৫৪৪-৬৩৩ হিঃ)। তিনি মীলাদের সমর্থনে বহু জাল ও বানাওয়াট হাদীছ জমা করেন।

হুকুমঃ

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছে যা এতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৪০. সহিহ বুখারী ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম ১৭১৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৬, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৪, আহমাদ ২৬০৩৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ২৬, ইরওয়া ৮৮, সহীহ আল জামি‘ ৫৯৭০, সহীহাহ্ ২৩০২, সহীহ আত্ তারগীব ৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছে যা এতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৪০, সহিহ বুখারী ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম ১৭১৮, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৬, সুনান ইবনু মাজাহ্ ১৪, আহমাদ ২৬০৩৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ২৬, ইরওয়া ৮৮, সহীহ আল জামি‘ ৫৯৭০, সহীহাহ্ ২৩০২, সহীহ আত্ তারগীব ৪৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অতঃপর নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দীনে (মনগড়াভাবে) নতুন জিনিস সৃষ্টি করা এবং (এ রকম) সব নতুন সৃষ্টিই গুমরাহী (পথভ্রষ্ট)। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৪১, সহিহ মুসলিম ৮৬৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ১০, সহীহ আত্ তারগীব ৫০, বুলূগুল মারাম ৪৪৮, দারেমী ২০৬, ইবনু মাজাহ্ ৪৫, নাসায়ী ১৫৭৮, সহীহ ইবনু খুযাইমাহ্ ১৭৮৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

বিলাল ইবনু হারিস আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার কোন একটি সুন্নাতকে যিন্দা করেছে, যে সুন্নাত আমার পরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, তার এত সাওয়াব হবে যত সাওয়াব এ সুন্নাত ’আমলকারীদের হবে, কিন্তু সুন্নাতের উপর ’আমলকারীদের সাওয়াবে কোন অংশ হ্রাস করা হবে না। আর যে ব্যক্তি গুমরাহীর নতুন (বিদ্’আত) পথ সৃষ্টি করবে, যাতে আল্লাহ ও তাঁর রসূল রাযী-খুশী নন, তার জন্য সে সকল লোকের গুনাহ চাপিয়ে দেয়া হবে, যারা তার সাথে ’আমল করবে, অথচ তাদের গুনাহের কোন অংশ হ্রাস করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৮, সুনান আততিরমিযী ২৬৭৭, সুনান ইবনু মাজাহ্ ২১০)।

ইরবায ইবনু সারিয়াহ্] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করালেন। অতঃপর আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে গেলেন। আমাদের উদ্দেশে এমন মর্মস্পর্শী নাসীহাত করলেন যাতে আমাদের চোখ গড়িয়ে পানি বইতে লাগল। অন্তরে ভয় সৃষ্টি হলো মনে হচ্ছিল বুঝি উপদেশ দানকারীর যেন জীবনের এটাই শেষ উপদেশ। এক ব্যক্তি আবেদন করলো, হে আল্লাহর রসূল! আমাদেরকে আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার, (ইমাম বা নেতার) আদেশ শোনার ও (তাঁর) অনুগত থাকতে উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে হাবশী (কৃষ্ণাঙ্গ) গোলাম হয়। আমার পরে তোমাদের যে ব্যক্তি বেঁচে থাকবে সে অনেক মতভেদ দেখবে। এমতাবস্থায় তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নাতকে ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ি রাশিদীনের সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধরা এবং এ পথ ও পন্থার উপর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দীনের ভেতরে নতুন নতুন কথার (বিদ্’আত) উদ্ভব ঘটানো হতে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রত্যেকটা নতুন কথাই [বা কাজ শারী’আতে আবিষ্কার করা যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ করেননি তা] বিদ্’আত এবং প্রত্যেকটা বিদ্’আতই ভ্রষ্টতা। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ) কিন্তু এ বর্ণনায় তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ সালাত আদায়ের কথা উল্লেখ করেননি। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৬৫, আহমাদ ১৬৬৯৪, সুনান আবূ দাঊদ ৪৬০৭, সুনান আততিরমিযী ২৬৭৬, সুনান ইবনু মাজাহ্ ৪২)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

আহমাদ ও আবূ দাঊদে মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)হতে (কিছু পার্থক্যের সাথে) বর্ণনা করেন যে, ৭২ দল জাহান্নামে যাবে। আর একটি দল জান্নাতে যাবে। আর সে দলটি হচ্ছে জামা’আত। আর আমার উম্মাতের মধ্যে কয়েকটি দলের উদ্ভব হবে যাদের শরীরে এমন কুপ্রবৃত্তি (বিদ্’আত) ছড়াবে যেমনভাবে জলাতংক রোগ রোগীর সমগ্র শরীরে সঞ্চারণ করে। তার কোন শিরা-উপশিরা বাকি থাকে না, যাতে তা সঞ্চার করে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৭২, আহমাদ ১৬৪৯০, সুনান আবূ দাঊদ ৪৫৯৭, সহীহুত্ তারগীব ৫১)।  হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।

ইমাম মালেক (রহঃ) স্বীয় ছাত্র ইমাম শাফেঈকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীদের সময়ে যেসব বিষয় ‘দ্বীন’ হিসাবে গৃহীত ছিল না, বর্তমান কালেও তা ‘দ্বীন’ হিসাবে গৃহীত হবে না। যে ব্যক্তি ধর্মের নামে ইসলামে কোন নতুন প্রথা চালু করল, অতঃপর তাকে ভাল কাজ বা ‘বিদ‘আতে হাসানাহ’ বলে রায় দিল, সে ধারণা করে নিল যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) স্বীয় রিসালাতের দায়িত্ব পালনে খেয়ানত করেছেন’। (আল-ইনছাফ, পৃঃ ৩২)।

মীলাদ বিদ‘আত হওয়ার ব্যাপারে চার মাযহাবের ঐক্যমত

‘আল-ক্বাওলুল মু‘তামাদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, চার মাযহাবের সেরা বিদ্বানগণ সর্বসম্মতভাবে প্রচলিত মীলাদ অনুষ্ঠান বিদ‘আত হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তাঁরা বলেন, এরবলের গভর্ণর কুকুবুরী এই বিদ‘আতের হোতা। তিনি তার আমলের আলেমদেরকে মীলাদের পক্ষে মিথ্যা হাদীছ তৈরী করার ও ভিত্তিহীন ক্বিয়াস করার হুকুম জারী করেছিলেন।

উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামঃ

মুজাদ্দিদে আলফে ছানী শায়খ আহমাদ সারহিন্দী, আল্লামা হায়াত সিন্ধী, রশীদ আহমাদ গাংগোহী, আশরাফ আলী থানভী, মাহমূদুল হাসান দেউবন্দী, আহমাদ আলী সাহারানপুরী প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম ছাড়াও আহলেহাদীছ বিদ্বানগণ সকলে এক বাক্যে প্রচলিত মীলাদ অনুষ্ঠানকে বিদ‘আত ও গুনাহের কাজ বলেছেন।

মৃত্যু দিবসে জন্মবার্ষিকীঃ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব মতে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঠিক জন্মদিবস হয় ৯ই রবীউল আউয়াল সোমবার। ১২ রবীউল আউয়াল সোমবার ছিল তাঁর মৃত্যুদিবস। অথচ ১২ রবীউল আউয়াল রাসূলের মৃত্যুদিবসেই তাঁর জন্মবার্ষিকী বা ‘মীলাদুন্নবী’র অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।

একটি সাফাইঃ

মীলাদ উদযাপনকারীরা বলে থাকেন যে, মীলাদ বিদ‘আত হ’লেও তা ‘বিদ‘আতে হাসানাহ’। অতএব জায়েয তো বটেই বরং করলে ছওয়াব আছে। কারণ এর মাধ্যমে মানুষকে কিছু বক্তব্য শুনানো যায়। উত্তরে বলা চলে যে, ছালাত আদায় করার সময় পবিত্র দেহ-পোষাক, স্বচ্ছ নিয়ত সবই থাকা সত্তেবও ছালাতের স্থানটি যদি কবরস্থান হয়, তাহ’লে সে ছালাত কবুলযোগ্য হয় না। কারণ এরূপ স্থানে ছালাত আদায় করতে আল্লাহর নবী (ছাঃ) নিষেধ করেছেন। রাসূল (ছাঃ)-এর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছালাত আদায়ে কোন ফায়দা হবে না।

তেমনি বিদ‘আতী অনুষ্ঠান করে নেকী অর্জনের স্বপ্ন দেখা অসম্ভব। হাড়ি ভর্তি গো-চেনায় এক কাপ দুধ ঢাললে যেমন পানযোগ্য থাকে না, তেমনি সৎ আমলের মধ্যে সামান্য শিরক-বিদ‘আত সমস্ত আমলকে বরবাদ করে দেয়। সেখানে বিদ‘আতকে ভাল ও মন্দ দুই ভাগে ভাগ করা যে আরেকটি গোমরাহী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ক্বিয়াম প্রথাঃ

সপ্তম শতাব্দী হিজরীতে মীলাদ প্রথা চালু হওয়ার প্রায় এক শতাব্দীকাল পরে আল্লামা তাক্বিউদ্দীন সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হিঃ) কর্তৃক ক্বিয়াম প্রথার প্রচলন ঘটে বলে কথিত আছে। (আবু ছাঈদ মোহাম্মাদ, মিলাদ মাহফিল (ঢাকা ১৯৬৬), পৃঃ ১৭)।

তবে এর সঠিক তারিখ ও আবিষ্কর্তার নাম জানা যায় না।

এদেশে দু’ধরনের মীলাদ চালু আছে। একটি ক্বিয়ামযুক্ত, অন্যটি ক্বিয়াম বিহীন। ক্বিয়ামকারীদের যুক্তি হ’ল, তারা রাসূলের ‘সম্মানে’ উঠে দাঁড়িয়ে থাকেন। এর দ্বারা তাদের ধারণা যদি এই হয় যে, মীলাদের মাহফিলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রূহ মুবারক হাযির হয়ে থাকে, তবে এই ধারণা সর্বসম্মতভাবে কুফরী। হানাফী মাযহাবের কিতাব ‘ফাতাওয়া বাযযারিয়া’তে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, মৃত ব্যক্তিদের রূহ হাযির হয়ে থাকে, সে ব্যক্তি কাফের’। (মীলাদে মুহাম্মাদী পৃঃ ২৫, ২৯)।

অনুরূপভাবে ‘তুহফাতুল কুযাত’ কিতাবে বলা হয়েছে, ‘যারা ধারণা করে যে, মীলাদের মজলিসগুলিতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রূহ মুবারক হাযির হয়ে থাকে, তাদের এই ধারণা স্পষ্ট শিরক’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় তাঁর সম্মানার্থে উঠে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ধম্কি প্রদান করেছেন।

হাদিসঃ

মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার মনের অভিলাষ এই যে, মানুষ তার সম্মুখে মূর্তির মতো দণ্ডায়মান থাকুক, সে যেন জাহান্নামকে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৬৯৯, সুনান আবূ দাঊদ ৫২২৯, সুনান আততিরমিযী ২৭৫৫, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১৬১৭৬, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৫৮২, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৪২০৮, শু‘আবুল ঈমান ৮১৬০, আহমাদ ১৬৯১৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৩৫৭, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ২৭১৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

অথচ মৃত্যুর পর তাঁরই কাল্পনিক রূহের সম্মানে দাঁড়ানোর উদ্ভট যুক্তি ধোপে টেকে কি?

মীলাদ অনুষ্ঠানে প্রচারিত বানাওয়াট হাদীছ ও গল্পসমূহঃ

(১) ‘(হে মুহাম্মাদ!) আপনি না হ’লে আসমান-যমীন কিছু্ সৃষ্টি করতাম না’। (দায়লামী, সিলসিলা যঈফাহ হা/২৮২)।

(২) ‘আমি আল্লাহর নূর হতে সৃষ্ট এবং মুমিনগণ আমার নূর হতে’।

(৩) ‘নূরে মুহাম্মাদী’ হ’তেই আরশ-কুরসী, বেহেশত-দোযখ, আসমান-যমীন সব কিছু সৃষ্টি হয়েছে’।

(৪) ‘আদম সৃষ্টির সত্তর হাযার বছর পূর্বে আল্লাহ পাক তাঁর নূর হ’তে মুহাম্মাদের নূরকে সৃষ্টি করে আরশে মু‘আল্লায় লটকিয়ে রাখেন’।

(৫) ‘আদম সৃষ্টি হয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে জ্যোতির্ময় নক্ষত্ররূপে মুহাম্মাদের নূর অবলোকন করে মুগ্ধ হন’।

(৬) ‘মে‘রাজের সময় আল্লাহ পাক তাঁর নবীকে জুতা সহ আরশে আরোহন করতে বলেন, যাতে আরশের গৌরব বৃদ্ধি পায়’ (নাঊযুবিল্লাহ)।

(৭) রাসূলের জন্মের খবরে খুশী হয়ে আঙ্গুল উঁচু করার কারণে ও সংবাদ দান কারিণী দাসী ছুওয়াইবাকে মুক্ত করার কারণে জাহান্নামে আবু লাহাবের হাতের মধ্যের দু’টি আঙ্গুল পুড়বে না। এছাড়াও প্রতি সোমবার রাসূলের (ছাঃ) জন্ম দিবসে জাহান্নামে আবু লাহাবের শাস্তি মওকূফ করা হবে বলে হযরত আববাস (রাঃ)-এর নামে প্রচলিত তাঁর কাফের অবস্থার একটি স্বপ্নের বর্ণনা।

(৮) মা আমেনার প্রসবকালে জান্নাত হ’তে বিবি মরিয়ম, বিবি আসিয়া, মা হাজেরা সকলে দুনিয়ায় নেমে এসে সবার অলক্ষ্যে ধাত্রীর কাজ করেন।

(৯) নবীর জন্ম মুহূর্তে কা‘বার প্রতিমাগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে, রোমের অগ্নি উপাসকদের ‘শিখা অনির্বাণ’গুলো দপ করে নিভে যায়। বাতাসের গতি, নদীর প্রবাহ, সূর্যের আলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ইত্যাদি...।

উপরের বিষয়গুলি সবই বানাওয়াট। দেখুন : মওযূ‘আতে কাবীর প্রভৃতি। মীলাদ উদযাপনকারী ভাইদের এই সব মিথ্যা ও জাল হাদীছ বর্ণনার দুঃসাহস দেখলে শরীর শিউরে ওঠে। যেখানে আল্লাহর নবী (ছাঃ) হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার নামে মিথ্যা হাদীছ রটনা করে, সে জাহান্নামে তার ঘর তৈরী করুক’।

হাদিসঃ

আবদুল্লাহ্ ইবনু’য্-যুবায়র (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতা যুবায়রকে বললামঃ আমি তো আপনাকে অমুক অমুকের মত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেনঃ ‘জেনে রাখ, আমি তাঁর থেকে দূরে থাকিনি, কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নিবে (এজন্য হাদীস বর্ণনা করি না)।’ (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ১০৭, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১০৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।  

তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কর না, যেভাবে নাছারাগণ ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেছে।... বরং তোমরা বল যে, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল’।

হাদিসঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ‘উমার (রাঃ)-কে মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন যে, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ‘ঈসা মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ) ৩৪৪৫, ২৪৬২, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩১৯০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১৯৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

যেখানে আল্লাহপাক এরশাদ করছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই, তার পিছনে ছুটো না। নিশ্চয়ই তোমার কান, চোখ ও বিবেক সবকিছুকে (ক্বিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে’ (বনী ইস্রাঈল ১৭/৩৬)। সেখানে এই সব লোকেরা কেউবা জেনে শুনে কেউবা অন্যের কাছে শুনে ভিত্তিহীন সব কল্পকথা ওয়াযের নামে মীলাদের মজলিসে চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাবতেও অবাক লাগে।

‘নূরে মুহাম্মাদী’র আক্বীদা মূলতঃ অগ্নি উপাসক ও হিন্দুদের অদ্বৈতবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী আক্বীদার নামান্তর। যাদের দৃষ্টিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতে কোন পার্থক্য নেই। এরা ‘আহাদ’ ও ‘আহমাদের’ মধ্যে ‘মীমের’ পর্দা ছাড়া আর কোন পার্থক্য দেখতে পায় না। তথাকথিত মা‘রেফাতী পীরদের মুরীদ হ’লে নাকি মীলাদের মজলিসে সরাসরি রাসূল (ছাঃ)-এর জীবন্ত চেহারা দেখা যায়। এই সব কুফরী দর্শন ও আক্বীদা প্রচারের মোক্ষম সুযোগ হ’ল মীলাদের মজলিসগুলো। বর্তমানে সরকারী রেডিও-টিভিতেও চলছে যার জয়জয়কার। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন- আমীন!

মিলাদ কিয়ামে রাসূলুল্লাহ ()-কি হাযির-নাযির হোন?

বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের শতকরা ৯৫ জনই যেকোনো অনুষ্ঠানে স্থানীয় কিছু আলেম যেমন, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং আশ পাশের লোকজনকে ডেকে নিয়ে মধুর সুরে ছন্দাকারে মিলাদ কিয়াম পাঠ করে থাকে। এরপর জিলাপী বা মিষ্টি বিতরন করা হয়। আবার যিনি মিলাদ কিয়াম করলেন অর্থাৎ ঐসব হুজুরকে কিছু হাদিয়াও দিয়ে থাকে।

আমি নিজে বেশ কয়েকটি পিরের দরবার ঘুরেছি এবং দেখেছি যে, দরবারে এই মিলাদ কিয়াম খুবই গুরুত্বসহকারে পাঠ করা হয়। অনেকে কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় বেহুশ হওয়া ঐ লোকটি পাঁচ ওয়াক্ত সালাতও পড়ে না, পেশাব করে পানিও নেয় না। বাড়ির সব মহিলারা বেপর্দায় চলাফেরা করে। এরকম হাজারো ফরজ ইবাদত আছে সেগুলো তারা পালন করে না। পির বাবায় বলেছে রাসুল (সাঃ) খুশি থাকলে আল্লাহ খুশি থাকবেন। পির বাবা আর মুরিদরা প্রকাশ্যে বলে থাকে মিলাদ কিয়ামে রাসুল (সাঃ) উপস্থিত হোন এবং সালামের জবাব দেন। সবচেয়ে বড় খবর হলো এরা মিলাদ কিয়াম অনুষ্ঠানে রাসুল (সাঃ) কে দেখে থাকেন।

রাসুল (সাঃ) কখন এলেন, কখন গেলেন সব নাকি তারা দেখে। শুধু তাই নয় তারা ডানে বায়ে তাকালে আল্লাহ তায়ালাকেও নাকি দেখে। স্বপ্নে তো ঘন্টায় ঘন্টায় দেখে। আমি এদেরকে বললাম আপনারা সব দেখেন আমি দেখি না কেনো? তারা জবাবে বলে আমার নাকি সে চোখ নেই। অথচ যারা ফরজ , ওয়াজিব ও সুন্নত ইবাদতের ৯৮% মানে না তারা নাকি আল্লাহ ও রাসুল (সাঃ) কে দেখেন। যাই হোক আলোচ্য বিষয় হলো, মিলাদ কিয়ামে রাসুল (সাঃ) উপস্থিত হয় কিনা।

রাসূলুল্লাহ ()-এর ‘ইলমুল গাইব’ ও মীলাদে উপস্থিতির সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি প্রচলিত বানোয়াট কথা যে, তিনি ‘হাযির-নাযির’। হাযির-নাযির দুটি আরবী শব্দ। (حاضر) হাযির অর্থ উপস্থিত ও (ناظر) নাযির অর্থ দর্শক, পর্যবেক্ষক বা সংরক্ষক। ‘হাযির-নাযির’ বলতে বোঝান হয় ‘সর্বত্র বিরাজমান ও সবকিছুর দর্শক’। অর্থাৎ তিনি সদা-সর্বদা সর্বত্র উপস্থিত বা বিরাজমান এবং তিনি সদা সর্বদা সবকিছুর দর্শক। স্বভাবতই যিনি সদাসর্বত্র বিরাজমান ও সবকিছুর দর্শক তিনি সর্বজ্ঞ ও সকল যুগের সকল স্থানের সকল গাইবী জ্ঞানের অধিকারী। কাজেই যারা রাসূলুল্লাহ ()-কে ‘হাযির-নাযির’ দাবি করেন, তাঁরা দাবি করেন যে, তিনি শুধু সর্বজ্ঞই নন, উপরন্তু তিনি সর্বত্র বিরাজমান।

সম্মানিত পাঠক, নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুনঃ

প্রথমত: এ গুণটি শুধু আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ আল্লাহ বারংবার বলেছেন যে, বান্দা যেখানেই থাক্ তিনি তার সাথে আছেন, তিনি বান্দার নিকটে আছেন... ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ ()-এর সম্পর্কে কখনোই ঘুণাক্ষরেও কুরআন বা হাদীসে বলা হয় নি যে, তিনি সর্বদা উম্মাতের সাথে আছেন, অথবা সকল মানুষের সাথে আছেন, অথবা কাছে আছেন, অথবা সর্বত্র উপস্থিত আছেন, অথবা সবকিছু দেখছেন। কুরআনের আয়াত তো দূরের কথা একটি যয়ীফ হাদীসও দ্ব্যর্থহীনভাবে এ অর্থে কোথাও বর্ণিত হয় নি। কাজেই যারা এ কথা বলেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ ()-এর নামে মিথ্যা কথা বলেন। কোনো একটি সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ হাদীসেও বর্ণিত হয় নি যে, তিনি বলেছেন ‘আমি হাযির-নাযির’। অথচ তাঁর নামে এ মিথ্যা কথাটি বলা হচ্ছে। এমনকি কোনো সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা ইমাম কখনোই বলেন নি যে, ‘রাসূলুল্লাহ () হাযির-নাযির’।

দ্বিতীয়ত: কুরআন-হাদীসে বারংবার অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ () ‘ইলমুল গাইব’ বা গোপন জ্ঞানের অধিকারী নন। রাসূলুল্লাহ ()-কে ‘হাযির-নাযির’ বলে দাবি করা উক্ত সকল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আয়াত ও হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধিতা করা।[1]

তৃতীয়ত: আমরা দেখেছি, বিভিন্ন হাদীসে তিনি বলেছেন, উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর কবরে উপস্থিত করা হয়। রাসূলুল্লাহ ()-কে হাযির-নাযির বলে দাবি করার অর্থ দরুদ-সালাম কবরে পৌঁছানোর হাদীসগুলোকে মিথ্যা বলে গণ্য করা। উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর কাছে উপস্থিত হয় না, বরং তিনিই উম্মাতের কাছে উপস্থিত হন!! কাজেই যারা এ দাবিটি করছেন, তাঁরা শুধু রাসূলুল্লাহ ()-এর নামে মিথ্যা বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। উপরন্তু তাঁরা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ -কে মিথ্যাবাদী বলে দাবি করেন, নাঊযু বিল্লাহ! নাঊযু বিল্লাহ!! (সূরা (৪) নিসা: ১৭১ আয়াত, এ বিষয়ক আয়াত ও হাদীসগুলোর জন্য দেখুন গ্রন্থকার রচিত ‘কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃষ্ঠা ১৯৬-২০৭)।

এ সকল মিথ্যার উৎস ও কারণঃ

এখানে পাঠকের মনে প্রশ্ন হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ () এরূপ ইলমুল গাইবের অধিকারী, হাযির-নাযির, ইত্যাদি যখন কোনো হাদীসেই বর্ণিত হয়নি এবং কুরআনেও এভাবে বলা হয়নি, তখন কেন অনেক মানুষ এগুলো বলছেন? তাঁরা কি কিছুই বুঝেন না?

এ বইয়ের পরিসরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। তবে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইলমুল গাইব, হাযির-নাযির ও অন্যান্য বিষয়ে বানোয়াট কথা রাসুলুল্লাহ ()-এর নামে বলার পিছনে দুটি কারণ প্রধান:

প্রথম কারণ: এ বিষয়ক কিছু বানোয়াট কথা বা বিভিন্ন আলিমের কথার উপর নির্ভর করা। পাশাপাশি দ্ব্যার্থবোধক বিভিন্ন আয়াত বা হাদীসের উপর নির্ভর করে সেগুলোকে নিজের মতানুযায়ী ব্যাখ্যা করা। আর এ সকল দ্ব্যর্থবোধক আয়াত ও হাদীসের বিশেষ ব্যাখ্যাকে বজায় রাখতে অগণিত আয়াত ও হাদীসের সুস্পষ্ট অর্থকে বিকৃত করা বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করা।

অতিভক্তির নামে ‘মিথ্যা’ ও মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করতে সত্য ওহীর ‘ব্যাখ্যা’ এ দুটিই ধর্ম বিকৃত করে। খৃস্টধর্মের বিকৃতি এর সুস্পষ্ট নমুনা। আমরা মিথ্যা ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তাওহীদকে শিরকে রূপান্তরিত করার কিছু নমুনা উল্লেখ করেছি। বস্ত্তত সাধু পল ও তাঁর অনুসারীরা তিনটি পর্যায়ে ঈসা (আ)-এর ধর্মকে বিকৃত করেন: (১) ঈসার (আ) নামে অতিভক্তিমূলক কিছু কথা প্রচলন করেন, যা তিনি বলেন নি, এমনকি প্রচলিত ইঞ্জিলের মধ্যে বিদ্যমান তাঁর বক্তব্যেও তা নেই। (২) ঈসা মাসীহের কিছু দ্ব্যর্থবোধক ও অস্পষ্ট কথাকে নিজেদের এ সকল বানোয়াট কথার পক্ষে দলীল হিসেবে পেশ করতে শুরু করেন। (৩) এ সকল মিথ্যা ও ‘দলীল’-এর ভিত্তিতে তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জিলের মধ্যে বিদ্যমান সকল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন কথাগুলো নানারকমের ব্যাখ্যা করে বাতিল করতে থাকেন। আল্লাহ বলেন:

 ‘হে কিতাবীগণ, দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ্ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলো না। মরিয়ম তনয় ঈসা মাসীহ আল্লাহর রাসূল, এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মরিয়মের নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর থেকে (আগত) আত্মা (আদেশ)। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর এবং ‘তিন’ বলো না ...।

অর্থাৎ আল্লাহ যতটুকু বলেছেন ততটুকুই বল। তাকে আল্লাহর ‘কালিমা’ বল; কারণ আল্লাহ তাকে পিতা ছাড়া ‘হও’ বাক্য দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এ থেকে বাড়িয়ে বলো না যে, তিনি আল্লাহর অনাদি-অনন্ত কালাম বা জ্ঞানের মুজাস্সাম বা দেহরূপ। তাঁকে আল্লাহর রূহ বল; কারণ তিনি আল্লাহর সৃষ্ট একটি আত্মা। কিন্তু এ থেকে বাড়িয়ে বলো না যে, যেহেতু তিনি আল্লাহর রূহ কাজেই তিনি আল্লাহর যাতের অংশ ও আল্লাহরই মত জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী। এভাবে আল্লাহকে আল্লাহ (পিতা), কালিমা (পুত্র) ও রূহ (পবিত্র আত্মা) তিন ব্যক্তিতে ভাগ করে ত্রিত্ববাদের শিরকে লিপ্ত হয়ো না।

আল্লাহ তাঁকে ‘আল্লাহর কালিমা’ ও ‘আল্লাহর রূহ’ বলেছেন। প্রচলিত বাইবেলে তিনি আল্লাহকে পিতা বলেছেন, নিজেকে, শিষ্যদেরকে ও সকল মুমিনকে আল্লাহর পুত্র বলেছেন। কিন্তু কখনোই তাঁকে আল্লাহ, আল্লাহর যাতের (সত্তার) অংশ বা ‘তিন আল্লাহর একজন’ বলা হয় নি। অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় আল্লাহর একত্ব, শরীয়ত পালন, ঈসা (আ) আল্লাহর বান্দা, মানুষ, গাইব সম্পর্কে অজ্ঞ, আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কাউকে নাজাত দিতে অক্ষম ইত্যাদি বলা হয়েছে। সাধু পল প্রথমে কিছু অতিভক্তিমূলক মিথ্যা চালু করলেন: ঈসা স্বয়ং আল্লাহ, তিনি আল্লাহর যাতের অংশ, আল্লাহর বাক্যের মুজাস্সাম বা দেহরূপ (God Incarnate), তিনি সৃষ্ট নন, বরং জন্ম দেওয়া (ঔরসজাত), তিনি পিতার মতই জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী, মধ্যস্থ ও মুক্তিদাতা, তাকে বিশ্বাস করলে আর শরীয়ত পালন লাগে না... ইত্যাদি। এরপর তাওরাত-ইঞ্জিলের দ্ব্যর্থবোধক কিছু কথার ইচ্ছামাফিক ব্যাখ্যা করে সেগুলিকে ‘দলীল’ হিসেবে পেশ করলেন। এরপর তাদের উদ্ভাবিত ‘মিথ্যা’ ও নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা এ দুটির ভিত্তিতে তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জিলের তাওহীদ ও শরীয়ত বিষয়ক সকল নির্দেশ বাতিল করে দেন। ‘‘কিতাবুল মোকাদ্দস, ইঞ্জিল শরীফ ও ঈসায়ী ধর্ম’’ বইটি পড়লে পাঠক বিস্তারিত জানতে পারবেন।

‘‘কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা’’ নামক বইটি পড়লে পাঠক দেখবেন যে, ইসলামের প্রথম যুগ থেকে যারা বিভ্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যেও একই কারণ বিদ্যমান। খারিজী, শিয়া, কাদারিয়া, জাবারিয়া, মুরজিয়া, মু’তাযিলী ইত্যাদি সকল সম্প্রদায়ই কুরআন-সুন্নাহ মানেন। একটি কারণেই তারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। নিজেদের পছন্দমত কিছু ওহী বহির্ভূত ‘মত’ তৈরি করা, এরপর কুরআন-হাদীসের কিছু দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যকে দলীল হিসেবে পেশ করা। সর্বশেষ এ সকল ‘মত’ ও ‘ব্যাখ্যা’র ভিত্তিতে ওহীর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য ব্যাখ্যার নামে বাতিল ও অকার্যকর করা।

‘ইলমুল গাইব’ ও ‘হাযির-নাযির’ বিষয়টি ইসলামের প্রথম কয়েকশত বছর ছিল না। পরবর্তী কালে এর উৎপত্তি। এ বিষয়েও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া আসমান-যমীনের মধ্যে কেউ গাইব জানেন না। বারংবার বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ‘গাইব’ জানেন না। মাক্কী সূরায়, মাদানী সূরায়, মদীনায় অবতীর্ণ একেবারে শেষ দিকের সূরায় সকল স্থানেই তা বলা হয়েছে। (দেখুন: সূরা (৬) আন‘আম: ৫০, ৫৯; সূরা (৭) আ’রাফ: ১৮৮; সূরা (৯) তাওবা: ১০১; সূরা (১০) ইউনুস: ২০; সূরা (১১): হূদ: ৩১; সূরা (২১) আম্বিয়া: ১০৯, ১১১; সূরা (২৭) নামল: ৬৫; সূরা(৪৬) আহকাফ: ৯; সূরা (৭২) জিন: ২৫ আয়াত)।

এর বিপরীতে একটি আয়াতেও বলা হয় নি যে, ‘রাসূলুল্লাহ () ‘আলিমুল গাইব’। তিনি ‘গাইবের সবকিছু জানেন’ এ কথা তো দূরের কথা ‘তিনি গাইব জানেন’ এ প্রকারের একটি কথাও কোথাও বলা হয় নি। তবে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ বলেছেন, এগুলো গাইবের সংবাদ যা আপনাকে ওহীর মাধ্যমে জানালাম... ইত্যাদি।

বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ () অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি ‘গাইব’ বা অদৃশ্য জ্ঞানের মালিক নয়, তিনি মনের কথা জানেন না, তিনি গোপন কথা জানেন না এবং তিনি ভবিষ্যত জানেন না। আয়েশা, উম্মু সালামা, আসমা বিনত আবী বাকর, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ, আনাস ইবনু মালিক, আবূ সাঈদ খুদরী, সাহল ইবনু সা’দ, আমর ইবনুল আস প্রমুখ প্রায় দশ জন সাহাবী (রাঃ) থেকে অনেকগুলো সহীহ সনদে বর্ণিত ‘মুতাওয়াতির’ হাদীসে রাসূলুল্লাহ () বলেছেন যে,

সাহ্ল ইব্নু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – কে বলতে শুনেছি যে, আমি হাউজের ধারে তোমাদের আগে হাজির থাকব। যে সেখানে হাজির হবে, সে সেখান থেকে পান করার সুযোগ পাবে। আর যে একবার সে হাউজ থেকে পান করবে সে কখনই পিপাসিত হবে না। অবশ্যই এমন কিছু দল আমার কাছে হাজির হবে যাদের আমি (আমার উম্মাত বলে) চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। কিন্তু এরপরই তাদের ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা দাড় করে দেয়া হবে।

আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন, আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম, এমন সময় নু’মান ইব্নু আবূ আয়াস আমার নিকট হতে এ হাদীসটি শুনে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সাহ্ল থেকে হাদীসটি এরূপ শুনেছেন। আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আবূ সা’ঈদ খুদ্রী (রাঃ) - কে এ হাদীসে অতিরিক্ত বলতে শুনেছি যে, নবী (সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন বলবেনঃ এরা তো আমারই অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয় জানেন না যে, আপনার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কি পরিবর্তন করেছে (নতুন নতুন ধর্মীয় নিয়ম, যা আপনি করতে বলেননি) । এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে, তারা (বিদআতী পির-অলি ও আলেম) দূর হোক, দূর হোক। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৫০-৭০৫১, আধুনিক প্রকাশনী- ৬৫৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫৭৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

আবদুল্লাহ্ ইব্নু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি হাউযে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেই হাজির থাকব। তোমাদের থেকে কিছু লোককে আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তাদের পান করাতে উদ্যত হব, তখন তাদেরকে আমার নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব, হে রব! এরা তো আমার সাথী। তখন তিনি বলবেন, আপনার পর তারা নতুন কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৭০৪৯, ৬৫৭৫, আধুনিক প্রকাশনী ৬৫৬০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৭৩)। হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস।

এ সকল অগণিত সহীহ হাদীসের বিপরীতে একটি হাদীসেও তিনি বলেন নি যে, আমি ‘আলিমুল গাইব’, বা আমি সকল গোপন জ্ঞানের অধিকারী, অথবা আমি তোমাদের সকল কথাবার্তা বা কাজ কর্মের সময় উপস্থিত থাকি, অথবা আমি ঘরে বসেই তোমাদের সকল কাজ কর্ম ও গোপন বিষয় দেখতে পাই ...  এরূপ কোনো কথাই তিনি বলেন নি।

তবে রাসূলুল্লাহ () ভবিষ্যতের সংবাদ প্রদান করেছেন, অনেক মানুষের গোপন বিষয় বলেছেন, কোনো কোনো হাদীসে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নে বা সালাতে দাঁড়িয়ে তিনি জান্নাত, জাহান্নাম সবকিছু দেখেছেন। তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে পিছনের মুসল্লীদেরকেও দেখতে পান বলে জানিয়েছেন। কিন্তু কখনোই বলেন নি যে, তিনি পর্দার আড়ালে, মনের মধ্যে বা দূরের কোনো কিছু দেখেন। বরং বারংবার এর বিপরীত কথা বলেছেন।

এখন মুমিনের দায়িত্ব এ সব কিছু সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করা। কুরআনের বিভিন্ন সুস্পষ্ট আয়াত ও বিভিন্ন সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে মুমিন বিশ্বাস করেন যে, রাসুলুল্লাহ () ‘গাইব’ জানতেন না। আবার কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসের ভিত্তিতে মুমিন বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে ওহীর মাধ্যমে গাইবের অনেক বিষয় জানিয়েছেন। তাঁর জ্ঞান ছিল সকল নবী-রাসূলের জ্ঞানের চেয়ে বেশি ও পূর্ণতর।

একান্ত প্রয়োজন না হলে কোনো ব্যাখ্যায় যেতে নেই। প্রয়োজনে ব্যাখ্যা করলেও গুরুত্বের কম বেশি হবে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে। স্পষ্ট কথাকে অস্পষ্ট কথার জন্য ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাতিল করা যাবে না। বরং প্রয়োজনে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন কথার জন্য অস্পষ্ট বা দ্ব্যর্থবোধক কথার ব্যাখ্যা করতে হবে। ‘খবর ওয়াহিদ’ বা একক হাদীসের জন্য কুরআনের স্পষ্ট বাণী বা মুতাওয়াতির ও মাশহূর হাদীস বাতিল করা যাবে না। প্রয়োজনে কুরআন বা প্রসিদ্ধ হাদীসের জন্য একক ও দ্ব্যর্থবোধক হাদীসের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা করতে হবে।

দলীল ও ব্যাখ্যার তুলনামূলক পর্যালোচনা

যারা রাসূলুল্লাহ -এর ইলমুল গাইবের বা হাযির-নাযির হওয়ার দাবি করেন তাঁরা নিজেদের পছন্দ বা বিভিন্ন আলিমের বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি ‘মত’ গ্রহণ করেন। এরপর এ সকল দ্ব্যর্থবোধক বা ফযীলত বোধক আয়াত ও হাদীসকে তাঁদের মতের পক্ষে ব্যাখ্যা করে সে ব্যাখ্যাকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। এরপর তাঁদের ‘মত’ ও ‘ব্যাখা’র ভিত্তিতে অগণিত সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীসকে ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করে দেন। পাঠকের হৃদয়ঙ্গমের জন্য এখানে তাঁদের এরূপ কয়েকটি ‘দলীল’ আলোচনা করছি।

প্রথম দলীল: কুরআনে বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ -কে ‘শাহিদ’ ও ‘শাহীদ’ (شاهد وشهيد) বলা হয়েছে। (সূরা (৩৩) আহযাব: ৪৫; সূরা (৪৮) ফাত্হ: ৮; সূরা (৭৩) মুয্যাম্মিল: ১৫; সূরা (২) বাকারা: ১৪৩; সূরা (৪) নিসা: ৪১; সূরা (১৬) নাহ্ল: ৮৯; সূরা (২২) হাজ্জ: ৭৮ আয়াত)।

এ শব্দ দুটির অর্থ ‘সাক্ষী’, ‘প্রমাণ’, ‘উপস্থিত’ (witness, evidence, present) ইত্যাদি। সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুফাস্সিরগণ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে () দীন প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে ও সাক্ষীরূপে প্রেরণ করেছেন। যারা তাঁর প্রচারিত দীন গ্রহণ করবেন, তিনি তাঁদের পক্ষে সাক্ষ্য দিবেন। এছাড়া পূর্ববর্তী নবীগণ যে তাদের দীন প্রচার করেছেন সে বিষয়েও তিনি এবং তাঁর উম্মাত সাক্ষ্য দিবেন। অনেকে বলেছেন, তাঁকে আল্লাহ তাঁর একত্বের বা ওয়াহদানিয়্যতের সাক্ষী ও প্রমাণ-রূপে প্রেরণ করেছেন। (তাবারী, তাফসীর ২২/১৮, ২৬/৭৩; ইবন কাসীর, তাফসীর ৩/৪৯৮)।

এখানে উল্লেখ্য যে, অনেক স্থানে মুমিনগণকেও মানব জাতির জন্য ‘শাহীদ’ বলা হয়েছে। (সূরা (২) বাকারা, ১৪৩; সূরা (২২) হজ্জ, ৭৮ আয়াত)।

অনেক স্থানে আল্লাহকে ‘শাহীদ’ বলা হয়েছে। (সূরা (৪) নিসা: ৭৯, ১৬৬; সূরা (৫) মায়িদা: ১১৭; সূরা (১০) ইউনূস: ২৯; সূরা (১৩) রা’দ: ৪৩; সূরা (১৭) ইসরা (বানী ইসরাঈল): ৯৬; সূরা (২৯) আনকাবূত: ৫২; সূরা (৩৩) আহযাব: ৫৫; সূরা (৪৬) আহকাফ: ৮; সূরা (৪৮) ফাত্হ: ২৮ আয়াত)।

যারা রাসূলুল্লাহ ()-কে ‘সকল অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী’ বা ‘হাযির-নাযির’ বলে দাবি করেন তাঁরা এই ‘দ্ব্যর্থবোধক’ শব্দটির একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেন। এরপর সেই অর্থের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কুরআনের সকল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বাণী বাতিল করে দেন। তাঁরা বলেন, ‘শাহিদ’ অর্থ উপস্থিত। কাজেই তিনি সর্বত্র উপস্থিত। অথবা ‘শাহিদ’ অর্থ যদি সাক্ষী হয় তাহলেও তাঁকে সর্বত্র উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ না দেখে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। আর এভাবে তিনি সদা সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান বা হাযির-নাযির ও সকল স্থানের সকল গোপন ও গাইবী জ্ঞানের অধিকারী।

তাঁদের এ ব্যাখ্যা ও দাবির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়ঃ

প্রথমত: তাঁরা এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী, তাবিয়ী ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত গ্রহণ না করে নিজেদের মর্জি মাফিক ব্যাখ্যা করেন এবং সাহাবী-তাবিয়ীদের ব্যাখ্যা বাতিল করে দেন।

দ্বিতীয়ত: তাঁরা একটি দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যাখ্যাকে মূল আকীদা হিসাবে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে কুরআন ও হাদীসের অগণিত দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা নিজেদের মর্জিমাফিক বাতিল করে দিলেন। তাঁরা এমন একটি অর্থ গ্রহণ করলেন, যে অর্থে একটি দ্ব্যর্থহীন আয়াত বা হাদীসও নেই। সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী বা কোনো ইমামও কখনো এ কথা বলেন নি।

তৃতীয়ত: তাঁদের এ ব্যাখ্যা ও দাবি মূলতই বাতিল। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে প্রত্যেক মুসলিমকেই ‘ইলমে গাইবের অধিকারী’ ও হাযির-নাযির বলে দাবি করতে হবে। কারণ মুমিনগণকেও কুরআনে ‘শাহীদ’ অর্থাৎ ‘সাক্ষী’ বা ‘উপস্থিত’ বলা হয়েছে এবং বারংবার বলা হয়েছে যে, তাঁরা পূর্ববর্তী সকল উম্মাত সহ পুরো মানব জাতি সম্পর্কে কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবেন। আর উপস্থিত না হলে তো সাক্ষ্য দেওয়া যায় না। কাজেই তাঁদের ব্যাখ্যা ও দাবি অনুসারে বলতে হবে যে, প্রত্যেক মুমিন সৃষ্টির শুরু থেকে বিশ্বের সর্বত্র সর্বদা বিরাজমান এবং সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন। কারণ না দেখে তাঁরা কিভাবে মানবজাতির পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবেন?!

দ্বিতীয় দলীলঃ কুরআন কারীমে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:

 ‘‘নবী মু’মিনগণের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর (closer) এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা। এবং আল্লাহর কিতাবে আত্মীয়গণ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর।’’ (সূরা (৩৩) আহযাব, ৬ আয়াত)।

এখানে ‘আউলা’ (أولى) শব্দটির মূল হলো ‘বেলায়াত’  (الولاية), অর্থাৎ বন্ধুত্ব, নৈকট্য, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি। ‘‘বেলায়েত’’ অর্জনকারীকে ‘‘ওলী’’ (الولي), অর্থাৎ বন্ধু, নিকটবর্তী বা অভিভাবক বলা হয়। ‘আউলা’ অর্থ ‘অধিকতর ওলী’। অর্থাৎ অধিক বন্ধু, অধিক নিকটবর্তী, অধিক যোগ্য বা অধিক দায়িত্বশীল (more entitled, more deserving, worthier, closer)।

এখানে স্বভাবতই ঘনিষ্ঠতর বা নিকটতর (closer) বলতে ভক্তি, ভালবাসা, দায়িত্ব, সম্পর্ক ও আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতা বুঝানো হচ্ছে। মুমিনগণ রাসূলুল্লাহকে তাঁদের নিজেদের চেয়েও বেশি আপন, বেশি প্রিয় ও আনুগত্য ও অনুসরণের বেশি হক্কদার বলে জানেন। এই ‘আপনত্বের’ একটি দিক হলো যে, তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। আবার উম্মাতের প্রতি রাসূলুল্লাহ ()-এর দরদ ও প্রেম উম্মাতের আপনজনদের চেয়েও বেশি। রাসূলুল্লাহ () স্বয়ং এই আয়াতের ব্যাখ্যায় এ কথা বলেছেন। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া ও আখিরাতে আমি প্রত্যেক মুমিনেরই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতর। যদি তোমরা ইচ্ছা কর তাহলে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে দেখঃ ( النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ )  ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর। তাই যখন কোন মুমিন মারা যায় এবং মাল রেখে যায়, তা হলে তার যে আত্মীয়-স্বজন থাকে তারা তার ওয়ারিস হবে; আর যদি সে ঋণ কিংবা অসহায় পরিজন রেখে যায়, তবে তারা যেন আমার নিকট আসে; আমিই তাদের অভিভাবক। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)  ২৩৯৯, ২২৯৮, ৪৭৮১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪০৪৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬১৯, আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২২৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২২৪১)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

কিন্তু ‘হাযির-নাযির’-এর দাবিদারগণ দাবি করেন যে, এখানে দৈহিক নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। কাজেই তিনি সকল মুমিনের কাছে হাযির আছেন।

এখানেও আমরা দেখছি যে একটি বানোয়াট ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তারা কুরআন ও হাদীসে অগণিত দ্ব্যর্থহীন নির্দেশকে বাতিল করে দিচ্ছেন। তাঁরা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ()-এর ব্যাখ্যাকেও গ্রহণ করছেন না। সর্বোপরি তাদের এ ব্যাখ্যা সন্দেহাতীতভাবেই বাতিল। কারণ এ আয়াতেই বলা হয়েছে যে ‘‘আত্মীয়গণ পরস্পর পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর’’। অন্যত্রও বলা হয়েছে যে, ‘‘আত্মীয়গণ একে অপরের ঘনিষ্ঠতর বা নিকটতর।’’ (সূরা (৮) আনফাল: ৭৫ আয়াত)।

তাহলে এদের ব্যাখ্যা অনুসারে আমাদের বলতে হবে যে, সকল মানুষই হাযির নাযির। কারণ সকল মানুষই কারো না কারো আত্মীয়। কাজেই তারা সদাসর্বদা তাদের কাছে উপস্থিত এবং তাদের সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন!

অন্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী () ও মুমিনগণ মানুষদের মধ্যে ইবরাহীম (আ)-এর সবচেয়ে ‘নিকটতর’ বা ‘ঘনিষ্ঠতর’ (أولى)। (সূরা (৩) আল-ইমরান, ৬৮)।

এখানে দাবি করতে হবে যে, সকল মুমিন ইবরাহীমের নিকট উপস্থিত...!

অন্য হাদীসে, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদ্বীনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীগণ ‘আশূরার দিনে সওম পালন করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কি ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে সওম পালন কর কেন?) তারা বলল, এ অতি উত্তম দিন, এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হতে নাজাত দান করেন, ফলে এ দিনে মূসা (আঃ) সওম পালন করেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী, এরপর তিনি এ দিনে সওম পালন করেন এবং সওম পালনের নির্দেশ দেন। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)  ২০০৪, ৩৩৯৭, ৩৯৪৩, ৪৬৮০, ৪৭৩৭, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ২৫৪৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১৩০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৬৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৮৭৫)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এখন আমাদের দাবি করতে হবে যে, আমরা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্য মূসার কাছে উপস্থিত!!

তৃতীয় দলীল: আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন,

তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, তোমরা রুকু ও সিজদা পূর্ণভাবে কর।[1] যাঁর হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম!। তোমরা যখন রুকূ এবং সিজদা কর তখন আমি তোমাদেরকে আমার পিছন থেকে অবশ্যই দেখতে পাই। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)   ৬৬৪৪, ৪১৯, ৭১৮, আধুনিক প্রকাশনী- ৬১৮১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১৮৯)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এ অর্থে আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন:

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি মনে কর যে, আমার দৃষ্টি (কেবল) ক্বিবলার দিকে? আল্লাহর কসম! আমার নিকট তোমাদের খূশু (বিনয়) ও রুকূ কিছুই গোপন থাকে না। অবশ্যই আমি আমার পেছন হতেও তোমাদের দেখতে পাই। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)  ৪১৮, ৭৪১, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৮৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪২৪, আহমাদ ৮০৩০, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০৭)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

এ হাদীস থেকে আমরা রাসূলুল্লাহ ()-এর একটি বৈশিষ্ট্যের কথা জানতে পারছি। তা হলো অন্যান্য মানুষ যেভাবে সামনে দেখে রাসূলুল্লাহ () পিছনেও সেভাবে সাহাবীগণের রুকু-সাজদা ইত্যাদি দেখতেন। ইসলামী আকীদার অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় এখানেও তিনটি ধারা বিদ্যমান:

(ক) মুতাযিলী ও ‘আকল’ বা জ্ঞানবুদ্ধির অনুসারী বলে দাবিদার কিছু মুসলিম। তাঁরা সহীহ হাদীসে প্রমাণিত এ বিষয়টিকে তাঁর ‘বাশারিয়্যাত’ বা মানবত্বের সাথে সাংঘর্ষিক বলে কল্পনা করে এ অর্থের হাদীসগুলি ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা বলেন: এখানে ‘দেখি’ অর্থ ‘ধারণা করি’, কারণ ‘দেখা’ আরবীতে ‘ধারণা’ বা মনের দেখা অর্থে ব্যবহৃত হয়, অথবা দেখি অর্থ আমাকে সংবাদ দেওয়া হয়... ইত্যাদি। তাঁদের দাবি: কুরআন প্রমাণ করে যে, তিনি মানুষ, আর মানুষ পিছনে দেখতে পরে না, অতএব কুরআনের অর্থ সংরক্ষণের জন্য এ হাদীসের এরূপ ব্যাখ্যা জরুরী। তাঁরা দাবি করেন, তাদের এ ব্যাখ্যা আরবী ভাষা ও কুরআন-হাদীসের ব্যাবহারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এরূপ ব্যাখ্যা ওহীর বিকৃতি মাত্র। মানবত্ব ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বৈপরীত্য কল্পনা করার কারণেই এ বিকৃতি।

(খ) শীয়া ও পরবর্তীকালে সুন্নীগণের মধ্যকার অতিভক্তিতে নিমজ্জিত মুসলিমগণ। তাঁরা ‘পিছনে দেখা’-র এ হাদীসটির একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেন, তা হলো: ‘বিশ্বের সকল স্থান ও সময়ের সবকিছু দেখতে পাওয়া’। এর ভিত্তিতে তাঁরা তাঁকে ‘আলিমুল গাইব’ ও ‘হাযির-নাযির’ বলে দাবি করেন। এরপর তাঁর বাশারিয়্যাত বিষয়ক ও ‘গাইব না জানা’ বিষয়ক কুরআন-হাদীসের অগণিত সুস্পষ্ট বক্তব্যগুলো ব্যাখ্যাপূর্বক বাতিল করেন।

(গ) সাহাবী-তাবিয়ীগণ ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ধারা। তাঁরা বাশারিয়্যাত বা মানবত্ব ও ‘পশ্চাত-দর্শন’ উভয় বিষয়কে স্বাভাবিক ও প্রসিদ্ধ অর্থে গ্রহণ করেন এবং সরল অর্থে বিশ্বাস করেন।

হাদীসটি পাঠ করলে বা শুনলে যে কেউ অনুভব করবেন যে, বিষয়টি স্বাভাবিক দৃষ্টি ও দর্শনের বিষয়ে। মানুষ যেরূপ সামনের দিকে দেখতে পায়, রাসূলুল্লাহ () সালাতের মধ্যে সেভাবেই পিছনে দেখতে পেতেন। হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবেই জানা যায় যে, এ দর্শন ছিল সালাতের মধ্যে ও রুকু সাজদার মধ্যে। অন্য সময়ে তিনি এইরূপ দেখতেন বলে কোনো হাদীসে বর্ণিত হয় নি। তা সত্ত্বেও যদি তা মনে করা হয় যে, তিনি সর্বদা এইরূপ সামনে ও পিছনে দেখতে পেতেন, তবুও এ হাদীস দ্বারা কখনোই বুঝা যায় না যে, তিনি দৃষ্টির আড়ালে, ঘরের মধ্যে, পর্দার অন্তরালে, মনের মধ্যে বা অনেক দূরের সবকিছু দেখতে পেতেন। তা সত্ত্বেও যদি কুরআন ও হাদীসের বিপরীত ও বিরোধী না হতো, তবে আমরা এই হাদীস থেকে দাবি করতে পারতাম যে, তিনি এভাবে সর্বদা সর্বস্থানের সর্বকিছু দেখতেন এবং দেখছেন। কিন্তু আমরা দেখেছি যে, বিভিন্ন আয়াতে ও অগণিত সহীহ হাদীসে সুস্পষ্টত ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বারংবার এর বিপরীত কথা বলা হয়েছে। মূলত মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়মত রাসূল ()-কে এরূপ ঝামেলা ও বিড়ম্বনাময় দায়িত্ব থেকে ঊর্ধ্বে রেখেছেন। ইবনু হাজার আসকালানী বলেন:

‘‘হাদীসের বাহ্যিক বা স্পষ্ট অর্থ থেকে বুঝা যায় যে, পিছন থেকে দেখতে পাওয়ার এ অবস্থাটি শুধুমাত্র সালাতের জন্য খাস। অর্থাৎ তিনি শুধু সালাতের মধ্যেই এইরূপ পিছন থেকে দেখতে পেতেন। এমনও হতে পারে যে, সর্বাবস্থাতেই তিনি এইরূপ দেখতে পেতেন। (আবূ জাফর আহমাদ ইবনু সাঈদ দাঊদী নামক একজন আলিম সহীহ বুখারীর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেন। তাঁর পরিচয় বা ব্যাখ্যাগ্রন্থটির নাম সম্পর্কে অন্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ইবনু হাজার আসকালানী ফাতহুল বারী রচনায় এ ব্যাখ্যাগ্রন্থটি থেকে অনেক সময় উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন)।

নামক ব্যাখ্যাকার একটি উদ্ভট কথা বলেছেন। তিনি এ বর্ণনায় ‘পরে’ শব্দটির অর্থ ‘মৃত্যুর পরে’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ উম্মাতের কর্ম তাঁর কাছে পেশ করা হবে। সম্ভবত তিনি আবূ হুরাইরার (রা) হাদীসের সামগ্রিক অর্থ চিন্তা করেন নি, যেখানে এ কথার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে...। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১/৫১৫, ২/২২৫)।

এখানে লক্ষণীয় যে, দাঊদীর যুগ বা হিজরী ৯ম শতাব্দী পর্যন্ত এরূপ উদ্ভট ব্যাখ্যাকারীরাও ‘দেখা’ বলতে ‘উম্মাতের কর্ম তাঁর কাছে উপস্থিত করা হলে দেখেন’ বলে দাবি করতেন। তিনি মদীনায় নিজ কবরে অবস্থান করে সবত্র সবকিছু দেখেন অথবা সদা সর্বদা সর্বত্র উপস্থিত হয়ে সব কিছু দেখেন বলে কেউ কল্পনা করে নি। সর্বোপরি পিছনে ‘দেখা’ বা ‘গায়েবী দেখা’ দ্বারা ‘সদা সর্বদা সর্বত্র উপস্থিতি’ বা সবকিছু দেখা প্রমাণিত হয় না। কুরআনে বলা হয়েছে যে, শয়তান ও তার দল মানুষদেরকে গায়েবীভাবে দেখে:

‘‘সে (শয়তান) ও তার দল তোমাদিগকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না।’’ (সূরা : ৭ আ’রাফ, ২৭ আয়াত)।

এখানে কি কেউ দাবি করবেন যে, যেহেতু ‘‘তেমাদিগকে দেখে’ (يراكم) বর্তমান কালের ক্রিয়া, সেহেতু শয়তান ও তার দলের প্রত্যেকে ‘হাযির ও নাযির’: তারা সদা সর্বদা সকল স্থানের সকল মানুষকে একই ভাবে দেখছে?

চতুর্থ দলীল: বিভিন্ন হাদীসে উম্মাতের বিভিন্ন কর্ম রাসূলুল্লাহ -এর নিকট পেশ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উম্মাতের দরুদ-সালাত তাঁর নিকট পেশ করা হয় অর্থে অনেকগুলো সহীহ হাদীস বর্ণিত। এছাড়া উম্মাতের সাধারণ কর্মও তাঁর নিকট পেশ করা হয় অর্থে হাদীস বর্ণিত।

এক হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন:

‘‘আমার জীবন তোমাদের জন্য কল্যাণকর; তোমরা কথা বল এবং আমিও তোমাদের সাথে কথা বলি। এবং আমার মৃত্যু তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তোমাদের কর্ম আমার কাছে পেশ করা হবে। আমি ভালকর্ম দেখলে  সেজন্য আল্লাহর প্রশংসা করব এবং খারাপকর্ম দেখলে তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছ ক্ষমা চাইব।’’ ইমাম হাইসামী বলেন: সনদের রাবীগণ নির্ভরযোগ্য। কোনো কোনো মুহাদ্দিস সনদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। (বায্যার, আল-মুসনাদ ১/৩০৭; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়ায়িদ ৮/৫৯৪; বূসীরী, ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারাহ ৭/৭৪;& আলবানী, যায়ীফাহ ২/৪০৪-৪০৬; হুওয়াইনি, আল-ফাতাওয়া আল-হাদীসিয়্যাহ (শামিলা) ২/১৪-১৫)।

এরূপ একটি বক্তব্য  প্রসিদ্ধ তাবিয়ী সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব (৯০ হি) থেকেও দুর্বল সনদে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ কিভাবে উম্মাতের জন্য ‘‘শাহিদ’’ হবেন বা সাক্ষ্য দিবেন তা ব্যাখ্যা করতে ইবনুল মুসাইয়িব বলেন: 

‘‘প্রতি দিনই সকালে বিকালে রাসূলুল্লাহ -এর সামনে তাঁর উম্মাতকে পেশ করা হয়, ফলে তিনি তাদেরকে তাদের নামে ও কর্মে চিনতে পারেন। এজন্য তিনি তাদের বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করবেন।’’ (কুরতুবী, মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ, আত-তাযকিরা ফী আহওয়ালিল মাওতা ও উমূরিল আখিরাহ, পৃ. ২৪৯; আল-জামিয় লি আহকামিল কুরআন ৫/১৯৮; ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫০০)।

উম্মাতের আমল রাসূলুল্লাহ ()-এর নিকট পেশ করার এ সকল হাদীসকে তাঁর ‘হাযির-নাযির’ ও ‘আলিমুল গাইব’ হওয়ার ‘দলীল’ হিসেবে পেশ করা হয়। এখানে নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষণীয়:

(১) উপরের হাদীসটি এবং সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িবের বক্তব্য নিশ্চিতভাবে ‘হাযির-নাযির’ ও ‘আলিমুল গাইব’ মতটি বাতিল প্রমাণ করে। কারণ এগুলি প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সদা-সর্বদা সবত্র হাযির (উপস্থিত) বা সবকিছুর নাযির (দর্শক) নন; বরং বরং উম্মাতের আমল তাঁর কাছে ‘হাযির’ করা হলে তিনি শুধু ‘আমলের’ নাযির বা দর্শক হন। তিনি উম্মাতের নিকট হাযির হন না; বরং উম্মাতের আমল তাঁর নিকট হাযির করা হয়।

(২) আমরা দেখেছি যে, দশজনেরও অধিক সাহাবী থেকে অনেক সহীহ সনদে বর্ণিত, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে সংকলিত ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন যে, তাঁর ওফাতের পরে সাক্ষী বা হাযির-নাযির হয়ে উম্মাতের সকল কর্ম দেখাশুনা করার ঝামেলা মহান আল্লাহ তাঁকে দেন নি। বরং তাদের অনেকের পরিবর্তন-উদ্ভাবন তিনি জানবেন না। দু-একটি দুর্বল বা একক হাদীসের মর্যিমাফিক ‘‘ব্যাখ্যা’’-কে আকীদার মূল বানিয়ে তার ভিত্তিতে কুরআন এবং মুতাওয়াতির হাদীসগুলির সুস্পষ্ট নির্দেশনা ব্যাখ্যার নামে বাতিল করার অর্থ ‘মিথ্যা’ ও ‘ব্যাখ্যা’ দ্বারা ধর্ম বিকৃত করা।

পঞ্চম দলীল: মহান আল্লাহ বলেন:

‘‘তুমি কি দেখ নি কেমন করলেন তোমার রব হস্তীবাহিনীর সাথে।’’ (সূরা (১০৫) ফীল: ১ আয়াত)।

রাসূলুল্লাহ ()-এর ‘‘হাযির নাযির’’ ও ‘‘ইলমুল গাইব’’ প্রমাণ করতে এ আয়াত উল্লেখ করা হয়। তাঁরা বলেন, এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ () তাঁর জন্মের পূর্বেও আবরাহার হস্তীবাহিনীর বিপর্যয় দেখেছিলেন। এথেকে বুঝা যায় যে, তিনি পূর্বের ও পরের সকল কিছু দেখেন, তিনি সর্বজ্ঞ এবং সদা-সর্বত্র হাযির বা বিরাজমান!!

এদের কেউ হয়ত সত্যিই অজ্ঞ এবং কেউ জ্ঞানপাপী। তা নাহলে আরবী ভাষা সম্পর্কে অভিজ্ঞ সকলেই জানেন যে, আরবীতে ‘‘দেখা’’ বলতে শুধু চক্ষুর দেখা বুঝানো হয় না, জানা বা জ্ঞানলাভও বুঝানো হয়। কুরআনে এরূপ ব্যবহার অগণিত। দুটি নমুনা দেখুন। কাফিরদের বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন:

‘‘তারা কি দেখে নি আমি ধ্বংস করলাম তাদের পূর্বে কত জাতি?’’ (সূরা (৬) আনআম: ৬ আয়াত)।

তাঁদের যুক্তির ধারায় এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আবূ জাহল-সহ সকল কাফিরই ‘‘হাযির-নাযির’’ বা অতীত-বর্তমান সবকিছুর দর্শক। তারা নূহ (আ) এবং অন্যান্য নবীদের (আ) যুগের কাফিরগণের ধ্বংসলীলার সময় উপস্থিত ছিল ও তা অবলোকন করেছিল!! অন্যত্র আল্লাহ বলেন:

 ‘‘তোমরা কি দেখ নি কিভাবে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ সপ্ত আসমানকে স্তর-বিন্যস্তকরে?’’ (সূরা (৭১) নূহ: ১৫ আয়াত)।

আমরা কি বলব যে, কুরআন পাঠকারী ও শ্রোতা সকলেই সপ্ত আকাশ সৃষ্টির সময় ‘‘হাযির’’ বা উপস্থিত ছিলেন এবং তা অবলোকন করেছিলেন?!

‘‘হাযির-নাযির’’, ‘‘ইলমুল গাইব’’ ইত্যাদি বিষয়ের সকল ‘‘দলীল’’-ই এরূপ। এভাবে আমরা দেখছি যে, রাসূলুল্লাহ ()-এর নামে এ সকল বানোয়াট ও মিথ্যা কথা যারা বলেন, তাঁরা তাঁদের কথাগুলোর পক্ষে একটিও দ্ব্যর্থহীন সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীস পেশ করছেন না। তাঁরা অপ্রাসঙ্গিক বা দ্ব্যর্থবোধক কিছু আয়াত বা হাদীসকে মনগড়াভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং এরপর এরূপ ব্যাখ্যার উপরে নির্ভর করে তাঁরা অগণিত আয়াত ও সহীহ হাদীস বাতিল করে দেন। যারা এরূপ ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ()-এর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান তাঁদের অনেকের নেক নিয়্যাত ও ভক্তি-ভালবাসা হয়ত নির্ভেজাল। তবে তাঁরা ভাল উদ্দেশ্যে ওহীর নামে মিথ্যা বলেছেন এবং রাসূলুল্লাহ ()-এর নামে এমন কথা বলেছেন যা তিনি কখনোই নিজের বিষয়ে বলেন নি।

দ্বিতীয় কারণ: এ সকল কথাকে রাসূলুল্লাহ ()-এর মর্যাদা-বৃদ্ধিকর বলে মনে করা এবং এ সকল কথা বললে তাঁর প্রতি ভক্তি, ভালবাসা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি বা পূর্ণতা পাবে বলে মনে করা।

নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ ()-এর ভক্তি ও ভালবাসা এবং তাঁর প্রশংসা করা ঈমানের মূল ও মুমিনের অন্যতম সম্বল। তবে এ জন্য কুরআনের অগণিত আয়াত ও অগণিত সহীহ হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশের বাইরে আমাদের যয়ীফ, মিথ্যা, বানোয়াট কথা বলতে হবে, বা যুক্তি, তর্ক, ব্যাখ্যা, সম্ভাবনা ইত্যাদি দিয়ে কিছু কথা বানাতে হবে এ ধারণাটিই ইসলাম বিরোধী।

সর্বোপরি, আমরা যে বিষয়টিকে তাঁর জন্য মর্যাদাকর বলে মনে করছি সেটা প্রকৃতপক্ষে অমর্যাদাকর হতে পারে। হাযির-নাযির বিষয়টিই দেখুন। আমরা জানি, মর্যাদাহীন ব্যক্ত্যিই মর্যাদাশীল ব্যক্তির নিকট ‘হাযির’ হন। রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, প্রশাসক, বিচারক এবং সকল পর্যায়ের মর্যাদাময় মানুষদের কাছে সাধারণ মানুষেরা ‘হাযির’ হন। এ সকল মর্যাদাময় মানুষেরা কখনোই সাধারণ মানুষদের কাছে ‘হাযিরা’ দিয়ে বেড়ান না। প্রয়োজনে কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ মানুষদের তথ্যাদি নিয়ে তাদের কাছে হাযির হন।

 সহীহ হাদীসগুলো রাসূলুল্লাহ -এর এ মর্যাদাই প্রমাণ করেছে। তিনি তাঁর পবিত্র কবরে অবস্থান করছেন। মহান আল্লাহ অগণিত ফিরিশতা নিয়োগ করেছেন যারা পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে উম্মাতের দরুদ-সালাম তাঁর নিকট পেশ করেন। এটিই তো মর্যাদার পূর্ণতা। কিন্তু অতিভক্তির নামে যদি কেউ দাবি করেন যে, তিনি নিজেই উম্মাতের দ্বারে দ্বারে হাযিরা দিয়ে বেড়ান তবে তা তাঁর মর্যাদা বাড়াবে না কমাবে তা পাঠক একটু চিন্তা করুন।

এজন্য মুমিনের নাজাতের একমাত্র উপায় সকল ক্ষেত্রে বিশেষত, আকীদা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আক্ষরিকভাবে কুরআন ও সুন্নাহর উপর নির্ভর করা। আমলের ক্ষেত্রে কোনো আমল কারো জন্য জরুরী আর কারো জন্য কম জরুরী বা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসের বিষয় তা নয়। তা সকলের জন্য সমান। এজন্য আলিমগণ বলেছেন যে, বিশ্বাসের ভিত্তি হবে কুরআন কারীম বা মুতাওয়াতির হাদীসের উপর। অর্থাৎ যে বিষয়টি বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য প্রয়োজন সে বিষয়টি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ () তাঁর সকল সাহাবীকে জানিয়েছেন এবং সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষাতেই জানিয়েছেন। আর এরূপ বিষয় অবশ্যই কুরআনে থাকবে বা ব্যাপক প্রচারিত ‘মুতাওয়াতির’ হাদীসে থাকবে।

বিশ্বাসের ভিত্তি ‘গাইবী’ বিষয়ের উপরে। এ সকল বিষয়ে ওহীর নির্দেশনা ছাড়া কোনো ফয়সালা দেয়া যায় না। কর্ম বিষয়ে কুরআন বা হাদীসে সুস্পষ্ট বিধান নেই এরূপ অনেক নতুন নতুন বিষয় উদ্ভাবিত হয়, এজন্য সেক্ষেত্রে কিয়াস ও ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়। যেমন মাইক, ধুমপান ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু বিশ্বাস বা আকীদার বিষয় সেরূপ নয়। এগুলোতে নতুন সংযোজন সম্ভব নয়। এজন্য আকীদা বিষয়ে কিয়াস বা ইজতিহাদ নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন ইমামগণ। (বিস্তারিত দেখুন: গ্রন্থকার রচিত: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃ. ৭০-৭৩)।

আল্লাহর গুণাবলি, নবীগণের সংখ্যা, মর্যাদা, ফিরিশতাগণের সংখ্যা, সৃষ্টি, কর্ম, দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ নেই। কুরআন ও হাদীসে যেভাবে যতটুকু বলা হয়েছে তাই বিশ্বাস করতে হবে। এ সকল ক্ষেত্রে আমরা ওহীর কথাকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করতে পারি, কিন্তু যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারি না।

এজন্য মুমিনের মুক্তির একমাত্র উপায় হলো, কুরআন কারীমের সকল কথাকে সমানভাবে গ্রহণ করা এবং কোনো কথাকে প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য কথাকে বাতিল বা ব্যাখ্যা না করা। অনুরূপভাবে সকল সহীহ হাদীসকে সহজভাবে মেনে নেয়া। ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে সাহাবীগণের অনুসরণ করা। যে বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্ট কিছু নেই এবং সাহাবীগণও কিছু বলেন নি, সে বিষয়ে চিন্তা না করা, কথা না বলা ও বিতর্কে না জড়ানো।

জাল বইয়ের জাল হাদীস

হিজরী দশম শতকের প্রসিদ্ধ আলিম ইবন হাজার হাইতামী মাক্কী (৮৯৯-৯৭৪/১৪৯৪-১৫৬৬ হি)-এর নামে তুরস্কের মাকতাবাতুল হাকীকাহ নামক একটি প্রকাশনা সংস্থা গত ১৯৯৩ খৃ (১৪১৪ হি) ‘‘আন-নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়িদি ওয়ালাদি আদাম’’ (বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত আদম সন্তানদের নেতার জন্মের মধ্যে) নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। এ বইটির মধ্যে মীলাদের পক্ষে সাহাবীগণের নামে অনেকগুলো সনদ বিহীন জাল হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। এ জাল বইটির প্রথম অধ্যায় নিম্নরূপ:

‘‘প্রথম পরিচ্ছেদ মীলাদুন্নবী ()-এর মর্যাদা বর্ণনায়। আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী পাঠের জন্য এক দিরহাম ব্যয় করবে সে জান্নাতে আমার সাথী হবে। উমার (রা) বলেন: যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তা’যীম করবে সে ইসলামকে জীবিত করবে। উসমান (রা) বলেন: যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী পাঠের জন্য এক দিরহাম ব্যয় করবে সে যেন বদর বা হুনাইনের যুদ্ধে যোগদান করলো। আলী (রা) বলেন: ‘‘যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তা’যীম করবে এবং মীলাদুন্নবী পাঠের কারণ হবে, সে দুনিয়া হতে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাসান বসরী (রাহ) বলেন: আমার কামনা হয় যে, যদি আমার উহদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তবে আমি তা মীলাদুন্নবী পড়ার জন্য ব্যয় করতাম। ... ইমাম শাফিয়ী (রাহ) বলেন: যদি কেউ মীলাদুন্নবীর জন্য বন্ধুদেরকে জমায়েত করে, খাবার প্রস্ত্তত করে, স্থান খালি করে দেয়, দান-খয়রাত করে এবং তার কারণে মীলাদুন্নবী পড়া হয় তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সিদ্দীক, শহীদ ও সালিহগণের সাথে উত্থিত করবেন এবং সে জান্নাতে থাকবে।...’’

এভাবে আরো অনেক তাবিয়ী, তাবি তাবিয়ী ও পরবর্তী বুজুর্গগণের নামে মীলাদুন্নবী ‘পড়া’-র ফযীলতে অনেক বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এখানে দুটি বিষয় আলোচনা করব:

(১) বইটি ইবন হাজার হাইসামীর নামে একটি জাল বই এবং

(২) এ সকল হাদীস ও বক্তব্য সবই নির্লজ্জ জালিয়াতদের বানানো মিথ্যা কথা। নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:

(ক) আল্লামা ইবনু হাজার হাইতামীর পুরো নাম: আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাজার শিহাবুদ্দীন মাক্কী শাফিয়ী। তিনি মীলাদুন্নবী উদযাপন ও মীলাদ পালনের সমর্থক ছিলেন। মীলাদুন্নবী বিষয়ক তাঁর রচিত একটি গ্রন্থের নাম ‘‘ইতমামুন নি’মাতিল কুবরা আলাল আলাম বিমাওলিদি সাইয়িদি ওয়লাদি আদাম’’, সংক্ষেপে: ‘আন-নি’মাতুল কুবরা’। গ্রন্থটি প্রসিদ্ধ। বিগত ৪০০ বৎসরে অনেক আলিম এ গ্রন্থের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন এবং গ্রন্থটির অনেক পান্ডুলিপি বিশ্বের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে বিদ্যমান।

এখানে আরব বিশ্বের কয়েকটি গ্রন্থাগার ও পান্ডুলিপি নম্বর উল্লেখ করছি। ইরাকের সুলাইমানিয়া প্রদেশের ওয়াকফ গ্রন্থাগার (মাকতাবাতুল আওকাফ), নং ১৩/৪৫৬-আইন এবং পান্ডুলিপি নং তা/মাজামী/২১৫-২১৮।  সৌদি আরবের রিয়াদস্থ বাদশাহ ফয়সল গবেষণা কেন্দ্র, পান্ডুলিপি নং- ০২৬৩৩, ১৫২২-ফা-কাফ এবং পান্ডুলিপি বিষয়ক অধিদপ্তর, পান্ডুলিপি গ্রন্থাগার, নং ১৫৮৫, ৭০৩০, ১৪৪৬। মরক্কোর খাযানাতু তাতওয়ান গ্রন্থাগারে, পান্ডুলিপি নং ১৩/৪৫৬-আইন। ইয়ামানের সানআ শহরের বড় মসজিদের প্রাচীন গ্রন্থাগার: মাকতাবাতুল জামিয়িল কাবীর, পান্ডুলিপি নং ২২-মীম-জীম। সিরিয়ার দামেশক শহরের যাহিরিয়া গ্রন্থাগার, পান্ডুলিপি নং ৮৭২২, ৮১৬৪, ১১৩০১, ১১৩৪১, ৮৫৭১, ১১৩৬১, ৯৪৮৩, ৯৫৫৩। এ সকল পান্ডুলিপির ভিত্তিতে এ বইটি ইদানিং বৈরুত থেকে ছাপা হয়েছে।

(২) তুরস্কের মাকতাবাতুল হাকীকাহ প্রকাশিত ‘আন-নি’মাতুল কুবরা’ গ্রন্থটির সাথে এ সকল পান্ডুলিপির কোনোরূপ মিল নেই। বস্ত্তত বইটির কভারের নাম ও লেখকের নাম ছাড়া ভিতরের সবই জাল।

(৩) ‘আন-নি’মাতুল কুবরা’-র মূল পান্ডুলিপিগুলোর বক্তব্য নিম্নরূপ:

‘‘আল্লাহর প্রশংসা করছি সকল পরিপূর্ণ প্রশংসা এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সর্বোত্তম ও পূর্ণতম কৃতজ্ঞতা... মীলাদুন্নবী পালনের মূলভিত্তি বর্ণনা করার জন্য আমি একটি পুস্তিকা লেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম....। এটি লিখতে আমি উদ্বুদ্ধ হলাম তার কারণ মীলাদ পালনের মূলভিত্তি বিষয়ে মানুষেরা মতভেদ করেছে যে তা বিদআত কি না। আর গল্পকার বক্তা ও ওয়ায়িজগণ ব্যাপকভাবে জাল হাদীস এবং ভিত্তিহীন গল্প ও কবিতা বলছেন। তারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল () থেকে একটুও লজ্জাবোধ করেন না- নির্লজ্জভাবে তাঁদের নামে মিথ্যা বলেন- কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এবং কখনো মুর্খতার কারণে। এজন্যই ইমামগণ বলেছেন: প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব দায়িত্ব হাত দিয়ে, জিহবা দিয়ে বা অন্তর দিয়ে এদের প্রতিবাদ করা।... প্রথম পরিচ্ছেদ মীলাদ পালনের মূল ভিত্তি বর্ণনার জন্য। পাঠক জেনে রাখুন যে, মীলাদ পালন বিদআত; কারণ রাসূলুল্লাহ () যে তিন যুগের কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন সে তিন যুগের সালফ সালিহীন কোনো ব্যক্তি থেকে এ কর্ম বর্ণিত হয় নি। তবে তা বিদআতে হাসানা বা ভাল বিদআত। কারণ এর মধ্যে অনেক ভাল কাজ অন্তর্ভুক্ত। যেমন দরিদ্রদের ব্যাপক কল্যাণ ও সহযোগিতা করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, বেশি বেশি যিকর ও দরুদ পাঠ.....। ক্রুশের অনুসারী খৃস্টানগণ যদি তাদের নবীর জন্মের রাতকে সবচেয়ে বড় ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তবে এ কাজে ইসলামের অনুসারীদের অধিকার অধিকতর। .....।’’ (ইবন হাজার হাইতামী, আন-নি’মাতুল কুবরা (মিসরের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত পান্ডুলিপি, নং ৪৪৯) পৃষ্ঠা ১-৩)।

(৪) আমরা দেখছি যে, মূল ‘নি’মাতুল কুবরা’ গ্রন্থের প্রথমেই ইবন হাজার হাইতামী সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছেন যে, সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ীগণের যুগের একজন মানুষও মীলাদুন্নবী পালনের কথা জানতেন না। খৃস্টান সম্প্রদায় ২৫ ডিসেম্বর যীশুখৃস্টের জন্মদিনকে বড়দিন বা ‘ঈদে মীলাদুল মাসীহ’ হিসেবে পালন করেন। বিশেষত ৫ম হিজরী শতকের শেষে ৪৯১ হি/ ১০৯৭ খৃ থেকে খৃস্টান ক্রুসেডারগণ সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক ও মিসরের বিভিন্ন দেশ দখল করে খৃস্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এ সকল দেশে দখলদার খৃস্টানগণ মহাসমারোহে বড়দিন বা ‘ঈদে মীলাদুল মাসীহ’ পালন করতেন। বিষয়টি মুসলিমদেরকে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ পালনের প্রেরণা দেয়। শতবর্ষ পরে ষষ্ঠ হিজরী শতকের শেষ প্রান্তে এসে মুসলিম সমাজও ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করে।

পক্ষান্তরে জাল ‘নি’মাতুল কুবরা’ বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদের মূল বক্তব্য যে, খুলাফায়ে রাশেদীন সকলেই মীলাদ পালন করতেন এবং মীলাদ পালনকেই দীনের সবচেয়ে বড় বিষয় বলে প্রচার করতেন। চার খলীফা যখন এভাবে মীলাদের মহাগুরুত্ব প্রচার করতেন তখন স্বভাবতই তাঁদের যুগের সকল সাহাবী-তাবিয়ী প্রতিদিনই মহাসমারোহে তা পালন করতেন!!

(৫) আলিমদের উদ্ধৃতিও জাল ‘নিমাতুল কুবরা’-র জালিয়াতি প্রমাণ করে। সীরাহ হালাবিয়্যাহর লেখক আল্লামা হালাবী (১০৪৪ হি), তাফসীর রুহুল বায়ানের লেখক আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী (১১২৭ হি), ‘জা’আল হক্ক’ গ্রন্থের লেখক মুফতি আহমাদ ইয়ার খান প্রমুখ আলিম মীলাদের পক্ষে ইবন হাজার হাইতামী থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি তা বিদআতে হাসানা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মীলাদের পক্ষে সাহাবী-তাবিয়ীগণ থেকে কোনো হাদীস উদ্ধৃত করেছেন বলে কেউই উল্লেখ করেন নি। পান্ডুলিপির বর্ণনায় রচিত গ্রন্থগুলোতেও উপরে উদ্ধৃত মূল পান্ডুলিপির বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। (হালাবী, আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ ১/১৩৭; ইসমাঈল হাক্কী, রুহুল বায়ান ৯/২, ৪৭; ইসমাঈল পাশা বাবাতী বাগদাদী, ঈযাহুল মাকনূন ২/৬৬১; হাদিয়্যাতুল আরিফীন ১/৭৮; মুফতি আহমাদ ইয়ার খান, জা‘আল হক (অনুবাদ অধ্যাপক লুৎফুর রহমান, মোহাম্মদী কুতুবখানা, চট্রগ্রাম, ১৯৮৮), দ্বিতীয়াংশ ৩৯-৪০)।

(৬) এভাবে আমরা নিশ্চিত যে, মাকতাবাতুল হাকীকাহ প্রকাশিত এ বইটি ইবন হাজার হাইসামীর নি’মাতুল কুবরার নাম চুরি করে প্রকাশিত একটি জাল বই। তবে লক্ষ্যণীয় যে, এ জাল বইটি যদি জাল না হয়ে ইবন হাজার হাইতামী মাক্কী শাফিয়ীর নিজের লেখা বলে প্রমাণ হতো তাতেও এ গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসগুলোর বিশুদ্ধতা প্রমাণ হতো না। ইবন হাজার মাক্কী শাফিয়ী তো দূরের কথা, স্বয়ং ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস মাক্কী শাফিয়ীও বা অন্য কোনো ইমাম, মুজতাহিদ, পীরানে পীর বা বুজুর্গও যদি এভাবে সনদবিহীন কোনো কথা উদ্ধৃত করেন তবে তা সনদ অনুসন্ধান ও যাচাই না করে কোনো মুসলিম কখনোই গ্রহণ করবেন না। ইমাম শাফিয়ী উদ্ধৃত অনেক হাদীস পরবর্তী শাফিয়ী ফকীহগণ দুর্বল বা জাল বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হানাফী, মালিকী, হাম্বালী, কাদিরী, চিশতী, শাযিলী... সকল মাযহাব ও তরীকার আলিমগণ একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। প্রথম পর্বে আমরা এ সকল বিষয় আলোচনা করেছি।

(৭) রাসূলুল্লাহ () ও সাহাবীগণের হাদীসের ভাষা, শব্দ ও পরিভাষা সম্পর্কে যার সামান্যতম জ্ঞান আছে তিনিও বুঝতে পারবেন যে, এগুলো সবই জাল কথা। কোনো ইংরেজি ডকুমেন্ট জাল করতে যেয়ে পানি খাওয়ার ইংরেজি (eating water), অথবা আরবী ডকুমেন্ট জাল করতে যেয়ে ‘‘নামায পড়া’’-র আরবী ‘‘قراءة الصلاة’’ লিখলে কোনো যাচাই ছাড়াই বুঝা যায় যে, ডকুমেন্টটি জাল এবং জালিয়াত একজন বাঙালী। তেমনি ‘মীলাদ পাঠের’ আরবী (قراءة المولد/ قراءة الميلاد) শুনলে কুরআন-হাদীসের আরবী বিষয়ে অভিজ্ঞ যে কেউ নিশ্চিত বুঝবেন যে, কথাটি কখনোই সাহাবীদের যুগের কারো কথা নয়; বরং সুনিশ্চিত জাল কথা এবং এ জালিয়াত তুর্কী বা তুর্কী যুগের তুর্কী ভাষা দ্বারা প্রভাবিত কোনো আরব জালিয়াত। ৬০০ হিজরীর দিকে মীলাদ উদযাপন শুরু হলে প্রথম কয়েক শত বৎসর একে (الاحتفال بالمولد) ‘মীলাদ উদযাপন, (عمل المولد) মীলাদ পালন ইত্যাদি বলা হতো। বিগত ২/৩ শত বৎসর যাবৎ মধ্যপ্রাচ্যে মীলাদ মাহফিলে মীলাদ বিষয়ক পুস্তিকা পাঠের প্রচলন হয়েছে। এজন্য বিগত ১/২ শত বৎসর যাবৎ মীলাদ অনুষ্ঠানকে অনেক সময় ‘‘মীলদুন্নবী পাঠ’’ বলা হয়। জালিয়াতগণ এ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন।

আরো কয়েকটি জাল হাদীস

মীলাদ পালনের পক্ষে জালিয়াতদের বানানো আরো দুটি হাদীস:

‘‘ইবন আববাস বলেন, একদিন তিনি নিজ বাড়িতে রাসূলুল্লাহ -এর জন্মের ঘটনাবলি বর্ণনা করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ আগমন করেন এবং বলেন: তোমাদের জন্য আমার শাফাআত পাওনা হলো।’’ (জালিয়াত লক্ষ্য করে নি যে, ইবন আববাসের বয়স ৮ বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগেই রাসূলুল্লাহ -এর ইন্তেকাল হয়। তিনি কি ৫/৬ বৎসর বয়সে ছেলেমেয়েদের হাদীস শুনাচ্ছিলেন!)

আবূ দারদা (রা) বলেন, ‘‘আমি রাসূলুল্লাহ -এর সাথে আমির আনসারীর (রা) বাড়ির পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তাঁর সন্তান ও পরিবারের মানুষদের তাঁর  জন্মের ঘটনাবলি শেখাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন: আজই সেই দিন। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য রহমতের দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন এবং ফিরিশতাগণ তোমাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছে।’’

বর্তমানে মীলাদের পক্ষের কোনো কোনো আলিম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৯১১ হি), আব্দুল হক্ক ইলাহাবাদী ও অন্যান্য আলিমের নামে এ সকল হাদীস উদ্ধৃত করছেন। এগুলোর কোনোরূপ সনদ কেউ উল্লেখ করেন নি। এমনকি ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরে সংকলিত কোনো গ্রন্থে এগুলো সনদসহ বা সনদ ছাড়া সংকলিত হয়েছে বলেও কেউ প্রমাণ বা দাবি করেন নি।

৬০০ বছর যাবৎ সকল ইমাম ও বুজুর্গই কি মীলাদ বিরোধী?

সম্মানিত পাঠক, ইহূদী-খৃস্টানগণ তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি কিতাবের নামে জালিয়াতি করে তাদের ধর্মকেই বিকৃত করতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিম উম্মাহও ইহূদী-খৃস্টানদের হুবহু অনুকরণ করে বিভ্রান্তির গভীরে নিমজ্জিত হবে বলে রাসূলুল্লাহ () উম্মাতকে বারবার সাবধান করেছেন। (খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃ. ৫৪১-৫৬০)।

আমরা দেখি যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে হাদীসের নামে জালিয়াতির প্রবণতা ইহূদী-খৃস্টানদের মতই ব্যাপকতা লাভ করে। তবে মহান আল্লাহ দীন ইসলামকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছেন। সাহাবীদের যুগ থেকে উম্মাতকে সনদ সংরক্ষণ ও সনদ-যাচাইয়ের তাওফীক দিয়ে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার পথটি রক্ষা করেছেন। ইহূদী-খৃস্টান ও অন্যান্য ধর্মের সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। অন্যান্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলোতে সনদ সংরক্ষণ ও বিচারের ব্যবস্থা না থাকায় সহীহ ও জাল এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, পার্থক্য করার কোনো যুক্তিসম্মত পদ্ধতি নেই, ফলে প্রত্যেকে নিজ নিজ যুক্তি-বুদ্ধি ও পছন্দ অনুসারে কিছু সহীহ ও কিছু জাল বলে দাবি করেন। আর ইসলামের মধ্যে জালিয়াতগণ অনেক জালিয়াতি করলেও যাচাই করার পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু যদি কেউ জালিয়াতি করতে চান বা জাল কথা গ্রহণ করতে চান তবে তার কথা ভিন্ন।

সম্মানিত পাঠক, ন্যূনতম পর্যায়ের সাধারণ জ্ঞানের যে কোনো মুসলিম বুঝতে পারেন যে, এ কথাগুলো জাল। কারণ এগুলোর কোনো সনদ নেই। ইসলামের প্রথম ৬/৭ শত বছরের মধ্যে লিখিত কোনো গ্রন্থে সনদ-বিহীনভাবেও এ মিথ্যা কথাগুলো উল্লেখ করা হয় নি। তবে এ সকল হাদীসকে সহীহ বলে গ্রহণ করা আরো ভয়ঙ্কর বিষয়। নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:

(ক) মীলাদের সমর্থকগণ নিশ্চিত করেছেন যে, প্রথম তিন প্রজন্মের কেউ মীলাদ উদযাপন করেন নি। পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ গবেষক প্রফেসর ড. তাহির কাদিরী রচিত ‘মীলাদুন্নবী’ গ্রন্থটি পাঠ করলে পাঠক দেখবেন যে, তিনি নিজেও নিশ্চিত করেছেন যে, বাদশাহ কুকবূরী (মৃত্যু ৬৩০ হি) প্রথম মীলাদ উদযাপন শুরু করেন। এছাড়া তিনি মীলাদের সমর্থনে গত ৮০০ বৎসরের অনেক প্রসিদ্ধ আলিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা সকলেই বলেছেন, প্রথম তিন প্রজন্মের কেউ মীলাদ পালন করেননি।

(ড. তাহির কাদিরী, মীলাদুন্নবী (লাহোর, মিনহাজুল কুরআন পাবলিকেশন্স ২০০৪) পৃ ৫০৩, ৬১৫, ৬২৬-৬৩১, ৬৩৮-৬৩৯, ৯২৬)।

এখন উপরের জাল হাদীসগুলোকে সহীহ বলে দাবি করার অর্থ সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী তিন প্রজন্মের সকলকে বিভ্রান্ত বলে দাবি করা (নাউযূ বিল্লাহ)। কারণ রাসূলুল্লাহ () ও খুলাফায়ে রাশেদীনের এতগুলো বক্তব্য জানার পরেও যারা মীলাদ পালন করেন নি তাদের চেয়ে হতভাগা-বদকার ও রাসূলুল্লাহ ()-এর মর্যাদার শত্রু আর কে হতে পারে!! (নাঊযু বিল্লাহ)

(খ) এ সকল হাদীসকে সহীহ বলে মানতে হলে হাজার বৎসরের সকল হাদীস সংকলক মুহাদ্দিসকে নবীজী ()-এর দুশমন (!!) বলে গণ্য করতেই হবে। কারণ, ইবন আববাস (রা), আবূ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত মীলাদের মর্যাদা বিষয়ক রাসূলুল্লাহ ()-এর হাদীস এবং আবূ বকর (রা), উমার (রা), উসমান (রা) ও আলী (রা) থেকে বর্ণিত মীলাদের হাদীসগুলো তাঁরা গোপন করেছেন। এ সকল সাহাবী (রা) থেকে সহীহ, যয়ীফ বা জাল সনদে বর্ণিত অতি সাধারণ বিষয়ে অগণিত হাদীস তাঁরা সংকলন করলেন, অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ হাদীসগুলো তাঁরা কেউ কোনোভাবে সংকলন করলেন না!!

ইসলামের প্রথম হাজার বৎসরে সংকলিত হাদীসগ্রন্থগুলোতে হাঁটাচলা, পানাহার, মলমূত্র ইত্যাদি বিষয়ে অগণিত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ও অনুচ্ছেদ বিদ্যমান। কিন্তু ‘কিরাআতুল মাওলিদ’ (মীলাদ পাঠ), ‘আমালুল মাওলিদ’ (মীলাদ পালন), ‘ইহতিফালুল মাওলিদ’ (মীলাদ উদযাপন) ইত্যাদি নামে এ সকল হাদীসের গ্রন্থে একটি অধ্যায় তো দূরের কথা, একটি পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদও তারা লিখেন নি এবং একটি হাদীসও তাঁরা সংকলন করেন নি।

(খ) ইমাম আবূ হানীফাসহ চার ইমাম ও ইসলামের প্রথম ৬০০ বৎসরের সকল ফকীহ একইভাবে রাসূলুল্লাহ ()-এর মর্যাদা ও মীলাদের দুশমন বলে গণ্য হবেন। কারণ, তাঁরা তাঁদের ফিকহী গ্রন্থগুলোতে অতি সামান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁদের কারো গ্রন্থে ‘কিরাআতুল মাওলিদ’ (মীলাদ পাঠ), ‘আমালুল মাওলিদ’ (মীলাদ পালন), ‘তাযীমুল মাওলিদ’ (মীলাদের তাযীম) ইত্যাদি নামে কোনো একটি অধ্যায়, পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ বা মাসআলা তাঁরা লিখলেন না। এর গুরুত্বও বললেন না!

(গ) উম্মাতের প্রথম ৬০০ বৎসরের সকল আলিমই মীলাদ-বিরোধী ও রাসূলুল্লাহ ()-এর মর্যাদার দুশমন (!!!) বলে গণ্য হবেন। কারণ, ৬০৪ হিজরী সালে মীলাদুন্নবী পালনের উদ্ভব হওয়ার পর থেকে বিগত ৮০০ বৎসরে উম্মাতের আলিম ও বুজুর্গগণ মীলাদুন্নবী বিষয়ে হাজার হাজার পুস্তক-পুস্তিকা রচনা করেছেন। কিন্তু এর আগের ৬০০ বৎসরে একজন আলিম বা বুজুর্গ মীলাদুন্নবী বিষয়ে একটি পুস্তিকাও রচনা করেন নি। মীলাদের সমর্থক আলিমগণও বারবার উল্লেখ করেছেন যে, মীলাদ বিষয়ক প্রথম বই রচনা করেন আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবনু দেহিয়া (৬৩৩ হি.)। তাঁর রচিত এ বইয়ের নাম: ‘‘আত-তানবীর ফী মাওলিদিল বাশির আন নাযীর’’। (ড. তাহির কাদিরী, মীলাদুন্নবী (লাহোর, মিনহাজুল কুরআন পাবলিকেশন্স ২০০৪) পৃ ৫০৩, ৬১৫, ৬২৬-৬৩১, ৬৩৮-৬৩৯, ৯২৬)।

পূর্ববর্তী ৬০০ বৎসরের ইমাম, ফকীহ, মুজতাহিদ, মুজাদ্দিদ, পীরানে পীর, বুজুর্গ কেউ মীলাদ বিষয়ে একটি পুস্তিকাও লিখেন নি। তাঁরা অনেক বই লিখেছেন, কিন্তু তাঁদের লেখা বইয়ের মধ্যে ‘কিরাআতুল মাওলিদ’ (মীলাদ পাঠ) বা ‘আমালুল মাওলিদ’ (মীলাদ পালন) বিষয়ে একটি ছোট্ট অনুচ্ছেদ বা বাক্যও লিখেন নি!

আমরা যখন বলি যে, ইসলামের প্রথম ৬০০ বৎসর মীলাদ পালন ছিল না, পরে উদ্ভব হয়েছে তখন বিষয়টি খুবই সহজ হয়ে যায়। যেহেতু তাঁদের সময়ে কেউ মীলাদ পালন করার বিষয়টি জানতই না সেহেতু তাঁরা এ বিষয়ে কিছু লিখেন নি। কিন্তু যখন প্রমাণ হয় যে, হাদীসে নববী এবং সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্যে মীলাদের গুরুত্ব বিদ্যমান তখন বিষয়টি ভিন্ন হয়ে যায়। হাদীসে মীলাদের এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও তাঁরা মীলাদের বিষয়ে একটি লাইন লিখলেন না! জীবনে মীলাদ পালন করলেন না! তাঁরা কেমন মুসলমান???

বিষয়টি কী প্রমাণ করে? স্বভাবতই প্রমাণ করে যে, উম্মাতের প্রথম ৬০০ বৎসরে মুসলিমগণ ‘কিরাআতুল মাওলিদ’ (মীলাদ পাঠ), ‘আমালুল মাওলিদ’ (মীলাদ পালন) ইত্যাদি কিছুই জানতেন না। কিন্তু যদি কেউ উপরের হাদীসগুলোকে সহীহ বলে দাবি করেন তবে তাকে মানতেই হবে যে, উম্মাতের প্রথম ৬০০ বৎসরের সকল ইমাম, মুজাদ্দিদ, পীরানে পীর, বুজুর্গ সকলেই মীলাদ বিরোধী ছিলেন। শুধু তাই নয়, উপরন্তু তাঁরা মীলাদ বিষয়ক হাদীস গোপনের মত মহাপাপ করেছেন।

(ঘ)  ইমাম শাফিয়ীর প্রতিটি বক্তব্য সংকলন ও আলোচনা করেছেন বাইহাকী, নাবাবী ও অন্যান্য শাফিয়ী মুহাদ্দিস-ফকীহ। ইবন হাজার হাইতামী শাফিয়ীর নামে জালকৃত এ বইয়ে মীলাদের গুরুত্ব বিষয়ে তাঁর এ মহান বক্তব্যটি তাঁরা সকলেই গায়েব করে দিয়েছেন! শাফিয়ী মাযহাবের কোনো গ্রন্থে এ বক্তব্য নেই। এমনকি ইবন হাজার হাইতামীর লেখা শাফিয়ী মাযহাবের বড়বড় ফিকহী গ্রন্থেও তিনি মীলাদ বিষয়ে ইমাম শাফিয়ীর এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন নি। আমাদের মানতে হবে যে, এ বক্তব্য জাল অথবা নাবাবী, বাইহাকী, গাযালী, সুয়ূতী, ইবন হাজার আসকালানী, ইবন হাজার হাইতামী ও সকল শাফিয়ী ফকীহ তাঁদের ঈমানী ত্রুটির কারণে মীলাদের প্রসঙ্গ গোপন করেছেন!!

৮০০ বছরের সকল মীলাদ-পন্থীই কি সত্যগোপনকারী?

সম্মানিত পাঠক, এখানে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ৮০০ বৎসর যাবৎ অগণিত আলিম মীলাদের পক্ষে বইপত্র লিখেছেন। তাঁরা সকলেই মীলাদকে বিদআতে হাসানা বলেছেন এবং ইসলামের প্রথম তিন যুগে কেউ মীলাদ পালন করেন নি বলে বারবার নিশ্চিত করেছেন। উপরের জাল হাদীসগুলোকে সহীহ মানতে হলে আমাদের মানতে হবে যে, তাঁরা সকলেই সত্য গোপন করেছেন এবং মীলাদের অবমর্যাদা করেছেন। তাঁরা আবূ লাহাবের আমল দিয়ে মীলাদ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, অথচ রাসূলুল্লাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুস্পষ্ট হাদীসগুলো গোপন করেছেন। হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, ইতিহাস, তাসাউফ ইত্যাদি বিষয়ে সকল দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ ও অধ্যয়ন করে পানাহার, শয়ন-নিদ্রা, মলমূত্র এবং অন্যান্য অতি সাধারণ বিষয়ের হাদীসগুলো তারা সংগ্রহ, সংকলন ও যাচাই-বাছাই করলেন, অথচ মীলাদের গুরুত্ব বিষয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ হাদীসগুলো তারা সংকলন বা মূল্যায়ন কিছুই করলেন না!!

সম্মানিত পাঠক, খৃস্টান প্রচারকণ বাংলাদেশের মুসলিমদের নানাবিধ প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করছেন। জালিয়াতিতে ভরা ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’, ইঞ্জিল শরীফ ইত্যাদিকে ‘আল্লাহর কালাম’ হিসেবে পেশ করে তারা মুসলিমদের প্রতারণা করছেন। আমরা যখন ময়দানে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে জালিয়াতি প্রমাণ করতে যাই তখন তারা বিভিন্ন অযুহাতে পালিয়ে যান বা এড়িয়ে যান। কিন্তু ময়দান ফাঁকা হলেই তারা সরল মুসলিমদের বলেন, কুরআনেই তো আছে তাওরাত-ইঞ্জিল আল্লাহর কালাম, সেগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে। আর আমাদের হাতের এগুলোই আদি-অকৃত্রিম তাওরাত-ইঞ্জিল। কাজেই এগুলো বিশ্বাস না করলে মুসলমান থাকা যাবে না!!

জাল হাদীসের বিষয়টিও একইরূপ। বিগত দেড় হাজার বছর যাবৎ যত জাল হাদীস ও জাল পুস্তক প্রকাশ পেয়েছে, উম্মাতের আলিমগণ সেগুলোর জালিয়াতি উন্মোচন করেছেন। কিন্তু যারা যে কোনোভাবে নিজের মত প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর তারা জালিয়াতির এ সকল প্রমাণ খন্ডনের চেষ্টা না করে এবং হাদীসগুলোর সনদ অনুসন্ধান না করেই সাধারণ মুসলিমদের সামনে এগুলোকে হাদীস হিসেবে পেশ করে নিজেদের মত প্রমাণের চেষ্টা করছেন। জাল ‘নি’মাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ও মীলাদ বিষয়ক অন্যান্য জাল হাদীসের একই অবস্থা।

জালিয়াতি ও বিকৃতির অগণিত অকাট্য প্রমাণ জানার পরেও ইহূদী-খৃস্টানগণ বিভিন্ন অজুহাতে তাদের জাল ধর্মগ্রন্থগুলো প্রচার করে চলেছেন। মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও কিছু মানুষ এরূপই করছেন। তুরস্কের মাকতাবাতুল হাকীকাহ প্রকাশিত এ জাল বইটির জালিয়াতি সুস্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও এবং এতে উল্লেখিত হাদীসগুলো সনদবিহীন ও ভিত্তিহীন হওয়া সত্ত্বেও মীলাদ সমর্থক কিছু আলিম এ বইটির অনুবাদ ও প্রচার করছেন। হাদীসগুলোর সনদ অনুসন্ধানের কোনোরূপ চেষ্টাও করছেন না। ইহূদী-খৃস্টান ধর্মে জাল কথাগুলো সহীহ কথার সাথে মিশে গিয়েছে। তবে সনদ ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহ উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য যাচাইয়ের পথ খোলা রেখেছেন। হাজার বছর চলে গেলেও এবং হাজার হাজার প্রসিদ্ধ ইমাম আলিমের নামে জালিয়াতি করলেও কোনো জাল কথাই ইসলামের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে পারে না। সত্যানুসন্ধানীর জন্য নিরপেক্ষ ও বস্ত্তনিষ্ঠ যাচাইয়ের পথ উন্মুক্ত।

রাসূলুল্লাহ ()-এর নামে বা সাহাবী-তাবিয়ীগণের নামে মীলাদের পক্ষে এতগুলো হাদীস দেখে মুমিনের জন্য আনন্দিত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তাঁর ঈমানের দাবি যে, তিনি প্রথমেই এগুলোর সনদ ও সূত্র উদ্ধার করার চেষ্টা করবেন। নয়শত বা হাজার বছর পরে একজন আলিম একটি হাদীস বলছেন, তাহলে নিশ্চয় পুরাতন কোনো গ্রন্থে তা রয়েছে। মীলাদের পক্ষের বা বিপক্ষের প্রত্যেক আলিমের দায়িত্ব এগুলোর সনদ অনুসন্ধান ও যাচাই। যদি সনদ পাওয়া যায় ও গ্রহণযোগ্য হয় তবে সেগুলো মেনে নেওয়া প্রত্যেক মুমিনের ঈমানের দাবি। আর যদি সনদ না পাওয়া যায় বা সনদ জাল বলে প্রমাণ হয় তবে এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। ইবন হাজার হাইতামী এবং অন্যান্য ইমাম ও মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসের সনদ না জেনে বা অন্তত হাদীসের কোন গ্রন্থে তা সংকলিত তা নিশ্চিত না হয়ে সনদ-বিহীন হাদীস উল্লেখ করা ভয়ঙ্কর হারাম কর্ম এবং কোনো খতীব, ওয়ায়িজ বা লেখক এরূপ করলে তাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে শাস্তি দেওয়া জরুরী। (ইবন হাজার হাইতামী, আল-ফাতাওয়া আল-হাদীসিয়্যাহ (বৈরুত, তুরাস), পৃষ্ঠা ৬৩-৬৪ ও ১২১-১২২)।

সম্মানিত পাঠক, মীলাদ ও অন্য যে কোনো বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ভিন্ন মত পোষণ করা, ইজতিহাদ করা ও প্রমাণ পেশ করার অধিকার সকলেরই রয়েছে। কিন্তু তাই বলে জালিয়াতি!!

উল্লেখিত দলিলসমূহ দ্বারা এটা প্রমানিত যে, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা সুস্পষ্ট বিদআত।

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বিদআতি আমল থেকে হেফাযত করুন। আমিন!!

(সমাপ্ত)

Author and Compiler:

Md. Izabul Alam-M.A., C.In., Ed. (Islamic Studies-Rangpur Carmichael University College, Rangpur), Prominent Islamic Thinker, Researcher, Political Analyst, Writer and Blogger.

(1) GENERAL DIRECTOR-MEDINA SAHIH HADITH RESEARCH CENTER (MSHRC)

(2) GENERAL DIRECTOR- PURE MUSLIM MAKING RESEARCH CENTER (PMMRC),

(3) DIRECTOR-Bangladesh BCS Coaching (BBC)

(4) PRINCIPAL -PGDHRM TRAINING INSTITUTE (PTI)

(5) PRINCIPAL- BANGLADESH ONLINE UNIVERSITY (BOU)

(6) GENERAL DIRECTOR AND CONSULTAT-PRIVATE INVESTIGATION SERVICES (PIS)

(7) EDITOR-BDC CRIME NEWS24

কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক লেখকের অন্যান্য সকল বই এক সাথে দেখতে চাইলে PMMRC এর উপর ক্লিক করুন।

(PMMRC)

আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক

বইয়ের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Addressসহ অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। এজন্যে  আপনি বসে বসে সওয়াব পেতে থাকবেন।

(ক) আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০)।

(খ) তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে ভাল কথা আর কি হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে নেক আমল করে আর বলে যে, আমি সাধারণ মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। (সূরা হা মীম সিজদা আয়াত-৩৩)।

(গ)  আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে সৎ কাজের দিকে আহবান করবে, তার জন্যও সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে যা তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে, অথচ তাদের সাওয়াবের কোন অংশ একটুও কমবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাউকে গোমরাহীর দিকে আহবান করে তারও সে পরিমাণ গুনাহ হবে, যতটুকু গুনাহ তার অনুসারীদের জন্য হবে। অথচ এটা অনুসারীদের গুনাহকে একটুও কমাবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ১৫৮, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৬৬৯৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫৬০, ইসলামিক সেন্টার ৬৬১৪)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

(ঘ) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল। (সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) ৩৪৬১, আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২১২, হাদিস  সম্ভার, হাদিস নং ১৫৪৮,  রিয়াদুস  সলেহিন,  হাদিস নং  ১৩৮৮)। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)।

Please Share On 

No comments:

Post a Comment

ইসলামি আইন বাস্তবায়নে অধিকাংশ আলেমদের মুনাফিকীকরণ।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ইসলামি আইন বাস্তবায়নে অধিকাংশ আলেমদের মুনাফিকীকরণ ভূমিকাঃ আল্লাহতায়ালা বলেন, “সঠিক পথ প্রদর্শনের পরও যারা বি...